আলী নূরের : তুচ্ছ দিনের গান-- পর্ব ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬



-তেইশ-

ফার্স্ট ইয়ারের পড়া শেষ না হতেই পূর্ব পাকিস্তানে ৯২-ক ধারা জারি করা হল।। চীফ মিনিস্টার ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক। দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাঁকে পদচ্যুত এবং তাঁর মন্ত্রিসভা বাতিল করে দিল পশ্চিম পকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। গভর্নরের শাসন চালু হল। বাতিল করা হলো প্রাদেশিক আইন পরিষদ। এই সময় ধর-পাকড় চলছে চারিদিকে। একদিন আমাদের কলেজ থেকে আলাউদ্দিন রোড়ের পশু হাসপাতালের পিছনের পথ দিয়ে ঢাকা কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে এসে দেখি পুলিশের তাড়া। এলোপাথারি গ্রেফতার হলো বেশ কিছু ছাত্র। আমি রক্ষা পেলাম। হোসেন, ওয়াজেদুল মন্টু গ্রেফতার হলো বিনা দোষে। রাজনীতির সঙ্গে ওদের কোন সংশ্রব ছিল না। ক’দিন পরে গার্জিয়ানদের মুচলেকায় ওরা বেরিয়ে এল। এই সব কারণে এবং আমার পড়াশোনায় অমনোযোগ এবং আর সব অনিয়মের জন্য আব্বা বড় ভাইকে বললেন আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে যাবার জন্য। আমি খুশি হলাম। আমিও চাচ্ছিলাম ওইসব সঙ্গ ছাড়তে

এবং নিজেকে বদলাতে।কিন্তু ঢাকা না ছেড়ে তা সম্ভব হচ্ছিল না।

বড় ভাই রেডিওর চাকরি ছেড়ে তাঁর সিনিয়র সাদেকুর রহমানের পদাঙ্কঅনুসরণ করে ইনকামট্যাক্স প্র্যাকটিসে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যেইসুপ্রতিষ্ঠিত হলেন।তাঁর খুব নাম-ডাক তখন কুমিল্লায়। বিশাল পসার কুমিল্লা, চাঁদপুর, নেয়াখালী,ব্রাহ্মনবাড়িয়া নিয়ে। মনোহরপুরে নতুন বাসা নিয়েছেন। সামনের খালি জায়গা জুড়ে একটি সুন্দর ঘর তুললেন। তাতে তিনটে কামরা। মাঝেরটা চেম্বার, একদিকে মক্কেলদের থাকার এবং অন্যদিকে আমার থাকার ঘর। আমার কামরাটা সুন্দর করে সাজানো হলো - একটা খাট, চেয়ার, টেবিল এবং আলনা দিয়ে; সব একটা করে। নিজস্ব আলাদা কামরা পেয়ে আমি ভীষণ খুশি হলাম। ভর্তি হলাম কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। এই কলেজের অনেক ঐতিহ্য। প্রিন্সিপাল ছিলেন আখতার হামিদ খান যিনি পরবর্তী সময়ে পল্লী উন্নয়নে তাঁর অবদানের জন্য সারা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেন। কুমিল্লা বার্ড তাঁরই সৃষ্টি। অন্যান্য শিক্ষক যাঁরা ছিলেন তাঁদের সুনাম ছিল সারা দেশে। ইংরেজি কবিতা পড়াতেন জোৎস্নাময় বোস। কী যে সুন্দর ছিলেন দেখতে, কী উজ্জল গায়ের রং! সোনালি ফ্রেমের চশমা, পরনে ধবধবে ধুতি আর পাঞ্জাবি। নিঁখুত উচ্চারণ, মোহনীয় গলার স্বর। মুদ্ধ হয়ে শুনতাম তাঁর পড়ানো। ইংরেজি গদ্য পড়াতেন অজিত নন্দী। মিশমিশে কালো গায়ের রং, পরনে ধুতি পাঞ্জাবি, পায়ে চকচকে পালিশ করা কালো পাম্প সু। ভারি ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর চলাফেরায়। ইংরেজি স্যাটায়ার জর্জ অরওয়েলের এনিম্যাল ফার্ম পড়াতেন প্রিন্সিপাল আখতার হামিদ খান। আর নাটক পড়াতেন নবীন অধ্যাপক ননী গোপাল রায়। বাংলা পড়াতেন অধ্যাপক সুধীর সেন। সুনন্দা কবীরের বাবা। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের কাছে পড়েছেন। একটি কথা প্রচলিত ছিল, কবিগুরু সুধীর সেনকে যে প্রশংসাপত্র দিয়েছিলেন তাতে তাঁর নিজের হাতে লেখা ছিল, 'আমার সুধীর বাংলা জানে।' বাংলার আরেকজন অধ্যাপক আলী আহমদের কথা মনে পড়ে। ‘কবর’ কবিতা পড়াতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে বলতেন, এটি পড়ানো যায় না, তোমরা পড়ে নিও।

এই সব দিকপালদের সন্নিধ্যে এসে নিজেকে উন্নত করার আকাঙ্খা জাগল। খুব পড়লাম ক’দিন ইংরেজী। উৎসাহ দেখে বড়ভাই নিজেও পড়ালেন তাঁর প্রিয় সব ইংরেজি উপন্যাস, Thomas Hardyর Mayor Of Casterbridge, Far From The Madding Crowd, Pearl S. Buck এর Good Earth, Pavilion Of Women ইত্যাদি। বড়ভাই সেকালে স্কটিশচার্চ কলেজের মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তাঁর উৎসাহে পড়লাম আরো পড়লাম Jane Austen, Charlotte Bronte, Barnard Shaw এবং Earnest Hemingway. বড় ভাই যা পড়তেন তাই আমাকে পাঠিয়ে দিতেন। তাঁর বেশ বড় রকমের একটি লাইব্রেরি ছিল।

এই সময়ে চুয়ান্নর শেষ কিংবা পঞ্চান্নর জানুয়ারিতে শুরু হয় ময়নামতির শালবন বিহারের খনন কাজ। মনে পড়ে প্রফেসর আহমদ হোসেন দানীর নেতৃত্বে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের কয়েকজন ছাত্র এই খনন কাজের তদারকি এবং ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার কাজে সর্বক্ষণনিয়োজিত ছিল।তখন কোটবাড়ির বার্ড কিংবা অন্যকোনো বাসস্থান ছিল না। ছেলেরা মেসে্র মতো করে থাকত। ভোর হতেই কাজে লাগতে হতো।এই কাজের কথা শুনে সেজভাই আর আমি উৎসাহী হলাম এই ঐতিহাসিক কাজটি কাছে থেকে দেখতে হবে। শহর থেকে মাইল পাঁচেক দূর। সেজভাইয়ের সাইকেলের পেছনে বসে যাওয়া শুরু হল শালবন বিহারে। সবার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্বও হয়ে গেল। এর পেছনে মাতৃভাণ্ডারের বিখ্যাত রসমালাইর ভুমিকাটাও নিতান্ত কম ছিল না। এই খনন কাজ শুরু হবার গল্পটা হল, লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের সমতল জমি চাষ করতে গেলে লাঙলের ফালের সঙ্গে অনেক সময় একরকম পাথরখণ্ডবেরিয়ে আসতো যা এদের আকারের চেয়ে অনেক ভারী হতো। এগুলো ছিল ফসিল। কৃষকরা এগুলো তাদের পাল্লার ওজনের বাটখারা হিসাবে ব্যবহার করত। অনেক পোড়ামাটির ইঁট উঠে আসতো সঙ্গে কিছু মূর্তিও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পাশের ক্যান্টনমেন্টের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা বানানোর সময় কনট্রাক্টররা এখান থেকে অনেক ইঁট তুলে নিয়ে কনস্ট্রাকশনের কাজে লাগায়। এখানে প্রতি টিলার নিচেই প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার অনেক নিদর্শন মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। আমরা যখন গেলাম তখন মূল শালবনবিহারের খনন চলছিল। এটি চৌকো আকারের একটি বিরাট ভবন। দেখতে অনেকটা সলিমুল্লাহ হলের মত। মোট কক্ষের সংখ্যা ১৫৫টি। এগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন অধ্যয়ন এবং ধর্মচর্চার জন্য। প্রতিটির দেয়ালে তিনটে করে কুলুঙ্গি। কোনটিতে মূর্তি, কোনটিতে প্রদীপ আর অন্যটিতে বইপত্র রাখার জন্য। এটিতে ঢুকতে বেরোতে উত্তরদিকে একটি মাত্র পথ এবং সুরক্ষিত দরজা ছিল।দেখা যায় সুরক্ষার বিষয়টি খুব প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। কারণ সবগুলো দেয়াল ঘিরে বাইরের যে দেয়াল তা প্রায় ১৫ ফুট প্রশস্ত। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ধারণা করা হয় তুর্কী বাহিনীর অতর্কিত হামলার কারণে যেখানে যা ছিল তাই ফেলে সবাইকে পালাতে হয় জীবন নিয়ে। কুলুঙ্গীতে রাখা প্রদীপ, মূর্তি, মেঝেতে রাখা তৈজসপত্র এমন কী অভুক্ত খাদ্যকণা এবং পাত্রে রক্ষিত শষ্যদানাও ফসিল হয়ে অমন ভাবেই আছে। দেখলে মনে হয় লোকজন কাছেই কোথাও আছে, এখুনি ফিরবে। ইতিহাস যে এমন জীবন্ত হতে পারে বুঝিনি আগে কোনো দিন। নেপলসে্র পম্পেইই দেখে ঠিক এমনটিই মনে হয়েছিল।

এই সময়ের আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে। মহেশ প্রাঙ্গনে বিরাট করে এক সাহিত্য সম্মেলন হয়। এতে ওপার বাঙলার অনেক বড় বড় সাহিত্যিকরা উপস্থিত ছিলেন; মনোজ বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এবং শান্তিনিকেতন থেকে আসা কয়েকজন। এক সন্ধ্যায় অধিবেশনের পৌরহিত্য করছিলেন অধ্যাপক সুধীর সেন; বিষয়, রবীন্দ্রনাথের গান। মঞ্চে তাঁর পাশে উপবিষ্ট তাঁর স্ত্রী সুধা সেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, নিবেদিতা স্কুলের হেড মিস্ট্রেস এবং সুকণ্ঠী কীর্তন গায়িকা। স্যার একটি করে গানের চরণ বলে সেটি রচনার প্রেক্ষাপট এবং সাংগীতিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলতেন, সুধা, একটু মুখটা গাও তো। সুধা সেন মুখটা করলেন, সঙ্গে এস্রাজ। এমন করে চলল অনেকক্ষণ। বিশাল মহেশ প্রাঙ্গনে পিনপতন নীরবতা। সেন দম্পতির সুযোগ্যা কন্যা সুনন্দা কবীরও একজন সুসাহিত্যিক। তিনি তাঁর মা’র কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’ গান নিয়ে যখন রবীন্দ্রনাথের বিরূপ সমালোচনা হচ্ছিল যে তিনি এই গানে রাজা পঞ্চম জর্জের প্রশস্তি গেয়েছেন তখন সুধা সেন রবীন্দ্রনাথের কাছে সরাসরি চিঠি লিখে ব্যাখ্যা চাইলে কবি তাঁকে লেখেন, গানটিতে ‘হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত দিনরাত্রি’ এই পদটি থাকার পরেও যারা অমন মনে করেন তাদের সঙ্গে তর্ক করা নিজের আত্মার অবমাননা। এটি ১৯৩৯ সনের কথা। গানটিকে ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাবে রবীন্দ্র বিদ্বেষীরা এমন কুৎসিত সমালোচনায় মেতে উঠেন। এরপর সুধা সেন সব অনুষ্ঠানে এই গান করেছেন।



।।তুচ্ছ দিনের গানের পালা।।

-চব্বিশ-

এই সময়ে বড় ভাইয়ের খালু-শ্বশুর কাজী লতিফুল বারী সাহেব সরকারিচাকুরি থেকে অবসর নিয়ে সপরিবারে এলেন কুমিল্লায়। ইচ্ছা বড় ভাইয়ের সঙ্গে ইনকামট্যাক্স প্র্যাকটিস করবেন। তাঁর তিন মেয়ে ডলি, লিলি আর একেবারে ছোট বাবলী। ভাড়া নিলেন আমাদের বাসার পরেরটা। এর আগে থেকেই বড়ভাইয়ের সঙ্গে ছিল বড় ভাইয়ের শ্যালিকা, খুকি। এখন এসে জুটলো ওর বয়সেরই আরেকজন, লিলি। মন্দ হলো না। ঢাকা ছেড়ে আসার ব্যাথাটা যেন কিছুটা প্রশমিত হল। তখন কলকাতা বেতার থেকে ভীষণ জনপ্রিয় গানের অনুষ্ঠান অনুরোধের আসর প্রচার হতো প্রতি রোববার দুপুরে। আমার এ পর্যন্তগান শোনা শুধু গ্রামোফোনে। ঢাকার বাসায় আমাদের রেডিও ছিল না।চামেলীবাগ এলাকায় তখনও ইলেকট্রিসিটি পৌঁছায়নি। অবশ্য অনেক বাসাতেই তখনও রেডিও পৌঁছায়নি, যেমন অনেক বাসাতেই গ্রামোফোনও ছিল না। রেডিও তখন কিছু সচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের অধিকারে। আমি পাশেই ডা. শামসুল হুদার বাসায় গিয়ে হাতে বানানো একরকম হেডফোন উঁচু খুঁটিতে লাগানো অ্যারিয়ালের সঙ্গে তার জুড়ে ঢাকা বেতার শুনতে পেতাম কখনো কখনো। কুমিল্লায় এসে রেডিয়োতে গান শুনতে পারাটা একটা সৌভাগ্যরূপে দেখা দিলো। বড়ভাই একসময় রেডিওর লোক ছিলেন। তাঁর তো রেডিও থাকবেই। নব ঘুরিয়ে সঠিক স্টেশন ধরাটা বেশ একটা কসরতের ব্যাপার ছিল। তখন এখনকার মত হাতে হাতে ট্রানজিস্টার সেট ছিল না। ট্রানজিস্টর প্রযুক্তিই ছিল না তখন। যাই হোক, স্টেশন ধরার এই কাজটির দায়িত্বে ছিল খুকী। ভেতরের কামরায় রেডিও ছেড়ে বাইরের দিকের জানালা খুলে রাখত। আমি আমার বাইরের ঘরের কামরা থেকেই শুনতাম। যেদিন খুকী রেডিও ছেড়ে অনেক গান শোনায় সেদিন লিলির মুখ ভার। আর যেদিন লিলিদের বাসায় গিয়ে গল্প করে আসি সেদিন খুকীর মুখ ভার। ষাটের দশক ছিল আধুনিক বাংলা গানের স্বর্ণযুগ। এক সঙ্গে এতজন জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পীর আবির্ভাব আর কখনো হয়নি। সুপ্রভা সরকার, সুপ্রীতি ঘোষ, উৎপলা সেন, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গায়ত্রী বসু, নির্মলা মিশ্র, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, তরুন বন্দোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শৈলেন মুখোপাধ্যয়, পান্নালাল ভট্টাচার্য, অমল মুখোপাধ্যায়, অখিল বন্ধু ঘোষ, অপরেশ লাহিড়ী ।এমন সব। সকলেই ছিলেন গুণী, নিজ মহিমায় উজ্জ্বল। কয়েকটি গান এখনো কানে বাজে। তরুণবন্দোপাধ্যায়োর, ' ওরে মাঝি তরী হেথা বাঁধবেনা কো আজকে সাঁঝে' মৃণাল চক্রবর্তীর 'ঠুং ঠাং চুড়ির তালে থৈ থৈ বন্যা নাচে রে,' অহল্যা কন্যার ঘুম ঘুম কি ভাঙবে না’। অমল মুখোপাধ্যাযের, 'চুপ চুপ লক্ষ্মিটি শুনবে যদি গল্পটি', অখিলবন্ধু ঘোষের 'তোমার ভুবনে ফুলের মেলা আমি কাঁদি সাহারায়'। অপরেশ লাহিড়ীর কিছু গান সেকালে খুব জনপ্রিয় ছিল যেমন, ' লাইন লাগাও, লাইন লাগাও' আরেকটা 'টক্কা টরে, টক্কা টরে, খবর এসেছে ঘর ভেঙ্গেছে দারুন ঝড়ে'। অপরেশ লাহিড়ি হলেন বোম্বের বিখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক বাপ্পা লাহিড়ির বাবা। একবার আমি ব্যাঙ্গালোর(ব্যাঙ্গালুরু) থেকে মাদ্রাজ (চেন্নাই) যাচ্ছিলাম। প্লেনে উঠার সময় বৃস্টি । মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, একদম ভিজে গেলাম। পেছনের জন আশ্চর্য হয়ে বললেন, 'বাঙালী? আমি অপরেশ লাহিড়ী।ভেতরে বসে গল্প হবে।' ওরা পুরো পরিবার যাচ্ছে, ওঁর স্ত্রী বাঁশরী লাহিড়ী, ছেলে বাপ্পি লাহিড়ী এবং ওর স্ত্রী। অপরেশ লাহিড়ী সিট পাল্টে আমার পাশের সিটে এসে বসেই বললেন, 'আমি বাপ্পির বাবা, নিজেও গান করতাম একসময়।' আমি বললাম, অপরেশদা' আমি আপনাকে চিনি। আপনার টক্কা টরে আর লাইন লাগাও গান শোনা একজন মুগ্ধ বাঙালী। এমন খুশী হলেন । স্ত্রীকে বললেন, 'বাঁশরী, বাংলাদেশের শ্রোতারা এখনও আমার গান মনে রেখেছে।' বলতে গিয়ে আবেগাপ্লূত হয়ে পড়লেন।

রেডিও থাকায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চন্দ্রগুপ্ত নাটকে চাণক্যের ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় শুনেছিলাম যা এখনও স্মৃতিতে অম্লান। এবং তাঁর জলদ কন্ঠে মহালয়ার ভোরে মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানে চণ্ডীপাঠ ছাড়া তো দুর্গাপূজার কথা ভাবাই যেত না তখন, এবং এখনও যায় না।

সেকালে রেডিও সিলোনেরও খুব দাপট ছিল। সকালে শুরু হত, চলত সারাদিন। বাণজ্যিক সম্প্রচার বলে শুধু গান বাজানো হতো, তার ফাঁকে বিজ্ঞাপন। হিন্দি গানের জগতের সব জনপ্রিয় শিল্পীদের গান থাকতো; যেমন মোহাম্মদ রফি,তালাত মাহমুদ, লতা মুঙ্গেশকর, গীতা দত্ত, নূরজাহান । হারানো দিনের গানের মধ্যে সায়গল, পঙ্কজ মল্লিক, জগমোহন (জগন্ময় মিত্র) হেমন্তকুমার সেরা।অনুষ্ঠানটি হতো সকাল ন’টার দিকে। মনে পড়ে শর্টওয়েভ ৪৯ মিটার ব্যান্ডে সব চেয়ে পরিষ্কার শোনা যেত। সেকালের হিন্দি সিনেমার সব জনপ্রিয় গান আমার শোনা হয়ে যায়, সিনেমা না দেখেই।

মনোহরপুরে পর পর তিনটে বাসা ছিল। প্রথমটা, বড়ভাইয়ের পরেরটা লিলিদের এবং শেষেরটায় থাকতেন একজন সিলেটি ভদ্রলোক। কদিন পরে ঐ বাসায় একটি ছেলে আসে। কাপড়ে-চোপড়ে পরিপাটি। গায়ের রং ফর্সা, চোখ নীল। পুরুষ মানুষদের নীল চোখে কেমন বোকাবোকা দেখায়। কিন্ত ও ছিল খুব সপ্রতিভ। ছোটখাট মাপের মানুষ। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে এসেছে বোধ হয়। একটু গাম্ভীর্য নিয়ে বললাম কী পড়? ও বললো বি,এ। আমি এবার কোথায় যাই! বন্ধু হয়ে গেলাম দুজনে। সেই থেকে দু’জনে ছিলাম হরিহর আত্মা। ও আর ফিরোজ ছিল আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু। দুজনেই বেঁচে নেই। ওদের না থাকা আমার বড় কস্টের।

বাঙলা সাহিত্যে নেসারের খুব আগ্রহ। মুখস্থ বলে যায় যাযাবরের দৃষ্টিপাত। নজরুল- জাহানারার বিয়ে এবং তখনকার বিভিন্ন অবাঞ্ছিত ঘটনা নিয়ে সেকালে মাহে-নও পত্রিকায় কবি আব্দুল কাদির যিনি মাহে-নওয়ের সম্পাদকও ছিলেন অনেক অজানা কথা লিখেছিলেন। নেসারের কাছে শুনলাম পরে কবি আজিজুল হাকিমের সঙ্গে বিয়ে হয় জাহানারার। জাহানারা নিজেও লিখতেন। জাহানারার অভিযোগভরা চিঠির জবাবে নজরুল বেদনাভরা অতি রোমান্টিক এক চিঠি লিখেছিলেন। তাতে চক্রবাক কাব্যগ্রন্থে তাঁর ‘হিংসাতুর’ কবিতাটি পড়ে দেখার কথা বলেন। সম্পূর্ণ কবিতাটি নেসারের মুখস্থ ছিল, শুনে শুনে আমারও প্রথম স্তবকটি মুখস্থ হয়ে যায় । নিচে বই থেকে শুদ্ধপাঠ উদ্ধৃত করলাম -

হিংসাই শুধু দেখেছ এ চোখে? দেখ নাই আর কিছু?
সম্মুখে শুধু রহিলে তাকায়ে, চেয়ে দেখিলে না পিছু!
সম্মুখ হতে আঘাত হানিয়া চলে গেল যে-পথিক
তার আঘাতেরই ব্যথা বুকে ধরে জাগ আজও অনিমিখ?
তুমি বুঝিলে না, হায়,
কত অভিমানে বুকের বন্ধু ব্যথা হেনে চলে যায়!

নজরুলের অভিমানী রোমান্টিক কবিতা গুলো যেমন, বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি ও মুখস্থ বলে যেত। ও খুব অনুভূতিপ্রবন ছিল। ওর সহপাঠী ছিল লাতু ভাই। লাতু ভাইয়েরও বাংলা সাহিত্যে প্রবল অনুরাগ। ততোধিক অনুরাগ জেবনবুবুর প্রতি। মিলে গেলাম তিন রোমান্টিক হৃদয় এক সূত্রে। বিকেলে বসি তিনজনে ধর্মসাগরের পাড়ে নয় রানীর দিঘীর পাড়ে। চলে আমাদের সাহিত্য আলোচনা। আমদের জ্ঞান ছিল সীমিত কিন্তু উৎসাহ ছিল অনেক। নতুন নতুন সাহিত্যরসের ধারায় আমরা নিত্য অবগাহন করছি তখন। এই ভাবে কেটে গেল দিনগুলো। পরীক্ষা এগিয়ে এলো। আমাকে নির্বাসিত হতে হলো বড়বুবুর বাড়িতে। মেয়েদের সঙ্গে মেলা-মেশা, আড্ডাবাজি থেকে সরানোটা উদ্দেশ্য। এখানে থেকে তাজু ভাই এর অভিভাবকত্বে আর বুবুর প্রশ্রয়ে আমরা তৈরি হচ্ছি পরীক্ষার জন্য । আমি আই.এ. এবং লাতু ভাই বি.এ.পরীক্ষার জন্য। লাতুভাই অবশ্য আগে থেকেই ছিল বুবুর বাসাায়।

মনোহরপুরের বাসায় ভাবীর অকৃত্রিম স্নেহে কাটিয়েছি প্রায় বছর কাল। আমি ছেলেবেলা থেকেই ভাবীর খুব প্রিয়। আমি যেমন ভাবীর সব শখের ফুটফরমাস খাটতাম তেমনি ভাবীও আমাকে সব রকম প্রশ্রয় দিতেন। যেমন, সিগারেট-সিনেমা কিংবা ভালো কাপড়-জুতা কেনার সব পয়সা আসতো ভাবীর হাত দিয়ে। আমরা বড়ভাইয়ের কাছে সরাসরি কিছু চাইতাম না। এইসময় ভাবীর ভাই দুলুও থাকত ভাবীর সঙ্গে। আমারই বয়সের। ইউসুফ স্কুলে এইটে কিংবা নাইনে পড়ত। ভাবীর পক্ষপাতিত্বের পাল্লাটা আমার দিকেই ভারী থাকত। আমাকে বুবুর বাসায় যেতে দেবেন না কোনোমতেই। দুলু খুব ভালো ক্যারম খেলতে পারত। ভালো মানে- স্ট্রাইক করা থেকে সব গুটি ফেলে দিতে পারত এক চান্সে। বড়ভাইয়ের ওর সঙ্গে ক্যারম খেলা খুব পছন্দের ছিল।

একটা মজার ঘটনা ঘটল একদিন। জজকোর্টের বারান্দায় রোজ শুতে আসতেন একজন দরবেশ। তিনি মৌনী ছিলেন । লোকমুখে শোনা যায় তিনি একসময় জজকোর্টের একজন কর্মচারী ছিলেন। কোন পুন্যাত্মার দর্শন পেয়ে আধ্যাতিক সাধণায় ডুবে যান। আর কোনো দিন কথা বলেননি। তিনি চটের একটা আচ্ছাদনে গা ঢেকে থাকতেন। পরনের বেশ বলতে ওটাই। লাতুভাইয়ের খুব পীর-দরবেশে ভক্তি। পরীক্ষার রেজাল্টের দিন যত ঘনিয়ে আসছে ততই ওর দুশ্চিন্তা। একটা অন্য কারণও ছিল। জেবনবুর সঙ্গে ওর তখন গভীর প্রেম। বি.এ. পাশ করতে না পারলে হয়তো ওর কাছে মেয়ে দেয়া হবেনা এই আশংকায় ও সদা শংকিত। এক সন্ধ্যায় আমাকে নিয়ে জজকোর্টের পিছনের এক অন্ধকার বারান্দায় হাজির। দরবেশ বাবা তখন বারান্দায় শোবার চেষ্টা করছেন। লাতুভাই আমাকে ইশারা করে চটের ভিতর দিয়ে দরবেশবাবার দুই পা জড়িয়ে ধরলে তিনি আৎকে উঠে পা ছাড়াতে চেষ্টা করতে লাগলেন। লাতুভাই নাছোরবান্দা। মুখে একই কথা, বল্ বাবা, আমি পাশ করব কিনা। দরবেশবাবাতো কথা বলেন না বহু বছর। লাতুভাইয়ের অত্যাচারে হঠাৎ বলে উঠলেন, পা ছাড়, সারা বছর পড়াশুনা না করে বাবার পা ধরলেই কী পাশ করা যায়। আমি হতাশ হলাম। লাতুভাই বাবার ক্রোধের ভিন্ন অর্থ করে বেশ স্বস্তি পেলেন। বলল বাবার গোস্বার কারণে তার ফাঁড়া কেটে গেছে। অবশ্য ও পাশও করল এবং যথারীতি পরের বছর জেবনবুর সঙ্গে বিয়েটাও হল।

পরীক্ষা শেষ হলো ভালোয় ভালোয়। এই সময়ে একটা ফটো ষ্টুডিও খোলার চিন্তা-ভাবনা করলেন বড়ভাই। সেজ ভাই অমি খুব উত্তেজিত। ডার্করুমের মোটামুটি কাজ জানতাম আমরা। কিন্তু ফটো এনলার্জারের অভাবে এনলার্জ করাটা পারতাম না। সেজ ভাই একটা কোডাক বক্স ক্যামেরার পিছনে নিগেটিভ লাগিয়ে তার পেছন থেকে আলো ফেলে লেন্সের শাটার খুলে ব্রোমাইড প্যাপারে নিয়ে ফেললেন ভাবীর ফটোর এক চমৎকার এনলার্জমেন্ট। সবাই চমৎকৃত। এই কাজটি করার আগে সেজ ভাই আমাকে বোঝালেন ক্যামোরার লেন্স দিয়ে সামনের দৃশ্য ছোট হয়ে পিছনের ফিল্মে প্রতিফলিত হয়। আমরা যদি বিপরীত দিক থেকে অর্থাৎ ক্যামেরার পিছন থেকে নেগেটিভে আলো ফেলে সামনের দিকে প্রতিফলিত করতে পারি তাহলে লেন্সের কারনে যত দুরে প্রতিফলন হবে তত বড় এনলার্জ হবে ঐ নেগেটিভের প্রতিফলন। তার এক্সপেরিমেন্টে তার এই যুক্তি প্রমানিত হল। এরপর থেকে তার অসাধারণ বুদ্ধি নিয়ে আর কারো কোন সন্দেহ রইলনা।

পরদিনই আমি আর সেজভাই রওয়ানা হলাম চট্টগ্রাম। ষ্টুডিত্তর যাবতীয় যন্ত্রপাতি এবং ইত্যাদি কেনার জন্য। ষ্টেশন রোডোর জায়েদীস্ ফটোগ্রাফার থেকে কেনা হল দামী রলীফ্ল্যাকেস ক্যামেরা, জাপানী হানসা এনলার্জার, ডার্ক রুমের জন্য ইলফোর্ড সেফ লাইট, ছবি তোলার জন্য লাইট স্ট্যানড্ ইত্যাদি। ডার্করুমের জন্য অনেক কেমিক্যালস্। শুরু হলো ষ্টুডিও শামিমের যাত্রা। রাতদিন কাজ করি দুই ভাই। সেজভাই ফটো তোলেন তো আমি ডার্করুমে, সেজভাই ডার্করুমে তো আমি ক্যামেরায়। চলল কিছুদিন এক নেশার ঘোরে। স্থির হলো আমার পরীক্ষার রেজাল্টের পর আমাকে পাঠানো হবে করাচীতে সিনেমাটোগ্রাফি শেখার জন্য। আমার উত্তেজনার শেষ নেই। তখন করাচী যাওয়া আর বিলেত যাওয়া একই কথা। সেরা সিনেমাটোগ্রাফার হওয়াটাই জীবনের পরম আকাংঙ্খা হয়ে দাঁড়াল।



পঁচিশ 

সরাসরি ফ্লাইট, কোথাও বিরতি নেই। ১৯৫৬ -র জুনের এক সকালে কুর্মিটোলা এয়ারপোর্ট থেকে মেজ ভাই তুলে দিলেন বিমানে। দুপুর নাগাদ পৌঁছলাম করাচী । করাচী একেবারে বিদেশ মনে হল। গরম কাল; বাতাস কেমন গরম আর শুকনো। কোথাও গাছ পালা চোখে পড়ে না। বাঙলার শ্যামলিমার কিছুমাত্র নেই কোথাও। কিছু চিনি না, কাউকে জানি না। প্রথম ঘর ছেড়ে বাইরে। প্লেন থেকে নেমে কিছুটা হতভম্বের মত। একজন ভদ্রলোক নিজেকে বাঙালি পরিচয় দিয়ে বললেন, এয়ারফোর্সে চাকুরি করেন। আমাকে নিয়ে গেলেন তার সঙ্গে ড্রিগ রোড়ে এয়ারফোর্স মেসে। লাঞ্চ খাইয়ে তিনি আমাকে বান্দার রোডের একটা বাসে্ তুলে দিয়ে কোথায় নামতে হবে বুঝিয়ে দিলেন। পুরানো নুমায়েশের মোড়ে নেমে রিকসা নিলাম। যাব ১১ নং বান্দার রোড একস্টেনশন, মোরশেদের আব্বা মফিজউদ্দিন সাহেবের বাসায়। আব্বার বাল্যবন্ধু। তিনি তখন প্ল্যানিং কমিশনের মেম্বার। বিরাট পজিশন, ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদা।

এলাকাটা পার্সী কলোনি নামে পরিচিত। মুলত পার্সীদেরই বাস। আর থাকতেন সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের বড় বড় আমলারা। খোঁজ করতে দু’একটা বাসায় জিজ্ঞেস করতে গিয়ে দেখি সব স্কার্ট পরা মেয়ে। বড় ছোট সবাই। কেউ কেউ পিয়ানোর সামনে। ইংরেজি সুর বাজাচ্ছে। বাড়িঘর ভারি সুন্দর, খুব মার্জিত পরিবেশ। পার্সীরা ধনী সম্প্রদায়। এরা অতি ভদ্র, নম্র। একটি মেয়ে পরিস্কার ইংরেজিতে পথ বলে দিয়ে ১১ নং বাড়িটা চিনিয়ে দিল। পৌঁছে গেলাম মোরশেদদের বাড়ি। মেরশেদের মা বাবা অনেক আদরে আমাকে গ্রহন করলেন। একপাশের একটা ছোট বেডরুম যেখানে মোরশেদের বড় ভাই জামাল থাকত সেটি ছেড়ে দেয়া হলো আমার জন্য। একটা পড়ার টেবিল এবং সংলগ্ন বাথরুম। বিকাল হতেই তুমুল বৃষ্টি। বিশাল বান্দার রোড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে। গত কয়েক বছর নাকি কোন বৃষ্টি হয়নি। পরদিন জামাল আমাকে নিয়ে বের হয়ে চিনিয়ে দিল করাচীর ব্যস্ততম সদর রোড এলাকা। বিরাট শহর। ব্রিটিশ আমলের অন্যতম সেরা মেট্রোপলিটান শহর। বানিজ্যিক দিক থেকে বম্বে-মাদ্রাজের সমতুল্য ।

ভর্তি হলাম সিন্ধ্ মুসলিম কলেজে। বিখ্যাত এস.এম.কলেজ। জিন্নাহ সাহেব একই গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সিন্ধ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। নামেই মাদ্রাসা, আসলে একটি নামী ইন্টারমেডিয়েট আবাসিক কলেজ। পড়াশোনা সব ইংরেজি মাধ্যমে। বাইরে গেটের উপর বড় করে লেখা ছিল, ‘Enter to Learn, Go Forth to Serve’। তখনকার নামজাদা ক্রিকেটারদের অনেকে এখানকার সৃস্টি। বিখ্যাত টেস্ট ক্রিকেটার হানিফ মোহাম্মদ এখানকার ছাত্র ছিলেন। এস.এম.কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন গোলাম মোস্তফা। পরবর্তীতে সিন্ধ্ সরকারের শিক্ষাসচিব হয়েছিলেন। ভারি সুন্দর ছিলেন দেখতে। ভাইস প্রিন্সিপাল ছিলেন কোহাটি। ঘোর কালো রং ভীষণ মোটা, বিরাট ভুড়ি। তিনি সেকালের একজন প্রখ্যাত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। বোম্বের বিখ্যাত কন্ঠশিল্পী সি.এইচ. আত্মা ছিলেন তাঁর ছাত্র।এস.এম.কলেজ ছিল বার্নস্ রোড এলাকায়। পাশেই এস.এম.ল’ কলেজ এবং ডি.জে. সায়েন্স ও এন.ই.ডি.ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এই সব কলেজের ছাত্রদের হোষ্টেল ছিল জিন্নাহ কোর্টস-কাচারী রোডের উপর। সামনে পোলো-গ্রাউন্ড, তারপরই প্রেসিডেন্ট হাউস।

আমি জিন্নাহ কোর্টসে্ সিট পেলাম। আমার প্রথম হোস্টেল জীবন। আমার লোকাল গার্জিয়ান গোলাম মোস্তফা সাহেব, মোরশেদের মেজ ভাই। তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। সেবার সিএসপি হয়ে করাচীতেই প্রবেশনার হিসাবে ছিলেন। বেশ কিছু বাঙালি ছাত্র তখন জিন্নাহ কোর্টসে থাকত। জিন্নাহ কোর্টসের মেইন বিল্ডিংটা পাথরের তৈরী এক বিশাল ভবন। আর এদিকটায় একটা লম্বা শেডের মত। সামনে এক চিলতে মাঠ। এর মাঝখানটায় গোলাকার সাজানো সব বাথরুম। কিছু দূরে সব মেস। এই হোস্টেলে পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধী, বেলুচী, থাকত। আর থাকতো দেশ বিভাগের পরভারত থেকে আগত পরিবারের কিছু ছেলেরা। এদের মোহাজের বলতো পাকিস্তানীরা এবং খুব ভালো নজরে দেখত না। এই শেডের ৩-বি নং রুমে আমার স্থান হল। এইরুমে তখন বাঙালি ছাত্র বলতে ছিল আফতাব, আতিক ও সুলতান। এক সন্ধ্যায় গিয়ে পৌঁছলাম হোস্টেলের এই রুমে। তখন ছুটির কাল, হোস্টেল প্রায় খালি। কয়েকজন পাঠান ছেলে বারান্দায় চারপাইয়ে বসে হুক্কা টানছিল। জিজ্ঞেস করতে দেখিয়ে দিল পাশেই ৩-বি । তিনজন বাঙালি ছাত্রই রুমে ছিল। তাদের দলে একজন নতুন বাঙালি পেয়ে ভারি উৎফুল্ল তারা। পরিচয় হলো আফতাব, আতিক, সুলতানের সঙ্গে। আফতাব আমাকে অভয় দিয়ে বলল, চিন্তা করবেন না। উর্দূটা নিয়ে প্রথম কষ্ট হবে, আমি সাহায্য করবো। পরে টের পেলাম ওর উর্দু একেবারেই যা-তা। আমি ঢাকা থাকতেই ভালো উর্দূ বলতে পারতাম। ও আমার উর্দূ শুনে আর রা কাড়ে না।

ছুটির শেষে বাকি সব ছেলেদের আসা শুরু হল। এদের মধ্যে লাহোরের সুলতান মাহমুদ খান ছিল ভারি মজার। ও তখনকার দিনে পাকিস্তানের নামকরা পর্বতারোহী ছিল। কারাকোরাম পর্বত আরোহণ করে খুব নাম করেছিল। আর ছিল ভারতের হায়দ্রাবাদের ওয়ালী সাহেব, সিন্ধের নওয়াবশাহর আবদুল হক। ক’দিন পরে এসে জুটল গাফফার। হায়দ্রাবাদ ভারতের দখলে চলে যাবার পর ওর পরিবার পাকিস্তানে চলে আসে। জমে গেলাম আমরা সবাই। চুটিয়ে আড্ডা মারি বাাঙালি-অবাাঙালি সবাই। একজন ছেলের কথা বাঙালি ছেলেরা প্রায়ই বলতো। ওর নাম সাইদউল্লাহ। বলতো ও থাকলে খুব মজা হত, আপনার মতই কথা বলে আড্ডা মেরে জমিয়ে রাখত। আমি আমার এই প্রতিদ্বন্দ্বীর পথ চেয়েছিলাম, ফেরা মাত্র একটা মোকাবেলার জন্য। আড্ডাবাজিতে আমি চক্রবর্তী, আমাকে মোকাবেলা করার ক্ষমতা কে ধরে এই রকম একটা ভাব। একদিন দেশ থেকে ফিরলেন সেই কাঙ্খিত পুরুষ সাঈদউল্লাহ। ডাক নাম ফিরোজ। ঢাকার আরমানিটোলার ছেলে।ভারি চটপটে, দেখতেও খবু সুন্দর। প্রথম দেখাতেই আমার খুব ভাল লাগল ওকে। ক’দিনের মধ্যেই গভীর বন্ধুত্ব। ও প্রথম উঠেছিল ওর বাবার বন্ধু এস.এ. হায়াত এর বাসায়। সাঈদউল্লাহর বাবা আসাদউল্লাহ সাহেব ছিলেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, গণপরিষদের মেম্বার। ও রোজ আমাকে হোষ্টেল থেকে নিয়ে যায় জ্যাকব লাইনসের বাসায়। বাসাটা ছিল খালি, মালিক ঢাকায়। ও তখনও হোস্টেলে সিট পায়নি।কিন্তু আমার তর সইছিলনা। ফিরোজকে আনতেই হবে হোস্টেলেআমাদের কামরায়। সিট খালি ছিল না, আমি বললাম ডাবলিং করবো। তাই হলো। আমরা বেশ কিছুদিন ডাবলিং করলাম। ফিরোজ ভারি মজার, ভারি ফূর্তিবাজ ছেলে। বুদ্ধিমান, স্মার্ট। ও আজ নেই এই কথা মানতে কষ্ট হয়। যাবেই বা কোথায়! দুজনের কবর পাশাপাশি রক্ষিত। একটা ওর দখলে, পাশেরটা আমার অপেক্ষায়।

রোজ বিকেলে দল বেঁধে যাই সদরের দিকে। বোরী বাজার এলফিনষ্টোন স্ট্রিট, ভিক্টোরিয়া রোড হয়ে হোস্টেলে ফিরি সন্ধ্যা পার করে। হোস্টেলেরনিজস্ব কোনো খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। কয়েকটা গ্রুপ করে মেসিং এর ব্যবস্থা ছিল যেমন, পাঞ্জাবী মেস, পাঠান মেস, সিন্ধী মেস এবং বাঙালি মেস। বাঙালি মেস চালাতেন কিছু সিনিয়র ছাত্র। আমরা কিছুদিন বাঙালি মেসে থাকলেও আমাদের অবাঙালি বন্ধুর সংখ্যা বেশি থাকার কারণে এবং অনুরোধে ফিরোজ, আতিক, সুলতান আর আমি পাঞ্জাবী মেসে চলে এলাম। অবশ্য অন্যান্য বাঙালি ছাত্ররা ভালো চেখে দেখলোনা আমাদের। মেস থেকে রাতের খাওয়া সেরেই বসে যেতাম পড়তে নয়, আড্ডা মারতে। ক’দিনের মধ্যেই আড্ডাবাজীতে আমার প্রতিভার পরিচয় পেয়ে যায় সবাই। আড্ডা দিয়ে অনেক রাত করে ফেলতাম। রাত-জাগা আমার পুরনো অভ্যাস- সেজভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া। অন্য ছেলেরা সবাই চাকুরি করত। সকালে দেরি হয়ে যেত ওদের ঘুম থেকে উঠতে, অফিস যেতে আরও কিছু।ওরা খুব বিচলিত হল। কিন্তু আড্ডার নেশার গুলি ওদের গেলা হয়ে গেছে ততদিনে। ছাড়তেও পারছেনা কেউ। এমনি করে ফার্ষ্ট ইয়ারের পরীক্ষা এগিয়ে এল। সবাই চোখে সর্ষে ফুল দেখল। পরীক্ষায় সেবার ফিরোজ আর আমি ছাড়া আর কেউ পাশ করেনি। ওরা নালিশ জানালো হোস্টেল সুপার কোহাটির কাছে। সব অভিযোগের আঙুল আমার দিকে। কোহাটি স্যার না-খোশ হলেন আমার উপর। বললেন, কী করা যায় তোমাকে নিয়ে? আমি চাইছিলাম আমি যেন মেইন বিল্ডিং এর একটা ডাবল সিটের কামরায় আসতে পারি। খালিও ছিল একটা, রুম ৫২-এম। ভেজা গলায় বললাম, আমাকে সরিয়ে দেন স্যার, ওরা ভাল থাকুক । কোথায় দেয়া যায়, কোথায় দেয়া যায? দেখা গেল ৫২-এম খালি। অতএব আমার স্থান হল মেইন বিল্ডিংএর ঈর্ষণীয় ৫২-এম নম্বরে। শিরে সংক্রান্তি ৩-বি'র বন্ধুদের । ওরা ভেবেছিল আমার একটা বিহিত হবে আর হল গিয়ে একেবারে উল্টোটা। এই রুমে আমার রুমমেট হলেন নূর খাঁ নামের এক পাঠান। ও চাকুরি করত সী-কাস্টমসে্। এস.এম.ল'কলেজে ভর্তি হয়ে অনেক বছর ধরে এই হোস্টেলে একটা সেরা রুমে আরামে আছে।

আমার নতুন কামরায় আসার পর ফিরোজ খুব মন খারাপ করত। বাকিরাও থাকতে পারলোনা আমাকে ছাড়া।সবাই আমার রুমের কাছে এসে দাঁড়াত মেস থেকে ফেরার পথে। আবার চলল আগের মত। বিকেলে সবাই যাই একসঙ্গে সদরের দিকে। কখনও রাতে ইংরেজী সিনেমা দেখতে যাই প্যালেস সিনেমা হলে। হোস্টেলের কাছেই হোটেল মেট্রোপোলের পেছনে। ফিরোজ ছিল সিনেমার পোকা। ওর সঙ্গে বেশ কিছু ভালো সিনেমা দেখলাম এই সময় - আভা গার্ডনারের Barefoot Contessa, ইনগ্রিড বার্গম্যানের For Whom The Bell Tolls, অড্রে হেপবার্নের The War And Peace, The Sun Also Rises, Love In The Afternoon., উইলিয়াম হোল্ডেনের Love is a Many Splendored Thing, Picnic, মারলোন ব্র্যান্ডোর A Street Car Named Desire, রবার্ট মিটামের River of No Retun, মরিন ও’হারার How Green Was My Valley, মন্টগোমারি ক্লিফ্ট, ফ্রান্ক সিনাট্রার অবিস্মরণীয় ছবি From Here to Eternity, ইউল ব্রাইনারের The King and I, ডেবোরাহ কেরের Tea and Sympathy, আলফ্রেড হিচককের Rear Window, এমন আরো কিছু। মজার কথা, পরীক্ষার আগে Julius Caesar মুক্তি পেল। এটি আমাদের পাঠ্য ছিল। ক’দিন পর পরীক্ষায় জুলিয়াস সিজার থেকে যা প্রশ্ন এলো তা বেশ ভালই লিখতে পারলাম।

আমাদের পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়াতেন সেলিম কোরেশী। এক কথায়, হ্যান্ডসাম অ্যান্ড স্মার্ট। ইংরেজি পড়াতেন মিসেস হাবিবা রিজভী। শাড়িপরতেন, প্রথম দেখায় আমি বাঙালি বলে ভেবেছিলাম। শ্যামলা গায়ের রং, চেহারা লাবণ্যে ভরা। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। আর ছিলেন মিস সাদা ইসাহাক, পাঞ্জাবী মহিলা। সালোয়ার কামিজ পড়তেন। খুব সিগারেট খেতেন। ক্লাসে ঢোকার আগ মুহূর্তে দরজার গোড়ায় সুখটান দিয়ে সিগারেটের শেষ অংশটা পা দিয়ে পিষে ক্লাসে ঢুকতেন। বাংলা পড়াতেন ফারুক স্যার, নোমান স্যারের ছোটভাই। পরবর্তীকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমাদের লিপির মামা শ্বশুর। নোমান স্যারের কাছে আমি স্কুলে থাকাকালে ইংরেজি পড়েছি। ফারুক স্যার অতি যত্ন নিয়ে আমাদের পড়াতেন সোনার তরী, দেনা-পাওনা গল্পগুচ্ছ। আমরা মাত্র দুজন ছাত্র - ফিরোজ আর আমি।

একদিন প্রিন্সিপাল আমাকে ডেকে পাঠালেন। তাঁর পরিকল্পনা, কলেজের লাইব্রেরিতে বাংলা সাহিত্যের বই সংগ্রহ করা। বাংলা সোসাইটি সৃষ্টিহলো। আমি সম্পাদক, সহ-সম্পাদক চৌধুরী বদরুদ্দিন, আই.এ. ক্লাসের নতুন ছাত্র। আমার উপর ভার পড়লো বই সংগ্রহের। সদর রোডে একজন বাঙালি ম্যাগাজিন ব্যবসায়ী ছিলেন। তাকে দিয়ে অনেক বাংলা বই আনালাম। রবীন্দ্রনাথের সব বই, শরৎচন্দ্রের সব, বিভূতিভূষণ, মাইকেল মধুসূদন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্যারিচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল, কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকসা ইত্যাদি অনেক বই । জানিনা এখন এগুলো আর আছে কি না। তখন করাচী তথা সারা পাকিস্তানে পরিবেশটা ছিল ভারি উদার এবং আধুনিক। এখন তো শুনি ধর্মান্ধ আর উগ্রবাদীদের আশ্রয়স্থল।

অনেক রাত করে বসতাম আব্বাকে চিঠি লিখতে। ব্যক্তিগত কথা নিয়ে তেমন কিছু না, লিখতাম করাচীর প্রবাস জীবনে আমার নিত্যনতুন অভিজ্ঞতার কথা। অনেকরাতে চিঠি শেষ করে ফিরোজকে নিয়ে হেঁটে যেতাম ম্যাকলিউড রোডের পোস্ট অফিসে চিঠি ফেলতে। একদিন পরই পৌঁছে যেত সেসব চিঠি। আব্বা আমার এই সব চিঠি খুব পছন্দ করতেন এবং যত্ন করে জমিয়ে রাখতেন। কাউকে কাছে পেলে পড়ে শোনাতেন।

সেলিম কোরেশী স্যার ছিলেন কেতাদুরস্ত, ফিটফাট সাহেব। রোজ স্যুটপাল্টে আসতেন। ভীষণ স্মার্ট। এই সময়ে লাহোর গভঃ কলেজ থেকে আমাদের ক্লাসে একটি ভারি সুন্দরী মেয়ে এলো, নাম নার্গিস ওয়াহাব। ধনীর দুলালী। একটা সাদা ক্যাডিলাক কনভার্টিবল চালিয়ে কলেজে আসত। ভারি চটপটে মেয়ে। কোনো জড়তা নেই, সবার সঙ্গে হেসে খেলে মিশতো। ও ছিল ঐ সময়ের নামকরা ডিবেটার। ইংরেজি বলতো মেমসাহেবদের মত। ও আমাদের পর্যায়ের হতে পারে একথা ভাবতে পারতাম না। কিন্তু ওকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম ঠিকই - সে আমাদের জন্য নয়, সেলিম কোরেশীকে নিয়ে। ভাবতাম সেলিম কোরেশীই ওর যোগ্য।

আমাদের এক বছরের সিনিয়র ছিলেন আমার খালাত ভাই মোহসীন। নামকরা ডিবেটার। অল ইন্ডিয়া-পাকিস্তান ডিবেট প্রতিযোগিতায় অমৃতসর গোল্ডকাপ কয়েকবার জিতে এনে আমাদের কলেজের তথা পাকিস্তানের মর্যাদা বাড়িয়েছিলেন। বান্ডুং কনফারেন্সে তিনি পাকিস্তান ছাত্রদলের নেতা ছিলেন। তাঁকে নিয়ে সেবার ডন পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, ‘The Wonder-boy with magic shoes’। কনফারেন্সে তার পরনে ছিল শেরোয়ানি আর পায়ে জড়ির নাগড়া।

৩-বি’তে থাকতে একবার কলেজ থেকে ফিরে দেখি কে একজন আমার বিছানা দখল করে আছেন। কিছুক্ষণ পর ঘুম ভাঙতে ভদ্রলোক পরিচয় দিলেন তিনি ফজলে লোহানী। চিনতে ভুল হলো না এক কালের প্রিয় ম্যাগাজিন ‘অগত্যা’ র হুল ফোটানো লেখক-সম্পাদককে। ক’দিন ছিলেন আমার বিছানাতে। তারপর বিলেত চলে যান। এ ক’দিন আমি আবার ফিরোজের সঙ্গে ডাবলিং।

সেবার স্পেন থেকে ফিরলেন শিল্পী রশীদ চৌধুরী। সেজ ভাইয়ের বন্ধু। ক’দিন থাকলেন করাচী। তাঁর অনেক ছবি ফেলে গেলেন করাচীতে। সেগুলো পরে আমি ঢাকায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। এই প্রসঙ্গে একজনের কথা মনে পড়ছে খুব। ওর নাম সালাম, ঢাকার ছেলে, ফিরোজদের পাড়ার।খেলাধুলাই ছিল জীবনের একমাত্র স্বপ্ন। ক্রিকেটের নেশায় ছুটে এসেছে করাচী। করাচী ক্রিকেটের তীর্থক্ষেত্র আর সিন্ধ মাদ্রাসা তার সূতিকাগার। এখান থেকে বেরিয়েছেন বিখ্যাত সব ক্রিকেটার। এক কালের কৃতী টেষ্ট খেলোয়ার মাস্টার আজিজ ওখানকার কোচ। তাই সালামের সিন্ধ মাদ্রাসায় আসা। ও প্রায়ই ফিরোজের সঙ্গে দেখ করতে আসতো। সেই সুবাদে আমার সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। এমন শিশুর মত সরল, এমন নিস্বার্থ পরোপকারী মানুষ কি আর দেখা যাবে। রশীদ ভাই স্পেন থেকে করাচী ফিরে বিপাকে পড়লেন। পয়সা কড়ি নেই মোটেই। অনেক ছবি আছে সঙ্গে। এগুলো ঢাকায পাঠাবার দায়িত্ব নিলাম আমি। কিন্তু করাচী-ঢাকার টিকেটের পয়সা নেই। সালামের হাতে ঢাকা ফেরার একটা টিকেট ছিল। ও ওটা রশীদ ভাইকে অবলীলায় দিয়ে দিল নিজের ফেরা অনিশ্চিত করে। ঐদিনে দুশো টাকার টিকেট একটা বিরাট কিছু। সালামও আর নেই। ও ছিল মোহাম্মদপূর রেসিডেন্সিয়াল কলেজের স্পোর্টস্ টিচার ও কোচ। একদিন ছেলেদের সঙ্গে হকি খেলার সময় এক হার্ট অ্যাটাকে জীবন শেষ।

কলেজে ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যেই মোর্শেদের আব্বার চেষ্টায় ঢুকলাম ইষ্টার্ন ফিল্ম ষ্টুডিওতে শিক্ষানবীশ ফটোগ্রাফার হিসাবে। করাচীর ধনাঢ্যইউসুফ হারুণ পরিবার এর মালিক। তখন চীফ ক্যামেরাম্যান ছিলেন সোহেল হাসমী। এর পরে এলেন বাঙালি আফজাল চৌধুরী। শামিমা ভাবীর চাচা। অনেক ছবিতে কাজ করলাম ‘বড়া আদমী’, ‘তেরে বগায়ের’, ‘পরাই জমিন’ আরো কী কী। নূরজাহান এসেছিলেন একটা ছবির শুটিংয়ে। ভীষন সুন্দরী দেখতে। গায়ের রং পাকা আপেলের মত। খবু মানতো সবাই। বড় বড় টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার আসতো। ইউনিটের সবাইকে ঐ খাবার বিলোতেন - পরোটা, গোশ্ত, হালুয়া, ইত্যাদি।

আমার একটা আইকোফ্লেক্স ক্যামেরা ছিল। খুব ছবি তুলতাম। এগুলো প্রিন্ট করাতে যেতাম এলফিনস্টোন স্ট্রিটের থ্যাকারসন ষ্টুডিওতে। থ্যাকারসন ছিল সারা পাকিস্তানে রলীফ্ল্যাক্সের একমাত্র পরিবেশক। মালিকের স্ত্রী জার্মান মহিলা, খুব সুন্দরী। নিজেই বেশী সময় দোকানে বসত। তার একটা ছোট ছেলে ছিল ভীষণ মিষ্টি দেখতে, নাম ‘মামদু’। ভদ্রলোক জার্মানি থাকতে এই মহিলার সঙ্গে প্রেম এবং বিয়ে। মহিলা করাচী এসে জানতে পারেন ভদ্রলোকের আগের স্ত্রী বর্তমান। কিছু আর করার ছিল না। মেনে নিলেন সব। মহিলা নিজেই আমাকে গল্প করে বলেছিলেন সব।

ফটোগ্রাফির সুবাদে পরিচয় হল শামসুল ইসলামের সঙ্গে। বার্মা ইস্টার্নের ফটোগ্রাফার। লাকী ভাই বলতাম আমরা। খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল আমাদের সবার সঙ্গে । কাজ করেন আমাদের পাশেই পিআইডিসি বিল্ডিং এ বার্মা ইস্টার্নের এর অফিসে। দুপুরে খেতে চলে আসতেন আমাদের মেসে।থাকতেন ফেডারেল ক্যাপিটাল এরিয়ায়। মাঝে মাঝে লাকী ভাই এর সঙ্গে যেতাম ফেডারেল ক্যাপিটেল এরিয়ায়। এখানেই পরিচয় হয় নিজামউল হক, আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে নতুন করে।



ছাব্বিশ-

হোস্টেলের বন্ধুরা সবাই ছোটখাট চাকুরি করে নিজেদের খরচ চালিয়ে নিত। ব্যতিক্রম আমি আর সুলতান মাহমুদ। আমাদের টাকা আসত মানি অর্ডারে। মাহমুদ ছিল শিয়ালকোটের এক ধনী পরিবারের সন্তান। ওর টাকার কোনো হিসাব ছিল না, যখন যা চেয়ে পাঠাতো তাই আসতো। । আমার টাকা পাঠাতেন বড়ভাই। আমি নিতান্ত প্রয়োজনের বাইরে কোনো টাকা চাইতে সংকোচ বোধ করতাম। যদিও এ ব্যাপারে বড়ভাইয়ের কোনো হাত টান ছিল না। প্রায়ই জানতে চাইতেন আরো লাগবে কি না। আমার সিগারেট না হলে চলতো না। মাসের প্রথম সপ্তাহে টাকাটা হাতে পেয়ে প্রথমেই মেসের টাকা জমা করেই ছুটতাম ভিক্টোরিয়া রোড়ের মোড়ে। ওখানে রেক্স সিনেমার গেটেই ছিল ধুমপানের প্রয়োজনীয় বিলাসী সামগ্রীর একটা সুন্দর দোকান। পাইপ, নানা ব্র্যান্ডের তামাক, সব ব্র্যান্ড্রের বিদেশী সিগারেট। শুনেছিলাম জিন্নাহ সাহেবের শখের আবদুল্লাহ সিগারেট এখান থেকেই যেতো। আমি চার টিন থ্রী ক্যাসল ফাইন কাট ভার্জিনিয়া তামাক কিনে মাসের খোরাক নিশ্চিত করতাম। এগুলো রিজলা কাগজ মুড়ে সিগারেট বানানোর কৌশলটা আমার খুব রপ্ত ছিল।

পাঞ্জাবী মেসের খাওয়া-দাওয়া ছিল খুব ভালো। পাঞ্জাব থেকে আসতো টিন ভরে খাঁটি ঘি । তাই দিয়ে আমাদের সব রান্না হতো। মেসের ম্যনেজার ছিল একজন সিনিয়ার ছাত্র। একটা মুশকিল ছিল প্রায় মাসেই অনেক ছাত্রের টাকা বাকী পড়তো। মেস ম্যানেজার একবার অতিষ্ঠ হয়ে নোটিশ দিলেন সবাইকে আরো পঁচিশ টাকা করে জমা দিতে হবে। আমাদের কখনো বাকি থাকতো না। তথাপি আমাদেরকে আরো টাকা দিতে হবে একথা খুব অন্যায় মনে হলো আমার। আমি নোটিশের উপরই আমার এই মন্তব্য লিখে দিলাম। ফিরোজকে বলতেই দস্তখত কর দিল। তারপর পুরো দল- আতিক, সুলতান, গাফ্ফার আর সুলতান মাহমুদ। সন্ধ্যায় যথা নিয়মে বোড়িবাজার ঘুরে এসে মেসে খেতে বসতেই বাবুর্চী রশীদ কাঁচুমাচু হয়ে যা বললো তার তরল অর্থ ম্যানেজার সা’ব তোমাদের খানা বন্ধ করার হুকুম দিয়েছে। এই রাতে কোথায় যাই।পাঁউরুটি যাকে ওরা ডাবল রুটি বলে তাই খেয়ে রাত কাটালাম । সকালে দেখি বাবুর্চি রশিদ দরজার সামনে, নাস্তার জন্য ডাকতে এসেছে। ওর সহকারীদের মুখে শুনলাম রাতেই রশীদ ওদের সঙ্গে করে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে বলে, আমাদের কোন বাকি পড়ে না, তারপরও আমাদের খাওয়া বন্ধ করা বে-ইনসাফি। আমাদের খানা চালু না হলে ও সকালে চুলা ধরাবে না।

সুলতান মাহমুদ হোষ্টেলে কাটিয়ে দিল কয়েক বছর। ও শিয়ালকোটের এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। করাচীর এস এম কলেজে হোষ্টেলে থেকে পড়া ওদের জন্য এক গৌরবের কথা। মাহমুদ ছিল ভারি মজার ছেলে। সবসময় কিছু একটা রসিকতা ছাড়া কোন কথা বলতোনা। ট্রান্ক ভর্তি ছিল ওর কাপড় চোপড়। বেশির ভাগই দামি স্যুট। তার আবার অনেক গুলোই সেভিল রো’র বি-স্পোক। ও বাড়ি গেলে এগুলো দিয়ে যেত আমার জিম্মায়। অবাঙালিদের মধ্যে ও ছিল আমাদের খুব অন্তরঙ্গ। ও পাকিস্তানের একজন নামকরা পর্বতারোহী ছিল। ইতালীয়দের পর কারাকোরাম জয় করে প্রচুর নাম করেছিল।

ওর প্রেম ছিল লাহোরের একটি মেয়ের সঙ্গে, আত্মীয়দের মধ্যেই। মেয়েটি করাচী আসবে একবার । মাহমুদ আমাকে অগ্রিম নোটিস দিয়ে রাখলো কেমন করে ক্লিফটন বিচে হঠাৎ করে ওদের সামনে পড়তে হবে। নির্দেশ মত আমি পৌঁছে গেলাম ক্যামেরা নিয়ে। মেয়েটি বোরকা পরে এসেছিল।পর্দা করার জন্য নয়, ওকে যেন কেউ চিনতে না পারে। আমার সামনে লজ্জা পাচ্ছিল। মাহমুদ আশ্বাস দিয়ে বলল, আলী নূরকেলজ্জা কিসের। ওতো আমাদের 'হোনেওয়ালা বেটা কা মামু'। অর্থাৎ আমি ওর সম্ভাব্য উত্তরপুরুষের মামা, সেই অর্থে ওর শ্যালক, মানেমেয়েটির ভাই। লজ্জায় ওর মুখ লাল হয়ে থাকবে, দেখার তো ছিল না। বোরকা খুলতে দেখি এক অপরূপ সুন্দরী। অল্পক্ষনের মধ্যেই সহজ হয়ে গেল। পান্জাবী মেয়ে কথাবার্তায়ও খুব চটপটে।

কদিন পরেই আমাদের ৩-বি কামরায় একটা শ্যামলা পাতলা লম্বা মতন ছেলে এলো। দেখতে বাঙালির মত। ভারতের হায়দ্রাবাদের। ওর নাম গাফফার। ডি.জে.সায়েন্স কলেজে বি.এস.সি পড়ে, রাতে টেলিফোন এক্সচেন্জে অপারেটরের কাজ করে কাছেই ম্যাকলিউড রোডে। ভারি মিশুক ছেলে। কদিনের মধ্যেই দারুন ভাব হয়ে গেল আমাদের সঙ্গে, মানে ফিরোজ আতিক ও আমার সঙ্গে । এখন ওকে ছাড়া আর চলে না আমাদের। ও বাথ আইল্যান্ডের কাছে কলাম্বাস হেটেলে পার্ট টাইম টেলিফোন অপারেটরের কাজ করে কিছু উপরি উপার্জন করত। মাঝে মাঝে আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেত। সারা রাত থাকতাম একসঙ্গে। খাওয়া আসতো হোটেল থেকে। দুজনে ভাগ করে খেতাম। ও পরে এম.বি.এ করে ফিরোজের সঙ্গে। করাচীর আলী অটোমোবাইলসে চাকরি করে দীর্ঘদিন। পরে দুবাইতে টয়োটার সোল ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তা হিসাবে খুব নাম করে। অমি যখন ১৯৭০ সালে সপরিবারে করাচী বেড়াতে যাই ও তখন সর্বক্ষণ ছিল আমাদের সংঙ্গে। এখন কানাডায় থাকে। বর্ণা যখন কানাডায় ইন্টার্নশিপ করছিল তখন ও প্রায়ই বর্নাকে নিয়ে গিয়ে ওদের কাছে রাখত। ওর স্ত্রী বর্ণাকে নিজের মেয়ে আতিকার মত দেখতো। বর্ণার এল.এল.এম গ্রাজুয়েশনে অনুষ্ঠানে ১৯৯৬ সালের মে মাসে আমেরিকা গেলে ও আমাদেরকে ওর কাছে নেবার জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। আমি যেতে পারিনি। দেখি একদিন সন্ধ্যায় কানাডা থেকে ওর মেয়ে আতিকাকে নিয়ে সোজা হাজির। দু’তিন দিন আমার সঙ্গে কাটিয়ে যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন আমরা দুজনেই হোস্টেল জীবনের দিনগুলির কথা মনে করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। আতিকা ভারি সুন্দরী ও খুব স্নার্ট। একটা লাল পন্টিয়াক স্পীডবার্ড স্পোর্টস কার চালিয়ে এসেছিল ওর বাবাকে নিয়ে। আমাদের করাচীর হোস্টেল জীবনের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে কেবল গাফফার আর আমিই বেঁচে আছি। বাকীরা- ফিরোজ, আতিক, সুলতান সবাই ছেড়ে গেছে একে একে।

করাচী হোষ্টেল জীবনে আমরা যারা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলাম তাদের মধ্যে আতিক একজন।ও ছিল অতি সুদর্শন । লম্বা, চওড়া, ফর্সা গায়ের রঙ। শরিয়তপুরের ছেলে। ডামুড্যা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে করাচীতে পাড়ি জমায় চট্টগ্রাম থেকে জাহাজে করে। ছোটখাট চাকরি করে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। এসএম কলেজ থেকে বি.কম এবং ল' পাশ করে। এবং দীর্ঘদিন করাচীতে সুই গ্যাস কোম্পানিতে উচ্চপদে কাজ করে। বাংলাদেশে আসার পর ও অয়েলএ্যান্ড গ্যাস কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর হিসাবে অবসর নেয়। ও একটা বাংলা গান খুব দরদ দিয়ে গাইত, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্জের 'শুধু মুখের কথাটি শুনে গেছ তুমি, শোননি মনের ভাষা।' কার উদ্দেশ্যে এই গান এই নিয়ে আমরা খুব খ্যাপাতাম। ওর বাড়ি ডামুড্যার কাছে লাকার্তা গ্রামে। আমি পেশাজীবন শুরু করার আগে একবার সরেজমিনে সব কিছু দেখার জন্য ১৯৬৯ সালের শেষদিকে নেসারকে সঙ্গে নিয়ে বরিশাল গিয়েছিলাম। ফেরার পথে নেসার ডামুড্যা যাবার বায়না ধরল। আমি এক কথায় রাজি। ডামুড্যার সার্কেল অফিসার ছিলেন নেসারের আত্মীয়। ঐ বাড়ির একটি মেয়ের সঙ্গে নেসারের প্রেম এই প্রথম জানলাম। পরবর্তীকালে তিনিই নেসারের সহধর্মিনী।

মাঝরাতে স্টিমার পৌঁছল ডামুড্যা । বিশাল নদী। চারিদিকে থৈ থৈ পানি। কোন ঘাট নেই, নদীর মাঝখানেই স্টিমার নোঙর ফেলল। ছোট ছোট নৌকা দিয়ে যাত্রীদের উঠা-নামা। নৌকায় পরিচয় হল আলী আহমেদ নামে এক ছেলের সঙ্গে। এখানকার ছেলে, বরিশালে থেকে বি.এ পড়ে। পরিচয় খানিকটা ঘন হতে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, লাকার্তা গ্রাম চেনে কিনা। ও বললো চেনে, এবং আতিককেও চেনে ওদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হিসাবে। আমার কী খেয়াল হলো একবার অতিকের গ্রামের বাড়ি ঘুরে গিয়ে আতিককে তাক্ লাগিয়ে দেই। ওকে বলা যাবে অন্তত। সকালে আলী আহমেদ এলে ওকে নিয়ে ডামুড্য স্কুল ঘুরে দেখলাম।। দুপুরের খাবার পর আলী আহমেদকে সঙ্গে করে একটি নৌকা নিয়ে রওয়ানা হলাম লাকার্তা। সবটা এলাকা এক বিশাল বিল। এপার ওপার দেখা যায়না। বিকেলের দিকে পৌছলাম লাকার্তা। গ্রামটাকে মনে হলো একটা দ্বীপ, চারদিকে পানি। আতিকের বাড়ি খুঁজে পৌঁছে গেলাম ঠিক। ওর আব্বার সঙ্গে পরিচয় হলো। খুব আদর যত্ন হলো আমাদের। ফিরতে গিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আকাশে ঘন মেঘ করে এলো। চারিদিকে অথৈ কালো পানি। কিছু দেখা যায় না কোথাও। গভীর অন্ধকার, অকূল পাথার। ভয়ে আমার গা শিউরে উঠে।এর মধ্যে মাঝি বলল ও পথ হারিয়েছে, চিনতে পারছেনা। আতংকে কুকড়ে গেলাম। সলীল সমাধি বুঝি ঠেকানো গেল না। অনেক রাত করে ফিরলাম সার্কেল অফিসার সাহেবের বাড়ির খালে। দেখি পুরোদস্তুর একদল উদ্ধারকর্মী ছিপ নৌকা নিয়ে তৈরী। ভাবলাম, মৃতদেহ উদ্ধারের জন্যই হবে হয়তো।

হোষ্টেলের বন্ধুদের মধ্যে যার কথা না বললেই নয় সে হল সুলতান। ময়মনসিংহের ছেলে, পিআইডিসিতে কাজ করতো। এস.এম. কলেজে বি.কম পড়তো। ভারি সহজ,সরল এবং হৃদয়বান ছেলে। সবার জন্য ভীষণ দরদ। লেখাপড়ায় ভালো অথচ পরীক্ষায় তেমন ফল হতোনা। সুন্দর ইংরেজি লিখত এবং বলতো। তেমন বলতো উর্দূ।

ওর বাইরে খাবার খুব শখ ছিল। বোড়ি বাজারের ভেতর ‘হোটেল বোখারা’ নামে একটা রেস্তোরাঁ ছিল। মগজ ভুনা আর পায়া ছিল ওদের সিগনেচার আইটেম। একটা লম্বা পোলাউর ডিসে প্রথমে পায়া তার উপর মগজ ভুনা তার উপর দুটি সেদ্ধ ডিম সঙ্গে গরম গরম তন্দুরি রুটি, গনগনে তন্দুর থেকে বের করা।শেষে ঘটি ভরে লাস্সি। আহা! আমরা বার্নস রোডের বিখ্যাত খাবার জয়েন্টগুলোতেও সপ্তাহে এক দুবার যেতাম। ওখানে বড় বড় কড়াইতে দুধ জ্বাল হতে থাকত। পাশেই ঘিয়ে ভাজা বড় মোটা জিলিপী। বড় সাইজের এক গ্লাস গরম দুধে গরম গরম জিলিপী মিশিয়ে যে কী এক অমৃত তৈরি হত তা বোঝানোর মত না। প্রথমেই একটা পেতলের ঘটিতে কড়াই থেকে গরম দুধ নিয়ে আর একটা ঘটিতে অনেক উঁচু থেকে ঢেলে ফেনা তুলতো। এমন করে বারবার এত দ্রুত ঢালতো আর ওপরে নিয়ে যেত মনে হত দুধের একটা ধারা টেনে লম্বা করছে। তাই দেখে নাকি এক সর্দারজি বলেছিল, মুঝে দো গজ দুধ দাও। আমাকে দুই গজ দুধ দাও।

সুলতান খুব স্পর্শকাতর ছিল। অল্পতেই ইমোশনাল হয়ে পড়ত। দেশে ফিরে ঢাকায় ইপিআইডিসিতে যোগ দিল।ও বিয়ে করে জামান ফার্মাসিউটিক্যৈলস কোম্পানীর জামানদের বোনকে। কিছুদিনের মধ্যে ওর মানসিক ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ প্রকাশ পায়। দেশ স্বাধীনের পর ও সুগার মিলস কর্পোরেশনের চীফ একাউন্ট্যান্ট হয়। একদিন হঠাৎ কয়েকজন সহকর্মী ওকে নিয়ে আমার মতিঝিল অফিসে আসে। ও তখনও কাঁপছিল। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল। বারবার জিজ্ঞেস করল আমার কোনো বিপদ হয়েছে কি না। ওর সহকর্মীরা বলল অফিসে হঠাৎ আপনার নাম করে বলে আপনি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। এই নিয়ে ও খুব অস্থির হয়ে পড়ায় সবাই ওকে আমার কাছে নিয়ে আসে। বছর দুই তিনের মধ্যে ও সম্পূর্ণ উম্মাদ হয়ে যায়। এই সময় ও আমার কাকরাইল অফিসের সামনের মাঠে বসে অনর্গল ইংরেজিতে আমার সঙ্গে ওর বন্ধুত্বের কাহিনী বলতে থাকতো। লোকজন কৌতুহলী হয়ে জড়ো হতো। কেউ ভাবতো কোন কামেল, গুণী বুজর্গ। অনেকে অনেক কিছু চাইত ওর কাছে। ও এসবে কান দিত না। একদিন আমি ওকে আমার বাসায় নিয়ে এলাম। এক সঙ্গে খেলাম। সেই শেষ। একদিন শুনলাম ও আর নেই। ভারি কষ্ট হলো সুলতানের জন্য। ও বড় খাঁটি মানুষ ছিল। ওর মনটা ছিল শিশুর মত সরল, হৃদয় ছিল মহৎ আর দরদী। সুলতান নেই অনেকদিন। কিন্তু ওর কথা মন পড়ে খুব।


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ