মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত'র গল্প : বিচ্ছিন্ন


জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম থেকেই আকাশে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি হয়নি, হচ্ছে না। চারদিকে একটাই প্রশ্ন, কবে ঢুকবে বাংলায়? কী? আরে বাবা, আন্দামানে কেরলে তো এসে গেছে, বাংলায় কবে ঢুকছে বর্ষা? আকাশে মেঘ থাকায় মানুষের কষ্ট যেন আরো বেড়েছে। গুমোটে হাঁসফাঁস করছে সবাই। ছত্তিসগড়ের দিক থেকে শুকনো গরম হাওয়া এসে বাংলার আকাশের মেঘকে পুঞ্জিভূত হবার আগেই ছত্রভঙ্গ করে ফেলছে। এদিকে দেরি করে শুরু হলে আবার ওদিকে পুজোয় ভাসাবে। এবার আবার পুজোও বেশ তাড়াতাড়ি। সায়ক কাঁচের জানলা দিয়ে দূরে আকাশের দিকেই তাকিয়ে ছিল। জানলা তো ঠিক নয়, ফ্লোরের তিন-চার ফুটের ওপর দুটো দিক কাঁচ দিয়ে ঢাকা। ভেতর থেকে বাইরেটা দেখা যায় কিন্তু বাইরে থেকে ভেতরের সব কিছু হয়ে থাকে ঝাপসা। সায়ক অবশ্য গরম বোধ করছে না। বরং এ-সি’র হাওয়া সরাসরি ওর গায়ে এসে পড়ছে বলে খানিক ঠান্ডাই বোধ হচ্ছে ওর। সায়ক জানে এই বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় এ-সি’র তাপমাত্রায় ঠান্ডা খুব বেশি করে সেট করা থাকে। সায়ক’দের হাসপাতালেও তাই। সেটা অবশ্য ও-টি, কেবিন, ওয়ার্ড এইসব জায়গাতেই। নিজেদের হাসপাতালের রিসেপশনে কিরকম ঠান্ডা থাকে সেটা সায়ক জানে না। এই হাসপাতালে সায়ক রিসেপশনে বসে আছে। ঝকঝকে চারদিক। কমবয়েসে হাসপাতালে এলেই একটা আলদা অসুখ-অসুখ গন্ধ নাকে আসতো, পরে সে গন্ধই সায়কের নিত্যসঙ্গী হয়ে যায়। অবশ্য এখন নানা সুগন্ধী ব্যবহার করা হয় হাসপাতাল গুলিতে। ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হলো এইমাত্র, লোকজন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সায়ক এসেছে অনেকক্ষণ। এসে এখানেই বসে আছে। ওপরে যেতে ইচ্ছে করেনি। কী করবে গিয়ে ?

কালও নিজের মুকুন্দপুরের হাসপাতাল থেকে একঘন্টা আগে বেরিয়ে বাইপাসের এই হাসপাতালে এসেছিল। ওপরে তীর্থর কেবিনে গিয়ে ওর সামনে বসেছিল প্রায় মিনিট চল্লিশেক। কথা বলার চেষ্টা করেছিল সায়ক কিন্তু তীর্থ’র জবাব বুঝতে পারেনি। ডিলেরিয়াম শুরু হয়ে গিয়েছিল, তীর্থ’র। বিড়বিড় করে অস্পষ্ট, জড়ানো কিছু অবোধ্য শব্দ শুধু শোনা যাচ্ছিল। তীর্থ’কে দুদিন হল ওর ছেলে সানি এই হাসপাতালে ভর্তি করে সায়ককে মেসেজ করেছিল। ‘আংকল তোমার বন্ধুকে অ্যাপোলোতে ভর্তি করা হয়েছে।’ সানি সায়ককে কোনোদিনই পিসেমশাই বলে ডাকে না। ‘আংকল’ বলে। একসময় তীর্থ আর সায়ক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। যদিও সেসব আর এখন নেই। তবু সায়ক মেসেজটা যখন দেখল, উদ্বিগ্ন বোধ করল। ন’বছর আগে তীর্থ মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসে। তার এই বেঁচে ওঠার ব্যাপারে সায়কের যথেষ্টই ইনভল্ভমেন্ট ছিল। তীর্থ যে ডাক্তার দেখাচ্ছিল, তিনি জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন। সায়কই তখন ইন্টারনেট ঘেঁটে জানতে পারে এই রোগের এক এক্সপেরিমেন্টাল চিকিৎসার কথা। সায়কের নিজের কানেই এসেছে এসব কথা, তীর্থ নাকি নিজের মুখে অনেককেই বলেছে। সায়ক ভাবে আবার কি হল? খারাপ ছিল বলে তো কানে আসেনি। তৃষ্ণা তাহলে জানাত। যতই ভাইবোনে অ-বনিবনা থাকুক, হাসপাতালে ভর্তি হবার মত অবস্থা হলে অবশ্যই ওর জানার কথা। রাতের খাওয়া হয়ে গেলে সায়ক আর তৃষ্ণা যে যার নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। এ ব্যবস্থা অনেকদিনই, বুম্বা’র বিদেশ যাবার আগে থেকেই। সায়ক করিডর পার হয়ে তৃষ্ণার দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে বাংলা সিরিয়ালের সংলাপ ভেসে আসছে। তৃষ্ণার ঘরের দরজা ভেজানো না কি ভেতর থেকে লকড, বোঝে না সায়ক। ঠেলে দেখতে অস্বস্তি বোধ করে। আরেকবার টোকা দেয় সায়ক একটু জোরে। এবার রাত-পোশাকের ওপর একটা গাউন জড়াতে জড়াতে দরজা খোলে তৃষ্ণা --“কি ব্যাপার ? কি হয়েছে ?”

এ-বাড়ির সবচাইতে বড় বেডরুম এটা। হোম-ডেকর ফার্নিচারে সুসজ্জিত। দেয়ালে বড় টিভি-স্ক্রিনে চড়া সাজগোজ করা বিভিন্ন বয়েসী নারী-পুরুষ। যদিও সায়কের মনে হল পরিবারের মধ্যেরই কোনো দৃশ্যাভিনয় চলছে।

“একটু যদি ভল্যুমটা আস্তে করো টিভিটার…”

রিমোট দিয়ে তৃষ্ণা টিভি মিউট করে। মুখের আশ্চর্যভাব বেড়েই চলেছে।

“তীর্থকে হাসপাতালে অ্যাডমিট করা হয়েছে। তুমি কি জানো? আমি একটা মেসেজ পেলাম ওর ছেলের, মেসেজটা এসেছে বিকেলেই কিন্তু আমি এইমাত্র দেখলাম। রাত হয়ে গেছে বলে আর ফোন করলাম না। তোমাকে জানাতে এলাম...” এই পর্যন্ত বলে সায়ক থামে।

“মার কাছে তো সেদিন শুনলাম ওইখানে যাওয়া-আসা আবার খুব বেড়েছে...” তৃষ্ণাকে চিন্তিত হবার চেয়ে বিরক্তই মনে হল সায়কের।

“দেখো কি করবে, আমি কাল হসপিটালে ফোন করে দেখব কে দেখছেন, কথা বলব।” সায়ক নিজের ঘরে ফিরে আসে। শোবার ঘরগুলোর মধ্যে সায়কের ঘরটাই অপেক্ষাকৃত ছোট। বুম্বা’র ঘরটাও বেশ বড়সড়। এখন বন্ধই থাকে। সকালে একবার ঝাঁটপোঁছ করার জন্য খোলা হয় শুধু। বুম্বা আমেরিকা গেছে বছর দুয়েক। বিয়েও করতে চায় না। নিজের মধ্যেই থাকে। কলকাতা’য় যতদিন ছিল, তখনও বড় ঠান্ডা, শান্ত হয়ে ছিল। ওর বয়েসী অন্য ছেলেদের মত উচ্ছ্বাস নেই। ও যে কি ভালবাসে, কে জানে!

চোখে মুখে আরেকবার জল দিয়ে লাইট নিভিয়ে সায়ক শুয়ে পড়ে। কি মনে হতে মোবাইল’টা রাখে বালিশের পাশে। তীর্থ’র কথাই মনে আসছে বারবার। এবার কি হয়েছে সায়ক এখনও জানে না, তবু মনে হচ্ছে এবার টানতে পারবে তো তীর্থ?

*****

তীর্থ’র সাথে সায়কের প্রথম দেখা এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালে। সায়ক হাউস-স্টাফশিপ করছে তখন ওখান থেকে। তীর্থ’র ছোটমামা তখন ওই হাসপাতালের সুপার। তীর্থ’র অফিস কাছেই, ফাঁক পেলেই মামার সাথে দেখা করতে চলে আসত। সেখানেই সায়কের সাথে আলাপ এবং অদ্ভুতভাবেই হৃদ্যতা জন্মায়। ডিউটির পর প্রায়দিনই সায়ক বেরিয়ে তীর্থ’র সাথে দেখা করে কোনোদিন সিনেমা, কোনোদিন নাটক দেখে বাড়ি ফিরত। একবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গেছিল দু’জনে বসে গল্প করবে বলে। এদিক-ওদিক ঝোপের পাশে নানা অন্তরঙ্গ দৃশ্য দেখার পর দু’জনে মজা করতে আরো ঘুরঘুর করতে থাকে। শেষপর্যন্ত এক পুলিশ ওদেরকে ধরেন। অনেক কাকুতি-মিনতি করে ছাড়া পায়। কতদিন সায়ক আর তীর্থ এ-নিয়ে পরে হাসাহাসি করেছে। তৃষ্ণা’র সাথে বিয়ে আর দু’বছর পর। বন্ধুকে ভগ্নীপতি হিসেবে পেয়ে সবচাইতে খুশি হলো তীর্থ’ই। তীর্থ বিয়ে করে বেশ পরে। বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করে একে একে বোনেদের বিয়ে দিয়েছে, বড় ফ্ল্যাট কিনে মাকে নিয়ে থাকে। ব্যস্ত হয়ে পড়েছে সায়ক, সরকারি হাসপাতাল ছেড়ে যুক্ত হয়েছে প্রাইভেট হাসপাতালের সঙ্গে। বুম্বা জন্মালো। বন্ধুত্বর আর আলাদা করে কিছুই থাকল না, সম্পর্ক গিয়ে দাঁড়াল শুধুমাত্র শালা-ভগ্নীপতির।

তীর্থ’র কাজ ছিল ক্লায়েন্ট’দের নিয়ে। কলকাতায় এলে তাদেরকে এয়ারপোর্ট থেকে অ্যাটেন্ড করা এবং নিয়ে ঘোরানো এদিক-ওদিক। খাওয়া-দাওয়ার কোনো সময়ই ছিল না তীর্থ’র। আর দিনদিন বেড়েই চলছিল মদ্যপান। খানিকটা ছিল করপোরেট লাইফের সাথে তাল রাখতে, পরে সেটা অভ্যেসে দাঁড়ায়। এরকমই চলছিল, হঠাৎ একদিন ফোন করে জানায়, “সায়ক এই শনিবার ফ্রী আছো? না থাকলেও আমার জন্য ম্যানেজ কোরো ভাই। বিয়ে করছি ওইদিন।” গেছিল সায়ক। কলকাতা’র অভিজাত এক হোটেলে ঘনিষ্ঠ কিছুজন জড়ো হয়েছিল। বছর আটতিরিশের একটু কঠোর নয়না এক মহিলা তীর্থ’র পাশে। হালকা জামদানি গায়ে, প্রসাধন প্রায় নেই বললেই চলে। অবাক হয় সায়ক। যত দূর জানত, তীর্থ পছন্দ করে সম্পূর্ণ অন্যধরণের মহিলাদের। দু’বছরের মধ্যেই ডিভোর্স হয়ে যায় ওদের। তৃষ্ণা’র মুখ থেকে কখনো কানে আসে তীর্থ’র অতিরিক্ত ড্রিংকের কথা। ব্যাস, জীবন বলতে তো এই তীর্থ’র। একটা ছেলে আছে ওদের। সানি। তীর্থ’র স্ত্রী ওর দায়িত্ব তীর্থ’কেই দিয়ে গেছে।

*****

“আংকল, বাবার চেকবুক খুঁজে পাচ্ছি না। এদিকে আজই ৩০-৪০ হাজার টাকা দিতে হবে। আমি কোথা থেকে দেবো?” সানির ফোনটা এলো সকাল সাতটা নাগাদ।

সানি মানুষ হয়নি। তবে এ ব্যাপারে যদিও তীর্থর ত্রুটি তেমন ছিল না। ভালো স্কুল-কলেজে পড়িয়েছে। কোচিং ক্লাস। যদিও তৃষ্ণা’দের অভিযোগের শেষ নেই তীর্থর ওপর।

“রবিবারগুলোয় বাড়িতে থাকে কতক্ষণ দাদা? সেই তো গিয়ে মধুমিতার কাছে পড়ে থাকে। যতসব নোংরামো।’’

তীর্থ’র সাথে ওর বাড়ির সকলের দূরত্ব ক্রমশ বেড়েই চলেছে। যে যার নিজের মত থাকে। সানি পড়াশুনোয় ভাল, কিন্তু স্কুলে পড়তেই নেশা করতে শুরু করে। খাবার টেবিলে তৃষ্ণা’র কথায় শোনে শ্বশুরবাড়ির এই সমস্ত গল্প। মধুমিতা বলে এক ডিভোর্সি মহিলার সাথে তীর্থ’র সম্পর্ক প্রায় অনেকদিন। এ’ব্যাপারে সায়কের নীরব সম্মতি আছে বন্ধুর প্রতি। কোথাও গিয়ে তো দু’টো কথা বলতে পারছে তীর্থ, সারা সপ্তাহ ক্লায়েন্ট মিটিং’য়ের পর। সায়ক আর তৃষ্ণা’ও বেরোয় প্রায় রবিবারই। তৃষ্ণা খুব চড়া সাজে গাড়িতে সামনের সিটে সায়কের পাশে বসে। সায়কের ইচ্ছে করত ড্রাইভ করে দূরে গ্রামের দিকে চলে যেতে। কিন্তু তৃষ্ণা শপিং-মল আর আইনক্স ছাড়া কোথাও যাবে না। মা-বাবার মনোমালিন্য আর কঠিন মুখে বেড়াতে যাওয়া দেখে দেখে বুম্বা ছোট থাকতেই আর ওদের সাথে বেরোত না। বাড়ি বসে বই পড়ত। কোনো কোনো রবিবার সায়ক চাইত বুম্বার সাথেই থাকতে, সারা সপ্তাহ তো থাকাই হয় না।

“বুম্বা টিভি দেখবে, বই পড়বে, পিৎজা অর্ডার দেওয়া আছে। ও ঠিকই থাকবে, আমরা তো এই একটা দিনই বেরোই। তাছাড়া কটা কথা বলে ও কারুর সাথে?”

সায়ক বুঝছে বুম্বা কেমন অন্যরকম হয়ে পড়ছে। বড্ড চুপচাপ।

“সেইজন্যই তো ওর সাথে বেশি করে থাকা দরকার। কথা নাই বা বলল, আমিও ওর পাশে একটা বই নিয়ে বসব। তুমিও বসতে পারো তৃষ্ণা।” এর পরই তৃষ্ণা ঝলসে উঠত। সায়কের উপার্জন বৃদ্ধির সাথে তাল দিয়ে বাড়ছিল তৃষ্ণা’র নিজস্ব চাকচিক্যের জগৎ।

****

সায়কের চিন্তার জাল ছেঁড়ে গাড়ি হসপিটালের গেটে ঢোকার সাথে সাথেই। রিসেপশনে গিয়ে দেখতে পেলো সানি’কে। চোখ অসম্ভব লাল।

“তুই কি কাল রাতে এখানেই ছিলি নাকি?”

“না না ...” খুব তাচ্ছিল্যভরে সানি জবাব দেয়। সায়কের নাকে গন্ধ আসায় বোঝে এই সকালেও সানি মদ খেয়ে এসেছে। গতকাল সানি ব্যাঙ্কে গেছিল তীর্থ’র অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার জন্য, কিন্তু জয়েন্ট-অ্যাকাউন্ট না থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। সায়ক ওপরে তীর্থ’র কেবিনে যাবার জন্য লিফটের সামনে দাঁড়ায়, সানি রাজি হয় না যেতে। আজ সকালে তীর্থ একটু ভাল। সায়ক কাছে গিয়ে দাঁড়াতে একটু যেন হাসার চেষ্টা করে। পাশের চেয়ারটার দিকে তাকায় তীর্থ। সায়ক চেয়ারটা একেবারে তীর্থর মুখের কাছে সরিয়ে আনে।

“তুমি শুনলাম নিয়ম করে আর ওষুধপত্র খাচ্ছিলে না। হঠাৎ এমন সুইসাইডাল হয়ে উঠলে কেন?’’ তীর্থ জবাব দেয় না। সায়ক আবার জিজ্ঞেস করে কি অসুবিধে হচ্ছে?

এবার তীর্থ ঘরঘরে গলায় বলে, “কি রিপোর্ট এলো সায়ক? সব কি পুড়ে ঝাঁঝরা? গলার নিচ থেকে পেটের নিচ অবদি বড্ড জ্বালা করছে।” খুব কষ্ট করে এতটা বলে তীর্থ।

সায়ক খানিকক্ষণ চুপ করে থাকে। ডাক্তারের সাথে আসার আগে ফোনে কথা হয়েছে। সিরোসিস অফ লিভার। খুবই আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিলরোবিন ২৬। এসব কথা তীর্থ’কেই বলতে হবে। বাড়িতে এমন কেউ নেই যে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এ’ব্যাপারে। তীর্থ যাতে চমকে না ওঠে তাই হালকা ভাবে সায়ক বলে ---

“ঠিক তার উলটো পুরো জল। তীর্থ তুমি আবার তেল-মশলা, ইভেন ড্রিঙ্ক করতেও শুরু করেছিলে?”

“—মানে সিরোসিস অফ লিভার?” স্বাভাবিকভাবে তীর্থ জিজ্ঞেস করে।

“হ্যাঁ, লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে খানিক আশা আছে কিন্তু তীর্থ তোমার শরীরের যা কন্ডিশন, তুমি অত বড় সার্জারির ধকল এখন নিতে পারবে না।” তীর্থ’র ক্লান্ত মুখে অস্থিরতার রেখা দেখা দেয়। “প্রশ্নই আসে না। এবার আর পারব না টানতে। আগেরবার না হয় তুমি বাঁচিয়েছিলে।” তীর্থ হাঁফাতে থাকে। সায়ক পালস দেখে। সিস্টার’কে ডাকে। খুলে রাখা অক্সিজেন-মাস্ক আবার লাগিয়ে দেন সিস্টার।

নেমে এসে সায়ক বেরিয়ে যাচ্ছিল, সানি এসে সামনে দাঁড়ায়। “তুমি টাকার ব্যাপারটা জিজ্ঞেস করলে বাবাকে?” সায়ক প্রচন্ড বিরক্ত বোধ করে এই প্রশ্নে। গম্ভীরভাবে জবাব দেয়, সায়ককে এসবের মধ্যে যেন কোনোভাবে ইনভলভ না করা হয়। বলতে বলতেই কাঁচের বাইরে চোখ পড়তে দেখে তৃষ্ণা নামছে একটা ট্যাক্সি থেকে।

“তৃষ্ণা আসছে, তোরা ঠিক কর কি করবি না করবি। আমার হসপিটালে যেতেই হবে। সানি তোরা তৈরি হয়ে থাক, এবার তীর্থর সারভাইভ করার চান্স প্রায় নেই।” তৃষ্ণা এসে জানতে চায় তীর্থ’র কথা। ডাক্তারের সাথে সায়কের যা কথা হয়েছে সায়ক সেটাই তৃষ্ণা আর সানিকে জানায়।

“লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হচ্ছে একমাত্র উপায়। লাখ তিরিশেক খরচ।” সানি চমকে ওঠে “তিরিশ লাখ?” তৃষ্ণা সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে –“কেন তোর বাবার কি টাকা কম আছে না কি?”

সানি কিছু একটা বলতে উদ্যত হতেই সায়ক আবার বলে ওঠে –“আর লিভার কিন্তু বাইরের কেউ দিতে পারবে না।”

তৃষ্ণা আর সানি একসাথে বোলে ওঠে –“ মানে?”

“মানে –-বাড়ির কেউ বলতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হন স্পাউস, তীর্থর তো সে বালাই নেই। এরপর হয় সন্তান, নয় ভাই-বোনের মধ্যে কেউ ডোনার হয়।”

তৃষ্ণা আর সানি দুজনেই চোখ বড় করে সায়কের দিকে তাকায়।

*****


পর পর দু’টি বাচ্চার চোখের অপারেশন ছিল। সায়কের আসতে দেরি হওয়ায় দুপুর নাগাদ শেষ হল সার্জারি। নিচের ক্যান্টিনে লাঞ্চ সারতে বসেছে, আর তখনই ফোনটা এল। ফোনটা বাজছে, আর সায়ক তাকিয়ে আছে। ‘তাহলে কি আজই চলে গেল তীর্থ?’

সায়ক সকালে তখন তীর্থ’র কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, তীর্থ ইশারায় অক্সিজেন মাস্ক একবার খুলতে বলে, সিস্টার খুলে দিতে ঘড়ঘড় করে তীর্থ জিজ্ঞেস করে –“কত খরচ পড়বে ওতে ?” আর পারে না কিছুই বলতে, সিস্টার মাস্ক লাগিয়ে দেন। সায়ক বুঝেছিল তীর্থ লিভার প্রতিস্থাপনের খরচের কথা জানতে চাইছে। তীর্থ’র বয়েস আটষট্টি। বাড়ির কারো সাথেই তেমন প্রীতির সম্পর্ক নেই, ছেলে বড় হয়ে গেছে তবে মানুষ হয়নি। তীর্থ যদি এক দুঃখী মানুষের মত মা-বোনেদের কাছে এসে নিজের অসহায়তা প্রকাশ করত তাহলে সকলের প্রিয় হতো। তার বদলে তীর্থ নিজের মত নিজেকে ভাল রাখার চেষ্টা করেছে তাই ক্রমে বাড়ির সকলের থেকে দূরে সরে গেছে। বিশেষ করে তীর্থ’র সাথে মধুমিতা’র সম্পর্কের জন্য বাকি সব সম্পর্ক অনেক দূরে সরে গেছে।

“ওই মহিলা এসে খুব ঝামেলা করছে।” ফোন ধরতেই তৃষ্ণা ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে। বোঝে না সায়ক। পরে আবার তৃষ্ণা জানায় যে তীর্থ’র বান্ধবি মধুমিতা নাকি হাসপাতালে এসে খুব চেঁচামেচি করছিল যে কেন তীর্থ’র লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হচ্ছে না, সেই নিয়ে। সায়ক বোঝে, বাড়িতে তৃষ্ণা’র যতই প্রতাপ থাকুক মধুমিতা’র সাথে তেমন পেরে ওঠেনি। তাছাড়া তিনি না কি বলেছেন তিনি নিজেই তীর্থ’কে লিভার দেবেন। সায়ক বলে, “ঠিক আছে আমি পরে ওঁর সাথে কথা বলব। ডাক্তারি নিয়ম-কানুনও তো কিছু আছে।”

সন্ধ্যেবেলা খানিক তাড়াতাড়িই বাড়ি ফেরে সায়ক আজ। তৃষ্ণা নেই। তালা খুলে বাড়ি ঢোকে। তৃষ্ণা থাকলেও কথাবার্তা সেই রাতের খাবার টেবিলে। আজ সায়কের খুব ছটফট বোধ হচ্ছে। ইচ্ছে করছে নিজের কারো সাথে কথা বলতে, কাছে গিয়ে বসতে। তীর্থ’র অসহায় মুখটা বারবার মনে পড়ছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক মানুষ। ছেলে থেকেও নেই। সায়কের তো তা নয়। সায়ক ঘড়ি দেখে। বুম্বা মনে হয় এখন অফিস যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে, ওকে একটা ফোন করলে তো হয়। কোনো কোনোদিন আবার ঘরে বসেও কাজ করে অফিস না গিয়ে। দেখা যাক, আজ থাকে কি না। অনলাইনে কল করে সায়ক। নাহ, ধরে না বুম্বা। এবার সরাসরি টেলিফোন করলে বুম্বা ধরে, “হ্যালো”

“জানিস বুম্বা তোর মামা খুব অসুস্থ আর বুঝি বাঁচানো গেলো না।” সায়কের কাছ থেকে বুম্বা সব শোনে, কোনোরকম ধৈর্যহীনতা প্রকাশ পায় না। কিন্তু নীরব। কথাই বলে না বুম্বা। জিজ্ঞেস করলে জবাব দেওয়া ছাড়া। একটু পরে সায়ক নিজের থেকেই বলে –“ঠিক আছে, বুম্বা তুই তো বেরোবি।” এরপর সবচাইতে অপছন্দের কাজটাই করে সায়ক। এক পেগ স্কচ গেলাসে নিয়ে টিভি’টা খোলে।

রাত তখন এগারোটা সানি’র ফোন আসে যে হসপিটাল থেকে জানিয়েছে তীর্থ’র অবস্থা খুব খারাপ, ওরা বলছে ভেন্টিলেশনে রাখার জন্য।

“আংকল ভেন্টিলেশনে রাখার কি কোন মানে হয়? টেনে হিঁচড়ে ভেনটিলেশনে রেখে এরা বিল বাড়াবে।” সায়ক প্রথমে চুপ করে থাকে সানি’র কথায়, তারপরে জানায় –“রাতটুকু অন্তত থাক ভেন্টিলেশনে তীর্থ। কাল সকালেই আমি যাব।”

******

“শুনুন ...আপনাকে বলছি, আপনিই তো ডঃ সায়ক মিত্র? “উদ্ভ্রান্তের মতো এক মাঝবয়েসী সুন্দর চেহারার মহিলা সায়কের সামনে এসে চেঁচিয়ে ওঠায় সায়ক থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়ায়।

“কিসের জন্য তীর্থর ভেন্টিলেশন খুলে নেওয়া হয়েছে সকালে? কি ভেবেছেন আপনারা! ওর কেউ নেই? মেরে ফেললেন সবাই মিলে লোকটাকে?” তৃষ্ণা নেমে এসেছিল। এরপর সেই মহিলা আর তৃষ্ণা’র কথাবার্তায় চারদিকের লোকেরাও ওদের দিকে তাকায়। কে তীর্থ’র কত কাছের তাই নিয়ে কথা শুনতে আর সায়কের ভাল লাগল না। বডি এখনো হসপিটাল থেকে রিলিজ করানো যায়নি। সানি ব্যাঙ্কে। কি না কি অসুবিধে হচ্ছে টাকা তোলার ব্যাপারে। কে এম সি’র ডেথ-সার্টিফিকেট না দেখিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে কিছুতেই টাকা তোলা যাচ্ছে না। ইত্যাদি নানারকম। সায়ক ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। সকালে অপারেশন থাকায় সায়ক ইচ্ছে থাকলেও আসতে পারেনি তীর্থ’কে দেখতে। সানি ভেন্টিলেশন খুলে নেবার নির্দেশ দেয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। ঘন্টা দুয়েক বেঁচেছিল তারপর তীর্থ। সায়ক খবর পায়, তখন সে হাসপাতালে। গাড়ি স্টার্ট করে স্টিয়ারিং ঘোরাতে গিয়ে চোখ পড়ে বাঁ হাতের ঘড়িটার দিকে।

“যা জিজ্ঞেস করছি সবই না বলছ, আরে বিয়েতে কিছু তো তোমায় দেবো সায়ক। ঠিক আছে চলো একটা স্যুইস ঘড়ি কিনে দি তোমায়। এটা তুমি সবসময় পোরো সায়ক।” এত বছর ধরে সায়কের খেয়ালও ছিল না যে ঘড়িটা তীর্থ’র দেওয়া। একটা বড় শ্বাস ফেলে সায়ক স্পীড বাড়িয়ে হাসপাতালের গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়।




লেখক পরিচিতি
সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত
কলকাতায় থাকেন।
গল্পকার। অনুবাদক। 
বাচিক শিল্পী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন