সাহিত্যিক অমর মিত্র-এর সাক্ষাৎকার : লেখক সব সময়ই ক্ষমতার বিপক্ষে থাকবেন। ক্ষমতা তাঁকে বিবরে ঠেলে দেয়।


প্রশ্ন :
ব্যক্তি অমর মিত্র ও সাহিত্যিক অমর মিত্র - এই দু'জনের কাছে দু'জনের কি কোনও শর্ত আছে? আসলে আমরা জানতে চাইছি অমর মিত্র কোন শর্তে লেখক? কোন শর্তে ব্যক্তি মানুষ?

অমর মিত্র :
যে শর্তে ব্যক্তি মানুষ, সেই শর্তেই লেখক। একজন লেখক তঞ্চক হতে পারেন না। আমার বিশ্বাস, আমার লেখায় নানা ভাবেই ছায়া ফেলেছে। বিশ্বাস কী? মানবিকতা। নিরূপায়, অসহায়, দুর্বল মানুষের পক্ষে কিছু কথা বলা। ক্ষমতার বিপক্ষে কথা বলা। আমি মনে করি আমার ঈশ্বর ভগবান বুদ্ধের মতো ক্ষীণ হয়ে গেছেন উপবাসে, তপস্যায়। তিনি কুশী নগরের শালবনে শুয়ে আছেন ভগ্ন শরীরে। মহানির্বাণের অপেক্ষায় তিনি। এই ঈশ্বরকে পথেঘাটে দেখি। ফুটপাথে শুয়ে আছেন। বহুদিন উপবাসে আছেন। নিজেকে তখন অপরাধী লাগে। আমি খাই ও খায় না। আমি পাই, ও পায় না। অপরাধবোধ আমাকে লিখিয়ে নেয়। লেখা ছাড়া আমার কিছু করার নেই। লেখক সব সময়ই ক্ষমতার বিপক্ষে থাকবেন। ক্ষমতা তাঁকে বিবরে ঠেলে দেয়।


প্রশ্ন :
আপনি কোন কোন সম্পাদকের নামোল্লেখ করতে চান, যাঁরা আপনাকে নতুনভাবে ইন্সপায়ার করেছেন?


অমর মিত্র :
আরম্ভে অমৃত সম্পাদক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে পেয়েছিলাম। ১৯৭৭ সালে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। প্রথমে সম্পর্ক খুব সুবিধের ছিল না। পরে আমার একটি গল্প, ‘গাঁও বুড়ো’ পড়ে তিনি আমাকে তাঁর ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ বইটি উপহার দেন। সেই থেকে একজন বড় লেখক ও সম্পাদকের সাহচর্য পাই। তাঁর সঙ্গে মেলামেশা সম্পাদক এবং লেখকের ছিল না। ছিল অগ্রজ এবং অনুজের। জীবনকে দেখার একটি দৃষ্টি খুলে দিয়েছিলেন তিনি। তিনিই আমাকে চ্যালেঞ্জ নিতে শিখিয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নদীর মানুষ’ লিখি অমৃতে। তারপর ধারাবাহিক লিখি উপন্যাস, ‘পাহাড়ের মতো মানুষ’। সবই তাঁর কথায়। লিখতে হবে। লেখ। লিখেওছিলাম। এরপর আর একটি ছোট উপন্যাস লিখি, ‘ভয়’। পরে সেই উপন্যাস ‘আলোকবর্ষ’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। উপন্যাস লিখতে হয় কীভাবে তা শিখেছিলাম শ্যামলদার কাছে।

শ্যামলদার পরে অনীক সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তীর কথা মনে পড়ে। তিনি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক সম্পাদক। অনীক পত্রিকায় বছর তিরিশ আমি এক নাগাড়ে গল্প লিখেছি প্রতি শারদীয়তে। ‘দানপত্র’ লেখার সূত্রেই অনীক পত্রিকার সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ। এরপর প্রতিক্ষণ পত্রিকা, স্বপ্না দেব এবং দেবেশ রায়। দেবেশদা সম্পাদক না হলেও সম্পাদক মন্ডলীতে ছিলেন। ‘নিসর্গের শোকগাথা’ লিখেছিলাম তাঁর কথায়। লাতুর জেলার কিল্লারি থেকে আমি ফিরেছিলাম তখন ভূমিকম্পের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে। রিপোর্ট লিখব প্রতিক্ষণে সেই কথা ছিল। দেবেশদা বলেছিলেন, না পার যদি উপন্যাস লিখে আনো।

আর আমার সম্পাদক ছিলেন বারোমাস পত্রিকার সম্পাদক অশোক সেন। তিনি আমাকে অনেক ভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর সঙ্গে আলাপ ছিল জীবনের পরম প্রাপ্তি। তিনি আমাকে সত্য অর্থেই অনেকবার অনুপ্রাণিত করেছেন নানা লেখা প্রসঙ্গে। অনীক পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান’ পড়ে তিনিই বহুজনকে তা পড়তে বলেছেন। বারোমাস বন্ধ হয়ে গেছে। বারোমাস পত্রিকায় আমি আমার অনেক প্রিয় গল্প লিখেছি। ছোট উপন্যাসও লিখেছি। ‘কৃষ্ণগহ্বর’ বারোমাস পত্রিকাতেই লিখেছিলাম।

আর আনন্দবাজার রবিবাসরীয় সম্পাদক, রমাপদ চৌধুরী। তিনি আমার গল্প পছন্দ করতেন। লিখতে বলতেন। একটা সময় প্রায় দু’ আড়াই বছর যাইনি তাঁর কাছে, লিখিওনি আনন্দবাজারে। তিনি ডেকে পাঠিয়েছিলেন, কেন যাই না জিজ্ঞেস করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, উপন্যাস লিখতে চাই, এবং তা বাইরেই লিখতে হবে বুঝেছি, তাই আসি না। এক এক সম্পাদকের পছন্দ এক এক রকম, আমার কোনো ক্ষোভ নেই। এ ছাড়া খুব বড় একটি লেখা লিখছি, প্রাচীন ভারত এবং উজ্জয়িনী নগর নিয়ে। ধ্রুবপুত্র নিয়ে কথা বললাম। তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কে লিখতে বলেছে?

কেউ না।

তবে যে লিখছেন?

ভিতরের তাগিদ থেকে।

বাহ, কত শব্দ হবে?

এক লক্ষ পঞ্চাশ হবে।

তিনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, কে ছাপবে এত বড় লেখা?

বলেছিলাম, জানি না, কিন্তু লিখছি।

তিনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন, লিখুন, এই লেখাটি অনেক দূর নিয়ে যাবে আপনাকে।


প্রশ্ন :
অনেকেই মনে করেন, একজন ভালো লেখক হতে গেলে একজন ভালো সম্পাদকের দৃষ্টিতে পড়তে হয়। কখনও সেই সম্পাদকের সঙ্গে হৃত্যতাও গড়ে তুলতে হয়। এই বিষয়ে আপনার ব্যক্তিগত মতামত কি?


অমর মিত্র :
ভালো লেখক হতে গেলে ভালো লিখতে চেষ্টা করতে হয়। ক্রমাগত সেই চেষ্টা করে যেতে হয়। সাহিত্য সাধনার জায়গা। সাধনা দরকার, নিজেকে উন্নীত করা দরকার। লেখক নিজে হন, কেউ করে দিতে পারেন না। লিখতে না পারলে উপরের সম্পাদকরা কেউ তাকিয়েও দেখতেন না। হৃদ্যতা এমনিই গড়ে ওঠে। মিষ্টির হাড়ি কিংবা হুইস্কির বোতল দিয়ে গড়ে তুলতে হয় না। আমার দুই ভালো সম্পাদক, অবাণিজ্যিক সাহিত্য পত্রের। অমৃত পত্রিকাও ১৯৮২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিক্ষণে নিয়মিত লিখেছি বছর সাত-আট। তারপর প্রতিক্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। শ্যামল এবং দেবেশ যত না সম্পাদক, তার চেয়ে বেশি লেখক। তাঁদের লেখা পড়তে পড়তে বড় হয়েছি। তাইই ছিল সম্পর্ক। এঁদের ভয়ও করতাম। লেখা ভালো না হলে ছেড়ে কথা বলবেন না। রমাপদ চৌধুরী তো একটি উপন্যাস ছেপেছিলেন শারদীয় আনন্দবাজারে। তারপর আর ছাপেননি, বা ছাপতে পারেননি। কিন্তু আমাকে তো বলেছিলেন, ‘যে আদর করে লেখা চাইবে, দেবেন। সে অনীক হোক, পরিচয় বা অনুষ্টুপ, আনন্দবাজার হোক। আপনার যে এখানে পাকা আসন হবে, তা ধরে বসে থাকবেন না। নিজের জায়গা নিজে তৈরি করুন’।

তিনি আমার প্রিয় সম্পাদক। সঠিক পরামর্শ দিয়েছিলেন।


প্রশ্ন :
আপনার লেখার ক্ষেত্রে নস্টালজিয়া কাজ করে বেশি নাকি সমসাময়িক সমস্যা?


অমর মিত্র :
এ কথা তো পাঠকের বলার কথা। আপনি বলবেন। সময়কে কি দূরে সরিয়ে রাখা যায় ? সময়ের একটি দাবীও তো আছে। লেখকেরও দায় আছে। আবার সময় থেকে উত্তীর্ণ হওয়াও তো লেখকের কাজ। শুধুই বাস্তবতা চর্চা আমার পছন্দ নয়। আর শৈশব মানুষের বড় অবলম্বন হলেও নিরন্তর স্মৃতিকাতরতা ভালো নয়।


প্রশ্ন :
ইন্ট্রোভার্ট নাকি এক্সট্রোভার্ট - লেখক হিসেবে কারা বেশি সফল বলে আপনার মনে হয়?


অমর মিত্র :
যে লেখা আমার কাছে নতুন কথা বয়ে আনে, সেই লেখাই আমার পছন্দ। অবশ্যই তা অন্তর্মুখী লেখা হয়েছে বেশিরভাগ। সফলতা কী ? অমিয়ভূষণ, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায় কি সফল লেখক ? এঁরা সকলেই গভীর অন্তর্মুখী লেখক। সফলতার অর্থ এক একজনের কাছে এক এক রকম।


প্রশ্ন :
বাংলা সাহিত্যের গতিধারা কোন্ দিকে বলে আপনার মনে হয়? তেমন কোনো স্ট্রং রাইটারের কথা এই মুহূর্তে আপনার মনে আসছে কি যার হাত ধরে বাংলা সাহিত্য পূর্বের গৌরব ফিরে পেতে পারে?


অমর মিত্র :
লেখক একদিনে তৈরি হন না। সাড়া জাগিয়ে হারিয়ে গেছেন, এমন অনেক দেখেছি। প্রকৃতিতে শূন্যস্থান থাকে না। বাংলা সাহিত্য থেমে থাকবে কেন? ভালো লেখক আছেন। তাঁদের কেউ কেউ আছেন অন্তরালে প্রায়। ভয়ানক প্রচার, ২১ শতকের একমাত্র লেখক হিশেবে প্রচার পেয়েও সেইসব লেখক স্তিমিত হয়ে গেছেন লেখার কারণেই। ভালো লেখাই একমাত্র শর্ত যা কোনো লেখককে টিকিয়ে রাখতে পারে। অহেতু প্রচার মিথ্যা প্রচারে সাময়িক লাভ হতে পারে, শেষ অবধি তা লেখককে লেখক হিশেবে টিকিয়ে রাখতে পারে না। আপনারা জয়ন্ত দে-র নতজানু, জীবিত না মৃত, ভয় ভয় , আনসার উদ্দিনের গো রাখালের কথকতা, কিংবা অরিন্দম বসুর মহাজাতক, উত্তরবঙ্গের পটভূমিতে তিলোত্তমা মজুমদারের উপন্যাস স্বর্গের শেষ প্রান্ত, অলোক গোস্বামীর অদ্ভুত আঁধার পড়ুন, দেখবেন লেখক এসে গেছেন নতুন কথা নিয়ে। সন্মাত্রানন্দ, প্রীতম বসুর কথা বলতেই হবে।


প্রশ্ন :
ভারতীয় কথা-সাহিত্যের নিরিখে বাংলা কোন্ জায়গায় দাঁড়িয়ে বলে আপনার মনে হয়?

অমর মিত্র :
কেউ বলবেন ভালো, কেউ বলবেন, না। আমি বলছি বাংলা সাহিত্যের জায়গা চিরকালই উঁচুতে। তার ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ ঘটেনি। অনুবাদ হলে বোঝান যেত আমাদের জায়গা ছোট নয়। আমি উপন্যাস নিয়েই বলছি। গল্প যা আমাদের ভাষায় লেখা হয়, তা বিশ্ব মানের।


প্রশ্ন :
রাসকিন বন্ড বা চেতন ভগত বা ধরুন অমিশ, এঁরা প্রত্যেকেই মনে করেন, প্রতিটি লেখকের একটি নির্দিষ্ট জঁরের মধ্যেই থাকা উচিৎ। আপনার কী মনে হয়?


অমর মিত্র :
লেখকের দর্শন বড় কথা। মনে করি লেখক তাঁর স্বধর্মে স্থিত থাকবেন। লেখক যে দার্শনিক প্রজ্ঞার অধিকারী তা থেকে বিচ্যুত হবেন না। আমি জীবন অনুসন্ধানে নানা দিকে যাত্রা করেছি। নিজের লেখার অনুকরণ করিনি। এক বিষয় দুবার লিখিনি। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গিয়েছি। কিন্তু তা আমার পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া নয়। আমার পথ আমার নিজের পথ। অন্যরা তাঁদের মতো করে ভেবেছেন। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।


প্রশ্ন :
ধ্রুবপুত্র না অশ্বচরিত, আপনার মনের কাছাকাছি কোনটা? কেন?


অমর মিত্র :
বলতে পারব না। ধ্রুবপুত্র লেখা খুব কঠিন ছিল। আচমকা ওর বীজ পেয়েছিলাম ভাবনার ভিতর। এই উপন্যাসের কোনো ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা নেই। কাহিনির সমস্তটাই আমার তৈরি। যে অনাবৃষ্টির কথা আমি লিখেছিলাম, জল আর মেঘহীনতার কথা, তা সত্য হয়ে উঠছে ক্রমশ। জল নিয়েই তো একদিন যুদ্ধ হবে। লিখেছিলাম প্রায় সাত বছর ধরে। একটু একটু করে। লিখেছি, ফেলেছি, আবার লিখেছি। এক সময় মনে হয়েছিল, ফর্ম বদলান দরকার। যা লিখেছি তা হচ্ছে না, কিন্তু কমাস ফেলে রেখে আবার লিখতে আরম্ভ করেছিলাম। এই ভাবেই লেখা হয়েছিল। লিখতে পেরেছিলাম। ২০০০ বছর আগের ভারতবর্ষ কিন্তু আগামী ৫০ বছরের পৃথিবীও নিশ্চয়।

অশ্বচরিত লিখতে সতের বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল খসড়া লিখে। ঘোড়া আর ঘোড়া পালককে আমি চিনতাম। দেখেছিলাম দিঘার সমুদ্রতীরে। ঘোড়াটি হারিয়েছিল, আর ভানুচরণ তা খুঁজে বেড়াচ্ছিল। এইটুকু জানা ছিল। তার বেশি কিছু নয়। ঘোড়াটি যে বিভ্রমে মৃত্যুর দিকে ছুটে গিয়েছিল, সেই বিভ্রমকে খুঁজে বের করতে বছর খানেক অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

উপন্যাসে সেই ঘোড়াই হয়েছে রাজপুত্র গৌতমের ঘোড়া কন্থক। আর ভানু দাস হল রাজপুত্র গৌতমের সারথি ছন্দক। রাজপুত্র গৌতমকে তারা তপোবনে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি গৃহত্যাগ করে তপস্যায় বসবেন। হয়েছিলেন বুদ্ধদেব। উপন্যাসে সেই অশ্ব কন্থক এবং সারথি ছন্দক অপেক্ষা করছে এতকাল ধরে, বুদ্ধদেব, রাজপুত্র গৌতম ফিরবেন। জগত সুন্দর হবে। হিংসার অবসান হবে। বিভ্রমে পড়ে ভগবান বুদ্ধের জন্মদিন বৈশাখি পূর্ণিমার রাতে সেই ঘোড়া মৃত্যুর পথে যাত্রা করেছিল। পৌঁছে গিয়েছিল হিরোসিমায় ১৯৪৫-এর ৬-ই আগস্ট। ১৯৯৭ থেকে যাত্রা করে ১৯৪৫ এ পৌঁছে সে কালো বৃষ্টিতে গলে গলে যায়। হ্যাঁ, ১৯৯৭-এর বৈশাখি পূর্ণিমার দিনে ভারতের থর মরুভূমিতে পারমানবিক বিস্ফোরণ ঘটেছিল। আমি এই উপন্যাসের খসড়া লিখেছিলাম ১৯৮১ সালে। ১৯৮২-র ফেব্রুয়ারিতে তা প্রকাশিত হয়েছিল শিলাদিত্য পত্রিকায় নভেলেট হয়ে। সম্পাদক ছিলেন সুধীর চক্রবর্তী। ১৫ বছর বাদে ১৯৯৭ সালের বৈশাখি পূর্ণিমার দিনে থর মরুতে পারমানবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটলে লিখতে আরম্ভ করলাম অশ্বচরিত। এত বছর ঘোড়াটিকে নিয়ে ভেবেইছি শুধু। বিভ্রমে পড়ে সে গেল কোথায় ? হিরোসিমার ১৯৪৫-এ পৌঁছতে আমার অপেক্ষা ছিল এতটা বছর। এখন যে পৃথিবীতে আছি, যুদ্ধবাজের পৃথিবীতে, সেখানে ১৯৯৮-এর অশ্বচরিত ২০৪৫-এর অশ্বচরিত, তখন হিরোসিমার ১০০ বছর হবে।

দুই উপন্যাসেই আমার মনোজগতের ছায়া পড়েছে। সময়ের ছায়া প্রলম্বিত হয়েছে দুই উপন্যাসেই।


প্রশ্ন :
এমন কোনও ঘটনা বা চরিত্র যা আপনার লেখায় বারবার ছায়াপাত করে?

অমর মিত্র :
কবি এসেছেন কয়েকটি লেখায়। হ্যাঁ, নিরুদ্দেশ যাত্রা আমার লেখায় এসেছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু তা আগের লেখার অনুকরণ নয়। ধ্রুবপুত্র উপন্যাসে কবি নিরুদ্দেশে যান। অশ্বচরিত উপন্যাসে ঘোড়াটি। নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান উপন্যাসে জুটমিলের শ্রমিক। আর ধনপতির চর উপন্যাসে গোটা দ্বীপ নিয়ে দ্বীপবাসীরাই নিরুদ্দেশে ভেসে যায়। নিরুদ্দেশ যাত্রা আমার ভিতরে বারবার ছায়া ফেলেছে ভিন্ন ভিন্ন আখ্যানে। আমার মনে হয় এই পৃথিবী যেদিকে যাচ্ছে, নিরুদ্দেশ যাত্রাই মানুষের ভবিতব্য যেন। মানুষ ক্রমাগত তার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছিন্ন হচ্ছে। যাবে কোথায় সে? কী তার ভবিষ্যৎ ? এই সব কথাই যেন লিখেছিলাম পরপর।


প্রশ্ন :
মানুষের বাংলা বই পড়ার অভ্যাস আগের থেকে অনেক কমে গেছে, একজন সাহিত্য অ্যাকাডেমি উইনার রাইটার হিসেবে আপনার কি মনে হয় না এটি বাংলা সাহিত্য রচনার ব্যর্থতা?


অমর মিত্র :
কমে গেছে কি? আমার সঙ্গী যারা ছিল বাল্যকালে, দশজনের ভিতরে দুজন বই পড়ত, আর কেউ না। যারা পড়ত না, এখনো তারা পড়েন না। জীবনে সফলতা এসেছে। সারাজীবন বই না পড়ে কাটিয়ে দিল। আবার ঐ দুজন এখনো বই পড়ে। পড়া না পড়া আগেও ছিল, এখনো আছে। তরুণ প্রজন্মের একটা অংশ কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। আর কিছুই পড়েন না। আবার নতুন প্রজন্মের বড় অংশ পড়েও। আই টি পেশাদার যুবক, তাকে বই হাতেই দেখেছি অবসরে। বই পড়া হয়, না হলে এত বই প্রকাশিত হচ্ছে কেন? নতুন নতুন প্রকাশক আসছেন কেন? নতুন নতুন বিষয় নিয়ে বই বেরচ্ছে কেন ?

আমার মনে হয়, বই পড়ার জন্য একটা জীবন খুব ছোট। মনে হয় সেই সব বই পড়ি যা আমার ভিতরে হিংসা ক্লেদ মুছে দেবে। ক্রমাগত মুছে দিয়ে বিন্দু বিন্দু ভালোবাসার জন্য দেবে। পৃথিবীতে এত ভাষা। ভাষাগুলির সবই যদি আমার নিজের ভাষা হতো, গোটা পৃথিবী তখন ক্ষমতাহীন ঈশ্বরের বাসভূমি হতো। বই নেই, পৃথিবী আছে শুধু বারুদ গন্ধ নিয়ে, সেই পৃথিবী আমি চাই না, চাই না।


প্রশ্ন :
ছোটবেলায় পড়া এমন কোনও বই যা এখনও আপনার মনে আছে। বারবার পড়তে ইচ্ছে করে। কেন?


অমর মিত্র :
প্রগতি প্রকাশনের বইগুলি। মোরগছানা, দাদুর দস্তানা থেকে দুই হুজার, কশাক।

সুখলতা রাওয়ের বই নিজে শেখ এবং বাংলার উপকথা ( ফোক টেলস অফ বেঙ্গল ) যা সংগ্রহ করেছিলেন রেভারেন্ড লালবিহারী দে, অনুবাদ করেছিলেন লীলা মজুমদার।

পুশকিন, গোগোল, চেকভ, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি, গোরকি... অনুবাদে। প্রগতি প্রকাশনের বই পড়তে পড়তে বড় হয়েছি। মহৎ রাশিয়ান সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। একটি দুটি আছে এখনো। হারিয়ে গেছে বেশিরভাগ।


প্রশ্ন :
বুকপকেট করার পিছনে কোনও নির্দিষ্ট কারণ আছে কি?

অমর মিত্র :
তখন ইন্টারনেটে সবে এসেছি আমি। একটা চেষ্টা করেছিলাম নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরির। মুক্ত চিন্তার কথা হবে সেখানে। যাই হোক, এখন সেই নেট ম্যাগাজিন নেই। আর দেখেছি মুক্তচিন্তার প্ল্যাটফর্ম লোকনিন্দায় ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। তখন তা আর রেখে কী হবে?


প্রশ্ন :
আপনার কি মনে হয়, সাম্প্রতিক সাহিত্যের অঙ্গন রাজনৈতিক বেষ্ঠনী দ্বারা বেষ্ঠিত? যদি তাই হয়, তবে সেটি কতটা সাহিত্যের জন্যে মঙ্গল?


অমর মিত্র :
লেখকের রাজনৈতিক দর্শন থাকে। লেখকের সেই দর্শন মানবিকতার। ক্ষমতার বিপক্ষে থাকাই শ্রেয়। কেন না লেখক ক্ষমতাহীনের কথাই তো লেখেন। নিরুপায় মানুষের কথা লেখেন। ফলে রাজনৈতিক দল যাদের প্রধান লক্ষ্য ক্ষমতা দখল করা, লেখক তাঁর সঙ্গে না থাকলেই ভালো। তবে এইটির ভিন্ন মতও আছে। আমি আমার কথা বললাম।


প্রশ্ন :
সাম্প্রতিক সময়ের লেখকদের লেখা বাংলা ছোটগল্প ও উপন্যাস সম্পর্কে আপনার মতামত কী?

অমর মিত্র :
নতুন প্রজন্ম এসে গেছে। তারা গল্প নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। গল্পের আঙ্গিক ভাঙতে চেষ্টা করছে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, গল্প লিখতে জানতে হবে, মানে গড়তে। গড়তে জানলেই ভাঙা যায়। তাঁরা নিশ্চয় গল্পে নতুন ভাষা আনবেন। আমি নিয়মিত পড়ি নতুন প্রজন্মের লেখা।


প্রশ্ন :
সাম্প্রতিক সময়ে লিখতে আসা লেখকদের ছোটগল্প ও উপন্যাসের বিষয়, বিন্যাস ও ভাষার বাঁধন সম্পর্কে কি বলবেন?

অমর মিত্র :
তাঁদের গদ্যভাষায় নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে, অন্তত কয়েকজনের। তা স্বাগত। সংখ্যায় খুব বেশি নন তাঁরা। কিন্তু ভালো লাগে। এসেই জনপ্রিয় হবো যে কোনো উপায়ে, এই প্রবণতা ভালো নয়। সাহিত্য সাধনার জায়গা, এইটা মনে রাখতে হয়। ক্ষমতা আছে, কিন্তু এক নাগাড়ে অলৌকিক, হরর, থ্রিলার লিখে শক্তি ক্ষয় করা মোটেই বাঞ্ছিত নয়।


প্রশ্ন :
আমরা জানি ছোটগল্পের নির্দিষ্ট শর্ত থাকে। এই সময় অনেক লেখক-ই সেই শর্ত ভেঙে গল্প লিখছেন। এই প্রক্রিয়া কতটা বাংলা ছোটগল্পের জন্যে সুখের? আপনার মতামত জানতে চাই।

অমর মিত্র :
সাহিত্যের কোনো শর্ত নেই। শিল্পের কোনো বিধি নেই। লেখক শর্ত ভাঙতেই পারেন যদি তা গল্প বা উপন্যাস হয়ে ওঠে। আসলে তা গল্প হয়ে উঠতে হবে। ফর্ম ভাঙাই তো শর্ত ভাঙা। আমি দানপত্র লিখেছিলাম, দলিল লিখনের মতো। একটি জমি হস্তান্তরের দলিল যেভাবে লেখা হয়, সেই ভাবেই দানপত্র লেখা হয়েছিল। এরপর এই ফর্ম একটু উলটে পালটে নিয়ে লিখেছেন কেউ কেউ।

আপনি অমল চন্দের গল্প, বাসুদেব দাশগুপ্তর গল্প স্মরণ করুন। সুবিমল মিশ্রের গল্প, ‘আপনি যখন স্বপ্নে বিভোর, কোল্ড ক্রিম আপনার ত্বকের গভীরে কাজ করে’ মনে আছে ? সাহিত্য এইসব বিধি ভাঙা নিয়েই প্রাণময় হয়ে থাকে।


প্রশ্ন :
সাম্প্রতিক সময়ে লিখতে আসা লেখকরা কি সমাজের অন্তঃজ শ্রেণীকে ভুলে যাচ্ছেন? আপনার কি মনে হয়?


অমর মিত্র :
যাঁর সেই অভিজ্ঞতা আছে, তিনি লিখবেন। লিখছেনও কেউ কেউ। আনসারউদ্দিন লিখছেন দরিদ্র মুসলমান সমাজ নিয়ে। তিনি চেনেন তাই লিখেছেন। না চিনে লেখা ঠিক নয়। আর অনুভবে, উপলব্ধিতেও হয়। দেখায় হয়। লেখকের মরমে পশিলে হয়। লেখকের দর্শন ঠিক করে তিনি কী লিখবেন।


প্রশ্ন :
ভারতের অন্য প্রদেশের আজকের সাহিত্য সম্পর্কে আপনার কি মতামত? তরুণ প্রজন্ম-ই বা কতটা প্রভাব ফেলছে সেইসব সৃষ্টিতে?

অমর মিত্র :
অন্য প্রদেশে অন্য ভাষায় যা লেখা হয়, অন্তত গল্প, তা খুবই ভালো। অতি তরুণ তো অনূদিত হন না। যাঁরা অনূদিত হন, পড়েছি। মুগ্ধ হয়েছি।


প্রশ্ন :
আচ্ছা অমর দা, আপনি বিজ্ঞানের ছাত্র। অথচ আপনি সম্পূর্ণভাবে বাংলা সাহিত্যে ডুবে গেলেন। এই ব্যাপারটির পেছনে কি কোনও বিশেষ অনুপ্রেরণা কাজ করেছে?


অমর মিত্র :
বিজ্ঞানের সঙ্গে সাহিত্যের বিরোধ নেই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিজ্ঞানের ছাত্র। কবি বিনয় মজুমদার। অনেক উদাহরণ আছে। স্বচ্ছ দৃষ্টি বিজ্ঞান চর্চায় আসে। সাহিত্য পাঠই সাহিত্যে এনেছে। বিজ্ঞান করেছে যুক্তিবাদী। আর সময় থেকে সময়ান্তরে পরিভ্রমণ বিজ্ঞান না পড়লে হয়তো হত না। আমি রে ব্র্যাডবেরি, আইজ্যাক অ্যাসিমভ, পড়েছি। ছোটবেলায় জুল ভের্ণ , এইচ জি ওয়েলস খুব পড়েছি। খুব ভালো সায়েন্স ফিকশন আমাকে মুগ্ধ করে। সত্যজিতের কিছু গল্প, সেপ্টোপাসের খিদে, খগম অসামান্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ