কিযী তাহনিনের গল্প : নগরে নিখোঁজ সংবাদ



এ নগরে নাকি কোন পাখি মরে না। কেউ দেখেনি তো মরে যেতে। অনেকদিন। নগরের মূল প্রশস্ত রাস্তা একটিই। তার শেষ মাথায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সামনে যতদূর চোখ যায়, তাতে মরিচ লাল, ডিমের কুসুম আর গাঢ় সবুজ রঙা শুকনো চ্যাপ্টা পাতার মতন দেখতে তিন রঙের ফুল গাছের সারি। একটার পর একটা। পথের দু'পাশ ধরে। প্রায় পাঁচ তলা দালান সমান গাছ নগরের পথের পাশ জুড়ে। আর তাকে ছাতার মতন জাপ্টে রেখেছে তিন রঙের ফুলেরা। আর সেই ফুল থেকে যে আরাম শীতল জলের মতন এক ঝিরঝিরে সুগন্ধ, ঘন রোদ কিংবা বৃষ্টির ফোঁটা আর ভোরের কুয়াশায় মিশে মেখে যায়, তাতে আর এ নগরের জন্য আলাদা সুগন্ধের প্রয়োজন পরেনা। এ নগরের মানুষের জন্য ও নয়।

এমন কোন এক ঝিরঝিরে সুগন্ধি দিনে, পথের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, মুগ্ধ সময়ে, প্রধান নগরকবি এ নগরের নাম দিয়েছিলেন পপৌরি।

এই নগরের পাখিরা, যারা নাকি মরেনা, ওই ফুল গাছের ছাতার মতন মাথায় ঘুরে ঘুরে উড়ে, এবড়ো থেবড়ো ডালের গায়ে দু'পায়ে শক্ত বসে তারা দিন কাটায়। জনজীবনেও তারা ডানা ঝাপ্টে ঘুরে বেড়ায়। ওই যে দালানগুলোর সামনে এক চিলতে উঠোন, সেখানে, কিংবা যে আদি পেস্ট্রি আর মিষ্টির গোলাপি দোকান আছে, তার সামনেও বেশ দিন কাটে তাদের। মানুষের জীবন, পাখির জীবন যে যার মতন, সুগন্ধি নাগরিক জীবনের অলিতে গলিতে ঘুরপাক খায়, দ্বন্দ্বহীন।

কমলা রঙে, গাঢ় নীল ঠোঁট, কুঁচকুঁচে কাল চোখ। এক হাত সমান লম্বা, আর মেলে দেয়া কমলা ডানা। কেমন ঘোর জাগে পাখিদের দিকে তাকিয়ে থাকলে। একবার বহুদিন আগে, ডুবি ডুবি বৃষ্টির দিনে, গাছের তলে ছোট্ট জল জমা গর্তে শরীর মেলে বসে ছিল এক পাখি। নগরপ্রধানের কন্যা সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। দেখে বলে উঠেছিল, "ওমা কেমন জাফরানি রং, যেন জাফরান গোলানো।" সেই থেকে বহু দিন ধরে এই পাখি লোকমুখে জাফরানি নামেই পরিচিত।

এই হল সেই নগর। পপৌরি। জন্ম থেকে বেঁচে থাকা, মৃত্যু অবধি, সুগন্ধ নির্ভর। তাতে বৈচিত্র্য আছে, তীব্রতা আছে, মধু আছে। আর সবকিছু বাকি নগরগুলোর মতনই। তবু কেমন যেন পপৌরি খানিকটা অন্যরকম। গতি আছে, কিন্তু তাড়া নেই। অপেক্ষা আছে, কিন্তু ধৈর্য্যের সীমানা অতিক্রম করে নয়। আর আছে মাধুর্য। বড্ড ফুরফুরে, হালকা, আরাম।

নগরের মূল যে রাস্তায় গাছের সারি, তার প্রথম ডান দিকে বড় রাস্তাখানা চলে গেছে, সে রাস্তার নাম ডালিম গাছের মোড়। মূল রাস্তার ডান দিকে মোড় নিলেই, ঝোপ ধরে ডালিম গাছ। তাতে লাল ডালিম ফলে। নগরের সৌন্দর্যবর্ধন যে কমিটি, তারাই দেখভাল করে। মাটিতে টুপটাপ দুই একটা পড়লে পথ চলতে কেউ কুড়িয়ে নেয় বটে ডালিম। গাছ ছিড়ে নেয়না কেউ। শোনা যায়, নগরপ্রধানদের বিদেশী অতিথিদের শরবতে ব্যবহার করা হয়। আর বাকিটা বাজারে বেচা হয়, সেই টাকা নগরের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যবহার হয়। তাই এ ডালিমগাছগুলো এ নগরের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, এমনকি ডালিমের নামেই রাস্তার নাম হয়ে হয়েছে বেশ। আর এ রাস্তার শেষ মাথায় এ নগরের মূল ব্যাংক। কর্পোরেট অফিস, ঝা চকচকে। পুরো দালানজুড়ে ব্যাংকের কর্যক্রম চলছে। ভেতরে বাইরে কেমন বেগুনি আভা। নগরের শ্রেষ্ঠ স্থপতির নির্মাণ, বেগুনি রঙের এমন খেলা খেলেছেন, যেন আস্ত ল্যাভেন্ডার বন। কেটেছেঁটে সাজানো বন। গাঢ় হতে হতে নিভে যাওয়া বেগুনি যেখানে যেমন প্রয়োজন ঠিক তেমন। টাকার জমা-খরচ হিসেবে মিলিয়েও মানুষজন বেশ একটু নিচের বসবার জায়গায় বসে চারপাশ হেঁটে ঘুরে তবে ব্যাংক থেকে বের হয়।

একতলায় অপেক্ষার জন্য বেশ বড় এক খোলা জায়গা। যেখানে দিব্যি বসে অপেক্ষা করা যায় ডাক আসবার জন্য। আর তারপর কাঁচের দেয়ালের ওপারে রয়েছে ক্যাশ কাউন্টার। পাঁচ তলা দালানের প্রথম দুটো তলা লেনা-দেনার জন্য। আর উপরের তিন তলা জুড়ে বড় কর্তাদের অফিস, মিটিং রুম, ডাইনিং রুম। একটি বড় আধুনিক অফিসে যা থাকে তার চেয়ে কমতি কিছু নেই। বরং বেশিই আছে। আর আছে সুগন্ধ। বেগুনির যদি কোনো স্ব-ঘ্রাণ থাকে, তবে তা আছে এখানে। আর এখানে কাজগুলো মানুষগুলো ফিটফাট মানানসই, রঙে গন্ধে বর্ণে।

তবে গতকাল থেকে কোথাও কোন ছন্দপতন হয়েছে। কী, সেটা বোঝা যাচ্ছেনা। কাল শুরু হল এভাবে। এক গুরুত্বপূর্ণজন এসেছিলেন। এই ব্যাংকে তার জমা টাকার পরিমাণ, ওই সামনের কাউন্টারে বসে থাকা মানুষের সারাজীবনের সঞ্চয়ের চেয়েও ঢের বেশি। তিনি জানিয়েই আসেন। সময় যতটুকু প্রয়োজন তার চেয়ে বেশি সময় ক্ষেপণ করেন না। দ্রুত আসেন দ্রুত যান। তাঁকে সূর্য বানিয়ে, চারপাশে চাঁদ-তারার মতন ঘিরে থাকে মানুষজন। কাল এসেছিলেন। তবে কাজ সেরে দ্রুত ফিরে যেতে পারেননি। ফিরে যাবার জন্য মূল দরজার কাছে যেয়ে ধুপ করে পরে গিয়েছিলেন। বড্ড হল্লা হল চারপাশ জুড়ে। ব্যাংকের মোটা মাইনের যে চিকিৎসক আছে, বহুদিন পর তার কাজ হল একটা। ব্যতিব্যস্ত হয়ে এই-সেই করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরানো হল গুরুত্বপূর্নজনকে।
বললেন, "ঝামেলা। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ব্যাংকে তো ঝামেলা হচ্ছে কোন। কেমন দম আটকে ফেলা এক অচেনা বাতাস। দেখেন দেখেন, কী হল ব্যাংকে। আগে তো হয়নি কখনো।"

কেউ অবশ্য তেমন অন্যরকম বাতাসের আভাস বুঝলোনা। তবু এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ অসুস্থ হয়ে পরলেন। তিনি বললেন ঝামেলা আছে । চারপাশে সবাই ঝামেলা খোঁজা শুরু করল। কিছু পাওয়া গেলনা। গুরুত্বপূর্ণজন থিতু হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। বাকি দিন ঠিকঠাক চলল।

আজ আবারও শুরু হয়েছে। একটা ঝামেলা। কী ঝামেলা, কেউ বুঝে উঠতে পারছেনা। কিছুটা অন্যরকম। দিন শুরু হল, ঠিক করেই। কিন্তু ক্রমে গতি মন্থর হচ্ছে। কাজে, ভাবনা জগতে, শক্তিতে। বেগুনি রং পুরো দালান জুড়ে ফিকে ফিকে লাগে। কেউ বুঝে উঠতে পারেনা কেন। দুপুরের দিকে টুকটুকে লাল রং মাখানো ঠোঁটের এক পুরোনো ক্লায়েন্ট ভদ্রমহিলা ক্যাশ কাউন্টারের কাজ সেরে ফিরবার পথে যে স্বগোক্তি করলেন, "বড্ড গুমোট, নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে যেন", তা পাশে থাকা ম্যানেজারের কান ছুঁয়ে গেল।
"ঠিক কীরকম সমস্যা ,বুঝতে পারছেন ম্যাম?" কর্পোরেট মাখুনে গলায় প্রশ্ন করলেন ম্যানেজার।
টুকটুকে ডালিম লাল ঠোঁট গোল করে তিনি বললেন, -"নাহ, আমি জানিনা, সেতো আপনারা বুঝবেন। তবে খুব বাজে।"

বড় চিন্তার কথা। কপালের ভাঁজ টানটান করবার চেষ্টা করতে করতেই, আবারও চিন্তায় খ্যাচ টান খেল ম্যানেজার। হলটা কী? তার এতবড় টিম কেউ বুঝে উঠতে পারছেনা। ম্যানেজার তো ভবিষ্যত দেখতে পারেনা। নইলে সে জানত, কপালের ভাঁজ দাগ বসাতে চলেছে বহুদিনের জন্য। এবং আগামীকাল থেকেই ঘটনা শুরু হবে।

আজকে সেই আগামীকাল। যেদিন সকাল থেকেই সবাই নাক কুঁচকে, ভ্রু ছড়িয়ে আছে, টেনে টেনে হাঁটছে। খুব বাজে সেই ঘটনা খুঁজে পাওয়া গেছে। কিন্তু ঘটনার বাজে কারণ এখনো খোঁজা হচ্ছে। সকালে বনমালী এল, দালান ঝাড়পোঁছ করতে। সাথে তার তিন সহকারী। সকালে দপ্তর শুরুর আগে, সবকিছু ঝেড়ে মুছে সুগন্ধ মেখে দিতে হয়। বাকি দিনে ভাগে ভাগে পরিষ্কার চলে, যখন প্রয়োজন। আজ সকালে এসে বনমালীর সাথে কাজ করা নতুন ছেলেটিই ঘটনা খুঁজে পেল। "ও বনমালীদা কেমন বিচ্ছিরি গন্ধ চারপাশে। এতো বেগুনি গন্ধ নয়।"

দুদিন ধরে খুঁজতে থাকা ঘটনা, ছেলেটি ঠিক বলামাত্র যেন সামনে এসে দাঁড়াল। কী অপরিচিত গন্ধ। বেগুনি নয়, ভাল তো নয় মোটেও। চারপাশে থেকে সেই রংহীন তীব্র ঘ্রাণ যেন ঘিরে ধরল বনমালী আর তার দলের বাকি তিনজনকে। সুগন্ধি রেশমি রুমাল নাকে চেপে তারা খুঁজতে লাগলো, গন্ধের উৎস। নাহ কোন ময়লা নেই, আবর্জনা ধুলো এ দালানে অপরিচিত। নেই, তবে? কোথেকে? একতলায় তীব্র। দোতলায় গন্ধ আছে। উপরের বাকি তলায় এখনো হালকা গন্ধ। তবে ভেসে যাওয়া সেই বেগুনি গন্ধ এই দালানের আর কোথাও নেই। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।

ব্যাংক খোলার এক ঘন্টা আগে সাধারণত বাকি কর্মচারীরা অফিসে প্রবেশ করে। চা কফি কিংবা কেউ বেদনার দানা চেপা লাল শরবতের গ্লাস হাতে সারাদিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। আশপাশ টুকটাক গুছিয়ে নেয়। প্রতিদিনকার মতন ম্যানেজার আসল প্রথম। বনমালী তাকে সব জানাল। না জানালেও জেনে যেত চারপাশ মেখে থাকা থিকথিকে অচেনা গন্ধে। প্রথম জানল ম্যানেজার তারপর বাকি কর্মচারীরা। শেষে প্রধান হর্তাকর্তারা। বালতি ভরা তিনরঙা ফুল ভেজানো জল দিয়ে পুরো দালান মুছে, সুগন্ধি ঢেলে বিদঘুটে গন্ধ চাপা দেয়ার এক আপাত ব্যবস্থা করা হল। উপরের তলাগুলোর হালকা গন্ধ, একরকম চাপা পরেছে। ক্যাশ কাউন্টার ডিপার্টমেন্টের কিছু অফিসারের যে আজ দিনব্যাপী ট্রেনিং তাদের একতলার বদলে পাঁচতলায় বড় স্যারদের রুমগুলোর পাশে যে কনফারেন্স রুম সেখানে পাঠিয়ে দেয়া হল। আর ব্যাক অফিসের সকলে, দোতলা থেকে পাঁচতলা, এখানে ওখানে বসে দিনের কাজ করল। একতলার ক্যাশ কাউন্টারের বাকি কিছু অফিসার, আর গার্ড পিওন রুমালে মুখ চেপে কোনরকমে কাজ করল। আর প্রতিদিনের কাস্টমাররা বিদায় নেবার পর আসল । বিকেল থেকে রাত অব্দি চলল, একতলার গন্ধ মোছার কাজ। গন্ধ মুছে, অফিস বন্ধ করে সবশেষে বিদায় নিল ম্যানেজার আর বনমালী।

পরদিন একদম সকাল সকাল এসে ম্যানেজার আর বনমালী শুঁকে শুঁকে পরীক্ষা করে, দালানের এখান ওখান। একতলায় আগের মতন গন্ধ নেই। বলতে গেলে পুরোনো বেগুনি গন্ধ ফিরে না এলেও, আলগা কোন বদগন্ধ নেই। নিশ্চিত হয় তারা। নিচতলা সামলে, উপরে উঠল বনমালী। বড় কর্তারা আসবার আগে সব পরিষ্কার করতে হবে। দুদিন ধরে আর সহকারীদের হাতে কাজ ছাড়লে চলছেনা। সব কলা কৌশল ঢেলে নিজেকেই পরিষ্কারের কাজে নামতে হচ্ছে। ম্যানেজার খানিকটা নিশ্চিত হয়ে কফি নিয়ে নিচতলার কাস্টমার ওয়েটিং রুমে বসে। মাত্র ভোর ফুটেছে, অফিসে লোকজন আসতে ঢের দেরি। বনমালী পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, "স্যার, বড্ড গন্ধ, ওপর তলাগুলো যেন পঁচা গন্ধে ভেসে যাচ্ছে। এখন কী হবে?" সেদিনের সে চিন্তার ভাঁজের দাগ আজ আরো গভীর হয়ে উঠল ম্যানেজারের কপালে।

এর পরের ঘটনাগুলো আসলে বেশ গন্ধময়। থিকথিকে অচেনা গন্ধ। এবং সেই গন্ধময় গল্পের বেচারা নায়ক হয়ে উঠল ব্যাংকের এক তলার কোণায় ৯ নম্বর ক্যাশ কাউন্টারে বসে মাথা গুঁজে কাজ করা একজন মানুষ - ফিরদৌস বোধাতীত। সেদিন যখন উপরের তলাগুলো গন্ধে গন্ধে থিকথিকে, নামকরা ক্লিনিং সার্ভিস কোম্পানি এসে তাদের যন্ত্রপাতি, রং, কৌশল দিয়ে কারণ খুঁজতে লাগল। সেদিন একতলায় তুলনামূলক হালকা গন্ধ। সুগন্ধি ছিটিয়ে তিন রঙের ফুল ভেজানো জল ছিটিয়ে গন্ধ আপাত সামাল দিয়ে কাজ চলল দিনের লেনা-দেনার। হর্তা কর্তারা একতলার কনফারেন্স রুমে ঢুকে, আলোচনা করছিলেন। কী করা যায়? চারপাশে অস্থির পরিবেশ। উপরের তলার কর্মচারীরা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। বসবার জায়গা নেই। কাস্টমাররাও এতো ভিড়, গন্ধ, পরিষ্কারের ঢামাঢোলে বিরক্ত অস্থির। অবশেষে হর্তাকর্তাদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত ব্যাংকের বাইরে ঝুলিয়ে দেয়া হল - "আগামী দুদিন এই ব্যাংকের সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। সাময়িক এ অসুবিধার জন্য কতৃপক্ষ আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।" এ দুদিন ডিপ ক্লিনিং চলবে।

দুদিনের ডিপ ক্লিনিং শেষে ঝকঝকে অফিসে সবাই ফিরে এসেছে। গন্ধ নেই, নতুন রং, নতুন বেগুনি সুগন্ধ, কড়া কিন্তু স্বস্তির। মন পাক তোলে - আসন্ন প্রেমের মতন ফুরফুরে। কাজ চলছিল ব্যাংকের ঠিকঠাক। সকাল ১১টার দিকে ৮ নম্বর কাউন্টারে বসা নতুন মেয়েটি এসে ম্যানেজারকে জানাল - গন্ধ কিন্তু ফিরে আসছে।
উফফ আবার ও কপালে দাগ বসানো দিন, "কীভাবে সম্ভব?" শরীরের তিরতিরে চিন্তার কম্পন সামলে প্রশ্ন করলেন।
চটপটে নতুন মেয়েটি শান্ত গলায় বলল, "আমার পাশের কাউন্টার নম্বর ৯। ওখান থেকে আসছে। আসলে ওখানে যিনি বসেন তার থেকে।"
-" ঘাম? ঘামের গন্ধ এত .. "
"নাহ, তা নয়। উনার শরীর থেকে গন্ধ আসে, আমি আজকে স্পষ্ট বুঝতে পারছি। এ ক'দিন ক্যাশ কাউন্টারের অনেকেই ট্রেনিঙে ছিলাম তো উপরের ফ্লোরে, উনিও ছিলেন। দেখলেন না উপরের ফ্লোর কেমন গন্ধে ভরে গেল মাঝে, উনার কারণেই। আগে বুঝিনি, আজকে স্পষ্ট .. .. "
"আ আচ্ছা, আপনি যান। কাউকে কিছু বলেন না। আমি দেখছি।"

ম্যানেজার ধীর পায়ে যেয়ে দাঁড়ায় কাউন্টার নম্বর ৯ এর সামনে। আধা কাছের এক ছোট্ট কাঠের পার্টিশনের ওপারে মন দিয়ে টাকা গুনছেন - ফিরদৌস বোধাতীত। তার আঙুলের ফাঁক গলে, চুল ঠোঁট এপাশ ওপাশ শরীর থেকে কেমন ভেসে আসছে সেই থিকথিকে অচেনা গন্ধ, যা গেল কদিনের সবচেয়ে চেনা গন্ধ হয়ে উঠেছে। যার শরীর জুড়ে এমন গন্ধ, সে কিন্তু স্থির মনযোগে কাজ করছে। নিজের শরীরের গন্ধ সে পাচ্ছেনা?

ঠিক এই প্রশ্নটাই করলেন ম্যানেজার ফিরদৌস বোধাতীতকে তার নিজের রুমে ডেকে। ভেবেছিলেন অন্য গল্প করতে করতে মূল প্রসঙ্গে আসবেন। সকালে কি নাস্তা খেলেন? এমন ধরণের কোন আলাপ দিয়ে। কিন্তু এই কপালের দাগ স্বস্তি দিচ্ছেনা একটুও। তাই প্রথম প্রশ্নেই তীর ছুঁড়লেন।

"স্যার আমি নিজের শরীরে তো কোনো গন্ধ পাচ্ছিনা।"
-"আপনি বুঝতে পারছেন, আপনার শরীরে যে গন্ধ, সে গন্ধ পুরা অফিসে ছড়িয়ে পরেছে?"
"জ্বি আপনি বললেন তো এখুনি।"
-"তার আগে বুঝেননি?"
"আমার শরীরের গন্ধ বুঝিনি।"
-" অফিসে গন্ধ পেয়েছেন?"
"পেয়েছি।"
-"কিন্তু বুঝতে পারেননি, সে গন্ধ আপনার শরীরে আছে?"
"না।"
- "কীভাবে সম্ভব?"
"আমাকে আগে কেউ বলেনি আমার শরীরে গন্ধ।"
-"কেন আপনার বাসার লোক, রাস্তার মানুষ, বন্ধু বান্ধব?"
"জ্বি না, আমি বাসায় একা থাকি, আর হেঁটে বাসায় ফিরি। খুব কাছে বাসা। বাসা থেকে খুব একটা বের হইনা।"

মিটিং বসে। অনেক আলোচনা হয়। ফিরদৌস বোধাতীত এর কাজের ট্র্যাক রেকর্ড দেখা হয়। তার বয়স একত্রিশ। সে একজন মধ্যম মেধা মানের কর্মচারী। চার বছর আগে এসেছে। ট্রেইনী হিসেবে। এখন ক্যাশ কাউন্টারে কাজ করে। তার সাথে অনেকে আরো উঁচু পদে উঠেছে। সে উঠেনি। কিন্তু নামেও নি। ঠিকঠাক কাজ করে। যে ভুলচুক আছে ট্র্যাক রেকর্ডে, সেটা সবারই থাকে। খোঁজ খবর করে জানা গেল, ক্যাশ কাউন্টারে ৫ এর রইসুল ইসলামের সাথে তার একটা সখ্য আছে। সেটাও অফিসের মধ্যে। রইসুল ইসলাম তার বাড়ি চিনে। কখনো যাওয়া হয়নি। অন্য সহকর্মীদের সাথে ঝামেলাহীন সম্পর্ক।

বেগুনি দালানের এ ব্যাংকের হর্তাকর্তারা ভীষণ বিপদে পড়েন ফিরদৌস বোধাতীতকে নিয়ে। অনেক প্রশ্ন মনে। সমাধান কেউ জানেনা। ফিরদৌস বোধাতীতও নন। তিনি তো চার বছর ধরে কাজ করেন। তবে এই গেল ক'দিনে কি হল এমন হল যে, সে এমন অচেনা গন্ধের উৎস হয়ে উঠলেন? অসুখ কি কোন? ব্যাঙ্কের মোটা মাইনের ডাক্তার নানা ধরণের পরীক্ষা করে উল্টে পাল্টে কারণ খোঁজার চেষ্টা করলেন। ফিরদৌস বোধাতীতকে বসানো হল কাঁচের দেয়াল ঘেরা এক ঘরে। কাঁচের ওপারে দূর থেকে ডাক্তার চিকিৎসা চালালেন বেশ কদিন। তিন রঙা ফুলে থেকে যে নির্যাস তৈরী হয়, স্নানের আগে পরে, শরীরের ভাজে তা ব্যবহার করে দেখা হল। গন্ধ যায়না। রক্ত, ত্বক, চোখ সবকিছুই। গন্ধের উৎস খুঁজে পাওয়া যায়না। ঘামের উৎকট গন্ধ কমানোর চিকিৎসা ডাক্তার জানেন। প্রয়োজনে দু একটা শল্যচিকিৎসাও হতে পারে। কিন্তু ফিরদৌস বোধাতীত তো তেমন ঘেমে ওঠেন না। অনেক্ষন ভ্যাপসা গরম ঘরে বসিয়ে রাখলে স্বাভাবিক বিন্দু বিন্দু তাপের ফোটা কপাল জুড়ে - তার আর আলাদা কী চিকিৎসা হতে পারে? হলনা কাজ। তবে ডাক্তার একটা গুরুত্বপূর্ণ সত্য খুঁজে পেল - ফিরদৌস বোধাতীতের শরীর থেকে যে গন্ধ ছড়িয়ে পরে চারপাশে, সেটি স্থায়ী হয়না। প্রচুর ঘষামাজা করে পরিষ্কার করতে হয় বটে। কিন্তু চলে যায়। সে আসলে, গন্ধ আবার ফিরে আসে। আর এই গন্ধ ফিরদৌস বোধাতীত বাদে আর কারো শরীরে খেলা করেনা।

তবুও, একজন অজানা গন্ধে অসুস্থ মানুষের কারণে, প্রতিদিন এই বিশাল দালান প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘষামাজা করতে হবে, এমন সম্ভব নয়। সেই মানুষ সাধারণ মানের প্রয়োজনীয় এই ব্যাঙ্কের জন্য। তবে ব্যাঙ্কের লোকজন নিজেরা কানাঘুসা করে যে, হর্তাকর্তাদের এমন অসুখ হলেও, ব্যাংক একই ব্যবস্থা নিত। অসুখ হলে সবাই অপ্রয়োজনীয়। তবে এই গন্ধ সমস্যা অসুখ কিনা, সেই সংশয় মাথায় রেখে, ব্যাংকের স্বার্থে, ফিরদৌস বোধাতীতকে বেতনসহ একমাসের ছুটি দেয়া হল।

বেতনসহ এমন ছুটি পেয়ে, ফিরদৌস বোধাতীত খুশি হলেন কিনা সন্দেহ। কারণ সে ছুটি সংক্রান্ত চিঠি পেয়ে ম্যানেজার কে প্রশ্ন করল, "এক মাসে কী আমার এ গন্ধের সমাধান হবে?"
ম্যানেজার খানিকটা বিরক্তি চেপে উত্তর দেয়, "আপনি নিশ্চিত গন্ধ যাবেনা?"
ফিরদৌস বোধাতীতের বলাতে কোন তীক্ষ্ণ খোঁচা নেই, আছে সরল কৌতুহল " আমি নিশ্চিত না স্যার। আপনি?"
ম্যানেজারের সরলতার সময় নেই অত। কদিন ধরে বড্ড ভোগাচ্ছে এই লোক, মুখে রুমাল চেপে বিরক্ত স্বর না লুকিয়ে বলে, " না আমি ভবিষ্যত দেখতে পাইনা। তবে একমাস সময় দেয়া হল,আপনি খুঁজে বের করুন কারণ। আপনার সমস্যা। সমাধান করুন।"

ফিরদৌস বোধাতীতের ফিরে আসে তার ৯ নম্বর ক্যাশ কাউন্টারে, কাজ গুছিয়ে সহকর্মীদের দূর থেকে কাগজপত্র বুঝিয়ে এক মাসের জন্য অফিস থেকে বিদায় নেয়। তার ধরে কাছে ঘেঁষে না কেউই। যারা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল আশপাশ থেকে, তারা বুঝেছে, ফিরদৌস বোধাতীতের ভেতরে বাইরে হতাশ ভাব নেই। স্বাভাবিকভাবে বিদায় নিয়েছিল সবার কাছ থেকে। যেন বেতনসহ এমন অকস্মাক ছুটি অহরহ ঘটে থাকে। আর তার প্রায় পনেরদিন পরই নগরপিতার দপ্তরের এক বড়কর্তা ফিরদৌস বোধাতীতের খোঁজ নিতে আসেন এ ব্যাংকে।

অল্প সময়ের নোটিস দিয়েই সেই বড়কর্তা ব্যাংকে এলেন। সেই অল্প সময়েই বাড়তি ঝাড়পোছ করে দালানটাকে আরো বেগুনি করে ফেলা হল। এ দালান থেকে ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের গন্ধ মুছে গেছে। কথা বলবার বিষয় হিসেবে ফিরদৌস বোধাতীত এখনো রয়ে গেছে। এই যে দুপুর শুরুর আগে বড়কর্তা এলেন সেই প্রসঙ্গেই। অল্প কথার মানুষ তিনি, অনেক কাজ। ছোট্ট করেই বিশাল এক কাজের কথা সারলেন।
"কে এই ফিরদৌস বোধাতীত?"
জানলেন, পুরোনো রেকর্ড ফাইল দেখলেন।
এই ব্যাংকের হর্তাকর্তাদের তিনি বিশাল কাজ গছিয়ে দিলেন। "এই লোক এক অদ্ভুত অস্বাভাবিক গন্ধ তৈরী করছে পুরো নগর জুড়ে। জানেন?"
-"জ্বি, উনার একটা গন্ধ সমস্যা তো আছে ...."
"আপনারাও তো কাজ থেকে অব্যহতি দিয়েছেন এই গন্ধের কারণে?"
-"ঠিক অব্যহতি না, এক মাসের ছুটি। বেতন সহই।"
"এক মাস হতে তো আর অল্প কিছুদিন বাকি। গন্ধ কিছু যাচ্ছেনা। উনি দোকানে গেলে, আসে পাশে গেলে, মানুষ উনার শরীর থেকে গন্ধ পায়। উনার বাসার আশপাশ ঘিরেও গন্ধ থাকে। প্রতিবেশীরাও গন্ধে হয়রান।"
-"জ্বি বড্ড উৎকট গন্ধ, আমরা জানি।"
"নগরপিতার ভবন থেকে পরীক্ষা করে দেখেছি। উনি খোলা জায়গায় থাকলে, গন্ধটা কিন্তু অত তীব্র হয়না। তাই বলে তো উনাকে আর খোলা মাঠে থাকতে বলতে পারবেন না, ব্যাংকের কাজও সামনের রাস্তায় বসিয়ে করাতে পারবেন না, তাইনা?"
কী বলা যায় এর উত্তরে? ব্যাংকের হর্তাকর্তারা তাই চুপ থাকেন।
"তো আসলে এটা নগরপিতার নিজস্ব সিদ্ধান্ত, ফিরদৌস বোধাতীতকে কিছুদিন এ অঞ্চলের বাইরে থাকতে হবে। নগরের বর্ডার শেষে যে বড় রাস্তা তার ধারে একটি ছোট্ট বাড়ি আছে। ব্যবহার হয়না। নগরপিতার আওতাধীন। খোলামেলা জায়গা। কোন মানুষ থাকেনা। ছোট্ট কিন্তু একজন মানুষ থাকতে পারবে। সেখানে সে থাকবে। আগে তার সমস্যা সনাক্ত হোক। তারপর ফিরে আসুক। এ নগরের সাথে গন্ধ তো যায়না।"
-"জ্বি ঠিকই তো।" হাতে হাত ঘষে বলেন হর্তাকর্তারা। নগরপিতা বিচক্ষণ। নগরের মঙ্গলের কথা তিনি চিন্তা করেন সর্বাগ্রে। তার সিদ্ধান্তই সঠিক।
"তাই বলছি, অব্যাহতির বিষয়টি না ভাবলেও ভাবুন। সাময়িক অব্যাহতি দিন। নিয়ম আছে তো? নাইলে নিয়ম তৈরী করুন। কিছু অগ্রিম মাইনে দিয়ে দিন। যদি আবার সুস্থ হয়ে ফিরে আসে তো আসল। প্রয়োজন হলে তাকে কাজে বহাল করবেন। আর এই সমস্যা ঠিক না হলে ... "

এইটুকুই কথা হল। আর সাথে কয়েক চুমুক বেদানার রস। তিনি ব্যস্ত মানুষ। করিডোর দিয়ে যেতে যেতে হর্তাকর্তাদের সাথে বাকি কথা সেরে নিলেন। কাল রাতে এই নগর ছাড়বে ফিরদৌস বোধাতীত। কাগজপত্র, মাইনে, অব্যাহতিপত্র কাল দিনে দিনে পৌঁছে দিতে হবে।

বড়কর্তা বিদায় নেয়ার পর, হর্তাকর্তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত নিলেন, কাল দিনে রইসুল ইসলাম যার সাথে ফিরদৌস বোধাতীতের কিঞ্চিৎ সখ্য আছে এবং তার বাসা চেনে, সে যাবে কাগজপত্র আর মাইনে নিয়ে। সাথে যাবে ম্যানেজার। সই সাবুদ নিতে। ফিরদৌস বোধাতীতের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে যতসম্ভব দুরুত্ব মেপে কাজ সেরে নিজ বাড়ি ফিরে স্নান করে তারপর অফিসে ফিরবেন তারা। যাতে গন্ধ নিয়ে কোন সমস্যা না হয়। সব বুঝিয়ে শিখিয়ে দেয়া হল রইসুল ইসলাম এবং ম্যানেজারকে।

পর দিনে রইসুল ইসলাম এবং ম্যানেজার প্ল্যান মাফিক পৌঁছল ঠিকই, কিন্তু ফিরদৌস বোধাতীতের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলনা। ঢুকতেই হল। এ নগরের আর মানুষের মতোই ফিরদৌস বোধাতীতের বাড়ি। বরং বলা যায় তার চেয়ে বেশি সাধারণ। সামনে আধা মানুষ সমান লম্বা একটা সাদা গেটের ওপারে একতলা শ্যাওলা রঙের একটি বাড়ি। এ অঞ্চলে 'বাড়ি ভেঙে চুরি'র ধারণার সাথে কেউ পরিচিত নয়। তাই এই ছোট্ট একটু আধটু পাঁচিল আর দরজার আড়ালে কাজ চলে যায়। বাড়ির সামনে ছোট্ট এক চিলতে জায়গা। রইসুল ইসলাম এবং ম্যানেজার গেটের কাছে এসে দেখে গেট খোলা, গেটের ভেতর এক চিলতে জায়গা। সেখানে এমনকি বাড়ির ভেতর জুড়ে পাড়া-প্রতিবেশীদেড় ভিড়। তারা ভদ্র হয়ে দাঁড়িয়ে বটে, তবে মাছিদের মতন গুনগুন করছে। আর পুরো বাড়ি যেন মাকড়সার জালের মতন আটকে আছে ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের গন্ধে।

উঁকি দিয়ে যতটুকু দেখা যায়, তাতে বেশ বোঝা মূল বাড়িতে ঢুকলে প্রথমেই ছোট্ট বসার ঘর। আর তার উল্টো দিকে খোলা টানা দরজা, সেই দরজার ওপাশে এক চিলতে বাগান ধরণের। হল্লাটা সেখানেই বেশি। ফিরদৌস বোধাতীতকে কোথাও দেখা যাচ্ছেনা। ভিড়ের একটা টান আছে। সামনে টানে। সেই টানে, আর ফিরদৌস বোধাতীতকে খুঁজতে খুঁজতে রইসুল ইসলাম আর ম্যানেজার মুখে রুমাল চেপে বসার ঘর পার হয়ে পেছনের ছোট্ট বাগানে যেয়ে দাঁড়াল।

এ বাগানই হয়তো। ফুলহীন ফলশূন্য। পাতা নেই, শেকড় কিংবা গাছ, নেই। ছোট্ট একচিলতে জমি। ছোট ছোট গর্তে ভরা। আর সেই গর্তে শুয়ে আছে, এ কী! এ নগরের মৃত জাফরানি পাখি, অনেক। অনেক হলে যত হয়, তত। পাখিদের ঠিক গলার কাছে তিনটে ফোঁটা, যেন গুনে গুনে তিনটি সাদা তিল। প্রত্যেকটা পাখির। এ নগরের মৃত জাফরানি পাখি। পাখিগুলোর গর্ত থেকে ভেসে আসছে ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের গন্ধ। একই গন্ধ। ফিরদৌস বোধাতীত চলে গেছে হয়তো কাল রাতেই কিংবা আজ ভোরে, কে জানে? দরজা খুলে, সব রেখে। ফিরে আসে রইসুল ইসলাম এবং ম্যানেজার মাইনে এবং কাগজপত্র সমেত। আর সকলের কাছে পাখি খুনি, অসুস্থ, বিকারগ্রস্ত, গন্ধময় ফিরদৌস বোধাতীতের নামের সাথে অনেক ছি ছি জুড়ে গেল, প্রশ্ন এবং বিস্ময়ও।

এ নগর বড্ড ঝকঝকে, সুগন্ধি। এ নগরে সবার নিজস্ব কাজ আছে। নগর তাই চলতে থাকে ফিরদৌস বোধাতীতকে বাদ দিয়েও ঠিকঠাক। তবে খুব মন দিয়ে নাক টেনে বড় ঘ্রাণ নিলে, কেউ কেউ বুঝতে পারছে যে এ নগর তার ঝকমকে স্নিগ্ধ ঘ্রাণ হারাচ্ছে। যারা ফিরদৌস বোধাতীতকে চেনে না, তাদের কাছে অপরিচিত ঘিনঘিনে ঘ্রাণ। আর যারা চেনে, তাদের কাছে আতঙ্কের। পরদিন, তার পরেরদিন, তার পরও। ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে এ নগরের কোণায়, গোলাপি দোকানের মোড়ে, নগরের ছোট্ট ঝলমলে জলডুবি গর্তগুলোয়, যেখানে জাফরানিরা জলখেলা করে। ঠিক সেই বেগুনি দালানের ব্যাংকের গন্ধময় প্রথম দিককার মতন। সেই লাল গোল ঠোঁটের মহিলার মতন, এখানে সেখানে মানুষ অস্থির হচ্ছে, "কি বিচ্ছিরি।"

বনমালী, ওই যে বেগুনি দালান পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, তাদের একটা বড় দল আছে। সেই বড় দল, ছোট ছোট ভাগে নগরকে পরিষ্কার পরিছন্ন করে প্রতিদিন। কেউ বেগুনি দালান, কেউ নগর ভবন। রাস্তা, এলাকা ভাগ করে তারা পরিষ্কার চালায়, একদম নিয়মমাফিক। এমন গন্ধে গন্ধে দু-তিনদিন চলবার পর, বনমালীর দলের একজন জলডুবির গর্তের ভেতর থেকে একটা কাঠি দিয়ে বের করে আনে মৃত এক জাফরানি পাখি। গলার তিনটে সাদা তিল। আর গন্ধ? যেন ফিরদৌস বোধাতীত সাক্ষাৎ মিশে গেছে পাখির শরীরে।

এ নগরে নাকি কখনো পাখি মরেনা? কেউ নাকি দেখেনি কখনো? অনেকদিন? দেখছে এখন। ম্যাড়ম্যাড়ে অতীত, কিংবা পুরোনো গৌরবগাঁথা এখন - এ নগরে একসময়ে কোন পাখি মরতোনা। গোলাপি দোকানের পাঁচিলে, নগরপিতার জানালার সাদা কার্নিশে, বেগুনি দালানের মুখে, আর তিনরঙা ফুল টুপটাপ করে যে মাটিতে পরে, সেখানে ও মিশে থাকে সাদা তিলের মৃত জাফরানি।
এ নগরের বিশেষজ্ঞদল, কাপড়ে পেঁচিয়ে, হাতে না ছুঁয়ে, সাবধানে, মৃত জাফরানি নিয়ে গেছে পরীক্ষাগারে। পরীক্ষা নিরীক্ষা চলেছে। পাখিদের গুটি জ্বর। সাদা তিলের মতন গুটিদানা হয়ে, অসুখে মরছে পাখি। সমাধান অজানা। মরছে শুধু পাখি? এ নগরের সুঘ্রাণ ও যে মরছে। শরীরে মগজে, স্বপ্নে কী ভয়ের এক ঘ্রাণ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষ।

জরুরি বৈঠক হল নগরপিতার ভবনে। নগরের বুদ্ধিজীবীরা এক হলেন। তদন্ত কমিটির প্রয়োজন। যদিও এর প্রয়োজন সচরাচর হয়না। শেষ কবে হয়েছে মনে পড়ছেনা। পরামর্শ এবং তদন্ত কমিটি তৈরী হল। কমিটির বিষয় - ফিরদৌস বোধাতীত। নগরপিতার ধারণা ফিরদৌস বোধাতীতের সাথে পাখি মরে যাওয়ার সূত্র জড়িত। গন্ধ ও। এত সহজ হিসাব। বিশেষজ্ঞরা একমত হলেন।

তদন্তের প্রথম ভাগে বিশেষজ্ঞের দল তাদের লোকজন দিয়ে সরেজমিনে খোঁজখবর চালালেন। ফিরদৌস বোধাতীতের বাড়ি, এলাকা এবং প্রতিবেশীস্থানগুলো। বেগুনি দালানের ব্যাংক ও তদন্তে বাদ গেলনা। তার সাদামাটা শেষ বাড়িটিতে ফিরদৌস বোধাতীত গেল সাড়ে তিন বছর ধরে থাকত। বাড়ির ঘরগুলো উল্টে পাল্টে কিছু পাওয়া গেলনা, একটা বড় সাইজের খাট, আলমারি, বসার জন্য চৌকি মোড়া ইত্যাদি। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসের বাইরে কোনো বিলাসিতা নেই। বই আছে একটা, অভিধান, তাও প্রায় অ-ছোঁয়া। পাশের বাড়ির সাদা চুলের যেই ভদ্রলোক, তিনি জানিয়েছিলেন, প্রায় চার বছর আগে যখন ফিরদৌস বোধাতীত এ এলাকায় আসে, তখন তিনি জেনেছিলেন যে, অফিস কাছে জন্য এ এলাকায় বাসা নিয়েছে সে। এ কথা সত্য। ফিরদৌস বোধাতীতের বাড়ি থেকে ব্যাংকে হেঁটে যেতে বড়জোর বিশ মিনিট। অফিসের রেকর্ডেও বর্তমান ঠিকানা এটি। এর আগে কোথায় ছিল সে, প্রতিবেশী তা জানেনা। তদন্তের জন্য তা এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ন নয় দেখে, কেউ আর গভীরে খোঁজ ও করলনা। বরং দু'বাড়ি পরের যে মেয়েটি রাত জেগে পরীক্ষার পড়া পড়ে, তার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। ফিরদৌস বোধাতীতকে চলে যাওয়ার আগে সে শেষের প্রায় বিশদিন ধরে দেখেছে, একটা খালি দড়ির বস্তা নিয়ে বের হয় রাতে। আনুমানিক ১১ টা। মাঝরাতে ফিরতে ও দেখেছে বেশ কয়েকবার। তখন বস্তা ভরা থাকে। এ ঘটনার সত্যতা আরো অনেক জনের বয়ানে পাওয়া গেল। পাড়ার মোড়ের মনোহারী দোকানের মালিক, পাশের বাড়ির সাদা চুলের লোকটা, এলাকার পাহারাদার। কেউ বলছে বিশ দিন কিংবা এক মাস, এমন সময় ধরেই তারা দেখছিল। ফিরদৌস বোধাতীত চুপচাপ স্বভাবের। বেশি কথা হতোনা কারো সাথে। পাহারাদার একবার জিজ্ঞেস করেছিল, বস্তায় কী? কাজের জিনিস কিংবা বাগানের জন্য মাটি ইত্যাদি কিছু উত্তর দিয়েছে ফিরদৌস বোধাতীত, যা পাহারাদের আর এখন মনে নেই। আর ফিরদৌস বোধাতীত কখনো কারো সাথে ঝামেলা করেনি। তাই তাকে নিয়ে আলাদা মাথা ঘামায়নি কেউ।

তদন্ত দল, আরো গভীরে তদন্ত চালাল। ফিরদৌস বোধাতীতের বাড়ি থেকে একটা কাজের জিনিস পাওয়া গেল। তার একটা ছবি, ছোট সাইজ, চ্যাপ্টা। দাপ্তরিক কোন কাজে তোলা হয়তো। নগরের এ পাশ ওপাশ সে ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলল। বেশ কজন মানুষ সাক্ষ্য দিয়েছে, তারা এ লোককে রাতে দেখেছে, পথ থেকে কী যেন কুড়াতে। ভেবেছে নগরপিতার অফিসের লোক, পরিষ্কারের কাজ চলছে। এখানে, গভীর রাতে দরকারি কাজ ছাড়া এমনিও কেউ বের হয়না। আর এ নগরে কেউ রাস্তার উপর বাস করেনা। তাই ঘরের জানালার ভেতর দিয়ে দেখলেও খুব কাছ থেকে কেউ দেখেনি। তদন্ত দল দক্ষ। ফিরদৌস বোধাতীতের সেই পেছনের বাগান থেকে তারা দড়ির সে বস্তা খঁজে পেয়েছে। গন্ধে ভরা। মৃত পাখির পালক আটকানো টুকরো টুকরো। আর চিকিৎসক দল ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখছে গত মাসখানেক ধরেই প্রায় জাফরানি পাখিগুলো এ অসুখে আছে। সব তদন্ত মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদল এটুকু তো বুঝল, ফিরদৌস বোধাতীত জানত এ নগরে পাখি মরে। প্রতিরাতে মৃত পাখিগুলোকে জড় করে মাটি চাপা দিত। সেই অসুখে পাখির গন্ধ কেমন ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের গন্ধ হয়ে উঠেছিল।

ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের গন্ধ। ছড়াচ্ছে দ্রুত গতিতে এ নগরে। কেউ রাজি হচ্ছেনা মরে যাওয়া জাফরানি সরাতে। বনমালীর দল বেঁকে বসে। শরীরে গন্ধ মাখবে যে । সেটা কিভাবে দূর হবে? এ গন্ধ শরীরে এলে, সবার সাথে মিলেমিশে থাকবে কীভাবে? কোন উপায়? মরে যাওয়া জাফরানিরা কুৎসিত। বেঁচে থাকারাও ঝিমুচ্ছে। যে গন্ধ থেকে পালাতে বেগুনি দালান ছেড়ে দিয়েছিল ফিরদৌস বোধাতীতকে, সে গন্ধ যে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বেগুনি দালানের সে ক'দিনের বদগন্ধ, এখানে ওখানে সেখানে। ম্যানেজারের কপালের সেই দাগ চিন্তা হয়ে এখন নগরপিতার কপালে। কাউকে তো জোর করা যাচ্ছেনা পাখি সরাতে। সবাই বেঁকে বসেছে। যদি শরীর চিরদিনের জন্য গন্ধে মেখে যায়? তিনি বললেন, "খুঁজে আনো ফিরদৌস বোধাতীতকে।"

বর্ডার পার হয়ে যে নির্ধারিত স্থানে ফেরদৌস বোধাতীতের থাকার কথা ছিল, সেখানে সে যায়নি। বর্ডারই পার হয়নি সে। তদন্ত দল আরো তৎপর হল। ব্যাংকের কাগজপত্র ঘেঁটে খোঁজ মিলল, আদি ঠিকানার। বর্ডারের আগে যে অশহুরে কিছু মফস্বল অঞ্চল আছে। তার একটি। মসুরি। তদন্ত দল গিয়েছিল সেখানে। নেই ফিরদৌস বোধাতীত। তবে তদন্তদল একটা রিপোর্ট ধরণের লেখা জমা দিয়েছিল নগরপিতাকে। রিপোর্ট না বলে গল্প বলতে পারলে ভাল হত। তার মূল বিষয় এখানে উল্লেখ করা হল,

ফিরদৌস বোধাতীত। মসুর গ্রামের উত্তরদিকে তাদের বাড়ি। নিজেরদের আদি জমির ওপর দোতলা একটি বাড়ি। পিতা মাতা মৃত। তাঁদের একমাত্র সন্তান ফিরদৌস বোধাতীত। ফিরদৌস বোধাতীতের বয়স যখন সাত তখন তার মা দ্বিতীয় সন্তান প্রসব করতে যেয়ে মারা যান। সে সন্তান ও বাঁচেনি। এই বাড়িতে এখন একা থাকেন ফিরদৌস বোধাতীতের দাদা। বয়স পঁচাশি বছর। একুশ বছর বয়সে ফিরদৌস বোধাতীত বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। আর কোনদিন আসেনি মসুরিতে। এমনকি তিন বছর আগে তার বাবা মারা যাবার পর, পত্রে শোক জানিয়েছিল। যায়নি। এই যে সে মসুর ছেড়েছিল একুশে, রিপোর্টে সে বিষয়ে এক গল্প পাওয়া গেল।

ফিরদৌস বোধাতীত ছোট থেকে পাখি ভালোবাসে। মসুরি অঞ্চলের পাখিদের সাথে তার সখ্য ছিল। জাতে তারা জাফরানি পাখি। তবে আর একটু ছোট্ট। আর কিচির কিচির শব্দটা একটু গেঁয়ো, তীক্ষ্ণ। পাখিদের সাথে তার সখ্যের ধরণটা খুব মজার। এ অঞ্চলের ছোট পাখিরা ফিরদৌস বোধাতীতের আসে পাশে ভিড় জমাত। তার পেছন পেছন টুকটুক করে হাঁটত, আসে পাশে উড়ে বেড়াত। তার কান ঠোকাত, ঠোঁট দিয়ে চুল টানতো। মসুর অঞ্চলের সবাই এ ঘটনা জানে, এবং এটি একটি স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছিল।

ফিরদৌস বোধাতীতের যখন বিশ, তখন তার প্রেম হয়েছিল। টুই নামের একজনের সাথে। তার বয়স উনিশ। মসুরি অঞ্চলেরই মেয়ে। এমন পাখিময় জীবনে যে প্রেম এসেছিল, ফিরদৌস বোধাতীত আর টুইয়ের জীবনে, তা গভীর হয়েছে জাফরানি রঙের মতন, তবে দীর্ঘ হয়নি। এক ভরা শীতের দুপুরে নীল ফুলের জংলার মাঝে দাঁড়িয়ে, ফিরদৌস বোধাতীত চুমু খেয়েছিল টুইকে। প্রথম। শিখেছিল ঠোঁট, চোখ, নাক, চুমু। শিখেছিল সেই দুপুরে আরো অনেকে, অনেকজন? অনেক পাখি বললে যথার্থ হয়। হ্যাঁ পাখিরা শিখেছিল চুমু। ফিরদৌস বোধাতীত আর টুইয়ের আশপাশ উড়তে ঘুরতে। পাখিরা চুমু খেত, যুগলে। এক পাখি অন্য পাখিকে। মানুষের মতন লুকিয়ে নয়, সামনে, এখানে ওখানে। জলসা আসরে, মেলাতে দালানে, দুপুরে কিংবা শিশিরে। মসুরির জাফরানি রঙের পাখিরা চুমুতে কিচির মিচির করে তুলত চারপাশ। বড্ড তীক্ষ্ণ। এ কী? বড় অরাজকতা। মসুরির প্রধানের নির্দেশে গুলতির আঘাতে একদিন এলোপাতাড়ি মরেছে অসভ্য পাখিরা। এক মরা পাখি তুলতে যেয়ে চোখের নিচে যেয়ে গুলতি লেগেছিল টুইয়ের। কী হল আর জানা হয়নি। পরদিন টুই আর পরিবার, মসুরি ছেড়ে চলে গিয়েছিল। ফিরদৌস বোধাতীত, অন্ধকার ঘরে দু'দিন বসে থেকে, এক পাখিহীন ভোরে মসুরি ছেড়েছিল আর ফেরেনি।

তদন্ত কমিটির রিপোর্টের শেষ লাইনটা বড় অদ্ভুত। ফিরদৌস বোধাতীতের দাদা, নাকি তদন্ত কমিটিকে বলেছেন , "ফিরদৌস বোধাতীতের ভবিষ্যতে পাখি হয়ে যাবার কথা।"
তদন্ত কমিটির "কেন?" প্রশ্নের উত্তর তিনি দিতে পারেননি। বয়স হয়েছে, তাই তাঁর মনে নেই, তিনি কেমন করে জানেন এ কথা। কিন্তু তিনি জানেন।

এ নগরে পাখি মরছে। বর্ডার রেকর্ড বলছে, এ নগর ছেড়ে তো যায়নি সে। কিন্তু এ নগরের কোথাও ফিরদৌস বোধাতীত কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। এ পাখি মরা নগরের আনাচে কানাচে তবু ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের গন্ধ। অদ্ভুত, ঘিনঘিনে। বেদনার রং আর তিনরঙা ফুলের ঘ্রাণ মরা জাফরানি পাখিগুলোর মতন মৃত, ক্রমশ। এ নগরে থিকথিকে সে গন্ধ - সবার এখন বড্ড চেনা।

এ নগরে আগে কোনদিন নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি জাগেনি দেয়ালে। এ নগর থেকে আগে কেউ হারায়নি যে কখনো। কিন্তু ফিরদৌস বোধাতীতকে প্রয়োজন। সবাই খুঁজছে। নিখোঁজ সংবাদে চারপাশ গুনগুন। নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে ভরে গেছে এ নগর। পাখি মরা এ নোংরা নগরের ঘ্রাণ ফিরদৌস বোধাতীতের শরীরের ঘ্রাণ হয়ে কেমন জাগছে। ভবিষ্যতে নাকি ফিরদৌস বোধাতীতের পাখি হয়ে যাবার কথা? সেই ভবিষ্যতের আগ পর্যন্ত সবাই তাকে খুঁজছে। দেয়ালে দেয়ালে ফিরদৌস বোধাতীতের সেই ছোট্ট চ্যাপ্টা ঝাপসা ছবি - তোমাকে চাই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ