মনিজা রহমানের গল্প : হারামজাদা



মিল্টন যখন হাসে, ওর চোখ, চোখের তারা, ভ্রু, চোখের দুই কোন সব কিছু কেমন যেন হাসতে থাকে। 

এই ঘুম ঘুম চোখের আলগা মিষ্টিভাবের হাসির জন্যেই ওকে একদিন ভালোবেসেছিল শাহানা। এখন ভালোবাসার পরিবর্তে হৃদয় খুড়লে কাঁপা কাঁপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছু শুনতে পায় না। 

মিল্টনকে গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসে হাসিমুখে কারো সঙ্গে আমুদে ভঙ্গীতে কথা বলতে দেখল শাহানা। নতুন প্রেমে পড়লে যেমন পুরুষদের চেহারা হয়। 

ছেলেরা বাড়ি থেকে বের হয়ে গাড়িতে ওঠা পর্যন্ত জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে শাহানা। মিল্টন হাসিমুখে ফোনে কথা বলতে বলতে ছেলেদের গাড়িতে উঠিয়ে কারসিটে বসার ব্যবস্থা করছে। এত দূর থেকে শুনতে না পেলেও শাহানা জানে, কার সঙ্গে এত হেসে হেসে কথা বলছে মিল্টন! আর মিল্টনেরও অজানা নয় শাহানা এই সময়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছেলেদের স্কুলের যাওয়া দেখে! তবু ও প্রতিদিন এই সময়টা বেছে নেয় কথা বলার জন্য।

সকালে সবাই চলে যাবার পরে রাজ্যের বিষণ্ণতা জেঁকে বসে যেন শাহানার ওপর। 

মিল্টন দুই ছেলেকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে কাজে চলে যায়। সাড়ে সাতটার মধ্যে তিনজন চলে যাবার পরে হুইল চেয়ারে অনেকক্ষণ ঠায় বসে থাকে শাহানা। মাথার মধ্যে কেমন যেন ভোঁতা অনুভূতি হয়। অস্থিরতার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। বুকের মধ্যে দ্রিম দ্রিম করে শব্দ হতে থাকে। 

নিউইয়র্ক শহরের হৈচৈ ছেড়ে বাফেলো এসেছে ওরা মাস চারেক হল। এখানে নিজেদের বিরাট বাড়ি হয়েছে । তবু ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টারশায়ারের ওই দুই রুমের বাসার জন্য মন পোড়ে শাহানার। ছোটবেলা থেকে শহরে থাকার অভ্যাস, এত নিরিবিলি চারদিক ভালো লাগেনা। নির্জনতা যেন গিলে খেতে চায় ওকে।

শাহানা জানে, নিরিবিলি বাসাতে নি:সঙ্গ এই সময়টা খুব ভয়ংকর। এভাবে চলতে থাকলে আত্মঘাতীও হয়ে যেতে পারে ও! মস্তিস্কের একটা সংযোগ আছে কিনা জানেনা ও, এই সময়ে শাহানার মা নিসারুন নিসা প্রায় প্রতিদিন ফোন করেন মেয়েকে। মায়ের চেয়ে সন্তানকে কে এত ভালো চিনতে পারে পৃথিবীতে।

--কেমন আছস আইজ? খাইছস?

--এখনও খাই নাই। খামু। 

--মিল্টইন্যা তোর লগে ভালো ব্যবহার করে তো? কিছু হইলে আমারে বলবি! তোর মায়ে এখনও বাইচা আছে। 

মিল্টনকে আগে খুব পছন্দ করতেন নিসারুন নিসা। এখন দুই চোখে দেখতে পারেন না। তার অবশ্য কারণও আছে। মাকে এই জন্য দোষ দিতে পারেনা শাহানা।

প্রতিদিন সকালে ঘড়ি দেখেই ফোন করেন নিসারুননিসা। মিল্টন যখন বাসায় থাকেনা, সেই সময়টা বেছে নেন তিনি। ফোন করেই আগে জিজ্ঞাসা করেন, মেয়ে খেয়েছে কিনা! অথচ প্রশ্নটা প্রথম করা উচিত ছিল শাহানার। 

--আম্মা, আপনে খাইছেন? আপনার শরীর ভালো আছে?

মেয়ের সামান্য কথায় নিসারুননিসার মনের তন্ত্রীতে স্পর্শ করে। তার এত সাহসী মেয়েটা আজ কিভাবে ভাগ্যের নির্মমতায় পরাজিত। 

--আমি খাইছি মা। ফজরের আজানের আগে উইঠা খাবার দাবার রেডি করছি। রফিকে তো ভোর পাঁচটায় উইঠা গাড়ি লইয়া বাইর হয়। 

মায়ের কথায় অবাক হয়ে শাহানা।

--রফিক না আগে রাতে কাজ করত! 

--আমার রাইতকালে একা থাকতে ডর লাগে এই জন্য ওরে কইছি- বাবা তুই দিনের শিফটে কাজ নে।

নিউইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কসে ছোট ছেলের বাসায় থাকেন নিসারুননিসা। ছোট ছেলে এখনও বিয়ে শাদী করে নাই বলে সংসারে পুরো কর্তৃত্ব তার। আমেরিকা আসার পরে প্রথম কয়েক বছর ছিলেন বড় ছেলের জ্যামাইকার বাসায়। কুইন্সের বাঙালি এলাকায় বেশ মানিয়ে নিয়েছেন নিসারুননিসা। 

বড় ছেলে শফিক মা আর দুই ভাই বোনকে স্পন্সর করে এই দেশে আনছে। নিসারুননিসা বিধবা হন আটচল্লিশ বছর বয়সে। জীবনীশক্তি প্রবল বলে আটশট্টি বছর বয়সে এসেও এক মুহূর্ত বসে থাকতে পারেন না। ছেলেমেয়েরা হয়েছে বাবার মত, ফুলের ঘায়ে মুর্ছা যায় সবাই। 

--মিল্টন বাসায় কাজ কাম করে তো! নাকি সব কাজ তোর ঘাড়ে ফালাইয়া হারামজাদা বাইরে বাইরে ঘুইরা বেড়ায়!

প্রতিদিনই মেয়ের সঙ্গে আলাপচারিতার এক ফাঁকে কথাটা বলেন নিসারুননিসা। শাহানা শারীরিকভাবে পঙ্গু হওয়ার পরে সরকার থেকে বাসায় একজন দেখাশুনার লোক পায়। নিউইয়র্কে থাকতে মেয়ের দেখাশুনার কাজটা মা নিসারুননিসা করতো। তখন বেশ আরামে ছিল শাহানা। সংসারে কোন কাজে মেয়েকে হাত দিতে দিত না মা। 

বাফেলো আসার পরে কাগজপত্রে আরেকজনকে দেখিয়ে কাজটা মিল্টন নিজে করে। স্বামী হিসেবে স্ত্রীকে দেখাশুনার জন্য হোম এটেনডেন্টের এই চাকরীটা সে পায় না। এ জন্য অন্য একজনকে দেখিয়ে, তাকে সামান্য কিছু দিয়ে পুরো টাকা সে পকেটে ঢোকায়।



এই নিয়ে অনেক অভিযোগ করেছে শাহানা। নিসারুননিসা তো একদিন প্রচন্ড রাগারাগি করেছেন। সেই থেকে জামাই-শাশুড়ির কথা প্রায় বন্ধ। 

‘এই কয় টাকার লোভ সামলাইতে পারে না তোর স্বামী! অসুস্থ স্ত্রীর জন্য এমনিতে তার উচিত ছিল নিজের পকেটের টাকা খরচ করে ঘরে একখান দেখাশুনার লোক রাখা। সরকার থেকে ফ্রি একজনরে দিয়েছে, সেই টাকাও সে মেরে খায়।’



দুই বান্ধবী নাসরিন আর জলিও প্রতিদিন এই কথাগুলি শাহানাকে বলে। তবে কথাগুলি মিল্টনকে বলে নাই তারা সরাসরি। যে কারণে মিল্টনের সঙ্গে শাহানার বান্ধবীদের সম্পর্কে এখনও চিড় খায় নাই। 



হঠাৎ দেখে মোবাইলে মিল্টনের ফোন। শাহানা একটু অবাক হয়। আজকাল তো বাইরে একবার বের হলে বাসায় যে কেউ আছে মনেই থাকেনা মিল্টনের!

--মা, তোমার হারামজাদা জামাই ফোন করছে। পরে ফোন দিবনে তোমারে। 

--কিছু সমস্যা হইলে আমারে জানাইস কিন্তু। 



মিল্টন ছেলেদের স্কুলে দিয়ে গ্রোসারি শপের কাজে যায়। ওখানে ক্যাশিয়ারের কাজ করে ও। শাহানাকে বলছে, বছর খানেকের মধ্যে নিজেই একটা গ্রোসারি শপ দিবে। 



শাহানা ফোন ধরতে দেরী করায় মিল্টন ফোন কেটে দিছে। শাহানা নিজে থেকে আর মিল্টনকে ফোন করেনা। জরুরী কিছু হলে সে নিজেই জানাবে। 



হুইলচেয়ার ঘুরিয়ে কিচেনে গিয়ে জগ থেকে ঢেলে এক গ্লাস পানি খায়। তারপর চায়ের হাড়িতে কন্টেনার থেকে দুধ ঢেলে চুলায় বসায়। দুধ ফুটে উঠলে চায়ের পাতা ছেড়ে দেবে। মিল্টন আবার ফোন করে। 



--আজ বিকালে ল ইয়ারের অফিসে যাওয়ার কথা মনে আছে তো? 



মিল্টনের নরম কণ্ঠের প্রশ্ন শাহানাকে কিছুটা বিস্মিত করে। এত মধুর করে ইদানিং তো সে কোন কথা বলেনা। 

--মনে থাকবে না কেন? কিন্তু ছেলেদের কার কাছে রাইখা যাবা ঠিক করছ? 

--পাশের বাড়ির নোয়াখালিদের বইল্লা দেখনা! ওরা রাখতে পারবে কিনা দুই ঘন্টার জন্য? 

--আমি বলতে পারমু না। বার বার ওদের এত ডিস্টার্ব করতে ভালো লাগেনা।

--আচ্ছা, আমি আঙ্কেলকে ফোন কইর‌্যা দেখতেছি পাই কিনা! 

শাহানা কিছু বলে না। হঠাৎ এই ল ইয়ারের অফিসে যাবার বিষয়টা ওর কাছে ঠিক স্পষ্ট না। তবে এমন না যে ইমিগ্র্যান্ট আইন কানুনের ব্যাপারে ও কিছু জানে না। ভাইয়ের মাধ্যমে আমেরিকার সিটিজেন হওয়ার পরে মিল্টনকে তো বিয়ে কইর‌্যা ওই আনছে। শাহানাকে চুপ দেখে মিল্টন আবার কথা বলে ওঠে। 

--বাসায় বাজার সদাই কিছু আনতে হইব? 

-- না, কি আর লাগবে! আমরা কখন রওনা হমু?

--তিনটার মধ্যে রেডি হইয়া থাইকো। ছেলে গো স্কুল ছুটির পরে পিজা টিজা একটা ‍কিছু খাওয়াইয়া নিব নে! 



বাইরে থেকে কেনা পিজা-ফ্রায়েড চিকেন ছেলেদের খাইয়ে দিন পার করে দেবে এমন মা শাহানা না। শরীরের বাম দিক অবশ হয়ে গেছে। বাম হাত ও বাম পা বলতে গেলে কোন কাজ করেনা। প্রতিদিনের মতো এক হাত দিয়েই মুরগির মাংস রান্না করার প্রস্তুতি নেয়। পিঁয়াজ কাটা শেষ করে একটা ছোট লাউ ফ্রিজ থেকে করে। এই দেশে লাউয়ের মতো একটা সবজি পাওয়া যায়, নাম স্কোয়াশ। আলাদা করে সবজি রান্নার করার মত শক্তি নেই। মাংস কষানোর পরে লাউ দিয়ে দেবে। 

ধীরে ধীরে হুইল চেয়ার ঘুরিযে কাজ করে। খুব কষ্ট হয় শাহানার। কিন্তু মনে মনে ভাবে ‘খাইতে তো হবেই। দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাইয়া বাঁচতে তো হবেই।’ 



মুরগীর মাংসের চুলার জাল কমিয়ে দিয়ে হুইল চেয়ার নিয়ে বাথরুমে ঢোকে শাহানা। এই সময় একজন মানুষের দরকার হয়। মা থাকতে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে সুন্দর করে গোসল করিয়ে দিতেন। একটা হোম এটেনডেন্ট থাকলে হয়ত সাহায্য করতে পারত। কিন্তু মিল্টন কখনও সেটা করবে না। ছেলেদের গোসল করাতে গিয়েই তার কতো বিরক্তি! অথচ স্ত্রীর হোম এটেনডেন্ট হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা পকেটে ঢুকাতে একটুও বিরক্ত লাগেনা। 



--ওই টাকা দিয়ে নতুন বউয়ের জন্য দামী গিফট কিনে। এখন তো তার দুইটা সংসার। খরচ আছে না! 



বাথরুম থেকে ফিরে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে শাহানা প্রায় প্রতিদিন কথা বলে দুই বান্ধবীর সঙ্গে। দিনের এই সময়টা ওর সব থেকে প্রিয়। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় রোকেয়া হলে এক রুমে থাকতো ওরা তিনজন- শাহানা, নাসরিন আর জলি। সবাই বলতো এক বৃন্তে তিনটি কুসুম। নীলক্ষেত কিংবা নিউমার্কেটে যাবার সময় রিক্সার ওপরে উঠতো সব সময় শাহানা। ও ছিল তিন বন্ধুর মধ্যে সবচেয়ে হালকা পাতলা আর চালু। সেই সদা চঞ্চল মেয়েটি যে বাথরুমে পড়ে গিয়ে পক্ষাগাতগ্রস্ত হয়ে যাবে কেউ কি ভেবেছিল! 

--জলি তোরে না বলছি, মিল্টনের বিয়া নিয়ে কোন কথা বলবি না! আমাদের কি কথা বলার আর কোন সাবজেক্ট নাই। 

শাহানার বিরক্তি ওর দুই প্রাণের বন্ধুকে অল্প সময়ের জন্য স্পর্শ করে। কিছুক্ষণের জন্য ওরা হয়ত থামে। আবার একটু পরেই ওই প্রসঙ্গে কথা বলা শুরু করে। নাসরিন আর জলি দুজনেই ঢাকায় থাকে। রাতে ঘুমাতে যাবার আগে ওরা প্রায় প্রতিদিন শাহানার সঙ্গে মেসেঞ্জার গ্রুপে কথা বলে।

--তুই বেশী বেশী সহ্য করিস বলে মিল্টন এত পাত্তা পাইছে। আমেরিকার সিটিজেন করলি তুই ওরে, এখন সে তোর ওপর ছড়ি ঘোরায়। 

জলির কথা শেষ হবার পরে এবার নাসরিন মুখ খোলে। বান্ধবীদের মধ্যে ও সবচেয়ে ধনী। গত বছর নিউইয়র্কে বেড়াতে আসছিল। ওদের ব্রঙ্কসের বাড়িতেও কয়েকদিন থেকে গেছে। নাসরিন এবার কথা বলে ওঠে-

--গত বছর আমি ঢাকায় যাওয়ার সময় মিল্টন ওর নতুন স্ত্রীর জন্য দুই জোড়া সোনার চুড়ি দিয়ে দিছে। আবার এক লাগেজ ভরা জিনিষ। ওজনে বেশী হয়ে গেলে কাস্টমসে জরিমানা করবে, এই জন্য দুইশ ডলার আবার আলাদা করে দিয়ে দিছে। কত ঢঙ দেখছ!

আরো কি সব বলে যায় জলি আর নাসরিন নিজেদের মধ্যে, শাহানার কানে ঠিকভাবে যায় না। মিল্টন জগন্নাথ কলেজ থেকে টিএসসিতে আসতো আড্ডা দিতে। সেখানেই ওর সঙ্গে শাহানার পরিচয়। নাসরিন আর জলি অবাক হয়ে বলতো, তুই প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের ছাত্রী হয়ে জগা বাবুর পাঠশালার ছাত্রকে বিয়ে করবি! এটা তোর স্ট্যাটাসের সঙ্গে যায়! 

তখনই বান্ধবীদের উল্টো বোকা মনে হত শাহানার। মিল্টনের সুন্দর চেহারা আর নরম কোমল ব্যবহার দেখে ওর বিশ্বাস জন্মেছিল জিতে গেছে ও। আসলে যে মানুষটার ভিতরে পোকায় কাটা সেটা বুঝল দুর্ঘটনার পরে। ও পক্ষাঘাতগ্রস্থ হওয়ার ছয় মাসের মাথায় ওর অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে বিয়ে করল সে। শাহানার শারীরিকভাবে দাম্পত্য সম্পর্কে অক্ষম এই কথা বলা শুরু করল দুনিয়ার সবাইকে।

আসলে কথাটা সত্যি না। এক পাশ অবশ হয়ে গেলেও শাহানা শারীরিক সম্পর্কে অক্ষম ছিল না। কিন্তু মিল্টনের চঞ্চল আর অগভীর মনের সময় কোথায় শাহানার পিছনে সময় নষ্ট করার। তার দরকার তরতাজা নতুন মুখ, নতুন শরীর। দিন রাত নতুন স্ত্রীর সঙ্গে গলা নামিয়ে গুজুর গুজুর প্রেমালাপ, হাসাহাসি চলতেই থাকত ব্রঙ্কসের বাসায়। 



শাহানা অসুস্থতার জন্য বেশী নড়াচড়া করতে পারত না। কিন্তু নিসারুননিসা তো সারাদিন পুরো বাসায় চরকির মতো ঘুরে বেড়ান। তার চোখ এড়াবে কিভাবে! একদিন তিনি সরাসরি বলে বসেন, ‘মিল্টন, তুমি যে আমার মেয়ের সামনে এভাবে অন্য আরেক মেয়ের সঙ্গে হাসাহাসি কর, তুমি যদি অসুস্থ হতে আর আমার মেয়ে যদি অন্য পুরুষের সঙ্গে এভাবে কথা বলত, তোমার কেমন লাগতো!’ 



মনের মধ্যে পাপ থাকলে যা হয়, এরপর থেকে মিল্টনের আদিখ্যেতা বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নিসারুননিসার সঙ্গে কথা বলা কমিয়ে দিয়েছে। প্রয়োজন না হলে কোন কথাই বলেনা। শাহানাকে এক প্রকার জোর করে বাফেলোর এই বাড়িতে নিয়ে এসেছে। মেয়ে জামাই সম্মান করেনা, এই রাগে বাফেলোতে মেয়ের সঙ্গে আসেননি নিসারুননিসা। মেয়ে জামাই যেখানে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে সেখানে কেন যাবেন তিনি!



--মিল্টন নাকি ওর নতুন বউকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে, তুই কিছু শুনছিস? 

নাসরিনের প্রশ্নে সম্বিত ফিরে পায় শাহানা। 

--কে বলল?

যে কষ্টটাকে ভুলে থাকতে চায়। সেটাই যেন নানা রূপে সামনে চলে আসতে চায়। 

--মিল্টনের বোনের সঙ্গে কিছুদিন আগে গাউসিয়া মার্কেটে দেখা হয়েছিল। ও বলল, ভাইয়া নাকি নতুন ভাবীকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে! 

শাহানা আর নিতে পারেনা। দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা বলে বান্ধবীদের সঙ্গে ফোন কেটে দেয়। 



নিজের বোনা লাউ দিয়ে রান্না করার মুরগির মাংস, সেই সঙ্গে নিজের গাছের লেবু, তবু যেন ভাত গলা থেকে নামেনা শাহানার। প্লেটে খাবার নিয়ে বসে থাকে। লেবুর রসের মত কয়েক ফোটা নোনা জলও মিশে যায় ভাতের সঙ্গে। শাহানার গলায় ভাতের লোকমার বদলে কষ্টের দলা জমে হতে থাকে।



দরজার লক খোলার শব্দ হওয়ার পরে দ্রুত হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে প্লেট হাতে নিয়ে গার্বেজ বিনে ভাতগুলি ফেলে দেয়। বাসায় একা ঢোকে মিল্টন। ঢুকেই জানায়, প্রতিবেশী নোয়াখালিদের কাউকে না পেয়ে এলাকার এক ছোট ভাই মুরাদকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে। শাহানা আর মিল্টন যখন লইয়ারের অফিসে যাবে তখন গাড়িতে বাচ্চাদের সঙ্গে মুরাদ বসে থাকবে। 

মিল্টন বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে জামা কাপড় পাল্টানোর আগে শাহানা রেডি হয়ে যায়। পঙ্গু হবার পরে সাজ সজ্জ্বা কমে গেছে ওর। 

উজ্জ্বল রঙের শার্ট আর প্যান্টে ঝকঝকে মিল্টনের পাশে বড় ম্রিয়মান দেখায় শাহানাকে। হুইল চেয়ার থেকে কোলে করে স্ত্রীকে নিয়ে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে দেয়। মাকে দেখে দুই ছেলে খুশীতে চেঁচিয়ে ওঠে। মুরাদ পিছনের সিটে বাচ্চাদের সঙ্গে বসেছে। কম বয়সী একটা ছেলে। শাহানাকে হাসিমুখে সালাম দেয়। 

হুইল চেয়ারটা ব্যাক ডালায় রেখে গাড়ি স্টার্ট দেয় মিল্টন। 

--মুরাদ, তোর ভাবীর সঙ্গে পরিচয় হইছে?

--হ, একটু আগে সালাম দিলাম। 

--মুরাদরা চার বন্ধু মিলে একটা বাংলা খাবারের রেস্টুরেন্ট দিছে। তুমি চাইলে সন্ধ্যায় সেখানে খেতে পারি। 

গাড়ি চালাতে চালাতে শাহানার উদ্দেশ্যে কথাটা বলে মিল্টন। 

--বাচ্চাদের জন্য বাসায় মুরগি রান্না করছি। ওটা কে খাবে?

শাহানার কথা শুনে মুখ খোলে মুরাদ,

--ভাবী, আমাদের রেস্টুরেন্টে পোলাও-বিরিয়ানি আর শিক কাবাব এসবও আছে। আমার ধারণা বাচ্চারা খাবারগুলি পছন্দ করবে।

শাহানার মনের বিষন্নতার মেঘ একটু যেন ফিকে হয়ে আসে। অনেকদিন এভাবে গাড়িতে কোথাও যাওয়া হয়না। জরুরী কাজে কখনও বাইরে গেলে রেস্টুরেন্টে খেয়েছে কবে, এখন মনে পড়েনা। অথচ অসুস্থ হবার আগ পর্যন্ত শনি আর রবিবার বাসায় কখনও পাওয়া যেত না ওদের। 

গাড়ি চলতে থাকলে চারদিকের দৃশ্যবলী দেখতে থাকে শাহানা। সব কিছু সেই আগের মত সুন্দর-উজ্জ্বল। জীবনের কত কোলাহল চারদিকে। শুধু পাল্টে গেছে ওর জীবনটাই। 

মুরাদকে ছেলেদের কাছে রেখে মিল্টনের পিছনে পিছনে হুইল চেয়ার ঠেলে ল ইয়ারের অফিসে ঢোকে শাহানা। ভারতীয় বংশোদ্ভূত লইয়ার ওদের অভ্যর্থনা জানান নিজের রুমে। 

তারপর ঢাউস একটা ফাইল খুলে বসেন। ওদেরকে বসিয়ে রেখে বেশ কয়েকবার চোখ বোলান কাগজপত্রের ওপর। শাহানা এখনও বুঝতে পারছে না, কি জন্য এখানে এসেছে ও। মিল্টনকে কিছুটা উদ্বিগ্ন মনে হয়। 

--আপনার স্বামী যে বাংলাদেশে আরেকটি বিয়ে করেছে, আপনি তো জানেন নিশ্চয়ই? 

ল ইয়ার শাহানার কাছে জানতে চাইলে ও মাথা নাড়ায়। 

--কিন্তু আমেরিকান নিয়ম অনুযায়ী উনি নতুন স্ত্রীকে এই দেশে আনতে পারছেন না। এখন আপনি যদি সম্মতি দেন তাহলেই সে আনতে পারবে।

শাহানা খুব অবাক হয়ে একবার মিল্টন, আরেকবার লইয়ারের দিকে তাকায়। মিল্টন ওকে বোঝানোর দায়িত্ব নেয়।

--তুমি যেহেতু এখানকার মানে আমেরিকান আইন অনুযায়ী আমার স্ত্রী, তাই আমি আরেকজন স্ত্রীকে আনার জন্য স্পন্সর করতে পারব না। কিন্তু তুমি যদি এই কাগজে স্বাক্ষর কর, তাহলে সেটা পারব। আমেরিকান আইনে আমরা স্বামী-স্ত্রী না থাকলেও, ইসলামী রীতি অনুযায়ী তো আমরা স্বামী-স্ত্রী থাকব। সুতরাং তুমি স্বাক্ষর করার ব্যাপারে কোন চিন্তা কোর না। আমি তোমাকে ফেলে দেব না শাহানা।

শেষের কথাটা বেশ জোর দিয়ে বলে মিল্টন। ‘আমি তোমাকে ফেলে দেব না’! মানে শাহানা এখন একটা অচল জিনিষ। ইচ্ছে করলে গার্বেজের মতো বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া যায়।

শাহানার ভাবনায় ছেদ পড়ে মিল্টনের ফোনের শব্দে। মুরাদ ফোন করেছে। ছোট ছেলেটা গাড়িতে কান্নাকাটি শুরু করেছে। ছেলেকে থামাতে লইয়ারকে বলে বের হয়ে যায় মিল্টন। 

পুরো ঘটনায় এতটাই স্তব্ধ হয়ে গেছে শাহানা যে ছেলের কান্নাও ওকে স্পর্শ করেনা। 

--আবার আমাকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলবেন?

ইংরেজীতে জানতে চায় শাহানা। লইয়ারের কথাগুলি মিল্টনের সঙ্গে মিলে যায়। শুধু সে যুক্ত করে, শাহানা যেহেতু আমেরিকার সিটিজেন, সেহেতু তার এই দেশে থাকার ব্যাপারে কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু নতুন স্ত্রী শুধু বিয়ের সার্টিফিকেট দেখিয়ে এখানে থাকার বৈধতা পাবে। 

শাহানা আরও বুঝতে চায়। সে নতুন স্ত্রীর কথা শুনতে চায় না। সে নিজের কথা শুনতে চায়। শুনতে চায় ওর সন্তানের ভবিষ্যতের কথা। 

--আইনত বৈধ না হলে আমি কি আমার স্বামীর বাড়ি-সম্পত্তি এসব পাব?

-- না এসব কিছুই পাবেন না। স্বামীর ওপর আপনার কোন অধিকারই থাকবে না। এই এখানে যে ফাইল দেখছেন, এসব আপনাদের ডিভোর্সের কাগজপত্র। এখানে বিনা শর্তে আপনি আপনার স্বামীকে আইনত ডিভোর্স দিচ্ছেন। এতে করে আপনার স্বামী তার নতুন স্ত্রীকে এদেশে আনার সুযোগ পাবে। 

ল ইয়ারের কাছ থেকে ফাইলটা চেয়ে নেয় শাহানা। তারপর নি:শব্দে ডিভোর্স লেটারের প্রতিটি কাগজ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়তে শুরু করে ও। দুর্ঘটনার পরে এই প্রথম নিজেকে কিছুটা ক্ষমতাবান মনে হয় ওর।

মিল্টন লইয়ারের রুমে ঢুকে অনেকগুলি ছোট টুকরো কাগজ পুরো মেঝেতে ছড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ