ইন্দ্রাণী দত্তের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার : বই নিয়ে--লেখা নিয়ে



ইন্দ্রাণী দত্ত গল্প লেখেন। সম্প্রতি উপন্যাসও লিখেছেন। জন্ম পশ্চিম বঙ্গে। থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। পেশায় বিজ্ঞানী। তাঁর গল্প ম্যাজিক্যাল। গল্পপাঠের এমদাদ রহমান ২৫টি প্রশ্ন পাঠিয়েছিলেন ইন্দ্রাণী দত্তকে। প্রশ্নগুলো বইপড়া ও নিজের লেখালেখি নিয়ে। লেখককে জানার জন্য এ প্রশ্নের উত্তরগুলো খুব দরকারী। 

গল্পপাঠ :
কোন লেখক আপনাকে প্রভাবিত করেছেন এবং কীভাবে প্রভাবিত করেছেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
সে তো করেইছেন। বিশেষত শৈশবে, বাল্যে, কৈশোরে , প্রথম যৌবনে। আচ্ছন্ন করার কথা বললে আমি রবীন্দ্রনাথ (গল্পগুচ্ছ), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( চাঁদের পাহাড়, আম আঁটির ভেঁপু, আরণ্যক), বিমল কর (সুধাময়, জননী, খড়কুটো, অসময়), ডস্ট্ভয়েস্কি ( দ্য ইডিয়ট), টুর্গেনিভ (ফাদারস অ্যান্ড সানস), ভিক্টর হুগো ( হাঞ্চব্যাক অফ নোতরদ্যাম), চার্লস ডিকেন্সের ( এ টেল অফ টু সিটিজ, ডেভিড কপারফিল্ড) , হেমিংওয়ের কথা বলব। ভাবলে আরো কিছু নাম অবশ্যই আসবে। কিন্তু আজ মুহূর্তের ভাবনাই বলব। অত্যন্ত অল্পবয়সে পড়া এই সব আখ্যান আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, আক্ষরিক অর্থেই। কতবার পড়েছি একই বই, একই লাইন - সেই আখ্যানের বাইরে ভাবতে পারি নি কিছু -ঐ জগতে ঢুকে গিয়েছি, বেরোতে পারি নি। পরবর্তীকালে অনেক লেখকের লেখা পড়েছি-দেশ, বিদেশের- ভালো লাগা, মুগ্ধ হওয়া সবই ঘটেছে , ঘটে চলেছে- তবে আজকের উত্তরে বিদেশীদের সরিয়ে রেখে শুধু বাংলা সাহিত্যের ছোটো গল্পের কথাই বলি। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ও বিমল কর আমাকে প্রভাবিত করেছেন মূলত। প্রভাবিত বলতে আমার লেখার ধরণে/ গঠনে তাঁদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছে। বিমল করের সূক্ষ্মতা, আখ্যানের সেই অর্থে গল্পহীনতা,আশ্চর্য ইশারাময়তা, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিজ্ঞতার রস, অস্থি মজ্জা, বিপন্নতা দিয়ে গুটিপোকার মতো বুনন, অথচ নিজের উপস্থিতি দীন রেখে গল্পের আয়োজনই রাজকীয় করে তোলা- এই সব এর ছায়া আমার লেখায় পড়ে। এছাড়া শ্রী বিপুল দাসের লেখার ধরণে স্মার্টনেস, তাঁর বাঘের কামড়ের মতো গদ্যর প্রভাব আমার পক্ষে এড়ানো সম্ভব হয় নি।

আর যাঁর কথা না বললেই নয়- তিনি শ্রী অমর মিত্র। -তাঁর শূণ্য থেকে যাত্রা কথাটি আমার পাথেয়। 

আর শ্রী সুভাষ ঘোষাল। সুভাষ ঘোষাল বলেছিলেন , "শুধু গল্প বলা নয়, সেইসঙ্গে গল্প না-বলাও। শুধু কী বলব এই চিন্তাই নয়, সেই সঙ্গে কী বলব না এই দুশ্চিন্তাও।... নৈঃশব্দের সামর্থ্য নিয়ে কতটা এগিয়ে যাওয়া যায় , তার ওপরেই নির্ভর করে সব-মুন্ডু থাকবে না যাবে সেই ভবিতব্য"- আমি এই দর্শনে বিশ্বাসী।

গল্পপাঠ : 
এখন কোন বইগুলো পড়ছেন, খাটের পাশের টেবিলে কোন বইগুলো এনে রেখেছেন পড়বার জন্য?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
এই মুহূর্তে আমার মাথার কাছে ক্লকওয়র্ক অরেন্জ আর ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট। 

গল্পপাঠ : 
সর্বশেষ কোন শ্রেষ্ঠ বইটি আপনি পড়েছেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
শ্রী মণীন্দ্র গুপ্তর অক্ষয় মালবেরি।

গল্পপাঠ : 
আপনার প্রতিদিনকার পাঠের অভিজ্ঞতার কথা বলুন, কখন কোথায়, কী এবং কীভাবে পড়েন?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
 আমার দৈনন্দিন অতীব ব্যস্ততায় কাটে। ইদানিং ভয়াবহ ব্যস্ততা। পাঠের কোনো রুটিন নেই আপাতত।

গল্পপাঠ : 
কোন বইটি আপনার খুব প্রিয় কিন্তু অনেকেই বইটির কথা জানে না-
ইন্দ্রাণী দত্ত :
এর উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। খুব কম মানুষের সঙ্গেই আমার ইন্ট্যারাকশন। একটা সময়, অনেকদিন আগে, বিপুল দাসের নীল আলোর সন্তান বা সরমার সন্ততি পড়ে যখন নিজের ভালো লাগার কথা বলেছি, অনেকেই অবাক হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা কী পড়েন, কী পড়েন না আমার জানা নেই অতএব- এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।

গল্পপাঠ :
কোন বইটি জীবনে একবার হলেও প্রত্যেকের পড়া উচিৎ?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
এই মুহূর্তে যা মনে হচ্ছেঃ রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ, বিভূতিভূষণের আরণ্যক।

গল্পপাঠ : 
ঔপন্যাসিক, গল্পকার, নাট্যকার, সমালোচক এবং কবিদের মধ্যে এখনও লিখছেন এমন কাকে আপনি সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করেন? কেন করেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
ব্যক্তিগতভাবে কোনো লেখককেই আমি সেভাবে চিনি না। কাজেই ব্যক্তিগতভাবে শ্রদ্ধা অশ্রদ্ধার কথা আসে না। যাঁরা লেখেন, তাঁরা সবাই লেখক হিসেবে আমার কাছে মহান। লিখতে পারা, পাঠকের সঙ্গে সংযোগস্থাপন মহৎ গুণ।

গল্পপাঠ : 
লেখক হিসেবে তৈরি হতে কোন বইটি আপনার মনকে শৈল্পিক করে তুলেছে এবং কীভাবে?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
আমার মন শৈল্পিক কী না জানি না। তবে, প্রথম প্রশ্নের উত্তরই হয়তো রিপিট করব এখানে।

গল্পপাঠ : 
কোন বিশেষ ভাব কিংবা পরিবেশ কিংবা পরিস্থিতি আপনাকে লিখতে বাধ্য করে?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। কখনও মনে হয়, না লিখে পারব না। একটা অনুভূতি, অথবা কয়েকটা লাইন তাড়িয়ে বেড়ায়। শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করি। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পাদকের চাপ। তবে লেখা শুরু করে বুঝতে পারি কখনও ক্রোধ কখনও বেদনাবোধ থেকে লেখাটি উৎসারিত হচ্ছে।

গল্পপাঠ : 
আপনি কীভাবে আপনার বইগুলোকে গুছিয়ে রাখেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
বইয়ের তাকে বংলা বই, ইংরিজি বই, লিটল ম্যাগাজিন, গল্পের বই, কবিতার বই আলাদা আলাদা তাকে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করি। বই খুঁজে না পাওয়া আমার ঘোর অপছন্দের।

গল্পপাঠ : 
এই বইগুলো পড়ার পর কোন বইগুলো পড়বেন বলে ভেবেছেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
এলিফ শফক পড়ব, আর পড়ব যে বইটি বুকার পেলো- দ্য সেভেন মুন্স অফ মালি আল্মেডা। আর প্রুস্ত।

গল্পপাঠ : 
শব্দকে আপনি কীভাবে অনুভব করেন? আপনি কি কখনও শব্দের গন্ধ পেয়েছেন?

ইন্দ্রাণী দত্ত : 
শব্দ একটি জ্যান্ত জিনিষ এবং বিপদজনক। সেভাবে মনঃসংযোগ করতে পারলে, ধ্যানে বসার মতো লিখতে বসতে পারলে, শব্দের ঘ্রাণ পাই বই কি। কোন শব্দটা ভারি, কোনটা হাল্কা, কোনটা সুগন্ধি, কোন শব্দে দীপ্তি, কোনটায় মালিন্য- এসব একজন লেখককে চিনতে তো হবেই। সেই বাতিঘর লিখবে না লাইটহাউজ , কোথায় ফুল লিখবে, কখন পুষ্প , কখন কুসুম, গুপ্তচর না স্পাই- শব্দের গন্ধ, পায়ের শব্দ চিনতে তো হবেই। লেখা ব্যাপারটাই তো শব্দকে চেনা। শব্দের আরাধনা। তাকে তো চিনতে হবে। " তোরা শুনিস নি কি শুনিস নি তার পায়ের ধ্বনি, ওই যে আসে, আসে, আসে/যুগে যুগে পলে পলে দিনরজনী/ সে যে আসে, আসে, আসে।.... কত কালের ফাগুন-দিনে বনের পথে/ সে যে আসে, আসে, আসে/ কত শ্রাবণ অন্ধকারে মেঘের রথে সেযে সে, আসে, আসে/ দুখের পরে পরম দুখে, তারি চরণ বাজে বুকে, সুখে কখন্‌ বুলিয়ে সে দেয় পরশমণি।

গল্পপাঠ : 
সাম্প্রতিক কোন ক্ল্যাসিক উপন্যাসটি আপনি পড়েছেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
অমিয়ভূষণ মজুমদার পড়লাম কদিন আগে। অনেক কিছু খেয়াল করছি, যা আগে করি নি। উপমাগুলি বিশেষত। যেমন ধরুন- গড় শ্রীখণ্ডে একটি চরিত্রের চোখের বর্ণনাঃ "যেন একটি মীনের ছায়া জলের তলায় স্থির হয়ে আছে, এখনই চঞ্চল হয়ে উঠবে।" বা এই খানটা-"আকাশে যূধ্যমান হাওয়াই জাহাজের মতো দ্রুতগতিতে মেঘ চলেছে। কনক ঘোড়ার গতি দ্রুততর করে দিলো। .... কনকের পিছন দিকে তখন বর্ষা নামলো চিকন্দিতে। ... বৈশাখের এত সব বাতাস কোথায় আকাশের কোন দ'য়ে আটকে ছিলো, ... হাসির মতো শব্দ করে বাজ পড়ে সে দ'এর বাঁধে চিড় খেয়ে গেলে, বাতাস হু হু করে বেরিয়ে এলো। সান্যালবাড়ির কাছারির জানলা দিয়ে লাইমশাখার গন্ধ ধুয়ে নিয়ে তাদের বসবার ঘরে জলের ছাঁট ঢুকলো।"

গল্পপাঠ : 
আপনি যখন একটি বইয়ের কাজ করছেন, লিখছেন, সম্পাদনা করছেন, কাটাকাটি করছেন, সেই সময়টায় আপনি কোন ধরণের লেখাপত্র পড়েন? আবার ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে কী ধরণের লেখা আপনি এড়িয়ে চলেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
ঐ সময় নিমগ্ন থাকতে চাই। কিছু পড়ি না। প্রভাবিত হতে চাই না।

গল্পপাঠ : 
সম্প্রতি পঠিত বইগুলো থেকে এমন কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার কি জেনেছেন যা আপনার লেখক- জীবনকে ঋদ্ধ করেছে?

ইন্দ্রাণী দত্ত : 
মণীন্দ্র গুপ্ত যত পড়ছি তত বিস্মিত হচ্ছি। অক্ষয় মালবেরি ছাড়া একটি দিনও থাকতে পারছি না ইদানিং। ধ্রুবতারার মত এক একটি শব্দ, বাক্য এক্সপ্রেশন। রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে একবার চোখ বোলাই। মাথার কাছে সারারাত জেগে বসে থাকে সেই শব্দগুলি। দ্যুতি বেরোয়। "" নিঃশ্বাস নিই তাই বেঁচে থাকি। ভিতরে একা, সুখী না, দুঃখীও না। দশদিকে অসীম শূন্য এবং চিররহস্য। ""

গল্পপাঠ : 
আপনি কোন ধরণের লেখা পড়তে আগ্রহ বোধ করেন, আর কোন ধরণটি এড়িয়ে চলেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
আমি সবই পড়ি। গ্রহণ বর্জনের ব্যাপার তার পর। তবে বিদেশি থ্রিলারের প্রতি বিশেষ টান আছে আমার।

গল্পপাঠ : 
আপনার জীবনে উপহার হিসেবে পাওয়া শ্রেষ্ঠ বই কোনটি?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
এর তো কোনো শেষ নেই- ছোটোবেলায় জেঠু দিয়েছিল গল্পগুচ্ছ- "অপরাহ্নে মেঘ করিয়াছিল, কিন্তু বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা ছিল না। .... রাইচরণ ধীরে ধীরে গাড়ি ঠেলিয়া ধান্যক্ষেত্রের প্রান্তে নদীর তীরে আসিয়া উপস্থিত হইল। নদীতে একটিও নৌকা নাই, মাঠে একটিও লোক নাই মেঘের ছিদ্র দিয়া দেখা গেল, পরপারে জনহীন বালুকাতীরে শব্দহীন দীপ্ত সমারোহের সহিত সূর্যাস্তের আয়োজন হইতেছে। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে শিশু সহসা এক দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া বলিল, "চন্ন, ফু।" সমস্তজীবনের মত চন্ন ফু ডেমোক্লিসের খড়্গের মত আমার মাথায় ঝুলে রইল- একটা ভয় পিছু নিল সারাজীবনের মত-এই বুঝি কেউ বলল - চন্ন ফু- এই বুঝি মুহূর্তের অসাবধানতা , এই বুঝি ঝপ করে একটা শব্দ হবে আর "চন্ন বলিয়া কেহ উত্তর দিল না, দুষ্টামি করিয়া কোনো শিশুর কন্ঠ হাসিয়া উঠিল না; কেবল পদ্মা পূর্ববৎ ছল্‌ছল্‌ খল্‌খল্‌ করিয়া ছুটিয়া চলিতে লাগিল, যেন সে কিছুই জানে না এবং পৃথিবীর এই-সকল সামান্য ঘটনায় মনোযোগ দিতে তাহার যেন এক মুহূর্ত সময় নাই।" মা,বাবা র দেওয়া জীবনস্মৃতি - "খড়খড়ি দেওয়া লম্বা বারান্দাটাতে মিটমিটে লন্ঠন জ্বলিতেছে, সেই বারান্দা পার হইয়া গোটা চার পাঁচ অন্ধকার সিঁড়ির ধাপ নামিয়া একটি উঠান ঘেরা অন্তঃপুরের বারান্দায় প্রবেশ করিয়াছি, বারান্দার পশ্চিমভাগে পূর্ব-আকাশ হইতে বাঁকা হইয়া জ্যোৎস্নার আলো আসিয়া পড়িয়াছে, বারান্দার অপর অংশগুলি অন্ধকার, সেই একটুখানি জ্যোৎস্নায় বাড়ির দাসীরা পাশাপাশি পা মেলিয়া বসিয়া প্রদীপের সলিতা পাকাইতেছে" ।

রাজকাহিনী দিল মা। আমাদের মফস্সলের বাড়ি, শীতের রাতে ছাদে খচমচ শব্দ ওঠে, বিড়াল হেঁটে যায়, ঠাকুমা কাশে, বাবাকে ডাকে, মাঠ পেরিয়ে শববাহীর দল ধবনি দেয়- বল হরি হরি বোল! আমার মনে পড়ে, "সুভাগা দেখলেন, গায়েবের মুখে সূর্যের আলো ক্রমেই ফুটে উঠতে লাগল, আর গায়েবীর কালো চুলে চাঁদের জ্যোৎস্না ধীরে ধীরে নিভে গেল। তিনি মনে -মনে বুঝলেন, গায়েবীকে এই পৃথিবীতে বেশিদিন ধরে রাখা যাবে না।" থরথরিয়ে কেঁপে উঠে বলি, মা, আমি ইচ্ছামৃত্যুর বর চাই।

মা কলেজ ফেরৎ গাদা গাদা বই নিয়ে আসে - সুকুমার সমগ্র, উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র, রুশদেশের উপকথা, কেলে ভূতো, ম্যালাকাইটের ঝাঁপি, বুদ্ধিমতী মাশা, পথের পাঁচালি, চাঁদের পাহাড়, হীরা মাণিক জ্বলে, দেড়শো খোকার কান্ড, আরোগ্যনিকেতন, রবিনসন ক্রুশো , টম ব্রাউন্স স্কুল ডেজ, ট্রেজার আইল্যান্ড, রাজকাহিনী, দক্ষিণের বারান্দা , ঘরোয়া, সকালবেলার আলো, এণিড ব্লাইটন, আগাথা ক্রিস্টি, টিনটিন সব কখানা- 

মা আলমারি খুলে বের করছে বাঁধানো আনন্দমেলা, বলছে, "ব্যালান্স হারাসনি কমল, ব্যালান্স হারাসনি" । আমি আলমারির সামনে থেবড়ে বসে পড়ছি - "কমল উঠে দাঁড়াল। কোনও দিকে না তাকিয়ে মুখ নিচু করে সে মাঠের মাঝে সেন্টার সার্কেলের মধ্যে এসে দাঁড়াল। আকাশের দিকে মুখ তুলল। অস্ফুটে বলল, আমি যেন কখনও ব্যালান্স না হারাই। আমার ফুটবল যেন সারা জীবন আমাকে নিয়ে খেলা করে।"

মা আমার হাতে তুলে দিচ্ছে অসময়, ভুবনেশ্বরী, বালিকা বধূ আর খড়কুটো। মৃত্যু আমার পিছু ছাড়ে না-"অনাবিল জ্যোৎস্না মাথার ওপর, চারপাশ নিঃশ্ব্দ, নির্জন; রাশি-রাশি জোনাকি উড়ছে ঝোপের মধ্যে, আর আমার মা পুরু শ্যাওলার তলায় ডুবে শুয়ে আছে, যেন এতকাল মা যে-শয্যায় শুয়ে এসেছে সেটা মার নিজের মনোমতন হয় নি, এই শ্যাওলার শয্যা, জলজ লতাপাতার আবরণ, ঝোপঝাড়ের নির্জনতা, আকাশ থেকে ঝরে পড়া জ্যোৎস্না মার মনোমত হওয়ায় মা অকাতরে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাথরের ওপর রাখা মার ছোট্ট মাথাটি এক আশ্চর্য জলপদ্মের মতন ফুটে ছিল"।

শ্রেয়াদি দিলেন, বিপুল দাসের শঙ্খপুরীর রাজকন্যা। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে আমার পুনর্যোগ স্থাপিত হল- যেন রিটার্ন অফ দ্য প্রডিগাল সান। এর পরেই লিখতে শুরু করি।

গল্পপাঠ : 
ছোটবেলায় কেমন বই পড়তেন? সেই সময়ে পড়া কোন বই এবং কোন লেখক আপনাকে আজও মুগ্ধ করে রেখেছে?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
এ তো বলতে গেলে শেষ হবে না। এই নিয়ে পূর্বেও বলেছি। আগের প্রশ্নের উত্তরেও আছে। আবার বলিঃ অক্ষরজ্ঞান হয়নি -প্রথম যখন গল্পের কাছে; মা রঙচঙে বই থেকে পড়ে শোনাচ্ছে, সেখানে একটা লাইন- আকাশ ভেঙে পড়েছে রে আকাশ ভেঙে পড়েছে; মা পড়ছে, আর বিশাল একটা কিছু আমাকে গিলে নিচ্ছে, মাথা, মুখ, নাক, কান আর চোখ ঢাকা পড়ছে, দমবন্ধ হয়ে আসছে - এইরকম অনুভূতি হচ্ছে আমার; কিন্তু বিশাল ব্যাপারটা যে কী আর বিরাটত্ব ঠিক কতখানি - সেইটা বুঝতে পারছি না। খাবি খাচ্ছি, তারপর তারস্বরে কেঁদে উঠছি একসময়। অথচ মা কে বারবার বলছি ঐ লাইনটাই পড়তে- ডুবে যাওয়ার অনুভূতি আবার পেতে চাইছি। সবে পড়তে শিখেছি, স্কুল শুরু হয় নি, জেঠু গল্পগুচ্ছ থেকে 'ছুটি' পড়ছে-এই নিয়ে বোধ হয় পঞ্চমবার- "ফটিক খালাসিদের মতো সুর করিয়া করিয়া বলিতে লাগিল, এক বাঁও মেলে না। দো বাঁও মেলে — এ — এ না। ” আমি আবার সেই খাবি খাওয়া কান্না শুরু করে দিয়েছি, কারণ , এরপর ফটিকের মা আসবে আর ফটিক বলবে, “ মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি। ” সম্পূর্ণ অপরিচিত এক বালকের জন্য হাহাকার করে আমি কাঁদছি- নিজেই অবাক হতাম- এ আমার বকুনি খেয়ে কান্না নয়, আছাড় খেয়ে কপাল কেটে কান্না নয়, ইঞ্জেকশন নেওয়ার কান্নাও নয়- কেন কাঁদছি, কার জন্য কাঁদছি কিছুই স্পষ্টই নয়। বস্তুত মরে যাওয়া ব্যাপারটাই তখন আমার কাছে অস্পষ্ট। শব্দের পরে শব্দ সাজানো একটা বাক্য আমাকে কাঁদাচ্ছে আর সেই আশ্চর্য কান্না বারবার কাঁদতে চাইছি আমি-

আবছা মনে হ'ত, এই অবোধ্য আশ্চর্য দাঁড়িয়ে থাকছে একটি কি দুটি লাইনের ওপর-বহু ক্ষেত্রেই তা কাহিনীর বা একটি পর্বের শেষ লাইন - "বড় হইয়া নীলকুন্তলা সাগরমেখলা ধরনীর সঙ্গে তাহার বড় ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটিয়াছিল। কিন্তু যখনই গতির পুলকে তাহার সারাদেহ শিহরিয়া উঠিত, সমুদ্রগামী জাহাজের ডেকে হইতে প্রতিমুহূর্তে নীল আকাশের নব-নব মায়ারূপ চোখে পড়িত, হয়তো দ্রাক্ষাকুঞ্জবেষ্টিত কোনো নীল পর্বতসানু সমুদ্রের বিলীনমান চক্রবাল-সীমায় দূর হইতে দূরে ক্ষীণ হইয়া পড়িত, অদূরে অস্পষ্ট-দেখিতে পাওয়া বনভূমি এক প্রতিভাশালী সুরস্রষ্টার প্রতিভার দানের মতো মহামধুর কুহকের সৃষ্টি করিত তাহার ভাবময় মনে--তখনই তাহার মনে পড়িত এক ঘনবর্ষার রাতে, অবিশ্রান্ত বৃষ্টির শব্দের মধ্যে, এক পুরনো কোঠায়, অন্ধকার ঘরে, রোগশয্যাগ্রস্ত এক পাড়াগাঁয়ের গরীবঘরের মেয়ের কথা--তাহার হারানো স্মৃতি। অপু, সেরে উঠলে, আমায় একদিন রেলগাড়ি দেখাবি?" 

গোটা স্কুলজীবন এইভাবে প্রথম লাইন কিম্বা শেষ লাইন কখনও বা শুধুই শব্দ টুকিয়ে নিয়েছি - অ্যাসফল্ট শব্দটা ননী ভৌমিকের রাশিয়ান গল্পের অনুবাদে পেয়েছিলাম, কিম্বা ম্যালাকাইট অথবা যেদিন পড়েছিলাম, সরণিতে গৃহকোণে যেন , সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠে আলো, বায়োস্কোপের বাক্সে চোখ রাখার মত ব্যাপার ঘটেছিল- বরফ পড়া পথ, দুদিকে কাঠের বাড়িতে আলো জ্বলছে, আকাশে তারা- এই সবই দেখা হয়ে গিয়েছিল স্রেফ একটা শব্দে। সরণি, সরণি , সরণি- কী আশ্চর্য সুন্দর শব্দ- সমস্তদিন মাথার মধ্যে গুনগুন করল সরণি,তারপর রয়ে গেল।

ঠাকুমার ঘরে দু’খানি খুব ভারি আয়তক্ষেত্রাকার পিঁড়ি ছিল-আমাদের বাড়ির সব বিয়ে ঐ পিঁড়িতে; ফলতঃ সেই সব পিঁড়িতে অতীতের বিয়ের কিছু স্মৃতি লেগে আছে অবশ্যম্ভাবী - সে হয়ত গঁদের আঠায় সেঁটে থাকা রঙীন কাগজ কিম্বা প্রায় মুছে যাওয়া আলপনা-সেই পিঁড়ি রোদে এনে তার ওপর বাজি সাজাতাম-রং মশাল, ফুলঝুড়ি তুবড়ি চরকি ইলেক্ট্রিক তার সাপবাজি রকেট। দুপুরের রোদ সরে সরে যেত, আমরাও সেইমত পিঁড়ি সরাতাম-রোদ যেন লেগে থাকে বাজিতে। সেই সব হেমন্তের বিকেলে কালি পুজোর প্যান্ডেলে সন্ন্যাসী রাজার গান আর ডায়ালগ শুনতে পাচ্ছি-'যে বাড়িতেই যাওনা সখি'... পরক্ষণেই সুপ্রিয়া দেবীর ভারি গলা; এদিকে রোদ পড়ে আসছে, হাওয়ায় হিম টের পাওয়া যায়, বাজিতে তখনও রোদের গন্ধ। অন্ধকার হ'লেই বাজি পোড়ানো আর একবার শুরু হলেই মুহূর্তে শেষ তারপর আর কিছু নেই, স্রেফ আর কিছু নেই-শুধু পড়া আর পড়া-দুদিন পরে স্কুল খুলবে-অ্যানুয়াল পরীক্ষা -সব মিলিয়ে সেই সময়্টায় ভারি একটা বিষাদ জন্ম নিত। স্কুলের শেষের দিকে ঐ বিষাদ একটা আলোর ময়ূরে বদলে গিয়েছিল-'অন্ধকার আকাশের তলায় দেখতে দেখতে একটি আলোর ময়ূর ফুটে উঠল। আলোর ফুলকিগুলো যেন ভাসছিল... ময়ূরটির আকার যতই বাড়ছিল তার প্রত্যঙ্গগুলি ততই গলে যাচ্ছিল-' অথবা জোনাকি-'চোখের পলকে, মাটির অন্ধকার এ একটি আলো দপ করে জ্বলে উঠল.. উঠল তো উঠলই, গাছের মাথা সমান উঁচু হয়ে রংমশালের তারার মতন তুবড়ির ফুলের মতন ফরফর করে পুড়তে লাগল।।দেখতে দেখতে চারপাশে যেন জোনাকির মেলা বসে গেল... মনে হচ্ছিল একদল লোক যেন অন্ধকারে জোনাকির পিচকিরি ছুঁড়ে মারছে আর পলকে অন্ধকারের বসনে জোনাকি ধরে যাচ্ছে।'

গল্প যে মনে রাখার মত লাইন আর শব্দের বাইরে আরো কিছু দিতে সক্ষম সেইটা বুঝলাম।

সেই সময় অলরেডি পড়ে ফেলেছি, , "মেজদা সামান্য নড়ল। আকাশের দিকে তার মুখটি তোলা, অমল জ্যোৎস্না তার সমস্ত মুখ লেপে রেখেছে, তার দুই অন্ধ নয়ন নিবিড় করে সেই আলো মাখছিল। মেজদা তার সাদামাটা মেঠো সুরেলা গলায় বলল, .. মা যে কত অন্ধ আমি জানতাম। এই অন্ধ চোখ মাকে আর দিতে ইচ্ছে করে না। মা আমার হৃদয়ের চক্ষু পাক"; অথবা, "অমৃত দেখল, এখানে ভগবানের কোনও শেষ নেই। যতই এগোয় ততই বেড়ে যায়"।

বুঝতে পারছিলাম, এই সব গল্প পড়ার আগের মানুষ আর পরের মানুষ আলাদা- যেন পি সি সরকারের ম্যাজিক - বাক্সে ঢুকল একটা মেয়ে- হয় হারিয়ে গেল নয়ত বেরিয়ে এলো বাঘ হয়ে। গল্প সেই সময় থেকে আমার কাছে সার্কাসের আশ্চর্য তাঁবু।

শুধু গল্প , উপন্যাস নয়, রাণী চন্দ পড়েছি মুগ্ধ হয়ে। বুদ্ধদেব বসুর সব পেয়েছির দেশে, কালের পুতুল, আমার শৈশব, যৌবন সিরিজটা। মাধ্যমিক দিয়ে টুর্গেনিভের ফাদার্স অ্যান্ড সানস পড়েছিলাম- -“.... The tiny space I occupy is so infinitesimal in comparison with the rest of space, which I don’t occupy and which has no relation to me. And the period of time in which I’m fated to live is so insignificant beside the eternity in which I haven’t existed and won’t exist... And yet in this atom, this mathematical point, blood is circulating, a brain is working, desiring something... What chaos! What a farce!” চেকভের, মপাঁসার, অসকার ওয়াইল্ডের ছোট গল্প-
কত আর বলব-

গল্পপাঠ : 
এ পর্যন্ত কতগুলো বই অর্ধেক কিংবা পড়া শুরু করে শেষ না করেই ফেলে রেখেছেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
মুরাকামি পড়তে ভালো লাগছিল না- কটি বই অর্ধপঠিত রয়ে গেছে।

গল্পপাঠ : 
কোন বইগুলোয় আপনি নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
বই এবং নিজের লেখা আমার আত্ম আবিষ্কার। বই আমার দর্পণ নয়, সম্ভবত খনিত্র।

গল্পপাঠ : 
কোন বইগুলো জীবনে বারবার পড়েছেন এবং আরও বহুবার পুনর্পাঠ করবেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
গল্পগুচ্ছ, বিমল করের অসময়, জননী, সুধাময়, পূর্ণ অপূর্ণ, খড়কুটো, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের ছোটো গল্প।টুর্গেনিভ, ডস্টয়েভস্কি ( এখনই তো পড়ছি, দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলছিলাম....)

গল্পপাঠ : 
লেখালেখির নিরন্তর প্রক্রিয়ার সঙ্গে কীভাবে একাত্ম থাকেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
আচমকাই হালুম করে গর্দান বরাবর ঝাঁপ দিয়েছিল গল্প। টুঁটি চেপে ধরেছিল। একদিন হাত ধরল। নতজানু আমিও কথা দিয়েছি, তোমায় যতনে রাখিব হে-

এইভাবে চলছে। ভালবেসে।

গল্পপাঠ : 
কে সেই লেখক যাকে আপনি পাঠ করেন গভীর আনন্দের সঙ্গে, যিনি আপনার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
আগের অনেক প্রশ্নেই এর উত্তর রয়েছে। 

গল্পপাঠ : 
গল্প লিখতে শুরু করেন কীভাবে? একজন রিপোর্টারের মতোই কি আপনি চারপাশটাকে অবিরাম পর্যবেক্ষণে রাখেন? আপনি কি নোট নেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত :
লেখা গিয়ে সিরিয়াস হওয়ার পর থেকে টুকে রাখার ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ভাবনা, কী একটা দুটো লাইন মনে এলেই লিখে রাখি। হাতের কাছে নোটবুকটি না থাকলে স্টিকি নোটে, মোবাইলের নোটস- যেখানে হোক লিখে রাখি। শুধু ভাবনা নয়, কিছু দৃশ্যও- লিখে রাখি বা ছবি তুলে রাখি। কী ভাবে, কবে কোথায় ব্যবহার করব জানি না- কিন্তু জমিয়ে রেখে দিই। দৃশ্য হোক, শব্দ হোক বা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন - এসবই বীজ বা উপাদান। তার সঙ্গে একটা অনুভূতি। এটা একটা গল্পের স্টার্টিং পয়েন্ট হতে পারে নাও হতে পারে। হয়তো নোটবুকে টুকে রাখা জাস্ট একটা লাইন থেকে গল্প শুরু করলাম, বেশ ক লাইন লিখলাম, লেখা তখনও কোনো অভিমুখই নেয় নি, দুম করে একটা দৃশ্য, শব্দ আর তার সঙ্গে আবছা অনুভূতি মনে পড়ে গেল, যা নোটবুকে টোকা নেই- গল্পটা অভিমুখ নিয়ে নিল এই নোটবুক বহির্ভূত উপাদান দিয়ে। কী করে এটা হয় আমি জানি না- মস্তিষ্কে কী কাজ চলে , নিউরনরা কোন সিগন্যাল বহন করে সেই মুহূর্তে আমি জানি না- তবে ঐ মুহূর্তগুলো যেন হঠাৎ হাওয়ায় ভেসে আসা ধন। মাঝে মাঝে এক একটা বীজ যেমন উড়ে আসে। লিখিয়ে নেয়। 

গল্পপাঠ : 
লেখালেখির সবচেয়ে কঠিন দিক হিসেবে কোনটিকে চিহ্নিত করবেন?
ইন্দ্রাণী দত্ত : 
এক :  শূন্য থেকে বিষয় হয়ে ওঠা; 
দুই : শিল্প হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে যাওয়া।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ