মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাস : আমার যেদিন ভেসে গেছে--পর্ব ৩০



অনুবাদ : উৎপল দাশগুপ্ত
পর্ব ৩০

শান্তি স্থাপন হবার পর যখন গ্রীষ্মের ঊষ্ণ বাতাস সবে বইতে শুরু করেছে, টারার বিচ্ছিন্ন অবস্থা অকস্মাৎ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তারপর বহু মাস ধরে জীর্ণ স্বল্পবাস ক্ষুধার্ত মানুষ দল বেঁধে লাল টিলা কষ্টেসৃষ্টে অতিক্রম করে টারার প্রাঙ্গনের বৃক্ষছায়ায় এসে হাজির হতে লাগল। খাদ্যের জন্য, রাতের আশ্রয়ের জন্য। কনফেডারেট সৈন্য ওরা, হেঁটে বাড়ি ফিরছে। জনসনের বাহিনীর অবশিষ্ট জওয়ানদের উত্তর ক্যারোলাইনা থেকে রেলপথে অ্যাটলান্টায় এনে ছেড়ে দিয়েছে। সেখান থেকে ওরা পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করেছে। জনসনের বাহিনী চলে যেতে না যেতেই ভার্জিনিয়ার পশ্চিম বাহিনীর অভিজ্ঞ, রণক্লান্ত সেনারাও আসতে শুরু করলেন। আরও দক্ষিণে ওঁদের বাড়িতে পৌঁছনোর ইচ্ছা নিয়ে। সেই বাড়ি এখনও দাঁড়িয়ে আছে কিনা জানা নেই, পরিবারের লোকজনও হয়ত এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে, কিংবা হয়ত বেঁচেই নেই। হেঁটেই ফিরছেন বেশির ভাগ, ভাগ্যবান দু’চারজন তাঁদের হাড়জিরজিরে ঘোড়ায় অথবা খচ্চরে। আত্মসমর্পণের শর্ত অনুযায়ী ওগুলো ওঁরা রাখবার অধিকার লাভ করেছেন। কৃশ পশু, নিতান্ত অনভ্যস্ত চোখেও বলে দেওয়া যায় যে ফ্লোরিডা বা দক্ষিণ জর্জিয়ার মত দূর গন্তব্য অবধি পৌঁছনোটাই অনিশ্চিত।

বাড়ি ফিরে যাচ্ছি! বাড়ি ফিরে যাচ্ছি! কেবল এই ভাবনাটাই সবার মনে কাজ করে চলেছে। কেউ চুপচাপ, কেউ দুঃখী, আবার কেউ কেউ খুশিতে উচ্ছ্বল। কৃচ্ছসাধন নিয়ে অনেকের মনেই জমে আছে ক্ষোভ, কথাবার্তায়, হাবেভাবে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে। তবু যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে, আর ওরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, এই ভাবনাটাই ওদের মনে আশা জাগাচ্ছে। কিছু লোকের মধ্যে একটা তিক্ততাবোধ। স্ত্রী আর বৃদ্ধ মা বাবার কাছে সেই তিক্ততাবোধ ছেড়ে এসেছে। যথাশক্তি লড়াই করেও পরাজিত হয়েছে। এখন সেই পরাজিত পতাকার আশ্রয়েই শান্তিতে চাষবাস করে বাকি জীবনটা কাটাতে চায়।

বাড়ি ফিরে যাচ্ছি! বাড়ি ফিরে যাচ্ছি! এছাড়া ওদের মুখে আর কোনও কথাই নেই। যুদ্ধের কথা নয়, লড়াইয়ের ময়দানে হওয়া জখমের কথা নয়, বন্দী হয়ে জেলে কাটানোর কথা নয়, ভবিষ্যতের কথাও নয়। পরে কখনও হয়ত ছেলেমেয়ে, নাতিনাতনিদের কাছে যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করবে, যুদ্ধ নিয়ে নানান রকম রঙ্গরসিকতা করবে, হানাহানির গল্প, ক্ষিধের কথা, বাধ্য হয়ে পলায়ন করা, সব গল্পই করবে, তবে এখন নয়। এদের কারও একটা হাত নেই, বা একটা পা নেই, কেউ কেউ যুদ্ধে একটা চোখ হারিয়েছে, সারা শরীরে ক্ষতের দাগ বহন করে আছে, বর্ষায় কিংবা শীতে হয়ত বেদনায় কাতর হতে হবে – যদি সত্তর বছরও বাঁচে ততদিনই। এই মুহুর্তে এসব নিতান্তই তুচ্ছ ব্যাপার। পরে ততটা তুচ্ছ নাও লাগতে পারে।

বৃদ্ধ হোক কি তরুণ, মুখর হোক কি নীরব,এক সময় ধনী কৃষক ছিল কি গরীব চাষী ছিল – দুটো জিনিস সবার মধ্যেই বিরাজমান – উকুন আর আমাশা। কীটভারাক্রান্ত অবস্থাতে এরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে স্থানকালপাত্র ভুলে জোরে জোরে চুলকাতে শুরু করত, এমনকি মেয়েদের সামনেও। আর আমাশা – মেয়েরা যেটাকে রেখে ঢেকে ‘রক্তবৎ প্রবাহ’ বলত – প্রাইভেট থেকে জেনারাল – কাউকেই রেহাই দেয়নি। চার বছরের অর্ধাহার, চার বছর ধরে রেশনের শুকনো, সবজে বা আধপচা খাবার থেকে যে লোকসান হবার তাই হয়ে গেছে। টারাতে যারা কয়েকদিন বিশ্রাম নেবার জন্য এসে পৌঁছল, তারা সকলেই হয় এই রোগ থেকে আস্তে আস্তে ভাল হয়ে উঠছে, অথবা এখনও এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে।

ম্যামির মনে হল, “ কনফেডারেট সেনাবাহিনীতে এমন কেউ নেই যার পেট ভাল আছে।” উনুনে কালোজামের শেকড় দিয়ে একটা তেতো মিশ্রণ বানানোর সময় ঘামতে ঘামতে এই পর্যবেক্ষণ। এই ধরণের রোগে এলেন সবার জন্য এই প্রতিবিধানই দিয়ে থাকতেন। “আমার মনে হয় ইয়াঙ্কিরা ওদের যত না পিটিয়েছে, তার অনেক বেশি এই রোগ ওদের কাবু করে দিয়েছে। এই রকম পেট নিয়ে কোনও ভদ্রলোক কি লড়াই করতে পারে!”

ম্যামি সবাইকে এই মিশ্রণ খাইয়ে দিল। জনে জনে পেটের অবস্থার কথা জানার প্রয়োজনও বোধ করল না। সবাই খেয়েও ফেলল, কোনও প্রতিবাদ না করেই। হয়ত সুদূর কোনো গ্রামে, অন্যরকম পরিস্থিতিতে, অন্য কোনও কঠোর ডার্কির হাত থেকে চামচে করে ওষুধ খাওয়ার কথা ওদের মনে পড়ে যাচ্ছিল।

জওয়ানদের আশ্রয় দেওয়া নিয়েও ম্যামির ছুৎমার্গ খুব প্রবল। মাথাভরা উকুন নিয়ে আসলে টারায় প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। খানিকটা দূরে একটা ঘন ঝোপের পাশে ওদের দৌড় করিয়ে নিয়ে যেত। যাতে ওখানেই ওরা ইউনিফর্ম খুলে রেখে একটু হালকা হতে পারে। এক গামলা জল, সাবান আর একটা করে কম্বলের ব্যবস্থা থাকত। ইউনিফর্ম খোলার পর লজ্জা নিবারণের জন্য ওই কম্বল গায়ে জড়িয়ে নিতে পারবে। প্রকাণ্ড কাপড় কাচার গামলায় ওই সব ছাড়া জামাকাপড় গরম জলে সেদ্ধ করতে বসিয়ে দিত। মেয়েরা বুঝিয়েছিল যে এরকম ব্যবহার করে জওয়ানদের এক রকম অপ্রস্তুত করা হচ্ছে। কিন্তু ভবী ভোলবার নয়। উলটে জবাব দিয়েছিল নিজেদের গায়ে উকুন ঘোরাফেরা করছে দেখতে পেলে মেয়েদেরকেই অনেক বেশি অপ্রস্তুত হতে হবে।

নিত্যই যখন সৈন্যদের টারাতে আসা লেগে রইল, তখন ম্যামি ওদের বেডরুম ব্যবহার করার ব্যাপারেও আপত্তি জানাল। যদি একটাও উকুন ওর নজর এড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে! স্কারলেট ওর সঙ্গে তর্কাতর্কিতে না গিয়ে একটা বসার ঘরে ভেলভেটের পুরু গালিচা পেতে ওটাকে ডর্মিটারি বানিয়ে দিল। ম্যামি অবশ্য তাতেও ওকে কথা শুনিয়ে দিতে কসুর করল না। চেঁচিয়ে সবাইকে শুনিয়ে দিল, যে মিস এলেনের গালিচায় জওয়ানদের শোবার ব্যবস্থা করে ও সেটা অপবিত্র করে ফেলেছে। স্কারলেট অবশ্য কথাটা কানে তুলল না। জওয়ানদের কোথাও ঘুমোতে তো হবে। অতএব, আত্মসমর্পণের কয়েক মাসের মধ্যেই, এলোপাতাড়ি চলাফেরা আর ব্যবহারে রোঁয়া উঠে জীর্ণ হতে হতে সেই নরম গালিচার বেশ কিছু জায়গায় গর্ত হয়ে গেল।

প্রত্যেক জওয়ানের কাছেই ওরা সাগ্রহে অ্যাশলের কথা জানতে চাইত। স্যুয়েলেন ওদের থামিয়ে দিয়ে মিস্টার কেনেডির খবর নিত। কিন্তু কেউই ওদের সন্ধান জানাতে পারেনি। নিরুদ্দেশ মানুষদের নিয়ে আলোচনাও ওরা এড়িয়ে যেতে চাইত। নিজেরা বেঁচে ফিরেছে, এটাই ওদের কাছে অনেক পাওয়া। হাজার হাজার মানুষ যারা নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে বা কবরে ঘুমিয়ে আছে – যারা আর কোনও দিনই ফিরে আসবে না, তাদের নিয়ে বৃথা মাথা ঘামিয়ে লাভ কি।

বার বার হতাশ হয়েও মেলানির যাতে ভেঙে না পড়ে, তাই বাড়ির সকলে ওকে সাহস দিত। অ্যাশলে যে কারাগারে বন্দী অবস্থায় মারা যায়নি, সেটাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেরকম হলে কোনও যাজক নিশ্চয়ই চিঠি দিয়ে জানাতেন। জেলে বন্দী থাকতেই পারে, কিন্তু বাড়ি থেকে সেই জেলখানা এত দূরে, তাই ছাড়া পাওয়ার পরও ফিরে আসতে এত সময় লাগছে। ট্রেনে করে আসতেই তো কতদিন লেগে যায়! আর ধর যদি এদের মত ওকে পায়ে হেঁটে ফিরতে হয় তাহলে তো … তাহলে অন্তত একটা চিঠি লিখেও তো জানাতে পারত? জানোই তো সোনা, চিঠিপত্র আসা কত অনিয়মিত হয়ে গেছে – ডাকবিভাগ কত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে – ঠিকঠাক হতে কিছু তো সময় লাগবেই। ধরে নাও যদি ও ফেরার পথে মারা গিয়ে থাকে? তাহলে মেলানি, কোনও ইয়াঙ্কি মহিলা ঠিক লিখে জানিয়ে দিতেন! ইয়াঙ্কি মহিলা – বাহ্‌! আরে মেলি অনেক ভাল ইয়াঙ্কি মহিলাও তো আছে! আমি বলছি থাকতেই হবে! ঈশ্বর অন্তত কিছু মহৎ মহিলা ছাড়া কোনও জাতিকে সৃষ্টি করেন না। আচ্ছা স্কারলেট তুমি মেলিকে বল তো – সারাটোগায় আমরা সেই যে একজন খুব দয়ালু ইয়াঙ্কি মহিলার দেখা পেয়েছিলাম!

“দয়ালু না হাতি!” স্কারলেট বলল। আমাকে জিজ্ঞেস করছিল যে ডার্কিদের পেছনে ধাওয়া করার জন্য আমরা কটা করে শিকারি কুকুর রাখি! আমি মেলির সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত যে আমি এখনও পর্যন্ত একজনও ইয়াঙ্কি দেখিনি – সে পুরুষই হোক কি মহিলা – যাকে ভাল বলা যেতে পারে। হয়ত ওকে অনেক দূর থেকে হেঁটে আসতে হচ্ছে – হয়ত জুতো ছাড়াই হাঁটতে হচ্ছে।”

অ্যাশলেকে খালি পায়ে হাঁটতে হচ্ছে কল্পনা করেই ও ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেল। অন্য জওয়ানরা খালি পায়ে আসুক, খোঁড়াতে খোঁড়াতে আসুক, কিচ্ছু এসে যায় না, অ্যাশলেকে যেন ওরকম কষ্ট না করতে হয়। টগবগে ঘোড়ায় চড়ে, দুরস্ত পোশাকে, পালক দেওয়া টুপি পরে, চকচকে জুতো পায়ে ও বাড়ি ফিরে আসুক। অন্য সৈন্যদের মত অ্যাশলেরও একই হাল হয়েছে, এটা ভাবতে ওর একদম ভাল লাগে না।

জুন মাসের এক অপরাহ্ণে, পরিবারের সবাই মিলে বাড়ির পেছনের উঠোনে জড়ো হয়ে পোর্ককে বছরের প্রথম অর্ধপক্ক তরমুজ কাটতে দেখছিল। এমন সময় সামনের ড্রাইভওয়েতে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা গেল। প্রিসি অলস পদক্ষেপে সামনের দরজার দিকে গেল। বাকি যারা থাকল তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল তরমুজটা লুকিয়ে ফেলবে না সাপারের জন্য রাখা হবে। কে জানে হয়ত যে লোকটা এসেছে সে একজন সৈন্য!

মেলি আর ক্যারীন বলাবলি করতে লাগল সৈন্য অতিথিকে তরমুজের ভাগ দেওয়া উচিত। স্কারলেট – স্যুয়েলেন আর ম্যামির কাছ থেকে জোর পেয়ে – পোর্ককে তরমুজটা লুকিয়ে ফেলতে বলল।

“বোকামি কোরো না! আমাদের নিজেদের জন্যই যথেষ্ট নেই, তার ওপর আবার যদি দু’তিনজন ভুখা সৈন্য এসে পড়ে, তাহলে তো কথাই নেই! ওটা কেমন খেতে সেটাই আমরা জানার সুযোগ পাব না!”

তরমুজটা হাতে ধরে পোর্ক বোকার মত তাকিয়ে থাকল। কোন কথাটা রাখা হবে বুঝতে উঠতে পারছিল না।

প্রিসি বাইরে থেকে চেঁচিয়ে উঠল, “হে ভগবান! মিস স্কারলেট! মিস মেলি! তাড়াতাড়ি আসুন!”

“কে এসেছে রে?” বলে স্কারলেট সিঁড়ি থেকে উঠে হলের দিকে ছুটে গেল। সবাই ওর পেছন পেছন চলল।

“অ্যাশলে নাকি!” বিদ্যুৎচমকের মত ওর মনে এল। “নাকি – ”

“আঙ্কল পিটার! মিস পিটিপ্যাটের আঙ্কল পিটার!”

ওরা দৌড়ে সামনের বারান্দায় চলে এল। আন্ট পিটির সেই প্রায় স্বৈরাচারী অভিভাবক ধূসর চুলওয়ালা লম্বা আঙ্কল পিটার ধেড়ে-ইঁদুরের মত লেজওয়ালা একটা টাট্টু ঘোড়ার পিঠ থেকে নামছে। কালো মুখে গ্রাম্ভারিভাব, কিন্তু পুরোনো বন্ধুদের দেখা অনেকদিন পর পেয়ে চোখে একটা খুশির ঝিলিক। ভুরু কোঁচ হয়ে আছে, কিন্তু খোলা মুখ দন্তহীন হাউন্ডের মত দেখাচ্ছে।

সবাই ছুটে গেল ওকে স্বাগত জানাতে। কালো আর সাদা হাত ঝাঁকানোর পালা চলল। সবাই প্রশ্ন করে চলল। মেলানির গলা সব থেকে উচ্চগ্রামে।

“আন্টির শরীর খারাপ হয়নি তো?”

“না, ম্যাম। ভগবানের দয়ায় উনি ঠিকই আছেন,” প্রথমে মেলানির দিকে, তারপর স্কারলেটের দিকে রাগ রাগ মুখ করে তাকাল। দুজনের মুখেই একটা অপরাধী অপরাধী ভাব, যদিও কারণটা ওদের কাছে স্পষ্ট হল না। “উনি ঠিকই আছেন, তবে তোমাদের ব্যবহারে খুব হয়রান হয়ে গেছেন। আরও স্পষ্ট করে যদি বলি, আমিও হয়রান হয়ে গেছি!”

“সে কি কথা আঙ্কল পিটার! কি এমন হল – ”

“বাজে অজুহাত দেবার চেষ্টা কোরো না! মিস পিটি তোমাদের বাড়ি ফেরার জন্য চিঠির পর চিঠি লেখেননি? আমি নিজের চোখে ওঁকে লিখতে দেখেছি। আর তোমাদের জবাব পেয়ে ওঁকে কান্নাকাটিও করতে দেখেছি। কি না তোমাদের এই ধুঁকতে থাকা পুরোনো খামারে এত কাজে তোমরা ফেঁসে আছ যে বাড়ি ফেরার ফুরসৎ নেই!”

“কিন্তু, আঙ্কল পিটার – ”

“একা থাকতে উনি কত ভয় পান সেটা জেনেও তোমরা কেমন করে ওঁকে একা ফেলে রাখলে? তোমরা ভাল করেই জান, মিস পিটি কখনও একলা থাকেননি। ম্যাকন থেকে ফেরার পর থেকে উনি কত ভয়ে ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন! তোমাদের মুখের ওপর বলে দিতে বলেছেন যে উনি বুঝতেই পারছেন না যে এরকম দরকারের সময়ে তোমরা কি করে ওঁর কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছ!”

“চুপ কর!”, ম্যামি ফোঁস করে উঠল। টারাকে ‘ধুঁকতে থাকা পুরোনো খামার’ বলায় ওর আঁতে ঘা লেগেছে। এই সব অজ্ঞ শহুরে ডার্কিরা খামার আর প্ল্যান্টেশনের তফাৎ যদি বুঝত! “আমাদের জন্য বুঝি দরকারের সময় হতে পারে না? মিস স্কারলেট আর মিস মেলিকে এখানকার জন্য দরকার নেই? মিস পিটি কেন ওঁর ভাইকে এসে থাকতে বলছেন না, একলা থাকতে যদি এতই ভয় ওঁর?”

আঙ্কল পিটার ম্যামির দিকে কটমট করে তাকাল।

“মিস্টার হেনরির সঙ্গে অনেক বছর হল আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। নতুন করে আবার সেই সম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার অসুবিধে আছে।” বলে মেয়েদের দিকে ফিরল। ওরা হাসি চাপার চেষ্টা করছিল। “তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত। বেচারি মিস পিটিকে তোমরা একলা ফেলে রেখেছ। ওঁর অর্ধেকের বেশি বন্ধুবান্ধব মরেই গেছে। আর বাকিরা ম্যাকনেই থেকে গেছে। অ্যাটলান্টায় এখন ইয়াঙ্কি সৈন্য আর খলাস পাওয়া নিগারদের আবর্জনাতে ছেয়ে গেছে।”

আঙ্কল পিটারের বকুনি, যতক্ষণ পারা যায়, দুই মেয়ে, ভাল মানুষের মত মুখ করে শুনে যাচ্ছিল। কিন্তু আন্ট পিটি পিটারকে পাঠিয়েছেন বকাবকি করে ওদের অ্যাটলান্টাতে ধরে নিয়ে যাবার জন্য, এটা ভাবতেই ওরা আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। একে অন্যের গায়ে ঢলে পড়ে ওরা খুব হাসতে লাগল। স্বাভাবিকভাবেই পোর্ক, ডিলসি আর ম্যামি ওদের প্রিয় টারার অপবাদকারীকে অপদস্থ হতে দেখে অট্টহাসি চেপে রাখতে পারল না। স্যুয়েলেন আর ক্যারীনও হেসে ফেলেছিল, এমনকি জেরাল্ডের মুখেও একটা হাসির আভাস। সবাই হাসল, পিটার ছাড়া। ওর রাগ উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছিল। এক পায়ের ওপর থেকে ভরটা ছেড়ে অন্য পায়ের ওপর দিল।

“এই নিগার তোমার অসুবিধেটা কোথায় বল তো?” ম্যামি একচোট হেসে নিয়ে বলল। “তুমি কি নিজেকে এতটাই বুড়ো মনে করছ, যে তোমার মালকিনের দেখাশোনা করতে পারছ না?”

একেবারে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল পিটার।

“কি বললে? বুড়ো! আমি বুড়ো হয়ে গেছি? না, ম্যাম, মিস পিটির দেখাশোনা করার ক্ষমতা আমার আছে! সব সময়ই দেখাশোনা করেছি। ম্যাকনে ওঁকে কে নিয়ে গেছিল, যখন আমাদের চলে যেতে হয়েছিল? ইয়াঙ্কিরা যখন ম্যাকনে এল, তখনও আমিই সামলেছি! ভয় পেয়ে উনি ঘন ঘন অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। ওঁর ইচ্ছেতেই আবার ওঁকে আর ওঁর বাবার রুপোর জিনিস নিয়ে অ্যাটলান্টাতে অতটা পথ ফিরিয়ে আনিনি?” কথার যথার্ততা প্রমাণ করার জন্য ও সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। “ক্ষমতা আমি রাখি, রেখেও চলেছি। তোমাদের ভরসায় ফেলে রাখিনি। কিন্তু সেটা কি ভাল দেখায়?”

“কি ভাল দেখায় না?”

“মানে আমি বলতে চাইছি লোকে কি ভাববে? মিস পিটি একা একা থাকছেন! অবিবাহিত মহিলারা একা একা থাকলে লোকে নিন্দে করার সুযোগ পায়,” পিটার বলে চলল। ওর কথা শুনে ওদের মনে হচ্ছিল যে মিস পিটিপ্যাট এখনও ষোলো বছর বয়সী কিশোরি যাকে এখনও কলঙ্ক রটনা থেকে সতর্ক থাকতে হয়। “আর লোকজন ওঁর সম্বন্ধে যে বলাবলি করছে সেটাও আমার কানে আসছে। সঙ্গী পাবার জন্য বাড়িতে কাউকে রাখতেও পারছেন না। আমি বলে দিয়েছি, যতদিন শরীর দেবে ততদিন ওসব ভাবার দরকার নেই। তবে এখন আর উনি শক্ত সমর্থ নেই তেমন। মিস পিটি – কি বলব – এখন একেবারে শিশুর মত অবুঝ হয়ে পড়েছেন আর – ”

কথাটা শুনে স্কারলেট আর মেলি আরও জোরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে মেলির চোখ থেকে জল বেরিয়ে এল।

“বেচারা আঙ্কল পিটার! কিছু মনে কোরো না। অত জোরে হেসে ওঠা ঠিক হয়নি। কিন্তু মিস স্কারলেট বা আমি কেউই যে এখান থেকে এখুনি যেতে পারছি না! সেপ্টেম্বরে হয়ত যাব আমি, তুলো তোলা হয়ে যাবার পর। আচ্ছা বল তো আন্টি কি শুধুই আমাদের ঘাড় ধরে নিয়ে যাবার জন্য তোমাকে পাঠালেন?”

কথাটা শুনে পিটারের চোয়াল ঝুলে পড়লে। অপরাধীসুলভ হাবভাব। বলিরেখা জর্জরিত কালো মুখে ভয়ের ছায়া। যেভাবে কচ্ছপ খোলের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে ফেলে, ঠিক সেই ভাবে পিটারের চোয়াল বন্ধ হয়ে গেল।

“মনে হয় বুড়ো হয়ে যাচ্ছি, মিস মেলি! দেখ, বলতে ভুলে গেছি আসল কথাটা, যার জন্য মিস পিটি আমাকে পাঠালেন। কথাটা খুব দরকারিও। তোমার জন্য একটা চিঠি আছে। ডাকবিভাগের যা অবস্থা, মিস পিটি বিশ্বাস করে ডাকে না দিয়ে আমার হাতে পাঠালেন।”

“চিঠি! আমার নামে? কার কাছ থেকে?”

“আসলে – মিস পিটি আমাকে বললেন – ‘পিটার কথাটা খবরটা তুমি একটু রয়ে সয়ে দিও – মিস মেলিকে’, আমি বললাম- ”

আশঙ্কাতাড়িত হয়ে মেলি সিঁড়ির ধাপ থেকে উঠে পড়ল।

“অ্যাশলে! অ্যাশলে! ও আর বেচে নেই!”

“না ম্যা’ম! না ম্যা’ম!” পিটার আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। মলিন কোটের পকেট হাতড়াতে লাগল। “বেঁচে আছে! এই যে ওর লেখা চিঠি। ও বাড়ি ফিরে আসছে! হে ভগবান! ম্যামি ওকে ধর! দাঁড়াও – ”

“বুড়ো ভাম কোথাকার! বেচারিকে এমন করে চমকে দিলে!” অজ্ঞান মেলানিকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে বাঁচাতে ম্যামি ফুঁসে উঠল। “মুখপোড়া হনুমান! এরকম খবর আস্তে আস্তে ভাঙতে হয়! পোক, মিস মেলির পা’দুটো ধর। মিস ক্যারীন ওর মাথার তলায় হাতটা রাখ। চল বসার ঘরের সোফার ওপর ওকে শুইয়ে দিই।”

স্কারলেট বাদে বাকি সকলে মেলানির জন্য বালিশ, জল আনতে ছুটল। উত্তেজিত কথাবার্তায় ঘর ভরে উঠল। মুহুর্তের মধ্যে বারান্দায় স্কারলেট আর আঙ্কল পিটার ছাড়া কেউ রইল না। স্কারলেট খবরটা শুনে উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়েই স্থানু হয়ে গেছে। নড়াচড়া করার অবস্থাতেই নেই। বুড়ো মানুষটার হাতে একটা চিঠি। স্কারলেট সেটার দিকে অপলক চেয়ে আছে। মায়ের কাছে বকুনি খেলে বাচ্চারা যেরকম অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে – ওর ঠিক সেই দশা। আত্মমর্যাদাবোধ ধুলোয় লুটিয়ে গেছে।

কয়েক মুহুর্ত স্কারলেট ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। নিশ্চল, নির্বাক। মনের মধ্যে একটা কথাই কেউ জোরে জোরে বলছেঃ “ও মারা যায়নি! ও বাড়ি ফিরে আসছে!” খবরটা ওর মনে কোনও আনন্দ জাগাতে পারছে না; উত্তেজনাও জাগাচ্ছে না। খবরটা ওকে চলৎশক্তিহীন করে ফেলল। আঙ্কল পিটার কিছু বলছে। মনে হল অনেক দূর থেকে ওর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। বিলাপের মত করে, সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে।

“মিস্টার উইলি বার – ম্যাকনের – আমাদের স্বজন – উনি চিঠিটা মিস পিটির কাছে এনে দিলেন। মিস্টার অ্যাশলের সঙ্গে জেলে একসাথেই ছিলেন। মিস্টার উইলির ঘোড়া ছিল, তাই উনি তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলেন। মিস্টার অ্যাশলে তো পায়ে হেঁটে আসছেন তাই –”

স্কারলেট পিটারের হাত থেকে চিঠিটা ছিনিয়ে নিল। খামের ওপর মেলির নাম লেখা – মিস পিটির হাতের লেখা। তা সত্ত্বেও স্কারলেট কোনও ইতস্ততঃ না করেই খামটা ছিঁড়ে ফেলল। মিস পিটির লেখা একটা চিরকুট মাটিতে পড়ে গেল। খামের ভেতরে ভাঁজ করা একটা কাগজ – নোংরা পকেটে করে আনার জন্য ময়লা হয়ে গেছে। ওপরে অ্যাশলের হাতে লেখাঃ “মিসেজ় জর্জ অ্যাশলে উইল্কস, প্রযত্নে মিস সারা জেন হ্যামিল্টন, অ্যাটলান্টা, অথবা টুয়েল্ভ ওকস জোনসবোরো, জর্জিয়া।”

কাঁপা কাঁপা হাতে ভাঁজ খুলে পড়লঃ

“প্রিয়তমে, আমি বাড়ি আসছি – তোমার কাছে – ”

স্কারলেটের দু’চোখ বেয়ে ঝরঝর করে জল পড়ে সব কিছু আবছা করে দিল। আনন্দে হৃদয় উদ্বেল হয়ে উঠল। চিঠিটা আঁকড়ে ধরে বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে হলের ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে, ড্রয়িংরুম পেরিয়ে এলেনের অফিসঘরে চলে এল। ড্রয়িংরুমে টারার বাসিন্দারা অজ্ঞান মেলানিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে। দরজাটা বন্ধ করে ঝুলে পড়া সোফাটাতে বসে পড়ে চিঠিটাকে চুম্বন করতে করতে পাগলের মত হাসতে আর কাঁদতে লাগল।

“প্রিয়তমে,” মনে মনে আওড়াল, “আমি বাড়ি আসছি – তোমার কাছে!”

ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে সবাই ধরেই নিল, যদি ইতিমধ্যে অ্যাশলের পিঠের ওপর দুটো ডানা না গজিয়ে থাকে, তাহলে ইলিনয় থেকে জর্জিয়া পৌঁছতে মোটামুটি সপ্তাহ এমনকি মাসও পেরিয়ে যেতে পারে। তবুও টারার গাছের সারির ভেতর দিয়ে কোনও জওয়ানকে যেতে দেখলেই সকলের বুকেই আশার আলো জ্বলতে শুরু করত। দাড়িওয়ালা, ছেঁড়াখোঁড়া জামাকাপড় পরা কাউকে দেখলেই ওদের মনে হত ওটা অ্যাশলে হতেও পারে। আর অ্যাশলে না হলেও ওর খবর জানলেও জানতে পারে। অথবা ওর বা আন্ট পিটির কোনও চিঠিও নিয়ে আসতে পারে। পায়ের আওয়াজ শুনলেই সাদা কালো সকলে মিলে বাইরের বারান্দায় গিয়ে ভিড় জমাত। ইউনিফর্ম পরা থাকলেই হল, যে যেখানে আছে, কাঠের গোলায়, চারণভূমিতে, তুলোর ক্ষেতে, সব কাজ ফেলে ছুটতে ছুটতে চলে আসত। চিঠিটা আসার পর থেকে প্রায় মাসখানেক কাজকর্ম মাথায় উঠল। ওর এসে পৌঁছনোর সময় কাউকেই যেন বাড়ির বাইরে থাকতে না হয়। বিশেষ করে স্কারলেট তো একেবারেই বাইরে যেত না। ফলে অন্যদেরও কিছু বলতে পারত না।

মাস পেরিয়ে আরও কয়েক সপ্তাহ যখন কেটে গেল, অ্যাশলের ফেরার কোনও নামগন্ধও নেই, না কারোর কাছ থেকে খবর পাওয়া গেল, তখন আবার যে যার মত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অনন্ত প্রতীক্ষায় সবার মনেই চাপ বাড়তে শুরু করেছিল। ভেতরে ভেতরে স্কারলেট অস্থির হয়ে পড়ছিল। রাস্তায় কোনও কিছু হয়ে যায়নি তো! রক আইল্যান্ড কত দূর! জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় ও হয়ত অসুস্থ ছিল, হয়ত পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কপর্দকশূন্য হয়ত। হয়ত এমন সব জায়গার মধ্য দিয়ে আসতে হচ্ছে, যেখানে কেউ কনফেডারেটদের সহ্য করতে আরে না। যদি ও জানতে পারতে অ্যাশলে কোথায় আছে, তাহলে এখুনি ও যেটুকু টাকা ওর কাছে আছে সব ওকে পাঠিয়ে দিত, তার জন্য যদি এখানে উপোস করেও থাকতে হয় সেটাও সইবে। ট্রেনে করে ও অনেক তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতে পারত।

“প্রিয়তমে, আমি বাড়ি আসছি – তোমার কাছে।”

কথাগুলো প্রথম পড়ার পর খুশির জোয়ারে স্কারলেটের মনে হয়েছিল অ্যাশলে যেন বাড়িতে ওর কাছেই আসছে। প্রথম উত্তেজনার রেশ কাটার পর অ্যাশলে যে আসলে মেলানির কাছেই আসছে এই বোধোদয় হতে ওর সময় লাগেনি। আজকাল মেলানি একেবারে খুশিতে ডগমগ করছে। মাঝে মাঝে স্কারলেট তিক্ততার সঙ্গে ভাবে, বাচ্চা হওয়ার সময় মেলানি অ্যাটলান্টাতেই তো মরে যেতে পারত! সেটাই তো সব থেকে ভাল হত! অ্যাশলেকে ও বিয়ে অরে ফেলতে পারত, অবশ্যই সময়ের শালীন ব্যবধান রেখে। বিউ একজন ভাল সৎমা পেত। এই সব ভাবনা মাথায় এলেই যে সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে ফেলতে হবে, তেমন নয়। ঈশ্বরকে আজকাল আর অতটা পাত্তা দেয় না ও।

সৈন্যদের আসা অব্যাহত থাকল। কখনও একাই আসে, কখনও দু’জন মিলে, আবার কখনও দল বেঁধে। বিশ্বগ্রাসী খিদে নিয়ে হাজির হয় সবাই। এর থেকে এক ঝাঁক পঙ্গপালও ভাল ছিল, স্কারলেট হতাশ হয়ে ভাবে। আতিথেয়তার মান্ধাতার আমলের প্রথাগুলোকে স্কারলেট গালাগালি দেয়। তখন সব কিছুই অঢেল ছিল। যেই আসুক, অবস্থাপন্ন হোক বা গরীব, একটা রাতের আশ্রয় তার প্রাপ্য। তাঁকে খাওয়াতে হবে, এমনকি তার সাথে যদি ঘোড়া থাকে, তাকেও! সৌজন্যের ঘাটতি হলে চলবে না! স্কারলেটের মনে হয় সেসব দিন চলে গেছে। চিরকালের মত। বাড়ির অন্যরা মানতেই চায় না! সৈন্যরাও বোঝার চেষ্টা করে না। যেন বহু প্রতিক্ষিত অতিথি, সবাইকে এভাবেই স্বাগত জানাতে হবে।

ক্রমে ক্রমে স্কারলেটের মন শক্ত হয়ে ওঠে। যে খাবার ওরা খেয়ে ফেলছে, সেটাতে টারার বেশ কয়েক মাসের খাবারের জোগাড় হয়ে যেত। কত পরিশ্রম করে এই সব শাকসবজি ফলিয়েছে। কত দূরদূরান্ত থেকে খাদ্যসামগ্রী ওকে কিনে আনতে হয়। খাওয়ার জোগাড় করা কত কঠিন। ইয়াঙ্কিটার ওয়ালেটের টাকায় তো সারা জীবন চলবে না! কয়েকটা আমেরিকার পত্রমুদ্রা আর মাত্র দুটো সোনার মোহর পড়ে আছে। এই সব ক্ষুধার্ত মানুষের দলকে খাওয়াবার জন্য ওর কি দায় পড়েছে! যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে বিপদের মধ্যে পড়ার কোনও মানে হয় না। পোর্ককে বলে দিল, যখন জওয়ানরা থাকবে তখন টেবিলে কম করে খাবার রাখতে। আদেশটা মেনেই চলা হচ্ছিল। কিন্তু একদিন স্কারলেট লক্ষ্য করল মেলানি পোর্ককে নিজের থালায় নামমাত্র খাবার রেখে বাকি খাবার সৈন্যদের দিয়ে দিতে বলছে। এদিকে বিউ হবার পর থেকে মেলানির দুর্বলতা কাটতেই চাইছে না।

“এটা তোমাকে বন্ধ করতে হবে মেলানি,” স্কারলেট তিরস্কারের সুরে বলল। “তুমি এখনও পুরো সুস্থ হয়ে ওঠোনি। তোমার আরও বেশি খাওয়ার দরকার। যদি অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে যাও তবে আমাদের সবাইকে তোমার শুশ্রূষা করায় ব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে। এদের একটু খিদে থাকলে কিছু হবে না। ওদের অভ্যেস আছে। চার বছর ওরা এভাবেই কাটিয়েছে। না হয় আর কিছুদিন থাকল!”

মেলানি ওর চোখে চোখ রেখে তকাল। ওর শান্ত চোখে এমন অনাবৃত অভিমান স্কারলেট আগে কখনও দেখেনি।

“ওহ্‌ স্কারলেট, আমাকে বোকো না অমন করে। এটা আমাকে করতে দাও। এটা করলে আমি যে মনে কতটা শান্তি পাই, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না! যখনই একটা গরীব মানুষকে আমার ভাগের থেকে কিছু দিই আমার কি মনে হয় জান? মনে হয় উত্তরদিকের কোনও পথপ্রান্তে কোনও এক মহিলা আমার অ্যাশলেকেও তার খাবারের ভাগ দিয়ে ওকে আমার কাছে ফিরে আসার জন্য সাহায্য করছে!”

“আমার অ্যাশলে!”

“প্রিয়তমে, আমি বাড়ি আসছি – তোমার কাছে।”

স্কারলেটের বাকস্ফুর্তি হল না। উঠে চলে গেল। এরপর থেকে মেলানি লক্ষ্য করল অতিথিরা থাকলেও টেবিলে খাবার বেশি করে রাখা হত। স্কারলেট মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেও মুখে কিছু প্রকাশ করল না।

যে সব জওয়ানরা অসুস্থতার জন্য কিছুদিনের জন্য বিশ্রাম নিতে বাধ্য হত – এদের সংখ্যা খুব কম ছিল না – স্কারলেট ওদের জন্য বিছানা আর বিশ্রামের ব্যবস্থা করত, বলাই বাহুল্য আক্রোশ মনে চেপে রেখে। একজন অসুস্থ লোক মানেই তো একটা বাড়তি পেট! তার সেবা করার জন্য একজন লোক, মানে হাল চালানো, বীজ বপন, ফসল তোলা, জমিতে বেড়া দেওয়া, আগাছা সাফ করা, কোদাল চালানো এসব কাজের জন্য একজন লোক কম! একদিন ফেয়্যাটভিলগামী এক অশ্বারোহী সৈন্য একজন কিশোরকে বাড়ির সামনের উঠোনে ফেলে রেখে চলে গেল। রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল, মুখে দানা বেরোতে শুরু করেছে। তাই তুলে নিয়ে সব থেকে নিকটবর্তী বাড়ি, মানে টারাতে নিয়ে এসেছে। মেয়েরা ভাবল হয়ত ছেলেটা একজন শিক্ষানবিশ। শেরম্যানের মিলেজভিলে আসার খবর পেয়ে ওকে মিলিটারি স্কুল থেকে লড়াই করার জন্য ডেকে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুই জানা গেল না। পরের দিন অজ্ঞান অবস্থাতেই ছেলেটা মারা গেল। ওর পকেটা হাতড়েও কোনও কিছু জানা গেল না।

এত সুন্দর ছেলেটা, ভদ্র পরিবারেরই হবে নিশ্চয়ই, হয়ত কোনও মা ছেলের অপেক্ষা করে বসে আছে, কোথায় আছে, কবে ফিরবে কিছু জানা নেই, ঠিক যেমন মেলানি আর স্কারলেট দাড়িওয়ালা কোনও মানুষ দেখলেই উন্মুখ হয়ে উঠছে। ছেলেটাকে পারিবারিবারিক সমাধিক্ষেত্রে, তিন ও’হারা ভাইয়ের পাশে সমাধিস্থ করা হল। পোর্ক যখন কবরে মাটি ফেলছে, মেলানি তখন আর অশ্রু সম্বরণ করতে পারল না। মনে মনে গোপন আশঙ্কা ফেরার পথে এরকম কোনও বাড়িতে অ্যাশলেকেও কেউ সমাধিস্থ করছে না তো!

এই নাম-না-জানা ছেলেটার মত উইল বেন্টিনও নামে আরও একজনকে অচৈতন্য অবস্থায় তার সঙ্গী ঘোড়ার জিনে বসিয়ে টারাতে নিয়ে এল। নিউমোনিয়াতে গুরুতরভাবে আক্রান্ত উইল। মেয়েরা ওকে একটা বিছানায় শুইয়ে দিল। মনে ভয়, কে জানে এই মানুষটাও খুব শিগগিরই ওই কবর দেওয়া ছেলেটার সঙ্গী হয় যাবে কিনা!

দক্ষিণ জর্জিয়ার গরীব সাদা লোকদের মত ফ্যাকাসে ম্যালেরিয়াগ্রস্ত চেহারা, রঙচটা গোলাপি চুল, ম্লান নীল চোখ, প্রলাপ বকার সময়ও সেটা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে না। একটা পা নেই। সেই জায়গায় একটা কাঠের গোঁজ লাগানো। কোনও সন্দেহই নেই যে উইল গরীব বাড়ির ছেলেই হবে। আবার ক’দিন আগে যে ছেলেটাকে কবর দেওয়া হল, সে যে কোনও প্ল্যান্টারের ছেলে তাতেও কোন সন্দেহ নেই। কেমন করে এমন ধারণা হল সে ব্যাপারে মেয়েরা স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারল না। এমন নয় যে অন্যান্য সম্ভ্রান্ত পরিবারের জওয়ান – যাদের টারা হয়ে ফিরতে হয়েছিল - তাদের থেকে উইল বেশি অপরিষ্কার ছিল, বা ওর গায়ে বেশি ঘন লোম ছিল, বা উকুনও বেশি বেশি ছিল। এটাও নয় যে প্রলাপের মধ্যে যে ভাষায় বকবক করত সেটা টার্লটন ভাইদের থেকেও বেশি অমার্জিত। ওরা নিজে থেকেই বুঝতে পেরেছিল। একটা সদ্বংশজাত ঘোড়া আর অজ্ঞাতকুলশীল ঘোড়ার তফাৎ যেমন ওরা বুঝতে পারত। অবশ্য এটা আন্দাজ করে নেওয়ার পরেও উইলকে সেবাযত্ন করে বাঁচিয়ে তোলার ব্যাপারে ওদের কোনও গাফিলতি ছিল না।

এক বছর ইয়াঙ্কি জেলে কাটানোর পরে, দুর্বল শরীরে আর নড়বড়ে কাঠের গোঁজের পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে একেবারে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। নিউমোনিয়া থেকে সেরে ওঠবার ক্ষমতাটাও হারিয়ে গেছিল। দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে গোঙানো আর ঘোরের মধ্যে নতুন করে লড়াই চালিয়ে যাবার জন্য উঠে বসার চেষ্টা করা। মা, বউ, বোন বা প্রেমিকার নাম ধরে ডাকাডাকি নেই, একবারের জন্যও। ক্যারীন এসব নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

“সব মানুষেরই কিছু না কিছু আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের থাকার দরকার,” ক্যারীন বলল। “এর তো মনে হচ্ছে পৃথিবীতে আপনার বলতে কেউই নেই!”

শরীর নড়বড়ে হলেও ভেতরে ভেতরে জীবনীশক্তির অভাব ছিল না। সেবায় শুশ্রূষায় সাড়া দিল। একদিন ও হালকা নীল চোখ মেলে ঘরের চারপাশটা লক্ষ্য করল। চোখ পড়ল বিছানার পাশে বসে ক্যারীন মালা জপ করছে। সকালের আলো এসে ওর সোনালী চুলের ওপর পড়েছে।

“আপনি তাহলে স্বপ্ন নন,” নিষ্প্রভ গলায় বলল। “আশা করি আমি আপনাকে খুব বেশি জ্বালাতন করিনি, ম্যাম।”

পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে ওর অনেকটাই সময় লাগল। বিছানায় শুয়ে চুপচাপ জানলার বাইরে ম্যাগনোলিয়া ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকত, কাউকে কোনও রকম জ্বালাতন না করে। প্রশান্ত অথচ সরল নীরবতার জন্য ক্যারীনের ওকে ভাল লাগত। দীর্ঘ উষ্ণ মধ্যাহ্নে পাশে বসে থেকে নীরবে ওকে বাতাস করে যেত।

আজকাল ক্যারীনের বলার মত কথা কমই থাকে। নিঃশব্দে, ছায়ার মত চলাফেরা করে আর সাধ্যে যেটুকু কুলোয় সেটা করে ফেলে। প্রার্থনা করাতেই ব্যস্ত থাকে বেশির ভাগ সময়। স্কারলেট আগে থেকে না জানিয়ে নিঃসাড়ে যখন ওর ঘরে যেত, ওকে বিছানার পাশে হাঁটুমুড়ে বসে থাকতে দেখত। মনে মনে অসন্তুষ্টই হত। মনে হত এই সব অর্থহীন প্রার্থনা করবার দিন চলে গেছে। ভগবানের যদি ওদের শাস্তি দেবারই উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তাহলে সেটা প্রার্থনা না করলেও তিনি দেবেন। স্কারলেটের কাছে ঈশ্বরভক্তি একটা দেওয়া নেওয়ার ব্যাপার। ভগবানের কাছে ভাল হয়ে থাকার প্রতিজ্ঞা করতে ওর আপত্তি কিছু নেই, শুধু তার বিনিময়ে ভগবানেরও কিছু প্রতিদান দেওয়া কর্তব্য। ঈশ্বর তাঁর কর্তব্যপালনে বার বার ব্যর্থ হয়েছেন, তাই স্কারলেটের মনে হয় ওর কাছ থেকেও ঈশ্বরের কিছু প্রত্যাশা করার নেই। তাই ক্যারীনকে প্রার্থনা করতে দেখলেই ওর মনে হত এই সময়টা একটু ঘুমিয়ে নিলেই পারে, বা সেলাই বা অন্য কিছু করতে পারে। যেন ক্যারীনের এই প্রার্থনা করা কাজে ফাঁকি দেবার একটা অজুহাত মাত্র।

কথাটা একদিন উইল বেন্টিনকে বলেই ফেলেছিল স্কারলেট। ও সেদিন বিছানা ছেড়ে সোজা হয়ে একটা চেয়ারে বসতে পেরেছে। ওর নিষ্প্রাণ জবাব শুনে স্কারলেট অবাক হয়ে গেল। “ওঁকে ওঁর মতই থাকতে দিন, মিস স্কারলেট, উনি এতেই শান্তি পান।”

“শান্তি পায়?”

“হ্যা, উনি আপনার মা আর ওঁর জন্য প্রার্থনা করছেন।”

“তা এই ‘উনি’টি কে শুনি?”

একটুও অবাক না হয়ে, ওর হালকা নীল চোখ দিয়ে স্কারলেটকে ভাল করে দেখল। কিছুই যেন ওকে অবাক বা উত্তেজিত করতে পারে না। হয়ত এত বেশি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন ওকে হতে হয়েছে যে অবাক হওয়ার ক্ষমতাটাই ও হারিয়ে ফেলেছে। ওর বোনের হৃদয়ের এমন কি কথা স্কারলেট জানে না অথচ এই লোকটা জেনে ফেলেছে – ব্যাপারটা ওর কাছে বেশ অদ্ভুত লাগল। ক্যারীন যে অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও ওর সঙ্গে কথা বলে শান্তি পায়, সেটা লোকটা বেশ স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছে।

“ব্রেন্ট – বা এরকমই কিছু নাম হবে – ওঁর প্রেমিক – যিনি গেটিসবার্গের যুদ্ধে মারা গেছেন।”

“ওর প্রেমিক, না হাতি!” স্কারলেট বলে উঠল। ও আর ওর ভাই আমারই প্রেমিক ছিল!”

“সেটা উনি বলেছেন আমাকে। আমার মনে হয় কাউন্টির বেশিরভাগ যুবকই আপনার প্রেমিক ছিল। সে যাই হোক, আপনি ওঁকে অস্বীকার করার পর উনি ওঁরই প্রেমিক হয়ে গেছিলেন। শেষবার ছুটিতে আসার পর ওঁদের দুজনের বাগদান হয়ে যায়। উনি আমাকে বলেছেন, ওঁকে ছাড়া আর কারোর সম্বন্ধে ওঁর দুর্বলতা ছিল না। তাই ওঁর জন্য প্রার্থনা উনি করতেই পারেন।”

“যত্ত সব আজগুবি কথা!” স্কারলেট একটু হিংসুটে সুরে বলে উঠল।

বেশ একটু কৌতুহল নিয়েই স্কারলেট এই রঙচটা চুল, অবিচলিত শান্ত দৃষ্টিওয়ালা তালপাতার সেপাইটিকে লক্ষ্য করল। তার মানে হল এই লোকটা পারিবারিক এমন সব ঘটনা জেনে গেছে, যেটা ও নিজে কখনোই জানার চেষ্টা করেনি। এই হল তার মানে ক্যারীনের সারাদিন ধরে প্রার্থনা করার রহস্য। সেটা নিয়ে অবশ্য চিন্তা নেই, একদিন না একদিন ও এই খামখেয়ালীপনা কাটিয়ে উঠতে পারবে। অনেক মেয়েই আছে যাদের প্রেমিকরা বা স্বামীরা লড়াইতে মারা গেছে। চার্লসের মরে যাবার দুঃখ ও কি কাটিয়ে ওঠেনি? অ্যাটলান্টার একটা মেয়ের কথা ও জানে, যে এই লড়াইতে তিন তিনবার বিধবা হয়েছে, আর এখন যুদ্ধের শেষে নতুন প্রেমিকের খোঁজে আছে। উইলকে বলল এসব কথা। ও শুধু মাথা নাড়ল।

“মিস ক্যারীন অন্য রকম মানুষ,” বেশ জোরের সঙ্গেই বলল কথাটা।

উইলের সঙ্গে কথা বলে খুব আরাম। ওর নিজের খুব কিছু বলার থাকত না। সব কথা সহানুভূতির সঙ্গে শুনে যেত। স্কারলেট নিজের সমস্যার কথাও বলেছিল – আগাছা সাফ করা, জমিতে লাঙল দেওয়া, বীজ বপন করা, শুয়োরগুলোকে পুষ্ট করে তোলা, গরুর বাচ্চা বিয়োনো। উইল খুব ভাল পরামর্শ দিতে পারত। দক্ষিণ জর্জিয়াতে ওর ছোট্ট খামার ছিল, আর দুজন নীগ্রো। ওর ক্রীতদাসরা যে মুক্তি পেয়ে গেছে এখন, সেটাও ও আন্দাজ করে নিয়েছে। ও জানে যে ওর সেই জমি এখন আগাছা আর পাইনের চারাতে ভরে গেছে। ওর বোন – একমাত্র আত্মীয় ওর – টেক্সাসে ওর বরের সঙ্গে চলে গেছে – সে বেশ অনেকদিন আগে। এখন বিশ্বসংসারে ও একেবারে একা। অবশ্য এসব ওকে ভাবাত না, যেমন ভার্জিনিয়াতে একটা পা ফেলে আসাটাও ওকে ভাবায় না।

উইলসের সঙ্গে কথা বলে স্কারলেট বেশ শান্তি পায়। এই কঠিন সময়ে, যখন নীগ্রোরা গজগজ করতে থাকে, স্যুয়েলেনের অসহ্য ঘ্যানঘ্যানানি, আর জেরাল্ড বারবার জিজ্ঞেস করে চলেছেন এলেন কবে আসবেন! উইলের কাছে সব কথা খুলে বলা যায়। এমনকি সেই ইয়াঙ্কিকে মেরে ফেলার গল্পও ওকে বলে বেশ একটা আত্মপ্রসাদ লাভ করেছে। উইল ছোট করে বলেছে, “ঠিক করেছেন!”

দেখা গেল পরিবারের সকলেই – এমনকি ম্যামিও – সমস্যার কথা শোনাতে উইলসের ঘরে গিয়ে হাজির হয়। প্রথম প্রথম অবশ্য ম্যামি একটু দূরত্ব রেখে চলত, কারণ হাজার হলেও যার মাত্র দুজন ক্রীতদাস ছিল, তাঁকে ঠিক সমপর্যায়ের মনে করা যায় না।

যখন ও একটু এঘর ওঘর করতে সক্ষম হল, তখন ও ওক কাঠের টুকরো দিয়ে ঝুড়ি বানিয়ে দিত, ইয়াঙ্কিরা ঘরের যে সব আসবাবপত্র ভেঙে দিয়েছিল, সেগুলো মেরামতের কাজে লেগে যেত। কাঠ চেরার ব্যাপারে খুব দক্ষ ছিল। ওয়েড ওর পাশ থেকে নড়তেই চাইত না। কাঠ চিরে ওর জন্য অনেক খেলনা বানিয়ে দিয়েছিল। ওর কাছে ওয়েড আর দুটো বাচ্চাকে রেখে কাজে যেতে সবাই খুব নিশ্চিন্ত বোধ করত। ম্যামির থেকেও অনেক ভালভাবে বাচ্চাদের দেখাশোনা করতে পারত। সাদা আর কালো, দুটো বাচ্চারই কান্না সামলিয়ে শান্ত করার ব্যাপারে একমাত্র মেলিই ওকে পাল্লা দিতে পারত।

“অপরিচিত হওয়া সত্ত্বেও আপনারা আমার সঙ্গে এত সদয় ব্যবহার করেছেন, মিস স্কারলেট, যেটা আমি কখনোই ভুলতে পারব না,” উইল একদিন বলল। “আপনাদের কত জ্বালাতন করেছি, কত দুশ্চিন্তায় রেখেছি। যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমি এখানেই থেকে যেতে পারি। অন্তত যতদিন না আপনাদের ঋণ শোধ না করতে পারি। আপনাদের কাজে হাত লাগাতে পারি। অবশ্য এত ঋণ টাকাকড়ি দিয়ে শোধ করা যায় না, জীবন দিয়েই করতে হয়।”

তাই উইল টারাতেই থেকে গেল আর ধীরে ধীরে এবং নিঃশব্দে স্কারলেটের অনেক দায়িত্বই উইল বেন্টিনের হাড় জিরজিরে কাঁধের ওপর চলে এল।

সেপ্টেম্বর মাস। তুলো ওঠানোর সময়। উইল বেন্টিন সিঁড়ির ধাপে স্কারলেটের পায়ের কাছে বসে অপরাহ্ণের হেমন্তের রোদের আরাম নিচ্ছিল। ফ্যেয়াটভিলের নতুন তুলোর মিলে তুলো থেকে সুতো তৈরির খরচ নিয়ে নিস্তেজ স্বরে অনর্গল বকবক করে চলেছিল। সেদিন ফ্যেয়াটভিলে গিয়ে জানতে পেরেছে যে যদি দু’সপ্তাহের জন্য একটা ওয়াগন আর ঘোড়া মিলের মালিককে ধার দিতে পারে, খরচটা সিকিভাগ কমিয়ে ফেলা যায়। চুক্তিটা পাকা করার আগে স্কারলেটের সঙ্গে আলোচনা করে নিচ্ছে।

স্কারলেট আড়চোখে উইলকে দেখল। বারান্দার রেলিংয়ে হেলান দিয়ে একটা খড় চিবোচ্ছে। ম্যামি মাঝে মাঝেই বলে যে ভগবানই নাকি উইলকে ওদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন। স্কারলেটও বিস্মিত হয়ে ভাবে উইল না থাকলে এই কটা মাসে কত অসুবিধেতেই না টারাকে পড়তে হত! লোকটা কথা খুব অল্পই বলে, চারপাশের ব্যাপারে অতিরিক্ত কৌতুহল কখনও দেখায় না, এমনকি অতিসক্রিয়তার লেশমাত্র নেই, অথচ টারার প্রত্যেকের ব্যাপারেই ওর ধারণা খুব স্পষ্ট। অনেক কাজ করে। সবটুকুই নীরবে, অসীম ধৈর্য্যসহকারে, দক্ষতার সঙ্গে। একটাই মাত্র ঠ্যাঙ থাকলে কি হবে, পোর্কের থেকে অনেক বেশি চটপটে। সব থেকে বড় কথা হল ও পোর্ককে দিয়েও কাজ করিয়ে নিতে পারে। স্কারলেট উইলসের এই অদ্ভুত গুণের তারিফ না করে পারে না। গরুটা যখন পেটের যন্ত্রণায় ছটফট করছিল বা ঘোড়াটা রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ল, স্কারলেট ভেবেছিল ওগুলোকে এবার চিরতরে বিদায় দিতে হবে। উইল দিন রাত এক করে যত্ন করে দুটো পশুকেই বাঁচিয়ে তুলল। বেচাকেনার ব্যাপারে ওর বিচক্ষণতাকেও স্কারলেট খুবই সম্মান করে। এক বা দুই বুশেল আপেল, মিষ্টি আলু আর তরি তরকারি নিয়ে ঘোড়ায় চেপে বেরিয়ে গিয়ে দিনের শেষে যতটা বীজ, কাপড়, ময়দা, সব্জি আর অন্যান্য জরুরী জিনিস নিয়ে ফিরে আসত, স্কারলেট ভেবে দেখেছে যে ও নিজেও অতটা এনে উঠতে পারত না। দরাদরিতে নিজেও খুব পটু হওয়া সত্ত্বেও।

দেখতে দেখতে ওকে পরিবারেরই একজন সদস্য হিসেবে মেনে নেওয়া হল। জেরাল্ডের ঘরের পাশের ড্রেসিংরুমটায় একটা পালঙ্কে ওর শোবার ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। টারা ছেড়ে চলে যাবার কথা উইল একবারও তোলেনি। স্কারলেটও সতর্কভাবে সেই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে। মাঝে মাঝে স্কারলেট ভাবে লোকটার যদি কাণ্ডজ্ঞান থেকে থাকে, তাহলে একদিন না একদিন বাড়ি যাবার কথা বলে ফেলবে, বাড়ি বলতে যদি কিছু না থাকে তাহলেও। কথাটা ভাবামাত্রই, ঐকান্তিকভাবে প্রার্থনা করতে থাকত উইল যেন অনির্দিষ্টকাল ধরে টারাতেই থাকে। বাড়িতে একজন পুরুষ মানুষ থাকা খুব সুবিধেজনক।

স্কারলেট এটাও ভাবে যে ক্যারীনের যদি বিন্দুমাত্র বোধবুদ্ধি থাকে, তাহলে ওর বোঝা উচিত যে উইল ওর ব্যাপারে কত যত্নশীল। উইল যদি ক্যারীনকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় তাহলে স্কারলেট খুবই খুশি হবে। অবশ্য যুদ্ধের আগে হলে উইলকে ক্যারীনের যোগ্য প্রার্থী বলে মেনে নেওয়া কঠিন হত। ওকে ঠিক প্ল্যান্টারদের দলে ফেলা যায় না, আবার খুব গরীব সাদা মানুষও বলা চলে না। বলা যেতে পারে ও একজন গরীব ঘরের অর্ধশিক্ষিত ছোট চাষী। বোলচালে একটা গ্রাম্যতা দোষ আছে। ও’হারা পরিবারের প্রচলিত মাপকাঠিতে ভদ্রলোকসুলভ আদবকায়দার ব্যাপারেও সুক্ষ্মতাবোধের অভাব। স্কারলেট বুঝেই নিয়েছে ওকে সেভাবে ঠিক ভদ্রলোক বলা চলে না। মেলানি অবশ্য জোর দিয়েই বলে যে উইলসের মত দয়ালু আর বিবেচক লোক সদ্বংশজাত না হয়েই যায় না। স্কারলেট মনে মনে ভাল করেই জানে যে উইলসের সাথে এলেনের কোনও মেয়ের বিয়ের কথা শুনলে উনি মূর্চ্ছা যেতেন। কিন্তু গরজ বড় বালাই, তাই এলেনের দেওয়া শিক্ষাদীক্ষা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা ওর পক্ষে অসম্ভব। দেশে পুরুষ মানুষের বড় আকাল, অথচ মেয়েদের বিয়ে হওয়াটাও দরকার, আর টারার দরকার একজন পুরুষ অভিভাবকের। আর এদিকে ক্যারীন দিনে দিনে জপতপে বেশি বেশি করে ডুবে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতির থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। উইলকে বসিয়ে নিয়েছে ভাইয়ের আসনে। যেন ধরেই নিয়েছে উইলকে চিরকাল বাঁধা থাকবে, যেমন স্কারলেট ধরে নিয়েছে পোর্ক ওর কাছে চিরকালের জন্য বাঁধা আছে।

“ক্যারীনের জন্য আমি যা করেছি তা নিয়ে ওর মনে একটুও যদি কৃতজ্ঞতাবোধ থাকত, তাহলে উইলকে ওর বিয়ে করে ফেলা উচিত,” স্কারলেট মনে মনে গর্জায়। “তার বদলে এমন একজনের চিন্তায় মগ্ন রয়েছে যে কিনা ওকে সত্যি সত্যি কখনও পাত্তা দিয়েছে কিনা সন্দেহ!”

তো উইল টারাতে থেকে গেল – ঠিক কি কারণে সেটা স্কারলেটের কাছে স্পষ্ট নয় – কিন্তু ওর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে ব্যবসা নিয়ে পেশাদারী ভঙ্গিতে আলোচনাতে ও বেশ আনন্দ পায়, পছন্দও করে। অন্যমনস্ক জেরাল্ডকে পরিবারের প্রবীণ হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়, কিন্তু যে কোনও জরুরি ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য স্কারলেটই যে আসল গৃহকর্ত্রী সেটা বুঝে নিয়েছে।

স্কারলেট ঘোড়া আর ওয়াগন ভাড়া দেবার প্রস্তাব অনুমোদন করে দিল। এর জন্য হয়ত সাময়িকভাবে ওদের কাছে যাতায়াতের কোনও সাধন থাকবে না। স্যুয়েলেনই সব থেকে বেশি চটে যাবে এর ফলে। উইলকে প্রায়ই ব্যবসার কাজে শহরে যেতে হয়। উইলসের সঙ্গে ঘোড়ার গাড়িতে বসে জোন্সবোরো বা ফ্যেয়াটভিল যাওয়ায় স্যুয়েলেনের খুব আনন্দ। প্ল্যান্টেশন ছেড়ে বেরোবার কোনও সুযোগই ও হাতছাড়া হতে দেয় না। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিলে কাউন্টির যাবতীয় রসালো গল্পে মেতে উঠবে, আর যারা জানে না যে ওকে ক্ষেতে আগাছা সাফ করতে হয় বা বিছানা পাততে হয়, তাদের কাছে এমন চালে কথা বলবে যেন এখনও ও পুরোনো দিনের সযত্নলালিত সেই মিস ও’হারাই রয়ে গেছে।

কি আর করা যাবে! মিস চালবাজকে নাহয় সপ্তাহ দুয়েকের জন্য দৌড়াদৌড়ি বন্ধ রাখতে হবে! সবাইকে ওর ঘ্যানঘ্যানানি আর চেঁচামেচি একটু সহ্য করতে হবে। মনে মনে ভাবল স্কারলেট।

মেলানিও বারান্দায় চলে এল। বাচ্চা কোলে করে। একটা কম্বল মেঝেতে বিছিয়ে বিউকে বসিয়ে দিল, হামাগুড়ি দেবার জন্য। অ্যাশলের চিঠি আসার পর থেকে মেলানি দুভাগে সময় ভাগ করে নিয়েছে। কিছুটা সময় আনন্দে স্ফুর্তিতে নেচে গেয়ে কাটায়, আর বাকি সময় অনন্ত প্রতীক্ষায়। খুশিতে থাকুক বা মন খারাপ করে থাকুক, ওকে খুবই রোগা লাগে, খুবই ফ্যাকাসে লাগে। নিজের ভাগের কাজে অবশ্য কোনও গাফিলতি নেই। শরীরটা কিছুতেই ভাল থাকতে চায় না এই যা। বৃদ্ধ ডঃ ফোনটেন বলেছিলেন যে এটা স্ত্রীরোগজাতীয় সমস্যা। বিউকে যে ওর ধারণ করাই উচিত ছিল না, সে ব্যাপারে ডঃ মীডের সঙ্গে উনি একমত ছিলেন। মুখের ওপর বলেই দিয়েছিলেন, আরেকটা বাচ্চা হলে ওকে কেউ বাঁচাতেই পারবে না।

“আজ যখন ফ্যেয়াটভিলে গেছিলাম,” উইল বলল, “একটা জিনিস পেলাম – এত সুন্দর – মনে হল আপনারা – মানে লেডিরা – জিনিসটা দেখলে খুশি হবেন। তাই ওটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি।” পেছনের পকেটে ঘেঁটে গাছের বাকল দিয়ে পোক্ত করা কাপড়ের তৈরি একটা ওয়ালেট বের করল। ক্যারীন এই ওয়ালেটটা ওর জন্য বানিয়ে দিয়েছে। ওটা থেকে একটা কনফেডারেট বিল বের করল।

“যদি তুমি ভেবে থাক কনফেডারেট বিল দেখে আমি খুশি হব, তাহলে উইল তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ,” স্কারলেট হতাশ গলায় বলল। কনফেডারেট টাকা দেখেই ওর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। “বাপীর ট্রাঙ্কে এই মুহুর্তে কনফেডারেটের তিন হাজার ডলার আছে। ম্যামি আমার পেছনে লেগে আছে ওগুলো ওকে দিতে, যাতে চিলেকোঠার গর্তের ওপর ওগুলো সাঁটিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া বন্ধ করতে পারে। দিয়ে দেব বলেই ভাবছি। অন্তত কিছু কাজে তো লাগবে!”

“স্বৈরাচারী সিজ়ার মৃত, মৃতদেহ মিশেছে ধূলায়,” ম্লান হেসে মেলানি বলল। “ওটা কোরো না স্কারলেট। ওয়েডের জন্য রেখে দাও ওই ডলার বিলগুলো। কোনো একদিন এগুলো দেখে গর্বে ওর বুক ফুলে উঠবে।”

“স্বৈরাচারী সিজ়ার সম্বন্ধে অবশ্য আমার কিছুই জানা নেই,” উইল বলল। “কিন্তু ওই যে ওয়েডের জন্য রেখে দেওয়ার কথা যেটা বললেন না, আমি আপনার সঙ্গে পুরোপুরি এক মত। এই দেখুন, মিস মেলি – একটা কবিতা – বিলটার পেছনে সাঁটানো রয়েছে। মিস স্কারলেট অবশ্য কবিতা-টবিতার ধার ধারেন না। তবু ভেবেছিলাম এই কবিতাটা ওঁর পছন্দ হবে।”

বিলটা ও উলটে ধরল। বাদামি রঙের একটা মোটা কাগজ সাঁটানো রয়েছে। বাড়িতে তৈরি হালকা কালিতে কিছু লেখা আছে। উইল গলা পরিস্কার করে আস্তে আস্তে, বেশ একটু কষ্ট করেই পড়লঃ

“কবিতার নামটা হল ‘কনফেডারেট নোটের পেছনে কয়েকটা লাইন’”, ও বলল।

“স্রষ্টার ভুবনে নেই চিহ্নমাত্র যার,

দুরন্ত বন্যার জলে হল ছারখার –

নিশ্চিহ্ন জাতির সেই ক্ষুদ্র অঙ্গীকারে,

হে বন্ধু, তুমি রাখ তারে।

মুছে যাওয়া সে জাতির স্বপ্ন ছিল যত,

স্বাধীনতা, দেশপ্রেম, বলিদানব্রত

এই তুচ্ছ লিপিতে রাখি সেই স্বপ্নটুকু ধরে,

সমব্যথী স্বজনের তরে।”

“ওহ, কি সুন্দর! কত মর্মস্পর্শী!” মেলানি সজল চোখে বলে উঠল। “স্কারলেট ম্যামিকে তুমি ওই নোট চিলেকোঠায় সাঁটতে দিও না। ওগুলোর কাগজের থেকে অনেক বেশি অমূল্য। ঠিক কবিতাটায় যেমন বলা আছে – ‘নিশ্চিহ্ন জাতির সেই ক্ষুদ্র অঙ্গীকার!’”

“ওহ মেলি, অত আবেগপ্রবণ হয়ে পোড়ো না! কাগজ হল কাগজই, আর আমাদের কাছে একটু বেশিই পড়ে আছে। চিলেকোঠার ফাঁক নিয়ে ম্যামির গজগজ শুনে শুনেও আমি বিরক্ত। ওয়েড বড় হলে ওই জঞ্জাল কনফেডারেট নোটের জায়গায় বরং বেশ কিছু আমেরিকার পত্রমুদ্রাই ওর হাতে তুলে দেওয়াটাই বুদ্ধির কাজ হবে!”

উইল ওই নোটটা নাড়িয়ে মেঝেতে বসে বিউকে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করছিল। মাথা তুলে ড্রাইভওয়ের দিকে নজর পড়তেই এক হাত চোখের ওপর রেখে ভাল করে দেখল।

“নতুন অতিথি মনে হচ্ছে,” রোদ্দুরে চোখ কুঁচকে গেছে। “আরেকজন জওয়ান।”

ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে স্কারলেটও চিরপরিচিত দৃশ্যটা দেখতে পেল। দাড়িওয়ালা একটা লোক – পরনে নীল আর ধূসর রঙের মেলানো মেশানো ইউনিফর্ম – মাথা ঝুঁকে পড়া, ক্লান্ত – সেডার গাছের সারির ভেতর দিয়ে পা টেনে টেনে আসছে।

“আমি তো ভেবেছিলাম সৈন্যদের বাড়ি ফেরার পাট চুকে গেছে,” ও বলল। “আশা করি এই লোকটা বেশি ক্ষুধার্ত হবে না।”

“ক্ষুধার্তই হবে,” উইল সংক্ষেপে বলল।

মেলানি উঠে দাঁড়াল।

“যাই ডিলসিকে গিয়ে একটা বাড়তি প্লেট লাগাতে বলে আসি,” বলল মেলানি, “আর ম্যামিকে সাবধান করে দিই, যাতে বেচারার গা থেকে জামাকাপড় খুলিয়ে ফেলার জন্য বেশি তাড়াহুড়ো না করে, আর – ”

এমন হঠাৎ করে থেমে গেল যে স্কারলেট অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। মেলানির সরু সরু হাতগুলো ওর গলার কাছে এসে জড়ো হয়েছে – এমনভাবে যেন অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। মুখ আরও পাণ্ডুর হয়ে উঠেছে, দু’চোখ বিস্ফারিত।

এখুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে, স্কারলেট ভাবল। উঠে দাঁড়িয়ে ওর হাত ধরে ফেলল।

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে, সিঁড়ি বেয়ে নেমে, নুড়িপাথরের রাস্তা ধরে ও পড়ি কি মরি করে দৌড় লাগাল। শরীর যেন পাখির মত হালকা। দু’বাহু প্রসারিত। রঙচটা স্কার্টটা পেছনে উড়ছে। এতক্ষণে স্কারলেট ব্যাপারটা বুঝতে পারল। উঠোন থেকে দূরে তাকিয়ে লোকটাকে ভাল করে দেখতে পেল। দাড়িওয়ালা লোকটা মুখ তুলে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেন আর এক পা এগোতেও অশেষ ক্লান্তি। বাড়ির চারপাশটা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। স্কারলেটের বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল। মেলি অব্যক্ত কান্নায় ভেঙে পড়ে লোকটাকে জড়িয়ে ধরেছে। স্কারলেট দৌড়ে যাবার জন্য পা বাড়াল। উইল পেছন থেকে ওর স্কার্টটা টেনে ধরে বাধা দিল।

“আনন্দটা মাটি করে দেবেন না।”

“আর ছাড় আমাকে, বোকা কোথাকার! ছাড় আমাকে! অ্যাশলে এসেছে!”

কিন্তু উইল মুঠো আলগা করল না।

“হলেই বা, উনি ওঁরই স্বামী, তাই নয় কি?” খুব শান্তস্বরে উইল জিজ্ঞেস করল। খানিকটা আনন্দ, খানিকটা নিষ্ফল ক্রোধ নিয়ে স্কারলেট উইলের চোখে চোখ রাখল। দেখল সহানুভূতি আর সমবেদনার ছোঁয়া ওর চোখের গভীরে।

টীকাঃ

স্বৈরাচারী সিজ়ার মৃত, মৃতদেহ মিশেছে ধূলায় - Imperious Caesar, dead and turned to clay – হ্যামলেট পঞ্চম অঙ্ক, প্রথম দৃশ্য

মূল কবিতাটি হল –

Lines on the Back of a Confederate Note:
Representing nothing on God's earth now,
And naught in the waters below it,
As the pledge of a nation that's dead and gone,
Keep it, dear friend, and show it.

Show it to those who will lend an ear
To the tale that this trifle can tell
Of Liberty born of the patriot's dream,
Of a storm-cradled nation that fell.
(মেজর সিডনি অ্যালরয় জোনাস-এর লেখা কবিতার প্রথম কয়েকটি পঙক্তি)



(তৃতীয় পর্ব সমাপ্ত)

প্রথম খণ্ড সমাপ্ত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ