মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

সুবিমল মিশ্র'র গল্প : নুয়ে গুয়ে দুই ভাই



তারা ছিল দুই ভাই নুয়ে আর গুয়ে। আপন বলতে তাদের কেউ ছিল না এক দূরসম্পর্কের মাসী ছাড়া। লেখাপড়া না-শিখে বখাটে হয়ে গেছে বলে একদিন সেই মাসীও তাদের তাড়িয়ে দিল। মনের দুঃখে নুয়ে গুয়ে এসে বসল এক বাজপড়া খেজুর গাছের ওপর। একটা বিড়ি দু'টান দিয়ে নিভিয়ে খুঁজে রেখেছিল কানে। সেটা ধরিয়ে টানতে টানতে তারা ঠিক করল, এভাবে আর নয় যে-করেই হোক জীবনে উন্নতি করতেই হবে। কিন্তু কি করে উন্নতি করা যায়? জীবনে উন্নতি করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়! রাজ্য রমরম সভা গমগম লোকজন গুরগুর রাজা-রাণী হাতি-ঘোড়া ঠাট-কটক কাঠ-কানাৎ সাথ-সাথী রাজীর পুত্র উজীর পুত্র— তবু এদেশের লোক একবেলা পেটপুরে খেতে পায় না। ১৫ টাকা মাইনের হোটেলে রেসটুরেনটে এঁটো কাপডিস ধোয়ার কাজ পাওয়াও ভার এখন! ইনজিনিং নাকি ঐ রকম বেশ বড় বড় পাশ দিয়ে কত ছেলে বসে আছে। কলেজে পাশ করা ছেলে সিনেমার টিকিট বেলাক করে বেড়াচ্ছে। ম্যাট্রিক পরীক্ষায় যে ছেলে জলপানি পেল দুদিন যেতে না যেতে হাটের মধ্যিখানে এসে ঝাণ্ডা হাতে সে চেঁচিয়ে বেড়াতে লাগল: এই শিক্ষা ব্যবস্থায় যে যত পড়ে সে তত মূর্খ হয়। তা এই যখন দেশের হালচাল তখন উন্নতি করব বললেই তো আর উন্নতি করা যায় না।

খেজুর গাছের গুঁড়ির ওপর পায়ে-পা-তুলে বসে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে তারা ভাবতে লাগল জীবনে উন্নতি করার কি উপায়! বড় ভাই নুয়ের বরাবরই বুদ্ধিটা একটু কম। সে বলল: চল গুয়ে বেসাতি করি। ছোট ভাই গুয়ে বেশ চালাক চতুর। বলল: বেসাতি করবি কড়ি পাবি কোথা? মুলেধনে উবে দিনে দিনে ডুবে। চল বরং ওয়াগন ভাঙি। শিবুদের দল এই করে লাখপতি হয়ে গেল। নুয়ে ভাবল হাত সুড়সুড়ি পা সুড়সুড়ি করতে কি আমি পারব চুরি! তবু লোভ যায় না। শেষ কালে ঠিক করল: যা হবার হবে। আগে ওয়াগন ভাঙি। জীবনে উন্নতি তো করতেই হবে। করাটা যে বড্ড দরকার।

নিঝুম রাত। নুয়ে শুয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে খুব সাবধানে অন্ধকারে টিপটিপ পা ফেলে গেল ওয়াগন ভাঙতে। দ্যাখে রেল লাইনের ওপর একটা মালগাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। শেষ রাত্তির, চান্দিকে কুয়াশা, আশে পাশে জন-মনিষ্যি দেখা যায় না। নুয়ের হাতে একটা লম্বা ছুরি। গুয়ের হাতে হাতুড়ি। দুজনের কাঁধে দুটো বস্তা। গুয়ে ফিস ফিস করে বলল; চল এটা ভাঙি। বলে নৃয়ের হাত ধরে এগোতে লাগল। এতে নুয়ের বুকের পিট-পিটানি আরো বেড়ে গেল। প্রাণ যায় তো লোভ যায় না! জীবনে তো উন্নতি করতে হবে। সাত-সাবধানে পা রেখে ওয়াগনের ওপর উঠে পড়ল তারা। একজন ছুরিটা দিয়ে কব্জাখানায় জোরে চাপ দিল। অন্যজন তার ওপর হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে লাগল। ভয়ে আনন্দে আর উত্তেজনায় নুয়ের প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছিল। এক্ষুনি এই ওয়াগনটা ভাঙতে পারলে তারা বড়লোক হয়ে যাবে! হোটেলে রেসটুরেনটে ১৫ টাকা মাইনের এঁটো কাপডিস ধোয়ার কাজ খুঁজে বেড়াতে হবে না। তাকে সবাই সমীহ করবে-- নুয়ে বাবু যে আসুন বসুন লিন খান চা-সিগ্রেট। এই রকম যখন ভাবা তখন কোথেকে একটা লোক এসে, মাথায় তার গান্ধীটুপি, খাচ' করে ধরে ফেলল তাদের হাত:

কে রে বেটা মর্দানা—
রাজার ঘরে ডংকা মারিস কয়টা ঘাড়ে গর্দানা!

একেই বলে ভাগ্য! কোথায় বড় লোক হওয়া আর কোথায় কি! প্রথম দিন রোজগার-পাতির জন্য বেরল আর ধরা পড়ে গেল! নুয়ের মুখ কাদো কাদো ভয়ে। লোকটা মিহি-মোটা গলায় টুপি ঝাঁকিয়ে বলে উঠল: ওয়াগন ভাঙা সামাজিক অপরাধ। তোরা সমাজবিরোধী। এক্ষুনি তোদের পুলিশে হ্যানডওভার করব। শুনে নুয়ে গুয়ের চোখ তো ছানাবড়া! হায় হায় এখন তাদের কী হবে! কে বাঁচাবে এই বিপদে-- কে দেবে সাহস-- কে করবে সাহায্য! তারা প্রাণপণে ঠাকুর দেবতাকে ডাকতে লাগল। হেই মা কালি হেই বাবা তারকেশ্বর তোমাদের জোড়া পাঁঠা পুজো দেব, এই বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করে দাও বাবা! আকুল হয়ে প্রাণপণে ডাকতে লাগল তারা। দর দর ধারা ঝরল চোখ দিয়ে। তাতে ঠাকুরদের বুঝি দয়া হল। লোকটা মিহি গলায় তাদের সাবধান করে দিল: বাছারা, ছুটে পালিওনি বাবু। তাহলে মারা পড়বে। দু-হাত দূরে দূরে আমাদের লোক আছে। নুয়ে গুয়ের সব কেরামতি ভেঙে গিয়েছিল। তারা গিয়ে লুটিয়ে পড়ল লোকটার মাটিতে লোটানো কোঁচার ওপর: এবারটি দয়া করে প্রাণে মেরোনি বাবা। এই কান মলছি নাকে খত দিচ্ছি, এমন কম্ম প্রাণ থাকতে আর কোনদিন হবেনি।

দয়া করার জন্য লোকটা যেন মুখিয়ে ছিল। মাথার টুপিটা খুলে বাঁ-হাতে নিল। চোখের কোণে মিচকি হাসল। তারপর বলল: আচ্ছা সে দেখা যাবে খন। বড় শীত। চ একটু চা খাওয়া যাক।

লোকটা তাহলে তাদের পুলিশে ধরিয়ে দিচ্ছে না! একেবারে গলে গেল নুয়ে গুয়ে। কী দরাজ দিল রে-- কী মহৎ প্রাণ! অনুগত কুকুরের মত তার পেছন পেছন হাঁটতে লাগল নুয়ে গুয়ে। তারা এসে পড়ল একটা অন্ধকার ঘুপচি মতন চায়ের দোকানে। তাদের মহাজনকে দেখে দোকানি নিজের কোঁচার খুঁট দিয়ে বাঁশের বেঞ্চিটার ধুলো মুছিয়ে দিল, বিনয়ে গদগদ হয়ে ‘রাম রাম শেঠজী বসতে আজ্ঞা হয়’ বলে অভ্যর্থনা করল। লোকটা চায়ের অর্ডার দিল। পকেট থেকে দামী সিগারেটের বাকস বার করে নিজে ধরাল একটা। তাদের দিল। তারপর চায়ের ভাড়ে চুমুক দিতে দিতে আসল গল্প শুরু করল সে। করার আগে পকেট থেকে পানের ডিবে বার করে একখিলি মুখে দিয়ে পিক কাটল, বোঁটায় চুন নিয়ে মুখে দিল, তারপর ধীরে-সুস্থে জিজ্ঞাসা করতে সুরু করল সমস্ত কথা : খুলে বল তো বাছারা-- কেন ওয়াগন ভাঙতে এসেছিলে? ভক্তিতে ভালবাসায় নুয়ে গুয়ে তখন গদগদ। যে তাদের পুলিশ ধরিয়ে দিয়ে জেলে পাঠাতে পারত সে কিনা তাদের সংগে এমন ভাল ব্যবহার করছে! তারা ছলছলিয়ে উঠল: পেত্তয় নিন বাবা— আজ এই পেত্থম। এই নাক-কান মুলছি এমন কম্ম আর পেরান থাকতে কোনদিন হবেনি। লোকটা ধুতির খুঁটে চশমার কাচ সাফ করতে করতে বলল: আজকে যে প্রথম তা বুঝতে পেরেছি। না হলে রাত্তির বেলা এভাবে কেউ চোরের মত ওয়াগন ভাঙতে আসে না। যারা ভাঙে তারা দিনের বেলায়ই ভাঙে। ভাঙে প্রকাশ্য দিবালোকে। আর পাঁচজনের চোখের ওপর।... তা এত কিছু থাকতে ওয়াগন ভাঙতে এসেছিলে কেন?

তখন নতুন ভোরের আলো। সেই আলোতে লোকটার চার আঙুলে চারটে পাথর ঝকঝকিয়ে উঠল। তাই মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে নুয়ে বলে ফেলল: স্রেফ জেবনে উন্নতি করার জন্যি স্যার। অন্য কোন বদ উদ্দিশ্যি আমাদের ছেল না। জীবনে উন্নতি করার জন্য এভাবে ওয়াগন ভাঙতে গিয়েছিলত শুনে লোকটা হো হো হা হা হেসে উঠল। একচোট হেসে নেওয়ার পর সে গম্ভীর হল! বলল: এভাবে কেউ কি কোন দিন উন্নতি করতে পেরেছে রে— এভাবে কি জীবনে উন্নতি করা যায়? নুয়ে গুয়ে তখন লোকটিকে ভগবান ভাবতে সুরু করেছে। তবে তারা আর কি করে জীবনে উন্নতি করবে এই মাগগি-গণ্ডার বাজারে! তারা লোকটির কাছে জানতে চাইল। মাথার টুপিটা খুলে ভাঁজ করে পকেটে রাখতে রাখতে লোকটা বলল: সে রাস্তা আমি বাতলে দিতে পারি। নেওয়া না-নেওয়া তোদের ইচ্ছে। তারপর একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে বলল: ওয়াগন ভেঙেটেঙেই আসলে জীবনে উন্নতি করতে হয়। কিন্তু এভাবে নয়। দিনের বেলায়। চোরের মত নয়। বীরের মত।

শুনে নুয়ে গুয়ে ত ভয়ে থ! কুঁড়ে বাঁধি’ কুঁড়েয় আছি, তার তলেও রাজার হাঁচি! একবার ভাঙতে গিয়ে হাতে নাতে ধরা পড়ে জেলে যাবার যোগাড় হয়েছিল। এবার যদি কোন বিপদ আপদ ঘটে...

লোকটা যেন তাদের মনের কথা পড়তে পারল। বলল: ডরো মৎ। কোন বিপদ হবে না। পুলিশলোক আসবে না। সে সব আমি সমঝে দেবো।

নুয়ে জানতে চাইল; কিন্তু ওয়াগন ভাঙতি যাওয়া তো বুরা কাম। সামাজিক অপরাধ।

নুয়ের কথায় আবার লোকটা হেসে উঠল। ঝকঝকিয়ে উঠল তার চার আঙুলের চার পাথর। সে তখন দিলখোলা। তাদের পিঠে আদরের টোকা দিতে দিতে বলল: দুর ব্যাটা- এই বুদ্ধি নিয়ে ওয়াগন ভাঙতে আসা! যা বলতে হয় করতে হয় তার ঠিক উল্টো। এই যে গান্ধী-মহারাজ এত বড় একটা লোক তার জীবন থেকে কি শিক্ষা পেয়েছিলি বল তো? ওরা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। লোকটা গান্ধী-মহারাজের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এই যে নিজে টুপি পরো না কিন্তু অপরকে টুপি পরাও। গান্ধী-মহারাজের কোনদিন টুপি পরা ছবি দেখেছিস? অথচ যারা গান্ধীবাদ করে বেড়ায় তাদের সবার মাথায় গান্ধীটুপি। নিজে যা করবে না, অন্য লোককে তা করতে বলতে হয়। নিজে যা পারবে না অপরকে তা পারতে বলতে হয়। এই হল ইতিহাসের শিক্ষা। আসল শিক্ষা ।.. বুঝলি কিছু?

অকাট্য যুক্তি। নুয়ে গুয়ে শুনতে লাগল। লোকটা আস্তে আস্তে সব কিছু বুঝিয়ে বলল তাদের। বম্বে থেকে তার ৫ ওয়াগন মাল আসছে। দামী মাল। কয়েক লাখ টাকা দাম। ইস্টিশানে পৌঁছবার আগেই সেইসব মাল সে মাঝপথে নিজের গোডাউনে তুলিয়ে নিতে চায়। কোন ভয়ের কারণ নেই। ট্রেন আস্তে আস্তে চলবে। যে-সব ওয়াগনে মাল আছে সেগুলোতে চিহ্ন করা থাকবে। শুধু তালা ভেঙে মালগুলো বের করে আনাটাই হল কাজ। রেল-ব্রিজের নিচে লরি রেডি রাখা হবে। মালগুলো সংগে সংগে বোঝাই হয়ে চলে যাবে বাইরে। পুলিসের জন্য কোন ভয় নেই। তাদের সংগে রফা করা আছে। তারা দূরে সরে দাঁড়াবে। দুজন রাইফেলধারী রেল-পুলিশের সংগে বিশেষ বন্দোবস্ত আছে। কাজ হাসিল করার সময় তারা পাহারা দেবে। তেমন তেমন বুঝলে দু-একটা ফাঁকা আওয়াজও করতে পারে।

লোকটা সব কিছু খোলসা করে বুঝিয়ে বলল। বলল এইভাবেই জীবনে উন্নতি করতে হয়। মালগুলো সব ইনসিওর করা আছে। এর দরুণ সে রেল কোম্পানি থেকে টাকা পাবে। আবার ইস্টিশনে পৌঁছনোর আগেই তার সমস্ত মাল আগে ভাগে চলে আসছে তার গোডাউনে। মালকে মাল পাওয়া যাচ্ছে টাকাকে টাকা। আর এই হচ্ছে পন্থা-- ঠিক এই রকম কায়দায়ই জীবনে উন্নতি করতে হয়।

লোকটার মন খুব দরাজ। সে নুয়ে গুয়েকে জলের মত সব কিছু বুঝিয়ে দিল। বলল: এ কাজে একটু রিস্ক আছে। আর রিস্ক না থাকল তো জীবন কোথায়? তা ছাড়া এসব কাজ আটঘাট বেঁধে করা হয়। কোন ভয় থাকে না। আর কাজটা করতে পারলে এক থেকে হাজার-দশেকের মত টাকা পেয়ে যাবে তারা। এখন একমাস ধরে ঘরে বসে থাক না। টাকা ওড়াক দুহাতে। মদ খাক মাগিবাড়ি যাক। এ লাইনে এভাবে একটু-আধটু রিস্ক নিতে পারলে এক থেকে পাঁচ-দশ হাজার টাকা কামিয়ে নেওয়া তো নস্যি! আর এক থেকে যদি পাঁচ-দশ হাজার টাকা কামানো না যায় তা হলে জীবনে উন্নতি করাটার আর হল কি!

নুয়ে গুয়ের জন্য আর এক ভাড় চায়ের অর্ডার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল তখন। চায়ে চুমুক দিয়ে লেড়ো বিস্কুট চিবোতে চিবোতে তারা ভাবল এই ভাবেই জীবনে উন্নতি করতে হয়। নিজে টুপি না পরে দেশের লোককে টুপি পরাতে হয় এই ভাবে। এ বাজারে এক থেকে পাঁচ-দশ হাজার টাকা কামাতে না পারলে তাকে কি আর জীবনে উন্নতি করা বলে ? তারা রাজি হয়ে গেল। গান্ধীটুপি পরা লোকটির দলবল এসে কাল তাদের কাজ করার কায়দা-কানুন রপ্ত করিয়ে যাবে। রেলওয়ে-সাইডিঙগুলোতে সংগে নিয়ে ঘোরাবে কয়েকদিন। বিশেষ ধরনের সব যন্ত্রপাতি-- ওয়াগন ভাঙতে সে সব দরকার হয়- শিখিয়ে পড়িয়ে দেবে তাদের ব্যবহার। ছুরি আর হাতুড়ি নিয়ে ওয়াগন ভেঙে জীবনে উন্নতি করতে গিয়েছিল ভেবে তারা তখন, সেই নুয়ে গুয়ে, নিজের মনেই হেসে উঠল।

নুয়ে গুয়ের গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হল না। অবস্থা ঘুরে গেল। রাজসভার চাদ্দিকে হাজার হাজার তলোয়ার খাড়া হয়ে উঠল।

লোকে রব তুলল শুন সভাজন এই রাজ্য কার
দেশের সব নেতারা বলতে লাগল আমার আমার

তখন সেই গান্ধীটুপি-পরা লোকটা একদিন সকাল বেলা এসে হাজির। বলল: নুয়ে গুয়ে রে বড় বিপদে পড়িচি। লালঝাণ্ডাওয়ালারা বড্ড মারছে আমাদের। ওরা আমাদের শত্রুর। তোরা ওদের ওপর পেটো মার। বাগে পেলে গলা কেটে ফ্যাল। নুয়ে গুয়ে তখন অনেক ঝানু হয়ে গেছে। রাজ্য রাজনীতি বুঝতে শিখেছে। তারা লালঝাণ্ডাদের ওপর পেটো ফেলতে লাগল। বাগে পেলে তাদের গলা কেটে নিতে লাগল। দুপুর বেলা আবার গান্ধীটুপি এসে হাজির। বলল: লালঝাণ্ডারা এখন আমাদের বন্ধু। ওদের কিছু বলিস না। নীলঝাণ্ডারা খারাপ লোক। আমাদের শত্তুর। তোরা ওদের ওপর পেটো মার। বাগে পেলে গলা কেটে ফ্যাল।

নুয়ে গুয়ে তখন লালঝাণ্ডাদের বাদ দিয়ে নীলঝাণ্ডাদের ওপর পেটো ফেলতে লাগল। বাগে পেলে তাদের গলা কেটে নিতে লাগল।

বিকেল বেলা আবার এল গান্ধীটুপি। বলল: নীলঝাণ্ডাদের সংগে সমঝোতা হয়ে গেছে। লালঝাণ্ডাওয়ালারাই খারাপ। আমাদের শত্রুর। তোরা ওদের ওপর পেটো মার। বাগে পেলে গলা কেটে ফ্যাল।

ব্যাপার স্যাপার দেখে থ মেরে গেল নুয়ে গুয়ে। সকালবেলা যারা শত্তুর ছিল বিকেলবেলা তারা বন্ধু হয়ে যায়। বিকেলবেলা যারা বন্ধু ছিল সন্ধেবেলা তারা শত্তুর হয়ে ওঠে। এ বড় মজার খেল শিখেছে তো গান্ধীটুপি! তারা রেগে গেল। বলল: এ ভাবে কাজ করা যায় না। সকালবেলা যারা বন্ধু ছিল বিকেলবেলা তারা শত্তুর হয়ে গেল? আর যারা ছিল শত্তুর তারা পাল্টে গেল বন্ধুতে। একি ভোজবাজি নাকি!

গান্ধীটুপি হাসল: হাঁ এ ভোজবাজি। এ খেলা এমনি ভাবেই খেলতে হয়।

নুয়ে গুয়ে বুঝল সব। নিশ্বাস ফেলল। আজি ষোল কলায় পূর্ণ চাদ পূর্ণিমার রথে!

তারপর এক সময় তারা সোজা উঠে দাঁড়াল, গান্ধীটুপিকে বলল: আমাদের দিয়ে আর কিছু হবে টবে না, অন্যপথ দেখ।

গান্ধীটুপি বলল; সাবধান, দেয়ালে দেয়ালে লেখা পড়েছে, ওয়াগন ব্রেকাররা আজকাল বাঙলা দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে।

তারা বলল: পড়ে পড়ুক।

গান্ধীটুপি বলল: তোমাদের জীবনে উন্নতি করাটা কিন্তু আটকে যাচ্ছে।

তারা বলল: যাক আটকে।

গান্ধীটুপি রেগে গিয়ে বলল: শেষ বারের মত বলছি, ভেবে দেখ।

তারা বলল: ভেবে দেখেছি।

তখন গান্ধীটুপি ইংগিত করল। গুণ্ডা দিয়ে যারা রাজনীতি করে সেই গুণ্ডাদের ওপর নজর রাখার জন্য অন্য গুণ্ডাদেরও তাদের পুষতে হয়। অন্ধকারের ভেতর থেকে দু-দুটো চারটে গুলি বেরিয়ে গেল নুয়ে গুয়ের ফুসফুস এ-ফেঁড় ও-ফেঁড় করে। দু-তিন ফেঁটা রক্ত ছিটকে এসে লাগল সদ্য ইস্তিরি করা সাদা খদ্দরে। গান্ধীটুপি সংগে সংগে তাতে চুন লাগিয়ে দিল। টুপিটা ঠিক মত বসিয়ে নিল মাথায়। এগিয়ে গেল সোজা রাস্তা ধরে। হিংসার রাজনীতি বন্ধ করার পদযাত্রায় এখুনি তাকে যোগ দিতে হবে।




[সেপ্টেম্বর ১৯৭৩]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন