মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

মল্লিকা ধরের গল্প : শিমূল-পূর্ণিমা


১।

মালিনী ফিসফিস করে বলে, "জঙ্গল থেকে জ্যোৎস্না মেখে উড়ে আসবে দুই সোনার হাঁস, সরোবরের উপর দিয়ে উড়ে যাবে পূর্ণ চাঁদের দিকে । এই বলেছিল না টুসু, মোরাইয়া, রাংলি, মুরঝ -- ওরা সবাই? "

সৌরাংশু হেসে বলে, "তুই বিশ্বাস করেছিস নাকি? ওটা তো গল্প, কিংবদন্তী । "

মালিনী বলে, "হোক গল্প, হোক কিংবদন্তী । আমার বিশ্বাস করতেই ইচ্ছে করছে । এই সরোবরকেও তো মায়া সরোবর ভেবেছিলাম দূর থেকে, কিন্তু এটা তো সত্যি । সত্যিকার হ্রদ । আয় এখানে বসি ।"

হ্রদের জলের থেকে একটু দূরে একজোড়া বড় বড় কালো পাথর পাশাপাশি । দু’টো পাথরে ওরা দু'জন বসল । কিংবদন্তীর সুবর্ণহংসের প্রতীক্ষায় ।

সৌরাংশু আস্তে আস্তে বলল, "লিন, কাজটা কি ঠিক হল? "

মালিনী হেসে বলে, " কোন্‌ কাজটা? ফিল্ড ওয়ার্কে এসে এইভাবে হঠাৎ বাকী সবার কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়াটা? মোবাইল টোবাইল সব অফ করে ব্যাকপ্যাক পিঠে এইভাবে গহীন জঙ্গলে ঢুকে পড়াটা? "

সৌরাংশু চিন্তিত গলায় বলে, "হ্যাঁ, সবটাই । দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতন হয়ে গেল না ব্যাপারটা?"

মালিনী বলে, "আমরা তো এইরকমই ঠিক করে রেখেছিলাম, সৌ । আসার আগে থেকেই । এইভাবেই দলের বাকীদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবো, কন্ট্যাক্ট অফ করে দেবো । করিনি এরকম প্ল্যান?"

"হুঁ, তা করেছিলাম । কিন্তু বাস্তবে জিনিসটা কেমন দাঁড়াবে সেটা তখন---এখন বাকীরা কী ভাবছে --- পুলিশে খবর দিয়েছে কিনা--- বাড়িতে ফোন করেই বা কী বলে দিয়েছে---সেখানেই বা কী কান্ড চলছে ---" সৌরাংশুর গলার স্বরে উদ্বেগ চাপা থাকে না ।

মালিনী কেমন একটু তীক্ষ্ণ গলায় বলে,"তুই কি রিগ্রেট করছিস, সৌ? এখনও তো সময় আছে, ফিরে যা । এক্ষুনি মোবাইল অন করে বলে দে তুই কোথায় আছিস, কখন ফিরবি ক্যাম্পে, সব । কিন্তু আমায় জড়াতে পারবি না । আমি ফিরবো না । আমার কোনো কথা ওদের জানাতে পারবি না ।"

সৌরাংশু চুপ করে চেয়ে থাকে মালিনীর দিকে । ওর কেমন যেন অচেনা লাগছে মালিনীকে । ছোটো থেকে খেলার সাথী, পরবর্তীকালে কলেজে সহপাঠিনী যে মালিনীকে সে এতদিন চিনতো, চেনে, এই আসন্ন-চন্দ্রোদয় অরণ্যে সেই মালিনী যেন আর নেই । কোনো জাদুকাঠির ছোঁয়া লেগে বদলে গিয়েছে ।

হ্যাঁ, ক্যাম্পে আসার আগেই অবশ্য এইরকম একটা প্ল্যান মালিনী করেছিল সৌরাংশুর সঙ্গে, কিন্তু সত্যি সত্যি যে ও সেটাই করে বসবে, এতটা ধারণা ছিল না সৌরাংশুর । এখন ওর ভয় লাগছে, নার্ভাস লাগছে, মনে হচ্ছে ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে ।

পুলিশ কেস হলে সৌরাংশু যে সহজে রেহাই পাবে না সেটা সে জানে । একটাই শুধু সুবিধে আছে যে ওদের দু’জনেরই বয়স একুশ বছর, দু'জনেই প্রাপ্তবয়স্ক । কিন্তু ধরে ফেললে তাও হয়তো অভিযোগ উঠবে যে সৌরাংশু জোরজবরদস্তি করে ---

মালিনী যেন ওর মনের কথাগুলো পড়ে ফেলছিল । বলল, "তুই কি ভয় পাচ্ছিস পুলিশ কেস হলে তোকে ফাঁসিয়ে দেবো যে তুই আমায় জোর করে ধরে নিয়ে পালিয়েছিস? আমি তো বললাম, তুই ফিরে যা । ফিরে গিয়ে বলবি তুই নিজে একা জঙ্গলে হারিয়ে গেছিলি, টাওয়ার পাসনি তাই ফোনে যোগাযোগ করতে পারিস নি । অনেক কষ্টে রাস্তা খুঁজে ফিরে গেছিস । আমার ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গ কিছু জানিস না ।"

সৌরাংশু এবারে একটু রেগে ওঠে, হয়তো নার্ভাসনেসটা চাপা দেবার জন্যই । রাগী গলায় বলে, "বার বার এক কথা বলিস না লিন । তোকে এখানে একা রেখে আমি ফিরে যাবো? আমাকে ভাবিস কি তুই?"

মালিনী ঠান্ডা গলায় বলে, "কেন? আমি তো তোকে এখানে একা ফেলে দিব্যি ক্যাম্পে চলে যেতে পারি । কোথাও বাধবে না । যেন সেটাই স্বাভাবিক । কিন্তু তুই পারিস না । আমি মেয়ে বলে? ভেবে দ্যাখ সোশ্যাল কন্ডিশনিং আমাদের হাড়ে মজ্জায় চলে গিয়েছে কীরকম!"

সৌরাংশু নির্বাক হয়ে চেয়ে থাকে মালিনীর দিকে । কী বলবে ভেবে পায় না । অচেনা হয়ে গিয়েছে মালিনী । এইরকম কথা আগে বলেনি কোনোদিন ও । কিংবা কেজানে হয়তো সৌরাংশুকে বলে নি, অন্যদের বলেছে । ছোটো থেকে পাশাপাশি বড় হয়েছে বটে তারা, কিন্তু তাতেই কি সবটা জেনে ফেলার নিশ্চয়তা থাকে?

মস্ত বড় গোল চাঁদ ঠিক তখনই উঠে আসে সরোবরের পূর্বতীরের গাছের আড়াল ছেড়ে । সেইদিকে মুখ করে বসে থাকা মালিনীর চোখ সেই আশ্চর্য আরণ্যক জ্যোৎস্নায় যেন জ্বলজ্বল করে ওঠে । আচ্ছন্নের মতন মালিনী বলে, "এই পূর্ণিমাকে ওরা বলে শিমূল-পূর্ণিমা । এইসময় শিমূল গাছ ফুলে ভর্তি, সেইজন্যেই হয়তো এইরকম নাম ।"

আশ্চর্য সেই গোল চাঁদের দিকে চেয়ে সৌরাংশুও যেন মুহূর্তের জন্য আত্মবিস্মৃত হয়ে যায় । অতীত, ভবিষ্যৎ মুছে যায় গাঢ় কুয়াশায়, শুধু জেগে থাকে এই জ্যোৎস্নাপ্রহরটুকু । নিজেকে নির্ভার পাখির মত লাগে ওর ।

মনে হয় ডানা মেলে দিলেই উড়ে যেতে পারবে এই ভয়ভাবনাদুঃখহতাশাময় পৃথিবী থেকে । পাশে থাকবে মালিনী, সেও তখন তার ডানা মেলে দিয়েছে । আস্তে আস্তে গুণগুণ করে সৌরাংশু জীবনানন্দের কবিতা আবৃত্তি করে, " 'আমি যদি হতাম বনহংস / বনহংসী হতে যদি তুমি' ", মালিনী সঙ্গে সঙ্গে পরের অংশ বলে ওঠে," ‘কোনো এক দিগন্তের জলসিঁড়ি নদীর ধারে / ধানক্ষেতের কাছে / ছিপছিপে শরের ভিতর / এক নিরালা নীড়ে ’ ”

সৌরাংশু বলে, " ' তাহলে আজ এই ফাল্গুণের রাতে / ঝাউয়ের শাখার পেছনে চাঁদ উঠতে দেখে / আমরা নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে / আকাশের রুপালি শস্যের ভিতর গা ভাসিয়ে দিতাম-’ ”, সে থামতেই মালিনী ধরে নেয়, "' তোমার পাখনায় আমার পালক, আমার পাখনায় তোমার রক্তের স্পন্দন-/ নীল আকাশে খইক্ষেতের সোনালি ফুলের মতো অজস্র তারা, / শিরীষ বনের সবুজ রোমশ নীড়ে / সোনার ডিমের মতো / ফাল্গুনের চাঁদ ।’ ”

তারপরে কবিতা ছেড়ে সে নিজের কথা বলে, "সৌ, ঠিক যেন এই মুহূর্তটা । সোনার ডিমের মতন চাঁদ উঠে আসছে । কবি কেমন করে জানলেন? তিনি কি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা?"

"কিন্তু তারপর?" কেমন একটা অদ্ভুত বিষাদমিশ্রিত স্বরে সৌরাংশু বলে, " ' হয়তো গুলির শব্দ : / আমাদের তির্যক গতিস্রোত, /আমাদের পাখায় পিস্টনের উল্লাস,/আমাদের কন্ঠে উত্তর হাওয়ার গান!' "

মালিনীর গলায় কিন্তু বিষাদ নেই, সে বলে, "হয়তো গুলির শব্দ আবার:/ আমাদের স্তব্ধতা, আমাদের শান্তি । / আজকের জীবনের এই টুকরো টুকরো মৃত্যু আর থাকত না : / থাকত না আজকের জীবনের টুকরো টুকরো সাধের ব্যর্থতা ও অন্ধকার;' "

সৌরাংশু বলে, "তুই সত্যি করে বল তো লিন, আসলে তোর উদ্দেশ্যটা কী? তুই কি কিছু লুকোচ্ছিস আমার কাছে? "

মালিনী হঠাৎ গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলে, "চুপ! ওই দ্যাখ, জলের মধ্যে চাঁদ আর আকাশে চাঁদ, একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে । জ্যোৎস্না তীব্র হয়েছে । তুই কোনো গন্ধ পাচ্ছিস? ফুলের গন্ধ? আমি পাচ্ছি । হয়তো কোথাও কোনো রাত্রিবেলার ফুল ফুটছে ।"

সৌরাংশুর ধৈর্যচ্যুতি হয়, রুক্ষ গলায় সে বলে, "লিন, সিরিয়াসলি, কথার উত্তর দে । আমার কিন্তু কিছুই ঠিকঠাক লাগছে না ।"

মালিনী সৌরাংশুর দিকে একবারও না তাকিয়ে আকাশের চাঁদের দিকে চোখ রেখেই বলে, "কিছুই ঠিকঠাক নেই সৌ, তাই তোর ঠিক লাগছে না । দিনের পর দিন খাঁচায় আটকে থেকেছিস কখনও? অদৃশ্য শিকলে বাঁধা? ডানা মেলতে গেলেই লোহার শলার খোঁচা? তুই বুঝতে পারবি না । সেইজন্যেই তো বিরল মুহূর্তে খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে উড়াল দিলাম । ডানায় জোর নেই, বহুকালের বন্দীত্বে ডানা দুর্বল, কিন্তু তার জন্য ভয় করলে কোনোদিনই মুক্তি আসবে না । এই নিয়েই উড়তে হবে । তুই ফিরে যা সৌ, আমি আমার পথ ঠিক করে নিয়েছি ।"

সৌরাংশু পাথরটা থেকে উঠে দাঁড়ায়, মালিনীর কাছে এসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলে, "তুই কি পাগল হয়ে গেলি লিন? এসব কী বলছিস?"

চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখা যায় মালিনীর চোখ জলে ভর্তি হয়ে গিয়েছে, একসময় উপচে পড়ে । অশ্রুভেজা গলায় সে বলে, "সৌ, আমার ফেরার পথ নেই । ওরা আমাকে নিতে আসবে এখান থেকেই । তুই জানিস না, তোরা কেউ জানিস না, আমি যোগ দিয়েছি একটা গোপণ সংগঠনে । কয়েক মাস আগে। এই এতদিন দূর থেকেই কাজ করেছি, কিন্তু এইবারে ঘাঁটিতে না গেলেই নয় । আমায় ক্ষমা কর সৌ, তোকে এভাবে ভুল বুঝিয়ে এতদূর আনার জন্য । আমার উচিত ছিল একলাই হারিয়ে যাওয়া, তোদের কাছ থেকে । খামোখা তোকে জড়ালাম । কেন যে? হয়তো শেষ মুহূর্তটা তোর সঙ্গে কাটাতে চেয়েছিলাম। আমাদের সেইসব আশ্চর্য শৈশব কৈশোরের দিনগুলো, কিছুতেই ভুলতে পারলাম না রে । তুই আমায় মাফ কর । "



২।


স্তম্ভিত হয়ে যায় সৌরাংশু । বিশ্বাস করতে পারে না প্রথমে । "ত ত তু তুই এসব কী বলছিস লিন? কীসের গোপণ সংগঠন? কীভাবে যোগ দিলি? কেন যোগ দিলি? "

মালিনী হাসে, বলে, "এত কিছু বলার সময় আর নেই । পরে যদি কোনোদিন সময় হয়---হয়তো আর হবে না--কিন্তু হয়তো জানতে পারবি খবরেই --- আমাদের কিছু কিছু অপারেশন ---" এই পর্যন্ত মালিনী বলতে পেরেছিল, তারপরেই জঙ্গলের মধ্যে শোনা গেল একদল লোকের পায়ের আওয়াজ ।

কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র । তারপরেই জঙ্গল থেকে দশজন লোক এসে দাঁড়াল, সকলের গায়ে ঘন রঙের পোশাক । বিদ্যুতের মতন ছিটকে উঠে দাঁড়াল মালিনী, লোকগুলোর দিকে ফিরে দাঁড়াল । উচ্চারণ করল একটা দুর্বোধ্য শব্দ, হয়তো ওটা কোড । লোকগুলোর মধ্য থেকে একজন উচ্চারণ করল আরেকটা দুর্বোধ্য শব্দ । তার উত্তরে মালিনীর আরেকটা ওরকম শব্দ ।

বেশ কিছুক্ষণ শব্দ চালাচালি চলল । সৌরাংশু কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে শুনছিল । ওর মনে হচ্ছিল যেন হঠাৎ একটা দুঃস্বপ্নের ভিতরে পড়েছে, এখনই ঘুম ভাঙলে দেখবে সবই স্বপ্নের ঘোর । কিন্তু ভাঙল না দুঃস্বপ্ন । একসময়ে সে দেখল মালিনী ওকে বিদায় জানিয়ে লোকগুলোর সঙ্গে চলে যাচ্ছে, মিলিয়ে যাচ্ছে জঙ্গলের রহস্যময় অন্ধকারে ।

সমস্ত পেশী শক্ত হয়ে ছিল সৌরাংশুর, এবারে এক ঝটকায় সেগুলো আলগা করে দিয়ে লাফিয়ে উঠল সে । এতক্ষণ যেন সে পাথরের মূর্তি ছিল, এইবারে জ্যান্ত হল । লাফিয়ে গিয়ে সে পড়ল ওদের কাছে, মালিনীর কাঁধ আঁকড়ে ধরে আর্তনাদের মতন বলে উঠল, "আমিও যাবো, আমিও যাবো সঙ্গে । "

একটি বলশালী হাত চেপে ধরল তার বাহু, কী একটা যেন বলল । ওদের ভাষা জানা নেই, শব্দটার অর্থ বোধগম্য হল না সৌরাংশুর । মালিনী ওদের নেতৃস্থানীয় লোকটিকে কী যেন বুঝিয়ে বলছিল ওদের ভাষায় । সৌরাংশুর ততক্ষণে বিস্মিত হবার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে, নইলে মালিনী এই আগন্তুকদের ভাষায় কথা বলছে দেখে তার বিস্মিত হবার কথা ছিল । এর পর ঠিক কী যে ঘটল সৌরাংশু বলতে পারবে না, সব আঁধার হয়ে গেল ।

হয়তো কোনো চেতনানাশক বা অন্যকিছু ওরা প্রয়োগ করেছিল । জ্ঞান সম্পূর্ণ হারাবার আগে সে অনুভব করেছিল দু'টি সবল হাত সতর্ক যত্নে তকে শুইয়ে দিচ্ছে বনের মাটি ছেয়ে থাকা ঝরাপাতার উপরে ।

জ্ঞান ফিরে প্রথম সে দেখল স্তব্ধ অরণ্যে ঝিকমিকে রুপোর গুঁড়োর মত জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে । গোল চাঁদ আকাশের ঠিক মাঝমধ্যিখানে । ঝরাপাতার শয্যায় পাশ ফিরল সে । ব্যাকপ্যাকটা পাশেই । কার এটা? আলতো হাত রাখল সেটার গায়ে । তারপর আবার শুয়ে পড়ল চিৎ হয়ে । এইখানটায় গাছের আড়াল নেই, জ্যোৎস্না অবারিত হয়ে পড়েছে তার শরীরে ।

ফিসফিস করে ও বলে উঠল, "নিম্নভূমির জলের গন্ধ ছেড়ে / আকাশের রুপালি শস্যের ভিতর ", থামল সে, তারপরে কী? মনে পড়ছে না । তার আগেই বা কী? সে কোথায়? কীভাবে সে এখানে এল? সঙ্গে কি কেউ ছিল? কী তার নাম? কী তার পরিচয়? কিছু মনে পড়ছে না । অদ্ভুত একটা ভয় তার বুকের ভিতরটা সাপ্টে ধরল । কুলকুল করে ঘামতে লাগল সে ।

তখনই স্তব্ধ অরণ্যকে মর্মরিত করে বয়ে গেল হাওয়া, স্নিগ্ধ একটা স্পর্শ শান্ত করে দিল ওকে । দীর্ঘ্শ্বাস ফেলে সে চোখ বুজল । কিছুর দরকার নেই তার । নাম, পরিচয় কিছুর দরকার নেই । সে মুহূর্তজাতক, এই মুহূর্তে জন্মাল সে এই অরণ্যে, তার অতীত নেই ।

একটা রাতপাখি ডেকে ওঠে, "টু লি লি, টু লি লিইইইইই" , কেমন আশ্চর্য মায়াজড়ানো ডাক । শুনতে শুনতে সে মনে করার চেষ্টা করে এরকম আগে কি কোনোদিন শুনেছে সে? অন্য কোথায়? অনেক দূরে অন্য এক পূর্ণচাঁদের রাতে?

হঠাৎ একটা ব্যাপার সজোর ধাক্কার মতন এসে পড়ে তার মনে । সোজা উঠে বসে সে । ওই আকাশের ওটাকে বলে চাঁদ, সে যেখানে বসে আছে সেটা পৃথিবীর মাটি, এখন রাত, পরে সূর্য উঠলে দিন হবে---এসবই তো সে জানে! শুধু সে কে, কোথা থেকে এখানে এল, সঙ্গে কেউ ছিল কিনা --- এইসব ব্যাপারগুলো মনে পড়ছে না । স্মৃতিতে যেন ওখানে কুয়াশা ।

ততক্ষণে মাঝ-আকাশ থেকে চাঁদ ঢলে পড়েছে খানিকটা পশ্চিমে । সে ব্যাকপ্যাকটা পিঠে নিয়ে রওনা দিল যেদিকে তার পা দু'টি তাকে নিয়ে যায় । হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গল শেষ হল একসময় । সামনে একটা বিরাট মাঠ, মাঠের ওপাশে নীল পাহাড়ের রেখা । ক্লান্ত পায়ে সেইদিকে চলতে চলতে উপুড় হয়ে পড়ে গেল মাঠের ঘাসে । পড়েই আবার অচেতন ।

অনেক দূরে গহীন জঙ্গলের ভিতরে তখন মালিনীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আরো কয়েকজন নতুন আসা দীক্ষাপ্রার্থীর সঙ্গে, একটি বিশেষ দীক্ষা-অনুষ্ঠানে । প্রথমে কালো কাপড় দিয়ে তাদের চোখ ঢেকে বেঁধে দেওয়া হল । তারপরে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসা হল একটি সুপ্রাচীন বৃক্ষের কাছে । বৃক্ষকান্ডের ঠিক সামনেই একটি চৌকো কালো পাথর । সেই পাথর ঘিরে জ্বলছে বারোটি প্রদীপ, বারো মাসের প্রতীক ।

প্রথমে দলনেতা এগিয়ে গিয়ে বসলেন পাথরের সামনে । অন্যরা দীক্ষাপ্রার্থীদের চোখের ঢাকা খুলে দিয়ে নেতার দু’পাশে বসালো সারি দিয়ে । নির্দেশ দিল নেতা যা উচ্চারণ করবেন এরা যেন পুনরুচ্চারণ করে । তাই হল । অদ্ভুত অদ্ভুত সব শব্দ উচ্চারিত ও পুনরুচ্চারিত হতে লাগল । এই প্রক্রিয়া চলল প্রায় ঘন্টাখানেক ।

তারপর নেতা পাথরের ছুরি দিয়ে নিজের ডানহাতের তর্জনীর ডগা ছিন্ন করলেন । রক্তধারা পাথরের মাঝখানে ঝরে পড়ল । নেতার নির্দেশে দীক্ষাপ্রার্থীদেরও তাই করতে হল । তারপরে সবাই তর্জনীর ডগায় বিশেষ ভেষজপাতার ব্যান্ডেজ জড়িয়ে সরু লতা দিয়ে বেঁধে নিল । এবারে গোটা দল চলল ঘাঁটির দিকে ।

ততক্ষণে রাত শেষ হয়ে এসেছে । শিমূল-পূর্ণিমার চাঁদ ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তের কাছে । পূর্ব দিগন্তে ঊষাভাস দেখা দিয়েছে ।


৩।

দশ বছর পর । আরেকটি শিমূল পূর্ণিমা । কত জল বয়ে গিয়েছে পৃথিবীর সমস্ত নদীতে নদীতে, কত খরা, কত বৃষ্টি... কত পরিবর্তন হয়ে গেল তাদের সকলের জীবনে, কত হারানো কত প্রাপ্তি.... সৌরাংশু এসে দাঁড়ায় সেই অরণ্যে, সরোবরতীরে । ঠিক সেই পাথর দু'টির পাশে । এই জায়গাটা এখনও একই আছে ।

দশ বছর আগের সেই শিমূল-পূর্ণিমার রাত্রির পরদিন ভোরে বনের পাশের মাঠে অচেতন সৌরাংশুকে প্রথম দেখতে পায় মুরঝ আর রাংলি । ওরা মোষ চরাতে আনছিল ওই মাঠে । মাঠের মাঝখানে মানুষ পড়ে থাকতে দেখে প্রথমে ওরা খুব ভয় পেয়েছিল, ভেবেছিল খুনের কেস নাকি!

কিন্তু কাছে গিয়ে দেখতে পায় মানুষটা বেঁচে আছে, আর শুধু তাই না, চেনা মানুষ । শহর থেকে আসা "নিখাই পড়াই" করা বাবুদের একজন । উঁয়াদের ক্যাম্পেই তো তারা গল্প করতে যায় সনঝেবেলা । রাংলিকে পাহারায় রেখে দ্রুত মোষের পিঠে চড়ে গাঁয়ে ফিরে মুরঝ অন্যদের খবর দেয় । ক্যাম্পেও খবর চলে যায় । তারপর অনেকে মিলে গিয়ে সৌরাংশুকে উদ্ধার করে ক্যাম্পে পৌঁছে দেয় ।

ক্যাম্পে প্রাথমিক কিছু শুশ্রুষার পর জ্ঞান ফেরে সৌরাংশুর । কিন্তু স্মৃতি ফেরে না । সহপাঠী বন্ধুদের যেকোনো জিজ্ঞাসার উত্তরে হয় সে মৌন থাকে নয় মৃদুস্বরে বলে, "আমি যদি হতাম বনহংস, বনহংসী হতে যদি তুমি" । তার চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে, কুয়াশাময় ।

বাকীরা তখন দিশেহারা । সৌরাংশু ফিরে এল মানসিক ভারসাম্যহীন, স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায়, এদিকে মালিনীর কোনো খবর নেই । সবদিক বিবেচনা করে মালিনীর জন্য পুলিশে খবর দেওয়াই ঠিক করল ওরা তারপর । পুলিশ কেস নিতে আপত্তি করে নি । তবে খুব একটা ভরসাও দিতে পারে নি দ্রুত খুঁজে দেবার।

ফিল্ড-ওয়ার্কের আরো কিছু বাকী ছিল । কিন্তু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সেইসব কাজ মুলতুবি রেখেই ওরা শহরে ফিরতে বাধ্য হল । ফেরার পরই সৌরাংশু অ্যাডমিটেড হল হসপিটালের সাইকিয়াট্রি বিভাগে । সেখানে ছ'মাস থাকার পর সে স্বাভাবিক হল । কিন্তু স্বাভাবিক হবার পরেও সে মালিনী সম্পর্কে একটি কথাও বলেনি । তার বক্তব্য ছিল, সেই রাত্রে সে জঙ্গলে পথ হারিয়েছিল, মোবাইলে চার্জ ছিল না বলে ক্যাম্পে যোগাযোগ করতে পারেনি । জঙ্গলে পথ হারিয়ে সে একই জায়গায় ঘুরছিল, একসময়ে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে মাঠে এসে সে জ্ঞান হারায় । তার সঙ্গে কেউ ছিল না । এই স্টেটমেন্ট সৌরাংশু সবাইকে দিয়েছিল, সহপাঠী বন্ধুদের, পুলিশকে, বাড়ির লোকেদের । কোথাও কোনো নড়চড় হয় নি ।

পুলিশ মালিনীকে খুঁজছিল । তার বাইরেও মালিনীদের বাড়ি থেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ নিয়োগ করা হয়েছিল । কিন্তু মালিনীর কোনো চিহ্ন ছিল না কোথাও । মালিনীর বাড়ির লোকেরা সৌরাংশুর কথা বিশ্বাস করে নি পুরোপুরি, তারা সন্দেহ করত সৌরাংশুর হাত আছে মালিনীর নিরুদ্দিষ্ট হবার পেছনে । কিন্তু কোনো প্রমাণ না থাকায় সৌরাংশুকে কেউ ধরতে পারে নি ।

কলেজে সেই বছরটাই ফাইনাল ইয়ার ছিল সৌরাংশুদের । সৌরাংশুর তো পরীক্ষা দেবার মতন অবস্থা ছিল না, সে তখনও সম্পূর্ণ সেরে ওঠেনি । সেরে ওঠার পরে তার তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল অন্য শহরে, তার মামা-মামীর কাছে । সেখানকার কলেজে একেবারে শুরু থেকে নতুনভাবে পড়াশোনা শুরু করল সে, নতুন বিষয় নিয়ে । তিন বছর পর ব্যাচেলর ডিগ্রী আর আরো দু'বছর পর মাস্টার্স ডিগ্রী পেয়ে যাবার পর চাকরিতে যোগ দিল ।

বছর চারেক ধরে চাকরি করছিল সে ভালোভাবেই, একাধিক বিয়ের সম্বন্ধও এসেছিল তার । কিন্তু নানা কারণে সেগুলো নাকচ হয়েছিল । সম্প্রতি একটি সম্বন্ধ স্থির হয়ে গিয়েছিল, সবকিছু ফাইনালাইজ করে ফেলতে চাইছিলেন সৌরাংশুর মা-বাবা-মামা-মামী । এই অবস্থায় হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দিয়েছে সৌরাংশু । একটা ব্যাগে সামান্য কয়েকটা জিনিসপত্র ও পকেটে কিছু টাকাকড়ি নিয়ে সে পালিয়ে এসেছে মামা-মামীদের বাড়ি ছেড়ে, শহর ছেড়ে । চিঠি লিখে অবশ্য জানিয়ে এসেছে যে সে স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তাকে যেন না খোঁজা হয় । সময় হলে সে নিজেই ফিরবে । পালিয়ে এসেছে সেই জঙ্গলে, দশ বছর আগে যেখান থেকে স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায় ফেরৎ গিয়েছিল সে ।

অন্যদিকে, মালিনীর জীবন বইছিল অন্য খাতে । অরণ্যের অধিকার নিয়ে লড়াই করছিল মালিনীদের গোপণ সংগঠন । জঙ্গলের মাটির তলায় বিপুল পরিমাণ মূল্যবান খনিজ সম্পদ । সেই সম্পদই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াল । এক বিখ্যাত মাইনিং কোম্পানির কাছে অরণ্য ইজারা দিতে বসেছিল সরকার । এইসবের বিরুদ্ধেই লড়ছিল মালিনীদের সংগঠন । কিন্তু রাষ্ট্রশক্তি বাধা দিল প্রচন্ডতম, দলের আরো অনেকের মত মালিনী পুলিশের সঙ্গে খন্ডযুদ্ধে মারা গিয়েছে তিন বছর আগে ।

এসব খবর সকলের মতন সৌরাংশু পেয়েছে খবরের কাগজ থেকেই । এসব খবরগুলো পড়ার সময় সে মাঝে মাঝে ভাবত, এখনও কি মালিনীর বাবামা তাকে সন্দেহ করেন? মালিনীর খবর, তাদের গোপণ সংগঠনের খবর, লড়াইয়ের খবর---সবই তো জানতে পেরেছেন তাঁরা! সৌরাংশু বাড়ি যেত কালেভদ্রে, মামামামীর কাছেই থাকত সে । বাড়ি গেলে নিজের মা-বাবার কাছে মালিনীপ্রসঙ্গ তুলতে তার ইচ্ছে করত না । ওঁরাও কেউ কিছু বলতেন না নিজে থেকে । তাই ওর আর জানা হয় নি মালিনীর বাবামা আজও সন্দেহ করেন কিনা ওকে ।

জঙ্গলের একটা অংশ এখন খনি, সেইদিকে গড়ে উঠেছে শহর । অরণ্যের আদিবাসীরা উৎখাত হয়ে চলে গিয়েছে অন্যত্র । কিন্তু কোনো অজানা কারণে এখনও এই হ্রদ তীরবর্তী অঞ্চলে থাবা পড়ে নি, এখনও এইদিকে অরণ্য প্রায় আগের মতই আছে ।

আজ এই জঙ্গলে হ্রদের তীরে দাঁড়িয়ে দশ বছর আগের সেই রাত্রির কথা তীব্র হয়ে ফিরে এল । সে আর মালিনী, মালিনী আর সে । স্থানীয়দের কাছে শোনা সেই কিংবদন্তী । শিমূল-পূর্ণিমার রাতে জঙ্গল থেকে উড়ে আসা দুই সুবর্ণহংসের রূপকথা । ওরা কবিতা আবৃত্তি করছিল সেদিন, জীবনানন্দের কবিতা.... তখনও তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না কী করতে চলেছে মালিনী । তারপর...

তিন বছর আগে খবরের কাগজে মালিনীর চরম পরিণতির খবর পড়েও কিন্তু সেরকম কোনো তীব্র বেদনার অনুভূতি সৌরাংশুর হয় নি, যেন সে ওরকমই কিছু একটা এক্সপেক্ট করেছিল । তারপরেও দিনের পর দিন কেটেছে, সে যন্ত্রের মতন ফলো করে গিয়েছে তার দৈনন্দিন জীবনের সমস্ত কাজকর্ম, খাওয়াদাওয়া, খেলাধূলা, সামাজিকতা ইত্যাদি ।

হঠাৎ দু'দিন আগে যেন ঝাঁকুনি খেয়ে সে জেগে উঠল, মনে হল ঘুমের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে যেন সে এসে দাঁড়িয়েছে খাদের ধারে । আর এক পা এগোলেই পড়ে যাবে । চাকরিবাকরি ছেড়ে পরিচিত সবকিছু ছেড়ে এভাবে না পালিয়ে তার উপায় কী ছিল?

যে মালিনীকে সে ভালোবাসতো, সে তো ওভাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চলে যায় নি একলার লড়াইয়ে! যেতে পারে না । তার সঙ্গে সৌরাংশুর শেষ বোঝাপড়া আজও বাকী যে!


৪।

সোনার ডিমের মত চাঁদ উঠে এসেছে, শিমূল-পূর্ণিমার চাঁদ । হ্রদের জলের মধ্যে তার ছায়া টলটল করছে। জলের চাঁদ আর আকাশের চাঁদ একসঙ্গে দেখতে পাচ্ছে সৌরাংশু । একটা হাওয়ার ঝাপটা এল, পাতায় পাতায় মর্মর । যেন অরণ্য ফিসফিস করে উঠছে । সৌরাংশু বসে পড়ল সেই পাথরটার উপরে, যেটায় সে বসেছিল সেই দশ বছর আগের শিমূল-পুর্ণিমার রাতে ।

ফিসফিস করে সে বলল, "লিন, লিন, লিন ..."

পাতায় পাতায় হাওয়া ফিসফিস করে উঠল যেন, "সৌ, সৌ, সৌ, এই তো আমি..."

গায়ে কেমন কাঁটা দিল সৌরাংশুর । কিন্তু সে যেন মনে মনে প্রস্তুত । দশ বছর আগের শিমূল-পূর্ণিমায় যা হবার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি, এইবারে যেন তা হবে ।

শৈশব, কৈশোরের কথা মনে পড়ে তার । সে আর মালিনী, পাশাপাশি বাড়ির একই বয়সী দু’টি ছেলেমেয়ে, একই সঙ্গে খেলাধুলো করে বড় হয়েছে । বিশেষ করে মনে পড়ে দু'টো পূর্ণিমা ওদের খুব প্রিয় ছিল । একটা বসন্তের, দোলপূর্ণিমা । অন্যটা শরতের, কোজাগরী পূর্ণিমা । সেইসব দিনে, ওরা যখন ছোটো, কী বিশাল দেখাত সেই পূর্ণচন্দ্রদের ওদের চোখে! শিমূল পলাশ কৃষ্ণচূড়ার রঙে মাতাল বাসন্তী পৃথিবীতে নামত সেই দোলপূর্ণিমার বিশাল গোল চাঁদের রুপোলি জ্যোৎস্না, চরাচর ভাসিয়ে দিত । কোকিলেরা ডেকে উঠত দিন ভেবে । আবার অনেক মাস পর শিউলির সৌরভে ঘেরা কোজাগরী রাতের গোল চাঁদ, সেই জ্যোৎস্নায় কেমন এক গভীর মৌন রহস্য । সেই রহস্যের ভিতর দিয়ে ডানা ভাসিয়ে ভাসিয়ে চলে যেত ধবধবে সাদা লক্ষ্মীপেঁচারা । আসলে চন্দ্র তো নির্বিকার, সে তো অনেক দূরে । ওরাই পৃথিবীর বিচিত্র রঙীন ও সুরভিত প্রাণের আদর ফিরে ফিরে পেত আর মনে রাখত গোল চাঁদ সাক্ষী রেখে।

জলের দিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে আপনমনে বলে, "কেন সেদিন আমাকে সঙ্গে নিলি না লিন? আমি কি খুব অযোগ্য ছিলাম? লড়াই করার কি কোনো সামর্থ্য ছিল না আমার? "

একথোকা জোনাকি জ্বলে উঠল পাশের খালি পাথরটার উপর, জল থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে আবার গায়ে কাঁটা দিল সৌরাংশুর ।

শিমূল-পূর্ণিমার চাঁদ ততক্ষণে আকাশের আরো উপরে উঠেছে । জঙ্গলে একটা হাল্কা ঝটপট শুনে সেদিকে ফিরল সৌরাংশু । তারপরেই সে দেখতে পেল একজোড়া হাঁস, জ্যোৎস্নায় সোনার মতন ঝকঝক করছে তাদের শরীর, তারা উড়ে যাচ্ছে সোনার ডিমের মতন চাঁদের দিকে ।

যারা এই কিংবদন্তী তাদের শুনিয়েছিল দশ বছর আগে, তারা বলেছিল এই হাঁসেরা মানুষের আদি পিতামাতা । তাদের ডিম ফুটেই জন্ম হয়েছিল প্রথম মানুষদের । আজ সেই গল্প শোনানো মানুষগুলো কেউ আর নেই, গ্রামটাই আর নেই । গ্রামের সবাই চলে গিয়েছে অন্য জায়গায় । কেজানে সেই জায়গা কোথায়!

চাঁদের দিকে উড়ে যেতে যেতে ডেকে উঠেছে কিংবদন্তীর সুবর্ণহংস সুবর্ণহংসী । চমক ভেঙে সৌরাংশু উঠে দাঁড়ায়। তারপর এগিয়ে যেতে থাকে হ্রদের জলের দিকে । ফিসফিস করে সে বলে, "আমি যদি হতাম বনহংস, বনহংসী হতে যদি তুমি..."




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন