অলোক গোস্বামীর গল্প : বাণিজ্যবায়ু



বিদেশি সিগারেট প্যাকেট আর লাইটারটা দুটো সিটের মাঝখান দিয়ে বাড়িয়ে দিয়ে রাজেশ জালান বললেন, দামটা বোড়ো কোথা না মিত্তরবাবু, টেস্টটাই আসোল। এই শোহরে আমাকে কিনে নিবার মতোন ওনেক রিচ মানুষ আছে, বাট সোব বানিয়া, টেস্ট বোলে কিচ্ছু নাই। 

নিজে ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও রাজেশের এই শ্রেণি বিরোধিতা আদৌ কোনো মূল্য পেল না শ্রোতার কাছে। উত্তরই এলো না রসিকতার। গাড়ির পেছনের সিটে দুহাত এমন ভাবে মেলে বসে আছেন কৃষ্ণচন্দ্র মিত্র ওরফে কেষ্ট মিত্র যেন ওদুটো মানুষের হাত নয়, পাখির ডানা। অনেক উঁচুতে উঠে যাবার পর পাখিকে যেমন ডানা ঝাপটাতে হয় না শুধু বাতাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাখতে পারলেই ভেসে বেড়াতে পারে, কেষ্ট মিত্রর বসার ভঙ্গীটাও তেমনই। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক কেননা একদা বহু ডানা ঝাপটেছেন বাতাস চিনতে ভুল হওয়ায় বাতাসের এই স্তরে পৌঁছন হয়নি, ফলে নির্ভার হয়ে উড়ে বেড়াতেও পারেননি। পরিশ্রম করেছেন তিনি উড়েছেন অন্য কেউ। 

সেদিন শেষ। এখন বাতাস নিজে এসে সার্ভিস দিয়ে যায়। যেমন এখন দিচ্ছে রাজেশ জালান। নিজের স্বার্থেই কেষ্ট মিত্রকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে চলেছে। তাহলে সামান্য সিগারেটের জন্য ডানা গুটিয়ে ঝুঁকতে যাবেন কেন তিনি! শুধু চোখ দুটো সামান্য কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন রাজেশের মুখের দিকে। হাতের দিকে নয়।

রাজেশ যেহেতু জাত খেলুড়ে তাই চালটা বুঝতে অসুবিধে হলো না। সামনের সিট থেকে অনেকটা ঝুঁকে কেষ্ট মিত্রর কোলে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা রেখে দিলেন এবং ব্যাপারটা যে নিছক ভদ্রতা ছাড়া অন্য কিছু নয় সেটা বোঝাতে মুখের হাসি একতিল না মুছে বলে চললেন, মোডেলটার ফোটো দেখেই ভালো লেগেছিল। চোড়ে মোনটা বিলকুল ভোরে গেল। হেব্বি কমফর্টেবল। নো ঝাঁকি, নো একস্ট্রা সাউন্ড। মাইলেজ একটু কোম বাট ইট’স ওক্কে। 

যেহেতু কাউকে সিগারেট ধরিয়ে দেয়ার অনুরোধ করা যায় না তাই এরপর ডানা দুটো গোটাতে হলো কেষ্ট মিত্রকে। যদিও এটাকে ডানা গোটানো বলা চলে না কারণ গতিসূত্র মোতাবেক গাড়িটার গতিই এখন কেষ্ট মিত্রর গতি। ডানা ঝাপটানোর প্রয়োজন নেই। 

সিগারেট ধরাতে ধরাতে কেষ্ট বললেন, এসিটা বন্ধ করে দিন। জানলাটা খুলতে হবে। 

রাজেশ খেয়াল করলেন সিগারেট ধরানোর পর প্যাকেট এবং লাইটারটা পাশে রেখে দিলেন কেষ্ট মিত্র। দেখে খুশী হলেন। ওরকম দু-দশ প্যাকেট প্রতিদিনই বিলোতে হয়। শুধু সিগারেট বিলিয়েই যে কাজ হয়, তা নয়। আরও কত কিছু দিতে হয়। ভাগ্যিস নেশা নামক বস্তুটি এখনও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি নাহলে অনেক মানুষের মাথায় হাত পড়ে যেত। নেশা মারফত যত তাড়াতাড়ি একজন মানুষের মনের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যায় ততটা অন্য কিছু দিয়ে সম্ভব হয় না। রাজেশের কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানুষ হলো তারা যাদের কোনো নেশা নেই। তাদের কব্জা করাটা খুব কঠিন। যেমন সে নিজে। সুতরাং পরীক্ষা মূলক ভাবেই প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়েছিলেন রাজেশ। যদি খিঁচিয়ে ওঠে কাঠখোট্টা লোকটা, ‘ঘুষ দিচ্ছেন নাকি!’ তাহলে বুঝে নিতে হবে সহজে ডাল গলবে না।

বিপদটা কেটে যাওয়ায় হাসিমুখে রাজেশ বললেন, উইন্ডো খোলার দোরকার নেই। এসিতে সিস্টেম আছে ধুঁয়া বের করার। বললাম না, লেটেস্ট মডেল? 

উত্তর দিলেন না কেষ্ট মিত্র। বাইরের দিকে তাকিয়ে এমন উদাস ভাবে সিগারেট টেনে চললেন যেন গাড়িটা নিজস্ব। নেহাত রাজেশ জালান হাতেপায়ে ধরায় সামনের সিটে চাপিয়েছেন, বাড়াবাড়ি করলে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেবেন। 

ভাবুক কেষ্ট মিত্র যা খুশী। প্রয়োজনে এই গাড়িটা যেমন দান করেও দিতে পারেন রাজেশ তেমনই পারেন যে কাউকে ঘাড় ধরে নামিয়ে দিতেও। অপর পক্ষকেই ঠিক করে নিতে হবে সে কোনটার উপযুক্ত। 

প্রায় মাঝামাঝি চলে আসার পর ফের পেছনে তাকালেন রাজেশ। সিগারেট শেষ। ফের সিটের দুপাশে ডানা মেলে দিয়েছেন কেষ্ট মিত্র। চোখ বন্ধ। অন্য কেউ হলে হয়ত ভাবতো এসির আরামে ঘুমিয়ে পড়েছেন কিন্তু রাজেশ জানেন, কেষ্ট মিত্র ঘুমোলেও তার মগজ ঘুমোয় না। প্যাঁচ কষে চলে। ওফ, ধড়িবাজ লোক বটে। একসঙ্গে তিনপক্ষকে ল্যাজে খেলাচ্ছে। রাজেশ জালান, নেওটিয়া কনস্ট্রাকশনস্ আর গভর্নমেন্টকে। অবশ্য সঠিক ভাবে বলতে গেলে বলা উচিত চারপক্ষকে, কেননা কেষ্টর দলও তো চাইছে ডিলটা হয়ে যাক। কেষ্ট মিত্র যতই চন্দনপুরের শ্রমিক ইউনিয়নের সর্বেসর্বা হোক তাবলে দলের ওপরে তো নয়। দলই শেষকথা। হয়ত এতদিনে সব ম্যানেজ হয়ে যেত যদি না সখের পরিবেশ প্রেমী, মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসে জুটত। গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে জুটেছে মিডিয়া। একদিকে নেওটিয়া, রাজেশ জালানের থেকে টাকা নিচ্ছে অন্যদিকে ফলাও করে আন্দোলনের খবর প্রকাশ করছে। তাই সবপক্ষই চাইছে হিসেব করে এগোতে যাতে লাঠি না ভেঙেই সাপটাকে মারা যায়। আর এই কেষ্ট মিত্র সেই সুযোগটাই নিচ্ছেন। 

রাজেশ জালানেরও যেহেতু বয়স হয়েছে তাই কথাগুলো মনে হোতেই মাথাটা এমন চিড়বিড়িয়ে উঠলো যে কেষ্ট মিত্রর মৌতাতটাকে না ভেঙে দিয়ে পারলেন না। 

--আজকের মিটিঙেই ডিলটা ফাইনাল কোরে ফেলেন মিস্টার মিত্তর। 

কথাটা শুনে কেষ্ট মিত্রর ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। চোখ না খুলেই বললেন, সেজন্যই কি আমাকে এভাবে জামাই আদরে নিয়ে যাচ্ছেন জালানবাবু? 

কথাটা শুনে জালানের মুখে একটা তিন অক্ষরের খিস্তি প্রায় উঠেই এসেছিল কিন্তু গিলে ফেললেন। কেষ্ট মিত্র তার কর্মচারি নন। ভুললে চলবে কেন এই লোকটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।

--এটা কী বোললেন মিত্তরবাবু! বিজনেস ম্যান বোলে কি ভদ্রতা জানি না? আমাকে এ রোকম ভাবলেন! 

উত্তর দিলেন না কেষ্ট মিত্র। চোখও খুললেন না। এমন কী ঠোঁটে সামান্য একটু হাসির রেখাও ফুটিয়ে তুললেন না। সাধে কী আর লোকজন বলে কাষ্ঠ মিত্র? 

রাজেশের অবশ্য তাতে কিছু এসে যায় না। করুক যা খুশী। চ্যালেঞ্জ না থাকলে ব্যবসায়ে মজা থাকে নাকি! নাহলে পৈত্রিক চাল-ডালের ব্যবসাটা নিয়ে থাকলেই তো হোত। সেটাও তো কম লাভজনক নয়। গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের সাপ্লায়ার জালান অ্যান্ড সন্স। চ্যালেঞ্জটা নিতেই তো চন্দনপুর চা বাগানটা কিনেছেন। পরিবারের সবাই আপত্তি জানিয়েছিল। আপত্তির কারণটা স্বাভাবিকও কারণ বহুদিন থেকেই নানা সমস্যায় ভুগছে চন্দনপুর। কিংবা বলা ভালো সমস্যায় ভোগানো হচ্ছে। লাভে চলা বাগানটাকে নিয়ে আসা হয়েছে লোকসানের আঙিনায়। একের পর এক মালিকানার হাত বদল হয়েছে, সবাই লাভের গুড়টা খেয়ে চলে গিয়েছে, শুধু চন্দনপুরের ভবিষ্যত অন্ধকারে ডুবেছে। এরকম চা বাগান কেউ কেনে নাকি! রাজেশ জালান কিনেছেন। শুধু কেনা নয় ঘরের টাকায় শ্রমিক, কর্মচারিদের বকেয়াও খানিকটা মিটিয়েছেন। মিডিয়াও ধন্য ধন্য করেছে এতদিন। কিন্তু কেনার উদ্দেশ্যটা যখন চরিতার্থ করতে চলেছেন তখনই মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে বিভিন্ন সংগঠন। এতদিন কোথায় ছিল এরা? তিলে তিলে যারা বাগানটার সর্বনাশ করেছে তাদের বিরুদ্ধে তো কখনও আঙুল তোলেনি! এখন সুষ্ঠু মীমাংসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইছে। আসলে এরা চায় না সমস্যাটার সমাধান হোক। সেই না চাওয়া লোকগুলোর প্রধান মাথা এই কেষ্ট মিত্র। এই মাথাটাকে না নোয়ানো অবধি শান্তি নেই রাজেশ জালানের। 

--আপনি তো ভালো মতোই জানেন মিত্তরবাবু চন্দনপুর টি এস্টেট ইজ নাউ এ লস্ট কেস। কেউ বাঁচাতে পারবে না। বরং ডিলটা হোয়ে গেলে সবার লাভ হোবে। 

এবার চোখ খুললেন কেষ্ট মিত্র।

--লস্ট কেস বললেই তো হবে না মিস্টার জালান, লস্ট কেন সেটাও বোঝাতে হবে। চায়ের ডিমান্ড কি কমে গিয়েছে? মার্কেট কি খুব খারাপ? অন্য বাগানগুলো যখন ফুলে ফেঁপে উঠছে তখন চন্দনপুর কেন পারবে না? চন্দনপুরের চায়ের ডিমান্ড তো কম ছিল না!

--পাস্ট ইজ পাস্ট। আচ্ছা, বোলেন তো লাস্ট কবে প্রোডাকশন হয়েছে চন্দনপুরে? কত কেজি? নিলামে কি রেট উঠেছিল? 

পাশে রাখা প্যাকেট থেকে ফের একটা সিগারেট ধরালেন কেষ্ট মিত্র। মৌজ করে টান দিয়ে বললেন, আপনি কি আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছেন মিস্টার জালান? আপনি জানেন না এসব তথ্য? না জেনে বাগানটা কিনেছিলেন? 

--জানি জন্যই তো লস্ট কেস বোলছি। 

-- শুধু বললেই তো হবে না, চেষ্টাও তো করতে হবে বাঁচিয়ে তোলার। কেনার পর থেকে তো বাগানটা বন্ধ করেই রেখে দিয়েছিলেন। প্রোডাকশন চালু করুন দেখবেন পুরনো দিন ঠিক ফিরে আসবে। আপনি ঠিক পারবেন ফিরিয়ে আনতে। আপনার সেই ক্ষমতা আছে।

জালান বুঝলেন গ্যাস খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন কেষ্ট মিত্র। তবে খুব সস্তা গ্যাস। এত ঘটনা ঘটে যাবার পর ফের চন্দনপুর চা বাগান চালু করার প্রশ্নই ওঠে না। জালান চাইলেও পারবেন না। কেউই চায় না বাগানটা চালু হোক এবং সে কথা ভালোই জানা আছে কেষ্ট মিত্রর। 

প্যাঁচ কষার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন রাজেশ, যদি চালু কোরি পাশে থাকবেন? লোনের বেওস্থা কোরবে গভমেন্ট? বোলেন, তাহলে মিটিঙে বোলবো। 

উত্তর না আসায় পেছনে তাকালেন রাজেশ, ফের চোখ বুঁজে ফেলেছেন কেষ্ট মিত্র। অর্থাৎ উত্তর নেই। থাকার কথাও নয়। এতদিন কিভাবে পাশে ছিল সেটা অন্যদের মতো নিজেরাও জানে।

প্যাঁচটাকে আরেকটু কষে দিতে ফের জিজ্ঞেস করলেন রাজেশ, আমি যদি বাগানটা এখোন ছেড়ে দেই, কি কোরবেন আপনেরা? 

চোখ বন্ধ রেখেই মুখে পুরোন হাসিটা ফোটালেন কেষ্ট মিত্র।

-- ছাড়তে পারবেন? নেওটিয়ারা ছাড়তে দেবে আপনাকে? 

কথাটা শুনে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলার ইচ্ছা হলো রাজেশের। একটা পেল্লায় ঘুঁষি হাকানো যায় না শয়তান লোকটার মুখে? নিজের পক্ষে সম্ভব না হলে ড্রাইভারটাকে তো হুকুম করাই যায় মেরে পাশের ধানক্ষেতে ফেলে দেয়ার! বদমাইশির একটা সীমা থাকা উচিত। রাজেশকে বেকায়দায় ফেলে দিয়ে এখন কিনা সেটা নিয়ে মজা করছে?

যদিও নিমেষে নিজেকে আয়ত্বে নিয়ে নিলেন রাজেশ জালান। সেটাই স্বাভাবিক। খুচরো ব্যবসায়ীরা মাথা গরম করলেও শিল্পপতিদের সে সুযোগ নেই। এ রাজ্যে শিল্প গড়তে গেলে যে প্রতিপলে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয় সেটা কি জানতেন না রাজেশ? জেনে বুঝেই যেহেতু পা বাড়িয়েছেন তাই ফের ঘাড় ফেরালেন।

--এটা তো পুরা না ইন্সাফি হোচ্ছে মিস্টার মিত্তর! কোনট্রাকটে যাওয়ার আগে তো পুরা প্ল্যানটা ইন ডিটেইলস জানিয়েছিলাম আপনাদের। তোখন তো কোনো লেভেল থেকে ওবজেকশন আসেনি। বরং এনকারেজ কোরা হোয়েছিল। এখোন পিছন থিকে ছুরা মারছেন কেনো? 

গাড়ির আরামে বুঁদ থেকেই কেষ্ট মিত্র জবাব দিলেন, কে কাকে ছুরি মারছে সেটা আপনিই ভেবে দেখুন। আমাদের অবস্থাটা কখনও ভেবে দেখেছেন? না পারছি এগোতে না পারছি পিছিয়ে আসতে।

--পিছিয়ে আসার কী ওসুবিদা? সোরকার যোখন ওবজেকসন দিচ্ছে না তখন আপনেদের কী!

--সরকার চোখ বুঁজে আছে জন্যই তো ঝামেলাটা হচ্ছে।

--কীসের ঝামেলা! দল আর সোরকার কি আলাদা?

--সব সময় নয়। যে কাজে রিস্ক থাকে সেখানে আলাদা। সরকার তখন সব দায় চাপিয়ে দেয় দলের কাঁধে। সরকারের রেপুটেশন খারাপ হলে ধর ব্যাটা কেষ্টকে। 

--এখানে তো রিস্কের কিছু নেই? কমপেনসেশন তো দিচ্ছি। আমি তো কিচ্ছু না দিয়েই ডিলটা করতে পারতাম।

অনেকক্ষণ নিজের স্বাভাবিক রুক্ষতা চেপে রেখেছিলেন কেষ্ট মিত্র। এবং সেটা গাড়ি চড়ানোর কৃতজ্ঞতা বশতঃ নয়। একেই রাজেশের হাত অনেক লম্বা তার সঙ্গে জুটেছে নেওটিয়াদের হাত। নাহলে একটা চা বাগানের জমিতে কখনও আবাসন গড়ে তোলা যায়? আইনে স্পষ্ট বলা আছে, চা বাগানের জমিতে শুধু চা বাগানই করতে হবে। সেই আইনটাই যারা বদলে দিতে পেরেছে তারা যে একটু অসতর্ক হলেই কেষ্ট মিত্রর ঘাড়টাই মটকে দেবে, এতে সন্দেহ কোথায়! যদিও মৃত্যুভয় নেই কেষ্ট মিত্রর কিন্তু এই ঘাড়ের সঙ্গে বহু মানুষের ঘাড়ও যেহেতু মটকে যাবে, চিন্তাটা সেখানেই। তাবলে ভয়টাও যেহেতু প্রকাশ করা যাবে না তাই রুক্ষতার সামান্য একটু নমুনা পেশ না করে পারলেন না। 

--কিসের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন জালান সাহেব, জীবনের, নাকি পরিবেশের? শহরের গা ঘেষে থাকা এই ফুসফুসটা কংক্রিটে মুড়ে দেয়ার পর প্রজন্মের পর প্রজন্ম যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে পারবেন সেই ক্ষতিপূরণ করতে? পরিবেশের কথা নাহয় ছেড়েই দিলাম, ওটা আমার এক্তিয়ার নয়, কিন্তু আপনার অফার করা ত্রিশ লাখ টাকা ভাগ হওয়ার পর মাথাপিছু কত পড়বে, সেটা ভেবে দেখেছেন? ওদিয়ে বাকি জীবন চলে যাবে আমার ইউনিয়নের মেম্বারদের? 

এরপর রাজেশ জালান জানতে চাইতেই পারতেন, এতদিন কিভাবে চলছে কেষ্ট মিত্র'র মেম্বারদের জীবন? বহুদিন ধরেই তো বেতন বন্ধ! বরং ঝামেলাটা বাঁধার পর কিছুটা পয়সার মুখ দেখছে শ্রমিক-কর্মচারিবৃন্দ। একটা কমিটি গড়ে উঠেছে, চন্দনপুর চা বাগান বাঁচাও কমিটি। চাঁদাও উঠছে। 

কিন্তু এ প্রশ্ন করার অর্থই তো আজকের মিটিংটাকে ভেস্তে দেয়া। তখন ব্যর্থতার সব দায় রাজেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে কেষ্ট মিত্র। সরকার নিজেকে বাঁচাতে প্রোজেক্টটা ক্যানসেল করে দেবে আর তখন নেওটিয়ারা চেপে ধরবে রাজেশকে। সুতরাং রাজেশ বাধ্য হলেন সুর নরম করতে। 

--কমপেনসেশন এমাউন্টটা নিয়ে কোথা বোলা যেতেই পারে। জবের ব্যাপারটাও কন্ডিশনে থাকতে পারে। ওসুবিদা কিসের? মিটিংটা তো নেগোসিয়েশনেরই! 

রাজেশের প্রস্তাবে হাসলেন কেষ্ট মিত্র।

--চাকরির ব্যাপারে আপনি প্রস্তাব দেবেন কিভাবে জালানবাবু? ওটা তো নেওটিয়াদের হাতে!

--আমি কন্ডিশন রাখবো। ইন রাইটিং। না মানলে ডিল হোবে না। ওক্কে? 

এই শর্তটাই চাইছেন কেষ্ট মিত্র। তবু চোখ খুললেন না। মাথাও নাড়ালেন না। 



২.

ব্রেকফাস্ট টেবিলে আড্ডা বসেছে। যথারীতি প্রধান বক্তা মল্লিকা। শ্রোতা দুজন, বাপ আর মেয়ে। গল্পগুজব করার জন্য সারাদিনে এই একটা মাত্র সময়ই বরাদ্দ। আগে তো এই সময়টুকুও পাওয়া যেত না। সকাল হলেই বেরিয়ে পড়তে হোত কেষ্ট মিত্রকে, কাজ কর্ম সেরে ফিরতে ফিরতে বেলা গড়িয়ে যেত। ততক্ষণে মা, মেয়ে দুজনেই বেরিয়ে গিয়েছে। একজন পড়াতে অন্যজন পড়তে। বিকেলে ওরা যখন ফিরত তখন কেষ্ট মিত্র ফের বাইরে। বেশ কিছুদিন হলো রুটিনটা বদলে গিয়েছে। সকালে বের হওয়াটা বন্ধ করেছেন কেষ্ট মিত্র। স্বেচ্ছায় নয়, ডাক্তারের হুকুমে। স্নান-খাওয়া নিয়ে একদম অনিয়ম করা যাবে না। অগত্যা বাধ্য হয়েছেন বাড়িতেই অফিস বানিয়ে নিতে। ব্রেকফাস্ট সেরে বসবেন অফিসে। বের হবেন বিকেলে। প্রথম প্রথম অস্বস্তি হলেও ইদানিং ভালোই লাগে এই গল্প-গুজবটুকু।

স্কুলে ঘটে যাওয়া একটা মজার ঘটনা শোনাচ্ছেন মল্লিকা। সদ্য জয়েন করা এক টিচারের প্রেমিক স্কুলে দেখা করতে এসে কি রকম নাকাল হয়েছে সে গল্প। এমন কী হেডমিস্ট্রেস হওয়া সত্বেও খোদ মল্লিকাও যে সেই র‍্যাগিঙে অংশ নিয়েছিলেন, খোলাখুলি বলছেন সে কথাও। সৃজা যথারীতি প্রতিবাদ করছে, দিস ইস ইনহিউম্যান মা। অ্যাটলিস্ট তুমি তো হেল্প করতে পারতে? 

কেষ্ট মিত্র যতটা না মনযোগ দিয়ে শুনছেন তারচেও বেশি ভাবছিলেন পুরোন দিনের কথা। আজ যিনি সহকর্মীর নার্ভাসনেস নিয়ে মজা করছেন একদা তিনিও কি প্রেমের ব্যাপারে কম নার্ভাস ছিলেন? পার্টি করা মেয়ে অথচ আড়ালে দুটো কথা বলতে গিয়ে কেঁপে সারা হোতেন। কিভাবে যেন চিত্তদার কানে পৌঁছে গিয়েছিল খবরটা। কেষ্ট মিত্রকে কিচ্ছু না বলে সোজা মল্লিকাকে পাকড়াও করেছিলেন, তুমি নাকি কেষ্টকে ভালোবাসো? কী দেখে ভালোবাসলে ওই শুকনো কাঠটাকে? বলো?

ওরকম একটা দশাসই চেহারার লোকের ওরকম ধমকানির মুখে পড়ে যে কেঁদেই ফেলেছিলেন মল্লিকা সে কথাটা এখন মনে করিয়ে দেবেন নাকি কেষ্ট? মেয়ের সামনে আচ্ছা জব্দ হবে মল্লিকা। 

আচমকা ফোন বেজে উঠতেই গল্পটা থেমে গেল। তিনজন পরস্পরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। অর্থাৎ কে যাবে ফোনটা ধরতে। যদিও ফোনটা কেষ্ট মিত্ররই হওয়ার কথা কারণ এ বাড়িতে একমাত্র ওঁরই মোবাইল নেই। বাড়িতে এনিয়ে যথেষ্ট রাগারাগি হয়েছে কিন্তু কোনো চাপের কাছে মাথা নোয়াননি। মোবাইল থাকলে লোকজন তিষ্ঠোতে দেবে নাকি! মিটিঙের মধ্যেও জ্বালিয়ে খাবে।

ফোনটা বেজেই চলেছে। কেষ্ট তাকালেন মেয়ের দিকে। মাথা নামিয়ে হাত দুটো ওপরে তুলে দিলো সৃজা, অর্থাৎ যাবে না। মল্লিকা গম্ভীর মুখে কাপ-প্লেট গুছিয়ে ঢুকে গেলেন রান্নাঘরে। অর্থাৎ সময় নেই। অজুহাতটা অবশ্য মিথ্যে নয়। রান্নার মেয়েটাকে সব বুঝিয়ে এখনই স্নানে যেতে হবে। নাহলে স্কুলে পৌঁছতে দেরী হয়ে যাবে। কেষ্ট মিত্রও ব্যাপারটাকে অনুমোদন করেন না। হেডমিস্ট্রেস যদি ডিসিপ্লিন না মানে তাহলে অন্যরা মানবে কেন?

অগত্যা ডাইনিং টেবিল ছেড়ে উঠতেই হলো কেষ্ট মিত্রকেই।

--হ্যালো?

--মিত্তরবাবু, আমি রাজেশ জালান বোলছি।

এতক্ষণের ফুরফুরে মেজাজটা নিমেষে কেটে গেল কেষ্ট মিত্রর। আবার কী চায় হারামজাদাটা? সেদিন মিটিঙে এই লোকটার জন্য অনেক কথা শুনতে হয়েছে। গাড়িতে যে নেগোসিয়েশনের কথা বলেছিল মিটিঙে তা নিয়ে উচ্চবাচ্যটুকুও করেনি। বরং বলে কিনা এর আগেও তো সরকার বহুবার শহরের উন্নতির জন্য চন্দনপুরের জমি বিনে পয়সায় অধিগ্রহণ করে নিয়েছে, তখন তো এত ঝামেলা হয়নি! এখনও তো শহরের উন্নতির জন্যই চন্দনপুর স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছে, তাহলে এত বিরোধিতা কেন? 

কাকে কী বোঝাতে চায় খচ্চরটা? সরকারের জমি অধিগ্রহণ আর বিক্রি করে মুনাফা করা, এক কথা? তাছাড়া কিভাবে উন্নতি হবে শহরের? ওখানকার ফ্ল্যাটের যা দাম হবে সাধারণ মানুষ পারবে কিনতে? বরং বড়লোকের ফার্ম হাউস হয়ে উঠবে।

অবশ্য মুরুব্বি জোটাতে না পারলে মিটিঙে অত বড় বড় কথা বলার মুরোদ হোত না জালানের। সেদিন পার্টিতে জয়েন করা নিতাই সামন্ত রাতারাতি নেতা হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করা শুরু করে দিয়েছে! রাজেশের তালে তাল দিযে বলে কিনা, চন্দনপুর ক্রমশ সমাজবিরোধীদের হাতে চলে যাচ্ছে! কাদের দিকে ইশারা করল নিতাই? নীতির বিরোধিতা আর সমাজ বিরোধিতা এক?

অবশ্য নিতাই সামন্তকে দোষ দিয়ে লাভ কী! মিটিঙের রিপোর্ট শুনে খোদ চিত্তদা কিনা বলে বসল, শিল্পায়ন ছাড়া রাজ্যের উন্নতি সম্ভব নয়! চা বাগান বিক্রি করে উপনগরী গড়ে তোলাটার নাম শিল্পায়ন? এসব ছেঁদো যুক্তির প্রয়োজন হচ্ছে কেন সেটা বুঝতে তো কারোরই অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। 

রাজেশের গলার আওয়াজ শুনে যতই বিরক্ত লাগুক যেহেতু সেটা প্রকাশ করা যাবে না তাই ব্যঙ্গের সুরে বললেন কেষ্ট মিত্র, আবার লেটেস্ট কি কিনলেন, হাতি নাকি ঘোড়া? আমার কিন্তু ওসবে চড়ার শখ কিংবা সাহস, কোনটাই নেই। 

রাজেশও হাসলেন।

--নাকি হিম্মত নেই?

কেষ্ট মিত্র খেয়াল করলেন ‘হিম্মত’ শব্দটার সঙ্গে তাচ্ছিল্য মেশালেন রাজেশ জালান। গায়ে মাখলেন না কেষ্ট মিত্র।

--বলতে পারেন সেটা। মেহনতি মানুষের অত হিম্মত থাকে না। থাকতে নেই। 

--কে মেহনতি মানুষ নয় বোলেন তো মিত্তরবাবু? বিজনেস ম্যানরা মেহনত করে না? আপনের পেছনেই তো কুলির মতো মেহনত করতে হচ্ছে আমাকে, ফিরভি কোনো ফয়দা পাচ্ছি না। 

কেষ্ট মিত্র বুঝলেন ফের প্যাঁচ খেলতে শুরু করেছেন রাজেশ জালান। সাত সকালে এ কেমন দিকদারি! 

--নিজের ফয়দার কথাটা কম ভেবে একটু মানুষের ফয়দার কথা ভাবুন, দেখবেন, বেশি মেহনত করতে হবে না।

--সেইজন্যই তো ফোনটা কোরলাম মিত্তরবাবু। আপনাকে একটু আসতে হবে। একটা প্রোপোজাল দেবো, দেখবেন আপনার পসন্দ হোয়ে যাবে।

--আবার নতুন কি প্রপোজাল ভাবলেন? 

--ফোনে তো বোলা যাবে না। অনেক বাতচিত কোরতে হোবে। তাছাড়া সোঙ্গে তো আরও লোকজন থাকবে। তারা ভি কিছু বোলবে।

--কারা থাকবে?

--সারপ্রাইজ। ধরে নিন নেওটিয়াদের লোকজন। 

কেষ্ট মিত্র একবার ভাবলেন পার্টি অফিসে চলে আসতে বলবেন কিন্তু সামলে নিলেন। ওখানে একা একা কথা বলার উপায় থাকবে না, অনেক ফড়ে জুটে যাবে। যদি সত্যিই কোনো ভালো প্রোপোজাল দেয় জালান তাহলে সেটার কৃতিত্ব নেবে চিত্ত সামন্ত। এত খাটুনি বৃথা যাবে। তারচে বরং নিজেই জটটা খুলে কেষ্ট মিত্র দেখিয়ে দেবেন, আন্দোলনই পারে সমস্যার সমাধান করতে।

--কোথায় যেতে হবে? কখন?

হো হো করে ওপ্রান্ত থেকে হাসি ভেসে এলো, সাসপেন্সটা থাকুক। তিনটে নাগাদ গাড়ি পাঠিয়ে দেব, চোলে আসবেন।

ফোন রাখতে রাখতে বললেন, ভোয় নেই, খারাপ জায়গায় নিয়ে যাব না। 



৩.



হাইওয়ের পাশে এরকম অনেক রেস্তরাঁ গজিয়ে উঠেছে। খাটিয়ে পাতা লাইন হোটেল নয়, রীতিমত তাক লাগানো সাজসজ্জা। যাতায়াতের পথে চোখে পড়েছে কেষ্ট মিত্রর। ওগুলোর আদৌ লাইসেন্স আছে কিনা কে জানে! সম্ভবত নেই। শিল্পায়নের তত্বে বিশ্বাসী সরকার কি আর ওসব দেখতে যায়?

সামনের লনে ছাতার নীচে সাজানো চেয়ারে বসতে চাইছিলেন কেষ্ট মিত্র, বাধা দিলেন রাজেশ জালান, ভিতরে চোলেন। এসি আছে। আরাম কোরে কথা বোলা যাবে।

--এখানেই তো বেশী আরাম হবে। প্রাকৃতিক বাতাস কি এসির চে’ কম কিছু?

বিরক্ত হোলেন রাজেশ। 

--কেসটা তো শুধু আরামের না, প্রাইভেসি বোলেও তো একটা বেপার আছে। আপনি ফেমাস লোক। কেউ দেখে ফেললে বাত বাড়াবে, আমাদের ডিস্টার্ব হোবে।

কথাটায় যেহেতু যুক্তি আছে তাই মেনে নিলেন কেষ্ট মিত্র।

ভেতরটা সত্যিই আরামদায়ক। লোকজন তেমন নেই। যারা আছে তাদেরও চেনা যাচ্ছে না উপযুক্ত আলোর অভাবে। রেস্তরাঁগুলোর ভেতরটা কেন যে এরকম অন্ধকার রাখা হয় কে জানে! মানুষ কি আজকাল অন্ধকারকেই বেশি পছন্দ করছে? 

--আপনার লোকরা কোথায় জালানবাবু?

হাসলেন জালান। মোবাইলে খুটখাট করতে করতে বললেন, চোলে আসবে। আগে বোলেন কি খাবেন?

--দুপুরের খাওয়াটাই হজম হয়নি। শুধু একগ্লাস জল দিতে বলুন। 

সত্যিই তেষ্টা পেয়েছিল। এক নিঃশ্বাসে গ্লাস শেষ করে কেষ্ট মিত্র বললেন, ঠিক আছে, য়খন আসার আসবে, ততক্ষণ আপনি আপনার কথা বলুন। 

--কত টাকা দিতে হোবে, আপনিই বোলেন। 

বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে জেনেও কেষ্ট মিত্র বললেন, এক কোটি। 

শুরুটা হোক না, তারপর দর কষাকষি করা যাবে। 

ঘাঘু ব্যবসায়ী রাজেশ জালানের যথারীতি কেষ্ট মিত্রর চালটা বুঝতে অসুবিধে হলো না। 

--ওতো টাকা দেয়ার ক্যাপাসিটি যে আমার নাই সেটা আপনিও জানেন মিত্তরবাবু।

--কতটা দেয়ার ক্যাপাসিটি আছে?

--ম্যাক্সিমাম ফিফটি। ওক্কে? 

রাজেশের প্রস্তাবে চিন্তায় পড়ে গেলেন কেষ্ট মিত্র। হঠাৎ হলো কী ব্যাটার! রাতারাতি প্রায় দ্বিগুণ টাকা দিতে রাজী হয়ে যাচ্ছে। মুরুব্বিরা কি হাত গুটিয়ে নিয়েছে? নাকি নেওটিয়ারা হুমকি দিচ্ছে? কারণ যেটাই হোক আখেরে লাভ তো চন্দনপুরের শ্রমিক-কর্মচারিদেরই হোতে চলেছে। নেওটিয়ার লোকজন এলে যদি চাকরির ব্যাপারটায় রাজী করানো যায় তাহলে তো সোনায় সোহাগা। গলা থেকে চন্দনপুর নামের কাঁটাটা কৌশলে সরিয়ে দিতে পারার কৃতিত্বে হয়ত পার্টি কেন্দ্রিয় কমিটিতে জায়গা করে দেবে।

--ওক্কে। বাট ওয়ান কন্ডিশন, টাকাটা কিন্তু ক্যাশে দিতে হবে, চেক ফেক চলবে না। নাহলে কিন্তু ফের ঝামেলা বাঁধবে।

কেষ্ট মিত্রর শর্ত শুনে হাসলেন রাজেশ জালান।

--অবভিয়াসলি। কিন্তু ওতো টাকা তো একসাথে দিতে পারব না। চারটে ইনস্টলমেন্টে দেব।

--অহেতুক গরিবীপনা দেখাবেন না জালানবাবু। ওই টাকাটা আপনার কাছে নস্যি। 

--নস্যি নাকি গুটখা, সেটা তো আমিই জানি! এছাড়া একাউন্টসের বেপারও তো আছে।

--ঠিক আছে, চারটে নয়, দুটো ইন্সটলমেন্ট। ওক্কে?

--ওক্কে। ডান। আমি একটু বাইরে গিয়ে দেখি ওরা এলো কিনা। আপনি তোতক্ষণ কিছু একটা খেতে থাকুন। এখানকার বিরিয়ানি দারুন টেস্টি।

কয়েক পা গিয়ে ফের এলেন রাজেশ জালান। ওপাশে থাকা ব্রিফকেসটা রাখলেন কেষ্ট মিত্রর পাশের চেয়ারে।

--একটু খেয়াল রাখবেন। 

হাসলেন কেষ্ট মিত্র। এই না হলে ব্যবসায়ী! সব সময় মানুষজনকে চোর ভাবে। 

--আপনার নাম কৃষ্ণচন্দ্র মিত্র? 

বিরিয়ানির মাংসটা জুত করে খেতে থাকা কেষ্ট খেয়ালই করেননি কখন চারজন লোক টেবিলের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। বুঝলেন, এদের কথাই বলেছিল রাজেশ জালান। কিন্তু সে নিজে কোথায়!

হয়ত খাবারের অর্ডার দিচ্ছে, ভেবে কেষ্ট মিত্র বললেন, বসুন, বসুন।

এমন ভদ্রতা সত্বেও একজন রুক্ষস্বরে জবাব দিলো, বসতে আসিনি। ব্রিফকেসটা খুলুন।

অবাক হলেন কেষ্ট, আমি খুলব কেন? ওটা তো আমার নয়! 

কথাটা শুনে লোকগুলোর ভেতর থেকে একজন খুললো ব্রিফকেসটা। কেষ্ট মিত্র দেখলেন তাড়া তাড়া নোট সাজানো।

ব্রিফকেসটা বন্ধ করে লোকটা বললো, আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে মিস্টার মিত্র। আমরা এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে আসছি। আপনার বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেলিঙের অভিযোগ আছে।

এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন কেষ্ট মিত্র। তাকালেন চারদিকে। কোথাও রাজেশ জালান নেই। পা দুটো কেঁপে ওঠা সত্বেও গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করতে করতে বললেন, একটা ফোন করতে পারি?

--নট নাউ। 



৪. 

খেলাধুলোর জগতে একটা কথা চালু ছিল, বসে যাওয়া অথবা বসিয়ে দেয়া। কোনো খেলোয়ার শারীরিক ভাবে অসমর্থ হলে নিজেই স্বেচ্ছায় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। আবার কখনও লাগাতার ব্যর্থতার কারণে টিম ম্যানেজারও তাকে জোর করে বসিয়ে দেয়। কেষ্ট মিত্র কোন গ্রুপে পড়বেন? নিজে হয়ত প্রথম গ্রুপের মেম্বার হোতেই চাইবেন কিন্তু দুনিয়া তাকে দ্বিতীয় গ্রুপেই ঠেলে দেবে। কারণ, হয়ত কেষ্ট মিত্র পার্টির শো-কজের জবাব দেননি কিন্তু দিলেও বহিষ্কারের হাত থেকে রেহাই পেতেন? অবশ্যই নয়। কারণ তাকে ছাড়াই যে গুরুত্বপূর্ণ পার্টি মিটিংটা হয়েছে সেখানে একজন সদস্যও পক্ষে কথা বলেনি। স্বামীকে প্রশ্রয় দেয়ার অপরাধে মল্লিকাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষক সমিতির পদ থেকে। যারা মল্লিকার পক্ষ নিয়ে ঈষৎ গাঁইগুঁই করেছিল তাদের তীব্র ভাবে ভর্ৎসনা করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, পার্টির ইমেজ নিয়ে কোনো ধরণের ছেলেখেলাকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। কেষ্ট মিত্রর কেসটা যেন সবাই দৃষ্টান্ত হিসেবে মনে রাখে। 

যদিও খবরগুলো কেউ বাড়ি বয়ে এসে জানিয়ে যায়নি কেষ্ট মিত্রকে। মল্লিকাও পার্টি অফিসে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। নেহাত মেম্বারশিপ ছাড়লে চাকরির ক্ষেত্রে অসুবিধে হবে তাই ওটুকু রেখে দিয়েছেন। অবশ্য মল্লিকা যদি খবরগুলো জানতেন তবু হয়ত স্বামীকে জানাতেন না। কেননা ঘটনাটা নিয়ে কোনদিন একটা কথাও বলেননি। কেষ্ট মিত্র খুলে বলতে চাইলেও শোনেননি, নিঃশব্দে উঠে গিয়েছেন। 

তাবলে কেষ্ট মিত্রর জানতে অসুবিধে হবে কেন? খবরের কাগজ আছে না? পার্টির যেকোনো গোপন মিটিঙেরও পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট পরদিন খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়ে যায়। শুধু কে কী বললো সেটুকু নয়, কোন কথা শুনে কার মুখের ভাব কেমন হয়েছিল তারও বিবরণ থাকে। দোরবন্ধ মিটিঙের খবর বের করা কিভাবে সম্ভব হয় কে জানে! তবে রিপোর্টগুলো যে মনগড়া নয় তার প্রমাণ পার্টির তরফ থেকে কোনো প্রতিবাদ ওঠেনি। 

চিরকালই খবরের কাগজ পড়ার নেশা কেষ্ট মিত্রর। এতদিন শুধু পার্টির মুখপত্র পড়েছেন এখন বুর্জোয়া সংবাদপত্র পড়েন। এবং মনে মনে স্বীকার করেন ওদের খবর পেশের ধরণটা সত্যিই মোহময়। কেমন যেন নেশা ধরিয়ে দেয়! যতদিন জামিন মেলেনি ততদিন অবশ্য সে সুযোগ ছিল না, বাড়িতে আসার পর সুযোগটা পাওয়া যাচ্ছে। নিজের খবর পড়তে পড়তেও অবাক হন কেষ্ট মিত্র, সত্যিই এতদিন রাজেশ জালানের থেকে মাসোহারা নিতেন নাকি! এবারের চাহিদাটা বেশি হওয়ায় রাজেশ জালান বাধ্য হয়েছিল পার্টিকে জানাতে? পার্টি থেকে শাসানো হয়েছিল তবু পরোয়া করেননি কেষ্ট মিত্র! হাজতের গরাদে নাকি মাথা ঠুকে ঠুকে রক্ত বের করে ফেলেছিলেন! 

খবরগুলো পড়তে অবাক হয়েছেন, এ কোন কেষ্ট মিত্রর কথা বলছে এরা? মানুষটা এরকম নাকি! 

শুধু কি নিজের সম্পর্কে জেনেছেন? জেনেছেন অন্যদের বিষয়েও। মোবাইলে নাকি আরও অনেক কুরুচিপূর্ণ কথা রেকর্ড করা ছিল, স্ত্রী এবং কন্যার কথা ভেবে সেগুলো মুছে দিয়েছেন রাজেশ? মল্লিকা নাকি প্রথমদিন হাজতে স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে যেতে চাননি! বলেছিলেন, ওই ঘৃণ্য মুখটা দেখতে চান না! বলেছিলেন নাকি মল্লিকা? তাহলে এত টাকা খরচ করে, দোরে দোরে হত্যে দিয়ে স্বামীকে জামিনে ছাড়াতে গেলেন কেন? যেহেতু এসব বিস্ময় ঘোচানোর উপায় নেই তাই নিজে নিজেই অবাক হয়েছেন। 

এসব অবশ্য অনেক আগেকার ব্যাপার। ইদানিং কেষ্ট মিত্র সংক্রান্ত খবর আর ছাপা হচ্ছে না। কোর্টে হাজিরা দিলে পরদিন একটা খবর থাকছে বটে কিন্তু সেটা বস্তুনিষ্ঠ। ফলে খবরটার ঠা্ঁই জুটেছে পঞ্চম পাতার অষ্টম কলামে, ছোট্ট পরিসরে। পাবলিক উৎসাহ হারালে খবরের কাগজের কিসের দায় পড়েছে পাতা নষ্ট করার! পৃথিবীতে মজার ঘটনা কিছু কম ঘটে না। সেগুলোই পাতা আলো করে রাখে। যেহেতু খবরের কাগজ পড়ে বিস্মিত হওয়ার একটা নেশা তৈরি করে ফেলেছেন কেষ্ট মিত্র তাই সেগুলোই পড়েন। জানেন অচেনা লোকের কেচ্ছা। তেমন খবর না পেলে বিজ্ঞাপনগুলোও খুঁটিয়ে পড়েন। সাবান, তেল, শ্যাম্পু থেকে কর্মখালি পর্যন্ত। ওসবেও বিস্মিত হওয়ার মতো অনেক উপাদান থাকে। এই তো আজই একটা আয়ুর্বেদিক ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞাপন রয়েছে। বেতনের অঙ্কটাও মন্দ নয়, শুরুতেই পঞ্চাশ হাজার। বেতনের অঙ্কটা অস্বাভাবিক লাগেনি কেষ্ট মিত্রর কারণ আজকাল আয়ুর্বেদের যে রমরমা বাজার চলছে সে খবর তিনি রাখেন। প্রতিটি প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনে লেখা থাকে, কেমিক্যাল নয়, হার্বাল জিনিসে তৈরি। এই তথ্যে নিশ্চয়ই কাজ হয় নাহলে খবরের কাগজে এত বড় বড় বিজ্ঞাপন দেয় কিভাবে? পড়তে পড়তে ভাবেন, আহা রে গ্রাম-গঞ্জের কবিরাজরা এই সুদিন দেখে যেতে পারলেন না। না খেতে পেয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেন!

সুতরাং বিজ্ঞাপনটার জন্য নয়, কেষ্ট মিত্র বিস্মিত হয়েছেন পদপ্রার্থীর আবশ্যিক যোগ্যতার কথা পড়ে। অভিজ্ঞতা নয়, কোম্পানি চাইছে সুবক্তা। কেন! 

খবরের কাগজটা কোলে বিছিয়ে যখন এসব আবোল তাবোল ভাবছিলেন কেষ্ট মিত্র ঠিক তখনই কলিংবেলটা বেজে উঠল। পরপর তিনবার। প্রথমবার সংক্ষিপ্ত, দ্বিতীয়বারের সময়সীমা তারচে খানিকটা বেশি, তৃতীয়বারেরটা তো প্রায় সিনেমা হলের শো ভাঙার সংকেতের মতো! 

প্রথমবারই শুনেছেন কেষ্ট মিত্র কিন্তু ওঠেননি। এই নিঝুম দুপুরে কে আসতে পারে? এই সময়টায় যিনি এ বাড়িতে থাকেন তিনি তো একজন ফুরিয়ে যাওয়া মানুষ, তার কাছে কার প্রয়োজন থাকতে পারে! 

--নমস্কার। আপনিই কি মিস্টার মিত্র?

দরজাটা পুরো না খুলে আগন্তুককে ভালো মতো জরিপ করলেন কেষ্ট মিত্র। টাক মাথা, মেরে কেটে পাঁচ ফুটের এ লোকটা যে কিনা এই গরমেও কোট পরে দরদরিয়ে ঘামছে, কে হোতে পারে! সবচে বিপজ্জনক হলো, এর হাতেও একটা ব্রিফকেস রয়েছে।

--ভেতরে আসতে পারি?

যতই ‘না’ বলার ইচ্ছে থাকুক ভদ্রতা বশত দরজাটা খুলে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন কেষ্ট মিত্র।

লোকটা বিনা অনুমতিতে চেয়ারে বসেই দাবী জানালো, একগ্লাস জল হবে? 

যদিও একগ্লাস জল চেয়েছে আগন্তুক কিন্তু গ্লাস আনতে হলে রান্নাঘরে যেতে হবে। বলা যায় না সেটুকু অনুপস্থিতির সুযোগেই ব্রিফকেসটা নিয়ে কোনো চাল খাটাতে পারে, তাই জলের বোতলটা এগিয়ে দিলেন কেষ্ট মিত্র। ভদ্রলোক পুরো বোতলটা শেষ করে দিলো। করুক সে সুযোগে কেষ্ট মিত্র আরও খুঁটিয়ে দেখলেন লোকটাকে। চেহারায় ছাপোষা মনে হলেও চোখ দুটোয় কাঁচা ধুর্তুমি রয়েছে। তাকানোর ধরণেই বোঝা যাচ্ছে অনেক ঘাটের জল খাওয়া চিজ। 

তা হোক, কেষ্ট মিত্রও এলেবেলে কেউ নন। তার অভিজ্ঞতার ঝুলিও ফেটে চৌচির।শোনা-ই যাক না লোকটার মতলব। বহুদিন পর কথা বলার মতো কাউকে পাওয়া গিয়েছে। এমন তেমন বুঝলে নাহয় ঘাড় ধরে তাড়িয়ে দেয়া যাবে। 

--বলুন?

--আয়াম নটবর মন্ডল, ম্যানেজিং ডিরেক্টর অফ মন্ডল হার্বালস।

কোম্পানির নামটা শুনে কোলের ওপরে থাকা খবরের কাগজটার দিকে তাকালেন কেষ্ট মিত্র। ঘটনটা নজর এড়াল না নটবর মন্ডলের।

--যাক, বিজ্ঞাপনটা দেখেছেন আপনি। থ্যাঙ্কস।

বিজ্ঞাপন তো দেয়া হয় মানুষের নজরে পড়ার জন্যই, তাহলে থ্যাঙ্কস কেন, বুঝতে পারলেন না কেষ্ট মিত্র। 

--কি প্রোডাক্ট তৈরি করেন আপনারা?

কেষ্ট মিত্রর কৌতূহলে খুশি হন নটবর। মুচকি হেসে টাইয়ের গিঁটটা ঢিলে করতে করতে বলেন, অনেক কিছু। গুড কাফসিরাপের নাম তো নিশ্চয়ই শুনেছেন? বাজারের সবচে চালু কাফ সিরাপ। 

নামটা না শোনা থাকা সত্বেও মাথা নাড়ালেন না কেষ্ট মিত্র। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের দিকে। ভদ্রলোক নিজের ঘাগুপনার প্রমাণ দিয়ে ফের বললেন, থ্যাঙ্কস। এখন আমরা একটা বিশেষ উইঙে কাজ করতে চাইছি, মেন্টাল প্লাস ফিজিকাল হেল্থ কম্বাইন্ড উইং। 

--বুঝলাম না! একটু ডিটেইলসে বলুন।

কেষ্ট মিত্রর আগ্রহ দেখে হাসলেন নটবর মন্ডল।

--খুলে বলব জন্যই তো এসেছি। আপনি তো জানেন সেক্স প্রবলেম এখন ওয়ার্ল্ডের সবচে বড় প্রবলেম। বর্তমান সময় আমাদের অনেক কিছু দিচ্ছি ঠিকই কিন্তু কেড়ে নিচ্ছে সবচে আসল সম্পদটা। সেটা হলো যৌনস্ফূর্তি। সেক্স কে না করে কিন্তু কতজন সেটা স্বতস্ফূর্ত ভাবে করে, বলুন তো? ম্যাক্সিমাম টু পারসেন্ট। বাকি নাইন্টি এইট পার্সেন্টের ভেতরে এইট্টি এইট পার্সেন্ট মানুষ কাজটা করতে হয় তাই করে, বাকিরা করেই না। 

নটবর মিত্রর শতকরা বিশ্লেষণে অবাক হন কেষ্ট মিত্র। এসব তথ্য কোথায় পেলেন ভদ্রলোক!

কেষ্ট মিত্র'র চোখে বিস্ময় ফুটে উঠতে দেখে খুশি হ'ন নটবর। সোৎসাহে বলে চলেন, এত স্ট্রেস, অ্যাংজাইটি, টেনশনের ভেতরে থাকলে পারফরম্যান্স ভালো হয় নাকি! ইম্পসিবল। এরকম একটা ন্যাচারাল কর্তব্যে অবহেলা করলে যা হয় সেটাই হচ্ছে। পৃথিবীটা ভরে যাচ্ছে ক্রাইমে। খবরগুলো খুঁটিয়ে পড়লে দেখবেন ইচ অ্যান্ড এভরি ইনসিডেন্টের পেছনে মোটিভ হিসেবে কাজ করেছে সেক্সুয়াল ডিপ্রেশন। আমাদের মেডিসিন সেই ডিপ্রেশনটা কাটিয়ে দেবে। তৈরি করবে স্ফূর্তিতে ঝলমল করা সমাজ। 

‘ঝলমল’ শব্দটা এতদিন ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনেই পড়েছেন কেষ্ট মিত্র, এই প্রথম ওষুধের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হোতে শুনলেন। মন্দ কী! আজকাল বিজ্ঞাপনই তো নতুন নতুন শব্দ সৃষ্টি করার দায়িত্বে রয়েছে। কিন্তু যেটা বুঝতে পারছেন না কেষ্ট মিত্র তাহলো তার কী করার আছে? এই সত্তর পেরুনো জীবনে নিশ্চয়ই ঝলমলে হয়ে উঠতে চাইবেন না! 

--আমার কাছে এসেছেন কেন?

নটবর মন্ডল সম্ভবত এই প্রশ্নটার অপেক্ষাতেই ছিলেন। রীতিমত লাফিয়ে উঠলেন।

--আপনার কাছেই তো আসতে হবে। আপনিই তো স্বপ্নের আসল ফেরিওলা। ইন ফ্যাক্ট আরও আগে আসা উচিত ছিল, তাহলে বিজ্ঞাপনের খরচটা বেঁচে যেত। ব্যাড লাক। ইনফর্মেশনটা দেরিতে এলো। পাওয়া মাত্র ছুটে এসেছি। কোনো স্টাফকে পাঠাইনি নিজে এসেছি।

--কিসের ইনফর্মেশন?

--আপনার পারফর্মেন্সের। প্রত্যেকটা লোক প্রশংসা করেছে আপনার। বলেছে, আহা, যেমন ভয়েস তেমনই প্রেজেন্টেশন। এত নিখুঁত ভাবে স্বপ্ন দেখাত যে শুনতে শুনতে ঘোর লেগে যেত। মনেই হোত না মনগড়া অবাস্তব কথা বলছে! কেষ্টবাবুর সবকথা বিশ্বাস করে ফেলতাম। 

নটবর মন্ডল যে চেয়ারটায় বসেছেন সেটা কেষ্ট মিত্রর হাতের নাগালের বাইরে বটে তবে পায়ের নাগালের ভেতরেই। একটা আলতো কিকেই মানুষসহ চেয়ারটাকে দরজার ওপারে পাঠিয়ে দেয়া যায়। উঠে দাঁড়ালে তো হাত-পা দুটোই ব্যবহার করা যায়। কিন্তু তীব্র আলস্য এমন ভাবে ঘিরে ধরে কেষ্ট মিত্রকে যে অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হন নটবর মন্ডলের দিকে।

টোপ ধরেছে বুঝতে পেরে ফের ঘোড়া ছোটান নটবর।

--ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কেন নষ্ট করবেন আপনার এই ঈশ্বর প্রদত্ত ক্ষমতাটাকে? কেন তিলে তিলে ক্ষয় করবেন স্বপ্ন ফিরি করার শক্তি? ঝলমল করে উঠুন। আপনাকে দিয়ে আমরা ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে সেমিনার করাবো। মানুষকে ফের স্বপ্ন দেখাবেন আপনি। ঝলমলে হয়ে ওঠার স্বপ্ন। কথার জাদু দিয়ে ফের সবাইকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করবেন, একমাত্র আমারাই পারি সব সমস্যার সমাধান করে ঝলমলে সমাজ গড়ে তুলতে। আপনি তো চিরকাল এমন সমাজই দেখতে চেয়েছিলেন মিস্টার মিত্র। সো, কাম অন। জয়েন আস। 

কথাগুলো শুনতে শুনতে কেষ্ট মিত্র তাকালেন কলিংবেলটার দিকে। বহুদিন হলো বিকল হয়ে পড়ে আছে। মল্লিকা কবে যেন বলছিল, নতুন একটা কলিংবেল কিনে আনবে। আজকাল নাকি সুন্দর সুন্দর বাজনা বাজানো কলিংবেল পাওয়া যায়।

কোলে রাখা খবরের কাগজটা ভাঁজ করতে করতে কেষ্ট মিত্র সিদ্ধান্ত নিলেন মল্লিকাকে নিষেধ করবেন। বলবেন, কলিংবেলের আওয়াজে বুকে ভেতরটা ধড়ফড়িয়ে ওঠে। এখন আগন্তুকদের না আসা-ই ভালো।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ