মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

স্বকৃত নোমনের গল্প : কালো মানুষ


দিনা ও মোকতারের বিয়েতে রাফিদার অমতের কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না বেনু মাঝি। মোকতার রোহিঙ্গা তাতে কি? তার মতো এমন রোহিঙ্গা এই ইছাখালীতে তো বটেই, গোটা উপজেলায় ডজন ডজন আছে। কেউ গেরস্তবাড়ির দিনঠিকা মজুর খাটছে, কেউ মাসঠিকা। কেউ হোটেলের মেসিয়ারি করছে, কেউ রাস্তাঘাটে কি ইটভাটিতে মাইট্যালি করছে, আর কেউ জেলেদের সঙ্গে সাগরে মাছ ধরছে।

সীতাকুণ্ড, বোয়ালখালী, চকরিয়ার দিকে তো বিস্তর রোহিঙ্গা নকল আইডি বানিয়ে ভোটার হয়ে গেছে, নকল পাসপোর্ট বানিয়ে সৌদি-দুবাই পাড়ি দিয়েছে। অনেকে বিয়েশাদি করে বটগাছের মতো শিকড়-বাকড় ছড়িয়ে এমন থিতু হয়েছে, চাইলেই কেউ তাদের তাড়াতে পারবে না। আঙুল তুলে বলতে পারবে না, এ দেশ তোমার নয়, তোমার দেশ রাখাইন। যাও, ফুটো।

অনেকে বিয়েশাদি করে বটগাছের মতো শিকড়বাকড় ছড়িয়ে এমন থিতু হয়েছে, চাইলেই কেউ তাদের তাড়াতে পারবে না। আঙুল তুলে বলতে পারবে না, এ দেশ তোমার নয়, তোমার দেশ রাখাইন। যাও, ফুটো। বেনাউল হোসেন ওরফে বেনু মাঝি মোকতারকে এনেছিল মিরসরাই বাজার থেকে। পেটেভাতে। মজুরিবিহীন। পেটেভাতে এমন মজুর মিরসরাই বাজারে প্রায়ই মেলে। মেইন রোড থেকে যে রাস্তাটি ইস্টিশনের দিকে গেছে, সেই রাস্তার ওপর সপ্তায় দুই দিন হাট বসে। মজুরের হাট। দূর-দূরান্ত থেকে গেরস্তরা এসে মজুরদের কিনে নিয়ে যায়। এক হাটবার থেকে আরেক হাটবার পর্যন্ত কাজ করলে আট শ টাকা মজুরি। থাকা-খাওয়া ফ্রি। অনেকে আবার মজুরি চায় না। বিশেষত রোহিঙ্গা মজুররা। থাকা-খাওয়া দিলেই রাজি।

বেনু মাঝি মাছের কারবারি। ঠিক মাছের কারবারি নয়, মাছের কারবারি ছিল তার বাপ। সাগর থেকে যেসব জেলে মাছ ধরে আনত, তাদের কাছ থেকে পাইকারি দরে কিনে মিরসরাই বাজারে বেচত। বেনু মাঝি ট্রলার মালিক। দুটি ট্রলার ভাড়া দেওয়া। মৌসুমে যা আসে তাতে সারা বছর চলে যায়। ধানি জমি আছে সাড়ে পাঁচ কানি। চাষাবাদ আর দেখভালের জন্য একজন লোক দরকার। মোকতারকে এনেছিল বছর ঠিকায়। থাকতে দিয়েছিল বাড়ির কাছারিঘরে। প্রথম দিন দিয়েছিল মাটি কাটার কাজ। বাড়ির রাস্তাটা ভেঙে গিয়েছিল। পুকুর থেকে মাটি কেটে রাস্তাটা ভরাট করতে দিয়েছিল। মাটি কাটতে গিয়ে কোদালের কোপে মোকতার কেটে ফেলল পায়ের আঙুল।

কী ব্যাপার মিয়া, মাটির কাজ আগে কখনো করোনি?

মোকতার কাঁদে, কেবলই কাঁদে।

পারো না সেটা তো আগে কইবা, নাকি? আগে কী কাজ করতা? হালচাষ পারো?

কান্নার চোটে মোকতারের মুখে কথা ফোটে না।

রোয়া লাগাইতে পারো?

মোকতার ডানে-বাঁয়ে মাথা নাড়ায়। অস্ফুটে বলে, না।

তা পারোটা কী? আনছি কাজের জন্য, কাজ তো করতে হবে বাপু। তোমারে তো আমি বসিয়ে খাওয়াইতে পারমু না। কও কী কাজ পারো?

আমি কায়দা-সিপারা পড়াতে পারি।

ও।

বেনু মাঝি আর কিছু বলল না, চলে গেল বাজারে। ফিরল দুপুরে। মোকতার তখন কাছারিঘরে শুয়ে শুয়ে বিড়ি টানছিল আর ভাবছিল নিজের কথা। সেই পাঁচ বছর বয়সে রাখাইন থেকে মা-বাবার সঙ্গে সাম্পানে চড়ে উখিয়ায় এসেছে। নাফ তখন কী যে উত্তাল ছিল! মোকতারের কেবলই মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সাম্পানটা উল্টে গেল, এই বুঝি সবাই উত্তাল স্রোতে ভেসে গেল! স্রোতের সঙ্গে লড়ে তীরে ভিড়ল সাম্পান। তারা উঠল কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। পনেরো বছর বয়সে এক তুমুল ঝড়-বৃষ্টির রাতে ক্যাম্প ছাড়ল মোকতার। মেইন রোডে এসে চড়ে বসল কক্সবাজারগামী একটা বাসের ছাদে। ভেবেছিল কক্সবাজারের কোনো হোটেল-মোটেলে কাজ নিয়ে জীবনটা গোছাবে। পারল না, জড়িয়ে পড়ল ইয়াবা বড়ির কারবারে। সপ্তায় তিন দিন বড়ি নিয়ে চট্টগ্রাম যেত। টানা আট মাস যাতায়াত করেছে, কখনো ধরা পড়েনি, পুলিশ কখনো তাকে সন্দেহের চোখে দেখেনি।

একদিন। রোজার মাস ছিল তখন। কথা ছিল বড়ি নিয়ে সে বহদ্দারহাট মায়ের দোয়া হোটেলে থাকবে, সন্ধ্যার পর মহাজনের লোক মিন্টু এসে তার কাছ থেকে বড়ি নিয়ে যাবে। কথামতো সে মায়ের দোয়া হোটেলে বসে মিন্টুর অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে ১৩ হাজার পিস বড়ির একটা ব্যাগ। রাত ৮টা বেজে গেল, মিন্টু এলো না। সাড়ে ৮টার দিকে এলো একদল পুলিশ। মোকতার ভেবেছিল পুলিশ বুঝি খেতে এসেছে। তবু তার ভয় জাগে, পালানোর পথ খোঁজে। ব্যাগটা নিয়ে যেই না উঠতে যাবে, অমনি এক কনস্টেবল চট করে ধরে ফেলল তার হাত। ব্যাগটাসহ তাকে নিয়ে গেল থানায়। এক মামলায় পাক্কা তিন বছরের হাজতবাস। জামিনে বেরিয়ে কুতুপালং ক্যাম্পে গিয়েছিল মা-বাবার কাছে। মন টেকাতে পারেনি। ভেবেছিল আবার বড়ির কারবারে ঢুকবে, কিন্তু ঠিক সুবিধা করতে পারল না। বেরিয়ে পড়ল অজানার পথে। চোখ যেদিকে যায় চলে যাবে। ঘুরতে ঘুরতে চলে এলো মিরসরাই।

মোকতার মিয়া আছ? বাইরে থেকে ডাক দিল বেনু মাঝি।

জি কাকা, আছি।

আসো দেখি।

মোকতার বাইরে এলো। হাত দুটি বুকের ওপর ভাঁজ করে মাথা নুইয়ে দাঁড়াল।

শোনো মিয়া, বেনু মাঝি বলল, আজ থেকে তুমি আমার দুই মাইয়ারে সিপারা পড়াইবা, এটাই তোমার কাজ। কী, পারবা না?

মোকতার ওপর-নিচ মাথা নাড়ায়, জি কাকা, পারমু ইনশাআল্লাহ।

মক্তবে দিছিলাম, কায়দাটা শিখছে, সিপারার কিচ্ছু পারে না। সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা পড়াইবা। ওদের মাথা গোবরে ভরা। পড়ায় মন না দিলে তুমি কিন্তু শাসন করবা। আমি তো সব সময় বাড়ি থাকি না। কোনো সমস্যা হলে তোমার চাচি আছে, তারে জানাইবা।

সন্ধ্যায় বড়ঘরে গেল মোকতার। সামনের কামরার মেঝেতে একটা পাটি বিছিয়ে দিল রাফিদা। মোকতার বসল পাটির এক পাশে, দিনা ও রিনা আরেক পাশে। মোকতার একবার রাফিদাকে দেখে, একবার দিনাকে। দিনার বয়স তো চৌদ্দর কম হবে না। এত বড় একটা মেয়ের মায়ের বয়স কিনা এত কম! মোকতারের বয়স উনিশ। তার মায়ের বয়স কত জানে না। কখনো জিজ্ঞেস করেনি। তার আন্দাজ, পঞ্চাশের কম হবে না। সেই হিসাবে দিনার মায়ের বয়স তো কমপক্ষে চল্লিশ হওয়ার কথা। তার মায়ের মতো দিনার মায়েরও চাপাচুপা ভেঙে যাওয়ার কথা, মুখে মেছতা পড়ার কথা, কোমর-পিঠ বেঁকে যাওয়ার কথা। অথচ কী আশ্চর্য, তিরিশের বেশি মনেই হচ্ছে না তাকে। কী ভরাট মুখ! মুখে মেছতা তো দূর, একটা তিলও নেই। মনে হচ্ছে কুতুপালং ক্যাম্পের ম্যাজিস্ট্রেটের বউয়ের মতো সুন্দরী যুবতী। যেন এখনো বিয়েই হয়নি।

আপনে কি এদের আসল মা? রাফিদাকে জিজ্ঞেস করল মোকতার।

রাফিদা শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে হেসে উঠল, এ মা! এ কিরম কথা! আসল মা না তো কি সত্মা?

না, আপনের বয়স কম তো, বুঝতে পারতেছিলাম না।

দিনা-রিনা একসঙ্গে হেসে দিল। আঁচলে মুখ চেপে হাসতে হাসতে ভেতরের কামরায় চলে গেল রাফিদা। মোকতার বিব্রত হয়। হুট করে এমন প্রশ্ন করা যে ঠিক হয়নি বুঝতে পারে।

দিন যায়। রোজ সকাল-সন্ধ্যা মোকতার এসে দেড় ঘণ্টা করে দিনা-রিনাকে পড়িয়ে যায়। শাপলুর পড়ার বয়স হয়নি। তবু সে মাঝেমধ্যে এসে বোনদের সঙ্গে বসে। মোকতার তাকে আদর করে, কোলে বসিয়ে মুখে মুখে পড়ানোর চেষ্টা করে, বলো আলিফ, বে, তে...। শাপলু পড়ে না, মুখ ঘুরিয়ে নেয়, কিংবা উঠে মায়ের কাছে চলে যায়। মোকতারের জন্য রোজ তিন বেলা কাছারিঘরে ভাত-তরকারি দিয়ে আসে রিনা। রাতে রিনার সঙ্গে দিনাও যায়।

এক রাতে, দিনা-রিনাকে পড়িয়ে মোকতার যখন কাছারিতে ফিরল, নামল তুমুল বৃষ্টি। রাত ৯টা বেজে গেল, অথচ ভাত আসার খবর নেই। খিদায় অস্থির মোকতার বসে বসে চিড়া চিবুচ্ছিল। ঘরে সব সময় সে চিড়া রাখে। খিদা লাগলে খায়। তার মা বলত, খিদা লাগলে ভাত না পেলে চিড়া খাবি। চিড়া পেট ঠাণ্ডা রাখে। চিড়া খাচ্ছিল আর সে মায়ের কথা ভাবছিল। আর তখন বাইরে শুনতে পেল রিনার গলা, হুজুর ভাইসা! হুজুর ভাইসা!

দরজা খুলল মোকতার। ছাতা মাথায় পৈঠায় দাঁড়িয়ে রিনা।

মায় আপনেরে বড়ঘরে যাইতে কইসে।

ক্যান?

এ মা! ভাত খাইবেন না? এখানে আনতে গেলে তো সব ভিজি যাইব।

সেদিন থেকে তিন বেলা মোকতার বড়ঘরে গিয়েই খায়। বেনু মাঝি তো রাত ১০টার আগে কোনো দিন বাড়ি ফেরে না। মাঝেমধ্যে ফিরলে মোকতারকে ডেকে একসঙ্গে খায়। বৃষ্টি-বাদলার দিনে দিনা-রিনা ৮টা না বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে। না খেয়েই। তখন রান্নাঘর থেকে মোকতারের জন্য ভাত-তরকারি রাফিদাকেই আনতে হয়। মোকতার খায়, রাফিদা দরজার কাছে মোড়া পেতে বসে স্বামীর অপেক্ষা করে। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে মোকতার আড়চোখে রাফিদাকে দেখে। এক পলক দেখেই আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়। ভয় লাগে। যদি রাফিদার চোখে চোখ পড়ে যায়! রাফিদা ব্যাপারটা খেয়াল করে। সেও আড়চোখে মোকতারকে দেখে। কী সুন্দর যুবক। গায়ের রং কালো, মুখটা লম্বাটে, গলাটা কিঞ্চিৎ তামাটে, থ্যাবড়ানো নাক। যে পেটানো শরীর, যেন কোনো কুস্তিগির। যেন শহরের লালদীঘি ময়দানে জব্বারের বলিখেলার একজন খেলোয়াড়।

রাফিদার মনে পড়ে মিনারের কথা। ডোমখালীর মিনার। দেখতে ঠিক মোকতারের মতো ছিল। রাফিদা স্বপ্ন দেখেছিল তাকে নিয়ে। সংসারের স্বপ্ন। মাকে বলেছিল সেই স্বপ্নের কথা। মা দিল ঝাড়ি, অসম্ভব! এমন কালো বেটার সঙ্গে বিয়ে! পাগল! ছেলেমেয়েরা সব কালো হবে।

মায়ের কথা অযৌক্তিক ছিল না। রাফিদার বংশে কোনো কালো মানুষ নেই। বেনু মাঝির বংশেও না। দুই বংশের নারী-পুরুষ সবাই লম্বা-চওড়া, ফরসা। যেন বাঙালি নয়, পাঠান কিংবা তুর্কি। বেনু মাঝির পূর্বপুরুষ বাঙালি ছিল না বটে। তার দাদার দাদার দাদা ইরান কি তুরান থেকে জাহাজে চড়ে রেঙ্গুন যাচ্ছিল। ঝড়ের কবলে পড়ে জাহাজ ঢুকে পড়েছিল উত্তরের সাগরে। আটকে গেল একটা ডুবোচরে। সেই জাহাজ আর উদ্ধার করা গেল না। যাত্রীদেরও আর রেঙ্গুন যাওয়া হলো না, থেকে গেল ইছাখালীতে, চিরতরে। গোটা বংশে একমাত্র কালো আর বেঁটে ছিল বেনু মাঝির ছোট কাকা আলমাস মাঝি। বেনুর দাদি বলত, ছোটবেলায় আলমাস কালো ছিল না, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে রোদে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। বংশপরম্পরার স্বার্থেই বেনু মাঝির সঙ্গে রাফিদার বিয়ে হয়। ছেলেমেয়েরা কালো হয়নি বটে। দিনাও না, রিনাও না। শাপলুও মা-বাবার মতো ফরসা।

একদিন কী এক কাজে বেনু মাঝি গেল চট্টগ্রাম শহরে। রাতে ফিরল না। সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। দিনা, রিনা আর শাপলু ঘুমিয়ে পড়েছে। রান্নাঘরে ঢুকতে ইচ্ছা করছিল না রাফিদার। ইচ্ছা করছিল বসে বসে বৃষ্টি দেখতে। কদমের গন্ধভরা বৃষ্টির রাত তার খুব ভালো লাগে। কেবলই মনে পড়ে মিনারকে। মনে হয়, বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পুকুরে জাল মেরে মাছ ধরছে মিনার, কিংবা জমিনে হাল দিচ্ছে। কালো তেলতেলে মুখ বেয়ে, গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। তার ভেজা গা-টা রাফিদা গামছা দিয়ে মুছে দিচ্ছে, মুছতে মুছতে মিনারের পিঠে আলতো করে ঠোঁট বসিয়ে দিচ্ছে।

কিন্তু রাত হয়ে যাচ্ছে, মোকতারকে তো খেতে দিতে হবে। বলল, ওরা তো ঘুমাই গেল, ভাত-তরকারি এখানে আনতে পারমু না। চলো, আজ রান্নাঘরে বসি খাইবা।

মোকতার মাথা কাত করল, আচ্ছা।

রান্নাঘরে রাফিদা পাটি বিছিয়ে দিল, ভাত-তরকারি বেড়ে খেতে দিল। মোকতারের মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। রাখাইনে তাদের বাড়ির রান্নাঘরটা ছিল থাকার ঘর থেকে আলাদা, কয়েক হাত দূরে। রান্নাঘারে রান্না হলেও খাওয়াদাওয়া হতো থাকার ঘরে। মাঝেমধ্যে, এমন বৃষ্টির রাতে, সবাই রান্নাঘরে গিয়ে খেত। পিঁড়িতে বসে তার মা ভাত-তরকারি বেড়ে দিত। সেসব দিনের স্মৃতি কাতর করে তুলল তাকে। স্মৃতির তাড়নায় গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল অশ্রু।

কী হইল? কানতেছ ক্যান? বিস্ময়ে বলল রাফিদা।

মোকতার জবাব দেয় না। অশ্রুর কয়েক ফোঁটা পড়ে ভাতের থালায়। দ্রুত সে লুঙ্গি তুলে চোখ মোছে। রাফিদার চোখ যায় তার তেলতেলে ঊরুর দিকে। মনে হয়, এই ঊরু মোকতারের নয়, মিনারের। তার সামনে যে বসে আছে সে রোহিঙ্গা মোকতার নয়, বাঙালি মিনার।

বাড়ির কথা মনে পড়ছে?

মোকতার মাথা নোয়ায়, কবজি দিয়ে চোখ মোছে।

কান্দিও না ভাই। মনে করো এ বাড়ি তোমারও, আমরা তোমার কয়কুটুম। মন খারাপ করিও না। এখন তো মাছের মৌসুম, তোমার ভাই খুব ব্যস্ত। বর্ষাটা গেলেই একবার বাড়ি থেকে ঘুরে এসো।

ভাই সম্বোধনে মোকতারের কেমন যেন লাগল। লাগারই কথা। বেনু মাঝিকে সে কাকা ডাকে, সেই হিসাবে রাফিদা তার চাচি। সে রাফিদার মুখের দিকে তাকায়। রাফিদার ঠোঁটে মুচকি হাসি। হাসির আড়ালে কী যেন লুকিয়ে। লুকানো ব্যাপারটার কিছুটা বোঝে মোকতার, আবছাভাবে। তবে সেই বুঝটুকু সে মনে ঠাঁই দেয় না, দ্রুত বের করে দেয়। গপাগপ গিলতে থাকে ভাতের লোকমা। গিলতে গিলতে খালি করে দেয় থালা। হাত ধুয়ে বলে, বৃষ্টি থামি গেছে, আমি এখন যাই।

যাইও না, সামনের ঘরে একটু বসো। রাফিদা বলে।

লুঙ্গিতে হাত মুছে সামনের ঘরের দরজার কাছে মোড়াটায় বসল মোকতার। একটা বিড়ি টানলে ভালো লাগত, কিন্তু বিড়ির বান্ডিলটা কাছারিঘরে। তা ছাড়া রাফিদার সামনে টানা যাবে না। কখনো টানেনি।

কিছুক্ষণ পর এক বাটি গুড়ের পায়েস নিয়ে রাফিদা এলো। বাটিটা মোকতারের হাতে দিয়ে বলল, বিকেলে বানাইছি, খাও। তোমার ভাই খুব পছন্দ করে। মাঝে মাঝে আমি খাওয়াই দিই। খাওয়ার সময় এমন পাগলামি করে, আমার আঙুল কামড়ে খেয়ে ফেলতে চায়...হা হা হা।

আকাশে বিজলি চমকাল। ভেতরেও ঢুকল ঝলক। মোকতারের মনে হয়, আকাশের বিজলি ঢুকে পড়েছে তার শরীরে, শরীরটা গরম হয়ে উঠছে তাপে।

তুমি কিসসা জানো? একটা কিসসা হুনাও না?

আগে অনেক জানতাম, এখন ভুলি গেছি।

মালেকের কিসসাটা জানো?

কোন মালেক?

ওই যে মালেক-নূরনেহা।

জানি না, আপনে জানেন?

ক্যান জানুম না? হুনবা?

হুঁ।

কিসসাটা রাফিদা শুরু করতেই ভেতর-ঘরে কেঁদে উঠল শাপলু। সন্ধ্যায় না খেয়ে ঘুমিয়েছে। ঠিক এই সময়ে জাগে। রাফিদা খাইয়েদাইয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেয়। রাফিদা বলল, আচ্ছা আরেক দিন কমু, এমন বৃষ্টির রাইতে। বৃষ্টির রাইত বিনে কিসসা জমে না।

রাফিদা হাসে। সেই মুচকি হাসি। হাসির আড়ালে সেই রহস্য, যার অর্থ মোকতার কিছুটা বোঝে, আবছাভাবে। কিন্তু বুঝটুকু মনে ঠাঁই দেয় না, আগের মতোই দ্রুত বের করে দেয়। বৃষ্টি থেমে গেছে, সে পা বাড়ায় কাছারিঘরের দিকে। পৈঠা থেকে নেমে পেছন ফিরে দেখে, রাফিদা তাকিয়ে আছে তার দিকে, মুখে সেই রহস্যময় মুচকি হাসি। আকাশে আবার চমকে ওঠে বিজলি। মোকতারের আবারও মনে হয়, আকাশে নয়, বিজলি চমকাচ্ছে তার শরীরে, চমকে চমকে তার ভেতরটা পুড়িয়ে দিচ্ছে।

তারপর তো কেটে গেল অনেক দিন। মোকতার এখন বাইরের কেউ নয়, মাঝিবাড়িরই একজন। চাষাবাদের সব ভার তার ওপর ছেড়ে দিয়ে বেনু মাঝি এখন নির্ভার। পাঁচ মাস বাদেই মোকতারের বেতন ধার্য করেছিল তিন হাজার, বাড়িয়ে এখন করেছে পাঁচ হাজার। মোকতার এখন প্রতি বেলা রান্নাঘরে বসেই খায়। দিনা-রিনা আর শাপলু ঘুমিয়ে পড়লে রাফিদার সঙ্গে বসে বসে গল্প করে। রাফিদা তাকে কিসসা শোনায়। মালেক-নূরনেহার কিসসা, ভেলুয়া সুন্দরীর কিসসা। মাঝেমধ্যে মোকতারও শোনায়। কিভাবে রাখাইন থেকে সাম্পানে চড়ে উখিয়ায় এসেছিল, কিভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ছেড়েছিল, কিভাবে বড়ির কারবারে জড়িয়ে ধরা খেয়ে জেল খেটেছিল সেসব কথা। রাফিদার সামনে এখন সে বিড়িও খায়।

এভাবে চলছিল। ছেদ পড়ল রাফিদা গর্ভবতী হওয়ায়। বেনু মাঝির খুশির সীমা নেই। আরেকটা পুত্রসন্তানের খুব ইচ্ছা তার। দুই মেয়ের সঙ্গে ছেলেও দুটি হোক। তার আশা, নিশ্চয়ই এবার ছেলে হবে। শাপলুর মতো ফরসা, গোলগাল মুখ। কিন্তু তার আগে দিনার বিয়েটা দিয়ে দেওয়া দরকার। আঠারো হয়ে গেছে বয়স, আর দেরি করা ঠিক হবে না। মেয়েমানুষের বিয়ে যত তাড়াতাড়ি দেওয়া যায়, তত ভালো। সম্বন্ধ এসেছে কয়েক জায়গা থেকে, বেনু মাঝির পছন্দ হয়নি। অপছন্দের কারণ অবশ্য মোকতার। বেনু মাঝি যতবারই মেয়ের বিয়ের কথা ভাবে, ততবারই মোকতারকে মনে পড়ে যায়। পাত্র হিসেবে খারাপ হবে না মোকতার। কাজের ছেলে। এক হাতে চাষাবাদের সব সামলাচ্ছে। গায়ের রং একটু কালো তাতে কী, আরাম-আয়েশে থাকলে ফরসা হতে কদিন? দিনা তার সঙ্গে সুখী হবে নিশ্চিত।

মনের গুপ্ত কথাটা বেনু মাঝি একদিন বউকে বলল। শুনেই ফুঁসে উঠল রফিদা, অসম্ভব! হতেই পারে না।

ক্যান? হওয়ালেই হবে। মোকতার খারাপ কিসে?

রাফিদা উত্তর খুঁজে পায় না, চুপ করে থাকে।

তোমার মাইয়া এ বাড়িতেই থাকবে, দূরে কোথাও যেতে হবে না। মোকতারের সঙ্গে আমি কথা কইছি, ঘরজামাই থাকতে সে রাজি।

অসম্ভব! এই বিয়াতে আমি রাজি না। মেয়ে শুধু আপনের একার না, আমারও। আমার মত ছাড়া এ বিয়া হবে না, হতে আমি দিমু না।

ক্যান, মোকতার রোহিঙ্গা বলে?

কাউয়ার মতো এমন কালা, যার জাত-বংশের ঠিক নাই, তার কাছে আমার মাইয়া বিয়া দিমু?

বেনু মাঝি গেল খেপে। হুট করে বলে বসল, তোর জাত-বংশের ঠিক আছে খানকি মাগি? মাইনসে তো কয় তোর দাদা রেঙ্গুন গিয়া রোহিঙ্গা বেটিরে বিয়া করছিল। মাইনসে কি মিছা কয়?

রাফিদাকে কে আর ঠেকায়! লাগল স্বামী-স্ত্রীর তুমুল ঝগড়া। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে বেনু মাঝির মেজাজ এমন চড়াই চড়ল, হুট করে বউয়ের গায়ে তুলে বসল হাত। চুলের মুঠো ধরে গালে মারল চড়। রাফিদা ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, আমার অসুস্থ শরীলে হাত! এই সংসার আমি করমু না, কাল বেয়ানে আমি চলি যামু। এমন অজাতের ঘরে আমি লাথি মারি।

বেনু মাঝি চিৎকার করে বলল, যা মাগির ঘরে মাগি, কে তোরে আটকাচ্ছে? গেলে একবারেই যাবি। বাড়ির বাইরে এক পা দিলে আমার ভাত তোর জন্য হারাম হয়ে যাবে।

রাফিদা কি আর যেতে পারে? স্বামীর সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া তার উপায় থাকে না। সেদিন থেকেই মোকতারের সঙ্গে সে কথাবার্তা বন্ধ করে দিল। দেখাও। মোকতারও আর বড়ঘরে খেতে আসে না। আসার সাহস পায় না। আগের মতো রিনা কাছারিঘরে ভাত-তরকারি দিয়ে যায়। দিনা তো ভুলেও মোকতারের সামনে পড়ে না। যার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তার সামনে পড়বে কেমন করে।

পান-সালাত হলো, বিয়ের দিন-তারিখ ধার্য হলো। পৌষ মাসের ১১ তারিখে মোকতার ও দিনার বিয়ে সম্পন্ন হলো। চৈত্র মাসের ১৩ তারিখে রাফিদা জন্ম দিল পুত্রসন্তান। এই প্রথম বেনু মাঝির বংশে কালো মানুষের জন্ম হলো। ঠিক মোকতারের মতো কালো, লম্বাটে মুখ, থ্যাবড়া নাক।

পুত্রের এমন বর্ণ দেখে রাফিদা কাঁদে, কেবল কাঁদে। পুত্রকে কোলে নিয়ে বেনু মাঝি বলে, কালো বলে কানতেছ? আমার ছোট কাকা তো এমনই ছিল, ঠিক এমন কালো, মুখটাও ছিল এমন লম্বাটে। দেখতে ঠিক কাকার মতো হয়েছে বেটা, শুধু নাকটা ছাড়া। সবই খোদার লীলাখেলা, কান্নার কী আছে?



২টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ গল্পটি।বাস্তবতাই গল্পের প্লট তৈরি করে।রোহিঙ্গাদের অসহায়ত্ব কী অসাধারণভাবে তুলে এনেছেন!অদ্ভুত আপনার লেখার হাত

    উত্তরমুছুন
  2. অনেকে বিয়েশাদি করে বটগাছের মতো শিকড়-বাকড় ছড়িয়ে এমন থিতু হয়েছে, চাইলেই কেউ তাদের তাড়াতে পারবে না। আঙুল তুলে বলতে পারবে না, এ দেশ তোমার নয়, তোমার দেশ রাখাইন। যাও, ফুটো।

    উত্তরমুছুন