জয়ন্ত দের গল্প : গোপালের বিধবা বউ


গোপাল সুবোধ বালক ছিল না। এ কথা নন্দা খুব ভালো করেই জানত। এ নিয়ে ওর মনে খুব দুঃখ ছিল। গোপালকে এই শহর নাকি গিলে ফেলেছিল। মেসে থাকত। নন্দা বলত, শহরের জল ওর পেটে। গোপাল সে কথা শুনে হাসত। আসলে গোপাল ফি শনিবার মেসের তেতলার ঘরে মদ্যপান করত। আর যখনই নেশা করত, তখনই সে ফোনে বউকে গান শোনাত। কিশোর কুমার। অন্য সময় ওর গলা দিয়ে সুর বেরুত না।

আমি গোপালকে ভিডিও কল করা শিখিয়েছিলাম। অন্যসময় গোপাল কারও সামনে নন্দার সঙ্গে কথা বলত না। ফাঁকা ঘর, টানা বারান্দা তবু মেসের ছাদে গিয়ে বউয়ের সঙ্গে কথা সেরে আসত। কিন্তু যখন মদ খেত তখন ও আমার সামনে নন্দার সঙ্গে প্রেমের কথা বলত। সে কী প্রেম! রস যেন চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ত। কে বলবে, গোপাল এমন প্রেমিকস্বভাবের।

গোপালের প্রেমের কথা শুনে নন্দা মুখ ঝামটা দিত, রাগ করত, কিন্তু ফোন কাটত না। অপছন্দের কথায় তো মানুষ ফোন কেটে দেয়, কিন্তু নন্দা ছিল বিপরীত। প্রথম প্রথম মনে হত, নন্দার ওই রাগ বুঝি সত্যি নয়, দেখানো! কিন্তু কিছুদিন পরে অন্য কথা মনে হয়েছিল, অন্য কথা। সত্যি কথা বলব, আমার মনে হত, গোপালের ঘাড়ের কাছে আমি থাকতাম বলে নন্দা ফোন কাটত না। নন্দার সঙ্গে আমার চোখে চোখে কথা হতো। নন্দা মাঝে মাঝে ঠোঁট বেঁকিয়ে বলত— ঢং।

ওর ঢং বলা শুনলে আমার বুকের ভেতর মুচড়ে উঠত। আমার গলায় সুর ছিল না। আমি গান জানি না। তবে গোপালের সঙ্গে একটু কথার পরে নন্দা একবার না একবার বলতই, ‘জগৎদা কোথায়, দেখিনে কেন?’

আমি যেন ওটুকু শোনার জন্যই ঠাঁই মেরে বসে থাকতাম।

গোপাল বলত, ‘জগৎভাই এদিকে এসো, তোমার বউদিরে একটু আলো দেখাও।’

আমি জগৎপতি আলো। বাড়ি বাঁকুড়ার সোনামুখী। এই মেসে থাকি। আমি আর গোপাল দাস এক ঘরে। আমার নাম আর পদবীর জন্য আমি এই মেসের সবার কাছে একটা হাসির আইটেম ছিলাম। আমিও সেটা উপভোগ করতাম। মজার মজার জোকস বলতাম। একে তাকে নকল করতাম। এর হাঁটুনি, ওর হাঁচা, এর হাসা, ওর খাওয়া! ক্যারিকেচার। মেসের এই জন্য আমার খুব কদর ছিল। সস্তার আনন্দ! নন্দার কাছেই সেইজন্যও আমার ডাক আসত। ভিডিও কলে আমাকে দেখতে পেলেই বলত, ‘ও জগৎদা আপনার মাসি কেমন আছে গো? হোন্ডা মাসি!’

আমাদের মেসের রান্নার মাসির নাম ছিল হেনা। আমিই তাকে হোন্ডা বানিয়েছিলাম। সে সাতসকালে এসে একটা ট্যালটেলে মাছের ঝোল, খলখলে ডাল আর জাবনা মাখা তরকারি করে চলে যেত। মাসি একটু অন্যরকম, একটু ভালো রান্নার কথা বললেই সে হোন্ডা জেনারেটারের মতো গব গব করে উঠত। আমি ভিডিও কলে হোন্ডামাসিকে নকল করে দেখাতাম। নন্দা দেখত আর হাসত। হাসলে ওর শরীর কেমন ফুলে ফুলে ওঠত। নন্দা জানে না, আমি সেটাও দেখতাম। কিন্তু সেটা আমি কখনও নকল করার চেষ্টা করিনি।

তবে, আমি নন্দাকেও নকল করার চেষ্টা করতাম, নন্দার হাসি। পারতাম না। নন্দার মুখ বেঁকানো। পারতাম না। ঠোঁট মোচড়ান। পারতাম না।

গোপাল আমার হাতের ভিডিও কলের ফোন ধরিয়ে বিছানায় গড়াগড়ি খেত। ওর তখন নেশা চড়ছে। আমি নন্দার সঙ্গে গল্প করতাম। তবে সেখানে গল্প কমই থাকত। থাকত, নন্দার অনুরোধের আসর। কখনও হোন্ডা মাসি, তো কখনও মেসের ম্যানেজারবাবুর নস্যি নেওয়া নাকি সুরে কথা। আমি নন্দাকে জোকস বলতাম।

জোকস— সাধুবাবাকে শিষ্য বলল, বাবা প্রেম কী? সাধুবাবা বলল, জীবনের চলার পথে আলো? শিষ্য বলল, তাহলে বাবা বিবাহ কী? সাধুবাবার জবাব— সেই আলো জ্বালানোর খর্চা বৎস। ইলেকট্রিক বিল! শিষ্যা বলল— বাবা পরকীয়া কী? সাধুবাবা বলল— আর বিল ছাড়া আলো জ্বালানো। হুকিং বুঝিস বেটা— চুরি করে আলো জ্বালানো।

আমার কথায় নন্দা মোবাইল জুড়ে ফুলে ফুলে হাসত। ওই হাসি, ওই মুখ বেঁকানো একদম তারই মতোই। দারুণ, দুর্দান্ত, বিউটিফুল!

নন্দা বলত, আমাদের ওখানে সব হুকিং করে আলো জ্বালায় গো, তোমার দাদা কারেন্ট পুড়িয়ে বিল দেয়—।

আমি গোপালকেও নকল করতাম। গোপালের নাক ডেকে ঘুমানো, চোখ বড় বড় করে দেশের বাড়ির কথা বলা, মায়ের হাতের চুনো মাছের টক। এইসব, সাতপাঁচ।

নন্দা আমাকে বিয়ের কথা বলত। বলত, ‘এবার একটা বিয়ে করেন জগৎদা।’

আমি এক কথায় রাজি হয়ে যেতাম। বলতাম, ‘তোমার মতো একটা ম্যে দেখে দাও।’

কথা বলার সময় আমার দু’চোখে মোহ আর লোভ ঝিলিক মেরে দিত।

নন্দা বলত, ‘তার তো আমার মতো কপাল হতো, ফেলে পালাতেন খালি—।’

আমি ফিসফিসে গলায় বলতাম, ‘আমি পালাতাম না, যত্নে রাখতাম।’

নন্দা মুখ বেঁকাত, ‘হুমম, কী করে যত্নে রাখতেন?’

আমি তখন লোভ-ধরা গলায় বলতাম, ‘ফি হপ্তায় দৌড়ে দৌড়ে বাড়ি যেতাম।’

নন্দা বলত, ‘আর?’

‘যাওয়ার সময় শাড়ি, নেলপালিস, লিপিস্টিক, চুলের ফিতে কিনে নিয়ে যেতাম।’

‘আর?’

‘ব্যাগ ভর্তি করে চানাচুর, ঝুরিভাজা, শোনপাপরি কিনে নিয়ে যেতাম।’

‘আর?’

‘মাসের মাইনে পেয়ে তোমার হাতে দিতাম।’

‘আর?’

‘তুমি মনের সুখে খরচ করতে।’

‘আর?’

‘তুমি আমার গৃহলক্ষ্মী!’

নন্দা ঠান্ডা গলায় বলত, ‘আমি কেন গৃহলক্ষ্মী হব, লক্ষ্মী হবে আপনার বউ! আমি অলক্ষ্মী!’

নন্দা কেন নিজেকে অলক্ষ্মী বলত, সেটা আমি জানি। আমার মুখ দিয়ে কথা সরত না। আমি তখন ফোনের ভেতর হরিয়ে গেছি। আমার পাশে, আমাকে ফোন ধরিয়ে নেশাতুর গোপাল ঘুমায়। গোপাল সুবোধ বালক ছিল না। ফি শনিবার মদ খেত। আমি ওর সঙ্গে লেগে থাকতাম। কেন? মোহ! মোহ! গোপাল নেশা করে ঘরে আসবে। আমি বলব, ‘নন্দাকে ফোন করেছ গোপালদা?’ ও নন্দাকে ফোন করবে। গান শোনাবে। গান গাইতে গাইতে ওর কথা জড়িয়ে আসবে। তখন নন্দা বলবে— জগৎদা কোথায়? গোপাল বলবে—জগৎ তোমার বউদিরে আলো দেখাও।

আমি জগৎপতি আলো। আজ সত্যি সত্যি আলো দেখাতে গোপালের বাড়ি চলেছি। অফিস থেকে শিয়ালদা স্টেশন। সেখান থেকে ট্রেন। হেমন্তের বিকেল। যেমন হাওয়া, তেমন মায়ামরা আলো। আজ শনিবার। আজ গোপালের নেশা করার দিন। এমনই এক শনিবারের রাতে নেশা করে শুয়ে গোপাল ভোরে আর ওঠেনি। মরে গেছে। হার্ট অ্যাটাক। সে এক হুলুস্থুলু কাণ্ড। মেসের সবার কোমরে দড়ি পড়ে পড়ে। আমরা শোক করার সময় পাইনি। শুধু নিজেদের সামলেছি। তিনমাস থানায় চক্কর কেটে তবে শান্তি। আমি গোপালের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। খোঁজখবর নিতাম। বাড়িতে ওর মা আর বিধবা বউ। তিথি নক্ষত্রের হিসেবে কাল গোপালের বাৎসরিক কাজ। ওর বিধবা বউ আমাকে ডেকেছে। ‘একবার আসুন।’ ওর মাও ডেকেছে, ‘একবার এসো বাবা।’

আমি যাচ্ছি।

নন্দা যখন গোপালের বউ ছিল, ফি শনিবার আমি নন্দার সঙ্গে কথা বলতাম। মাঝে মাঝে মোবাইল ঘুরিয়ে আমি নেশায় লটকে থাকা গোপালকে দেখাতাম। তারপর দুজন মিলে হাসতাম। তখনই একদিন আমি নন্দাকে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছিলাম। সেদিন চোখ পাকিয়ে নন্দা বলেছিল, ‘জগৎদা আপনি কি নেশা করেছেন?’

আমি বলেছিলাম, ‘নেশা করেই তো মানুষ সত্যি কথা বলে। নেশা না করলে মিথ্যে! আমি তোমার নেশা করেছি!’

নন্দা মুখে আঙুল দিয়ে আমাকে চুপ করতে বলেছিল। বলেছিল, ‘ও যদি শোনে কী কীর্তি হবে জানেন? নির্ঘাত আমাকে ঘর থেকে বের করে দেবে।’

আমি বলেছিলাম, ‘ইশ, তেমন হলে আমি তোমাকে নিয়ে আসব।’

নন্দা বলেছিল, ‘কোথায়? মেসে?’

‘মেসে কেন বাসা ভাড়া নেব, তোমার সঙ্গে সংসার করব, তুমি ভাত ডাল রান্না করবে, আমাদের ছেলেপুলে হবে—।’ কথাটা বলে আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। ওদের কোনও সন্তান ছিল না। এই নিয়ে গোপালের মা খুব অশান্তি করত। অলক্ষ্মী বলত। সেই অশান্তির ভয়ে গোপাল বাড়ি যেত না। শনিবার শনিবার মদ খেত। ওর মনে খুব দুঃখ ছিল।

এখনও নন্দার সঙ্গে আমার ভিডিও কল হয়। ইচ্ছে করলে রোজ হতে পারত, আর গোপালের ভয় নেই। কিন্তু হয় না। আমার পাশে বেডে এখন রমেশ জানা। খুব হারামি ছেলে। আমার ফোন এলেই কান খাড়া করে থাকে। মাঠে ঘাটে বসে তো আর ভিডিও কল করা যায় না। কথা হয় ফোনে ফোনে রোজ। হপ্তায় একদিন ভিডিও কল। শনিবার। সেদিন রমেশ জানা ওপরতলার ঘরে মদের আসরে থাকে। সে সময় আমি গোপাল হই, জগৎপতি আলো হই। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফোন করি। আমি সারা সপ্তাহের খোঁজ খবর নিই। খোঁজখবর দিই। তবে আমার খবর দেওয়াটা এখন শুধুই খবর। তার মধ্যে কোনও রস কষ তোতা বুলবুলি থাকে না। আলগোছে একবার গোপালের মা‌য়ের কুশল জানতে চাই। কান্নাকাটি করে কি না খোঁজ নিই। নন্দার শরীর ঠিক আছে কি না জানি। আলত করে টাকা পয়সার কথা জিজ্ঞাসা করি। বলি, কোনও দরকার পড়লে বলো। আমি আছি। নন্দা আমাকে আর হোন্ডামাসি, মেসের ম্যানেজার এমনকী আমার বিয়ের কথা বলে না। তবু আমি খুঁজে খুঁজে কথা বলি, আবহাওয়া থেকে তৃণমূল বিজেপি। সারের দাম থেকে রাস্তার জ্যাম। সব বলি। নন্দা কিছু জিজ্ঞাসা করে না। ও শুধু শোনে। নন্দা এখন গোপালের বিধবা বউ। তবে আমি এখনও মনে মনে ওকে ‘আই লাভ ইউ’ বলি। ভিডিও কলে দেখা নন্দাকে আদর করি। চোখ বুজে ওকে ছুঁয়ে শুয়ে থাকি। নিয়ম করে ওর ফোনে টাকা ভরে দিই। ডাটা ভরে দিই।

আজ নন্দার কাছে যাচ্ছি।


দুই

গোপালের কাছে শুনে শুনে ওদের বাড়ির রাস্তা আমার মুখস্ত। স্টেশনে নামলে ট্রেন সামনের দিকে চলে যাবে, আমি যাব পিছন দিকে। পিছনে গিয়ে ওদিকের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এদিকে আসব। গেলেই দেখতে পাব টান টান রাস্তা চলে গেছে সোজা। আমাকে হাঁটতে হবে বাঁদিকে। প্রায় বিশ পঁচিশ মিনিট। নইলে ডানদিকে যেতে হবে। গেলেই মিলবে সাইকেল ভ্যান, রিকশ। আমার কাছে দু ব্যাগে জিনিসপত্র। ডানদিকে গিয়ে একটা রিকশ নিলাম। যাব পাল পাড়া— ওই যে গোপাল দাসের বাড়ি— ব্যস আর বলতে হল না। রিকশচালক নিয়ে এসে দাঁড় করিয়ে দিল ওদের বাড়ির গোড়ায়।

আমাকে দেখেই গোপালের মা এগিয়ে এল। বুড়ি যেন অপেক্ষা করেই ছিল। একবারেই চিনে নিয়েছে। আমার চোখ খুঁজছে নন্দাকে। কোথায় নন্দা?

আমি উঠোন পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় এসে বসি। লম্বা টানা বারান্দা। কিন্তু বেশিরভাগ জায়গায় মেঝের চলটা উঠে গেছে। কোথাও কোথাও ইট, আর ইটের ফাঁক দিয়ে সবুজ ঘাস। বারান্দায় হাতল ভাঙা একটা চেয়ার রাখা, তার পাশে নীচের দিকে ক্ষয়ে যাওয়া, একদিক বেঁকে যাওয়া মোড়া। আমি চেয়ারে বসলাম। চেয়ারটা বেশ নড়বড়ে। পাগুলো হয়তো শক্তই আছে, কিন্তু পিছনটা দেওয়ালে ঠেস দিতে হয়েছে। খুব সাবধানে বসে আছি। পড়ে গেলে বেইজ্জত হয়ে যাব। কই, নন্দা কই?

আমার সামনে মেঝের ওপর গোপালের মা বসে।

গোপালের মাকে বলি, মেসের সবাই এগুলো দিয়েছে— এটা আপনার।

বুড়ি আমার সামনে তার ব্যাগ উপুর করে ঢালে। একটা শাড়ি। চিঁড়ে মুড়ি চিনি, ডাল, ঘি, আপেল, মিষ্টি।

নন্দা এসে দাঁড়ায়। আমি দুচোখ ভরে ওকে দেখি। নন্দা! নন্দা! কত কতদিন মোবাইলের ভেতরে দেখেছি।

আমার কাছে আর একটা ব্যাগ আছে। সেটা নন্দার জন্য। বুড়িকে বিড়বিড় করে বলি— এটা গোপালের বিধবা বউয়ের।

আমার মুখ দিয়ে কথা সরে না, তবু ফিসফিস করি, তোমার এটা—। নন্দা ব্যাগ সরিয়ে রাখে। আমার চা, জল খাবারের আয়োজনে ভেতরে চলে যায়।

বুড়ি এগিয়ে এসে নন্দার ব্যাগ খোলে। ওর একটা শাড়ি, একটা বিছানার চাদর, বিস্কুট, চানাচুর, শোনপাপড়ির প্যাকেট। বুড়ি সব টেনে টেনে নিয়ে যায় নিজের ঘরে। তারপর ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।

সন্ধে নামে।

আমি আর নন্দা বারান্দায় বসে থাকি। নন্দা মুড়ি মেখেছিল। পেঁয়াজ আমতেল লঙ্কা দিয়ে। খেয়ে পেট ভরে জল খেয়েছি।

আলো নেই। হ্যারিকেন জ্বলছে। পাখির পরিত্যক্ত বাসার মতো আলোর শেড ঝুলছে। বললাম, ‘তোমাদের আলো নেই নন্দা?’

বলল, ‘বিল বাকি পড়েছিল— লাইন কেটে দিয়েছে।’

‘তাহলে?’

‘সবাই হুকিং করে জ্বালায়— আমি করিনি।’

হেমন্তর হাওয়া বড় বিষণ্ণ। উঠোন জুড়ে হাওয়া খেলে। বলি, ‘মাসি তো সেই দোর দিলেন—’

‘হ্যাঁ, প্রায় দিনই এমন করে। সন্ধে হলে ঘরে দোর দিয়ে শুয়ে পড়ে।’

‘খাবে না?’

‘একবেলা খাওয়া জোটে এই ঢের। আজ তো অনেক খাবার নিয়ে দোর দিয়েছে। আজ আর খুলবে না। সেই কাল ভোরে—’

আমার গায়ের ভেতর শিরশির করে। আমি আর নন্দা। আমি চুপ করে থাকি। গাছের আড়ালে চাঁদ। যেন মোবাইলের ভেতর আলোমাখা নন্দার মুখচ্ছবি।

বারান্দা ছেড়ে আমি এখন গোপালের ঘরে। এটা শোয়ার ঘর। আলাদা আর কোনও ঘর নেই। বুড়ি একটা ঘরে ঢুকে দোর দিয়েছে, অন্য ঘরে ঠাকুর আর ভাঁড়ার। এখন ঠাকুর আছে, ভাঁড়ার নেই। এসব কথা আমি গোপালের থেকে আগেই শুনেছি। আমি গোপালের খাটে বসি, খাটের আর এক কোণে নন্দা। বাজুতে মুখ রেখে। ঠিক আমার থেকে তিন হাত দূরে। কেউ কোনও কথা বলি না। রাত ঘনায়। বাড়ির উঠোন ঘেঁষে ছায়া ছায়া হেঁটে যায়। আমি চোখ কুঁচকে বলি, ‘কে?’ নন্দা উত্তর করে না। কেউ শিস দেয়। বলি, ‘কারা?’

নন্দা বিড় বিড় করে, ‘একা বিধবা, তাই হুক মেরে আলো জ্বালাতে আসে—।’

আমি চুপ করে থাকি। হঠাৎ আমার মনে হয়, গোপালের গলায় কে যেন গাইছে? কিশোরকুমার!

আমি আর নন্দা মুখোমুখি। ঘরে আর তো কেউ নেই?

আমাদের দুজনের মাঝে নীল আলো। মোবাইলের আলো যেমন হয়। তবে কি আমি গাইছি? কিশোরকুমার! যা! আমার গলায় সুর—

হঠাৎ নন্দা বলে— তুমি আবার নেশা করেছ?

আমি হাসি— তুমি কী করে বুঝলে?

—গন্ধ পেলাম।

—মোবাইলের ভেতর দিয়ে গন্ধ পেলে? বাব্বা কী নাক তোমার?

—বলব, তোমার মাকে, তোমার ছেলে মদ গিলছে।

—না, না, মাকে বলো না। বুড়ি কাঁদবে, মাথা কুটে মরবে।

—বুড়ি নেই। ঘরে ঢুকে দোর দিয়েছে।

—বুড়ি নেই। অ্যাই একটু কাছে এসো।

—মোবাইলের ভেতর দিয়ে কাছে যাওয়া যায়।

—যায়, যায়, যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে সব যায়।

—তোমার মেসের ঘরে কেউ নেই?

—কেউ নেই। এসো। কতদিন তোমাকে দেখিনি।

নন্দা আর আমি, আমি আর নন্দা চাঁদের আলোর ভেতর মাখামাখি। দুজনে থরথর কাঁপি। ভূতগ্রস্থ চাঁদ হুমড়ি খেয়ে পড়েছে চালতা গাছের মাথায়। আলোছায়ার ভেতর গোপাল নামে। গোপাল দাস—

আমি নেই। আমি কোথাও নেই। আমি কী মেস ছেড়ে আসতে আসতে, ট্রেন যাত্রার ভেতর, রিকশায় দুলতে দুলতে একটু একটু করে বদলে গেছি? আর এই রাতে হেমন্তের হাওয়া রাতের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছি?

আমি নেই। আমি জগৎপতি আলো যেন নিভে যাচ্ছি। আমার গা হাত পা হিম হয়ে আসে। নিজেকে ঠেলে তোলার চেষ্টা করি। বলি, সেই জোকসটা মনে আছে— হুকিং করে আলো জ্বালাও নন্দা।

নন্দা আমায় জড়িয়ে ধরে বলে— তুমি গোপাল। আমি হুকিং করে আলো জ্বালাব না। তুমি গোপাল। এই তো বাপ হওনি, তাই তো তোমার কত দুঃখ, তাই তো তুমি মদ গিলেছ—।

আমি চিৎকার করে বলার চেষ্টা করি— আমি জগৎপতি আলো।

কিন্তু কে শোনে আমার কথা। নন্দা আমাকে ঘিরে ধরে ফুঃ দিয়ে আলো নিভিয়ে দেয়। তারপর, ফিসফিস করে, তুমি জগৎপতি আলো হলে— আমাকে হাসাতে পারতে। তুমি আমাকে হাসাও দেখি— হাসাও।

আমি বলি, এই দেখো আমি হোন্ডা মাসি, আমি মেসের ম্যানেজারবাবু!

আমি সারারাত ধরে নন্দাকে হাসানোর চেষ্টা করি। নন্দা হাসে না। ওর চোখের কোণে কালি। শেষে আমি মোক্ষম অস্ত্র ছাড়ি। বলি, এই দেখো আমি জগৎপতি আলো আমি এখন গোপাল হচ্ছি! আমি তোমাকে গোপাল সেজে হাসব!

তারপর থেকে আমি গোপালকে নকল করি।

আমি— গোপালের মতো চোখ বড় করে কথা বলি। গোপালের মতো নাক ডাকি। গোপালের মতো বিছানার ওপর গড়াগড়ি খাই—

আমি জগৎপতি আলো ক্রমশ নিভে যাচ্ছি, নিভে যেতে যেতে গোপাল হচ্ছি। গোপাল যা যা করত, গোপাল যা যা করে। সব করছি, সব। আমি জগৎপতি আলো আগে তো নন্দাকে মোবাইলের ভিডিও কলে কত বার গোপাল হয়ে দেখিয়েছি। এখন কেন পারব না নন্দাকে হাসতে? নন্দা হাসলেই— আমি তাই ক্রমশ...আমার গোপালের মতো হাত, গোপালের মতো পেট, ঢলঢলে মুখ, গোল গোল চোখ...।

##

আমি সোমবার ট্রেন ধরে জগৎপতি আলো হয়ে কলকাতা ছুটি। শনিবার ট্রেন থেকে নামি গোপাল হয়ে। ঘরে বুড়ি মা। আলো জ্বলে ঘরে। এখন আমার নামে আসা বিদ্যুতের বিল দেখি। স্পষ্ট লেখা আছে— গোপাল দাস। বিদ্যুতের বিল ভরব গো বিদ্যুৎ কোম্পানি। আমি গোপাল দাস আর নন্দা আমার বিধবা বউ।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

6 মন্তব্যসমূহ

  1. খুব ভালো লাগলো । লেখকের মুন্সিয়ানায় গল্পটিতে অন্য মাত্রা যোগ হয়েছে ।

    উত্তরমুছুন
  2. পড়ার পর অনুরণন রয়ে গেল। একরাশ মুগ্ধতা।

    উত্তরমুছুন
  3. কতবার যে পড়তে হবে গল্পখানা জানিনে। হয়তো একেকবার এক একেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে...

    উত্তরমুছুন
  4. দুরন্ত গতির সাহসী লেখা

    উত্তরমুছুন