সাদিয়া সুলতানার গল্প : চৌহদ্দি

আপন পর হয়
পর আপন বটে
মানুষে মানুষে কত
বিভাজন ঘটে।


সুঁই-সুতায় বোনা চিত্রলিপিটির বাম দিকে কোনায় সবুজ সুতায় লেখা সন ১৩৭৪, ডানদিকের কোনায় লাল সুতায় লেখা ‘চম্পা।’ চম্পা নামের দুপাশে ভরাট সেলাইয়ের গোলাপ দুটির রং অনুজ্জ্বল কমলা।

সোমা অনেক দিন ধরেই বলছে, দেয়ালে ঝুলানো ধূলায় মলিন চিত্রলিপিটা নামিয়ে দিতে। অম্বু নামায়নি। আজ সে নিজেই পলিথিনের আবরণে মোড়ানো চিত্রলিপিটা দেয়াল থেকে নামিয়ে উঠানের কোণে ছুঁড়ে মেরেছে।

জলপাই গাছের লাল, সবুজ পাতার আড়ালে টুউব...টুউব...স্বরে উদাসী পাখি ডাকছে। পাখির ডাকে ক্রমশ ধীর হচ্ছে অম্বুর শ্বাস-প্রশ্বাস। কত শত দুপুরে সে আর দাদা পাখির এমন ডাক নকল করেছে। ধরতে পেরে মা থেকে থেকে ডাক দিয়েছে, ‘দাঁড়া, দুই পাখিরে অখনই ধইরা খাঁচায় পুরতাছি...।’ আড়াল থেকে দুই ভাই তুমুল হেসেছে।

পাখি ডাকে, টুউব... টুউব...। আবেগের ভারে অম্বুর চোখে জল জমে।

দাদা বাড়িতে নেই। শম্ভু সাতসকালে বাবার বাকসোটা নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। এখনো ফেরেনি। বাকসোটা দুই ভাইয়ের কাছে কুবেরের ধন। দুজনে একসঙ্গে ছাড়া হাত দেয় না এতে। বাবার ঘরের আবলুশ কাঠের আলমারির ভেতরে ড্রয়ারে তালাবন্ধ বাকসোটি খুব সুরক্ষিত অবস্থায় থাকে। এমনিতে এটি দেখতে সাদামাটা, টিনের পাতের তৈরি। পিতরঙা বাকসোটি বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে ঠিক কী আছে।

দুই ভাই অবশ্য জানে এর ভেতরে কী আছে। কেউ কারো অনুমতি ছাড়া বাকসে হাত দিতে পারবে না সেই প্রতিজ্ঞা ছিল দুজনের। অথচ সকালে ফুলকো লুচি আর কাউনের পায়েসের পাত ফেলে রেখে শম্ভু বাকসোখানা বগলদাবা করে কাউকে না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে।

বাড়ির সকলেই জানে শম্ভু দত্ত খেতে ভালোবাসে, খালি পেটে বাড়ি থেকে বের হবার কথা ভাবতেই পারে না। খাওয়ার সময় হলে তিনবেলাই মিহি গলায় ভাইয়ের মেয়েকে ডাক দেয়, ‘ও দিপা, তোর মা না খাওয়ায় মারব নাকি।’

শম্ভু প্রতি সপ্তাহে বাজারে যায়। ভাইয়ের আনা সদাই তার পছন্দ হয় না। বাজার করাই তার জীবনের একমাত্র শৌখিনতা। আজ শম্ভুর বাজারে যাবার কথা। কিন্তু মানুষটির বাড়ি ফেরার নাম নেই।

স্বামী মাঠ থেকে ফিরতে না ফিরতেই সোমা সতর্ক গলায় খবরটা দিয়েছে, ‘কয়দিন ধইরা আপনি বাইরে গেলে আমির মুহুরি আইসা দাদার লগে কী কী গুটুরগুটুর করে। আইজ সকালে গেটের বাইরে নিতাই কাকাও দাঁড়ায় ছিল।’

খবরটা শোনার পর থেকে অম্বু মুখ ভার করে বসে আছে। যেন তার পাতে থাকা রুই মুড়ো লুট করে নিয়ে গেছে শম্ভু। অথচ রঘুনাথ দত্ত বাড়ির মাসকাবারি বাজারের সঙ্গে মহিশলুঠির রুই আনলে মুড়োটা এক পাতে তুলে দুই ভাইয়ে ভাগজোক করে খেতো। কাজলগৌরী ইলিশের পেটি সমান মাপে জায়গা নিতো দুই ভাইয়ের কাঁসার থালায়। এতকাল পাড়ার কোনো শত্রুও বলতো না, ভাইয়ে ভাইয়ে মিল নেই।

রঘুনাথ মৃত্যুশয্যায় দুই ভাইয়ের হাত ধরে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল-বাড়িতে চিরকাল লক্ষ্মীর পূজা হবে আর দুই ভাই কখনো ভিটেমাটি ভাগ করবে না। বাবা বলতেন, মা লক্ষ্মী ধনসম্পদ দেওয়ার অধিকারী হলেও সেই ধন পাহারা দিতে তাদের দুই ভাইকেই কুবের দেবতা হতে হবে।

বেঁচে থাকতে বাবার কথা কখনো অমান্য করেনি তারা। মুখেরটা, হাতেরটা দুই ভাই সমান ভাগে ভাগ করে নিয়েছে। ফি বছর পুরোহিত লক্ষ্মী পূজার পর কুবের দেবতার পূজা দিয়েছে এই বাড়িতে। সেই বন্ধুসম দাদার পরম বিশ্বাসঘাতকতায় এখন অম্বুর বুক ভার।

ওর মনে পড়ে স্কুলে অংক স্যারের বেতের বাড়ি থেকে ভাইকে বাঁচানোর জন্য শম্ভু একবার স্যারের পা ধরে বসেছিল। সে কী কাণ্ড! শম্ভুর টানাটানিতে মজিদ স্যারের পায়জামা খুলে যাওয়ার দশা হয়েছিল। আরেকবার পৌষের মেলায় অম্বু হাত থেকে ছুটে গিয়েছিল বলে শম্ভু পুবপাড়ার ময়দানের ধারে জোড়া বহেরা গাছের নিচে বিলাপ করে এক মিছিল লোক জড়ো করে ফেলেছিল।

অবেলায় শত শত বাল্যস্মৃতি অম্বুর মনে-মগজে বিছা পোকার মতো হেঁটে বেড়ায়। জ্বালা বাড়ায়।

বারান্দায় শীতলপাটি পেতে বসা অম্বু আকাশের দিকে ঘোলা চোখে তাকায়। সুর্মা রঙা মেঘে ঢাকা আকাশ তার চেয়েও বিমর্ষ। পাখির ডাক থেমে গেছে। অম্বু চুপচাপ বসে আছে। সোমা স্বামীর পছন্দমতো রান্না করেছে। কুমড়ো বড়ি দিয়ে পালংশাক ভাজা আর কাঁচা টমেটো-তিনকাটা মাছের ঝালঝোলের তরকারিসহ ভাত বেড়ে সে অম্বুকে খেতে ডাকে। স্বামীর খাওয়ার তাগিদ নেই দেখে গজগজ করতে করতে সোমা চার বছর বয়সী মেয়ে দিপাকে খাইয়ে ঘুম পাড়াতে নিয়ে যায়। সূর্য নামবে নামবে করছে। থেকে থেকে চোখের জল মোছে অম্বু। বিরক্ত সোমা স্বামীর দিকে তাকায়।

‘এইভাবে বইসা থাকলে কাম হইব। একটু নাড়াচাড়া দিয়া ওঠেন। দুইটা ভাত খাইয়া আমিরের বাড়িতে যান।’

স্ত্রীর কথার কোনো উত্তর দেয় না অম্বু। সোমা তবু অনর্গল কথা বলে। সেই কলকল শব্দস্রোতে ঘুরেফিরে আসে স্বামীর বোকামির কথা।

অম্বুর বুকের ভেতরটা বিনা বাতাসে কাঁপে। বাবার বাকসোতে আছে এই দত্ত পরিবারের চৌদ্দপুরুষের কাগজপত্র। ওদের পূর্বপুরুষ জগৎরাম দত্ত বৈষয়িক মানুষ ছিলেন। সাতচল্লিশের আগেপরে হিন্দু বাড়িগুলো যখন ফাঁকা হতে শুরু করেছিল তখন কোনো আতংক বা উচ্চাশাই তাকে ঘায়েল করতে পারেনি। নোয়াখালি, খুলনা, ময়মনসিংহ-এসব জেলার দাঙ্গার সব খবর আসতো তার কানে। যদিও দাঙ্গার আঁচ লাগেনি এ গাঁয়ে, তবু সবার মনে ভয় ছিল। জগৎরাম দত্তের ভরসা ছিল, এ গাঁয়ের মানুষেরা অন্তত তার পরিবারের কোনো ক্ষতি করবে না। হিন্দু-মুসলমান পরস্পর বিবাদেও জড়াবে না। যদিও দুএকজন শুভাকাঙ্ক্ষী তাকে দেশ ছাড়ার জন্য উস্কানোর চেষ্টা করেছে। জগৎরাম দত্তের মন ঘোরেনি। দেশে দেশে বিভাজন ঘটলেও বৈষয়িক মানুষটি তার গড়ে তোলা ভিটেমাটি হাতছাড়া হতে দেয়নি।

জগৎরাম দত্তের যোগ্য উত্তরসুরী ছিল শম্ভু আর অম্বুর বাবা রঘুনাথ দত্ত। আদি পুরুষের সম্পত্তি ধরে রাখার পাশাপাশি রঘুনাথ দত্ত নিজেও বিস্তর জায়গাজমি করেছেন। যদিও একাত্তরের সশস্ত্র সংগ্রামের সময়ে তাকে ভিটেবাড়ি ছেড়ে পরিবারসহ ওপারে যেতে হয়েছিল। যুদ্ধ শেষে সবাই ফিরেও এসেছিলেন।

সে আরেক ভাঙা-গড়ার আখ্যান। সবটা অম্বু জানেও না। জানে ওর দাদা শম্ভু আর বাড়ির পেছনের ঐ মুখবোঁজা কুয়া।

অম্বু জানতেও চায় না এত ইতিহাস। সে শুধু চায়, এই ভিটেবাড়ি, জায়গাজমির চৌহদ্দিতে দাদার সমান সমান খবরদারি। সমান সমান নজরদারি। নিজেদের ভিটেমাটির চৌহদ্দির খবর জানা নেই-এই নিয়ে কম কটাক্ষ শুনতে হয় না তাকে। যদিও বাবার বাকসের কাগজপত্রের কড়া, গন্ডা, আনা, পাই আর চৌহদ্দির হিসাবনিকাশ দেখলে ওর মাথার ভেতরে একটা পাখি টুউব...ডাক তুলে চক্কর দেয়। কানের ভেতরে ভোঁ ভোঁ শব্দ হয়। অংকে ফেল করা ছাত্রের মতো কাগজাদি দাদার হাতে গুঁজে দিয়ে সে এতকাল তাই স্বেচ্ছায় পালিয়ে বেড়াতো। এখন আর পালানো সম্ভব না। নিজের সংসার হয়েছে। সন্তান হয়েছে। এদিকে দাদাও গায়ে পড়ে সংকট বাড়াচ্ছে, বিবাদে জড়াচ্ছে।

বাবার মৃত্যুর পর দুই ভাই যেন ধনসম্পদ নিয়ে বিবাদ না করে সেই বিষয়ে রঘুনাথ বার বার সন্তানদের সতর্ক করেছেন। ফাঁক পেলেই তিনি দুই ভাইকে জমিজিরাতের হিসেবনিকেশ শিখে নিতে বলতেন। পূর্বসূরীদের মালিকানার উৎসও মুখস্থ রাখতে বলতেন। চোখ বড় বড় করে অম্বু বাবার মুখের সেইসব কথা শুনতো। সেই কোন বাংলা সনে কোর্ফা পত্তনমূলে ওদের আদি পুরুষ জগৎরাম দত্ত আঠারকোটা মৌজার এই জমাজমি পেয়েছিলেন। তখনও দেশের মাটি ভাগ হয়নি। সেটেলমেন্ট খতিয়ানে ডাঙা হিসেবে জগৎরাম দত্তের নামে রেকর্ডও হয়েছিল। তার দুই মেয়ে চম্পা দত্ত, শম্পা দত্ত আর স্ত্রী কামিনি থাকলেও শেষ পর্যন্ত নাতি হিসেবে রঘুনাথই এই জমির উত্তরাধিকার হয়েছিল।

ঠাকুমা চম্পা দত্তকে দেখেনি অম্বু। শুধু দেখেছে তার হাতে বোনা সুই সুতার চিত্রলিপি।

অলস মস্তিষ্ক কুচিন্তার শিকার
পরিশ্রমী যেজন তার আছে পুরস্কার

এই বাড়ির প্রতিটি ঘরের দেয়ালে সুই সুতায় এমন নকশা করা ছন্দ, ভক্তিমূলক গানের কলি ঝুলানো আছে। প্রতিটি নকশার নিচে বাংলা সন আর শিল্পী হিসেবে ‘চম্পা’ নামটি লেখা আছে। ঠাকুমার স্মৃতি বলতে এইটুকুই। আর কিছু নেই। আছে বাবার স্মৃতি।

বাবার কথা মনে হতেই আবার বুক ভার হতে থাকে অম্বুর। ওরা দুই ভাই বাবার জমির সমান সমান ওয়ারিশ থাকলেও শম্ভু ছোট ভাইয়ের ওপরে মাঝেমাঝেই ছড়ি ঘোরাতে চায়। যেন অম্বু এখনো সেই ছোটটি আছে। আর এ কারণেই বুঝি ছোট ভাইয়ের সঙ্গে এমন করতে তার বিবেকে বাঁধলো না!

অম্বু ভাবতে পারে না দাদা এমন বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলো! ওকে গোপন করে কাগজপত্র চুরি করে নিয়ে গেল! তাও আবার নিতাই দালালকে দোসর করে?

অবশ্য গত কয়েক দিন ধরেই শম্ভুর ভাবগতিক তার কাছে ভালো লাগছে না। বাড়ির পেছনের অব্যবহৃত কুয়োর ধারে বসে দিন নেই, রাত নেই দাদা বিড়বিড় করে। অম্বুর একবার সন্দেহ হয়েছিল। দাদাকে যতটুকু চেনে দিনরাত ‘ওম শাম কুবেরায় নমঃ’ মন্ত্র ভিন্ন অন্যকিছু জপ করার মানুষ সে না। দিপার মা একদিন বলছিল, ‘দাদা, বড় পাগলামি করছে। খেতে দিলে সহজে খেতে আসে না। স্নানের সময়ও ঠিক নেই। এখন অম্বু বেশ বুঝতে পারছে, ওসব দাদার পাগলামি না ছাই-বাড়িঘর নজরদারিতে রাখতো। আর এই এজমালি সম্পত্তিতে দাদা একা নজর দেবার কে? আজ আসুক দাদা। বিবাদ না করে অম্বুর উপায় আছে?

ওদের বাবা ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গেলেও তিনি বিবাদ করার মতো বিস্তর ধনসম্পত্তি রেখে গেছেন। এদিকে ওদের মা উমারানী গত হয়েছে একবছরও হয়নি। বাবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি আর মায়ের স্ত্রীধন সব মিলিয়ে ওরা দুভাই যা পেয়েছে তা নিয়ে বিবাদ জমে উঠার আগেই একটা ঘটনা দুজনের সম্পর্ক শীতল করে দিয়েছিল। আঠারকোটা মৌজার ধানি জমি আর পুকুর ইজারা দেওয়া নিয়েই দুজনের মন কষাকষির সূত্রপাত।

শম্ভু দত্ত পরিবারের বড় সন্তান হয়েছে দেখে স্বেচ্ছাচারিতা করবে, ছোট ভাইকে না জানিয়ে এজমালি সম্পত্তি ইজারা দিয়ে গোপনে অগ্রিম টাকা নিয়ে নিবে আর ছোট হয়ে অম্বু কিছু বলবে না, সে তো হবার নয়। তাই হাটবার আমির মুহুরির কাছে খবরটা শুনে অম্বু বাড়িতে এসে শম্ভুকে ইচ্ছেমতো কথা শুনিয়েছে। শম্ভু ভারি গলায় ভাইকে বলেছে, ওসব নিয়ে ওর মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আঠারকোটার জমি আর পুকুর দূরে হওয়ায় নিজেরা ভোগদখলে রাখা মুশকিল। তাই সে ইজারা দেওয়ার কথা ভেবেছে। টাকা পয়সা যা পাবে তা দুই ভাই ভাগ করেই নিবে, ভাইয়ের ঐসব বোঝার বুদ্ধি হয়নি তাই বলার প্রয়োজন মনে করেনি সে।

দাদার কথা শুনে দিপার মা মুখ টিপে হেসেছে সেদিন। স্ত্রীর মুখের তাচ্ছিল্যের হাসিটুকু আজও ওর বুকে বিঁধে আছে। স্ত্রীর সামনে সম্মানহানি হলে যে কোনো স্বামীর পক্ষে মানা মুশকিল। সেদিনের পর থেকে তাই দাদার প্রতি নিজের অসন্তুষ্টভাব লুকিয়ে রাখতে পারে না অম্বু। যদিও অম্বু স্বীকার করে জমিজিরাতের প্যাঁচগোচ সে দাদার মতো ভালো বোঝে না। এসবের যাবতীয় খোঁজখবর শম্ভুই রাখে। দিপার মা মাঝেমাঝে বলে, নিজেদের কাছে এক ফর্দ কাগজপত্র রাখা জরুরি। বিশ্বাস করে দাদার হাতে সব ছেড়ে দিয়েছে সে আর দাদাই যে কালে কালে যক্ষ হয়ে উঠবে তা তো অম্বু বুঝতেই পারেনি।

কত কী ভাবতে ভাবতে বেলা ফুরিয়েছে। সূর্য ডুবেছে।

সোমা ছুটে এসে স্বামীর কানে খবরটা দেয়। শম্ভু ফিরেছে। মুখ ভার করে আছে। অম্বু সারাদিনের না খাওয়া, মাথা তেতে আছে তার। ঐ অবস্থাতেই সে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

এদেশ ছাড়ি ওদেশ ছাড়ি
উড়ে যায় পাখি
দুঃখ উড়ে পাখির ডানায়
সুখ বেঁধে রাখি।

শম্ভুর ঘরের দেয়ালে ঝোলানো চিত্রলিপিটির ফ্রেমের এক কোণ আলগা হয়ে গেছে। এ ঘরের সাজসজ্জার দিকে এখন নজর নেই কারো। মা উমারানীর মৃত্যুর পর থেকে শম্ভু বাবা-মায়ের ঘরে থাকে। আর বাড়ির পশ্চিম দিকে শম্ভুর বড় ঘরখানায় এখন সপরিবারে অম্বু থাকে।

শম্ভুর ঘরের মাঝখানে সিংহমাথার নকশার প্রাচীন আমলের পালংক। অম্বুকে সে বাবা-মায়ের পালংক নেওয়ার জন্য সাধাসাধি করেছিল, কিন্তু বাবা-মায়ের ঘরের জিনিসপত্র এদিক-সেদিক করতে সে রাজী হয়নি। এই পালংক ছাড়া এই ঘরের আসবাবপত্র বলতে আছে বিশাল এক কাঠের আলমারি, লেপ-তোশকে ঠাসা টিনের একটা বড় তোরঙ্গ, এক সেট টেবিল চেয়ার আর কাঠের নকশাদার ফ্রেমে বাঁধা আয়নাসহ কাপড় ঝোলানোর একটা আলনা।

শম্ভু অকৃতদার। এই ঘরে কোনো নারীস্পর্শ নেই তা চারপাশে একবার চোখ বুলালেই বোঝা যায়। এই ঘরের জিনিসপত্র অবিন্যস্তই থাকে। সোমা পারতপক্ষে ভাসুরের ঘরে ঢোকে না। মানুষটা নিজের মতো থাকে। খাওয়ার সময় হলেই কেবল তার হাঁকডাক শোনা যায়।

সোমা শাশুড়ির কাছে শুনেছে, সম্ভ্রান্ত এক কায়স্থ পরিবারে বিয়ে ঠিক হয়েছিল তার ভাসুরের। অপূর্ব সুন্দরী কনেকে দেখে খুব পছন্দ করেছিল পরিবারের সবাই। প্রথম দর্শনেই পাকা কথা হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের ঠিক দুদিন আগে ওই বাড়িতে ডাকাত পড়ে কনেসহ পরিবারের কর্তা-কর্ত্রী খুন হয়ে যান। এরপর থেকে শম্ভুকে কেউ আর বিয়েতে রাজি করাতে পারেনি।

ঘরে ঢুকে সোমা স্বামীর চোখে চোখ রেখে ইশারা করে। অম্বু কোনোরকম ভনিতা না করে দাদাকে বলে, ‘কাগজপত্রে একা হাত দিছেন ক্যান আপনি? এমন তো কথা ছিল না।’

ভাইয়ের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায় না শম্ভু। সে খাটের ওপরে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বসে থাকে। অম্বু তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে পালংকের ওপরে রাখা বাকসোখানা দেখে। তারপর হাত বাড়িয়ে সেটিকে কাছে টেনে ভেতরের দলিল-দস্তাবেজ নেড়েচেড়ে দেখে। কাগজপত্র না বুঝলেও সংখ্যা গুনে নিয়ে সে প্রসন্ন চোখে দাদার দিকে তাকায়।

‘কী এমন দরকার পড়ল যে আমারে না জানাইয়া দলিলপত্র নিয়া আপনার বাইরে যাওয়া লাগল?’

যথাসম্ভব ভারি কণ্ঠে বলে অম্বু। প্রাথমিক উত্তেজনা কেটে গেছে তার। এবার সে খেয়াল করে দাদা ডানহাতে একটা হলদে রঙা স্ট্যাম্প পেপার আঁকড়ে ধরে আছে। অম্বু ভ্রু কুঁচকে সোমার দিকে তাকায়।

সে ভাইকে দ্বিতীয়বারের মতো আক্রমণ করার আগেই শম্ভু ম্লানমুখে বলে, ‘বস অম্বা, তোর সাথে কথা আছে।’

অম্বু বিনা বাক্যব্যয়ে দাদার পাশে বসে পড়ে। ভাইয়ের দিকে না তাকিয়ে হাতের নকশাকাটা স্ট্যাম্প পেপারটি খুলে শম্ভু পড়তে শুরু করে,

‘নিবেদন এই যে, আঠারকোটা মৌজার নিম্ন তফসিলবর্ণিত জমি জমার মালিক চম্পা দত্ত ও শম্পা দত্ত বহুদিন পূর্বে ভারত চলিয়া গিয়াছেন এবং উক্ত সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হিসাবে রহিয়াছে। আমি উক্ত সম্পত্তি বন্দোবস্ত লইতে ইচ্ছুক আছি। বিধায় প্রার্থনা এই যে, দয়া করিয়া উক্ত সম্পত্তি আমার নামে বন্দোবস্ত দিবার যথাবিহিত আদেশদানে মর্জি হয়।

ইতি

৫/১২/৭০

বিনীত মোঃ ইছাহাক মিঞা’

বোকাসোকা অম্বুর কাছে বড় গোলমেলে লাগে দরখাস্তের ভাষা। দাদার হাত থেকে স্ট্যাম্প পেপারটি নিয়ে সে আরেকবার পড়ে। এই পরিবারের মানুষ চম্পা ও শম্পা দত্তের নাম ছাড়া এ কাগজে লেখা কোনো শব্দই ওর চেনা না। এসব কথার কোনো কিছুই পরিষ্কারভাবে বুঝতে না পেরে অম্বু হাল ছেড়ে দেয়া ভঙ্গিতে সোমার দিকে তাকায়। বিচলিত ভাইয়ের দিকে দৃষ্টি না দিয়েই শম্ভু নেপথ্যের ঘটনা বলতে শুরু করে।

সেই সত্তর সাল থেকে নাকি এই বাড়ির জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে রেখেছে ইছাহাক মিয়া। তার ওয়ারিশরা লিজ নবায়নও করেছে। এতদিন কাগজপত্র দেখায়নি ইছাহাকের ছেলের ঘরের নাতি হানিফ। সব গোপন করে তাদের দুই ভাইয়ের কাছ থেকে বছর খানেক আগে আঠারকোটা মৌজার ধানি জমি আর পুকুর ইজারাও নিয়েছে। সপ্তাহ খানেক আগে হানিফের সঙ্গে টাকা নিয়ে তর্কাতর্কি হওয়ার সময় সে জানিয়েছে, এ জমির মালিক অম্বু বা শম্ভু কেউই না, সরকার। সরকারের কাছ থেকেই ইজারা নবায়ন করেছে তারা। ওর কাছে নাকি কাগজপত্র আছে।

আমির মুহুরি শম্ভুকে এসব কাগজের নকল তুলে দিয়েছে। সরকার নতুন করে অর্পিত সম্পত্তির গেজেট প্রকাশ করেছে। সরকারি সেরেস্তায় গিয়ে শম্ভু নিজের চোখে দেখে এসেছে, শুধু আঠারকোটা মৌজার জমিজমা না তাদের এই ভিটেবাড়িও সরকারের নামে রেকর্ড হয়েছে।

শম্ভু হলদে কাগজখানা উল্টাতেই দেখা যায় পরের কাগজে ইংরেজিতে কীসব লেখা। সে ইংরেজি পৃষ্ঠাটি ছোট ভাইয়ের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলে, ‘এই সেই আদেশনামা।’

অম্বু অত ইংরেজি, বাংলা বোঝে না। কিছুক্ষণ আগে শোনা শব্দরাশির মধ্য থেকে দুটো বিশেষ শব্দ ওর শূন্য করোটিতে ক্রমাগত পাক খেতে থাকে। গোলমেলে ভাবনা থেকে কোনোরকমে নিজেকে বিযুক্ত করে সে দাদার কাছে প্রশ্ন করে, ‘দাদা, শত্রু সম্পত্তি কী? আমরা কি দেশের শত্তুর? নাকি চম্পা ঠাকুমা আর শম্পা ঠাকুমা শত্তুর?’

ভাইয়ের কথার উত্তর দেয় না শম্ভু, কিছু একটা বিড়বিড় করতে করতে বাড়ির পেছনের কুয়োর পাড়ে চলে যায়। শম্ভুর পিছু পিছু হাঁটতে থাকা উৎকর্ণ অম্বু অনেক চেষ্টা করেও সেসব কথা শুনতে পায় না।

মুখবোঁজা কুয়ো পাড়ে দাঁড়িয়ে শম্ভু ভেতরে উঁকি দেয়। কীসব বিড়বিড় করে। শম্ভুর কাঁচাপাকা চুল বাতাসে এলোমেলো হয়ে যায়। খুব কাছেই ডাকে ক্লান্ত ডানার পাখি, টুউউব...। অম্বু ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে দাদাকে দেখে। দাদাকে অবিকল বাবার মতো দেখাচ্ছে। গম্ভীর, ধ্যানী পুরুষ যেন। সময়ে-অসময়ে তাদের বাবাও এমন কুয়োপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন।

শম্ভু এবার শান্তস্বরে ভাইকে জানাতে থাকে সকল বৃত্তান্ত। চম্পা আর শম্পা দত্ত পঁয়ষট্টি সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে দেশত্যাগ করে ভারতে যায়নি, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এদেশেই দেহত্যাগ করেছে; মোকদ্দমা করে সাক্ষী-সাবুদ দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে।

সবকিছু গোলমেলে লাগে অম্বুর কাছে। ওদের পূর্বপুরুষেরা এদেশের মাটিতে দেহ রেখেছে তা প্রমাণ করতে না পারলে এই ভিটেবাড়ি নাকি কাগজেকলমে সরকারের নামে লেখা হয়ে যাবে, এ কেমন আইন তার মাথায় ঢোকে না। সে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে দাদার দিকে তাকায়। পুনরায় জানতে চায়, শত্রু সম্পত্তি কী?

ভাইকে নিজের সীমাবদ্ধ জ্ঞানে বিষয়টা বুঝিয়ে দিয়ে শম্ভু আকুলকরা দৃষ্টিতে কুয়ার দিকে তাকায়। যেন এই কুয়ার ভেতরে লুকিয়ে আছে সব উত্তর, রহস্যভেদের মন্ত্র। সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে বহুক্ষণ তাকিয়ে থেকেও শম্ভু খুঁজে পায় না সেই মন্ত্র। মন্ত্রের বদলে কানের কাছে বাজতে থাকতে আমির মুহুরির কথাগুলো।

হিন্দুদের পরিত্যক্ত সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল পাকিস্তান সরকার, সেই সম্পত্তি দেশ স্বাধীনের পর অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় ঢুকানো হয়েছে। এসব কথা পরিষ্কার বুঝলেও এই তালিকায় তাদের চৌদ্দ পুরুষের ভিটেবাড়ি কী করে ঢুকে গেছে তা বোঝেনি শম্ভু।

দাদাকে নিশ্চুপ দেখে কথা খুঁজে পায় না অম্বু। সে এক ছুটে বাড়ির ভেতরে যায়। মিনিট দশেক পরে হাঁপাতে হাঁপাতে অম্বু কুয়োর ধারে ফিরে আসে। শম্ভু দেখে ওর মাথার চুল উসকোখুসকো, চোখে-নাকে ধূলার আস্তর আর হাতে চম্পা ঠাকুমার সুঁই সুতায় বোনা সকল চিত্রলিপি।

‘দাদা এই তো চম্পা ঠাকুমা থাকার প্রমাণ। চিন্তা নাই। এইগুলা কোটে জমা দিলেই হইব দাদা।’

শম্ভু ভাইয়ের হাতের সাক্ষ্য-সবুদের দিকে ঘোলা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ফ্রেমগুলোর উপরের ফ্রেমটি দৃষ্টিসন্ধির কাছাকাছি থাকলেও লাল-সবুজ সুতায় বোনা ছন্দটি সে কোনোভাবেই পড়তে পারে না।



পরেরদিন সকালে কোনোরকমে পাতের ভাতটুকু নাকেমুখে খেয়ে বাবার বাকসোখানা বগলদাবা করে শম্ভু নিতাইয়ের বাড়ি চলে যায়। নিতাই নওটিকা গ্রামের দেওয়ানী। এই গ্রামের মানুষের সহজাত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো চোখের পলকে শরীকেরা পরস্পরের গায়ে হাত উঠায়। জমিজমা নিয়ে এ ওর সঙ্গে বিরোধ বাঁধায়। গাঁয়ের দেওয়ানীর সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে করতে সকলের বিরোধ শেষ পর্যন্ত কোর্টকাচারি অব্দি গড়ায়।

ভাইয়ে ভাইয়ে, শরীকে শরীকে জমিজমা নিয়ে মামলা মোকদ্দমা চলমান এমন বাড়ি নওটিকা গ্রামের প্রতি মাইলে অন্তত দুটো করে আছে। মোকদ্দমা দায়েরের সম্ভাবনা তৈরি হলে যেকোনো বাড়িতে আমির মুহুরির আসা-যাওয়া বেড়ে যায়। দেওয়ানী নিতাইয়েরও কদর বাড়ে। ওদিকে শরীকান বিরোধের জেরে ভাইয়ে ভাইয়ে, বাবা ছেলের মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়। তবে দত্ত বাড়িতে এবার ব্যতিক্রম হয়েছে। মামলা-মোকদ্দমার কারণে দুই ভাই দূরে যাবার বদলে কাছাকাছি চলে এসেছে। অম্বু দেখছে উকিল-মোক্তার ধরে খেটেখুটে শম্ভুই তাদের সম্পত্তি সরকারের তালিকা মুক্ত করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। অম্বু এখন আর ভাবতেও পারে না, দাদা ভেতরে ভেতরে ওকে ঠকাচ্ছে।

শম্ভু যেদিন প্রথম সদরে গিয়ে উকিল সাহেবের সঙ্গে বুঝেশুনে মামলার আরজির খসড়া করেছে সেদিনই কেবল অম্বু সঙ্গে গেছে। নীল কাগজে স্বাক্ষর করেছে। মোকদ্দমার তদবিরকারক হিসেবে দাদার ওপরে সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে সে এখন মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয়ে আছে।

এরপর একবছর দুবছর করে বছর চার পার হয়েছে। কোর্ট-কাচারি দৌড়ানো শম্ভুর বয়স বেড়েছে। দাদার ওপরে নির্ভরতা বেড়েছে অম্বুর। সরল হয়েছে সোমার ভ্রুকুটি। নিঃসঙ্গ আর সংসারে নিবেদিতপ্রাণ মানুষটির প্রতি দায়বদ্ধতাও বেড়েছে তার।

আজ বাড়িতে পা দিয়েও ভাতের খোঁজ করেনি দেখে সোমা দিপাকে পাঠিয়েছে জ্যেঠুর খোঁজ নিতে। এদিকে বাড়ি ফিরেই শম্ভু কুয়োপাড়ে বসেছে। খেতেও আসেনি। দূর থেকে জ্যেঠুকে দেখে ডাকবে কি ডাকবে না ভাবতে থাকে দিপা।

কোমল স্বরে পাখি ডাকছে। বাড়ির চৌহদ্দির ভেতরের সব গাছের সবুজ, ফিকে সবুজ পাতায় মুখ গুঁজেছে বিকেলের শেষ রং। সাদা আর গোলাপি নয়নতারারা দুলছে। জাংলায় নাচছে পুঁইয়ের কচি ডগা। হলুদ হলুদ চাঁপা ফুলের ঝুমকোর পাশে উড়ছে ফড়িং। কাঁচা সবুজ টিয়ে উঁকি দিচ্ছে জলপাইয়ের ঘন পাতার আড়ালে। দূরে ডাকছে পাখি, টুউউউব...। এত নির্মল বিকেল তবু কোনো সুন্দরই সুন্দর হয়ে ধরা দিচ্ছে না শম্ভুর চোখে।

কুয়োর পাড়ে পিঠ ঠেকিয়ে শ্রান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে সে। এই কুয়োতে জল নেই। মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাবার হাত ধরে যেদিন ওরা এই বাড়িতে ফিরে এসেছিল সেদিন থেকে এই কুয়োর মুখ বোঁজা দেখছে। বাবার হাতে দলিল-দস্তাবেজ ফিরিয়ে দিতে দিতে নিজামুদ্দিন কাকা সেদিন ভয়ানক এক কাহিনি শুনিয়েছিলেন।

এই কুয়ো এমনি এমনি বন্ধ হয়নি। হাত-পা বাঁধা অর্ধগলিত লাশে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কুয়োর মুখ। তিন-চার হাত নিচ থেকে পানির বদলে লাশে ভরেছিল। কোনোটার মাথা ছিল। কোনোটার মাথা ছিল না। নাক-মুখ কাপড়ে জড়ানো ছিল। নিচের দিকে ছিল হাড়গোড় আর মাথার খুলি। মানুষের পরিধেয় পোশাকগুলো চেনা যাচ্ছিল না রক্তের ছোপছাপে। নিজের বাবা-কাকার লাশ খুঁজতে এসে চম্পা দত্তের শরীরে প্যাঁচানো সাদা থান তবু ঠিকই চিনেছিলেন নিজামুদ্দিন কাকা। এরপর কুয়োর মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন কাকা। এখন কুয়োর ভেতরে মাটি আর আবর্জনার স্তূপ।

অকস্মাৎ জলঠান্ডা হাওয়ার পরশ লাগে শম্ভুর পিঠে। মামলায় হেরে যাবার অবিনাশী দুঃখ ফুলে ফুলে ওঠে সেই হাওয়ায়। নিজেদের পক্ষে রায় পায়নি ওরা দুই ভাই। অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালের বিচারক রায়ের আদেশ অংশ উন্মুক্ত আদালতে ঘোষণা করেছেন, ‘অতএব আদেশ হলো যে, দরখাস্তটি দোতরফাসূত্রে বিনা খরচায় নামঞ্জুর করা হলো।’

উকিল সাহেব বলেছে, এস.এ রেকর্ডীয় প্রজা চম্পা ও শম্পা দত্ত পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে যে ভারতে গমন করেনি এবং দুজনে এদেশেই মৃত্যুবরণ করেছে তা সাক্ষ্যের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে পারেনি। তাই আদালত দরখাস্তের তফসিলভূক্ত সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ যাবে না বলে সরকারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এখন রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আদালতে যেতে হবে। উকিল সাহেবের আশ্বাস শুনেও শম্ভুর মনে হয়েছে ওর কোথাও যাওয়ার নেই।



পথ পড়ে রয় পথের ধারে
মা, চিনি না পথ, দেখাও মোরে

শম্ভুর ঘরে পশ্চিমের দেয়ালে ঝুলানো এই চিত্রলিপির চারদিকে খয়েরি সুতার বুননে ‘মা’ শব্দটি লেখা। সময়ের ভারে শিল্পীর নাম ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল। ওদের মা উমারানী নতুন করে চেইন ফোঁড় তুলেছে, সন ১৩৭৫, চম্পা।

চাঁপা ফুলের ঘ্রাণ লাগে নাকে। চাঁপার হলুদ গুচ্ছফুলে ছেয়ে গেছে গাছ। দলবেঁধে সব কুঁড়ি আজই ফুল হয়েছে। শেষ বিকালের ¤্রয়িমান আলোয় নিচে বসে সকল ফুলের সুবাস বুকের ভেতরে টেনে নিচ্ছে শম্ভু। দিপা ডাকছে, ‘জ্যেঠু, ও জ্যেঠু...।’ দিপার মিহিকণ্ঠের ডাক কেউ শুনতে পাচ্ছে না। শুনতে পাচ্ছে পাখির টুউব...ডাক। অক্লান্ত দিপা বার বার ডাকে, ‘জ্যেঠু, ও জ্যেঠু...।’

চোখ মুছতে মুছতে শম্ভু এবার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়, যে বাড়ির চৌহদ্দি দ্রুতই পাল্টে যাবে। কী মনে হয়, হঠাৎ ঘুরে কুয়োর দিকে ফেরে শম্ভু। একটা ঢিল ছোঁড়ে কুয়োর বন্ধ মুখে। লাল ইটের টুকরোটি আটকে থাকে আবর্জনার স্তূপে। খুব ছোটবেলায় এমন ঢিল মারলে তা নিমিষেই কুয়োর অভ্যন্তরে হারিয়ে যেতো। শম্ভু তবু উঁকি দিয়ে দেখতো হতচ্ছাড়া ঢিল কোথায় হারালো।

শম্ভু আবার ঢিল ছোঁড়ে। এবার টুপ করে একটা আওয়াজ হয়। বুক ঢিবঢিব করে শম্ভুর। সে কুয়োর ভেতরে উঁকি দেয়। কিছুক্ষণ আগে বুকের ভেতরে জাপটে ধরা ভয়টা সরসর করে সরে যায়। জলডোবা চোখে শম্ভু দেখে কুয়ার ভেতরে পরিচ্ছন্ন জল টলমল করছে। আর জলের আয়নায় ভেসে উঠেছে কত চেনা মুখ।

কুয়োর জল বাড়ে। বাড়ে ঠান্ডা হাওয়ার তোড়। শম্ভুর চোখ গড়িয়ে পড়া জল কুয়োর ভেতরে পড়তে থাকে...টুপটাপ, টুপটাপ...।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ