ময়নার খালে উপুড় হয়ে ভেসে-যাওয়া সাদা লাশ প্রথম দেখতে পায় সুদেব। হরিসভা থেকে দু কিস্তি খিঁচুড়ি ভোগ খেয়ে ফেরার পথে তার তলপেটে অসহ্য ব্যথা শুরু হয়। হতে পারে, কারণ দ্বিতীয়বার তার মনে হয়েছিল তরকারির সঙ্গে কিছু একটা বিজাতীয় দ্রব্য সে চিবিয়ে ফেলেছে। সামান্য বিস্বাদ মনে হলেও প্রসাদজ্ঞানে সে অন্য কিছু ভাবেনি। নিশ্চিন্তে গিলে ফেলেছিল। এমন কী সে তৃতীয়বারও লাইন দেবে কিনা ভেবেছিল। কিন্তু ঘোর কালো একজন বাবাজি অনেকখণ থেকেই তার দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে দেখে সুদেব আর সাহস পায়নি। নামগানের আসর থেকে একমুঠো বিড়ি আর একটা নতুন দেশলাই ম্যানেজ করে সরে পড়েছিল।
বড় ছাতিমগাছ পার হয়ে মানকচুর ঝোপের আড়ালে বসে সে আয়েস করে বিড়ি ধরাল। বদন পালের হাতবাঁধা বিড়ি। হেভি ধক্। ঝোপের নিচে মানকচুর বড় বড় পাতার আড়ালে তৃপ্তিসূচক শব্দ শোনা যায়। তখন বেশ ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু সুদেবের মাথার ওপরে যেন স্বয়ং পালমশাই বিরাট একটা সবুজ ছাতা ধরে রেখেছে। এই বৃষ্টি তার শরীরের একটা লোমও ভেজাতে পারে না। সুদেব একটা বিধ্বংসী টান দিলে আগুন ঘুন্সিতে নেমে গেল। সুদেব আবার আঃ বলে। তারপর লুঙি কোমরের ওপরে তুলে দু’পা ফাঁক করে খালের দিকে এগিয়ে যায়। তলপেটের ব্যথাটা মনে হয় একটু কমেছে। খালপার থেকে পরিষ্কার হয়ে উঠে আসার পর সুদেব নিমডাঙার দিকে একটু এগোতেই দেখল কচুরিপানার সঙ্গে সাদা মড়া ভেসে যাচ্ছে। ঠিক ধব্ধবে সাদা নয়, সামান্য কালচে সবুজ রঙ আছে ওই দেহে। ভীষণ উত্কট একটা গন্ধ নাকে এল তার। মনে হল প্রসাদের খিচুড়ি এখনই সব বেরিয়ে আসবে। সত্যিই তার পেটে মোচড় দিয়ে উঠল।
আজ জন্মাষ্টমী। এই দিনে কংসের কারাগারে দেবকীর উদরে তিনি জন্ম নিয়েছিলেন। মথুরাতে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করেছিল। ভাদ্র মাসের আজ ষোলোই। ইংরেজি দোসরা সেপ্টেম্বর। বাংলা তারিখ তার মনে রাখার কথা নয়, কিন্তু সুদেব মালোদাস আকাশ বাতাস জল এবং আশ্রমের বাবাজিদের চালচলন লক্ষ করে বুঝতে পারছিল জন্মাষ্টমীর আর দেরি নেই। সাধু ঘোষের আশ্রম নব-বৃন্দাবন ক্রমেই লোকজনে ভরে উঠছে। মানুষ যেমন বাঁশবনে ফুল এবং কাশবনে ফুল দেখে মড়ক এবং পাট পচানোর সময় বোঝে, যেমন নক্ষত্রের উদয় এবং অস্ত দেখে মানুষ বীজবপনের ও শস্য সংরক্ষণের সময় বুঝতে শিখেছিল, সুদেব মালোদাসও তেমনই ভেতরের কোনও এক তাগিদে লক্ষ রাখে ব্রজবিহারীর জন্মদিনের দিকে। আদিম মানুষের মত সে বুঝতে পারে অষ্টপ্রহর নামগান, সন্ধ্যাবেলার কথকতা, সাধু ঘোষের শিষ্যদের ভাবসমাধি এবং তার সঙ্গে খিচুড়ি তরকারির অচ্ছেদ্য সম্পর্কের কথা।
কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, সুদেব মালোদাস আসরে বসে শুনেছে বসুদেব কীভাবে কংসের কারাগার থেকে দেবকীর অষ্টম গর্ভের সন্তানকে লুকিয়ে বার করে এনেছিল। যশোদা আর নন্দ সেই সন্তানকে বড় করে তুলেছিল। তারপর সেই নন্দদুলাল যখন ননী চুরি করে খেত, সে কথাও সুদেব রেকর্ডে শুনেছে। হায় হায়, কী অপূর্ব গান! ময় নেহি মাক্খন খায়ো। বলিহারি অনুপ জালোটা। চক্ষে আপনেই জল আইস্যা পড়ে।
খিচুড়ির সঙ্গে যে তরকারি থাকে, কচুঘেঁচুকাঁচকলার একটা ঘ্যাঁট, নীলমাধবের ইচ্ছায় কোনও বার যেন অমৃত। কিন্তু কখনও সেই ঘ্যাঁট বিস্বাদও হয়। সাধু ঘোষের দোষ নেই। সে হল ভক্তজন। সুদেব মালোদাসের মত হাবিজাবি লোকের সামনেও সে হাত জোড় করে দাঁড়ায়। এই না হলে কীসের বৈষ্ণব। কিন্তু ঘ্যাঁটের পেছনেই যদি সময় বয়ে যায়, চিন্তা নষ্ট হয়, তবে তার নাম স্মরণ করবে কখন। হ্যাজাকের পাম্প থেকে ভোগারতি, কীর্তনপার্টির পেমেন্ট থেকে লালনীল পতাকা, রাধামাধবের মালা থেকে টেম্পোরারি বাথরুম – এত সব সামলে ব্রজের রাখালের কথা ভাবতে হয়। তার নাম নিতে হয়। গোপাল জয় জয়, গোবিন্দ জয় জয়। তারপর আর ঘ্যাঁটের কথা মনে থাকেনা। যদিও নৃসিংহমুরারী সব কিছুর ভেতরেই থাকেন। প্রহ্লাদের সেই গল্প তো আর মিথ্যে নয়। সুতরাং কাঁচকলা অথবা কুমড়োর ভেতরেও তিনিই রয়েছেন। এই কথা টা কেউ বোঝে না। সবাই ভাবে বিগ্রহের ভেতরেই বুঝি তিনি। আরে বাবা, ভক্তিভরে যদি কচুঘেঁচুকেই পুজো করা যায়, তবে তারই পায়ে সব পৌঁছয়। এই যে দুদিন পেটে কিছু না পড়লে কেমন যেন খিদে খিদে পায়, শরীরটা কেমন যেন নেতিয়ে পড়ে, এর ফলে তিনিও তো কষ্ট পান। এই দেহে তিনি কি বিরাজ করেন না। তার প্রসাদ তাকেই বাঁচিয়ে রাখে। সুদেব মালোদাস তো নিমিত্তমাত্র। সুতরাং আশ্রমে সাধু ঘোষের নড়াচড়ার দিকে লক্ষ রাখতেই হয়। প্রথম দুটো দিন খিচুড়ি ভোগ, শেষ দিন আবার শেষপাতে পায়েস থাকে। আগামীকাল রাতে সুদেব তার বউবাচ্চাকে নিয়ে আসবে। তার ছেলে সুধন্য মালোদাস কোনও দিন পায়েস খায়নি।
গত দশবারোদিন সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। কখনও ভারি কালো মেঘ, কখনও ধূসর স্লেট রং-এর মেঘে আকাশ ঢাকা ছিল। মাঝে মাঝে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে, কখনও ঝিরঝিরে। ময়নার খালের গতর যেন ভরাযুবতী। কত কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেই সর্বনাশী জল। বাঁশের সাঁকো পার হওয়ার সময় পা যেন আর বাঁশে থাকে না। বশে থাকে না। নিচে তাকালে মনে হয় না এই হল চিরকালের সেই চেনা ময়নার খাল। উজানে খেতখামার উজাড় করে, ঘরসংসার ভাসিয়ে দক্ষিণে ভেসে যায় কুরশা নদীর দিকে।
বিড়ি আসলে বাঁধে বদন পালের বউ। বদনের তো নড়তে চড়তে আঠারো মাস। বদনের বউ-এর হাতে জাদু আছে। বড় চমৎকার বিড়ি বাঁধে। ভেতরে ডালপালা নেই, হড়হড় করে ধোঁয়া বুকের ভেতরে চালান হয়ে যায়। তারপর কেমন একটা ঝিম আসে। নিমেষে কোষ্ঠসাফ। বদন বিড়ির জবাব নেই। লুঙির কষি বদন একবার হাতিয়ে দেখল। আছে, আসর থেকে সংগ্রহ করা বিড়িদেশলাই যথাস্থানে আছে।
ঘোলাজলে ভেসে আসা কচুরিপানা দেখছিল সুদেব। ঘোলাজল আর এই ঘন সবুজ কচুরিপানা মিলেমিশে একটা গন্ধ হয়। সুদেব স্পষ্ট বুঝতে পারে। জলকাদার সঙ্গে তার নিত্যদিনের সহবাস। এই গন্ধ তার চিরকালের চেনা। হঠাৎ তার চোখে পড়ল উপুড় হয়ে ভেসে আসা একটা নোরাং সাদা শরীর। ফুলে ঢোল হয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে বীভৎস একটা পচা গন্ধ তার নাকে এল। এই গন্ধ চিরকালের চেনা গন্ধ নয়, কিন্তু চিনতে কোনও কষ্ট হয় না। মরণ এসে ছুঁয়ে গেছে ওই দেহকে। মরণের পেছনে থাকে পুরোহিত, শকুন, মাংসখেকো পোকা। মরণ এসে প্রাণটি হরণ করে নিলেই ওরা সবাই নড়েচড়ে ওঠে। মরা নিয়ে ভাগবাটোয়ারা হয়। উল্লাসে কিলবিল করে ওঠে পোকার দল। নাকে হাত চাপা দিয়ে সুদেব ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। খুব বেশি লম্বা নয় শরীরটা। খালি গা, নিচে মনে হয় একটা হাফপ্যান্ট। বাচ্চা ছেলে। হরে কিষ্ণো হরে কিষ্ণো – সুদেব অস্ফুটে বলল।
অন্ধকারে দাঁড়িয়েছিল সুদেব। সাধু ঘোষের আশ্রমের বাইরে। ভেতর থেকে খোলমন্দিরার শব্দ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে উলু শোনা যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে সুদেব দেখল ঘন অন্ধকার। আজ সারাদিন আকাশে মেঘ ছিল। কোথাও আবার বৃষ্টি নেমেছে। ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে সুদেবকে। সুদেবের পেটের ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠল। এক পা দু’পা করে ময়নার খালের দিকে রওনা হল সুদেব। অন্ধকারে বাঁশের সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে একবার খালের উজানে, একবার ভাটির দিকে ভালো করে দেখল সে। জলের কলকল অস্পষ্ট শোনা যায়। ঘোলাজল এখন কালো দেখায়। দিনের চেনাজানা খাল এখন কেমন অচেনা মনে হয়। পারের ঝোপজঙ্গল এখন যেন ওত পেতে বসে থাকা কোনও জন্তু। তলপেটে হাত বুলিয়ে একটু আরাম পেতে চাইল সুদেব।
তার কাঁধে কেউ হাত রাখল। সুদেব পেছন ফিরে দেখল না। সে গুনগুন করে গাইছিল –
নন্দলাল নাচত ভাল
যশোদা তাহে ধরত তাল
সুদেব, আমি এসেছি। যেন উজান থেকেই কথা ভেসে এল।
জানি। তলপেটের ব্যথা যেন গলা বেয়ে ওপরে উঠে আসতে চাইছে। ঠোঁটের কশে হাত রাখল সুদেব। এখনও ভেজা ভেজা। জিভ দিয়ে চাটল।
সুদেব, আমাকে চিনতে পারছ? আমি মরণ। খিদে পেয়েছে সুদেব?
না, আমার কিছু ভালো লাগছে না। মরণ, তুমি কোনও দিন পায়েস খেয়েছ? খাবে? এখনও আমার জামায় লেগে রয়েছে। সাধু ঘোষের ছেলে আমার পেটে লাথি মারলে পায়েসটা বেরিয়ে এসেছিল। মরণ, তুমি কি আমাকে নিয়ে যাবে?
না সুদেব। মরণ কি শুধু জলে ভেসে যাওয়া মড়া? আমি সবখানে থাকি। পায়েসেও আছি, পদাবলিতেও আছি। কাঁচাকলায় আছি, প্রজাপতির ডানার সূক্ষ্ম কারুকাজেও আছি।
বুঝি না তোমার কথা।
সুদেব, আমার লীলাখেলার কথা সবাই ভুলে থাকতে চায়। আমার লাবণ্য, আমার বাহারের কথা খোলমন্দিরা নিয়ে কেউ গায় না।
তুমি কি তবে সুন্দর?
সুন্দর কাকে বলে সুদেব? তোমার সুন্দর আর সাধু ঘোষের সুন্দর আলাদা। অলকা দিদিমণি আর বাহারুল শেখের সুন্দর আলাদা।
আসল সুন্দর বলে তবে কিছু নেই?
এদিকে ফিরে তাকাও
সুদেব বাঁশের সাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে উজান থেকে ভাটির দিকে ঘুরল। দেখল বড়ছাতিমগাছের মাথার ওপর মেঘ একটু হালকা। অষ্টমীর ভাঙাচাঁদ দেখা যাচ্ছে। তারপর সেই চাঁদ, ছাতিমগাছ, খালের জল, সাঁকো, ঝোপজঙ্গল, খোলমন্দিরার অস্পষ্ট আওয়াজ – সব মিশে যাচ্ছে। যেন একটা প্রবল ঘূর্ণির ভেতর সব হারিয়ে যাচ্ছে। বাতাস, এমন কী এই সময়কেও মনে হয় টেনে নিচ্ছে ঘূর্ণির চোখ।
সেই চোখ সব কিছু গেলার পর ক্রমশ বড় হতে শুরু করল। সুদেব দেখল গহ্বর থেকে প্রথমে পাতলা খিচুড়ির মত হলুদ ধারা নেমে আসছে। অনন্তধারায় বইছে খিচুড়ি। তারপর রুপোলি স্রোতের মত নেমে এল পরমান্ন।
সোনালি আর রুপোলি ধারায় জগৎজুড়ে আনন্দ বয়ে যায়। মরণের মুখে সেই রূপ দর্শন করে সুদেব মালোদাস। মৃত্যুর মুখ থেকে জীবনের গন্ধ ভেসে আসছিল।
লেখক পরিচিতি
বিপুল দাস
কথাসাহিত্যিক।
বিপুল দাস
কথাসাহিত্যিক।
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত।


4 মন্তব্যসমূহ
ভালো লেখা। তবু মরণ আর সুদের মালোদাস যেনো একাকার হতে পারলো না। অবশ্য ব্যক্তিগত মনে হওয়া গুরুত্ব না দিলেও চলবে। একটি বাক্যে বদন আর সুদেবে বোধহয় গন্ডগোল আছে।
উত্তরমুছুনসুদেব মালোদাস, সুদের লেখা ভুল হয়েছে।
উত্তরমুছুনসুন্দর গল্প। ভালো লেগেছে।
উত্তরমুছুনগল্পের আইডিয়াটা ভালো। তবে মরণ- এর মুখোমুখি হবার সময়ে সুদেব-এর বিপন্নতাবোধ তেমন কাজ করে না - এটাই এই গল্পের আংশিক অসম্পূর্ণতা।
উত্তরমুছুন