শামীম আজাদের গল্প : বিগম'স স্টোরি



বসে আছি আমার ঘরের কাছেই রোমান রোডের লাইব্রেরীতে। এর নাম আইডিয়া স্টোর লাইব্রেরী। লন্ডনে এ এক ধরনের লাইব্রেরীর চেইন স্টোর আছে, যেখানে আরো কিছু সামাজিক সেবাও দেয়া হয়। অনেকটা সোস্যাল ক্লাবের মত। ক্যাফে, বইক্লাব, বিল দেয়া, গাড়ির পার্কিং করার পারমিট সহ অনেক কিছু। তাই লাইব্রেরীতে এসে বই নাপড়তে চাইলেও অনেক কিছু করবার থাকে। ভিডিও দেখা যায়, কানে হেড ফোন লাগিয়ে বইপড়া শোনা যায়, সংবাদপত্র আর কফি নিয়ে যে কোন ক্যাফের মতই সময় কাটিয়ে কাজে বা ঘরে ফিরে যাওয়া যায়।

নিত্য আমি আমার ল্যাপটপ নিয়ে যাই, লিখি ,গল্প করি, ঘন সয়া দুধের গরম ল্যাটে পান করি, লেখার ফাঁকে ফাঁকে মানুষ দেখি। এই আমার বিলাসিতা। তবে ইদানিং রোজ যাচ্ছি। আর গিয়েই একরাশগ্রীক, রোমান বা ইজিপসিয়ান পুরাণ বা উপকথার বই আর এক ঢাউস কাপে কফি নিয়ে বসি। সিসেরো, সাইকী, জিউস, পাইথন, হেরোক্লিস কেউ বাদ যায়না। আসলে কি হয়েছে জানেন, আমি দু’সপ্তাহ পরেই এথেন্স যাচ্ছি। কারণ ওখানের এক নামী সাহিত্য সংস্থা ‘এ পোয়াটস এ্যাগোরা’ থেকে কবি হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়েছি। মানে আমি সেই হাউসের আবাসিক কবি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এমন এই বিরল সুযোগ ও সম্মান পেয়ে খুশিতে পাগল হয়েগেছিলাম আর এখন যাবার প্রস্ততুতি নিতে গিয়ে পড়ে পড়ে পাগল হয়ে যাচ্ছি।

গ্রীসে যাবার আগে যে কদিন লন্ডনে আছি তার প্রতিদিনই গ্রীক সাহিত্য পড়ে, ইউটিউবে দেখে, নোট লিখে এবং যারে কাছে পাই তাকেই গ্রীক, রোমান বা ইজিপসিয়ান পুরাণের গল্প আলোচনা করে মানুষের মাথা খারাপ করে ফেলছি। আমাকে যে তাদের প্রকাশনার জন্য গ্রীস ইন্সপায়ার্ড কবিতা লিখতে হবে! না পড়লে যে কোন লেখাই আসে না। তাই আমি যখন যা লিখি তখন সে ধরনের কিছু বৈ নিয়ে শয়নে স্বপনে নিদ্রা ও জাগরনে তাদের নিয়েই থাকি।এদের সঙ্গে নিয়ে এমন কি প্রক্ষালন কক্ষেও যাই। ইদানিংতো স্বপ্নেও দেখি এ্যাথেন্সের প্রাচীন ধংসাবশেষের মধ্যে বসে আছি। আর বাউলা বাতাসেরঘূর্ণিতে আমার স্কার্ট গোল হয়ে গেছে। নিচের ঐ গভীর নীল সমুদ্র থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে আমার হাতে উঠে আসছে শঙ্খ, শামুক, ঝিনুক। আমার আশে পাশে ফিসফাস করছে পৌরানিক পশু ও মানুষ।

আমি বসেছিলাম কম্পিউটার রুমের বাইরে। কিছু গোলাকার টেবিল এবং একই ধাতুতে তৈরি কাঠরঙা চেয়ার আছে। এখানেও কাজের জন্য বসা যায় তবে সকেট পয়েন্টে নিজের ল্যাপটপ লাগিয়ে নিতে হয়। ভেতরে বসলে চারপাশে ডেস্কটপ আর তাতে সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষের মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যায়না। কিন্তু বাইরে বসলে ক্যাফের লোক দেখা যায়। কফি নিয়ে অন্যের সঙ্গে টুকটাক কথা সারা যায়। আর না চাইলে কোলাহলের মধ্যেও নিজেকে একা করে পড়া বা লেখা যায়। ক্যাফে থেকে অর্ডার দিয়ে চা কফি নিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি সারি সারি ফুলে ফলে অবনত শাখা । নিশ্চয় রোমান শষ্য ও ফসলের দেবী ডীম্যাটার এখন বাগানে বাগানে তার পরশ বুলিয়ে যাচ্ছেন। এখনো তার অপরূপ সুন্দরী কন্যা পার্সেফনিকে কে পাতালের পাগল হরন করেনি। বসন্তের বাউরি বাতাসে ক্রিমরঙা ব্লসমের পাপড়ি উড়ছে। ঐ ফুল্গুলো না উড়লে আমি কাচের দেয়ালের এপার থেকে বাতাস যে বইছে তা বুঝতে পারতাম না। এমনি সুন্দর কোন সময়ে পার্সেফনি নার্সিসাসের গুচ্ছ দেখে ব্যাকুল হয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলেই পাতালরাজ হেইড তাকে হরন করেছিলো - অনেকটা রাবনের সীতা হরনের মত। হঠাৎ এমন সময় এক রাশ সোনালী গহনার ঝিলিক দেখি। দেখি আগুনের বোন্দার মত এক নারী । সীতা যেমন পথে পথে তার চিহ্ন ছুড়ে ছুড়ে গেছেন। তেমনি তার বস্ত্রখন্ড বা স্কার্ফ।

ভাবতে ভাবতে চোখ বন্ধ হয়ে গেলে আমি সেই নরম রোমের মত বস্ত্রখন্ডের পরশ পাই। আমার পিঠে পরশ বুলিয়ে যাওয়া সে কাপড়েপাউডার আর পারফিউমের ঘ্রাণ পাই। স্বপ্নকে আটকে রাখতে চোখের পাতা জুড়ে রাখতে রাখতেই বুঝি সে স্পর্শ যেন খসে যাচ্ছেআর কানে আসে মিষ্টি এক কিশোরী কন্ঠ- মলের মত ঝমঝমিয়ে হেসে চলে যাচ্ছে। আর এদেশের লিঙ্গুয়াফ্রাঙ্কা যে ইংরাজী তাতেই বলে যাচ্ছে মিথের কাহিনী। আমি চোখ বন্ধ রেখে তার তার অনুবাদ শুনি, এক হাজার একশটা পাইথন আর তেত্রিশটি শিংওলা কুকুর কালো আসমান থেকে আসবে, জিব্রাইল লাল ডানা দিয়ে তোদের আটকে ধরবে আর তার পর পাইথন আর কুকুরের কামড়ে কামড়ে আমার একশ মিলিয়ন পাউন্ডের ফর্জারির শোধ তুলে নেবে।

কি সাংঘাতিক কথা! একি স্বপ্ন না বাস্তবতা! চোখ খুলে দেখি এক হালকা সোনালী শিফনের উড়না মাটিতে লুটিয়ে আছে আর তার সামনে হেঁটে যাচ্ছেন কাঁচা পাকা চুল এলানো এক নারী। তিনি বোধ করি কাউকে তার মোবাইল ফোনে এসব কথাগুলো বলছিলেন। কিন্তু ভয়ঙ্ক্রর এসব কথা বলছেন ঝম ঝম করে হেসে হেসে। হাঁটছেন আর কথা বলেই যাচ্ছেন বিরামহীন।

আমি কি লিখতে লিখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? আর স্বপ্ন দেখছিলাম? মাথা ঝাঁকি দিয়ে তাড়াতাড়ি কফিতে চুমুক দিয়ে ঘোর কাটাই। দেখি নাহ্‌ সত্যই। ঐ যে চলে যাচ্ছেন তিনি। হাঁসের মত ভেসে ভেসে । এক রূপালী রমনী। তার পেছনে পেছনে কাউন্সিলের স্বেচ্ছাসেবী এক মধ্যবয়সী পুরুষ। তার হাতে জিনিষ বোঝাই পুরানো প্লাস্টিক ব্যাগ। সে মধ্যবয়সী পাতলা পুরুষের চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, গায়ের কাউন্সিলের হ্যালোজেন রঙা প্লাস্টিক ওয়েস্টকোট। ঐ রঙের কোট না দেখলে সব আমারই বিভ্রম মনে হত। 

আমি তার ফ্লোরে পড়ে যাওয়া সোনালী শিফন হাতে তুলে বুঝি চকচকে হলেও তা অনেক দীর্ণ। কিন্তু তা থেকেও আসছে পাউডার কিংবা পারফিউমের সুবাস। এক্সকিউজ মি এক্সকিউজ মি বলে দৌড়ে গিয়ে তাদের থামিয়ে দিয়ে উড়নাটা তুলে দিতে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে দেখি নকল সোনায় ভরা তার গা। পাথর বসানোসোনালী চুড়ি ঠাসা দু’টো হাতের একটিতে রুপালী কভারের এক মোবাইল। হাত কাঁপছে তির তির। কিন্তু তার কানে কোন ইয়ার ফোন নেই। তাহলে একা একাই কথা বলছিলেন। আমি দাঁড়িয়ে থাকতেই সেই মোবাইলে একটি ঝাকানাকা মিউজিক বেজে উঠলো। আর সে বয়ষ্ক রূপসী এক অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় তক্ষুনি তা কাঁপা কাঁপা হাতটি দিয়ে কানের কাছাকাছি নিয়ে অন্য হাতের তর্জনী তুলে গ্রাম বাংলার খাঁটি সিলেটিতে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলতে থাকেন, হুনরে শয়তানোর সাগরেদ। তুই মাইনষর বাইচ্চা নায়। নাইলে আমি তোর চাচি নানি? বার্কলেস ব্যাঙ্ক তনে আমার আংগুল লাগাইয়া আমার যত টেকা মারসস সব ফিরত দিলেনে। খবিসর গরর খবিস! কিতা মন করসস আমারে ? হুম অফিসো খবর দিছি। তুমরার সবটিরে স্পেশল পুলিশ দিয়া দরাইয়া আমি জেলো ডুকাইয়ার। ইউ আর ফেব্রিকেটর, চিট!

বলেই, অপর পক্ষ কিছু বল্ল বা বল্ল না তার অপেক্ষা না করেই ফোনটা তার ফিরোজা রঙা লং স্কার্টের ওপরের ডটেড কার্ডিগানেরপকেটে ঢুকিয়ে দৃঢ় ভঙ্গীতে তার সঙ্গীকে নির্দেশ দেন, স্টিভ,অল ফিক্সড নাও! লেটস্‌ গো টু দ্যা টাউন হল। কিন্তু উলটো ইউটার্ণ করে লাইব্রেরীর ফয়ারের পেছন দিকে হাঁটতে থাকলেন। আমি কিছূটা বিমূঢ়, কিছুটা শংকিত হয়ে ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করি।চিল্ড্রেন সেকশনের সামনে যেখানে ছোটখাটো মিটিং করার জন্য কয়েক সেট কালো চামড়ার সোফা রাখা আছে, বুঝলাম সেখানেই তার গন্তব্য। সাথের স্টিভ ভদ্রলোক তখন মৃদু স্বরে বললেন, ইট ইজ বেটার ইউ স্টে হিয়ার ফর দা টাইম বিং। আই শ্যাল চেক আপন ইউ লেটার। অর শ্যাল আই টেইক ইউ টু দ্যা হসপিটাল? নো, নেভার! বলে এমন গরম চোখে তিনি তাকালেন স্টিভের দিকে যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম।

স্টিভ কিন্তু মিষ্টি হেসে ওকে ওকে... বলে তার অনুগামী হলেন। কিন্তু এই যে আমি তার লুটন্ত স্কার্ফ তুলে দিলাম তিনি কি আমাকে একদমই দেখতে পেলেন না? তা কি করে হয়। আশ্চর্যতো! একথা ভাবতে ভাবতে টেবিলে ফিরে বসার সময় দেখি তিনজনককেশিয়ান ত্রুন রিসেপশন ডেস্কে তাদের বই বা সিডি ফেরত দিয়ে উচ্ছসিত পায়ে ফয়ার দিয়ে তাদের পার হয়ে যাচ্ছে। যেই না তাদের চোখে মহিলার চোখ পড়েছে অমনি তিনি তর্জনী তুলে রাগত ও উচ্চকিত স্বরে বলেন, খাড়াও তুমরা সবটিরে পুলিশ দিয়া দরাইরাম। একবার জেলো হামাইলে বাফর নাম বুলাই দিবো। যে হিদলর হুটকী দিয়া মজা করি বাত মাকি মাকি খাস জেলো তার কুন্তা পাইতে নায় – হূ...! বলে একটা বিচিত্র ধ্বনি দিলেন। আশে পাশের ক’জন ফিরে তাকালো। বাংলাদেশ হলে এতক্ষনে মানুষ ঘিরে ধরতো। বলা যায় না হয়তো ছেলেদেরকে পিটাপিটিও শুরু করে দিত।

এবার আমি বেশ আতংকিত হয়ে পড়ি। মুসলিম টেরোরিস্টদের কারনে বিলেতে এখন এক বর্নের মানুষের প্রতি আরেক বর্নের মানুষের অসহিষ্ণুতা যা বেড়েছে না! ভাগ্যিস ছেলেগুলোতো সিলেটি বুঝেনি। কিন্তু ওরা বিস্মিত ও তীর্যক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে চাইতেই বোঝা বহনকারি স্টিভ, মহিলার দৃষ্টি এড়িয়ে ফের মাইমেই মহিলার মাথায় গোলযোগ আছে সেরকম ঈঙ্গিতকরতেই তারা চলে গেল। ভাগ্য ভালো। আমি শ্বাস ফেললাম। কিন্তু আমি আর তো লিখতে পারি না। এখন আমার সব কৌতুহলসেই অসাধরণ রূপবতী অন্ত্যবয়সিনীর দিকে। 

একটু শীত শীত করছে। কোট গায়ে দিয়ে ধিরে ধিরে আমি ল্যাপটপগুছালাম। কফির দাম দিলাম। ক্যাফের ভেতর থেকে সদ্য ভাজা কড ফিস আর আলুর সুঘ্রাণ আসছে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এমনিতেও এখন বেরুলে ভিজে যাবো। ছাতা নেই। আমার মেঘবরন সামার জ্যাকেটে কোন হুডও নেই। হাতে শুধু সিসেরোর বইখানা নিয়ে তার কাছাকাছি একটি সোফাতে বসার পাঁয়তারা করতে করতে দেখি তিনি ব্যাগ থেকে তার বাঘমার্কা কোটটা সুন্দর করে ভাঁজ করে নামিয়ে রাখলেন। তারপর নিজের মুখ ঘিরে যে রূপালী চুলচূর্ণ চমকাচ্ছিলো তাতে একটা চাপড় দিলেন। শয়তান! তারপর সেগুলো ও পেছনের গোছা ধরে সবেগে যেন ধানের গোছা কাটবেন এমনভাবে ধরে দুহাতে টেনে ঝকমকে হেয়ার ক্লিপটি খুলে নিয়ে আবার আটকালেন। তারপর খামচি মেরে জামার ঝুল টান মেরে তুলে আনলেন কোমরের কাছে। তারপর পেছনের ফিতা দিয়ে আচ্ছা করে বেঁধে জামাটাকে প্রায় মিনি স্কার্টের মত করে নিয়ে পা ছড়িয়ে জুত করে বসলেন। এবার তাকে দেখাচ্ছে এক স্বাস্থ্যবতী কিশোরীর মত। পোটলা পাটলি তার সামনেই। স্টিভ তাকে বসিয়ে রেখে চলে যাবার আগে আমার পিঠে টোকা দিলেন। আমি প্রশ্নবোধক ভাবে তাকাতেই বলেন, শি ইজএ্যাবসলিউটলি হার্মলেস!

সঙ্গে সঙ্গে আমি উঠে দাঁড়ালাম আর মিঃ স্টিভ ম্যারি নিজেকে একজন ভলেন্টারি কাউন্সিল সেফটি ওয়ার্কার হিসেবে পরিচয় দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমিও। প্রৌঢ় স্টিভের খসখসে কঠিন হাত। চেহারাও বেশ জীর্ণ। সামনের দাঁতদুটো টুইডি পাই’র মত। মুখের গড়ন অনেকটা হ্যাপি একটা মিকি মাউসের মত! মায়াবি এককন্ঠস্বরে তিনি বল্লেন, বিগম হ্যাজ গন লিটল ক্রেজি নাউ। বাট শি ইজ নট ম্যাড। লোকটার চোখে তার চশমা ছাপিয়ে বেগমের জন্য মায়া ও বেদনা দেখতে পেলাম। 

বুঝলাম বিগম মানে বেগম। হয়তো বা মহিলার নাম সামসুন্নাহার বেগম বা বেগম নাজমুন্নাহার। এরকম কিছু একটা হবে। ইংরেজরা তাই বিগম ডাকে। স্টিভ হয়তো তাকে দীর্ঘদিন থেকে দেখে আসছেন তাই এই বন্ধুতা। আচ্ছা কত বয়স হবে এ মিহিলার? এখনো যদিও টকটকে গায়ের রঙ, মসৃণ ত্বক, গায়ে কড়া ফিরোজা রঙের কাফতান আর জরির জুতো পায়ে, তবু বুঝি তিনি আমার থেকে বেশ কয়েক বছর বড়ই হবেন। তবে সত্তর হয়নি। মুখমন্ডল এখনো মৃত জোছনার মত মিহি। কিন্তু হাসির সময় দেখেছি দাঁতগুলো ক্ষয়ে গেছে। সে হতে পারে যা তা খাওয়া দাওয়া এবং নিয়মিত দাঁতের যত্ন না নেয়ার কারণে। বেগমের হয়তো এক সময় অনেক কিছু ছিলো।

স্টিভের কাছ থেকে অতি উৎসাহ ছাড়া যতটুকু সংবাদ পেয়েছি তাহল, এখন রানীর ভাতায় চলেন। এই বাক্সটন স্ট্রিটেই কাউন্সিলের দেয়া এক ফ্ল্যাটে একা থাকেন। আশে পাশের মানুষরাই তার খোঁজ খবর নেয়। কদিন আগেও গাড়ি করে করে আত্মীয়রা আসতেন। এখন আসে শুধু কেয়ার ওয়ার্কার। স্বামী ছিলেন ভাল কোন রেস্তোঁরার শেফ। বেগম বলেন ডায়ানার কিচেনে নাকি তিনি কাজ করতেন। যদিও তা নিয়ে স্টিভের সন্দেহ আছে। রোমান রোডে এই প্রতি মঙ্গলবার স্ট্রিট মার্কেটে বাজার করে এখানে এসে বসে থাকেন। তখন কেউ না কেউ তার জিনিসপত্র বহন করে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দেয়। 

বই হাতে তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে আমি বন্ধুর মত হাসতে চেষ্টা করি। তিনি দেখেও দেখেন না। মুখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু দু’মিনিট পরই এক উজ্জ্বল হাসি দিয়ে জরির জুতো খুলে পা জোড়া সোফায় মেলে দেন। কাঁপা হাতে ব্যাগ থেকে কোকের ক্যান আর একটি জ্যাফা কেকের প্যাকেট ছিড়ে তার একটি মুখে দিয়ে উর্দুতে জিজ্ঞেস করেন, তু খায়ে গা? আমি মাথা নাড়ি। এবার জিজ্ঞেস করেন আমার কাছে কি মালিশ আছে কি? আমি কি তার পায়ে একটু ম্যাসাজ করে দেবো? বড্ড ব্যাথা করছে আজ। আমি উর্দু বুঝি না। আঁচ করতে পারি। আমি এবারও না বোধক ভাবে মাথা নাড়লাম। এসময় আবার ঝাকানাকা স্বরে তার মোবাইল বেজে উঠলো। আবার তিনি ফোনে কারো হ্যালো না শুনেই একই রকম হুমকি দিলেন। তবে এবার হিন্দিতে।

সেদিন ইচ্ছা থাকা স্বত্ত্বেও দেখতে পারলাম না বেগমের কি হল তারপর। দ্রুত বায়োস্কোপ দেখা বন্ধ করে মাইল্যান্ড হাসপাতালে ছুটতে হল। এ আমার হাঁটুর জন্য নিয়মিত ফিজিও ক্লাশ। শেষ করতে হবে এ্যাথেন্স যাবার আগেই। শুক্রবার শেষ দিন।

বাইরে বেরিয়েই দেখি বৃষ্টি থেমে গেছে। স্ল্যাবগুলো গা ধুয়ে শুয়ে আছে। টাউনহলের সামনের সেই রোমান আমলের নীলাভ পাথরের পিঠগুলো চকচক করছে । গড়ুড়ের মত আমার ডানা থাকলে আমি ওদের উপর পা ফেলতাম না। অর্জুনের মত রথ থাকলেও আমি ওদের বুকে চাকা রাখতাম না। আহা, বেগমের মনের উপরটা পা দিয়ে কে মাড়িয়ে গেছে কে জানে! কে তাকে কি করেছে রমন বিপন্ন? আজ যা বা যতটুকু দেখলাম তাতে আঁচ করি একদিন তিনি হয়তো বা এক সম্পন্ন নারী ছিলেন। গায়ে খাঁটি সোনার গহনা ছিলো। সত্তর দশকে হয়তো কোন প্রবাসীকে কে বিয়ে করে এদেশে এসেছিলেন। নাকি তার বাবা চল্লিশ দশকে জাহাজেরলস্কর হয়ে পাকিস্তান আমলে এসেছিলেন। তবে তিনি বিত্তবান ও এদেশে স্কুলে যাওয়া মেয়ে। যে তার ব্যত্যয় হবার নয়। বাড়িতে পাকিস্তানী বা এশিয়ান কাজের লোক ছিল মনে হয়। না হলে যেভাবে আমাকে দেখে তার পায়ে মালিশ দিতে আজ্ঞা করছিলেন। মনে মনে হেসে বলি তেমন মালিশ পেলে আমিও আমার হাঁটুতেএকটু লাগাতাম। হাঁটুতে প্লাস্টিক লাগাতে আমার ভয় হয়। তাই না মরিয়া হয়ে ফিজিও নিতে ছুটি।

ইতোমধ্যে গ্রীস আর রোমান পর্ব বাদ দিয়ে বাকি ক’দিন পা ও পোশাক ইত্যাদি নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে বেগমের কথা মনেই ছিল না। মনে হতেই, শুক্রবার শুধু বেগমের সঙ্গে দেখা হবে ভেবেই লাইব্রেরীতে গেলাম। সোনার বাটির মত টিউলিপে ভরে আছে সব দিক। ছোট ছোট ঘন্টা আকৃতির ব্লুবেল ও মাঝে মাঝেবসানো যেন কেকের উপরটা। বাতাসে সাদা ফুলের ঘ্রাণ। কফি ছাড়াই এবার সাইকীকে নিয়ে বসে হাসপাতাল ছোটার সময় হয়ে এলেও এদিক ওদিক তাকাই। কালো সোফায় এক সোমালিয়ান মা, মেয়ের মাথার হিজাব ঠিক করে বাঁধছে। একটু বাক্সটন স্ট্রিট হয়ে যাবো নাকি। কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব! ফ্ল্যাটের নম্বর জানি না। প্রতিবেশীরাও সন্দেহ করতে পারেন। সুতরাং হাঁটু হাতাতে হাতাতে ২৫ নম্বর বাস ধরলাম। আজ পড়ছি পার্সিফনির গল্প। সেই যে পাতালরাজ তাকে হরন করার সময় তার ফেলে যাওয়া পোশাকের টুকরো দেখে তার মা বুঝেছিলো মেয়েটি মাটির নিচে মৃত্যুপুরীতে আটকে আছে। এখন তার হাতে বেদানার দানা তুলে দিয়েছে হেইড। একটি দানা খেলেও তাকে পাতালে থাকতে হবে এক মাস। আমার মনটা খচ খচ করছে। না না তুমি কিছুতেই খেও না পার্সিফনি। অতটুকু পর্যন্ত বাস থেকে পড়ে কুইনম্যারি ইউনিভারসিটির এনেক্স বিল্ডিং স্টপেজে নামলাম। তারপর একটাশর্টকাট রাস্তা নিয়ে হাসপাতালের রিসেপসনে সেশনের হাজিরা দিয়ে দেখি হাতে আধ ঘন্টা হাতে আছে। রিসেপশনেই সুন্দর সুন্দর চেয়ার। সামনে এ্যাম্বুলেন্স পার্কিং এর জায়গা। রোগী নামছে কাঁধে, কখনো হুইল চেয়ারে। আমার কাছাকাছিই রেড জোন। আমি দ্রুত বই খুলে মার্কার দেয়া জায়গাটা খুলে ধরতেই শুনি পার্সিফনির চিৎকার। যাবোনা আমি যাবোনা, না...। মাই গড, এই কন্ঠতো আমার চেনা। 

এ্যাম্বুলেন্স থেকে প্যারামেডিকরা বেগমকে নামাতে চেষ্টা করছে। তিনি কিছুতেই হাসপাতালে প্রবেশ করবেন না। সব চিৎকার ইংরাজিতেই চলছে। তারা যত তাকে বুঝাচ্ছে তিনি তত তাদের বলছেন এই হাসপাতালেই তার সর্বনাশ হয়ে গেছে। তার সব টাকা নিয়ে গেছে। আমি হতচকিত হয়ে উঠে দাঁড়াতেই তিনি আমাকে দেখে কেঁদে ফেলেন। মাইগো তুমি তারারে বুজাইয়া কও আমি বেহুশ অইয়া ইকানো আইলেই শয়তান ফুয়া আইছিল। অখন যুদি হিরবার... বেহুশ অই তে আমারে ডেড করি লাইবো...।

ততক্ষনে এ্যাম্বুলেন্সের পেছন থেকে নেমে এসেছে স্টিভ। আর তাকে দেখে বেগম পরম আস্থায় ফিক করে হেসে ইংরাজীতে বলেন, হেলোস্টিভ মাই, ফ্রেন্ড! ইউ নো দা ফ্যাক্ট। টেল দেম অল এ্যাবাউট ইটপ্লিজ!

বেগমের গল্প ওখানেই শেষ। তাকে ওয়ার্ডে দিয়ে যাবার সময় বল্ল, আজ রোমান রোডের পাউন্ড শপে অজ্ঞান হয়ে গেছিলেন। তাই তিনিই এ্যাম্বুলেন্স ডাকেন। কিন্তু হাসপাতাল ফোবিয়া আছে বেগমের। ধারনা এখানেই প্রথমবার অচেতন অবস্থায় এলে তখন কেউ না কেউ তার বুড়ো আংগুল ছুঁইয়ে মোবাইল থেকে তার সব পাস ওয়ার্ড নিয়ে তিনি হাসপাতালে থাকতেই তার ব্যাঙ্ক খালি করে ফেলেছে।

ঘটনা কি সত্য?

হু নউস! বিগম টোল্ড মি দ্যাট। দিস ইস হার স্টোরি।



লন্ডন

২৮.৪ ১৯

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ