মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

মুর্শিদা জামানের গল্প : অপ্রতিরোধ্য বসন্ত


রীতিমত জমকালো অনুষ্ঠান পর্ব দিয়ে তাকে আগত বন্ধু স্বজনদের সামনে উপস্থিত করা হলো যখন কারো মুখে রা ছিলনা পর্যন্ত। আর থাকবেই বা কি করে! এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে সেই দুরূহ ভাবনা কে ভাবতে পেরেছে? প্রত্যেকের সামনে তখন ধোঁয়া ওঠা কাবাব, তাতে স্বর্গীয় সুগন্ধ ঢালা পরম যত্নে বানানো সোনালী সস। অথচ ভ্রুক্ষেপটি নেই কারো। প্রত্যেক নর নারীর চোয়াল থেকে আনন্দ ঠিকরে বেরুচ্ছে। রমনীকুলের সবার মনে হতে লাগলো সঠিক পোশাক পরে আসা হয়নি আজ। পুরুষদের ভেতর থেকেও মৃদু ফিসফিসানি।

‘আরও সময় নিয়ে দাড়ি কামানো উচিত ছিল, কে জানতো সে কথা!’

আনুষ্ঠানিক আলাপচারিতা এবং আহার পর্বের পরই কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে গান করলো। কেউ বা দু’চারটে কৌতুক শোনালো। কেবল যাকে ঘিরে এতসব আয়োজন তার কোন মেজাজ মর্জি টের পাওয়া গেলনা। নিরেট পাথুরে মূর্তির মত অবস্থান নিয়ে সে বসে আছে কেবল, তবু কী অলিক সৌন্দর্য খেলা করছে সবটা জুড়ে। কথা না বলুক, হাসিতে ফেটে না পড়ুক এমনি বসে থাক। তাতেই জীবন ধন্য হতে চলেছে সবার।

অনিচ্ছাসত্বেও মিশকালো বেড়ালের মতো গুটি গুটি পায়ে বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরলো অবশেষে সবাই। যাবার আগে প্রত্যেকের ফেলা দীর্ঘশ্বাসে ঘর ভারি হয়ে এলো, এতটা ধারালো আর লম্বা ছিল সে দীর্ঘশ্বাস যে তা দিয়ে মস্ত একটি পুকুর কেটে ফেলা যেতো অনায়াসে। রাতে কেউ ঘুমোতেই পারলোনা -- ইস আমার কেন নেই?

- আহ! যদি থাকতো আমার! অপ্রাপ্তির বেদনায় জবুথুবু হয়ে ক্লান্ত সকলে সেদিন দেখলো আবারো সকাল হয়েছে কোন পরিবর্তন ছাড়াই। সূর্য বা সকাল কোনটাই কাউকে বিস্মিত করে না বহুকাল।

সহজ সরল সকালকে তান্ডবে পরিণত করতে মেঘলার চিৎকারই যথেষ্ট। একটু আলসেমি, গড়িমসি, এপাশ-ওপাশ আজ কোনটাই হলোনা জামিউলের।

- আগেই বলেছিলাম, ওটাকে বেঁধে রাখো। কোন কথা শুনলেনা।

- কী হয়েছে, চেঁচাচ্ছ কেন?

- ছাদের সবগুলো খাঁচার দরজা খুলে দিয়েছে, একটা পাখিও নেই।

পাখি হারানোর বেদনার চাইতে চিৎকারের মাত্রা এতো বেশি কিছুতেই অনুভব করা গেলনা তাকে।

- উড়ে গেছে, ভালো হয়েছে। নতুন এনে দেয়া যাবে। দয়া করে চেঁচামেচিটা বন্ধ কর।

- একটা অচেনা উটকো লোকের জন্য আমার এতদিনের পোষা পাখিদের হারালাম। আর তুমি বলছো চুপ করতে!

- এই উটকো লোকটিকে নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় তুমিই কিন্তু বান্ধবীদের সাথে আহ্লাদে কুটি পাটি হচ্ছিলে।

- সেটার কথা আলাদা। আজ পাখি গেছে। কাল কি হবে সেটা তুমি জানো?

- না, কেউই জানে না!

মেঘলার সাথে আর কথা না বাড়িয়ে সোজা ছাদে এলো ‘জামিউল’। তরল সোনার মতো রোদে ঝিলিক খাচ্ছে সে। মিষ্টি হাসিতে ভরা মুখ। শূণ্য খাঁচার পাশে একটা ভরাট পৃথিবী যেনো।

- তুমি খেয়েছো?

মাথা নাড়লো সে।

- মেঘলার ওপর রাগ করোনা। অনেকদিনের পোষা পাখি তো, তাই অমন করছে।

- পোষা হলে তো উড়ে যেতো না। দরজা খুলে দিলাম। ওরা তো দিকবিদিক হয়ে উড়ে গেলো!

- তুমি তো বেশ কথা বলতে পারো। তাহলে কাল চুপচাপ ছিলে কেন? দেরি হয়ে যাচ্ছে। চল খেয়ে নেই।

এক সপ্তাহ ধরে ল্যাপটপ চালাতে শিখছে তোতাই কিন্তু খুব যে আগ্রহ আছে তা নয়। তার মনোযোগ রান্নাঘরেই বেশি। আর যে কি কি জানে সেটা এখনো আবিস্কার হয়নি। এক মাসের কিছু বেশি সময় ধরে তোতাই এখানে। শহুরে চালচলন কিংবা ভাষা সবই রপ্ত করেছে নিমিষে। তোতাইয়ের থরো চেকআপের দিন কিছুটা ভয় হচ্ছিল। তেমন বেগ পেতে হয়নি অবশ্য সেদিন। যত সময় যাচ্ছে তোতাই তত আকৃষ্ট করছে সবাইকে। শহরের প্রথম স্বাস্থ্যবান তরুণ সে। এমন তরতাজা ঝড়ো হাওয়ার মতো পুরুষ কয়েক দশক ধরে দেখেনি কেউ। পুরুষ গুলোর দিকে তাকানো যায়না। মাথার তালুতে প্রথম অসুখটা ধরা পড়ে। এরপর শরীরের চামড়া মাচায় ঝুলতে থাকা লাউ-শসার মতো হয়ে যায়। গলার চামড়া গলকম্বলের ন্যায় তাই ঢাকতে জামা কাপড়ের কাটিং বদলে গেছে। বেশিরভাগ পুরুষই ঘরবন্দী জীবন আঁকড়ে মরা কাঠের মতো পড়ে থাকে এক কোনে। আশ্বার্য হলেও সত্যি কোন নারী এই ব্যাধীতে আক্রান্ত হয়নি। অনন্ত যৌবনা সব। প্রাণশক্তিতে, কর্মে, অক্লান্ত তারা।

ঠিক এইরকম পরিস্থিতি যে কতদিন চলবে তা কেউ জানেনা। অনেকেই ভুলে গেছে তাদের অতীত। পূর্বপুরুষরা কেমন ছিল দেখতে, তাদের নিয়ে ভাবতেও চায় না আর। চোখের সামনে যাই পায় তাই নিয়ে মেতে থাকাতেই আনন্দ এখন। ভেতরে ভেতরে পোড়া ঝামা ইটের মতো। অথচ বাইরে মসৃণ প্রলেপ তুলে কাপড়ের বেঢপ আচ্ছাদনে মোটেও সুখি ছিল না জামিউল। শূণ্য খাঁচার পাশে তোতাই জল্যজ্যান্ত রঙিন হিরামণ। ওর চোখের তারার নাচন, পেলব ত্বক, মজবুত হাত, তার নড়াচড়া সবই চেয়ে চেয়ে দেখে জামিউল। এত সুন্দর! এত সুন্দর মানুষ জন্ম নিয়েছে অথচ কেউ জানতো না। তোতাইকে নিয়ে এতো এতো মেইল আসছে। সবই তাকে দেখতে চাওয়া নিয়ে প্রায়। কেবল অধ্যাপক জগন্নাথের মেইলটি ছাড়া।

ঠিকানা অনুযায়ী বাড়িটা পেতে ঝামেলাই হলো। কেননা বিচিত্র লতাপাতার ভেতরে চাপা পড়ে আছে নেমপ্লেটটা। শহরের এ প্রান্তে কেউ থাকতে চায়না তেমন। তোতাইকে দেখে অধ্যাপক সাহেবের চক্ষু চড়কগাছ। তিনি বারবার ঘুরে ফিরে দেখছেন আর বলছেন -

অবিশ্বাস্য! অবিশ্বাস্য!

তোতাই ততক্ষণে দেয়ালের রাশি রাশি বই নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করে দিয়েছে।

- ঠিক জানতাম! আবার জন্ম নেবে নিরোগ পুরুষ।

আহ্লাদে গদ গদ হয়ে ছোটখাটো মানুষটা আরও ছোট হয়ে বসলেন।

- হ্যাঁ, আপনার গত বছরের আর্টিকেলটা পড়েছিলাম। কিন্তু সবাই তো উড়িয়েই দিল সে কথা।

- উড়ে যাবার মতো কিছু যে বলিনি, এবার বুঝতে পারছো তো জামি! আর উড়িয়ে দেবেই তো। বইপত্র কিছু তো পড়েনা। ঘিলুর চুড়ান্ত অপব্যবহার করছ তোমরা-- বুঝতে পারলে। চুড়ান্ত অপব্যবহার।

অধ্যাপক সাহেবের শুকুনের দৃষ্টি। আর গলায় তিতিবিরক্তি। কেউ তার সাথে মেশেনা, কথা বলেনা। পড়ে আছে পঁচা মাছের আড়তের ঝুড়িগুলোর মতো বছরের পর বছর উপুড় হয়ে। জামিউল সিগারেট ধরাতে গেল। অমনি তেড়ে এলেন তিনি।

- নেভাও, নেভাও এক্ষুণি। আমার বইয়ের সর্বনাশ করতে চাও নাকি!

- স্যরি।

- শোনো, যে জন্য ডেকেছি। মনে হয় না তুমি ওকে বেশিদিন কাছে রাখতে পারবে। মানুষের বুকের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা তাড়না জেগে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনা, বলে দিলাম।

- গতকাল তো তেমন কিছু দেখলাম না, সবাই তো খুশি। আর বলেছে মাঝে মাঝে এসে শুধু দেখতে চায় তোতাইকে।

মুখের কুঁচকে যাওয়া চামড়ায় দ্বিগুন ভাঁজ ফেলে অধ্যাপক তাকালেন জামির দিকে। নল খাগড়া ঝোপের ভেতর থেকে যেন একটা বুড়ো ব্যাঙ তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কাঠি কাঠি আঙ্গুল সমেত হাতের তালু দিয়ে বাতাসে মাছি মশা ধরার মতো কিছু একটা খপ করে ধরে মুঠোবন্দী করে বললেন -

- বলতে পারো কী ধরেছি?

মাথা নাড়লো জামিউল।

আবারো সেই ব্যাঙ মুখ!

শকুন চোখ। মরা মাছের ঝুড়ি!


- এই মুঠোর ভেতর যা আছে তাই দিয়ে তোমার পিন্ডি বানিয়ে শ্রাদ্ধ করে দেবে ঐ সুন্দর মানবের, জানিনা কাদের ঘরে জন্ম নিয়েছে ও। তবে দ্যাখো বইপত্র নিয়ে বসেছে যেমন করে ঠিক কোন জ্ঞানী লোকের ঘরে জন্ম ওর।

- জঙ্গলে মাটি খুঁড়ে মাকে কবর দিচ্ছিল স্যার।

- আর কিছু জানতে পেরেছো?

- তেমন কিছু না। সেদিন কেবল ঐ দক্ষিণের জলাভূমির দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়েছিল ওদিকে থাকে।

- ঠিক আছে, এখন তুমি যাও। আমার কাছে কতদিন থাকুক ও। কী নাম যেনো।

- তোতাই।

- তোতাইকে রেখে যাও আপাতত। আর এখানে যে আছে সে কথা ঢাকঢোল পিটিয়ে জানিয়ো না কাউকে। এমন কি মেঘলাকেও না।

মোটা গাড্ডা গোড্ডো বই নিয়ে বসে গভীর মনোনিবেশে বসে আছে সে। জামি জানে মোটেও ভুল করছে না। একটা তো বিহিত হবেই। অধ্যাপক সাহেবের চাইতে এই নিয়ে ভাবার কেউ নেই এ তল্লাটে। নিশ্চিত মনে উঠে পড়লো জামিউল।

এর কয়েক হপ্তা পরে ইয়াকুব এলো হন্তদন্ত হয়ে। উত্তেজনায় গলার বিশেষ পোশাকটি পরে আসেনি। একটা বিদঘুটে গলকম্বল ঝুলছে বুকের পরে তার। জামিউল ভাবলো ওরো তো গলায় একই চামড়া ঝুলছে, কিন্তু খারাপ লাগছে কেন তাহলে? নিজেরটা ঢেকে রেখেছে বলে? একটা বিরাট সত্য ঢেকে রাখলেই যে তা মিথ্যে হয়ে যায় এমন তো না। তবুও চোখের সামনে গলকম্বল ঝুলতে দেখে গা রি রি করতে লাগলো জামির। মুখে চোখে বিস্ময় ফুটিয়ে ইয়াকুব হাড্ডিসার হাত নেড়ে নেড়ে বললো,

- সাড়া পাচ্ছিরে জামি, সাড়া পাচ্ছি! তোরও কি হয়েছে?

- কী? কিসের সাড়া?

চেয়ার ছেড়ে জামির নিম্নাঙ্গে শলা শলা আঙ্গুলে চেপে,

- এইখানে রে, টান খাচ্ছে চামড়া!

- রিমিকে বল্লাম রাতে। ওর গন্ডারের চামড়া কিছুতেই শুনলো না আমার কথা। মোতাহার কে বললাম, খটাশ করে ফোন রেখে দিলো! তুই তো বিশ্বাস কর জামি। নাইলে চল বাথরুমে, দেখবি চল। একটু একটু লাফায় রে!

এতক্ষণ জামি গলকম্বলের নীল নীল শিরার দিকে তাকিয়ে ছিল। হ্যাঁ, জামি সব বিশ্বাস করে। তোতাইকে দেখার পর থেকে কোন কিছুই আর অবিশ্বাস্য নেই ওর কাছে। হয়তো অধ্যাপক সাহেবের কথাই ফলতে শুরু করেছে। আবার শহরে সুপুরুষের জন্ম হবে।

- ডাক্তারের কাছে যা তাহলে। আমি কি করতে পারি।

- ইশ তুই বুঝতে পারছিস না, মেশিনের আর দরকার পড়বে না আমাদের, যদি এটা কাজ করে।

- তাহলে মেশিনে গোলমাল আছে বলতে চাস।

- নয়তো কি? ইচ্ছে করে ডাক্তাররা মেয়েদের এইরকম করে দিচ্ছে।

- অসভ্যের মত কথা বলিস না।

- তোতাই কেন সুন্দর? ওর নিশ্চই সত্যিকারের শুক্রাণুতে জন্ম!

ইয়াকুবের ভাবনাটাও ভাবেনি যে একেবারে তা নয়, কিন্তু ঐ জলাভূমিতে আবার কি ফিরে যাবে মানুষ? হঠাৎ করে মরাকাঠে কি সবুজ পত্রশাখা গজাবে? ইয়াকুব উদভ্রান্ত টুকরো টুকরো ছেঁড়া কাগজের মতো চলে গেল। তোতাইকে নিয়ে আজকাল বাইরে যাওয়া যায়না। সবাই ওকে ফেলে রাখা মাংসের টুকরোর ওপর হামলে পড়া মাছির মতো নখে, আঙ্গুলে চিমটি কাটে। সেদিন তো মেঘলার এক বান্ধবি জোর করে তোতাইয়ের ন্যাংটো ছবি তুলতে চাইছিল। ভাগ্যিস মেঘলা দেখে ফেলেছিলো। কিন্তু কতদিন আর।

মেঘলাও যদি এমনটা চায়!

জামিউল জানে সেই তীব্র শরীরি ইচ্ছেটা মেঘলার নেই। ওর ডিম্বাণু ব্যাংকের ভল্টে জমা করা আছে। মেঘলা নিত্য গাড়ি কিনছে। নেকলেসের নক্সা বদল নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অলংকারের ম্যানেজমেন্টের সাথে মিটিং করছে। এই ওর জগৎ।

যেখানে খুশি যাচ্ছে, কোথাও বৃহৎ ছন্দপতন নেই। চির বসন্তের মত দাপিয়ে বেড়ায় মেঘলা। ও জানে একটা ফুলের পাপড়িও ঝরে যাবেনা। কোথাও এক তিল রঙের হেরফের হবে না। এমন কি ভ্রমরের অসহিষ্ণু পাখার দোলাতেও হবেনা পরাগ রেণুর ক্ষতি বিচ্যুতি।

মেঘলার মুখে নিছক হাসি লেপ্টেই থাকে সারাটাক্ষণ।


আর জামির?

ইয়াকুবের?

মোতাহারের?


শহরের বাকী পুরুষদের সবার মুখে ঝুলে থাকে ক্ষয়প্রাপ্ত প্রাসাদের ঝিমুনি খাওয়া ঘোড়ার উলঙ্গ হাড়ের বিদ্রুপ! তবু তো ইয়াকুবের সাড়া মিলেছে। কিন্তু রিমি বা মেঘলা ওদের সাড়া কে জাগাবে? মনের পর্দায় দৃশ্যটা ভাসতেই মুখের ভেতর কাচের কুচির ঢোক গিললো জামি।

তোতাই, মেঘলা, রিমি, সুহানা সবাইকে একসাথে নিয়ে যদি আবিস্কার করে ফেলে প্রকান্ড ক্ষমতাকে-- তাহলে?

জামি কি মেনে নেবে, সেই টান টান চামড়া,

সেই উজ্জ্বল আনন্দ!

অনিন্দ্য সুখ!

গ্রহের সমস্ত শক্তি খরচ করে মানুষের জন্য সুপেয় জল, সুলভ খাদ্য, নিশ্চিন্ত ঘুম এসবের বন্দোবস্ত করতে করতে একটি একটি করে নিম্নভূমি যে জলে ডুবে যাচ্ছে সেই দিকে কেউ নজর রাখেনি। যাদের উচ্চভূমিতে থাকার সক্ষমতা আছে কেবল মাত্র তারাই এ ভূমন্ডলের অধিবাসি। কিন্তু নিম্ন জলাশয়ে ডুবে যাওয়া লক্ষ লক্ষ মানুষ কী করে বাঁচলো, নাকি বাঁচলো না তাই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায়নি কেউ। আজ তোতাইয়ের আশ্চার্য বাঁচা, বাঁচার জন্য মৃত্যুর মতো আগ্রাসি সত্যের সাথে বোঝাপড়া সবই নথিবদ্ধ করে ফেলেছেন অধ্যাপক জগন্নাথ কর্মকার। তোতাইয়ের মা চেয়েছিল পূর্বপুরুষের মতো সম্মানের মৃত্যু। একটু মরার মুখে মাটি! জলে পঁচে মাছে, হাঙ্গরে, কুমিরে কামড়া কামড়ি করে খাক সেটা চাননি। এই যে চাওয়া, চাওয়ার ইচ্ছে। তাই কী তোতাইয়ের মতো ছেলের জন্ম দিতে শিখিয়েছিল তাকে? জামি ভাবতে থাকে দিনরাত।

তোতাই এখন চমৎকার কাটিং এর জামা পরে, জুতো পরে। অধ্যাপকের কাছ থেকে লিখতে শিখে ফেলেছে। সারাক্ষণ ল্যাপটপে ওর সবল মাংসালো আঙ্গুল চঞ্চল ঘুর্ণি খায়। দেখে কী যে সুখ!

হ্যাঁ দিন দিন তাগাদা আসছে বটে তোতাইকে নিয়ে। সবাই তাদের বাড়িতে রাখতে চায়। তোতাই যেনো মেঘলার সেই হিরামণ। বাড়ির অতিরিক্ত মর্যাদা। যা না থাকলে আলাদা কদর মেলে না। কদিন হলো কিছু ফিসফিস কানে আসছে। সেসব গুঞ্জরণকেই অধ্যাপক ভয় পান। সে ভয় জামির মনেও ঢুকিয়ে দিচ্ছেন ক্রমশ। জামি প্রবল ক্ষমতাধর ব্যাক্তি এ শহরে। তোতাইকে নিয়ে সার্বিক নিরাপত্তার আচ্ছাদন রয়েছে। এ ভুল ভাঙ্গতে বেশি দিন সময় লাগলো না। যাকে পুত্রস্নেহে নিয়ে এসেছে তারই প্রতি মেঘলার দিনকে দিন খোলা, পরিস্কার লোভাতুর দৃষ্টি দেখতে পাচ্ছে জামিউল। তাতানো লোহা জলে ডুবালে যে শব্দ হয় সেইরকম করে কথা বলে আজকাল। সামান্যতেই কথা বিবাদে পরিণত হয়। একদিন ছোট ছোট ঢেউ বড় বড় ঢেউ হচ্ছিল যখন তোতাই এসে বললো,

- তোমরা কার কি হও?

মেঘলা প্রশ্নটা ধরতে পারেনি।

- মানে?

- সবসময় রেগে রেগে কথা বল, মনে হচ্ছেনা তোমরা কেউ কারো কিছু হও।

জামি সিগারেট নিভিয়ে দিল। কিন্তু চোখের তারায় সেই জ্বলুনি, সেই ধোঁয়া তুলে মেঘলাকে দেখলো একবার।

- চল তোতাই আমরা একটু বেরোই।

মেঘলা অন্তিম চেষ্টা চালালো।

- তোমাদের এই ঘষাঘষি আহ্লাদের মানে বুঝিনা ভাবছো?

দরজার কাছে জুতো পরতে পরতে জবাব দিল-

- হ্যাঁ ঠিক বুঝতে পারো তুমি?

--আমার আর তোতাইকে নিয়ে শহরে যে কথা চলছে সেটা তোমার ব্যর্থ প্রচেষ্টার চক্রান্ত সেটা বুঝতেই দেরি হলো আমার।

দরজার ফাঁক গলে মেঘলার কথার প্রদাহ যাতে ওদের আক্রান্ত না করতে পারে সে জন্য গলার লম্বা কাপড় খুলে গুঁজে দিলো দরজার তলায়। গাড়ি ছোটালো অধ্যাপকের বাড়ির দিকে যতটা দ্রুত ছোটানো যায়। কিন্তু গোটা শহরে একটা হট্টগোল বেঁধে গেছে। তারই চিৎকার বাতাসে ভাসছে।

- তোতাই জানালার কাচ তোল, জলদি তোল।

- আমরা কোথায় যাচ্ছি?

- এখানে আর থাকা যাবে না বুঝতে পারছো।

শহরের সব থেকে বড় রাস্তা ধরে ছুটে আসছে মানুষ। তাদের কারো কারো মুখ রঙিন মুখোশে ঢাকা। একটা বৃহৎ হাসি ঠোঁটে নিয়ে তেড়ে আসছে সে মুখোশের দল। কেউ কেউ ভাঙ্গছে সামনে যা পাচ্ছে তাই। তোতাই সামান্য কাঁপতে লাগলো সেসব দেখে।

- ভয় পেয়োনা, আমি থাকতে কেউ তোমার কিচ্ছু করতে পারবে না। চুপ করে শুয়ে পড়।

পিঙ্গল বর্ণের সন্ধ্যে নেমেছে আজ । সেই সাথে প্রতিটি রাস্তায় নারী পুরুষের বহুবর্ণ ঢল। জামি তার ভেতর দিয়ে সাপের মতো এঁকে বেঁকে গাড়ি পার করছে। জানালার কাচ ভাঙ্গলেই বিপদে পড়তে হবে ওদের। মনে মনে রাতের অন্ধকার কামনা করলো। সূর্যের আলো পুরো নিভে না যাওয়া পর্যন্ত একটা আঘাতও পড়তে দিল না গাড়িতে। পুলিশের সাইরেন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এতো মানুষের উন্মোত্ততায় সেও কতক্ষণ। তোতাইকে চায় সবাই। তোতাইয়ের মত সবল, পূর্ণাঙ্গ শরীর পেতে চাইছে মানুষ। মানুষের অগ্নিগোলক ঢল থেকে কোনক্রমে ছোটাতে পারলো গাড়িটা জামি। এই উঁচু শহরে ওরা আর নিরাপদ না। যেতে হবে জলাশয়ের দিকে। যেখানে অধ্যাপক জীবনের নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছেন। যে করেই হোক তোতাইকে বাঁচাতে হবে। তাতে আজ ওর প্রাণ যদি চলেও যায় যাক।

স্নেহভরা চোখে পেছনে তাকালো একবার। জলে বাঁচার সক্ষমতা আছে তোতাইয়ের। কিন্তু জামি জানে ওর ফুরিয়ে যাওয়া মরা ফুসফুসে সে দম নেই। একটা দুর্বার বসন্তের জন্য জরাজীর্ণ শীত যেভাবে চলে যায় সেভাবে গাড়িটা নামতে লাগলো ঠিক নীচের দিকে।


লেখক পরিচিতি
মুর্শিদা জামান
কবি। গল্পকার। চলচ্চিত্রকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন