মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

শাহাব আহমেদের ধারাবাহিক উপন্যাস : পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু



৪০ তম পর্ব


অভ্রের রুমে আড্ডা চলছে। এক বন্ধু পড়াশুনো শেষ করে দেশে চলে যাচ্ছে,তারই ফেয়ারওয়েলের আয়োজন করেছে অভ্র। ভদকা, কালবাছা, পনির, কালো ও লাল ক্যাভিয়ার, কালোরুটি, শসা ও চেরেমসার পিকল ইত্যাদি কোন কিছুই সে বাদ রাখেনি। মনেই হবে না যে, অসংখ্য মানুষ না খেয়ে মরছে এখন। বন্ধুদের প্রায় সবাই প্রাক্তন বামপন্থী, তবে সবাই প্রাক্তন নয়। কিছু এখনও কট্টর এবং তুমুল গর্বাচভ এবং পেরেস্ত্রোইকা বিরোধী।

কিছু সামান্য পরিবর্তিত। “তোমরা আর যাই বলো সমাজতন্ত্র আসলে কৃত্রিম এবং পুঁজিবাদ বেশি ন্যাচারাল”, কিছু এই মতে বিশ্বাসী ।

নীল, অভ্রের খুব কাছের বন্ধু নীলকণ্ঠ, ডিপ্রেশড ও চুপচাপ। সে রাজনীতির পোড় খাওয়া একটিভিস্ট। কলেজে থাকতে ছাত্রদের এক আন্দোলনে খুব সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার কারণে বিএনপির গুন্ডারা ওকে ধরে নিয়ে ঢাকা ভার্সিটির মোহসিন হলে খুব মারপিট করে, কয়েকটি দাঁত ভেঙ্গে দেয়, জামা কাপড় খুলে সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেয় শরীর, তারপরে শুধু অন্তর্বাস পরা অবস্থায় ছেড়ে দেয়। এরশাদের আমলে যে ছাত্র আন্দোলনে জাফর, জয়নাল, মোজাম্মেল, কাঞ্চন, দীপালি সাহা শহীদ হয়, সে তুমুল মার খায় পুলিশের হাতে।

১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মিছিলে সে ছিল সেলিম দেলোয়ারের পাশেই, হঠাৎ করে পুলিশের ঘাতক ট্রাকটি জীবন কেড়ে নেয় ওদের, চোখের সামনে, সে দৌড়ে বাঁচে কিন্তু মুখগুলো বুকে গেঁথে যায় ওর। সে জানে কোনোদিন সে পারবে না বিশ্বাসঘাতকতা করতে ওদের রক্তের সাথে। গোর্কির দাঙ্কো ঘন তমসার রাতে বুক চিরে নিজের হৃদয় হাতের মুঠোয় উঁচু করে ধরেছিল এবং তা-ই দিয়েছিল তমসাবিদারি পথদিশারি আলো, নীলকণ্ঠের হৃদয়ে ছিল সেই আলো।

সে ভাঙবে কিন্তু আদর্শ থেকে টলবে না।

১৯৮৫ সালে সে বৃত্তি নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে আসে। পার্টির সব পবিত্র বিধি-নিষেধ মেনে চলে অর্থডক্স সন্তের মত। এক পয়সা দিয়েও সে পরিবারকে সাহায্য করতে পারেনি। অথচ তার সাহায্য করার প্রয়োজন ছিল। অর্থাভাবে দেশেও যায়নি। কোনোদিন প্রকাশ করেনি বাংলার মাঠ দেখার তৃষ্ণার কথা, বাংলার নদীর ঘোলা জলের ঘুর্ণির চঞ্চলতার হৃদয়ে ঘুরপাক করা আবেগ বা কার্তিকের ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের নির্মল হাতছানির উন্মনতা। সবাই কবিতা লেখে, সে লেখে না। মহাদেবের মতই নীরব ও অনুভূতিহীন। এত স্বল্পবাক, এত অভিযোগহীন বাংগালী হয় না, মহাদেব বাংগালী ছিলেন না।

সেই নীলকণ্ঠ পার্টি ভেঙে যাবার পরে সবচেয়ে বেশি আশাহত ও বিভ্রান্তদের মধ্যে একজন হয়ে পড়ে। কোনোমতেই মেনে নিতে পারেনি এই ভাঙ্গন। একা একা থাকে, কারো কাছে যায় না, কাকেও ডাকে না। চলা যায় না, তবু শুধু স্টাইপেন্ডে ক্ষুধার্ত কাকের মত চলে। কোনো ব্যবসায় নামেনি। অভ্র বহু বলেছে কিন্তু সে কথা শোনেনি।

কিছু মানুষ ঘাড় ত্যাড়া জিন নিয়ে জন্মায়। ওর সেই জিন। দাদা ছিলেন বৃটিশ বিরোধী কোনো এক সন্ত্রাসী পার্টির সদস্য। জেলে বসে সমাজতন্ত্রের মানবতা মুক্তির আইডিয়ার সাথে পরিচিত হন, পরে কমিউনিষ্ট পার্টির ‘আঁধার’ ও ‘ন’ আঁধারির ‘না-ঘরকা না-ঘাটকা’ জীবন কাটান। কোনো এক ফাঁকে বিয়েও করেন। জন্ম হয় নীলকণ্ঠের পিতার। দেশ যাদের কাঁধে, সংসার বহন করার স্থান তাদের কাঁধে অপ্রতুল। তারা ঘর বাঁধে শুধুমাত্র কিছু মানুষকে কষ্ট দেয়ার জন্য। তাই নীলের পিতার শৈশব যৌবন ছিল বড় কষ্টের, বড় সাদা মাটা। বহু কষ্ট করে সে স্কুল ও কলেজ শেষ করে। তারপরে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করার সময়ে যুদ্ধ শুরু হয়। নীলের তখন ৭ বছর বয়স। যুদ্ধটা নীল দেখেনি, তবে গল্প শুনেছে অনেক এবং কে তা শোনেনি?

এই যুদ্ধ ছিল কারো জন্য মুক্তিযুদ্ধ, যদিও “মুক্তি” বিষয়টি সময়ের “সোনার পাথর বাটি” থেকে কখনই পৃথক করা যায় না, তবে নিশ্চিত অনেকের জন্যই হয় সৌভাগ্যের চেরাগ। বহু মানুষের জন্য এই যুদ্ধ ছিলো দৈহিক মৃত্যুর, যেমন নীলকণ্ঠের দাদু। অত্যন্ত বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানী সৈন্যরা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তাকে নদী তীরে নিয়ে হত্যা করে নদীতেই ভাসিয়ে দেয়। ওদের দাহ করার খরচটা বেঁচে যায়।

নীলের পিতার জন্য যুদ্ধটা ছিল স্বপ্ন মৃত্যুর। একটি পা হারিয়ে সে পঙ্গু হয়ে ঘরে ফেরে। ঠিক ঘরেও নয়, ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। চলাফেরা করতে পারতো না। নিজ ভিটার ওপরে একটি মুদি দোকান দিয়ে কোন মতে সংসার চলতো। বাড়ী সংল্গ্ন সামান্য যা কিছু জমি ছিল, স্বাধীনতার সোনার চামচমুখে একজন দখল করে নেয় যুদ্ধের পর পরই। স্বাধীন দেশে দেশী মিত্রের সাথে বাহাস করা, বিদেশী শত্রুর সাথে লড়াই করার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন সে হাড়ে হাড়ে টের পায়। এখন তাদের ভিটেবাড়ি নিয়ে টানাটানি চলছে। কিছুদিন আগে চিঠি এসেছে বাড়ি থেকে।

অকল্পনীয়, অবাস্তব বাস্তবতার হাঙরমুখো চিঠি। চিঠি পেয়ে সে অপ্রকৃতস্থ হয়ে যায়, দেশ ও বিপ্লবের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত যে, তার ‘বাড়ি নিয়ে টানাটানির’ চিঠি পেয়ে পাগল হয়ে যাবার বিষয়টা, সব বিপ্লবীরই কাছে ‘পেটিবুর্জোয়া’ পশ্চাদপদতা মনে হবে। বিপ্লবের জন্য যে ইস্পাতদৃঢ় মন ও ইচ্ছাশক্তি দরকার, তা তার নেই, তা নিশ্চিত হয় যখন তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় এবং প্রায় ১ মাস চিকিৎসা করতে হয়। বের হয়ে এসে এখনও এক গাদা ঔষধ খেতে হচ্ছে।

ঔষধের কারণে না অসুস্থতার কারণে বোঝা মুশকিল, সে এখন কোন ইমোশন প্রকাশ করে না, কোনো কথাও বলে না। চেয়ে থাকে একটি বিন্দুতে দৃষ্টি স্থাপন করে। কিছুদিন ধরেই নীলকণ্ঠের পিতা ও পরিবারকে ভাতে ও পানিতে মারার ক্যাচকা কলে ফেলা হয়েছে। গ্রামের যে প্রভাবশালী ব্যক্তিটি তাদের জমিজমা কেড়ে নিয়েছিল স্বাধীনতার পর পর, ক্ষমতার ঘরে বহু উত্থান পতন সম্পন্ন হলেও তার পার্টি ক্ষমতা ছাড়ে নাই। নীলদের ভিটা দখলের নীলনকশার অংশ হিসাবে সে একটি মুদি দোকান বসিয়েছে নীলদের বাড়িতে ঢোকার পথেই এবং নিশ্চিত করেছে লোকজন যাতে ওর পিতার দোকানে আর না যায়। বাড়ি থেকে বের হবার রাস্তাটিও আর নেই।

তারপর হঠাৎ একদিন ওর পিতাকে কে বা কারা ধরে নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখে দরজা জানালা বন্ধ কোনো কক্ষে। না খাইয়ে রেখে মারধোর করে, চাপ দেয় বাড়ি লিখে দিতে। যে হাতে সে একদিন চক ডাস্টার ধরতো এবং যুদ্ধের সময় প্রায় ৮ মাস ধরেছে রাইফেল, তা পিঠমোড়া করে বাঁধাছিল অন্যহাতের সাথে। একটি টেবিলের দুই পাশে স্বাধীন দেশের দুই স্বাধীন নাগরিক বসেছিল, মুখামুখি। বস্তুতপক্ষে তার প্রতিপক্ষের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিল সে-ই, কারণ অন্যজনের জন্ম তখনও হয় নাই। সে বলেছিল, ভিটা নিবে নাও, আমাকেও একটু রাখতে দাও, নইলে পঙ্গু আমি যাবো কোথায়? কিন্তু তার সাহস ও ধৃষ্টতায় অন্যজন বিরক্ত হয়ে চেয়ার থেকে টেবিলে উঠে দাঁড়িয়েছিল, তারপরে মাথার ওপরে পেশাব করে দিয়েছিল।

“এই দেশেতে জন্ম আমার এই দেশেতে মরি” র মহান মন্ত্র ভুলে গিয়ে এবং “হিন্দুরা এই দেশকে কখনই নিজের দেশ মনে করে না” এই উপাত্তটিকে সত্য প্রমাণ করে নীলকণ্ঠের বেইমান বাবা-মা, ভাই, বোন, ইন্ডিয়ায় চলে গেছে।

নীলকণ্ঠের এখন আর কোনো দেশ নেই, ফেরার মত ঘর নেই এবং বিশ্ববিপ্লব করা ব্যতিত তার আর কোনো পথও নেই।



কয়েক পেগ ভদকা হলকুম পুড়িয়ে নিচে নেমে গেলেই দর্শন এবং ডায়ালেকটিক মেটেরিয়ালিজম খুব সহজ হয়ে যায়। কিরণ ভাই সবার সিনিয়র ও শ্রদ্ধেয়। তিনি শুরু করেনঃ “ডাইওজিনিস দিনের বেলা হ্যারিকেন হাতে হেঁটেছেন সৎ মানুষ খুঁজে খুঁজে, সেই আড়াই তিনহাজার বছর আগে। সে ছিল এক বিশুদ্ধ উল্লুক। সৎ মানুষ খুঁজে অযথা নষ্ট করার দরকার কী? সংজ্ঞাটা বদলে দাও, দেখবে অসৎ মানুষ একটাও নাই। সংজ্ঞা বদলে দিলে যে জিনিস বা যে সমস্যা আজ কাছে, কাল তা আর থাকে না।”

রুমের সবাই মাথা নাড়ে, সংজ্ঞা বদলানোর মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের অভিনব ব্যাপারটা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

“এই যেমন ধরো, আগে অনেক জারজ সন্তান ছিল, লিভিং টুগেদারের যুগে এখন আর জারজ সন্তান জন্মায় না। এইদেশে ব্যবসায়ীকে আগে বলতো স্পেকুলান্ট, মানে ক্রিমিনাল, জেলে দিতো, এখন দেখো এরা কত শ্রদ্ধেয় বিজনেসম্যান ও কত ক্ষমতার অধিকারী। যেমন ধরো, আমেরিকায় ঘুষ দেয়াকে ঘুষ দেয়া বলা হয় না, ‘লবিইং করা’ বলা হয়।”

ভদকা একটা অপূ্র্ব জিনিস। দেখতেও পরিস্কার, মাথাও পরিস্কার করে দেয় খুব দ্রুত। জটিল জিনিস হয়ে যায় জলের মত সহজ। তাই কিরণ ভাইয়ের কথাগুলো জুয়েল আইচের ম্যাজিকের মত লাগে।

“শতাব্দী কাঁপানো সবচাইতে বড় সংজ্ঞা-পরিবর্তনের মাধ্যমে রাশিয়ার কমিউনিস্ট প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেল। আগে দেশের ছোট কও, মাঝারি কও,আর বড় কও, সব পদেই ছিল এরা, মুখে সমাজতন্ত্র ও মানবতাবাদে বিশ্বাসী। কল-কারখানা, দোকান-পাট, স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ইত্যাদির মালিক ছিল জনগণ, কিন্তু পার্টির লোকজন ছিল সমস্ত কিছুর প্রতাপশালী ম্যানেজার। তোমার পার্টির কার্ড নেই, তুমি কেউ নও। রাষ্ট্র ক্ষমতাও তাই। মার্কসবাদ- লেনিনবাদ ইত্যাদির হেঁচকি তুলে তাদের সুযোগ্য পরিচালনায়ই কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন নামের বিশাল জাহাজটি পেরেস্ত্রইকার চরে এসে ঠেকে গেল। কিন্তু কমরেডরা কী কয়? বলে, আমেরিকার কাজ। না, এইটা আমেরিকার কাজ না, আমেরিকা জাহাজ চরের দিকে নিত সাহায্য করেছে, তারপর

ঠেকে যাওয়া জাহাজের কাঠ মাস্তুল ভেঙে নিছে।

ধরো, তুমি একজন কৃষক, কৃষক জানে, শস্য বপন করে নিয়মিত আগাছা টেনে তুলতে হয়। আগাছার যদি শক্তি থাকতো, সে হয় কৃষকের হাত দুটো কেটে ফেলতো, নয় হাতকড়া পরাতো, তোমরা কী বলো?

সবাই মাথা নাড়ে। রাশিয়ায় আগাছারা ক্ষমতা দখল করেছিল, সাধারণ মানুষ ও বুদ্ধিজীবীদের কথা তারা শোনে নাই, তাদের কথা বলতেই দেয় নাই। সেই আগাছারাই সমাজটাকে ধ্বংস করেছে। তারা চুরি করেছে প্রচুর, আরও বেশি করতে চায়, কিন্তু সোভিয়েত কাঠামো রেখে আর পারছিলো না, তাদের প্রয়োজন ছিল পুঁজিবাদ, যেখানে টাকায় টাকা হয়।

কিরণ ভাইয়ের মাথায় ছিট আছে, পেটে ভদকা পড়লে কথাই নেই, গর গর করে কথা বের হয়। গ্রামে বড় হওয়া একজন দেশপ্রেমিক মানুষ। দেশে প্রফেসর মোজাফ্ফরের ছাত্র সমিতি করতেন। প্রফেসরের স্নেহাধন্য ছিলেন। একবার অভ্র দেশে যাবার সময় কিরণ ভাই বলেনঃ

ভাই আমার জন্য দেশ থেকে একটু মাটি নিয়ে এসো।

মাটি দিয়ে কী করবেন?

ভাই, দেশের মাটির জন্য মনটা আনচান করে।

আচ্ছা নিয়ে আসবো।

আর কয়টা কদু বিচি।

কদু বিচি দিয়ে কী করবেন?

বড় টবে দেশের মাটিতে লাগাবো। যখন কদু গাছ হবে সেই পাতার দিকে চেয়ে থাকবো। সেখানে সাদা সাদা ফুল হবে। তারপরে কদু। ভাবতে পারো কত ভালো লাগবে?

অনুরোধ মেনে অভ্র দেশ থেকে মাটি ও লাউ বিচি নিয়ে আসে প্লেনে লাগেজ আনার সীমিত ওজন সংকুচিত করে। কিরণ ভাইয়ের হোস্টেলে যায় তার খুশিমুখ দেখার জন্য। দরজার সামনে করিডোরে কোনো মেয়ের শীতের বুট। দেখে মনে হয় পায়ের সাইজ খুব বড় নয়, হয়তো অল্পবয়সী কেউ। দরজায় নক করে কিন্তু কোনো খবর নেই। নক নক নক, একই নৈঃশব্দ। শেষ পর্যন্ত সে দেশী মাটি আর কদু বিচি নিয়ে নিজ হোস্টেলে ফেরে।

দেখা হয় ক’দিন পরে।

কী কিরণ ভাই আপনার দরজার সামনে কোন্ মেয়ের বুট দেখলাম। আপনি তো রুমেই ছিলেন, এত নক করলাম দরজা তো খুললেন না।

তাই নাকি! আরে ভাই কইও না, আমার শিক্ষকের মেয়ে এসেছিল ক্লাশের এসাইনমেন্ট নিয়ে, সাহায্যের জন্য। এসাইনমেন্ট নিয়ে এতই ব্যস্ত ছিলাম যে, আওয়াজ শুনতে পাই নাই।

কিছুদিন পরে আবার দেখা হয় রেড স্কোয়ারে লেনিনের ম্যুসোলিয়ামের পাশে। নারিকেল ফোপড়ার মত সতেজ, সুন্দর ও কচি এক মেয়ের হাত বগলদাবা করে হাঁটছেন। রেড স্কোয়ার গোবিন্দ দাসের বর্ষার বিলের মত সুন্দর ও পবিত্র স্থান, সারা পৃথিবীর সাম্যসন্ধানী ভালো মানুষেরা এখানে হাঁটে। এমন জায়গায় পেত্নিকেও সুন্দর লাগে। আর কিরণ ভাইয়ের শিক্ষকের মেয়ে তো দেখতে ক্রেমলিনের রুবিনের তারাগুলোর মত। ফর্সা দাঁত যেমন ঝক ঝক করে, অবিকল সেই রকম। এই দেশের কী যে বেশী সুন্দর, দেশ না নারী, বলা মুশকিল। পেরেস্ত্রোইকার কষ্ট ও ধুসরতায় সেই সৌন্দর্য একটুও কমেনি।

কিরণ ভাই ঠিকই টবে বাংলাদেশ থেকে আনা মাটিতে কদু গাছ ফলিয়েছিলেন। হ্যাঁ, সাদা সাদা ফুল বা কদু হয়নি, কিন্তু সুন্দর ডগা ও পাতা হয়েছিল। তাজা ও সবুজ। অবিকল বাংলাদেশের লাউ গাছের মত। বাংলার ঘ্রাণ ও প্রাণ নিয়ে।

উনি যত্ন করে জল ঢালেন আর তাকিয়ে থাকেন সেই গাছের দিকে। জানালা দিয়ে তার দৃষ্টি চলে যায় বার্চ, মেপল, পপলার, এস্পিন গাছগুলোর মাথার উপর দিয়ে অনেক দূরে, যেখানে ইথারে কিছু অবোধ্য অনুভূতি কাঁপে, যেখানে মা অন্য জগত থেকে আলো বিকিরণ করেন।

বলেন, “জানো অভ্র, আমার মায়ের হাতের কদু গাছের মত গাছটা হয়নি, কিন্তু তারপরেও কী জানো, মনে হয় এটা আমার মায়ের হাতেরই গাছ। আমার হাত তো আসলে আমার মায়েরই হাত, তাই না, তুমি কী বল?”

ভদকার প্লাবনে সেই কিরণ ভাইয়ের কথায় আজ বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। তার বর্ণনায় খুব বেশি জেনেরালাইজেশন রয়েছে। প্রতিক্রিয়াশীলদের মত খুব একতরফা ও নিগেটিভ কথা বলছেন,

এই দেশে সবকিছু এত খারাপ ছিল না, মানুষের কাজ ছিল, শিক্ষা, চিকিৎসা, ছুটি, বাসস্থানসহ কতকিছু ফ্রি ছিল। বাংলার মানুষ এটুকু পেলে আর কিছুই চাইবে না।

“তাই? কথা বলতে চাইবে না?”

“ওরা তোমাকে বুড়ো আঙুল চুষতে দিয়ে পনির-মাখন খাবে, আর তুমি প্রতিবাদ মিছিল করতে চাইবে না এইটা কি সত্য বললে?”

“দুর্বৃত্তরা বেডরুমে গিয়ে কাউকে হত্যা করলে বাংলাদেশে বিচার চাইতে পারো, কিন্তু ইয়েসিনিনের স্ত্রী জিনাইদা রাইখের মত তোমার স্ত্রীকে যদি বেডরুমে গিয়ে চোখে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারে, তখন তুমি বিচার চাইতে পারবে? এই দেশের মানুষ পেরেছে?

“কিন্তু এগুলো তো পুরানো প্যাঁচানো কথা, এই দেশে এসব হয়েছে বলে আমাদের দেশেও হবে, এ কথা আপনে কেমনে বলেন?”

“চীনে হয় নাই? কাম্পুচিয়ায়, লাওসে, আফগানিস্থানে? “লাল সালু” উপন্যাস পড়েছো না তোমরা? ঐ মজিদ মিয়ার মত ভণ্ডপীর ছিল এরা এবং এদের চেলা চামুণ্ডারা, ওদের বুকে কোন মায়া-দয়া ছিলো না। তাদের সমাজতন্ত্র বাস্তবে ছিল লাল সালুর নিচে মাটি দেওয়া পীরের দরগা।”

এই কথা শুনে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে অভ্রের বন্ধু, হিলাল উদ্দিন খন্দকার, “আপনি কি বলতে চান আমাদের নেতারা ভণ্ডপীর ছিল?”

তার কণ্ঠে ফুটন্ত সামোভারের ঊষ্মা।

“তোমাদের নেতারা কী ছিল তা তো বলতে পারবো না, তবে এই দেশের এরা আছিলো।”


হিলাল উদ্দিন ফিজিক্সের ছাত্র। খুব তুখোর, বড় এক ছাত্রনেতার ভাই, নিজেও মিছিল মিটিং কম করে নাই। বিপ্লবীদের সব রাস্তাই রোমে যায় মস্কোর ওপর দিয়া। পদ্মলোচন সমাজতন্ত্রের রোমে যাত্রা করে অন্য সবার মতই ব্যবসা না করে সেও পার্টির আদেশ মেনে কৃচ্ছসাধনা করেছে দীর্ঘদিন। তারপরে পেরেস্ত্রইকার পেটা শুকানোর কড়া রোদে পড়ে অভ্রের থেকে কিছু টাকা ধার করে তুরস্ক যায় নবদ্ভুত “চেলনকি” সম্প্রদায়ের সাথে গার্মেন্টস, লেদার জ্যাকেট ইত্যাদি কিনে এনে বিক্রি করে বাঁচার জন্য। সবার জন্য লাভ প্রচুর যে ব্যবসায়, বিপ্লবী পদার্থ বিজ্ঞানীরও যে সেখানে লাভ হবে এমন কোনো কথা কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে লেখা নেই। পদার্থবিজ্ঞানী এজন্যেই পদার্থবিজ্ঞানী, আর গরু চোর, গরু চোর। অভ্রের টাকা ফেরত দিতে সে অক্ষম হয়। দেনা-পাওনার ক্ষেত্রে পাওনাদার নিশ্চুপ হলে দেনাদার বাঙ্ময় হয়। যে কোনো বাঙালীর মতই তর্কে সে পানিতে মছলী। পেটে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনে পয়সার স্বচ্ছ আলকাতরা জমা হয়েছে ততক্ষণে। বেশি এলকোহলে ভিজলে যে কোনো মানুষেরই সন্দেহবাতিকতা বা ‘প্যারানয়া’ হয়, বিপ্লবীদের হয় আরও বেশি এবং সারা দুনিয়াকে তখন শত্রু, গুপ্তচর, মিরজাফর, মোশতাক ও গর্বাচভ মনে হয়।

ফলে যে কথাগুলো স্পার্টাকাসের মুখেও অশালীন হতো, হিলাল উদ্দিন নির্দ্ধিধায় কিরণ ভাইকে জাত “মিরজাফর” ও “নিমকহারাম” বানিয়ে ছাড়ে, যে রাশিয়ার খেয়ে রাশিয়ার গিবত গায়।তারপরে সে শুরু করে সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের দালালদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধারের খিস্তি খাউর। সে বিপ্লবের জন্য গলা কাটতে প্রস্তুত আছে এবং কোনো শালারে ছেড়ে কথা বলার জন্য সোনার বাংলায় জন্মায় নাই।

কিরণ ভাই খুব আহত হয়ে পর পর কয়েক পেগ ভদকা হলকুমে পাচার করে, টক শশার পিকল চিবুতে চিবুতে বাম চিন্তাধারার বক্র পথ-ঘাট নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। বেলতলায় তিনিও তো কম হাঁটেন নাই। মননের ধরণ “সঠিক” বাম ও “বিচ্যুত” বামের একই। তিনি বোঝেন, বদ্ধ সমাজের ক্ষোভ ও ক্লেদই যে গ্লাসনস্ত-পেরেস্ত্রইকা হয়ে বের হয়ে এসেছে, এটা এরা মানবে না,

এদের নেতারা তা মানে না বলেই বাংলাদেশে পার্টি ভাঙছে। এদের দোষও দেয়া যায় না, আইসবার্গের চূড়ার মত সমাজের লাল কার্পেটে মোড়া দৃশ্যমান ভালোটুকুই তো তারা দেখেছে। দৃশ্যের নিচে অদৃশ্যের বিশাল দেহটি দেখার চোখ বা সামর্থ্য তাদের ছিলো না। সোভিয়েত ইউনিয়নেও ছিল বিশাল অন্ধকারের জগত, পুঁজিবাদী অন্ধকারের জগতের মতই, ছিলো অনেক অদৃশ্য দৈত্য, দানো, কালসাপ, ও কূহকীনি। তারা দেখেনি, কারণ সোভিয়েত মিডিয়া সর্বশক্তি দিয়ে এই জগতের উপস্থিতিকে অস্বীকার করেছে। আর এদেরই শেখানো বিকৃত দ্বন্দ্ববাদ বিপ্লবীদের প্রশ্ন না করে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে। “সমাজতন্ত্রে দ্বন্দ্ব নাই” এ কথা তারা মুখে না বললেও বিপ্লবীরা ঠিকই বুঝে নিয়েছে, এই সমাজে দ্বন্দতো নাই-ই, মন্দও নাই। ফলে কোনো বিদেশির পক্ষে কোনোমতেই জানা সম্ভব নয়, ৭০-৮০ দশকের লেনিনগ্রাদের মাফিয়া বস 'ফেকা'র কথা, লেনিনগ্রাদের সর্বশক্তিমান পার্টি সেক্রেটারি রমানভের চাকরি গিয়েছিল যার কারণে। কোনো মিডিয়ায় তার কথা বলা হয়নি। একইভাবে "তিয়াপ লিয়াপ" নামের দুষ্টচক্র ব্রেজনেভের আপাত শান্তির সময়টাতে কাজান শহরকে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল এবং মিলিশিয়া ছিল তাদের সামনে ভীত, সন্ত্রস্ত, কম্পমান ও অসহায়। ভুক্তভোগিরা ছাড়া জনগণও জানতো না। এন্টিক, আইকন , ডায়মন্ড ইত্যাদি পাচার করার দুষ্ট চক্রসমূহের অক্টোপাসীয় ট্যান্টাকল ছিল সুদূর বিস্তৃত, পার্টির শীর্ষ পর্যন্ত। দোকানগুলো ছিল লাল ডিরেক্টরদের চুরির স্বর্গ। আন্দ্রোপভের আমলে ১৫ হাজার "পার্টির টিকেটধারি চোর" গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু শুধুমাত্র একজন, মস্কোর বিখ্যাত গ্যাস্ট্রনম-১ এর ডাইরেক্টর, কমরেড সকোলভ ফায়ারিং স্কোয়াডে যায়। সেও যেতো না, যদি না সে শিষ্ঠ বালকের মত গুপ্তপুলিসকে গর গর করে বলে দিতো কারা তার বস, কারা বন্ধু, আর কারা সাগরেদ। তার স্বীকারোক্তি মস্কোর প্রথম পুরুষ, পার্টি সেক্রেটারি কমরেড গ্রিশিনের, যার

ব্রেজনেভের পরে সোভিয়েত পার্টির মহান জেনেরাল সেক্রেটারি হবার কথা, সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। ধরা পড়ে চোরের অতি সুবোধ হওয়া বা অতি কথা বলা বা বেশি তথ্য সরবরাহ করা ভালো নয়। তাতে বহু সাপের সন্ধান বের হয়ে আসে। এবং তা একটি স্বেচ্ছাচারী স্বৈরতান্ত্রিক সমাজের অপরাধের শিরা উপশিরা ধমনি অলিন্দ নিলয় সব নগ্ন করে দেয়। তখন তাকে তড়ি ঘড়ি নিস্তব্ধ করার প্রয়োজন পড়ে। সকোলভকে তাই ফায়ারিং স্কায়াডে পাঠিয়ে গ্রেফতারকৃত অন্য ১৫ হাজারকে বলা হয়, "চুপ থাকো, বানচোত কমরেডের দল, একদম কোনো কথা বলবে না।”

এবং কাজ হয়। এত কালের সত্য "silence is the language of God" বাক্যে আরও দুটো শব্দ যুক্ত হয়, "and criminals!”

অন্যসব দেশের মতই এখানেও চুরি করে অনেকেই, কিন্তু চরম শাস্তি পায় একজন সকোলভ। বাকিরা জেল খেটে জড়িমানা দিয়ে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয় ভবিষ্যত পেরেস্ত্রোইকার সময় তারা বা তাদের সন্তানেরা হয় তরুন তুর্কির দল। তারাই পেরেস্ত্রোইকাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। তাদের গল্পের শুরু যেমন নেই, শেষও নেই। দৃষ্টিতে খাটো যারা, তারা গভীরতা দেখতে পায় না। কিন্তু তা বলে তাদের জিভ খাটো নয়, তারা চরিত্র হরণ করতে খুব পারে।

আদর্শের ভদকা-প্লাবিত হিলালউদ্দিনকে একজন ওর রুমে নিয়ে শুইয়ে দিয়ে আসে। এমন অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য অভ্র কিরণ ভাইয়ের কাছে মাফ চায়। কিন্তু কিরণ ভাইয়ের আমুদরিয়া দিল, বলেন, “আরে ভাই রাখো, তুমি মাফ চাইবে কেন? ছোট ছোট পোলাপান, বয়েস বাড়বে, বুঝতে পারবে। আর না বুঝলেই কী? পার্টির নেতা হবে।”



পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু

৪১ তম পর্ব



সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে দিদারের মধ্যে একটি বড় পরিবর্তন দেখা দেয়। সে বেশ কিছুদিনের জন্য ব্যবসা করা বা টাকা কামাই করার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলে। সিঙ্গাপুরে যাওয়া বাদ দিয়ে দেয়। পড়াশুনো করে কোনো রকমে। আগে সে এলকোহল পান করতো সামাজিকভাবে কিন্তু এখন একাই বোতল শেষ করে। অসম্ভব হাসি খুশি প্রাণবন্ত ছিল সে, কিন্তু গাছ বেয়ে ওঠা লকলকে চালকুমরো লতার গোড়া কেটে দিলে কিছুক্ষণ পরেই তাকে যেমন লাগে, ঠিক তেমন সে এখন।

সবকিছুই নেতানো, বিছানায় শুয়ে কাটায় সময়।
পুষ্পিতা ওকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, এটা ও অন্যায় করছে। এটা তার দোষ নয় যে, সে দিদারকে কোনোদিন প্রেমিক হিসেবে ভাবতে পারেনি। এখানে জবরদস্তির কী আছে? জোর করে কি প্রেম হয়?
দিদার কোনো উত্তর দিতে পারেনি, তাকিয়ে থেকেছে দূরে, যেখানে মেঘ ছোটে অস্থির এবং মানুষের মনোজগতের কোনো হিসেব রাখার প্রয়োজন বোধ করে না।
পুষ্পিতা তপ্ত লাভার স্রোতে ভাসমান।
দিদারের কষ্টে ওর বুক ভাঙে কিন্তু ভালোবাসে সে অন্যজনকে এবং তাকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্নে বিভোর। দিদার কোনোদিন মুখ ফুটে জানায়নি যে, সে এত সিরিয়াস। অন্তত ৬ মাস আগেও যদি জানতে পেত হয়তো সবকিছুই হতো অন্য রকম। যে মানুষ এত হৈ হুল্লোড় করে আড্ডায় সবাইকে মাতিয়ে রাখে, নিজস্ব অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বোবা হলে সে করবে কী?

সে ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার।

আলো ও অন্ধকারের মাঝে তফাত কী?

শুধু একটি সুইচে। সুইচ না টিপলে আলো জ্বলে না, অন্ধকার ঘাপটি মেরে থাকে। দুজন মানুষ অতি কাছে থেকেও ভুল করে, "না" উত্তরটি শোনার আশংকায় মুখ খোলে না। ভাবে আপনা আপনি সব হয়ে যাবে। কিন্তু তা কি সবসময় হয়?



হোস্টেলের ছেলেমেয়েরা ফুর্তি ও ভদকার বাহুল্যে পুষ্পিতার বিয়ে খায়। দিদার সযত্নে নিজের প্রেমিকার বিয়ের তদারক করে, তারপরে লেখাপড়া ব্যবসা দূরে ঠেলে রেখে আরো প্রায় ৬ মাস মদ খায়। তারপরে একটা ঘটনার উৎপত্তি হতে শুরু করে। রুমের সামনে দিয়ে একটি মেয়েকে হেঁটে যেতে দেখে নিয়মিত। মেয়েটি নতুন এসেছে, সম্ভবত, প্রথমবর্ষে। ওর হাল্কা খয়েরি চোখে সম্মোহনী আফিমের আভা। চাঁদের বিভার মত মুখ। হাঁটে ঋজু। পোশাক রুচিসম্মত, দামি এবং বিদেশি।
হাতে ডায়মন্ডের আংটি যা সাধারণ সোভিয়েত নাগরিকদের হাতে দেখা যায় না। দেখেই বোঝা যায় ধনী বাপের মেয়ে, "ব্লাতনাইয়া দিয়েভুসকা", বা সমাজতান্ত্রিক "নিউ ক্লাস"য়ের প্রতিনিধি।

শৈশবে গ্রামের পরিত্যক্ত ভাঙা মন্দিরটির প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ বোধ করতো দিদার। সাপ খোঁপ বনবিড়াল, ভুত-প্রেত কোনো কিছুর ভয়ই ওকে দূরে রাখতে পারতো না সেই মন্দির থেকে। এই মেয়েটির আকর্ষণ অনেকটা সেই রকম। যদিও সে ভাঙা মন্দির নয় বরং দৃষ্টি অন্ধ করে দেয়া কিয়েভের সেইন্ট সোফিয়া ক্যাথেড্রালের জৌলুশ। তবে সে কিয়েভের নয়, বরং পাশের ছোট একটি শহরের সবচেয়ে বড় মানুষটির মেয়ে সে। শহরের পার্টি প্রধান মানে তার ওপরে নীলাকাশ।

পার্টি এখন ক্ষমতাচ্যুত হলেও, সে এখন নতুনক্ষমতার নতুন কর্ণধার।

দু’একবার “প্রিভেত” “হাই” “হ্যালো” বলেছে।
মেয়েটিও উত্তর দিয়েছে ভদ্রভাবে।

দিদারের দুই রুম পরে, যেখানে ওর ক্লাশের একটি মেয়ে, এলেনা থাকে তার স্বামী ও ছোট্ট বাচ্চাসহ, মেয়েটি সেখানে যায়। বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে হোস্টেলের লম্বা করিডোরে হাঁটাহাঁটি করে। কী তার যত্ন বাচ্চাটির প্রতি! বাঘিনী যেমন তার শিশুকে আগলে রাখে তেমনই একটা ভাব ওর মধ্যে। মা না হয়েও মা।
বাচ্চার বাপ মদ খেতে পছন্দ করে কিন্তু মা পড়াশুনা, শিশু পালন, ঘর-সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ভালো ছাত্রীও। এই মেয়েটি, সোফিয়া, ওর ছোটবোন। অবিকল বড়বোনের মতই দেখতে, যদিও অনেক বেশি সজীব। বসন্তের কচি মেপল পাতা, তারুন্যে চক চক।

তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়।

ইনস্টিউট এবং হোস্টেলের বেশ কয়েকটি ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে চোখ কানা করেছে, কিন্তু পাত্তা পায়নি। সোফিয়া তার সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে খুব সচেতন এবং কিছুটা দেমাগও আছে। কোনো রাশান বা বিদেশি ছেলেকে নিজের আশেপাশে ভিড়তে দেয় না। এমনকি "স্তুদসোভিয়েত" (স্টুডেন্ট সোভিয়েত) এর প্রেসিডেন্ট ওর সাথে বন্ধুত্ব করার প্রস্তাব দিয়ে সুবিধা করতে পারেনি।

একদিন সে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে হাঁটছে আর চেষ্টা করছে ওর একরোখা অসহনীয় চিৎকার থামাতে। কিন্তু নাছোড় বাচ্চাটা, কোনোমতেই থামছে না। সারা কড়িডোর ঝন ঝন করে প্রতিধ্বনি তুলছে ওর কান্নার। সোফিয়ার ধৈর্য্যচ্যুতি নেই। সে তার সমস্ত বৈভব, স্বরমাধুর্য

ও যত্ন দিয়ে চেষ্টা করে চলেছে। এই সময়ে দিদার ঘরে ফিরছিল। সে থেমে বাচ্চাটির সাথে দুচারটি কথা বলে থামানোর চেষ্টা করে কিন্তু তাতেও কোনো ইতর বিশেষ না হওয়ায় সোফিয়াকে বলে, "অপেক্ষা করো, আমি এক্ষুনি আসছি।"
সে রুমে ঢুকে ছোট একটি খেলনা নিয়ে বের হয়। বিদেশি রঙ্গীন খেলনা, ক্যাও ক্যাও করে আওয়াজ করে। বাচ্চাটির কাছে ধরতেই ম্যাজিকের মত ওর কান্না থেমে যায় এবং সে হাত বাড়িয়ে খেলনাটি ধরে ফেলে। নাড়ালেই আওয়াজ করে।
সোফিয়া হাসে। "বাহ্, তোমার ঘরে বুঝি বাচ্চাদের খেলনা থাকে?"
"সচরাচর থাকে না, সিঙ্গাপুর গিয়েছিলাম, খেলনাটি চোখে পড়ল, এত সুন্দর ও উজ্জ্বল দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।"
এতবড় একজন মানুষ অথচ বাচ্চাদের খেলনা পছন্দ করে, আজব তো!
ও ভাবে আর হাসে।
হাসে দিদারও।
বাচ্চাটি এখন আর বিরক্ত করছে না বরং মহা উৎসাহে খেলনাটি ঝাকাচ্ছে আর আওয়াজ করছে।
টুকটাক কথা হয়।
এই সময়ে ওর বোন এলেনা ঘর থেকে বের হয়। একই ক্লাসের, একে অন্যকে চেনে।

“কাক্ দেলা দিদারচিক্? কি খবর দিদার?”

রুশ মেয়েরা নৈকট্য বোঝাতে কখনও কখনও নামের পিঠে ‘চিক’ বা ‘ইক’ জুড়ে দেয়।

সে সোফিয়াকে ডাকে। সোফিয়া ধন্যবাদ দিয়ে চলে যায়। ঘণ্টাখানেক পরে দিদারের দরজায় নক্।
সোফিয়া!

খেলনাটি হাতে।
"তোমার খেলনাটি অনেক উপকার করেছে, ধন্যবাদ ।"
বলে এগিয়ে দেয়।
দিদার বলে, "না না, তুমি এসো, ভিতরে এসো, খেলনা তো আমি ওকে দিয়েছি, আমি ওটা দিয়ে কী করবো?"
সোফিয়া আসতে চায় না, কিন্তু দিদার বলে "এক কাপ চা খাবে আমার সাথে।"
বলে "চা খাবো না, ঠিক আছে একটু বসি।"
দিদারের রুমে টিভিটা বিদেশি, গুরুনডিক কোম্পাননির, খুবই বড় স্ক্রিনের এবং অসম্ভব দামি, একমাত্র বিশিষ্ট রাশিয়ানরাই ওই টিভি কেনার সামর্থ্য রাখে। পাশেই প্যানাসোনিক ভিসিআর আর বেশ বড় ঝকঝকে রেকর্ড প্লেয়ার। সোভিয়েত স্ট্যান্ডার্ডে বেশ দামি সোফা। বিছানা সুন্দর করে গুছানো। নিট এন্ড ক্লিন, চোখে পড়ার মত।ছেলেদের রুম সচরাচর এত গোছানো হয় না।
সোফিয়া সোফায় বসে।
দিদার গান ছেড়ে দেয়। মডার্ন টকিং খুব জনপ্রিয়।
রেকর্ড প্লেয়ারের পাশেই একটি সিডি রেকে অনেক জনপ্রিয় গানের সিডি।
আর অনেকগুলো বিদেশি ছবির ভিডিও ক্যাসেট।
ও খুটিয়ে খুটিয়ে মনযোগ দিয়ে দেখে।
বলে ,"বাহ্ তোমার তো গান ও ছবির বেশ ভালো কালেকশন। আমি বিদেশি গান ও ছবি খুব পছন্দ করি।"
দিদার বলে,"যখন গান শুনতে বা ছবি দেখতে ইচ্ছে হয় চলে এসো।"
চায়ের কথা আবার বলে সে কিন্তু সোফিয়া আবার না করে।
দিদার চকোলেট বের করে। সিঙ্গাপুর থেকে অনেকদিন আগে আনা অলমন্ড চকোলেট।
পুষ্পিতার খুব পছন্দের কিন্তু সে আর নেই, চকোলেট পড়ে আছে।
মেয়েরা চকোলেটে দুর্বল।

কিন্তু সোফিয়া তাও স্পর্শ না করে স্পাসিবা স্পাসিবা বলে।
খুব একটা কথা সে বলে না।

তারপরে উঠে দাঁড়ায় খেলনাটি সোফার ওপরে রেখে।

"এটা আমি তোমার বোনের মেয়েকে দিয়েছি, প্লিজ নিয়ে যাও। "
কিন্তু মেয়েটি একগুয়ে।
"আচ্ছা চল আমার সাথে।"
ওর বোনের দরজায় নক করতেই এলেনা বের হয়ে দিদারকে দেখে হাসিমুখে দাঁড়ায়। দিদার বলে "এই খেলনাটি আমি তোমার মেয়েকে দিয়েছি কিন্তু তোমার বোন কোনোমতেই নেবে না।"

হাসে, "আচ্ছা। আমি নিচ্ছি ধন্যবাদ। আমার বোন খুব একরোখা, না বললে হ্যাঁ করানো খুব কঠিন।"
দুটি বোনই সৌন্দর্যে অতুলনীয়।ধুতুরা ফুলের মত। কী জানি, হেমলক ফুলও হতে পারে।


আস্তে আস্তে সোফিয়ার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একদিন ওর বান্ধবী আসে কিয়েভ থেকে। দিদার ওদের পুশকিনস্কায়া মেট্রোর কাছে সদ্য খোলা ম্যাকডোনাল্ডসে নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে ওদের গালগল্প হয়। ম্যাকডোনাল্ডস খুব পছন্দ হয় ওদের। সম্পূর্ণ নতুন কিছু, রুশরা পুঁজিবাদি জগতের এই বিষের সাথে পরিচিত নয়। বিষ বেশিরভাগ সময়েই খুব বেশি এট্রাক্টিভ। বিষাক্ত ফুলগুলো সবচেয়ে বেশি সুন্দর। বিষাক্ত মানুষগুলো বেশি চার্মিং। তাই মানুষের জীবন অন্যায়, অহিফেন ও মধুর এক বিচিত্র সমন্বয়।

রাশিয়া সেই বৈচিত্র্যের দিকে চোখ বন্ধ করে ছুটছে।



পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু

৪২ তম পর্ব


সোফিয়া মাঝে মাঝে দিদারের রুমে ছবি দেখতে আসে। আসে তখনই যখন অন্য কেউ থাকে না। আবার দিদারের উপস্হিতিতেও কেমন ইতস্তত বোধ করে। দিদার একটি বুদ্ধির আশ্রয় নেয়। ও এলে কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই ভিডিওতে ওর পছন্দমত কোনো ছবি ছেড়ে দিয়ে রুমের ডুপিলিকেট চাবি এগিয়ে দেয়: "তুমি ছবি দেখ, আমার একটু বের হতে হবে। বেশি সময় লাগবে না, যদি আসতে দেরি হয়ে যায় ছবি দেখা শেষে ঘর বন্ধ করে চলে যেও। "
প্রথমে এক দুইবার সে আপত্তি করে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে চেয়েছে কিন্তু শেষে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
দিদার হয়তো অন্য কোনো তলায় কোনো বন্ধুর ওখানে গিয়ে আড্ডা দেয় বা বাইরে হাঁটাহাটি করে , বা ট্রলিবাসে চড়ে বসে। একদিন দিদার ওকে ডুপ্লিকেট চাবিটি দিয়ে বলে এটা তোমার কাছেই থাক, যখন ইচ্ছে হয় এসে ছবি দেখবে বা গান শুনবে।

“নেব?”

“নেয়ার জন্যই তো দিলাম।”

সে কিছুটা স্বচ্ছন্দ হয়েছে ততদিনে এবং চাবিটা নেয়।

“ইয়েস” দিদার খুশিতে ২০ হাত উঁচু লাফ দিয়ে ওঠে।

সোফিয়া হাসে। “এত খুশি, কী ব্যাপার?”

“খুশি হতে নেই বুঝি?”

“আমি চাবিটা নেয়ায় এত খুশি লাগছে?”

ও হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ায়।

“যাকে খুব আপন বলে বিশ্বাস করা যায়, তাকেই তো মানুষ নিজের ঘরের চাবি দেয়। তাই তো? আর কেউ যদি অন্যকে আপন বোধ না করে সে তার ঘরের চাবি নেবে কেন? তার মানে তুমি আমাকে আপন ভাবো এবং আমিও তোমাকে।”

সোফিয়া হাসে।

“যুক্তিতে একেবারে পিফাগোর!” (পিফাগোর =পিথাগোরাসের রুশ নাম)

পেরুর আদুরে আলপাকাগুলোর মত লাগে ওকে। ইচ্ছে হয় গালে ছুঁয়ে আদর করতে। আলপাকার অন্য নাম আদর। খুব কম লোকে তা জানে।

এক সন্ধ্যারাতে একটু দেরি করে বাইরে থেকে এসে দরজা খুলে দেখে ওর সোফায় শুয়ে টিভি দেখতে দেখতে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছবি শেষ, টিভির স্ক্রিনে ধুসরতার ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। ও চুপ করে তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত মুখের দিকে।
পুষ্পিতার কথা মনে পড়ে, বুকটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। জৈষ্ঠ্যের পদ্মানদীর ঝড় যেমন ওলট পালট করে দেয় সব। অথবা আষাঢ়ে ধুপ ধাপ করে কূল ভাঙে যেমন। সোফিয়া জেগে ওঠে। বিব্রত বোধ করে।

গালে অভ্রমের লাল চেরি, "সরি, কখন ঘুমিয়ে পড়েছি টেরই পাইনি, কী লজ্জা।"
দিদার বলে, "বা রে লজ্জার কী আছে? ঘুমাও।"
"তুমি কি অনেক আগে এসেছো?"
"না, এই তো এলাম।"
"আমি যাই" বলেই উঠে হাঁটা ধরে।
"একটু বসো না।" কিন্তু সোফিয়া চলে যায়।
দিদারের বুকটা খা খা করে। পদ্মার চরে এমন একটা শূন্যতা খা খা করে, জলহীনতার শুকনো নি:শ্বাসে বালু ওড়ে। সেখানে সে হা-ডু-ডু খেলতো বন্ধুদের নিয়ে। কোনো কষ্ট ছিল না তখন। ছিল নিরবিল আনন্দ।

খেলতে খেলতে ঘামে বালুতে একাকার হয়ে যেতো শরীর, যেমন পুষ্পিতা একাকার হয়ে আছে ওর সত্তায়। নদীতে ঝাপ দিয়ে বালু ধুয়ে ফেলা যেতো, কিন্তু পুষ্পিতা? পুষ্পিতাকে ধুয়ে ফেলার সাধ্য ওর নেই। ওর মনে হয় খুবই দুর্বল মনের মানুষ সে। ভালোবাসার জন্য মানুষ কত ত্যাগ করে, কেউ আত্মহত্যা করে, কেউ সন্ন্যাসী হয়। অথচ ও যেন মনের বাহির দুয়ার বন্ধ করতে করতে খিড়কি দুয়ার খুলে দিয়েছে সোফিয়ার জন্য। সোফিয়া, না পুষ্পিতা কাকে তার চাই, সে এখন গোলমাল করে ফেলে।

পুরুষের মন কখনও কখনও দ্বি-চারী হয়। একই সময়ে একাধিক নারীর প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করে। নারীর প্রশ্নে পুরুষের মন একটি নষ্ট নরক। সে হয়তো একজনকে নিয়েই থিতু হয় কিন্তু তার মনের উড়াল থামে না কোনোদিন। নারী হচ্ছে পুরুষের মনের উড়নের পাখা। প্রতিটি প্রেমিক পুরুষ কবি। শুধু অপ-পুরুষই নারীকে কষ্ট দেয়, নারীকে নির্যাতন করে।

আচ্ছা, সোফিয়া এবং পুষ্পিতা, দুজনই যদি দুইপাশে দাঁড়িয়ে দু’দিক থেকে হাত বাড়িয়ে কাছে ডাকে, সে কী করবে? চিন্তার এখানে এসে দিদার মাথায় অসম্ভব তাপ অনুভব করে। যেন সাহারা মরুভূমির মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে গনগনে সূর্যটা অর্বুত ওয়াটের অভিশাপ বিকিরণ করছে।

সে আর এগুতে পারে না।

চার পাঁচ মাস চলে যায় এবং সোফিয়ার উষ্ণতার পারদ থেমে থাকে শূন্যের কাছাকাছিই। সে সময় কাটায় দিদারের রুমে প্রায়শই, যখন দিদার থাকে না। যখন সে ঘরে আসে, সোফিয়া চলে যায়, যেন ঊষা ও কুয়াশা, পুরুরবা ও উর্বশী, একের আবির্ভাবে অন্যের নিষ্ক্রান্তি।

সক্ষম পুরুষ নারীর মন জয় করতে দামি উপহার কেনে। দিদারও করে তাই। ডলারের বেচা কেনা আগে ছিল অবৈধ, এখন আর তা নেই। বৃষ্টি শেষে ব্যাঙের ছাতার মত এখন অনেক দোকান গজিয়েছে যেখানে বিদেশি পণ্য কেনা যায় ডলার দিয়ে। প্রলেতারিয়েতের রাষ্ট্রের নেতাদের হাতে ডলার এখন প্রচুর। আর বিদেশি বিজনেসম্যানদের। দিদার ওদের একজন। সে ডলারের দোকানে যায় সোফিয়ার জন্য উপহার কিনতে। মেয়েদের একটি দামি ফারের ওভারকোট, যাকে বলে "শুবা" , ওর দৃষ্টি কাড়ে। বিদেশ থেকে আসা। সে সাথে সাথে কল্পনা করে সোফিয়াকে কেমন রাজরানীর মত দেখাবে সেই শুবায়। ৩৫০০ ডলার দাম ছিল, এখন তা কমানো হয়েছে ৩০০০ ডলারে। একটিই মাত্র এবং মস্কোতে অন্য কারোর গায়ে সে দেখেনি।

সে কিনে ফেলে।
সোফিয়া রেগে যায়।
বলে, "আমি নেব না, আমার দরকার নেই।"
কোনোমতেই তাকে রাজি করানো যায় না।
দোকানেও ফেরত নেবে না।
বলা সত্ত্বেও সোফিয়া অনড়।
দিদারের আলমারিতে ঝুলে থাকে অবশেষে।
কিন্তু একটা পরিবর্তন দেখা যায়।
মনে হয় সে কিছুটা উষ্ণ দিদারের প্রতি।
কিছুদিন পরেই দিদার সিঙ্গাপুর রওনা হয়। যাবার দিনে ওরা রুমে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। "তোমার জন্য কী আনবো?"
"কিছু আনতে হবে না।"
এখানে সে অকস্মাত সোফিয়াকে বুকে চেপে ধরে গালে টুক করে চুম্বন এঁকে দেয়।

"দুরাচক, শ্তো তি দিয়েলায়েস ?" ( দুষ্ট, তুমি এ কী করছ? ) বলে ঠেলে সরিয়ে দিতে গিয়েও, সম্পূর্ণ সরিয়ে দেয় না, আলতো করে ধরে থাকে।
ওর বুকের রোলার-কোস্টার-দৌড় দিদারের তথৈয়ের পিছু ছোটে।

"আমি তোষকের নিচে কিছু টাকা রেখে গেছি, তোমার লাগলে খরচ করো।"
"তোমার টাকা আমি খরচ করবো কেন?"
"না, যদি হঠাৎ প্রয়োজন পড়ে।"
"আমাকে বুঝি টাকা দিয়ে কিনতে চাচ্ছো!"
"তোমাকে কি কেনা যায়?"
ও মাথা নাড়ে।
সিঙ্গাপুর থেকে এসে দেখে টাকা সে খরচ করেছে। দিদারের মনটা খুশিতে ভরে ওঠে।

এই প্রথম সোফিয়া ওর কিছু থেকে গ্রহণ করেছে।

এর বেশ কিছুদিন পরে একদিন দরজা খুলে রুমে ঢুকে দেখে সোফিয়া, লম্বা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ওর কেনা শুবাটি পরে ঘুরে ফিরে দেখছে। মহারানী ক্যাথেরিন দি গ্রেটও যদি ওর সামনে এসে দাঁড়াতো সে এতটা মোহিত হতো কিনা সন্দেহ। সোফিয়া তটস্ত হয়ে শুবাটি খুলতে যায়, ওর গালে যেন উষার আকাশের রক্তিমাভা। দিদার থামিয়ে দেয়। দুই হাত বিশালভাবে প্রসারিত করে বিশাল ধরিত্রীকে আলিঙ্গন করার মত ওকে বন্দি করে ফেলে।
"সোফিয়া, সোফিয়া কী সুন্দর লাগছে তোমাকে!"
সোফিয়া নিজেকে মুক্ত করে, বলে,"আমার এটা খুব পছন্দ হয়েছে। ধন্যবাদ। খুব সুন্দর, আর কখনই এতটাকা খরচ করে কিছু কিনবে না আমার জন্য।"
দিনগুলো গড়িয়ে যায় দ্রুত।
সোফিয়া কাছে কিন্তু নিবিড়তায় ধরা দেয় না।

একদিন সে দিদারের বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। দিদার ছিল মাথার কাছে বসে। কিন্তু সোফিয়া বই পড়া নিয়ে ব্যস্ত। দিদার ইচ্ছা করে আড়মোড়া ভাঙতে গিয়ে হাতটি ওর গালে স্পর্শ করে দেয়।
ও বলে, "দুষ্টামি করো না।"
"কই দুষ্টামি করলাম, আড়মোড়া দিতে গিয়ে হাতটা কেবল গালে লেগেছে।"
"আমি সব বুঝি।"
"ও তাই?" এই বলে নিজের গাল নিয়ে ওর গালে ঘষে দেয় জোর করে।
ওর খসখসে গাল সোফিয়ার গালে আগুন ধরিয়ে দেয় কিন্তু সে লাফ দিয়ে উঠে বসে, খপ্ করে দিদারের দুটো হাত নিজের দুই হাতে বুকে চেপে ধরে বলে, "এই কী গুন্ডামি হচ্ছে? না থামলে কিন্তু আমি এক্ষুনি চলে যাবো।"
ওর দুটো চোখ গভীর বাইকাল হ্রদের মত ডুবিয়ে দেয় দিদারের পদ্মার বালিহাঁসের চোখের মত দুই চোখ।

দিদার সব শক্তি হারিয়ে ফেলে।



পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু
৪৩ তম পর্ব


ওরা মাঝে মাঝে একসাথে ডিনার করে। কিন্তু ওর শারিরীক সান্নিধ্য পবিত্র মানস সরোবরের মত অতি দূরে। অথচ ওরা যখন খেতে বসে, সোফিয়া ওর একটি পা তুলে দেয় দিদারের পায়ে, যেন সে মির্চা ইলিয়াদের “লা নুই বেঙ্গলি” পড়ে ট্রিকটা শিখেছে। ওটা ওর অনেকটা রুটিন ব্যবহার এখন।

রেস্টুরেন্টে গেলেও সে এমন ভাবে বসে যাতে অন্য কেউ দেখতে না পায় কিন্তু তার পা চলে যায় দিদারের পায়ের ওপর।
হোস্টেলে যেখানে সেক্স উন্মুক্ত মাঠের ঘাস ফুলের মত, একটু ইচ্ছে প্রকাশ করলেই পরী পার্বতী খুঁজে পেতে অভাব হয় না, সেখানে সোফিয়া বাস করে ভিক্টোরিয়ান যুগে, শুধু মাত্র "একটুকু ছোঁয়া লাগার" গাঁজাখুরি রোমান্টিকতায়। অনস্পর্শের চেয়ে একটুকু স্পর্শ, দিদারের জন্য অন্তত দুধের বদলে চা। চিনিহীন রং চা। অসম্ভব কষ্টকর এই উপরতি ও অনুভূতির বেতস-প্রহার। সমস্ত শরীরে লিবিডোর সিংহ-গর্জনের কামান বয়ে বেড়ায় সে। যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে গেলে মাথা ধরে। অবিশ্বাস্য ও অদ্ভুত, রিপলি’র “believe it or not” বাস্তবতায় বসবাস।

ওর সারা শরীরে কল কল করে তৃষ্ণা। শিরায় শিরায় ধমনীতে রক্ত নয়, যেন টেস্টোসটেরন ও অন্ডোদ্ভুত লক্ষ গ্যালন তরল চলাচল করে পাগলা হাতির মতন। করোটিতে থৈ থৈ করে প্লাবন। মগজের জেলিগুলো যেন শ্রাবণ-ডুবো হয়ে সমস্ত চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেলে। শুধু একটাই চিন্তা, সোফিয়া, সোফিয়ার চামড়ার সাথে একাকার হয়ে যাওয়া। আর কিচ্ছু নয়, শুধু তাকে, তাকেই চাই সম্পূর্ণতায়।

কিন্তু সোফিয়া ধরা দেয় না। বৃক্ষের অতি উঁচুতে ফুটে থাকা ফুলের মত সে।


পুষ্পিতা এখন সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে ওর মস্তিস্ক থেকে। যার কারণে মাত্র কিছুদিন আগেও মনে হয়েছিল বেঁচে থাকা অর্থহীন, সে এখন নিষ্ক্রান্ত শীতের হাওয়ার মত।

সোফিয়ার প্রতি অভিকর্ষের যে জ্বলন্ত ফার্নেস তার মধ্যে, তাই যেন গতি দেয় ওর ব্যবসায়। সে আবার সিঙ্গাপুর যাওয়া আসা শুরু করে, আনা শুরু করে কন্টেইনার ভরে ইলেকট্রনিকস। আর তা বিক্রি হয়ে যায় আসার সাথে সাথেই। একজনের কাছ থেকে একটা চলনসই কালো ভোলগা কিনে নেয় আড়াই হাজার ডলার দিয়ে। ড্রাইভার থাকে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত, মাত্র ৫০ ডলার মাসে। হোস্টেলে সুপারকে ঘুষ দিয়ে অবৈধভাবে একটা টেলিফোন আনিয়ে নেয় রুমে।
সে এক এলাহী কাণ্ড সোভিয়েত স্টান্ডার্ডে। কালো ভলগা হল সমাজতান্ত্রিক আভিজাত্যের প্রতীক , ঠিক প্রলেতারিয়েত নয়, প্রলেতারিয়েতের নেতাদের জন্য রাষ্ট্র থেকে বরাদ্ধ গাড়ি। তাদেরই শুধু ড্রাইভার থাকে। আর হোস্টেলে টেলিফোন থাকা, সে তো মরা ডোবায় দুষ্প্রাপ্য নীলপদ্ম!

সোফিয়া এখন ঘন ঘন আসে ফোন ব্যবহার করার জন্য। মাঝে মাঝে গাড়িতে পেছনের সিটে অতি কাছাকাছি বসে দুজন মস্কোর সৌন্দর্য অবগাহন করে। মস্কোনদীর তীর ধরে যে অপূ্র্ব রাস্তাটি চলে গেছে ক্রেমলিনের পাশ দিয়ে সেখানে নদী দেখে। কখনও দামি রেস্টুরেন্টে সময় কাটায়। এখন সে প্রায়শই রাত ১১টা ১২টা পর্যন্ত দিদারের রুমে থাকে। কখনও কখনও গা এলিয়ে দেয় ওর বিছানায় । স্পর্শ করতে দেয় কিন্তু এর বেশি নয়। একদিন দিদার ওকে খুব বেশি জ্বালাতন করে। খুব বেশি তটস্ত করে ফেলে দুই হাতে চারিদিক থেকে স্পর্শের পর স্পর্শ করে, বেপরোয়া সে কোনো কথাই শুনবে না। বাধ্য হয়ে সোফিয়া বলে, "তুমি কেন বোঝো না যে আমি পাথর নই, তীব্র ইচ্ছে হয় আমারও। কিন্তু এখনও সময় হয়নি। বোনের মত অসময়ে বাচ্চা নিতে আমি রাজি নই। তুমি আমাকে লক্ষ্যচ্যুত না করে বরং একটু সাহায্য কর, প্লিজ, আমি নিজেকে অসম্ভব কষ্ট করে

ঠেকিয়ে রেখেছি। তুমি অবুঝ হলে বিপদে পড়বো।”

সে কাঙালের মত দিদারের চোখে তাকায়। “সময় আসুক, সব পাবে।"
সে নিজের বুক শক্ত করে দিদারের বুকে চেপে রেখে ওর অবাধ্য হাতগুলো থেকে নিজেকে আড়াল করে।

দিদার ভেবে পায় না, কোথা থেকে সোফিয়ার এতটা আত্মসংবরণের ক্ষমতা। স্ফীত অণ্ড ও স্ফীত পৌরুষে অসম্ভব চাপ অনুভব করে সে, যেন এক তীব্র ব্যথা জমাট হয়ে আছে। শরীরের কোষে কোষে আগুন জ্বলে, যা সে নিভাতে পারে না। কিন্তু সোফিয়ার ধী, কথা ও ব্যবহারের অভিজাত্য এবং আন্তরিকতার বাঁধা অতিক্রম করার ঔদ্ধত্য সে দেখাতে পারে না।

এক শনিবারের রাত।

নিচে ডিস্কো নাচ হচ্ছে। মিউজিক ও ড্রামের বিট শোনা যাচ্ছে। সোফিয়া দিদারের রুমে। হঠাৎ ওর জেলখানার চেয়েও শক্ত মেটালিক দরজায় দুমদাম শব্দ আর মাতালের গালাগালি। দিদার দরজার গ্লাজক দিয়ে দেখে সোফিয়ার রূপে দৃষ্টি অন্ধ এক যুবক। সে টাল। মদে না প্রেমে তা সব সময় বোঝা না গেলেও এখানে সহজে দৃশ্যমান। সে দরজা খুলতে যাবে কিন্তু সোফিয়া ওর পথরোধ করে বুকে জাপটে ধরে। এই প্রথম ওর স্বতস্ফুর্ত আলিঙ্গন। “এখন বাইরে যাবে না, ও মাতাল, কাণ্ডজ্ঞানহীন, মারপিট লেগে যাবে। ও আমাকে খুব বিরক্ত করছে। ধৈর্য্যের একটা সীমা আছে। একটা কিছু না করলেই নয়।”

সে তার পিতাকে ফোন করে ইউক্রেনে। পিতার হাতে আলাদিনের চেরাগ।

সোমবারে ওদের ইনস্টিউটে একজন মাতাল ছাত্রের সংখ্যা কমে যায়।


দিদার ভে-দে-এন-খা’য় কসমস প্যাভিলিয়নে দোকান নেয়। তার কিছুদিন পরে আর একটি। ব্যবসা রমরমা। প্রচুর ক্যাশ ডলার হাতে। ব্যবসা এখন স্বর্ণকুম্ভ, যে একটু বোঝে, যার হাতে কিছু টাকা আছে, সে-ই প্রচুর অর্থ কামাই করছে। চতুর, পার্টি, রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত সোভিয়েত নাগরিকদের তো কথাই নেই।
পেরেস্ত্রইকার সময়টাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের নজিরবিহীন হরিলুটের ডামাডোলে অর্থহীন, জৌলুশহীন, ও প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল এই ভে-দে-এন-খা। অথচ তার আগে কী অসম্ভব জমজামাট ছিল তা! সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কয়েক কোটি লোক আসতো প্রতিবছর। আসতো বিদেশি ডেলিগেট ও ট্যুরিস্টরা। সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, কৃষি, জিওলজি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের আবিস্কার, অর্জন ও সাফল্যের পার্মানেন্ট প্রদর্শনীর স্থান ছিল এটা। প্রতিটি রিপাবলিকের নিজস্ব প্যাভিলিয়ন। ক্যাপিটালিজমের চাহিদা সৃষ্টির সুক্ষ্ন মার্কেটিংয়ের বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের মোটাতাজা প্রচার ও প্রকাশনার কর্মক্ষেত্র।

এখানে এলে মনে হতো উৎসব।

সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেলে তা মৃতপুরীতে পরিণত হয়, চুরি হয়ে যায় মূল্যবান সবকিছু। তারপরে মস্কো ব্যক্তিগত মালিকানায় যায় কিছু মহান রাশিয়ানের, তাদের টাকার অভাব নেই, ক্ষমতা আকাশচুম্বী। এত সুন্দর ও ‘প্রাইম রিয়েল এস্টেট’টিও কর্তাহীন থাকে না। বিরাট বিরাট প্যাভিলিয়নগুলো ছোট ছোট দোকানে ভাগ করে ভাড়া দেয়া শুরু হয় জায়মান ব্যবসায়ীদের কাছে, অফিশিয়াল ভাড়া কয়েক কোপেক কিন্তু আনঅফিশিয়াল ভাড়া কয়েক ডলার।

তুমুল বেচা কেনা হয় এখানে। এমন কোনো বিদেশি পণ্য নেই যা সেখানে পাওয়া যায় না। আগে এখানে এসে কখনই মনে হতো না কেনা-বেচাই জীবন ও সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এখন মনে হয়। মনে হয়, জীবন আর কিছু নয়, একটি কোলাহলপূর্ণ বাজার, যেখানে মানুষের প্রয়োজনীয় হাজারো পণ্যের মধ্যে গোটা দুই দেশী পণ্য এখনও পাওয়া যায়- কমলা রংয়ের গাজড়, আর কালো কর্দমাক্ত আলু। আলু ধুয়ে কাদা মুক্ত করার পুঁজিবাদী “হাইটেক” এখনও এসে পৌঁছায়নি। গাজরের মত দেশপ্রেমিক শস্য দ্বিতীয়টি নেই। আফগানিস্থানে পরাজয়, পেরেস্ত্রইকার দু:সময় ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার মত এত বড় বিপর্যয় সত্ত্বেও গাজর সবসময় ছিল। নাকের সামনে মূলা, না গাজর, কী বেশি কার্যকর তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, গাজর ৭০ বছরের বেশি যে কাজ করে না, তা প্রমাণিত।

তাই এখন চলছে মূলার ব্যবসা, পশ্চিমা মূল্যবোধের মূলা। রাশিয়া কোনোদিন মানুষকে বন্দি করে দাস হিসাবে বিক্রি করেনি, পশ্চিম করেছে; রাশিয়া কোনোদিন কোনো ক্রুসেডে অংশ নেয়নি বা পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ, দেশকে দেশ দখল, লুণ্ঠন বা আদি জাতিসমূহের নির্মূল সাধন করেনি, পশ্চিম করেছে; সেই পশ্চিম এখন রাশিয়ার কাছে বিক্রি করতে এসেছে “মানবিকতা”, “হিউম্যান রাইট”ও গণতন্ত্রের মন্ত্র এবং এরা নিজের দেশকে লুণ্ঠন করে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে হাজার বছরের সঞ্চিত সম্পদ, সংস্কৃতি ও দুর্বৃত্ত দমনের দুঃসাহস।

যে সমাজে দাস বিক্রি হয়, সেখানে বুদ্ধিজীবীও বিক্রি হয়, মনাকো রাষ্ট্রটির চেয়েও বড় এলাকা জুড়ে, প্রায় ৮২ টি প্যাভিলিয়ন নিয়ে ভে-দে-এন-খা’র এই মহান ক্রয়-বিক্রয়ের বিশাল স্থাপনা। মূল ফটকের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সোভিয়েত স্থপতি ভেরা মুখিনা'র ৩৫ মিটার উচু বিশ্ববিখ্যাত কাস্তে ও হাতুড়ি হাতে "শ্রমিক ও কৃষানি” মনুমেন্ট, যা সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতীক। আকাশের উদারতায় প্রশস্ত কাস্তে ও হাতুড়ি ধরে রাখা দুটি শক্ত হাত। সভ্যতার সৃষ্টি করে ও প্রগতির চাকা ঘুরায় যে শ্রমজীবি নারী পুরুষ, তাদের মেদহীন পেশীবহুল দেহ সৌষ্ঠব, দৃঢ়তা ও ক্ষিপ্রতার জয়গান গাওয়া "সমাজতান্ত্রিক রিয়েলিজমের" এই অবিস্মরণীয় স্থাপত্য।

১৯৩৭ সালে প্যারিসের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর সোভিয়েত প্যাভিলিয়নের সামনে এটি প্রথম স্থাপন করা হয়। সেখানে অসম্ভব জনপ্রিয়তা লাভ করে। পিকাসোসহ অনেকেই এর উচ্চ প্রশংসা করেন। পরে যখন প্যারিস থেকে এনে ভে-দে-এন-খার সামনে দাঁড় করানো হয়। এই সময়ে নাকি ভেরা মুখিনার গর্দান যায় যায় দশা হয়েছিল বলে গুজব শোনা যায়। কেউ গিয়ে কমরেড স্তালিনকে রিপোর্ট করেছিল যে, রাতের আলোতে কৃষানির স্কার্টের ভাজে ট্রটস্কির মুখের আদল দেখা যায়।

সচরাচর বড় বড় নেতা নেত্রীরা কান কথায় খুব বেশি বিশ্বাস করেন।
তাদের করতে হয়।

কমরেড স্তালিন এমনিতেই রাতে ঘুমাতেন না, তিনি ইতিহাস থেকে জেনেছেন যত প্রেসিডেন্ট, রাষ্ট্রনেতা ও জার নিহত হয়েছেন, তাদের বেশিরভাগই নিহত হয়েছেন রাতের অন্ধকারে। তাই তিনি সারা রাত জেগে থেকে সকালে ঘুমাতে যেতেন। এই ছিল তার রুটিন। কৃষানির স্কার্টে ট্রটস্কির মুখ দেখা যাবার বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি একরাতে সেই মূর্তির সামনে গিয়ে গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে ট্রটস্কির মুখ খুঁজেন খুটিয়ে খুটিয়ে। কিন্তু মুখিনার ভাগ্য ভালো, ট্রটস্কিকে তিনি সেই কৃষানির স্কার্টের নিচে খুঁজে পাননি। তার গর্দান রক্ষা হয়, উল্টা তাকে পুরস্কৃত করা হয়।

ভে-দে-এন-খা’র মুল ফটকটি নিজেই একটি এলাহি ব্যাপার। দুইসারি উঁচু উঁচু চতুষ্কোণাকার স্তম্ভের উপরে ছাদ, ছাদের ওপরে একজন পুরুষ ও একজন নারী মাথার উপরে ধরে আছে এক বিশাল সোনালি শস্যের আঁটি আড়াআড়ি ভাবে। তার উচ্চতা এতই যে সারা পৃথিবী থেকে দেখা যায়। বুখারিন ইত্যাদি শত্রুদের মুখে ছাই দিয়ে সোভিয়েত কৃষির সমবায়করণের সাফল্য ও পেশি প্রদর্শনের বিশাল এই নিদর্শন।

ফটক পার হয়ে হেঁটে এলেই পরে মনোহরনকারী “ফনতান দ্রুঝবি নারোদভ” বা "জাতি সমুহের বন্ধুত্বের ঝর্ণাধারা”। ১৭০ মিটার উঁচু, সাড়ে তিনহাজার বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে, মাটির অনেক নিচে বসানো পাম্প থেকে ৭১ টি টানেল দিয়ে প্রতি মুহূর্তে ১২০০ লিটার জল উর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হয় ২০ মিটার উঁচু পর্যন্ত।

প্রতি দেড় ঘন্টা পর পর জলের ধারার ডিজাইন বদলায়। আর রাতে ২৫০টি প্রজেক্টর থেকে আলোর ধারা জলের ধারায় একাকার হয়ে যায়। সৃষ্টি হয় এক অপূ্র্ব মায়াবী আবহের। তৃতীয় বিশ্বের সদা আত্মগোপন করে থাকা, নি:স্ব, অর্ধাহারী, অনাহারী কোনো বিপ্লবী, যে ইওরোপ আমেরিকার “পতিত, গলিত, পচনশীল” ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে শুনে ও বক্তৃতা দিয়ে অভ্যস্ত, তাকে সোভিয়েত পার্টির অর্থে এখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিলে মুহূর্তের মধ্যে সে সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যাবে। তার মনেই থাকবে না যে, নিজদেশের বাইরে যে অন্য আর একটা দুনিয়া আছে তাকেও দেখা দরকার তুলনা করার জন্য।

জাতি সমুহের বন্ধুত্বের ঝর্ণাধারাটির বিশালত্বের চেয়েও মানুষকে বেশি মুগ্ধ করে যা তা হলো এর স্থাপত্যের কম্পোজিশন। ঝর্ণার মাঝখানে দাঁড়ানো গম, সূর্যমুখি ও শণসমন্বিত বিশাল এক শস্যের আঁটি। তাকে ঘিরে ১৬ জন অপূ্র্ব সুন্দরী নারীর মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে চক্রাকারে। প্রত্যেকে তাদের জাতীয় পোশাক পরিহিত, প্রত্যেকের মুখের গড়নে রয়েছে স্ব স্ব জাতির এথনিক বৈচিত্র্য -মাধুর্য। এই মাধুর্য স্পষ্ট ও যথাযথভাবে প্রকাশিত হয়েছে এমন চেহারার ১৬ জন নারীকে নির্বাচিত করা হয়েছিল মডেল হিসেবে। তাদের সৌন্দর্য, চেহারা ও দৈহিক বৈভব জীবন্তভাবে অভিব্যক্ত হয়ে আছে পাথরে, কিন্তু তারা আর নেই, তাদের নামও আছে কিনা সন্দেহ।

প্রত্যেকই হাতে ধরে আছে নিজস্ব রিপাবলিকের মূল শস্যটি।

এই নারী মূর্তিগুলো এমনিতেই অনুপম, ডিজাইন অনুযায়ী তাদের সোনার প্রলেপ দেয়ার কথা ছিল না। কমরেড স্তালিন তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন, কিন্তু তাঁর মনে খুঁতখুঁতি থেকে যায়, “আমাদের মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত সোনা কি সোভিয়েত রাষ্ট্রের নেই?”

কমরেড বেরিয়া রাষ্ট্রিয় রক্ষনাগার থেকে সাড়ে তিন কিলোগ্রাম স্বর্ণ বের করে দেয় এবং মেয়েরা উজ্জ্বল হলুদ সোনার প্রলেপে হেসে ওঠে। ১৫টি রিপাবলিক অথচ ১৬ জন নারী।

কেন?

এই নিয়ে অনেক মাথা ঘামিয়েছে দিদার। তারপরে জানতে পেয়েছে যে, ১৯৪০ সালের ৩১শে মার্চ থেকে শুরু করে “কারেলো-ফিন রিপাবলিক” ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ১৬তম রিপাবলিক। ১৯৫৬ সালে সেই রিপাবলিক রাশিয়ার একটি স্বায়ত্বশাসিত রাজ্যে পরিণত হয়। কিন্ত ঝর্ণাটি ততদিনে তৈরি করা হয়ে গেছে, উদ্বোধনও হয়েছে ১৯৫৪ সালে, কমরেড স্তালিনের মৃত্যুর পর পর।

কিন্তু কারেলিয়ার মেয়েটিকে বিদায় করা যায়নি, সে আরো ১৫ জনের সাথে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, তাকে বাদ দিতে গেলে পুরো ঝর্ণাটি নতুন করে বানাতে হবে।

দিদার প্রতিদিন এই ঝর্ণার পাশ দিয়ে হাঁটে, যেমন সে শৈশব, কৈশোরও উঠতি যৌবনে হাঁটতো পদ্মা তীরের দিঘলী বাজারে। কার্তিকের দোকানের কাঁচা ছানা টানতো মাছির মত। সেই কার্তিক ইন্ডিয়া চলে গেছে বহু আগে, আছে কী নাই তাও কেউ জানে না কিন্তু তার সেই কাঁচা ছানার স্বাদ আজও মুখে লেগে আছে।

সেই কাঁচা ছানার মত সোফিয়া। সে মাঝে মাঝে রান্না করার জন্য সবকিছু কেটে কুটে তৈরি করে দিদারের রুমে। রান্না হয় কমন কিচেনে। একদিন সে দিদারকে চাবি দিয়ে পাঠায় নিজের রুমে শশা, টমেটোর পিকল আর কম্পত নিয়ে আসার জন্য। শুকনো ফল জলে ভিজিয়ে যে ড্রিন্ক বানানো হয়, তাই হল কম্পত। জলটা হয় খুবই সুস্বাদু, আর শুকনো ফল ভিজে ভিজে নরম। খেতে বেশ লাগে ।

দিদার চাবি দিয়ে দরজা খুলে একেবারে থ। বাঘ বা ভাল্লুক দেখলেও এতটা চমকাতো কিনা সন্দেহ। মধ্য বয়েস পার হয়ে যাওয়া এক ভদ্রলোক সোফিয়ার বিছানায় বসে আছে। টান টান শিড়দাঁড়া।

দামি স্যুটকোট পরা, চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ।

দিদার তটস্ত হয়ে বলে, “দু:খিত, আমি বোধ হয় ভুল রুমে ঢুকেছি “

উনি বলেন, “না, তুমি ঠিক রুমেই এসেছো। এই রুমের যে কর্ত্রী, আমি তার পিতা, আলেকসান্দ্রভ ইগর আলেক্সেইভিচ, হঠাৎ করে এসেছি। আমার বিশ্বাস তুমি গসপাদিন দিদার, ঠিক বলেছি?”

মিস্টার শব্দটি তখনও ব্যবহার শুরু হয়নি, গসপাদিন হল তার রুশ প্রতিশব্দ।

দিদার মাথা নেড়ে এগিয়ে এসে করমর্দন করে।

মুখটি অবিকল সোফিয়ার মুখের মত।

“ও আমাকে পাঠিয়েছে কিছু জিনিস নিতে। দেরি হলে রেগে যাবে, আমি এক্ষুনি আসছি।” বলে দিদার পালাতে চায়।

ইগর আলেক্সেইভিচ হো হো করে হেসে ওঠেন,“তুমি ঠিক বলেছ, এটাই আমার মেয়ে, খুব রাগী।”

“আপনি আমার ওখানে চলুন, আমাদের সাথে ডিনার করবেন।”

“না, আমি খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছি, এখনই চলে যাবো, তুমি বরং ওকে একটু পাঠিয়ে দিও। তোমার সাথে পরিচয় হয়ে ভালো লাগলো, আশা করি আবার দেখা হবে।”

দিদার রুমে গিয়ে বলতেই সোফিয়া চলে আসে।

ঘণ্টাখানেক থেকেই সে চলে যায়। গাড়ি নিচেই ছিল, সরাসরি এয়ারপোর্ট।

সোফিয়া স্বল্পভাষী। ওর মনোজগতের খোঁজ পাওয়া অসম্ভব। দিদারের খুব কাছের হয়েও অনেক দূরের। দিদার যে তাকে তীব্রভাবে কামনা করে, সে তা জানে। সেও যে সেই একই ফুটন্ত কড়াই দেহে নিয়ে হাঁটে, সে তা প্রকাশ করে না। অসম্ভব অস্থিরতায় ভোগে সেও, নিজের স্থান খুঁজে পায় না। পড়াশুনোয় মন বসাতে পারে না। ক্লাস মিস করে, কিন্তু এ কথা সে কাউকে বলে না।

তার মধ্যে একটা অদ্ভুত ফেটিসিজমের জন্ম হয়, সে দিদারের সোফায় বা বিছানায় বসে, দিদারের দেহের গন্ধ মিশ্রিত বাতাসে শ্বাস নিয়ে বা তার একা রুমে বসে যতটুকু স্থিরতা বোধ করে, নিজের রুমে ততটাই অস্থির ও উন্মন হয়ে থাকে। অন্যদিকে দিদার রুমে চলে এলে ও মিশ্র অনভূতিতে দিশেহারা হয়ে যায়। একদিকে হেমন্তের কুয়াশার মত একটা শান্তি ও স্থিরতা নেমে আসে, অন্যদিকে ভয় জ্বরের মত কাঁপায়, দিদার যদি খুব নাছোড়বান্দা হয় সে তাকে ফেরাতে পারবে না এবং তা হবে দিদারের কারণে নয়, তার নিজের কারণেই। দেহ দিয়ে সে তাকে চায়, কিন্তু মন দিয়ে এখনও নয়। সে বোনের করা ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না। এদিক থেকে সে তার পিতার সন্তান, ধীর, ক্যালকুলেটিভ, দূরদৃষ্টি সম্পন্ন। সে জানে, জল যখন ফোটে ৯৯ ডিগ্রি পর্যন্ত তা জলই থাকে, কিন্তু মাত্র আর ১ টা ডিগ্রির বাঁধা পার হয়ে গেলে জলকে আর জলে ধরে রাখা যায় না। শুধু দিদারই যে বয়লারে ফুটন্ত, তা নয়, এখন সে নিজেও সেখানে। দিদার যদি একটু বেপরোয়া পা ফেলে, সে নিশ্চিত পিছলে পড়ে যাবে।

আপাত যার লৌহ কন্ট্রোল নিজের উপরে, সে কয়েকটি সাবজেক্টে ফেল করে বসে আছে। এবং তাই ছিল তার পিতার অকস্মাত আগমনের কারণ। তাকে ইনস্টিউট থেকে বহিস্কার করার প্রস্তুতি চলছিল। সেই বহিস্কার রদ করার জন্য বিশাল পিতাকে অপেক্ষাকৃত ছোট ডীনের সাথে দেখা করতে হয়েছে।

“আমি তোমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়ব এই রাতে”, বাদল ঝরা বিনিদ্র রাতের তৃতীয় প্রহরে শূন্য বিছানা থেকে কেউ যদি ফোন করে বলে, সোফিয়া বলবে , “পাগলকে কি পাগল বানানো যায়? এই দেখ আমার দিকে তাকিয়ে, আমি নিজেকে হারিয়ে পাগল হয়ে আছি কত আগে।”



পেরেস্ত্রইকা মস্কো ও মধু

৪৪ তম পর্ব


একজন ত্যাগী বামপন্থী হুট করে ডানে যেতে পারে না, তাকে কতগুলো ধাপ পার করতে হয়। প্রথমে সে অর্থ কামাই করে স্বয়ংসম্পূ্র্ণ হয় কিন্ত তার বিবেকের কোথায় যেন বিছায় চুলকায়। তার প্রাক্তন সহযোগী ও কমরেডদের জন্য মন কাঁদে। সে তাদের সাহায্য করতে চায়, ডেকে এনে নিজের কোম্পানীতে কাজ দিয়ে সেই বিবেকের বিছাকে নিস্ক্রিয় করতে চায়। সহযোগী বা কমরেডরা তখন প্রাক্তন রাজনৈতিক বিশ্বাসের সূত্র ধরে তার অর্থ সম্পদকে কমন অর্থাৎ নিজস্ব মনে করে। তারা টাকা মেরে উপকারীর ১২টা বাজিয়ে কেটে পড়ে।

তখন সেই প্রায় মাঝে চলে আসা বামপন্থী তার প্রাক্তন কমরেডদের বিশ্বাস করে না, ভয় পায়, ঘৃণা করে, এড়িয়ে চলে, সমালোচনা করে কিংবা অর্থ উদ্ধারের জন্য ধাওয়া করে। এই পর্যায়ে তার অসংখ্য বন্ধুরা বলে, “দেখো সে কেমন পচা পচেছে, টাকার লোভে প্রাক্তন সহযোদ্ধার পেছনে লেগেছে।”

সে তখন ডানে মিত্র খুঁজতে গিয়ে মেফিস্টোফিলিসের শরণাপন্ন হয় এবং সেই সাথে তার ডানে উত্তরণ পূর্ণাঙ্গতা পায়। এই পর্যায়ে তাকে ডানপান্থি ডাকলে স্বনামে ডাকা হয়। এর আগে বললে গোবরকে গু বলা হয়।

১৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় মরুভূমি দিয়ে খালি পায়ে হাঁটার যন্ত্রনার মতই বখতিয়ার খিলজি ভাই

বাম থেকে ডানে ভ্রমণের এই পুরো পথটি অতিক্রম করেন। তাতে তাকে ক্লান্ত কুকুরের মত জিভ বের করে শ্বাস নিতে দেখা যায় শেষ পর্যন্ত।

ব্যবসার রম রমা অবস্থায় সে “বখতিয়ার ইন্ডাস্ট্রিজ”, “বখতিয়ার ইলেকট্রনিকস”, “বখতিয়ার ক্লিয়ারিং হাউজ”, “বখতিয়ার ট্রেডিং”, “বখতিয়ার গার্মেন্টস”, “বখতিয়ার শিপিং”, “বখতিয়ার স্পোর্টস, ইত্যাদি ইত্যাদি এক গাদা কোম্পানি তৈরি করে। দেশে ভেঙে যাওয়া কমিউনিষ্ট পার্টির দুই টুকরাকেই বড় অংকের চাঁদা দেয়। তারপর একটুকরো বিলুপ্ত হয়ে গেলে অবশিষ্ট ছোট আঙ্গিকে বিশুদ্ধ পার্টিকে বড় অংকে চাঁদা দিতে থাকে।

একদিন হিলাল উদ্দিন আসে অভ্রের কাছে। সাথে বখতিয়ার ভাইয়ের চাচাতো ভাই আব্দুল মালেক। সে-ই এখন মস্কোতে তার ব্যবসায়ের দেখা শোনা করে। বখতিয়ার ভাই রাশিয়ার বাইরের ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত। মূলত বাংলাদেশেই থাকেন। মাঝে মধ্যে মস্কোতে আসেন। মানুষ যখন আর্থিক স্বাচ্ছল্যের একটি নির্দিষ্ট স্তর পার হয়ে যায় তখন তাদের সুখী মানুষ বলে মনে হয়। সুখী মানুষের জীবন একঘেয়ে জীবন। এই একঘেয়েমি যখন খুব বেশি বোঝা হয়ে দাঁড়ায় তখন মানুষ কুকুর বিড়াল পালে, নয় নতুন করে বিয়ে করে। বখতিয়ার ভাই দ্বিতীয়টি করেন।
রাশিয়ায় যে বৌ নিজে চাকরির আয়ে তার বোঝা এতকাল টেনেছে, তার দুটি সন্তান লালন-পালন করার সাথে সাথে তার বিশাল রাজনৈতিক বন্ধুবান্ধব দঙলের আপনজন হয়ে থেকেছে এবং যে স্বভাবতই একজন মাতৃময়ী যত্নশীল নারী, সেই নাদিয়া ভাবীকে বখতিয়ার ভাই এমন একটি নিষ্ঠুর উপহার দেবেন এটা কারো ধারণায় ছিলো না। নাদিয়া ভাবীর তো নয়ই। এবং সবচাইতে দু:খজনক যে, কাজটি তিনি করেন গোপনে, ভাবীকেও না জানিয়ে।
বড় মানুষের বড় কাজ!

নাৎসীবাদের চরম বিরোধি কমরেড স্ট্যালিনও তো হিটলারের সাথে “মলোতভ-রিবেনট্রপ গোপন চুক্তি” করে উপঢৌকন হিসেবে রাশিয়ায় লুকিয়ে থাকা জার্মান কম্যুনিষ্টদের গেস্টাপোর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গেস্টাপো তাদের হত্যা করেছে বা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়েছে।

কিন্তু পৃথিবীর বড় বড় মনিষীরা তা বলে স্ট্যালিনের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি।

যেমন পাবলো নেরুদা।

যেমন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। পাবলো পিকাসো এবং আরও অজস্র নাম।

কী করে এটা সম্ভব? এত জ্ঞানী মানুষ এরা!

যে হেমলক নিজের গিলতে হয় না, তার স্বাদ মধুর মত। যে চাবুক নিজের পিঠে পড়ে না, তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুনতে বিরক্তির উদ্রেক করে। যে রক্তের সমুদ্রে নিজে সাতরায়নি, সে বিশ্বাসই করে না, রক্তের সমুদ্র হয়।

তারা যেসব দেশে বাস করেছেন সেখানে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় ছিল না, ফলে নিজের চামড়ায় টের পাননি আন্না আখমাতভা, গুমিলেওভ, ম্যান্ডেলস্টাম, পাস্তেরনাক, ব্রদস্কি, বেবেল, জস্সেন্কো, পিলনিয়াক বা স্যুলঝিনিতসিনের বেদনা।

তারা স্বাধীনভাবে লিখতে পেরেছেন, ভ্রমণ করতে পেরেছেন, সারা বিশ্বের সৃজনশীল মানুষের সাথে মিশতে পেরেছেন, স্বীকৃতি পেয়েছেন।


"আমি পছন্দ করি না যখন কেউ আমাকে পিছন থেকে গুলি করে।

এও আমি পছন্দ করি না যখন কেউ সরাসরি কপালে ট্রিগার টেপে।"

ভিসোৎস্কি গেয়েছিলেন রক্তঝরা কণ্ঠে।
বখতিয়ার ভাই লক্ষ্যভেদী গুলিটি ছুড়েছেন পেছন থেকে। অভ্র বিষয়টি জানে না।
সে পুরনো অভ্যাসের বশেই বখতিয়ার ভাইকে বিশ্বাস করে, শ্রদ্ধা করে। এবং মেধাবি ফিজিসিস্ট হিলালউদ্দিনও ততদিনে ব্যবসা শিখে ফেলেছে। আর শেখার কী-ই আছে? সোভিয়েতভাঙ্গা সাম্রাজ্যে ব্যবসা বেশ্যার মতই, গায়ে পড়ে টাকা আসে। একটু চালাকি, একটু বিবেকের হেরফের, একটু জিভের নাড়াচাড়া এই তো পুঁজি, আর মুনাফা বৃষ্টির কৈ মাছে,
শিং মাছ।

তবে বেশ্যা বা ব্যবসায়ী যাই হোক, হিলাল উদ্দিন এখনও তুখোর রাজনীতিবিদ। বাংলাদেশের বিশুদ্ধ পার্টির মস্কোর প্রতিনিধি সে এবং ঢাকার যে “কিম ইল সুং” পরিবার দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল মশালবাহী, সেই পরিবারের মেয়ে বিয়ে করেছে। সমাজতন্ত্রের জয় যে হবেই এ ব্যাপারে সে আগের চেয়ে বেশি নিশ্চিত, কম্যুনিষ্টদের বিরুদ্ধে সমালোচনা সে একেবারেই সহ্য করতে পারে না। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙেছে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টদের ৭০ বছরের দুর্নীতি ও নীপিড়ন নীতির কারণে নয়, সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের ফলে।

হিলাল উদ্দিনের ব্যবসায়িক পার্টনার, এখানকার আরেক প্রাক্তন ছাত্র আব্বাস, বামপন্থী ঘরানার হলেও রাজনৈতিকভাবে শসা প্রকৃতির নিউট্রাল। তারই এক আত্মীয় বাংলাদেশের বিশাল ব্যবসায়ী টাইকুন। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে গাঁজার ব্যবসা, কোথায় তার নেক নেই। সে আসে তাদের সাপ্লায়ার হয়ে, অনেক মাল দেয় কনসাইনমেন্টে, দেয় আব্বাসকে স্নেহ করে বলে। ওরা মাল বিক্রি করে টাকা দেয়।

আব্বাস বয়সে হিলালউদ্দিনের ছোট এবং তার মেধা, প্রজ্ঞা, সততা ও চারুবাকে মুগ্ধ।

হিলাল উদ্দিন ও বখতিয়ার ভাইয়ের চাচাতো ভাই আব্দুল মালেকের হঠাৎ অভ্রের কাছে আসার কারণ বখতিয়ার ভাইয়ের অতি আর্জেন্ট কিছু টাকা ধার করা দরকার। বাংলাদেশে সে যে গার্মেন্টস ফ্যাকটরি খুলছে তার ক্যাশ ক্যাপিটালে টান পড়েছে। সেই গার্মেন্টসের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর, ছাত্র ইউনিয়নের এককালের বাঘা ছাত্রনেতা ইফতেখার ভাই হচ্ছেন হিলালউদ্দিনের বড় ভাই। আর ভাইস প্রেসিডেন্ট আরও বড় ছাত্রনেতা, নাজিম হিকমত ভাই। উনি নেহায়েতই ভালো মানুষ, ব্যবসা বোঝেন না, পার্টি ভেঙে গেছে, কাজ নেই কিন্তু সংসার আছে। বখতিয়ার ভাই তাকে এনে

তার নতুন গার্মেন্টসের শো-রুম সাজিয়েছেন। এতকালের প্রিয় কমরেড, না খেয়ে তো মরতে দেয়া যায় না!

এবং অনেক বড় ব্যবসায়ীরও নগদ পুঁজিতে টান পড়ে। অভ্রের এক ইহুদি বন্ধু আছে, যে মস্কোর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং ফ্যাকাল্টির ডীন। রাষ্ট্রীয় যে কোনো সংগঠনের নেতৃপদস্থ

যে কোনো লোকের মতই সেও বিশাল টাকার কুমির।

সুদে টাকা খাটায়। ৫% মাসে।

টাকা খাটায়, তার মানে, কেউ টাকা ধার নিয়ে টাকা ফেরত না দিলে তার নাড়ি ভুড়ি বের করে নেয়ার ক্ষমতা সে রাখে। তারপরে সে একজন প্রফেসর-দৃষ্টিখোলা আলোকিত মানুষ। অভ্র তার সাথে অনেক লেনদেন করেছে, সে অভ্রকে বিশ্বাস করে। তবে বিশ্বাস ব্যবসায়ীর মূল মোটিভেশন নয়, প্রফিটই মূখ্য ।
অভ্র ওদের নিয়ে যায় সেই প্রফেসরের কাছে।

ভালোমানুষ প্রফেসর বলেন, "অভ্র, আমি অন্য কাউকে চিনি না, চিনি তোমাকে, তুমি চাইলে তোমাকে ধার দেব।"

হিলাল উদ্দিনদের কথায় এবং বখতিয়ার ভাইয়ের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে অভ্র নিজের কাঁধে ঋন নিয়ে টাকাটা ওদের দেয়।

দেয় কারণ অভ্র একটা গর্দভ। ঋণ করে ঘি খাওয়া যায় কিন্তু ঋণ করে ঋণ দেয়া, তাও বর্তমান নয় প্রাক্তন নেতাকে, এটা কোনো দরজা দিয়েই ঢোকে না। প্রথম ৬ মাস বখতিয়ার ভাই সুদ পরিশোধ করেন সময় মত, তারপরে তা হয় অনিয়মিত। মেঘ ও রৌদ্রের মত। টাকা আসে, টাকা আসে না।

বখতিয়ার ভাইয়ের মস্কোর অফিসে আব্দুল মালেকের সাথে কাজ করে মস্কোর আরও দুই প্রাক্তন ছাত্র নেতা। এ ব্যাপারে বখতিয়ার ভাইকে ধন্যবাদ বলতেই হয়। তিনি প্রায় প্রতিটি কোম্পানিতে প্রাক্তন ছাত্রনেতা, পার্টি নেতাদের ভালো বেতনে ডাইরেক্টর বানিয়ে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসিয়েছেন। এরা সবাই মিছিল মিটিং ও রাজপথ গরম করে অভ্যস্ত। রাজা উজির মারার টিপ-সইও তাদের ভালো। তারা প্রবল প্রতাপে ম্যানেজারি করেন। কিন্তু দুই নিতম্বের মধ্যখানের পাইপ দিয়ে রক্তক্ষরণ হয় শুধু মাত্র বখতিয়ার খিলজির।

কমরেডরা ত্যাগ করে অভ্যস্ত, মুনাফা করা তাদের আদর্শ বহির্ভুত কাজ। কিন্তু দিন শেষে তারাও মানুষ, "ময়দায় গড়াগড়ি করলে গায়ে ময়দা লাগবে না" এটা ভাবা ভুল। যাদের হাতে একটা পুরো সিস্টেম, পুরো সাম্রাজ্য লাটে উঠেছে, তাদের হাতে একটা কোম্পানির লাটে উঠতে কতক্ষণ?
সবচাইতে বড় কথা হল মুনাফা করা অন্যায় কিন্তু চুরি করা তো অন্যায় নয়। ওই আলোকিত ইহুদি প্রফেসরের দিকে তাকিয়েও কি এটা মনে হয় না?
এহ্ বখতিয়ার, বখতিয়ার!


ইতিহাসের মহাশক্তিধর ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজিকে ধ্বংস করেছিল কে?
আলীমর্দান খিলজি, তারই প্রিয় কমরেড!



চলবে



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন