মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০২২

আমিন্তা বুয়েনান্যিও 'র গল্প : মেনি



অনুবাদ : জয়া চৌধুরী

নেকগুলো বছর কাটিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। কোনদিনও ওদের বলে নি সেকথা, তবে বুড়ো না হওয়ার শপথ নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সবচেয়ে বেশি যা ছিল ওঁর, তা হল মৃত্যুভয়। কিন্তু সেকথা কখনও জানাতেন না। নিজের বিরাট বড় বাড়িতে হেঁটে চলে বেড়াতেন। বাড়িটার ঢালে পুরো ওষুধের সরঞ্জাম ভরা দোকান ছিল। সর্দি হলে এক্কেবারে ভোরে উঠেই ভিটামিন সি খেয়ে নিতেন। ই- খেতেন বার্ধক্য ঠেকাতে। বাত, হাড়ের ক্ষয় ঠেকাতে ওমেগা থ্রি। মন্তিস্কের জন্য ফ্যাট আর তেল সরিয়ে রাখতে খেতেন সয়া সমৃদ্ধ লেসিথিনের বড়ি। স্নায়ুর জন্য বাচ ফুল, হাড়ের জন্য ক্যালসিয়াম, স্মৃতিশক্তির জন্য অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফিওতোন, শক্তির জন্য জিনসেন, ত্বকের নারীসুলভ পেলবতার জন্য সালভিয়া পাতা, শরীরের ফ্রি র‍্যাডিক্যালগুলোর সঙ্গে লড়াই করবার জন্য অ্যান্টি অক্সিডেন্টস… ধরুন যদি, কিছু যদি তিনি ভুলেই যান খেতে তাহলে সেটা পুরিয়ে দেন মাল্টি ভিটামিনের বড়ি খেয়ে। সেগুলো ওঁর এক বান্ধবী মায়ামি থেকে ওষুধপত্র কিনে আনার সময় নিয়ে এসেছিলেন। মনের সন্তুষ্টির জন্য মাতা দোলোরোসার বাণী লেখা একটা ছোট্ট কার্ড ওয়ালেটের খাপে রাখেন। সমৃদ্ধির জন্য চেকবুকের গায়ে এক মন্ত্রপূত কবচ রেখে দিয়েছেন। যাতে “নজর না লাগে” সেইজন্য বাঁ হাতের কবজিতে একটা টকটকে লাল রঙের বালা পরে থাকতেন।

ঘরের দেয়ালগুলো প্যাস্টেল রঙে রাঙিয়ে ছিলেন। প্রত্যেক কোণে ফুলের টব দিয়ে সাজিয়েছিলেন। চন্দন আর দারচিনির গন্ধ ওয়ালা ধূপকাঠি জ্বালিয়ে রাখতেন যাতে পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে একটা পবিত্র অনুভুতিও হয়। অশুভ আত্মা তাড়াতে ঘরে ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে ঝুলিয়ে দিতেন ছাত থেকে। ওঁর বাড়ির দেয়াল্রে দেয়ালে বিখ্যাত সব উদ্ধৃতি বাঁধাই করে ঝুলিয়ে রাখতেন। বিভিন্ন আশাপ্রদ, বলপ্রদ বাণী বাঁধিয়ে এমন জায়গায় ঝুলিয়ে রাখতেন যে চোখে পড়লে মন শক্তিতে ভরে ওঠে এবং সবসময় আলোর পথে এগিয়ে চলতে উৎসাহ দেয়। একটা শব্দের ভেতরে খুঁজতেন, অস্থির হয়ে উঠতেন, আশা খুঁজে নিতে মরীয়া হয়ে পড়তেন। অমরত্বের পবিত্র দরজায় শীর্ণকায় স্বর্ণকেশ দেবদূতদের প্রহরায় অনন্ত যৌবনের অমৃত পাবার জন্য মরীয়া থাকতেন তিনি। এবং যাদের থেকে – এক সুউচ্চ মিনারের মত আধ্যাত্মিক বইপত্তর, আত্ম উন্নতির জন্য পথপ্রদর্শক বইপত্র যা তিনি নিজে কিনে আনতেন প্রতি পনের দিন অন্তর, তাদের সবাইকে নাম ধরে চিনতেন। তারা কোন বিভাগে আছে, তাদের কার কী দায়িত্ব সবকিছু জেনে রাখতেন যাতে দরকারে অভিযোগ জানানো যায়, কিংবা ক্ষতিপূরণ আদায় করা যায় কেনবার সময় বই ক্ষতিগ্রস্থ হলে।

অশালীন জরাজীর্ণতার প্রতি মারাত্মক ভীতি ছিল ওঁর। “যেদিন ত্থুথুরে বুড়ি হয়ে যাব, সেদিন মরব”- একথা বলেছিলেন প্রিয় বান্ধবীকে। তিনি আবার বয়সে খানিকটা বড়ও বটে। কফির গন্ধ শুঁকে চিজকেকের ওপর কামড় বসাতে বসাতে বান্ধবীটি ওঁর দিকে একটু দুঃখ মেশানো দয়ার চোখে তাকিয়ে ছিল। কেকটা উনি আগেই খাবেন না বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কী না।

কাজ থেকে যখন ফিরতেন যাতে মোটা না হয়ে পড়েন সে কারণে লেটুস ও অন্যান্য শাক পাতা দিয়ে বিকেলে খাবার খেয়ে নিয়ে, ভালভাবে হজমের জন্য দই খেয়ে, এবং ত্বক পেলব ও চকচকে রাখার জন্য আট গ্লাস জল খেয়ে পোড়া চিনি রঙা মোটকা বেড়ালটাকে কোলে করে টিভি দেখতে বসতেন। সে বেড়াল পাশে শুয়ে শুয়ে ঘুমোত। বেড়ালটাকে তিনি একদম প্রাণের চেয়ে বেশি ভালবাসতেন। ও তাঁর মেয়ে, তাঁর আবেগ। ওঁর ভালবাসার কমা এবং দাঁড়ি। সে বিড়ালের গায়ের মূল্যবান ছাতা একমাত্র তিনিই আঁচড়ে ফেলে দিতেন, আর বিড়ালটা তা সহ্য করত। তাঁর ব্লন্ড ও আধা বাদামী আধা ছাই ছাই সে লোম। মহিলা হেঁচকি তুলতে তুলতে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে নিজের ভেজা চুলে চিরুনী বোলাতেন আর বিড়াল তা শুনতে শুনতে ফায়ার প্লেসের দিকে ভেজা কান খাড়া করে শুকোত।

বিড়ালের কাছে তিনি নিজের সব দুঃখ আর ভয়ের গল্প করতেন। যেসব দিনে উনি বিছানা থেকে নানবার সময় প্রথমে ডান পায়ের পাতা মেঝেয় রাখেন নি সেসব দিনে কী কী অঘটন ঘটেছিল তাঁর সঙ্গে, অফিসে বস কী খারাপ ব্যবহার করেছেন, বন্ধুরা কে কে মিথ্যা কথা বলেছে, বা ঝুড়িঝুড়ি মিথ্যে বলেছে, পুরনো ব্যর্থ প্রেম, বিশেষ করে তাঁর ভয়, তাঁর ভয়ংকর ভয়ের কথা … সে সবকিছু তিনি বিড়ালকে বলতেন। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর দানবীয় ভয় ছিল। শুধু তার কাছে মানে সে বিড়ালের কাছে তাঁর নিজের অতিরিক্ত মেদ থাকা নিয়ে লজ্জা প্রকাশ করতেন, কীভাবে কোমরের চারপাশে থলথলে মেদ গজিয়ে থাক বানাতে শুরু করছে, তাঁর খুব যত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা পায়ে ইতিউতি গজিয়ে ওঠা ফোসকা নিয়ে যত উৎকণ্ঠা সব বিড়ালের কাছে বলতেন। সপ্তাহান্ত এলেই মনের মধ্যে মেঘের মত যে বিষাদ ঘনিয়ে আসত সে সব কথা শুধু ওর কাছে বলতেন তিনি।

ওইজন্যই তিনি সহ্য করতে পারেন নি। যেদিন ওরা সবাই তাঁর বিড়ালটাকে মেরে ফেলল সেদিন তিনি আর সহ্য করতে পারেন নি। সেদিনটায় বরাবরের মতই তিনি অনেক সকালে তার চকচকে লোমে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে দুধ খেতে দিয়েছিলেন। তখন তিনি সহ্য করেছিলেন। মিষ্টি কাটা কফিতে চুমুক দিয়েও সয়ে গেছিলেন তিনি। বিড়ালও তখন তাঁর দু পায়ের ফাঁকে নাইলন রঙের মোজার মাঝখানে গুটিসুটি মেরে বসে পড়েছিল। বিড়ালের চালচিলনে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেছিলেন তিনি। সাধারণত যখন তিনি খেতে দিতেন বিড়ালটা কাছে আসত। রাজকীয় ভঙ্গীতে, তীক্ষ্ণ নজর দিয়ে চেয়ে ও গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে আসত। কিন্তু এখন দেখে মনে হচ্ছিল সে বুঝি ওঁর আরো কাছে আসতে চাইছে। তার বিশাল বড় চোখ দুটো যেন কিছু বলতে চাইছে। কোন অপ্রত্যাশিত কথা বলতে চাইছে। যা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে তিনি নিজেই ওঁকে পাশে এনে বসালেন। তারপর ডিপার্টমেন্টের দরজা ভালকরে বন্ধ করে, দুটো চাবি দিয়ে তালা দিয়ে কাজে চলে গেলেন। বিকেল তিনটে নাগাদ বুকে একটা চাপ অনুভব করলেন। তিনি মনে করলেন বুঝি হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। কিন্তু ব্যথাটা বা হাঁত বেয়ে নামছিল। অফিসের মারিয়া ওঁকে শান্ত করল। অনেক পরে সামান্য জল খেতে গেছিলেন। মনে হচ্ছিল বমি করে দেবেন। সোয়া চারটের সময় অফিসের ডাক্তার ভদ্রমহিলা স্ট্রেসের জন্য কয়েকটা ট্যাবলেট লিখে দিলেন। তারপর বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। মাঝপথে সেটা এগিয়ে এল। একটা কালো মেঘ, পাকস্থলির মুখটায় একটা ব্যথা, বুক, দুই স্তনে হাতুড়ি মারছিল যেন, সেই অবসরে সে আসছিল। মনে হচ্ছিল যেন মাইগ্রেনের পুরনো ব্যাথাটা ফিরে আসছে। দরজায় চাবি ঘোরানোর সময় কানে এল খুব ক্ষীণ গলায় বিড়ালটা মিউ মিউ করে ডাকছে। শুনে খুব আশ্চর্য লাগছিল ওঁর। তিনি ওকে নানা রকম আদরের গলায় খুশি মনে ডাকছিলেন যেমন অন্যান্য সময় করেন। খাটের নিচে খুঁজছিলেন। ফ্রিজের পিছনে, বইগুলোর মাঝখানে, শেষ মেস বারান্দায় গিয়েও দেখে এলেন। একটা ক্যাকটাস গাছের পাশে, ঠিক যে কোণে সূর্যের আলোটা পড়ে, দেখলেন বিড়ালটা লম্বা হয়ে পড়ে রয়েছে, সাড়াশব্দ নেই। নিথর। শুকনো ফুলের পাপড়ির মত ছিন্নবিচ্ছিন্ন। কাচের মত বিপুল স্বচ্ছ নীল চোখে খুলে শুয়ে রয়েছে। মুখে তখনও কালচে সবুজ বমি লেগে রয়েছে। জানতেন না কী করবেন। মনে হল পাগল হয়ে যাবেন। বিড়ালের চোখদুটো যেন ওঁকে অনুনয় করছে তখনও তাকে বাঁচিয়ে দেবার জন্য। দেখে মনে হচ্ছিল বুঝতে পারছে না ওরা, আজ কালকের মাঝখানে যে নরক খুলে গেল তা যেন তারা বুঝতে পারছে না।

পরদিন অফিসে গেলেন না তিনি। তারপরের দিনও নয়। তার পরেও না। যখন বান্ধবী মারিয়া ওঁকে দেখতে এল তখন এক সপ্তাহ হয়ে গেছে তিনি কাজে যান নি। টেলিফোনও তোলেন নি। মারিয়া এসে ওঁকে দেখতে পেলেন না। তার বদলে দেখা হল এক বৃদ্ধার সঙ্গে। খড়ি ওঠা ডগা ভাঙা চুলের এক বুড়ি। গর্তে বসা দুটো চোখ। কুঁচকানো,ঝুলে পড়া চামড়া। অনুচ্চ গলায় তাকে সে জানাল এক সপ্তাহ হল কারা যেন তার বিড়ালকে বিষ দিয়েছে সেটাই উনি নিশ্চিত করে জানতে চাইছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন