রঞ্জনা ব্যানার্জীর গল্প : ভ্যান গগের কান


*শ্যনন 

সুইডেন ফেরার আগে আমার ফ্ল্যাটে এসেছিল শ্যনন। ওর জন্যেই ছবিগুলো আনিয়েছিলাম চাটগাঁ থেকে। আমি নিজেও এদের নব্বই সনের পরে আর দেখিনি।মাকে এইসব ছবি নিয়ে জিজ্ঞেস করতে বাধছিল। এই ছবি দুটো নিয়ে বাবা একসময় অনেক কথা শুনিয়েছিল মাকে। মায়ের সেই বিষণ্ণ মুখ আমার মনে খোদাই হয়ে আছে। ছবিগুলো আদৌ মা রেখেছে কি না সে ব্যাপারেও সন্দেহ ছিল। কিন্তু মাকে বলতেই মা বলল, “আমি তো ভেবেই রেখেছিলাম এবার ঢাকা যাওয়ার সময় ছবিগুলো নিয়ে যাব। বাড়িতে অনেক কিছুই আজ অপ্রয়োজনীয়। ছবি দুটো বাঁধাই করে রাখিস। তোর দেওয়ালে মানাবেও ভালো”। আমি দোনোমনা করছিলাম মাকে বলব কি বলব না- পরে ছবিটা নিয়ে শ্যননের সন্দেহের কথাটা বলেই ফেললাম। মা শুনে অবাক, “তাই!” দুই দিন পরে মা ফোনে জানাল মায়েরও মনে হচ্ছে ছবিটাতে অন্য কারো হাত পড়েছিল। কিন্তু কে? 

ছবিগুলো কীভাবে পাঠাবে মা ভেবে পাচ্ছিল না। বাবা বা পিপলু ভরসার নয় মোটেই। তাছাড়া টের পেলে পিপলুর বৌ মন্দিরা এ নিয়ে কাসুন্দি তুলবে। আমি যাব কিন্তু তা পরের মাসে এবং তখন শ্যনন থাকবে না। কী ভেবে জানি না খানিক পরে ইব্রাহিমকেই ফোন দিলাম। আমাদের কক্সবাজারে সেই গাইড ইব্রাহিম। ও বলেছিল ঢাকায় এলে দেখা করবে। ঠিকানা দেওয়া হয়নি ওকে। ও হয়তো লজ্জায় চায়নি আর আমিও আগ বাড়িয়ে এইসব দুদিনের পরিচিতদের জীবনে জড়ানোর পক্ষে নই বলে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। ফোন পেতেই সে খুশিতে কোনো কথাই ঠিকঠাক বলতে পারছিল না। বেশ কসরতের পরে জানলাম ও আসতে চায় ঢাকায়, ম্যাডামকে কদমবুসি করবে। জানলাম শ্যনন ইব্রাহিমের বাচ্চার জন্যে বেশ বড় অংকের টাকা পাঠিয়েছে। শ্যননের সংগে আমার প্রায় প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে অথচ আমি ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পাইনি। ইব্রাহিমকে অবশ্য এসব কিছু বললাম না কেবল জানালাম শ্যনন চলে যাবে। ইব্রাহিম বার বার বলতে লাগল, “উনি ফেরেস্তা”! নিজের কাছে নিজেকে বড় বেশি ছোট লাগছিল। লজ্জাও। সেবার ইব্রাহিমের বাড়িতে যাওয়ার সময় হাতে করে কিছু নেয়নি বলে শ্যননের ওপর ভয়ানক বিরক্ত হয়েছিলাম। যাই হোক ইব্রাহিমের এই ঢাকা আসার ইচ্ছেও যেন আমারপ্রয়োজনের স্বার্থেই কেউ ঘটিয়ে দিলো। ওকে অনুরোধ করলাম চট্টগ্রাম হয়ে যেতে এবং এ-ও জানালাম যে টিকেটের খরচটা আমিই দেবো। ইব্রাহিম এক কথায় রাজি হলো এবং ছবি দুটো সযত্নেই নিয়ে এসেছিল। আমার বাড়িতেই ডেকেছিলাম ওদের- শ্যনন, আসিফ আর ইব্রাহিমকে।দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেলাম । ইব্রাহিম শ্যননকে কীভাবে কৃতজ্ঞতা জানাবে যেন বুঝতে পারছিল না। ঝিনুকের গয়না, বার্মিজ কাঠের বাটি-চামচ আর ঝলমলে জড়িপাড়ের দুটো শাড়ি উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিল। শাড়ি দুটোর একটা আবার আমার জন্যে। ওর এই সৌজন্যবোধ আমাদের দুজনকেই মুগ্ধ করল। 

আসিফ আর ইব্রাহিম চলে যেতেই আমরা ছবিগুলো নিয়ে বসি। মা কী পরম যত্নেই না ছবিগুলো রেখেছে্ন! শ্যননও সায় দিলো, “তিনি দারুণ কিউরেটর” ।

পুরো ব্যাপারটা নিয়ে আমি তখনও ঘোরে। মনে হচ্ছিল আমার জীবনটা অন্য কোনো সময়ের তলে পিছলে ঢুকে গেছে। যা ঘটছে সবই আসলে স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই ফিরে আসব এই জীবনে। শ্যননকে একথা বলতেই ও আমাকে জোরে চিমটি কেটে বলেছিল, “এটাই বর্তমান। আমরা সকলেই এক প্রাচীন কাফেলার যাত্রী, হাঁটছি তো হাঁটছিই যাত্রা ফুরোচ্ছে না। সেই অবিরাম যাত্রায় আমাদের প্রত্যেকের জীবনের অসমাপ্ত বিষয়গুলি মৃত পায়ের ছন্দ নিয়ে জেগে থাকে পরের যাত্রীর পায়ের চিহ্নে জুড়বে বলে। এই প্রবাহ চলতেই থাকে যতক্ষণ না সেইসব বিষয়ের সুরাহা হয়”। ওর মতে যে গল্পের শুরু আছে তার শেষ থাকবেই। “মাঝে মাঝে ঘুরপথে সেই শেষবিন্দুতে পৌঁছাতে হয় এই যা”। শ্যননের মতে অলৌকিক বলে কিছু নেই বেমিলে হুবহু মিল পেলেও নয়।এরা শাড়ির কুঁচির নক্সার মতোই মিলমিল ঘটনা- যুক্ত না-থেকেও সমপাতন যাকে বলে। 

*ছবির কথা 

শ্যননের মতো যুক্তি দিয়ে অবাককে সবাক করার মেধা আমার নেই তবে ওর সেই “প্রাচীন কাফেলার যাত্রী”র ভাবনাটা আমি ইদানিং বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। যেসব চিহ্ন এতকাল আমার দৃষ্টির অগোচরে ছিলতার প্রায় সবই আমার চোখে এখন স্পষ্ট হচ্ছে। শ্যনন বলে, দেখতে চাইলেই মন লাগাতে হয় চোখে আর তখনই চোখ চক্ষুষ্মান হয়। ‘মাইন্ডফুলনেস ডিয়ার’, ও আমার কাঁধে চাপড় দিয়ে বলেছিল, “যা তুমি খুঁজছ তাকে মন দিয়ে খুঁজলেই পেয়ে যাবে। ইচ্ছের তীব্রতার টান অভিকর্ষ-মহাকর্ষ সকল আকর্ষণবলের চেয়ে প্রবল”। 

শ্যনন যা বলে তা কেবল তত্ত্বকথা নয়, ওর বিশ্লেষণ ক্ষমতা দারুণ- যে ছবি নিয়ে তাঁর ফিরে আসার নতুন গল্প তৈরি হয়েছিল সেই ছবিটা না দেখে কেবল আমার মুখে গল্প শুনেই ও বলেছিল, “উনি আসলেআসেননি। দ্বিতীয় কেউ আছে এর পেছনে” । এবং ছবিটা হাতে পাওয়ার পরে চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল ওর যুক্তির পক্ষে অসামঞ্জস্যগুলো। অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে আমার না হয় অবুঝ বয়স ছিল তখন, কিন্তু বাড়ির বড়দের চোখে কীভাবে এমন বেখাপ্পা ফুলআর প্রজাপতির ডানা এড়িয়ে গেল! শ্যননের অবশ্য তৈরী-জবাব : “ছবিটা যারা দেখছিল তারা ভরাট জায়গাটা দেখছিল কীভাবে ভরলোতার রহস্য খুঁজছিল না আর আমি ছবিটা দেখছি না, ভরাট হওয়ারকারণ খুঁজছি। আমার দৃষ্টি কেবল এই একটি জায়গায় আলো ফেলেছে। তোমাদের দেখার ক্যানভাস বড়, মনোযোগ নয়। আসলে আমাদের দু-পক্ষের উদ্দেশ্য ভিন্ন এটা মাথায় রাখলেই সবই লৌকিক মনে হবে”।এরপরেই ও হাসতে হাসতে বলল, “তুমিও দেখবে এখন আর সূর্যমুখির দোল দেখছ না দেখছ বিষম রঙ এবং কাঁচা হাতে আঁকা প্রজাপতি। আর এই বেমিলগুলো সর্বনাশ করবে তোমার- ছবিটাকে আর আগের মতো ভালো লাগাবে না। বরং ঐ ন্যাতানো ফুলের ছবিটা মাস্টারপিস হয়ে যাবে”। এর পরেই হাসতে হাসতে বলেছিল, “যাই বল ভদ্রলোকের কিন্তু দারুণ রসবোধ। দেখা হলে যত বয়সই হোক আমি ঝুলে পড়ব”। হেসে বলি, “আমিও”। 

মায়ের জন্যে আঁকা ছবিটা আমার বিছানায় পেতে প্রায় কুড়ি মিনিটের মতো একভাবে তাকিয়ে ছিল শ্যনন। এরপর সিগারেটের ছাই আধখাওয়া কফির কাপে ঝাঁকিয়ে বলল, “এটা একটা রোমান্টিক ছবির গল্প হতে পারে। আমি কোনো একদিন সিনেমা বানাব এই গল্প নিয়ে। মিসেস ডাট্টা নিশ্চয় আমাকে অনুমতি দেবেন। আসলে নেতিয়ে পড়া ফুলের তোড়াটাই ছিল তাঁর মূখ্য ছবি। তুমি যেটা নিয়ে হৈচৈ করছ ওটাকিন্তু ফাউ। এই একটা ছবি কত কী বলছে দেখ!” আমিও ঝুঁকে দেখতে থাকি। মনে পড়ল ত্রিশ বছর আগে আট বছরের সেই বালিকাটির এই ছবির ন্যাতানো ফুলগুলি দেখে মনে হয়েছিল ওরা হয়রান হয়ে গেছে।ঠিক এই শব্দটাই মনে এসেছিল, “হয়রান”। মায়ের মুখে তখন এই শব্দটা লেগে থাকত। রাতে যখন অবশেষে আমাদের পাশে আসতোতখন মায়ের নিজের চুলটা বাঁধারও শক্তি থাকতো না। বিছানায় গা এলিয়ে মা যেন নিজেকেই শোনাতো কিংবা বাবার কাছে ছুটির আর্জিকরতো অলক্ষ্যে, “হয়রান হয়ে গেলাম রে”। আমাদের পরিপাটি বাবা তখন পাশের খাটে অপেক্ষায়- কবে মা আমাদের ঘুম পাড়িয়ে যাবে তাঁর পাশে। আমার চোখ জ্বলতে থাকে। সেখানেও দায়িত্ব- ভালোবাসার টান নয়। শ্যনন ছবিটা আমার দিকে ঘুরিয়ে পাতে। আঙুল রাখে পাপড়িতে, ‘দেখ ফুলগুলোর বাইরের কিনারায় খয়েরি ছোপ ভেতরটা অতটা ম্রিয়মান নয়। তোমার মা মানে সেই কিশোরি যাকে তিনি আবৃত্তি শিখিয়েছেন, যিনি নাচে পুরস্কার পেয়েছিলেন ছেলেবেলায়, যাঁকে আঁকা নিয়ে তোমাদের সামনেই মজা করেছেন তার সবই আসলে এক গভীর বেদনার প্রকাশ। পরে এই ছবিতে হারানো মেয়েটাকে জাগাতে চেয়েছিলেন- এত কিছুর পরেও মেয়েটা নিজের ভেতরের সেই “আমি”টাকে সজীব রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে- এই সত্য তিনি দেখতে পেয়েছিলেন”। শ্যনন যখন এইসব বলছিল তখন আমার মনের পর্দায় দৃশ্যগুলির বিনির্মাণও চলছিল। আমি ছায়াছবির মতো দেখছিলাম সেই কিশোরীকে- পায়ের নুপূর খুলছে, চোখের কাজল ভুলছে, গলার গান উবে যাচ্ছে সিঁথির সিঁদুরের লালে। অতঃপর সে নিজের স্বপ্নের ডানা কন্যার পিঠে বসাচ্ছে। প্রাণপণে চাইছে কন্যা পাখা মেলে উড়ুক কন্যা নিজের আকাশে- আর নিজের ছায়ার ভেতরে গুটিয়ে যেতে যেতেওদুহাতে ঠেলছে বিষণ্নতার মেঘ। মুখে বললাম, “উনি নিজ মুখেই বলেছেন মায়ের বিয়ের দশ বছর বাদে বাসি উপহার দিচ্ছেন- সেটার রূপকই হয়তো এই ন্যাতানো ফুল”। অন্য ছবিটাতে কিছু লেখা না থাকলেও এটা উল্টোপিঠে মোটা অক্ষরে লেখা ‘টুম্পাকে বিয়ের উপহার- পথে হলো দেরি’। নিচে তারিখ,২রা নভেম্বর ১৯৯০। আশ্চর্য এই ‘পথে হলো দেরি’ বাড়তি লাইনটা শুনিনি তো আগে! কেউ উলটেও দেখেনি হয়তো না কি দেখেছিল বলেই বাবা ছবিটার ওপরেই রাগ ছুঁড়েছিল? শ্যনন কপালের পাশে টোকা দিয়ে বলল, “থিংক মাই ফ্রেন্ড। মানুষ মুখের ভাষা রপ্ত করার আগে ছবি দিয়েই মনের কথা বলত। হাজার কথার চেয়ে দামী হতে পারে একটি রেখা। আমার কথা মিলিয়ে নিও। এ ছবি কেবলই ছবি নয়, এটি মেসেজ। ফুল তোড়া বেঁধে রাখলে বাঁচে না। তাজা রাখতে হলে জল চাই। ফুলের তোড়াটি কোনো সুদৃশ্য টবেও নয়, মেঝেতেও নয়- দেখ ব্যাকড্রপ নেই, স্টিললাইফ ছবিগুলোতে একটা কিছুআয়োজন থাকে। এটা এক্কেবারে ঝুলিয়ে রেখেছে। মূল ছবির বাইরে কোনো আঁক নেই। যেন সিদ্ধান্ত তোমার। এই ফুল ফেলবে নাকি রাখবে। এখন বিষয় হলো এই তুমিটা কে?” এবার আমি হাসতে থাকি। “এটা তো এমনও হতে পারে প্রেমিক অপেক্ষায় ছিল ফুল হাতে, দেরি দেখে চলে গেছে। তোড়াটি ফেলে দিয়েছে। প্রয়োজন নেই। পথে হলো দেরি -পাঞ্চ লাইন ভুলছ তুমি” । “হুম” শ্যনন আবার দেখল ছবিটা, “এই মেসেজ হলে ফুলের পঁচনের এত ডিটেইল আঁকতেন না। পাতা দেখ কেমনসতেজ” । আমি দেখলাম। একটা কথা মনে পড়ল- খাবার টেবিলে উনি আমার ড্রইং খাতায় আঁকা সূর্যমুখি দেখে বলেছিলেন: ওটা ড্রইং, আর্ট নয়। দীর্ঘশ্বাস চেপে ভাবলাম শ্যননের চোখ আছে দেয়ালের আলোছায়ার কুহক থেকে সেও হয়তো পায়রা খুঁজে নিতে জানে। 

ছবিগুলি গুটাতে গুটাতে বলি, “মা শুনলে আমাদের দুজনকেই ঝাঁটা-পেটা করতো।”

শ্যনন বলল, “ইস্‌ তোমার মায়ের সঙ্গে যদি দেখা হতো!” 

সত্যি মাকে আনতে পারলে ভালো হতো। পিপ্‌লুর ছেলের স্কুলে ফাংশন। মা বাবা না থাকলে বাচ্চাটা মন খারাপ করবে, নয় তো মাও শ্যননকে দেখতে আসতে চেয়েছিল। 

শ্যননকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “এই নতুন আয়োজনে পুরোনো কাফেলায় তোমার সংযুক্তিও তবে বিনা কারণে নয় বলো?”

ও লম্বা টান দিয়েছিল সিগারেটে। আমরা আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের ব্যাল্কনিতে বসেছিলাম। আকাশে কাঁসার থালার মতো ঝলমলে চাঁদ। শ্যনন সেই দিকে নিখুঁত ধোঁয়ার রিং উড়িয়ে বলেছিল, “আমি কারণ না হলেও অনুষঙ্গ তো বটে। এই নাটকে আমরা সকলেই কুশীলব, নাট্যকার নই। এই নাটকের কোনো দৃশ্যে গড়বড় হলে তা মেরামতও হয় স্বতঃস্ফূর্ততায়। পুণঃযাত্রার শুরু ঠিক সেইখান থেকে। এই মেরামতের একটা নিজস্ব চিহ্ন থাকে। কেউ কেউ টের পায় বেশিরভাগ সময়ই ঘটনার স্রোতই ঘটনায় টেনে নিয়ে যায় আমাদের। আমি স্বতঃস্ফুর্ততায় বিশ্বাস করি, কারণে নয়।” 

“আমার পূণঃযাত্রার সেই চিহ্ন তবে ‘ভ্যানগগের কান’ মানে জয়নাল?” 

শ্যনন হেসে উত্তর দিয়েছিল, “হতে পারে”। 

ওর এই শেষ কথায় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডাস্রোত নেমেছিল। চোখের সামনে চম্‌কে ভেসে মিলিয়ে গিয়েছিল অরুণাংশু রায়ের মুখ। মাঝখানের ত্রিশ বছর কাফেলার যাত্রাপথে তিনি কি ছিলেন? না কি শ্যনন কিংবা জয়নাল হেঁটেছে তাঁর হয়ে? 

যাই হোক ছবি নিয়ে আমার ভাবনাটা হয়তো একসময় থিতিয়ে যেতো অথবা কে আঁকল, কেন আঁকল এ নিয়ে পরের ক’মাস আদাজল খেয়ে লেগে থাকতাম না কিন্তু সেই রাতে শ্যননের আমাকে নিয়ে মজা করে দেওয়া উপদেশ শুনেই ছবির দ্বিতীয়জন নিয়ে ভাবনাটা আমাকে পেঁচিয়ে ধরল। 

শ্যনন সেদিন আর হোটেলে ফেরেনি আমার সঙ্গে ছিল। দুপুরের আয়োজনে যা বেঁচেছিল তাতে আমাদের দিব্যি হয়ে যেত কিন্তু পরদিন রাতে ওর ফ্লাইট বলে আমি মশলাদার কিছু খাওয়ানোর পক্ষে ছিলাম নাযদিও বিদেশীদের মতো তেল মশলা নিয়ে শ্যননের ছোঁকছোঁক নেইমোটেই । ওর অনুমানের সঙ্গে ছবির বেমিল মিলে যাওয়ায় ও বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিল; বলল আমার সঙ্গে ওর একটা রান্নার ভিডিওকরবে। ইউটিউবে আধ ঘণ্টা ঘোরাঘুরির পরে চিংড়ির মালাইকারি পছন্দ হলো ওর। এরপর শ্যননের সুইডিশ ধারাবিবিরণীর সঙ্গে রান্না হলো সাদা ভাত, দেশি স্টাইলে সর্ষের তেল মাখা পেয়াজ-লঙ্কাকুচি-ধনেপাতাদিয়ে টমেটো শসার সালাদ সঙ্গে চিংড়ির মালাইকারি। প্লেটে সাজিয়ে ছবিটবি তোলার পরে যখন খেতে বসলাম তখন ভাতের ধোঁয়া মিইয়ে গেছে। আঙুলে মাখিয়ে ভাত খাওয়াটা সে রপ্ত করতে পারেনি এখনও। আমি ওর ভাত ঝোল নিয়ে আঙুলের কুস্তি দেখে উঠে হাত ধুয়ে কাঁটাচামচ দিলাম। হাত মোছার জন্যে টিস্যু এগিয়ে দিয়ে বললাম, “আরাম করে খাও নইলে স্বাদ তো পাবে না” ও খানিক লজ্জা পেল হয়তোবা। টিস্যু নয় সেও হাত ধুয়ে কাঁটা দিয়ে ভাত মাখাতে লাগল। বলল, “ঠিক কথা এখন রিহার্সলে বসলে মনোযোগ ছুটে যাবে কিন্তু তিতলী তোমারও এই ভ্যান গগ সিন্ড্রোম থেকে এবার বেরিয়ে আসতে হবে। পৃথিবীতে ভ্যান গগই একমাত্র সূর্যমুখির রূপ খুলেছেন তা নয়। মনে’র ছবিগুলো দেখ, মনে হবে প্রকৃতি তোমার ঘরে এসে ঢুকেছে। রুসো প্যারিস ছেড়ে কোত্থাও যায়নি অথচ কী দুর্দান্ত সব ছবি এঁকেছেন। রঙের কী বাহার ওদের ছবিগুলোরও কদর করতে শেখ”। “মানে”? আমি থতমত খেয়ে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে। ও হাত ঘুরিয়ে চারপাশ দেখিয়ে বলল, “তোমার ঘরে সব কিছু হলুদ আর ব্রাউন। এখানে সাদা ঢোকাও, খানিক বিরাম হোক চোখের” । আমি নিজেই অবাক হলাম নিজের চারপাশ দেখে- এভাবে দেখিনি তো! তবে দেওয়ালের রঙ আমার দেওয়া নয়। অ্যাপার্টমেন্টের মালিকের পছন্দে। বললাম, “আমাদের দেশে কাঠের আসবাবপত্র খয়েরিই স্বাভাবিক আর এখানে সাদা হলে মনে হতো না শূন্যে ভাসছি? আমার উচ্চতায় অসুবিধা আছে।” সত্যি আমার উচ্চতাভীতি আছে; আমি পারতপক্ষে লিফট চড়ি না। জানালার ধারে প্লেনে বসি না। আসবাবপত্রের খয়েরি স্পেসকে সসীম করে। ও আমার টেবিলের থালাবাটির দিকে ফের কাঁটাচামচ তুলল, “এই হলুদ?” এবার আমি চুপ। ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে।আমি সজ্ঞানে করিনি এটুকু বলতে পারি। হলুদ আমার প্রিয় রঙ হলো ঠিক কোন বয়সে তাও মনে নেই। এমনকি শ্যননের সামনে যে ফতুয়া পরে বসে আছি সেটিও হাল্কা হলুদ-কাকতালীয়ই । শ্যনন চোখে হাসি নিয়ে আমাকে দেখতে দেখতেই কাঁটায় গাঁথা চিঙড়ি মুখে তোলে। আমি দেখি চিঙড়ির গায়েও মালাইকারির সোনালি হলুদ ঝলকাচ্ছে! আর তখনই মাথার ভেতর বেড়াল আঁচড় কাটল- দ্বিতীয়জন কে জানলেই হলুদের সঙ্গে বোঝাপড়া সারা হবে হয়তোবা। 


*ফিরে দেখা 

কক্সবাজারে শ্যননের ট্যুর-গাইড হওয়ার কথা ছিল আসিফেরই। আসিফ আমাদের প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্টসে কাজ করে। বিদেশী ক্রেতা কিংবা বিনিয়োগকারীরা এলে তাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয় সে। ইংরেজি, ফরাসী, চিনা এবং জার্মান এই চার ভাষাতেই চোস্ত আসিফ। দুই বছর আগে শ্যননের প্রথম সফরে আসিফই গাইড ছিল। আর ঠিক সেই বছরেই আমি ‘স্বপ্নে’র রিসাইক্যালড পেপারগুডস বিভাগের সহকারি প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। শ্যনন তখনসুইডেনের এক বিজনেস ম্যাগাজিনের জন্য স্বপ্নের ওপর প্রতিবেদন তৈরির কাজে এসেছিল বাংলাদেশে। সুইডেন আমাদের অন্যতম গ্রাহক। আমাদের দেশে “স্বপ্ন” ই সর্বপ্রথম পুনঃব্যবহারযোগ্য কাগজ,কাপড়, সুপুরির খোল আর কলার খোলের আঁশ থেকে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী উৎপাদন শুরু করেছিল। আমাদের মূল কারখানা যশোরে। এই যশোর থেকেই সাত বছর আগে মাত্র চার জন কর্মচারী নিয়ে আসমা খান এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করেছিলেন । এখন ‘স্বপ্ন’প্রায় তিন হাজার কর্মচারীর রুটিরুজির সংস্থান করছে । 

সেবার প্রজেক্টের কাজ সরেজমিনে দেখে আসার জন্যে আসমা আপা ওদের সঙ্গে আমাকেও পাঠিয়েছিলেন। অপারেশন ম্যানেজার নাঈম সাহেব গিয়েছিলেন কোম্পানির ব্যবস্থাপকদের তরফ থেকে। আমাদের বিমানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শ্যননের অনুরোধে সময়সাপেক্ষ হলেও সড়কপথেই যশোর যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। শ্যনন ওর ব্যক্তিগত ট্রাভেল-ভ্লগের জন্য বাংলাদেশ সফরের ভিডিও করছিল । শ্যননের কারণে সেই যাত্রা দীর্ঘ হয়েছিল। কিন্তু আমরা উপভোগ করেছিলাম; নিজের দেশটা যেন নতুন চোখে দেখছিলাম । খানিকক্ষণ পরপর গাড়ি থামাচ্ছিল শ্যনন। নাঈম সাহেবের আর্থ্রাইটিস উনি এই ফাঁকে হেঁটে মাংসপেশীর জট ছাড়াচ্ছিলেন। নাঈম সাহেব একাত্তরে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁর কাছ থেকে আমরা সেইসব যুদ্ধদিনের গল্প শুনছিলাম। যশোরে ঢুকতেই আসিফ, মৌসুমী ভৌমিকের ‘যশোর রোড’বাজানো শুরু করেছিল। বাংলাদেশের উত্থান নিয়ে বেশ পড়াশোনা করে এসেছিল শ্যনন। ‘অ্যালেন গিন্সবের্গের’ যশোর রোডও শুনেছিল সে।আসিফের বয়ানে মৌসুমীর যশোর রোড এর তর্জমা শুনতে শুনতেই গাড়িতে বসেই মুক্তিযুদ্ধ এবং একটা বিধ্বস্থ রাষ্ট্রের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের ইচ্ছে জানিয়েছিল শ্যনন। 

নাঈম সাহেব তখনই প্রস্তাব করেন কাজ শেষে সবাই মিলে বেনাপোল সীমান্ত ঘুরে আসতে পারি আমরা শ্যনন কিছু প্রাথমিক চিত্রধারণ করে ফেলতে পারে এই সু্যোগে। তিনি আসমা আপাকে ম্যানেজ করবেন। শ্যননের মতো সেটি আমারও ছিল প্রথম যশোর সফর। খুবই আনন্দ হচ্ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারব ভেবে। কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষদিকের উথালপাথাল বৈশাখী ঝড়ের খপ্পরে পড়ে আমাদের শেষ দুই দিন হোটেলেই কাটাতে হয়; যশোর যাওয়া হয়নি সেবার তবে সেই দু’দিনেই শ্যননের সঙ্গে আমার কেজো সম্পর্কটা বন্ধুত্বে পালটায় এবং পরের দুই বছরে হোয়াটস-অ্যাপ আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে তা গাঢ় হয়। 

দুই বছর পরে এবার বাংলাদেশে নেমেই শ্যনন যশোরে ছুটেছিল সবার আগে। ও মজা করে বলেছিল, “তোমাদের আনপ্রেডিক্টেবল কান্ট্রি, আনপ্রেডিক্টেবল পিপল, অ্যান্ড আনপ্রেডিক্টেবল মাদার ন্যাচার, কোনো রিস্ক নেবো না আমি” । কিন্তু কক্সবাজারে এসে আবার সেই আনপ্রেডিক্টেবল সমস্যায় পড়েছিল সে। 

যশোরে ওর গাইড হিসেবে আসিফই গিয়েছিল। শ্যনন অবশ্য একাই যেতে চেয়েছিল কিন্তু আসমা আপা ওর নিরাপত্তার ঝুঁকিতে যেতে চাননি। যেহেতু তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদনের কাজে মূলত ওর আসা, ওর নিরাপত্তা স্বপ্নের দায়িত্ত্বে পড়ে। তাছাড়া স্বপ্নের উত্থান নিয়েও কথা থাকবে জেনে আসমা আপা শ্যননের এই ব্যক্তিগত তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য সার্বক্ষনিক গাড়ির সুবিধা দিয়েছিলেন। শ্যননের সংগে আসমা আপার সম্পর্কও কাজ ছাপিয়ে ব্যক্তিগত হয়ে গেছে এই ক’বছরে। কারণও আছে- দুই বছর আগের শ্যননের করা সেই প্রতিবেদনের সূত্রেই স্বপ্নের উৎপাদিত সামগ্রীর ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল ইউরোপের দেশগুলোতে এবং সুইডেন ছাড়াও নতুন দুটি দেশ স্বপ্নের পাটের পুতুলের গ্রাহক হয়েছে। কিন্তু এর পরেই শ্যনন সেই বিজনেস ম্যাগাজিনের কাজ ছেড়ে দিয়ে নারীদের ফ্যাশন এবং জীবনযাত্রা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘অ্যাল’ এর সুইডিশ সংস্করণের প্রদায়ক হিসেবে যোগ দেয়। ওর এবারের সফর ছিল ‘অ্যাল’ ম্যাগাজিনের দক্ষিণ এশিয়ার নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে প্রতিবেদনের সূত্রে । আগের কর্মসূত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাই অ্যালের সম্পাদকীয় পরিষদ শ্যননকে বাংলাদেশ অংশের দায়িত্ব দিয়েছে। এবং বুদ্ধিমতি শ্যনন স্বপ্নের প্রতিষ্ঠাতা আসমা খানকেই এবারেও ওর প্রতিবেদনের বিষয় করেছে। এই কারণেই সে দুই সপ্তাহের বেশি সময়বাংলাদেশে কাটিয়েছে। অ্যালের অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকে ফাঁকে ওঁর সেই তথ্যচিত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধের নানা স্থাপনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করেছিল। এইকাজে অফিস ছুটির পরে ঢাকা শহরের ভেতরে কোথাও গেলে কখনও-সখনও আমিও শ্যনন,আসিফের সঙ্গী হয়েছি। 

কিন্তু কক্সবাজারে শ্যননের সফরে আমার অন্তর্ভুক্তি ছিল কাকতালীয়। আসিফের মায়ের কিডনিতে টিউমার ধরা পড়েছে। মাকে নিয়ে আসিফ ভেলোরে গেছে। সত্যি বলতে কী এই সময়ে আমি স্টেশন ছাড়তেই চাইছিলাম না। সেই সপ্তাতেই রিসাইকেল্ড গুডস সেকশনের কার্ডবোর্ড বাক্স আর পেপারটাওয়েলের একটা বড় চালান যাওয়ার কথাআমেরিকায়। নর্থ আমেরিকার এটাই স্বপ্নের প্রথম চালান। এবং এই কোম্পানিতে দু’বছরের চাকরি জীবনে এই কাজটি সম্পুর্ণ আমার তত্ত্বাবধানেই হয়েছে। আমি চাইছিলাম প্যাকেজিং এবং শিপমেন্টের সময় সশরীরে থাকতে। তাছাড়া চট্টগ্রামে জন্ম হলেও কক্সবাজারে আমি একবারই গেছি । সেও প্রায় কুড়ি বছর আগে, কলেজে পড়ার সময়। গাইড হওয়ার মতো জ্ঞান নেই আমার । আরও বাজে ব্যাপার হলোচাটগাঁর ভাষা বুঝলেও বলতে পারি না ভালো। আসিফের বিকল্প হিসেবে নয় শ্যননের সংগে আমার বন্ধুত্বের কারণেই আসমা আপা খুব সম্ভব আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। আর আমিও আসমা আপাকে ‘না’ বলতে পারিনি। 

কক্সবাজারে শ্যননের দুই দফায় কাজ করবার কথা। মোট পাঁচ দিনের কার্যক্রম। রোহিংগা শরনার্থীদের এদেশে জীবনসংগ্রাম এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় এই অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিফলন দেখাতে কক্সবাজারকে ওর তথ্যচিত্রে সংযুক্ত করেছে। প্রথম দফায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে রোহিংগা শরনার্থীদের প্রতি স্থানীয়দের মনোভাব এবং পরের দফায় শরনার্থী-শিবিরে গিয়ে সরেজমিনে শরনার্থীদের জীবনযাত্রার মান এবং তাদের মুখে তাদের সংগ্রাম শোনার পরিকল্পনা ওর। এই দ্বিতীয় পর্বের জন্য অনুমতি জোগার করা সম্ভব হয়নি। ইউনিসেফের স্থানীয় একজনের সংগে কথা বলে ভেতরের সহযোগিতার আশ্বাস পেলেও মন্ত্রনালয়ের অনুমতি মেলেনি। আসমা আপা ভরসা দিয়েছিলেন ব্যবস্থা হয়ে যাবে। রোহিংগাইস্যু বাংলাদেশের জন্য এক অস্বস্তিকর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে তাই সরকারিমহল থেকে অনুমতি জোগাড় করা ক্রমশ কঠিনতর হচ্ছে । শ্যনন নিজেও মন্ত্রনালয়ে বেশ কবার ধর্ণা দিয়েছিল। ওর বাংলাদেশে থাকার সময় বাড়ানো সম্ভব নয়। আসার আগেই ও যে ধারণা নিয়ে ওর স্কেজ্যুল তৈরি করেছিল অনুমতির গেঁড়োতে পড়ে কাজটা ওর পরিকল্পনা মতো হবে কি না তা নিয়ে আমারও সংশয় ছিল তবে তার চেয়ে বেশি পীড়া ছিল ভাষার অস্বস্তি। চট্টগ্রামের মেয়ে হয়ে সেই ভাষায় সাবলীল না হওয়া যতটা আমার খারাপ লাগছিল তার চেয়ে বেশি দুর্ভাবনা ছিল আমার ভাষার দুর্বলতা ওর কাজে প্রভাব ফেলবে বলে। কিন্তু শ্যননের কাছ থেকে এ কথা শুনে কক্সবাজারে আসার ঠিক আগের দিন ভেলোরে বসেই আসিফ, ইব্রাহিম নামের স্থানীয় এক যুবককে আমাদের সাহায্য করবার জন্য ঠিক করে দিয়েছিল। ফলে কক্সবাজারে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলাকিংবা শিবিরে কাজ করার অনুমতি পেলে সেখানেও কথোপকথনে ভাষাজনিত জটিলতার ঝামেলা দূর হয়েছিল। 


* সূর্যমুখি এবং 

প্রথম পর্বের প্রায় পুরোটা কাজই তিন দিনে শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষ দুই দিন তোলা ছিল রোহিংগা শিবিরের ভেতরে কর্মকর্তা এবং শরনার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি তখনো আসেনি। ইব্রাহিম একজন রোহিংগা রিক্সাওয়ালার খোঁজ দিয়েছিল কিন্তু স্থানীয়কাউকে বিয়ে করে সে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে,মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। টাকার টোপ দিয়েও ক্যামেরার সামনে তাকেকিছু বলতে রাজি করানো গেল না। আবার স্থানীয়রাও ভিডিওতে চেহারা দেখাতে যতটা আগ্রহী রোহিংগাদের নিয়ে মুখ খুলতে ততটাই অনিচ্ছুক। কেউ কেউ আবার ইব্রাহিমকে একপাশে ডেকে নানা প্রশ্ন করে আমাদের আসল উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করছিল। 

তৃতীয় দিনই লোকটাকে দেখেছিলাম । ভোরের আলো ফোটার আগেই শ্যনন ইব্রাহিমকে নিয়ে হিমছড়িতে গিয়েছিল ভিউপয়েন্ট থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য তুলবে বলে। আমি যাইনি। আমার ডান হাঁটুর লিগামেন্ট ছেঁড়া, পাহাড় বাইতে পারি না আমি। শ্যনন চলে গেলে আমি আরও খানিকক্ষণ শুয়ে ছিলাম। কটেজের জানালার কাচ চুঁইয়ে আলো ঢুকতেই বেরিয়ে পড়েছিলাম। কটেজ থেকে সৈকত পাঁচসাত মিনিটের পথ। আমি জলের ধার ধরে হাঁটছিলাম। তিন-চার জোড়া অল্পবয়েসী যুগল ছাড়া তেমন কেউ নেই। লোকটাকে দেখে আমি মনে মনে বললাম, জানো কি ফাঁকা সৈকতে আমরা দুজনই কেবল বেজোড়। সে একমনে বালি দিয়ে কিছু বানাচ্ছিল। প্যান্টের এক পা হাঁটুর ওপর ভাঁজ করে গোটানো, খালি গা। চুলে দাড়িতে হৈচৈ অবস্থা। ভবঘুরে টাইপ। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কী অবিশ্বাস্য দ্রুততায় হাত চলছে তার। আধঘণ্টার মধ্যেই এক মৎস্যকন্যা বালি ফুঁড়ে জেগে উঠল! এতো দ্রুত সে বালি থাবড়ে জড়ো করছিল আর পাতছিল যে শেষ না হওয়া পর্যন্ত বুঝবার জো ছিল না ঠিক কী তৈরি হচ্ছে! কাজ শেষ হতেই লোকটা খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল নিজের সৃষ্টির দিকে। আমি ভালো করে দেখবার জন্য এগিয়ে গেলাম। লোকটা মাথা ঘুরিয়ে আমাকে দেখল। এরপর হনহন করে পাড় ধরে উল্টো দিকে হেঁটে চলে গেল । আশেপাশে যুগলেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কেউ ছবি তুলছে। মনটা ভারী হয়ে গেল আমার। আহা কেউ টের পেলো না কী এক অসাধারণ শিল্পকর্ম সৃষ্টি হলো ওদের হাতের কাছেই এবং কী ভীষণ অবহেলায় শিল্পী সেটি সমুদ্রকে দানও করে দিলো বিনা-শর্তে। দেখলাম ঢেউ ছুঁয়ে দিচ্ছে মৎস্যকন্যার চুল। খানিক পরেই ধুয়ে যাবে সব।আমি ঝটপট বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম। বিকেলে শ্যনন কটেজে ফিরলে ওকে দেখিয়েছিলামছবিগুলো । কী নিখুঁত কাজ! মৎস্যকন্যার লেজের প্রতিটি আঁশ এমন করে ফুটে আছে যেন হাতে নয় ছাঁচে গড়া। শ্যনন বিশ্বাসই করতে চাইছিল না যে কেবল দুই হাত দিয়েই লোকটা এই কাজ করেছে। বিকেলে আমরা লোকটার খোঁজে গিয়েছিলাম সৈকতে। বেশ অনেকক্ষণ ছিলাম কিন্তু লোকটার হদিস পেলাম না। পেলাম চতুর্থ দিন। 

রোহিংগা ক্যাম্পে যাওয়া সংক্রান্ত অনুমতির কোনো হিল্লে হলো না। আসমা আপা নিজেও বিরক্ত। যার মাধ্যমে চেষ্টা করছেন সে ব্যক্তি তখনও আশ্বাস দিয়েই চলেছে। শ্যনন এতসব শুনেও হাল ছাড়তে চাইছে না, না হয় আরও দু’দিন দেখি। আসমা আপা আপত্তি করলেন না। এবং আমাকে আশ্বস্ত করলেন আমার নর্থ আমেরিকায় শিপমেন্টের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবেই চলছে, তিনি নিজে তদারক করছেন। সেইদিন সকালে শ্যনন অ্যালের প্রতিবেদনের কাজ করল। আমি নয়নতারা সায়গলের ‘রিচ লাইক আস’ এর শেষ কপাতা পড়ে ফেললাম। বেলা এগারোটার পরে শ্যনন হাই তুলতে তুলতে বলল, “ফোনের অপেক্ষায় বসে থেকে তো গাছ হয়ে গেলাম! চল বেরোই। কিছু কেনাকাটা অন্তত করে আসি বার্মিজ মার্কেট থেকে।” আমাদের ভাড়া গাড়ি মোটেলের রাস্তাতেই থাকে সকাল নটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। ইব্রাহিমকে ও বিকেলে আসতে বলেছিল। এখন ফোন দিলে আসতে আসতে আরও আধঘণ্টা। আমি প্রস্তাব দিলাম আমরা বার্মিজ মার্কেটে চলে যাই বরং ইব্রাহিম আসুক ওখানে। শ্যনন মানল। ইব্রাহিম বার্মিজ মার্কেটেআমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো। ইব্রাহিম থাকাতে দামাদামি করতে সুবিধা হচ্ছে আমাদের। শ্যনন ওর সুইডেনের বন্ধু-স্বজনদের জন্যে ঝিনুকের গয়না আর কাঠের ছোট ছোট স্মারক কিনল। আমিও ভাইয়ের বৌ আর মায়ের জন্যে টুকটাক কিনলাম। পেটে ছুঁচো চড়তেই বুঝলাম দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে আমাদের। ইব্রাহিমেরও হয়তো একই দশা সে বেচারা মুখ ফুটে বলতে পারছে না । আশেপাশে ভালো খাবার হোটেল কোনটা জিজ্ঞেস করতে ইব্রাহিম খুব লাজুক গলায় জানাল যদি আমাদের আপত্তি না থাকে তবে আমরা ওর বাড়িতে খেতে পারি, ওর বাড়ি কাছেই। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই ওভাবে কারো বাড়িতে যাওয়া যায়? শ্যননকে তর্জমা করে বলতেই সে প্রস্তাব লুফে নিলো। স্থানীয়দের বাড়িতে খাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে না কিছুতেই বরং ইব্রাহিমকে উল্টে শর্ত দিলো যে ওর বাড়িতে কাটানো সময়টা ভিডিও করতে দিতে হবে। 

ইব্রাহিমের বাড়ি আসলেই বার্মিজ মার্কেটের কাছেই। ওর বৌ খুব গোছানো মেয়ে। বছর খানেকের একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে ওদের। আমরীন নাম। আমরা কিছুই নিয়ে যাইনি। শ্যননের এ নিয়ে কোনো বিকার নেই । আমিই দুজনের নাম করে কিছু কিনে দিতে টাকা গুঁজে দিলাম বৌয়ের হাতে। ইব্রাহিমের বৌয়ের হাতে জাদু আছে। আমরা আসবো জানতো না। রূপচাঁদা মাছ আর ডাল রেঁধেছিল। মাথা ঝাঁকিয়ে এ দিয়ে আমাদের খেতে দিতে রাজি হলো না- দুই পদ দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা যায়? ও আমাদের সামনেই রান্নাঘরের ঝাঁকা থেকে ঢেড়স বার করল। ইব্রাহিম কোন ফাঁকে বেরিয়ে ঠান্ডা কোক আর চিঙড়ি নিয়ে এলো আমরা টেরই পেলাম না। আমি ওর বৌকে বললাম, “তোমার দুবেলার খাবারে আমরা ভাগ বসালাম আবার তো রাঁধতে হবে রাতে।”সে মিষ্টি হেসে জোরে মাথা নাড়ল জানাল ওরই সৌভাগ্য আল্লাহ ওর বাড়িতে আমাদের রিজিক নির্দিষ্ট করেছেন। কথাটা এতই ভালো লাগল যে আমি শ্যননকে তর্জমা করে বললাম : বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনদর্শন এমনই, এই কথাটা ভিডিওতে যেন অবশ্যই রাখে। শ্যনন ইব্রাহিমের বৌয়ের চটজলদি রান্নার আয়োজন যত্ন করে ভিডিও করল। ডিম ভাজার পরে ঢেড়স-চিঙড়ি বলে অমৃতসমান পদটি রেসিপিসহ ক্যামেরার সামনেইকথা বলে রেঁধে দেখাল। যদিও সে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিল কিন্তু এতটাই সাবলীল তার বয়ান এবং ক্যামেরার সামনেও সে এতটাই জড়তাহীন যে মনে হচ্ছিল যেন এই ধরনের “শেফ শো” সে নিয়মিতইকরে আসছে। ওর মাদুর পেতে আমাদের খাবার পরিবেশনের ধরনটাওদারুণ ছিল। অনাড়ম্বর কিন্তু মমতা মাখা। শ্যনন খুটিনাটি সবই ভিডিও করল। এবং ইব্রাহমের বৌয়ের মুখে আমার কথার রেশে রিজিকের বিষয়টাও সুন্দর করে ঢোকাল। 

বেশ ভালোই খেয়েছিলাম দুজনেই, যা পারি তার চেয়ে বেশি। শ্যনন সরাসরি কটেজে ফিরতে চাইল না। একটু হেঁটে হজম না করলে সব গায়ে লেগে যাবে! কটেজের কাছে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে সৈকতের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম আমরা। সূর্য চলছিল আমাদের সঙ্গে তবে পশ্চিমমুখি তাই তেজ ছিল না তেমন। চারটের কাছাকাছি প্রায়। শ্যনন ছবি তুলতে তুলতে এগোচ্ছিল। আমি একটু পিছিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ দেখিকোত্থেকে এক ঝাঁক নানা বয়েসী কিশোর কিশোরী শ্যননের চার পাশে! বিনবিন করে সমানে একঘেয়ে সুরে জানান দিচ্ছিল - জুতো রাখবে ওরা। “ডলার ডলার”, দুই হাতের পাতা খুলে দশ আঙুল দেখিয়ে দরদামও জানিয়ে দিচ্ছে নিজ গরজে। শ্যননকে দেখলে এমন হয় রোজই কিন্তু আজকের বাচ্চাগুলো বেশ নাটুকে। শ্যননও ওদের কাণ্ড দেখে বেশ মজা পাচ্ছিল। “জুতো খুলবো না”, আমি গম্ভীর মুখে জানালাম আধভাঙা চাটগাঁইয়ায় । আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলাম নজর টানল শ্যননের বাম দিকে। সেই লোকটা! কোনো ভুল নেই। শ্যননের সামান্যদূরেই উবু হয়ে কিছু বানাচ্ছে । আমি শ্যননকে দেখানোর আগেই শ্যনন দেখে ফেলল। প্রায় চেঁচিয়েই জিজ্ঞেস করল, “দ্যাটস হিম রাইট?” আমি উত্তর না নিয়ে এগোতে থাকলাম আমার আগেই শ্যনন ছুটতে লাগল। হ্যাঁ সেই লোকটাই! 

শ্যনন হঠাৎ থেমে বাচ্চাগুলোর দিকে ফিরে বলল, “টাকা দেবো যদি কথা শোনো”। আমি ও বলার আগেই বুঝে গেলাম ওর পরিকল্পনা। আমার ধারণা সত্যি করে শ্যনন জানাল সে ভিডিও করতে চায় লোকটার কাজ। বাচ্চাগুলো দর্শক হয়ে ছড়িয়ে দাঁড়াবে। কী ভেবে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও”। আমি মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালাম, ‘আমায় টেনো না” আমার তর্জমা করার আগেই বাচ্চাগুলোও কীভাবে যেন বুঝে গেলশ্যননের প্রস্তাব। ঢ্যাঙা মতো ছেলেটাই ওদের সর্দার। ও আমার দিকে তাকিয়ে তথ্য দিলো, “ছবি তুললে ২০ টাকা আর ভিডিও করলে ৩০ টাকা”। ওর বলার ভঙ্গি দেখে হাসি চাপা দায়। আমি যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে বললাম, “দশ টাকা করে পোষালে দাঁড়া নয়তো ভাগ”। বাচ্চাগুলো বেশ সেয়ানা। বিশ্বায়নের হাওয়ার গতি ওরা রপ্ত করে নিয়েছে : টাকা ছাড়া কথা নেই। ওরা সরলো না গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শ্যনন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জানতে চাইল। আমি ছেলেটাকে বাদ দিয়ে বাচ্চাগুলোকে বললাম, “সবাইকে দশটাকা করে দেবে। দশ মিনিট দাঁড়াবে”।বাচ্চাগুলো দলনেতার দিকে তাকিয়ে রইল, নড়ল না।আশ্চর্য সংহতি ওদের! আমি শ্যননকে বললাম, “চল দর্শক বাদ তুমি লোকটার কাজের ভিডিও কর। “একাকী মগ্ন শিল্পী” ক্যাপশন”। শ্যনন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “ সেটা বোঝাতেই তো চারপাশের হৈচৈয়ের প্রতীক হিসেবে এদের দাঁড় করাতে চাইলাম”। আমি হাঁটতে থাকলাম জবাব দিলাম না। শ্যননও লং শটে লোকটার ভিডিও করতে করতে এগোতে থাকল। এবারদলপতি ছেলেটাই এগিয়ে এসে আমাকে বলল, ১৫ হলে করবে। আমি হাত নেড়ে ইশারায় নাকচ করলাম। এবার আমরা লোকটার কাছে যাওয়ার আগেই বাচ্চাগুলো পৌঁছে গেল। শ্যননের নির্দেশনায় দুপাশে দুই কোণে জ্যামিতিক সামঞ্জস্যে দাঁড়িয়েও পড়ল। ব্যাপারটা আমার বড় বেশি সাজানো মনে হচ্ছিল। লোকটার শিল্পকর্মে যে ওদের কোনো কৌতূহল নেই তা ওদের শরীরের ভঙ্গিতেই ধরা যাচ্ছে। শ্যনন হয়তো এডিট করে পরে এতে স্বতঃস্ফূর্ততা আনতেও পারে- আজকাল সবই সম্ভব। 

এইসব এলোমেলো ভাবতে ভাবতে লোকটার কাজ দেখছিলাম। সেদিনের মতোই লোকটা ঠিক কী বানাচ্ছে বোঝা যাচ্ছিল না। তেজহীন সূর্য এবার উবু হয়ে আছে লোকটার সামনে জলের ওপারে। অদ্ভুত কমলাহলুদ আলো লোকটার রুক্ষচুলে এসে পড়েছে। ওর দুই হাতের ওঠানামায় হঠাৎ পাতার আকার আর শিরা-উপশিরার নিখুঁত বিন্যাস ভেসে উঠতে দেখে আমার টনক নড়ল, আমি মনোযোগী হলাম এবং খানিক পরেই অবাক হয়ে দেখলাম বালি ফুঁড়ে জেগে উঠছে সূর্যমুখির ঝাড়। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি শ্যননের পেছন থেকে নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এলাম। শ্যনন লোকটার হাতের উপর ক্যামেরা জুম করতে করতে ইতোমধ্যে বাঁদিকে সরে ওর মুখের কাছে প্রায় ঝুঁকে ভিডিও করতে শুরু করেছে। লোকটার বাঁ হাতই চলছে বেশি ডান হাতে সে কেবল বাড়তি বালি সরাচ্ছে কিংবা টানছে। ক্যামেরা লোকটার মুখের দিকে তাক করেই শ্যনন অস্ফুটে বলে উঠল, “হোয়াট দ্য ফাক!” শ্যননের আশ্চর্য হওয়া কিংবা বিভোর হওয়া এমনকি রেগে যাওয়া, সবেতেই ‘ফাক’। কিন্তু উলটোদিকে দাঁড়ানো আমিও মনে মনে ওর কথারই পুনরাবৃত্তি করলাম, এমন মিল কীভাবে সম্ভব! লোকটা মাথা তুলে যেন চমকে তাকাল। শ্যনন তখনও ওর ক্যামেরা তাক করে ঝুঁকে আছে। লোকটার নাকের পাটা বুনো মোষের মতো ফুলছে, নামছে। ওর শরীরের ভঙ্গি দেখে মনে হলো এক্ষুনি লাফিয়ে টুঁটি চেপে ধরবে শ্যননের। আমি ছুটে শ্যননকে সরানোর আগেই লোকটা এক টানে ওর হাতের ক্যামেরাটা কেড়ে নিল। হতবিহ্‌বল শ্যনন সাম্য রাখতে না পেরে চিৎ হয়ে পড়ে গেল সুর্যমুখির পাপড়ির ওপরেই। লোকটা ক্যামেরা ছুঁড়ে ফেলল শ্যননের পায়ের কাছে এবং সেই সূর্যমুখির ঝাড় মাড়িয়ে চোখের নিমেষে বালিয়াড়ির ধার ঘেঁষে কোথায় যে মিলিয়ে গেল! বাচ্চাগুলো শ্যননের পড়ে যাওয়া দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমি শ্যননকে তোলার জন্যে হাত বাড়াতে ভুলে গেছি। আমার মাথার ভেতর কোথাও কেউ মন্ত্রপাঠের মতো আওড়ে যাচ্ছে, “ একে বলে মাইক্রোশা”। 

আমি উল্টে হেঁটে পৌঁছে যাচ্ছিলাম সেই দিনে- মাঝখানের ত্রিশ বছর কুঁচকে মিলে গেল যেন বর্তমানে! 

বাচ্চাদের একজন আমার ইতিউতি খোঁজার মর্ম বোঝে। বিজ্ঞের মতো তথ্য দেয় জেলে পাড়ার পেছনে ঝোরার দিকে গেলে পাওয়া যেতে পারে তাকে।আরেকজন মাথা নেড়ে বলে মতিন মিস্ত্রীর ডিপোয়। হঠাৎ করে সূর্যের পায়ে চাকা লাগল যেন! ঝপ করে আলো কমে গেল।

আমার মাথার ভেতর তখন হাতুড়ি চলছে। শ্যননকে বলি, “চল ফিরি”।আমার কথা শেষ না হতেই বাচ্চাগুলো হঠাৎ মারমুখী জনতার মতো ঘিরে ফেলল শ্যননকে। আমরা ইংরেজিতে কথা বলছিলাম ওরা কী বুঝছিল জানিনা দেখতে পাচ্ছিলাম ওদের মুখের শৈশব উড়ে গেছে- চোখে শত জন্মের রাগ নিয়ে হাত মুঠো করে আছে যেন সকলে। 

শ্যনন ওদের এই কয়েক মিনিটের জন্য প্রত্যেককে দশ টাকা করে দিতে অস্বীকার করছিল। সময়ের হিসেবে কম কিন্তু সে তো ওদের কারণে নয় আর শ্যননের জন্য বেশি কিছু তো নয়ই। হয়তো ওরা ওর পড়ে যাওয়ায় মজা নিয়েছে বলেই শোধ । ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও ওরা জোর গলায় তর্ক করে যাচ্ছিল। আমার মুখের ভেতর জ্বরের তেতো স্বাদ ঘুরছিল প্রবল বেগে। মনে হচ্ছে বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আমার ভেতর থেকে সব বেরিয়ে আসবে। আমি শ্যননকে বলি, “ঝামেলা করো না যা বলেছিলে তাই দিয়ে দাও”। শ্যনন অনিচ্ছায় আমার কথা মানল।

আমরা হেঁটেই ফিরি হোটেলে। সারা রাস্তা দুজনের কেউই কিছু বলি না। আমার পাশে শ্যনন মাঝে মাঝেই মাথা ঝাঁকিয়ে জিভ দিয়ে চকাশ চকাশ আওয়াজ করছে। আমি তাকাই না। ও হয়তো অপরাধবোধে ভুগছে। আমার মনের তোলপাড়ের হদিশ জানে না ও। হোটেলে পৌঁছেই শ্যনন ইব্রাহিমকে ফোন দেয়। ইব্রাহিম তোলে না। শ্যনন বিরক্ত হয় “এই ছেলের ডিউটি শেষ হতে আরও আধাঘণ্টা আছে”। বিছানায় ফোন ছুঁড়ে দিয়ে আমাকে বলে, ‘গা ধুয়ে এসে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে লোকটার খোঁজ নেওয়ার জন্য সাহায্য চাইব। তুমি বুঝিয়ে বলবে। আমার খুব খারাপ লাগছে।শিল্পী মানুষ আমার ওর অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল”। 

আমি কিছু শুনছিলাম না ত্রিশ বছর আগের সেই দিনটা পিংপং বলেরমতো আমার মগজের মেঝেতে তখন লাফাচ্ছে অবিরাম।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না। চোখ খুলতেই দেখি শ্যনন বিছানায় বসে ক্যামেরার মনিটর দেখছে মন দিয়ে । আমি জিজ্ঞেস করি, “সত্যিই কিলোকটার কান ছিল না?” আমার কথায় শ্যনন মুখ তুলে তাকায়। ওর মুখে হাসি, “এটা ভ্লগে দেবো না। ভাবতে পার মিয়েস্ত্রো এন্ড হিস আর্ট বাই এ রুর‍্যাল আর্টিস্ট? এটা দিয়ে শর্ট ফিল্ম করব।” এরপর হঠাৎ আমায় শুনতে পেল এমনভাবে বলল, “তুমি দেখেছিলে? তাই অমন সাদা হয়ে গিয়েছিলে?” আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ফের বিস্ময়, “কীভাবে দেখলে? আমি তো জুম করার আগে টেরই পাইনি”। আমি উত্তর দিই না। ও ভিডিও রোল করা শুরু করে এরপরে আমার দিকে ক্যামেরা বাড়িয়ে ধরে। আমরা দুজনই দেখি খানিক আগে ঘটে যাওয়া সেই দৃশ্য আবার: সূর্যমুখি পাপড়ি মেলছে গায়ে গা লাগিয়ে। এবং শ্যননের ক্যামেরা লোকটার হাত ছেড়ে মুখে বসেছে। কানের দিকটা জুম করতে করতে এগোচ্ছে শ্যনন, “হোয়াট দ্য ফাক” ওর কথা ভেসে এলো সাগরের শোঁ শোঁ আওয়াজ পেরিয়ে অনেক দূর থেকে! আমি দেখলাম কানের জায়গায় বাদামের মতো সেই একটুকরো মসৃণ মাংস উঁচু হয়ে আছে। ছবি নড়ে গেল, এরপরেই মনিটরে অমারাতের অন্ধকার। 

শ্যনন ক্যামেরা বন্ধ করে বলল, “আমার এমন করা উচিত হয়নি। আই মাস্ট হ্যাভ অফেন্ডেড হিম” ।

আমি ফিসফিস করে বললাম, “ওটা ভ্যান গগের কান নয় মাইকক্রোশা”। শ্যনন থমকায়, “বেগ ইয়র পার্ডন’। আমি বলি, “নাথিং”। শ্যনন আমার কাঁধে হাত রাখে, “তিতলী আই নো সামথিং ইজ ট্রাব্লিং ইউ। আই নোটিসড দ্য চেঞ্জ। স্পিল ইট আউট।। ইউ হাভ মাই ইয়ারস”। আমি চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। আমার দুই চোখ ভরে ফের ঘুম নামছে। মনে হচ্ছে যেন কতকাল পরে আপন কেউ বাড়ি ফিরেছে। অথচ ইনি তিনি নন আমি নিশ্চিত তাও কেন এমন অনুভব? 


*জয়নাল শেখ

লোকটার পরিচয় জেনেছিলাম আমরা। তার আগে কটেজের ম্যানেজার থেকে বার্মিজ মার্কেট- সবখানে শ্যননের ভিডিও শটের স্টিল থেকে লোকটার ছবি প্রিন্ট করে আমরা দেখিয়েছি। এমন কি ইব্রাহিম জেলেপাড়ায়ও গিয়েছিল। কেউ চেনেনি কিংবা বলতে চায়নি। অবশ্য ছবিতে লোকটার মুখও স্পষ্ট আসেনি। মতিন মিস্ত্রীর কথা বলেছিল সেইদিনের বাচ্চাগুলোর একজন। ভুলেই গিয়েছিলাম, মনে পড়তেই ইব্রাহিমকে জানালাম। ইব্রাহিম চেনে তাকে। 

মতিন মিস্ত্রি জেলে নৌকার কারিগর। এই লোকটা মতিন মিস্ত্রির নৌকা রঙ করেছে তিন চার মাস। “ইবা তো জয়নাল শেখ। রোহিংগা। এক কাইন্না। কানর জাগাত গোস্তর দলা”। (ও রোহিংগা । জয়নাল শেখ। এক কানওয়ালা। কানের জায়গায় মাংসপিণ্ড।) মতিন মিস্ত্রীর গলায় বিরক্তি। জানলাম লোকটা আধা কাজ করে চলে গেছে। পয়সাও নিয়ে যায় নি। “ফউল কিসিমর(পাগল কিসিমের)”। 

মতিন মিস্ত্রির কাছ থেকে এইটুকু তথ্য বার করতে সেইদিন আমাদের ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছিল। আমাদের আসার উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে ওর প্রশ্নই যেন শেষ হচ্ছিল না। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে জয়নাল রোহিংগা হওয়ায় ওর নাম মতিন মিস্ত্রির দিনমজুরের বেতনের খাতায় ওঠেনি। শ্যননকে সে রোহিংগা ক্যাম্পের কোনো বিদেশী পর্যবেক্ষক ঠাওরেছিল। বারবার বোঝাচ্ছিল যে জয়নাল নিজেই উদয় হয়েছিল। শুরুতে নৌকার কাঠচেড়াইয়ে কাজ করত। সেইকাজে মন ছিল না। পরে মতিন মিস্ত্রী রঙের কাজে লাগিয়েছিল ওকে। নৌকার বডি রঙে ও দারুণ চৌকস ছিল। এমনই টান যে কোথাও রঙের কমবেশি ধরা পড়তো না। 

যে ঘরটায় আমরা বসেছিলাম সেই ঘরটা আগুনের হল্কা ছাড়ানোর মতো তাতানো গরম, কেমন যেন গুদাম ঘরের মতো বদ্ধ এবং টানা বারান্দার মতো লম্বা । বোঝা যায় মূল বাড়ির গা ছেড়ে বাড়ানো হয়েছে। এককোণে কাঠের টুকরো ডাঁই করে রাখা। আলকাতরা, রজন, রঙের কৌটা, ফুলের ঝাড়ু আগোছালো এদিক সেদিক। একটা ঝাঁঝালো গন্ধ লটকে আছে হাওয়ায়। চারপাশে টিনের ঘের।মাটির মেঝে কিন্তু মাথার ওপরের টিনের চালের উত্তাপে মাটিও যেন তেতে আছে। ডানদিকে দরজার পাল্লা ভেতরের ঘরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই ঘরকে। সেই দরোজার ওপারে কেউ আমাদের লক্ষ করছে টের পাচ্ছিলাম। ইব্রাহিম বাইরে অপেক্ষা করছে। এখানে আমাদের এতটা দেরি হবে ভাবিনি। মতিন মিস্ত্রী গরুর জাবর কাটার মত পান চিবোচ্ছে। কাঁধের গামছায় মাঝে মাঝে ঠোঁট মুছছে আর শ্যননকে দেখছে আড় চোখে। শ্যনন সালোয়ারের ওপরে ঢোলা টিশার্ট পরেছিল। ঘামে জবজবে টিশার্ট বুকের খাঁজে লেপ্টে আছে। একটা টুলের ওপরে টেবিলফ্যান রাখা। হাওয়া ছড়াচ্ছে যত না আওয়াজ করছে তারচে’ বেশি। আমি শ্যননকে ইশারা করলাম সোজা হয়ে বসতে। ঠিক এই সময়ে ভেতরের সেই ঘর থেকে বছর সাতেকের একটা বাচ্চা মেয়ে আমাদের দুই জনের জন্যে স্প্রাইটের বোতল নিয়ে এলো। মতিন মিস্ত্রী আমাদের ইশারায় বোতল নিতে বলল। আমি হাতে নিয়ে দেখি বোতলও গরম। আমার ভাগেরটা বাইরে ইব্রাহিমের জন্য পাঠাতে অনুরোধ করলাম। শ্যনন নিমেষেই বোতল খালি করে বাচ্চা মেয়েটার হাতে বোতল ফেরত দিয়ে দিল। মতিন মিস্ত্রী মুখে সুপুরি পুরতে পুরতে মেয়েটাকে দেখিয়ে বলল আমার ছোটো মেয়ে। মেয়েটা পরিচয়পর্বের জন্যে অপেক্ষা করল না। খালি-ভরা দুই বোতল নিয়েই চলে গেল ভেতরে। কে জানে ইব্রাহিমকে দেবে কি না! মতিন মিস্ত্রী মেয়ের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ণ গলায় বলল, “আঁর মাইয়ারও মাতবোল নাই, বুবি। জইনাইল্লা আঁর মাইয়ার দিলত বউত দুঃখ দিয়ে। । (আমার মেয়েটা কথা বলতে পারে না বোবা। জয়নাল আমার মেয়ের মনেও দুঃখ দিয়েছে।)” আমার বুক কেঁপে উঠল। আট বছরের আমিও তো দুই দিনেই কী আপন ভেবেছিলাম তাঁকে! কীভাবে সময় ভাঁজ করে পাটেপাট মিলে যায়! 

আমরা যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াই। ঠিক তখনই ছোটো মেয়েটা খবরের কাগজে মোড়ানো একটা কিছু এনে মতিন মিস্ত্রিকে দেয়। মতিন মিস্ত্রি বাচ্চাটাকে দেখিয়ে জানায় সে প্রায়ই কারখানায় যেত। জয়নাল ওকে সুরুয-ফুল এঁকে দিয়েছিল। আমি থমকে তাকাই। কী ফুল? এবার খবরের কাগজটা মেলে ধরে বলে, “ইবা আর মাইয়াফোঁয়ারে দিয়েদে”।(এটা আমার মেয়েকে দিয়েছে।) আমার বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে। থোকা থোকা নিখুঁত রঙহীন সূর্যমুখি আমাদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। শ্যননের চোখ ঠিকড়ে বেরিয়ে আসবে যেন, “ওয়াও ইনক্রেডিবল!” শ্যনন ছবিটা হাত বাড়িয়ে নেয়। নিউজপ্রিন্ট কাগজে চারকোলে আঁকা।অসাধারণ! এই লোক পাকা শিল্পী। শ্যনন আমার দিকে তাকিয়ে বলে জিজ্ঞেস কর, “এই ছবি কি বিক্রি করবে? করলে আমি দশ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি”। মতিন মিস্ত্রীকে বললে অবাক হয়ে জানতে চায়, “ইবা কি ডঁড় মানুষ না? অঁনেরা চিনুন না?” ( ইনি কি অনেক বড় কেউ? আপনারা চেনেন?) আমি উত্তর দেওয়ার আগেই মেয়েটা হঠাৎ বাবার হাত থেকে টান দিয়ে ছবিটা নিয়ে ভেতরে চলে যায়। যাবার আগে ওর চোখের সেই তীব্র চাউনি ফুঁড়ে যেন ত্রিশ বছর আগের আট বছর বয়েসী আমিই ছিটকে বেরিয়ে এলাম! আমি শ্যননকে টেনে বার করে আনি। 

সেদিনই মোটেলে ফিরে শ্যননকে বলেছিলাম আমার গল্প। 


*ভ্যান গগের কান

দিনক্ষণ সব মনে আছে আমার। পয়লা নভেম্বর ১৯৯০। আমার ছোটো ভাই পিপলুর চার বছরের জন্মদিন ছিল সেদিন। প্রেসিডেন্ট এরশাদের বিরুদ্ধে জনরোষের ঘুর্ণী তখন চূড়ায় । একটাই চ্যানেল ,বিটিভি। এবং তাতে হবু রাজার গবু মন্ত্রিসভার চাহিদার মাপে দর্জিসেলাই খবর সম্প্রচার করা হতো। পাড়ায় পাড়ায় সন্ধে হতেই রেডিওর নব ঘুরতো বিবিসি আর ভোয়ার স্টেশনে থিতু হওয়ার জন্যে। দেশের হালহকিকতের খবর জানাতো তারাই। আমাদের বাড়িতেও অফিস থেকে ফিরেই বাবা, জেঠু দাদুর সঙ্গে চায়ের কাপ নিয়ে সেই যে ডাইনিং টেবিলে রেডিও ঘিরে বসতো একদম রাতের খাবার শেষ করে তবেই উঠতো।

ইনকিলাব পত্রিকায় বাবড়ি মসজিদ ভাঙা সংক্রান্ত গুজব ছাপানো হয়েছিল কদিন আগে তার জেরে দেশ জুড়ে সংখ্যালঘুর উপর নির্দয় হামলা চালাচ্ছিল মৌলবাদীরা। দুদিন আগে ত্রিশে অক্টোবর মধ্যরাতে কৈবল্যধামে মন্দির এবং এর আশেপাশে হামলা হয়ে গেছে । আমাদের পরিবার রামঠাকুরের ভক্ত।প্রতিমাসে আমরা যাই ওখানে। কী সুন্দর গাছগাছালি ঘেরা আশ্রম। আমার প্রিয় জায়গা ছিল আশ্রমের বাগান, পদ্মভাসা পুষ্করণী আর নাটমন্দিরের ঠান্ডা মেঝে। ঐ বয়েসেই অনেক পাখি চিনেছি আমি কৈবল্যধামে এসে। আমার দাদুর সঙ্গে মোহান্ত মহারাজের ভালো চেনাজানা। কৈবল্যশক্তি নামের সেই বটগাছের শাখায় ঠাম্মা আমাদের জন্য কতকত মানসী সুতো বেঁধেছেন! হামলার খবর শোনার পর থেকে ঠাম্মা খানিকক্ষণ পরপর বিনবিন করে কাঁদছেন আর দাদুর বকা খাচ্ছেন। 

সেদিন পিপলুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে ঘরে কোনো আয়োজনই হয়নি। বেলুন নেই এমনকি কেইকও কেনা হয়নি। জেঠিমা পুডিং বানিয়েছিল।পিপলুও যেন বুঝেছে সময়টা বিরূপ, ওর নতুন পাওয়া গাড়িটা নিয়েচুপচাপ খেলছিল।জেঠুর মুখে পাহাড়তলিতে হামলার খবর শুনে রহিমাখালা আলো থাকতেই বাড়ি চলে গিয়েছিলেন। রাতের খাবারও নেননি। জবার জন্যে একটু পুডিং দিয়েছিল মা, খালা রেখে গেছেন, “কাইল আইলে খাইবো নে”। উনার ছেলে ভাটিয়াড়িতে শিপইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কাজ করে। ছেলের চিন্তায় খালা কাজে মন বসাতে পারছিল না। ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুরু হতেই গেটে ধাক্কাটা পড়েছিল। টুম্পা টুম্পা করে কেউ ডাকছিল বাইরে থেকে। বাবা রেডিওর আওয়াজ কমিয়ে দিলেন। সারা পাড়াও যেন হঠাৎ করে নিঝুম হয়ে গেল ।আবার ধাক্কা পড়তেই সবাই নিশ্চিত হলো আমাদের বাড়িতেই এসেছে কেউ। কলিং বেলটা পিলারের ভেতরে। হাত ঢুকিয়ে বাজাতে হয়। অচেনা কেউ নিশ্চয় নইলে অমন পাড়া কাঁপিয়ে গেইট ভাঙতো না। ফের টুম্পা টুম্পা করে চেঁচাতেই জেঠু নেমে গেল উঠোনে, পেছন পেছন বাবাও। টুম্পা আমার মায়ের নাম। মা বুঝতেই পারেনি যে তার নাম ধরেই ডাকা হচ্ছে। মামারা ছাড়া এই নামে কেউ ডাকে না মাকে। মামারাও বছর-দু’বছরে আসেন আমাদের বাড়ি। 

আমাদের বাড়ির গেইট উঠোন পেরিয়ে খানিক দূরে। রান্নাঘরের বাইরে তারে ঝোলানো লাইটের আলো কলতলা পর্যন্ত কোনোমতে পৌঁছায় । রাস্তার লাইটের এমনিতেই ধার কম আর তাতে ঝাঁক বেঁধে উড়ছে উঁইপোকার দল । জেঠু কারো সঙ্গে কথা বলছে আমরা শুনতে পাচ্ছি কিন্তু কী বলছে বোঝা যাচ্ছিল না। বাবা গেইট পর্যন্ত যায়নি একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। খানিক বাদেই গেইট বাঁধার আওয়াজ শুনতে পেলাম আমরা। কেউ একজন আসছেন জেঠুর সঙ্গে সমান পায়ে যেন নিজের বাড়ির চেনা পথ ধরে ফিরছেন ঘরে। বাবা আসছে পেছন পেছন। বাবা জেঠু সবাইকে ছাপিয়ে তাঁর মাথা আমাদের দেখছে । বারান্দার সিঁড়ির মুখে আসার আগ পর্যন্ত আমরা তাঁর মুখ দেখতে পাইনি। রাস্তার মরা আলো তাঁর ঢোলা সাদা পায়জামাতে জন্ডিসের হলুদ আভা নিয়ে ঝুলছিল । উঠোনের নারকেল পাতার ছায়া ভেঙে পড়ছে তাঁর মুখে। কাঁধে ঝোলা, গায়ে পাঞ্জাবি, হাতে আরো একটা পেটফোলা ছোট ব্যাগ।মাথায় ঢুলিদের মতো ডুরে গামছা বাঁধা। কাঁধ অব্দি লম্বা চুল। সিঁড়িতে পা দিয়েই তিনি মাকে ঠিক চিনে ফেললেন। হৈহৈ করে বললেন , “কী সর্বনাশ টুম্পা তুই তো আর আমাদের পুঁচকে টুম্পা নেই রে, বিশাল গিন্নি হয়ে গেছিস!” মা জেঠিমার পেছনে সরে দাঁড়াল, নিরাপদ দূরত্বে। এর পরে এক সেকেন্ডেরও কম বিরতিতে সবাইকে অবাক করে উচ্ছ্বল কিশোরীর মতো তড়বড়িয়ে নেমে পৌঁছে গেল সিঁড়ির মুখে, “ওমা খেলু দা! তুমি দেশে এলে কবে?” তিনি হাসছেন, স্বস্তির হাসি। মায়ের থমকে যাওয়ায় হয়তোবা ভড়কে দিয়েছিল তাঁকে। তার পুরু চশমার ভেতর থেকে খুশির ঝিলিক চুঁইয়ে পড়ছে, “আরে তুই তো সেইরকমের জিনিয়াস!দাড়িগোঁফের জঙ্গল থেকে ঠিক আমাকে খুঁজে নিলি!” 

মায়ের উচ্ছ্বাস বশে আসার পরে সকলে ধীরে ধীরে জানল তিনি মায়ের পাড়াতুতো দাদা। তাঁর অমন দাড়ি আর লম্বা চুল ছিল না, সেই কারণেই মা চিনতে পারে নি। তিনি শিল্পী এবং থিয়েটারকর্মী। মায়ের বিয়ের মাস খানেক আগে জাপানে গিয়েছিলেন জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে।নানাদেশে ঘুরে প্রায় এগারো বছর পরে দেশে ফিরেছেন। সেও ছয়মাস হতে চলল। চট্টগ্রামে কোনো এক সাংস্কৃতিক গ্রুপের আমন্ত্রণে এসেছেন আজ সন্ধ্যায়। তিন মাস আগে এদের সঙ্গে কক্সবাজারে এসেছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আর্টক্যাম্প পরিচালনা করেছিলেনসেখানে। সপ্তাহ খানেক ছিলেন। দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। টগবগে এই তরুণদের সঙ্গে একধরনের আত্মার বন্ধন তৈরি হয়েছে। এরা ঢাকা এলেই তাঁর সংগে যোগাযোগ করে। তাই দ্বিতীয়বারের ডাকে তিনি সহজেই সাড়া দিয়েছিলেন। আসার আগে বড় মামার কাছ থেকে মায়ের ঠিকানা নিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে বোনকে দেখে যাবেন। কিন্তু সব গড়বড় হয়ে গেল। চাটগাঁর অবস্থা যে এত খারাপ জানা ছিল না। ট্রেন দেড় ঘণ্টা লেট ছিল। স্টেশনে কাউকে পেলেন না। ওদের সংস্থার ঠিকানা লেখা একটা কাগজ মানিব্যাগে ছিল সেখানে ফোন নম্বরও। সেটা কীভাবে যে পড়ে গেল কে জানে! লাভলেইনে আবেদিন কলোনির আশে পাশে কোথাও ওদের অফিস বলেছিল মনে আছে। এত রাতে খোলা থাকার কথা নয়, ধারে কাছের হোটেলে উঠবেন ভেবে রিক্সা ভাড়া করতে গিয়ে জানলেন ওদিকে বিকেল থেকে গণ্ডগোল চলছে। স্টেশনেই রাত কাটিয়ে দেবেন ভাবছিলেন হঠাৎ তখনই টুম্পার কথা মনে পড়ল। পরিকল্পনা তো ছিলোই এবার কেবল সময়টা এদিকওদিক। একটাই ভয় ছিল তাঁর এই ডাকাতে চেহারা দেখে টুম্পা যদি না চেনে! তাঁর বলার ধরনে নিমেষে গুমোট পরিবেশ হাল্কা হয়ে গেল। খানিক পরেই বেশ জমে উঠল বাড়ি। 

আমি যে ঘুমের সময় পার করে দাঁড়িয়ে আছি কেউ খেয়াল করেনি। মা ভদ্রলোকের খাওয়ার ব্যবস্থা করতে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই দেখে ফেলল, “ও মা পাকা বুড়ি তুই এখনও দাঁড়িয়ে!” তারপরে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “খেলু দা আমার কন্যা, রজতপ্রভা।” কানে হাত দিয়ে বেশ জোরে উনি জানতে চাইলেন, “কী নাম বললি ?” মাও বেশ চেঁচিয়ে বলল, “রজতপ্রভা”! উনি বললেন, “আরেব্বাস এ তো দাঁতকপাটি লাগার মতো নাম”। অমন জোরে উত্তর দেওয়ায় সবাই বেশ চমকে তাকাল। উনি যেন বুঝলেন।হাত জোড় করে বললেন, “আমি কানে কম শুনি”। পরক্ষণেই আমার দিকে হেসে বললেন, “ভ্যান গগের মতো আমি এক-কানওয়ালা। তোমার মায়েরা ছেলেবেলায় আমায় ‘ভ্যানগাড়ি দাদ ডাকত।তোমায় নিশ্চয় ভ্যান গগের গল্প শুনিয়েছে মা? সেই যে রবিঠাকুরের ‘সুন্দর বটতব অঙ্গদখানি তারায় তারায় খচিত” গানটার মতো রাতের আকাশের ছবি যিনি এঁকেছিলেন? সূর্যমুখি তো নির্ঘাত আঁকিয়েছে তোমায়” । নাহ্‌, মা আমাকে এই নাম বা গল্প কিংবা গান কিছুই বলেনি। তবে সূর্যমুখির ছবি আঁকিয়েছে দেদার। কিন্তু উনি জানলেন কীভাবে? উনি আমার উত্তরের অপেক্ষায় নেই, নিজের মনেই কথা বলছেন, “জানো তো যারা কানে কম শোনে তারা চেঁচিয়ে কথা বলে। আমার গলার আওয়াজ তাই অমন বিচ্ছিরী বাজখাঁই। রজতপ্রভা তুমি হাই তুলছ মানে ঘুমের সময় পেরিয়ে গেছে তোমার। কাল তোমার সঙ্গে গল্প করব। বড় অবিবেচকের মতো কাজ হলো, সবার দেরি করিয়ে দিলাম।” দাদু ঠাম্মাকে বলল, কুটুমকে খেতে দাও। রাত তো বাকি নেই বেশি। মা রান্নাঘর থেকেই বলল, “তিতলী তোমার ড্রইং খাতার সূর্যমুখি দেখাও মামাকে।‘ দাদুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এ এখন বিছানায় গেলে পিপলুকেও জাগাবে বাবা। আমার কাজের বারোটা বাজবে”। মায়ের উপর আমার ভয়ানক রাগ হলো। উনি একবার এর মুখ, একবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন পরিস্থিতি মাপছেন। এরপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “নিয়ে এসো তবে”। জেঠিমার দিকে তাকিয়ে বললেন “কষ্ট যদি না হয় তবে এককাপ চা খেতে পেলে চাঙ্গা লাগতো”। জেঠিমা বললেন, “সে কি! এক্ষুনি এনে দিচ্ছি”। আমি ড্রইংখাতা আনতে গেলাম। বাবা ফের রেডিও অন করল, অনেকখানি খবর বেরিয়ে গেছে। আমি খাতা হাতে ফিরে বেশ কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাবা, জেঠু, দাদু সবাই কথা বলছে: জুম্মাবারে নামাজ শেষে মিছিল বেরোবে। আরও হামলা হবে। উনাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বললেন, সকালে উঠেই চলে যাবেন। লাভলেইনে দশটার দিকে যাবেন কাউকে পেলে তো ভালোই ওরাই যাওয়ার ব্যবস্থা করবে নয়তো উনি যে বাস পাবেন সেই বাস ধরেই ঢাকা ফিরবেন। বাবা তখন সোহেল চাচার ওসি ভাইয়ের কথা বলল। সোহেল চাচার খালাতো ভাই আমাদের কোতোওয়ালি থানার ওসি। কাল জুম্মার সময় সেই ওসি সাহেবের আমাদের বাড়ি ঘুরে যাওয়ার কথা, যাতে করে কোনো মতলববাজ এ বাড়িতে হামলার সাহস না -করে। বাবারা সকলেই তাঁকে আশ্বস্ত করল সকালে সোহেল চাচার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সব ঠিক করে নেওয়া যাবে। জেঠু নিশ্চিত করেই বললেন খোলা পেলেও এই পরিস্থিতিতে কোনো আর্টক্যাম্প হবে না। সেই কারণেই এরা উনাকে আনতে যায় নি। উনি সাঁয় দিলেন জেঠুর কথায়, “হতে পারে” । কথা বলতে বলতেই ড্রইন খাতা ধরা আমার দিকে নজর পড়ল তাঁর, হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি সূর্যমুখির পাতাটা বার করে দিলাম। উনি হাসতে হাসতে যেন নিজেকেই বলছেন, “দেখ একই কাণ্ড করছে মেয়ের সঙ্গেও!” মা চায়ের কাপ হাতে জেঠিমার পিছু পিছু বেরিয়ে এলো, “কপি করিয়েছিস না?” মা বলল, “ওদের ড্রইং টিচার তিন ধরনের ফুল আঁকতে বলল যে!” উনি চোখ কুঁচকে মাকে বললেন, “ও দেখেছে এইফুল?” মা উত্তর দেওয়ার আগেই উনি আমাকেই জিজ্ঞেস করলেন ফের, “তুমি সূর্যমুখি দেখেছ?” আমি মাথা নাড়লাম। উনি বললেন, “তোমার দেখা তিনটে ফুলের নাম বলো ঝটপট” আমি বললাম, “জবা, নয়নতারা আর সন্ধ্যামালতি” । উনি কানে হাত দিয়ে বললেন, “আবার বলো”। আমি আবার বললাম। উনি বললেন,’ “বাহ্‌, ওদের কাল দেখবে। চোখ খুলে মন দিয়ে। এরপরে চোখ বুজে দেখতে পাও কি না দেখবে। যদি পাও তবেই ওরা ধরা দেবে, তখনই আর্ট হবে , ড্রইং হবে না”। এরপরে বললেন, “তোমার মা কেন যে সূর্যমুখি আঁকাতে গেল? ঐ সেই ভ্যান গগের টান! কী এক ভ্যান গগের ছবি দেখিয়েছিলাম ছেলেবেলায় সে সূর্যমুখিতে আটকে রইল। অথচ সূর্যমুখি সূর্যের দিকে তাকিয়েই ঝরে যায় সূর্যের কাছে যেতে পারে না , নকল করতে হলে পাখিদের ছবি নকল কর। ওদের ডানা আছে উড়ে উড়ে সূর্যের দিকে যাওয়ার অন্তত চেষ্টা করতে পারে”।উনি হাত দুটো হেলিয়ে ওড়ার ভঙ্গি করলেন। দাদু বললেন, “আজকের মতো অঙ্কনপাঠ শেষ হোক। ঘুমাতে যাও সোনা”। আমার ওঁকে ভালো লাগতে শুরু করেছে। যেতে ইচ্ছে করছিল না। এমন অদ্ভুত কথা আমাকে কেউ বলে নি আগে। চোখ বুজে দেখতে পেলেই ছবি আঁকা যায়! নাহ্‌ একজন বলেছে একথা। জবা। রহিমা খালার মেয়ে জবা। জবা পাখির ছবি আঁকে মন থেকে। ছাদে খেলবার সময় ও ইটের টুকরো দিয়ে একটানে ফুল আঁকে। মানুষও আঁকতে পারে। না দেখেই। 

খবরে পাহাড়তলির কথা বলছে তখন। জেঠু রেডিওতে প্রায় মাথা ঢুকিয়েদিয়েছেন। উনি আমাকে কাছে টেনে নিচুস্বরে বললেন, “আমার কাছে ঘুমের জাদু আছে। চাও?” আমি মাথা নাড়লাম, উনি দেওয়ালের গায়ে আমাদের মাথার ছায়ার দিকে আঙুল তুললেন। এমন আলোছায়া থেকে যদি পাখিদের খুঁজে বের করতে পার তবে দেখবে ম্যাজিক ঘটছে। আর তখন কপি করতে হবে না তুমি যা চাও তাই-ই আঁকতে পারবে। পাখিরাই গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবে” । আমি বিছানায় এসে মশারির ভেতর দিয়ে দেওয়ালে আলোছায়ায় পাখিদের খুঁজতে থাকি। হঠাৎ কেন যেনবুকের ভেতর হুহু করে ওঠে! আমার ড্রইং খাতা আছে আমি আর্ট পারি না। জবার ড্রইং খাতা নেই ও মন থেকে আঁকতে পারে। 

আমার ঘুম যখন ভাঙল তখন রোদ লাফাচ্ছে বিছানা জুড়ে । পিপলুনেই পাশে। বাবার বিছানাও পরিপাটি। আমাকে ডাকেনি মা !তার মানে নাচের স্কুলে যেতে হবে না আজ । তারপরেই মনে পড়ল উনি আমাকে তিনটে ফুল দেখতে বলেছেন মন দিয়ে। তাড়াতাড়ি বাইরে এলাম। বাবা টেবিলে পেপার পড়ছেন। রান্নাঘরে উঁকি দিতেই মায়ের চোখাচোখি , “অনেক ঘুমিয়েছ। দাঁত মেজে জামা পাল্টে এসো। ফুলকো লুচি দেবো।তারপরে অংক করবে টিভি দেখার ইচ্ছে থাকলে।“ পিপলু ওর নতুন গাড়ি নিয়ে বাবার পাশে মেঝেতে খেলছে। টিভি দেখার ইচ্ছে নেই আমার। ফুল দেখতে হবে । কিন্তু উনি কোথায়? বাথ্রুমের দিকে পা বাড়াতেই দেখি রহিমা খালা কাপড় ধোয়ার বালতি হাতে নামছে সিঁড়ি দিয়ে। পেছন পেছন জবা। 

মা রহিমা খালাকে বললেন, “হাত মুছে খাবারটা দিয়ে এসো ওপরে”। আমাকে তাড়া দিলেন, “জবার মা কিন্তু আজকেও তাড়াতাড়ি চলে যাবে। খেলু মামাও। খেলতে চাইলে ঝটপট খেয়ে অংক সেরে নাও। আমার কিন্তু অনেক কাজ। দেরি করলে খাবার পাবে না”। আমার মন খারাপ হলো। জেঠিমা ছুটির দিনে সহজে ঘুম থেকে ওঠে না। মায়ের কোনো ছুটির দিন নেই। আমারও নেই। 

আমি নাকে মুখে খাওয়া শেষ করলাম। দেখলাম মা ট্রে গুছিয়ে দিচ্ছেঅতিথির জন্য। উনি তাহলে সঞ্জয় দাদার ঘরে ছিলেন রাতে! সঞ্জয় দাদা আমার জেঠতুতো দাদা। আমেরিকায় নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ে এঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ঐ ঘরে জেঠিমা কাউকে ঢুকতেই দেয় না। মাসে একবার নিজ হাতে ঘর পরিস্কার করেন। কিন্তু ওখানে কেন? বাবা সুফিয়া খালার ট্রের দিকে তাকিয়ে মাকে বললেন, “উনি কবে যাবেন? দুপুরের পরে পরিস্থিতি কেমন হয় বলা যাচ্ছে না কিন্তু। খাবার ওপরে পাঠানোর কী হলো?” মা বলল, “তুমিই তো উনাকে ওপরে নিয়ে গেলে। শিল্পী মানুষ আকাশ ছেড়ে তোমার কলতলার সৌন্দর্য দেখবে কাছারি ঘরে? রহিমার কাছে না কি চা চেয়েছে। রাতে তো তেমন খাননি হয়তো খিধে লেগেছে।চায়ের সংগে খাবারটাও পাঠিয়ে দিলাম। তা ছাড়া দাদা তো ফেরেননি মর্নিং ওয়াক সেরে” । বাবা বিড়বিড় করলেন, ‘ভ্যান গগগিরি করছে। বাড়ি ফিরে ছবি আঁকার তর সইছে না” । মা উত্তর দিলো না। বাবার কথাটা মাথায় ঘুরছে আমার, উনি কি ছবি আঁকছেন? উনার কাঁধের ঝোলায় আঁকার জিনিসে ঠাঁসা। কাল দেখেছি। আমি খেয়ে অংক করতে ছুটলাম। জবাকে মা খেতে দিয়েছে ভেতর। খানিক্ষণ পরে জবা এলপিপলুকে নিয়ে। টেবিলের কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। আমার আর দুটো অংক বাকি। আমি কথা না বলে অংক করতে থাকি। জবা বলল, ‘বেডা এমুন সোন্দর ছবি আঁকতাসে মনে হয় য্যান সত্য’। রাগ হলো ইস্‌ আমি দেখার আগে জবা দেখে ফেলল? আমি মাথা না তুলে তাও জানতে চাই, “কে?” “তুমার মামা। ছোট বাপির গামছা মেলতে গেসিলাম। আল্লারে দেখি সঞ্জয় দা’র ঘর খোলা। আমি আঁতকা এমুন ডরাইসিলাম, নাইম্মা পড়সি। মামী কইল তুমার নাকি মামা”। 

অংক শেষ করেই ছুটলাম জবার পিছু পিছু। বাবা, জেঠা, দাদু সবাই টেবিলে খাচ্ছেন। আমাকে দেখেই বাবা ডাক দিলো, “মামাকে গিয়ে বল দাদু নিচে আসতে বলেছে”। 

আমরা ছাদে উঠে দেখি উনি একমনে আঁকছেন। মাথায় সেই ডুরে গামছা বাঁধা। আমাদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাননি মোটেই। ঝলমলে হলুদ রঙ টিউব থেকে সরাসরি ক্যানভাসে ফুটকির মতো বসাচ্ছেন চেপে চেপে। এরপরে একটা চ্যাপ্টা ছুরির মতো জিনিস দিয়ে তা থেবড়ে দিচ্ছেন। এমন অদ্ভুত কাণ্ড জবা তো নয়ই আমিও এর আগে দেখিনি। স্কুলে আমরা এখনও ক্রেয়ন আর রঙ পেন্সিল আর মার্কার দিয়ে আঁকি । জবা আমাকে ইশারায় দেখাল মেঝেতে আরেকটা ছবি রোদের আলোয় পাতা। একগোছা মিয়ানো সূর্যমুখি আঁকা তাতে। ওদের দেখে মায়ের মতো হয়রান মনে হচ্ছে। এটাই তিনি সকালে আঁকছিলেন। অবাক হয়ে দেখি ক্যানভাসের সেই হলুদ ফুটকি কোনো এক জাদুবলে যেন সূর্যমুখি হয়ে পাপড়ি মেলছে! এরা মেঝেতে পাতা ছবির ফুলগুলির মতো স্থির নয়, হাওয়ায় দুলছে! আমাদের বিস্ময় সরেনা। তখনই উনি ঝট্‌ করে ফিরলেন আমাদের দিকে। পুরু চশমার ভেতরে তাঁর চোখ জোড়া আমাদের এফোঁড় ওফোঁড় করে দেখছে। আমি ঘাবড়ে গিয়ে তড়বড়িয়ে বললাম, “বাবা ডাকছে”। জবা শুধরে দিল, “দাদু ডাকছে”। উনি অপ্রস্তুত হেসে বললেন, “আবার বল। আমি বাম দিকে শুনতে পাই না। কান নেই”।ওহ্‌ কান নেই! আমি জবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। মনে পড়ে গেল রাতে বলেছিলেন উনি নাই-কানের কথা। আমি ব্যাপারটা বুঝিনি ঠিকঠাক। উনি গামছা খুলে চুল সরালেন। দেখি কানের জায়গায় বাদামের মত এক টুকরো মসৃণ মাংসপিণ্ড। আমার আর জবার চোখ গোল হয়ে গেল। “ভ্যান গগের মতো কান কাটিনি আমি। একে বলে মাইক্রোশা”। আমাদের দুজনের মুখে তাঁর চোখ জোড়া ঘুরল, “বোঝা গেল না, না?”। আমরা আসলেই বুঝিনি। উনি গামছা দিয়ে কানটা ফের ঢেকে দিলেন এবং আমাদের দিকে ঘুরে বসলেন। “ব্যাপার হলো কি তোমাদের দুজনকে ভগবান ধীরেসুস্থে বসে সময় নিয়ে মনের মতো করে গড়েছেন আর আমার বেলায় ভগবান কানটা ঠিকঠাক বানাবার আগেই হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিলাম পৃথিবীতে”। জবা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমারে আল্লাহ বানাইছে”। উনি হাসতে হাসতে বললেন, “তাই? তিনিও দারুণ কারিগর”। এবার তাঁর হঠাৎ মনে পড়ল এমন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন “ভ্যান গগের কথা বলেছিলাম না কাল ?” আমি হেসে দিলাম মনে পড়ল মায়েরা উনাকে ভ্যান গাড়ি দাদা বলতেন।। উনি জবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভ্যান গগ মস্ত বড় শিল্পী ছিলেন। তাঁর আঁকা সূর্যমুখি হাওয়াতে দুলতো। তিনি নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন’। জবা আঁতকে উঠল, “ও আল্লাহ নিজে নিজের কান কাইট্যা বয়রা হয় নি কেউ?” উনি হাসতে লাগলেন। বললেন, “আমিও বয়রা। বামদিকে একটুও শুনতে পাই না। ডানদিকেও খুব যে শুনি তা নয় কিন্তু ঠোঁট নড়লেই পড়তে পারি। মানে তুমি আওয়াজ না করে কথা বললেও আমি শুনে ফেলব”। আমি অধৈর্য হয়ে জানতে চাইলাম, “ভ্যান গগ কান কাটলো কেন?” “ও কানে বেশি শুনছিল। তাই ছবি আঁকতে পারছিল না”। “ওমা! কানে বেশি শোনা ভালো না?” তিনি অদ্ভুত একটা কথা বললেন, “সব শোনা ভালো না।ছবি আঁকতে হলে মনের চোখ খুলতে হয়। কথা বেশি হলে মনের চোখ ঘুমিয়ে পড়ে”। এর পরে আলতো করে জানতে চেয়েছিলেন, “আচ্ছা তোমার ছোট নামটা কী যেন?” আমার আগেই জবা তড়বড়িয়ে বলল, “তিতলী”। আমি জবার দিকে রেগে তাকালাম। “বাহ্‌ ভারী সুন্দর নাম তো! তুমি দেখতেও প্রজাপতির মতো।তোমরা দুজনই পরির মতো সুন্দর।তোমার নাম কী?” তিনি জবাকে জিজ্ঞেস করলেন। এবার আমি উত্তর দিলাম, “জবা”।“আরে বাহ্‌! একজন ফুল আরেকজন প্রজাপতি! এই ফুলটাতে একটা প্রজাপতি আঁকতে হবে। কী রঙের পাখা হবে বল তো?” আমরা উত্তর দেওয়ার আগেই রহিমা খালা দাঁড়ালেন এসে। আমাদের দুজনের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে খাবারের ট্রেতে চায়ের কাপ তুলতে তুলতে বললেন, “আপনাকে খালুজান ডাকে” “ও হো বাচ্চারা বলেছিল আমিই দেরি করলাম। কী কাণ্ড বল তো মেসো নিশ্চয় বিরক্ত হয়েছেন। বড় অন্যায় হয়ে গেল” বলতে বলতে উনি তুলি নামিয়ে সুফিয়া খালার আগেই দুদ্দাড় করে নেমে গেলেন। সুফিয়া খালা জবাকে বকতে লাগলেন । আমিও সিঁড়ি টপকে ঝড়ের গতিতে নেমে এলাম নিচে। 

সেইদিন উনি আরেকদফা চা খেয়েছিলেন দাদুর সংগে গল্প করতে করতে। জেঠিমা জানতে চেয়েছিল স্নানের জন্য গরম জল লাগলে রহিমা যাওয়ার আগে স্নানঘরে দিয়ে আসবে। উনি জেঠিমাকে দেখিয়ে মাকে বললেন, “এই তোর শ্বশুর বাড়ির লোকজন দারুণ তো। সকাল না হতেই আমাকে তাড়ানোর পাঁয়তারা করছে!" জেঠিমা বলল, “নালিশ করে ফায়দা নেই। এ এখন দত্ত বাড়ির বৌ। রাজশাহীর মেয়ে নয় আর”। উনি হাসতে হাসতে জানালেন, “গরম জলের দরকার নেই রাজশাহীর মানুষেরা নভেম্বরের শীতে কাবু হয় না”। এইসব হাসি ঠাট্টার শুনতে শুনতেই আমি নয়নতারা, সন্ধ্যমালতি আর জবা ফুল দেখছিলাম। 

বাবা ফোনে সোহেল চাচার সঙ্গে ভেতরের ঘরে গিয়ে কথা বলছিলেন।উনি কোন ফাঁকে উঠোনে নেমে কাছারি ঘরের দিকে গেলেন দেখিনি। খানিক পরে কাছারি ঘর থেকে পেটফোলা ব্যাগটা নিয়ে ফের বার হতেই বুঝলাম বুঝলাম দাদুর কাছারিতেই ছিলেন রাতে। সিঁড়ির দিকে এগোতেই জেঠিমা ডেকে বললেন, “ওখানে কিন্তু স্নানের ব্যবস্থা নেই”। উনি কেমন ঘাবড়ে গেলেন যেন,বললেন, “ তুলি ধুতে হবে। ভেজা তুলিঝোলায় রাখা যাবে না। পলিথিনে মুড়ে ব্যাগে ঢোকাবো। ওপর থেকে ইজেলটিজেল সব একবারে গুছিয়ে আনি”। বাবা সিঁড়ির গোড়ায় এসে জানালেন সোহেল চাচা নিজে গাড়িতে করে তাঁকে পৌঁছে দেবেন। বাস না চললেও অসুবিধা নেই। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। উনি মনে হলো খুব খুশি। সিঁড়িতে দাঁড়িয়েই গলা তুলে বললেন, “টুম্পা খাবার রেডি কর আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে নেমে স্নান সেরে আলবিদা বলব । পরের বার তোর জা যতোই বলুক বছর খানেকের আগে নড়ছি না”। জেঠিমা বললেন, “আমার সৌভাগ্য এমন মজার মানুষ থাকলে ফুসফুস ভালো থাকবে সবার”। উনি ওপরে ওঠার সময় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, “বললেন যাই তবে তিতলীর ছবিটা তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলি”। মা বেরিয়ে এসেছিল। চোখ বড় করে আমাকে বলল, “সে কি মামাকে এরই মধ্যে বায়না দিয়ে এসেছ?” আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি বললেন, “তিতলী লক্ষ্মী মেয়ে। তুই তো ছেলেবেলায় আমাকে ছবি আঁকতে দেখলেই সূর্যমুখি এঁকে দাও বায়না করতি তাই তোকে দিতামনা। তিতলীকে আমিই বলেছি একটা তিতলী এঁকে দেবো সূর্যমুখির ওপর”, বলেই মায়ের দিকে হাসলেন। “তবে তোর বিয়ের উপহারটা পাওনা ছিল, এঁকে দিলাম। বাসি উপহার”। মাকে কেমন লাল লেগেছিল কি? এত কিছু খেয়াল করে দেখার বয়স হয়নি আমার। এই সব খুঁটিনাটি হয়তোবাআমি নিজেই কল্পনা করছি কিন্তু শ্যননকে বলবার সময় এমনই একটা দৃশ্য কেন যেন চোখের সামনে ভাসছিল আমার। সিঁড়ির শেষধাপে উঠে ফের নেমে এসেছিলেন তিনি। জবাকে ডেকে এক মগ জল ওপরে পৌঁছে দিয়ে আসতে বলেছিলেন- তুলি ধুবেন। 

খানিক পরে রহিমা খালা চলে গেলেন জবাকে নিয়ে। বলে গেলেন পরিস্থিতি ভালো না থাকলে আর ওবেলা আসবে না। ছাদ থেকে নামার পরে জবার সঙ্গে ভালো করে কথাই হয় নি আর। ও কেমন যেন দূরে দূরেই থাকছিল নানা কাজের ছুতোয়। জবারা চলে যাওয়ার পরেই বাড়িটা হঠাৎ সুনসান হয়ে গেল। 

আমার খুব ছাদে যেতে ইচ্ছে করছিল। ছবিটা কতটা হলো। ভগবান যেন আমার কথা শুনতে পেয়েছিলেন। এগারোটার দিকে সোহেল চাচা ফোনে জানালেন তিনি আসছেন উনাকে নিতে । বাবা মা’কে বলল, “উনি তো এখনও নামলেন না” মা বলল, “আমার রান্না শেষ তিতলী যাও মামাকে বল নেমে আসতে”। আমি সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতেই বাবা বলল, “তুমি থাক আমিই যাচ্ছি”। মিনিটখানেকের মধ্যে বাবা এসে বললেন, “ওপরে তো কেউ নেই।” জেঠু অবাক হলো শুনে, ‘ব্যালকনিতে দেখেছিস?”বাবা বলল, “ছাদের কোথাও নেই”। বাবাকে পাশ কাটিয়ে জেঠু নিজেই গেল ওপরে। বাবা আর জেঠিমাও গেলেন পিছুপিছু। । জেঠিমা নেমে এসে জানাল, “ ইজেলে ছবিটা আছে। নিচেও একটা ছবি পাতা আর একটা রঙের টিউব। উনি নেই”। মা রান্নাঘরের দরোজার কাছেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জেঠিমা জেঠুকে বাইরে রাস্তায় হেঁটে আসতে পাঠালহয়তো সিগারেট বা পান কিছু একটা কিনতে বেরিয়েছে। কিন্তু রহিমা খালা যাওয়ার পরে তো দাদু গেইট বন্ধ করেছিল, খুললে আওয়াজ হতো। তাও জেঠু গেলো বাইরে। 

এবার দাদু গেল ওপরে। দাদুর পিছু পিছু আমিও। দরোজার মুখে বসেইউনি আঁকছিলেন। ইজেলে আমার জন্যে আঁকা ছবিটা চাপানো তখনও, শেষ হয়নি- যতটা আমি দেখেছি ততটাই। মায়ের জন্যে আঁকা ছবিটাআগের মতোই মেঝেতে পড়ে আছে। তার পাশে হলুদ রঙের টিউব। আমার খুব অপমান লাগছিল। কান্নাও। জবার সামনে বলেছিলেন এঁকে দেবেন। দাদু দরোজা টেনে বেঁধে দিলেন।

নিচে নেমেই দাদু বাবা আর জেঠুকে বললেন, “এখন আর কোথাও যেও না কেউ । সোহেল এলে ওকে বলো যে উনার লোক এসেছিল নিয়ে গেছে। আর চুপচাপ থাকো” 

মা মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন। ঠাম্মা বার বার সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন, “রাগ করে নি তো?’ দাদু রেগে গেলেন, “রাগ তো আমরা করব। অমন চেঁচিয়ে কথা বলে বলে কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছে। নিচে উপরে দুইখানা ঘর খুলিয়েছে”। আমার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছিল আমি চোখ বুজে নয়নতারা দেখতে চাইছিলাম। কিছুতেই মনে ভাসছিল না বরং ওঁর আঁকা অসমাপ্ত সুর্যমুখিটাই দোল খাচ্ছিল। 

খানিক পরেই সোহেল চাচা এলেন। অতিথি চলে গেছেন শুনে দেরি করলেন না,গেইট থেকেই দাদু আর ঠাম্মাকে সালাম জানালেন। জুম্মার মিছিলের সময় যেন কেউ ছাদে না যায় মনে করিয়ে দিলেন আর গেইট বন্ধ রাখতে বললেন। আশ্বস্ত করলেন উনার ভাইকে বলা আছে,কোনো বিপদ হবে না। ঘণ্টাখানেক পরেই মিছিল বেরুলো। “নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর” সেই গা হিম করা আওয়াজ তুলে মিছিল চলে গেল।কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না। আরও ঘণ্টাখানেক পরে বাবা বড় মামাকে ফোন দিলেন। সব শুনে মামা অবাক। মাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন ঠিক চিনেছে কি না। ঠিকানা দেওয়া দূরের কথা উনি যে বাংলাদেশে সে কথাই জানেন না বড় মামা। বাড়তি জানালেন, “ওদের বাড়ি তো কবেই রিয়েল্টরকে দিয়ে দিয়েছে! কেউ থাকে না ওখানে। ভাইটাও দেশের বাইরেতবে বোন থাকে ঢাকায়। মামা খবর নিয়ে জানাবেন বললেন।

কেউই তাঁর এমন হঠাৎ অন্তর্ধানের মাথামুণ্ডু উদ্ধার করতে পারলো না।পরেরদিন রহিমা খালা কাপড় শুকাতে দিতে গিয়ে জানাল ছাদের ঘরেলাইট জ্বালানো। বাবা আর জেঠু তখন অফিসে। দাদু, ঠাম্মা জেঠিমা সবাই গেল দেখতে। পিপলুকে দেখতে বলে মা-ও উঠে গেল খানিক বাদে। সবাই মুখ গম্ভীর করে নামল। মায়ের হাতে ছবি দুটো আর ইজেল। আমি কান পেতে শুনলাম বাবাকে ফোনে বলছে দাদু, “কেউ এসেছিল। ব্যালকনির দরজা বাইরে থেকে টেনে বেঁধেছিল পুরো লাগেনি। আর একটা লিফলেট পড়ে আছে টেবিলের ফাঁকে”। মায়ের হাতে লিফলেটটাদিলেন দাদু। দেখালেন ওতে স্বৈরাচার বিরোধী শ্লোগান লেখা আর বামপন্থি রাজনৈতিক দলের লোগো। দাদু বলল, “বুঝেছ এবার কেন পালাল? সোহেলের ভাই ওসি জেনেই পালিয়েছে”। মায়ের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। একটা বিপদ হতে পারতো। বাবা সরকারি চাকরি করে। ছবি দুটো মা দুপুরে বিছানায় পেতে দেখছিল । আমি অবাক হয়ে দেখলাম,গাঢ় হলুদ পাখা দেওয়া প্রজাপতি আঁকা। মাকে জানালাম ওটা আঁকা ছিল না আগে। মা, দাদু আর জেঠিমাকে ডেকে শোনাল। দাদুর ছবিতে কী ছিল না ছিল মনে নেই কিন্তু জেঠিমার মনে হচ্ছিল ছবিটাতে সত্যিই ফাঁকা জায়গা ছিল খানিক। আমি কাঁদতে কাঁদতে আঙুল দিয়ে দেখালাম, ‘ উনি আমাকে প্রজাপতি এঁকে দেবেন বলেছিলেন। এইখানে ফুলটাতেই। জবাও জানে”। কেউ বিশ্বাস করলো কি না বোঝা গেল না তবে মা আমার চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, “ হ্যাঁ উনি কথা রেখেছেন। তোমাকে ফুল এঁকে দিয়ে গেছেন, প্রজাপতিও। কিন্তু উনি আমাকে ছোট করেছেন সবার কাছে তাই আমরা এই গল্প আর কারো কাছে করবো না, জবার কাছেও না”। বিকেলে অফিস থেকে ফিরে বাবা আর জেঠু আবার উপরের ঘরে গেল। দরজায় ডবল তালা পড়ল। নিচে নেমে ছবি লিফলেট সব দেখল খুঁটিয়ে। মাকে দেওয়া ছবিটা বাবা ছুঁড়ে ফেললেন। মা দুটো ছবিই বাক্সে তুলে রাখল। জেঠু পরদিন খবর আনলেন আবেদিন কলোনির আশেপাশে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিস নেই। 

বড় মামা এসেছিল কদিন পরে। ছবিগুলো দেখেছিল। ছবি নিয়ে আমার গল্পটাতে আগ্রহ দেখালেন না। তবে লিফলেটের লোগো দেখে জানালেন ছাত্র থাকাকালে অরুণাংশু রায় বা খেলু দা’র ঐ সংঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার একটা গুজব ছিল, সক্রিয় ছিলেন বলে মনে হয় নি কখনও।লিফলেটটা পকেট থেকে লাইটার বার করে বড় মামাই পুড়িয়ে ফেললেন। 


*শেষ অথবা শুরু

শ্যননের সেই রাতে আমার হলুদপ্রীতি নিয়ে খোঁচানোর পর থেকে আমার ঘুম উড়ে গিয়েছিল। নিজের কাছে নিজেকেই কেমন অচেনা লাগছিল। সেই ঘটনার পরে মা আমাকে কখনও সূর্যমুখি আঁকতে বলে নি। আমিও ভ্যান গগ নিয়ে কারও কাছে জানতে চাইনি। হলুদ আমার প্রিয় রঙ হবার পেছনে ভ্যান গগ নয় নিশ্চিত। কিন্তু ছবিগুলো বাঁধাই করার পরে আমি বাড়িতে থাকলেই এদের সামনেই ঘুরে ফিরে বসছি টের পাই। ফুলগুলোর রঙের তারতম্য তো বটেই ব্রাশের স্ট্রোকের তারতম্যও প্রকট হয়ে ধরা পড়ছে আমার চোখে । এক ছুটির বিকেলে কফি খেতে খেতে প্রজাপতির পাখার আনাড়ি রঙ দেখতে দেখতে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল মাথায়। জবা! আরে কেন মনে হলো না এ কথা? জবা ছাড়া কেউ করেনি এই কাজ। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি পিপ্‌লুকে ফোন দিলাম: জবার ঠিকানা চাই। পিপ্‌লুকে কোনো কাজ দিলে আমার অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু এবার ও আমাকে অবাক করে পরদিনই ফোনে জানাল রহিমা খালাবস্তিতে থাকে না আর। কোথায় থাকে কেউ জানে না। জবার ভাইটা মরে গেছে বাসের ধাক্কায়। জবার বিয়ে করে গোসাইলডাঙা থাকত মায়ের কাছে আসত মাঝে মাঝে এখন কোথায় তাও কারো জানা নেই। জবার বিয়ের কথা আমি জানতাম। কোনো এক গার্মেন্টে কাজ করতো সেখানেরই কাউকে বিয়ে করেছিল। রহিমা খালা আমাদের বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়েছিল জবার বিয়ের আগেই । বস্তিরই একজন অবশ্য বলেছে বাড়তি কিছু জানলে পিপলুকে জানাবে। 

সেই বাড়তি খবর পেতে পেতে প্রায় পাঁচ মাস পার হয়ে গিয়েছিল । তাও বিস্তর ঘোরাঘুরির পরে আমাদের পাড়ার এক দোকানি খবরটা জোগাড় করে দিয়েছিল। তার মেয়ের সঙ্গে জবা একই গার্মেন্টে কাজ করতো। জানাল জবা অসুস্থ। টিবি হয়েছে। মেথরপট্টির ওদিকে কোথাও ভাড়াবাসায় থাকে। বরের সঙ্গে বনিবনা নাই। একটাই মেয়ে। স্কুলে পড়তো। জবার টিবি হওয়ায় ওকে কাজ থেকে ছাটাই করেছে কর্তৃপক্ষ। ওর জায়গায় ওর মেয়েকে নিয়েছে ওরা। খুব মন খারাপ হলো শুনে। কদিন পরেই চাটগাঁ গেলাম। পিপ্‌লুকে নিয়ে গেলাম জবার ঠিকানায়। গলির ভেতরে বাড়ি। একটা বাচ্চা মেয়ে দেখিয়ে দিলো। পিপলু গলির মোড়েই টেক্সিতে বসে রইল ভেতরে এলো না। সারসার গায়ে গা লাগানো ইটের বাড়ি। চার নম্বরটা সাবিনার মায়ের। জবা এখন সাবিনার মা। দুয়ারের সামনেই পা টেনে বসে ছিল সে। মেয়ের নাম ধরে ডাকতেই দাওয়া থেকে নেমে এলো নিচে। আমাকে দেখেই চিনল কিন্তু আমি সেই হাড়মাংসের অবয়বে কোত্থাও ছেলেবেলার জবাকে খুঁজে পেলাম না। ও বিষণ্ণ হেসে জানতে চাইল, “আপনি ভালো আছেন?” খট করে কানে লাগল। বললাম, “তুমি আমাকে আপনি করে বলতে না তো” । ওহাসল, “ছুডুকালে সক্কলে ছুডুই থাকে। বড়ো হইতে হইতেই উঁচানিচা জ্ঞান হয়। আপ্নে উঁচা তাই “আপ্নে” । আমি নিচাতেই এখনও, তুমি কইরাকওনই জায়েজ”। কথার সেই তেজ! যাক কথায় অন্তত পুরনো জবা বেঁচে আছে- আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। 

ওর পিছুপিছু উঠলাম ঘরে। বিকেল চারটা মতো বাজে অথচ ঘরের ভেতরে নিঝুম রাত যেন। ও লাইট জ্বালাল। একটাই চৌকি। টানটান চাদর পাতা। নিচে তোশক নেই। কোণের জলচৌকি টেনে আমাকে হাত দিয়ে চৌকিতে বসতে ইশারা করল ও। জলচৌকিতে বসেই সে হাঁপাচ্ছে বুঝতে পারছিলাম। কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। ও মাথা নিচু করে আছে অপরাধীর মতো। লাইটটা এত নিচুতে মনে হচ্ছে আমি মাথা সোজা করলেই লেগে যাবে। আমি সরে বসি একধারে। কেমন যেন জন্ডিসের মতো ঘোলাটে লাগছে চারপাশ। ইটের ওপরে সিমেন্টের প্রলেপ পড়েনি। খাঁজের অন্ধকারে আরশোলা ঘাঁপ্টি মেরেআমাকে দেখছে মনে হচ্ছে। এখনও আমি আরশোলা ভয় পাই। জবা খপ করে ধরে ফেলতো ছেলেবেলায়। আমার অস্বস্তি হতে থাকে। ও উঠে দাঁড়ায়। এরপরে আমার পাশেই উবু হয়ে মেঝেতে বসে চৌকির তলা থেকে একটা তোরঙ্গ বার করল টেনে। ডালা খুলে ভেতর থেকে প্লাস্টিকের লম্বামতো টিফিনবক্স রাখে আমার পাশে। বলে খোলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো খুলি ঢাকা। এক ভোঁতা প্লপ আওয়াজ হয় হাওয়ার প্রতিরোধের ক্রিয়ায়। আমার চোখের সামনে হলদে আলোয় স্পষ্ট হয় এক গাদা তুলি আর হলুদ রঙের টিউব । টিউবটা আমার চেনা। এই টিউব থেকে রঙের ফুটকি বসাচ্ছিলেন তিনি ক্যানভাসে! আমার গা কাঁপতে থাকে। মনে মনে ভাবলেও চোখের সামনে এতকাল পরে ওদের দেখবো ভাবিনি আমি। ও বাক্সের অন্যধারে বসে চৌকিতে।ভেতর থেকে টিউবটা তুলে আমার দিকে এগিয়ে ধরে। হাতে নিয়ে দেখি লোহার মতো শক্ত । ও আমার হাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকক্ষণ পরে বলে, “ এইসব আপ্নারেই দিবো বইলা রাখসিলাম । আম্মার নজর বাঁচাইতে বাঁচাইতেই জীবন শ্যাষ। আমি ভাবসিলাম আপনি আরও আগে বুঝবেন। আপনি তো জানতেন আমি আঁকতে পারি কিন্তু উনার মতো পারার কথা না। অনেক চেষ্টা করসিলাম তারপরেও পাপড়ি মিলাইতে পারি নাই। সঞ্জয় দাদার ওইখানে পেন্সিল ছিল না। তোকাইতে গেলে আওয়াজ হইতো। ফজরে আইসা করসি তো। আলো ফুটে নাই। আম্মা মনে করসে টাট্টির লাইনে আমি। আম্মাতো আপনাগো বাড়িত সেইসব সাইরতো। লাইট জ্বালাইয়া আঁকসি।ডরে হাত কাঁপতেসিল। রাস্তায় মানুষ নামার আগেই রেলিং বাইয়া দৌড়ান দিসি। লাইট নিবাইতে ভুইল্লা গেসিলাম। আম্মায় কাপড় ম্যালতে গিয়া দেইখা ফেলসে। বাড়িত আইয়া কইসে আব্বারে। হেরাও মহা চিন্তায় পড়সিল।হেরা তো সেই মামার চইল্লা যাওনের খবর জানত না। আব্বা তো নাই আম্মা এহনো জানে না। ধরা পইড়লে আব্বাই আমারে কতল দিত। আল্লাহ যে ক্যাম্নে বাচাইসে আল্লাই জানে।” আমি কথা বলি না। ও আবার বলতে থাকে, “উনারে আমিই বাইর কইরা দিসিলাম। সামনে দিয়াই গেসেন। আপ্নে তখন ফুলগাছের তলে। আমি ব্যাগ নামাইসি ছাদের কিনার দিয়া”। আমি অবাক হয়ে জানতে চাই, এইসব কেন করল আর ওকেই বা পেলো কীভাবে? জবা হাসল। “ঐ যে মগ ভইরা পানি দিতে উপ্রে গেলাম তখনই। উনি আমারে আঁকতে পারি কি না জিগান। আমি পারি বইলতেই আমারে তুলি দিয়া একটা সূর্যমুখি রঙ কইরতে দিলেন। ভালো হয় নাই আবার অইটারে রঙ দিয়া থ্যাবড়াইয়া আঁকলেনদেখাইয়া দিলেন ক্যামনে তুলিরে ঘুরাইতে হয়। তারপরে কইলেন কাউরেনা কইতে। উনি থাকলে ছোট বাপির বিপদ । উনি এরশাদ বেডারে গদিছাড়া কইরবেন। কইলেন আমার অনেক সাহস। ট্যাহা দিতে চাইস্‌লেন আমি নিই নাই। তখন আমারে উনার তুলি গুলান দিলেন,রঙ দিলেন। বুঝি নাই ট্যাহারই দরকার আসিল , তুলি-রঙে পেড ভরে না”। আমার গলা বুঁজে আসে কান্নায়। ও কাশতে থাকে । আমি নিজেকে সামলে বলি, “আমি তোমার চিকিৎসা করাব। তুমি ছবি আঁকবে।তোমার মেয়েকেও আমি দেখব, পড়াব”। ও উত্তর দেয় না। মুখে কাপড় দিয়ে কাশতেই থাকে। আমি দেখি ওর চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। 

মা একবার বলেছিল জবার যদি অন্য কোথাও জন্ম হতো ও অনেক কিছু হতে পারতো। জবার চোখে দেখতে জানে- অরুণাংশু রায় বুঝেছিলেন।ও আমি আর জবা যে অসমান তা বুঝেছিলাম আমি। জবা বোঝেনি। আমার ড্রইং খাতা ছিল। ওর ছিল না। নিজেকে নিজের প্রচণ্ড ছোটো লাগে। যে জীবন আমি যাপন করছি সেই জীবনের যোগ্য কি আমি? দুজনে সমান সুযোগ পেলে আমিই হয়তো পিছিয়ে যেতাম। জবার জীবনের খানিক পরিবর্তন আমাদের পরিবারও আনতে পারতো। আমি শ্যননের কথা মনে মনে আওড়াই সব গল্পেরই শেষ আছে। কোনোটা সোজা কোনোটা খানিক ঘুরপথে। অজস্র মৃত পায়ের চিহ্ন থাকলেও গল্পের শেষ আছেই। এই দীর্ঘযাত্রার কোনখানে কোন গল্পের শেষ সে কেবল বিধাতাই জানেন। আর সেই শেষ থেকেই হয়তো ফের নতুন গল্পের শুরু। আমরা কে কার পায়ের ছাপে হাঁটছি কেউ জানি না!আপাতত এটুকুই জানি জবার সকল দায় আমার। 

ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াতে জবা আমাকে মাথার আঁচল সরিয়ে দেখায় ।ওর ডান কানের চেয়ে বাম কান বেশ খানিকটা ছোট। ও হাসতে হাসতে বলল, “আগে দ্যাখসিলা?” আমি মাথা নাড়ি। কখনোই চোখে পড়েনি। ও বলে, “তিনি দ্যাখসিলেন” । তারপরে বলে, “ছুডুকাল সোন্দর” । ও আমাকে ফের তুমি বলছে! আপন ভাবছে! আমি ওকে জড়িয়ে বলি, “বড়োকালও আমরা সুন্দর বানাবো” । ও হাসে। তারপর বলে, “কান ছুডু তয় হুনি বালাই। ভ্যান গগের মতন এক -কানা না”। ও হাসে। আমি অবাক হই জবাও ভ্যান গগ মনে রেখেছে! আমরা দুজনই হাসতে থাকি। আমি জানি ওর চোখের সামনেও সেই স্মৃতি ভাসছে। আমিও যেন দেখছি জবা গালে হাত দিয়ে বলছে, “ও আল্লাহ নিজে নিজের কান কাইট্টা বয়রা হয় নি কেউ?” হাসতে হাসতে আমার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। জবার ফের কাশি ওঠে। আমি মনে মনে বলি তোমাকে ভালো হতেই হবে।

জবার ওখান থেকে ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোমায় ভালোবাসতেন? মা বলল, “কোনোদিন বুঝিনি। বয়সে কত বড়! তবে যদি মুখ ফুটে বলতেন কখনও হাত ছাড়তাম না” । আমি মাকে জড়িয়ে রাখি। মা আমার চুলে বিলি কাটতে থাকেন, আমি শুনি মায়ের হৃৎপিণ্ডের ধুকপুক…



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ