শাহাব আহমেদের ধারাবাহিক উপন্যাস : পেরেস্ত্রইকা মস্কো ও মধু-- পর্ব ৪৫ থেকে ৫০




৪৫ তম পর্ব

অভ্র, যাকে বলে, বখতিয়ার ভাইয়ের সুন্দর দুই চোখের দিকে তাকিয়ে, টাকাটা ধার করে ধার দিয়ে ধরা খায়। শুধুই আবেগ কাজ করেছে এখানে, কোনো ব্যবসায়িক বুদ্ধি নয়। এমন মাটি খাজা কাজ কেউ করে?

বখতিয়ার ভাইকে খুঁজে বের করা দরকার। অভ্র তার অফিসে যায়।
দেখা গেল মস্কোর অফিসের আগের সেই শান শৌকত জৌলুশ আর নেই। মস্কোতে এখন হাতি ঘোড়া জিরাফ, জেব্রা, কালাশনিকভ, ট্যাংক, মিসাইল, প্লেন ইত্যাদির ব্যবসা চলছে অথচ এরা এখনও সেই তিন চার বছর আগের রমরমা কিন্তু এখন মৃতপ্রায় ইলেক্ট্রিক হিটার, চায়ের কেটলি, ডালের হাড়ি ইত্যাদি হাবি জাবি বিক্রি করে কোনোমতে চলছে।
“বখতিয়ার ভাই কই?”
“দেশে।”

“উনি টাকা কবে ফেরত দেবেন?”
পিছলায়। কমরেডরা পিছলাতে সিদ্ধ। হিলালউদ্দিনদের এখন আর কোনো উত্তর নেই। মুখে তালা। অভ্র দেশে ফ্যাক্সের পরে ফ্যাক্সে চিঠি পাঠায়, বখতিয়ার ভাই উত্তর দেন না। দেশে ফোন করে, তিনি ফোন ধরেন না। ব্যস্ত মানুষ, তিনি আজ এখানে তো কাল ওখানে।
অভ্র নিজের পকেট থেকে সুদের টাকা পে করতে থাকে। কিছুদিন পরে বখতিয়ার গার্মেন্টসের ইফতেখার ভাই মানে হিলালউদ্দিনের বড় ভাই আসেন মস্কোতে।

অভ্র চাঁদ হাতে পায়।
অভ্রের অতিপ্রিয় নেতা তিনি।
একসাথে মিছিল মিটিং করেছে ঢাকায়।

তার চুম্বক পার্সোনালিটির কারণে তাকে পছন্দ করে না, ছাত্র ইউনিয়নের এমন একজন কর্মীও নেই। মানুষের হাসি বিক্রি করা গেলে নিঃসন্দেহে তার হাসিটি পেটেন্ট করে বাজারজাত করা হতো অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা। অভ্র তার কাছে টাকার খোঁজ নিতে যায়। তারপরে নেতাকে নিয়ে মস্কো ঘোরাঘুরি করে।রেড স্কোয়ার, লেনিনের মমি, ক্রেমলিন, মাস্কভা রিভার ক্রুজ কিছু বাদ থাকে না। ইফতেখার ভাই নিজের ছোট ভাইয়ের তুলনায় অভ্রের সাথে ঘোরা ফেরা করতে বেশি পছন্দ করেন।

তাদের গার্মেন্টসের সাফল্যের ব্যাপারে ইফতেখার ভাই উচ্ছসিত। খুব ভালো চলছে। ইওরোপে গার্মেন্টস যাচ্ছে। কোম্পানি ভালো প্রফিট করছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন দেশে গিয়ে বখতিয়ার ভাইয়ের সাথে কথা বলে অভ্রের টাকাটা ফেরত দেবার বন্দোবস্ত করার। অভ্র স্বস্থি পায়। সে গর্দভ নয় ঠিকই।

তবে যতটা না ব্যবসায়ী, তারচেয়ে নেতাদের প্রতি বিশ্বস্থ।

একদিন হিলাল উদ্দিন অভ্রকে প্রস্তাব করে বখতিয়ার/ইফতেখার ভাইয়ের গার্মেন্টস ফ্যাকটরি থেকে এক কন্টেইনার "ডেনিম" শার্ট আনার। ৪০ হাজার ডলার কন্টেইনারের দাম, ১ মাস লাগবে আসতে। লাভ হবে কমপক্ষে ৪০ হাজার। সে যদি ৪০ হাজার ডলার ইহুদির কাছ থেকে এনে দিতে পারে, ৫০% প্রফিট তার। অভ্র টাকা এনে দেয়। ১ মাসের মধ্যে কন্টেইনার চলে আসে। বিক্রি করে ৫৫ হাজার ডলার লাভ হয়। অভ্রের মধ্যে ব্যবসায়ির বদলে কমরেড সত্তাটি জেগে ওঠে। বলে, আমাকে ৫০% দেয়ার দরকার নেই, বরং আমরা তিনজনে ১৫ হাজার করে নিই, আর বাকি ১০ হাজার দিয়ে ইফতেখার ভাইকে বাংলাদেশে একটা গাড়ি কিনে দিই। তিনজনের মধ্যে সে সিনিয়র, হিলাল উদ্দিন খুবই খুশি হয়, আব্বাস শালীনতা বজায় রেখে মৌন থাকে।

কিছুদিন পরে অনেকটা কাকতালীয় ভাবেই বিভিন্ন কাজে তিন জনই দেশে যায় এবং বখতিয়ার ভাইয়ের গার্মেন্টসে তাদের দেখা হয়। তারা ইফতেখার ভাইকে ধরে নিয়ে যায় টয়োটা ডিলারশিপের শো রুমে এবং ৪ লাখ টাকা দিয়ে একটি "ব্র্যান্ড নিউ" টয়োটা করোলা কিনে দেয়। ইফতেখার ভাই বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে পারলে নিঃসন্দেহে এর চেয়ে অনেক বেশি খুশি হতেন, কিন্তু নতুন গাড়িটা তাকে মঙ্গোলিয়ার পার্টি নেতার আমেরিকান কোম্পানির কাছ থেকে উপহার পাওয়া “হার্লি ডেভিডসনের” চেয়ে কম আনন্দ দেয় না।

পরের দিন আব্বাস অভ্রকে নিয়ে যায় তার বাবার বন্ধু, বয়স্ক এক কমরেডের কাছে। তার সামান্য ক’টি পাকা চুল, মাথার বাকিটা ফাঁকা। ঢাকায় তার দুটো বাড়ি। একটিতে নিজে থাকেন, অন্যটিতে পার্টি ও ন্যাপের ফুল টাইম রাজনীতি করে এমন কিছু লোকজন থাকে বিনা পয়সায়। তা স্থানীয় রাজনৈতিক অফিস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গার্মেন্টসের ডায়িং ফ্যাক্টরি তার। গার্মেন্টসের অন্যান্য মেটেরিয়ালেরও সাপ্লাই দেন। আব্বাসকে দেখে খুব খুশি হন। পিতার পরিচয় পেয়ে অভ্রকেও আপন করে নেন। চা বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করেন। বাসায় যাবার নিমন্ত্রন জানান।
উঠে আসার সময়ে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেন, "বাবা, তোমরা যে ডেনিম কন্টেইনারটা নিছিলা, তার দামটা কবে দিবা? ইফতেখার তো অনেকদিন ধরে বলছে তোমাদের মাল বিক্রি হয় নাই, তাই টাকা দিতে পারো নাই।"

ওরা দুজনেই মাটি থেকে পাতালে পড়ে যায়। ৪০ হাজার টাকা পাঠানো হয়েছে ৪ মাস আগে। মাল বিক্রি হয়ে গেছে কন্টেইনার পাবার সাথে সাথে। ওরা নিজেদের প্রফিটের টাকা এখনও নেয় নাই , এমন কী ইহুদীর কাছ থেকে আনা ৪০ হাজার ডলারও। তারা সব টাকা রি-ইনভেস্ট করেছে দুই কন্টেইনার জুতার জন্য। প্রফিটের ১০ হাজার টাকা দিয়ে গতকালই ইফতেখার ভাইকে গাড়ি উপহার দিয়েছে। আর সে কিনা বৃদ্ধ কমরেডের টাকাটা পরিশোধ করে নাই। দুজনেই প্রায় সমস্বরে বলে, "আমরা তো টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি ৪ মাস আগে।"
কমেরডকে বিপর্যস্ত দেখায়, "বল তো কী কথা! ইফতেখার আমাদের হাতে গড়া এত প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্রনেতা, সে কিনা মিথ্যা বলে আমার টাকাটা আটকে রেখেছে।"

আব্বাস পরের দিন ইফতেখার ভাইয়ের বজ্রের নীচে পড়ে।

"এত পটর পটর করে কেন উত্তর দাও কোনো কিছু না জেনে না শুনে?"
আব্বাস বুঝতে পারে না, তার অন্যায়টা কোথায়?
তাকে বলা হয়েছে, তারা টাকা পে করে নাই।

সে শুধু বলেছে, করেছে।

তার কি সেখানে মিথ্যা বলা উচিত ছিল? তা ইফতেখার ভাই আগে বলে দিলেই তো পারতেন।

বখতিয়ার ভাইয়ের সাথে অভ্রের দেখা হয় না। সে নাকি ঢাকায় নেই, ইন্দোনেশিয়ায়। মস্কো ফিরে আসে। আরো কিছু টাকা ইনভেস্ট করে জুতার জন্য হিলাল উদ্দিন আব্বাসের ব্যবসায়ে। হিলাল উদ্দিন ওকে তাদের ব্যবসায়ের ১/৩ পার্টনার করে নেয়ার ঘোষণা দেয়। নিজেদের মধ্যে কাজ, লেখালেখির দরকার সে বোধ করে না।

ইফতেখার ভাই আবার মস্কো আসেন।

ছোট ভাইয়ের সাথে থাকলে ফুর্তি করা যায় না। ওঠেন অভ্রের ওখানে। অভ্র তাকে এনটারটেইন করে, ইনট্যুরিস্টের বারে, নাইটক্লাবে নিয়ে যায়। ক্যাসিনো, জুয়া, নাচ, গান, ড্রিন্কস এখন সবই আছে।
ইফতেখার ভাই ক্যাসিনো বা জুয়ায় নেই।

তবে ডিসকো ফ্লোরে মস্কোর সবচেয়ে সুন্দরি মেয়েরা চোখে আগুন লাগিয়ে দেয় হাসন রাজার পিয়ারির মত। তাদের ৯০ % ই ৩০০ ডলারের বিনিময়ে পেগাসাসে বদলে যেতে পারে এক রাতের জন্য। তাদের গায়ে যেটুকু পরিধেয়, সে টুকু না থাকলে সবটাই মাটি হয়ে যেত। কিন্তু ঐ টুকু থাকায় তারা যেকোনো তীব্র মদের চেয়েও মাদকীয়, যে কোনো জাহান্নামের চেয়েও লেলিহান। ইফতেখার ভাই ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকেন। ১-২-৩ টা ড্রিন্ক্স যখন হলকুম পার হয়ে মগজে ঘুর্ণি তোলে তখন তাদের সাথে ফ্লোরে নেচে নেচে তার গায়ে আগুন ধরে যায়। অভ্র তার চোখে মুখের অভিব্যক্তিতে বুঝতে পায় তিনি কী চান। কিন্তু সে তার ছোট ভাইয়ের বন্ধু, এবং তিনি ওর এত বড় নেতা, ফলে বাধাটুকু রয়েই যায়। তীব্র অতৃপ্ত ইচ্ছা মানুষকে মেরে ফেলে। ইফতেখার ভাই জিন্দাপীরের আগুন দেহে নিয়ে মরা মানুষের মত মস্কোতে বাঁচেন।

তবে শুধু ফুর্তি করাই নয়, ব্যবসায়ের আলোচনাও তাদের মধ্যে হয়। ইফতেখার ভাই বলেন গার্মেন্টসের লাভ ও উন্নতির কথা। কিন্তু বখতিয়ার ভাইয়ের টিকিটিও অভ্র ধরতে পারেনি। আরও বহুবার ফ্যাক্স পাঠিয়েছে কিন্ত উত্তর পায়নি। ইতিমধ্যেই ১৫-২০ হাজার ডলার সুদ বকেয়া হয়ে গেছে। সে নিজের পকেট থেকে টানছে। ইফতেখার ভাই প্রতিশ্রুতি দেন আর কয়েক মাস পরেই, বছর শেষে তার টাকা শোধ করে দেবেন।
তিনমাস পরে উনি আবার আসেন। যথারীতি অভ্রের সাথে থাকেন। বেলজিয়াম যাচ্ছেন, বড় এক ক্রেতার সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। অভ্র তাকে দুতাবাসে নিয়ে ভিসা করে দেয়।

উনি চলে যান।
দেশে ফিরে যান বেলজিয়াম থেকে সরাসরি।
কিছুদিন পরে খবর আসে উনি বখতিয়ার ভাইয়ের গার্মেন্টস ছেড়ে চলে গেছেন। নিজে হাই ফাই বায়িং হাউজ খুলেছেন। সাথে গেছে রংপুরের আর এক কমরেড যিনি এতদিন তারই ডান হাত হিসেবে বখতিয়ার গার্মেন্টসে ছিলেন।
অভ্র এবার ভয় পেয়ে যায়। তার এতদিন ভরসা ছিল যে, ইফতেখার ভাই টাকাটা শোধ করবেন। শেষ ভরসা চলে গেছে শুনে সে সাথে সাথে বাংলাদেশে ওড়ে।

খুঁজে বের করে ইফতেখার ভাইয়ের বায়িং হাউজ।
রংপুরের কমরেড রিসিপশনে, বলেন, "অভ্র আসো, কেমন আছো? বসো।" তার মধ্যে আগের উষ্ণতা আর নেই। অভ্রের কসেরুকা দিয়ে মাঘ মাসের শীতের দমকা হাওয়া বয়ে য়ায়।
ইফতেখার ভাইকে খবর পাঠানো হয়।

কিন্তু উনি ব্যস্ত।
ডাকেন না।

সময় যায়।
অভ্র বসে বসে মস্কোর নাইট ক্লাবের কথা স্মরণ করে। ইফতেখার ভাইয়ের লিবিডোতাড়িত হায়েনার চোখের মত চকচকে চোখগুলো চোখে ভাসে, আর তার মস্কোর উর্বশীদের সাথে হাস্যকর অপরিশীলিত নৃত্য। সে-ই সব সময় উদারভাবে পয়সা খরচ করেছে। ইফতেখার ভাইয়ের হাসিটি! আহা, অমন হাসির জন্য গিলোটিনে গলা পেতে দেয়া যায়। তার সাথে ঢাকার রাজপথে সমাজতন্ত্র প্রায় ছুঁই ছুঁই কত মিছিল সে করেছে। সেই ইফতেখার ভাইয়ের দেখা পাবার জন্য সে তীর্থের কাকের মত বসে আছে। ৫০ মিনিট বা ৫০ ঘন্টা পরে ইন্টারকমে ডাক আসে।

অভ্র ভেতরে যায়। ইফতেখার ভাইয়ের ছিমছাম সুন্দর অফিস। খালি একটা লেনিনের ছবির অভাব।

ইফতেখার ভাইয়ের হাসিটি আর নেই, কোথায় কখন যেন তিনি তা হারিয়ে ফেলেছেন। একজন মানুষ আসলে তখনই মৃত যখন তার সনাক্তকারী হাসিটি মরে যায়। অভ্রের মনে হয় তার সামনে একজন অনুভূতিহীন মৃতমানুষ। অভ্রকে যেন তার চিনতে কষ্ট হয়, যেন গ্রামের কোনো গরীব আত্মীয় ভিক্ষা বা চাকরি চাইতে এসেছে। এই অভ্র মস্কোর অভ্র নয়, ছোট ভাইয়ের ওখানে না থেকে যার সাথে না থাকলে তার মস্কো ভ্রমণ আলুনি হয়ে যায়। যার কেনা মদ না গিললে বা অর্ধনগ্ন উর্বশীদের নাভিপদ্ম না দেখলে তার জীবনটাই হয়ে ওঠে বিপ্লবপরবর্তি শীতল ও অভুক্ত পেত্রোগ্রাদের মত।
তিনি খুব ব্যস্ত।
কাগজে খস খস করে কিছু লিখছেন, ওর দিকে তাকানোর সময় নেই।
"কী খবর অভ্র?"
"আমার টাকা কই?"
"তুমি বখতিয়ার ভাইকে জিজ্ঞেস করো, আমি তো তোমার থেকে কোনো টাকা নেই নাই। তুমি তার সাথে দেখা করো। আমি আর তার সাথে নাই। নাজিম ভাইকে পাই টু পাই বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। সেই এখন বখতিয়ার গার্মেন্টস চালায়।"
"আমি এখন কী করবো একটা পরামর্শ দেন।"
"আমি কী বলবো? তুমি যা ভালো বোঝ তাই করো। আমি আজ খুব ব্যস্ত আছি, তোমার সাথে আবার কথা হবে।”

অভ্রের পিতা, বখতিয়ার ভাই, ইফতেখার ভাই, নাজিম ভাই একই পার্টির রাজনীতি করেছেন এক সময়ে। বাবা বলতেন ইফতেখার ছেলেটি খুব মেধাবী, সে অনেক দূরে যাবে।

অভ্র নিজেও সেই রাজনীতি করেছে। কোনো শোষণ থাকবে না, একজন মানুষ আর একজন মানুষকে ঠকাবে না। মানুষ হবে মানুষের ভাই, বন্ধু ও কমরেড।

অভ্র এই প্রথম বোধ করে, কী ভালোই না হয়েছে যে ওর পিতা এই মানুষগুলোর পরিবর্তিত মুখ দেখার আগেই চলে গেছেন। পিতা এবং তার সাথে যারা রাজনীতি করেছেন তারা ছিলেন অন্য মানুষ। রাশিয়ায় বিপ্লব করেছিল তার পিতার মত মানুষেরা কিন্তু রাশিয়া শাসন করেছে বখতিয়ার ইফতেখার ভাইয়ের মত কমরেডরা।

এটা আদর্শের ব্যাপার নয়। আদর্শ ভালো কী মন্দ, ভুল কী শুদ্ধ তার দার্শনিক বিশ্লেষণের গুরুভার বিতর্কও নয়, এটা সম্পূর্ণই একজন মানুষ এবং আর একজন মানুষের ব্যাপার। এটা শুধুমাত্র তাদের মধ্যেকার স্বার্থের ব্যাপারও নয়, স্বার্থবোধেরও ব্যাপার। অভ্র বের হয়ে আসে এত কালের প্রিয় ইফতেখার ভাইয়ের রুম থেকে। রংপুরে কমরেডকে বলে, "ভাই কী করি বলেন তো, আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেল?"
“তুমি ভাই ভালোই বিপদে পড়েছো। রংপুরে গিয়ে দেখো সেখানে বখতিয়ার ভাইকে পাও কিনা।”

তার থেকে ঠিকানা নিয়ে অভ্র পালোয়ান সাইজের এক আত্মীয়কে নিয়ে প্লেনে চড়ে বসে।


পেরেস্ত্রইকা মস্কো ও মধু
৪৬ তম পর্ব

লোকে বলে বাংলাদেশ রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের দেশ। কিন্তু বিদেশে বসবাসকারী বাঙ্গালীমাত্রই জানে, ওটা মিথ্যা উপকথা।‘রয়্যাল’ কিছু বাংলাদেশে কোনোদিনই ছিল না। সবকিছুই ছিঁচকে। বাংলায় রাজারা বামন, যারা মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী ত্যাদড়ের ভয়ে পালিয়ে যায়। অথবা ২৩শ শাদা শয়তান ৪৭ হাজারের বিশাল ব্রাউন সৈন্যবাহিনীকে হারিয়ে সিরাজহীন করতে পারে। ছোট দেশ, ছোট মানুষ, ছোট মন। কেউ খুব বড় হলে সেখানে আর আটে না। মাত্র কয়েকজন বামন সেই বিশালকে হত্যা করে আর কোটি কোটি ছোট মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে।

এসবের মধ্যে রয়্যাল কী আছে?

লোভ বিশাল, বিশাল আকাশেরও হয়তো সীমা খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু লোভের যায় না। বানর আর বিষধর অনেক, পকেটমার আর কিলবিলকরা পামর। মেফিস্টোফিলিস হাঁটে বড় ছোট সব রাস্তায়, রাস্তা ছেড়ে ঘুপছি ও সংকীর্ণ গলিতে। বাড়ির আঙ্গিনায়, বাড়ির পেছনে, কিশোরী ও যুবতী বাংলার ওড়না টেনে ধরে।

বিদেশের সাদা কালো পরিবেশে থেকে, বাংলার বট হিজল বরষার নস্টালজিয়ায় ভুগে ভুগে অভিবাসি ভাবে, দেশ তাদের জন্য ফুলের ডালা নিয়ে বসে আছে। ভুলেই যায় যে এয়ারপোর্টে পা দেবার সাথে সাথে শুরু হয় যন্ত্রনা, দুর্গন্ধময় টয়লেটের মত পিছু ধাওয়া করে অশিষ্ট জীবন; প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি শ্বাস-নি:শ্বাস বিষায়িত করার জন্য সদা প্রস্তুত কত কত মানুষ।

আপনজনের বিষথলি কত বড়! বন্ধু বন্ধু নয়, ভাই ভাই নয়, বোন নয় বোন।

প্রেমিকা-ভুজঙ্গ। অার অভিবাসি-কল্পতরু, তার কাছ থেকে সব আদায় করা যায়, চোখের জলে বা চোখ রাঙিয়ে।

অভ্রের মধ্যে কেমন কস্টিক একটা কষ্ট, একটা তীব্র ক্ষার মগজে ঘায়ের মতো জ্বলে। বখতিয়ার , ইফতেখার, জগৎ শেঠ ও ঘসেটি বেগমদের দেখে সে সর্বত্র। কখনও পুলিশ, কখনও র‍্যাবের পোশাকে, কখনও রাজনীতির ব্যানারে। হিংস্র এক প্যারানয়া। হিজল ফুলের সৌন্দর্য্য, হেলেঞ্চার গাঢ় সবুজ যৌবন-অঙ্গ সৌষ্ঠব আর ভাদ্রের কাঁশফুল নিয়ে যেই বাংলা, তার রূপকে মলিন করে রাখে এই শ্বাসরুদ্ধকর বোধ। ওর দাদু, ওর পিতা এই দেশের মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারায়নি কোনো দিন। ভারতে গিয়ে নিরাপদ জীবন খোঁজেনি, বরং বাংলার কালবোশেখীর টুটি চেপে ধরার দু:সাহস নিয়ে হেঁটেছে।

সে রংপুর এসে পৌঁছায়। বখতিয়ার ভাইয়ের বাড়ির সামনে অনেক লোক, তার সঙ্গোপাঙ্গো ও মেঠো কর্মি। সবুজ রংয়ের একটি রাশিয়ান আর্মি জীপ “উয়াজ” দাঁড় করানো। মস্কো থেকে এসেছে শুনে পাহারাদার ভিতরে যেতে দেয়। বখতিয়ার ভাই দুপুরের খাবার খাচ্ছেন।
দুজন তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বড়লোক বা নাস্তিক, ভূত দেখলে যে-কেউ চমকায়।
অভ্রকে তার ভূতের মত মনে হয়।
"তুমি কেন ফ্যাক্সে আজে বাজে কথা লেখ? আমার একটা মান ইজ্জত আছে না?"

“আপনি উত্তর দেন না কেন? আপনার সাথে আমার কোনো ব্যবসা নাই। আপনি ইহুদির টাকাটা দিয়ে দেন আমি এক্ষুনি চলে যাবো ।"
"কয়দিন আছো?"
“আমি আপনার জন্য এসেছি। যখন টাকা দেবেন তখনই চলে যাবো।”
"আচ্ছা কাল রাত ১০ টায় তুমি ঢাকায় আমার বাসায় আসো।"
ঠিকানা দেয়।
“থাকবেন তো?”
“থাকবো।”

“বসো, খাওয়া দাওয়া করো।”

“না খাবো না, কালরাতে আমরা বাসায় আসবো।”
বলে অভ্র বের হয়ে আসে।

ওর বমি বমি বোধ হয়। বের হয়ে সে আসলেই অপ্রত্যাশিতভাবে বমি আটকাতে পারে না।

ধ্বকল গেছে অনেক। বিশ্রাম হচ্ছে না। তাছাড়া প্রাক্তন নেতার সাথে দেখা করতে বমি প্রতিষেধক লেবুপাতা সাথে রাখতে হবে এমনটা সে ভাবেনি। দেখে সারেনি জীবনের সত্য চেহারাটি এখনও।

পরেরদিন রাতে ঠিকানা খুঁজে বখতিয়ার ভাইয়ের বাসায় আসে। আঁটসাঁট গঠনের বেশ সুন্দরি যৌবনবতী এক নারী দরজা খোলে। নাদিয়া ভাবী পড়ন্ত যৌবনা, নিঃসন্দেহে ইনি অনেক বেশি আকর্ষণীয়া।

বখতিয়ার ভাই নেই। কখন আসবে সে জানে না। অভ্র পরের দিন আবার যায়।

ভাগ্য ভালো আজ আছেন। তিনটি চেক লিখ দেন তিনি।

প্রতিটি ৪ লাখ টাকার, সর্বমোট ১২ লাখ, ১ ডলার = ৪০ টাকা হিসেবে ৩০ হাজার ডলার। বাকিটা মস্কো এসে দেবেন।

“চেকগুলো কাল নয়, পরশু জমা দিও।” উনি বলেন।

সময়মত চেক জমা দেয়া হয়, কিন্তু বাউন্স হয়ে ফিরে আসে। কোনো টাকা নেই।

পরের দিনও তাই।

মস্কো ফিরে যাবার তাড়া। মামার হাতে চেকগুলো দিয়ে চলে আসে সে। মামা ৭-৮ বার চেক নিয়ে ব্যাংকে যায় কিন্তু একই ঘটনা। আবার শুরু হয় ফ্যাক্স পাঠানো। কোনো উত্তর নেই।

বখতিয়ার ভাইকে আর পাওয়া যায় না।

মস্কোতে রমরমা ব্যবসার সময়, বখতিয়ার ভাইয়ের ইচ্ছে হয়েছিল বাংলাদেশে কিছু করতে। আর যাই হোক, মাতৃভূমি; ব্যবসাও হবে, দেশের জন্যও কিছু করা হবে। কিন্তু টাকার গরম কাক চিল মৌ মক্ষী ডেকে আনে। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকে এবং বাম রাজনীতির তর্জনি দিয়ে অন্যের পশ্চাত খুটতে খুটতে তিনি বুঝতেই পারেননি যে, দেশের মানুষ মস্কোয় পড়াশুনা করতে যাওয়া মেষ শাবকদের মত নয়। দেশে সোভিয়েত পার্টির মত কোনো ক্ষমতাসীন পার্টিও তার পেছনে নেই।

অল্পদিনেই এক নারী তাকে প্রলুব্ধ করে ফেলে। বাঙালি নারী তার জন্য অচেনা আমাজন বন। সেই বনে হারিয়ে যাবার ইচ্ছাকে সে অবদমিত করতে পারে না। একটু বেশিই এগিয়ে যায় এবং ফেরার পথ হারিয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়।

অভ্রের দেখা সেই নারী ১ বছরের মাথায়, ‘প্রেমিকা-ভুজঙ্গ’ এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে তার ব্যবসা ও অর্থে বিরাট কামড় দিয়ে চলে যায়। ততদিনে নাদিয়া ভাবী তার প্রতি এত ক্ষিপ্ত যে, দুই সন্তান নিয়ে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলেছে এবং বখতিয়ার ভাইকে আর ঘরেই ঢুকতে দেয় না। তার দীর্ঘদিনের পরিচিত মস্কো প্রায় অপরিচিত হয়ে ওঠে।

বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে গিয়ে আবার বিয়ে করেন।

পার্টির যে লোকজন নিয়ে ব্যবসা করেন তারাও মুৎসুদ্দি চরিত্র লুকানোর চেষ্টা করে না। প্রিয় কমরেড ইফতেখার সিঁদ কেটে বখতিয়ার গার্মেন্টসকে নিঃস্ব করে চলে যাবার কিছুদিন পরে নাজিম হিকমত ভাই মারা যান। মূলত সেখানেই বখতিয়ার গার্মেন্টসের বিলুপ্তি ঘটে।

বখতিয়ার ভাই অনুধাবন করেন সমাজতন্ত্র ও কমিউনিস্ট পার্টি ভালো কিন্তু প্রয়োজন ক্ষমতার। ক্ষমতাই হচ্ছে আদর্শের বিশ্বস্থতম স্থান। কিন্তু বাংলাদেশের ‘বিশুদ্ধ কিন্তু ছোট’ পার্টি দিয়ে সেই ক্ষমতা অর্জন সম্ভব নয়। তিনি ‘রংপুরের ছাওয়াল’ এরশাদের সাথে দেখা করেন।

এরশাদ এত ভালো!

সে তাকে ফেব্রুয়ারীর ইলেকশনে এমপি’র নমিনেশন দেয়।

প্রতিদ্বন্দীহীন ইলেকশনে এমপি হয়ে বখতিয়ার ভাই পুরানো রাজনৈতিক জীবনকে নতুন মোড়কে পরিবেশন করার প্রস্তুতি নেন। কিন্তু শালার জনগন, শুধু বাঁধা হয়েই দাঁড়ায় না বরং হিংস্র ধাওয়া করে দীর্ঘ দিনের জন্য তাকে দেশ ছাড়া করে।

মস্কোতে হিলাল উদ্দিন সমস্যার সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। বড়ভাইয়ের পথ ধরে সে অভ্রের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করছে। অভ্র তখন অফিস নিয়েছে এবং তার গোডাউনে ওদের ১ কনটেইনার বাংলাদেশের সেরা জুতা এবং আরো কিছু মাল রাখা আছে। ইহুদির থেকে ধার করে আনা ৪০ হাজার ডলার প্লাস আরো কিছু আসল এবং এতদিনের মুনাফা মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ ডলার ওর পাওনা।

সে মালগুলো আটকে দেয়।

তিন পার্টনারের মিটিং বসে। একপর্যায়ে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। হিলাল উদ্দিন বলে, "আমি যদি আপনার টাকা না দেই আপনি কী করতে পারবেন? আমি কিন্তু আপনাকে ছাতু করে দিতে পারি।”

অভ্র সচরাচর ক্ষেপে না। সবসময় নরম গলায় কথা বলা মানুষ। এটা ওদের পারিবারিক উত্তরাধিকার। রাগকে জয় করতে পারা।

কিন্তু ওর ভেতরের অজানা রি-একটরে তুমুল বিস্ফোরণ হয়। সে লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং একটা চেয়ার উচিয়ে তেড়ে যায়, “শুওরের বাচ্চা আমি তোকে খুন করবো।”

আব্বাস ওকে আটকায়।

আব্বাস ভালো ছেলে। অন্তত সে মারপিট-খুন-জখমের থেকে রক্ষা করে। সে জানে খুনাখুনি হয় ক্ষমতার করিডোরে, সমাজতন্ত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়। তা বলে বন্ধুতে বন্ধুতে মারামারি করবে টাকার জন্য তা ভালো নয়, বিশেষ করে তাদের যখন একই পার্টি এবং মানুষের কল্যান করার একই আদর্শ।

অভ্র কিছু জুতা বিক্রি করে ২৫ হাজার ডলারে। পরে পায় আরও ১০ হাজার। বেচতে গিয়ে দেখে এগুলো স্টকের এক সাইজের জুতা। হয় হিলালউদ্দিন জেনে কম দামে কিনেছে এবং ওদের জানায়নি, নয় বাংলাদেশের সাপ্লায়ার প্রতারণা করেছে। এখন আর কিছু করার নেই। সোভিয়েত ইউনিয়নে ব্যবসা করতে আসা প্রায় প্রতিটি বিদেশি কোম্পানি তাই করেছে, নাই মামার দেশে তখনও “ইমপোর্টের কোয়ালিটি কন্ট্রোল” বলে কার্যকরি কিছু ছিল না। তাদের দেশে যা চলে না, তাই তারা সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঠিয়েছে এবং জনগন তাই কিনেছে না জেনে এবং অন্য বিকল্প না থাকার কারণে।

অভ্র অবশিষ্ট কিছু জুতা কয়েকটি পরিচিত দোকানে কনসাইনমেন্টে বিক্রির জন্য দেয়। হিলাল উদ্দিন ক্ষিপ্ত হায়েনায় পরিণত হয়। বা ক্ষিপ্ত কোবরায়। বড় ভাই যা করেছে বখতিয়ার ভাইয়ের সাথে, সেও অভ্রের সাথে তাই করে পার পেয়ে যেতে চায়। অভ্রের টাকা পয়সার প্রতি স্বভাবজাত ঔদাস্যের কারণে

এবং অযৌক্তিক বিশ্বাসপরায়ন হবার কারণে সে অভ্রের অনেক টাকা কুক্ষিগত করেছে। নিজের টাকা যে নিজের কাছেই সবচেয়ে নিরাপদ তা না ভেবে অভ্র ভুল ভেবেছে, “টাকা হিলালউদ্দিনের কাছে আছে, অসুবিধা কী? যখন দরকার হবে নেব। তাছাড়া টাকা তো ব্যবসায়ই খাটছে, তার মানে বাড়ছে।”

কিন্তু ইফতেখার - হিলাল উদ্দিন এরা একই মাল-মশলা দিয়ে তৈরী। মুখে ভীষণ আদর্শবাদী, আদতে শ্ঙ্খচূড়।

কথায় বলে,“যার ধন তার নয়, নেপোয় মারে দই”; হিলাল উদ্দিন বিচার বসায়। কয়েকজন বাঙালি ব্যবসায়ি যারা টাকার গরমে চোখে আগুন পোষে, তারা মানতে রাজি নয় যে, হিলাল উদ্দিন অভ্রকে বাধ্য করেছে মাল আটকাতে। তারা বিশ্বাস করে না, হিলাল উদ্দিন তার কাছে প্রায় দেড় লাখ ডলার দেনা। বিশ্বাস করার কথাও নয়, কারণ ব্যবসায় নেমে তারা নিজেরা অভ্রের মত আনাড়ি কাজ কোনোদিন করেনি। ধরা ও সরার মধ্যে পার্থক্য সনাক্ত করতে অক্ষম বিচারকদের একজন অভ্রকে হুমকি দেয়ঃ “আপনি জানেন আমি আপনাকে ভ্যানিস করে দিতে পারি?”

অভ্র হাসে, “হ্যাঁ, হিলাল উদ্দিন বলেছে আমাকে ছাতু করে দিতে পারে, তুমি বলছো ভ্যানিস করে দিতে পারো, তোমাদের ক্ষমতার কোনো কমতি নেই। তা দাও ভ্যানিশ করে।”

অভ্র ইহুদির ৪০ হাজার ডলার ফেরত দেয়। বাকি আছে আরও ৬০ হাজার ডলার, যা বখতিয়ার ভাইয়ের কাছে পাওনা। কিন্তু তাকে ধরা অসম্ভব। বাধ্য হয় নাদিয়া ভাবিকে ফোন করতে। ভাবি সবসময় ছিলেন অভ্রের প্রতি অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ। আজ পাওনাদার হয়ে তাকে ফোন করতে সে খুবই অস্বস্থি বোধ করে। বলে ভাবি, “আমি এতদিন তোমাকে এর বাইরে রেখেছি। কিন্তু আমি আর পারছি না। ইহুদি আমাকে মেরে ফেলবে। এই অবস্থায় আমার একমাত্র পথ তোমার নাম ঠিকানা ইহুদির ডাকাতদের হাতে তুলে দিয়ে বলা যে, তুমি বখতিয়ার ভাইয়ের স্ত্রী এবং তার সমস্ত টাকা পয়সা তোমার হাতে।

ভাবি ঘাবড়ে যায়।

বলে,”তুই আমার বাসায় আয়।”

অভ্র ভাবিকে চিনিতে পারে না। অসম্ভব বয়েস বেড়ে গেছে। চোখ গর্তে, চেহারায় বিধ্বস্ততা, তার যৌবনের কম্রতা কোথায় উবে গেছে। একজন দু:খী, প্রতারিত, বিপর্যস্ত নারী।

বলে, “দেখ আমার ছেলেটা ড্রাগ এডিক্ট, সম্পূর্ণ আউট, চিকিৎসা করেও কিছু করতে পারিনি। মেয়েটা, যে ছিল বাপের ন্যাওটা, তার বিশ্বাসঘাতকতা সইতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে, ২ বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে, আমি নিজে অসুস্থ। আর এই পিদারাস্ত (এটি একটি খারাপ গালি) দেশে গিয়ে বিয়ে করেছে। আমি কি সারাজীবন তোদের জন্য কিছুই করিনি? তোরা আমাকে এত কষ্ট দিচ্ছিস কেন?

তোরা কি এতই মেরুদণ্ডহীন যে আমাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে দিবি? আমার দুই সন্তানের কী হবে? শোন্ আমার এই ফ্লাটটা আছে ৪ রুমের। আর একটা ফ্লাট আছে ২ রুমের, ভাড়া দেয়া, আর আছে দাচা।

এই আমাদের সম্পদ। এই ফ্লাট আর দাচা আমি তোকে দিতে পারবো না। তুই ২ রুমের ফ্লাটটা নিয়ে বিক্রি করে টাকা শোধ কর।”

“ভাবি দেনা ৬০ হাজার, প্রায় আরও ১০ হাজারের মত সুদ জমে গেছে। ওই ফ্লাট বেচলে পাওয়া যাবে বড়জোর ৪০ হাজার, আমি বাকি টাকা কোথায় পাবো?”

ভাবি ওর হাত ধরে, “ভাই, তুই আমাকে বাঁচা।”

অভ্রের ভিতরে একটা কান্না গুমড়ে ওঠে। ভাবি সত্যিই একজন অসামান্যা নারী, ২ বছর আগেও ছিলেন অপরিমেয় ধনাঢ্য। তখনও তার মধ্যে দম্ভ ছিল না, নব্য রাশিয়ান হয়েও সে চিরায়ত রাশিয়ান নারীর ঔদার্য্য হারায়নি।কিন্তু একজন মানুষের অর্বাচীনতায়, এখন প্রায় নিঃস্ব এবং তিনজন মানুষের ধ্বংসপ্রাপ্ত জীবন।

সে উঠে আসে। তার চোখে ঝাপসা হয়ে টল টল করে অস্বচ্ছ স্ফটিক। শেষপর্যন্ত ফ্লাট বিক্রি করে ৪৫ হাজার ডলার পায়। নিজের পকেট থেকে বাকিটা দিয়ে সে ইহুদির ঋণমুক্ত হয়ে বেশ কিছুদিন ব্যবসার থেকে দূরে সরে যায়।


পেরেস্ত্রইকা, মস্কো ও মধু
৪৭ তম পর্ব

অন্যত্র ডিজেল জেনেরেটর বিক্রির পরে সুদীপ নিকোলাই সের্গেইভিচ এবং অন্যান্যদের প্রাপ্য কমিশন পে করে দেয় অবিলম্বে। ফলে সে বিশ্বস্থতা অর্জন করে। সের্গেইভিচ অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই আর্মির ৫০টি নতুন ‘উয়াজ’ জিপ বিক্রির ব্যবসা নিয়ে আসে। আর্মি ওগুলোকে পুরোনো ও অকেজো দেখিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্তীকরণের অতি প্রচলিত পদ্ধতি। সরকারী জিনিস মানে আমার জিনিস। আগে ক্ষেত থেকে একটা বাঁধাকপি চুরি করলেও গুলাগে যেতে হতো, এখন যে যা নিতে পারে। অবশ্য সাধারণ মানুষের চুরি করার তেমন কিছু নেই, কদাচিৎ একে অন্যের বৌ বা প্রেমিকা চুরি করা ছাড়া। সেটা পুঁজিবাদ সমাজবাদে একই রকম।

বাংলাদেশে চুরি করে বা ঘুষ খায় কারা?

প্রায় সবাই, যারা রাষ্ট্রিয় চাকরি করে বা রাষ্ট্রিয় সম্পদের সাথে জড়িত। বাংলাদেশ কেন দুনিয়ার সব দেশেই। ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানির কর্মচারি ফাইল আটকিয়ে রেখে “চা-পানির” পয়সার জন্য ধানাই পানাই করতে পারে না, ফাইল তাকে মুভ করতে হয় দ্রুতগতিতে, নইলে প্রফিটে বাঁধা সৃষ্টি হয় এবং তার চাকরি যায়। যে সংস্থা সবার, সে সংস্থা শয়তানের।

জিপের ডিলটা অনেকটা আগের মতই। বিক্রেতা এবং ক্রেতা দুই পক্ষই প্রস্তুত, দরকার সুদীপের বিদেশি কোম্পানি। সামান্য কিছু রুবল পাঠাতে হবে সরকারি একাউন্টে, বাকিটা নগদ।

এই ব্যবসাটি করেও সুদীপ-মোশতাকের কোম্পানি ভালো প্রফিট করে। তারপরে আসে ঘরের পাশের ফিনল্যান্ডের একটি কোম্পানি যারা গাছের গুড়ি কিনতে চায়। রাশিয়ায় এর অভাব নেই। ফিনল্যান্ডের বর্ডারের পাশেই কারেলিয়া থেকে ওরা কাঠ রপ্তানি করে। সুদীপ জানেই না কিভাবে বগির পরে বগি গাছ বর্ডার ক্রস করে চলে যায়। সুদীপ জিজ্ঞেসও করেছিল কিন্তু ওরা বলেছে এ নিয়ে তার মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। তারা সময়মত মাল ডেলিভারি দেবে। তার কাজ শুধু কোম্পানির একাউন্টে ডলার গ্রহণ করা এবং সের্গেইভিচের হাতে নগদ তুলে দেয়া।

সের্গেইভিচ জায়গামত তা পৌঁছে দেয়। প্রথম প্রথম একটু ভয় হতো, কিন্তু অচিরেই জানা গেল ভয়ের কিছু নেই। এটি একটি বৃত্ত, সে সেই বৃত্ত-সম্পূর্ণকারী পরিধির একজন মাত্র।

সুদীপ বৃত্তের কেন্দ্রের লোকগুলোকে চেনে না। তারাও সুদীপের চায়ের মানে ভদকা, চেরেমসা ও সিলিওদকা’র দাওয়াত গ্রহণ না করে, ভদ্রভাবে বলে দিয়েছে ‘পরে একসময় বসা যাবে’। তবে ধন্যবাদ জানাতে ভোলে নাই। একটি বড় কাগজের ফ্যাক্টরির কর্মকর্তা ওরা। ফ্যাকটরি গাছ কেনে কাগজ বানাবার জন্য, গাছ বিক্রি করা তাদের কাজ নয়, কিন্তু এখন সবকিছুই ‘‘আপসাইড ডাউন’। তারা গাছ কেনে সরকারি দরে, তারপরে প্রোডাকশনে না পাঠিয়ে পাচার করে দেয় সুদীপের কোম্পানির মাধ্যমে। সময় যাচ্ছে দ্রুত, রাষ্ট্রের যেখান থেকে যেটুকু সম্ভব থাবা মেরে ছিনিয়ে নেয়া যায়। কাজটি অন্যায় সুদীপ জানে, সে মার্কস লেনিনের শিষ্য, বিবেকবোধ পুরাপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

কিন্তু এত টাকা!

অন্যেরা সমুদ্র চুরি করছে, আমি তো পুটিমাছও না…..আমি না করলেও চুরি তো ওরা করবেই…. সে নিজের সাথে কথা বলে।

সে করবে কী? একজন বিদেশির কোনো বৈধ চাকরির পথ এখানে নেই। তাকে পরিবার নিয়ে বাঁচতে হবে তো! চিন্তাটা যখন এই রাস্তায় হাঁটে তার অপরাধবোধের তীব্রতাটা থিতু হয়ে আসে।

সে একজন ভালো স্বামী ও ভালো পিতা।

কম্যুনাল কোয়ার্টারে থাকে শহরের কেন্দ্রে, শীত প্রাসাদ থেকে ধীর পায়ে হেঁটে আসতে লাগে মাত্র ১৫ মিনিট। ৫ টি রুম সেখানে, ওদের দুই রুম, আর একটি পরিবারের দুই রুম এবং তৃতীয় পরিবারটির এক রুম। বড় কমন কিচেন, বাথরুম ও টয়লেট। বিপ্লবের আগে ১ টা পরিবার থাকতো যেখানে, সেখানে ৭০ বছর পরেও ৩ টি পরিবার ও ১১ জন মানুষ থাকে, এটা কি মানবিক?

আমাদের দেশে মানুষ রাস্তায় থাকে, অমানবিকতা কোথায়?

সমস্যা হল, রাশিয়ার মানুষ নিজেদের জীবন, বাংলাদেশের মানুষের সাথে তুলনা করে না, করে পশ্চিমের সাথে, যেখানে নাকি একজন বেকারও আলাদা বাসায় থাকে।

রাশিয়ায় বিগত ৭০ বছর বাসস্থান ছিল সরকারি সম্পদ, বেচা কেনা করা যেতো না, এখন তা বৈধ করে

আইন হয়েছে। সুদীপ দুই পরিবারকে দুটি এপার্টমেন্ট কিনে দেয়, বদলে ওরা নিজেদের রুমগুলো ওর কাছে বিক্রি করে যায়। ৫ রুমের বিশাল এপার্টেমেন্টটি এখন আলিওনা ও সুদীপের শাশুড়ির নামে। নাগরিক নয় বলে ওর নাম বাদ যায়। খুব দ্রুত রিপেয়ার সম্পন্ন করে একটি ইওরোপীয় স্ট্যান্ডার্ডের সুন্দর এপার্টমেন্টে তৈর হয়।

শুধু তাই নয়, গাৎচিনার কাছাকাছি পুশকিনের প্রিয় ন্যানি আরিনা রদিওনভনার “কবরিনা” গ্রামের পাশেই সে ৬+৬ শতাংশের পাশাপাশি দুটি জমি কেনে। একটিতে ছোট একটি ঘর ছিল পুরনো, আগে এসে সেখানেই থাকতো। সেটি ভেঙে ফেলে একটি সুন্দর দাচা বা “গ্রীষ্ম বাড়ি” বানায় ‘লগ’ বা গোলাকার

গাছের কাণ্ড দিয়ে। রাশিয়ান ক্লাসিক বাড়ি। শীতের সময় ঘর গরম রাখার সুন্দর একটি “পেচকা” বা ফায়ার প্লেস বানায়। আলাদা করে স্নানঘর বা “বানিয়া” তৈরি করা হয়।

এখন আলিওনাকে নিয়ে ‘বানিয়া’র ছোট কক্ষটিতে, যেখানে কাঠ পুড়িয়ে গরম করা পাথরে জল ছিটিয়ে তপ্ত বাষ্প ও এক্সট্রিম তাপের সৃষ্টি করা হয়, অনম্বর বাষ্পস্নান করছে সে। গ্রিকদেবীর মত আলিওনা, অশিথিল হালকা গোলাপি ঋজু দেহ, আপেলের ত্বকের মত মসৃন ত্বক, বুক। গরমে মুখে গোলাপের পাঁপড়ি। সুদীপ বার্চগাছের পাতাসহ নরম ডালা দিয়ে তৈরী ছোট ঝাড়ু দিয়ে আস্তে আস্তে বাড়ি মারছে ওর পিঠে ও শরীরে, কখনও হাত চলে যাচ্ছে ওর অনম্বর স্তনে, আর ও দুই হাতে তা সরিয়ে দিয়ে শাসাচ্ছে, “দুষ্টুমি না থামালে, এক্ষুনি চলে যাবো, কখনও তোমার সাথে বানিয়া’য় ঢুকবো না।” উত্তরে সুদীপ তাকে বুকে চেপে ধরছে গভীর তীব্রতায়, আর হাসছে হা হা করে।

অসম্ভব গরম।

আষাঢ়ের আকাশের মত ভেজা শরীর, জল ঝরছে অবিরল। গরম অসহ্য হয়ে এলে বাষ্পকক্ষ থেকে বের হয়ে ওরা ঝাঁপদেয় পাশের কক্ষের ঠাণ্ডা জলের পুলে। এক অদ্ভুত আনন্দানুভূতির শিহরণ কাঁপিয়ে দেয় শরীর, কিছুক্ষণ জলে থাকে ওরা। এখন গ্রীষ্ম, শীতের সময়ে জল থাকে বরফ শিতল, বেশিক্ষণ থাকা যায় না, কিন্তু এক্সট্রিম হিট ও এক্সট্রিম ঠাণ্ডার ওই স্নানের অনুভূতি ও তৃপ্তি আরও তীব্র। রুশ বানিয়া’র ব্যবহার সর্বজনীন, গ্রাম যাদের দাচা রয়েছে, তাদের অনেকেরই “বানিয়া” আছে। শহরে আছে বড় বড় পাবলিক “বানিয়া” বা শৌচাগার, জনসাধারণের জন্য, সামান্য কয়েক কোপেক পে করতে হয়। পার্টি ও রাষ্ট্রনেতাদের বানিয়ায় বড় বড় নেতারা ‘নগ্ন পশ্চাৎ বিশ্রামের’ পাশাপাশি অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রিয় সিদ্ধান্ত নেয়।

সুদীপ দাচায় নানান জাতের বেরিগাছ লাগিয়েছে। মালিনা, স্মারোদিনা, অবলিপিখা, ক্রিঝোভনিক। স্মারোদিনা-ব্ল্যাক বা রেড কারান্ট, মালিনা-রাস্পবেরি, অবলিপিখা- সি বেরি আর ক্রিঝোভনিক-গুসবেরি। লাল টসটসে স্ট্রবেরি ফলে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে। স্মারোদিনা পাতার ঘ্রাণটা অদ্ভুত সুন্দর। লাল ও কালো দুই ধরনের স্মারোদিনা আছে। কালোটি বেশি স্বাদু কিন্তু লালটি এত তীব্র লাল যে দৃষ্টি কাড়ে বেশি। ক্রিঝোভনিকের পাতার ঘ্রাণটিও সুন্দর। আলিওনার দেহের মদ মদ ঘ্রাণের মত। অবলিপিখা বেরিগুলো ছোট ছোট খুব নরম, মুখে যেন গলে যায়, টক-মিষ্টি অপূ্র্ব স্বাদ তার। এর ছোট ছোট ঝোপ, জলাশয়ের কাছে হয়, লম্বা চিকন পাতা। সেই পাতা উজ্জ্বল কমলা রংয়ের বেরিগুলো লুকিয়ে রাখতে পারে না।

ড্রাইভার গ্রামে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যায় শুক্রবার রাতে। সুদীপ পরিবার নিয়ে সপ্তাহান্তের দুইদিন কাটায়। রোববার বিকেলে বাড়ি ফিরে আসে। সে গাছপালার যত্ন করে শর্ট পরে, খালি গায়ে। উষ্ণ রোদ গায় হাত বুলায়। আলিওনা সংক্ষিপ্ত বিকিনি ও রোদটুপি পরে বাগানে ফুল গাছ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অজস্র পিওনি ও গ্লাডিওলাসের মধ্যে ওর উন্মুক্ত শরীর ফুল বলে ভুল হয়। লাবণ্য ছোট ছোট পায়ে হাঁটে সবুজ ঘাসের উঠানে, ছোটাছুটি করে। নানি বাগানে কাজ করে আর লাবণ্যকে চোখে চোখে রাখে। ঈগলের চোখের মত তার চোখ, নাতনির প্রশ্নে সে সুদীপ আলিওনার চেয়েও বেশি সচেতন। সারাজীবন সে ডে কেয়ারে শিশুদের নিয়ে কাজ করেছে এবং জানে যে কোনো অপ্রত্যাশিত মুহূর্তে কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

একটা খুব ছোট নদী বয়ে যায় নির্জন, এত ছোট যে তাকে খালও বলা অন্যায়, ঝোরাখাল বলা যেতে পারে। তবে শুকায় না, মার্চ এপ্রিল মাসে যখন বরফ গলে, ঋতুমতি মেয়েদের মত ফুলে ফেপে ওঠে সে। গ্রীষ্মে একটু কমে যায়, তারপরেও স্বচ্ছ পানি থাকে, স্রোতও। তারই তীরে নারী পুরুষ শিশু রৌদ্রস্নানের উৎসবে নেমে পড়ে। সুদীপরাও মাঝে মাঝে যায়। শান্ত নিরিবিলি রাশিয়ার গ্রাম। কাজ ও রৌদ্র স্নানের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার গ্রীষ্মের দাচায় কায়িক পরিশ্রম করাকে ওরা বলে বিশ্রাম।

ওরা পরিশ্রমী মানুষ। ওদের সাথে মিশলে মনে হয় না, ওদের কোনো সমস্যা আছে। ওরা অভিযোগ করে না, মিছিল মিটিং করে না, সরকারের বা পার্টির বিরুদ্ধে কথা বলে না। পরিশ্রম করে, খায়- দায়, মাতাল হয়, ভালোবাসে, বাঁচে, তারপরে মরে যায়। তারপরে বেশ নীরবেই ওদের কফিন মাটিতে নামিয়ে দেয়া হয়, চোখ মুছতে মুছতে। ওরা চিৎকার করে কাঁদে না, বুক চাপড়ায় না।

নির্জনতা শব্দহীন পায়ে হাঁটে। গাছের পাতায় পাতায় যেটুকু শব্দ করে বাতাস, যে দু’একটা পাখি গায়, বড় ভালো লাগে। লগ দিয়ে সদ্য তৈরী ঘরটিতে আজই প্রথম ঘুমাচ্ছে সুদীপ এবং ওর পরিবার। নতুন কাঠের মাদকীয় ঘ্রাণ আর সেখানে লাবণ্য হি হি করে হাসছে আর লুকোচুরি খেলছে মায়ের সাথে। কী সুন্দর আলিওনা! একটুও অতিরিক্ত কিছু নেই ওর দেহে, একনলা পাইন বৃক্ষের মত। সুদীপ তাকিয়ে থাকে মা ও মেয়ের খেলার দিকে ।

তারপরে দোতলার প্রশস্ত মুক্ত বারান্দায় গিয়ে বসে। দক্ষিণ দিকটা আদিগন্ত উন্মুক্ত, ছোট ছোট ঝোপঝাঁড়, তারপরে সরু পিচের রাস্তা এবং বাসস্টপ, নাম যার "পোড়া বাস"। কবে, কখন, কোন্ দিন একটা বাসে আগুন লেগে পুড়ে গিয়েছিল এখানে। সেই থেকে নাম। গ্রামের বাসগুলো বাংলাদেশের পুরানো দিনের মুড়ির টিনের মত দেখতে কিন্তু আকারে খুব ছোট, বড়জোর ১০ জন লোক আটে। মাত্র কয়েকটা ট্রিপ দেয়, দিনে তিন চারবার, ট্রেনের রুটিনের সাথে মিলিয়ে। বাসের রাস্তা পার হয়ে আবারও ছোট ছোট গাছপালা, নীচু জংলা, জলাভূমি। বড় কোনো গাছ নেই বলে আকাশটা উপুড় হয়ে আছে চারিদিক ঘিরে।

ছোট বয়সে ছোট ফুফুর বাড়ি থেকে দখিন দিকে তাকালে কয়েক মাইল ফাঁকা ধানক্ষেত দেখা যেত, তারপরে পদ্মানদী। সাগরের মত বিশাল, যদিও সে তখনও সাগর দেখেনি। বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে ফুফু মারা যাবার পরেও সেই বিশাল ফাঁকা জায়গাটা ছিল অপরিবর্তিত অনেক বছর, আর ছিল বিশাল নদী।

তারপর একদিন একদিন কাকভোরে শুনেছিল মেজর ডালিম নামে কোনো এক দানবের রেডিও ঘোষণা। বাবা ইন্না লিল্লাহ বলে আহা হা হা করে উঠেছিলেন।

সুদীপ তখন ক্লাশ সিক্সের ছাত্র।
কী এক অজানা আশংকা!
থম্ থম্ চারিদিক।

তারপর থেকেই পদ্মানদী আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে থাকে, শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয় প্রতিবছর। চরের পরে চর নদীর বুক খাবলে ধরে অশিষ্টের মত। সে তখনও জানে না ফারাক্কা বাঁধের কথা, কিন্তু স্পষ্ট মনে আছে শেখ সাহেবের মৃত্যু এবং তার পর পর নদীর শুকিয়ে যাবার কথা। জোয়ারের সাথে চাঁদের সম্পর্ক যেমন, সুদীপের মনে হতো তেমনি কোনো সম্পর্ক রয়েছে ওই মানুষটির সাথে নদীর। যেন তিনি পদ্মার মূল প্রবাহটি সাথে নিয়ে চলে গেছেন। বালক মনের নির্বোধ ধারণা, যুক্তিহীন আবেগে সিক্ত।

হঠাৎ আকাশটা ছাই মেখে রুদ্ররূপ ধারণ করে, তারপরে মিসমিসে কালো হয়ে যায় চারিদিক। শুরু হয় ঝড়। সুদীপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে প্রকৃতির এই অন্যরূপ। আকাশ চৌচির করা বজ্র ও বিদ্যুৎ। উত্তাল উন্মত্ত হাওয়া।


শাশুড়ি ছুটে আসে, "সুদীপ ঘরে আসো, দরজা জানালা বন্ধ করে দাও। ভীষণ ভয় করছে।"
৭৩ বছর বয়সের একজন মানুষ, ২য় মহাযুদ্ধে অনাহারে কেটেছে বাল্যকাল, সে কয়েকটা জিনিসকে খুব ভয় পায়। একটা হল ঝড়, রীতিমত প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়ে যায়।

কেন? উত্তর সে দিতে পারে না।
দ্বিতীয় হল গরু বা ষাঁড়, ছোটকালে সে একটা লাল ফ্রক পরে গ্রামের রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। মাঠে ছিল একটা ষাঁড়, লালফ্রক দেখে সে তীব্রবেগে ছুটে আসতে থাকে। ভোঁ দৌড় দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে এক বাড়ির বেড়া টপকে অন্য দিকে পৌঁছে রেহাই পায়। সে কী রাগ ষাঁড়টার! সেই থেকে যা গরু, তাই ষাড় তার কাছে, কোনো কিছুর তফাত করার আগেই সে ভয়ে প্রায় কাপড় ভিজিয়ে ফেলে। তৃতীয় হল কুকুর। ছোটকালে তাকে কুকুরে কামড়েছিল এবং একগাদা ইনজেকশন নিতে হয়েছিল নাভির চারিদিকে।
সুদীপের যৌবন টগবগ করে। তার হাসি পায় বৃদ্ধার এই ভয়ে। গ্রামে বড় হয়েছে সে, আলোহীন ঘুট ঘুটে অন্ধকারে করেছে হাঁটাহাটি, ঝড় ঝাপটা কালবেশেখীর সাথে পাল্লা দিয়ে শৈশবে আম কুড়িয়েছে সে। না এসব উটকো ভয় তার নেই। সে বরং ঝড় দেখতে পছন্দ করে। গাছগুলো যখন মাথা নাড়তে নাড়তে পাগল হয়ে যায়, সে তন্ময় তাকিয়ে থাকে।

শাশুড়িকে বলে, “আপনি দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিচে চলে যান, আমি একটু এখানে থাকবো।”

শাশুড়ির চোখ ছানাবড়া, বলে কী, পাগল নাকি?

সে ভয়ে কাঁপছে। সুদীপের সাথে তর্ক করার সময় তার নেই। ছুটে চলে যায়।

বাইরে তাণ্ডব চলছে। ভেজা হাওয়ার ঝাপটা এসে বুকে জড়িয়ে ধরছে। সুদীপ সম্মোহিত রুদ্রের সৌন্দর্যে। ঝড় ঝাপটার ব্যপারে আলিওনা মায়ের মতই। ঝড়ের চেহারায় ভয়ের চেয়ে অন্যকোনো সৌন্দর্য সে দেখতে পায় না, চিৎকার করে ডাকে ভেতর থেকে: “সুদীপ, সুদীপ প্লিজ, ভিতরে চলে আসো, দরজা বন্ধ করে দাও। আমার ভয় লাগছে।”

কিন্তু সুদীপের চোখের সামনে সারাটি কবরিনা গ্রাম সদ্য স্নান করে উঠে আসা গ্রামীণ নারীর মত আঁটসাঁট ভেজা কাপড়ে যৌবন দুলিয়ে হাঁটছে, তার থৈ থৈ স্তন কাঁপছে, চুল বেয়ে জল ঝরছে, সুদীপ তার থেকে চোখ সরাতে পারছে না।



পেরেস্ত্রোইকা, মস্কো ও মধু
৪৮ তম পর্ব

রাশিয়ায় দুর্ভিক্ষ চলছে। কিছুই পাওয়া যায় না। দুবাইয়ের এক পার্টি তিন কন্টেইনার সবুজ মটরশুটি দানা বা “গ্রিন পিজ” নিয়ে এসেছে। সমস্যা একটা, ডেইট একসপায়ার হয়ে গেছে, তবে মাল পচা নয়। তারা কন্টেইনার ভাড়ার টাকাটা পেলেই ছেড়ে দেবে। সাথে দেবে নতুন এক্সপিরেশন ডেইটসহ স্টিকার। এই স্টিকার লাগিয়ে দিলে কেউ কিছুই টের পাবে না। কাস্টমস একটু ঝামেলা করতে পারে কিন্তু তাদের লাইন আছে, ক্লিয়ার করে দেবে।

সুদীপ নিয়ে নেয়।

মাল আসার পরে কয়েকটি ক্যান খুলে নিজে মুখে দিয়ে পরীক্ষা করে। এয়ারসিল্ড ক্যান, নষ্ট হয় নাই, স্বাদেও অস্বাভাবিকতা নাই। সে দরাজ দিলে অফিসের সবাইকে ১০টা করে ক্যান দিয়ে দেয় এবং সবাই খুশি হয়ে নেয়। সুদীপের উদ্দেশ্য হলো কেউ কোনো কমপ্লেইন করে কিনা সেটা জানা। না, সব ঠিকঠাক।এবার গুদামে লোক বসিয়ে দিয়ে নতুন স্টিকার লাগানো হয়। তিনদিনের মধ্যে সবগুলো কন্টেইনার বিক্রি হয়ে যায় তিনগুন লাভসহ।

এর পরে আসে জুতা।

বাংলাদেশ থেকে।

কিছুদিন আগে বন্যায় কাঁচামালসহ ফ্যাক্টরির গুদাম কয়েকদিন পানির নিচে ছিল। মালিক সেই কাঁচামাল ফেলে না দিয়ে জুতা বানিয়েছে। সে জানে রাশিয়ার বাজারে সব চলে। জুতাগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। আধুনিক ডিজাইন। রাশিয়ার জন্য সম্পূর্ণ নতুন। এর আগে সুদীপরা এই জুতা ৯ ডলার করে কিনে ১২ ডলারে হট কেকের মত বিক্রি করেছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের ম্যানুফ্যাকচারার তিন ডলারে ছেড়ে দিতে রাজি আছে।

সুদীপ ৩ ডলারে নিতে রাজি হয় এবং ৯ ডলারে বিক্রির দাম ধরে। এবার আরও দ্রুত চলে যায়।কিন্তু কন্টেইনার পাঠিয়ে দেয়া হয় সাইবেরিয়ায়, যাতে কোনো ক্রেতা জানতে না পারে কোথা থেকে মালগুলো এসেছে। ৮ হাজার জোড়া জুতার কন্টেইনার ২৪ হাজার ডলারে কিনে ৪৮ হাজার ডলার লাভ করে।

সাইবেরিয়ার যে পার্টি কেনে, সেও প্রচুর লাভ করে বিক্রি করে। সুদীপ জানে, সে না করলেও এই কন্টেইনার দেশে ফেরত যাবে না, কেউ না কেউ তা বিক্রি করবেই। অর্থাৎ জনগণ বিষ গিলবেই। সে তাহলে প্রফিট ছাড়বে কেন?

কিছুদিন পরেই সুদীপের ক্রেতার কাছে অভিযোগ আসতে থাকে যে সপ্তাহ খানেক পরার পরেই জুতার তলা খুলে যায়। সে কল করে সুদীপকে।

আকাশ থেকে পড়ে সে, “বলো কী? তার মানে বেটারা আমাদের ঠকিয়ে বাজে মাল দিয়েছে।”

সে তাকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, সেও তো কোনো কিছু না জেনেই কিনেছে। ভাগ্য ভালো যে, ক্রেতার লস হয়নি। সুদীপ প্রতিশ্রুতি দেয় পরেরবার জুতা কেনার সময় সে তাকে ভালো ডিসকাউন্ট দেবে।

ঝামেলা চুকে যায়।

চোর চোরের মাসতুত ভাই, লাল-কালো-সাদা-সবুজ সব সমাজেই।

সময়টা গলা কেটে বড় হবার। কারুরই ভোক্তার কথা, ভোক্তার অধিকার নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। আইন আছে কিন্তু আইন যারা প্রয়োগ করবে তাদেরও অন্য সবার মত মুখ আছে, বৌ আছে, সন্তান আছে, এমনকি মানুষের সেবা করার প্রতিশ্রুতি আছে।

ক্ষমতার সবচেয়ে ওপরে যারা তাদের প্রতিশ্রুতি সবচেয়ে বড়, যারা একটু নীচে তাদের একটু কম, সবচেয়ে নিচে যারা তাদের সবচেয়ে কম।

বন বিক্রি হচ্ছে, খনি বিক্রি হচ্ছে। কল-কারখানা, ফ্যাকটরি, ট্রান্সপোর্টেশন, রাইফেল, এরোপ্লেন, ট্যাংক, মিসাইল, নারী কোনো কিছু বাদ যাচ্ছে না। রুশনারী সুন্দর, পরিশ্রমি, সহজ-সরল ও সংসারি। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশ ভালো ডিমান্ড তার, দামও তত বেশি নয়। সুদীপের কয়েকজন পরিচিত থাইল্যান্ড, জাপান ও আরবদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সুখি জীবনের আবে জমজম দেখানোর হাতছানি দিয়ে দলে দলে রাশিয়ান নারী রপ্তানি করে বটগাছ বনে গেছে। আরবের শেখরা ওদের বেলি ড্যান্স দেখে পাগল, ওরা আরও বেশি চায়। বাংলাদেশেও যায় কিছু। ভালো, পয়সাঅলা গ্রাহক সেখানেও আছে। এই মেয়েদের অনেকই জানে না তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জানবে কী করে, তাদের কি কখনও তাদের দেশের বাইরে যেতে দেয়া হয়েছে? যেহেতু তারা বাহির দেখেনি, তাদের বোঝানো হয়েছে, ভেতরে তারা সবচেয়ে অসুখী। পরিখার বাইরে, পুবে বা পশ্চিমে, উত্তর বা দক্ষিণে মানুষ স্বাধীন, সুখী ও সমৃদ্ধ। সুখের সন্ধানে আরবদেশে যাওয়া বাংগালি নারী জানে কী সুখ সেখানে, এখন রুশনারীও জানছে। তারা ক্ষুধার্ত, তাদের সন্তানেরা ক্ষুধার্ত, পিতা-মাতারা ক্ষুধার্ত, দেশ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, জানলেও কি করতে পারে তারা?

কেন এত বিষ গিলতে হয় এই জাতিকে?

কারণ এরা স্বদেশে একটা বিপ্লব করেছিল যা থেকে সারা পৃথিবীর মানুষ লাভবান হয়েছে।কিন্তু তারা নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশাল তিমির শরীরের চেয়েও বিশালভাবে। ওই বিপ্লব সারা বিশ্বের বিপ্লবীদের মনে আশা জুগিয়েছে। কারো কারো মুখে অন্নও জুটিয়েছে। কিন্তু নিজদেশে ৭০ বছর ধরে বহু যত্ন করে বপন করেছে বিষবৃক্ষ। সেই বিষবৃক্ষ শুধু বিষাক্ত ফলই দেয়নি, যারা গৃহযুদ্ধ, ফায়ারিং স্কোয়াড, গুলাগ এড়িয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম হয়েছে, তারা অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা চিকিৎসা ও প্রজননের আপেক্ষিক নিশ্চয়তা পেয়েছে। ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকার অধিকার মৌলিক অধিকারগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিলো না, রাষ্ট্র যাকে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা, বিচারহীনভাবে বা সংক্ষিপ্ত বিচারের মাধ্যমে হত্যা করতে পারতো। “আত্মপক্ষ সমর্থনের” বুর্জোয়া বিলাসিতা সেখানে ছিলো না। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত “মত প্রকাশ” বা “কথা বলার” অধিকারও মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না। সুদীপরা এটা দেখেছে কিন্তু ওদের কাছে তা অস্বাভাবিক মনে হয় নাই। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে কিছু নাগরিকের অধিকার খর্ব করতেই হবে, শ্রেণিসংগ্রামের তত্ত্ব তো তাই বলে। কিন্তু “কিছু নাগরিকের অধিকার” খর্ব করার ব্যাপারটি কবে, কখন, কিভাবে “সব নাগরিকের” অধিকার খর্ব করায় বদলে গেছে ওরা তা বুঝতেই পারে নাই, ওদের নেতারাও ওদের বুঝিয়ে দেয়নি। হতে পারে সংগ্রামে ব্যস্ত নেতাদেরও দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে।

সমাজতান্ত্রিক রিয়েলিজমের আয়নায় কত সুন্দর সুন্দর ছবি তৈরী হয়েছে যেখানে। সুদীপরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছে। সেখানে মারপিট-শোষণ-প্রতারণা নেই, ড্রাগস নেই, মাফিয়া নেই। আছে শুধু হাসি-গান-নাচ, সুন্দর মানবিক প্রেম, সুখ আর সুখ। “প্রেম ও পায়রারা” ছবিতে নায়ক পায়রা পোষে এবং পায়রার সান্নিধ্যে সময় কাটায়, মদ-গাঁজা খেয়ে মাতাল থাকে না। তারপরে স্বর্গসম কৃষ্ণ সাগরে যায় ছুটি কাটাতে, যেখানে সে প্রেমে পরে অন্য নারীর এবং নিজের বৌ সন্তান সন্ততিকে ভুলে যায়। তার পরিবার যখন বেদনাদায়ক এই বিশ্বাসঘাতকতার বাস্তবতায় ক্লান্ত ক্ষিপ্ত ও বিপর্যস্ত, তখন নায়কের বোধদয় হয়, সে ফিরে আসে। শুরু হয় ফেলে যাওয়া স্ত্রীর সাথে নতুন প্রেম, বনচ্ছায়ায় নদী তীরে লুকিয়ে লুকিয়ে বিহার। যেন ওমর খৈয়ামের কবিতার রোমান্টিকতা। কী সুন্দর জীবন !

সবটাই মানবিক। বড় কোনো অশান্তি নেই, জীবন থেকে নেয়া একজন মাতাল স্বামী রক্ত -মাংসের বাস্তব কোনো নারীকে কুড়াল নিয়ে ধাওয়া করে না সেখানে। অথবা একজন মদাসক্ত টাল হয়ে বরফে পড়ে থেকে হাত পা খোয়ায় না।

অথবা “ভোলগা ভোলগা” ছবিটি, যেখানে ভোলগা তীরের একজন কালখোজের (সমবায়) সাধারণ নারী কীভাবে মস্কো যায় ভেদেএনখা’র প্রদর্শনীতে গান গাইতে। সারা ছবি ভরা শুধু গান আর গান, আর ভোলগার মনোহরণ রূপ। বিশাল বিস্তীর্ণ মাতৃভূমি রাশিয়া! তার মাঠেদের মত উদার মানুষ। কোনো দু:খ নেই, কষ্ট বা ট্র্যাজিডি নেই, আছে সোভিয়েত জনগনের সুন্দর সমাজতান্ত্রিক ভবিষ্যত গড়ার অদম্য স্পৃহা। কোনো বাঁধাই তাদের কাছে বাঁধা নয়।

যুদ্ধ এবং বীরত্বের ছবিগুলো অপরিসীম অনুপ্রেরণা ও দেশপ্রেমের উৎস। “ভোরেরা এখানে শান্ত” ছবিতে কারেলিয়ার জঙ্গলে একদল নারী আত্মত্যাগ করে যাচ্ছে শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। অপূর্ব সুন্দর ওরা, জীবন ও যৌবনের শাশ্বত সৌন্দর্য নিয়ে। মোমবাতি যেমন আলো দিতে দিতে নিভে যায়, তেমনি নিভে যায় ওরা একজন একজন করে। আর নির্জন বন স্থবির দাঁড়িয়ে থাকে। বাতাসে পাতার শব্দে যেন শোনা যায় সেই স্বদেশ ও সমাজতন্ত্রের জন্য জীবন দেয়া নারীদের নি:শ্বাসের শব্দ।

এরকম কত অজস্র ছবি, কত শত ! চুম্বকের মত ধরে রাখে, সিনেমা-শিল্পের উৎকর্ষ, মেধা ও মানবতার এক একটি অপূর্ব মাস্টারপিস। এইসব ছবি দিনের পর দিন দেখানো হতো টিভিতে, সিনেমা হলে। দর্শক সেখানে নিজের জীবন ও বাস্তবতা দেখতে না পেলেও বিশ্বাস করতো অন্যত্র জীবন এমনই সুন্দর এবং তাদেরও এমনই হবে, শুধু একটু অপেক্ষা, কম্যুনিজম এই এল বলে।

বিশ্বাস না করার কারণও ছিল না। টিভি, খবরের কাগজ, সংবাদ মাধ্যমগুলোতে কোনো জাতীয় বিপর্যয়, দুর্ঘটনা, ব্যর্থতা, যান্ত্রিক গোলযোগ চেপে যাওয়া হতো অথচ সাফল্য ও বিজয়গুলো প্রচার করা হতো সর্বোচ্চ কন্ঠস্বরে। তাই মহাকাশ বিজয় করতে গিয়ে কতজন মানুষ মারা গেল, সেই সংবাদ তাদের কান এড়িয়ে চলে যেতো আর্কাইভে, কিন্তু যে বিজয় অর্জিত হল তা বিস্ফোরিত হতো ইথারে ইথারে মিটিংয়ে মিছিলে।

প্রথম মহাকাশ বিজয়ীনি ভালেন্তিনা তেরেশকোভার সাফল্যের কথা সারা বিশ্ব জেনে যায় রাতারাতি। জানে তার মহাকাশ ভ্রমণ ছিল বৈচিত্র্য ও ব্যতিক্রমহীন, সোভিয়েত মহাকাশ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের ফল।

অথচ ৩০ বছর পরে বের হয়ে আসে অন্য খবর, জানা যায় যে, তিনি ছিলেন মৃত্যুর মাত্র কয়েক পলক দূরে। তিনদিন মাহাকাশে কাটানোর পর যখন তার রকেট ভস্তক-৬ পৃথিবীর দিকে আসতে শুরু করে, হঠাৎ সে গতিপথ পরিবর্তন করে ফিরে যেতে থাকে মাহাকাশের দিকে। কী সাংঘাতিক বিপর্যয় ! কি সে করবে জানে না। চারিদিক থেকে বাঁধা সে, নড়াচড়া করার উপায় নেই। মৃত্যু, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সে, পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। সে আর দেখতে পাবে না ঘাস-মাটি-মানুষ আর প্রিয় কমরেড ক্রুশ্চেভের গোলগাল মুখ আর গোল মাথা।

মুনকার নাকির নয়, আজরাইল বসে আছে কাঁধে।

সে নিজের মধ্যে ডুব দেয়। কতক্ষণ কেটে গেছে মনে নেই।

হঠাৎ মাথায় ক্লিক করে, পৃথিবীতে ফিরে আসার সয়ংক্রিয় মেকানিজমটি বিকল হয়ে গেছে। এমন অবস্থা হতে পারে তা কারো হিসাবে ছিলো না। সুতরাং কোনো ট্রেনিং তাকে দেয়া হয়নি। সে খুঁজে বের করে সুইচটি। রিস্ক নিয়ে “অফ” করে দেয়, তারপরে ম্যানুয়ালি চালাতে থাকে রকেট। বিশ্বের প্রথম নারী, একজন অর্ডিনারি তাঁতীনি।

সৌভাগ্য ও সাহসিকতা মহাকাশ বিজয় করে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে প্রিয় গ্রহে।

ল্যান্ডিং করার সময়ে মুখে ভীষণ আঘাত পায়। পর্যাপ্ত কসমেটিকস মেখে সেই আঘাতের দাগ ঢেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মস্কোর লেনিন মুস্যুলিয়াম ট্রিবিউনে পৃথিবী জয় করার জন্য। কিন্তু এই দুর্ঘটনার খবর কেউ জানে না। জানলে সমাজতন্ত্রের সন্মানহানী হয়।

সুখ-দু:খ, সাফল্য-ব্যর্থতা, জয়-পরাজয়-মানবিক। কিন্তু শুধু সুখ, শুধু সাফল্য ও বিজয় -সমাজতান্ত্রিক। সেখানে দু:খ, ব্যর্থতা বা পরাজয়ের স্থান নেই। মানুষকে যখন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, যুগের পর যুগ এই বুঝানো হয়, সাধারণ মানুষ, বা বেশিরভাগ মানুষ তা বিশ্বাস করে। কিন্তু ঐ যে সামান্য কিছু ক্রান্তদর্শী কবি সাহিত্যিক শিল্পী বৈজ্ঞানিক, তারা তা বিশ্বাস করে না। তারা প্রশ্ন করে, চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দেয়।

তারা বলে, মিথ্যা ও প্রতারণার বিষ আমরা পান করবো না। তাই তাদেরকে বিতাড়ণ করতে হয়, নিপীড়ন করতে হয়।

যখন সমস্ত মিডিয়ায় স্ট্যালিনের সমবায়করণের জয় জয়কার চলছিল, লেখক আইজ্যাক বেবেল মস্কোর নিরুপদ্রব জীবন ছেড়ে গ্রামে চলে যান সবকিছু নিজ চোখে দেখতে। সমবায় থেকে সমবায় ঘুরে বেড়ান, কয়েক বছর কাজ করেন সাধারণ কৃষকদের সাথে “যারা স্বেচ্ছায়, আদর্শে গদগদ হয়ে” সমবায়ে যোগ দিয়েছে বলে সর্বত্র প্রচারিত। তাদের সত্যদর্শী জীবন নিয়ে লেখেন তার অমর গ্রন্থ “কোনোার্মিয়া” (The Red Cavalry)। সবকিছু তত রঙ্গিন ও রোমান্টিক নয়। বাস্তবতার মুখ অন্যরকম। খুব নিকট থেকে, লুবিয়ান্কা জেলখানার একটি নির্দিষ্ট রুমে, দেয়ালের দিকে মুখ করিয়ে, মাথার পেছনে …করোটি বিদীর্ণকারী বুলেট….একজন লেখক … একজন সত্যভাষী,

যে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতো, ভালোবাসতো ও বিশ্বাস করতো লেনিনকে।

পূর্ব পাকিস্তানে ছিল খাপড়াওয়ার্ড একটি। সোভিয়েত ইউনিয়ন বড় দেশ, ওদের একটিতে চাপাচাপি হয়, তাই ওদের খাপড়াওয়ার্ড ছিল অনেক বেশি। আমাদের দেশে খুনীরা ছিল সমাজতন্ত্রের শত্রু, ওই দেশে খুনীরা সমাজতন্ত্রী।

সময় আসে যখন মানুষের ঘুম ভাঙ্গে, তখন তারা মিথ্যাটা ধরতে পারে। বুঝতে পারে তারা

যেখানে আছে, তা জেলখানা। তাই তারা সেই সমাজকে ভেঙে ফেলে বা ভেঙে যেতে দেয় নির্দ্ধিধায়, বিনা বাক্যে, বিনা প্রতিবাদে।পুরোনো ব্যবস্থার ভালটুকুও তাদের আর ভালো লাগে না, মিথ্যা মনে হয়। কিন্তু তারা জানে না, যে সমাজের দিকে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তা আরো খারাপ।

সেখানে তাদের দেশের আদি ও সহজাত সমাজ নেই, মানুষে মানুষে বিশ্বাস নেই, নেই একটি ভবিষ্যত সুন্দর সমাজের স্বপ্ন। তাদের দেশে বরাহ বাহিনী ছিল, কিন্তু স্বপ্নও ছিল, কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখেছে অকৃত্রিম। কিন্তু যেখানে তাদের দলবেঁধে নেয়া হচ্ছে সেখানে শুধু টাকার খেলা।

টাকাই আদর্শ, টাকাই সত্য, টাকাই ধর্ম এবং টাকাই সবকিছু। মানুষের এক কড়ি মূল্যও নেই।

যারা এতদিন তাদের উপরে বন্দুক উচিয়ে রেখেছিল, এখন তাঁরাই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার। স্বাধীনতা ফালতু কথা বলার, নারীর দেহ বিক্রি করার, মাদকের মহা প্লাবনের, প্রতারণার নান্দনিকতার এবং ধনপতি দুর্বৃত্ত নির্বাচনের। আগে দুর্বৃত্ত এবং কিছু ভালোমানুষও নির্বাচন করতো পার্টি, এখন নির্বাচন করবে অভুক্ত, বিভ্রান্ত ও নি:স্ব জনগণ।

কেন তাদের এই ভাগ্য?

কেন তারা এত ত্যাগ, এত রক্ত দিয়েও শুধু মন্দ থেকে মন্দতেই যায়? জারতন্ত্রের জেলখানায় তারা কুকুরের মত ছিল খেয়ে, না-খেয়ে, কিন্তু তাদের কুকুর বা পাখির মত গুলি করে মারা হয়নি, গুলাগের কাঁটাতার দিয়ে বাঁধা হয়নি। তাদের দে ত্যাগ করার বা জেল থেকে পালানোর সুযোগ তাদের ছিল। কিন্তু তারা বিপ্লব করেছে।

মিখাইল শলোখভের “শান্ত দন” উপন্যাসে কী আছে? বিপ্লবের পরে দন নদীতীরবর্তী কসাকদের অশ্রু, রক্ত, আহাজারি, মৃত্যুর হৃদয় মোচড়ানো গাঁথা।

যে রুশ সৈন্যরা প্রথম মহাযুদ্ধে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, তাদের সামনে ছিল দুই পক্ষঃ মাতৃভূমি ও বিদেশি শত্রু। বিপ্লবের পরে সেই সৈন্য ও অফিসারদের সামনে এসে দাঁড়ালো পক্ষ বেছে নেয়ার ভারঃ কারো মনে হলো শতাব্দীর পরে শতাব্দী ধরে যে শোষণ চলে এসেছে জারতন্ত্রের ছায়াতলে, তার থেকে মুক্তির পথ বিপ্লব ও বলশেভিজম। অন্যদের মনে হলো হাজার বছর ধরে জার-পিতা এই দেশ চালিয়েছে ঈশ্বরের আশির্বাদ নিয়ে, তাকে ছাড়া চলবে না, তাকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তারা যুদ্ধে লিপ্ত হলো একে অন্যের বিরুদ্ধে, ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে, রুশ রুশের বিরুদ্ধে। অথচ সচেতন নির্বাচন ছিলো অল্পসংখ্যক মানুষের। বেশিরভাগ মানুষ হল পরিস্থিতির শিকার, সাদারা আসে হত্যা করে যায়, লালেরা আসে আবারও হত্যা করে।

এই হল দনের কসাকদের সমাজতন্ত্রে উত্তরণের গল্প।

সাদা-কালো, সত্য-মিথ্যা, দেশপ্রেমিক-দেশশত্রু এই বিষয়গুলো নিয়ে কত তর্ক হয়, অথচ দনের এই যুদ্ধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এদের মধ্যে কোনো দেয়াল নেই, একটি অন্যতে দ্রবিভূত হয়ে যায় অনায়াসে, বলশেভিক মিশা ও শ্বেত সেনাপতি গ্রিশা, শৈশব থেকে ঘনিষ্ট দুই বন্ধু পরিখার এপারে ওপারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ভাগ্যক্রমে। সত্য কোন্ দিকে?

এখানে যুদ্ধে ন্যায় বলে কোনো পক্ষ নেই।

নেই অন্যায় বলে অন্যপক্ষ।

তাই প্রতিশ্রুত মুক্তির বদলে এসেছে ভাতৃহত্যার গৃহযুদ্ধ।

“ক্রনস্টাডট” বিদ্রোহ।

গৃহযুদ্ধ শেষ করে যারা ঘরে ফিরেছে, ফিরেছে মাত্র অল্পদিনের জন্য, যতদিন কমরেড স্ট্যালিনের “ত্রইকা” বিচার ও ফায়ারিং স্কোয়াড তৈরি হয়নি। তারপরে তারা পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে লাখে লাখে।

পেত্রগ্রাদের অদূরে ফিন উপসাগরে কটলিন দ্বীপে “ক্রনস্টাডট” ফোর্টে ১৯২১ সালে ১-১৮ মার্চ নৌ-সৈনিকদের এক বিশাল বিদ্রোহ হয়। যুদ্ধ জাহাজ “পেত্রোপাভলভ্স্ক” ও “সেভাস্তোপোল” এর সৈনিকদের বেশিরভাগ ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু দুর্ভিক্ষ, অনাহার, “যুদ্ধ কমিউজিম” ও “প্রোদরাজ-ভেওরস্তকা” নামে কৃষকদের কাছ থেকে জবরদস্তিমূলক শস্য আদায় করার যে নিপীড়ন লেনিনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সরকার আরোপ করেছিল তার বিরুদ্ধে হয় এই গণবিদ্রোহ। ট্রটস্কির নেতৃত্বে রক্তের গঙায় ভাসিয়ে দেয়া হয় এই বিদ্রোহ। সরকারী

ও বেসরকারী ইতিহাস অন্যসব ক্ষেত্রের মতই এখানেও বিপরীতমুখী। কিন্তু বিদ্রোহী ও বিদ্রোহদমনকারী উভয় পক্ষের কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। অনেক মানুষ ফায়ারিং স্কোয়াডে যায়। লেনিনের মতে “এটা ছিল সোভিয়েত রাশিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংকট।”

এই বিদ্রোহের পরেই লেনিন “যুদ্ধ কম্যুনিজম” রদ করে ন্যাপের প্রোগ্রাম দেন। কবি নিকোলাই গুমিলিওভ ফায়ারিং স্কোয়াডে যান এই বিদ্রোহ মামলায়।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এগিয়ে আসে “মহান পিতৃভূমির যুদ্ধ।”

যুদ্ধে মহান কী থাকতে পারে প্রপাগান্ডা ছাড়া?

জনগণ জানতো না যে, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নাৎসি জার্মানির মধ্যে চুক্তি হয়েছে -তারা ইওরোপের কয়েকটি দেশ নিজেরা ভাগাভাগি করে নিয়ে তুষ্ট থাকবে, একে অন্যকে আক্রমণ করবে না। কিন্তু জার্মানি চুক্তিভঙ্গ করে আক্রমণ করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই যুদ্ধকে নাম দেয় “মহান পিতৃভূমির যুদ্ধ”। পরে একজনকে চিহ্নিত করা হয় মানবতার শত্রু বলে এবং অন্যজন হন মহানদের মহান। মানিক বন্ধোপাধ্যায়ের মত সত্যিকারের মহানেরা এই ছদ্মমহানের মৃত্যুর শোক সভায় সভাপতির অশ্রু ফেলেন। অথচ সেই যুদ্ধ থেকে ফিরে আসেনি দুই কোটি মানুষ!

ক্ষুধা, অনাহার, শীত!

আবার জেল। যারা বন্দী হয়েছিল নাৎসীদের হাতে, দেশে ফিরে তাদের যেতে হয় মাতৃভূমির জেলে। ক্রীতদাসের মত ‘রেডিও একটিভ’ খনিতে অনম্বর হাতে কাজ করে ব্লাড ক্যান্সারে মরে যেতে হয় হাজার হাজার ভাগ্যহতদের। পৃথিবীর সবদেশে শত্রুর হাতে যুদ্ধবন্দী বীরের মর্যাদা পায়, একমাত্র তাদেরই দেশে পায় শত্রুর সন্দেহ। তাই বিজয়ী জাতি বিজিত হয়। নি:স্ব, অভুক্ত ও শীতার্ত হয়ে সুদীপদের মত ফেরেশতাদের হাত থেকে কিনে খায় পচনশীল মটরশুটি, আর পরে শুকতলী খুলে যাওয়া তৃতীয় বিশ্বের বর্জ দিয়ে প্রস্তুত জুতা।


পেরেস্ত্রোইকা, মস্কো ও মধু
৪৯ তম পর্ব

মিশরে ৬০ এর দশকে নাসেরের আমলে আসোয়ান বাঁধ তৈরি হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায়। শুরু ১৯৬০ সালে, শেষ ১৯৬৮ সালে। সেখানে প্রচুর পরিমাণ সোভিয়েত ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করা হয়, এখন সময় এসেছে কয়েক ধাপে তাদের বদলানো। প্রথম কিস্তিতে দরকার ২৫টি দরকার। তারা ফ্যাকটরির সাথে যোগাযোগ করেছ, কিন্তু তাদের বলা হয়েছে ফ্যাকটরি বন্ধ, তাদের হাতে একটিও নেই।
ফ্যাকটরি না বললেই দরকার ফুরিয়ে যায় না। আর দরকার হাত পা গুটিয়ে বসেও থাকতে দেয় না।

পেরেস্ত্রইকার সোনায় সোহাগার আমল, পোলিশ ডিফেন্স মিনিস্ট্রির কিছু করিতকর্মা কমরেড একটি ট্রেডিং কোম্পানি তৈরি করেছে। তারা তৃতীয় বিশ্বে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশের যন্ত্রপাতি বিক্রি করে মধ্যসত্ত্বভোগী হিসেবে।

তাতে আর্থিক লাভ হয়, সমাজতান্ত্রিক নৈতিক দায়িত্ব পালনও হয়।

মিশরীয়রা তাদের শরনাপন্ন হয়।

তারা ফ্যাক্টরির রুশ কমরেডদের সাথে যোগাযোগ করে।

“তোমরা তো জানোই কী অবস্থা, তোমাদের যা, আমাদেরও তাই, রাষ্ট্র পয়সা দেয় না, ফ্যাকটরি বন্ধ, একটিও নেই।”

কমরেড কমরেডকে সাহায্য করবে এটাই ডগমার অন্তমাধুর্য। তা রুশ পোলিশ ভেদাভেদ করে না।

তাদের কাছে খবর আছে যে, এক বিদেশি কোম্পানি বহুদিন আগে তাদের কাছ থেকে অনেকগুলো জেনারেটর কিনেছিল, তাদের হাতে এখনও কিছু আছে। তারা চাইলে সে কোম্পানির বসের সাথে যোগাযোগ করে দেখতে পারে সে বিক্রি করবে কিনা। পোলিশ পক্ষ ইনটারেস্টেড হয়।

কয়েকদিন পরে তাদের জানানো হয় যে, বিদেশি ২৫টি জেনারেটর বিক্রি করতে রাজি আছে , তবে প্রতি জেনারেটরের দাম ১২৫,০০০ ডলার।

তৃতীয় বিশ্বের সরকারি ক্রেতারা দরাজ দিল, তারা দরিয়ার মাল দরিয়াতে ঢালতে কার্পণ্য করে না।

সরকারি বেচা-কেনা সব সময়ই কারো না কারো ভাগ্যের সিংহদরজা খুলে দেয়। তারা বেশি দামেই কিনবে, প্রয়োজন বড় নিষ্ঠুর।

নিকোলাই সের্গেইভিচ সুদীপের কাছে এসে উপস্থিত হয়। সুদীপই সেই বিদেশি, যার কাছে বাঘের দুধও মেলে।

“২৫ টি জেনারেটর বেচতে হবে।”

সুদীপ আকাশ থেকে পড়ে।

“আমার আছে ১টা, ২৫ টা বেচবো কী করে?”

“ফ্যাকটরি বেশি দূরে নয়, সেখানেই ব্যবস্থা হবে”, সের্গেইভিচ আশ্বস্থ করে। তার কাছে একটাই প্রশ্ন সে টাকা কামাই করবে কিনা?

৩.১২৫ মিলিয়ন ডলার তার বিদেশি একাউন্টে আসবে।

ডলারের দাম ৪০ রুবল, প্রতি জেনারেটরের জন্য ১ লক্ষ রুবল করে ২৫ লক্ষ রুবল সে তার রাশিয়ান কোম্পানির একাউন্ট থেকে ফ্যাকটরিকে পরিশোধ করবে, ওটাই রাষ্ট্রীয় দাম। প্রতি জেনারেটরের জন্য ২৫ হাজার ডলার নগদ বখশিশ দিতে হবে ফ্যাকটরির কর্মকর্তাদের। সের্গেইভিচকে ২৫০০ করে দিলেই চলবে।

জিনিসগুলো বর্ডার ক্রস করবে সোভিয়েত এবং পোলিশ আর্মির মধ্যে নিয়মিত মেশিনারি সাপ্লাইয়ের অংশ হিসেবে। নিরাপদ চ্যানেল, কাস্টমস নিয়ে সুদীপের কোন মাথা ব্যথা নেই।

সুদীপের অংকে মাথা ভালো। হিসাব করতে সময় লাগে না, প্রতি জেনারেটর বাবদ তার খরচ

৩০ হাজার, লাভ ৯৫ হাজার। ভাবতেই ওর দম বন্ধ হয়ে আসে।

সে ৫ ডলার পকেটে নিয়ে ৮২ সালে মানবতা মুক্তির মক্কায় এসেছিল। বহু মহামনীষীর মত সাইক্লোপ দৃষ্টি দিয়ে তাকাতে শিখেছিল এই দেশটির দিকে। বার্নাড শ বলেছিলেন, “ভবিষ্যত নিবদ্ধ লেনিন ও স্তালিনের মধ্যেই।” সেই ভবিষ্যত অতীত হয়ে গেছে লেনিনের মৃত্যুর সাথেই, সৎকারের প্রক্রিয়াটা একটু দীর্ঘ হয়েছে এই যা। মাও সে তুং বলেছিলেন: “ স্তালিন হলেন বিশ্ব বিপ্লবের নেতা। মানব সমাজ স্তালিনকে পেয়ে ধন্য হয়েছে।”

নি:সন্দেহে।

ইয়াগোদা, ইঝভ, ঝদানভ, ভিসিনস্কি, বেরিয়া এরা সবাই এই সুমহানের রক্তাক্ত আঙ্গুল। মেডুসার মাথা ছিল অনেক, শান্তনা, তিনি একটি মাথা নিয়েই জন্মেছিলেন। তাতেই আমাদের হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়রা ছিলেন গদগদঃ “মানবজাতির মুক্তির স্বার্থে তাঁর অবদান সারা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে প্রেরণা জোগাবে।”

সেই মহান নেতাই এই দেশটি তৈরি করেছিলেন। জার রাশিয়ার আমলাদের ঝাড়ু পেটা করে তাড়িয়ে গড়ে তুলেছেন মহান সমাজতান্ত্রিক আমলাদের, যাদের বলা হয়, “আপারাতচিকি” বা “নমেনক্লাতুরা।”

শিল্পায়নে ঘটিয়েছেন বিস্ময়কর অগ্রগতি। কিন্তু সেই অগ্রগতির দৃশ্যমান প্রাপ্তি জনগণের খুব কম, কুকুরকে দেয়া উচ্ছিষ্টের মত অপ্রতুল। পূর্ব ইউরোপে পরগাছা সমাজতন্ত্র ধুকছে। বিশাল মহাকাশ বিজয় পকেটে অনুভূত হয় না। হাইড্রোজেন বোম বা এটম বোম পকেটে আঁটে না।

ফিনল্যান্ড একদিন রাশিয়ার খুবই দরিদ্র কলোনি ছিল। ১৯৩৯ সালেও ফিনরা নাকে খত দিয়ে অনেক জায়গা ছেড়ে দিয়ে কেঁদে বেঁচেছিল। অথচ এখন তাদের তৈরি জামা কাপড় জুতা কেনার জন্য রাশিয়ার জনগণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, আর সমাজতন্ত্রের থৈ থৈ বিজয়ে কেঁদে ফেলতে চায়।

“কেন আমাদের বিজয়ের ফলগুলো কোনদিন আমাদের হাতে ধরা দেয় না?”

ওরা ভাবে।

“ধরা দেবে, কমরেড ক্রুশ্চেভ বলেছেন ১৯৮০ সালে আমরা আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাব, আমাদের দেশে উন্নত কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা হবে।”

“কিন্তু এখন ৮৩ সাল।”

“হ্যাঁ, তা ঠিক, কমরেড ব্রেজনেভ মারা যাওয়ায় একটু বাধা পড়েছে, কমরেড আন্দ্রোপভ খুব পরিশ্রম করছেন।”

সেই আন্দ্রোপভও মারা গেছেন, গেছেন চেরনেঙ্কোও, বহু আশা দেখানো গর্বাচভ যাই যাই করছেন। এবং সেই ১৯৯১ সালে দাঁড়িয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার কামাই করার স্বপ্ন দেখছে সুদীপ ।

অদ্ভুত তালের পায়েসের মত মাদকীয় স্বপ্ন। গ্রামে বড় হয়েছে সে, দারিদ্র্যের খোয়ারে শীর্ণ মুরগির মত। লেট্রিনের পেছনে বর্ষায় খলবল করতো প্রচুর পাঙ্গাস মাছ। সেই পাঙ্গাস মাছের মত অনেক অনেক ডলার ধরা দেবার জন্য উশখুশ করছে।

সের্গেইভিচ খবর নিয়ে আসে, পরের সপ্তায় পোলিশ ডেলিগেট আসবে।

বিজনেস মিটিং, তাদের আপ্যায়ন করতে হবে ভালো।

এ বিষয়টি সুদীপ নিজেও জানে। রাশিয়ায় পর্যাপ্ত খাদ্য ও পানীয় ব্যবসায়ের পথ মসৃন করে।

এখানে কার্পণ্য করা চলে না। নির্দিষ্ট দিনে সন্ধ্যে ৬ টায় “প্রিমরস্কি পার্ক পাবেদি”র* দামি ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট “ভস্তক”-এ সবাই মিলিত হয়।

৪ জনের পোলিশ পক্ষের গ্রুপে যে লিডার, বয়সে সে সবচেয়ে ছোট।

বড় জোর ত্রিশের যৌবনের এক নারী। বাকিরা মেদ মাধব।

“এল্ঝবেথ, বেথ”- হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে।

তার সামারের হাল্কা লং কোট খোলার পরে মিনি স্কার্টের অপ্রতুলতার নীচে তন্বী উরু দণ্ডকারণ্যের স্বর্ণমৃগের মত হাতছানি দেয়। অথবা আষাঢ়ের ঘোলা নদীর ঘুর্ণন সৃষ্টি করে মনের গহীনে। বাধ না মানা দেহের প্লাবন ভাসিয়ে নেয়ার হুমকিতে গম গম শাসায়। যেন সে বিজনেস মিটিংয়ে আসেনি , এসেছে একাকি একঝাঁক পুরুষের চোখে আগুন লাগিয়ে দিতে। আগুন নয়, আগুনের মশাল হাতে ঢুকে যেতে প্রত্যেকের দৃষ্টির গুহায়।

সুদীপ প্রচুর খাদ্যের অর্ডার দেয়।

ড্রিন্ক সার্ভ করা হয় জাম্বেসি-নায়েগ্রার মত।

ভদকা ও কনিয়াক।**

শ্যাম্পেন ও স্পার্কলিং ওয়াইন।

পেপসি ও নারজান।***

বেথ হাসে খিল খিল করে এবং তার চোখ নাচে কথায় কথায়। রাতের হায়েনার চোখের মত জ্বলজ্বল করে। অথবা আঁধার আকাশে হঠাৎ বিজলীর মত চমকায়। অবাক করা বিষয়, সে শ্যাম্পেন বা ওয়াইন নয়, হার্ড ড্রিন্ক বেশি পছন্দ করে। তার টলারেন্সও হাই ভোল্টের কমার্শিয়াল ইলেকট্রিক লাইনের মত। সুদীপকে সে দেখে মনযোগ দিয়ে। ব্যবসায়ী না নিষাদের দৃষ্টি, বোঝা মুশকিল। এভারেজ বাংগালির চেয়ে লম্বা এবং মেদহীন ব্যায়াম করা শরীর সুদীপের। “লিবারেটেড” নারীরা এই ধরনের শরীর পছন্দ করে।

ডিজেল জেনারেটর ফ্যাক্টরির ডাইরেক্টর, উপ ডাইরেক্টর, কমার্শিয়াল ডাইরেক্টর ইত্যাদি ছায়া মানুষগুলোর সাথে সুদীপের দেখা হয় শেষ পর্যন্ত।

“তি মালাদিয়েৎস” সুদীপকে কম্প্লিমেন্ট দেয়।(শাবাশ সুদীপ!)

এরা সবাই এক কালের বাঘা বাঘা পার্টি নেতা। সাদা সাদা, তেল চকচকে প্রলেতারিয়েত।

নিকোলাই সের্গেইভিচ আছে। আছে মোশতাকও।

খাদ্য ও পানীয়ের প্রতুলতার ফাঁকে ফাঁকে বিজনেস আলোচনা চলে।

রেস্টুরেন্টের মঞ্চে গান বাজনা চলছে।

অনেকে নাচছে।

বেথের চোখ সে দিকে।

সে সুদীপকে টেনে নিয়ে যায় নাচের ফ্লোরে।

নাচে বড় চমৎকার। অসম্ভব ফ্লেক্সিবল এবং ‘কামকোয়াড’**** দেহ বল্লরী।

একটা দামী পারফিউম ব্যবহার করেছে। সমাজতান্ত্রিক দেশের সাধারণ নারীরা এ পারফিউম ছোয়ার সামর্থ্য রাখে না। অবশ্য অফিশিয়াল আদর্শও এলাউ করে না।

সুদীপও দীর্ঘদিনে নাচের কসরত ভালো রপ্ত করেছে।

বেথ রাঁজহংসী হলে, সে-ও পাতিহাঁস নয়।

নাচে সে-ও সমানভাবে দক্ষ।

দ্বৈত নাচের সময় সুদীপকে প্রায় পিষে ফেলে যেন বেথ। সুন্দরবনের বাঘিনীর মত কেমন খাই খাই ভাব। আর হাসে খিল খিল। চোখ দিয়ে তীর ছোড়ে।বোঝা যায় ওর মগজের নিউরনগুলো ব্রান্ডিতে ডুবু ডুবু। নেচে ক্লান্ত হয়ে ওরা আবার টেবিলে ফিরে আসে।

আরও পান করতে করতে চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শেষ করে।

নাচের সময় তাকে কামার্ত, মদালস ঘৃতাচীর মত মনে হলেও সুদীপ লক্ষ্য করে যে ব্যবসায়ী আলোচনার সময় তার মনোযোগ টনটনে। কোনো ডিটেইলস বাদ যায় না।

পরের দিন কন্ট্রাক্ট সাইন হবে।

ফ্যাক্টরির কমার্শিয়াল ডাইরেক্টর তা তৈরি করবে।

মিটিং শেষ করে ওঠে যখন, প্রায় সবাই মদ ও প্রচুর অর্থ আহরণের স্বপ্ন-মাদকতায় ভারসাম্যহীন।

বেথ তার পার্টনারদের বলে যে, সুদীপের সাথে পার্কে হাঁটবে, পরে নিজেই হোটেলে চলে যাবে, তাদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। সুদীপ অবশ্য এটা আশা করেনি। তারও দৃষ্টি ঘোলাটে এবং সারা শরীরে কেমন একটা উত্তেজনা। ভদকা সেও কম খায়নি। সে বরং আলিওনার কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছুক।

বেথকে নিয়ে বাইরে আসতেই ফিন উপসাগরের ঠাণ্ডা হাওয়ায় মাথা কিছুটা পরিচ্ছন্ন হয়। অসংখ্য গাছ-পালায় ঘেরা ‘প্রিমরস্কি পার্ক পাবেদি’ ফিন উপসাগরে স্নান করতে নেমে গেছে। অসম্ভব নিরিবিলি ও গাছ গাছালীতে সুন্দর। গ্রীষ্মের শ্বেতরাত্রির সময় এটা। সূর্য নেই, নেই অন্ধকারও।

বেথ বেহায়া বেড়ালের মত, গা ঘেষে থাকে।

নারী যেন সমুদ্র, বাইরে থেকে শুধু সিল্যুয়েট দেখা যায় কিন্তু তার স্রোত, গভীরতা ও অসীমতার অভিকর্ষ এত তীব্র যে, পুরুষ তাকে এড়াতে পারে না, কলম্বাস, গামা, ভেসপুচি হয়ে ভেসে যায়।



পাদটিকাঃ

*প্রিমরস্কি পার্ক পাবেদি- সমুদ্র তীরবর্তী বিজয় পার্ক
**কনিয়াক - সোভিয়েত ব্রান্ডি
***নারজান - সোভিয়েত মিনেরাল ওয়াটার

****কামকোয়াড - ছোট্ট, সুন্দর, লটকা জাতীয় একটি সুস্বাদু ফল।


পেরেস্ত্রোইকা, মস্কো ও মধু
৫০ তম পর্ব

সুদীপ তুলনামূলকভাবে নব্য ব্যবসায়ী। একজন লাবণ্যের ঘুর্ণিপাক থেকে বের হবার আগেই আলিওনার স্বামী হয়ে আছে। এখনও সে তার বিশ্বাসের ব্যত্যয় ঘটায়নি কিন্তু যতই সে পোস্ট সমাজতান্ত্রিক শকুন- শকুনি ব্যবসায়ের ভেতরে ঢুকছে সে বুঝতে পারছে যেখানে টাকার খেলা সেখানে নারীরও মোহিনী জগত।

নারী ভদকার নেশা ও শ্যাম্পেনের বুদবুদের মত। বেথকে নিয়ে সুদীপ পার্কে হাঁটে বেশ কিছুক্ষণ।

তারপরে গাড়ীর কাছে এগিয়ে আসে।

ড্রাইভার ঝিমুচ্ছিল।

ভাসিলীর দ্বীপ, শীত প্রাসাদ, এডমিরালটি বিল্ডিং ও ১৮২৫ সালের ডিসেম্ব্রিস্ট বিদ্রোহের যে মাঠ, সেই মাঠে অশ্বারোহী পিটারের মনুমেন্ট পার হয়ে আস্তোরিয়া হোটেলে পৌঁছায়।

এক সময়ের রাশিয়ার সবচেয়ে দামী ও প্রেস্টিজিয়াস হোটেল।

হিটলার ঝটিকা আক্রমণে রাশিয়া দখল করে এই হোটেলে বসে লাঞ্চ করতে চেয়েছিল, চেয়েছিল জার আলেক্সান্ডারের ঘোড়সওয়ার অপূ্র্ব মনুমেন্টটির দিকে তাকিয়ে থাকতে কিছুক্ষণ। পাশেই আইজ্যাক ক্যাথেড্রাল বা “ইসাকিয়েভস্কি সাবোর” দাঁড়িয়ে আছে গর্বিত গম্বুজ আকাশে উঁচু করে। এখানেই জারদের অভিষেক হতো।

দেশ থেকে বড় মাপের পার্টি নেতারা এলে এখানে থাকে মাঝে মাঝে।

সে কয়েকবার এসেছেও নেতাদের সাথে দেখা করতে বা তাদের কোনো পূর্বনির্ধারিত মিটিংয়ে নিয়ে যেতে। রুশী খাদ্যে বিরক্ত হয়ে যাওয়া কমরেডদের হোস্টেলে নিয়ে বাংগালি ডাল ভাত খাওয়াবার ফাঁকে ফাঁকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের অগ্রগতির খবর শোনা ছিল বিপ্লবী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এই হোটেলে ঢুকতে বুকে একটা কষ্ট টনটন করে সব সময়।

হোটেল আঙ্গেলেটার, যা এখন আস্তোরিয়ারই অংশ, একসময় একটি আলাদা হোটেল ছিল।

১৯২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বরের একটি ধূসর দিনে সোনালি চুলের একজন যুবক, বহু নারীর হৃদয় কাড়া এবং কোটি মানুষের ভালোবাসার কবি সের্গেই ইয়েসিনিন মস্কোর জটিলতা থেকে পালিয়ে এসেছিলেন বাঁচার তাগিদে। কিন্তু তাকে পাওয়া গিয়েছিল সিলিং ফ্যানে ঝুলন্ত অবস্থায়। কেউ বলে তিনি আত্মহত্যা করেছেন, কেউ বলে এটাও ছিল এন-কে-ভি-ডির লক্ষ কোটি নিঁখুত কর্মের আরো একটি।

“অনেক ধন্যবাদ আমার সাথে একটু আলাদাভাবে সময় দেয়ার জন্য”, হোটেলে ঢুকে বেথের থেকে বিদায় নিতে চায় সুদীপ ।

“না, না, এত তাড়াহুড়ো কী, আমার রুমে চল।”

বেথ চায় তাকে রুমে নিয়ে যেতে।

ককেশিয়ার নানান রঙ্গীন ফুলের পাহাড়ি উপত্যকার মত একটি উপত্যকা আছে তার রুমে।

আছে নাম না জানা অনেক পাহাড়ি ঝর্ণা ও পাখি। বেথ তাকে তা দেখাতে নিয়ে যেতে চায়, মাতাল অচেতন মনে নয়, চেতনার সুরঙ্গ ধরে। সুদীপকে তার ভালো লেগেছে। এই রাতে সে তাকে বন্য ও বন্ধনহীন খরস্রোতা নদী দেখাবে।

সুদীপের জলে পড়ে যাবার মত অবস্থা হয়, সে সাঁতরাবে, না ডুববে বুঝে উঠতে পারে না।

আর কোনটা ডোবা, কোনটা সাঁতরানো, সেই বোধও ভদকার অস্বচ্ছ পর্দায় ঢাকা।

বেথ যদি বেথেলহেমের পবিত্র নদীর মত হয়, সাঁতরানো কি যায় না?

বলে, “আচ্ছা, চলো আগে ক্যাফেতে যাই, তৃষ্ণা পেয়েছে।”

“রুমে চল, ঠাণ্ডা জল আছে।

দু’জনের দুই তৃষ্ণা, কারো জলের কারো অন্য কিছুর।

কিন্তু সুদীপ আস্তোরিয়া হোটেলের ক্যাফের দিকে হাঁটা ধরেছে। বেথ বাধ্য হয়ে ওকে ফলো করে।

আবার মুখোমুখি বসে। ভারী সুন্দর সে। পোলিশ রূপসী নারী, রাশিয়ানদের থেকে একটু অন্যরকম।

নারীর প্রশ্নে সুদীপ পক্ষপাতমুক্ত নয়। নারীর চেয়ে সুন্দর কিছু হতে পারে এটা সে বিশ্বাসই করে না।

বেথের চুলগুলো সাদা শণের। শণের রুশ প্রতিশব্দ “কনোপ্লিয়া।”

কনোপ্লিয়া গাছ থেকে গাঁজা তৈরী হয়, অ্যামেরিকায় তাকে আদর করে ডাকে ‘মেরি জেন’।

বেথ যেন মেরি জেন।

চোখে দীর্ঘ কৃত্রিম ঝালর, কিন্তু অপূ্র্ব মানিয়েছে।

লাল ঠোঁট, লাল নখ, নারকীয় চুম্বক ।

“কী খাবে? কনিয়াক, না ভদকা?”

“ভদকা”

সুদীপ অর্ডার দেয়।

বেথ সাবাশ মেয়ে, গলার চামড়া এখনও কচি লাউয়ের মত মসৃন ও মোলায়েম। এত ভদকা সে কিভাবে সহ্য করে ভাবলে অবাক লাগে। সুদীপ ভস্তক রেস্টুরেন্টে বসেই টের পেয়েছিল বেথের দুর্বলতা কোথায়। মেয়েদের এতে ড্রিংক করতে হয় না, এতে সৌন্দর্য খর্ব হয়।

তাদের অন্তর্নিহিত চুম্বকের আকর্ষণশক্তি কমে আসে।

ফুলের গন্ধ যেমন, পরিমিতি তেমনি নারীর সৌষ্ঠব।

মাতাল নারী কদর্য নারী, সুদীপ বোঝে।

একসময় বেথ সম্পূর্ণ টাল হয়ে যায়।

সুদীপ ওকে রুমে নিয়ে যায় কোনমতে ওর স্লিম দেহের ভার বহন করে।

সে এখন মাতাল হাঙর। মাতাল হাঙর দাঁতাল নয়।

সুদীপ সাবধানে ড্রিন্ক করেছে, তার একটু দুলুনি আছে কিন্তু মাতাল নয়।

বেথের অরগ্যাজমের চাইতেও বেশি দরকার ওর হাতের বহু মিলিয়ন ডলারের বিজনেস।

না বললে, সে বিদ্রোহ করতে পারে। তাই তাকে ভদকার স্বচ্ছ হ্রদে স্নান করাতে হয়েছে।

সুদীপের “হ্যাঁ” বা “না” দুটোই বেথের কাছে এখন সমান গুরুত্বের। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বাইরে আসে সে। আস্তে আস্তে হেঁটে যায় ফনতানকা নদীর তীর ধরে। শ্বেতরাত হাঁটছে বেথের মতই যৌবন উন্মুক্ত হেলে দুলে।

শিস দিচ্ছে।

"চিঝিক পিঝিক ছিলি কই?
ফনতানকাতে ভদকা থৈ
খেলাম স্তপকা*, খেলাম দুই
ঘুরলো মাথা ঘুরলো ভুঁই।”

চিঝিক পিঝিক পাখি হঠাৎ হারিয়ে গিয়েছিল।

খোঁজ খোঁজ খোঁজ। ফিরে আসে সে যখন পার মাতাল। জানা যায় সে ফনতানকা নদী তীরে বসে ভদকা খাচ্ছিল।

সুদীপ হাঁটছে তন্বী সেই নদীর তীর ধরে।

এই পথে হেঁটে গেছে ইতিহাস। কখনও যুবক যুবতীর বেশে, কখনও প্রেম ভালোবাসা, হাসি ও কান্নার বোঝা কাঁধে নিয়ে। কখনও রাজপুত্র, কখনও রাজকুমারী ।

পিটার্সবুর্গের সবচেয়ে দামী, অর্থের বিনিময়ে প্রেমের মন্দির ছিল এই নদীতীরে।

রাজহংসীর মত নারীরা প্রেম বেচতো আর কাঁদতো। কান্নার জন্য ফনতানকা খুব উপযুক্ত স্থান।

এরই তীরে একটি বাড়িতে ডুয়েলে আহত পুশকিন মৃত্যুপূর্ব শ্বাসকষ্টে ভুগেছিলেন। অন্য এক বাড়িতে আন্না আখমাতোভাকে বিশাল কম্যুনাল কোয়ার্টারের জানালায় দাঁড়িয়ে প্রতিদিন বাগানের বেঞ্চে বসা এন-কে-ভি-ডির কমরেডকে দেখাতে হতো যে সে এখনও বেঁচে আছে, আত্মহত্যা করে নাই ।

“আমি ইচ্ছা করলেই তোমাকে গ্রেফতার করতে পারি, হত্যা করতে পারি, কিন্তু তাতে সবখেলা শেষ হয়ে যায়। খেলা শেষ হোক আমি তা চাই না।” ইঁদুর নিয়ে খেলায় সিংহের সিংহত্ব প্রকাশ পায়, একবারে মেরে ফেলায় নয়। “লোকে বলে তুমি আমার চেয়ে মেধাবি, আমার চেয়ে শক্তিশালি, এবং তোমাকে নাকি ভাঙ্গা যায় না। প্রতিটি মুহূর্ত আমি তোমাকে ভয়ে কাঁপতে বাধ্য করাবো। যতদিন না তুমি ঝুর ঝুর করে ভেঙ্গে পড়ো।”

দেয়াল গুলো ফিস ফিস করতো, ফিসফিস করতো জানালার বাইরে গাছগুলো। আন্না আখমাতোভাকে হত্যা করা হয় নাই, জেলে পর্যন্ত নেয়া হয় নাই, অথচ তার লেখা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, তাকে অনাহারে রাখা হয়েছে। তার ভালোবাসার পুরুষদের হত্যা করা হয়েছেঃ

নিকোলাই গুমিলেওভ, ওসিপ ম্যান্ডেলস্টাম, নিকোলাই পুনিন।

একমাত্র সন্তান লেভ গুমিলেওভ গুলাগে।

তিনি আরও হাজার হাজার নারীর মত ঘণ্টার পর ঘণ্টা শীতে শীতে কাঁপতে কাঁপতে শ্বেত তুষারাচ্ছন্ন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন এক দণ্ডের জন্য ছেলেকে দেখে নিশ্চিত হবার জন্য যে, সে বেঁচে আছে। তিনি বিধ্বস্ত, লুণ্ঠিত, ধর্ষিত রাশিয়ার কবি নন, লাখো লাখো সন্তানহীন, স্বামীহীন, প্রেমিকহীন নারীর একজন। সামনে দেয়াল, পেছনে দেয়াল।

দেয়াল নড়েনা।

ধীরে বহা মায়াবতী ফনতানকা মিখাইলভস্কি প্রাসাদের পাশ ঘেঁষে, সামার গার্ডেন ছুঁয়ে মিশে গেছে ভরাট নেভায়। নেভা জলে থৈ থৈ করে। নেভার যৌবন কোনোদিন মলিন হয় না।

"নেভা , তুমি এত জল পেলে কোথায়?"


"আন্না আখমাতভার চোখে।”
"এত জল নারীর চোখে?"
"না, একটা সমস্ত দেশ, একটা সমস্ত জাতির চোখের জল ওই চোখে।"
মহাদেবের জটা থেকে গঙা নেমে আসে জানা যায়, কিন্তু কোনো নারীর চোখ থেকে নদীর জন্ম হয় ?

হয়। প্রাচীন নীল নদ। যখন সেখানে থৈ থৈ জোয়ার হত, মিশরীয়রা জানতো যে, আইসিস দেবী বসে বসে কাঁদছেন, আর তার চোখের জলে ফুলে ফেপে উঠেছে নদী। তিনি কাঁদছেন তার নিহত স্বামী ওসিরিসের কথা মনে করে। আন্না আখমাতভা সেই দেবী, কাঁদছেন তার স্বামীদের জন্য, পুত্রের জন্য, স্বদেশবাসীর জন্য। তার অশ্রু, রক্ত। যে রক্তে পা ধোয় পৃথিবীকে বিবেকহীন করার দায়িত্ব নিয়ে আসা কালাপাহাড়ের দল।

সুদীপ স্বপ্ন দেখতো বিশ্ববিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীকে শোষণমুক্ত করার। কিন্তু এখন সে ব্যস্ত।

একটি বিশাল কন্ট্রাক্ট সাইন করবে সে, সুন্দর এই রাতটি অতিক্রম হলেই।

পরের দিন ফ্যাকটরিতে কনট্রাক্ট সাইন হয়।

বেথ মিটি মিটি হাসে। আজ সে সম্পূর্ণ সুস্থ এবং টনটনে ব্যবসায়ি।

কাজ শেষে সুদীপকে বলে, “তুমি খুব চালাক, কাল রাতে আমাকে ইচ্ছা করে মাতাল করে দিয়েছো, তাইনা?”

“না, মোটেও না”, সুদীপ হেসে অস্বীকার করে। “তোমার রুমে গেলাম, অথচ তুমি অনুপস্থিত।”

বেথ ওকে ওয়ারশতে যাবার দাওয়াত দেয়।

“ফিরে গিয়েই ইনভাইটেশন পাঠাবো, তুমি ওয়ারশতে আসবে, আমি তোমাকে মাতাল করে প্রতিশোধ নেব।”

ওরা হাসে।

হাসি মানুষের মনের গহিনের লাভা রসায়নের মিশ্রিত সৌন্দর্য।


চলবে
পাদটিকাঃ
*স্তপকা- ভদকা খাবার টাই গেলাস।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ