মোরশেদ শফিউল হাসানের গল্প : জগদীশ মাস্টার এখন কী করবেন




সুবোধ ডাক্তারের ডিসপেন্সারি থেকে ফেরার পথে কাল রাতে হাঁটুর বয়েসি কয়েকটা ছেলে যখন তাঁকে কড়কে দিল তারপর থেকেই তিনি আসলে বিষয়টা নিয়ে ভাবছেন। আর বোধহয় পারা গেল না! তাঁর ভেতরের প্রতিরোধটা যেন ভেঙে পড়ছে। অথচ এতদিন ব্যাপারটা নিয়ে পাড়াপড়শি, আত্মীয়পরিজনের সঙ্গে কত তর্কই না তিনি করেছেন! সে-সবই কি তবে ভুল ছিল, কুতর্ক ? নাকি আড়ালে ছেলে-বউরাও যে বলে, তিনি শুনেছেন দু’একবার, ‘বাবার বাস্তবুদ্ধি নেই’, সে কথাটাই ঠিক?

কিন্তু এ-দেশটা তো তাঁর নিজের দেশ, নাকি? তিনি জন্মেছেন এখানে, এখানে তাঁর বাপ-ঠাকুর্দাদের দেহভস্ম মিশে আছে। কেউ তো দয়া করে তাঁকে এখানে থাকতে দেয়নি। কিংবা কোথাও থেকে উড়ে এসেও তিনি জুড়ে বসেননি। অন্যদের কথা জানেন না; তবে তিনি নিজে তো কখনো, কোনোদিন, এক মুহূর্তের জন্যও অপর কোনো দেশকে তাঁর দেশ বলে ভাবতে পারেননি। আজ না হয় বৃদ্ধ, অথর্ব হয়ে পড়েছেন। কিন্তু জীবনের এতগুলো বছর যে শিক্ষকতা করলেন, শত শত ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শেখালেন, সে তো এক রকম দেশেরই কাজ! একাত্তরে, অন্য অনেকের মতো, তিনিও দেশ ছেড়েছিলেন। প্রথমে ক্যাম্পে কিছুদিন, তারপর নৈহাটিতে মেজ শ্যালকের বাড়িতে পরিবার নিয়ে কত কষ্টে তাঁর দিন কেটেছে! তখনও কি এক মুহূর্তের জন্য কোনোদিন দেশকে ভুলে থাকতে পেরেছেন? এই ভিটেবাড়ি, উঠোনের তুলসী গাছটা, স্কুল, সহকর্মী, পাড়াপড়শিদের কথা? রেডিওতে রোজ যুদ্ধের খবর শুনেছেন আর দিন গুনেছেন কবে দেশ স্বাধীন হবে, আবার সবাই দেশে ফিরে যাবেন। ডিসেম্বরের ষোলই দেশ স্বাধীন হল, জানুয়ারির গোড়ায় তাঁরা ফিরে এলেন। শালা-শালাবউদের অনেক অনুরোধ-উপরোধেও দুটো দিন অপেক্ষা করতে রাজি হননি। কি জানি, ঘরবাড়ির কী অবস্থা! তা ছাড়া স্কুল রয়েছে -- তিনি হেডমাস্টার -- এ সময় তাঁর না ফিরলে চলে? আজ সেই দেশ তাঁকে ছেড়ে যেতে হবে? কেন, কেন? জগদীশ মাস্টার কিছুতেই ভেবে পান না। সমস্যা-বিপদ-আপদ কার নেই? এই যে প্রতিদিন যত খুন-অপহরণ-ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে সব কি শুধু বেছে বেছে একটা সম্প্রদায়ের মানুষের ওপরেই হচ্ছে? নাকি কেবল এ-দেশেই হচ্ছে? ওপারে হয়নি? না হলে পার্টিশনের সময় যারা থেকে গেল তাদেরকে কেন পরে চলে আসতে হয়? কোন্ সুখের আশায়? তাদেরও কি ভিটেমাটি, প্রিয়-পরিচিতজনদের ছেড়ে আসতে একই রকম কষ্ট লাগেনি? নেতারা যাঁরা ম্যাপে দাগ টেনে মনে করেছিলেন সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করে ফেললেন, তাঁরা কি এই মানবিক দিকগুলো নিয়ে একবারও ভেবেছিলেন? তা ছাড়া দেশত্যাগ কি কোনো সমাধান? জগদীশ ভাবেন। ভেবে ভেবে কোনো কুলকিনারা পান না তিনি।

কিছুক্ষণ আগে বেশ এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখনও আকাশে মেঘ কালো করে আছে, তবে বৃষ্টি নেই। তবু জগদীশ ছাতা ফুটিয়েই, মাথায় ধরে চলছিলেন। হাতে তাঁর পুরনো দু-ব্যাটারির টর্চটা। একেই আজকাল রাতে ভালো দেখেন না, চশমার পাওয়ারও মনে হয় বদলানো দরকার, অনেকদিন চোখ দেখানো হয় না। বৃষ্টিতে রাস্তা পিছল হয়ে আছে। একটু এদিক ওদিক হলেই পা হড়কানোর সম্ভাবনা। খুব সাবধানে, পা টিপে টিপে, তিনি এগোচ্ছিলেন। বড় রাস্তা থেকে নেমে কসিমুদ্দির পাটক্ষেতের আল ধরে খানিকটা এগিয়েছেন, তখনই সড়সড়, ধুপধাপ শব্দ; বুঝে উঠতে না উঠতেই পাশ থেকে একটা ধাক্কা, হাত থেকে টর্চটা কোথায় ছিটকে পড়ল, তিনি উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন। সেই সময়ই ঘাড়ের কাছে বাড়িটা লাগল। ভাগ্যিস তিনি হাত দিয়ে মাথাটা চেপে ধরেছিলেন। না হলে লাঠিটা হয়তো মাথায়ই পড়ত। ওরা কি তাঁকে খুন করতে চেয়েছিল? নাকি শুধু ভয় পাইয়ে দেওয়ার জন্যই ওরা এটা করল? সমস্ত ব্যাপারটাই ঘটল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। যাওয়ার সময় কী সব বলে যেন ওরা তাঁকে শাসিয়ে গেল, কিছুই মনে নেই বা শুনতে পাননি। শুধু বারবার শোনা একটা কথাই মনে আছে, ‘শ্লা, মালাউনের বাচ্চা ¬--’

মাস দুই আগে দক্ষিণ পাড়ার সাধন কবিরাজের মেয়েটাকে স্কুল থেকে ফেরার পথে কারা যেন তুলে নিয়ে যায়। সাধনের ধারণা, তা ছাড়া কেউ কেউ নাকি দেখেছেও, হাশেম চেয়ারম্যানের বখাটে ছেলেটা তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে কাজটা করেছে। স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রায়ই নাকি ওরা মেয়েটাকে বিরক্ত করত। তো সাধন এসে তাঁর পায়ের ওপর আছড়ে পড়াতে ওকে নিয়ে তিনি কয়েকদিন চেয়ারম্যান বাড়ি আর থানা-পুলিশ দৌড়াদৌড়ি করেছেন। চেয়ারম্যান লোকটাও সুবিধার নয়, তিনি শুনেছেন। আগে থেকে তাঁর সঙ্গে চেনা-পরিচয়ও ছিল না। তবে চেয়ারম্যানের ছোটভাই আলফাজ তাঁকে খুব মান্যগণ্য করে, এক সময় স্কুলে তাঁর ছাত্র ছিল। এখন বিএ পাশ করে জেলা শিক্ষা অফিসে চাকরি পেয়েছে। বাড়ি থেকেই রোজ যাওয়া-আসা করে। তা সেই আলফাজের সূত্র ধরেই তিনি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করলেন। আলফাজের কারণেই কিনা জানেন না, চেয়ারম্যান তাঁকে দু’বারই খুব খাতির করে বসিয়েছেন। চা-নাশতা খাইয়ে তাঁর কথা শুনেছেন। তারপর ‘খোঁজখবর লাগাইছি মাস্টার বাবু, দেখি কী করা যায়।’ আশ্বাস দিয়ে বিদায় করেছেন। সাধনকে তিনি আগেই শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, চেয়ারম্যানের ছেলের কথা যাতে সরাসরি না তোলে। তবু একবার সেদিকে ইঙ্গিত করতেই চেয়ারম্যান তেতে উঠলেন, “সব ফালতু কথা! আমার বিরুদ্ধপক্ষ এসব রটাইতেছে। কেউ প্রমাণ করতে পারব? হ, পোলাডা আমার বরাবরই এট্টু ডানপিট্টা। একডা পোলা, ছোটবেলা থনে মায়ের বেশি আদর পাইছে। লেখাপড়াও বেশি শিখল না। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক মারপিট করে, খবর পাই। আমি শাসনও করি। করি না তা না। তয় মা-মরা পোলা তো, বেশি কিছু কইতে পারি না। তাই বইলা গেরস্থবাড়ির মাইয়া লইয়া কেলেঙ্কারি! তেমন হইলে আমি ছাইড়া দিমু? নিজের পোলা হইছে তো কী হইছে! কাইট্টা গাঙে ভাসাইয়া দিমু না! চিন্তা কইরেন না মাস্টার সাব, বাড়ি যান। আমার দিক থনে চেষ্টার ত্র“টি হইব না।” কিন্তু ওই পর্যন্তই। মেয়েটার খোঁজ আর পাওয়া যায়নি। বরঞ্চ উল্টে কারা নাকি সাধনকে বাড়িতে এসে শাসিয়ে গেছে, ব্যাপারটা নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করতে। ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করার ভয় দেখিয়েছে।

সাধনকে নিয়ে তিনি থানায়ও গিয়েছিলেন ডায়রি করতে। সবকথা শুনে দারোগা বললেন, “মেয়ে আপনাগো প্রেম-ট্রেম কইরা কারো লগে ভাগে নাই তো, আপনেরা শিওর? কারে সন্দেহ করেন? এমনি এমনি তো ডায়রি লেখা যাইব না। আর আপনাগেরোও কই, বউ-মাইয়াগো একটু সামলে-সুমলে রাখতে পারেন না! বোঝেনই তো, জোয়ান বয়সের পোলাপানরা একটু বেয়ারা-বেচাল হয়ই। তারপর আবার আপনাগো মাইয়ারা যেমন ফ্রি চলাফেরা করে --।” বুঝলেন কোনো কাজ হবে না। শুধু শুধু বয়ে এসে কতগুলো আজেবাজে, অপমানজনক কথা শুনতে হল।

গত রাতের ঘটনাটা সাধন কবিরাজের মেয়ের ব্যাপার নিয়ে তাঁর সে ‘বাড়াবাড়ি’ তৎপরতার প্রতিক্রিয়া নয় তো? এভাবেই কি ওরা তাঁকে সমঝে দিল?

তিনি তো ব্যাপারটা পুরোপুরি চেপে যেতেই চেয়েছিলেন। বাড়িতে এসেও কাউকে কিছু বলেননি। সোজা কুয়োপাড়ে গিয়ে হাত-পা ধুয়ে তারপর চুপচাপ ঘরে এসে ঢুকলেন। তা ছাড়া জখমটখম তো কিছু হয়নি, বলার কী আছে? শুধু ডান হাতের কনুইয়ের কাছটা একটু ছড়ে মতো গেছে, জ্বলছে। আর ঘাড়ের পেছনটা ব্যথা-ব্যথা করছে। মিনতি, নিতাইয়ের বউ, খাবারের জন্য ডাকতে তিনি শরীর ভালো নেই, খেতে ইচ্ছে করছে না, বলে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তারপরও পীড়াপীড়ি করাতে শুধু বললেন, “খাবারটা ঢাইকা রাখো। খিদা পাইলে পরে খামুনে।” আগেও এমনটা হয়েছে, তাই মিনতি আর কথা বাড়ায় না। কিন্তু বুড়ো হাড় সইবে কেন? রাতে ঘাড়ের, সেই সঙ্গে কোমরের পুরনো ব্যথাটা অসহ্য হয়ে ওঠাতে নিতাইকে না ডেকে পারেননি। তারপর সেঁক, তেল মালিশ, নিতাই-মিনতির রাত-জাগা।

তারপরও নিতাই ও তার বউয়ের কাছ থেকে তিনি কিন্তু আসল ঘটনাটা গোপন করে গেছেন। আর বলবেনই বা কী, ব্যাপারটার মধ্যে একটা লজ্জার দিকও তো আছে! শুধু বলেছেন, অন্ধকারে কাদায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলেন, তাতেই --। সবাই তাহলে জানল কী করে? নাকি ওরা কাণ্ডটা করে তারপর নিজেরাই খবরটা লোকের কানে তুলে দিয়েছে? নিজেদের দাপট বোঝাতে, সেই সঙ্গে লোকজনকে ভয় খাওয়াতে।

সকাল বেলায়ই ও পাড়ার চিন্তাহরণ এসে হাজির। সাধন কবিরাজের মেয়ের ঘটনাটার পর ও তার বিয়ের বয়েসি মেয়ে দুটোকে কলকাতায় ছোট ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে। ওখানে নাকি বড় মেয়েটার বিয়েও ঠিক হয়েছে।

“কী শুনছি, মাস্টার বাবু! কন তো, কেমনে কী হইল? কাউরে চিনতে পারছেন? আপনার মতো এমন একজন সম্মানী লোকের ওপর হাত তুলছে, এরপর কন, কেমনে মান-সম্মান নিয়া এখানে থাকি? জখম কি খুব বেশি? ডাক্তার বাবুরে খবর দিছেন?”

একটু বেলা হতে এদিক ওদিক থেকে আরও অনেকে এল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি দেখতে পাচ্ছেন, বউ-ঝিরাও কেউ কেউ উঁকি মারছে, নিতাইয়ের বউয়ের কাছে খোঁজখবর নিচ্ছে। নানাজন নানা কথা বলছে, তিনি কিছুই বলছেন না। কড়িকাঠের দিকে চোখ রেখে চুপচাপ শুয়ে আছেন।

বোধহয় সজীব, ঈশান পালের মেজ ছেলেটা, ফিসফিস করে কিন্তু তাঁকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলছে, তিনি শুনতে পাচ্ছেন :

“এরপরও মাস্টার জ্যেঠা কন, মাটি কামড়াইয়া পইড়া থাকতে, কি না সাত-পুরুষের ভিটা! এখন হইলটা কী?”

জগদীশ আর ধৈর্য রাখতে পারেন না। হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন --

“বেহানবেলা তোমাগো কি কাম-কাইজ কিছু নাই? কে তোমাগো খবর দিছে এখানে আইতে? সেই তখন থাইকা বকবক করতাছো! তোমাগো এখানে থাকতে মন না চায়, যাও গিয়া। কে তোমাগো আটকাইয়া রাখছে? নিজের পোলামাইয়ারাই থাকল না --”

মেয়ে-জামাইরা আগেই চলে গেছে। সে ব্যাপারে তাঁর কিছু করার ছিল না। জামাইয়ের এক দাদা কবেই, সেই ‘৬৪-এর দাঙ্গার পর, এখান থেকে সবকিছু বেচেটেচে ওপারে চলে গেছে। ওখানে, বারাসাতে, জমি-কাপড়ের দোকান নিয়ে তার নাকি বেশ বাড়বাড়ন্ত অবস্থা। কিন্তু জগদীশ মাস্টারের বুকের মধ্যে বড় একটা ধস নামল যেদিন বড় ছেলে এসে দুম করে তার সিদ্ধান্তটা জানাল, “বাবা, তোমারে বুঝানোর চেষ্টা করুম সে ক্ষমতা আমার নাই। তোমার আদর্শ-দেশপ্রেম এ সবেরও আমি শ্রদ্ধা করি। আমার মধ্যে ভালো যদি কিছু থাকে সে তো তোমার কাছ থেকেই পাইছি। নিজেও তো এতকাল প্রগ্রেসিভ পলিটিক্স কইরা কাটাইলাম। এভাবে চোরের মতন পালানোর মধ্যে যে লজ্জা-আপমান আছে, তা-ই বা অস্বীকার করি কেমনে? হ, ভাবতে গেলে খুব খারাপ লাগে। কিন্তু কী করুম, কও? একা মানুষ তো না! বউ-পোলা-মাইয়া লইয়া সংসার করি। ওগো কথাও ভাবতে হয়। পোলা-মাইয়াগো ভবিষ্যৎ আছে। ওদিকে দিদি-জামাই বাবুরা একটা বন্দোবস্ত কইরা বারবার চিঠি দিতাছে। এতদিন তো তা-না-না, দেখি-দেখছি কইরা কাটাইয়া দিলাম। কিন্তু হালচাল যা দেখতাছি, ভরসা পাইতাছি না। এরপর, ভগবান না করে, যদি খারাপ কিছু ঘইটা যায়, তখন দিদি-জামাই বাবুরা তো আমাগোই দুষবো, না কি? -- ‘তখন এত কইরা কইলাম --।’ নিজেরই বা কেমনে বুঝ দিমু? তা ছাড়া তোমগো বউমা, তারেই বা কী কমু? মেয়ে ডাঙর হইছে না? বাপ-মায় চিন্তা না কইরা পারে, তুমি কও? তুমি এখনই যাইতে না চাও, তোমারে জোর করুম না। নেতাই আর অর বউ তো আছে। অরা এ বাড়িত আইসা থাকব, তোমার দেখাশুনা করব। অগো ভালো মতন বুঝাইয়া কইয়া দিছি। তেমন কেউ জানে নাই। আমরা মঙ্গলবার মেলা করুম। তুমি রাগ কইরো না বাবা, মন খারাপ কইরো না। জানি, এখন ওখানে গিয়া মানাইয়া লইতে আমাগো সবারই কষ্ট হইব। কিন্তু কী করুম? এখানেও কী ভালো আছি, কও? সব সময় একটা আতঙ্কের মধ্যে। বিশ্বাস করবা বাবা, ছোটবেলা থনে যাদের সঙ্গে লেখাপড়া, একলগে খেলাধুলা করছি; যাদের লগে একত্রে রাজনীতি করলাম, তাদেরও কাউরে কাউরে মাঝে মাঝে খুব অচেনা মনে লয়। আসলে, আমাগো পরিস্থিতিটা আমাগো জায়গায় না দাঁড়াইয়া তো ঠিক বোঝন যাইব না, কেউ বুঝেও না! বাবরি মসজিদের ঘটনার সময় দেখলা না! আমাগো সাবধানে ঘরে বইসা থাকতে কইয়া নেতারা গায়ে হাওয়া লাগাইয়া ঘুইরা বেড়ায়। এ ছাড়া তাগো যেন আর কিছু করার নাই। একজন তো থিওরি কপচাইল, যতদিন সমাজের পরিবর্তন না হয়, সাম্প্রদায়িকতার উচ্ছেদ হইব না, শাসকশ্রেণী তাগো নিজেগো স্বার্থে বারবার সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করব। কথাটা হয়তো সত্য। কিন্তু ওগো তো ভয়ের মধ্যে, আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় না! না, তোমগো বউমা আর একটা দিনও থাকতে চায় না। কদ্দিন আর ওর লগে লড়মু, কিসের জোরেই বা লড়মু? অনুমতি দাও, বাবা।”

অনুমতির অপেক্ষা তো ছিল না। সবকিছু পাকা করেই ভবেশ তাঁকে বলতে এসেছে। জবাবে তিনি শুধু মাথা নেড়েছিলেন। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসেছিল তাঁর বুক থেকে। চেষ্টা করেও ভবেশের কাছ থেকে তিনি তা গোপন করতে পারেননি। বাকি খবরটুকুও দিয়ে ভবেশ বলেছিল, “বাড়িভিটা আর খালপাড়ের জমিটা রইল। আগের মতন আমাগো নূরু মিয়াই চাষ দিব। পুরান লোক, বিশ্বাসী। আশা করি তোমার অসুবিধা হইব না। তা ছাড়া নেতাই তো রইলই। সে সব দেইখা-বুইঝা লইব। বাজারের দোকানটা শওকত রাখছে। আর উত্তর পাড়ার জমিগুলান আজিজ চাচা। ভালো দাম পাই নাই। তবু ছাইড়া দিছি। পরে হয়তো এ-ও পাওয়া যাইত না। তা ছাড়া কাজটা তো গোপনে সারতে হইছে। সবারে জানান দিয়া তো বেচাকেনা করা যায় নাই। গুনাগারি কিছু দিতে হইবই। যারা কিনছে তারাও পরিচিত লোক। শওকত তো আমার বন্ধুই, এক পার্টি করছি। বেশি দরদাম করা যায় না। তুমি ভাইবা দেখ : ইচ্ছা হইলে বা শরীরটরীর খারাপ করলে আমারে খবর দিও। আমি নিজে আইসা বা লোক পাঠাইয়া তোমারে নিয়া যামু। তা ছাড়া নাতি-নাতনিদের দেখতেও তো যাওন দরকার। দিদি বন্দনার লাইগা পাত্র দেখতাছে। বিবাহ ঠিক হইলে তোমারে খবর দিমু। তুমি আশীর্বাদ করতে যাইবা না? বরুণটা তো তোমার খুব নেওটা। তোমারে ছাইড়া গিয়া অরা কেমনে থাকব বুঝতে পারতাছি না। এখনই তো বরুণ জিদ ধরছে তোমারে না নিয়া যাইব না। এখানে তোমার লগেই থাকব। আমারে কিছু কয় নাই, হের মা কইল। বন্দনাও নাকি লুকাইয়া-লুকাইয়া কাঁদে।”

প্রতিমা, ছেলে-বউ, অবশ্য কিছু বলেনি। যাবার দিন শুধু আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে তাঁকে প্রণাম করতে এসে বলল, “আশীর্বাদ করবেন বাবা, ছেলেমেয়েদের নিয়ে যেন বাকি দিনগুলা নিরাপদে কাটাইয়া দিতে পারি। ওদেরকে মানুষ করতে পারি। মেয়েটারে ভালোভাবে পাত্রস্থ করতে পারি। শরীরের যত্ন নিবেন। সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরা আসবেন। আজকাল তো চোখেও ভালো দেখেন না। মিনতি রইল, আপনারে দেখব।”

সত্যিই তো, বাবরি মসজিদের ঘটনার পর সবাই কদিন এমনভাবে তাঁর দিকে তাকাত মনে হত যেন এ ব্যাপারে তাঁরও কিছু বলার থাকতে পারে। নাকি এটা তাঁর বোঝার ভুল, মাইনরিটি কমপ্লেক্স? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেন তিনি। কিন্তু সেবারের সেই ব্যাপারটা! পঁয়ষট্টি সালের যুদ্ধের সময়টার কথা মনে পড়ে। যুদ্ধ শুরুর কদিন পর স্কুলে বিরাট করে ছাত্র-শিক্ষকদের সভা ডাকা হল। উদ্দেশ্য ভারতীয় হামলার প্রতিবাদ আর ছাত্রছাত্রীদের দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। তখন তাঁর বয়স অল্প, উৎসাহ-উদ্দীপনায় মন ভরপুর। স্কুলের যে-কোনো সভা-অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে তাঁকেই মূল দায়িত্ব পালন করতে হয়। হেডমাস্টার জলিল সাহেব এসব ব্যাপারে তাঁর ওপর অনেকখানিই নির্ভর করেন। তা সে বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, রবীন্দ্র-নজরুল-জয়ন্তী, যা-ই হোক। সেদিনকার সভায় শিক্ষকদের অনেকেই বক্তৃতা করলেন, পাকিস্তানের পাকভূমির ওপর কাফের-পৌত্তলিকদের হামলার নিন্দা ক’রে, ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুস্তানের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার সংকল্প ঘোষণা ক’রে। তিনিও মনে মনে একটা বক্তৃতা তৈরি করে রেখেছিলেন, নজরুলের কবিতা থেকে কোটেশন দিয়ে। কিন্তু সভা শেষ হয়ে গেল, তাঁকে আর ডাকা হল না। সভা শেষে রুমে ফেরার পথে জলিল সাহেব হাসতে হাসতেই তাঁকে বললেন, “জগদীশ বাবু, আপনারে বাঁচাইয়া দিছি। কী, ভালো করি নাই? হাজার হইলেও নিজেগো বিরুদ্ধে কথা বলা --।” সেদিন একবালপুর মডেল হাই স্কুলের এসিসটেন্ট হেডমাস্টার জগদীশচন্দ্র ঘোষ এক নতুন জ্ঞান লাভ করলেন, তিনি হিন্দু আর হিন্দু মানেই ভারত, হিন্দুস্তান! দুদিন পরই যখন বরদা উকিল আর ক্ষিতি বাবুকে পুলিশ কোনো কারণ ছাড়া এমনি এমনি ধরে নিয়ে গেল, তখন তাঁর কাছে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হল। কিন্তু সেদিন দেশটা তো ছিল পাকিস্তান, আজ কি অবস্থা বদলায়নি? না কি দেশই বদলেছে, মানুষ বদলায়নি? মানুষ বদলায় না?

বেলা বাড়তেই মাইনুদ্দিন মাস্টার এল, সঙ্গে কবির মেম্বার :

“কামটা কেমন হইল? মাস্টার বাবুর মতন একজন মানুষ, তারে কিনা -- ভাবা যায়? পোলাপানগুলাও যা হইছে, কেউরে মান্যগণ্য নাই।”

“আরে হিন্দু হইছে তো কী? হিন্দুরা কি মানুষ না? তারা এদেশের লোক না? জানস, তোগো বাপ-ভাইদের এই মাস্টার বাবু পড়াইছে?”

“এদিক ওদিক দাঙ্গা-রায়ট হইছে, শুনছি। কিন্তু আমাগো এলাকায় হিন্দু-মুসলমানে তো এতকাল শান্তিতেই আছিলাম। এতদিন পর কী যে হইল --!”

আবার সেই হিন্দু-মুসলমান! কিছুক্ষণ পর জগদীশ আবিষ্কার করলেন, আশপাশের কোনো কথাই আর তাঁর কানে ঢুকছে না। তিনি যেন একটা ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছেন।



লেখক পরিচিতি
মোরশেদ শফিউল হাসান 
চট্টগ্রামে জন্ম: ২১ মার্চ ১৯৫৩।  বাংলাদেশের একজন প্রাবন্ধিক, গবেষক, সমালোচক ও কবি। প্রবন্ধ ও গবেষণায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। 
প্রকাশিত বই
  • অবাক নাম ভিয়েতনাম, ৪র্থ সংস্করণ, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা (২০০০)
  • ইসলাম ও মৌলবাদ, প্রকাশক : প্রতিপক্ষ, ঢাকা (১৯৮৯)
  • ধর্ম ও ধর্মের রাজনীতি, প্রকাশক : প্যাপিরাস, ঢাকা (১৯৯৬)
  • পাকিস্তানবাদের বিরুদ্ধে, প্রকাশক : আজিম এণ্ড ব্রাদার্স, ঢাকা (১৯৯০)
  • সময়ের মুখোমুখি, প্রকাশক : পাঠক সমাবেশ, ঢাকা (১৯৯৪)
  • পাউডার পাঁচালি, প্রকাশক : সালমার, ঢাকা (১৯৯৭)
  • রাজনীতিহীনতার রাজনীতি, প্রকাশক : উত্তরণ, ঢাকা (২০০১)
  • ছফা ভাই: আমার দেখা আমার চেনা : মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা (২০০২)
  • বিশ্বায়নের কবলে বাংলা, প্রকাশক : অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা (২০০৮)
  • আমাজন অরণ্যের বীর, প্রকাশক : সুবর্ণ, ঢাকা (২০০৮)
  • স্রোতের বাইরে, প্রকাশক : শোভা প্রকাশ, ঢাকা (২০১১) [৮]
  • পূর্ব বাঙলার চিন্তাচর্চা (১৯৪৭-১৯৭০): দ্বন্দ্ব ও প্রতিক্রিয়া, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা (২০১২)
  • স্বাধীনতার পটভূমি : ১৯৬০ দশক, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা (২০১৪)
  • একাত্তর, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা
  • বেগম রোকেয়া: সময় ও সাহিত্য, (২য় সং) মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা (১৯৯৬)
  • অবাক নাম ভিয়েতনাম, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা
  • রবীন্দ্রনাথ : অন্য আলোয়, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা
  • বদ্ধিমুক্তির দায় ও দায়িত্ব, ২য় সং, অনুপম প্রকাশনী, ঢাকা, (২০১৩)
  • হীনন্মন্যতার বিপক্ষে, মওলা ব্রাদার্স, ঢাকা (২০১১)
  • ছোটদের গ্যালিলিও, কথা প্রকাশন, ঢাকা, ৩য় সং (২০১৬)
  • বুলবুল চৌধুরী, তাঁর শিল্প অভিযান, অক্ষর প্রকাশনী, ঢাকা (২০১৩)
সম্পাদনা
  • আহমদ ছফা স্মারকগ্রন্থ, প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা (২০০৩)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ