অটোর চালকের পাশের আসনে বসে লুকিং গ্লাস চোখ রেখে দিয়েছি বহুক্ষণ। পেছনের আসনে দুটি ছেলেমেয়ে, পাশাপাশি। মেয়েটির চোখেমুখে তীব্র অভিমান, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। হাওয়া খেলছে ওর এলোমেলো চুলগুলো নিয়ে। ছেলেটি সেই অভিমানের কোনও কারণই খুঁজে পাচ্ছে না। অহেতুক হাতড়াচ্ছে। ছেলেটি মেয়েটিকে ভালোবাসে। ওদের সম্পর্ক রয়েছে এ কথা বুঝতে অসুবিধে হল না। আমার থেকে অন্তত দশ বছর ছোট তো হবেই। মেয়েটির গায়ে একটি কাঁধখোলা জামা। ওর গলার কাছে হাড়গুলো দেখতে পাচ্ছি। সেগুলো মাঝে মাঝেই এতটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যেন একটি গভীর খাদ। ছেলেটি, একবার ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করল সেই খাদে। মেয়েটি প্রত্যাখ্যান করল। আমার থেকে দশ বছরের ছোট হবেই ছেলেটি। ওর এই অসহায় অবস্থা দেখে আমার করুণা হল। তবে শুধুমাত্র করুণা নয়, যেন এক তীব্র হাহাকার বুকের ভেতর পাকিয়ে উঠল আমার। ইচ্ছে হল, মেয়েটির পাশে গিয়ে বসি। ঐ খাদে নিজের মতো করে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করি। অটো থেকে নামার পরও কিছুক্ষণ আমার ভেতর এই হাহাকার এক না মুক্তি পাওয়া প্রেতের মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল। স্টেশনের কাছাকাছি আসার আগে অবধি মনে হতে লাগল, আসলে যারা প্রকৃত অর্থেই মেয়েদের ঐ গলার খাদটার মধ্যে ঝাঁপ দিতে শেখে তারা আজীবন মেয়েদের ভালোবাসা পায় না। যেমন পাইনি আমি। চিরকাল শুধু ঝাঁপ দিয়েছি আরও আরও গভীর সব খাদে।
আমার ট্রেন ধরার নেই কোনও। যেখানে চলেছি, তাতে করে এই স্টেশনটিকে এড়িয়ে গেলেও তেমন অসুবিধা হত না। তবু, স্টেশনের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে আমার বেশ লাগে। এই স্টেশনটির একটি মুখ যেখানে নেমেছে সেখানে এক বয়সে প্রেমিক হয়ে অনেক অপেক্ষা করেছি। তাও কেটে গেল প্রায় আটটি বছর। ডানদিকে বিখ্যাত মিষ্টির দোকানটি। বাম হাতে বাজার। বাজার যেখানে শুরু সেখানে চায়ের দোকানটির বিকলাঙ্গ ছেলেটি বড় হয়ে গেছে। কিছুটা এগিয়ে ডানহাতেই সেই টেলিফোন বুথটি। এখনও রয়েছে!
একটি টেলিফোন বুথ। আশ্চর্য এত বছর পরেও যার ভেতরে ক্রমাগত বেজে চলেছে একটা টেলিফোন। কেউ ধরার নেই। কেউ সেদিকে নজরই দিচ্ছে না। শুধু বেজে চলেছে যেন আমার মাথার ভেতরেই। অসহ্য অসহ্য একটা রিং। দ্রুত এগিয়ে চলি ডানদিকের রাস্তাটা ধরে। টেলিফোন বুথটা থেকে অনেকটা দূরে। স্পষ্ট মনে হয় বিকলাঙ্গ ছেলেটির দুটি চোখ আমাকে অনুসরণ করছে।
জায়গাটি আমার আট বছরের পরিচিত। মনে পড়ে একদিন এখানে প্রেমিক ছিলাম। এইসব পথ বুজে আমি হেঁটে যেতে পারি। শহরতলির এক প্রেমিকের কাছে প্রেমের দিনগুলোতে কেমন সর্বস্ব হয়ে ওঠে প্রেমিকার পাড়া। প্রেমিকার পাড়া, কী আশ্চর্য গভীর এক রূপকথা! প্রথম যেদিন আত্রেয়ী আমাকে বলল এখানেই ওর ফ্ল্যাট, চমকে গেছিলাম। এই ফ্ল্যাটটি হয়েছে বেশ কিছু বছর হল। আগে একটা পুরোনো বাড়ি ছিল, সামনে ছিল একটা জামরুল গাছ। সেই গাছ কাটা, বাড়ি ভাঙা, ফ্ল্যাট ওঠা সব আমার এই চোখের সামনেই ঘটেছে। এমনকী একদিন ভেবেছিলাম, আমি ও আমার সে সময়ের সঙ্গিনী এই ফ্ল্যাটের দোতলায় সংসার করব। সেই সংসার হয়নি তবু ফ্ল্যাটটি যে আমার জীবন থেকে নিজেকে মুছে নিতে পারেনি তা আত্রেয়ীর কথা শুনেই বুঝেছিলাম। আত্রেয়ী, আমার কিছুদিনের পরিচিত। ওর বড় পরিচয় হতে পারত এই -বিখ্যাত এক সদ্য মৃত পরিচালকের বিদুষী প্রেমিকা। হয়নি। কারণ সেই বিখ্যাত পরিচালক, তার এই গোপন প্রেমিকাটির কথা গোপনই রাখতে চেয়েছেন। তার সংসার ছিল, তার থেকেও বেশি ছিল মুখরক্ষার দায়। অযথা বিতর্কিত কিছু তিনি নিজের উজ্জ্বল কর্মজীবনে চাননি। আত্রেয়ী হল এই অযথা। পরিচালক বিখ্যাত, দীর্ঘ জীবন শেষেই তিনি মৃত্যুর কাছে গেছেন। রেখে গেছেন সংসার এবং অনেক প্রেমিকা। তার মধ্যে উজ্জ্বলতম হয়ত আত্রেয়ী। এমনই ধারণা আমার তবে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। আত্রেয়ীকে তিনি রেখেছেন এই শহরতলির এক ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটটি তারই। এখানে তার থাকার সময় ছিল অল্প। তবে অল্প সময়তেই আত্রেয়ীকে তিনি অভ্যস্ত করে তুলতে পেরেছিলেন। বুঝতে শিখিয়েছিলেন, সময়ের পরিমাপ নয়, সময়ের ব্যবহারই আসল কথা।
২
সকাল সকাল এই ফ্ল্যাটে এসে, বেল বাজিয়ে, আত্রেয়ীর হাসি মুখ এবং সাদা টি-শার্টের ভেতর ওর স্ফীত দুটি স্তন আমাকে শান্তি দিয়েছিল। তখুনি মনে হয়েছিল আত্রেয়ীকে আমি অল্প সময় ধরেই চিনি কিন্তু সময় সবসময় সবকিছুর নির্ধারক হয়ে ওঠে না। আত্রেয়ীকে আমি চিনি অনেক গভীরভাবে। আত্রেয়ীর ফ্ল্যাটটি ছোট, চারতলায়। একটি ঘরের নীচে বিছানা পাতা এবং তার চারিদিকে শামুকের মতো ছড়িয়ে রয়েছে বই। তার ওপর দেওয়ালে কোনও বিখ্যাত পেন্টিং এর নকল। সম্ভবত ছবিটি আইস্যাক লেভিটানের। একটা ভাঙা বেগুনি রঙের ফুলদানি যাকে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে। আরেকটি ঘর মানে ডাইনিং। সেখানে একটি আয়না। কোনও বাড়ির ডাইনিং এ আয়না এই প্রথম দেখলাম আমি। ডাইনিং লাগোয়া একটা ছোট রান্নার জায়গা যার মাথার ওপর একটি কাঁচের জানলা। দেখে মনে হল তার একটিমাত্র পাল্লাই খোলা যায়। সেই বন্ধ হওয়া পাল্লাটিতে ঝুল মাকড়সার সুন্দর রুপোলি সব বাসা। ডাইনিং এ একটা ছোট টেবিল, একজন বসে খাওয়ার মতোই। টেবিলটি কাঠের, ভিক্টোরিয়ান পায়া। চেয়ারটি অদ্ভুত সস্তা প্লাস্টিকের এবং দৃষ্টিকটুভাবে লাল। ঠিক তার নীচে একটি বেড়াল বসে থাবা চাটছে। বেড়ালটির দুটি চোখের মণি ভিন্ন রঙের। এই রোগের নাম যেন কী? হেটেরোক্রোমিয়া। বেড়ালটি বোবা।
আত্রেয়ীর গড়ন লম্বা কিছুটা পুরুষালি বলা যায়। ফ্যাকাশে ধরণের ফর্সা। মুখটাও কিছুটা লম্বাটে তবে অপূর্ব মায়াময়। চুলগুলো এলোমেলো, ঘাড় অবধি ঝুলে রয়েছে। তাকে অপূর্ব রুপসী বলা যায় না তবে প্রথম দেখাতেই বোঝা যায় অপূর্ব বুদ্ধিমতী। আত্রেয়ীর সাদা টি শার্টের তলায় দুটি স্ফিত স্তন আমাকে শান্তি দিয়েছে। উত্তেজিত করেনি। মনে হয়েছে, স্তনদুটি আশ্রয় দিতে পারে। সমস্ত ফ্ল্যাটটির রঙ শাদা এবং আগেই বলেছি আসবাবের সংখ্যা তিনটি – একটি আয়না, একটি কাঠের টেবিল যার ভিক্টোরিয়ান পায়া এবং একটি লাল সস্তার প্ল্যাস্টিকের চেয়ার। ইতিমধ্যে আত্রেয়ী বদলে এসেছে ওর পোষাক। ওর শরীরে এখন একটি উজ্জ্বল হলুদ রঙের নাইটি। নাইটিটি ওর উচ্চতার থেকে একটু খাটো। ফলে ওর হাঁটুদুটো বেরিয়ে আছে। আমরা বসলাম প্রথম ঘরটিতে, নীচের বিছানায়। চারিদিকে শামুকের মতো ঘেরা বইয়ের মধ্যে আত্রেয়ী বসল ঠিক আমার মুখোমুখি। যেকটি বই ইতিমধ্যে আমার চোখে পড়েছে- ম্যাকিয়াভ্যালির দ্যি প্রিন্স, হ্যামলেট এবং এক অজ্ঞাত কবির বেশ খারাপ প্রচ্ছদের কবিতার বই।
৩
শিলাদিত্য এসে দু'দিন থাকত। খুব বেশি হলে তিনদিন। এই তিনদিন। সেই তিনদিন আমাকে অদ্ভুত একটা নিয়মের মধ্যে থাকতে হত। প্রথমত, এই ফ্ল্যাটের অনেককিছুই ওর পছন্দ ছিল না। লাল রঙের প্ল্যাস্টিকের চেয়ারটা ও ফেলে দিতে চেয়েছিল। আমি দিইনি। ও অবাক হয়ে গেছিল ডাইনিং রুমে আয়নাটা দেখে। বলেছিল, আমি নাকি পাগল হয়ে গেছি। তবুও কিছুতেই আমি সরাতে দেইনি আয়নাটা। আমি ভালোবাসি ডাইনিং রুমে আয়না। আমার মনে হয় মানুষ যখন কিছু খেতে বসে তখনই তাকে সবথেকে সুন্দর দেখায়। আমার বইগুলোর মধ্যে অনেক কটাই ও নিয়ে গেছে, আর ফেরৎ দেয়নি। অচেনা অজ্ঞাত কবিদের লেখা বই ওর পছন্দ হত না। বারবার আমাকে ক্লাসিক পড়তে বলত। বলত এগুলো পড়ে ফেলা জরুরি। এদিকে যা কিছু জরুরি আমার কিছুই পড়তে ভালো লাগত না।
আত্রেয়ীর কথা শুনতে শুনতে আমি কিছুটা গা ছেড়ে বসলাম মেঝের তোষকটাতে। ভাবলাম, ওদের এত সব আদর, কাছাকাছি আসা, যৌন সংসর্গ নিয়ে কীভাবে অবৈধভাবে বেঁচে আছে তোষকটা। হয়ত, বিষয়টা এতটা অবৈধ বলেই খাট কেনার কথা মনে হয়নি শিলাদিত্য অথবা আত্রেয়ীর। তারপর হঠাৎ মনে হল, শিলাদিত্য ঐ বয়সে কি সঙ্গম করতে পারত আত্রেয়ীর সঙ্গে? ইতিমধ্যে বেলা সকাল পেরিয়ে দুপুরের গড়িয়েছে। আমরা উঠে এসেছি আত্রেয়ীর ছোট সরু বারান্দাটায়। সেখানে একজনের জন্য একটি বসার আসন। নিজেকে মেঝেতেই রাখলাম। আত্রেয়ী আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকল তারপর শুরু করল তার সদ্যমৃত বিখ্যাত প্রেমিকের কথা।
শিলার যে একটা সংসার ছিল সেটা তো সকলেই জানে। তুমিও জানো। শিলা সেই সংসারে অত্যন্ত খুশি ছিল। ওর মেয়েটি আমার থেকে বছর তিনেক ছোট। ওর বউয়ের সঙ্গে আমার একাধিকবার আলাপ হয়েছে। অত্যন্ত সংসারী মহিলা। শিল্পবুদ্ধি কম হলেও সংসারটাকে একেবারে সাজিয়ে রেখেছে। শিলার কোনও অভিযোগ ছিল না। একদিন একটি আলোচনা সভায় শিলার সঙ্গে আমার পরিচয়। পরে বলেছিল, ওর সিনেমা নিয়ে আমার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণই মুগ্ধ করেছিল। প্রায় মাফিয়াদের মতো আমার খোঁজ, যোগাযোগ, ঠিকানা সব বার করে তুলে এনেছিল এই ফ্ল্যাটে। বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় রইল না। শিলাই রাখতে দেয়নি। আমার বাবা ছিলেন সরকারি কর্মচারী। এই ফ্ল্যাটে চলে আসার ছ মাসের মধ্যে মারা যান। মা চলে যান ছোটমামার কাছে। এখনও ওখানেই থাকেন। শিলা কিন্তু আমার আত্মীয়দের মুখ বন্ধ করে রেখেছিল, এতটাই ক্ষমতা ছিল ওর। আমি ভেবেছিলাম, এ এক উন্মাদ ভালোবাসা। আমি তো চিরকাল এমন ভালোবাসাই চাইতাম। চলে এসেছিলাম। আর কিছু ভাবিনি। ধীরে ধীরে শিলা স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার কাছে। জীবনের কোনও সামান্যও ওর জন্য নয়। আমি ওর চিত্রনাট্যের একজন নায়িকা। অথচ এই চলচ্চিত্রের কোনও মুক্তি নেই। কোনও অগোছালো ভাব ও সইতে পারত না। সমস্ত ফ্ল্যাটটাই হয়ে উঠল ওর একটা সেট। সেখানে প্রতিটি বেলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পোশাক বদল করে আসতে হয়। আশ্চর্য সব পোশাক। ও থাকার দুটোদিন আমি ঘরের কোনও পোশাক পরে থাকতে পারতাম না। নয় আমাকে ও পরাত উজ্জ্বল দামি সব পোশাক, নয়ত কিছুই পরতে দিত না। এর মাঝে কোনও জীবন নেই। আমি এর থেকে মুক্তি চাইতে সমস্তকিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখতাম। শিলা এসে সমস্ত গুছিয়ে দিত আমার। যেন আমার এক তীব্র আর্তনাদকে ও মুখে হাত রেখে চেপে রাখতে চাইত।
আত্রেয়ীর মুখ ছেড়ে বারান্দা থেকে তলার দিকে তাকিয়ে দেখি দুটো প্রেতগ্রস্থ ঘোড়া কীসের এক অজানা ভয়ে ছুটে চলে গেল। ঠিক তখুনি যেন আবার এতদূর থেকেও শুনতে পেলাম স্টেশনের কাছে সেই বুথটার ভেতর থেকে টেলিফোনের অবিরাম বেজে চলা।
একদিন বেশ কয়েকজন তরুণকে নিয়ে এল ও এই ফ্ল্যাটে। আশ্চর্য হলাম। এই জায়গাটির কথা ও কাউকে জানায়নি কখনও। এটি ছিল ওর গোপন আশ্রয়স্থল। সেদিন ঐ কয়েকজন তরুণ থেকে গেল এই ফ্ল্যাটে। রাতে সকলে খাওয়া দাওয়ার শেষে ও সেই তরুণদের গোল করে বসালো মেঝের বিছানায়। তারপর ওদের সামনে একে একে খুলে ফেলল আমার সমস্ত পোশাক। ওর আদেশমতো গিয়ে বসলাম ঐ তরুণদের মাঝে। আমার সেই নগ্ন শরীরটি ভালো করে দেখতে নির্দেশ দিল শিলা। যেন ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে ওরা। দেখার ক্ষেত্রে যেন কোনও সংকোচ না করে। এতে করে শিল্পকে দেখার ক্ষেত্রে যে বাঁধা চোখ তৈরি করে তা কেটে যায় অনায়াসে – এই ছিল শিলার ভাবনা এবং প্রয়োগ। তরুণদের ঐ চোখের সামনে এক শিল্পবস্তু হয়ে পড়ে রইলাম আমি। সারারাত ওভাবেই। ভোর হলে শিলা ওদেরকে নিয়ে উঠে চলে গেল। আমাকে আর পোশাক পরতেও বলল না। আমি ওভাবে নগ্ন হয়ে পড়ে রইলাম দু’তিনদিন। একবারও পোশাক পরার কথা মনে হয়নি। দুতিনদিন পর ঝড়ের রাতে শিলা এল আবার। বিধ্বস্ত, ওর চোখমুখ দেখলে রীতিমতো আঁতকে উঠতে হয়। এসে লুটিয়ে পড়ল আমার পায়ে। বারবার নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চাইল। বলল, যে পাপ ও করেছে তার ক্ষমা নেই। তবুও ক্ষমা চাইতে লাগল বারবার।
৪
নিজেকে প্রতিষ্ঠা তারপর নিজেকে ভাঙা – এই দুই এক অদ্ভুত প্রবাহ। আত্রেয়ীর কথার মাঝেই যেন ভেতরে ভেতরে বিড়বিড় করে উঠলাম আমি। এতক্ষণে দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে গেছে। এতক্ষণ কেন যে লক্ষ করিনি, বারান্দার এক কোণায় একটি জলভর্তি অ্যাকোরিয়াম। তবে তাতে কোনও রঙিন মাছ নেই। শুধু একটা অ্যাকোরিয়াম এবং তার ভেতর স্বচ্ছ জল। ভেতরে পড়ে আছে রঙিন পাথর। কিছুটা শ্যাওলা পড়েছে। আত্রেয়ী উঠে ঘরের ভেতর যায়। পোশাক বদলে আসে। এখন তার শরীরে আকাশি রঙের গাউন। আমরা ঘরের ভেতর ঢুকে আসি। খারাপ প্রচ্ছদের কবিতার বইটি তুলে নেয় আত্রেয়ী।
এটি পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে পেয়েছি। খারাপ প্রচ্ছদ বলেই এই বইটির দিকে আমার নজর পড়েছিল। ভেতরের কবিতাগুলোও দুর্বল। তবে আমার পড়তে ভালো লাগে। বড় বড় বিখ্যাত সফল বইয়ের থেকে পড়তে বেশি ভালো লাগে। শিলাদিত্য বারবার ঐ বারান্দা দিয়ে বইটা বাইরে ফেলে দিয়েছে। আমি কুড়িয়ে নিয়ে এসেছি। একবার আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছিল বইটা। বাঁচাতে গিয়ে আমার হাতের এই জায়গাটা পুড়ে যায়। আত্রেয়ী দেখায় ওর পোড়া জায়গাটা। ইতিমধ্যে বেড়ালটা এসে বসেছে ওর গা ঘেঁষে। একটি বোবা বেড়াল। শুধুমাত্র গায়ে গা ঠেকাতে জানে, কোনকিছুর দাবি করতে পারে না। ইতিমধ্যে লক্ষ করিনি ঘরের এককোণে একটি সাইকেল। সাইকেলটি কখন এল! খেয়াল করিনি আগে – এ তো অসম্ভব। সাইকেলটি বহুদিন চালানো হয়নি স্পষ্ট বোঝা যায়। টায়ারগুলোতে হাওয়া না থাকায় বসে গেছে। আত্রেয়ী হঠাৎ সঙ্গীতের ওপর ঝুঁকে পড়ে। এডুয়ারড আরটেমিভ এর সেই আশ্চর্য সঙ্গীত যা তারকোভস্কি ব্যবহার করেছিলেন তার সোলারিস নামক চলচ্চিত্রে। আমার চিরকালের প্রিয়। আত্রেয়ী কীভাবে আমার এই পছন্দের কথা জানল- ভেবে বুক দুরুদুরু করে উঠল। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার পর আমি কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলা শুরু করলাম-
মঙ্গলবার গভীর রাতে ছোট মামা মারা গেল এই স্টেশনের কাছে এক বাড়িতে। আত্মহত্যার পদ্ধতি ছিল আশ্চর্য। নিজের বাথরুমের জলাধারটার ভেতর গলায় একটা ভারী পাথর চাপিয়ে মাথাটা ডুবিয়ে রেখেছিল। হাত ছিল বাঁধা। নিজেকে খুন করার এক সুন্দর পরিকল্পনা। হয়ত, রঙিন মাছ হতে চেয়েছিল ছোট মামা। বুধবার মায়ের সঙ্গে আমি আর যাইনি সেখানে। এইসব পথ দিয়ে হেঁটে গেছি টানা দুদিন। নিজের প্রেমিকাকেও কিছু জানাইনি। দেখা করিনি। শুধু হেঁটে গেছি। বৃহস্পতিবার থেকেই পথেঘাটে আমি ছোট মামাকে দেখতে শুরু করি। যেখানেই যাই, দেখি ছোটমামা দাঁড়িয়ে আছে। অপেক্ষা করছে। কার অপেক্ষা? আমাদের খুব একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল এমন বলা যায় না। আত্মহত্যার পর শুনেছি, শুধুমাত্র একটা চাকরি জোগাড় করতে পারেনি বলে মামা আত্মহত্যা করেছে। যারা এ কথা বলে তাদের বোকামিতে আশ্চর্য হই। একটা চাকরি না পেয়ে কেউ আত্মহত্যা করে? করে না। আসলে ওরা বোঝে না, ঠিক কী কারণে একটা মানুষ এভাবে অপূর্ব নিজেকে মেরে ফেলতে পারে। কীভাবে তাকে দিয়ে নিজেকেই খুন করায় সমস্তটা। ভরা বসন্তকালে আত্মহত্যা করেছিল ছোটমামা। যে সময় প্রকৃতি সবথেকে সুন্দর।
ইতিমধ্যে থেমে গেছে সঙ্গীত। বিকেল ছাড়িয়ে সন্ধে হয়ে আসতে চায়। চোখের সামনে অস্পষ্ট হয়ে উঠছে আত্রেয়ী এবং বেড়ালটি। আলো জ্বালানো হয় না।
ছোটমামাকে পথেঘাটে দেখতে দেখতে আমি তেমনই ক্লান্ত হয়ে উঠলাম। কী যেন ফিসফিস করে বলতে চায় ও। অপেক্ষা করে বিভিন্ন জায়গায়। অথচ, ওকে আমি ছুঁতে পারি না। মৃত্যু ওকে নিয়ে চলে গেছে অন্য এক পৃথিবীতে, সময়ে। তারপর একদিন আর দেখতে পেলাম না ওকে। আর কখনওই না। আজ এত বছর কেটে গেল ওকে খুঁজে চলেছি আমি।
৫
আলো জ্বালালো আত্রেয়ী। একটি হলুদ বাল্বের আলো। ঘুমন্ত বেড়ালটিকে কোল থেকে নামিয়ে চলে গেল পাশের ঘরে। পরে এল গভীর নীল রঙের একটি শাড়ি। ওকে আশ্চর্য দেখাচ্ছিল। বলল- চলো একটু বেড়িয়ে আসা যাক। যে পথ দিয়ে আমরা এতদূরে চলে এলাম তা বহুদিন আমার চেনা। এই পথের অন্ধকারে একদিন কত ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, কত চুমু খেয়েছি, কতদিন একা একা হেঁটেছি। কিছুটা গিয়ে সেই পুরোনো স্কুলটা। তার পাশ দিয়ে গেলে রেশনের দোকান। একটা ড্রাইভিং স্কুল। রাস্তাটা পার করে কিছুটা এগিয়ে পুরোনো পথটা ধরলাম। আত্রেয়ী আপত্তি করল না। বাড়িটা সেই আগের মতোই এক স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাক্তন প্রেমিকার এক প্রেতগ্রস্থ বাড়ি। কেউ থাকে না এ বাড়িতে। সামনের বাগানের গাছগুলো শুকিয়ে গেছে জলের অভাবে। গোটা বাড়িটাই খোলা। যে কেউ প্রবেশ করতে পারে। ঢুকে এলাম বাগানের ভেতর দিয়ে। বাগানের যে জায়গায় ওর পোষা কালো বেড়ালটির কবর সেখানে একটি শিউলি গাছ শুধু বেঁচে আছে। গোটা বাগানটা যেন ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলতে চাইছে বাড়িটাকে। প্রথমে ঢুকে বসার ঘর। এগিয়ে গিয়ে বামহাতে রান্নাঘর। ডানদিক দিয়ে সিঁড়ি উঠে গেছে। দুজনে দোতলার ঘরে উঠে গেলাম। আমার প্রিয় ঘরটি। এখনও দেওয়ালে ঝুলছে ওকে বহুবছর আগে দেওয়া ছবিটা। খুলে নিয়ে যায়নি কেউ। তোমার আঁকা ছবি? আত্রেয়ী জিজ্ঞেস করল। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালাম। ঘরের এদিক ওদিক ঘুরে দেখলাম, শুধু এই ঘরেই সমস্তকিছু তেমনই আছে যা আট বছর আগে ছিল। শুধু ধুলো পড়া। টেবিলে ছড়িয়ে আছে আমার দেওয়া চিঠি এবং উপহারগুলো। একদিকে তার একটি ছবি। ঘর থেকে বের হয়ে দেখি ছাদের দরজাটা খোলা। দুজনে ছাদে উঠে এলাম। দু’জন প্রেতগ্রস্থ মানুষ এসে দাঁড়িয়েছে ছাদের ওপরে।
আত্রেয়ী, জানো, এই ছাদ থেকে একদিন অন্য এক জীবন দেখার চেষ্টা করতাম। খুব শান্তির এক জীবন। যেখানে স্থিরতা আছে, বিশ্বাস আছে, কথা আছে। ধীরে ধীরে সবকিছুই কেমন মুছে গেল। আমার ভেতরে এক ভয়ানক রাক্ষস যেন ধীরে ধীরে গিলে ফেলছে আমাকে। আমি কিছুতেই বুকের ভেতরের এই জলটুকু স্থির করতে পারছি না। এত অস্থির এক আগুন। কিছুতেই সামলাতে পারছি না তাকে। কোথাও থিতু হতে পারছি না। ছোটবেলায় বাবা বলেছিল জীবনকে নিয়ে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে যায় যারা তারাই আদতে পুড়ে মরে। সেদিন বিশ্বাস করিনি। একটা খেলনা হিসেবে জীবনকে নিয়ে আমি বহুরকম খেলা খেলতে চেয়েছি। অথচ , আজ আমার শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন, তবু কিছুতেই খেলাটা আমি থামাতে পারছি না। এখন মনে হয় খেলাটাই আমাকে নিয়ে খেলছে।
৬
আমরা বাড়ি ফিরলাম বড় রাস্তার মোড় ঘুরে। আত্রেয়ী কিনল ইঁদুর মারার বিষ এবং মুরগির মাংস। সেই প্যাকেটের ভেতর তখনও রক্ত লেগে আছে। বাড়ি ফিরে সোজা রান্নাঘরে চলে গেল আত্রেয়ী। আমি গিয়ে বসলাম ঘুমন্ত বেড়ালটির পাশে। কিছুক্ষণ পর , কিছুটা সাদা ভাত এবং রান্না করা মাংস ও নিয়ে এল একটি থালায় করে। ইতিমধ্যে ওর পোশাক বদলে গেছে। এখন ওর গায়ে শুধু একটা সাদা অন্তর্বাস। খাওয়ার আগে কখনও প্রার্থনা করিনি আমি। আত্রেয়ী চোখ বুজে বিড়বিড় করে কিছু বলল। ও কি খ্রিস্টান হয়েছে? আত্রেয়ী মনের কথা বুঝতে পেরে চোখ খুলে হাসল। এতটা সুন্দর সারাদিনে ওকে কখনও লাগেনি। ভগবানকে নয়, প্রেতেদের ধন্যবাদ দিলাম। তারা যেন আমাদের এই ভোজনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। কিছুটা মুখে তুলে সরিয়ে রাখলাম বাকিটা। খাওয়া যাচ্ছে না। অখাদ্য রান্না। ভাত সেদ্ধ হয়নি। মাংসটি সম্পূর্ণ রান্না করা নয়। এমনকী তখনও জায়গায় জায়গায় রক্ত লেগে আছে। আত্রেয়ী পুরোটা গুছিয়ে খেল। আমার না খেতে পারা ওকে ব্যতিব্যস্ত করল না। সমস্ত নিয়ে ও ফেলে আসল রান্নাঘরের বেসিনে। সেই শব্দে ইতিমধ্যে জেগে উঠেছে বেড়ালটা। ক্লান্ত শরীর নিয়ে সে গেল রান্নাঘরে। আত্রেয়ী হাত ধুয়ে এসে বসল টেবিলে। মাথায় হাত রেখে, চোখ বুজে, চুপচাপ। বেড়ালটা উঠে গেল বেসিনের ওপর। আমার না খাওয়া মাংসগুলোকে আয়েস করে খাওয়া শুরু করল।
আমি ডাইনিং রুমে গিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতেই পড়লাম। বুঝতে পারলাম না এই সময়ে ওকে ডাকা উচিৎ হবে কী না। আর কোনও বসার জায়গা নেই এখানে। অগত্যা চলে এলাম পূর্বের ঘরেই। বেড়ালটি খেয়েদেয়ে ফিরে এল ঘরে। থাবা চাটতে চাটতে স্পষ্ট আত্রেয়ীর গলায় কথা বলা শুরু করল -
শিলাদিত্য এসে মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে অনেক খেলা খেলত। সেই উদ্ভট খেলাগুলোতে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে উঠেছিলাম। একদিন অ্যাকোরিয়াম থেকে রঙিন মাছটা তুলে ফেলে দিল মেঝেতে। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল মাছটির ছটফট করে মরে যাওয়া। আমাকে বলল নতুন মাছ এনে দেবে। নতুন কমবয়সী মাছ। এই মাছটি বুড়ি হয়েছে। ওর এভাবেই মরে যাওয়া ভালো। ও যে রাতে জাতীয় পুরস্কার পায় তার পরদিন ভোরবেলা আকন্ঠ মদ খেয়ে এসেছিল ফ্ল্যাটে। পুরস্কারটা এই খাবার টেবিলে রেখে খুব হেসেছিল। বলেছিল- এইতেই সত্যি, শুধু এইটেই। এর বাইরে নাকি কিছুরই কোনও মূল্য নেই। শুধু প্রতিষ্ঠা পাওয়া, বড় হওয়া। শুধুই শিল্পীর উন্মাদনা। কোনও সমাজ, সংসার, প্রেম, সম্পর্ক আর কিছুরই মূল্য নেই ওর কাছে। বলেছিল, ও তাদের ঘৃণা করে যারা কাঁদে। সেই বলে আরও জোরে হো হো করে হেসে উঠেছিল।
তারপর যে বেড়ালটিকে এতক্ষণ বোবা ভেবেছিলাম, আমার চোখে চোখ রেখে বলল- দীপ। ভালোবাসা শৈশবে উন্মাদনা, যৌবনে শরীর এবং বৃদ্ধ বয়সে প্রয়োজন।
কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে ডাইনিং রুমে আত্রেয়ীর হাউহাউ করে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। বেড়ালটি ছুটে পালাল বারান্দায়। আমি উঠে গেলাম ডাইনিং রুমে। দেখলাম, আয়নার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে আর্তনাদ করে কাঁদছে ও। কোনও কথা বলতে পারছে না। ওর গলা থেকে বোবাদের মতো এক গোঁ গোঁ শব্দ বেরিয়ে আসছে। আমি গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম ওকে পেছন থেকে। খুব শক্ত করে। ওর নরম শরীর যেন এলিয়ে পড়ল আমার দুহাতের ভেতর। ওর কাঁধের ওপর মুখ রেখে সমস্ত আর্তনাদ গিলে ফেলতে চাইলাম। দুজনে তাকিয়ে আছি আয়নার দিকে। যেন বহু বছর আগে স্বর্গভ্রষ্ট হওয়া আদম এবং ইভ। আমি আরও আরও শক্ত করে ওকে ধরে রইলাম। ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে গেল আয়নাটা। থেমে গেল আত্রেয়ীর কান্না।
৭
বারান্দা সংলগ্ন ঘরটায় অল্প অল্প বাইরের আলো এসে ঢুকছে। আমরা পাশাপাশি বসে আছি তোষকের ওপরে। হাতের সঙ্গে হাত লেগে আছে আমাদের। ঘরটি অন্ধকার। বুকোস্কির কবিতার সেই লাইনটি মনে পড়ে গেল। আলো যথেষ্ট না হলেও মাঝে মাঝে ঘরের অন্ধকার দূর করার জন্য সেটুকু আলোই যথেষ্ট। আত্রেয়ীর গায়ে কোনও পোশাক নেই তবু ওকে নগ্ন মনে হচ্ছে না। ইতিমধ্যে স্নান করে এসেছে একবার। শীতল জলের স্পর্শ এখনও ওর শরীরে লেগে আছে।
আত্মপ্রতিষ্ঠা এবং আত্মধংস। শিল্পীর কাছে এই এক আশ্চর্য খেলা, তাই নয় দীপ? শিলাদিত্যর কত সিনেমা দেখে আমি হাউহাউ করে কেঁদেছি। কী ভীষণ তার টান, মায়া। অথচ, মানুষটির মধ্যে কখনওই তার ছিটেফোঁটা দেখিনি। বারবার মনে হত একটি ধূর্ত মানুষ যে স্পষ্ট জানে মানুষের আবেগ নিয়ে কীভাবে খেলতে হয়। ও জানে, কীভাবে মানুষকে আকৃষ্ট করতে হয় নিজের শিল্পের মাধ্যমে। সেভাবেই তো এত উন্নতি করেছিল ও। অথচ ভেতরে ভেতরে মানুষটা এত অনুভূতিহীন, এতটা নৃশংস। মাঝে মাঝে আশ্চর্য লাগে। ওর মৃত্যুর দিনে মানুষের সমুদ্র নেমেছিল পথে। কত লোক কত আশ্চর্য কথা বলল ওকে নিয়ে। ওর স্ত্রী, মেয়ে কেঁদে ভাসালো। সরকার, গান স্যালুট দিল। অথচ কেবলমাত্র আমি জানি শিলাদিত্য কতটা ছোট, কতটা সামান্য। শুধুমাত্র আইডিয়া দিয়ে ভর্তি একটা ফাঁপা মানুষ। এই ক’বছরে যতবার আমাকে ভোগ করতে চেয়েছে ও, যতবার আমার স্তনদুটো কামড়েছে, যতবার প্রবেশ করতে চেয়েছে, একবারও ছুঁতে অবধি পারেনি। তারপর নিষ্ফল আক্রোশে আমাকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করতে চেয়েছে। মেরে ফেলছে চেয়েছে ঐ রঙিন মাছটির মতো জল থেকে তুলে। একবার এই ফ্ল্যাট থেকেও তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিল। সাহস করে উঠতে পারেনি। আমার কোনও কথাই ওর জানা হয়নি। ও জানতে পারেনি কেন ডাইনিং রুমে আমি রেখেছি ঐ আয়নাটা। কেন আমার খাওয়ার টেবিলে একটিমাত্র চেয়ার। কেনই বা পুষেছি ঐ বোবা বেড়ালটিকে। শিলাদিত্য আমার কিচ্ছু জানে না। ও ঘনিষ্ঠতা বলতে শুধু শরীরই বুঝেছিল। বোঝেনি, কথার ঘনিষ্ঠতা আরও কত কত গভীর। আদতে ওর চোখ থেকেই ঠুলিটা কোনওদিন সরে যায়নি।
দীপ শিল্পীরা নিজেদের নিয়ে মগ্ন থাকে। নিজের তৈরি করা জগত। সেই জগত নিয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়ে যায় যে আশপাশ তাদের আর মনে থাকে না। অথচ, পৃথিবী তো শিল্পীর সেই মনোজগৎ নয়। তার বাইরেও মানুষের চাওয়া পাওয়া থাকে। শুধুমাত্র ভালোবাসার জন্যও তো একটা জীবন বাঁচা যায়। শুধুমাত্র ভালোবাসা দিয়ে?
আত্রেয়ী শক্ত করে ধরে আমার হাত। অন্ধকারের মধ্যেও ওর মুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে-
কেন আমরা কেবল তাদেরই ভালোবাসি যাদের থেকে কিছুই পাই না কখনও। আর যারা আমাদের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করে তাদের কেন নিজেদের খেলার পুতুল করে তুলি? এই খেলা, এই সর্বনাশের খেলা কত মানুষের জীবন তছনছ করে দেয়।
৮
আত্রেয়ীর খোলা কাঁধের ওপর মাথা রাখলাম। মনে হচ্ছিল দীর্ঘদিন পর কোথাও একটা আশ্রয় পেয়েছি আমি। গোপন আশ্রয়। এখানে কেউ আমাকে খুঁজে পাওয়ার নেই। আত্রেয়ীর শব্দগুলো অদ্ভুতভাবে আমার শরীরের ভেতর ঢুকে আসছে, চোখ বুজে আমি স্পষ্ট দেখতে পারছি একটা বাড়ি। আমার ছবিটি, চিঠি, উপহারগুলো। বাড়িটিতে আলো জ্বলছে। মানুষের বসবাস চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। ফুলে ফুলে ভরে উঠছে বাগানটি। আট বছর আগে এখানেই একটি সংসার করার কথা ভেবেছিলাম আমি ও আমার তৎকালীন প্রেমিকা। তারপরও একাধিক সম্পর্ক হয়েছে আমার। কত জায়গায় আমি একটা আশ্রয় পেতে চেয়েছি। কোথাও হয়নি। উদ্বাস্তুর মতো একটির পর একটি ঘর ছেড়ে চলে গেছি। আজ বহুবছর পর আত্রেয়ীর কাঁধে মাথা রেখে মনে হল আমি ফিরে পেয়েছি সেই হারিয়ে যাওয়া ঘরটি। শুধু কথা নয়, নৈঃশব্দ্যও যে কত বড় এক ঘনিষ্ঠতা তা আজ বুঝতে পারি। দুটি মানুষ পাশাপাশি বসে থাকাও যে কত বড় এক সম্পর্ক। সেই সম্পর্কের কথা প্রায় কেউই বুঝতে পারে না। শুধু কথার পর কথা, বিবাদের পর বিবাদ। কেউ কাউকে নিজেদের আসল কথাগুলো বলে উঠতে পারি না। আত্রেয়ী এক বিখ্যাত পরিচালকের শখের খেলনা হয়ে নির্বাসিত এই ফ্ল্যাটে। আমি আজীবন শুধু ঘুরে ঘুরে চলেছি ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে। দুজনে আজ এতবছর পর কোনও এক আশ্চর্য মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছি একে অপরের কক্ষপথে। তারপর আবার হারিয়ে যাব।
ধীরে ধীরে ভোর হয়ে আসে। আকাশ তার অন্ধকারের পোশাক ছেড়ে পরে নেয় আলো। পাহারাদারের বাঁশি থেমে গেছে। রাতের অদ্ভুত অলৌকিক কুকুরেরা আর ঘুরে বেড়াচ্ছে না। রাতের পরীদের শরীরগুলো গলে গলে পড়ছে ফুলেদের ওপর, পাতাদের ওপর। আত্রেয়ীকে ঢেকে দিয়েছি তেমনই এক শাদা চাদরে। ওর মাথা আস্তে করে তোষকের ওপর রাখি। ওর নরম হাতটি যা সারারাত আমার হাতের ভেতরে ছিল ছাড়িয়ে নিই। পৃথিবীতে এক মুহূর্তের জন্য যদি কোনও ভালোবাসা থাকে তাহলে এই মুহূর্তে আমি আত্রেয়ীকে ভালোবেসেছি। কোনও আইডিয়া দিয়ে নয়, ওর রূপমুগ্ধ হয়ে নয়, ওর দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত কথার জন্য নয়। আমি আত্রেয়ীকে ভালোবেসেছি ওর মানুষ হিসেবে দুর্বলতার জন্য। এই দুর্বলতা ওকে অপূর্ব সুন্দর করে তুলেছে।
বারান্দায় গিয়ে দেখি অ্যাকোরিয়ামটিতে ফিরে এসেছে রঙিন মাছটি। বেড়ালটি উল্টে ঘুমিয়ে রয়েছে বারান্দার একদিকে। ডাইনিং রুমে আয়নাটি এই ভোরের আলোয় আশ্চর্য সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে ওর ভেতর থেকে মুক্তি পেয়েছে প্রেতের আর্তনাদ। আমি ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে আসি পথে। দেখি দু’য়েকজন লোক প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়েছে। তারা আমাকে চিনতে পারে না। বুঝতে পারে না আট বছর আগে ঠিক এখানেই আমি প্রেমিক ছিলাম। শাদা ঘোড়াদুটো স্থির দাঁড়িয়ে ঘাস খাচ্ছে পথের ধারে। আমার দিকে একবার মুখ তুলে তাকিয়ে আবার ঘাসে মন দিল। হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের পথে এসে দেখি বিকলাঙ্গ ছেলেটির ঘুম জড়ানো চোখেমুখে স্বাভাবিক হাসি। ভোর, বহু বছর পর এক অপূর্ব ভোর, ঠিক যেন আমার কৈশোরের মতো। এমন ভোরেই একদিন বাগানে ডেকে নিত ঠাকুরদা, ফুল চেনাতো। বাবা লম্বা পাইপে করে জল দিত গাছগুলোতে। যেন বহুবছর পর সমস্ত পৃথিবী আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে অনুভবের ক্ষমতাটুকু। ভোরের প্রথম ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে প্ল্যাটফর্মে। ধীরে ধীরে যাত্রীতে ভরে উঠছে।
৯
হাসছে আরেকজন। প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকে কত বছর পর আমার দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে রয়েছে ছোটমামা। ওর অ্যাকোরিয়ামের শখ ছিল।একদিন এই পৃথিবীর ভার সহ্য করতে না পেরে গলায় পাথর বেঁধে অ্যাকোরিয়ামের রঙিন মাছটি হতে চেয়েছিল ও।
দূর থেকে দেখি ওর হাতে দুলছে একটি স্বচ্ছ পলিথিন। তার ভেতর জল। আর সেই জলে ধরা আছে একটি সুন্দর রঙিন মাছ। তার গায়ে এসে পড়ছে ভোরের প্রথম আলো, বিচ্ছুরিত হচ্ছে। দেখি, প্ল্যাটফর্ম পার করে নেমে আসে ছোটমামা। ঢোকে টেলিফোন বুথটিতে।
তারপর নামিয়ে রাখে এত বছর ধরে পৃথিবীর অসুখের মতো বাজতে থাকা টেলিফোনের, রিসিভারটি।


3 মন্তব্যসমূহ
খুব ভাল লাগল। - অমিতরূপ চক্রবর্তী।
উত্তরমুছুনঅদ্ভুত আলো আঁধার খেলে গেল চোখের সামনে। খুব ভালোলেগেছে দীপ শেখর।
উত্তরমুছুনঅসামান্য
উত্তরমুছুন