রবিউল হক বক্সীর গল্প : স্নিগ্ধ সময়ের ঘ্রাণ


দশ বছর আগে যদি কোনভাবে জেনে যাওয়া যায় দশ বছর পরের দিনগুলো কেমন হবে, রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ের মাঝেও স্বাভাবিক জীবন হবে প্রত্যেকের,আর আশেপাশের মানুষগুলো ক্রমাগত বৃদ্ধ হতে থাকবে- দুএকটা বিশাল গাছের স্মৃতি শুধু মনে পড়তে পারে কিন্তু নতুন অনেক গাছ আর এসবের বিশাল পরিবর্তনেও আমরা টিকে থাকব এবং আশ্চর্যজনক হলেও মেনে নিতে পারব তুমি একটা বাচ্চার মা, তোমার ব্যক্তিগত জীবনের সকল পরিশ্রমের উদ্দেশ্যই তোমার বাচ্চা কিন্তু দূর্ঘটনাক্রমে সেই বাচ্চাটা শুধুই তোমার অথচ এতকিছু ঘাত প্রতিঘাতের পরেও কোনদিন আবার দেখা করার পাঁয়তারা করব এমনভাবে যেন আমরা এই শহরের ফেরারি আসামী আর দুজন দুজনকে হীন চোখে দেখতে শুরু করব এবং দেখা না করার মত সামাজিক সূত্র ও সিদ্ধান্তগুলোকে যথারীতি শ্রদ্ধাও করব।

কিন্তু কেন? আসলে আমরা দশ বছর আগের সেই সময়টাকে ব্যবচ্ছেদ করতে চাই।

তুমি তোমার বাচ্চার ছবি দেখাতে চাইবে বারবার, আমি দেখব কিন্তু মরুভূমির বালু দেখার মত ভাবলেশহীন দেখা হবে সেটা। তুমি সযতনে তোমার স্বামীর ছবি লুকিয়ে ফেলবে অথবা প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাবে অথচ আমি তা ধরব কিন্তু মনে মনে আফসোস করব এটা ভেবে যে এখনও তুমি আনাড়ি আছ সেই আগের মতো। কী এমন দরকার এত কারচুপির? সাথে সাথে এটাও বুঝব যে তুমি আমাকে বিবেচনায় নিয়েছ দশ বছরের আগেরকার আমাকে।

এক দৃষ্টিতে আমার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকবে তারপর বলবে, এত সুন্দর তোমার হাত ঘড়ি!

আমার অফিসের পজিশন নিয়েও কথা বলবে আর চিরায়ত মেয়েলি বালখিল্যেও মাতবে।

“একদিন সময় করে তোমার অফিসে যাব, বসন্ত দিনে ঘটা করে শাড়ি পরে যাব আমি। বাসন্তী রঙের শাড়ি পরে তোমার অফিসে যেয়ে তোমাকে বিব্রত করব।”

আমি নরম সুরে বলব, এস।

এসব দশ বছর পরে আমাকে ছুঁয়ে যাবে না দেখে তুমি আবার বলবে, কোন বিষয় নিয়ে কি তোমার মন খারাপ?

“না তো!”

তারপর কিছুক্ষণ নির্বিকার বসে থাকবে তুমি। আমি কফিতে শুধু মৃদু চুমুক দিতে থাকব। এবং তুমি আবিষ্কার করবে আমার মাথায় কয়েকটা পাকাচুল। হাত দিয়ে স্পর্শ করার চেষ্টা করবে কিন্তু সাথেসাথেই তড়িৎস্পর্শের মত হাত সরিয়ে ফেলবে।

“সামনের চুলগুলো কালার করে নিতে পার।”

এ বিষয়ে কোন কথা বলব না আমি শুধু বর্তমান সময়ের কথা বলব।

“কফিটা খেতে অনেক জোস তাই না?”

কিন্তু তুমি ফিরে যাবে পেছনের ঠিক দশ বছর আগে। আমরা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ছুটতাম। তখন যেকোনভাবেই হোক তোমার একটা চাকরির দরকার ছিল আর আমি দশ বছর আগের সেই দিনগুলোর বিহ্বলতা এড়িয়ে শুধু তোমাতে পড়ে থাকতাম বলে প্রতিনিয়ত ঠাট্টা করতে।

“তোমার তো আর চাকরির দরকার নেই। তোমার একটাই চাকরি আর তা হল আমাকে জ্বালাতন করা।”

দশ বছর পর তোমার একটা চাকরি হয়েছে, আমার একটা চাকরি হয়েছে কিন্তু তুমি, আমি এলোমেলো ভাবে কেন দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম অথবা কেনইবা আমাদের গন্তব্য হল রেস্টুরেন্ট? তোমার বাবা এখনও তো জুয়া খেলেন, তোমার মা এখনও হয়ত প্রতিনিয়ত কাঁদেন। কিন্তু অতি দ্রুত যে সিদ্ধান্তগুলো তুমি, তোমার পরিবার নিয়েছিল দশ বছর পর দেখ সেই সিদ্ধান্তগুলোতে কত ভ্রান্তি! তোমার ফোনের স্ক্রিনে তোমার বাচ্চার ছবি, এত তাড়াতাড়ি স্বপ্নগুলো চুরি হয়ে যাচ্ছে! এমন কী যতসব কিছু চুরি হয়ে যাচ্ছে তার পরিমাণও আমরা জানতে পারছি না।

প্রথমত, আমি তোমার ঘুমের প্রসঙ্গ টানব। এখন সপ্তাহে কমপক্ষে দুদিন তোমার বাধ্যতামূলক নাইট ডিউটি। বার দুটো তুমি অনেকবার আমাকে মনে করিয়ে দাও কিন্তু কিছুতেই তা আমার মনে থাকছে না। কবে কবে তোমার নাইট ডিউটি? এতসব মনে না থাকায় তাই দীর্ঘদিন আমি যোগাযোগ করিনি। আর তুমি থেকেছ অভিমান করে। ঠিক দশ বছর আগের অভিমান। তুমি পুনরায় যোগাযোগ না করলে আমৃত্যু অভিমানে থাকলেও তো আমি বুঝতে পারতাম না, ভাবতাম তোমার আর একটি ফুটফুটে বেবি হয়েছে, ইদানিং হয়ত তুমি তোমার বরের বাহুবন্ধনে থেকে বেশি ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছ বা তোমার আর কোনভাবেই রুচি হচ্ছে না পেছন ফিরে তাকানোর।

দশ বছর আগে রাত এগারোটার পর কিছুতেই তুমি জাগতে পারতে না। একটু পরপর হাই উঠত, রাতের ফুলের মত তোমার পাঁপড়িগুলো রাত এগারোটার পর মিইয়ে যেত।

আবর্জনাময় পড়াশোনার প্রসঙ্গ না টানলেই নয়। দশ বছর পর এখন কয়টা ব্যাকটেরিয়ার নাম আমাদের মনে আছে? তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করে ব্যাকটেরিয়ার প্রকরণগুলো, মনে আছে- সাইক্রোফিলিক, মেসোফিলিক ও থার্মোফিলিক ব্যাকটেরিয়াগুলোর নাম? তুমি সব মুখস্ত বলতে পারতে এখনও হয়ত পার কিন্তু আজ আমরা ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগের পর্যালোচনায় বসিনি।

আমরা কেমন আছি?

দুজনে তা জানতে বা জানাতে এসেছি। তুমি আমার সামনেই বসে আছ, তোমার নিঃশ্বাসের সেই পরিচিত গন্ধটা নাকে আসছে তবু চমকে চমকে উঠছি না। এবং তোমার মধ্যেও একটা নির্বিকার ভাব এসেছে- যা বলছে, আমরা শুধু সময় অতিবাহিত করে এগিয়ে যাচ্ছি। এরকম দেখা করা বা না করার মধ্যে কোন কারণ বা পার্থক্য নেই। আর হঠাৎ মনে হচ্ছে-আমরা কেমন আছি? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অপর মানুষটাই চুরি করে বসে আছে, আমরা নিজে নিজে তা জানি না। শুধু জানি বাচ্চাটা কেমন আছে, কফিটা খেতে কেমন।

আরও আশ্চর্য হচ্ছি এটা ভেবে যে, তোমার শরীর স্পর্শ করার আমার কোন তাড়না নেই। এখন যদি তোমার হাতটা ধরি, কফির মগটা ধরে থাকার অনুভূতি হতে পারে আমার। এবং তা যদি তোমাকে বলি তোমার মন তা মেনে নিবে কিন্তু তুমি দশ বছর আগের প্রকৃত অভিমানের মত একটা অভিনয় করতে পার, যদিও তা হাস্যকর ভাবে মেকি দেখাবে এবং পরক্ষণই তুমি তা হেসে উড়িয়েও দিতে পার।

তবে এ বসে থাকার হয়ত একটা কারণ আছে। আমরা অনেক আবর্জনা মাড়িয়ে বর্তমানে এসেছি এবং মৌনভাবে স্বীকার করে নিচ্ছি আমাদের অনেক ভুল ছিল। পেছন ফিরে যাচ্ছি বারবার, যেন প্রতিটি ভুল সংশোধন করে আবার এগুতে যাচ্ছি। আর এটাই এক প্রকার নেশা তা দুজনের দৃষ্টি একটা নির্দিষ্ট ভুলে নিবিষ্ট হয়েছে আর এভাবেই প্রায় দশ বছর পর আমরা সঙ্গমের সুখ কুড়াচ্ছি।

“তোমার বরের সাথে আমাকে নিয়ে কোনদিন কথা হয়েছে তোমার?”

“না, কোনদিন বলিনি। সে তোমাকে যে ভাবে চেনে তা হল তুমি আমাকে সব সময় ডির্স্টাব করে গেছ।”

“এতেই তোমার বর কনভিন্সড?”

“না হয়ে উপায় আছে? বিয়ে যখন হল তখন তো মেনে নিতেই হয়। খাবার প্লেটে একটা পোকা পড়লেও ভাবতে হয় সেটা পোকা নয় মসলার অংশ।”

আমরা দুজনেই হেসে উঠি। দশ বছরে এ হাসিও আমাদের পরিবর্তিত হয়েছে। কোনভাবেই হোক মানুষকে ঠকিয়ে বিশ্রীভাবে হেসে উঠতে পারি- দশ বছর আগে আমরা তা ভাবতে পারি না।

সে টেনে আনল তার মেয়ের প্রসঙ্গ। যে কোনভাবেই হোক সে তার মেয়েকে সুখী দেখতে চায়।

আমি বলি, তোমার বাচ্চাটা মেয়ে?

“হুঁ, মেয়ে।”

“কার মত দেখতে হয়েছে?”

“তুমি ছবি তো দেখলে, কার মত হয়েছে তুমিই বল! আমার মত নিশ্চয়ই নয়!”

ছবিতে বাচ্চাটাকে দেখেছিলাম কিন্তু তা মরুভূমির বালু দেখার মত, আবছা... প্রচন্ড রোদ পড়লে চকচকে যে আলোক ধাঁধাঁ তৈরি করে আর সে ধাঁধাঁ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।

আমি বলি, ভাল করে দেখিনি, বল না কার মত?

“ওর বাবার মত।”

দশ বছর আগে আমার প্রথম যৌবনে ভাবতাম শরীরের একটা আজীব অংশ আছে যার হাত হবে, পা হবে, চোখ হবে মায়াময়, ছোট চুলগুলো আস্তে আস্তে বড় হবে, ওর একটা মা হবে, চুলগুলো লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা হবে- এভাবে শুধু একটা মেয়ে বাচ্চাই কল্পনায় আসত। অথচ দশ বছর পর সেরকম একটা মেয়ে বাচ্চার মুখ আমি দেখতে চেষ্টা করলে তা আবছা, আলোক ধাঁধাঁয় বিলীন হচ্ছে।

সে বলে যাচ্ছে অনেক কথা, আমার জীবনের ভুলগুলোই পাঠ্য হবে আমার মেয়ের। ওকে আমি স্কুল,কলেজে ভর্তি করাব না বা আমাদের মত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ব্যাকটেরিয়ার কালচার থেকে ব্যাকটেরিয়া কাউন্ট করুক এটা হতে দিব না। আমি ওকে ‘সুখ’ নামের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাব আর ওর পাঠ্য হবে তুমি। অবশ্য এখনকার তুমি নও, দশ বছর আগের তুমি। ওকে বলব এক অচিন লোকের কথা যে সবসময় একটা রঙিন ছাতার নিচে একটা মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যে মেয়েটির চোখমুখের বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে দেয় ওর হাতের টিস্যু পেপার দিয়ে আর ওকে অক্লেশে জড়িয়ে ধরার মানসে রিক্সায় ওঠে, তবুও ধরতে পারে না শুধু হাত ধরে বসে থাকে। একটা সুন্দরী আশ্চর্য নদীর কথা ওকে বলব, যে নদীর তীরে একাকী গেলে নদীটা হয় গোমরামুখী পে্ত্নী আর সেই লোকের সাথে গেলে হয় মায়াময় স্রোতস্বিনী, এমনকি মেয়েটিরও নদী হতে ইচ্ছে করে। আমার মেয়েকে ঝরা পাতা দিনের গল্প করব- শুকনো পাতার উপর হেঁটে হেঁটে কিভাবে নান্দনিক একটা ছন্দ তৈরি করত সেই লোকটি আর মেয়েটির সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে যেত। আর তারা যখন রোদে সিমেন্টের বেঞ্চে বসত, ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামত।

আমি ওকে বলব, এরকম কোন একটা ছেলে যদি তোমার জীবনে আসে তাহলে তুমি তাকে পলকে পলকে জড়িয়ে ধরবে, চুমু খাবে... কোন কিছুর জন্য অপেক্ষা করবে না, একটা কাজ পড়ে আছে বলে যদি তুমি তাকে ব্যস্ততা দেখাও তাহলে সারাজীবনটা ব্যস্ততায় কাটবে তোমার, এমনকি আমি ওকে বলব- ধর আমি অসুস্থ, হাসপাতালে মৃত্যুসয্যায় তবুও তুমি অপেক্ষা করবে না বা তোমার মা অসুস্থ বলে অজুহাত দেখাবে না।

সে উন্মাদনায় আরেক বার বাচ্চাটার ছবি দেখাল। তারপর আমার চোখের দিকে চেয়ে থাকল-চোখের ঘোলাটে আভায় বিষাদের কোন রঙ ধরা দেয় কিনা তা বোঝার চেষ্টা করল, দশ বছর আগে যেমন সে অনেক কিছুই বুঝতে পেত। বসন্তের শুরুতে এমনিতেই ছটফটে লাগলে বা শ্বাসকষ্টের অনুভূতি হলে সে আমাকে কষ্ট করে সময় দিত ঘুরতে যাওয়ার জন্য, তারও আগে পরীক্ষামূলকভাবে আমরা কয়েকবার ডাক্তারের কাছেও গিয়েছি আর প্রতিবার আমি সম্পূর্ণ ফিট বলে ডাক্তার কোন ওষুধ লেখেননি। আর তখন সে অভিনব ভাবে আমার পাশে থাকার পন্থাটা খুঁজে পায় এবং আশ্চর্য যে আমার শ্বাসকষ্ট প্রশমিত হতে থাকে।

কিন্তু আমি চলে গেলাম বাচ্চাটির ভবিষ্যতে, সেখানে ধুধু বালি ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না। আমার ছটফটেও লাগছে না বা শ্বাসকষ্টের অনুভূতিও হচ্ছে না। দশ বছর পরের এ অনুভূতির সাথে আমি পরিচিত নই। এবং আমার এমন ভুতুড়ে মুখায়বব দেখে সে ছবিটা সরিয়ে ফেলল। সে যেন আমার কাছে অন্য কিছু শুনতে চাচ্ছিল, বা বুঝতে চাচ্ছিল কিছু আনকোরা ব্যথার অনুভব।

আমি বললাম, তোমার বেবিটা অনেক কিউট।

সে আবার তার মেয়েকে সুখী করার পন্থাগুলো বলতে শুরু করল।

রেস্টুরেন্টের স্বচ্ছ কাচ ভেদ করে বিকেলের এক চিলতে রোদ নেমে এসেছে টেবিলে। সেই রোদটাকে সময়ের বিবর্তনে একমাত্র বন্ধু মনে হল আমার, পরিচিত খুব চেনা মানুষের মতো। এমনকি ওকে বলতে ইচ্ছে হলো, এই রোদটুকুকে তুমি কি চেন?

সে কিন্তু বলে যাচ্ছে তার মেয়ের কথা। পয়সাওয়ালা মানুষের মতো পয়সা দেখাচ্ছে, উঠতি বয়সের ছেলের মতো রাস্তায় প্রচন্ড বেগে বাইক চালাচ্ছে। ভয়ে রাস্তা থেকে নেমে গেলাম।

সাহস করে বললাম, রোদটুকু দেখ তো, চিনতে পার কিনা?

“চিনতে পারছি, এ রোদটুকু ক্রমাগত দীর্ঘতর ছায়া ফেলে দ্রুত সরে যায়।”

ছায়া ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে সময়, এমনকি আজ এই বসে থাকার আয়োজনটাকে আগামীকালের ছায়া পুরোপুরি গ্রাস করবে। এভাবে গত দশ বছরে ছায়াটা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে।

সে বলল, এবার উঠি?

আমিও বললাম, ঠিক আছে।

চোখের দুকোণে আঙ্গুল চেপে ধরল সে। সেখানে ঘামের মত দু’ফোটা অশ্রুকে ঘষে অদৃশ্য করে ফেলল এবং চোখ দুটো যখন শান্ত হয়ে এল সে আবার বলল, উঠি?

আমি আবারও বললাম, ঠিক আছে।

দুজনের পরিচিত রোদ টুকুকে নিয়ে সে চলে গেল। চলে যাওয়ার পর আমি নিজের দিকে তাকালাম। কুয়োতে মুখ দিয়ে যেন নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পাচ্ছি- স্বচ্ছ জলের উপর শুধুমাত্র অন্ধকার নয় একটা গভীরতার ভয় লুকানো আছে। আমি যদি নামতে পারি তাহলে স্বচ্ছ জলের পূর্ণ প্রতিবিম্বটা দেখতে পাব।

আমাকে কুয়োতে নামতেই হলো। তার আগে অনুভব করলাম সামনে ফাঁকা চেয়ারটা যে চেয়ারে সে বসেছিল সেই চেয়ারের উষ্ণতাগুলো আস্তে আস্তে উবে যাচ্ছে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি সেগুলো বেগুনী রঙ্গের ধোঁয়ার মত উড়ে যাচ্ছে।

এভাবে দশ বছর পরের ঘটনা বা উপলব্ধিগুলোকে আমি একটার পর একটা সাজাতে পারি।

আমি লাইব্রেরীর সামনে আমগাছের নিচে বসে আছি দুই ঘন্টা হলো, কিন্তু সে বের হচ্ছে না। সে সাইক্রোফিলিক ব্যাকটেরিয়ার নামগুলো মুখস্ত করছে। আমি ওর সামনে কিছুক্ষণ বসেছিলাম।

সে বলল, তুমি চলে যাও, আমার বেরুতে অনেক সময় লাগবে।

“তুমি পড়, তোমার সামনে বসে আছি আমি।”

“তুমি থাকলে পড়ার ডিস্টার্ব হয়।”

মনটা চাচ্ছিল হাত ধরে টেনে হিঁচড়ে বের করি ওকে। কিন্তু বসে আছি লাইব্রেরীর সামনে ওর অপেক্ষায়, সে কিন্তু জানে না। ওর বাবা জুয়া খেলে বলে সর্বদা ওর মন খারাপ থাকে। ওর মা কাঁদে বলে ওর মন খারাপ থাকে। আমি ওকে ভালবাসি বলে মাঝে মাঝেই সে বিষণ্নতায় ভোগে।

একটা মেয়ের খারাপ লাগার বরফ খন্ডকে চর্তুদিক থেকে আগলে ধরি। বরফ খন্ড আস্তে আস্তে গলে যাচ্ছে।

দশ বছর পর মেয়েটা সুখী হওয়ার চেষ্টা করবে। একটা রেস্টুরেন্টে বসে আমরা নিজ নিজ সুখের কৈফিয়ত দিব। দশ বছর আগে আজকের দিনে যদি সে সুখী হওয়ার চেষ্টা করত!

আমি দুই ঘন্টা ধরে বসে আছি। ব্যাকটেরিয়াগুলোর নাম ওর মুখস্ত হচ্ছে না।

দশ বছর পরের বেগুনী রঙের ধোঁয়া চোখের সামনে উড়ছে, আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।





লেখক পরিচিতি
রবিউল হক বক্সী
ঔপন্যাসিক ও গল্পকার
প্রকাশিত উপন্যাস-‘উড়ে যাওয়ার দিন’, ‘উনিশ বছরের কালো মেয়ে’
গল্পগ্রন্থ-‘তিলোত্তমা ও 208 নং রুম’
বাংলাদেশের উত্তরের শহর রংপুরে বসবাস করেন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ