দীপক দাসের গল্প : ভৈরবথানের ভক্তা



গাছের ডালটা ঝপাৎ করে লাগল বাবলার কপালে। ভিডিও করছিল বাবলা। দু’হাতে ধরা মোবাইল। চোখ মোবাইলের স্ক্রিনে। সামনে ঝুলে থাকা বিপদটাকে ঠিক খেয়াল করতে পারেনি। ঝাপটা লাগার পরে এক হাতে মোবাইল ধরে ‘উহু আহা’ করতে শুরু করল।

আমরা জঙ্গল সাফারি করছি। জঙ্গল সাফারি শুনলে হেব্বি কিছু বলে মনে হয়। সেসব কিছুই নয়। নেহাতই গরিবের সফর। বাহন বলতে একটা ছোট ম্যাটাডর। টিভির বিজ্ঞাপনের কল্যাণে যার নাম হয়েছে ছোটা হাতি। এটাই আমাদের জঙ্গল সাফারির হুড খোলা জিপ। আমরা নাম দিয়েছি, গরিব রথ। লোকে ঘুরতে গিয়ে ম্যাটাডর ভাড়া করে না। আমরাও প্রথমে করতে চাইনি। কিন্তু প্রায় উপায়হীন ছিলাম। বেলপাহাড়ির ইন্দিরা গান্ধী চকে কোনও গাড়ি মিলছিল না। দুর্গাপুজোর অষ্টমী আজ। বেশির ভাগ গাড়ি ভাড়ায় চলে গিয়েছে। একটা মিলেছিল। কিন্তু সেটা রয়েছে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বালিচুয়া নামে একটা জায়গায়। সেখানে চারজনের যেতে একটা খরচ আছে। তার ওপর ওই গাড়ি ভাড়াও বেশি বলছে। তখনই মিলেছিল ম্যাটাডরটি। সব সময় পরিপাটি থাকা ইন্দ্র একটু নিমরাজি ছিল বটে। আমরা পাত্তা দিইনি। ওকে কেবিনে ঠেসে দিয়ে চড়ে বসেছিলাম ছোটা হাতির পিঠে।

এ তো গেল বাহন। আমাদের জঙ্গলটাও তেমন অভিজাত নয়। দেশের যে সব জঙ্গলে হাতির পিঠে, হুড খোলা জিপে সাফারি করা যায় তার ধারে কাছে তো নয়ই। এমনকি আমঝর্না ঝাড়গ্রামের পর্যটন মানচিত্রেও তেমন জায়গা করে উঠতে পারেনি। লোকজন এদিকে তেমন আসেন না। তাঁদের গাড়ির গন্তব্য ওই কাঁকড়াঝোর পর্যন্ত। এটাও ঠিক, আমরা বিখ্যাত স্পষ্টে তেমন যাই না। আমঝর্নাকে খুঁজে পেয়েছিলাম ফেসবুক থেকে। কোনও এক মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের কভার পিকচার ভেসে এসেছিল আমার ওয়ালে। দূরে পাহাড়। কাছে একটা জলাশয়। জলে লাল রঙের শালুক ফুটেছে। আর পাহাড়েরও ছায়া পড়েছে সেই জলে। সঙ্গে সঙ্গে কভারওয়ালাকে ইনবক্স।বিস্তারিত খোঁজখবর। তার পর দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়া। ফেসবুক ফ্রেন্ডের ছবির জল-পাহাড়-ফুল দেখা হয়ে গিয়েছে। সে সব পিছনে ফেলে এসে থেমেছিলাম এক জঙ্গলের সামনে।তারপর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব কাটিয়ে গাড়ি নিয়ে জঙ্গলে।

বাবলা তখন ডালের ঘা সামলে নিয়েছে। আমরাও মজা করতে শুরু করেছি আবার। আমি ওকে ছদ্ম শাসানি দিলাম, ‘‘ভিডিও থেকে যেন জঙ্গলের একটি অংশও বাদ না পড়ে। আর ডালের ঝাপটায় তুইও যেন গাড়ি থেকে ছিটকে না পড়িস! তাহলে কিন্তু তোকে রেখে পালাব। তোকে বাঘে ধরে নিয়ে গিয়ে পুষবে। তুই হবি, ঝাড়গ্রামের শেরলি।’’ দীপু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘‘শেরলিটা কী?’’ আমি বলি, ‘‘শের খানের পোষ্য শেরলি। মোংগলির মতো।’’ ওরা হো হো করে হেসে ওঠে।

হাসি, মজা, ডালের চোট পেরিয়ে আমরা তখন জঙ্গলের প্রায় দু’কিলোমিটার ভিতরে। সরু কাঁচা, বৃষ্টিতে ধোয়া, ভাঙা পথ। গাড়ি ঘরঘর করতে করতে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। এই জঙ্গলে কে কী করতে চায়, তা নিয়ে সমস্ত রকম আলোচনা শেষ। দীপুর ইচ্ছে, তাঁবু খাটিয়ে অস্থায়ী শিবির করবে। প্রতি বছর বর্ষার পরে। নতুন নতুন চারা বেরোয় তখন। ও নানা প্রজাতির গাছ খুঁজবে। তথ্য বন্দি করবে ডায়েরিতে। বটানির গবেষক কিনা। বাবলার ইচ্ছে, জঙ্গল আর পাহাড়ের মাঝে ঝোরা খুঁজে নিয়ে ও মাছের চারা ছাড়বে। আর সারাদিন ছিপ ফেলে মাছ ধরবে। কেবিনের আরামে বসে থাকা ইন্দ্রকেও ইচ্ছের কথা জিজ্ঞাসা করা হল। চেঁচিয়ে বলল, ‘‘বনমুরগি, বনমুরগি। পাতার পোশাক পরে হুলা লা হুলা করতে করতে শিকার করব। তারপর রোস্ট।’’ ও খাওয়াদাওয়ার বাইরে কিছু চিন্তা করতে পারে না। শুনেই দীপু খেপে গেল, ‘‘বনমুরগি! জেলে যেতে চাও? তোমাকে গাছে বেঁধে বাবলা ঢিল ছোড়া প্র্যাকটিস করবে। অনেকদিন হল ও ঢিল ছোড়া ছেড়ে দিয়েছে।’’ আমাকেও কিছু বলতে হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, ‘‘এই জঙ্গলে দুলিকে একবার দেখতে চাই। অরণ্যের দিনরাত্রির। সুনীলের নয় কিন্তু। সত্যজিতের।’’ শুনেই ওরা হাঁ হাঁ করে উঠল। বাবলা আর দীপুকে ছোটবেলায় পড়াতাম। এখন ওরা বন্ধু হয়ে গিয়েছে। তবে গুরু-শিষ্যের সম্মানজনক ব্যবধানটা ছিল। সেটা ভাঙতেই ওরা হাহাকার করে উঠল।

আমি হাসতে লাগলাম। নতুন কিছুতে সব মানুষেরই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া একটু নেতিবাচক হয়। ওদের আশ্বস্ত করে বললাম, ‘‘কোনও ভয় নেই। চরিত্র বজায় থাকবে। এখানে লোক কোথায়? দুলি আসবে কোত্থেকে! আমি শুধু জানতে দেখতে চাইছিলাম, বাস্তবে ওমন ধারাল চেহারার দুলিরা থাকে কিনা। তোদের সঙ্গে তো কত জঙ্গলে, আদিবাসী পল্লিতে ঘুরলাম। দেখতে পেয়েছি কি? গল্প, উপন্যাস, সিনেমার পাথর কোঁদা ভাস্কর্যের মতো সাঁওতাল রমণীরা কোথায় থাকেন? দেখেছিস তো কী করুণ চেহারা সব।’’...

আমরা ততক্ষণে আরও এক কিলোমিটার চলে এসেছি। কিন্তু একটা মানুষের মুখ দেখিনি। না পথচারী, না সাইকেল আরোহী। রাস্তাটায় অল্পস্বল্প মোরাম ফেলা। মানে লোকে যাতায়াত করে। সেজন্যই কাদা থেকে বাঁচার ভাবনা। কিন্তু কারা যায়? কতজন যায়? থাকে কোথায় তারা! দীপু বলল, ‘লোকজন না থাকাই ভাল। মানুষ জাতটা মোটেও সুবিধের নয়। জঙ্গলের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে।’

তারপর সব চুপচাপ। আমরা জঙ্গলের নির্জনতা উপভোগ করছিলাম। ভাঙা, সরু পথে ছোট হাতির সাবধানী চলার শব্দ নির্জন জঙ্গলে অন্য অনুভূতি জাগাচ্ছিল। গাড়িটা একটা গর্তে পড়ে লাফিয়ে উঠল। জল ছোটে রাস্তার উপর দিয়ে। তাই গর্ত।টাল সামলানোর পরেই দূরে রাস্তার বাঁকে দেখা গেল একটা লাল আভা। সবুজ জঙ্গলে লাল রংটা বেশ খোলতাই। চেঁচিয়ে উঠলাম, ‘‘দেখা গিয়েছে। মানুষ দেখা গিয়েছে।’’ ধীরে ধীরে সেই লাল আভা আর আমাদের গাড়ি কাছাকাছি এসে পড়ল। একটা বুড়ি। জঙ্গল পথে একা। চালকদাদা ঠিক বুড়িটার সামনে গাড়ি দাঁড় করালেন। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘কুথায় যাচ্ছিস মাঈ?’ বুড়িটা বলল, ‘‘ঢাঙ্গিকুসুম যাব। কুটুমবাড়ি।’’

কথাবার্তায় আঞ্চলিক ভাষা। কান খাড়া করে বুঝতে হচ্ছিল। চালকদাদা, ঢাঙ্গিকুসুম নাম শুনে বিস্মিত হলেন। বললেন, ‘‘সে তো অনেইক দূর রে! হেঁইটে যাবি?’’ বুড়ি জানায়, আর কোনও উপায় নেই। এই রাস্তায় গাড়ি চলে না। হেঁটে ছাড়া যাবে কী করে? তার পরেও কথা চলে দু’জনের...। চালকদাদার প্রবল কৌতূহল। এত রোদে কেন সে জঙ্গলপথে একা বেরিয়েছে? কী এমন দরকার? ঢাঙ্গিকুসুম যেতে পুরো পথটা তো আর জঙ্গল পড়বে না। মাঈর কষ্ট হবে তো! আসলে চালকদাদা জঙ্গলমহলের বাসিন্দা হলেও তিনি যে এলাকায় থাকেন সেই বেলপাহাড়িতে আধা শহুরে হাওয়া। পাকা রাস্তা। বাজার, বিডিও অফিস। পর্যটক আসেন বলে হোম স্টে হয়েছে। কলকাতায় যাতায়াতের বাস চলে। গাড়িও কিছুক্ষণ অন্তর মেলে। ফলে, তাঁর কাছে বুড়ির এলাকাটা জঙ্গুলে এলাকা। তাদের রোজকারের জীবনযাত্রা ঘণ্টাদেড়েকের ব্যবধানে বিস্ময়কর।

বুড়িটা চালকদাদার কৌতূহল মেটায়। সে আসলে জামাই বাড়ি যাচ্ছে। বছর পাঁচেক হল জামাই বাড়ি যায় নাই। মেয়ের বাড়ির কাছে বাবা ভৈরবনাথের থান আছে। পুজো হবে পরশু। তাই সে বেরিয়ে পড়েছে। আমরা অবাক হলাম। এখান থেকে ঢাঙ্গিকুসুম ১০ কিলোমিটার হবে। এতটা পথ হেঁটে যাবে এই বয়সে! বুড়িকে গাড়িতে তুলে নিতে পারলে হত। কিন্তু আমরা তো যাচ্ছি উল্টোদিকে। সমাধানের একটা উপায় বাতলালেন চালক। বুড়িকে বললেন, ‘‘তুই যা মাঈ। আমরা ফিরার সময়ে তোকে তুলে নিব।’’

গাড়ি এগোল। পিছন ফিরে দেখলাম, নাইলনের ব্যাগের মুখটা চেপে ধরে বুড়িটা ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছে জঙ্গলের পথে। এখন চোখে পড়ল, একটু ঝুঁকে চলে বুড়িটা।...

কিন্তু আমরা গেলাম আটকে। আরও কিছুটা এগনোর পরে থামতে হল। একটা জায়গায় রাস্তার ওপর দিয়ে জল ছুটেছে। রাস্তা গিয়েছে ভেঙে। দু’পাশে নালা মতো। গাড়ি নিয়ে ওই জায়গা পার হওয়া মুশকিল। চাকা বসে গেলে এই জঙ্গলে তোলার জন্য কোনও সাহায্য মিলবে না। পড়ে থাকতে হবে লোকের অপেক্ষায়। কাছাকাছি কোনও গ্রাম আছে বলেও মনে হচ্ছে না। গাড়ি ফিরল।

আফশোস শুরু করলাম তিনজনে। রাস্তার জন্য বাদ পড়ে গেল জঙ্গল ফুঁড়ে ঝাড়গ্রাম থেকে ঝাড়খণ্ডে গিয়ে ওঠার পরিকল্পনা। দেখা হল না মানুষজনও। শুনেই বাবলা বলে উঠল, ‘দুলিকে দেখা বলো!’ আমরা হেসে উঠলাম। কিন্তু বুড়িটা তো খারাপ রাস্তা নিয়ে কিছু বলল না! ‘কী করে বলবে? এই রাস্তা দিয়ে কি গাড়ি যায়? গেলে হয়তো বলাবলির অভ্যাস থাকত। এমনও হতে পারে, বুড়িটা ভাবেইনি আমরা কতদূর যাব।’ ব্যাখ্যা দেয় দীপু।

এত কিছুতেও ইন্দ্রর কোনও সাড়া নেই। দীপু উঁকি দিয়ে দেখল একবার। আমাদের রেশনের চিড়ে আর কাজু বিস্কুট চিবোচ্ছে মন দিয়ে। কিছু দেখতে না পারার আক্ষেপটাকে নিজের ব্যর্থতা বলে মনে করছিলেন চালকদাদা। ইন্দ্রকে দিয়ে বলালেন, কাছেই ‘শব্বর’ পাড়া আছে। আমরা যেতে চাইলে উনি নিয়ে যাবেন। প্রস্তাবটা শুনে প্রথমে একটু সংকোচ হল। শবররা কি কোনও দর্শনীয় বস্তু! তবুও রাজি হলাম। মানুষ দেখতেই তো চাইছিলাম। আর জীবন। তাছাড়া কিছুদিন আগেই এই জঙ্গলমহলেরই এক এলাকায় সাত শবরের মৃত্যু হয়েছিল। রোগে ভুগে। চিকিৎসার অভাবে। এবং অবশ্যই অপুষ্টিতে। খবরের কাগজে যা নিয়ে আলোড়ন ওঠে তা তো দর্শনীয় হয়। তার সঙ্গে যতই না কেন কষ্টের, লজ্জার স্মৃতি জড়িয়ে থাক। এখন তো জালিয়ানওয়ালাবাগেও লোকে সেলফি তোলে।

গেলাম কাটাচুয়া গ্রামে। বেশি দূর নয়। আমরা যেখানে ছিলাম সেখান থেকে দু’তিন কিলোমিটারের মধ্যেই হবে। গ্রামের নামেই জঙ্গলের একটা আভাস। ‘‘কাঁটাচুয়া মানে তো শজারু? এক সময়ে এখানে হয়তো প্রচুর শজারু পাওয়া যেত।’’ ব্যাখ্যা দিচ্ছিল দীপু। একটু সংশোধন করে দিলাম। ‘‘কথাটা কাঁটাচুয়া নয় রে, কাটাচুয়া। চুয়া মানে কুয়ো। জলের জন্য কাটা হয়েছে যে কুয়ো তা-ই কাটাচুয়া।’’ বাবলা আর ইন্দ্র তারিফ করল, ‘‘বাহ স্যার। ঘোরার সঙ্গে পড়ানোও চলছে, অ্যাঁ!’’

আমরা চারজন আর চালকদাদা ঢুকে গেলাম শবর পাড়ায়। রাস্তার ঠিক পাশেই। জায়গাটায় প্রচুর গাছপালা। বুনো ঝোপঝাড়। তার মাঝ দিয়ে চলার পথের রেখা। রাতে সাপখোপের লেজে পা পড়লে কিছুই করার থাকবে না। একটা দু’টো বাড়ির সামনে গাছতলায় গরু শুয়ে। একটা দু’টো বাড়ির উঠোনে মাচা থেকে লাউ ঝুলছে। কেটে রাখা গাছের ডাল, কঞ্চি বেয়ে উঠেছে শিম জাতীয় কোনও গাছ। উঠোনে দু’একটা মুরগি চরছে। ইন্দ্র তাকিয়ে ছিল মুরগিগুলোর দিকে। ইশারায় সাবধান করলাম, মুখ খুলবি না। দেশি মুরগি তো। ও হয়তো এখখুনি বলে বসবে, ‘‘একটা নিয়ে নেব?’’ তার পর সেই কেনা মুরগি নিয়ে ছোটাছুটি। এখানে কাটানোর সুযোগ হবে না। তাছাড়াকাটা মাংস এতটা পথ নিয়ে যাওয়াও মুশকিল হবে। ঘুরতে এসে গোটা একটা মুরগি নিয়ে চলাফেরা করা বেশ অসুবিধেজনক।

পাড়ায় গোটা ছয়-আটেক ঘর। যদি এগুলোকে ঘর বলা যায়। খুদে খুদে ছিটে বেড়া, মাটির দেওয়াল। দু’একটা বাড়ির দেওয়াল হেলে পড়েছে। কোনওটা টিনের ছাউনি দেওয়া,কোনওটায় খড়। চালের খড় পচেছে। চলে যাওয়া বর্ষায় খড় পাল্টানো হয়নি। হয়তো ফুরসত মেলেনি। বা টাকা, কড়ি। পাড়ায় কোনও পুরুষ নেই। একটা মাত্র পুরুষ দেখতে পেলাম। সে বছর ষোলো-সতেরোর এক কিশোর। খাটিয়ায় শুইয়ে রাখা এক নবজাতককে পাহারা দিচ্ছে। বাকিরা জঙ্গলে গিয়েছে কুরকুট ঝাড়তে। কুরকুট মানে পিঁপড়ে। চালকদাদা জানালেন, আজ মহাজনের ফড়ে আসবে। সে ওই কুরকুটের ডিম নিয়ে যাবে। দু’শো টাকা কিলো। শহরে পিঁপড়ের ডিম বাবুলোকেদের ছিপ ফেলার টোপ হিসেবে কাজে লাগে। বনবাসী মানুষগুলো কুরকুট খায়। পিঁপড়ে আর পিঁপড়ের ডিম। টকটক খেতে। শাক ভাজা, ভাতের সঙ্গে কুরকুটের চাটনি। মানুষগুলোর শরীরে প্রোটিনের অন্যতম জোগানদার। মাঝে মাঝে খবরের কাগজে বনবাসী মানুষগুলোর কষ্টের জীবন জায়গা পেয়ে যায়। তখন দেশ জুড়ে জোর হল্লা। আর সেই হইচইয়ে অবধারিত ভাবে আসে এদের খাওয়াদাওয়া। আসে করকুটের কথা। আমরা শহরে, উন্নয়নের ছোঁয়ায় থাকা মানুষগুলো কাগজ পড়ে ‘আহা রে কী কষ্ট’ বলে কষ্ট পেয়ে যাই। তার পর কাগজটা ডাইনিং টেবিলে ফেলে চিংড়ি কিনতে চলে যাই।

শবর পাড়ায় থাকতে আর ভাল লাগছিল না। চলে আসার কথা বলতে যাব ইন্দ্র বলল, ‘‘ওই দেখো তোমার দুলি।’’ একটা পড়ো পড়ো মাটির দেওয়াল আর খড়ের চালের ঘরের দিকে ইঙ্গিত করল ইন্দ্র। ঘরের সামনে একটা বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে। কত বয়স হবে? কোনও মতেই ষোলোর বেশি নয়। মুখে কিশোরীবেলার লাবণ্যের ছোঁয়া এখনও অল্প হলেও রয়ে গিয়েছে। কিন্তু লিকলিকে চেহারা। ওই রোগা চেহারাটাকে জাপটে ধরে রয়েছে একটা বাচ্চা। বছর খানেকের মধ্যে বয়স শিশুটার। মেয়েটি এক সময়ে হয়তো স্বাস্থ্যবতী ছিল। কিশোরীকালের স্বাভাবিক বাড়। পরনের ব্লাউজটা দেখলেই তা বোঝা যায়। কিন্তু শিশুর জন্ম দিয়ে থমকেছে সেই বৃদ্ধি। লাবণ্যও ছেড়েছে শরীর। ওই একটা খুদে শরীর থেকে কতজনের রসদ জোগাবে মেয়েটা? লাবণ্যের নাকি তার শিশুর?

দীপুকে বললাম, ‘‘চল এবার পালাই।’’ কাছাকাছি দীপুই ছিল। ইন্দ্র আর বাবলা অন্যদিকে গিয়েছে। দীপু মা আর শিশুর ছবি তুলছিল। ফেসবুকে দেওয়া হবে। কী ক্যাপশন হবে? ‘কাঁটাচুয়ার ম্যাডোনা?’ সেই যে বিখ্যাত এক নাটকে এক ফটোগ্রাফারের ছবির ক্যাপশন! দুর্ভিক্ষে কলকাতার ফুটপাথে আশ্রয় নেওয়া এক অস্থিচর্মসার মায়ের বুক থেকে প্রাণপণে বাঁচার রসদ টানার চেষ্টা করছিল সন্তান। সেই ছবির ক্যাপশন হয়েছিল, ‘এ যুগের ম্যাডোনা’। অস্থির হয়ে উঠছিলাম। ইন্দ্র আর বাবলাকে ডাকলাম। বাবলা উল্টে আমাদের হাত নেড়ে ডাকল।

কাছে যেতে একটা ছাউনির দিকে আঙুল তুলল। বাঁশের একটা মাচা। তার উপরে পলিথিনে চাদরের ছাউনি। মাচায় একটা বঁটি, কতকগুলো আলু ছাড়ানো। মাচার নীচে হাঁড়িকুড়ি, থালা। অনেকটা মেলায় জিলিপি বাদামের দোকানের মতো। এখানে কি আলুর দম বিক্রি হচ্ছে? নিশ্চয় ইন্দ্রর কাজ। অনেকক্ষণ খাওয়া হয়নি। ওর খিদে পেয়েছে নিশ্চয়। আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘‘খাবি কি? রান্না তো চাপেইনি এখনও। রাস্তায় খেয়ে নেব।’’ বাবলা বলল, ‘‘এটা দোকান নয় গো। একটা বাড়ি।’’ অবাক হয়ে বাবলার দিকে তাকালাম। বাবলা জানাল, চালকদাদা বলেছে এটা ডমন শবরের বাড়ি। শুনে চমক লাগে। চারদিক খোলা একটা মাচা কারও বাড়ি হতে পারে। চালকদাদা অনেক জানেন। এই এলাকার বেশ কিছু পাড়া চেনেন। লোকজনও চেনা। গাড়ি নিয়ে যাতায়াত আছে বোধহয়। উনি বললেন, মালকো বাড়ি করার জন্য সরকারের টাকা পায়নি। আগে সরকার সরাসরি এদের টাকা দিত। কিন্তু এরা নাকি সেসব নেশা করে উড়িয়ে দিত। পাড়ার একটা আধা হওয়া পাকা বাড়ি দেখিয়ে বললেন, ‘‘টাকা শেষ করে ফেলায় বাড়ি আর করতে পারেনি ললিত শবর। এখন আর ওদের হাতে সরাসরি টাকা দেওয়া হয় না। সরকার থেকে বাড়ি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পেয়ে যাবে এবার।’’

দ্রুত বেরিয়ে এলাম। আমরা মজা করতে এসেছি। প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে এসেছি। কষ্টের জীবন দেখে কেন মন খারাপ করব? দ্রুত পালাতে হবে এলাকা ছেড়ে। জঙ্গল সাফারিটা শবর পাড়ায় মারা পড়ল। এখন উচিত আরেকটা ভাল জায়গায় গিয়ে মনটা সতেজ করে নেওয়া। কিন্তু বিকেলে ট্রেন। ফিরতে হবে ঝাড়গ্রাম। ঝুঁকি হয়ে যাবে।

গাড়ি চালু হয়েছে। তখনই একজন হাত দেখালেন। চালকের সঙ্গে কী সব কথা হল। তারপর ইন্দ্র আমাদের জিজ্ঞাসা করল, ‘‘উনি কাঁকড়াঝোর যাবেন বলছেন। গাড়িতে নেওয়া যাবে কিনা জানতে চাইছেন।’’ দীপু বলল, ‘‘কেবিনে নিয়ে নাও।’’ ভদ্রলোক কিন্তু কেবিনে উঠলেন না। আমাদের কাছে উঠলেন। বেশ হাট্টাগাট্টা শরীর। চোখে একটা বুদ্ধিমত্তার ছাপ আছে। গাড়ি চালু হল। আমাদের আলাপ পরিচয়ও। ওঁর নাম মঙ্গল সিং। উনি শবর বা মুন্ডা নন। ভূমিজ। দীপুর গলায় ক্যামেরাটার দিকে তাকাচ্ছিলেন বারবার। এক সময় জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন, ‘‘শবর পাড়ায় ছবি তুলছিলেন?’’ দীপু হ্যাঁ বলল। উনি বললেন, ‘‘কী হবে ছবি তুলে? বেলপাহাড়ি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই এই কষ্টের ছবিটা ভুলে যাবেন। এতদিন ধরে এত পর্যটক, এত সাংবাদিক তো এসেছেন। ভুলে গেছেন।’’ উনি কি আমাদের ছবি তোলার বিষয়টা পছন্দ করছেন না? বিদেশি পর্যটকেরা এসে আমাদের দেশের দারিদ্রের ছবি তুললে, ‘জিভ কাটো লজ্জায়’ লিখলে আমরা যেমন রেগে যাই উনিও হয়তো সেইরকমই রেগে যাচ্ছেন। কিন্তু সাংবাদিকদের কথা তুললেন কেন? আমার নোটবুকটা দেখতে পেলেন? ওটা সব সফরেই সঙ্গে থাকে। কিছু কিছু নাম, জায়গার নাম ভুলে যাই। ফেসবুকে লিখতেও তো কাজে লাগে। ভুল হলে সর্বনাশ। লোকজন ঝাঁপিয়ে পড়বে। মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢালার খাপ পঞ্চায়েত এখন আর বসে না। ফলে মানুষের তেমন আমোদ হয় না। কিন্তু ফেসবুক এখন সেই খাপ পঞ্চায়েতের দায়িত্ব নিয়েছে। ঘোল নিয়ে সকলে তৈরি। মনোমতো না হলেই হাঁড়ি উপুড়। আর ভুল হলে নরসুন্দর ডাকতে হবে না। ট্রোল করে মাথা কামিয়ে দেবে।

কিন্তু নোটবুকটা দেখার কথা নয়। ওটা ব্যাগের আড়ালে আমার আর বাবলার মাঝে পড়ে আছে। আস্তে আস্তে সেটা আমার উরুর নীচে নিয়ে নিলাম। আর তখনই মঙ্গল আমার দিকে চেয়ে জানতে চাইলেন, ‘‘নিউটন সিনেমাটা দেখেছেন?’’ আমরা তিনজনেই হ্যাঁ বললাম। দেখে কী মনে হল? দীপু বলল, ‘‘সিস্টেম। একটা সিস্টেমই এই দেশটাকে শেষ করে দিচ্ছে। যে সিস্টেম শুধু নিজের কথা ভাবায়।’’ মঙ্গলের ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। তার পর জানতে চান, ‘‘আর কিছু?’’ আমরা পরস্পরের দিকে তাকালাম। মঙ্গল নিজেই বলতে শুরু করেন, ‘‘ওই জায়গাটার কথা মনে আছে? সিআরপিএফ জওয়ানদের নিয়ে ভোটকেন্দ্রের দিকে এগোচ্ছে নিউটন আর ভোটকর্মীরা। একটা জংলা, পাথুরে স্রোত পার হল তারা। একদল বনবাসীর সঙ্গে দেখা হল। জঙ্গলে কেঁদ পাতা তুলতে যাচ্ছিল। ওদের ভোট দিতে যেতে বলল নিউটন। তারপর ভোটকেন্দ্রের কাছে গোন্ড জনজাতির মানুষগুলোর কথা মনে করুন। তাদের ভাঙাচোরা মুখ, ঝোপঝাড়ের মতো ঘর। উঠোনে চরে বেড়ানো মুরগি, বাঁশের কাজ করা গোন্ড যুবা, বৃদ্ধ? মনে পড়ছে কিছু?’’

মঙ্গল একবার থামলেন একটুখানিকের জন্য। তারপর আবার শুরু করলেন, ‘‘ভোটকেন্দ্রের মহিলা ভোটকর্মীটির কথা মনে আছে? মালকো? যে সেই লাল পিঁপড়ে ভর্তি একটা গাছের ডাল এনেছিল? তারপর একটা পিঁপড়ে খেয়ে দেখল? মিল পাচ্ছেন না? এই তো শবরপাড়ায় দেখে এলেন। পাড়ার সবাই কুরকুট ভাঙতে গিয়েছে।’’

কথা শেষ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন ভূমিজ মঙ্গল। আমাদের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করছেন বোধহয়। আমার মনে পড়তে লাগল এক এক করে। মিল খুঁজে পেতে লাগলাম। শুশুনিয়া পাহাড়ের আদিবাসী পাড়া, বরন্তির বাড়িগুলো, পুরুলিয়ার মুরগুমা-অযোধ্যা পথে যেতে রাস্তার পাশে হঠাৎ করে চলে আসা গ্রাম, এই ঝাড়গ্রাম। এখানকার টুকরো টুকরো ছবিই তো দেখেছি নিউটনে! এতদিন মিল খুঁজে পাইনি। মঙ্গল সিং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে সব এক মনে হতে শুরু করল। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার আড়ালে থাকা আরেক ভারত। একই রকম টুকরো টুকরো ভারত ছড়িয়ে আছে সারা দেশ জুড়ে।

মিলটা খুঁজে পাওয়ার পরেই একটা ভয় পেয়ে বসল। এই জঙ্গলমহল বছর দুই-তিনেক আগে পর্যন্ত অশান্ত ছিল। খুন, জখম, অপহরণ লেগেই ছিল। এখন এলাকা শান্ত। কিন্তু প্রশাসন বোধহয় শান্ত থাকার বিষয়টি ঠিক বিশ্বাস করে না। তাই জায়গায় জায়গায় সিআরপিএফ ক্যাম্প রয়ে গিয়েছে। মঙ্গল কি সেই খুনের মাধ্যমে সমানাধিকার ফিরিয়ে আনার দলে? শবরপাড়ার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা ‘নিউটন’ নিয়ে, আদিবাসীদের জীবন আলোচনা করছেন। করতেই পারেন। স্মার্টফোন এখন বহু হাতে। ডিশ টিভির অ্যান্টেনাও নজরে পড়েছে রাস্তার পাশের দু’একটা বাড়িতে। ‘নিউটন’ দেখতেই পারেন। কিন্তু শহুরে মন জঙ্গলবাসীর এতটা জ্ঞান মেনে নিতে পারছিল না।

দীপুর দিকে তাকালাম। ওর মুখটা থমথম করছে। বাবলা ব্যাগগুলোর আড়াল দিয়ে আমার উরুতে খোঁজা দিল। ঠিক তখনই মঙ্গল বলে উঠলেন, ‘‘ভয় পাবেন না। আমি...’’। ওঁর কথা শেষ হল না। গাড়িটা হুড়মুড়িয়ে ব্রেক কষল। আমরা এ ওর গায়ে পড়লাম। দীপু চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘কী হল গো ইন্দ্রদা?’’ ইন্দ্র বলল, ‘‘সেই বুড়িমা।’’ উঁকি দিলাম। হেঁটে হেঁটে এত দূর এসে পড়েছে বুড়ি! পায়ের জোর আছে। ইন্দ্রকে বললাম, ‘‘কেবিনে তুলে নে।’’ কিন্তু বুড়িমা কেবিনে উঠতে চাইলেন না। উঠে এলেন আমাদের কাছেই। মঙ্গল উঠতে সাহায্য করলেন।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। আলোচনার খেই হারিয়েছে। তার ওপর নতুন সদস্যের আগমন। নীরবতা ভাঙলেন মঙ্গল। বুড়িকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘মাঈ, কুথাকে যাবি?’’ বুড়ি প্রথমবার দেখা হওয়ার সময়ে চালকদাদাকে যা জানিয়েছিল তা-ই বলল।ওড়গেন্দায় ভৈরবথানে দশমীর দিনে পুজো হয়। মেলা বসে। ওর একটা মানত আছে। বাবা ভৈরবনাথের কাছে মানত করেছিল বুড়ি। মেয়ের ছেলেপুলে হলে সে বাবার কাছে জোড়া পায়রা বলি দেবে। যতদিন না হচ্ছে ততদিন জামাই বাড়ি যাবে না। মেয়ের মেয়ে হয়েছে মাস পাঁচেক হল। বুড়ি মানত রক্ষায় চলেছে। মঙ্গল বুড়ির ব্যাগের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘‘পায়রা আছে?’’ বুড়ি একটুখানি হাসল। মঙ্গলও মিটিমিটিহাসতে শুরু করলেন। একবার নিজের কপালে টোকা মারলেন। আক্ষেপ বোধহয়। এখনও নাতিনাতনির মুখ দেখার কৃতিত্ব ঠাকুর দেবতা পাচ্ছেন! উপরি হিসেবে ভেটও।

কথাবার্তা তেমন আর হল না। হঠাৎ আতঙ্কে স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়। আতঙ্ক দূর হলেও কিছুক্ষণ স্তব্ধতা বজায় থাকে। আমাদের আতঙ্ক এখনও দূর হয়নি। মঙ্গল কে এখনও জানি না। আমার জানতে ইচ্ছে করছে উনি কী করেন? কোথায় থাকেন? এখন কোথায় চলেছেন? নীরবতা ভাঙলেন মঙ্গলই। জানতে চাইলেন, আমরা কোথা থেকে এসেছি। এখানে কোথায় কোথায় ঘুরলাম। সকলে মিলে উত্তর দিলাম। মঙ্গল কোথায় যাবেন জানতে ইচ্ছে করছিল। প্রশ্ন করেই ফেললাম। ‘‘শুশনিজবি’’, জানালেন মঙ্গল। আমরা এখানকার কিছুই চিনি না। আর কোনও নাম বেশিক্ষণ মনেও থাকছে না। তাই চুপ করে রইলাম। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি হু-হু করে এগোচ্ছে।কাছে ধান জমি। দূরে জঙ্গল। জড়ামড়ি করে থাকা গাছপালার পাঁচিলের ওপর দিয়ে উঁকি মারছে পাহাড়। একটানা দিগন্ত প্রাচীর।

শুশনিজবি এসে গেল বোধহয়। কারণ মঙ্গল চেঁচিয়ে গাড়ি থামাতে বললেন। থামল গাড়ি। তখনই চোখে পড়ল একটা প্যান্ডেল। দুর্গাপুজো হচ্ছে। এতক্ষণের ঘোরাঘুরিতে আমরা মাত্র দু’টো পুজো দেখলাম। রাস্তায় একটা পড়েছিল। পুজো দেখতে এসেছেন? গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিলেন। প্রশ্ন শুনে হাসলেন। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে বললেন, ‘‘ঠাকুর! না, দাদা। একটা লোককে দেখতে এসেছি। ঝুন্নু শবর। একা থাকে লোকটা। বিচ্ছিরি ভাবে পা ভেঙে গিয়েছে। বিডিও-কে বলেছিলাম। বিডিও জানিয়েছেন, একটা লোক জোগাড় করে দিতে। যিনি ঝুন্নুর সঙ্গে হাসপাতালে থাকতে পারবেন। তাহলে উনি হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।চিকিৎসা না করালে ওর পা-টা নষ্ট হয়ে যাবে।’’

আমরাও নেমে পড়লাম গাড়ি থেকে। একটা লোক পা ভেঙে পড়ে রয়েছে। তাকে সাহায্য করতে অনেক দূর থেকে একজন এসেছেন। পাড়ার লোক কেউ নেই নাকি! বিষয়টা তো দেখার মতো। আমরা গাড়ি থেকে নামায় বুড়ি হঠাৎ বলল, ‘‘কুথা যাচ্ছিস তোরা?’’ মঙ্গল বুঝিয়ে বললেন। শুনে বুড়িও যেতে চাইল।

পুজো প্যান্ডেলের ঠিক উল্টো দিকে একটা মাঠ। আড়াআড়ি ভাবে মাঠ পার করে একটা চালায় পৌঁছলাম। ঝোপড়ার মতো ঘর। বড় মহুয়া গাছের নীচে। মঙ্গল খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিতেই একটা ক্ষীণ স্বর শোনা গেল, ‘‘জল, জল।’’ শুনে গা-টা শিউরে উঠল। এ সব তো সিনেমায় দেখা যায়। একটা বোতল বের করে দেওয়া হল মঙ্গলকে। মঙ্গল বোতলের ছিপি করে অল্প অল্প জল লোকটার মুখে দিতে লাগলেন। গলাটা একটু ভিজতেই লোকটা বলল, ‘‘দু’দিন কিচ্ছু খাই নাই।’’

মঙ্গল আমাদের দিকে তাকাল। কিন্তু আমাদের কাছে আর কোনও রেশন নেই। চিড়ে ভাজা, টোস্ট, বিস্কুটের প্যাকেটগুলো সব শবর পাড়ার বাচ্চাদের হাতে দিয়ে এসেছি। ইন্দ্র বলল, ‘‘কিছু কিনে এনে দিচ্ছি।’’ মঙ্গল হাসলেন। বললেন, ‘‘এখানে দোকান কোথায়? দোকান পেতে হলে তিন কিলোমিটার যেতে হবে।’’ তাহলে উপায়? মঙ্গল বলল, ‘‘পুজোর ওখান থেকে কিছু আনি।’’ আমরাও গেলাম। কিন্তু পুজো কমিটির কর্তারা কিছু দিতে রাজি নন। সাফ জানালেন, পুজো না হওয়া পর্যন্ত কিছু দেওয়া যাবে না। পুজো শেষ হলে ওরা প্রসাদ দিয়ে আসবে।

থমথমে মুখে মঙ্গল হাঁটতে শুরু করলেন। প্যান্ডেল থেকে কিছুটা দূরে আসতেই উত্তেজিত স্বরে বলতে শুরু করলেন, ‘‘কেন ঝুন্নু বাড়িতে পড়ে বুঝতে পারলেন? এই হল পাড়ার লোক। অথচ এই পুজোটা সরকারি পুজো। পুলিশ পুজোর পয়সা দেয়। মন্ত্রী উদ্বোধন করতে আসেন। এ বছরও করেছে।’’ পুলিশ পয়সা দেয়! অবাক আমরা। মঙ্গল বলেন, ‘‘একসময়ে এখানে মাওবাদীদের বাড়বাড়ন্ত ছিল। সরকার মাওবাদীদের দমন করল। লোকজনকে বঞ্চনা, অধিকার ভোলাতে পুজো চালু করল। লোকজন খুশি। এই তল্লাটে আর কোনও পুজো নেই কিন্তু। উৎসবের ছলে অনেক কিছু ভুলিয়ে রাখা যায় যে।’’

আমরা ফিরতেই বুড়ি জিজ্ঞাসা করল, ‘‘কী রে, কিছু পালিনি?’ মঙ্গল হতাশ ভাবে মাথা নাড়েন। আমি বললাম, ‘‘আমাদের গাড়িটা নিয়ে চলুন। দোকান থেকে কিছু কিনে আনা যাক।’’ বাধা দিল বুড়ি, ‘‘এতটা যাবি আসবি? দরকার নাই।’’ বুড়ি ওর ঝোলায় হাত দিল। শালপাতায় মোড়া খানপাঁচেক বাতাসা। একটা ভেঙে ঝুন্নুর গালে দিল। তারপর বোতল থেকে একটুখানি জল ঝুন্নুর গালে ঢালল। ঝুন্নুর চোখে জল। এই দু’দিন হয়তো সারাক্ষণ চিন্তা করেছে, না খেয়ে, তেষ্টায় ছাতি ফেটে ওকে মরতে হবে। অচেনা কয়েকজনের ভালবাসা পেয়ে নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না। হয়তো বাঁচার খুশিতেই চোখে জল। বুড়ি আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দেয়। তারপর ব্যাগ থেকে একটা একটা করে জিনিসপত্র বের করতে থাকে। একটা পুঁটুলি। দু’টো শসা। বুড়ি বলে, ‘‘দু’টা পাথর লিয়ে উনান বানায়ে দে রে মঙ্গল। একটু ভাত রাঁধি।’’

দু’দিন না খাওয়া ঝুন্নুকে পেট পুরে খাওয়ালে হিতে বিপরীত হতে পারে। বুড়িকে সাবধান করলাম আমরা। বুড়ি বলে, ‘‘জানি রে। এক মুঠা চাল দিয়া ফ্যানা ভাত রেঁধে দিব। কিছু হবেক নাই।’’ মঙ্গল ততক্ষণে দু’টো পাথর জোগাড় করে পাশাপাশি রেখেছে। যেমন করে আমরা ছোটবেলায় ইট সাজিয়ে উনুন করে ঘুড়ির সুতোর মাঞ্জা দেওয়ার সাবুদানা সেদ্ধ করতাম। মঙ্গল আরেকটা চ্যাটাল পাথর জোগাড় করে উনুনের পিছনের দিকটা বন্ধ করে দেয়। যাতে আগুনের তাপ ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে না যায়। পাথরের অভাব নেই এখানে। আমরা সবাই মিলে কাঠপাতা জোগাড় করতে শুরু করি। কাজটা সহজই ছিল। এলাকাট জঙ্গুলে। বাবলা একটা গাছে উঠে পড়ে। মঙ্গল আরেকটায়। শুকনো ডালপাতা কুড়িয়েও নেওয়া হল।

পাথরের উনুনে, মাটির হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে দেয় বুড়ি। হাঁড়িটা ঝুন্নুর। আমরা বোতল থেকে ভাতের জল দিই। কোনও জলের কল চোখে পড়েনি এলাকায়। খোঁজার সময়ও ছিল না। রাস্তায় আমরা জল ভরে নিতে পারব।

ভাতের হাঁড়ির জল টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছে এবার আমাদের যেতে হবে। বিকেলে ট্রেন। বেলপাহাড়ি পৌঁছে ঝাড়গ্রামের বাস ধরতে হবে। পুজোর সময়ে এই এলাকায় বাস কম চলে। একটা ভরা জলের বোতল বুড়ির কাছে রেখে দিই। আমাদের ঘোরাঘুরির ফান্ড থেকে মঙ্গলের হাতে কিছু টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া আর কী করতে পারি আমরা! টাকাটা নিতে নিতে মঙ্গল বলে, ‘‘আমাদের হাসি শুনতে পাচ্ছেন তো? দেখতে পাচ্ছেন জঙ্গলমহল হাসছে?’’

চুপ করে রইলাম। কিছু বলার ছিল না আমাদের। আমার ভীষণ সংকোচ হচ্ছিল। যেন অপেক্ষাকৃত সুবিধেভোগী শ্রেণির প্রতিনিধি হয়ে আমরাই এঁদের দুর্দশার জন্য দায়ী, মনে হচ্ছিল বারবার। নীরবতা ভাঙল বুড়ি। আমাদের স্বস্তি দিল। জানাল, আমরা যেন ওর জামাইকে একটু খবর দিয়ে যাই। বিকেলে জামাই যেন একটা ইঞ্জিন ভ্যান ভাড়া করে পাঠায়। ছেলেটাকে হাসপাতালে নিতে হবে। জামাইকে খুঁজতে অসুবিধা হবে না।বিদায় নিলাম আমরা। ঝোপড়াটা ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে এসেছি, বুড়ির গলা পেলাম। মঙ্গলকে বলছে, ‘‘ব্যাগে দু’টো কবুতর আছে। একটা মেরে দে। ছেলেটাকে রেন্ধে দিব। ঝোল করি। গায়ে একটুক জোর পাবে। হাসপাতালে নেওয়ার আগে খাওয়াইব।’’

থমকে দাঁড়াতেই হল। ভৈরবথানে নাতনির মঙ্গল কামনায় জোড়া কবুতর উৎসর্গ করবে বলে মানত করেছিল বুড়ি। সেগুলোর একটাকে অচেনা একজনকে রেঁধে খাওয়াবে? পাঁচ বছর মেয়ের বাড়ি যায়নি বুড়ি, শুধু নাতনির মঙ্গল কামনায়!

হাঁটতে শুরু করলাম আমরা। মাঠের শেষ প্রান্তে পৌঁছে একবার পিছনে তাকালাম। দেখি, মঙ্গল উবু হয়ে বসে পায়রার ছাল ছাড়াচ্ছে।

তখনই পুজো প্যান্ডেল থেকে ভেসে এল ঢাকের আওয়াজ। পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে।



দীপক দাস

পাতিহাল, হাওড়া

৯৪৭৪১৯৯৬৫০

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ