আহমাদ মোস্তফা কামালের গল্প : বড়োদের গল্প যেমন হয়



প্রতিদিন গল্প শোনার সেই ছোটবেলার নেশা এখনো মাঝে-মাঝে পেয়ে বসে ঊর্মিমালাকে। এটা তার নাম নয়, দাদু ডাকে এই নামে, ঊর্মির সঙ্গে মালা যুক্ত করে। সে নিজেও খুব ভালোবাসে এই ডাক। নিজের দাদুই তার ‘গল্পদাদু’, যদিও সে আবদার করে দাদু-দাদি দুজনের কাছেই, কিন্তু দাদুর মতো দাদি অত সুন্দর করে গল্প বলতে জানে না। এখন অবশ্য আর তেমন একটা আবদারও করা হয় না, সে বড়ো হয়ে গেছে কিনা! কলেজের পরীক্ষা শেষ, এরপর সে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে, বড়ো হতে আর বাকি কই! কিন্তু এই অফুরন্ত অবসরে বই পড়ে, টিভি দেখে, ইন্টারনেটে ঘোরাঘুরি করেও যেন কোনো-কোনোদিন সময় কাটতে চায় না। তখন আর কিছুই ভালো লাগে না, মন ভার হয়ে থাকে, মনে হয়-- এই শহর ছেড়ে কোথাও চলে যেতে পারলে বেশ হতো! শহরটা যেন সাঁড়াশির মতো তার গলা চেপে ধরে মাঝে-মাঝে। কিন্তু চাইলেই তো আর যাওয়া যায় না, হাসফাঁস লাগলে সে তাই দাদুর কাছেই যায়, বলে: একটা গল্প বলো তো দাদু।

তুই না বড়ো হয়ে গেছিস, এখনো গল্প শুনতে চাস কেন?

বড়ো হয়ে গেছি! দাদি না তখন বললো, তুমি এখনো অত বড়ো হওনি যে বান্ধবীর বাসায় গিয়ে রাত কাটাবে!

তোর দাদি তো আমাকেও ওসব বলে! আমি পাত্তাই দিই না।

কী যে মুশকিল! একবার বলো বড়ো হয়ে গেছি আবার বলো অত বড়ো হইনি। তুমি বলো, দাদি বলে, মা-বাবা বলে, ভাইয়া-আপুও বলে। আসলে যে কোনটা সত্যি!

তোর বয়স কত হলো?

আবার ভুলে গেছ! সেদিন না আঠারো হলো আমার!

ওহ! তাহলে তো সত্যিই বড়ো হয়ে গেছিস।

বড়ো হলে হয়েছি। বড়োদের কি গল্প শুনতে ইচ্ছে করে না?

তা করে। তবে ছোটদের গল্প একরকম, বড়োদের গল্প আরেকরকম।

উফ দাদু! এত কথা না বলে গল্প বলো তো!

তাহলে একটা বড়োদের গল্পই শোনাই তোকে।

আচ্ছা।

অনেক-অনেক দিন আগের কথা। এক দেশে একটা অপূর্ব সুন্দর শহর ছিল...

আচ্ছা দাদু, তোমার সব গল্পই অনেক-অনেক দিন আগের গল্প কেন? এই সময়ের কোনো গল্প নাই?

গল্পের মধ্যে প্রশ্ন করলে আমি গল্প বলি না।

ও হ্যাঁ। শুধু ‘তারপর কী হলো’ বলা যাবে, তাই তো? ভুলে গিয়েছিলাম। ঠিক আছে আর প্রশ্ন করবো না, তুমি বলো।

তো সেই শহরের চারপাশে ছিল নদী, আর শহরজুড়ে ছিল অজস্র গাছ, সেখানে থাকতো অনেক পাখি, পাখির ডাকে ঘুম ভাঙতো শহরবাসীদের। ছোটখাটো শান্ত-স্নিগ্ধ শহর ছিল সেটি। কোনো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দুর্ভোগ-দুর্ভাবনা ছিল না। লোকগুলোও ছিল আড্ডাপ্রিয়, আমুদে আর অলস ধরনের। সবাই সবাইকে চিনতো, দেখা হলে কুশল-বিনিময় তো করতোই, পারলে কিছুক্ষণ আড্ডাও দিতো। কারো কোনো তাড়া ছিল না। অল্পে তুষ্ট ছিল সবাই। কিন্তু একসময় এক বিচিত্র সমস্যা দেখা দিলো শহরে। চুরি হতে লাগলো এখানে-ওখানে, এ-বাসায় ও-বাসায়, দোকানে-বাজারে, অফিস-আদালতে। টাকা-পয়সা তো বটেই, গয়নাগাটি, জিনিসপত্র সবই। লোকজনের কথাবার্তার বিষয়ও বদলে গেল। একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে হয়তো জিজ্ঞেস করতো: কী হারালো আজকে?

প্রশ্ন শুনে মলিন মুখেও হাসতো অপরজন : আমার হাতঘড়িটা!

যাক! অল্পের ওপর দিয়ে গেছে!

অল্প! আমার মা দিয়েছিলেন ওটা। তাঁর পবিত্র স্মৃতি হিসেবে যতœ করে রেখে দিয়েছিলাম। অল্প কিছু নয়।

ওহ! কী আর করবেন ভাই! মেনে নেন।

হ্যাঁ, কারো কিছু করার ছিল না বলে সবাই ব্যাপারটা মেনে নিতে চেষ্টা করছিল। না মেনে উপায় কী? শহরে তখন রোজই চুরি হচ্ছে। সব বাসা থেকেই কিছু-না-কিছু হারাচ্ছে প্রতিদিন। কে নিচ্ছে, কেন নিচ্ছে, ধরা যাচ্ছে না কিছুতেই। প্রথম প্রথম সবাই এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই ভেবেছিল। এক বাড়িতে চুরি হলে অন্য বাড়িগুলোতে তা বড়োজোর মুখরোচক গল্পের বিষয় হতো। কিন্তু চুরি ক্রমশ বেড়ে চললো। এক বাড়ি-দু’বাড়ি-তিন বাড়ি এভাবে বাড়তে বাড়তে সব বাড়িতেই ঘটতে লাগলো চুরির ঘটনা। শুধু বাড়ির সংখ্যাই বাড়লো না, আগে হয়তো সপ্তাহে একবার, তারপর দু-তিন দিন পরপর একবার চুরি হতো, তারপর প্রতিদিনই ব্যতিক্রমহীনভাবে চলতে লাগলো এই চুরির উৎসব। মুখরোচক গল্প হয়ে রইলো না আর বিষয়টি, বরং দুঃশ্চিন্তার ভাঁজ পড়লো শহরের অভিভাবকদের কপালে। হচ্ছে কী এসব, অ্যাঁ? কী হচ্ছে? প্রত্যেক বাড়িতে চুরি হচ্ছে, দোকানপাটে চুরি হচ্ছে, অফিস-আদালতে চুরি হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চুরি হচ্ছে, এমনকি উপাসনালয়েও চুরি হচ্ছে, অথচ চোর ধরা পড়ছে না, এ কেমন কথা? শুরুতে সন্দেহ করা হতো গৃহকর্মীদের। সাধারণত যা হয় আর কি! এরাই ঘরের মধ্যে থাকে কিনা, ওদেরই তো সুযোগ বেশি! সেই ধাক্কায় বেশ কিছু গৃহকর্মী বাদ পড়ে গেল বিভিন্ন বাসা থেকে। তারপরও চুরি থামলো না। এরপর সন্দেহের তালিকায় এলো দারোয়ান এবং ড্রাইভাররা। কারণ ওরাও নানা ছুতোয় বাসার ভেতরে ঢোকার অনুমতি পায়। প্রমাণ না থাকলেও স্রেফ সন্দেহের বশে চাকরি খোয়ালো বেশ কিছু দারোয়ান ও ড্রাইভার। না, তাতেও লাভ হলো না। চুরি তো কমলোই না, বরং বেড়েই চললো। বাড়ছিল সন্দেহভাজন চোরের তালিকাও। হকার, ফেরিওয়ালা, দুধওয়ালা, মিস্ত্রি, সবজীওয়ালা-- মানে যারা অহরহই আসে নানা কাজে, এমনকি বেড়াতে আসা আত্মীয়স্বজনরাও সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ গেল না। তাতে অস্থিরতা বাড়লো, লাভ হলো না কিছুই, বরং ক্ষতি হলো অনেক। শহরের কোনো বাড়িতে আর গৃহকর্মী রইলো না, দারোয়ান-ড্রাইভাররাও চলে গেল, হকাররা সংবাদপত্র বিলানো বন্ধ করে দিলো, ডিশ লাইনগুলো অচল, ওরাও আর আসে না, সবজী বা মাছ বেচতে আসে না কেউ, এমনকি আত্মীয়স্বজনরাও শহরের বাসিন্দাদের ত্যাগ করলো। কে-ই বা চুরির অপবাদ নিতে চায়, কে-ই বা আত্মসম্মান খোয়াতে চায়? শহরবাসীরা পড়লো মহাবিপদে। এই লোকগুলো ছাড়া যে তাদের জীবন প্রায় অচল, সেটা তারা অনুভব করতে লাগলো ওরা চলে যাওয়ার পর। কিন্তু চুরি কেন কমছে না? শহরের মুরুব্বিরা একসঙ্গে বসে শলাপরামর্শ করেন, কী করা যায় তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তর্ক-বিতর্ক করেন, তারপর হয়তো কোনো একটা সিদ্ধান্ত নেন। পুরো শহর উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়, প্রাচীরের ওপরে কাঁটাতার; প্রবেশ পথে বিশাল বিশাল গেট, যেন কিছুতেই অচেনা কেউ ঢুকতে না পারে। সন্ধ্যার পার হতে-না-হতে সেই গেটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। শহরের বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউ ঢুকতে গেলে তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হয়। যুবক ছেলেরা সারা রাত জেগে পাহারা দেয়। তবু সকালে জানা যায়-- প্রতিটি বাসা থেকে কিছু-না-কিছু খোয়া গেছে।

চুরির ধরনও পাল্টালো। আগে শুধু টাকা হারাতো, তারপর বাবার হাতের ঘড়ি, মায়ের হাতের চুড়ি বা গলার হার, এমনকি দাদা বা দাদির ব্যবহৃত জলের গ্লাসটা, যা কেবল স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই সঞ্চিত ছিল, তাও খোয়া যেতে লাগলো। টাকা-পয়সা, গয়নাগাটি হারালে জাগে ক্ষোভ ও ক্রোধ, কিন্তু স্মৃতিচিহ্ন হারালে জেগে থাকে দুঃখবোধ ও বেদনা। বিষণœ হয়ে যেতে লাগলো মানুষ। ধীরে ধীরে চুপ হয়ে যেতে লাগলো তারা। আর এই ফাঁকেই হারাতে লাগলো আরো অনেক কিছু।

শিশুদের সারল্যে-ভরা শৈশব হারালো, হারালো কিশোরদের দুরন্তপনা, তরুণ-যুবকদের সাহস-জেদ-সংকল্প-স্বপ্ন হারালো, তরুণ-তরুণীদের প্রেম হারালো, দম্পতিদের সুখ ও উচ্ছ্বাস হারালো, বৃদ্ধদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হারালো; গাছ থেকে ফুল হারালো, ফল থেকে বীজ হারালো, হারিয়ে গেল পাখির ডাক; নদীর জলের শুদ্ধতা হারালো, পাহাড়ের সবুজ হারালো, বনভূমির বৃক্ষ হারালো; উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা হারালো, অভিযাত্রীদের উদ্যম হারালো, ভ্রমণবিলাসীদের আনন্দ হারালো; মানুষ হারালো সম্পর্ক, শ্রদ্ধা, স্নেহ-মমতা; একে অপরের দিকে ক্রুর চোখে তাকিয়ে থাকতে লাগলো তারা, সে চোখে সন্দেহ-অবিশ্বাস-সংশয়, সে চোখে ঘৃণা ঘৃণা ঘৃণা। যে শহরের মানুষের চোখে ছিল মায়া, তাদের বেঁচে থাকার মূলমন্ত্রই ছিল মায়া, সেই চোখে এখন শুধুই ঘৃণা।

আচ্ছা দাদু, এত কিছু হারিয়ে গেল, সেই শহরের মানুষরা কিছুই করলো না? -- প্রশ্ন না করার শর্ত ভুলে গিয়ে জিজ্ঞেস করে ঊর্মি।

নাহ।

কেন?

শহর-প্রধানের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে।

সেই শহরে প্রধানও ছিল?

সব শহরেই প্রধান থাকে রে টুনিমেম।

কিন্তু লোকেরা নিজেদের সমস্যার কথা বললে প্রধানের বিরাগভাজন হবে কেন?

কেন হবে তা তো জানি না। তিনি বোধহয় বিরক্ত হতে ভালোবাসতেন!

যেগুলো হারিয়ে গেল সেগুলো আবার ফিরিয়ে আনা যায় না, দাদু?

কি জানি! যাদের বয়স তোর মতো, এই ধর আঠারো-ঊনিশ, কিংবা কুড়ি-একুশ, বা বাইশ-তেইশ, তারা চাইলে হয়তো ফিরিয়ে আনতে পারে। বয়স বেড়ে গেলে তো শহর-প্রধানের স্তুতি করেই জীবন পার করতে হবে। হয় স্তুতি করো, অথবা ভয় পাও, নইলে মরো! কিন্তু তুই এত প্রশ্ন করলে গল্প শুনবি কীভাবে?

আচ্ছা, আর প্রশ্ন করবো না। বলো।

একদিকে চুরির পরিমাণ বাড়তেই লাগলো অন্যদিকে পাল্টে যেতে লাগলো শহরের চেহারা। বড়ো বড়ো অট্টালিকা উঠলো, নদীর ওপরে তৈরি হলো সেতু, নদীর নিচে পাতালপথ, রাস্তার ওপর উড়াল সড়ক আর রেলপথ; সব চোখ ধাঁধানো ব্যাপারস্যাপার। এসব করতে গিয়ে গাছগুলো কাটা পড়লো, পাখিগুলো গেল পালিয়ে। রুক্ষ, রুদ্র, অসহনীয় হয়ে উঠলো শহরের আবহাওয়া। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, আকাশে মেঘ জমে কিন্তু বৃষ্টি পড়ে না, নদীতে জল থাকে কিন্তু মাছ থাকে না, থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক; বিস্তীর্ণ প্রান্তর থাকে কিন্তু সবুজের চিহ্ন থাকে না, থাকে ইটভাটার চিমনি; বনভূমিতে বৃক্ষের বদলে থাকে কারাখানার কালো ধোঁয়া।

এর মধ্যেই চুরির ধরন আবারো পাল্টালো। এবার হারিয়ে যেতে লাগলো মানুষ। আজ এ-বাড়ির অমুক নেই তো কাল ও-বাড়ির তমুক নেই। বিষণœতার বদলে এবার ভর করলো আতঙ্ক। কীভাবে হারাচ্ছে, কেন হারাচ্ছে, কোথায়ই বা হারাচ্ছে মানুষ? উদ্বিগ্ন-আতঙ্কিত লোকজন ভিড় করলো শহর প্রধানের কাছে, বললো-- মাননীয়, একটা কিছু বিহিত করুন!

আমি কী বিহিত করবো? -- ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন প্রধান।

মানুষ হারিয়ে যাচ্ছে আর আপনি কোনো ব্যবস্থা নেবেন না?

ওরকম একজন-দুজন হারালে কিছু হয় না।

এটা কোনো কথা বললেন মাননীয়? যার হারাচ্ছে সেই জানে হারানোর বেদনা কত গভীর!

তা কি আর আমি জানি না? আমিও কি আপনজন হারাইনি?

মানুষ নীরব হয়ে থাকে। হ্যাঁ, তিনিও তো হারিয়েছেন! কিন্তু তাতে তাদের উদ্বেগ দূর হয় না। তিনি হারিয়েছেন বলে সবাইকেই হারাতে হবে, এ আবার কেমন কথা? কেউ কেউ ফিসফিসিয়ে বলেও সেটা। কিন্তু প্রধানের কান বড়ো তীক্ষè, কিছুই তাঁর শ্রবণ-শক্তির বাইরে নয়, এমনকি ফিসফিস কথাও নয়। তিনি এবার অভিমানভরে বলেন-- আমি কতবার বলেছি, এসব ঘটনা সহজভাবে নাও। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কথা তোমরা শুনছো না। বুঝতে পারছি, আমার ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেছ তোমরা, তোমাদের নতুন প্রধান দরকার। ঠিক আছে, তোমরাই ভোট দিয়ে নির্ধারণ করো, কে হবে তোমাদের প্রধান।

লোকজন সমস্বরে বলে ওঠে-- না না, আমরা মোটেই আস্থা হারাইনি। আপনার বদলে আর কাকেই বা বেছে নেবো আমরা? আপনার চেয়ে আর কে ভালোবাসেন এই শহরকে? আপনি মহান, আপনি অতুলনীয়, আপনি ম্যাজিক ম্যান...

না, ভোট তোমাদের দিতেই হবে।

না না ভোটাভুটির কী দরকার? আমরা তো মেনেই নিয়েছি আপনাকে। বিনাপ্রশ্নে। যতদিন আপনি বেঁচে আছেন ততদিন আপনিই আমাদের অভিভাবক।

মুখে বললে হবে না। ভোট দিয়ে তার প্রমাণ দাও।

লোকজন দোটানায় পড়ে। এমনিতেই অস্তিত্বের সংকট, তারওপর শহর-প্রধানের বিরাগভাজন হওয়ার ভয়!

বাধ্য হয়েই তারা মেনে নিলো ভোটের প্রস্তাব। কিন্তু শহর-প্রধানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে কে? কার এত সাহস আছে? তবু কিছু অতি উৎসাহী লোক কোত্থেকে যেন এক বৃদ্ধকে ধরে এনে ভোটে দাঁড় করিয়ে দিলো। আর যায় কোথায়! প্রধানের সমর্থকরা ঝাঁপিয়ে পড়লো তার ওপর; নানা কুৎসা, নানা অপপ্রচার, নিন্দামন্দ চলতে লাগলো তার বিরুদ্ধে, যদিও একসময় সে প্রধানের ঘনিষ্ট মানুষই ছিল। সে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তারচেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো কয়েক দিনেই। জমে উঠলো ভোটের লড়াই। পুরো ব্যাপারটা যে প্রধানের সাজানো, কেউ তা বুঝতেই চাইলো না। বিপুল উৎসব আর উত্তেজনায় মানুষ প্রায় ভুলেই গেল তাদের সংকটের কথা। কিন্তু ভোটের দিন সকালে তারা কেন্দ্রে গিয়ে দেখলো ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে গেছে। ফলাফল ঘোষণা করা হচ্ছে-- শতকরা একশভাগ ভোট পেয়ে পুনর্নিবাচিত হয়েছেন শহর-প্রধান। তিনি যে পুনর্নিবাচিত হবেন তা-তো জানা কথাই, তারাও তো তাঁকেই ভোট দিত, তাই তারা অবাক হলো না। কিন্তু অবাক হলো অন্য এক ব্যাপারে-- তারা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগেই ভোটগুলো দিলো কারা? এতদিন ধরে যারা হারিয়ে যাচ্ছিল তারাই কি কোনো অলৌকিক উপায়ে ফিরে এসে ভোটগুলো দিয়ে গেছে? না, কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেলো না কেউ। বরং হতবিহ্বল, হতভম্ব, বিস্মিত, অপমানিত, অধিকার হারানো লোকগুলো মুখে তালা মেরে দিলো চিরদিনের জন্য।

তারপর কী হলো দাদু?

তার আর পর কী?

গল্প তো শেষ হলো না!

এ গল্পের শেষ নেইরে বোকা। যেখানে মানুষ হারিয়ে গেলেও কোথাও কোনো সাড়া পড়ে না, উল্টো লোকজন মেতে ওঠে সাজানো ভোটের উৎসবে, সেখানে কোনো গল্পেরই শেষ থাকে না।

ঊর্মিমালা দাদুর কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলে : এরকম গল্প বললে কেন দাদু? আমার মন খারাপ লাগছে।

তুই যে বড়ো হয়ে গেছিস, বড়োদের গল্প এমনই হয়রে দাদুমনি!

ঊর্মিমালা বুঝলো, দাদুর কণ্ঠ কেমন ভেজা ভেজা; হয়তো চোখ দুটোও। কিন্তু সেদিকে তাকাবার সাহস পেলো না সে। দাদুর মায়াভরা চোখে জল দেখতে চায় না ঊর্মি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ