ইন্দ্রাণী দত্তের উপন্যাস: চার রঙের উপপাদ্য: পুরুষোত্তম সিংহ



গদ্যের ভিতর দিয়ে দেখি ভুবনখানি

ইন্দ্রাণীর গদ্যের একটা শক্তি আছে। আছে নিপুণতা। যা একটা অদৃশ্য জাল রচনা করে বহু চরিত্রের সমাবেশে। চরিত্রকে ক্যানভাসে রেখেও সবটা ব্যক্ত না করে অদৃশ্য টানে কাহিনিকে পড়িয়ে নেওয়াই এই (‘চার রঙের উপপাদ্য’) গদ্যের সত্তা। বোম বিস্ফোরণ নিয়ে উত্তেজনা। প্রাণ হারিয়েছে সবজি বিক্রেতা মানিক। যার প্রভাব ফেলেছে সোসাইটিতে। বিপ্লব-ছন্দা-মিঠুরা শহুরে কালচারে পরিবেষ্টিত মধ্যবিত্ত মানুষ। জীবনের সম্পাদে নানা সম্পর্ক যেমন বর্তমান তেমনি নানা বিন্যাস উপস্থিত। জীবনে বাঁচতে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রয়োজন। রিকশাওয়ালা থেকে সবজি বিক্রেতার মতো তুচ্ছ মানুষও প্রভাব ফেলে জনজীবনে। এইভাবে আখ্যান শুরু হয়েছে। আসলে একটা শুরু থাকতেই হয় তাই এই জার্নি। পরেই তা রং-বেরঙের অলিগলিতে ক্রমাগত ঘূর্ণি খাবে। জীবনের ছকবাজিতে সমস্তটাই ধূসর রঙে আঁকা হতে থাকবে। গদ্যটাই এই আলেখ্যের ইন্দ্রধনু। গদ্যের ভিতর দিয়ে জীবনের স্কেচ উঁকি দেয়। নানা চরিত্রের সমাবেশে নানামাত্রিক জীবনের বহুকৌণিক বীক্ষণ। নাগরিক জীবনের ঘেরাটোপে যাপনের বিচ্ছুরণ সজ্জিত হলেও সুরেলা গদ্যটাই এর চালিকাশাক্তি। চিত্ররূপময় কাব্যিক পরিসর, একটা মৃদু বাতাবরণে বাইরের সংবাদের উড়ে আসা, জীবনের অলিগলিতে গিয়ে যাতায়াত করে নাগরিক পরিসরের সৌরভ বিকশিত হয়। দেশ-বিদেশ, পাড়ার জাদু-আন্তর্জাতিক জাদু, জন্মদিন-বার্থডে সবমিলিয়ে আখ্যানে একটা রুট ম্যাপ আছে। ভারতীয় নাগরিক বিদেশে গিয়েও পুরো বদলে যায়নি। তারা দেশের, পাড়ার সংবাদ যেমন রাখে তেমনি বিদেশের সঙ্গেও মানিয়েছে। মুখের ভাষায়, শব্দ প্রয়োগে পড়াগাঁর কিছু শব্দ এখনও আছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার ভায়াগ্রা স্রোতে মত্ত হয়েও উপনিবেশবাদ বিদ্যমান। এই ক্লাইম্যাক্স যা জীবনের ভিতর তল দিয়ে গিয়েও জীবনকে অন্য পথে নিয়ে যায়। এ আখ্যান আন্তর্জাতিক এক অর্থে কেননা দুই দেশের প্রাত্যহিক বাস্তবতাকে মেলাতে চেয়েছেন। পরিসর ভিন্ন কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা বলয়ে তা রঙিন হয়ে উঠেছে।

এই গদ্যের নানা বিচ্ছুরণ আছে। বিচ্ছুরণের মালা নির্মাণ করাই এ গদ্যের কাজ। জীবনের ভিতরের বলয়ে প্রবেশ করেও তা দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় না। বিদ্যুৎ চমকের মতো স্থান বদল করে অন্য পরিসর ধরে আবার তা থেকে পাঠককে অন্য ভুবনে নিয়ে যায়। নির্দিষ্ট বিষয় অপেক্ষা একাধিক বিষয়ে আলো ফেলে অন্ধকার-আলোর চতুষ্কোণ আবিষ্কার করে নিজের গতিতে এগিয়ে যায়। নির্দিষ্ট কাহিনিতে দাঁড় করানো অপেক্ষা হাওয়া দলের মতো স্পর্শ করে যায় নানামাত্রিক জীবনকে। সংবাদ-কাব্য-তৃষ্ণা-বিতৃষ্ণা-সময় সরণি—জীবনের অন্ত-বাহ্যিক বিন্যাস নিয়ে এ গদ্য ঘূর্ণি সৃষ্টি করে।

আজ মহাকাব্যিক উপন্যাসের দিন অস্তমিত। পাঠকের ধৈর্যও নেই সেই দিগন্ত বিস্তৃত আখ্যান পড়ার। কিন্তু সেদিনের সমস্যা অপেক্ষা আজকের সমস্যা আরও জটিল, আরও তীব্র। জীবনের ঝালাপালায় খাণ্ডবদাহনে মানুষ নিজেই অতিষ্ঠ, তিতিবিরিক্ত। তেমনি জীবনের কত অলিগলি পথ-বিপথ, দিগন্ত। লেখিকা স্বল্প পরিসরে সেই বহুমাত্রিক জীবনকে ধরতে চান। তাই কাহিনি হারিয়ে যায় সুরে। গতির সুরে। দেশ-বিদেশের বহু চরিত্র, বহু রোমন্থন, ইচ্ছা-উদ্দীপনা, অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন-আশাবাদ নিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু জীবনের তারে তা হতাশা-যন্ত্রণা-ক্লেদ-অমাবস্যা বর্তমান। লেখিকা বাস্তব থেকে পরাবাস্তব, মরবিড, লোকবাস্তব, হেঁয়ালি, স্বপ্নবাস্তব-অতীতচারিতার নানা ফর্মে প্রবেশ করেন। আমাদের সব্যসাচী সেন ‘হেমন্তের কারুবাসনা ও পরাজিতের আখ্যান’ এ জীবনের অন্ধকার নিকেতনের গল্প শুনিয়েছিলেন। ইন্দ্রাণী’র ‘চার রঙের উপপাদ্য’ এর প্রথম সম্পাদ্য ‘হেমন্ত’। কালচিহ্নের আড়ালে বিস্তৃত সময় পরিসরের আনাচে কানাচে গিয়ে কতরকম জাল বিভাজিকা, কতরকম সমস্যা—সব মিলিয়ে জীবনের অণু-পরমাণুর একাধিক ফরমান হাজির করান। এখানে চরিত্র প্রাধান্য নয়। মহাবিশ্বের অংশ হিসেবে আমাদের বাঁচা, সামান্য কার্যকলাপই প্রধান। তা প্রতিপদক্ষেপে ঝঞ্ঝাটমুখর, বাধাপ্রাপ্ত, অভিজ্ঞতার জানালা খুলে যায় প্রতিমুহূর্তে—সেই ঘটমান-বর্তমানের কালসেতু লেখিকা গতিশীল গদ্যে ধরতে চান। ছয়টি বৃত্ত (হেমন্ত, শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ) জলের মতো ঘুরে ঘুরে জীবনকে ঘুরিয়ে চলে।

এ গদ্যের একটা আশ্চর্য বাঁক আছে। স্পর্শকাতর ও অন্তর্মুখী বদল আছে। তিনি সম্পূর্ণ বলেন না। কেবল মুহূর্ত সৃষ্টি করেন। সেই মুহূর্তটাই এ আখ্যানের সম্পদ। সে মুহূর্ত পাঠকের মনে নানা তরঙ্গের মালা এঁকে দেয়। যে যেমনভাবে উপলব্ধি করবে। তবে সহিষ্ণুতা আছে। দেশ-বিদেশ, ঘর-বাহির, বাঙালিয়ানা-বিদেশীয়ানা, দেশের শহরতলীর অলিগলি থেকে বিদেশের উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ, চিন্তা-মনস্তত্ত্ব সব নিয়ে ঋতু সংগীত বেজে চলে। ছন্দা-মিঠু-বিপ্লব, পঙ্কজ-স্মিতা, সাহিল-কঙ্কনা সব মিলিয়ে জীবনের চাপান উতর, আলখোল্লা স্পষ্ট হতে থাকে। এ আখ্যানের নানা রং আছে। রঙের ভিতর রং, সুরের ভিতর সুর, আলেখ্যের ভিতর আলেখ্য নিয়ে তা বিরজমান। শতদল বিকশিত পাঁপড়ির মতো এ আখ্যান। একাধিক তরঙ্গমালার ঢেউ আখ্যানে ভাবতরঙ্গের সুর তোলে। সুর বয়ে যায়। সুর থেকে আরেক সুরে ছড়িয়ে যায় আখ্যান। সুরের মালা নিয়ে তা সময় সরণি নির্মাণ করে।

বৃত্তের ভিতর বৃত্ত। সমীকরণের চৌহদ্দিতে একাধিক সমীকরণ রেখে লেখিকা অন্তঃসারহীন সময়ের সত্যে পৌঁছতে চান। ইহা ইন্দ্রাণীর প্রথম উপন্যাস। আখ্যানের ভিতর সাহিল উপন্যাস লেখার জন্য প্লট খুঁজে চলেছেন। চারিদিকে অদৃশ্য মায়াজাল। সন্ধান নেই জাদুকরের। অবয়বহীন অবয়ব, বৃত্তহীন বৃত্ত নিয়ে আখ্যান এগিয়ে চলে। একেবারেই বৃত্ত যে নেই তাও নয়। কাটা কাটা দৃশ্য, কিছু উড়ে আসা চিত্রনাট্য, বৃত্ত গড়তে গিয়েও ভেঙে যাওয়া সবমিলিয়ে বাস্তব-মায়াবাস্তবে আখ্যান ভেসে গেছে। দৃশ্যাবালি, চিত্রনাট্য ঘুরে ঘুরে আসছে কিন্তু লেখিকা স্থিত হতে দিচ্ছেন না। আসলে সবটাই ঘূর্ণিজালে আবদ্ধ। ঘুরে চলেছি পরিত্রাণহীন আত্মসিদ্ধির পথে। কিন্তু সে পথ তো সহজ নয়। সেই পথের বাঁক, পারিপার্শ্বিক বলয়কে লেখিকা ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

এই গদ্যে ফ্যান্টাসি আছে, কল্পনা আছে, আটপৌঢ় জীবনের মুন্সিয়ানা আছে। আসলে লেখিকা বিদেশে থাকার ফলে বাঙালির ঘরোয়া জীবনের খুঁটিনাটিকে ভীষণভাবে মিস করেন। তাই বাইরের খোলসে বিদেশী ক্যানভাস থাকলেও ভিতরের বলয়ে বাঙালির অন্তরঙ্গ জীবনের বায়ু বয়ে চলে। খাদ্য, লোকাচার, বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, প্রেম, হতাশা, আত্মগ্লানি সব মিলিয়ে এমন এক রোমন্থন গড়ে তোলেন যার জুড়ি মেলা ভার। একাধিক চরিত্রের ডাইমেনশনে আখ্যান দুলতে থাকে। সংলাপের বহুবিধ রূপান্তর, আলোচনার বহুমুখী খোলা জানালা, বনময়ূরের ধারণা এক নানামাত্রিক আখ্যানের জন্ম দেয়। গল্প অপেক্ষা সংবাদ, কাব্যময় বিন্যাস, ফ্যান্টাসি ও এলোমেলো বয়ানে দ্রুত ছন্দ নির্মাণ করে। যেন সবটাই আপেক্ষিক। আবার কোনটাই ফেলে দেওয়ার নয়। কোন বিষয়েই গভীরে গিয়ে কাহিনি খদিত হয় না আবার হালকা বলে বাতিল করে দেওয়াও যায় না। গদ্যের চলন-ভঙ্গিটাই এর ধী-কেন্দ্র। স্থির সত্য বলে কিছু তো নেই। চারিদিকে অস্থিরতা বিরজমান। ফলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে কাহিনি। শুধু কাহিনি নয় বলার ঢঙও। চার রং নয় জীবনের সাত রঙে যেন রামধনু।

ইন্দ্রাণী আধুনিক সময়ে বসে আধুনিক উপন্যাস লিখেছেন। এখানে গল্প বিবেচ্য নয়। টেকনিক, উপস্থাপন, গদ্য, ভঙ্গি, চলমানতা ও বিষয়ের বিবিধ বিন্যাস জরুরি। সাহিলের উপন্যাস লেখার পরিসর যা টেক্সট এর ভিন্নধর্মী বয়ান হিসাবে গ্রহণ করা যায়। জাদুবাস্তব, মায়াবাস্তব, প্রচ্ছন্নবাস্তব, বাস্তবের ভিতর বাস্তব, নির্মিত বাস্তব নিয়ে ইন্দ্রাণী পৌঁছে যেতে চান সভ্যতার চলতি ধারাপাতে। নারী-পুরুষ, দাম্পত্য জীবন, সম্পর্কের বনিবনা, ব্যক্তির ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-স্বপ্নহীনতাসহ একাধিক ফরমান দ্বারা সময়ের বুকে দাপিয়ে চলা সত্যের জ্বালামুখ উন্মুখে নজর দেন। টেক্সট-এর ভিতর একাধিক ছিন্ন টেক্সট, সাংস্কৃতিক পরিসর, লেখক-পাঠক নির্মিত নিয়ে যেমন এক সত্যে পৌঁছোতে চান তেমনি স্পষ্ট কোনো সত্য নেই। যাত্রা আছে লক্ষ নেই। এই উদ্দেশ্যহীন রুদ্ধশ্বাস পরিণতিই আখ্যানের গোত্র নির্ণায়ক।

পাঠকের মনে হতে পারে এই গদ্য কি খেই হারিয়ে ফেলেছে না অন্য কিছু! দেবেশ রায়ের ‘উচ্ছিন্ন উচ্চারণ’ এর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে হয় এ গদ্য ‘বিচ্ছিন্ন উচ্চারণ’। বর্ষার মেঘের মতো শুধু খণ্ড খণ্ড উপদ্বীপ নিয়ে ভেসে যাচ্ছে। বজ্রপাত আছে, কোথাও একটু বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু স্থায়ী নয়। অসুখ থেকে ক্রিকেট, সংস্কার থেকে উপন্যাস লেখা, প্রাত্যহিক জীবনের নানাবিধ উপকরণ নিয়ে তা দৈনন্দিনের মালা সাজাতে ব্যস্ত। আছে জলতরঙ্গের শব্দমালা। সুর নিকেতন। জীবন ঘেঁটে আগুন নয় লেখিকা জীবন ঘেঁটে সুখ-অসুখের সুর বাজাতে চেয়েছেন। কিন্তু জীবনের তো বহু রং, বহু উপপাদ্য। তাই ‘ক্ষণিকের অতিথি’ হয়ে ‘বন্ধনহীন হরিণশিশু’র মতো তার এগিয়ে চলা। তবে এড়িয়ে চলা নয়। স্পর্শবিন্দু থেকে স্পষ্ট-অস্পষ্ট বিন্দুতে ধাক্কা খাওয়াই এ আখ্যানের নিগূঢ় নিকেতন।

পঙ্কজ-স্মিতা, লিপি-ছন্দা-বিপ্লব, সাহিল-কঙ্কনার জীবনের বহির্বাস্তব-অন্তর্বাস্তব, ঘর-বাহির, মনজগৎ-কর্মজগৎ, প্রত্যেককে কেন্দ্র করে ভিন্নজনের ভাবনা, চিন্তা-দুশ্চিন্তা, যার মধ্য দিয়ে সমাজ-পারিপার্শ্বিক-রাষ্ট্রের নিগূঢ় ধারাপাত সংযুক্ত, সেই পরিসরকেই লেখিকা উপস্থাপিত করতে চেয়েছেন। সকলেরই পরিসর ভিন্ন, জীবনচিন্তা-কর্মবলয় পৃথক। কিন্তু তা জীবনেরই সম্পাদ্য। জীবন তো বহুমাত্রিক। সেই জীবনের বহুকৌণিক বিন্দু উপস্থাপন প্রায় অসম্ভব। লেখিকা অদৃশ্য জালে বহু বিচ্ছুরণের মালা ঝুলিয়ে রাখেন। ভূ-মণ্ডল থেকে নক্ষত্রমণ্ডল, গবেষণা থেকে কর্পোরেট, সংসার থেকে সম্পর্ক ইত্যাদি-প্রভৃতি নিয়ে লেখিকার যাতায়াত। ভুবনভোলানো নানা রসদ, বাস্তুবিদ্যা-কারিগরিবিদ্যা, দেশ-বিদেশের যোগসূত্রের মেলবন্ধনে এ আখ্যান একক, স্বতন্ত্র। মনে রাখতে হবে এটি লেখিকার প্রথম উপন্যাস। গল্পের আবরণে কিছু ত্রুটি থাকতে পারে! তবুও সচেতন পদক্ষেপ। সচেতন এ জন্যই প্রথাগত বাংলা উপন্যাসের ঐকরৈখিক কাহিনির যাত্রাপালা থেকে বেরিয়ে এসে কিছুটা একটা করতে চেয়েছেন। নারীকেন্দ্রিক বলয়ের (ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে—মহাশ্বেতা দেবী, অনিতা অগ্নিহোত্রী, অহনা বিশ্বাস, প্রতিভা সরকার) সাংসারিক টানাপোড়েনের বৃত্ত থেকে নতুন ভঙ্গিতে নতুন বীক্ষণে যে উড়ানের চেষ্টা তা অভিবাদনযোগ্য।

বিদেশের জীবন আরও জটিল, আরও ভয়ংকর। দ্রুতগতিতে ছুটেছে সব। দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে সম্পর্ক। মানুষ এক শহর থেকে অন্য শহরে দ্রুত কর্মসংস্থানে চলে যাচ্ছে। তেমনি ভায়াগ্রা স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এ আখ্যান যেহেতু সেই জীবনকে স্পর্শ করতে চেয়েছে তাই গদ্যও দ্রুত ছুটছে। বিদেশে যাওয়া ভারতীয়দের সংকট বেশি। তারা পুরোপুরি যেমন বিদেশী হতে পারেনি তেমনি দেশের সমস্ত রীতিপ্রথা, আদব-কায়দা খাদ্যাভাস বিসর্জন দিতে পারেনি। বাঙালি খাদ্যাভাসে মত্ত বাঙালির পৃথিবীর অন্য খাদ্য কি শ্রেষ্ঠ মনে হতে পারে? মন পরে থাকে দেশে, মনের ক্যানভাসে উঁকিঝুঁকি দেয় শহর-শহরতলির নানাকথা অথচ জীবনের টানে কেবল ছুটতে হচ্ছে। সেই দ্বন্দ্বকে লেখিকা অদ্ভুত কায়দায় বাজিমাত করেছেন।

মানুষ চলতে চলতে বিভ্রান্ত হয়, ভুল পথে অগ্রসর হয়, কেউ রূপকথার অলীকে যেতে ভালোবাসে। ব্যক্তির অধিগোলকের পূর্ণিমা-অমাবস্যা নিয়ে আখ্যান এগিয়ে চলে। তেমনি আছে শব্দের বহুমাত্রিক প্রয়োগ। লোকজ শব্দ থেকে বহির্বিশ্বের ইংরেজি শব্দ, জীবনস্রোতের ভেসে যাওয়া শব্দের ক্যানভাসে আখ্যানে জলরঙের জলছবি অঙ্কিত হয়। বিশ্বায়ন, ভোগবাদ, চাহিদার সূত্রে বদলে গেছে জীবনের ছাঁচ। অলস ভাতঘুমে মত্ত বাঙালির জীবনেও এসেছে গতি। সকলেই বিরামহীনভাবে ছুটছে। সাহিল চলে যাচ্ছে অন্যত্র, লিপি চাকুরি ছেড়ে দিয়েছে। কেই আশাহত, কেউ নতুন আশায় মত্ত। তেমনি ব্যক্তির নিঃসঙ্গতা আছে। ব্যক্তির অধিগোলককে পার্শ্ববর্তী মানুষ কিছুতেই বুঝতে পারছে না। মানসিক সংকট থেকে ব্যক্তির অন্তররহস্যে লেখিকা দূরবীন চালিয়ে বহুপ্রকার আলেখ্য প্রকাশ করেন। জগতের অন্তসারশূন্যতা উপলব্ধির মধ্য দিয়ে আখ্যান বয়ে যায় জীবনের রুদ্ধগলিতে। ব্যক্তির অভিজ্ঞানে পরিবর্তন সর্বত্র বিরজমান। সেই সাইকোলজি, ব্যক্তির চিন্তাধারা, ব্যক্তির কার্যকলাপ সমস্ত মিলিয়ে আখ্যান এক অদৃশ্য অবয়ব নির্মাণ করে। আপাত অর্থে তা মরবিড কিন্তু ব্যক্তির অস্তিত্বের অংশ হিসেবে সঞ্চরণশীল।

সময়ের উপান্তে দাঁড়িয়ে সময়কে ছিন্নভিন্ন করে রুদ্ধশ্বাস সময়ের আয়ুধকেই নির্মিত হতে দেখি। মানুষ ক্রমেই ক্লান্ত হচ্ছে, হতাশা-ক্লেদ-বিবমিষা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্রমেই ব্যবধান বাড়ছে, হারিয়ে যাচ্ছে বিশ্বাস। আবার মিরাকলও আছে। জীবন আছে, জীবনের জাদু আছে। জাদু আছে বলেই মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সংযোগ-বিয়োজন-সংযোগের সূত্র ধরে এগিলে চলে মানবলীলা। সম্পর্ক-সম্পর্কহীনতা-নব সম্পর্কের সমানুপাতে জীবনের আলো-অন্ধকার বিরাজ করে।

ইন্দ্রাণী এই আখ্যানে বিচিত্র বীক্ষণে বহুমুখী সমস্যাকে ধরতে চেয়েছেন। আসলে জীবনের বহুমুখী জ্বালামুখই তাঁর কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে তিনি গাঢ় কাহিনির বদলে ছিন্নসূত্রে চেতনা থেকে উঠে আসা কিছু স্তব্ধ নির্বাক সংলাপকে ছুঁড়ে দেন। তা অসংগত নয়। সংযোগ করতে পারলে জীবনের জাদুলণ্ঠন উপলব্ধি সম্ভব। এই কমিউনিকেশন সম্পূর্ণ পাঠকের মননের উপর নির্ভরশীল। যে যেমনভাবে নেবেন। যে যেমনভাবে বুঝবেন।
 
চার রঙের উপপাদ্য। ইন্দ্রাণী। 
গুরুচণ্ডাল৯। প্রথম প্রকাশ—বইমেলা ২০২২। মূল্য—১৭৫।
পুরুষোত্তম সিংহ। ঘোষাপাড়া, সুভাষগঞ্জ, রায়গঞ্জ। উত্তর দিনাজপুর। ৬২৯৭৪৫৮৫৯১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ