কথাশিল্পের মায়ায় গাঁথা এই বসুন্ধরা


✍🏼 অমিতাভ ঘোষ

ছেলেবেলায় ছুটির দিনগুলো কেটে যেত কলকাতায়, আমার দাদামশায়ের বাড়িতে। আর সেখানেই আমার বইপড়ার শুরু। সে বাড়িতে হইচই লেগে থাকত সর্বক্ষণ। একগাদা মামা, মামী, মাসতুতো-মামাতো ভাইবোন আর আশ্রিতদের ভিড় ছিল সেখানে। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ছিলেন সৃষ্টিছাড়া, খেপাটে ধরনের; কেউ বা সামান্য ছিটগ্রস্ত। কিন্তু একটা ব্যাপারে তাঁদের মধ্যে খুবই মিল ছিল— সামান্য উসকানিতেই উত্তেজিত হয়ে উঠতেন সবাই। এসব কিছু সত্ত্বেও, পঠন সম্পর্কে আমি স্কুলে যা শিখেছি, তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছি এই বাড়িতে।

দাদামশায়ের বাড়ির দেওয়ালগুলোতে ছিল পরপর বইয়ের সারি—কাচে ঢাকা আলমারিতে সুন্দরভাবে সাজানো। বিরাট হলঘরে আলমারিগুলো এমনভাবেই ছিল যে চোখে না পড়ে উপায় নেই। হলঘরটায় প্রায়ই একটা না একটা পারিবারিক অনুষ্ঠান লেগেই থাকত, এমনকী বৈঠকখানা বা খেলার মাঠের কাজ চালাতেও ওই হলঘর। আর সেখানে উঁচু আলমারিগুলো ওপর থেকে ঠায় চেয়ে থাকত, যেন আড়ি পেতে প্রতিটি কথা শুনত, বাচ্চারা ঝগড়া করলে কটমট করে তাকাত। বাড়ির সব কেচ্ছা আর হাঁড়ির খবর রাখত তারা। আলমারিগুলোর এই নীরব গোয়েন্দাগিরিতে ব্যাঘাত ঘটত কালেভদ্রে, বইগুলোতে কেউ প্রায় হাত-ই দিত না। গোটা বাড়িতে একমাত্র আমিই বোধহয় নিয়মিত সেগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করতাম, কিন্তু বছরে কয়েক মাসের বেশি আমার তো কলকাতায় থাকাই হত না। আমার অনুপস্থিতিতে আলমারিগুলোয় যে একেবারেই হাত পড়ত না, এমন নয়—কিন্তু তা বইয়ের বিষয়গুণে নয়, কোনও বিশেষ উপলক্ষে ঝাড়পোঁছ দরকার হলে তবেই। আর বিয়ের পাকাদেখার মতো গুরুতর ব্যাপার হলে, আলমারিগুলোর কপালে জুটত দারুণ ঘষামাজা। তার অবশ্য দরকার-ও ছিল, কারণ হলঘরে অভিনীত সেই ছোট্ট নাটকগুলোতে বইয়ের তাকের ভূমিকা ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অতিথিকে তারা জানান দিত যে, এ বাড়িতে বইয়ের কদর আছে, অর্থাৎ এদের পরিবার বেশ কৃষ্টিসম্পন্ন।

আমাদের পরিবার কি সত্যিই কৃষ্টিসম্পন্ন ছিল? সন্দেহ আছে। আমার স্মৃতিতে যে দাদামশায়ের বাড়ি, সবসময়ই তা মামা-মামী আর ভাইবোনে ঠাসা। কত লোকের যে সেখানে আশ্রয় জুটত, দু'বেলা পাত পড়ত আর আমোদফুর্তি-পড়াশোনা সব কিছুর ব্যবস্থা হত, তা ভাবলে মাঝে মাঝে অবাকই লাগে। কিন্তু আমার মামারা ছিলেন ব্যস্ত, বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন, মোটের উপর সফল পেশাদার—বই পড়ে নষ্ট করার মতো সময় তাঁদের ছিল না।

আমার একজন মামাই ছিলেন যথার্থ পাঠক। তিনি আবার খানিকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের মানুষ, ভাইবোনদের লেখাপড়া শেখানো বা আত্মীয়দের রুচি উন্নত করার ভার নিজে হাতে তুলে নেবেন সেরকম লোকই নন। আলমারির প্রায় সব বই-ই ছিল ওঁর। শান্ত ও চুপচাপ এই মানুষটি পরিবারের ব্যাপারে বিশেষ নাক গলাতেন না। মানুষ ঠাসা সেই বাড়িতে কোথাও কোনও বাড়তি জায়গা ছিল না। তবু এটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে তাঁর আলমারিগুলো হলঘরে সসম্মানে ঠাঁই পাবে। কিন্তু চারপাশে আত্মীয়দের কোলাহলে বিরক্ত হয়ে আমার এই গ্রন্থপ্রেমী মামা ওবাড়ি থেকে হঠাৎ একদিন পাততাড়ি গুটিয়ে উঠে গেলেন একটু দূরে, আলাদা বাড়িতে। অথচ, আমাদের অবাক করে আলমারিগুলো যথাস্থানেই রয়ে গেল।

বহুদিন ধরেই সেই আলমারিগুলো গোপনে ঘাঁটাঘাঁটির অভ্যেস ছিল। দাদামশায়ের বাড়ির হাতবদল হঠাৎ-ই তাতে পূর্ণচ্ছেদ টেনে দিল। তখন এতে অত্যন্ত বেদনা বোধ করলেও, আজ মনে হয় সেই না পড়তে পারার মধ্যেও একটা শিক্ষা প্রচ্ছন্ন ছিল। তা হল, বইকে, বইয়ের ছাপা শব্দগুলোকে শ্রদ্ধা করতে শেখা। আর সেটা ঠিকঠাক না শিখলে কি কেউ ভাষার ব্যাপারী হয়ে জীবিকার্জনের কথা কল্পনা করতে পারে? সন্দেহ আছে। অন্যদিক থেকে ভাবলে, বই যে আসলে দুই মলাটের ভিতরে ঠাসা ছাপা কাগজ-ই শুধু নয়, তাও আমাকে শিখিয়েছিল ওরাই। আমার আর বইয়ের আলমারিগুলোর মাঝখানে অন্তরায় হয়ে ওঠার জন্য ওদের উপর যতই বিরক্ত হই না কেন, সেই শিক্ষা আমি আজও ভুলিনি। একটা বই, খাঁটি বই যেমন হওয়া উচিত—আমি এখনও মনে করি, আলমারিতে রাখা বইগুলি ছিল ঠিক সেই গোত্রের।

কী ধরনের বই ছিল সেগুলো?

কোন কোন বই ওই আলমারিতে রাখা হবে, সেসংক্রান্ত নিয়ম-নির্দেশ কেউ কখনও খোলসা করে আমায় বলেনি। তবু যতদূর জানি, আলমারিতে ঠাঁই পাবার প্রশ্নে বেশ কয়েকটা কড়া নিয়ম ছিল। টেক্সটবুক এবং স্কুলপাঠ্য বই নৈব নৈব চ, পেশা বা প্রযুক্তি সংক্রান্ত বইয়েরও সেখানে জায়গা হত না। ম্যানেজমেন্ট, আইন তথা মামাদের জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বই একটাও ছিল না ওই আলমারিতে। বইগুলোর অধিকাংশই ছিল উপন্যাস। কিছু কবিতার বইও যে ছিল না তা নয়, তবে ঝোঁকটা ছিল উপন্যাসের দিকেই। নৃতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্বের বই ছিল কিছু; সে যুগের সাহিত্যচেতনায় কোনওভাবে ঢুকে পড়া বই-ও ছিল বেশ কয়েকটা। যেমন— ‘গোল্ডেন বাও’ বা ‘কালেক্টেড ওয়ার্কস্ অব সিগমুন্ড ফ্রয়েড', মার্ক্স-এঙ্গেলসের ম্যানিফেস্টো, হ্যাভলক এলিস আর ম্যালিনোওস্কির ‘সেক্সচুয়াল বিহেভিয়ার' ইত্যাদি।

দাদামশায়ের বাড়ির বইগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে উপন্যাসের সংখ্যাই ছিল সবচেয়ে বেশি। সম্ভবত সে কারণেই, আজও বইয়ের আলমারিতে কোনও টেক্সটবুক অথবা কম্পিউটার ম্যানুয়াল রাখার সময় আমি কুণ্ঠাবোধ করি।

বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে উপন্যাসের গুরুত্বের প্রসঙ্গে প্রাক্তন কলকাতাবাসী নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন, “ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে বাঙালির জীবন ও বাংলা সাহিত্যের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল। শিক্ষিত বাঙালি অন্য কোথাও ঠিক সেটাই এনে দিল। শহর, মফস্সল অথবা গ্রামে (যেখানে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের শিকড় ছিল তখনও) সাহিত্যই ছিল আবেগ, অনুভূতি দিয়ে গড়া বাঙালি জীবনের প্রধান অবলম্বন। ভাবাবেগ তথা আদর্শের চেতনার ধারকও ছিল সাহিত্যই...১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে যখন আমার বোনের বিয়ে হয়, আমার কলেজের এক বন্ধু তাকে প্রথম সারির লেখকদের পনেরোটি সাম্প্রতিক উপন্যাস উপহার দিয়েছিল। আর বোনের কাছে দামি দামি শাড়ি-গয়নার চেয়ে সেই উপহারের মূল্য কিছু কম ছিল না। সত্যি বলতে কী, বিয়ের উপহার হিসেবে গল্প-উপন্যাস আর কবিতার বাঁধা বিক্রি প্রকাশকদের কাছেও একটা ভরসা ছিল।”

মামার আলমারির প্রায় সিকিভাগ বই ছিল বাংলায়—সমকালীন বাংলা সাহিত্যের মূলস্রোতের এক নির্বাচিত সংগ্রহ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, বনফুল আর সৈয়দ মুজতবা আলির বই। বাকি সব বই-ই ছিল ইংরেজিতে। কিন্তু তার মধ্যেও অধিকাংশ অন্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ। প্রকৃতই ইংরেজিতে রচিত বই বেশ কম। উনিশ শতকের মহান সৃষ্টিগুলিও যথাযথভাবে উপস্থিত ছিল—যেমন, ডস্টয়ভ্স্কি, তলস্তয়, তুর্গেনেভ, ভিক্টর হিউগো, ফ্লব্যের, স্তাঁদাল, মপাসাঁ প্রমুখের উপন্যাসসমূহ। এই বইগুলো ছিল আলমারির সবচেয়ে উঁচু তাকে—প্রায় নাগালের বাইরে। তাই ধুলোও জমত সবচেয়ে বেশি।

চোখের সামনে সাজানো বইগুলো ছিল কিছুটা এলোমেলো ধরনের। এরকম কিছু বই সর্বত্রই বইয়ের আলমারিতে চোখে পড়ে-- যেমন জেমস জয়েস বা ফকনার। কিন্তু বাদবাকি অনেকেই দীর্ঘকাল যাবৎ বিস্মৃত, ইতালিতেও খুব কম লোক-ই মনে রেখেছেন মেরি কোরেলি বা গ্রাজিয়া ভেলেডাকে। কিন্তু আমার কাছে এই শব্দগুলো অনেকটা গোপন এক জাদুমন্ত্রের মতো, যার উচ্চারণমাত্র আমার স্মৃতির ওই আলমারিগুলোর দরজা খুলে যায়। ন্যুট হ্যামসনও একদা এই জাদুমন্ত্রেরই অংশ ছিলেন। কিন্তু অন্যদের মতো তাঁকে লোকে ভুলে যায়নি। সঙ্গত কারণেই তাঁর খ্যাতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

সেই আলমারিতে আর যাঁদের বই ছিল, পুঁজিবাদের পুনরুত্থানের এই যুগে, তাঁদের অনেকের নাম-ই কিছুটা অস্বস্তি, অস্বাচ্ছন্দ্য বয়ে আনে। যেমন—সোস্যাল রিয়্যালিস্টরা। মামার তাকগুলোয় কিন্তু রুশ আর মার্কিনিরা পাশাপাশি সগৌরবে, মাথা উঁচিয়েই থাকতেন, ম্যাক্সিম গোর্কি-মিখায়েল শোলোকভের পর-ই জন স্টেনবেক-আপটন সিনক্লেয়ার। আরও অনেক নাম-ই সেখানে ছিল, এক ঝলকে যাদের সহাবস্থানের হেতু খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল, যেমন—কুয়ো ভাদিসের সিনকিউইজ্, মরিস মেটারলিঙ্ক বা বার্গসন। সম্প্রতি পোকায় খাওয়া সেই বইগুলোর ধ্বংসাবশেষ ঘাঁটতে গিয়ে চোখে পড়ল সংগ্রহের শেষতম সংযোজনটি—ষাটের দশকে প্রকাশিত ইভো অ্যান্ড্রিকের ‘ব্রিজ অন দ্য ড্রিনা'।

মামার বই সংগ্রহের পাঁচমিশেলি চরিত্র আমাকে দীর্ঘকাল যাবৎ বিস্মিত করেছে। রুচির স্বাতন্ত্র্য যে এজন্য দায়ী নয়, তা অবশ্য জানতাম। মামা খুবই মনোযোগী পাঠক ছিলেন, কিন্তু লাইব্রেরি বা বইয়ের দোকানে ঘুরে ঘুরে বই কেনার ক্ষেত্রে নিজের পছন্দকে খুব একটা গুরুত্ব দিতেন বলে মনে হয় না। প্রচলিত মতামত-ই ছিল তাঁর রুচির নিয়ামক। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, লেখালেখিতেও মামার ঝোঁক ছিল। সংস্কৃত সাহিত্যসম্ভার থেকে চরিত্র ধার করে মহাকাব্যিক নাটক লেখার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। আমার এই মামা ভারতের বাইরে কোনওদিন যাননি, পশ্চিমবঙ্গের বাইরেও পা রেখেছেন কালেভদ্রে।

খুব সাধারণ কিছু ব্যাপার মন দিয়ে লক্ষ করলে, মামার রুচি কোন পথে পরিচালিত তা অনেক আগেই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে যেত। কুইজে চৌখস ছেলেমেয়েরা গ্রাজিয়া ডেলেডা, গোর্কি, হ্যামসন, শোলোকভ, সিনকিউইজ আর অ্যান্ড্রিচের মধ্যেকার যোগসূত্র আবিষ্কার করে ফেলবে নিমেষেই—এঁরা প্রত্যেকেই সাহিত্যে নোবেলজয়ী।

বিশ-তিরিশের দশকের কলকাতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে নীরদ চৌধুরী বলেছেন, “সমাজের সম্ভ্রান্ত মহিলারা যেভাবে পোশাকে-আশাকে ফ্যাশন দুরস্ত হতে চাইতেন, আমাদের মধ্যে সাহিত্যের একেবারে হালের ফ্যাশন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার হুজুগ তার চেয়ে বেশি বই কম ছিল না। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার চালু হওয়ার পর সেটা আরও বেড়ে গেল। নোবেলজয়ী কোনও লেখকের অন্তত একখানা বইও কারও বাড়িতে না থাকলে তাকে প্রায় নিরক্ষর বলে গণ্য করা হত।”

তবে নোবেল পুরস্কার অবশ্যই বৃহত্তর এক প্রক্রিয়ার নিদর্শন তথা অনুঘটক ছিল—আর তা হল ‘বিশ্বজনীন সাহিত্যের’ ধারণার উদ্ভব। শৈল্পিক ব্যঞ্জনারই এ এক নবতর আঙ্গিক, যা দেশ ও সংস্কৃতি আবেগ ও আকাঙ্ক্ষার বিভিন্নতাকে আত্মস্থ করেও তাদের মধ্যে যোগসূত্র বজায় রাখে। এই ধারণার জন্মস্থান ইউরোপ হলেও আমার মনে হয়, ইউরোপের বাইরে তা অনেক বেশি উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছিল। সত্তরের দশকের শেষ আর আশির দশকের গোড়ার দু’বছর আমি ইংল্যান্ডে পড়াশুনো করেছিলাম। মামার মতো বইয়ের সংগ্রহ সেখানে কোথাও কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। মামার সংগ্রহের বইগুলি যেন সাহিত্যের প্রতি এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই আহৃত হয়েছিল—নানা দেশের বিচিত্র মিছিল থেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনা বইয়ের সে এক অত্যাশ্চর্য সম্ভার।

পরে অবশ্য অনেক জায়গাতেই আমি সে-জাতীয় সংগ্রহ দেখেছি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বর্মায় প্রয়াত ম্যা থান টিন্টের বাড়ির লাইব্রেরির কথা। প্রসঙ্গত, ম্যা থান টিন্ট বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বর্মি লেখকদের একজন।

অদ্ভুত মানুষ ছিলেন এই ম্যা থান টিন্ট। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি কাটিয়েছেন রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে। তার মধ্যে বেশ কিছুটা সময় আবার কুখ্যাত কোকো আইল্যান্ডে থাকতে হয়েছে তাঁকে। দণ্ডিত অপরাধীদের কারাবাসের জন্য ব্রিটিশরা এই পাথুরে দ্বীপটা বেছে নিয়েছিল। বন্দিদের সেখানে খাবারদাবার পর্যন্ত ঠিকঠাক দেওয়া হত না—বাঁচার শর্তই ছিল কঠিন সংগ্রাম। মুক্তি পাবার পর তিনি বিভিন্ন গল্প তথা স্কেচ প্রকাশ করেন। সেসব বইয়ের পাঠকসংখ্যা ছিল প্রচুর আর তারপরই ম্যা থান টিন্ট সারা দেশের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন। অত্যন্ত অকপট আর জীবন্ত এই রচনাগুলি সম্প্রতি ইংরেজিতেও ‘টেল্স্ অব এভরিডে পিপ্‌ল' নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।

আমার সঙ্গে ম্যা থান টিন্টের দেখা হয় ১৯৯৫ সালে, তাঁর রেঙ্গুনের বাড়িতে। তাঁর প্রথম কথা-ই ছিল, “আমি তোমার নাম আগে কোথাও দেখেছি।” আমি তো স্তম্ভিত! বর্মার সেন্সরশিপ এতই কড়া যে আমার বই বা লেখাপত্র রেঙ্গুনে পৌঁছনোর কথাই নয়।

‘এক মিনিট দাঁড়াও’ বলেই ম্যা থান টিন্ট চলে গেলেন তাঁর পড়ার ঘরে। তারপরে একটা পুরনো ছেঁড়াখোড়া ‘গ্রান্টা’ ম্যাগাজিনের সংস্করণ নিয়ে এসে তার সূচিপত্রে আমার নামটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।

বিস্ময়ে হতবাক আমি জিজ্ঞেস করলাম, এটা পেলেন কোত্থেকে? মুচকি হেসে ম্যা থান টিন্ট বললেন, কাগজকুড়ুনিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েই তিনি তাঁর লাইব্রেরিটা টিকিয়ে রেখেছেন। দূতাবাসের বাতিল জঞ্জাল থেকেই তারা তাঁকে বইপত্র জোগাড় করে দেয়।

ম্যা থান টিন্টের বইয়ের তাকগুলো দেখতে দেখতে আমি আবিষ্কার করলাম ক্ষুদ্র একটা গণ্ডিতে আটকে পড়ার বিরুদ্ধে তাঁর যে জেহাদ, তার উৎস আসলে বইয়ের এই আলমারি-ই। আর আমার মামার সংগ্রহের সঙ্গে তার কী অদ্ভুত মিল! রেঙ্গুনের সেই উজ্জ্বল ঘরটায় বসে দু’জনে যখন গল্প করছিলাম, ন্যুট হ্যামসন-ম্যাক্সিম গোর্কি-শোলোকোভ ইত্যাদি পরিচিত নামগুলো যেন কলকাতা থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে এসে কানে বাজছিল।

আর একজন আশ্চর্যরকমের সাহসী ও দৃঢ়চেতা লেখকের সঙ্গেও আমার একবার আলাপ হয়েছিল। তিনি ইন্দোনেশিয়ার ঔপন্যাসিক প্রমোদয়া অনন্ত তোয়ের। বন্দিত্ব ও বিরোধিতার অনুরূপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হলেও ম্যা থান টিন্টের সঙ্গে একটা জায়গায় তাঁর অমিল রয়েছে। প্রমোদয়া এমন একটা ভাষায় লেখেন, সাহিত্যরচনার মাধ্যম হিসেবে যার উন্মেষ হয়েছে অতি সম্প্রতি—বাহাসা ইন্দোনেশিয়া। অনেকেই তাই তাঁকে ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় সাহিত্যের ঐতিহ্যের প্রাণপুরুষ মনে করেন।

কোনও একটা প্রসঙ্গে আমি প্রমোদয়াকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর সাহিত্যে কার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। জবাবে কী শোনার আশা করেছিলাম তা জানি না, তবে উত্তরটা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। আমার অবাক হওয়ার অবশ্য কথা ছিল না, কারণ প্রমোদয়া সেই চেনা নামগুলিই বলেছিলেন—ম্যাক্সিম গোর্কি আর জন স্টেনবেক।

বিগত কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের অজান্তেই ম্যা থান টিন্ট বা প্রমোদয়া অনন্ত তোয়ের এসে পড়েছেন পাঠকের দুনিয়ায়। ঠিক যে ধরনের পাঠাভ্যাসের ক্ষেত্রে তাঁরা পথিকৃৎ, বিশ্বের সব পাঠকের কাছেই আজ তা প্রায় বাধ্যতামূলক। যেখানেই যাই না কেন, নিষ্ঠাবান পাঠকের বইয়ের তাকে এখন সবসময় সেই নামগুলোই চোখে পড়ে—গার্সিয়া মার্কোয়েজ, ইয়ুর্সেনার, গ্যুন্টার গ্রাস, সালমান রুশদি। সাহিত্যের স্রোত যে এখন পলকে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে আর সঙ্গে সঙ্গেই পাঠকসমাজে তার আত্মীকরণ ঘটে, তা প্রায় স্বয়ংসিদ্ধ। অত্যন্ত প্রত্যক্ষ এই প্রক্রিয়াটির উল্লেখই বরং ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন।

উপন্যাস প্রকৃত অর্থে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছে এক শতাব্দীরও আগে থেকেই। ভারত, বর্মা, মিশর ও অন্যত্র দীর্ঘকাল ধরেই তা প্রায় স্বয়ংসিদ্ধ। আশ্চর্যের বিষয়, উপন্যাসের শিকড় যেখানে সবচেয়ে গভীরে প্রোথিত, সেই ইউরোপেই এই সত্যকে সবচেয়ে জোরালোভাবে অস্বীকার করা হয়ে থাকে। অন্যভাবে বলা যেতে পারে এই অস্বীকৃতির জন্যই ইউরোপে উপন্যাস লেখা সম্ভব হয়েছে।

আঙ্গিক হিসেবে উপন্যাস শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক। আমরা জানি স্প্যানিশ, ইংরেজ, ফরাসি ও রুশ ঔপন্যাসিকরা একে অপরের লেখা আগ্রহের সঙ্গে পড়তেন সেই আঠেরো শতক থেকেই তবু আঙ্গিক হিসাবে উপন্যাস সম্পর্কে চিন্তা করলে যা আমাদের সবচেয়ে বেশি ধাঁধায় ফেলে তা হল, পরিসরের স্বল্পতাকে ভিত্তি করেই উপন্যাস গড়ে ওঠে। জায়গার নাম, অবস্থান—সবকিছুই সেখানে নির্দিষ্ট। অন্যভাবে বললে উপন্যাসকে সর্বদাই একটা নির্দিষ্ট স্থান ঘিরে গড়ে উঠতে হবে এবং ধ্রুপদী উপন্যাসের ক্ষেত্রে, চরিত্রগুলির তুলনায় সেই স্থানের ভূমিকা এতটুকুও কম গুরুত্বপূর্ণ হবে না। পটভূমি তাই উপন্যাসের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মিসেস গ্যাসকেলের ক্র্যানফোর্ড হোক বা জয়েসের ডাবলিন—পটভূমি ব্যতীত উপন্যাসের কথা কল্পনাও করতে পারি না আমরা। গ্রন্থিত শব্দ থেকেই কবিতা তার প্রেক্ষাপট ও আবহ নির্মাণ করে নিতে পারে, উপন্যাস পারে না।

ঠিক যেভাবে নাটকের ক্ষেত্রে অভিনেতা আর আলোর উপস্থিতি আমরা ধরেই নিই, এই প্রত্যয়ও সেভাবেই আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত। সাধারণ এই বিশ্বাসগুলি আমাদের মনের এত গভীরে নিহিত যে আসলে তারা কতখানি অদ্ভুত সেকথা মাথাতেই আসে না। ভেবে দেখুন, যে নির্দিষ্ট স্থান তথা পটভূমির ভাবনা উপন্যাসকে সম্ভব করল, তার জন্য এমন একটা সময়ে, যখন পৃথিবীর প্রতিটি দেশ, প্রতিটি স্থান বিপর্যস্ত। মিডলমার্চ বা মাদাম বোভারি পড়ার সময় আমাদের একবারও মনে হয় না, যে জীবনের কাহিনী এখানে নিহিত, তা সম্ভব হয়েছে বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যগুলিরই কল্যাণে (পর্তুগিজ সাহিত্যের পথিকৃৎ-সৃষ্টি ক্যামোয়েন্স লুসাইড্সের সঙ্গে বৈপরীত্য খেয়াল করুন)। হর্থন পড়ার সময় নিউ ইংল্যান্ডের বন্দরগুলোর যে বর্ণনা পাই তা থেকে সুদূরপ্রসারী বাণিজ্যের একটা সুস্পষ্ট ছবি আমাদের খুঁজে নিতে হয়। সাহিত্যে পটভূমির প্রচলন ও ঐতিহ্য মার্কিন সাহিত্যে যতটা শক্তিশালী ততটা আর কোথাও নয়, অথচ সেই আমেরিকা নিজেই কিছু যুগান্তকারী অভিবাসনের ফসল।

গদ্যরচনার অন্যান্য ধারার সঙ্গে উপন্যাসের একটা সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। সহস্র এক আরব্যরজনী বলতে বাগদাদ নগরের কথা মনে আসে সত্যিই। কিন্তু, শাহারাজাদের সেই বাগদাদ যতটা পটভূমি, তার চেয়ে যেন অনেক বেশি পরশমণি আর জাদুমন্ত্রের এক মায়ানগরী। ইন্দ্রজালের আবেশমাখা অমন একটা শহর কল্পনা করে নিতে পারলে বিশ্বের যে কোনও জায়গাতেই ওই সব গল্পে বর্ণিত ব্যাপারগুলো ঘটা সম্ভব।

কিংবা ভাবা যাক পঞ্চতন্ত্রের সেই অত্যাশ্চর্য গল্পগুলোর কথা। অরণ্যের একটা আবহ ছাড়া এই গল্পগুলোরও তেমন কোনও পটভূমি নেই। তবু অনেকেরই ধারণা, এক বাইবেল ছাড়া কোনও বই-ই এমন বিশ্বজনীন পরিচিতি পায়নি। প্রথম সহস্রাব্দের গোড়ার দিকে ভারতে রচিত এই বইটি ষষ্ঠ শতকে ফারসি অনুবাদের মারফত আরবে পৌঁছেছিল । সহস্ৰ এক আরব্যরজনীর অংশবিশেষ সমেত মধ্যপ্রাচ্যের বহু শ্রেষ্ঠ রূপকথার উৎস এই পঞ্চতন্ত্র। গ্রিকদের মাধ্যমে শ্লাভিক ভাষাতে, তারপর হিব্রু থেকে গল্পগুলি প্রচলিত হয় ল্যাটিনে। ১২৭০ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চতন্ত্রের একটি ল্যাটিন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে ক্রমে জার্মান ও ইতালিয়ান ভাষাতেও অনূদিত হয়। ইতালিয়ান সংস্করণটি থেকেই স্যার হেনরি নর্থ এলিজাবেথের আমলে তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য মরাল ফিলসফি অব ডোনি’ (১৫৭০) রচনা করেন। আবার এই গল্পগুলো গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে লা ফঁতেইন বা গ্রিম ভাইদের রূপকথার মতো বহু কাহিনীকে। সুতরাং আজ তা নিঃসন্দেহে এক বিশ্বজনীন ঐতিহ্যেরই অঙ্গ।

একইভাবে, জাতক-কাহিনীর জন্ম যদিও ভারতে, বৌদ্ধধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার দিকে দিকে তা ব্যাপ্তি লাভ করে। মধ্যযুগের এশিয়ায় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে কর্তৃত্ব ভারত অর্জন করে, তার অনেকখানিই জাতকের মহাকাব্যিক রূপ বা সংক্ষিপ্ত কাহিনীর সূত্রে। অবশ্য সভ্যতার প্রসারে হলিউডি গল্প যবে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে, তার বহু আগেই ভারতের সেই কর্তৃত্বের অবসান।

পৃথিবীর যে-যে প্রান্তে এই গল্পগুলো ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানেই স্থানীয় পারিপার্শ্বিকের প্রেক্ষিতে তার রূপান্তর ঘটেছে। বস্তুত গল্পগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল, ভিন্ন সমাজ-ভাষা-সংস্কৃতিতেও তার আত্মীকরণ সম্ভব। মূল গল্পের পটভূমির গুরুত্ব এখানে খুব বেশি নয়। পঞ্চতন্ত্র বা জাতকের কাহিনীর আবেদন গল্পে বিবৃত ঘটনাগুলি কোথায় ঘটেছে তার উপর নয়, বরং কীভাবে ঘটছে তার উপর নির্ভরশীল! অন্যভাবে বললে আখ্যান-ই এখানে প্রধান। আর একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মনে করুণ ইউরোপের সেই আখ্যায়িকার কথা যাকে উপন্যাসের পূর্বসূরি বলা যেতে পারে—ট্রিস্টান আর ইসোল্ডের কাহিনী। কর্নওয়াল আর ব্রিটানিতে জন্ম হলেও মধ্যযুগের শেষাশেষি এই কেল্টিক কাহিনী বহু ইউরোপীয় ভাষাতেই অনূদিত তথা আত্মীকৃত হয়ে গিয়েছিল। ট্রিস্টান আর ইসোল্ডের গল্প যে-যে নতুন দেশে ডানা মেলেছে, সেখানেই তার পুনর্জন্ম হয়েছে নতুন পটভূমিতে, নতুন আবহে। এই গল্পের উৎস আর মূল পটভূমি এখন একমাত্র বিদ্বজ্জনেরই বিবেচ্য হতে পারে।

গল্পের এই বিশেষ নীতিতে কাহিনীই একটা বিশেষ স্থানকে অর্থবহ করে তোলে। আর সে কারণেই বেনারসের একটা অখ্যাত রাস্তা থেকে তাইল্যান্ডের শহরের নামে ঘুরে ফিরে আসে রামায়ণের অযোধ্যা।

গল্প-উপন্যাসের এই আখ্যানরীতি কিন্তু হারিয়ে যায়নি আজও। ভারত ও অন্য বহু দেশে জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের ধারায় এর উপস্থিতি এখনও সজীব। হিন্দি ছবি বা কুংফুর সিনেমায় পটভূমি একেবারেই গৌণ। হিন্দি ছবিতে তো একটা গানের চলচ্চিত্রায়নেই বার কয়েক পোশাক বদলে যায়, পটভূমিও পালটায় ক্ষণে ক্ষণে। বিভিন্ন মহাদেশ জুড়ে এই সব ছবির দর্শকও যে বিপুলসংখ্যক, তা নিশ্চয়ই আমার বলার অপেক্ষা রাখে না। সত্যি বলতে কী এমন ব্যাপকভাবে অন্য কোনও সাংস্কৃতিক নির্মাণ প্রচারিত হয়েছে কি না সন্দেহ। বিকেল চারটেয় ইন্দোনেশিয়ার গাঁ-মফস্সলের রাস্তাঘাট হঠাৎ-ই ফাঁকা হয়ে যায়। ম্যাক্সিম গোর্কি বা জন স্টেনবেক কিন্তু এজন্য দায়ী নন— তখন আসলে টিভিতে রোজকার হিন্দি ছবি দেখানো হয়।

এই আখ্যান শৈলীর নিরবচ্ছিন্ন প্রভাব আমার মামাকে পর্যন্ত তাঁর সাধের বইয়ের ভুবনের বাইরে টেনে আনতে পেরেছিল। জীবনের শেষ দিকে আমার সেই গ্রন্থপ্রেমী গোর্কি, শোলোকভ, হ্যামসনের সঙ্গত্যাগ করে বোম্বাইমার্কা হিন্দি ছবির বেজায় ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। গাদা গাদা হিন্দি ছবি দেখতেন তিনি, কোনও কোনও অলস বিকেলে আমরা একসঙ্গেও সিনেমা দেখতে যেতাম। বাড়ি ফেরার পথে মামা ফিল্মি ম্যাগাজিন কিনে নিয়ে যেতেন। ধ্রুপদী পশ্চিমি সংজ্ঞায় যাকে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে, জীবনের বেশিরভাগ সময় মামা ছিলেন সেরকমই ঋজু, মিতভাষী, কেমন যেন দূরের মানুষ। জীবনের শেষ দিকে মানুষটা একদম বদলে গিয়েছিলেন—হাসিখুশি, অন্তরঙ্গ, নানা চিন্তায় মশগুল। ওঁর নিজের ভাইবোনরাও সেই মানুষটাকে ঠিক চিনে উঠতে পারতেন না।

একবার আমরা দু’জনে মিলে কী একটা সিনেমা দেখতে গেছি। বোম্বাইয়ের ফিল্ম দুনিয়ার তখনকার সবচেয়ে দাপুটে নায়িকা তাতে অভিনয় করেছিলেন। সিনেমা দেখতে দেখতে মামা হঠাৎ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, “ওই নায়িকার মাথায় সাংঘাতিক উকুন হয়েছে।”

“তুমি কোত্থেকে জানলে?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“স্টার ডাস্টে ওর হেয়ারড্রেসারের ইন্টারভিউ পড়েছিলাম”, মামার উত্তর। মনে পড়ল, আমার বয়স যখন পুরো বারোও হয়নি এই মানুষটাই আমায় “অ্যান্ড কোয়ায়েট ফ্লোজ দ্য ডন” বইটা উপহার দিয়েছিলেন।

গল্প পরিবেশনের বিভিন্ন রীতিগুলির মধ্যেকার বহু প্রশ্ন যে আজও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে, মামার জীবনই তার প্রমাণ। উপন্যাসের নেতৃত্বাধীন সাহিত্যের রণপোতকে বিজয়ীর শিরোপা দিলেই যে অন্য পক্ষ (সেরকম কিছু যদি আদৌ থেকে থাকে) পরাজয় স্বীকার করে নেবে, এমনটা মনে করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু এই যুদ্ধের হেতু কী? কী নিয়েই বা এতসব বিতর্ক? অথবা আরও সোজা ভাষায় বললে, পটভূমি-সংক্রান্ত চিন্তায় ঔপন্যাসিকদের সঙ্গে অন্য ধারার গল্প-লিখিয়েদের তফাৎটা কোথায়?

আমার মতে এই বৈপরীত্যটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে, যেখানে উপন্যাস অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক আমদানি। বাংলার একটা উপন্যাসের কথা উদাহরণ হিসেবে এখানে বলা যেতে পারে। “রাজমোহন’স ওয়াইফ” শীর্ষক এই উপন্যাসটি ঊনবিংশ শতকের ষাটের দশকে লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র।

বঙ্কিমচন্দ্রের চরিত্র ছিল বহুমাত্রিক। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সিভিল সার্ভেন্ট, এক পণ্ডিত ব্যক্তি, ঔপন্যাসিক এবং একজন প্রতিভাবান তার্কিক। ইংরেজি ছাড়াও বাংলা ও সংস্কৃতে তাঁর ছিল অগাধ পড়াশুনো। একদিক থেকে ভাবলে মামার বইয়ের আলমারির পূর্বসূরি বোধহয় বঙ্কিমচন্দ্রের বইসংগ্রহ।

ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলা সাহিত্যের যে অসাধারণ উন্মেষ ঘটে, এতে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলা ভাষায় বহু গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস তিনি লিখেছেন আর তার প্রতিটি অবিলম্বে অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্যের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উপমহাদেশ জুড়ে। সেদিক থেকে দেখলে, তিনিই সম্ভবত আধুনিক সময়ের প্রথম প্রকৃত ‘ভারতীয়’ লেখক। নীরদ চৌধুরীর বর্ণনায় তিনি “বাংলা গল্প-উপন্যাসের স্রষ্টা...বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক।” ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম উদগাতা হিসেবেও বঙ্কিম শ্রদ্ধেয়।

‘সংস্কৃত ঘরানার’ সাহিত্যের প্রতি আঘাত হেনে আত্মসচেতন বঙ্কিম বাংলা ভাষায় উপন্যাস সৃষ্টি তথা প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। সাহিত্যের প্রধানতম আঙ্গিক এখন উপন্যাস। উনিশ শতকের ভারতে বঙ্কিমের কাজটা যে কতটা শক্ত ছিল, আজ তা কল্পনা করাও কঠিন। প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী যে সাহিত্যধারাকে বঙ্কিম স্থানচ্যুত করতে চাইছিলেন, তার প্রবল প্রয়াসের সামনে কট্টর সমালোচকরা পর্যন্ত সম্ভ্রমে হতবাক হয়ে যেতেন। সে ক্ষমতা অবশ্য তার আজও আছে—কোনও আধুনিক লেখকের পক্ষেই কী আর ‘পঞ্চতন্ত্রে’র সাফল্য ছোঁয়া সম্ভব?

একমাত্র সাহস থাকলেই উপন্যাসের মতো কৃত্রিম আর কাল্পনিক একটি আঙ্গিকের দ্বারা এই আদি অ্যাখ্যানশৈলীকে প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করা সম্ভব। বঙ্কিমের আন্তরিক প্রয়াসও নিশ্চয়ই মাঝে মাঝে এনে দিত শুধুই হতাশা। তার ওপর আবার এই তথাকথিত ‘সংস্কৃত ঘরানার’ সাহিত্যের অনুগামীরা সংখ্যায় কিছু কম নয়। বঙ্কিম ও অন্য যাঁরা উপন্যাসের বঙ্গীকরণের চেষ্টায় মেতেছিলেন তাঁদের পরিহাস করা হত পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকারী বলে (সেই সব সমালোচকদের ভাষায় এই অনুকরণ ছিল অনেকটাই বাঁদরসুলভ)।

বঙ্কিম তো পুরোদস্তুর বিদ্রোহেরই ডাক দিলেন। তিনি সোজাসুজি লিখলেন, অনুকরণ অগ্রগতিরই নিদর্শন। কোনও সভ্যতাই স্বতোৎসারিত বা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, অন্যের কাছ থেকে ঋণ নিয়েই সে এগোতে পারে। তিনি আরও লিখলেন, “বাংলার সমকালীন লেখকদের রচনার সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই মানবেন, ভালমন্দ-নির্বিশেষে এই লেখকদের দুটি গোত্রে ভাগ করা যায়—সংস্কৃত আর ইংরেজি ঘরানা। প্রথমোক্তরা দেশের প্রাচীন সাহিত্য তথা সংস্কৃত পাণ্ডিত্যের প্রতিনিধি, আর দ্বিতীয় দল পাশ্চাত্যের জ্ঞান ও ভাবনার ফসল। অধিকাংশ বাংলা লেখকই এই সংস্কৃত ঘরানার অনুগামী, কিন্তু ভাল লেখকদের অধিকাংই আবার অপর গোত্রটির অন্তর্ভুক্ত...বলা যেতে পারে সংস্কৃত সাহিত্য বা ইউরোপ কারও কাছেই ঋণী নন, এমন কোনও স্বদেশী ঘরানা এখন নেই।”

আজ একশো বছর পরে বঙ্কিমের কথাগুলো কী নিদারুণ পরিহাসের মতো শোনায়! মূলত ব্রিটেনে কর্মরত প্রবাসী ভারতীয়দের কয়েক প্রজন্ম এতদিন বঙ্কিম ও তাঁর ভারতীয় উত্তরসূরিদের শিক্ষা ভুলে যেতে কত চেষ্টাই করেছেন। উনিশ শতকের শেষ ও চলতি শতকের গোড়ায় উপন্যাসের ঐতিহ্যের এমন সার্থক আত্মীকরণ ঘটেছে, যে বহু ভারতীয় পাঠকের কাছেই তা আজ কিছুটা স্থানিক, দেশীয়, সহজ সরল—তার সাবলীলতায় পাঠক স্বচ্ছন্দ বোধ করেন; অথচ সেই একই নিরিখে জি ভি দিশানি, জুলফিকার ঘোষ, সালমান রুশদি, আদম জামিঞ্জার, শশী থারুর বা অন্যদের লেখাকে মনে করা হয় বেশি মাত্রায় কায়দাদুরস্ত এবং পরীক্ষামূলক।

সংস্কৃত ঘরানার লেখকদের বিরোধিতা করলেও বঙ্কিম অনেক বেশি নিশ্চিত ছিলেন ভারতীয় সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে। তিনি ১৮৮২ সালে ডবলিউ হেস্টি নামে এক প্রোটেস্ট্যান্ট যাজকের সঙ্গে বেশ চিত্তাকর্ষক এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। কলকাতার ‘দ্য স্টেট্সম্যান’ পত্রিকায় হেস্টির গোটা দুয়েক চিঠি প্রকাশিত হবার পরই দু’জনের বিতর্কের শুরু। এখানে ওই চিঠিগুলির একটা থেকে উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারছি না: “ভারতে দেবদেবীর আধিক্য ও পৌত্তলিকতা নিয়ে যতই লেখা হোক না কেন, এই রাক্ষুসে প্রথার স্থূল ও কদর্য দিকগুলো এখনও কেউই সেভাবে চিত্রায়িত করতে পারেননি। একজন খুব সঙ্গত কারণেই একে বলেছেন ‘শয়তানের সেরা সৃষ্টি...প্রাচীনকালের একটা ভুলকে সযত্নে রক্ষা করার জন্য নির্মিত সবচেয়ে চমৎকার ও বিস্ময়কর দুর্গ'। সংস্কৃত সাহিত্যের প্রথম পর্বে যা ছিল উৎকৃষ্ট আর স্বাস্থ্যকর, তা-ই পরে নৈতিক কুষ্ঠের আকারে সংক্রামক ব্যাধির মতো তার অস্থিমজ্জা ছেয়ে ফেলল। বাংলার তাবড় সংস্কৃত পণ্ডিতেরা ভালই জানেন আমি কী বলতে চাইছি...বিগত হাজার বছর হিন্দুদের প্রধান আধ্যাত্মিক আহার্য আর প্রায়-দেবত্বপ্রাপ্ত পুরোহিতদের গণিত পরম্পরাও এটিই। জাতীয় জীবনের মূলে চেতনাগুলোকে যা কুরে কুরে খাচ্ছে, মানুষের মনুষ্যত্বকে নষ্ট করছে এটাই কি সেই ঘৃণ্য ব্যাধি নয়? এক প্রাচীন খ্রিস্টধর্ম-সমর্থক গ্রিক একবার চিৎকার করে বলেছিল, ‘আমায় তোমাদের দেবদেবী দেখাও, আমি তোমাদের মানুষ দেখাব'। আর, একজন হিন্দুকে তার পুতুল-ভগবানেরা যা বানিয়ে রেখেছে, সে ঠিক তাই-ই। বিদেশি আক্রমণকারীরা নয়, নিজেদের পৌত্তলিকতাই হিন্দুদের সবচেয়ে বড় এক ঐতিহাসিক অভিশাপ। মানুষ একমাত্র নিজেই নিজেকে টেনে নামাতে পারে আর হিন্দুদের ক্ষেত্রে একথা একেবারে অক্ষরে-অক্ষরে সত্যি।”

এই চিঠির প্রত্যুত্তরে বঙ্কিমচন্দ্র মিঃ হেস্টিকে “মূল সংস্কৃত সাহিত্য থেকে কিছু কিছু জ্ঞান আহরণ করার” পরামর্শ দিলেন (কারণ) সংস্কৃত সাহিত্য থেকে কোনও ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করলে মূল অর্থের কাছাকাছি যাওয়াও প্রায় অসম্ভব। টিউটনদের মস্তিষ্কে স্পেন ধ্যানধারণার কথা কোনওদিন আসেনি, বা কখনওই ইংরেজি বা জার্মান ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রাচীন ভারতের সংস্কৃতভাষী মানুষ যে উন্নত সভ্যতা ও স্বকীয় সাহিত্যিক ঐতিহ্যের স্রষ্টা, তার সঙ্গে ইংল্যান্ড বা জার্মানির বিন্দুমাত্র সংস্রব ছিল না বলেই বহু ভারতীয় ধারণার সঙ্গে ইংরেজ বা জার্মানরা পরিচিত নন, ঠিক যেমন ইউরোপীয়দের অনেক ধারণাই হিন্দুদের কাছে এখনও একদম নতুন।...(মিঃ হেস্টির দৃষ্টিভঙ্গি) কিছু কিছু ইউরোপীয়র সবজান্তা মনোভাবেরই অনিবার্য ফল...যদিও আসলে ভারত সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাই ভারতীয়দের কাছে বেশ কৌতুকাবহ...পথভ্রষ্ট হয়ে এদেশে চলে আসা একজন ইউরোপীয় নাবিক একজন ভারতীয়ের কাছে কিছু খাবার চেয়েছিল। সে তাকে একটি নারকেল খেতে দেয়। ক্ষুধার্ত নাবিকটি সেই আস্ত নারকেল ছোবড়া-সমেত দাঁত দিয়ে কামড়ায়, চিবোনোর চেষ্টা করে, তারপর রেগেমেগে তা হতভাগ্য নারকেল-দাতার মাথাতেই ছুড়ে মারে। সংস্কৃত সাহিত্যের ছোবড়াতে কামড় দিয়ে মিস্টার হেস্টি ও অন্যদের যে ধারণা হয়েছে, ভারতে ফল নিয়ে ঠিক সেরকম ধারণাই তৈরি হয়েছিল ওই নাবিকের মনে। কিন্তু তাঁরা কেউই ভিতরের শাঁসের স্বাদ কীভাবে পেতে হয়, তা জানতেন না।” বঙ্কিমচন্দ্র আরও লিখেছেন, “জ্ঞান ও বুদ্ধির ক্ষেত্রে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব আমি সানন্দে মেনে নিতে রাজি। কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্বের সুবাদে অন্ধ চোখে দেখতে পাবে, বা বধির শ্রবণশক্তি ফিরে পাবে—এ কথা মানতে প্রস্তুত নই।”

বঙ্কিম যখন উপরে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদগুলি লিখছেন, তার আগেই তিনি একজন স্বীকৃত ঔপন্যাসিক, বাংলা সাহিত্যের এক দিকপাল। কিন্তু উপন্যাস নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরু তারও প্রায় কুড়ি বছর আগে। আর উপন্যাস রচনায় তাঁর প্রথমদিকের প্রয়াসগুলি ছিল ইংরেজিতেই। যতদূর জানা যায়, বঙ্কিমের লেখা প্রথম কাহিনীর নাম “রাজমোহন’স ওয়াইফ” আর তার রচনাকাল ১৮৬০ সালের কাছাকাছি।

উপরে উদ্ধৃত অনুচ্ছেদগুলি এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে পরিবেশিত হলেও তা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে বঙ্কিম চমৎকার ইংরেজি লিখতেন। তাঁর প্রবন্ধ ও চিঠি লেখার শৈলী ছিল নমনীয়, লঘু অথচ কার্যকর। “রাজমোহন’স ওয়াইফ”-এ যে শৈলী তিনি অনুসরণ করেছেন তা কিন্তু খুব সুচিন্তিত, সংশয়াচ্ছন্ন এবং প্রায়শই গুরুগম্ভীর। এই বইয়ে যে জিনিসগুলি আমার সবচেয়ে বেশি দুর্বোধ্য মনে হয়, তা হল বেশিরভাগ পরিচ্ছেদের শুরুতে বর্ণনামূলক দীর্ঘ অংশ এবং কয়েকটা অত্যন্ত অতিনাটকীয় দৃশ্য।

কয়েকটা উদাহরণ দেওয়া যাক—

“মফস্সলসুলভ জাঁকজমক আর অপরিচ্ছন্নতার খাঁটি সংমিশ্রণ ছিল মথুর ঘোষের বাড়ি।

দূরের ধানখেত থেকেই গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে বাড়িটার চারদিকে লোহার বেড়া আর কালো রঙের দেওয়াল চোখে পড়ত। আর একটু কাছে গেলেই দেখা যেত বহু পুরনো পলেস্তারার প্রলেপ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীর্ণ বাড়িটাকে বিদায় জানাতে তারা তৈরি...

বাড়ির এক কোণ থেকে অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ঘরের জটিল গোলকধাঁধা পেরিয়ে ঢুকতে হত অন্দরমহলে। সেখানে একটা চৌকো উঠোন, তার চারপাশ ঘিরে আগের মতোই থামের উপর উঁচু দোতলা বারান্দা। ঘরের উপরে-নীচে, দেওয়ালগুলিতে লাল, সাদা, কালো, সবুজ রঙের অসংখ্য ডোরাকাটা-রামধনুর প্রতিটি রং সেখানে বিদ্যমান; কেউ হয়তো মুখভর্তি পানের পিক সামলাতে না পেরে থুথু ফেলেছে সেখানে অথবা অসতর্ক দাসী গোলা-হাঁড়ি ভেঙে ফেলেছে আর তাঁর ভিতরের ঘোলাটে বস্তুটি ছিটকে এসে দাগ রেখে গেছে দেওয়ালে।...দেওয়ালে আবার কাঠকয়লার আঁকা প্রচুর ছবি, যদিও (মাইকেল) এঞ্জেলোর চিন্তা বা গুইতো (রেনি)-র রং ব্যবহারের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং সেগুলো এ সাক্ষ্যই দেয় যে দুষ্টু আর চালাকচতুর মেয়েরা খিদে পেলে সময় কাটাত আঁকিবুকি কেটে দেওয়ালগুলিকে নষ্ট করে।

একটা ভারী আর পেল্লাই দরজা ছিল বাড়ির বাইরে থেকে ‘গুদোমে’ প্রবেশ করার জন্য—পুরুষরা তখন মহলকে গুদোম-ই বলতেন।”

[বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, “রাজমোহন’স ওয়াইফ”-এর নির্বাচিত অংশের অনুবাদ, বঙ্কিম রচনাবলী, সম্পাঃ যোগেশচন্দ্র বাগল, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, পৃ. ৫২-৫৩] রান্নাঘরের একটি দৃশ্য:

“মাধব তাই হুড়মুড় করে অন্দরমহলে ঢুকে পড়ল। কিন্তু জেনানা-জগতের সেই ব্যস্ত সময়ে তার গলার আওয়াজ কাউকে শোনানোটাই তখন বেজায় মুশকিল। সেখানে তখন এক কৃষ্ণকায়া, গোলগাল, মুখরা দাসী ঘর-গেরস্থালির নানান টুকিটাকি জিনিসপত্র তার হাতে দিতে আদেশ করছে, যদিও কাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলা, তা বোধগম হচ্ছে না। প্রায় একই রকম চেহারার আরেকজনও সেখানে ছিল, কিন্তু সেই চেহারা অন্যের চোখের আড়াল করতে হয়তো তার মর্যাদাবোধে বাধছিল। মনের মেঝেতে স্তূপীকৃত শাকসব্জির খোসা ও ডাঁটির ছোট ছোট পাহাড়গুলিকে একটা ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করতে সে ব্যস্ত। অর্ধনগ্ন এই দাসীটি অবশ্য ঝাঁট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব্‌জিগুলো যে কেটেছে তার উদ্দেশে অনর্গল শাপশাপান্ত করেই যাচ্ছিল।”

যখন এই দীর্ঘ ও আয়াসসিক্ত বর্ণনাগুলি পড়ি, আমার মনে প্রশ্ন জাগে: এগুলো কেন লেখা? কাদের জন্য লেখা? বঙ্কিম এগুলো লিখতে-ই বা গেলেন কেন? গড়পড়তা বাঙালি জমিদারের বাড়িঘর সম্পর্কে কোনও ধারণা নেই এমন লোকের পক্ষে তাঁর বই পড়ার সম্ভাবনা যে খুবই কম, তা তিনি নিশ্চয়ই জানতেন। কারণ, সে সময় কলকাতার শিক্ষিত জনতার অধিকাংশই ছিলেন জমিদার বংশোদ্ভূত। আবার জেলেদের মাছ ধরা বা সারসের মাছ শিকার প্রভৃতি অন্য যেসব দৃশ্যের বিবরণ তিনি দিয়েছেন সেগুলিও তখনকার প্রাত্যহিক জীবনের-ই অঙ্গ। সেকালে খুব অল্প সময়ের জন্যও কেউ বাংলাদেশে এলে এগুলি তার চোখে পড়ার কথা।

তা হলে বঙ্কিম এসব বর্ণনা লেখার কষ্ট করতে গেলেন কেন? তিনি কী ভেবেছিলেন বাংলাদেশের সম্পর্কে যাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, এমন লোকেরাও তাঁর বই পড়বে? এগুলি খুব স্বাভাবিক ও অনিবার্য প্রশ্ন, কিন্তু এ থেকে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব বলে মনে হয় না। সত্যি বলতে কী, আমার তো মনে হয়, “রাজমোহন’স ওয়াইফ” প্রকাশ করারও কোনও ইচ্ছেই তাঁর ছিল না। উপন্যাসের শেষটা তো রীতিমতো সংক্ষিপ্ত ও ত্বরিত, যেন মনে হয় বঙ্কিম অনুশীলন করার জন্যই সেটি লিখেছিলেন, আর কাজ ফুরোতেই পাশে সরিয়ে রেখেছিলেন। বাস্তবেও উপন্যাসটি লেখা শেষ হবার পর অন্তত বছর দশেক বইটি প্রকাশিত হয়নি। স্পষ্টতঃই, বঙ্কিমের কাছে “রাজমোহন’স ওয়াইফ” ছিল একটা মহড়া, অন্য কোনও কিছুর এক প্রস্তুতিপর্ব।

আমাদের উত্তর সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে। বর্ণনামূলক দীর্ঘ অনুচ্ছেদগুলি আসলে যে শুধু বর্ণনার খাতিরেই লেখা, তা নয়। বিশেষ একটি স্থান বা পটভূমির বর্ণনায় সিদ্ধহস্ত হতে বঙ্কিমের প্রয়াস — আখ্যায়িকার দুই ভিন্ন পরম্পরার অন্তবর্তী দূরত্ব লঙ্ঘনের এক হাতিয়ার।

মনে হয় অনেকটা একই কারণে বঙ্কিম তাঁর প্রস্তুতিপর্ব সেরেছেন ইংরেজিতে, বাংলায় নয়। নিজের পারিপার্শ্বিক সম্পর্কে লেখা কারুর পক্ষেই সহজ বা স্বাভাবিক নয়; এমনকী সেই পরিবেশকে ঠিকমতো লক্ষ করতে গেলেও তার সঙ্গে খানিকটা দূরত্বসৃষ্টি প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়ে। আর তার বিবরণ লিখতে গেলে চাই একটা বিশেষ অবস্থান, সম্বোধনের এক বিশেষ রীতি। অন্যভাবে বললে, পদ্যের মাধ্যমে নিজেকে কোনও নির্দিষ্ট স্থানে নিবেশিত করতে হলে আগে স্থানচ্যুতির প্রয়োজন। ইংরেজি ভাষা বোধহয় বঙ্কিমকে এই সুযোগই করে দিয়েছিল। বস্তুত, ইংরেজি ছিল সেই সাময়িক বেদি, যার উপর দাঁড়িয়ে বক্তা বঙ্কিম সম্বোধনের বিবিধ রীতি ঝালিয়ে নিতে, পরখ করতে পেরেছিলেন। একটা প্রশ্ন কিন্তু তা সত্ত্বেও থেকেই যায়। যে কোনও সম্বোধনরীতিরই পূর্বশর্ত হল নীরব শ্রোতার উপস্থিতি। বঙ্কিম যখন “রাজমোহন’স ওয়াইফ” লিখছিলেন, কোন্ শ্রোতার কথা কল্পনা করে নিয়েছিলেন তিনি? আমার ধারণা, বইয়ের আলমারি। কাল্পনিক, আদর্শ বইয়ের আলমারির যে ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র্য, সেটাই ঔপন্যাসিককে তার পরিপ্রেক্ষিতে, একটা নির্দিষ্ট স্থানে নিজেকে নিবেশিত করতে বাধ্য করে। পটভূমি প্রতিষ্ঠার দাবিও তৈরি হয় এখান থেকেই।

এটাই উপন্যাসের বিচিত্র স্ববিরোধিতা। অনেক সময়ই আমরা উপন্যাস পড়ি এ কারণে যে তা আমাদের মধ্যে একটা ‘স্থানের বোধ’ সঞ্চার করে। অথচ: কোনও নির্দিষ্ট স্থানিক বোধের অনুপস্থিতিই কাহিনীতে সেই স্থানের আলেখ্য-রচনাকে সম্ভব করে তোলে।

['The March of the Novel through History; The Testimony of my Grandfather's Bookcase', Kunapipi; A Journal of Post-Colonial Writing (U.K.), Vol. XIX No. 3, Kenyon Review, Vol. XX, No 2, Spring 1998, (Pushcart Prize, 1999).

লেখক-কৃত বাংলা অনুবাদ ‘কথাশিল্পের মায়ায় গাঁথা এই বসুন্ধরা' শিরোনামে শারদীয় দেশ-এ (১৪০৫, ১৯৯৮) প্রকাশিত। লেখকের এই প্রথম বাংলা লেখার প্রয়াসে তাঁকে সহায়তা করেছেন রাঘব বন্দ্যোপাধ্যায়।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ