মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

শমীক ঘোষের গল্প : অকশন হাউজ


ঠাৎই তার মনে পড়বে শব্দটা। আশ্চর্য হয়ে সে ভাববে, এতদিনে কত নতুন শব্দই তো শিখেছে। অথচ কোথায় প্রথম দেখেছিল, কোথা থেকে শিখেছিল, কিছুই মনে পড়ে না। শুধু এই একটা শব্দই ব্যাতিক্রম।

আর ঠিক সেই মুহূর্তটায় জীবনে প্রথমবার বরফের ঘ্রাণ টের পাবে সে। শীতল, সাদাটে, সোঁদা সোঁদা আশ্চর্য এক ঘ্রাণ, যা সস্তা মদের চড়া বিশ্রী গন্ধটাকে ঢেকে দিয়ে তার নাকে এসে লাগবে।

ভয় পাবে সে। মুখের কাছ থেকে মদের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রাখবে। ঠিক তখনই শীত করে উঠবে তার। খাঁড়া হয়ে উঠবে সমস্ত শরীরের রোম। মনে হবে অনেকদিন আগেই বোধহয় সে মরে গিয়েছে। আর বরফের মধ্যে মুড়ে রেখে দেওয়া হয়েছে তাকে। চালানি মাছের মতো।

চমকে উঠে, তাকাবে টেবিলটার দিকে। দেখবে আধ খাওয়া চিলি চিকেনের প্লেট। বাদামের বাটি। মদের গ্লাস। না, এর কোনও কিছুরই গন্ধ পাচ্ছে না আর। এক শুধু বরফ ছাড়া। চমকে উঠে বরফ ভর্তি বাকেটটা হাত দিয়ে ঠেলে একটু দূরে সরিয়ে দেবে।

তার কানে খুব জোরে এসে লাগবে গাঁক গাঁক গিটারের কর্ড। ড্রামের বিট। বেসুরো মহিলা কণ্ঠে চটুল হিন্দি গান। যেন এটাও সে এতক্ষণ টের পায়নি।

প্রায় রিফ্লেক্সে ঘড়ি দেখবে। সোয়া এগারোটা বাজে। দু’টো হাতের অগ্রভাগ টেবিলের ওপর রেখে অল্প চাপ দিয়ে উঠে পড়ার ভঙ্গি করবে। তারপর বলবে, ‘চল উঠি রে, বাড়ি যেতে হবে তো।’

আর ঠিক তখনই একটু দূরে মাইক ধরা যুবতী বার-সিঙ্গারের দিক থেকে মুখ সরিয়ে শ্রাবন্তী তাকে বলে উঠবে, ‘ইররিকনসিলেবিলিটি। তাই না?’

‘মানে!’ সে আরও চমকে উঠবে।

‘ওই শব্দটাই তো তুই ভেবেছিলি? তাই না।’

সে তার শরীরটা আবার ছেড়ে দেবে। মাথাটা নামিয়ে ফেলবে। ভাববে কী আশ্চর্য! ঠিক এই শব্দটাই তো মাথায় এসেছিল তার। প্রথম পড়েছিল লেনিনের লেখা ‘স্টেট অ্যান্ড রেভোলিউশানে’। লাইনটা স্পষ্ট মনে থাকবে তার। ‘দ্য স্টেট ইজ এ প্রোডাক্ট অ্যান্ড এ ম্যানিফেস্টেশান অফ দ্য ইরিকনসিলেবিলিটি অফ ক্লাস অ্যান্টাগনিজম।’

লাইনটা পড়ে ডিকশনারিতে মানে খুঁজেছিল।

অনেক অনেকদিন আগে কোনও এক দুপুরবেলায় কলেজ ফাঁকি দিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরির উঁচু সিড়িতে বসে ঠিক এই লাইনটাই সে বলেছিল শ্রাবন্তীকে। গোদা গোদা বাংলায় বুঝিয়েছিল মানেটাও। ‘ইররিকনসিলেবল মানে হল যেটা খাপ খায় না। যেটাকে মেলানো যায় না। রাষ্ট্র... শ্রেনী বৈষম্যের এই না মেলাতে পারা খাপ না খাওয়া জায়গাটা থেকেই উদ্ভুত। মানে ধর এক দলের কাছে প্রায় কিছুই নেই। তারাই সংখ্যাগুরু। আর এক দলের কাছে সব আছে। তারা মাত্র কয়েকজন। তো যারা সংখ্যাগুরু তারা তো গায়ের জোরে সব কেড়ে নিতে পারে। সেটা আটকানোর জন্যই শাসনের উৎপত্তি, রাষ্ট্রের উৎপত্তি…’

ভাসা ভাসা চোখ মেলে একটু অবাক হয়েই তার কথাগুলো শুনছিল শ্রাবন্তী। তারপর হঠাৎ মাঝ পথে তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। দু’হাত দিয়ে ধরে ফেলেছিল তার মাথাটা। তারপরেই চুমু খেয়েছিল।

সেদিন প্রকাশ্যে চুমু খেতে খেতে সে ভুলে গিয়েছিল লেনিন-মাও-মার্ক্স। ছাত্র আন্দোলন। পড়াশুনো। সে শুধু মিশে যেতে চেয়েছিল শ্রাবন্তীর ঠোঁটে।

সেই ছাত্রবয়সের উদ্দাম প্রেমের কথা ভেবে একটু লজ্জা করে উঠবে তার। হয়ত অস্বস্তিও। সামনে বসা শ্রাবন্তীর থেকে চোখ সরিয়ে নেবে সে। মুখ ঘুরিয়ে তাকাবে যুবতী বার-সিঙ্গারের দিকে।

বছর পঁচিশ বয়স হয়তো মেয়েটার। ফর্সা। ছিপছিপে। সুন্দরীই বলা চলে। শরীরে ছোট্ট একটা ঝালর লাগানো সবুজ ফ্রক। হাঁটুর অনেক ওপরে শেষ হয়ে গিয়েছে। দু’টো কাঁধ খোলা। স্ট্যান্ডে লাগানো মাইকটা দু’হাতে ধরে, শরীর দোলাতে দোলাতে চিৎকার করছে।

মেয়েটা এবার তার দিকে তাকাবে। যেন সে গানটা গাইছে তারই জন্য। সে স্পষ্ট শুনতে পাবে কথাগুলো। ‘লমহে যো হোতে হ্যায়, মিলতে যো হ্যায় ইহাঁ, ইত্তেফাক সে।’ কথাগুলো কেটে কেটে বসে যাবে তার কানে। আর ঠিক তখনই তার মনে হবে, মেয়েটার চোখ দুটোয় মণি নেই। পুরোটাই সবুজ।


লেখাটা পড়তে গিয়েই চমকে উঠেছিলাম। এটা কী করে সম্ভব? কেউ কি পেছনে বসে আমাদের দেখছিল? কিন্তু ঠিক কী ভাবছিলাম, আমার ছাত্র বয়সের স্মৃতি, এইগুলো সে কী করে জানবে? তারপর ক্রিয়াপদগুলো সবটাই ভবিষ্যতে লেখা। যেন আগাম সব কিছু লিখে রেখেছে কেউ। এমনকী, আমি কী ভেবেছি সেটা অবধি!

গা গুলোচ্ছে। মাথা ঘুরছে বন বন করে। বুকের কাছে জ্বালা জ্বালা ভাব। আর সব চেয়ে অদ্ভুত হল সেই বরফের গন্ধটা। বেড়ে গিয়ে আমার দু’নাকে আটকে রয়েছে। খাতাটা বন্ধ করে দিলাম।

উল্টো দিকের সোফায় বসে আছে লোক দু’টো। অবিকল এক রকম দেখতে দুই বামন। যমজ। গ্র্যাব্রিয়েল আর মিখাইল। দেখলে বয়স বোঝা যায় না। ফর্সা টক টকে রঙ। তার ওপর চড়া মেক আপ। শুধু চোখের নীচে ফোলা ফোলা আর সামান্য ত্বকের কুঞ্চন দেখলে বোঝা যায় খুব কমও না। মাথায় একটা চুলও নেই। লোম নেই সারা গায়ে কোথাও। দু’জনের মুখেই স্মিত হাসি।

‘কী আর পড়বে না?’ জিজ্ঞাসা করল মিখাইল।

‘ভয় পাচ্ছে।’ আমার কিছু বলার আগেই উত্তর দিল গ্যাব্রিয়েল।

‘তোমরা তো সবই জানো। আমি কী করব সেটাও আগে থেকে জানো। তাহলে আর আমাকে জিজ্ঞাসা করছ কেন?’

‘তুমি বোধহয় খাতার নম্বরটা দেখোনি।’

‘এটা ন’শো আটাত্তর নম্বর খাতা।’ পাশ থেকে ফুট কাটে মিখাইল।

‘তোমার বয়স ৩৮ বছর ১৩০ দিন। অর্থাৎ ঠিক ১৪ হাজার দিন বেঁচে নিয়েছো। ওই প্রত্যেকটা দিন তুমি কী করবে, কী ভাববে, কার সাথে কথা বলবে, কী খাবে সব কিছুই লেখা ছিল বাকি ন’শো সাতাত্তরটা খাতায়। আগে থেকেই।’

‘কিন্তু আজকের খাতাটা অসম্পূর্ণ। ওতে আগে থেকেই লেখা ছিল তোমার এই অকশন হাউজে আসা অবধি সব কিছু। কিন্তু তারপর থেকে খাতাটা ফাঁকা। তুমি এখানে ঠিক যা করছ ওখানেও তাই তাই লেখা হচ্ছে।’

‘তুমি যদি রাজি হও, তাহলে তোমার জীবনের বাকি খাতাগুলোও লেখা হবে। একদম তুমি যেভাবে চাইবে, সেই ভাবে…’

সব কিছুই ভীষণ অবাস্তব লাগে। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি।

‘কী বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ সতেরো নম্বর পাতাটা খোলো।’ প্রায় ধমকের সুরে বলে মিখাইল।

আমি খাতাটা ফের খুলি। পাতা ওলটাতে থাকি। থামি ঠিক সতেরো নম্বর পাতায়। পাতাটায় কিচ্ছু লেখা নেই। হঠাৎ, সাদা পাতার ওপর সবুজ অক্ষরে কতগুলো শব্দ ফুটে ওঠে।

আমি পড়ি। ‘তারপর সতেরো নম্বর পাতাটা খুলবে সে। পাতাটা একদম সাদা। কতগুলো শব্দ নিজে থেকেই ফুটে উঠবে সেখানে। লেখা থাকবে…’

আমি খাতাটা ছুঁড়ে ফেলে দিই। তড়াক করে লাফিয়ে উঠি। চিৎকার করি, ‘আমি বাড়ি যাব, আমি বাড়ি যাব…’

মিখাইল আর গ্যাব্রিয়েল পরস্পরের দিকে তাকায়। মুচকি হাসে। তারপর দু’জনে এক সঙ্গে, এক সুরে বলে ওঠে, ‘বাড়ি গেলে যাও। কে আটকাচ্ছে। কিন্তু… এমন সুযোগ… বারবার কি হাতে আসে? সত্যিই ছেড়ে দেবে?’

আমি ধুপ করে আবার বসে পড়ি।


তখনও বিকেল। অন্ধকার তখনও জমাট বাঁধেনি আকাশের বুকে। শুধু ময়লা, আরও ময়লা হতে হতে নিভে যাচ্ছিল আকাশটা। ফ্ল্যাটবাড়ির ছোঁয়াচ এড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিল পাখিদের দল। চেতলা ব্রিজের শেষ প্রান্তে বড় কমপ্লেক্সটা থেকে আমি সবে বেরিয়ে এসেছিলাম বাইরে।

বিরক্ত লাগছিল। ভীষণ বিরক্ত। কতদিন হয়ে গেল লেখা হয় না আমার। কখন লিখব? সারাদিন শুধু কাজ আর কাজ। অথচ এই কিছুক্ষণ আগে সেই গল্প লেখার, গল্পকে বোঝার ক্ষমতা দিয়েই কথা বলে যাচ্ছিলাম মিটিং-এ। নামী চলচিত্র পরিচালকের সামনে বসে কাঁটাছেড়া করছিলাম তারই লেখা স্ক্রিপ্ট। গল্পটা আমি বেশ বুঝি। সেই জন্যই এত মাইনে দেয় কম্পানি। অথচ নিজের লেখাই হয় না। সবাই বলে দিয়েছে ফুরিয়ে গিয়েছি।

এক রাশ বিরক্তি নিয়ে সিগারেট ধরিয়েছিলাম। দেরি করছিলাম ইচ্ছে করেই। উবের ধরে সেই তো অফিসেই ফিরে যেতে হত। আর ঠিক তখনই আমি দেখতে পেয়েছিলাম শ্রাবন্তীকে।

টাইট স্লিভলেস টপ। থ্রি কোয়ার্টার ক্যাপ্রি। কাঁধে সরু স্ট্র্যাপের ভ্যানিটি ব্যাগ। আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। মেলাতে চাইছিলাম প্রায় বছর কুড়ি আগের ফর্সা তন্বী সালোয়ার কামিজের সঙ্গে।

না, এখন আর সেইদিনের মতো সরু ছিপছিপে নেই। বাঙালি মেয়েদের মতোই একটু মুটিয়েছে। শ্রাবন্তীর দিকে আমি তাকিয়েছিলাম অবাক হয়ে। ভেবেছিলাম চোখ সরিয়ে হয়ত পাশ দিয়েই হেঁটে যাবে ও।

কিন্তু আমাকে অবাক করে থমকে দাঁড়িয়েছিল। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করেছিল, ‘তুই?’

চড়া মেক আপ ওর মুখে। কালচে লাল লিপস্টিক। গোটা মুখেই ছোট ছোট অজস্র ফুটো। পুরু মেক আপের নীচেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল তাদের।

কিছুটা ভ্যাবলার মতো মুখ করেই এক গাল হেসে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘হ্যাঁ আমিই!’

‘তুই নাকি লিখিস?’ উচ্ছ্বাস ঝরে ঝরে পরে শ্রাবন্তীর গলায়।

আমি থমকাই। মাথাটা একটু নীচু করেই তুলে নিই আবার। ‘লিখতাম।’

‘সে কী! রাজনীতির মতো এটাও ছেড়ে দিলি?’

জোর করে হাসার চেষ্টা করেছিলাম আমি। ‘পেশা।’

‘চল কোথাও বসি।’ আমার হাত ধরে টান দিয়েছিল শ্রাবন্তী। তারপরেই ব্রিজ থেকে নেমে আসা হলুদ ট্যাক্সির দিকে ছুটে গিয়েছিল কিশোরীর প্রগলভতায়।

তারপর দমকা হাওয়ায় চুল উড়বে শ্রাবন্তীর। গুমোট বিকেলের সারি সারি ধীর গতির শহুরে যান টপকাতে টপকাতে এগিয়ে যাবে ওদের ট্যাক্সিটা। আর ভীষণ বিষণ্ণতায় সে বলে যাবে লেখক জীবনের ব্যর্থতার কথা। অর্থ উপার্জনের দৈন্যন্দিন গ্লানির কথা। এক নাগাড়ে। মনোলগের মতো। প্রবল জোরে ঝাঁকানো সোডার বোতল, হুশ করে এক লহমায় বার করে দিচ্ছে ভেতরের চাপ। ফাঁপা, ভীষণ ফাঁপা, অজস্র ক্ষণমুহূর্তের, নশ্বর বুদবুদের মতো। বিন্দুমাত্র না ভেবে, উল্টো দিকের মানুষটা আদৌ এই সব শুনতে চায় কী না।

সময় থমকাবে না। বয়ে যাবে। বিকেলের গুমোট ছিন্নভিন্ন করে দেবে প্রথম সন্ধের লঘু-চপল বাতাস। আর সেও এক সময় বলে উঠবে, ‘আচ্ছা তুই কী করিস বললি না তো?’

‘আমি? আমি একটা কম্পানির সেলস এজেন্ট।’

‘সেলস! তুই! কীসের কম্পানি?’

মুখটা ঘুরিয়ে ওর দিকে তাকাবে শ্রাবন্তী। মুচকি হাসবে। ‘একটা অকশন হাউজের।'

‘অকশন হাউজেরও সেলস এজেন্ট থাকে? কী বিক্রি হয় তোদের অকশন হাউজে? ছবি? অ্যান্টিক…’


তেরোর পাতায় ঠিক এই কথাগুলোই লেখা। মিখাইল আর গ্যাব্রিয়েল চলে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। আর আমি ফের খাতাটা খুলেছি।

আচ্ছা শ্রাবন্তী কি তবে ফাঁদ? এই সব আসলে একটা কোনও গভীর ষড়যন্ত্র? সব কেমন ঘোলাটে লাগে।

ঘরটা ভালো করে দেখি আবার। চার পাশের দেওয়ালে মোটা রেক্সিনের গদি লাগানো। মেঝেটাও সাদা একদম। তার ওপর প্রচণ্ড ঠান্ডা। এসিটা কোথায়? খুঁজে পাই না। শুধু মনে হয় শীতটা প্রবল বেড়ে যাচ্ছে। আমার হাত-পা জমে যায়। হু হু করে কাঁপতে থাকি আমি।

একটা সোঁদা ফ্যাকাশে গন্ধ আমাকে আছন্ন করে তোলে। বরফের গন্ধ। এই ঘরটা আমাকেও যেন বরফ করে দেবে। জমাট। শক্ত। সাদা।


‘এখানে ঢুকবি?’

‘হ্যাঁ! কেন তোর অসুবিধে?’

‘না, না!’ সে একটু অপ্রস্তুত হয়েছিল। ভেবেছিল কোনও কফিশপেই হয়ত বসবে দু’জনে। বড় জোর রেস্তোরাঁ। তাই বলে কলকাতার এঁদো গলিতে, অচেনা অজানা এক গুমোট বারে নিয়ে আসবে শ্রাবন্তী? যেখানে গান হয়!

শ্রাবন্তী কি এখানেই আসে রোজ? বারে ঢুকতে কেমন কুণ্ঠা হয়েছিল। শ্রাবন্তী তাকে ফাঁসাবে না তো? যদি টাকা চায়? অকশন হাউজের সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ। সেটাই বা কেমন চাকরি?

‘তুই মদ খাস তো?’ জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকিয়েছিল শ্রাবন্তী। আর সে আপাদমস্তক আবার দেখেছিল শ্রাবন্তীকে। তার পকেটে দুটো ক্রেডিট কার্ড মিলিয়ে দশ লাখ টাকার লিমিট। ঘড়ি, মোবাইলটাও দামী।

তার পরেই মনে পড়েছিল, মোবাইলটা সে অফ করে দিয়েছিল ট্যাক্সিতে উঠেই। সেই একই ভাবে, অবিরাম একঘেয়েমিকে লহমায় ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার প্রত্যাশায়, খুব হিসেব করে বেহিসাবী হয়ে ওঠার উদগ্র ইচ্ছেয়, সে একই ভাবে ঢুকে পড়বে বারের মধ্যে। বসে পড়বে একদম ধারের একটা টেবিল। গুমোট ভিড়ে, প্রবল মিউজিকে, হিন্দি গানের চটুল আয়োজনে, সস্তা মদের তেঁতো গন্ধে, টেবিলে লেগে থাকা কোন জন্মের আবছা হলুদ একটা দাগ তার অস্বস্তির জন্ম দেবে।


পরের দেড় পাতায় কী লেখা ছিল পড়া যায় না। সমস্ত পাতার ওপর স্টিকার মারা। হালকা আকাশী রঙের কোনও কিছু না লেখা স্টিকার। যেন ইচ্ছে করেই লেখাগুলোকে ঢেকে রাখা। কেউ চায় না কী লেখা আছে পড়া যাক।

বারে ঢোকার পর কী করেছিলাম আমরা? কী কথা হয়েছিল? ভাবার চেষ্টা করি। ঘোলাটে লাগে সব। মনে পড়ে না কিছুই।

নখের ডগা দিয়ে স্টিকারটাকে খুঁটে খুঁটে তোলার চেষ্টা করি আমি। ওঠে না। একদম জমাট হয়ে আটকে থাকে।

মদে কি কিছু মিশিয়ে দিয়েছে শ্রাবন্তী? বরফের কি গন্ধ হয়? আর বার-সিঙ্গারের সেই সবুজ চোখ?


দপ দপ করবে সাদা আলোটা। ঝলসে উঠেই মিলিয়ে যাবে পরিষ্কার সাদা মার্বেলে মোড়া দু’পাশে উঁচু দুটো স্টল। ওপরে মাংস ঝোলানোর বিরাট বিরাট আঁকশি। আর তাদের মাঝে একটানা পরিত্রাহী চিৎকার করবে নিকষ কালো একটা ছাগল। বারবার গলা ঝাড়া দিয়ে খুলে ফেলতে চাইবে মোটা শিকলটা। পারবে না কিছুতেই।

দোকানটার সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকবে অবাক হয়ে। দু’পাশের সারি সারি দোকানের শাটার বন্ধ। নিভে গিয়েছে রাস্তার আলোগুলোও। জানলা বন্ধ দু’পাশের সমস্ত বাড়ির।

‘এখানে?’ সে জিজ্ঞাসা করবে শ্রাবন্তীকে।

সে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখবে চারপাশ। বোঝার চেষ্টা করবে, এখানে সে আগে কখনও এসেছে কিনা। মাংসের দোকানের পাশের সরু গলিটাতে ঢুকে যাবে শ্রাবন্তী। সামান্য কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সেও হাঁটতে থাকবে পিছু পিছু।

অথচ একবারও সে দেখবে না হাত ঘড়িটাকে। জানবে না স্থবির হয়ে গিয়েছে তার দুটো কাঁটা। সে বুঝবে না একটা মুহূর্ত, জমতে জমতে, দীর্ঘ হতে হতে, অফুরান হয়ে আটকে গিয়েছে এই শহরের ওপর। স্ট্রিটল্যাম্পের চড়া আলোয় মন্ত্রমুগ্ধ পোকার মতো।

অন্ধকার গলিটার পর ডানদিকে সরু একটা সিঁড়ি। খুব স্তিমিত ফিকে হলুদ একটা আলো তাতে অদ্ভুত সব আলপনা আঁকবে। নির্মাণ করবে অদ্ভুত আলো আঁধারি।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে সে আবার ভাববে বার থেকে বেরনোর পরের কথাগুলো।


উবেরটা বুক করবে শ্রাবন্তীই। তখন সে একবারও জানতে চাইবে না লোকেশনটা। শুধু বার বার সরে আসতে চাইবে কাছে। তারপর কোনও এক সময় ছুঁয়ে দেবে হাতটাও। তার দিকে তাকাবে শ্রাবন্তী। এগিয়ে আসবে আরও কাছে। হাত রাখবে ঘাড়ের পেছনে। তারপর মুখটা টানতে টানতে ঠোঁটে মিশিয়ে দেবে।

সে ভুলে যাবে সব কিছু। চোখ বুঝে শুধু আহরণ করতে চাইবে ওষ্ঠের ওম, ঠোঁটের স্বাদ, ভিজে জিভ। বরফের ফ্যাকাশে গন্ধ তার নাক থেকে উবে যাবে একদম। শ্রাবন্তীর সস্তা পারফিউম তার মদের নেশাকে বাড়িয়ে দেবে।

তারপর ধাতব শব্দে ঘোর ভাঙব তাদের। চমকে ওঠে দু’জনেই সামনে তাকাবে। দেখবে উবেরের ড্রাইভার হাতটা বার করে দিয়েছে জানলা দিয়ে। আর ক্রমান্বয়ে বাড়ি মারছে গাড়ির ছাদে।

লজ্জা পাবে তারা। পরস্পরের থেকে সরে বসবে সামান্য। তারপর দু’জনের হেসে ফেলবে। শরীরটাকে সে ছেড়ে দেবে সিটের নরমে। বুজে ফেলবে চোখদু’টো। জোর প্রশ্বাসে পুনর্বার অনুভব করতে চাইবে শ্রাবন্তীর গন্ধ।


দরজাটার লোহার। বেশ বড়। তার ওপর পেতলের দু’টো বিরাট কড়া ঝোলানো। ওপরে বিরাট একটা আর্চ। তার গায়ে ঝুলছে একটা নকল লেজ বাঁকা মাছ।

অবাক হলাম। এই বাড়ির সঙ্গে এই দরজাটা বেশ বেমানান।

‘এটাই তোদের অকশন হাউস?’

‘হ্যাঁ এটাই। সব বিক্রি হয় এখানে।’ কাঠ কাঠ গলায় বলল শ্রাবন্তী। তারপর কড়া ধরে নাড়ল খুব জোরে।

দরজা খুলল একটা বিরাট মোটা লোক। খাকি পোশাক। লাল পাগড়ি। পাকানো মোটা গোঁফ। আমাদের সেলাম ঠুকল লোকটা। তারপর হাত দিয়ে দেখাল ভেতরের দিকে।

একটা হল ঘর। বিরাট বড়। ভেতরে সারি সারি খাঁচা। তার মধ্যে নানা সাইজের বিভিন্ন ধরনের কুকুর। ঝিমোচ্ছে। কুকুরে আমি ভয় পাই।

‘এটা কী ভেটেনারি হাসপাতাল…’ শ্লেষের সুরে বলতে যাব শ্রাবন্তীকে, হঠাৎ আমার কানের কাছে কী যেন একটা খুব জোরে ফ্যাঁশ করে উঠল। চমকে তাকালাম পাশে। বেড়াল! খাঁচার মধ্যে। এমন বেড়াল আমি আগে দেখিনি কখনও। সারাটা গা সবুজ। ফ্লুরোসেন্টের মতো জ্বলছে।

বেড়ালটা এগিয়ে এল। সমস্ত লোম খাড়া হয়ে আছে। রেগে গিয়েছে খুব। মুখ থেকে লালা বেরোচ্ছে। বেড়ালটা আমার প্রায় আমার মুখের কাছে এগিয়ে এসে চিৎকার করল। খুব জোরে।

সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠল ঘরের সবকটা কুকুর। প্রবল আক্রোশে। দাঁত বার করে। খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে আসবে যেন। আঁতকে উঠলাম। হাত-পাগুলো কুঁকড়ে সিঁটিয়ে গেলাম।

‘তুই এখনও কুকুরে ভয় পাস!’ হা হা করে হাসিতে ফেটে পড়ল শ্রাবন্তী। আর ওর হাসিটা এই বিরাট বড় হল ঘরের দূর দূর দেওয়াগুলোয় ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসতে লাগল।

হঠাৎ পাক দেয় একটা চোরা হাওয়া, ঘূর্ণি তোলে ধুলোর। তার কয়েক মুহূর্তের একটা ঝড় হয়ে আছড়ে পড়ে চারপাশে। তার পেছন পেছন আশ্চর্য সোঁদাটে গন্ধটা। কয়েক মুহূর্তের তুমুল লণ্ডভণ্ডের পরেই থেমে যায় সব। ছাদের কাছ অবধি পৌছানো ধুলোরা খসে পড়ে ধীর গতিতে। বরফ পড়ার মতো। বরফই পড়ে। আশ্চর্য সাদা পেঁজা পেঁজা বরফ।

কুকুরগুলো থেমে গেল আচমকাই। থেমে গেল সবুজ বেড়ালটাও। কাঁপতে লাগল শীতে। গোঙাতে লাগল করুণ স্বরে। স্পষ্ট দেখলাম খাঁচার গায়ে হিম জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। শীত করছে আমারও। শীত, প্রচণ্ড শীত।

জমে যাচ্ছে আমার মজ্জা, রক্ত, হাঁড়, চামড়া, পেশি, মাংস… সব।


সব কিছু নীল হয়ে যাবে সেই মুহূর্তটায়। তার মনে হবে চেয়ারটা আর মাটিতে নেই। তাকে শুদ্ধু নিয়ে ভাসছে হাওয়ায়। দুলছে অল্প। সে ভাববে নেশা। বেশ নেশা হয়েছে তার। টলমল টলমল করে উঠবে সব কিছুই।

আর শ্রাবন্তী চোখ দুটো সরু করে তাকে বলবে, ‘যাবি? গিয়ে দেখবি একবার? তোকে শুধু চাইতে হবে। চাইলেই পপুলার হতে পারবি। সফল হতে পারবি। বই বিক্রি বেড়ে গেলে চাকরি করতে হবে না তোকে…’

সে বারবার অবিশ্বাস করতে চাইবে। বলতে চাইবে, ‘জ্যোতিষ নাকি?’

তার মনে পড়বে অফিসের কথা। সারাদিনের অনন্ত পরিশ্রম। তার মনে পড়বে নাগাড়ে চলে যাওয়া মিটিংগুলো। তার মনে পড়বে, তার বসের কথা। বার বার বলেও ঠিক দু’দিন আগে জানা ছুটি ক্যানসেল হয়ে গিয়েছে। রাত দেড়টার সময় হঠাৎ হঠাৎ লম্বা ফোন কলগুলোর কথা। তার রাগ হবে। মদের গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়েই ফের টেবিলের ওপর দুম করে নামিয়ে রাখবে।

তারপর লোভ হবে তার। সে টের পাবে গানটা গম গম করছে তার কানে। ‘রাত বাকি, বাত বাকি, হোনা হ্যায় যো হো জানে দো।’ সবুজ চোখ গায়িকার ভুল ভিব্র্যাটো, নীচু সুরে বার বার সরে যাওয়া বিভ্রান্ত করবে তাকে। সে একবারও দেখব না একটা সবুজ আলো চিড়িক চিড়িক করছে শ্রাবন্তীর চোখে। মণিটা বাদামী থেকে ধীরে ধীরে হয়ে যাছে ঘন সবুজ।

সে শুধু বলবে, ‘গিয়ে দেখলেই হয়!’


হল ঘরটার পর একটা সরু প্যাসেজ। ডান দিকে দরজা দিয়ে আরও একটা বড় ঘর। সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে সবজে একটা আলো। পিয়ানোর আলতো আওয়াজ। আর মৃদু কোলাহল। অনেক মানুষ এক সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলছে যেন।

শ্রাবন্তী আমার পিঠে হাত রাখে। আমরা দু’জন এগিয়ে যাই দরজার দিকে।

বিরাট এই ঘরটাও। সবুজ ওয়ালপেপারে মোড়া। চার দিকে অনেক মানুষ। নারী। পুরুষ। সবার মুখেই মুখোশ। কারও মাথা পুরোটা ঢাকা। কারও আবার শুধু চোখগুলো। প্রায় সবাই ফর্মাল পোশাকে। কেউ গল্প করছে, কেউ হাসছে, আবার অনেক দূরে দেওয়ালের কাছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে একজন মহিলা।

কে যেন কার কোলের ওপর বসে আছে। ওই দূরে চুমু খাচ্ছে দু’জন। দু’টি পুরুষ নাগাড়ে স্পর্শ করছে একটা পুরুষকে।

এটা কী তবে কোনও মধুচক্র? আমাকে ফাঁসিয়ে নিয়ে এল শ্রাবন্তী? সিক্রেট সোসাইটি নয়তো। ছাদে তাকাই। প্রকাণ্ড একটা শ্যান্ডেলিয়ার। তার গা থেকে সবুজ আলো ঠিকরে ঠিকরে নামছে।

‘বনজোঁর মসিয়েঁ।’

‘ওয়েলকাম টু দ্য শো!’

দু’টো বামন ছুটতে ছুটতে এগিয়ে আসে। অবিকল এক রকম দেখতে। যমজ। ধবধবে ফর্সা। মাথায় একটাও চুল নেই। দু’জনেই টকটকে লাল ডিনার জ্যাকেট পরে আছে। তার ওপর চকচকে পাথর বসানো। সাদা জামার ওপরে নীল বো টাই।

‘ওর নাম মিখাইল।’

‘আর ওর নাম গ্যাব্রিয়েল।’ অন্যজনকে দেখিয়ে বলে ওরা। তার দু’জনেই মাথা নীচু করে বো করে নিখুঁত কায়দায়।’

‘তাহলে আপনি পার্টিসিপেট করতে রাজি তো?’ গ্র্যাব্রিয়েল জিজ্ঞাসা করে।

‘পার্টিসিপেট?’ বোকার মতো বলে ফেলি আমি।

‘সেকি! তুমি বলোনি?’ শ্রাবন্তীকে প্রায় ধমক দেয় মিখাইল।

‘কাম, কাম, কাম, কাম, কাম… আপনি আসুন। লেটস ডিসকাস।’ খুব শান্ত গলায় বলে ওঠে গ্যাব্রিয়েল।

আমার দু’টো হাত ধরে দু’জনে তারপর টানতে নিয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে টের পাই, গোটা ঘরের গুঞ্জন থেমে গিয়েছে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে।


ঘরটা অদ্ভুত। একদম সাদা। চারপাশের দেওয়ালে মোটা রেক্সিনের গদি লাগানো। মেঝেটাও সাদা। মার্বেলের। মাথার ওপরে আবার একটা ঝাড়বাতি।

ঘরে মধ্যে একটা লাল সোফাসেট। বড়টায় বসেছি আমি। উল্টোদিকে দু’টো কাউচে মিখাইল আর গ্যাব্রিয়েল।

‘পাবলিসিটি চাও?’ আপনি থেকে হঠাৎ তুমিতে নামে গ্যাব্রিয়েল।

‘আমাদের তুমিও তুমি করেই বলবে।’ হুকুম করে মিখাইল।

‘হ্যাঁ যা বলছিলাম… পপুলারিটি?’ ফের কথা শুরু করে মিখাইল।

‘পাবে।’ মাথা নাড়ে গ্যাব্রিয়েল।

‘বইয়ের এডিশনের পর এডিশন… মোটা রয়্যালটি।’

‘পাবে।’

‘টিভিতে টক শো।’

‘পাবে।’

‘প্রচুর টাকা।’

‘পাবে।’

‘কী বিশ্বাস হচ্ছে না?’ কোটের ভেতর থেকে একটা খাতা বার করে ছুঁড়ে দেয় মিখাইল।

‘পড়ো।’

আমি খাতাটা খুলে চমকে উঠি। এই গদ্যটা তো আমারই। ঠিক এমনই আমি লিখতাম ছাত্র বয়সে। লেখা শুরু করবার সময়।


‘কী করতে হবে?’ ধাতস্থ হওয়ার পর জিজ্ঞাসা করি।

‘কিচ্ছু না পার্টিসিপেট।’

‘তার বদলে যা চাও, সব তোমার…’

‘এমনকী টাকাও পাবে।’

‘তোমার সর্বোচ্চ দর।’

‘আমরা শুধু কমিশন নেব।’

‘বেশি না সেভেন্টি পারসেন্ট!’

‘ওটা তো নেবই। আমরা তোমাকে সুযোগ করে দিচ্ছি।’

‘আর কিচ্ছু করতে হবে না আমায়? যেমন খুশি...’

‘না, না,’ আঙুলটা তুলে নাড়তে থাকে গ্যাব্রিয়েল।

‘যেমন খুশি মোটেও না, একদম আমাদের খুশি মতো...’ মিখাইলের গলাটা মোলায়েম হয়ে ওঠে।

‘আমরা তোমার ম্যানেজার... আমাদের কাজ তোমাকে বলে দেওয়া কী লিখবে, কী বলবে...’

‘কোন রঙের জামা পরবে, কোন দলের সঙ্গে মিশবে...’

‘সবই তোমার স্বার্থে...’

‘আমার স্বার্থে... এভাবে হয় নাকি... আমি তো আমার মতোই...’

‘তোমার বস তোমাকে যা বলে তুমি শোনো না?’

‘পাড়ার দাদা?’

‘মিডিয়া?’

‘রাষ্ট্র?’

‘কিন্তু আমি যদি না বলি পরে?’

‘এখন না বললে তুমি বোকা।’

‘আর পরে না বললে আরও বোকা!’

‘কী বোকা না?’ মিখাইল আর গ্যাব্রিয়েল পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে। এক সঙ্গে। এক সুরে। যন্ত্রের মতো। তারপর দু’জনেই হা হা করে হাসতে শুরু করে।


অসহায় লাগবে। খুব অসহায় লাগবে তোমার। শিরদাঁড়ার কাছটা শিরশির করবে শুধু। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাবে। হাত দু’টো মুঠি করে তুমি আস্তে আস্তে ঠুকবে সোফার হাতলে। বারবার।

তোমার মনে পড়বে লাল আর সবুজ কতগুলো ঢেউ। মনিটরের এপার থেকে ওপার অবধি যেতে যেতে থমকে যাচ্ছে বারবার। মুছে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আবার জ্বলে উঠছে একটু পরেই। আই সি ইউ-এর কাচের বাইরে দাঁডিয়ে তুমি দেখবে তোমার বাবাকে।

বারবার তোমার মনে পড়বে হাসপাতালের অফিসে শোনা কথাগুলো। ‘আরে... আমি তো আপনাকে বারবার বলছি, আপনাদের ইনসিউরেন্স রিজেক্ট করেছে... আমরা তো করিনি... না, না, টাকাটা এখনই জমা না দিলে অপারেশন হবে না...’

তোমার মনে পড়বে অজস্র ফোন কল। বন্ধুদের, আত্মীয়দের। আর প্রতিবার শোনা... ‘না রে টাকা দিতে পারব না এখন...’

কাচের বাইরে দাঁড়িয়ে তোমার নিষ্ফল রাগ হবে। কলেজ শেষ করা তুমি বিড়বিড় করে বলবে, ‘বড় হতে হবে, বড় হইতে হবে আমায়।’

তোমার রাগটা আরও বাড়বে। মনে পড়বে বইমেলায় একদম একা ঘুরছো তুমি। তোমার চেনা প্রকাশক তোমার দিকে এগিয়ে আসছে তোমার দিকে। তুমি এক মুখ হাসছো। আর তারপরেই দেখতে পাচ্ছ তোমার পাশ দিয়ে, সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে, সে চলে যাচ্ছে পেছনে। অন্য কারো দিকে।

এক মুহূর্তে মিলিয়ে যাচ্ছে তোমার হাসি। একা বইমেলার ভিড়ে হাঁটতে হাঁটতে তুমি বুঝতে পারছ, তুমি কেউ না। কেউ না। কেউ না।

আরও পেছনে তাকাবে তুমি। দেখতে পাবে তোমার পেছন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে তোমার অপমানরা। তোমার অফিসে, পাড়ার মোড়ে, অটোর লাইনে... সমস্বরে চিৎকার করছে তারা। ‘তুমি কেউ-না। তুমি কেউ-না।’

দপ করে জ্বলে উঠবে তুমি। বিড়বিড় করে বলবে, ‘আমাকে বড় হতেই হবে...’


‘তুমি রাজি?’

‘গুড চয়েস!’

‘ভেরি গুড!’

‘বেশ তাহলে জামাকাপড় খোলো!’

‘মানে?’

‘লোকে তোমায় কিনবে, পুরোটা দেখে নেবে না?’


আমার মাথার ওপর একটা স্পটলাইট। জোরালো আলোটা ধুয়ে দিচ্ছে আমায়। আমি বসে আছি সিংহাসনের ওপর। সম্পূর্ণ নগ্ন। আমার হাত দু’টো আটকানো ক্ল্যাম্পে। সামনে চাপ চাপ অন্ধকার।

একটা অবয়ব এগিয়ে আসে আমার দিকে। কালো গাউন পরা। মুখে মুখোশ। ঠিক টানা চশমার মতো। সোনালি রঙের। আমি চেনার চেষ্টা করি। শ্রাবন্তী? শ্রাবন্তিই না?

অবয়বটার হাতে একটা হাতুড়ি।

ঠং ঠং ঠং। হাতুড়িটা ঘা মারে একটা গং-এ। ‘উই উইল স্টার্ট!’ চিৎকার করে মহিলা। গলা শুনে আমি নিশ্চিত হই শ্রাবন্তীই। ‘যে সব থেকে বেশি দাম দেবে… দ্য হাইয়েস্ট বিডার উইনস!’

হাতুড়িটা দিয়ে আবার বাড়ি মারে গং-এর ওপর। ‘লেটস স্টার্ট দ্য অকশন!’

চুপ সব। স্তব্ধ একদম। আমার ভয় করে আবার। তবে কি আমার দাম নেই কোনও?

হঠাৎ ডান দিক থেকে কে যেন চিৎকার করে ওঠে, ‘দশটা এডিশন।’

কথাটা শেষও হয় না। বাঁ দিক থেকে চিৎকার করে কে। ‘বেস্ট সেলার!’


ঠিক সেই মুহূর্তটায়, দূরের একটা ঘরে, টেবিলের ওপর খুলে রাখা তার হাত ঘড়ির একটা কাঁটা নড়ে উঠবে আবার। সচল হবে সময়। সে এই সব কিছু জানতে পারবে না। তার শুধু মনে পড়বে ছোট্টবেলার কুয়োতলাটা। সারি সারি দাঁত বার করা ইঁট। ফাঁকে ফাঁকে শ্যাওলার সবুজ। হেঁটে যাওয়া অজস্র পিঁপড়ে।

সাবানজলের বুদ বুদ। তার ফুঁ থেকে তৈরি হয়ে ভেসে যাচ্ছে বাতাসে। তারপর ফেটে, মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে। একটা লাল ঘুড়ি। একটা সাদা খাতা, একটা কলম।

তীব্র হবে গন্ধটা। সোঁদা, ফ্যাকাশে, সাদা। বরফের ঘ্রাণ পাবে সে আবার। শীত করবে, শীত করবে তার।


লেখক পরিচিতি
শমীক ঘোষ
কলকাতায় থাকেন।
গল্পকার। চলচ্চিত্রকার।

২টি মন্তব্য: