মোহাম্মদ কাজী মামুনের গল্প : বিনা টিকেটের সিনেমা



লোকটি ওযু সেরে মসজিদে ঢুকতে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটি দৃশ্য তাকে থামিয়ে দিল। দৃশ্যটি তার সামনে হলেও সন্নিকটে ছিল না, রাস্তাটার ওপারে সে রচিত হচ্ছিল। যদিও প্রাইভেট কার, আর রিকশার মেদ সেখানে পর্দা টেনে দিচ্ছিল, ঠেলেঠুলে দেখে যাচ্ছিল সে। দুটি ছেলে একটি কুকুরের পিছু নিয়েছে। ওদের বয়স দশ-এগারোর বেশী হওয়া উচিৎ নয়। উচ্চতা প্রায় সমান হলেও একজন একটু বেশীই শুকনো। ওদের একজন নিজের হাতটি লাঠির মত করে বানিয়ে তাক করেছিল কুকুরটিকে, আর ওতেই ভয় পেয়ে সে দৌঁড়ুতে শুরু করে। একটি ছেলে এক সময় কুকুরটির নাগাল পেতে সক্ষম হয়, আর ধাম করে হাতের লাঠিখানা বসিয়ে দেয় ওর পিঠে, মাথাটা একটুর জন্য মিস্‌ করে যায় সে। সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটি যে কিনা বাচ্চাদুটোকে ডজ্‌ দিতে একের পর এক দিক পরিবর্তন করে যাচ্ছিল, পিঠখানা সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, আর গগনবিদারি চিৎকারে আকাশ-বাতাস কাঁপাতে থাকে। এদিকে ছেলে দুটি যারা ভোঁ দৌড় দিয়েছিল কুকুরটির ঘাড় ঘোরানোর আভাস পেয়েই, তারাও জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে আর ভেংচি কাটতে থাকে। সেখান থেকেও ভেসে আসে গগনবিদারী আওয়াজ, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে!

একটা দীর্ঘশ্বাস ঘন হয়ে বাষ্পাকারে ছড়িয়ে পড়ে মসজিদের মার্বেল বাঁধানো চত্বরে, যেখানে লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল। একটা অসহায়ত্ব মূর্ত হয়ে উঠে তার চোখজোড়ায় – যানবাহনের বাঁধা সত্বেও পৃথিবীর একটি পরিষ্কার চিত্রগ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছিল যারা! আদব শেখেনি ছোঁকরাগুলি, আজকের জমানাটাই এমন, চুড়ান্ত রকমের নির্মম! যেন মায়ের পেটে বসেই দাঙ্গা হাঙ্গামা শিখতে থাকে বিচ্ছুগুলি! রসাতলে যাচ্ছে জগৎ! যারপরনাই হতাশা প্রকাশ করতে করতে মসজিদের সুদৃশ্য খিলানটাতে মাথা ঢুকিয়ে দেয় সে।

পরের দিন দুপুরে নামায শেষে সে ফিরে আসছিল সেই রাস্তাটা ধরে। একটি দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কিছু একটা খুব চেনা মনে হলে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। একটি পিঠ আর তার উপর একটি গেঞ্জি - কিছু মানুষ ও বস্তুর ভীড়ে যার একটি ফালিই শুধু ভেসে উঠেছিল তার চোখে। হ্যাঁ, এরকম জামাই পরে ছিল, কালকের ছেলে দুটোর একজন হবে; কিন্তু ভর দুপুরে করছে কী? আরও খানিকটা এগিয়ে মাথাটা গলিয়ে দেয় সে; উপায় নেই, এই উন্মুক্ত সিনেমাগুলি উঁকি মেরে, আর জামা-কাপড়-জুতোর নিপীড়ন সয়েই দেখতে হয়। আর সিনেমা হলে যাওয়ার অভ্যেস না থাকায় রাস্তাঘাটের বিনা টিকেটের সিনেমাগুলি খুব কমই মিস্‌ করে থাকে সে।

ছেলে দুটোর একজনের কোলে বসেছিল কুকুরটি, আর অন্যজন তাকে পাউরুটি খাওয়াচ্ছিল, দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসেছিল তারা। অস্তাগফিরুল্লাহ্‌ বলে লোকটি মুখ ঘুরিয়ে নিল সাথে সাথেই, একটা জান্তব আর বুনো গন্ধ তীব্র গতিতে ছুটে আসছিল তার দিকে। আরো তো কুকুর রয়েছে, কিন্তু একে দেখলে মনে হয়, এইমাত্র ড্রেনে ডুবিয়ে এসেছে। নোংরা কীটের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে বেড়াছে শরীর জুড়ে। এই নাপাক জীবকে এভাবে কোলে বসিয়ে আদর করে খাওয়ানো! কেউ একজন বলল, জীবটা অনেকক্ষণ রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছিল, হয়ত কোন অসুখ করেছে, কিছুক্ষণ আগে ছেলেদুটোর চোখে পড়ে। ছেলেগুলির মনে হয় কোন ফ্যামিলি নেই! বই পত্র শেঁকোয় তুলে সারাদিন রাস্তায় টো টো করে বেড়ায় এই জীবটার মতই। যতই দিন যাচ্ছে, ছেলেপুলেগুলো বেশী করে বখে যাচ্ছে!

আগের দিনের হতাশাটা মাথায় নিয়েই নিজের এক চিলতে উঠোনের ছিমছাম দোতলা বাড়িটিতে ঢুকে পড়ে লোকটি। বাড়িটি বানিয়েছিল চাকুরি-জীবনের মাঝামাঝি সময়ে। ছেলে-মেয়ে দুটো যে কদিন দেশে ছিল, অষ্টপ্রহর সরগরম থাকতো বাড়িটা। এখন সে, তার গিন্নি আর দারোয়ান ছাড়া কেউ থাকে না এখানে। এই মুহূর্তে অবশ্য গিন্নিও নেই। দিন কতেক হল, অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন তিনি ছেলের ঘরের নাতিকে পাহাড়া দেয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব কাঁধে চাপিয়ে। এই অবস্থায় ঘরকন্নার কাজ লোকটাকে একাই সামলাতে হয় অনেকটা। কাজের লোকজন আছে বটে, কিন্তু তাদের উপর কি ভরসা করা চলে?

প্রতিদিনের মত আজও ডাইনিং টেবিলটা ছিল ন্যাড়া। ভাতের সাথে একমাত্র তরকারিটা ভাল করে মেশানোর পর মুখে পুরতে যাবেন, হঠাৎ কেমন একটা পচা-বোটকা গন্ধ তার নাকে এসে ঝাপ্টা মারতে থাকে। মনে হয় গন্ধটা সেই রাস্তা থেকে তার সাথী হয়েছে। রাস্তার এই এক দোষ - সে সেজেগুঁজে বসেই থাকে না শুধু, সামনে দিয়ে যাওয়া পথিকের পকেটে নিজের কিছু পসরা সম্পূর্ণ ফ্রি-তে পুরে দেয়া চাই! লোকটির বমি বমি ভাব এল, কয়েকবার বেসিনে গলাটা নামিয়ে দিল, শেষ পর্যন্ত আর খেতেই পারলো না। পৃথিবীটাকে আরো বেশী করে নাপাক, নৃশংস, আর বসবাসের অযোগ্য মনে হত লাগলো তার!

পরদিন বিকেলে মসজিদের দিকে ধীরপায়ে হাঁটছিল লোকটি। হঠাৎ কিছু একটা তার পায়জামার কোনা ঘেঁষে বিপুল বেগে ছুটে গেল; সরতে গিয়ে সে ছিটকে গিয়েছিল প্রায়। কোনমতে তাল সামলে দেখতে পেল, একটি ছেলে, তার হাত ধরে রয়েছে। অন্য ছেলেটি কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কাছেই। ওদের সহায়তায়, না কি, নিজের প্রচেষ্টআয় ফিরে পেয়েছে দেহের নিয়ন্ত্রণ, তা নিয়ে কিছুক্ষণ মাথা ঘামালো সে। কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেলে, ছেলেদুটো মাফ চাইল! কিন্তু লোকটির সেদিকে কোন খেয়ালই ছিল না, সে একটা অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়েছে ততক্ষণে। গত দুদিন বারবার সংযোগ ঘটছে এদের সাথে - স্রষ্টার নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য আছে! এরপর গভীর চিন্তাক্লিষ্ট মুখে মসজিদের দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে রাস্তা ও পাদুকার তীব্র একটা সংঘর্ষ কানে এল; এক নজর চোখ বুলিয়ে দেখতে পেলে - ধুলো উড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে ছুটছে ওরা, রাস্তা শেষের বাঁয়ের গলিটা ধরতে তারা যেন পাল্লা লাগিয়েছে। গলিটার মুখে হঠাৎ ঝিলিক দিয়ে উঠল একটি কুকুরের ছবি, মেঘলা আকাশের বিদ্যুত ছটার মত। চলতে চলতেই ছেলে দুটো চেঁচাতে লাগলো, খিলখিল হাসির দমকও বিরতি দিয়ে দিয়ে ফুটতে লাগলো ফোয়ারা হয়ে।

সূর্যের পড়ন্ত আলো ছেলে দুটির মুখে অদ্ভুত দ্যুতি তৈরী করছিল; কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের সামনে এসে পড়া গলির মাথার বিরাট বাড়িটা, তার পেছনের মাঠটা, আর তারও পেছনের প্যাচ-প্যাচ জলাভূমিটা ধরে রেখেছিল যে সাদা মেঘের ভেলা, তাতে চড়ে তারা হারিয়ে গেল সাত সমুদ্দর ওপারে। সন্ধ্যে নাগাদ অবশ্য তাদের লাইন ধরে ফিরতে দেখা গেল - দলটির অগ্রভাগে ছিল একটি ফুটবল, আর তার ঠিক পিছু পিছু সেই কুকুরটা। ইতোমধ্যে কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে, তাই সাঝের আঁধারেও দলটিকে চিনে নিতে সমস্যা হল না লোকটির; মসজিদে নামাযের সময় হয়ে এলেও সে বোধহয় ঢুকতে বিলম্ব করছিল এই দৃশ্যটির জন্যই!

এরকম অতি সাধারণ কিছু দৃশ্যকে বলী দিয়ে একটি সপ্তাহ যখন তার মেয়াদ অতিক্রম করতে যাচ্ছিল, বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছিল লোকটি; কিছু নিত্য কেনাকাটা ও রাতের নামাযের উদ্দেশ্যে। চলতে চলতে হঠাৎ কুকুরটি নজরে এল তার। ছেলেদুটোর মতই খুব পরিচিত হয়ে উঠেছিল এই পশুটাও! রাস্তায় পড়ে চিৎকার করছিল সে, থেমে থেমে। আর কী সেই রক্ত হিম করা চিৎকার! লোকে বলাবলি করছিল, কোথাও থেকে হয়ত ঠ্যাঙ্গানি খেয়ে এসেছে। আঘাত নাকি মারাত্মক! যাক, ল্যাঠা চুকলো! এবার হয়তো নিস্তার পাওয়া যাবে নাপাক জানোয়ারটার দৌরাত্ম্য থেকে! কিন্তু বলা নাই, কওয়া নাই, হঠাৎ কোথা থেকে একটা ‘খটকা’ উড়ে এসে জুড়ে বসল, আর বিরতিহীন এক অস্বস্তিতে ফেলে দিল তাকে! জিনিসটা মাথায় থাকতে থাকতেই সে নামাযটা সেরে নিল, যদিও মনোসংযোগ বিপুলভাবে বিঘ্নিত হল। এরপর যখন সে বেরিয়ে এল মসজিদের গম্ভুজটা ছেড়ে, প্রাণিটার হাড় কাঁপানো চিৎকার আবার কানে এল, আগের থেকেও উচ্চগ্রামে। কয়েক কদম এগুতেই প্রথমবারের মত কুকুরটার চোখে চোখ পড়ে গেল তার, আর স্ফুলিঙ্গের মত ছেলেদুটো তার মনের পর্দায় ভেসে উঠলো। ওরা কোথায়? এতক্ষণেও খবর পায়নি যে তাদের বন্ধুটি রাস্তায় পড়ে? কিন্তু খবর কি কেউ কখনো দেয় ওদের? ওরাই না খবর করে রাস্তায় পড়ে থেকে সারাটা দিন? তাহলে? আচ্ছা, পরীক্ষা-টরিক্ষা নয়তো? না কি, বাসা পালটেছে? চলে গেছে অন্য পাড়ায়?

যাক্‌! এসব নিয়ে তার মাথা ঘামানোর কী দরকার! পথের কুকুর, কি করার আছে তার? আর থাকলেও কেনই বা তার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে যাবে সে? ও ওর মত পড়ে থাকুক, সেরে উঠুক, খাক, দাক, ঘুমোক, বা, মরুক! ভাবতে ভাবতে লোকটি বাসার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল; হঠাৎ ভিন্ন একটা চিন্তা ধেয়ে এল, আর ঘাঁটি গেড়ে ফেলল তার মাথাটায় মুহূর্তের মধ্যে। আচ্ছা, এতটা সময় ধরে কুকুরটার পাশে কেউ দাঁড়ায়নি, তার মানে, কারো কোন আগ্রহ নেই একে সারিয়ে তোলার। সেক্ষেত্রে রাতের বেলা জন্তুটা ঐ চক্রটির হাতে পড়বে না তো যাদের কথা কয়দিন আগেই পত্রিকায় পড়েছে? ঐ যে আহত কুকুরের খোঁজে থাকে এক দল নিশাচর! ধরে নিয়ে জবাই করে খাসির মাংসের সাথে একটু করে মিশিয়ে দিতে পারলেই হল, তিনগুন মুনাফা পাক্কা!

আশংকা, বিতৃষ্ণা, বিশ্বাদ – সব দলা পাকিয়ে যেতে লাগলো লোকটির মাথায়। অনেকক্ষণ এভাবে থাকার পর একটা প্রত্যাদেশ নেমে এল যেন তার উপর, আর সে ঘুরতি পথ ধরে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলো। আর যতই এগুতে লাগলো সে, গতি বেড়ে চলল। আচ্ছা, মিস্‌ হয়ে যাবে না তো? দুষ্ট চক্রটির হাতে পড়ার আগেই পৌঁছুতে পারবে তো? তার বুকটা ঢিবঢিব করতে থাকে, হৃদপিন্ডটা লাফাতে থাকে সজোরে! শেষ কবে এতটা দ্রুত হেঁটেছে, মনে করতে ব্যর্থ হয় সে।

উট্‌কো কিছু ঝামেলা বাড়বে ঠিকই, হয়তো ওযুর সময় হাত-পা-মুখ-নাক একটু বেশী কচলাতে হবে, হয়তো সাবান-সুগন্ধির প্রয়োজন পড়বে, চোখের সামনে হয়ত একটা নাপাক জীব জিহ্‌বা নাড়তে থাকবে আর লালা ঝরতে থাকবে অনর্গল; কিন্তু কিছু লোককে তো হারাম খাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে! সেক্ষেত্রে যে সওয়াবটুকু মিলবে, তার তুলনায় এই কষ্টটুকু তো কিছুই নয় - ভাবতে ভাবতে লোকটি যখন কুকুরটি কোলে করে বাড়িতে ঢোকে, কেমন এক যুদ্ধ জয়ের আনন্দ হয় তার! তার সব আশংকাকে মিথ্যা প্রমাণ করে কুকুরটি তখনো চেঁচিয়ে যাচ্ছিল, যখন সে তার কাঁপা কাঁপা হাতটি রেখেছিল ওর নোংরা পিঠটাতে।

বাড়িতে ঢোকার পর কুকুরটি চিৎকার আরো শক্তি সঞ্চয় করেছিল, আর বিপুল বেগে আছড়ে পড়ছিল এর জীর্ণ সব ইট-পাথরে। ক্ষতটা মনে হয় বাড়ছিল। লোকটি এক সময় টিকতে না পেরে পাশের বাড়ির ডাক্তার মাসুদকে ফোন করলো। এরপর একটা মলমের নাম লিখে নিতে তাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল, কারণ ফোনের ওপার থেকে মাসুদ সাহেব কথার বিপুল ঝড় বইয়ে দিচ্ছিলেন, যার সারমর্ম ছিল, তিনি পশুর ডাক্তার নন, আর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়। এদিকে মালিশটা লাগানোর সময় কুকুরটি যে হারে রক্তহিম করা চিৎকার ছুঁড়ছিল, মনে হচ্ছিল, সময় ঘনিয়ে আসছে দ্রুত। কিন্তু কুকুরটার কাতরানি মিনিট কতেকের মধ্যেই ঠান্ডা হয়ে এল। আর একটা অদ্ভুত স্বস্তি ফুটে উঠলো লোকটির চোখে-মুখে! কিছুটা সময় কেটে গেলে, তার মনে পড়লো জন্তুটা অভূক্ত। একটি পাউরুটি জেলিতে মাখিয়ে যখন মুখের উপর ধরল, নড়েচড়ে উঠলো ওর শীর্ণ শরীরখানা।

পরদিন সকাল। বিচিত্র বর্ণের আলোক রশ্মিরা তার জানালা দিয়ে দল বেঁধে এসে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে গেল – আচ্ছামত একটা ঘুম এসেছিল, গত সন্ধ্যে থেকে যা গেছে! লোকটি দাঁত মাজতে মাজতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো, সোনালী রোদের মুক্তোয় চিক্‌ চিক্‌ করছে চারপাশ। কেমন একটা ফুরফুরে হাওয়া বইছে থেমে থেমে, আলতো করে দুলছে বিশ্বচরাচরের সব পর্দা – তারই একটিতে হঠাৎ ভেসে উঠলো একটি কুকুর, আর দু’টো দশ-এগারো বছরের ছেলে।

ভীষণ চমকে গিয়েছিল লোকটা! আচ্ছা, কুকুরটা বেরুলো কি করে? সদরদরজায় তো তালা ঝুলানো ছিল। সদরদরজাটার নীচের এক বিঘত ফাঁকটির দিকে চোখ চলে যেতেই তার ঠোট দুটোও ফাঁক হল আকর্ণ এক হাসিতে। তবে কুকুরটির থেকেও ছেলেদুটি তাকে অবাক করেছে বেশী! কোথা থেকে উদয় হল ওরা ভোজবাজির মত? ওরাও কি বন্দী ছিল কোথাও? কুকুরটার মত? বেরিয়েছে এমন কোন ফাঁক দিয়ে, যার উপর ছিল বিশাল সাইজের লোহার দরজা?

লোকটি আবার পর্দাটার দিকে তাকালো, কুকুরটা তার বাড়িটা থেকে অনেক দূরের একটি সাদা বাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে, ছেলে দুটো আবার ভোঁ দৌঁড় লাগিয়েছে, ছুঁয়ে ফেলতে গিয়েও পিছিয়ে যাচ্ছে তারা একে অপরের থেকে! আস্তে আস্তে তারা মিলিয়ে যাচ্ছে গলির ফাঁকে, পর্দার বাইরে! হঠাৎই যেন শেষ হয়ে গেল সিনেমাটা! কেমন একটি অতৃপ্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে লোকটির মধ্য থেকে!


লেখক পরিচিতি
মোহামদ কাজী মামুন
শরিয়তপুরের জাজিরায় বাড়ি। 
বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। 
গল্পকার। প্রবন্ধকার। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ

  1. খুব সুন্দর লিখেছ মামুন

    উত্তরমুছুন
  2. তোমার বিষয় নির্বাচন সবসময় তাক লাগিয়ে দেয়। পর্যবেক্ষণ বড় ভালো, তীক্ষ্ণ তোমার।

    উত্তরমুছুন
  3. সুন্দর গল্প। বর্ণনার গুণে ছবির মত ফুটে উঠল দৃশ্যগুলো।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালো লাগলো। বিষয় বৈচিত্রে মুগ্ধ হলাম।

    উত্তরমুছুন