গত দুদিন ধরে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ধারায় গ্রামটা হাঁটুজলের নিচে নড়েচড়ে নিশ্বাস ফেলছে। নাড়িকাটা আকাশ থেকে ঝরঝর করে নামছে সমুদ্র শোষিত জল। গত সন্ধ্যায়, সেই যে আকাশটা গলা বাড়িয়ে রুদ্ররূপে চরাচরের দিকে তাকিয়েছে, এই পর্যন্ত বিষণ্ন বিলাপের অবসর নেই। তখন কে জানত, রাতের মধ্যেই মাঠ-ঘাট, বিল আর নদী সব বাড়তি জলের তলায় এমনভাবে ডুবে যাবে! আলী মকদমের একমালাই নৌকার ছইয়ের ওপর পুরনো গোলপাতার ছাউনি। এক-দু’বার বৃষ্টি হলে ছাউনি দিয়ে জল গড়াতে গড়াতে সোজা নদীতে গিয়ে নামে। পাতাগুলির শরীরে সর্বনাশা দারিদ্র্য এমনভাবে মিশে আছে, দু’খান ভাঙা টিনের ফালা গোলপাতার ওপর চেপে না দিলে নৌকাটা কবে, কোন নদীর বাঁকে হারিয়ে যেত তার ইয়ত্তা নেই। একটা পলিথিনের পরম মিত্রতার কারণে আলী মকদম কাঁথা কয়টা থুবড়া করে নৌকার এককোণে রেখেও আরাম পায় না। তার মনে হয়, যেখান থেকে নদীর পেট চিরে খালটা গ্রামের ভিতরে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে, সেখানকার সামান্য দূরে মুন্সীবাড়ির কাছারিঘরে যেতে পারলে কোনোমতে বাঁচে। কিন্তু বাইরে যে-পরিমাণ আঁধার, দুটো মানকচুর ডগা কিংবা তরতাজা দেখে কলাপাতা কেটে কাঁথার গাঠুরি ঢেকে গেলেও বৃষ্টির জল থেকে রেহাই পাবে, এমনটা সম্পূর্ণই দুরাশা। মুন্সীর কাছারিঘর কমছেকম সোয়ামাইল দূরে। সংক্ষিপ্ত পথ ধরে হেঁটে গেলেও কাঁথা-কাপড়ের একটিও আর শুকনো থাকবে না। আলী মকদম তাকিয়ে দেখে, অবোধ শিশুর মতো উদবিলাইদুটো চড়াটের ওপর খুটখুট করে। জলের ওপর হঠাৎ বিজলির আলো যমদূতের নৃত্যের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লে উদবিলাইদুটো ভয়ে কুঁকড়ে গিয়ে একটার শরীরে আরেকটা আছাড় খায়। এমন অবোধ, অবোলা বাচ্চাদুটোকে খালি নৌকায় রেখে যাওয়া নির্ঘাৎ অমানুষের কাজ। কে বলতে পারে, বোবা প্রাণিদুটির সঙ্গে আর কখনো দেখা না-ও হতে পারে! আলী মকদম চড়াটে বিছানো পলিথিন তুলে কাঁথাগুলো যত্নকরে পেঁচিয়ে পিঠের ওপর ঝুলায়। তারপর উদবিলাইদুটোকে বগলদাবা করে ডাঙায় ওঠে। কী বিশ্রী গন্ধ ওদের শরীরে! ভ্যাপসা গরমের সময় কোনো বদ্ধ ঘর থেকে মৃত প্রাণির উটকো গন্ধ একটু ফুটোর প্রশ্রয় পেলে যেরকম তিরতির করে ছড়িয়ে যায়, তেমনই অসহনীয় মস্তিষ্কপীড়াদায়ক এক গন্ধ। সন্তানতুল্য ভোঁদড়দুটোর স্নেহের কাছে সমস্ত গন্ধ বিসর্জন দিয়ে আলী মকদম শুধু একটি পরিবারের কথাই ভাবে। তবে তার আফসোস, ওদের আরেকটু স্নেহের পরশে আগলে রাখার জন্য সঙ্গে কোনো মেয়েমানুষ নেই।
নদীপাড়ের উঁচুভেড়ি থেকে সংকীর্ণ একটা পথ নেমে গেছে গ্রামের দিকে। পথের দু’পাশে ঝোপঝাড়ের আত্মীয়তার বন্ধন। আলী মকদম হাঁটতে গিয়ে দিশা পায় না। মাঝেমধ্যে উত্তরের ঝাপা এমনভাবে মাটির দিকে আছড়ে পড়ে, তাতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কয়েকগুণ জল নিয়ে নগ্ননৃত্য করতে শুরু করে। আলী মকদম মনে মনে বলে- যাক, সব ভিজে যাক, তবু পোয়া মাইল কাদাজলে হেঁটে মাতামগাজী বাড়ির মসজিদের দিশা। নইলে ভিজতে ভিজতে সকালবেলা নির্ঘাত বেদম হয়ে পড়ে থাকতে হবে।
রাতও দু’টোর কম হবে বলে মনে হয় না। গাঁয়ের মানুষ দমকা হাওয়ার সাথে বৃষ্টির জলের মিশ্রিত পরশে আপোস করে যার যার ঘরে বেহুঁশের মতো ঘুমায়। আলী মকদম ভাবে, গাজীমেয়া মসজিদের বারান্দাটা তো একটুখোলা রাখতে পারত! এই ঝড়বাদলের রাতে বেওয়ারিশ কুকুর-বেড়ালও তো মসজিদের সাইসের কাছে একটু দাঁড়ানোর জন্য আশ্রয় খোঁজে।জগতে খোদার ঘর এমন এক আশ্রয়স্থল, সেখানে যে কোনো প্রাণির মহা দুষ্কালে আশ্রয় নেয়ার অধিকার আছে।স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির এই বন্ধন অদৃশ্য, অসীম।
মসজিদের বারান্দার টিনের দরজায় পুরনো জং ধরা ছোট্ট একটা তালা। আলী মকদমের ইচ্ছে করে পায়ের তলার পোড়া আধলাখান উঠিয়ে কয়রাটায় দু’খান বাড়ি মারে। কিন্তু খোদার ঘরের সঙ্গে এতবড় বেয়াদবি করার সাহস তার হয় না। সে কয়রাটায় ত্যারছা করে মোচড় দিয়ে আয়ত্তে নিয়ে ফেলে। বারান্দায় উঠে চটের বস্তাটা খুলে কাঁথাদুটো স্যাঁতসেঁতে খাটালে মেলে দেয়। একটা কাঁথা জলের স্পর্শ থেকে লজ্জাবতীর মতো এখনো নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আলী মকদম ভেজা কাঁথাটা মেঝেতে ছড়িয়ে সেটার ওপর উদবিলাইদুটো বসিয়ে রাখে। অভ্যাসবশত ওদের খ্যাঁক খ্যাঁক করার যে দুঃসহনীয় জ্বালা, একজন মা ছাড়া এমনটা আর কে প্রশ্রয় দেবে! চলমান বিদ্ঘুটে রাতের এমন এক পীড়ন, বিলাইদুটোর কানের কাছে মুখ নিয়ে আলী মকদমের বলতে ইচ্ছে করে- বাছাধন, ঝড়-তুফানের মধ্যে গাজী মেয়ার মছছিদে আইয়া এট্টু জানে বাঁচতে পারছ, এহন বাপু দোমন অ।
রাত্রিচর বোবা পশু, মৃত্যুকে আহ্বান জানানো কোবপক্ষির ভেজা শরীরের গা-ছমছমে ভয়ের কারণে কি না কে জানে, বেড়ালদুটোর অস্থির ছোটাছুটির অবস্থা বিরক্তির চরম পর্যায়ে চলে যায়। আলী মকদমের ইচ্ছে করে ও-দুটোর পাছায় জোরে জোরে গোটাদুয়েক কুরুত দেয়। কিন্তু নিষ্ঠুর আঁধারে কার্বনের কালির মতো চোখের সামনে মোটা পরত। আলী মকদম লাঠি খুঁজে পাবে কোথায়? সে গলাটা বাড়িয়ে কণ্ঠে বিরক্তির শ্লেষ মিশিয়ে বলে, থাহো পানিতে, ঝড়-বইন্যা ডরাও না। তোমাগো কী, যত্ত জ্বালা ব্যাবাক মোর!
তবে বোবা প্রাণিদুটো বুঝি একটু অযত্নই অনুমান করল।ওরা অভিমান করে টিনের বেড়ার কাছাকাছি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটি বেড়াল কিছুটা দূরে সরে গিয়ে আরামে বসার চেষ্টা করে কিন্তু গলার দড়িতে টান পড়লে আবার বেড়ার কাছে ফিরে যায়। আলী মকদম যদি ওদের গলার রশিটা খুলে দিত তাহলে বারান্দার চারপাশে ওরা পাক দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারত। কিন্তু ঝুঁকি নিয়ে এতটা সহৃদয় হওয়ার মতো দিলের রহম মকদমের ভেতর এই মুহূর্তে নেই।
মসজিদের ভাঙাচোরা বারান্দার কুড়ি পা উত্তরে কচুরিপানার পুরনো পুকুর। বহুবছরধরে পাড় সংস্কার না হওয়ায় বৃষ্টির দাপট বাড়লে পুকুরটা ঘুমভাঙা পশুর মতো হাই তুলতে শুরু করে। আলী মকদম দেখে, ব্যাড়ালতার ঝোপঝাড় এবং দুটো কলাগাছের মাঝখানের অপরিসর পথ দিয়ে পাগলা ঘোড়ার মতো জল ছুটে আসছে। মসজিদের পায়ের কাছে চোরা ফাটল থেকে সৃষ্ট মাটির গর্তে কলকল করে ঢুকছে সেই ধারা। পূর্ণিমারাতে যৌবনের নব উন্মাদনায় মাতাল নাগিনীর মতো খলবল করছে জলের সাথে ভেসে আসা কয়েকটা উজাল মাছ। আলী মকদম প্রাণান্ত যুদ্ধ করে, দুটো মাছের পরাজয় ঘটিয়ে বেড়ালদুটোর সামনে দেয়।আঁধারের ভেতর মাছের লম্ফঝম্ফ দেখে বেড়ালদুটো খ্যাঁকখ্যাঁক করে। হঠাৎ এক ঝলক বাতাসের উদ্দেশ্যহীন গতির দাপটে বারান্দার দক্ষিণদিকের ডামিশ লোহা পেটানো বেড়ার টিন চিত হয়ে পড়ে। হু হু করে পিচকারির মতো জল তেড়ে আসে বারান্দার খাটালে। আলী মকদম বেড়ার আচ্ছাদনহীন উলঙ্গ দিকটিতে তাকিয়ে ভাবে, পরিবারিক গোরস্থানের কোন্আত্মা জলের থেকে আরাম পেতে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে আল্লা মালুম। সে বিদ্যুতের ঝিলিক দেয়া আলোর অনুগ্রহে ডানদিকে তাকিয়ে দেখে, সদ্যমৃত লোকটির তাজা কবরের মাটিগুলো জলে ধুয়ে নেমে যাচ্ছে বেড়ের দিকে। দমকা হাওয়ার এমন এক ঘোর, গাছের ডালের ছায়ার নিচে চোখ থির করে তাকালে মনে হয়, লাশটা কবর থেকে উপরে উঠে এই বুঝি বেড়ার কাছে এসে দাঁড়াবে। মসজিদের ভেতর থেকে আলী মকদমের কানে আসে ঘুমন্ত মানুষের নাক ডাকার ভয়াল শব্দ।
মসজিদের বারান্দায় জংধরা টিনের কয়েকটা ফুটো দিয়ে চিকন জলের ধারা ট্যাপর-ট্যাপর মাটিতে পড়ছে। যা একটা শুকনো কাঁথা ছিল, সেটাও ভিজে চুপচুপা। আলী মকদম ভাবে, কলকল করে নামা জলের মোটা ধারাটার নিচে একটা খাপড়া পাততে পারলে সামান্য আছান পাওয়া যেত। দূরে, বিলের দিকে লম্বালম্বি একটা বিজলির রেখা হঠাৎ ঝলকে উঠে পোয়া মাইল দূরের জলের ছবি দিনের আলোর মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। বারান্দার পায়ের কাছে চোখে পড়ল একটা মাটির মালসা। আলী মকদম মালসাটা হাতে নিয়ে দেখে তুষ আর কাদায় মাখামাখি। কয়েকদিন আগে নতুন কবরে মূর্দা রাখার পর লাশের আত্মীয়পরিজন কয়েকবাড়ি খুঁজেও একটা মাটির বাসন পায়নি। শেষে হেরবন আলীর দুধ দোহনের মালসাটাই চেপে দিয়েছিল কবরের ওপর। বিরামহীন বৃষ্টির দাপটে সেই মালসার নিচের মাটি সরে গিয়ে হু হু বাতাসে একটু একটু নড়ে মসজিদের পায়ের কাছে ঠেকেছে। আলী মকদম মালসাটা তুলে টিনের ফুটো দিয়ে পড়া জলের মোটা ধারার নিচে পাতল।
পুরুষ মানুষের শরীর এমন এক অদ্ভুত রূপক, সময়ের প্রয়োজনে সে যে-কোনো রূপে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে। নিষ্ঠুর দুরাশায় বসেও উস্তর মেয়েলোকের কোমল কল্পনায় যে-কোনো পুরুষের শরীর উত্তেজিত হতে পারে। এবং ঝড়-বাদলের হিরহিরে ঠাণ্ডায় পরিচিত মেয়েলোক পুরুষের মনে এমনভাবে আস্তানা গাড়ে, সুনির্দিষ্ট বিপদ অনুভব না করলে সামান্য কিছুতে শীতল হওয়ার জো নেই। আলী মকদমের হঠাৎ মনে পড়ল ইনুচ ঢুলীর মেয়ে সোমেলার কথা।সে ঠোঁটের কোণে বিড়িটা ধরিয়ে নিজেকে একটু চাঙা করার কথা ভাবে। নিরক্ষর, ধর্মজ্ঞানহীন আলী মকদমের হঠাৎ মনে হয় খোদার ঘরের ত্রিসীমানায় এই মোবাহ কাজটা সারা কি উচিত? তার আরও মনে পড়ে, একদিন সোমেলাকে নিয়ে যখন স্রোতের অনুকূলে নৌকা ছেড়ে দিয়েছিল, মেয়েটা চরম বিরক্ত হয়েছিল বিড়ির ধোঁয়ার গন্ধে। বলেছিল, এইসাপ আহোচা ব্যাডাগো ঘামে গোনেও বিড়ির গোন্ধ আয়। কোন মাগী তোমার গলা ধইর্যা ঘুমাইবে কও তো!
সোমেলার পুরুষ-ভোলানো হাসিটা সুন্দর! আলী মকদমের মনে হয়, সোমেলা যদি তার সঙ্গে জলের জীবন বেছে নেয় তবে হাজারবার সে বিড়ি খাওয়া ছেড়ে দিতে পারে। ভালো সে না-বাসুক, নৌকার ছইয়ের নিচে এরকম ঝুম বৃষ্টির রাতে পাশাপাশি শুয়ে থাকলে জীবনের সেরা সুখের স্বাদ সে পেতে পারত। দিনের পর দিন একা রেঁধে খেতে আর ভালো লাগে না তার। সোমেলা গাঙের নরম মাটি দিয়ে একটি চুলা তৈয়ার করে নৌকার চড়াটে বসে রাঁধবে। চুলার ছাই-কালিমাখা মুখে ঘেমে নেয়ে নিজেকে একাকার করে ক্লান্ত হলে আলী মকদম কাছে বসে দৃশ্যটা চেয়ে চেয়ে দেখবে। এর চেয়ে সুখের দৃশ্য আর কী হতে পারে!
এসবের কিছুই না হোক, সোমেলা মাতৃস্নেহে উদবিলাইদুটোকে লালনপালন করবে। গাঙের দিকে বাতাসমুখী বসে গুনগুন করে গান গাইবে। আলী মকদম রাতের শান্ত স্রোতের অনুকূলে নৌকাটা ছেড়ে দিয়ে সোমেলার ভাঁজপড়া উর্বর পেটের গতরে হাত রেখে রমণের সুখে হারিয়ে যাবে। কিন্তু এমন সুখের স্বপ্ন শুধু কল্পনাই ধরা দেয়, বাস্তবে বহুদূর।
নারীর ছলনা বোঝার জ্ঞান আলী মকদমের কোনোদিন ছিল না, ভবিষ্যতেও সেই জ্ঞান রপ্ত করতে পারবে এমনটাও আশা করা যায় না। সে সবসময় মনের ভেতর এমন এক সরল বিশ্বাস পোষে, সদ্য গোঁফের রেখাফোটা ছেলেটিও তাকে যে-কোনো কথার মাধুর্যে ভোলাতে পারে। সোমেলা তার সরল মনের প্রকোষ্টে কষ্টের মোটাদাগ দিয়ে তার ডাকাত বাপের ঘরে কাদার মতো ঘুমায়। অথচ আলী মকদম ক্ষুধায় কাতর হয়ে, লাল পিঁপড়ার কামড় খেয়ে দুঃসহনীয় জ্বালা ভোগ করছে মসজিদের বারান্দায়। মেঘের আড়ালে থাকা সূর্যের মতো আলী মকদমের মনের ক্ষুধাও উঁকি মারে সেটা সত্য, কিন্তু খোদার ঘরের চৌহদ্দিতে অমন পাপ-কল্পনা মনে আনাও অধর্ম।
তুলাতলী নদীতে আলী মকদমের একমাত্র সহোদর ইনুচ ঢুলী। একসময় পালাগানের আসরে ঢোল বাজিয়ে আয়-রোজগার করত। ওয়াজ মাহফিলের দাপটে গ্রাম-গঞ্জ থেকে যখন পালাগান উঠে যায়, ইনুচ ঢুলী বাপ-দাদার জেলেপেশায় ফেরে। লোকটির অন্তর খোদাই করা পাথরের মতো নিষ্ঠুর, চোখদুটো ডিমের মতো গোল আর ডাকাতের মতো রক্তবর্ণ। পরশ্রীকাতরতার এমন এক সংক্রমণ, লোকটা ভোঁদড়দুটোকে দেখে আর চোখ টাটায়।
পৃথিবীতে ঈর্ষা এমন এক ভয়ানক বস্তু, সারাক্ষণ তুষের আগুনের মতো অন্তরে ধিক ধিক করে মানুষের ভেতরকার সুন্দর মানুষটিকেও জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে কুৎসিত করে দেয়। কে বলতে পারে, ইনুচ ঢুলীও পরশ্রীকাতরতার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়েছে হয়তো!
আলী মকদম চৌদ্দঘড়ির সময় ভোঁদরদুটোকে জলের ভেতর ছেড়ে দেয়। ওরা জলের তলায় মাছগুলো তাড়িয়ে জালের ভেতর নিয়ে আসে। দুপুরে আলী মকদমের নৌকার চড়াটে বাছা বাছা মাছগুলো দেখে ইনুচ ঢুলী ভোঁদড়দুটোকে মনে মনে অভিশাপ দেয়।
একদিন বিকেলে ইনুচ ঢুলীর মেয়ে সোমেলা আলী মকদমের নৌকার কাছে নিশ্চুপ দাঁড়ায়। ছোটখাটো গড়নের মেয়ে, চেহারা অতটা সুশ্রীও নয়। জায়গায় জায়গায় ছুলি ওঠা মুখে ভাসা ভাসা চোখদুটো পুরুষদের প্রেমের আহ্বান জানায়।
অপরিচিত মুখ দেখে ভোঁদড়দুটো খাঁচার ভেতর ছটফট করে। সোমেলার মনেও কোথা থেকে অবিশ্বাস্য, অপ্রকাশিত মায়া এসে বরফের মতো জমাট বেঁধে যায়। শিশুদের মতো ভোঁদড়দ্বয়ের কোমল দুটি মুখ দেখে তার নারীহৃদয় ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
তখন বিকেলটা মরে গিয়ে সন্ধ্যার সীমান্তে-এসে ঠেকেছে। নদীর ওপার গাছগাছালির মাথার ওপর তেজহীন সূর্যটার লাল আভায় পৃথিবীর পুব সীমানা সুষমামণ্ডিত। পশ্চিমের সেই আভা সোমেলার মুখের ওপর পবিত্রতার ছায়া ফেলে এমন এক আশ্চর্য সৌন্দর্যে উদ্ভাসিত করেছে, একজন নারী ছাড়া অমন রূপের জাদু আর কে দেখাতে পারে! আলী মকদম ভাবে, অদৃষ্টকে অভিশাপ দিয়ে আর কী হবে, বউ মরা ভাগ্য তার। জীবন থেকে যে হারিয়ে যাবার সে তো যাবেই। মানুষের চলার পথের এত বাঁক, এত যন্ত্রণা কেমন করে সে অস্বীকার করবে! বিশ্বাসের সেরা সত্য হল এই, মাথার উপর অদৃশ্য একজন আছেন, তিনি নিয়মিত প্রত্যক্ষ করেন অধীনস্তের নত মুখের কোলাহল। না হলে জগতে আলী মকদমেরও কেউ একজন রেঁধে খাওয়ানোর মতো থাকত। সোমেলা একবার যদি ছইয়ের নিচে বসবাসের জন্য রাজি হত, তার জীবনটাই পাল্টে যেত। জীবনের চার-চারটি বছর জলের বুকে দুর্গন্ধময় বিছানায় ঘুমিয়ে নারীসঙ্গহীন নিরুৎসব জীবন কেটে গেছে তার। বিড়ি খাওয়া মুখের গন্ধটা আশকারা দিতে কোনো মেয়েমানুষই উদ্বত্তৃ নেই। সোমেলা একবার মাথা নাড়লে আলী মকদম ইনুচ ঢুলীর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়তে পারে।
আলী মকদম ছইয়ের ভেতর থেকে গলাটা বের করে বলে-কী দ্যাহো সোমেলা?
ঠোঁটদুটো পরস্পর দৃঢ় আলিঙ্গন করে সোমেলা উত্তর দেয়, উদবিলাইদুডা বেমালা সুন্দর আলীভাই। কোম্মেগোনে আনছ এ দুডা?
আলী মকদম উদের বাচ্চাদুটো এনেছিল নড়াইল জেলার চিত্রা নদীর জেলে রাধেশ্যামের থেকে। কিন্তু তার সেসব ইতিহাসের বাহুল্য চর্চা করার ইচ্ছে একেবারে নেই। আলী মকদম একটা বিড়ি অর্ধেক ফুঁকে ফিক মেরে দূরে ফেলে দেয়।
চর সমজদি বালীগ্রাম তো দূরে থাক, এই অঞ্চলে কোথাও মাছ শিকারের এই পুরনো পদ্ধতিটির প্রচলন নেই। বিলাইদুটোর জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকালে যে কারো অবোধ শিশুর মতো মায়া হয়। গায়ের লোমগুলো এত ঘন, পশম ভেদ করে চামড়ায় কখনোই জল স্পর্শ করে না। লেজের মাথাটা মেকাপ দেওয়া তুলির মতো নরম। জগতের সবটুকু মায়া বেড়ালদুটোর মুখের ওপর খেলা করে। নারীহৃদয়ে জমে থাকা এমন এক মায়া, তারা শৈশবে, অগঠিত মনেও কাপড় দিয়ে পুতুল তৈয়ার করে। হোক সে অবুঝ, তবুও তার শিশুমনে খেলা করে সন্তান পালনের পবিত্র ইচ্ছা। আলী মকদম চেয়ে দেখে সোমেলার মুখে ফুটে উঠেছে মাতহৃদয়ের অদৃশ্য ছায়া। তার একগোছা চুল গালের একপাশ আড়াল করে বুকের ওপর এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, আলী মকদম যে অমূল্য বস্তুদ্বয় দেখার জন্য আঁকুপাকু করছে সেসব দৃষ্টির আড়াল।
সোমেলা মুচকি হাসির ভঙ্গিতে বলে, আলীভাই, উদবিলাইদুডা মাছ ধরে ক্যাম্মে?
আলী মকদম বুঝিয়ে বলার মতো উত্তর খুঁজে পায় না।
উদবিলাইদুটো খাঁচার ভেতর খ্যাঁখ খ্যাঁক করে। দুহাতে চেপে ধরে ফালাকরা মাছগুলো চিবিয়ে খায়। সোমেলা মাছের টুকরোগুলো ওদের সামনে বিনয়ের সাথে ছুড়ে মারে। নারীহাতের এমনই এক মাতৃস্নেহের পরশ, পৃথিবীর যে-কোনো মানুষ সহজেই সেখানে বাঁধা পড়ে যায়। আলী মকদম সংসারহারা এক মাতহৃদয়ের হাহাকার শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে।
তারপর থেকে সোমেলা প্রতিদিনই উদবিলাইয়ের সাথে আলাপ করতে আসে। সে শুনেছে, শিক্ষিতজনেরা প্রাণীটিকে ভোঁদড় বলে থাকে। প্রতিদিন নৌকার কাছে এসে সোমেলা একটু চড়া গলায় ভোঁদড়দুটোর সাথে ইতরামি করে-ওই ভোঁদড়, ফির্যা চা।
উদবিলাইদুটোও এমন, সোমেলার কণ্ঠ শুনলে কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। সোমেলা খাঁচার ঝাপ খুলে বেড়ালদুটো বের করে চরাটের ডোঙার ওপর ছেড়ে দেয়। কোনো পাত্রে যদি দু’একটা মরা মাছ অবশিষ্ট থাকে, বাংলা দা দিয়ে সেটা ফালা ফালা করে কেটে ডোঙায় ছড়িয়ে দেয়। আদুরে বাচ্চার মতো উদবিলাইয়ের মাছ খাওয়ার দৃশ্য সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। তখন সোমেলার মুখের ওপর এমন এক অভূতপূর্বরেখা জেগে ওঠে, যা সদ্যভূমিষ্ট শিশুকে আদর করতে থাকা এক মায়ের মমতার দৃশ্য। সন্ধ্যাটা জমে উঠলে আলী মকদম বিলাইদুটোকে খাঁচায় পুরে হাওয়ামুখী নাও ছেড়ে দেয়। সে ডান হাতের আঙুলের ফাঁকে বিড়ির গোড়াটা চেপে ধরে বৈঠায় টান মেরে নদীর বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যায়। সোমেলা আঁচলে বাঁধা চাবির ছড়াটা ঝুনঝুন করতে করতে বাড়ির পথে ফেরে।
একদিন নদীর জল ফুলেফেঁপে চর ছাপিয়ে রাস্তার কাছাকাছি চলে আসে। গড়িয়ে চলা বাতাসে পরিবেশটা কেমন আউলা করে দেয়। আলী মকদমের নৌকার ছইয়ের তলায় ব্যাটারির লাইটের আলো জোনাকপোকার মতো ঝিকমিক করে। সে তাকিয়ে দেখে চড়াটের কাছে ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছে সোমেলা। তখন নৈর্ঋত কোণে জমাট বাঁধা কালো মেঘ নদীর ওপর বেদনা-বিধূর ছায়া ফেলে। আলী মকদম লুঙ্গিটা গুটিয়ে জরাজীর্ণ চড়াটে সোমেলার কাছাকাছি বসে। কোন্ অভাবনীয় খেয়ালের বসে কে জানে, সোমেলার শাড়ির আঁচলটা বুকের একপাশ থেকে খসে পড়ে যায়।বুকের সেই অনাবৃত অংশটুকু আলী মকদমের চোখে বিদ্যুতের আলোর মতো ঝলক দিয়ে ওঠে। ভোঁদড়ের খাঁচার ভেতর ছড়ছড় শব্দে শোনা যায় বোবা প্রাণের অনুভূতির স্পন্দন। আলী মকদম সোমেলার টান টান হয়ে এঁটে থাকা বাউজের ভাঁজে মুখ গোঁজার অতৃপ্ত কল্পনায় হারিয়ে যায়। ভোজবাতির অসংখ্য স্ফুলিঙ্গের মতো ক্রমাগত আওয়াজে নিজের চাপা আবেগকে মুক্তি দেয় সোমেলা। তার মনে পড়ে, তার বিয়ের আগের যৌবনটা হারিয়ে গেছে সত্য তবু এখনো সে চাইলে যে-কোনো পুরুষকে ভোলাতে পারে। সোমেলার নদীর জল আর বাতাস দুটোই ভালো লাগে। সে স্বামীর সাথে নদীর ধারে বাতাসমুখী হয়ে বসে ফুরিয়ে দিত মুখরিত গল্পের রাত। সোমেলার স্বামী ছিল চুপচাপ, ভাবুক আর স্বল্পভাষী। গায়-গতরে প্রচুর শক্তি ছিল তার আর নপুংসকও ছিল না সে। তবু সোমেলা ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিল, লোকটার নারীসঙ্গের প্রতি আগ্রহটা ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। সোমেলা রাতের-পর-রাত মধুর মিলনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিছানা সাজাত আর লোকটা ভাবুকের মতো একপাশে ফিরে অদৃশ্যের তপস্যায় কাটিয়ে দিত সারারাত। অথচ এমনও নয় যে লোকটা অন্য নারীর সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসে। তার অনীহা আর অনাগ্রহ সোমেলাকে ব্যথিত নয় বরং চিন্তিত করত। বহুবার বিছানায় উসকেছেও লোকটাকে, কিন্তু সে ছিল নির্জীব এক প্রাণ। গাঁয়ের লোক তাকে অলস বলে খ্যাপাতে থাকত। হয়তো সে-কারণই নাকি কে জানে, একদিন চিরতরে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল মানুষটা।
বৈঠাহীন নৌকাটা ভাসতে ভাসতে বহুদূর এসে পড়ে। একপাড়ে বালুর জাহাজের সারি। একেকটা জাহাজের ভেতর থেকে জলের ওপর পড়েছে তরবারির ফলার মতো তীক্ষ্ম আলো। ভেতর থেকে দু-একজন স্টাফের অস্থির গুঞ্জন শোনা যায়। ডাঙায় বালুরখলা থেকে ভেসে আসে তাস পেটানোর শব্দ। আবশ্যম্ভবী জয়ের উল্লাসে গমগমে কণ্ঠধ্বনির ভেতর থেকে শোনা যায়- তুরুপ! নৌকাটা জলের ওপর চরকার মতো ঘুরে ঘুরে পাক খেতে থাকে। উদবিলাইদুটো খাঁচার ভেতর থেকে জানান দেয়, ওরা আছে। ছোট ছোট ঢেউ কেটে নৌকাটা চলার সময় গলুইয়ের ভেতর থেকে ছলকে ওঠে ময়লা জল। বাতাসে সুখ আর প্রেম পরস্পর জড়াড়ড়ি করে মিশে যায়।
আরেকটু দূরে যাওয়ার পর স্রোতটা দম দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, আস্তে আস্তে কমে আসে বাতাসের আলোড়ন। জলের কুণ্ডুলির পাল্লায় পড়ে নৌকাটা রহস্যময় বুড়ির ঘাটে লাগে। সেখানটায় ঝোপের আড়ালে নোংরা, জনশূন্য একটি ছাপড়ার ঘরে এক বুড়ি মহিলা থাকত একা। লোকমুখে শোনা যায় মহিলার নামে বিচিত্র সব কথাবার্তা। একবার কার্তিক মাসে হিন্দুপাড়ার তিন-চারজনের ছোট একটি দল বুড়ির বাড়িতে কচ্ছপ খুঁজতে এসেছিল। লোকগুলো সুপারির শলা দিয়ে মাটিতে খোঁচা দিয়ে কচ্ছপের পিঠের শক্ত চাড়াটার সন্ধান করত। তারা বুড়ির ঘরের পেছনে খোঁচাতে খোঁচাতে পেয়ে গেল মানুষের মাথার খুলি। সেই খুলিটার ওপরের দিকের হাড়টা এমনভাবে ছেঁটে ফেলা, তাতে যে-কারো মনে হতে পারে মৃত লোকটার মগজ বের করে কেউ ভেজে খেয়েছে। তারপর অনেকদিন পর লোকমুখে চাউর হয়ে যায়, বর্ষার রাত প্রকতিকে যখন মৃত্যুপুরীর মতো আচ্ছন্ন করত, সেই নিষ্ঠুর আঁধারে একদল ডাকাত দূরগ্রামে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার সামনে মেয়ের সম্ভ্রম লুটে আনন্দ করত। কারো রুপোর চেইন কিংবা কোমরের বিছা পেলে মুহূর্তেই সেসব শরীর থেকে বিছিন্ন করত। প্রকতির কঠিন আক্রোশে না-কি কে জানে, মাঝেমধ্যে ঘরের ভেতর দু-একজন ডাকাত আটকা পড়ত। চারিদিকে হই হই শব্দে যখন গ্রামবাসীর ডাকাত ধরার নেশা চড়ত, সর্দার ঘরের ভেতর থেকে আটকেপড়া ডাকাতের গলাটা যে-কোনো ফাঁক দিয়ে বাইরে বের করতে বলত। সর্দার বাড়িয়ে দেয়া ঘাড়ের ওপর রামদার এক কোপে মুণ্ডুটা চ্ছিন্ন করে বুড়ির বাড়িতে নিয়ে আসত। তারপর দীর্ঘদিনের সহচরের মাথাটা সাদা কাপড়ে জড়িয়ে বুড়ির ডেরার পেছনে পুঁতে রাখত।
শেষে লোকমুখে চাউর হতে থাকল, ডাকাতরা বুড়িকে দিয়ে মানুষের মগজ তেলে ভাজিয়ে খেয়েছে। সেই ঘটনা সত্য না-কি মিথ্যা-এমন অবান্তর প্রশ্ন কেউ কাউকে কোনোদিন করেনি।
বুড়ি একদিন ঘরের খাটালে মরে পড়ে রইল।কয়েকদিন পর অপরিচিত, বীভৎস দুর্গন্ধ বের হলে মানুষ পুলিশকে খবর দেয়। তারপর থেকে বাড়িটা বিরাণ। সেই বাড়ির ঘাটে জলের দিকে নুয়ে পড়া করমচা গাছের ডালের সাথে আলী মকদমের নৌকাটা আটকে যায়। আলী মকদম সোমেলাকে নিয়ে বুড়ির পরিত্যাক্ত বাড়ির জঞ্জালের কাছে দাঁড়ায়।
তিন-চার তিঁথি পর আকাশে পাতলা চাঁদ উঠে পৃথিবীর ছায়াটা শীতল করেছে। আলী মকদম আবছায়ায় দেখতে পায়, চোখের সামনে সোমেলার যৌবন কেমন টলমল করছে। সোমেলার পেকে যাওয়া শরীরের কোথায় মেদ, কোন্ জায়গাটা বিকেলের আলোর মতো নরম, কোথায় শাড়ির ফাঁক দিয়ে নাভীমূলের টান টান রেখাগুলো চিকচিক করে- সেসব দেখে তার মনে আর কুলোয় না। আলী মকদমের মনে নিস্তব্ধ আঁধার ঠেলে প্রবৃত্তির কু আসে। দরদর করে গরম ঘাম নামে তার গাঢ় রঙের মুখ বেয়ে। কিন্তু সোমেলাকে চেপে ধরা বা হাত বাড়িয়ে কিছু একটা প্রস্তাব করার সাহস তার নেই। সে মনে মনে ভাবে, নিস্তব্ধ আঁধার ঠেলে বের হওয়া আলোর মতো পুরুষের মনেও কামনা জমাট বাঁধে। এটা মানুষের এমন এক বৈশিষ্ট্য, কেউ সেটা দমন করার ক্ষমতা রাখে না। সোমেলার কাছে হোক সে অপরাধী, তবু একজন নারীকে এমন নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশে কাছে পেয়ে অধিকার না-করা কাপুরুষের কাজ। অভিসন্ধিটা আন্দাজ করতে পেরে সোমেলা আলী মকদমকে বলে,ওইসব পাপের কাম হরার ইট্টুও ইচ্ছা নাই মোর।
কথাটা শোনার পর আলী মকদমের মনে হয়, যেন বাতাসের স্নিগ্ধ ভাবটা মুহূর্তেই থেমে গেছে। ঝুলে পড়া আকাশের তারাগুলো নিভুনিভু হয়ে সরে গেছে সহস্রমাইল দূরে। সোমেলা আন্দাজ করল পরিণতিটা। একজন শক্তিশালী ব্যাটাছেলে যে-কোনো মুহূর্তে হামলে পড়বে তার বুকের ওপর।
মেয়েলোকের এমন এক উপস্থিতবুদ্ধি, সোমেলা চট করে বলল- বিয়া হরবা মোরে?
-হরমুতো, দে না এহন এট্টু।
-না ভাই, তোমার বউমরা ভাগ্য। দুননাইডা আরো ইট্টু দ্যাকতে চাই।
-কও কী! তোর ভাবুক ভাতার আর ফেরবে না। এহন মুই তোর ভরসা। দরকার অইলে তোর বাপের ধারে যামু।
-যাইও না। হোনলে তোমারে চুড়া দেবে। এহন এইহানে বইয়া বইয়া দোমন অও।
ইঙ্গিতটা আলী মকদম বোঝে। তবুপ্রবল উত্তেজনা প্রশমিত করতে সোমেলাকে ফুঁসলায়- ল, কাইলই বিয়া হরমু তোরে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরাজয় হয় আলী মকদমের। নিস্তব্ধ রাতে সোমেলাকে ধস্তাধস্তি করে আয়ত্তে আনার সাহস সে করে না। যদি জলে পড়ে গিয়ে কেলেংকারি হয়! মেজাজটা বড় তিরিক্ষি তার। তীক্ষ্ম, জ্বালাজ্বালা ক্রোধের মতো ঈর্ষা। আলী মকদম ভাবে, হোক না পরাজয়। এই পরাজয়ের ভেতরও আছে আশা করার আনন্দ। যদি পথে যেতে যেতে একবার রাজি হয় সোমেলা! ঢেউয়ের তালে তালে নৌকাটা আরেকটু দুলবে। দীর্ঘদিনের জৈবিক ক্ষুধাটা মিটিয়ে সুখে কাহিল হয়ে পড়বে সে।
কিন্তু ফেরার পথটুকু কথায় কথায় আর গল্পের ভেতর পার হয়ে যায়। সোমেলাকে ঘাটে তুলে দিয়ে নৌকাটা নিয়ে আঁধারে অদৃশ্য হয়ে যায় আলী মকদম। উদবিলাইদুটো খাঁচার ভেতর ছটফট করে।
তারপর নিত্যদিন উদবিলাইয়ের সাথে আলাপ করতে আসে সোমেলা। নিজহাতে জ্যান্তমাছ ফালা ফালা করে কাটে। উদবিলাইয়ের সাথে কথা বলে আর রুটির মতো মাছের ফালাগুলো ডোঙার ভেতর ছুড়ে দেয়। আলী মকদম জালের টুটাফাটা সুতা দিয়ে বুনতে বুনতে এসব দেখে খুশি হয়। তবে সময় সময় আলী মকদমের ভেতরের মানুষটা কামনার নেশায় জ্বলে ওঠে। আলী মকদম তখন ঠোঁটদুটো গোল করে বলে-অ সোমেলা?
পান খাওয়া রক্তিম মুখে সোমেলা ভেংচি কেটে উত্তর দেয়- ফাও ফাও মদু খাওয়া অত সোজা না চান্দু।
সোমেলার সেই রহস্যভরা ভেংচি কাটার দৃশ্যটা এখনো চোখে লেগে আছে আলী মকদমের।
শেষরাতে বৃষ্টির দেমাগ কমে এলে প্রকৃতি ধুয়েমুছে শ্বেতবর্ণ হয়ে যায়। আকাশটা নিজেকে ছাড়াতে মেঘরাজ্যের দেবতার সাথে লড়াই করে পরাজিত হয়। আলী মকদম ভাবে, আজানের আর বেশি দেরি নেই। মসজিদের খাটালের উপর পুরনো চটের একাংশ বহুদিন ধরে হয়তো কারো পথ চেয়ে অপেক্ষা করেছিল। আলী মকদম খোদার ঘরের অপ্রয়োজনীয় চটের সদ্ব্যবহার করার আগে সেটার গায়ে বারদুয়েক চুমা খায়। কাঁথাদুটো দলা পাকিয়ে চটের ভেতর ভরে চরম অসন্তোষ নিয়ে জলকাদার অমসৃণ পথে সে পা বাড়ায়। শরীরটা তার একেবারে অবশ হয়ে পড়েছে। কাঁধের জীবদু’টো মনে হয় দুখণ্ড পাথর। কাঁথার বস্তাটা কোনোরকম কায়দা করে বহুবছরের সাক্ষী সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলে সে। পথে জলসিক্ত গাছের পাতা বাতাসের দোলায় তাকে ভিজিয়ে দিল। শরীরের যেটুকুউত্তাপ ছিল নিমিষেই আগুনে জল ঢালার মতো শীতল হয়ে যায়। হঠাৎ রশি আলগা হয়ে একটা উদবিলাই কাঁধ থেকে ধপাস করে মাটিতে পড়ে। আলী মকদমের মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে ওঠে তখন। কাদার ভেতর লুটোপুটি খাওয়া উদবেড়ালের দড়িটা ধরে সে এমনভাবে দূরে ছুড়ে মারে, যেন সংসারের অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল ভাগাড়ে ফেলেছে। জীবনের এত ক্লেদ, এত ঝঞ্ঝাট আর ভালো লাগে না তার। সোমেলা একবার নিজের হলে একটা দো’চালের ঘর তুলে অন্তত সংসার পাততে পারত। নারীমন এতটা নিষ্ঠুরও হয়!
যে সন্তানকে পিতস্নেহে লালনপালন করে এতদিন নিজের কাছে রেখেছে, মনের আক্রোশে তাকে দূরে ছুড়ে ফেলে ভীষণ অমানুষের কাজ করেছে আলী মকদম। জলে আর কাদায় লেপ্টে যাওয়া উদবিলাইটা অবর্ণনীয়ভাবে চেয়ে থাকে আলী মকদমের দিকে। দৃশ্যটা অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে হৃদয়বিদারক। উপর থেকে নিঃশব্দ নিরাকারে যিনি এই দৃশ্যটা দেখছেন, মানুষ আর যে কোনো ইতরপ্রাণি তার-ই ইচ্ছার সৃষ্টি। আর সেই সৃষ্টির সাথে সৃষ্টির এমন এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন, কাদার ভেতর লুটোপুটি খাওয়া উদবিলাইটার মুখের দিকে তাকিয়ে আলী মকদম ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে।যেন পিতৃস্নেহের করুণ পরাজয়। সে বিবর্ণ আকাশের দিকে চেয়ে খোদার কাছে মনে মনে সোমেলাকে কামনা করে।দৃশ্যটা বড় করুণ।
ঘণ্টাখানেকের পথ হেঁটে আলী মকদম নৌকার কাছে পৌঁছে যায়। উদবিলাইদুটো খাঁচায় পুরে চটের ভেতর থেকে কাঁথাদুটো বের করে আনে। কোথাও এতটুকু শুকনো ভাব আর নেই। সারারাতের অসহিষ্ণু অত্যাচার সয়ে সয়ে চোখদুটো তার ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। শেষে ভেজা চড়াটের ওপর ছেঁড়া মাদুরটার জল মুছে শরীরটা এলিয়ে দেয়।
ঘুম তার কিছুতেই আসে না। সে ভাবে, ভোরের আলো ফোটার পর চরের ওপর মানুষের পদাঙ্কিত রেখার দিকে চেয়ে সে সোমেলার জন্য অপেক্ষা করবে। সারারাতের ঝড়ে দুনিয়াটা ওলটপালট হয়ে গেছে। সোমেলা উদবিলাইয়ের মায়ায় কিছুতেই ঘরে থাকতে পারবে না। আসুক একবার, সে সোমেলার হাতদুটো ধরে অনুনয় করে বলবে-হারারাইত বাচ্চাদুডা লইয়া জলে এক্কেরে হাবুডুবু। তোর আল্লার দোয়াই লাগে সোমেলা, রাজি অইয়া যা।
কথাগুলো সে এমনভাবে বলবে, যেন চোখের কোণে দরদর করে জলের ধারা আপনা-আপনিই নিচের দিকে নেমে যায়। সোমেলা পুরুষলোকের কান্না দেখলে নিশ্চয়ই কাবু হয়ে যাবে। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আলী মকদম সত্যিই কেঁদে ফেলে।
অদৃষ্টের কেমন এক অভিশাপ, ভোরের দিকে আবার জোরে বৃষ্টি ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাতাস নেই তবু বধির জলের নাচনে নৌকাটা হোতার ভেতর লাফাতে থাকে। আলী মকদম ভাবে, এ যাত্রা রেহাই পেলে নৌকাটা বেচে দিয়ে জেলে-জীবনের ইস্তফা দেবে সে।
পরদিন ভেরের দিকে আকাশটা পরিষ্কার হয়ে রোদের দাপটে চরাচর আবার হেসে ওঠে। সোমেলা সকালে একবার বিলাইদুটোর সাথে খেলা করে কী এক তাড়াহুড়োয় বাড়িতে চলে যায়। আলী মকদম মনের কথাটা বলার মত অবসর আর পায়নি। বিকেলে সাধুরহাটে মাছ বেচতে যাওয়ার সময় সে দেখে, উদবিলাইদুটো নিজেদের মধ্যে মারামারি করে। যেতে যেতে আলী মকদম ভাবে, ভ্রাম্যমাণ জীবনের ক্লান্তি আর নিস্তরঙ্গ জীবনের গোপন ব্যথাটা বিকেলে কীভাবে সবিস্তারে জানাবে সোমেলাকে। কেমন করে কাদায় লেপা চুলার গর্তে প্রতিদিন তাকে ফুঁ দিয়ে আগুন জ্বালাতে হয়, কী করে ছইয়ের তলার নিরুৎসব বিছানায় তার একা থাকার রাতগুলো ভোর হয়ে যায়। কত বীভৎস তার জীবন!
জীবনের পথে ফাঁপা ঝুলি নিয়ে চলার মতো কষ্ট আর অন্যকিছুতে নেই।সেদিন মাছ বিক্রি করে দ্রুত ফিরে আসে আলী মকদম। তার মনের ভেতর গুড়িম গুড়িম করে ফাটতে থাকে অস্থিরতার পাহাড়। নৌকার কাছে এসে দেখে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। উদবিলাইদুটো ডরার ওপর মরে কাত হয়ে পড়ে আছে, যেন কাচা ধানের ওপর অদৃষ্টের নির্মম বাড়ি। নদীর তীরটা একদম ফাঁকা, কোথাও কেউ নেই। নৌকার দুপাশে ছাপানো জলের ঢ্যাবঢ্যাবে আলোড়ন।একটুদূর দিয়ে ভেসে যায় গাছের দুখণ্ড মরা ডাল। আর সেই ডালের সাথেই নির্দ্বিধায় ভেসে যাচ্ছে প্লাস্টিকের বিষের বোতল।
লেখক পরিচিতি
মোস্তফা অভি
পটুয়াখালী সদর উপজেলার বড় বিঘাই গ্রামে ১৯৮৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় ব্যাংকার। বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় লিখেছেন অসংখ্য গল্প। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ তিনটি। বাজপাখির পুনর্জন্ম-২০১৭, সিএস খতিয়ান ও একটি মামলার ইতিবৃত্ত-২০১৯ এবং বেড়ালের কোয়ারেন্টাইন-২০২২।


3 মন্তব্যসমূহ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ দিয়ে গল্পের শুরু -- দুটি অবলা উদবিড়াল ছানা সহ অসহায় মকদম আলীর ঝড় জল বিধ্বস্ত রাতের দুর্দশা, আশ্রয় অন্বেষণ সোমেলা নামি নারীর সঙ্গে তার চাপান উতোর এবং উদবিলাই ছানা দুটিকে
উত্তরমুছুনছুঁড়ে ফেলা , নিরীহ প্রাণীদ্বয়ের মৃত্যু,
তথা বোতল বন্দী বিষের শিশিতে সোমেলার লাশের ভেসে যাওয়া এক অদ্ভুত যাদু জগৎ সৃষ্টি করেছে।
গল্পকার কে জানাই উদ্বাহু সেলাম।
অন্যদিকে প্লাস্টিকের বোতল বন্দী বিষের শিশিতে সোমেলার লাশ স্বরূপ
ভেসে যাওয়া যেন এক অদ্ভুত যাদু জগৎ সৃষ্টি করেছে। একজন অনামা গল্পকার হিসেবে আমি বিমুগ্ধ বিষ্ময়ে পাঠান্তে হতচকিত হয়ে পড়েছি।
এটি যে একটি মোস্তফা অভির সেরা গল্প তা উদ্বাহু হয়ে জানান দিচ্ছি।
ভেসে যাওয়া সোমেলার
লাশ স্বরূপ
মগ্রিক
বৃষ্টিমুখর সারারাত উদবেড়ালদুটো নিয়ে আলী মকদম মসজিদের বারান্দায় থাকে। পাশেই ক'দিন আগে এক মরার তাজা কবর। বিজলির আলোতে জলে মাটি ধুয়ে যাওয়া করবটা দেখা যায়। যে পুকুরটা বহুদিন কচুরিপানায় ভরা বিরাণ ডোবা ছিল বৃষ্টির জলে পূর্ণ হতেই সেখান থেকে দড়িছাড়া জন্তুর মত জল ছুটতে থাকে। কী দারুণ! একটা বেড়াল মকদমের ঘাড় থেকে যখন কাদায় পড়ে যায়, বেড়ালটার পরিনতি দেখে আলী মকদম ঠিক বাচ্চার মায়া অনুভব করে কেঁদে ফেলে। বিভৎস সুন্দর।
উত্তরমুছুনগ্রামবাংলার এই ধরনের প্লটে ইদানিং বাংলা গল্প লেখা হয়না। যা হয় সেগুলো পড়ার পরই রেস কেটে যায়। মনে রাখার মত গল্প।
উত্তরমুছুন