দীপংকর গৌতমের গল্প : গাদলা



আষাঢ়ের গাদলা। ৩ দিন ধরে বৃষ্টি শেষ না হওয়ায় মলনের ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছে অবিনাশ। কোন মতে ধানের সুরক্ষা হচ্ছেনা। মাত্র দুই দিন পাল্লায় থাকার পরই ধানের আাটিতে সিধলা পড়ে যাচ্ছ। কষ্টে তোলা ধান গোলায় উঠানোর আগেই এ কোন বিপদ এলো। ইচ্ছা ছিলো ধান ওঠার পর ঘরের টিনগুলা বদল করবে। বাবার কিছু বন্ধক রাখা জমি মুক্ত করবে।কিন্তু একোন দুর্যোগে পড়লো সে। ভেবে পায় না। ঘরের দ্য়ুারে বসে লুঙ্গির কাছার ভেতরে পলিথিনে বাঁধা একটা ৫৫০ মার্কা বিড়িতে টান দেয়। বিড়িতেও কড়কড়া স্বাদ নেই। কেমন ড্যাম ড্যামভাব গলা পোড়ায়। মাত্র শুকুর দোকান থেকে আনা বিড়ি কিভাবে ড্যাম হলো বুঝতে পারে না অবিনাশ। এই কৃষিকাজ করতে আর তার ইচ্ছে করে না। কত ঝামেলা আজকাল। সারের ডিলার পর্যন্ত অনেক ক্ষমতাধর। কোন কিছুতেই কিছু বলার উপায় নেই। কথায় কথায় পুলিশের ভয় দেখায়। কীটনাশক থেকে সেচের জল সবখানে রাজনীতি। এতসব কি অবিনাশ সামলাতে পারে? সব কিছুতে দাম বেশী। দাম নেই তার ফসলের। অবিনাশ শীতকালে এবার মেয়ের বাসাবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলো। পদ্মা সেতু পার হয়ে ঢাকায় যাওয়ার সময় পাশে বসা একলোক তাক বুঝিয়েছিলো।এই সেতুতে তারও ভাগ আছে। তাতে অবিনাশ বিস্মিত হয়েছিলো। তার যদি ভাগ থাকে সে এই সেতুতে একটু দাঁড়াবে। তার মেয়ের মোবাইল ফোনটা দিয়ে একটা ফটো তুলবে। কিন্তু এসব চিন্তা তার শেষ হয়ে যায় গুলিস্তানে নেমে মেয়ের জন্য সবজি কিনতে গিয়ে তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। সব সবজি ৮০ থেকে ৬০ টাকা।অবিনাশ বজ্রপড়া বৃক্ষের মতো সবজির ডালার দিকে তাকিয়ে থাকে। টমেটো, বেগুন, ঢেড়স, পটল তারদিকে তাকিয়ে কথা বলতে থাকে। -বাবা গো তোমার হাতে আমাগো জন্ম। কিন্তু তোমার হাতে থাকলে াামাগো দাম থাহে না। তুমি আমাগো বেচো ৫ টাহায়, খাইয়া না খাইয়া আমাগো যতœ করো, রোদে পেড়ো-বৃষ্টিতে ভেজো। আর এহন আর ৬০-থেকে ৮০ টাহায়। শপিংমলে আরো বেশী।তুমিও ঢাহায় আইসো।দেহোনা যারা আমাগো ডালায় ভওে তাগোও অনেক টাহা। তুমি এত কষ্ট করো ক্যান বাবা? এবাওে অবিনাশের চোখ খুলে যায়। সত্যি কথাতো। তার বোনা সবজি এতদামে বিক্রি হয় আর তার জমি চাষের কিস্তি দিতে জীবন যায়। এ কেমন বিচার? ঢাকায় যে কয়দিন ছিলো সে কয়দিন খুবই মনমড়া ছিলো। মেয়ে ময়না বার বার জিজ্ঞেস করে'

-বাবা তোমার কি অইছে?

-খাও না কেন?

অবিনাশ চুপ করে বিড়িতে সুখটান দিয়ে চলে।

এ কেমন দেশ সে খুঁজে পায় না। অবিনাশের দাদু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের দাঙ্গায় আহত হয়ে দেশে এসে ছেলে মন্মথ বিশ্বাসকে বলেছিলেন। জিহ্না- মহাত্মা গান্ধী দেশভাগ করলেও মাটি ভাগ করতে পারবে না। এই মাটি আমাদের মা। আমাদের ভবিষ্যৎ। মাটি ছাড়বি না। বাবার মুখে বার বার সে একথা শুনেছে। তার বাবা মাটির সঙ্গে কথা বলতো। মাটির ভাষা বুঝতো। মাটির ডাকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে শরনার্থী ক্যাম্পে বাবা মন্মথর বাবা ডায়রিয়ায় মারা যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশে আসলে অবিনাশের জন্ম। অবিনাশ তার বাবার মতো মাটির ভাষা বোঝে।মাটির সুখ- দুঃখ বোঝে, মাটির সঙ্গে কথা বলে। জমিতে ফসলের বীজ বুনে সে জমিনের উপর শুয়ে মাটিতে কান পাতে, মাটির কথা শোনে। কতক্ষণ শুয়ে থেকে উঠে পড়ে। অন্যান্য কৃষকদেও তারপরে বলতো ,মাটির কথা শুনেছি। এবার ফসল ভালো হবে । বেশী বৃষ্টির হলে বা ফসলে লু হাওয়া বইলেও সে বলতে পারতো। সব চাষীরা তাই সন্ধ্যা হলে অবিনাশের বাড়িতে এস তামাক খেত-তাসের আসর জমিয়ে যাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করতো- ও অবিনাশ মাটির কথা শুনেচিস? কি কইলো মাটি? ফসল ভালো হবে?

অবিনাশের কথার খুব হেরফের হতো না। তাই সবাই বিশ^াস করতো অবিনাশের কথা। কিন্তু ইদানিং সময় কেমন বদলে যাচ্ছে। সে ঋণ করে ফসল চাষ করে আর লাভ নিয়ে যায় কারা?তার উৎপাদিত ফসল যেন তাকে চেনে না।৫ টাকার টমেটো এখন ৮০ টাকা। এতোসব ভাবতে ভাবতে দেখে পাশের বাড়ি শুকদেব টিন নিয়ে আসছে বৃষ্টির মধ্যে। মন্মথ জিজ্ঞেস করে - ও বেডা টিন দিয়া কি হরবা?

- শুকদেব বলে গাদলা শুরু হইছে দেখছো না। বইসকা থাকলেতে ধান নষ্ট হবে। তাই গাদলার মধ্যেই ধানের মলন দেব। টিনের ছাপড়া বানাইতেছি । বেডা বইসকা থাকলেতো হবে না। গাদলা হয় হউক। এয়ার মধ্যেই মলনের। কাজ শেষ হরবো।

------

প্রতিবছর গাদলা আসে। তিন চারদিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি হয়।গাদলায় জনজীবনে দুর্ভোগ অন্তহীন।তারপর সদ্য ধানকাটা কৃষকের অবস্থা আরও করুন। বেশী বৃষ্টিতে নেতিয়ে যাচ্ছে ধান। ধানের আাটিতে ছত্রাক পড়ছে। শুকদেব এতকক্ষণে অবিনাশের উঠানে ছাপড়া দিতে ব্যস্ত হয়ে যায়। ছাপড়া হলেই শুরু হলো ধানের মলন।গরু দিয়ে ধান মলতে মলতে অবিনাশের মনে পড়ছে এমনি একদিনে পাশের বাড়ির ধাত্রী সুরবালা এসে চিৎকার করতে করতে তাকে ডাকছিলো

- ও অবিনাশ তাড়াতাড়ি আয় তোর ছাওয়াল হইছে। বাড়ির বিটিগো ক ঝাহে ঝাহে জোহার দিতে।

অবিনাশ গিয়ে আতুড় ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলো চাঁন্দের মতো ছেলে তার। তার ঘরে কোন ভুলে এসেছে কে জানে? কিন্তু জন্মের তিনদিন পর ছেলেটা মারা যায়। শহরে ডাক্তারের কাছে নিলে ডাক্তার বলেছিলো, বাঁশের যে চটা দিয়ে নাড়ি কেটেছিলো সে চটায় ধনুস্টংকারের জীবানু ছিলো। তার মায়ের কতজন সন্তান তাদেও জন্ম এভাবেই।শুধু তাই কেন,বাড়ির আশপাশে কত বাচ্চা হচ্ছে এভাবে দিনের পর দিন। আর এতাদিনে কপাল পোড়া গেল তার? তার সন্তান ধনুষ্টংকারে মারা গেল একতা অবিনাশ বিশ^াসই করতে পারে না। ছেলে সন্তান বলে কথা। সন্তান মারা যাওয়ায় অনিাশ বজ্রপড়া বৃক্ষের মতো শোকে চুপ হয়ে গেল। পরে ছেলে তারপরে মেয়ে হলেও প্রথম সন্তানের কথা সে কোনমতেই ভুলতে পারে না। এর মধ্যেই আসলো লক্ষ্মীদীঘা ধানের মৌসুম । এসময় এলেই তার মাথা ঠিক থাকে না। তার গোঁসাই তাকে বলেছে এই ছেলে বেঁচে থাকলে তার কোন দুঃখ থাকতো না। তার ধনে জনে পূর্ণ হতো। কিন্তু তার কোন পাপে তার এই রাজ সন্তান তার ঘরে থাকলো না। তার স্ত্রী সুরবালা তাকে বার বার বুঝিয়েছে, তার কি সে অপূর্ণ আছে। ধন জন তার কি নেই তার? কিন্তু কোন কথায় তার বুঝ মানে না অবিনাশ। বার বার বিঢ়িতে সুখটান দিয়ে চলে একটা পিছে একটা বিড়ি ধরায়। ভাত খাওয়া প্রায় বন্ধ। এবার মেয়ের কাছ থেকে এসে সে তার স্ত্রীকে ডেকে বলেছে। -- তুই কস বউ আমার ধনে জনে পূর্ণ। শহরে যাইয়া দেখ আমার ৫ টাকার টমেটো আমার কাছে ৮০ টাকা চায়। কত সবজি! সব সবজি আমার দিকে চাইয়া থাহে, কথা কয়। আমার কষ্টে কষ্ট পায়।আমার ক্ষ্যাতের ফসল, আমারে চেনে দূও শহওে যাইয়াও। আর দোকানদার দাম চাইতেই থাহে।এট্টা লোক নাই এট্টু উচিত কথা কবে! আমার ঘাম ঝরানো,বৃষ্টিভেজা ফসলে অন্যমানুষ সুখ নেয়।

এবারে শুকদেবের জন্য ভালোয় ভালোয় অবিনাশ ও শুকদেবের মলন শেষ হয়। তখনও ভাসছে ক্ষেত। গাছপালা বৃক্ষরাজি সব যেন অপরিচিত লাগে অবিনাশের। বৃষ্টিতে রঙ ধুয়ে আরো ঘন হয়ে উঠেছে। ঘুমের ভিতরে অবিনাশ দেখে জোছনার ভিতরে তার বাবা বলছে অবিনাশ। মাটির কথা শোনতে পাস না। মাটিতো কান্দে। কৃষকের অধিকার ছাড়া দেশ বাঁচে না। লাঠি নিয়া বাইর হ অবিনাশ। বজ্জাতে দ্যাশ ভইরে গেছে। লাঠি হাতে ল। ঘুম থেকে উঠে পড়ে অবিনাশ। মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে। হাতে লাঠি নিয়ে বের হয়। কেমন ধবল জোছনায় ভেসে যাচ্ছে মাঠ ক্ষেত। সে মাটিতে কান পাতে। আবার উঠে দাঁড়ায়। তার বউ এসে বলে তোমার কি অইছে? অবিনাশ বলে,বউ দ্যাশ ভালো নাই, বাজারে নষ্ট লোকের রাজত্ব। মাটির ডাক শোন। আমাগো সম্পদ লুট হয়ে যাচ্ছে। আমাগো স্বপ্ন লুট করে নিচ্ছে। সুরবালা কাঁদে- তোমার কি অইলো? এই রাজনীতি বোঝার দরকার নেই। এসব আমাগো জন্যে না। তুমি ঘুমাও। অবিনাশ দেখে জোছনার ভেতরে তার ছায়া যতদূর চোখ যায় ততদূর দীর্ঘ। বউকে কাছে ডেকে এবার অবিনাশ বলে, আমার বাবা কইতো মানুষের চেয়ে ছায়া বড় হলে সে আর বাঁচে না। আমার ছেলে - মেয়ে জমি সব তোর রইলো। মাটি ডাক দিছে সবাইরে কইস।আমার বুকে ব্যথা ওঠছে। সে বুক চেপে ধরে বউকে বলে-আমি চলে গেলাম বউ-মরণ ব্যথায় বায় আমাওে ডাক দিছে। ঘরের পাশে আতা গাছে একটা পেচা ডাকতে থাকে। কাউরিয়া বিলের পাশে স্বর্নগ্রামে কুপির আলো একটার পর একটা জ্বলছে।অবিনাশের চিৎকারে জেগে ওঠে পাড়া।তার সঙ্গে সুরবালার দিশেহারা কান্নায়। গ্রামের পর গ্রাম নিম্নবর্গের কৃষকেরা সব ছুটে আসতে থাকে। এই ভর রাত্তিরে কৃষক প্রান অবিনাশের কি হলো? মানুষের দীর্ঘ সারি ক্রমশ দীর্ঘ হয় অবিনাশ ও সুরবালার চিৎকারে। কুপির আলোর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কৃষকেরা সে আলোতে গাদলায় অসহায় ফসলের ক্ষেত দেখতে থাকে। দিনের পর দিন এই ফসল তারা ফলায় আর তাদেও ভাগ্য বদলায় না। ধনী হয়ে যায় অন্য মানুষ-মধ্যসত্বভোগীরা। অবিনাশের কাতরানো এক সময় কমে আসে।তাগড়া শরীরটা নিস্তেজ হয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকে। সুরবালা তারস্বওে চিৎকার দিয়ে বলে-ভগবান ,এ কেমন বিচার তোমার। আমার সব শ্যাষ হইয়া গেল। গাদলার বৃষ্টি অঝোওে ঝরতে থাকে। অজস্র মানুষ এসে অবিনাশকে চাপড়ায় নিয়ে চলে। কেঁদে ওঠে সবাই। বৃষ্টির শব্দে তখোন আর কিছু শোনা যায় না।বৃষ্টির গতি বাড়ে। অন্ধকার চারদিক। বিল, বৃক্ষ সব যেন কালো পর্দায় ঢেকে আছে। তার মধ্যে সোনালী রঙের আলোর মিছিল বাড়তেই থাকে।নলীনি খুড়োর ডাক পড়ে। পাড়ার প্রাজ্ঞজন,ঝাড় ফুক করে-তিনি এসে চিৎকার কওে বলেন অবিনাশ আর নাই রে।শোকের আগুন জ্বলে। অজস্র মানুষ এসে অবিনাশকে ছাপড়ায় নিয়ে চলে। কেঁদে ওঠে সবাই। বৃষ্টির শব্দে তখোন আর কিছু শোনা যায় না।বৃষ্টির গতি বাড়ে। অন্ধকার চারদিক। বিল, বৃক্ষ সব যেন কালো পর্দায় ঢেকে আছে। তার মধ্যে সোনালী রঙের আলোর মিছিল বাড়তেই থাকে। নলিনী খুড়োর ডাক পড়ে। পাড়ার প্রাজ্ঞজন,ঝাড় ফুক করে- অবিনাশকে ধরে কিছুক্ষণ বিড় বিড় করে কিসব মন্ত্র যেন উচ্চারণ করতে থাকে। এক সময় তিনি চিৎকার কওে কাঁদতে কাঁদতে বলেন অবিনাশ আর নাই রে। চারদিকে শোকের আগুন জ্বলে ওঠে। অবিনাশকেও দাহ করার প্রস্তুতি চলে।গাদলা তখনও শেষ হয় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

4 মন্তব্যসমূহ

  1. গল্পটি চমৎকার! এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম। মাটি ও মানুষের গন্ধে চারিদিক ভরে ওঠছে। লেখককে অশেষ ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  2. চমৎকার একটি গল্প পড়লাম। গল্পকার দীপংকর গৌতমকে ধন্যবাদ।

    উত্তরমুছুন
  3. এক পলকে গল্পটি পড়লাম। রক্ত ঝড়ানো ঘামে উৎপাদিত কৃষককে তার ফসলের নায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে এ রাষ্টব সমাজ বসে স্থা

    উত্তরমুছুন
  4. ভালো গল্প।মাটি ও মানুষের হাহাকার, উৎপাদকের হাহাকার, যার নিয়ন্ত্রণে থাকেনা নিজের উৎপন্ন পন্যের উপর।অনেক কিছু উঠে এসেছে গল্পে। শোষিতের প্রতীক হয়ে উঠা অবিনাশের বুকের ভেতরের আগুন, সমাজের ভেতরের দহনের চিত্র।অবিনাশদের মৃত্যু নেই অজস্র সোনালী আলো প্রজ্বলিত শিখা, শোষণ যন্ত্র কে গুড়িয়ে দিবে এ প্রত্যাশা করি। শুভ কামনা প্রিয় গল্পকার দীপংকর গৌতম দাদা।

    উত্তরমুছুন