মোস্তফা অভির গল্প : আলোকবর্ষ দূরে



মিয়ামি বিমানবন্দরে তখনো সন্ধ্যা নামেনি। আকাশটা ভীষণরকমের সুন্দর, কোথাও এক টুকরো মেঘের দেখা নেই। আমাদের বিমানটা মাটি স্পর্শ করল। ইমিগ্রেশন পেরিয়ে আমরা একজন একজন করে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের দু’পাশে দু’জন করে মার্কিন সোলজার।ওরা নিজেদের পেশাদারিত্ব বজায় রেখে হেঁটে যাচ্ছে। আমাদের ভেঙেপরা শরীর, ক্ষুধার্ত পেটে নাড়িভুঁড়িগুলো সহস্রমাইল রেসের ঘোড়ার মত দৌঁড়াচ্ছে। উনিশ ঘণ্টা জার্নির পর শরীরে একফোটাও শক্তি নেই। আমরা বিমানবন্দরের সীমানা পেরিয়ে গাড়ি পার্কিং করা লটের এক প্রান্তে জড়ো হলাম, যেখানে দাঁড়িয়ে খোলা জমিনটা বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়। সামান্য দূরে কিছুসংখ্যক লোক জড়ো হয়ে আমাদের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে ছিল যেন, ভিন্ন কোনো গ্রহের জীব আমরা। আফগানী সংস্কতির পোশাকে আমাদের শরীর এতটাই আবৃত ছিল, সম্ভবত তারা কোনো মার্কিন নারীকে এইরকম পোশাকে দেখায় অভ্যস্ত ছিল না।

দু’জন নারী সোলজার আমাদের ব্যাগ তল্লাসি করল। আমাদের কোমড়ের নিচে হাত দিয়ে কাপড়ের আচ্ছাদনে ঢাকা স্থানগুলো পরখ করল। তারপর একজন করে জীপে উঠিয়ে দুদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসিয়ে দিল। আমরা বোবা আর অর্থহীন মানুষের মত মার্কিন মুলুকের হরেক রকম চেহারার মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাদের বেশি দূর যেতে হয়নি। মিনিট কুড়ি পর জীপ এসে নিরিবিলি একটা জায়গায় থামল। সোলজারদের প্রধান মিস্টার স্টিভ আমাদের সেখানেই নামতে বললেন। পাচীলঘেরা একটা মাঠে নিয়ে আমাদের শুমারি করা হল, সংখ্যায় আমারা একান্নজন অথচ লিপিকার জোরশব্দে উচ্চারণ করলেন বায়ান্ন। অবশ্য পরে সেই রহস্যটা কেটে গিয়েছিল আমার। আমাদের দলের ভেতর একটা মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা ছিল। আর শুমারিতে মেয়েটাকে দু’জন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা দীর্ঘভ্রমণের ব্যথায়, যন্ত্রণায় এতটাই ক্লান্ত ছিলাম, যে-কোনো মুহূর্তে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারতাম। হতে পারে সেটা কোনো দৈব আশীর্বাদ, আমরা ক্লান্তির পরেও দীর্ঘক্ষণ মাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম। মিস্টার স্টিভ ও তার দল আমাদের একটা হলরুমে নিয়ে গেলেন। রাতটা সেখানেই কাটিয়ে দিলাম।



পরদিন যখন ঘুম ভাঙে, তখন দিনের প্রায় অর্ধেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা দেয়ালের বাইরে বেরোলাম। এই প্রথম মার্কিন মুলুকের দিনের স্পষ্ট আলো আমাদের চোখে পড়ল। চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আমার মনে হল, এ এক আজব দেশ। যেন আমরা কোনো সুদূরের দ্বীপ থেকে ছাড়া পেয়ে হঠাৎ কোনো সুখের লোকালয়ে পা রেখেছি। চারদিকটা এত ঝকঝকে আর উজ্জ্বল, দূর থেকে দালানের চূড়াগুলো অন্যরকম সুন্দর দেখা যায়।

সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আমরা অপরিচিত কিছু খাবার খেলাম। যা ছিল অত্যন্ত সুস্বাদু এবং রুচিকর। খাবার জল এতটাই স্বচ্ছ আর উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল, আমরা ঢকঢক করে পুরো বোতল খালি করে ফেললাম। মিস্টার স্টিভ আমাদের আবার দেয়ালের ভেতর, যেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সেখানে যেতে আদেশ করলেন।

আমাদের হাঁটার গতি খুবই মন্থর, কোমড়ে প্রচণ্ড ব্যাথা আর পায়ের পেশীগুলো অসাড় হয়ে আসছে। আমরা সেনা ক্যাম্পের দূরে একটা মোটামোটা অল্পবয়সি ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমাদের দেখে ছেলেটির মনে কী প্রতিক্রিয়া খেলা করছে কে জানে! ছেলেটির ছোট্ট মুখের দিকে তাকিয়ে আমার ভেতর অপরিশীম মায়া জন্মালো। তবে আমার ভেতরটা এমন এক নীল শূন্যতায় ভরা, কিছুতেই আর যেন স্বস্তি মেলে না। আমাদের সঙ্গের ছেলেদের আলাদা পথে নিয়ে যাওয়া হল। আমরাও বিশ্রাম নেওয়ার ঘরটির দিকে ধীরপায়ে হাঁটতে লাগলাম। ভেতরে আমাদের দেখভালের জন্য সুশ্রী দু’জন নারী সোলজার পাঠানো হল। ওরা দেখতে এতটাই সুন্দরী আর ওদের পেশাদার পোশাকে খুব সুন্দর মানিয়েছিল! অমরা বোবা প্রাণির মত ওদের মুখের দিকে নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলাম। ওরা ইংরেজি ভাষায় আমাদের কিছু উপদেশ দিয়ে চলে গেলো। আমরা মেঝের ওপর কিছুটা আরামদায়ক বিছানা পেয়ে শুয়ে পড়লাম।

আমি ঘুমানোর খুব চেষ্টা করলাম অথচ, এত ক্লান্তিতেও আমার ঘুম কোথায় চলে গেছে জানিনা! আমি ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলাম আর আমার মনে পড়ল অতীত জীবনের সমস্ত সুখের দিনগুলির কথা। আমি কোথায় ছিলাম! সহস্রমাইল দূরের সেই উঁচু-নিচু পথ, পাথরের পাহাড় আর পাহাড়ের ঢালে বসবাসকরা হাসিখুসি মানুষগুলো। আর আমাকে পাগলের মত ভালোবাসত বাংলাদেশের এক নিরীহ যুবক। যাকে কখনোই আমি পাত্তা দিতাম না। এমনকি আমার জন্য না খেতে খেতে ছেলেটি মরণপন্ন অবস্থায় পড়েছিল অথচ ওর জন্য আমার মনে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া ছিল না। আমি কী এতটাই নিষ্ঠুর!

আমার চারপাশে মেয়েগুলো কেমন নেশাতুরের মত ঘুমাচ্ছে। ওদের বুকের ওপর কারো আলাদা কাপড় নেই। কারো কারো জামার ফাঁক দিয়ে ভারি স্তনগুলো বেরিয়ে আসছে। কারো জামা পেটের ওপর উল্টে যাওয়ায় ধবধবে সাদা চামড়া দেখা যায়। কেউ আবার অন্যের শরীরে পা তুলে ক্লান্ত পশুর মত ঘুমায়। বিকেলটা যখন প্রায় মরে এসেছে আমি জানালার গ্লাস ঠেলে একদিকে সরিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। নিজদেশে থাকাকালীন আমি এই সময়ে ছাগলগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরতাম। তখন, সেই সময়ে আঁধার আর আলো এতটা রহস্যময়ভাবে খেলা করত, আমি প্রকৃতির সেই রূপটিকে খুব উপভোগ করতাম। কিছুক্ষণ পর মার্কিন প্রকৃতিতে সন্ধ্যার ছায়া নেমে চারপাশটা আঁধারে ঢেকে গেল। আমি নিজ ভূমি থেকে বহু বহু প্রান্তর, সমুদ্র আর লোকালয় ছেড়ে অচেনা পৃথিবীর আঁধারের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম।

জানালার ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যার কালোছায়া ভেতরে খেলা করতে শুরু করেছে। মনে হল, বাইরের আঁধারের মত আমার জীবনটাও অন্ধকার, মলিন। যেন পূর্বপুরুষের কোনো অভিসাপের প্রতিফলন হচ্ছে আমার ওপর। একজন মানুষের জীবনে এতটা উত্থান-পতন যে থাকতে পারে, অতীতে কখনোই আমার জানা ছিল না।



আমার মনে পড়ল ছোট্টবেলার সেইসব স্মৃতির কথা। সকালে পাল থেকে ছাগলগুলো বের করে পাহাড়ের ঢালে দিয়ে আসতাম। আর আমার মা, যিনি সর্বদা ভাবতেন যে-কোনো মুহূর্তে পাহাড়ের উপত্যাকা থেকে বন্দুকের নল উঁচিয়ে কোনো মুজাহেদিন আমাকে জিম্মি করে নিয়ে যাবে। ওরা গুহার ভেতরে মোমবাতির আলো জ্বেলে আমাকে কনের আসনের মতো হাঁটুগেড়ে বসাবে। তারপর কোনো এক মধ্যবয়সি পুরুষের দিকে আঙুল ইশারা করে সরা জারি করবে। নিকাহ সম্পন্ন হলে গুহার ভেতরের কোনো কোটরে নিয়ে যাবে আমাকে। তারপর বহুদিনের অতপ্ত আত্মায় যৌবনের সমস্ত কামনা ঢেলে দিয়ে আমাকে ভোগ করবে লোকটা। তৃপ্ত হওয়ার পর আমাকে বসিয়ে ধর্মীয় মাছায়েল বলবে। এই যেমন, নারীদেরকে এই পৃথিবীতে কেন পাঠানো হয়েছে আর তারা কী কী উপায়ে নিজনিজ পুরুষের আত্মাকে তৃপ্ত করে বেহেস্ত জয় করতে পারে, সেসব। আমি সেই বন্দিদশা থেকে কখনোই মুক্ত হতে পারবো না।

যেহেতু আমার বাবা ছিল না। আমি ছিলাম এতিম এক কিশোরী। চাচাজানেরা আমাকে যেটুকু যত্ন করতেন তা শুধুমাত্র মায়ের জন্য। এক কথায় মায়ের মতো রূপবতী নারী আর হয় না। দাদু আমাকে এতটাই ভালোবাসতেন যা ছিল একজন পবিত্র আত্মার মানুষের থেকে সত্যিকারের ভালোবাসার প্রতীক। আমিও দাদুকে মনে মনে ভীষণ পছন্দ করতাম। তার সুললিত কণ্ঠের কাছিদাপাঠ আমার ভেতরকে খুব আলোড়িত করত। আমি বৃদ্ধ মানুষটির ইনসাফ আর শততায় মুগ্ধ ছিলাম।

আমাদের বাড়ি ছিল তাজাকাস্থান সীমান্তে। খুগজ এলাকার দুটো পাহাড়ি উপত্যাকার একপাশে দীর্ঘ পপি চাষের ক্ষেত, অন্যদিকের লোকালয়ে আমাদের বাড়ি। কখনো এমন হত, আমি ছাগল চড়াতে চড়াতে সীমান্তের কাছে চলে যেতাম। ওপারের পুরাকীর্তি, ঝকঝকে সড়ক আর সুদৃশ্য নকশাদার বাড়িগুলোর দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতাম। সীমান্তের খুব কাছাকাছি কয়েকঘর শিয়া মুসলিমদের বসবাস। আমার চোখে তারা ছিলেন অত্যন্ত সৎ আর দয়ালু। আমি ঠিক জানিনা সেটা আমার কেন মনে হত, শিয়া পরিবারের প্রতিটি সদস্য প্রায় দেখতে ছিল একইরকম। তারা কথায় কথায় ইয়া আলী উচ্চারণে হৃদয়ে অদৃশ্য শক্তি সঞ্চয় করতেন। তারা খুব পরিশ্রমী ছিলেন আর সারাবছর তুলা চাষ করে এমনকি তালিবানিদের দেওয়া জমিতে পপি ফসল বুনতেন। আমি সেই শিয়া পরিবারে তাপসী রাবেয়া নামক এক বন্ধুকে পেয়েছিলাম। আমার আর তাপসী রাবেয়ার বন্ধুত্ব ছিল অত্যন্ত নিবিড় আর আমরা একসঙ্গে বিদেশি আশীর্বাদপুষ্ট একটা স্কুলে পড়তাম। আমরা দুজনেই খুব ধর্মানুরাগী ছিলাম। প্রতিদিন বিকেলে কোরআন পড়ে আমরা আত্মাকে পবিত্র করতাম। তখন আমাদের ভেতরে এমন এক ঐশ্বরিক পুলকতা খেলা করত, আমরা মনে মনে শুদ্ধ হয়ে উঠতাম। বিকেলের শেষ আলোর সময় আমরা দুজন সীমান্তের কাছে কোনো উইলো গাছের নিচে বসে জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর গল্প করতাম। কখনো এমন হত, তালিবান যোদ্ধারা পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে ফরমান জারি করত। তারা পাহাড়ি সড়কে গাছ ফেলে মার্কিন বাহিনীর গতিরোধ করত। যখন প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পেতাম কিছুদিনের জন্য আমার আর তাপসী রাবেয়ার মধ্যে সময়ের বিচ্ছেদ ঘটত। তখন আমরা দু’জন দু’জনার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তাম।

বাবা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি অতটা সুদর্শন ছিল না সত্যি তবে আমি বারবার বাবার পুরুষালি ভ্রুর দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতাম। তার ছিল আজানুলম্বিত দাড়ি। ঘনো ঘনো চোখের পলক ফেলতেন আর আঞ্চলিক পশতুনে প্রচুর কথা বলতেন। আমি তাকে কখনো নিষ্ঠুর হতে দেখিনি। ফজরের সময় বাবা জোর উচ্চারণে কেরাত পড়ে নামায় আদায় করতেন। আমি ঘুমঘুম চোখে বাবার কণ্ঠের কেরাত শুনে মুগ্ধ হতাম। তার তেলাওয়াতের সুর আমাকে এতটাই আপ্লুত করত, মনে হত আমি দূর থেকে ভেসে আসা কোনো ধর্মীয় বয়ান শুনছি। ঘুম, স্বপ্ন আর জাগরণ এই তিন মিলে আমার ভেতর এমন এক আবহ তৈরি হত, ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত আমি রহস্যময় ঘোরে বিভোর হয়ে থাকতাম। আমিও বাবাকে প্রচণ্ডরকম ভালোবাসতাম।

একরাতে বাবা আমাদের বললেন, আমি চললাম। মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, দাদুর সাদা দাড়ি ভিজে ফোটায় ফোটায় জল গড়িয়ে পড়ল। চাচাজানেরা শতবার করে বাবাকে বারণ করলেন কিন্তু তিনি তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অনড়। সেই রাতে আমাদের কারো ঘুম হল না। আমি সারারাত আয়তকার জানালা দিয়ে বাইরের আঁধারের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হল, রাতটি যেন অক্ষয় হয়ে আছে। বহু বহু বছর পার হলেও সেই রাত আর কখনো ভোর হবে না। বাবা কালো আলখেল্লা পরলেন, মাথায় পাগড়ি বাঁধলেন তারপর আমাদের ছোট্ট উঠানটায় নেমে বারকয়েক জোরকণ্ঠে আল্লাহু আকবর ধ্বনি তুললেন। তার সেই কণ্ঠস্বর এমনভাবে গমগম করে উঠেছিল, সেরকম অচেনা কণ্ঠস্বর আগে কখনো শুনিনি। বাবা আবেগ তাড়িত হয়ে পড়লেন। সামান্য দূর থেকে আমার মাথাটা তার কাছে টেনে নিয়ে বুকের সাথে চেপে ধরলেন। আমি বাবার সেই স্নেহমেশানো বুকের উষ্ণতা আজও অনুভব করি। তিনি পথের দিকে প্রথম কদম ফেলার আগে আমার কপালে শেষ চুম্বন করলেন। তার বিসর্জিত অশ্রু ছিল একজন বাবার সত্যিকারের আবেগের। আমি বাবাকে বহু অনুনয় করে ফেরাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সবাইকে উপেক্ষা করে বাবা তালিবান মুজাহিদের কাতারে নাম লেখালেন।



সেটা আমার মায়ের অদৃষ্ট ছিল কী না জানিনা, হয়ত আমার এতিম হওয়া প্রকৃতি থেকেই নির্ধারিত ছিল। একদিন প্রভাতের প্রথম বাতাসের সাথে আমাদের কাছে দুঃসংবাদ এলো, বাবা ইসলামের তরে খোদার পথে জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই পৃথিবীর একপ্রান্তে আমি ও আমার মা এতটাই হতভাগা; প্রকতির এমন শাস্তিপ্রাপ্ত আর জগতের এতটাই অস্বীকৃত যে সত্যিই আমাদের চোখের সামনে ঘোর অমাবস্যা দেখা দিল। আমি ওটুকুন বয়সেই বুঝেছিলাম, পুরুষগুলোর লালসা নরকের বীজের সৃষ্টি। ওদের নিক্ষিপ্ত চাহনি যে-কোনো নারীকে অসীম যন্ত্রণার ভেতর ডুবিয়ে দিতে পারে। তখন আমার মা ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে দিশেহারা নারী।

নিয়তি আমাকে সবকিছু মেনে নিতে সাহায্য করেছিল। আমি চিন্তায় জারিত হয়ে ভাবতে থাকি, সেইসব দুঃসহ দিনগুলির কথা। যে কথাগুলো বলার মত তখন আমার কেউ ছিল না। এমনকি আমার বন্ধুতাপসী রাবেয়াও নয়। আমার ছোটচাচা, যে প্রায় আমরই সমান বয়সের আর আমার বাবার আপন ছোট ভাই। সে একদিন অন্ধকারে আমার চৌদ্দবছর বয়সের অগঠিত স্তন চেপে ধরল। যা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত অমর্যাদাকর আর লজ্জার। তখন আমার নিজেকে পৃথিবীর এতটাই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছিল যেন ছোট হতে হতে আমি ক্রমশই মাটির সাথে মিশে যাচ্ছি। সুঁচ ফোটার মতো একটা অসহনীয় ব্যাথা আমার সারা শরীর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। কেমন নির্লজ্জের মতো ঢিলে পাজামা খুলে আমার ডান হাতটা ওর শিশ্নের ওপর ধরেছিল। অথচ বহুদিন ধরে আমি ওর থেকে সতর্ক থাকতাম। সেই স্মৃতিটা এখন আমার জন্য এতটাই দুঃসহনীয়, আমার মনে হয়, পাথরের ওপর দিয়ে লিকলিকে একটা সাপ হেঁটে যাচ্ছে আর আমি ওটার শীতল শরীর স্পর্শ করছি। এসব ভাবনা আমাকে এমন এক স্রোতের ধারার ভেতর ঠেলে দেয়, মনে হয় আমি অচিরেই জলের অতল গহ্বরে ডুবে যাব। হয়ত সেখান থেকে কোনোদিন আর ফিরে আসা সম্ভব নয়।

মা আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, চিন্তা করোনা এসব হল আল্লারই ইচ্ছা। জগতে যা কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত আর যা ধ্বংস হবে সবকিছুই তিনি আগে থেকেই নির্ধারণ করে রাখেন। আর যে-কোনো মানুষ এমনকি প্রাণির পরিণামও খোদার অজানা থাকে না। কেননা, তিনি সৃষ্টির প্রমদিনেই আমাদের ভাগ্য সিদরাতুল মুনতাহায় সীমান্তের বরই গাছের পাতায় লিখে রেখেছেন। অথচ, মানুষগুলোর ঈমানের প্রতি আস্থা নেই, যেন ওদের কাছে জগতের সবকিছুই অবিনশ্বর। যেন অমর জীবন নিয়ে এসেছে ওরা। আমার দেবর প্রতিরাতেই আমার শরীর পেতে অপেক্ষা করে। আমি দরজা বন্ধ করে সালাতের মুছাল্লায় বসে দু’হাত তুলে খোদার কাছে প্রাথর্না করি। তখন খোদার প্রতি করুণায় আমার আত্মা পূর্ণহয়ে যায়। আমি প্রভূকে সত্য মনে করি আর অপেক্ষা করতে থাকি প্রথম ভোরের জন্য। আমি সেজাবনত হয়ে কাঁদতে কাঁদতেই ঘুমিয়ে পড়ি।

একদিন আমার মায়ের সকল সতর্কতা ব্যর্থহয়ে যায়। আমার মেঝো চাচাজান ইয়াজুজ মাজুজের মতো প্রতিরাতে মায়ের দরজার পাশে বসে বসে অপেক্ষা করত। ইয়াজুজ মাজুজ, যাকে বাইবেলে বলা হয়েছে গোগ উমাগোগ।পবিত্র কোরআন মতে, বাদশা জুলকারনায়েনের শিসাঢালা প্রাচীরের কাছে ওরা প্রতিদিন অপেক্ষা করে। সকাল থেকে সন্ধ্যা, ওরা প্রাণান্তকর চেষ্টা করে শীসাঢালা প্রাচীর ভেঙে লোকালয়ে প্রবেশ করতে। যাতে ওরা মানবজাতিকে হত্যা করে তাদের ধনসম্পদ লুণ্ঠন করতে পারে। ওদের এই চেষ্টা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যর্থ হয় অথচ ওরা ভাবে একদিন নিশ্চয়ই লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারবে। চাচাজান ঠিক ইয়াজুজ মাজুজের মতোই বহুদিন চেষ্টা করে মায়ের রুমে ঢুকতে সক্ষম হল। সে মায়ের প্রাথনারর্ত মুছাল্লায় বসে বিনীতভাবে শরীর কামনা করল। মা ছিলেন শক্তিহীন একজন সাধারণ মেয়েমানুষ। একজন নীরিহ মানুষের যতখানি রেগে যাওয়া সম্ভব মা ততখানি রেগে গেলেন। মা বললেন- এটা আপনি নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন, শয়তান মানুষের ঈমান নষ্ট করতে প্রতিনিয়ত আয়নার প্রতিবিম্ব ছুড়ে দেয়।

চাচাজান বিনীত প্রার্থনার ভঙ্গি পাল্টে মুহূর্তেই একজন সত্যিকারের শয়তানের রূপ ধারণ করল।

মা চোখ বন্ধ করে খোদার কাছে কামনা করলেন, কোনো অনিষ্ট হবার আগে যেন তার মৃত্যু হয়। তিনি তার সতীত্বকে অক্ষয় রাখার জন্য প্রভূর কাছে এমনভাবে আকূতি জানালেন যেভাবে একজন নির্ঘুম মানুষ ঘুমের জন্য কামনা করে। মা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন। একটা ঝকঝকে সাদা ছুরি তার ঘাড়ের পেছনে দৌঁড়ে আসছে। সামনের চারদিকে পাহাড়ের প্রাচীর যেন নরকের সীমানা। মায়ের পালানোর ইচ্ছা হারিয়ে গেল। তিনি নিরস্ত্র,অসহায় মানুষের মত চাচাজানের সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ়কণ্ঠে আল্লাহর অমোঘ বানী স্মরণ করিয়ে দিলেন-যথেষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন পুরুষের যে কোনো অসহায় নারীকে হেফাজত করতে হয়,তাকে সর্বনাশ করতে নয়।

চাচাজান বললেন, কয়েকদিন পর আমি তালিবানি মুজাহিদে নাম লেখাবো। সেজন্য আমি তোমাকে বিয়ে করে দ্বিতীয়বারের মত বিধবা হতে দিতে পারিনা। অথচ মনের ভেতর দীর্ঘদিনধরে পুষে রাখা এমন এক কামনা, যা চাইলেও আমি দমিয়ে রাখতে পারছিনা। আমি যে কোনো মূল্যে তোমাকে পেতে চাই।

মা বললেন, এই নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকারে পৃথিবীর সকল প্রাণি ঘুমিয়ে গেছে। চরাচরে প্রকতির নিস্তব্ধ নীরাবতা। অথচ খোদার দৃষ্টি থেকে পৃথিবীর যে-কোনো ছোট্ট বিষয়ও এড়ায় না।

চাচাজান বলল, আমি এই মুহূর্তে ধর্মের অমোঘ বাণীগুলো মনে করতে চাইনা। আমি আবারও বলছি, যে-কোনো মূল্যে আমি তোমাকে পেতে চাই। চাচাজান সমস্ত শক্তি দিয়ে মায়ের ওপর জোর করল। যেন তার লালসা থেকে আগুনের ফুলকি লকলক করে সবকিছু গ্রাস করতে চাইছে। আর মা একজন পুরুষের লালসার ছুরিকাঘাতে এমনভাবে আহত হলেন, সেই দুঃসহ রাত তার জন্য ছিল দোজখের আগুনের চেয়েও ভয়াবহ।

ভোরে দাদাজান ভাঙাভাঙা কণ্ঠের আওয়াজে বললেন- জেনা করেছ তোমরা, ব্যাভিচার হয়েছে আমার সংসারে। শরীয়তের বিচার বড় নির্মম। আমি তোমাদের কাউকে ভয়াবহ সেই বিচারের পথে ঠেলে দিতে পারি না। আমি চাই তোমরা নিকাহ করে নাও।

মায়ের অনাকাঙ্ক্ষিত বিয়ের চারমাস সতেরোদিন পর চাচাজান একদিন নিরুদ্দেশ হল। কাউকে বলতে হলনা কিছু। আমরা বুঝেই নিয়েছিলাম সে তালিবানি মুজাহিদে নাম লিখিয়েছে। হঠাৎ চারপাশের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠল। আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। ভোরে ছাগলগুলো পাল থেকে নিরুদ্দেশের উদ্দেশে ছেড়ে দিতাম। আমি জানতাম, সন্ধ্যায় সবগুলো আর ঠিকঠাক পালে ফিরে আসবে না। কখনো পপি ক্ষেতের পাশে গিয়ে দেখতাম, ছাল ছাড়ানো একটি ছাগলের চামড়া রক্তে মাখানো অবস্থায় পড়ে আছে। রাজধানী কাবুলের অবস্থা তখনো অতটা খারাপ হয়নি। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর পাহাড়ি গুহা থেকে তালিবান মুজাহিদরা নেমে আসে। পাহাড়কাটা সরুরাস্তায় গাছ ফেলে তারা মার্কিন সেনাদের গতিরোধ করে। কখনো মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে ভারী ভারী বোমাগুলো পাহাড়ের উপর আছড়ে পড়ে। তাতে এতটাই শব্দ হত, যেন ঝনঝন করে পৃথিবী কেঁপে উঠল। তবে সেসব আমাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। আমরা ভাবতাম, হয়ত যে কোনো দিন বর্ষিত বোমার আঘাতে আমাদের দেহটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে। ধ্বংস হয়ে যাবে খুগজ এলাকার সমস্ত নিশানা। তবে আমাদের উৎকণ্ঠা ছিল অন্যখানে। কোনোদিন শোনা যেত,পরিচিত কোনো কিশোরীকে তালিবান মুজাহিদের কেউ তুলে নিয়ে গেছে। তারা অপ্রাপ্তবয়সি মেয়েটির নিকাহের খবর বাবামাকে চিঠি দিয়ে জানায়। আমি নিজেকে নিয়ে ভয়ে ভয়ে সময় পার করতে থাকলাম। মনে মনে ভাবতাম, যদি ওরা আমাকেও একদিন ধরে নিয়ে যায়! প্রথমে ওরা আমার শরীরটা অনাবৃত করে ফেলবে, যেভাবে একজন ভাস্কর নিরাবরণ প্রতিকৃতি গড়ে। তারপর বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত নারী পেয়ে ইচ্ছে মতো ভোগ করবে আমাকে। আমার নিস্তেজ দেহটা পাহাড়ের গুহার কোনো কোটরে নিঃশব্দে পড়ে থাকবে। যদি আমি চিৎকার করি তবে সেই শব্দগুলি পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার দিকেই বার বার ফিরে আসবে। আমার সেই আর্তচিৎকার কখনোই আমার আপনজনের কাছে পৌঁছবে না। সেইসব ভাবনায় আমি শিহরিত হতে থাকতাম, আমার শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠত।এক মুহূর্তের জন্যও সেই আশংকা আমি মন থেকে তাড়াতে পারতাম না।

তালিবানদের সবাই ঈমানের জজবায় খোদার দিদারপ্রার্থী ছিল না। ওরা কেউ কেউ অস্ত্র নিয়ে সন্ধ্যার পর যে কোনো পথিকের স্বর্বস্ব লুটে নিত। একবার সীমান্তের কাছে একদল ঈমানদার ডাকাত এক ফ্রেঞ্চ সাংবাদিকের গতিরোধ করে আল্লাহু আকবর বলে ধ্বনি তুলল। ওরা এতটাই নিষ্ঠুর ছিল যে, সাংবাদিকের যা কিছু ছিল সেসব লুট করে মুণ্ডুটা কেটে সীমান্তের ওপার নিক্ষেপ করেছিল।

কয়েকদিনের মধ্যে কাবুল আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল। কান্দাহারের প্রায় প্রতিটি বৌদ্ধবিহার ধ্বংস হয়ে জঞ্জালে পরিণত হল। এমনকি বামিয়ান শহরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দিরটিও মাটির সাথে গুড়িয়ে দেয়া হল। আর মাজার-ই-শরীফ সামান্য শান্ত থাকলেও সেখানে অল্পবয়সী মেয়েদের বেচাকেনা ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার।

একবার বহুদূরের সফর শেষে দাদু এসে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা বলেছিলেন-কান্দাহারের উপকণ্ঠে এক শিয়া মজুর পরিবার দীর্ঘদিন কাজ না পেয়ে বহুদিন অভূক্ত কাটিয়েছে। তালিবান মুজাহিদরা ঝপঝপ করে পশ্চিমের হেরাত আর উত্তরের কাবুল প্রায় দখল করে আনন্দ উল্লাস করেছিল। ওদের আনন্দ উদযাপনে প্রয়োজন ছিল অল্পবয়সি মেয়ে। ওরা বহু পরিবার থেকে কিছু খাবার আর আফগানী মুদ্রা দিয়ে ছোট্ট মেয়েদের কিনে নিল। এমনকি সেই শিয়া পরিবারের মেয়েটিকেও। ওরা রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিল, স্কুল-কলেজ গুড়িয়ে দিল। এতকিছুর পর যা কিছু অক্ষত ছিল, মার্কিন বোমা হামলায় সেসবও ধ্বংস হয়ে গেল। বাচ্চারা স্কুল ছেড়ে গাছের নিচে পরীক্ষায় বসল। আমি আর তাপসী রাবেয়া সেই পরীক্ষায় আর অংশগ্রহণ করিনি। তারপর মার্কিন সেনাদের তৎপরতায় বহুদিন শান্ত ছিল আমাদের গ্রাম। আমি পরীক্ষা দিয়ে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করলাম। তবে আমার সাথে যে মেয়েগুলো পড়াশোনা করত, যারা আমার সহপাঠী-প্রায় সকলেই তখন মৃত। কেউ যদি বেঁচেও থাকে তবে সে ছিল জীবন্মৃত।

একবার মুজাহিদিনদের মত ছেলেদের পোশাক পরে এক পাহাড়ি উপত্যাকা ধরে দাদুর সাথে তুলা নিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের গ্রামের পূর্ব সীমান্তের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের সীমানায় দেখেছিলাম, খোলা আকাশের নিচে কতগুলি ছোট মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত আলুাথালু দেহ। যদিও দৃশ্যটা দেখে আমি অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েছিলাম তবে একজন মুজাহিদের মত দৃশ্যটা পাশ কাটিয়ে সামান্য সময়ের মধ্যে নিজেকে সামলেও নিতে পেরেছিলাম। আমরা তুলাগুলো তালিবান মধ্যস্থতাকারী এক লোকের কাছে দিয়ে আফগানী মুদ্রা নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম।

অনেকদিন বাদে চাচাজানেরও শহীদ হওয়ার খবর আসে। খবরটি আমাদের পরিবারে ছিল খুবই সাধারণ। আমার মায়ের চোখেমুখে তেমন কোনো পরিবর্তন ছিল না। দাদু আবার ফরমান জারি করলেন, আমার কনিষ্ঠ চাচা যে ছিল আমার সমবয়সী সেই চাচাকে মায়ের নিকাহ করতে হবে। আমি বিদ্রোহী হলাম। কয়েকরাত নির্ঘুম কাটালাম। আমি মায়ের মুখের দিকে একবারও ফিরে তাকাতাম না। প্রতিরাতে শীতের হাওয়া আমাকে হীমে ডুবিয়ে রাখত আর আমি রাগে, যন্ত্রণায় শীতের তীব্রতা কাটিয়ে আগুন হয়ে উঠতাম। একদিন দাদুর সামনে দাঁড়িয়ে দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, তোমার ছোটছেলে ভাইয়ের মেয়ে বলেও আমার প্রতি সদাচারণ করেনি। সে আমার সাথে ব্যভিচার করেছে। তুমি কিছুতেই আমার বয়সী একটা লম্পট ছেলের সঙ্গে আমার মায়ের নিকাহ দিতে পারোনা।

দাদুচুপ করে রইলেন। আমার কোনো পদক্ষেপে কোনো কাজ হল না। এক বৃহস্পতিবার ছোটচাচার সাথে মায়ের নিকাহ হয়ে গেল।

আমি মানসিকভাবে বিধস্ত হয়ে পড়লাম। অনেকদিন পর শিয়া এলাকায় গিয়ে আমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু হাযারা ভাষায় ওর আত্মীয়রা বলল, তাপসী রাবেয়া বিদেশে পড়াশোনার জন্য শহরে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে গেছে। আমি ঠিকানা জেনে সেখানে গিয়ে তাপসীর মতোই বাংলাদেশি একটি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার জন্য আবেদন করলাম। কয়েকদিন পর খবর নিয়ে জানলাম, বন্ধু তাপসী আর আমার আবেদন মঞ্জুর হয়েছে।

আমাদের অপেক্ষার পালা আর শেষ হচ্ছিল না। দাদুর কাছে আমার লম্বা ঘাড়টা নিচু করে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষটির মত বললাম- জীবনের সমস্ত বাস্তবতা আমি দেখেছি দাদু। এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে আমার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করা মোটেও সম্ভব নয়। দয়া করে তোমার জমানো সম্পদ থেকে আমাকে কিছু আফগানী মুদ্রা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দাও। আমি সেখানে পড়াশোনা করতে যেতে চাই।

দাদু আমাকে তার বুকের কাছে টেনে নিলেন আর তিনি বললেন, তোমার মা খুব পতিব্রতা সতীস্বাধ্বী নারী। পুত্রবধু হিসেবে তাকে আমি খুবই পছন্দ করি। আমি কখনোই চাইতাম না, যুদ্ধবিধ্বস্তএই দেশে সে কোনো পুরুষের আশ্রয়হীন হয়ে থাকুক। আমি তোমাকেও খুব ভালোবাসি দাদু। আমি দ্রুতই তোমার বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করছি।

সেটা ছিল আমার জন্য সত্যিই রোমাঞ্চকর কিছু। আমরা ঢাকা বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সতেরোজন ছাত্রছাত্রী এদিক উদিক তাকাচ্ছিলাম। আমাদের গন্তব্য ছিল সদরঘাট। আমরা দেশের সবচেয়ে দক্ষিণের জেলা পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাচ্ছি। সারাদিন যতটুকু সম্ভব ঢাকা শহরটা দেখে নিলাম। বিকেলের দিকে মানুষের ভিড় ঠেলে, পুরণো অলিগলি পাশ কাটিয়ে সদরঘাট পৌঁছলাম। আমরা বিলাসবহুল আর আরামদায়ক একটা জাহাজে চড়লাম। আমি সারারাত জাহাজের কিণারায় দাঁড়িয়ে বিশালদেহী নদীর দৃশ্যরূপ দেখলাম। নতুন দেশ, নতুন আমোদ আর প্রকৃতির নতুন প্রতিচ্ছবি। রাত্রিবেলা বিশালদেহী নদীটা কল্পরাজ্যের শান্ত সমুদ্রের মতো দেখা যায়। প্রকৃতির এত শোভা, এত সৌন্দর্য তবুও শেষরাতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ল আমার। আমি মুখের ওপর চুলগুলো ছড়িয়ে ঝরঝর করে কতক্ষণ কাঁদলাম। তখনই টের পেলাম, রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কেবিনের ভেতর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে যখন উঠলাম, তখন চোখের সামনে একটা সমতল মফস্বল দেখলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতেই অনেক বাংলাদেশি ছেলেদের দেখা পেলাম, যারা আমাদের সাহায্য করেছিল। সেদিন আমি সেখানে একজন আশিক রহমানকেও পেয়েছিলাম।



ঘুম ভাঙার পর আমরা প্রায় অধৈর্য হয়ে পড়লাম। আমি মিস্টার স্টিভকে বললাম- অপরাধ নেবেন না, আমাদের পক্ষে এই পরিবেশে থাকা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। আমাদের দেশে যে কারাগারটি আছে, বাগরাম। ওটাও সম্ভবত এর থেকে সুসজ্জিত। এতটা দুঃসহনীয় যন্ত্রণা থেকে আমাদের মুক্তি দরকার। আমরা নিরাপদ একটা থাকার জায়গা চাই।

মিস্টার স্টিভ শান্ত আর দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, আমরা অতি দ্রুতই একটা শরনার্থী শিবিরে যাচ্ছি। যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষ অবৈধ উপায়ে মার্কিন দেশে ঢুকে পড়েছেন। আমরা আশা করি আপনারা তাদের সঙ্গে বেশ খোশমেজাজেই থাকবেন।

আমরা ভোর পাঁচটায় নতুন ঠিকানার উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। শীত আমাকে এনভাবে জাঁকিয়ে ধরল আমার চামড়ার মোটা জ্যাকেকটা একদমই শীত তাড়াতে পারছেনা। কাঁপতে কাঁপতে পাশের মেয়েগুলোর চেহারা দেখি আমার মতই পাংশুবর্ণ। সন্ধ্যার পর আমরা টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ব্রাউন্সভিল শহরের শরনার্থী শিবিরে পৌঁছলাম। এখানে শতশত আশ্রয়প্রার্থী, বেপরোয়া মানুষগুলি মেক্সিকো সীমান্ত পেরিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ জীবন রক্ষার্থে এসেছে আরো আরো দূরের কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে। আমাদের ঠিক জানা নেই, এতবড় একটা আশ্রয় শিবিরের কোথায় আমাদের জায়গা হবে! মিস্টার স্টিভ আমাদের কিছু সান্ত্বনার বানী শুনিয়ে বিদায় নিলেন। আমার মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ, একটু একটু করে একটা সরুপথ ধরে লাইন করে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানা নেই। শেষে একটা ঝকঝকে নতুন দালানের ভেতর ঢুকলাম। রুমগুলো ছোট, অপরিসর। দুজন মানুষ কোনোমতে থাকা যায়। তবে সেখানে আগে থেকেই বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন চেহারার মানুষ সংসার পেতে বসেছে। আমাকে যে রুমে দেয়া হয়েছে সেখানে একটিমাত্র মেয়ে। ওর নাম মারিয়া। মেয়েটি হেসে হেসে আমাকে স্বাগত জানাল। আমি করমর্দন করতে চাইলাম কিন্তু মারিয়া আমাকে বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। অল্প আলাপেই জানলাম ও হণ্ডুরাসের নাগরিক। ভাগ্য ওকে এখানে ঠেলে নিয়ে এসেছে। খুব যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতিতে অনেক কষ্ট স্বীকার করে এখনো বেঁচে আছে মেয়েটি। রাতের মধ্যেই ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

আমাদের একটা করে ছুরি, পানির বোতল, সামান্যকিছু খাবারদাবার আর হলুদ রঙের বোতলে একটা স্প্রে দেয়া হল। সারারাত বেহুশের মত ঘুমিয়ে রইলাম। পরদিন ঘুম থেকে জেগে দেখলাম, আকাশটা ঝকঝকে পরিস্কার, কোথাও থেকে কেমন একটা দুর্বোধ্য আওয়াজ আসছে। ভারী কোনো বস্তু ধুপ করে পড়ে গেলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক সেরকমই একটা শব্দ। আমি পেছনে ফিরে দেখি মারিয়া ঝরঝর করে কাঁদছে। আমি মারিয়ার কাছে ওর কান্নার কারণ জানতে চাইলাম। মারিয়া ওর হারানো প্রেমিকের স্মৃতিচারণ করে বলল- কখনো ওর প্রিয় রাখাল প্রেমিকের কাছে আর ফেরা হবে না।

হণ্ডুরাসের এক নিভৃত পল্লীতে ছিল মারিয়াদের বসবাস। মেয়েটি খুব ভালো স্প্যানিশ বলে। শিবিরে থাকতে থাকতে ইংরেজিটাও রপ্ত করে নিয়েছে। আমি মারিয়ার কথাবার্তার মর্মার্থ বুঝতে পারলাম। মারিয়া দীর্ঘাঙ্গী, সমুচিত চেহারা। ওর মুখের দিকে তাকালে অনুমান করা যায় রোদে পোড়ার মতো কোনো পেশায় নিযুক্ত ছিল। আমি মারিয়ার কাছে আদ্যপান্ত জানতে চাইলাম।

হণ্ডুরাসের টেগুসিগালপা শহর থেকে একশো কিলোমিটার দূরে মারিয়াদের বাড়ি। ও ছিল হণ্ডুরাসের এক ক্যাথলিক বংশের রাখাল। সারাদিন মাঠে গৃহপালিত পশুগুলো চড়াত আর ওর বাবা ছিল একজন ক্ষুদ্র আখচাষী। ওর এক রাখাল বন্ধু ছিল যে প্রতিনিয়ত ওর জন্য নতুন নতুন উপহার নিয়ে আসত। মধ্যাহ্ন পেরুনোর পর পশুগুলো যখন ক্লান্ত হয়ে ছায়ায় বিশ্রাম নিত, ওরা মাঠের বহুদূরে মরিচিকার মতো দেখা যায়, এমন কোনো নির্জনে বসে পড়ত। ওরা জীবনের গল্প করত, পেছনের জীবনের স্মৃতিচারণ করত আর মারিয়া রাখাল বন্ধুর সাথে ওর মনিবের সুবিশাল হৃদয়ের প্রশংসা করত। ওরা মধ্যাহ্নের সেই মরিচিকাময় খোলা জমিনে কখনো নিজেদের সপে দিত একে অন্যের কাছে। ছেলেটি ওকে এত বেশি আদর করত যা এখনো ও স্মৃতি থেকে তাড়াতে পারছেনা। ও বলল, ছেলেটির কণ্ঠস্বর ছিল রেশমের মত কোমল। ওকে আদর করার সময় কানের কাছে এসে ছেলেটি মোলায়েম কণ্ঠে ওকে কতগুলি কুৎসিত শব্দে উপমিত করত। শব্দগুলো সুরেলা সঙ্গীতের মত ওকে এতটাই আপ্লুত করত, যা ছিল ওর জন্য স্বর্গের সুখের মত সুন্দর।

হণ্ডুরাসে হঠাৎ গৃহযুদ্ধ শুরু হল। বিদ্রোহীরা ওর ক্ষুদ্রচাষী পিতা আর ওর মালিককে হত্যা করল তারপর দেশে চরম খাদ্যসংকট দেখা দিল। একদল সসস্ত্রবাহিনী বিদ্রোহ দমন করতে নেমে মেয়েগুলোকে ভোগ করে সীমান্তের কাছে ফেলে আসত। ভাগ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া সেইসব মেয়েরা দলে দলে সুদূরের পথে হেঁটে যেতে লাগল। মারিয়াও সেইসব মেয়েদের দলের সঙ্গী হয়েছিল। তারপর বহু চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে মার্কিন সীমান্তের ভেতর ঢুকতে পেরেছিল ওরা। ওর সেই রাখাল বন্ধু এখনো জীবিত কী না সে সম্পর্কে ওর জানা নেই। প্রেমিকের জন্য ওর ভেতরকার হাহাকার দেখে আমারও বাংলাদেশের আশিক রহমানের কথা মনে পড়ল।



বাংলাদেশের আশিক রহমান খুব ভালোবাসত আমাকে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমি আশিক রহমানকেই দেখেছিলাম, কেমন অন্যরকমভাবে প্রেমের দৃষ্টি নিয়ে তাকাত আমার দিকে। ও ছিল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়র বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ওখানকার স্থানীয়ই। আমাদের বন্ধুত্বও হয়েছিল কিন্তু অল্প কয়েকদিনে ও আমাকে প্রেমের প্রস্তাব করে বসল। আমি ওকে পছন্দ করতাম তবে তা ছিল একজন সাধারণ বন্ধুর মতন। আশিক রহমান ছিল আমার চেয়ে অন্তত চার ইঞ্চি খাটো। বাংলাদেশের ছেলেরা গড়পড়তা যেমন উচ্চতার হয় ঠিক তেমনই। তবে আমরা আফগান মেয়েরা বরাবরই বাংলাদেশি ছেলেদের থেকে উচ্চতায় বেশি ছিলাম। আমি সবসময় চাইতাম, একজন লম্বা আর সুদর্শন ছেলেকে ভালোবাসতে। আমি আশিক রহমানকে বলতাম- তুমি হয়ত জানোনা, আমার জীবনটা কুড়ি বছর পার হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেছে। জীবনটা পাক খেতে খেতে দীর্ঘায়িত করে এই পর্যন্ত এসছি। মনে করো আধো অন্ধকারে এঁকেবেঁকে চলা কোথাও না পৌঁছানো মানুষের মত আমার জীবন। আমার বাবা নেই, দেশে পরমাত্মীয় বলতে আমার মা আর দাদু। আমি ঠিক জানিনা, দাদু কখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। তবে আমি আমার মায়ের কাছে ফিরে যেতে চাই। আশিক রহমান আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য পাগলামি শুরু করল।

মারিয়ার কান্না দেখে আশিক রহমানের মুখটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সেই শান্ত, ম্লান স্মিত হাসির ছেলেটি- যাকে আমার একেবারেই অস্বাভাবিক মনে হত। অথচ ওর জন্য মনের ভেতর এখন কত হাহাকার! হোক আশিক রহমান আমার চেয়ে লম্বায় খাটো, তবুও তো ও ভালোবাসত আমাকে। আর ওর ভালোবাসা এতটাই তীব্র আর আলোকময় ছিল, জীবনটা প্রায় বিপন্ন করেছিল আমার জন্য।

আমাদের নির্ধারিতভাবে দেখা-স্বাক্ষাৎ হত না। আশিক রহমান বন্ধুদের সাথে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতো। আমি অন্য মেয়েদের সঙ্গে ওর সামনে দিয়ে চলে যেতাম। আমার কখনোই মনে হত না, কেউ আমাকে বিশেষভাবে দেখছে। অথচ আমার চলে যাওয়ার দিকে কেমন বোবা মানুষের মতো তাকিয়ে থাকত ছেলেটা। সেসব নিয়ে বান্ধবীরা অনেক কথা শোনাত আমাকে কিন্তু আশিক রহমানকে নিয়ে যত আলোচনাই হতো, কখনোই ও আমার মনের ভেতর আন্দোলিত হতো না।দিনের পর দিন ছেলেটা আমার জন্য অপেক্ষা করত, কখনো একা পেলে কাছে এসে নিচুকণ্ঠে বলত- অনেক ভালোবাসি তোমায়। ওখন ওর কণ্ঠটা এতটাই নরম হয়ে যেতো, যেন কোনো অপরাধী বিনয়ের সাথে নিজ অপরাধ স্বীকার করছে। যখন ও কথাটা বলে চলে যেতো, গুনগুন করে একটা সুখি সুখি ভাবের গান গাইত। সেটা ছিল বাংলাদেশি ভাষার গান। আমি সেখানকার বেশিসংখ্যক শিল্পীর গানের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। সেজন্য আমি জানতাম না গানটি আসলে কার গাওয়া বা কতটা তাৎপর্যপূর্ণ। প্রেমিকের থেকে বিদায় নেয়ার মুহূর্তে গাওয়ার জন্য গানের কথাগুলি কতটাই বা উপযুক্ত। তবে আমি ওর সুর শুনে মুগ্ধ হতাম। আশিক রহমান সম্ভবত ভালো গান গাইতে পারত।

একবার ইউনিভার্সিটি ট্যুরে পটুয়াখালী জেলার সবচেয়ে আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলাম। আমাদের জন্য বাস ভাড়া করা হল। বাংলাদেশি কোনো এক পপ শিল্পীর গান বাজছিল সেখানে। ছেলে-মেয়েরা এতটাই আনন্দিত ছিল সেই গানে, ওরা বাসের ভেতরেই নাচানাচি শুরু করল। আমার সাথের কিছু আফগানী মেয়েও নাচছিল সেই দলে। এমনকি তাপসী রাবেয়াও,যে আফগানিস্থানে হেজাব পরে চলত আর আমাকে উপদেশ দিত যতটা সম্ভব নিজেকে ঢেকে রাখার। আমি চুপচাপ সিটে বসে সেসব দেখছিলাম। আশিক রহমান আমার দুই সিট সামনেই বসা ছিল। ওর বন্ধুরা ওকে নাচার জন্য উদ্বুদ্ধ করল কিন্তু আশিক রহমান এক মুহূর্তের জন্যও সিট থেকে নড়ল না। আমি জানতাম, আমার নীরবতাই ওকে দারুণভাবে সংক্রমিত করেছে। আমি ছেলেগুলোর নাচার তালে অন্যকিছুও দেখেছিলাম। একটা মেয়ে বেশ উদাস হয়ে গানের সাথে ঠোঁট মেলাতে মেলাতে নাচছিল। মেয়েটি ছিল অন্যসব মেয়েদের থেকে অন্যরকম, আবেদনময়ী। নাচের তালে শারীরিক ভঙ্গির প্রতিটি পদক্ষেপে ওর শরীর নড়াচড়া করছিল। ছেলেরা নিজ নিজ তালের সাথে ওর বুকের দিকে তাকিয়ে শিস বাজাচ্ছিল। মেয়েটি গানের প্রতি এতটাই মগ্নছিল যে, ছেলেদের উদ্ভট শব্দ, শিস বাজানো কিংবা চোখের ইশারার দিকে ওর কোনোরকম ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আশিক রহমানকে আমি সেই মেয়েটির বুকের দিকে একবারও তাকাতে দেখিনি। কেমন এক উদাস দৃষ্টিতে ও রাস্তার পাশের সবুজ ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে ছিল। মাঝেমাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দু’একবার আমার দিকে তাকিয়েছিল। আমি দেখেছিলাম, ওর চোখে কয়েকফোটা জল টলমল করছে।

সমুদ্রসৈকতে নামার পর আমার অসম্ভব আনন্দ হয়েছিল। আমাদের দেশে উঁচুউঁচু পাহাড় আর দীর্ঘ উপত্যাকা। কোথাও সমতল জমিন থাকলেও সেখানে সারা বছর তুলা আর পপির চাষ হয়ে থাকে। আমাদের যে জাতীয় নদী আছে-হেলমান্দ, সেটা আমাদের বাড়ি থেকে কয়েকশ মাইল দূরে। একবার বন্দে আমীর ন্যাশনাল পার্কে ঘুরে আসার পথে নদীটা দেখেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, এত বিশাল আর দীর্ঘ কোনো জলের অস্তিত্ব আছে তা আমি কখনোই জানতাম না।হেলমান্দ নদীর তীর ধরে বহুপথ আমাদের গাড়িটা চলেছিল। আমি নদীটাকে স্বপ্নে দেখা কোনো অলৌকিক বস্তুর মত দীর্ঘদিন ধরে মনে রেখেছিলাম তবে কখনো এমন সুবিশাল সমুদ্র আমার চোখে পড়েনি। আমি বন্ধুদের সাথে খুব উল্লাস করলাম। সমুদ্রের জলে সাঁতার কাটলাম। সৈকতের ভ্রাম্যমান দোকান থেকে সামুদ্রিক টুনা মাছের বারবিকিউ খেলাম। মনে হল, এতটা আনন্দ জীবনে আর কখনো পাইনি। বিকেলে সবাই মিলে সৈকতে হাঁটতে লাগলাম। আশিক রহমান আমার পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিল। আমার চোখের সামনে অন্যান্য মেয়েরা ওদের পছন্দমত ছেলেদের সঙ্গে জোড়ায় জোড়ায় মিলিত হয়ে সৈকত ধরে হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছিল। একমাত্র আমি আর আশিক রহমান ছিলাম দলছুট পশুর মতন একা। একবার আমাকে একা পেয়ে আশিক রহমান সেই পুরনো বাক্য- “খুব ভালোবাসি তোমাকে” হয়ত শোনাতে চাইল। আমি দ্রুত পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। সন্ধ্যায় হোটেলে এসে ওকে ডেকে স্রেফ জানিয়ে দিলাম, অযথা কষ্ট পেওনা। আমার পক্ষে ভালোবাসাবাসি করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

আশিক রহমান আমাকে ছেড়ে, বন্ধুদের ছেড়ে, এমনকি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেল। বহুদিন পর্যন্ত ওকে আর কোথাও দেখতে পেলাম না।

একদিন ওর এক বন্ধুর থেকে জানলাম, বেচারা আমার জন্য অনশন করেছে। বাড়িতে নিজের ঘর ছেড়ে কোথাও বের হচ্ছে না। ধীরে ধীরে ওর শারীরিক অবস্থা কাহিল হয়ে পড়ল। খাবারদাবারের রুচি উঠে গেল। নাদুস-নুদুস যুবক ছেলেটা কঙ্কালসার দেহ নিয়ে বিছানায় চুপ করে পড়ে রইল। আর ওদিকে দিনের পর দিন আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে আরো বেশি আনন্দিত হয়ে উঠলাম।

অবস্থা এতটাই খারাপ সেটা আমার জানা ছিল না। প্রথমে ওর এক বন্ধুর থেকে শুনে আমি প্রায় অগ্রাহ্য করলাম। তারপর আরো কিছুদিন এভাবেই কেটে গেল। একদিন ওর আরেক বন্ধুর থেকে জানলাম, আশিক রহমান হয়ত আর বাঁচবে না। ওর বন্ধু কথা প্রসঙ্গে এটাও বলল, শুনেছি ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মানুষ জীবন বাজি রাখে, কখনো নিজেকে নিঃশেষও করে দেয়। তবে আশিক যা করল, সেটা এই যুগে কোনো প্রেমিকের পক্ষেই সম্ভব নয়।



জুন মাসে আমাদের ভার্সিটি ছুটি হয়ে গেল। আমরা আফগান বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিলাম, দেশে গিয়ে দুমাস থেকে আবার ফিরে আসব। ওদিকে করোনা ভাইরাসও মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে আমি অস্বাভাবিক একটা খবর শুনতে পেলাম। আমার সমবয়সি সেই চাচার ঘরে আমার মায়ের একটা ফুটফুটে বাচ্চা হয়েছে। চাচা মাকে উপেক্ষা করে কোনো এক কিশোরীকে নিকাহ করে কাবুলে সংসার পেতেছে। আর মা বাচ্চাটিকে নিয়ে একা হাবুডুবু খাচ্ছেন। ওদিকে দাদুরও মরণপন্ন অবস্থা। আমি বিষয়টিকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলাম না। আমার মনের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হল। ক্রোধমিশ্রিত অনুকম্পায় কেমন এক প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠলাম। ইচ্ছা করল, যত দ্রুত সম্ভব দেশে গিয়ে চাচাকে খুঁজে বের করে ইচ্ছেমত শাস্তি দিই। যেমন আমাদের দেশে শরীয়া আইনে বিচার করা হয়। অথচ, আমার মনে একবারও আসেনি, ইসলামে বহু বিবাহ মোটেই প্রথাবিরুদ্ধ নয়। তাই বলে সে আমার মাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারে না। আমি যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে যেতে চাইলাম।

যেদিন আমরা ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হব, আমার এক বাংলাদেশি বান্ধবী খুব অনুরোধ করল আমি যেন আশিক রহমানকে একবারের জন্য দেখতে যাই। কেননা, আশিক রহমান কী এক ওষুধ খেয়ে শরীরের মূল্যবান অর্গান প্রায় নষ্ট করে ফেলেছে। সেটা এমনই এক ওষুধ, খেয়ে একবার ঘুমিয়ে পড়লে জমানো কষ্টগুলো মাথা থেকে বের হয়ে যায়। কেমন এক ঝিমুনি ভাব চলে আসে শরীরের ভেতর। তখন পৃথিবীর কোনোকিছুই আর অস্বাভাবিক মনে হয় না।

আমি মনে মনে ভাবলাম, মনের দুঃখ ভোলার কোনো ওষুধ পাওয়া যায় এই প্রথম জানলাম। ওটা আমার পেছনের জীবনে পেলে খেয়ে আমার শরীরের সবগুলো অর্গান নষ্ট করে ফেলতাম। আমি মায়ের বেদনাগুলো খুব অনুভব করলাম। একজন নারী কী করে তার প্রতি জবরদস্তি করা পুরুষকে বিয়ে করতে পারে! কীভাবে একজন মহিলা বাধ্য হয়ে নিজ সন্তানের বয়সি দেবরকে স্বামী হিসেবে মেনে নেয়, সে যাকে একদিন জন্মাতে দেখেছিল!

আমার বান্ধবী আবার বলল, মানুষ হিসেবে কখনোই আমরা অতটা অকৃতজ্ঞ হতে পারিনা। একজন মানুষ এমন করে ভালোবাসলে তার মুখটা শেষবারের জন্য হলেও দেখে যেতে হয়। আমি সেই বান্ধবীকে নিয়ে পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজে আশিক রহমানকে দেখতে গেলাম। হাসপাতালের বিছানায় ওকে দেখার পর মনে হল আমি একজন মৃত মানুষ দেখছি। ওর রুগ্ন,ফ্যাকাসে মুখটা একটু উঁচুকরে আমার দিকে তাকাল। শরীরটা সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা, বুকটা খুব ধীরগতিতে ওঠানামা করছে।

আশিক রহমান কখনোই সুদর্শন ছিল না। ওর পোশাক পরিচ্ছদ ছিল সাধারণ আর কথায় কথায় মুখটা লজ্জায় ভরে উঠত। তবে যখন ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, একজন সুপুরুষের মত কণ্ঠটা গমগম করে উঠত। ওদের আড্ডায় প্রচুর হাসিঠাট্টা হত আর সেসবে ও ছিল দারুণ পারদর্শী। শুধুমাত্র আমার কাছে এলেই ও কেমন বেড়ালের মত কাতরকণ্ঠের হয়ে যেত। আশিক রহমানের সেই পেশিবহুল শরীর আর নেই, ওর গালদুটো শুকিয়ে পাতলা হয়ে গেছে। ওর বেড়ালের মত মায়বী চোখদুটো এমনভাবে কোটরে ঢুকে গেছে, আমার দিকে বারদুয়েক তাকানোর চেষ্টা করেও আর কুলিয়ে উঠতে পারল না। না খেতে খেতে ওর ঠোঁটদুটো রুক্ষ্মতায় ফেটে ফুলে উঠেছে। একটা কালো পরতের আস্তরণে ঠোঁটের অবয়ব আর দেখা যায় না। শরীরের রং হয়ে গেছে সাদা কাগজের মত যেন কোথাও একফোঁটা রক্ত নেই। আশিক রহমান আমার দিকে অতি কষ্টে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। আমি ওর ঠাণ্ডা হাতটা ধরে কেন যেন ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম। একজন মানুষকে ওই অবস্থায় রেখে ফিরে আসার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না। তবে আমি ওকে কথা দিয়ে এসেছিলাম, আফগানিস্থান থেকে ফেরার সময় পর আমি ওকে বিয়ে করব। আমি আর কখনোই যুদ্ধবিধ্বস্তদেশে ফিরে যেতে চাই না। আমি খুব কষ্ট নিয়ে হাসপাতালের করিডোর ত্যাগ করে বাইরে বেরোলাম। মাথার উপর তাকিয়ে দেখলাম যতদূর চোখ যায়, মেঘে মেঘে আকাশটা বিষণ্ন, ঠিক আমার ভারাক্রান্ত মনের মতন। সেই থেকে মনে মনে আমি আশিক রহমানকে বয়ে বেড়াচ্ছি। কিন্তু আজ আমি কোথায়!

আফগানিস্তান ফিরে মায়ের কোলে ফুটফুটে শিশুটি দেখে আমার মন অদ্ভুত মায়ায় ভরে গেল। মনে হল, শিশুটা আমারই গর্ভজাত। যেন আমিই ওর সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে দেখভাল করতে পারি। আমি জানতে পারলাম, মা বেশ কয়েকবার নিজেকে শেষ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েও থেমে গিয়েছিলেন। যাতে শিশুটি নিরাপদে পৃথিবীর মুখ দেখতে পারে। তারপর যখন ও ভূমিষ্ট হল, ওর কচি শরীরটার দিকে তাকিয়ে তিনি সবকিছু ভুলে গেলেন। একজন মা হয়ত তার জারজ সন্তানটিকেও সজ্ঞানে অনাথ করতে পারে না।

আমি আমার চাচাকে যতটা সম্ভব খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মার্কিন সেনারা যেদিন থেকে ওদের গুটিয়ে নিচ্ছিল, সেদিন থেকেই মোল্লা হাসান আখুন্দের তালিবানি মুজাহিদিনরা প্রথমে কান্দাহার তারপর হেরাত পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। মাজার ই শরীফের অবস্থা খুবই বিপজ্জনক। দলে দলে মানুষ পাকিস্তান সীমান্তের দিকে ছুটছে। মুজাহিদিনরা যখন বিনা রক্তপাতে কাবুলের দিকে আগাচ্ছিল, স্থানীয় সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করল। প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানি লয়া জিরগা বন্ধ করে নিজ প্রসাদ থেকে পালিয়ে চলে গেল। ছোটচাচাকে কোনোভাবেই আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব হল না।

বৌদ্ধ, মুসলিম শিয়া সম্প্রদায় আর সেইসঙ্গে অল্প কিছুসংখ্যক শিক জাতি প্রচণ্ডরকম কোনঠাসা পড়ল। বিদেশি প্রজেক্টগুলো বন্ধ হয়ে গেল। প্রবাসীরা নিজ নিজ দেশে ফেরত যেতে লাগল। এমনকি আফগান ধনী ব্যবসায়ীরাও পরিবারসহ পাশের দেশ, কেউ কেউ দূর দেশে আশ্রয় নিল। সমস্ত টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ হয়ে গেল। কোনোভাবেই দেশে থাকার মতো অবস্থা আর অনুকূলে নেই। আমি প্রথমে মাকে শিশুটিসহ বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করলাম। তাপসী রাবেয়া জানালো, সেটা কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। তাছাড়া বুড়ো দাদুকে এতটা অনিশ্চয়তায় ফেলে রেখে আমি স্বাথপরের্র মতো মাকে নিয়ে চলে যেতে পারিনা। তিনিতো আমারই বাবার বাবা। মায়ের প্রতি তিনি কোন চিন্তায় এমন অবিচার করেছেন কে জানে! হয়ত তার পরিকল্পনা ছিল সত্যিই ইতিবাচক, যা আমার কখনোই দৃষ্টিগোচর হয়নি। বয়সের ভারে দাদু এতটাই বিধ্বস্ত, মনে হয় বিছানায় মাংসহীন কোনো কিশোর শুয়ে আছে। তার বর্ণহীন মুখটা দেখে মনে হয় যেন মৃত্যুযন্ত্রণা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তার। একটুপরেই চিরকালের জন্য চোখদুটো বন্ধ করে ফেলবে। বিছানায় তিনি একা, ভগ্নহৃদয় ও স্বাভাবিক জীবন থেকে প্রত্যাখ্যাত একজন বয়োবৃদ্ধ। বেঁচে থাকা একমাত্র ছেলেটি পিতার অন্তিম মুহূর্তের কথা না ভেবে, নবাগত শিশুর কচি মুখ উপেক্ষা করে তুলা বিক্রির সমস্ত টাকা নিয়ে কাবুলে চলে গেছে। আমিও একমাত্র চাচার মতো নিষ্ঠুর হতে বাধ্য হলাম।

দাদুর প্রতি পেছনের সমস্ত রাগ, দুঃখ যা কিছু অন্তরে পুষে রেখেছিলাম, মুহূর্তেই সেসব ভুলে গেলাম। শেষে অনিশ্চয়তার অন্ধকুপের মতো দু’জন মানুষকে নিভতৃ গ্রামে রেখে আমি একাই অন্য মেয়েদের সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইলাম।

আমরা তিনটা বাস ভাড়া করলাম। কিছু ছেলে ছিল আমাদের সঙ্গে। ওরা আমাদের প্রচণ্ড সাহস যুগিয়েছে। ওদের প্রত্যেকের মুখে দাড়ি আর জোব্বায় ঢেকে নিজেদের আমূল পরিবর্তন করে নিয়েছে। আমরাও শরীয়া আইনের নিয়মের মতো নিজেদের বোরখায় ঢেকে ফেললাম। একদিন ভোরে পাহাড়ি এক উপত্যাকায় সবাই জড়ো হয়ে কাবুল বিমানবন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করলাম।



হয়ত আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্নছিল না, হয়ত আমরা ছিলাম দুঃসময়ে চরম বিপাকে পড়া যাত্রী। তাই কাবুলের পাহাড় কাটা রাস্তায় বেড়িকেট দিয়ে তালিবানরা আমাদের থামিয়ে দিল। পরদিন মুজাহিদিনরা কাবুল বিমানবন্দরও পুরোপুরি দখল করে নেয়।

আমরা দ্বিতীয়দিন ভোরে আবার যাত্রা করলাম। সীমান্তের পাশ ঘেঁষে পপি ক্ষেতের আড়ালের সরুপথ ধরে আমরা বহুদূর পর্যন্ত এগিয়ে গেলাম। সামনের পাহাড়কাটা রাস্তাটা ছিল খুবই অপ্রসস্ত। যে-কোনো মুহূর্তে খাড়া থেকে গড়িয়ে গাড়িটা এক দেড় কিলোমিটার নিচে পড়ে যেতে পারত। ড্রাইভার আমাদের আস্বস্ত করল। আমরা চোখবন্ধ করে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের কাছে গিয়ে মার্কিন সেনাদের নিষেধাজ্ঞায় পড়লাম। তারা আমাদের গাড়ি আবার ঘুরিয়ে দিল।

তৃতীয়দিন আমরা ক্লান্ত শরীর নিয়ে কোনোভাবেই যাওয়ার জন্য সাহস করলাম না। আমার আর তাপসী রাবেয়ার একই দিনে মেনুস্ট্রেশন হয়ে গেল। আমরা পেটের ব্যাথায় কাতড়াচ্ছিলাম। কিন্তু চর্তুদিন খবর পেলাম, তালিবান মুখপাত্র ঘোষণা দিয়েছেন, চাইলে যে কেউ দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারে। তারা কাউকে বাঁধা দেবেন না। দুঃসহনীয় পেটের ব্যাথা নিয়েই দুপুরের দিকে আমরা সোজা পথে কাবুলের দিকে রওয়ানা হলাম। তালিবান মুজাহেদিন এবং মার্কিন সেনাদের অল্প কয়েকটা জটলা পেরিয়ে আমরা সবাই বিমানবন্দরে ঢুকতে সক্ষম হলাম। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশ বা ভারতের কোনো বিমান নেই।

শেষে আমরা একটা মার্কিন কার্গো বিমানে উঠে অন্য যে-কোনো দেশে চলে যেতে চাইলাম। যেখান থেকে বাংলাদেশের প্লেন ধরে গন্তব্যে যাওয়া যায়। আমরা জানতাম, বিমানটা আমাদের কাতার এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেবে। কিন্তু সাই সাই করে একনাগারে বিমানটা বহুঘণ্টা ধরে চলতে থাকল। আমি ক্লান্তশরীর নিয়ে বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়লাম। বিমান অবতরণের পর আমাদের ট্রানজিটের জন্য নামানো হল। তাকিয়ে দেখলাম, আমরা সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে আছি।

আমরা বিমানের অন্য যাত্রীদের থেকে দলছুট হওয়ার চেষ্টা করলাম। মার্কিন সেনারা এমনভাবে আমাদের চোখে চোখে রাখল, সেটা আর কোনোভাবেই সম্ভব হল না। আমরা ছয়ঘণ্টা অপেক্ষার পর আরেকটা ফ্লাইটে উঠলাম। কয়েকঘণ্টার ব্যবধানে দ্বিতীয় ট্রানজিটের জন্য আমরা স্পেন বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম।



ইন্ডিগো কোম্পানির ফ্লাইট স্পেনের আকাশের প্রায় এক দেড়হাজার ফুট উপরে উঠে গেল। কয়েকঘণ্টা পার হবার পর মনে হল, নিচে আটলান্টিকের নীল জলরাশি। আমি পায়রার খোপের মতো জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ভেসে যাওয়া মেঘের ভেলা ছাড়া আর কিচ্ছুটি চোখে পড়ছে না। আমার মনের ভেতর ভিড় করল কল্পিত নতুন ঠিকানার কথা। কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে আমাদের! একবার মনে হল, যদি কোনো উপায় থাকত তাহলে মায়ের কাছে ফিরে যেতাম। ছোট্ট শিশুটিকে লালন-পালন করে অনিশ্চয়তার ভবিষ্যতের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতাম। নিজ বাসভূমে আমার মৃত্যু হলেও কোনো দুঃখ ছিল না। কিন্তু আল্লাহ তার বান্দাকে কঠিনসব বিপদের মুখোমুখি এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন তার সিফাতি নামগুলো জপ করে বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। আমি মনে মনে কোরআনের মুখস্ত পদগুলো আওড়াতে লাগলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভৌগলিক পরিবর্তনের কারণে সময়টা ঠিক অনুমান করতে পারলাম না। জানালার মুখে তাকিয়ে দেখি বিকেল প্রায় গড়িয়ে যাওয়ার মতো পরিবেশ। আমরা ধীরে ধীরে মিয়ামি শহরের উঁচুউঁচু টাওয়ারের চূঁড়াগুলো কাঁপতে থাকতে দেখলাম। অল্প সময়ের মধ্যেই স্বপ্নের জগতের মতো নতুন একটা শহরের রূপ দেখতে পেলাম। ইন্ডিগোর ফ্লাইট মিয়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করল।



কয়েকদিনের মধ্যেই মারিয়ার শরনার্থীশিবিরে কুকের সহকারী পদে চাকরি হয়ে গেল। আফগান শরনার্থী হিসেবে আমাদেরও মার্কিন আদালতে ডাক পড়ল। আন্তর্জাতিক একটা সংস্থা আমাদের আইনি সহায়তার জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। সবকিছু অনুকূলে থাকলে আমরা এখানকার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করতে পারব। আদালতে যাওয়ার পথে তাপসী রাবেয়া আমাকে জিজ্ঞেস করল, তোমার আশিক রহমানের এখন কী হবে?

আশিক রহমান! আমি প্রায় চমকিত মানুষের মতো বললাম, কে এই আশিক রহমান। নামটা সম্ভবত ইতোপূর্বে কয়েকবার আমি শুনেছি। তবে এই মুহূর্তে আমি তাকে মনে করতে পারছি না।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ