মধুময় পালের গল্প: আকালপিরেত



১.
কুন্তীপারে শান্ত গ্রাম শ্রীমন্তপুর
জল চলে রাতে দিনে দূর সমুদ্দুর
আকাশে লাগে সোনাধানের পরশ
প্রজাগণ গায় গান মনেতে হরষন
এই গ্রামে সহসা আসিল করাল আকাল

অন্নদা ছুটে পথে না পায় অন্নের নাগাল৷

***

বামে দক্ষিণে আকাশে বাতাসে ভাসে আর্তধ্বনি— ফ্যান দাও, মাগো, একটু ফ্যান দাও/তিনদিন পেটে একটা দানা পড়েনি, মা, একটু ফ্যান ঢেলে দাও, গড়িয়ে দাও/কোলের ছেলেটা শুকিয়ে মরল, মা/বাবু গো দুটো পয়সা দেন, রুটি কিনে খাব/লঙ্গরের বিষ খেয়ে মেয়েটা মুখে ফেনা তুলছে/আমার মা নর্দমায় পড়ে আছে, উঠতি পারেনি/বাবু গো, আমরা মানুষ বটে…

প্রৌঢ় একজন, নাম নিবারণ, বলে, এই ‘ফ্যান দাও’-এর মধ্যে দিয়ে আরও কতকাল পার হতে হবে৷

আপনমনে সে বলে, যায়, শুনতে পাচ্ছেন আপনারা? কানে হাত দেবেন না, দয়া করে! শ্রীমন্তপুর ক্ষুধায় চিৎকার করছে৷ একটি মৃতদেহের ওপর শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে আর-একটি মানুষ মৃতদেহ হয়ে যাচ্ছে৷ চোখ বুজবেন না, দয়া করে! মুখ ঘোরাবেন না৷ চেয়ে দেখুন, মরা-ছেলে কোলে ঝুলিয়ে যে মা আপনার কাছে একটা রুটি বা একমুঠো ভাত বা এক বাটি ফ্যান চাইছেন, তিনি কৃষাণী, রোদে জলে নিজের শরীরকে পোড়ামাটি করে ক্ষেত থেকে তুলে আনেন সোনার ফসল, যুগ যুগ ধরে আপনার, আপনার সন্তানের, আপনার পূর্বপুরুষ উত্তরপুরুষের ক্ষুধা মেটান৷ ভালো করে তাকিয়ে দেখুন, তিনি আপনার আমার মা অন্নদা৷ চোখ খুলতে ভরসা পাচ্ছেন না? ভয় হচ্ছে? ভেতরটা কেঁপে উঠছে? শুধু ভয়? নিজেকে হত্যকারী বোধ হচ্ছে? এত বছর বাদেও? বিশ, পঞ্চাশ, সত্তর, আশি বছর৷

সেদিন যারা বাঁচবে বলে দলে দলে অলীক জীবনের দিকে হেঁটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল, তাদের ছায়াশরীর আজও হাঁটে আমাদের চারপাশে, আমাদের সন্তানসন্ততির চারপাশে, হাজারে হাজারে৷ চোখ বুজে থাকলে সব মুছে যায় না৷

***

ভাঙা বাঁশেরসাঁকোর ওপর দাঁড়িয়ে গৌরহরি দূরের দিকে চেঁচিয়ে বলে, নিত্যহরি, শুনতে পাও? নিবারণকে ভূতে ধরেছে৷ ওইরাতে কলুভাগাড়ের পথ ধরে ঘরে ফিরল৷ পইপই করে নিষেধ করলাম৷ বোধহয় শ্যাওড়াগাছের নীচে পেচ্ছাবে বসেছিল৷ পইপই করে বলেছি, গাছের দিকে মোটে যাবে না৷ পট করে নেমে কাঁধে চেপেছে হয়তো৷ মামুদালিহাটার নিবারণ অধিকারীর কথা বলি৷ অঙ্কের মাস্টার ছিল৷ শ্যামবাটি থেকে ফিরতেছিল সে৷ অনুমান করি, সে নর্দমায় জল ছেড়েছিল৷ বার বার মানা করেছি, কাঁচা নর্দমায় সন্ধের পর মোটে জল সরাবে না৷ রতন নর্দমা থেকে গোরু উঠে আসতে দেখেছিল, মনে নেই? যে সে গোরু নয়, বিধবা, পরনে সাদা থান, কপালে ড্যাবা-ড্যাবা চোখ, একহাত জিভ৷ সেই থেকে রতন দিনদুপুরেও গোরুর তাড়া খেয়ে ছোটে৷ কত ডাক্তার-বদ্যি ফেল মারল৷ অনুমান করি, একে কাঁচা নর্দমা, তদুপরি ঘোঙা রাত৷ পেচ্ছাপ বেয়ে ঘাড়ে চেপেছে৷ গোঁদলপাড়ার ওঝা, হাড়কাটার ওঝা আর নসিবপুরের ওঝা— তিনজনে মিলে যত বলে ‘যা যা’, পিরেত বলে ‘খা খা’৷ লাল সিঁদুরে জবজবা বেন্দাবন ওঝা বলল, ‘তালগাছের ডাল ভেঙে চলে যা’৷ তাতে জবাব দিল, ‘তোর বাপের হেগো পোঁদ খা’৷ আরও যা যা বলেছে তাতে মোটাখরচের ডিগ্রিওলা ছেলেপুলেদের মুখখারাপ হলুদ হয়ে যায়৷ ওঝাও তো মানুষ, ঘরে বউ-বাচ্চা আছে৷ পাঁচজনে ভয়ভক্তি করে৷ অত কাঁচা গাল কি সয়? অনুমান করি, কাঁচা নর্দমা, কাঁচা পাঁক আর ঘোঙা রাত এই তিনে মিলে যে জিনিসটা তৈরি হয় তার উপদ্রব সহজে যাবার নয়৷

গৌরহরি সাঁকো থেকে নেমে এগিয়ে আসে৷ বলে, নিত্যহরি, তোমার সাড়া পাই না কেন? একা একা কত বকা যায়? শোনো, প্রসঙ্গটা যখন উঠেই গেল, আগে শেষ করি৷ নিবারণকে শুধু ভূতে ধরেনি, অনুমান করি, নিবারণ আর মনুষ্য নাই৷ কেন নাই? কলুভাগাড়ের দিকে যেতে কেন না বলেছি? বলেছি এই কারণে যে ওই পথে কবেকার মড়ার হাড়-খুলি পড়ে আছে৷ মন্বন্তরের মড়া হতেই পারে৷ তাদের খুলি-হাড় রাতে চলাচল করে৷ প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, যতে স্যাঁকরাকে ধরেছিল৷ তখন দেশভাগের হাঙ্গামা খুব হচ্ছে৷ পুলিশের তাড়ায় ছুটতে গিয়ে কোথাও খুলি বা হাড়ে পা দিয়ে ফেলে৷ আর যায় কোথা? যতের বাপ নাকি কয়েকঘর চাষির বাসনকোসন বন্ধক রেখেছিল কোনো আগে৷ বিশেষ করে এক চাষিবউয়ের রূপার হাড় আর দু-গাছা চুড়ি৷ চাষিরা বন্ধক ছাড়াতে পারেনি, না-খেয়ে মারা যায়৷ হাড়ে পা লাগতেই যতের ঘাড়ে চেপে ঘরে ঢুকল এক চাষি বা চাষি-বউ৷ সেই থেকে মাঝরাতে রান্নাঘরে বাসনের শব্দ৷ কাচা মাছ উধাও৷ যতের ল্যাঙ্গট উধাও৷ সিন্দুকের ভেতর কী যেন নড়েচড়ে৷ মাঝরাতে ধুনো জ্বেলে কোনো মেয়ে কাঁদে৷ যতে যজ্ঞ করল৷ যজ্ঞের রাতে কাঁসার বাসন তিন-চারটা চুরি গেল৷ কেউ টুঁ শব্দটি করেনি৷ উৎপাত ঘরে ডাকে কে? অনুমান করি, শ্রীমন্তপুরের মাটির সর্বত্র দুর্ভিক্ষের বডি৷

নিত্যহরি দাঁত মাজতে মাজতে আসে৷ বলে, গৌর, তুমি এখন? এই অবেলায়?

অবেলা বলো কী? সবে বিকাল হল৷

এটা বিকাল? সন্ধ্যা হতিছে, টের পাতিছো না?

তোমার চোখটা গেছে, নিত্য! বাদ দাও৷ বেলা অবেলা নিয়া এখন তর্ক করার মানে নাই৷ বলি, আমি যে প্রসঙ্গ এতক্ষণ তোমারে বললাম, তা কি কানে গেল?

কানে এল বটে৷ তুমি তো আর চুপেচাপে বলো নাই৷ কিন্তু, মনে করো সে, অভিপ্রায় বুঝতে পারতেছি না৷ নিবারণকে ভূতে ধরাচ্ছো কেন?

এই সন্ধ্যাকালে তোমার দাঁত মাজার অভিপ্রায় কী? অনুমান করি, দাঁতে পোকা ধরেছে৷

না, গৌর৷ মনে করো সে, দাঁত হতিছে মহারত্ন৷ চক্ষুরত্নের অধিক৷ চক্ষু আবছা হলিও কাজ চলি যায়৷ আবছা হলি বিশেষ সুবিধাও আছে৷ দেখিলেও দেখি নাই৷ কত সত্য এইভাবে না দেখি শান্তিতে বাঁচা যায়৷ মনে করো সে, আবছা দাঁতে কাজ চলে না৷ মিঠা করি হাসতে হয়৷ বয়স কচি রাখতি হয়৷ খাইদ্য হজম করতি হয়৷ টুটি টিপি ধরতি হয়৷ বাঘের মতোন৷ ফোকলা বাঘেরে মইষেও লাত্থি মারে৷ তাই দোকানে মাজন যা যা আছে, সব দিয়া মাজি৷

তোমার অভিপ্রায় ব্যক্তিগত৷ দাঁত তোমার নিজের জিনিস৷ দাঁতের ব্যবহারও নিজস্ব৷ আমার অভিপ্রায় সামাজিক৷ আমি সমাজ নিয়া ভাবি৷ সমাজ নিয়া থাকি৷

গৌর, তোমার সামাজিক অভিপ্রায় যারে ভূতে-ধরা বা মৃত বলতিছে, আমি সেইদিনও তারে দেখিছি৷ মনে করো সে, শুক্রবারের হাটে৷ সে গান গাচ্ছিল৷ ইসব দেখায় আমার চোখ আবছা হয় না৷ নিবারণের গলায় গান ছিল৷ হাঁ, অন্ন দে মা, অন্নদে৷

ঠিকই শুনেছ৷ নির্ভুল৷ এটা ক্ষুধার ভূতের গান৷ নিবারণের কাঁধে চেপেছে৷ নিবারণ আর নাই৷

তোমাদের বিচারে ভুল হতিছে৷ আকালের মরা ভূত বা পিরেত হতি পারে না৷ কেন পারে না? বিজ্ঞান দিয়া বিচার করো৷ বিজ্ঞান ছাড়া সব মইধ্যযুগ৷ বিজ্ঞান কী বলে? মনে করো সে, প্রতিটি মানুষের মৃত্যু পূর্বনির্ধারিত৷ বিধিলিখিত৷ শাস্ত্র আযুর কথা বলতিছে৷ কী বলতিছে? কো অদ্ধা বেদ ক ইহ প্রবোচৎ/কুত অজাতা কুত ইয়ং বিসৃষ্টিঃ৷ বেদে সব আছে৷ বেদই বিজ্ঞান৷ বিজ্ঞানভিত্তিক বিচার করো৷ সব প্রশ্নের উত্তর আছে৷ কর্মফল ন খণ্ডায়৷ শ্রীমন্তপুরে যে আকাল হল, যে হাজারে হাজারে লোক মরি গেল, তার মূলে কর্মফল৷ বিধির বিধান কে করে থণ্ডন৷ বিজ্ঞান বলে, আকালের মরণে, মারির মরণে দোষ নাই৷ তাহলি, এই মৃতরা কেন ভূত বা পিরেত হবে? মনে করো সে, শ্রীমন্তপুরের বাহিরে যারা কাজে যায়, কিন্তু ঘরে ফিরিতে পারে না, মারি ও লকডাউনের কারণে পথে মৃত্যুর কোলে ঢলি পড়ে, তারা কি ভূত হবে? কর্মফলে তাদের ওইরূপ মৃত্যু হয়েছে৷ এই মৃত্যুতে ঈশ্বরের বিধান আছে৷ সুতরাং তারা ভূত হতি পারে না৷ গৌর, নিবারণ সম্পর্কে তুমি যে বক্তব্য বলতেছ, তার মূলে কোনো অভিপ্রায় আছে হয়তো৷ মানুষ জন্মে বাঁচে মরে ঈশ্বরের ইচ্ছায়৷ মনে করো সে, সকলি তোমারই ইচ্ছা৷ মনে করো সে, আমি যন্ত্র তুমি যন্ত্রী৷ নিবারণকে আমি দেখেছি৷ পিরেত নহে৷ ছায়া নহে৷ পুরা কায়া৷

নিত্যহরি, তুমি সুস্থ আছো তো? হাকিমের চিকিৎসা নিয়মমতো করছ তো? বাড়ির সকলে সুখীমনে আছে তো?

জগদীশ্বরের ইচ্ছায় বিশ্বপুঁজির এই ভরা বাড়বৃদ্ধির কালে আমরা সকলে আনন্দেতে আছি৷ আট প্রকার মাজন দিয়া দিনে ষোলোবার দাঁত মাজতেছি৷ সপরিবার৷ হাসবার দাঁত ও খাইবার দাঁতের সুষম যত্ন নিতেছি৷

***

মৃতাবস্থা থেকে এক নারী উঠে দাঁড়াচ্ছেন৷ তাঁর দেহ পথের পাশে পড়েছিল কয়েকদিন৷ কেউ দেখেনি৷ দেখেও দেখেনি৷ কেউ ভেবেছে আর কত লাশ দেখা যায়৷ কেউ মৃত্যু থেকে পালাতে চেয়েছে৷ শালির হাত ধরে সিনেমায় যাবার পথে সাজুগুজু জামাইবাবু লাশ ডিঙোতে ডিঙোতে বলেছে, লাইফ হেল করে দিল৷

মৃতাবস্থা থেকে নারী উঠে দাঁড়ালেন৷ ক্ষুধা তাঁর নারী পরিচয় নিঃশেষে খেয়েছে৷ তিনি যে কারো কন্যা, কারো জায়া, কারো জননী হতে পারেন বোঝবার উপায় নেই৷ নারী উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললেন, একটু ফ্যান দেবে গো৷ অমনি চারদিক থেকে আওয়াজ আসে ‘চোর চোর, আরেকটা চোর’৷

অন্ধ অবিবেক অতিকায় রাষ্ট্রের সেবকরা, শাবকরা যার সর্বস্ব অপহরণ করেছে— ভিটে থেকে সন্তান পর্যন্ত, যেমন যেটুকু জোটে খেয়ে বেঁচে থাকবার অধিকার, কুন্তীনদীতে স্নান থেকে ব্রতকথার মতো সামান্য সাধ-আহ্লাদ, তারাই ‘চোর’ বলে তাড়া করে৷ কুকুরেরা তাড়া করে৷ অন্নদা দৌড়তে পারেন না৷ প্রাণভয়ে কয়েক পা ছুটে দেখেন সামনে পুকুর৷ জলে নামেন৷ তিনি দেখেন, জলের কিনারায় দেহ ভাসে৷ হয়তো ইনি ক্ষুধার যন্ত্রণায় জল খেতে নেমেছিলেন৷ শেষ পর্যন্ত উঠতে পারেননি৷ অন্নদা সেই দেহের পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, একটু ফ্যান দেবে৷

পাড়ে যারা দাঁড়িয়ে তাদের কেউ বলল, এত চোর আগে কখনও দেখেনি শ্রীমন্তপুর৷

কেউ বলল, এত ক্রিমিনাল কোথা থেকে আসে?

কেউ বলল, প্রশাসন বলে কিছু নেই৷

কেউ বলল, দেশে আইনকানুন বলে কিছু্ নেই৷

কেউ বলল, নাগরিকদের নিরাপত্তা কোথায়?

কেউ বলল, ঘর থেকে বেরোনোর উপায় নেই৷

কেউ বলল, বম্বে থেকে আমার শালা-বউ এসেছিল, পালিয়ে গেল দুদিনে৷

কেউ বলল, অক্সফোর্ড থেকে আমার ভগ্নীপতির আসার কথা৷

কেউ বলল, অন্য রাজ্যের লোকজন আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করে৷

কেউ বলল, আমরা মুঘল সভ্যতার উত্তরাধিকারী৷ আমাদের মহিমা আজ ভূলুণ্ঠিত৷

কেউ বলল, আমরা বৃটিশ উপনিবেশের বাসিন্দা৷ আমাদের গরিমা আজ ধুলায় পড়ে৷

কেউ বলল, আমরা শ্রেষ্ঠ সভ্যতার আবহে বড়ো হয়েছি৷ সে ইতিহাস রক্ষা করতে হবে৷

একজন বলল, এই মেয়েছেলেটাকে আমি একটা পুলিশের সঙ্গে মাঠের অন্ধকারে দেখেছি কয়েকদিন৷

দ্বিতীয়জন বলল, আমি দেখেছি ও নিজের ছেলেটাকে ময়লার লরিতে ছুঁড়ে দিচ্ছে৷

তৃতীয়জন বলল, আমি ওকে নর্দমায় মড়া দেখছি আট-দশদিন ধরে৷

জলের ওপর দাঁড়িয়ে-থাকা কঙ্কালমূর্তি, যার চোখ দেখা যায় না, যার রুক্ষ ধূসর চুল বাতাসে ওড়ে, হাওয়ায় এদিক ওদিক হেলে যার শরীর, তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এবার ভিড়ের মধ্যে ভয় ছড়ায়৷ ভিড় দ্রুত পালায়৷

***

জাতির উদ্দেশে রাষ্ট্রের ভাষণ ভেসে আসে:

খাদিয়া সমুসা বোলে কুছু নাই৷ ইসব প্রোপাগান্ডা চলতেছে৷ ফলস্ প্রোপাগান্ডা৷ আমাদেরকে মেলাইন করা হোতেছে৷ খাদিয়ামন্ত্রী ইস্টক নিয়া খুশি আছেন৷ কোনো চিন্তা নাই৷ বিরোধীরা সমুসা ক্রিয়েট করিতে চাইতেছে৷ রাষ্ট্র তার কর্তবিয়া নিয়া এলার্ট আছে৷ হামি নিজে ঘুমাইতে যাই না৷ স্লিপলেস নাইট৷ বিছানা ছাড়িতে দোপহর হইয়া যায়৷ তবু হামার ক্লান্তি নাই৷ শিমন্তপুরকো হাম লঙ্গরখানা দিয়া ছাইয়া ফেলবে৷ চাওল খাইয়া একজনও মরিবে না৷ হামি জানি নিচাগলিতে চাওলের দাম বাড়িয়াছে৷ লছমিপল্লি, তেলিপাড়া, চাষিপাড়া, বাগদিপাড়া, বার্বার সোসাইটি, জেলিয়াপাড়া, মাঝিপাড়াতে চাওল-গহুঁর ভাও অধিক হইয়াছে৷ হামি রিপোর্ট পাই৷ পাব্লিককে হামি বলি, খাদিয়া সমুসা নাই৷ যা আছে তাহা মেলনিউট্রিশন৷ জনগণ কম খাইলে, আধাপেটা খাইলে সমুসা আর থাকিবে না৷ শিমন্তপুরের বর্ডার এখন ডেনজারে আছে৷ ডেথ নিয়া কথা বলা ঠিক না৷ এনিমি হামাদের অ্যাটাক করিতে পারে৷ চাওল-গহুঁ নিয়া যারা কালাবাজার করে, তাহাদের হামি শূলে দিবে৷ ডেথ সব সুমায় পেইনফুল৷ লেকিন ইয়ে টাইম…

***

গান ভেসে আসে৷ মৃত্যুরোলের বাতাসে, মৃতদেহ ছড়ানো প্রান্তরে কারা যেন গান গায়৷

না না না না/মানব না মানব না/কোটি মৃত্যুরে কিনে নেব প্রাণপণে,/ভয়ের রাজ্যে থাকব না৷/অভয় পেয়েছি নতুন দিনের কাছে/দিকে দিকে তাই আশার পতাকা নাচে/পেশীতে পেশীতে রক্তের লাল আলো,/ধুয়ে দেবে অমাবস্যার যত কালো—/জয়ের রাজ্যে ঢুকবই মোরা থামব না/থেমো না থেমো না/মেনো না মৃত্যুর গ্লানি/মানি মানি সব মানি/ওদিকে শুনতে পাও কি ক্ষুধার কান্না/ফেন দাও প্রাণ দাও/নবজীবনের সমীরণ চোখে-মুখে ছড়াও/গ্রাম ভেঙে আজ এসেছি শহরে/ এনেছি দুঃখ,/এনেছি মৃত্যু,/এনেছি রোগ,/এনেছি শোক, ছেঁড়া থলি ভরে-ভরে৷/অন্ন দাও বস্ত্র দাও/আমাদের মরা বাছাদের এনে ফিরিয়ে দাও৷

গানের মিছিল এগিয়ে চলেছে৷ বেশি লোক নেই মিছিলে৷ তবু গানের কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে দূরে দূরে৷ যেন অনেক মানুষ গাইছে৷ আপনারা শুনতে পাচ্ছেন? মিছিল ত্রাণ চাইছে৷ আপনারা হাত বাড়িয়ে দেবেন? মিছিলের সামনে এক গাইয়েকে চেনা লাগছে যেন৷ হ্যাঁ, কলিম শরাফী৷ বীরভূমের মানুষ৷

একটি কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ত্রাণে তেমন সাড়া কই? দরজা জানালা খুলে তারা গান শোনে, পথে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখে৷ হাত বাড়ায় না যে৷ নিজের চোখে দেখলাম৷

সেই কণ্ঠস্বরের মালিক প্রশ্নের মুখে পড়েন, আপনাকে আমি কি চিনি?

চেনার কথা নয়৷ আমি লেখার চেষ্টা করি মাত্র৷

নাম?

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্৷ শ্রীমন্তপুরের মানুষের, বেশিরভাগ মানুষের মনটা বেঁচে নেই৷

শ্রীমন্তপুর এখন শ্রীমরণপুর৷ অন্নবস্ত্রের আকালের সঙ্গে জুড়েছে মনের আকাল৷

এই অনাহারী জনতার মৃত্যুযাত্রা নিয়ে আমার একটা লেখা আছে৷ আমু এক অনাহারী৷ সে পথের পাশে মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷ এই পথ, ওই পথ৷ এখানে পথের শেষ নেই৷ এখানে ঘরে পৌঁছনো যায় না৷ ঘর দেখা গেলেও কিছুতেই পৌঁছনো যাবে না সেখানে৷ ময়রার দোকানে আলো জ্বলে, কারা খেতে আসে, কারা খায় আর পয়সা ঝনঝন করে৷ কিন্তু এধারে কাচ৷ কাচের এপাশে মাছি, আর পথ আর আমু৷ তবু দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছা করে৷ কিন্তু ভেতর থেকে কে একটি লোক বাজের মতো খাঁইখাই করে তেড়ে এল৷ আরে লোকটি অন্ধ নাকি? মনে মনে আমু হঠাৎ হাসল একচোট, অন্ধ না হলে এমন করবে কেন? দেখতে পেত না যে সে মানুষ? পথে নেবে আমু ভাবলে, একবার সে শুনেছিল শহরের লোকেরা অন্ধ হলে নাকি শোভার জন্য নকল চোখ পরে৷ দোকানের লোকটি অন্ধ-ই, আর তার চোখে সে-নকল চোখ৷ কিছু একটা আওয়াজ শুনে হয়তো ভেবেছে বাইরে কুকুর, তাই তেড়ে উঠেছিল অমন করে৷ কিন্তু সে-কথা যাক, আশ্চর্য হতে হয় কাণ্ড দেখে, নকল চোখে আর আসল চোখে তফাৎ নেই কিছু৷

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, আপনি বলছেন চোখের আকাল?

আরও আকাল প্রস্তুতির পথে৷ মানের আকাল, শিক্ষার আকাল, রুচির…

বলতে বলতে ওয়ালীউল্লাহর কণ্ঠস্বর মিলিয়ে যায়৷

আমু কী চেয়েছিল? আমুরা কী চেয়েছিল? একমুঠো ভাত৷ ভিটেমাটি ছেড়ে কেন অনিশ্চয়ের পথ ধরেছিল তারা? বাঁচবে বলে৷ বুঝলে বিনোদ, আগে ওরা ঝুলি নিয়ে ভিক্ষেয় বেরত, যদি দুটো চাল পাওয়া যায়৷ তারপর হাতে নিল ভাঙা কলাইয়ের থালা, যদি চারটে ভাত কোথাও মেলে৷ তারপর হাতে নিল হাঁড়ি গামলা বাটি, যদি একটু ফ্যান কেউ দেয়৷ এখন শুধু কেঁদে ফেরে, কেঁদে মরে৷ ওরা ছিনিয়ে খায়নি৷ চিৎকার করে বলেনি, ভাত দে হারামজাদা, না পেলে তোকেই খাব৷

কে যেন বলল, গেরস্থর ঘরে ক্ষুধার ভয় ঢুকেছিল৷ কিন্তু যাদের অঢেল ছিল, সামর্থ্য ছিল, তারা মোচ্ছবে ফুর্তিফার্তা করেছে ঢের, উপোসিদের খেতে দেয়নি৷

আপনি কে বললেন?

কালিদাস রায়৷

মাস্টারমশাই৷

আমি লিখেছি: এক হাতে লোক খাক না খাবার/দশ হাতে তা ছড়াও কেন?/ খালি পেটে কাঁদছে হাজার/ভরতি জঠর ভরাও কেন?/মেনে মিছে সমাজ শাসন/শ্রাদ্ধ বিয়ে অন্নপ্রাশন/ছুতো ধরে তেলা মাথায়/তেলের ভাণ্ড চড়াও কেন?/ভোজ লাগিয়ে করছ ঘটা/টাকার বড়াই জাহির করে/খোঁজ রাখো কি রোজ কত লোক/মরছে তোমার বাহির দোরে?/জিভে যাহার নেইকো রুচি/তার পাতে দাও পোলাও লুচি/পয়সা কি হায় খোলামকুচি/লোকে ভয়ে ডরাও কেন?/না খেয়ে লোক যাচ্ছে মরে/বেশি কেয়েও কম মরে না/চোর ডাকাতে হরণ করে/জাতকুটুমে কম হরে না৷/লোকে স্বাস্থ্য হরণ করি/যমকে আনো চরণ ধরি/মা লক্ষ্মীরে তাড়াও কেন?

মাস্টারমশাই?

বলো৷

এত মানুষ মারা গেল৷ লাখে লাখে৷ মর্মান্তিক মৃত্যু সব৷ তা নিয়ে লেখা হল না কেন? আমাদের বাহির দোরে রোজ যে মৃতদেহ জমেছে, আমরা দেখিনি কি? মাস্টারমশায়, চোখের আকাল? না, অর্ডারের আকাল৷ যেমন অর্ডার হয় ধর্ম-টর্ম, ভূত-পিরেত, মিলন-বিচ্ছেদ, মাথার ব্যামো ইত্যাদি নিয়ে লেখার৷

অন্যদিকে নীরবতা৷

এখন আমরা না-দেখার অভ্যাস করছি৷ না-বোঝার অভ্যাস করছি৷ মাস্টারমশাই, বোধের আকাল থেকে আমরা একদিন সভ্যতার আকালে পৌঁছব ঠিক৷ আহা, কী আনন্দ! মুন্ডুহীন পিরেতনেত্য হবে আমাদের বুদ্ধি-উজ্জীবন৷

***

২.

আমাদের দেশ ছিল, আমাদের প্রতিবেশ ছিল
সবুজ সাকিন ছিল, আলোর দুপুর
আমাদের এক ভাষা ছিল, মনের যাওয়া-আসা ছিল
যৌথ যাপনে পারাপার বহুদূর
কোথাও যে ফাঁক ছিল, শত্রুরা চিনে নিল
ভাঙনের ডাক দিল, কেটে গেল সুর
দেশ গেল আমাদের, স্বাধীনতা এল
মহাদেশ পেল রিফুজি, অগণন মৃত্যুর৷

***

সার সার তাঁবু৷ আশেপাশে পৌঁটলা পুঁটলি বোঁচকা ছড়িয়ে৷ শাড়ি কাপড় শুকোচ্ছে দড়িতে৷ তাঁবুর বাইরে টিনের পাত্র, মগ, ঝাঁটা, ঝুড়ি, ছেঁড়া মাদুর৷ তাঁবুর ভেতর থেকে আসছে কথা বলার শব্দ, চিৎকার, শিশুর কান্না৷

কাকাবাবু, আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব৷

আমার সঙ্গে কেন? আমাকে চেনেন? আপনাদের আমি চিনি?

আমি হিমবন্ত৷ ও আমার বন্ধু সুধীন৷ আমরা খবরের কাগজ থেকে আসছি৷ এক যুবক জানায়৷ তার সঙ্গীর কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ৷

আমি রামহরি চোংদার৷ বুড়া উদবাস্তু৷ জীবনের শেষ পৃষ্ঠায় ভিটা হইতে উৎখাত নিরালম্ব শূন্যে উড্ডীন এক অস্তিত্ব৷ সুধীনের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনে নিশ্চয় ছবিওলা৷ মন্বন্তরের সময় হাড্ডির দোকানের ছবি তুলছেন৷ এখন নিজদেশ থেকে বিতাড়িত উৎপাতসকলের ছবি তুলবেন৷

সুধীন বলে, কাকাবাবু, এটা আমাদের কাজ৷ এই কাজের বিনিময়ে বেতন পাই৷ খেয়ে পরে বাঁচি৷

হিমবন্ত বলে, আপনারা যে অমানুষিক কষ্টের মধ্যে আছেন, সেই খবর দেশের মানুষকে, সরকারকে জানানোর কাজের একটা অংশ আমরা৷ এই গাছের নীচে বসে কথা বলতে পারি৷

শুধু এই গাছ কেন, সব গাছ সব মাটি সব আকাশের নীচেই বসতে পারি৷ শ্রীমন্তপুর এখন উদবাস্তুদের বধ্যভূমি৷

সুধীন, হেডিং পেয়ে গেলাম৷ শ্রীমন্তপুর এখন উদবাস্তুদের বধ্যভূমি৷ কাকাবাবু, আপনি দারুণ বললেন৷

রামহরি বলে, কথার আকালের কথা৷ পরথম পরিচয়ে জিগানো উচিত ছিল আপনেগো পিতামাতার নাম, লেখাপড়া কী, জীবনের স্বপ্ন কী, কোনো মনীষীকে আপনেরা শ্রদ্ধা করেন কিনা৷

সুধীন বলে, এসব ফালতু হয়ে গেছে৷ কেউ বলে না৷

দ্যাট ইজ দা রাইট ওয়ার্ড, ফালতু৷ ঠিক বলছেন৷ অখন খালি মারামারি কাটাকাটি চুরি-চোট্টামি ধাপ্পাবাজি ভণ্ডামি নোংরামি৷ চাইরটা লোক একজায়গায় হইলেই এগুলি নিয়া কথা কয়৷ কিছু মনে কইরেন না, নিউজপেপার ক্রমে ক্রাইমপেপার হইয়া গেল৷

তাঁবুর পাশে কতগুলো চিৎকার ছোটাছুটি করে: ‘চোর, চোর, ধর ব্যাটাকে, আমার নতুন প্যান্ট নিয়ে ভাগছে’, ‘কয়েকদিন আগে মায়ের কাঁসার থালা ঝেড়েছে’, ‘আমাদের লেটার বক্স খুলে নিয়ে গেছে’, ‘ঝাঁটাও বাইরে রাখা যাবে না, কী দিন পড়ল’, ‘সব ক-টা রিফুজি চোর’, ‘বাপ-মাগুলো আসল বদ, দশটা বিশটা করে ছাড়বে আর চুরি করতে পাঠাবে’, ‘ওদেশ থেকে তাড়িয়েছে, ঠিক করেছে’, ‘শালা বাঙালের জাত’৷

রামহরি বলে, প্রত্যহের ঘটনা৷ প্রত্যহের চিৎকার৷ প্রত্যহের প্রাপ্তি৷ কোনো বাড়ির ঝাঁটা বা গামছা বা চটি হারাইছে হয়তো৷ চুরি যে হয়, সেটা স্বীকার যাই৷ ধরলাম রিফুজিতেই চুরি করছে৷ এইটা একবার ভাবেন যে অগো চোর বানাইল কেঠা! অরা তো চোর ছিল না৷ নিজেগো ভিটা ছিল, দাওয়া ছিল, চাল ছিল, চুলা ছিল৷ সেইসব গেল কই? কেঠা চুরি করল? কেঠা উস্কাইল? জবাব দেন৷ বাঙালরা আপনেগো জমি, দেশ, ফসল, ধনসম্পত্তি, সিংহাসন, হিরার মুকুট হরণ করতে আসে নাই৷ তাগো দেশটাই চুরি হইয়া গেছে৷ তাগোরেই ‘চোর’ দাগাইয়া নিজেগো পাপ চাপা দিতে চান৷ আপনেগো রাজা হবার দরকার ছিল, আরাম-বিলাস দরকার ছিল, স্বাধীনতার লেইগা অনেক খাটাপিটা করছেন, ভাষণ-টাসন দিছেন, জেলে থাকছেন, গা টিপনের লোকের প্রয়োজন ছিল, তাই দেশটা কাটলেন৷ কাটতে দিলেন এমন একজনরে যে জীবনে একখান লাউ বা চালকুমড়াও কাটে নাই৷ কাটছে শুধু কেক৷ তার উপর দিলেন তারে রামতাড়া, অকখনি কাটতে হইব৷ সে ছ্যাদড়া-ব্যাদরা কইরা কাইটা দৌড় মাইরা পলাইল৷ আপনেরা আরামে থাকবেন বইলা আমাগো জীবন হারাম করলেন! একবার ভাবলেন না যে ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি কোনো দেশে ভিন্ন ধর্মের মানুষ কীভাবে বসবাস করে৷

নারীকণ্ঠের কান্না ভেসে আসে৷

শুনতে পান?

বাবা, চোখ খোলো৷ চোখ খোলো, বাবা৷ সাড়া দাও৷ আমি লতা৷ বাবা, আমারে একা ফালাইয়া তুমি যাইতে পারো না৷ এইটা তুমি করতে পারো না৷ মা গেছে৷ তুমি গেলা৷ আমি কই যামু৷ বাবা, আমরা তো আসতে চাই নাই৷ মায়ে ‘না’ কইছিল৷ আমিও কইছিলাম৷ এইবার আমি কই যামু? রামহরিকাকা আপনে কী জবাব দিবেন?

রামহরি বলে, আরও একজন গেল৷ সমর বটব্যাল৷ স্ত্রী নিখোঁজ হবার পর থেকে মনমরা ছিল৷ একটাই মেয়ে৷ বিবাহ হয় নাই৷ এবার সে কী করবে? কীভাবে একা বাঁচবে? দালালরা এতক্ষণে খবর পাইয়া গেছে৷ দুই-চাইরদিন ত্রাণ সাহায্য দিতে আইব৷ একদিন ভুলাইয়া-ভালাইয়া তুইলা লইয়া যাইব৷ আপনেরা ছবি নিবেন তো? শিকড়হীন চালচুলাহীন খানখান সংসারের অবশেষের ভিতর মৃত পিতার বুকে ক্রন্দনরতা অসহায় কন্যা৷ একখান মোক্ষম চিত্র হবে৷ কী যেন হেডিং বলছিলেন, হিমবন্তবাবু? শিমন্তপুর এখন উদবাস্তুদের বধ্যভূমি৷ লাগসই চিত্র পাইবেন৷ আপনেরা ভাইগ্যবান৷ দুর্ভিক্ষ দেখছেন৷ দাঙ্গা দেখছেন৷ দেশভাগ দেখতাছেন৷ আপনেরা ভাইগ্যবান৷ সূর্য সেন দেখেন নাই৷ প্রফুল্ল চাকি দেখেন নাই৷

ওভাবে বলবেন না৷ ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরছি আমরা৷ আপনাদের কথা লিখছি৷ ছবি তুলছি৷ মানুষকে জানাতে পারছি৷ কষ্ট আমাদেরও হয়৷ কিন্তু আর কী করতে পারি? যেটুকু পারছি, কর্তার ইচ্ছায়৷ মালিক যদি না চান, সম্পাদক যদি না চান, ইচ্ছে থাকলেও আমরা আসতে পারব না৷

সমর বটব্যালের মৃত্যু একটি হত্যাকাণ্ড৷ রামহরি বলে৷ লিখতে পারবেন?

হিমবন্ত জিজ্ঞেস করে, উনি কোন জেলার মানুষ ছিলেন?

উনি কর্ণফুলি নদীর মানুষ ছিলেন৷ এখানে যারা আছে, তারা ভৈরব, বুড়িগঙ্গা, পদ্মা, শীতলক্ষ্যা, আড়িয়াল খাঁ, নবসুন্দা, ব্রহ্মপুত্রের মানুষ৷ এদের রক্তপ্রবাহে নদীর ধারা বয়৷ জেলা বা গ্রাম স্বীকার না-ও করতে পারে, নদী অস্বীকার যায় না৷

হিমবন্ত বোঝে, এই বলা থেকে স্টোরি দাঁড় করানো যাবে না৷ নিউজ মেটেরিয়াল কম৷ চাই কোন জেলা, বিষয়সম্পত্তি, কেন আসা, দেশের স্মৃতি, পথে বিপদ, সরকারি সহায়তা, ত্রাণব্যবস্থা, মৃতের সংখ্যা৷ নদীর নাম দিয়ে কী হবে!

সুধীন ক্যামেরা বের করে ছবি তুলছে৷ নানা কোণ থেকে৷ দারুণ ছবি পাওয়া যাচ্ছে মাঝে মাঝেই৷ তাঁবুর ভাঁজে ভাঁজে বিপন্ন মানুষদের চলাফেরা বেশ সিনেমাটিক৷ মানুষের দুর্দশার ডিটেলে যে বিষাদ থাকে তা কখনও কখনও আপনা হতেই লিরিকাল হয়ে ওঠে৷

মেঘনার নাম শুনেছেন? নোয়াখালি? গুলি আগুন রামদা চাপাতি৷ গণহত্যা৷ গান্ধী গেছিলেন৷ ছিলেন তিনমাস৷ হিংসা বন্ধে গ্রামে গ্রামে ঘুরলেন৷ প্রার্থনা করলেন৷ ভাষণ দিলেন৷ গান শুনলেন৷ যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে৷ মেঘনায় ভেসে নোয়াখালি ছাড়লেন৷ তখনও হিংসা জ্বলতাছে, জ্বালাইতাছে৷ তাঁরে চইলা আসতে বাইধ্য করছিল কতিপয় বুদ্ধিমান নেতা৷ নোয়াখালির হিংসার খবর নাকি বানাইন্যা! রাষ্ট্রনেতা সংবাদপত্ররে ধমকাইয়া কইছিল, অল বোগাস৷ গ্রসলি একজাজারেটেড৷ কোনো প্রমাণ নাই৷ এ কনস্পিরেসি টু ইনফ্লেম দা কান্ট্রি৷ ধমকে সব চুপ৷ ইতিহাসও৷ মেঘনার জল সব জানে৷ রামহরি বলে, এইবার আমার উঠতে হবে৷ রিফুজি-মড়া পোড়ানোর জ্বালা কম না৷ রাষ্ট্রনেতারা বকা দেয়৷ বলে, বেওয়ারিশ লাশের আবার দেশ কি? কইত্থেইকা না কইত্থেইকা পাগল ছাগলে আইয়া মরব৷ তাগোরে রিফিউজি কইতে হইব? দূরে ফালাইয়া দাও৷ ধাঙড়ে পুড়াইয়া দিব৷

হিমবন্ত সুধীনকে বলে, ছবি তো হল৷ স্টোরি খুঁজতে হবে৷

রামহরি, আমি তো আইতে চাই নাই৷ খারাপ আছিলাম কি? আমরা আইতে চাই নাই৷ তুমি আমাগো ধইরা আনলা? মরণের মুখে ঠেইলা দিলা৷ প্রশ্ন করেন এক বর্ষীয়সী৷

একটু তফাতে দাঁড়িয়ে নোট করে হিমবন্ত৷

রামহরি জবাব দেয়, মনে হয় তুমিই ঠিক ছিলা, অন্নদা৷ আমি মূর্তিমান ভুল৷ ভুলের লর্দার৷

দেশে থাকলে সমর কি এইভাবে মরত? খাওন নাই, শান্তি নাই, স্বজন নাই, শরীর খারাপে ওষুধ নাই৷ বাঁচে কেমনে? সমর নিজের মাটিতে মরতে পারত৷ সেইটা হইত তার অমরত্ব৷ অখন আমাগো দেশ নাই, পিতৃমাতৃপরিচয় নাই, আত্মীয়স্বজন নাই, উত্তরপুরুষ নাই৷ তুমি আমাগো এইভাবে বেওয়ারিশ করলা, রামহরি?

অন্নদা তাঁবুর খুঁটি ধরে দাঁড়ান৷ বলেন, নারায়ণীর কথা মনে পড়ে৷ সে কইছিল…

দূর থেকে ভেসে আসে: আঁরে বাড়িঘর কারে দিতাম/আঁরে ক্যানে ভূতে পাইয়ে হিন্দুস্থান যাইতাম/ অ্যাডে আছে দুয়া ধেওন গাই/উগ্যার দুধে খরচ চলে/আর উগ্যার দুধ খাই/লোকের কথা শুনি হিন্দুস্থান যাই/হ্যাডে গেলে কী খাইতাম/অ্যাডে আছে খ্যাতে তরকারি/ফইর ভইরা মাছ আছে/ভাই, সুখে খাইত পারি/আটা রুটি জাউ খেচরি/কীল্যাই জান হারাইতাম/যারা হিন্দুস্থান গিইছে/আলোনদোলনে জায়গা হারাইয়ে/লোকের কথা ভাব না বুঝি/কীল্যাই দুঃখের বারমাইস্যা গাইতাম৷

***

নিত্যহরি, কোথায় আছো? লোহাপুলের ওপর দাঁড়িয়ে গৌরহরি ডাকে৷ কতদিন কথা নাই৷ কথা জমলে কষ্ট হয়৷

জবাব আসে, কে, গৌর? তোমার গলা বছর পর শুনতেছি৷ খাড়াও, আসি৷ দাঁত মাজা হল৷ মুখ ধুতেছি৷

বেশ আছো, ভাই৷ দাঁত মাজতেই দিন কাবার৷ দেশের কথা, সমাজের কথা চিন্তা করার সময় নাই৷

মুখ মুছতে মুছতে নিত্যহরি আসে৷ বলে, তোমার সাধ্য কি যে তুমি চিন্তা করো৷ মনে করো সে, চিন্তা করেন যিনি, তিনি চিন্তামণি৷ আমার ভাবের নাটক করি, আর কাল ফুরানোর দিন গুনি৷

আমরা চিন্তা করতে পারি না, এটা মন কীভাবে মানে?

এই না-মানাটাও তেনার ইচ্ছা৷ আমরা যাদের চিন্তাশীল, চিন্তাবিদ, চিন্তানায়ক বলি, জানো তারা টিভি-র ছবির মতো, তেনার চিন্তার ছায়া৷ তা বলো ডাকলে কেন?

কেন জানি ডাকলাম৷ খাড়াও, একটু গুছোয়ে নিই৷ হ্যাঁ৷ অনুমান করি, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ ইত্যাদি সম্পর্কে তোমার বিবেচনা শুনতে বাসনা হল৷

হো হো হাসে নিত্যহরি৷ আমি বিবেচনা করি এমন সাধ্য কী? কথাটা হতেছে, বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর৷ মনে করো সে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের স্কোরশিটটা কৃষ্ণের হাতে আগেই লিখা ছিল৷ অর্জুন বিশ্বাস করতে চায় নাই৷ শেষে বিশ্বাস গেল৷ যুদ্ধ হয়৷ ভাইয়ে-ভাইয়ে, বাপে-পুতে, গুরু-শিষ্যে৷ তারে বলি, দাঙ্গা৷ তিনি চান বলেই হয়৷ মনে করো সে, দেবতারা অস্ত্র সাপ্লাই করেন যখন, তারা মুচকি হাসেন৷ কারণ হার-জিত তো তারা আগেই লিখে রেখেছেন৷ মারি-মন্বন্তর বিষয়ে পূর্বে বলেছি৷ সব কর্মফল৷ দেশভাগটাও পরমেশ্বরের ইচ্ছা৷ গৌর, বিজ্ঞানের চোখে দেখ, উত্তর নিশ্চয় পাবে৷

গৌরহরি বলে, আমার মন অন্য কথা কয়৷ অনুমান করি, একটা অশুভশক্তি দেশের উপর ভর করেছে৷ তাই এত রক্ত, এত মৃত্যু৷

যাই বলো গৌর, পাড়ায় পাড়ায় পূজার বহর বাড়তেছে৷ থানে থানে ভক্তরা ছুটতেছে৷ নতুন নতুন দেবতার জন্ম হতেছে৷ মনে করো সে, এটা কী প্রমাণ করে? পূজা আর পার্টি আর ভোটবাক্স একাকার হতেছে, এটা কী প্রমাণ করে?

প্রমাণ করে যে আমরা অশুভশক্তিকে শান্ত করতে, তার কোপ থেকে মুক্ত হতে থানে থানে ছুটি, আঙুলে আঙুলে রত্ন ধারণ করি, কোটি টাকার মণ্ডপ বানাই৷ নিত্যহরি, অনুমান করি, আমরা চিন্তাশীল৷

ও গৌরহরি, তোমার সঙ্গে আমার বিবেচনার তফাৎ এক চুল৷ তুমি ভাবো ঈশ্বর, আমি ভাবি অশুভশক্তি৷ আসলে দুটাই অলৌকিক৷ দুটাই বিজ্ঞান৷ এই অলৌকিকের উপাসনা যুগ যুগ ধরে চলতেছে৷ নতুন সমাজে, শিক্ষিত সমাজে উপাসনা প্রতি ঘরে মন্দির হয়ি উঠিছে৷ সবাই শান্তি চায়, আনন্দে বাঁচতে চায়৷

নিত্য, মামুদালিহাটার নিবারণ অধিকারী কি অশুভশক্তি হল?

তুমি বড়ো বাজে কথা কও৷ এ-বিষয়ে আমার বিবেচনা আগেই বলেছি৷ নিবারণ আছে৷ আনন্দদ্ধেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে৷ আনন্দেন জাতানি জীবাঃ৷ ভূতসকল এবং জীবসকল একত্র আনন্দে বাঁচে৷

তবে কি নিবারণ অলৌকিক হল?

আমি তারে কয়দিন আগে কুন্তীর পাড়ে দেখিছি৷ ডাকলাম৷ মনে করো সে, শুনতে পায় নাই৷ পাড় ধরে নিজের খেয়ালে চলি গেল৷

গৌরহরি বলে, সেই স্থানেই তো বিপদ৷ আমিও শুনেছি, তাকে নদীর পাড়ে সময়ে অসময়ে দেখা যাচ্ছে৷ মনে করো নিত্যহরি, এই নদীতে কুঠিরঘাটে পঞ্চাশ কি একশো ছেলেপুলাকে ভাসান দিয়েছিল গুন্ডাপ্রকৃতির লোকজন৷ এপাড়া সেপাড়া খুঁজে প্রথমে তাদের খুন করা হয়৷ তারপর বডিগুলা ঠেলাগাড়িতে তুলে ঘাটে আনা হয়৷ বিবেকানন্দ ইস্কুলের অঙ্কের মাস্টারকে হুকুম দেওয়া হয়, হিসাব রাখো৷ বেচারা ভয়ে ভিরমি৷ তারে সুদ্ধা সব বডি জলে ফেলা হয়েছিল বাজনা বাজিয়ে৷ মনে পড়ে? শ্রাবণের নদী৷ ভেসে গেল বডি৷ কিন্তু তাদের আত্মা? মৃত্যুহীন আত্মারা বিচার চায়৷ আজও চিৎকার করে ওঠে৷ কুঠিরঘাটে কেউ যায় না৷ অনুমান করি, সেইখানে নিবারণ যদি যায়, আর কোনো আত্মার সঙ্গে ছোঁয়াছানি হয়, ভাবো নিত্যহরি, নিবারণের মাথা আগুনের পাতিল হবে কি না? কতকাল তারা বিচার পায় নাই৷ অন্যায়ের বিচার পায় নাই৷ সরকার যে বলে, ফাইল ভেসে গেছে কুন্তীর জলে, তার কি বিশ্বাস আছে? নিত্য, এই হত্যাকাণ্ড নিশ্চয় ঈশ্বরের ইচ্ছা নয়, কী বলো?

দাঁত মাজিবার সময় হল, গৌর৷

***



কুন্তীনদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে লাশ
সংখ্যাহীন যুবকের, তখন শ্রাবণ মাস
মানুষের মুক্তি চেয়ে যারা ছুঁয়েছিল গ্রাম
আকাশ-গর্জনে বলেছিল, কৃষিবিপ্লব লাল সেলাম
রাষ্ট্র জেল লকআপ ও আরও যত হাতিয়ারে
উজাড় করেছে তাদের ব্রিটিশ উত্তরাধিকারে
যারা বলেছিল, আমরা ক্ষমতায় এলে বিচার হবে
ভুলে গেছে তারা অ্যামনেশিয়ার কপট উপদ্রবে

***

দূর থেকে আবছা স্লোগান ভেসে আসে৷ কাছে এলে স্পষ্ট হয়: নকশালবাড়ি লাল সেলাম/কৃষিবিপ্লব জিন্দাবাদ/আধা-সামন্ততান্ত্রিক আধা-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থা খতম করো/বন্দুকের নলই রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস/গেরিলা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করো/সত্তর দশককে মুক্তির দশকে পরিণত করুন/বিপ্লবীদের হত্যা করে বিপ্লবের গতি রোধ করা যায় না/শহিদের মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারী…

মিছিল চলে যায়৷ নিবারণ আসে৷ যেন সে মিছিলেরই লোক৷ বলে, এই যুবকেরা আমার চেনা, অনেকদিনের চেনা৷ এদের সঙ্গে হাঁটি৷ আমার ভালো লাগে৷

এক যুবক নিবারণের কাছে আসে৷ সে আবৃত্তি করে; এক একটা মানুষের ত্যাগের শোণিতে/জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার পবিত্র মানুষ/এক একটা গ্রামের বুকের ভিতর/জন্ম নিচ্ছে পৃথিবীর লোক/এক একটা গ্রাম নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে সম্পূর্ণ আনন্দে/নিজেদের অন্যায় ও পাপ ঢেলে দিচ্ছে ত্যাগের আগুনে,/কে থাকছে, না থাকছে ভাবছে না কেউ৷/মানুষ ভাবছে, ‘আমি থাকি বা না থাকি—/থেকে যাবে মানুষের জয়৷’/এক একটা গ্রাম উঠে দাঁড়াচ্ছে,/অস্ত্র নিচ্ছে তুলে…

যুবক চলে যায়৷ এক বর্ষীয়সী আসেন তাঁর ছেলের খোঁজে৷ জিজ্ঞাসা করেন, খোকা এসেছিল? কপালের ওপর কোঁকড়া চুলের গোছা৷ আমার ছেলে সে৷

এসেছিল৷ বলে গেল, আমি থাকি বা না থাকি, থেকে যাবে মানুষের জয়৷ ওইদিকে হেঁটে গেল৷ মিছিলের দিকে৷

আমার হাতে ‘জয়া ও সুরার কথা’ বইটা তুলে দিয়ে সে বলল, মা, বইটা পড়ো৷ দ্যাখো, তোমার মতো এক মা কীভাবে তাঁর ছেলেমেয়েকে দেশের কাজে পাঠিয়ে দিয়েছেন৷ আমি বইটা নিলাম৷ পড়ার পর ভয়ে আমার বুক কাঁপতে থাকল৷ তবে কি ‘জয়া সুরার মা’র মতো আমাকেও তাকে হারিয়ে দিনগুলো পার করতে হবে? সেই ছোট্টবেলা থেকে তার কত চেহারা মনের মধ্যে ভেসে আসছে৷ কত হাসি-মাখা মুখ, কত কান্না-ভেজা ছবি, বকুনি খাবার পর রাগ-রাগ মুখ৷ আর সেই শেষবার আমি যখন তাকে দেখি: কাঁধে ঝোলা নিয়ে, পরনে ধুতি, গেরুয়া পাঞ্জাবি গায়ে, কপালের ওপর কোঁকড়া চুলের একটা গোছা৷ সে চলেছে সামনের দিকে, একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না৷ কিন্তু আমি মন দিয়ে বুঝতে পারছি— এই মাকে ছেড়ে যেতে তার কষ্ট হচ্ছে৷ কিন্তু সে কষ্টের চেয়েও তার কাছে মানুষের মুক্তির ডাক অনেক বড়ো৷ এই মরণপণ লড়াইয়ে সে একজন বিপ্লবী যোদ্ধা, আদর্শ তার কাছে সবচেয়ে প্রধান লক্ষ্য৷

নিবারণ জিজ্ঞেস করে, আপনি কি অন্নদা?

সামান্য হেসে সেই বর্ষীয়সী নিবারণের মুখে চোখ রেখে চলে গেলেন৷

প্রায় সঙ্গে সঙ্গে, নিবারণ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার চারপাশের তল্লাট জুড়ে বিশ-পঁচিশটা জোরালো টর্চ লাফায়৷ শোনা যায় ছোটাছুটির শব্দ, হাঁপানোর শব্দ, বুটের শব্দ৷ বোমা ফাটে৷ কেউ চিৎকার করে, শুট টু কিল, হারামজাদোঁকো মার ডালো৷ গুলির শব্দ৷ কে যেন হেঁকে বলে, লং লিভ টেগার্ট অফ জালিয়ানওলাবাগ৷ কুত্তার বাচ্চাদের খতম করো৷ পা বেঁধে ঝুলিয়ে পেটাও৷ পেছনে রড ঢুকিয়ে দাও৷ পাগলা ঘন্টি বাজে৷ পরপর গুলির শব্দ৷ পরপর আর্তনাদ৷ নৈঃশব্দ্য নামে৷ ভেসে আসে ক্ষীণকণ্ঠে, নকশালবড়ি জিন্দাবাদ৷

নিবারণ উবু হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েছিল৷ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়৷ চারদিক দেখে৷ বলে, আপনারা চোখ খোলা রাখুন, কান পেতে থাকুন৷ তিমিরের শরীর ওরা পিটিয়ে মাংসপিণ্ড করেছে৷ কিন্তু বিশ্বাসকে হত্যা করতে পারেনি৷ শেষ সাধ্যে তিমির বলে চলেছে, নকশালবাড়ি লাল সেলাম৷

কেউ কি কিছু বলে? পাঁচ দশক পার হয়ে ভেসে আসে কার কণ্ঠস্বর?

যে সমাজে পেটের জন্য মা-বোনদের নারীত্ব বিকোতে হয়, বেকারির জ্বালা. আত্মহত্যা করতে হয়, সস্তায় যুবকদের নেশা-ভাং করিয়ে, নোংরা ফিল্ম দেখিয়ে, নানারকম জুয়া রেস খেলায় অভ্যস্ত করিয়ে অধঃপাতে নিয়ে যাওয়া হয়, বর্তমানের এই সমাজব্যবস্থা ভেঙে আমরা চেয়েছিলাম এক নতুন সুখী সমাজ গড়তে, শ্রমিক-কৃষকরাজ প্রতিষ্ঠা করতে৷ এটা সহজ সরল কাজ নয়, অনেক বাধা বিপত্তি আসবে৷ কত ছেলের ফাঁসি, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের হুকুম হয়েছে, এমনকি মহিলার ফাঁসির হুকুমও বাদ যায়নি৷ কত শহিদের রক্ত ঝরেছে, কত মা বোন স্ত্রীর চোখের জল পড়েছে, তবুও আমাদের এগিয়ে যেতে হবে অতীতের সমস্ত ভুল ভ্রান্তি শুধরে নিয়ে৷ মা, তুমি জানো আমাদের ওপর কত অত্যাচারের ঝড় বয়ে গেছে৷ জেলে জেলে পিটিয়ে মেরেছে, পুলিশ লকআপে গুমখুন করেছে৷ মেয়েদেরও শয়তানরা বাদ দেয়নি৷…

নিরবধি তল্লাট জুড়ে নিবারণ একা৷ মাঝে মাঝে ভেসে আসে বোমার শব্দ, গুলির শব্দ, আর্ত চিৎকার৷

রাজপুরুষের মতো একজন গটগটিয়ে হাঁটে৷ বলে, গ্রসলি একজাজারেটেড৷ দুই-চারিটা স্ট্রে অ্যান্ড ইনসিগনিফিকান্ট ইনসিডেন্ট লইয়া হামাদের গরমেন্টকে ম্যালাইন করা হইতেছে৷ আ কনস্পিরেসি এগেনস্ট দা স্টেট৷

নেতা গোছের একজন দুলে দুলে হাঁটে৷ বলে, যাদের শহিদ বলা হচ্ছে, আসলে তারা ঘাতক৷ হিংসার রাজনীতি করত৷ মানুষকে মিসলিড করার চেষ্টা হচ্ছে৷ আমরা প্রতিরোধ করব৷

একজন পোস্টার হাতে হাঁটে৷ গণহত্যার বিচার চাই৷

নিবারণ চিৎকার করে বলে, কুন্তীর জলে লাশ ভেসেছে সংখ্যাহীন৷ সরকারি ফাইলগুলো কি নিজে নিজে ভেসে গেল, পাঁচুদা?

***

৪.

এই ছেলে তুই বাংলা স্কুলে, কেউ নেই রে তোর দুকূলে
অবাঞ্ছিত বাচ্চা রে তুই ভাসিয়ে দিল কুন্তীজলে
ঝাঁটা-লাথির কপাললিপি, ভাসতে থাক এ শৈশবে
জীবনটা তো বাকিই আছে নরককলরবে
জুটতে পারে ঢিপকপালে মান্য ব্যবহার
যদি হতে পারিস ইম্পর্টান্ট পার্টি-ক্যাডার৷

***

গৌর, শুনতে পাই, দেশের শিক্ষা ও পরিবেশ সম্পর্কে আলোড়ন হতেছে৷ তোমার কাছে খবর আছে?

খবর কী বলো, নিত্য, পালাবাজান হয়ে গেছে৷ গত একমাস নিত্যদিন মাইক চলছে পালা করে৷ মাইকে চিপ লাগায়, আর চিপ গাঁক গাঁক করে এককথা বাজায় একরকম দিবারাত্র৷ ফাঁকা টোটো এখন বিশেষ পাবে না৷ কপালে আর পাছায় চোং লাগিয়ে সব ঘুরছে৷ অনুমান করি, শ্রীমন্তপুরে গাছ পুকুর আর থাকবে না৷ আগে লুকাচুপা কাটা হত৷ এইবার খোলাখুলি নির্বংশ হবে৷ আগে লুকাচুপা জলা ভরাট হত৷ এইবার পুলিশ পাহারা বসিয়ে, ডিজে বাজিয়ে হবে৷

বলো কী গৌরহরি? গাছ হতিছে আদিপ্রাণ৷ পৃথিবীর আলো কে দেখল প্রথম? জল মাটি বাতাসের ভরে আকাশের দিকে প্রথম হাত বাড়াল কে? সব পূজায় গাছ বা গাছের পাতা লাগে কেন? আমাদের প্রাণের জন্ম গাছে৷ প্রাণের ধারণও গাছে৷ কী বলো, তুমি? মনে করো সে, সব পূজায় বিল্বপত্র লাগে৷ আম্রপল্লবও লাগে৷ এইবার কোথায় পাবে তুমি তারে?

প্লাস্টিকের বিল্বপত্র আছে৷

রসিকতা করতিছ?

কেন? ঈশ্বরের ইচ্ছা হলে আমাদের ঘরে ঘরে প্লাস্টিকের পোলাপান হবে৷ প্লাস্টিক বেবি৷ ক্রমে প্লাস্টিকের বউ৷ বিজ্ঞান কি সেদিকে চলছে না?

তুমি ঈশ্বর নিয়া ঠাট্টা করতিছ! এইটা ঠিক না৷ ইহাতে মনের শৃঙ্খলা বিচলিত হয়৷ শয়তানের বাসা হয় মন৷

শোনো নিত্য, ঠাট্টা আমি করি না৷ আমার মনে শয়তানের বাসা নাই৷ তোমার ঈশ্বর যদি মানুষের মনে হননচিন্তা প্রবিষ্ট করায়, তবে মানুষকে দোষ দেয়া যায় না৷ অনুমান করি, এটা অশুভশক্তির প্রভাব৷ যাকে আমরা মানুষ দেখি, সে আসলে ভূতে-লাগা ছায়া৷ তুমি বোধহয়, মন দিয়ে মাইক শোনো নাই৷ মাইক বলেছে, দাদ হাজা চুলকানি/আমার দাওয়াই ঝলকানি৷ ঝলকানি মানে, উন্নয়ন৷ হর ঘর ঝলমল করবে৷ মাইক বলেছে, বেশি গাছপালা মানে জঙ্গল৷ মানে উন্নয়ন হয় নাই৷ মানুষ কি জঙ্গলে থাকবে? জঙ্গল মানুষকে জানবর বানাবে৷ সভ্যতায় মানুষের দাম বেশি, গাছ জঞ্জাল৷ মানুষের জমি চাই৷ উন্নয়নের জমি চাই৷ উন্নয়ন বাতাসে হবে কি? মাইক বলেছে, ছ্যানা-ম্যানা-ট্যানাদের হাতে দুটো দানাদার ধরিয়ে দিলে এক মাসে গাছ পুকুর সব সাফ৷ মাইল মাইল সমান ডাঙা৷ উন্নয়নের রথ সাঁ সাঁ ছুটবে৷ যেভাবে নিউ ইয়র্ক হয়, নিউ টাউন হয়৷ মাইক বলেছে, আমি গনতনরো ভালোবাসি৷ তাই ছ্যানা-ম্যানাদের কাজের ভার না দিয়ে জনগণের সঙ্গে কথা বলি৷ দাদ হাজা চুলকানি/আমার দাওয়াই ঝলকানি৷ ঝলকানি মানে উন্নয়ন৷ বোল তু নে কেয়া দিয়া/হরিবল আচারিয়া৷

গৌরহরি, কী সাংঘাতিক পালাবাজান শুনালে! মনে করো সে, গাছ মাঠ পুকুর জলা ফল শস্য মৎস্য সব সাফ! আমাদের কী বলার আছে?

কাকে বলবে? গনতনরোকে? সে তোমার ঘাড়ে চাপবে৷ অনুমান করি, পূজা দিলে যদি অশুভশক্তির কোপ ঠান্ডা হয়৷ চলো, একদিন বাবার থানে যাই৷

ভালো বলিছ৷ বাবা আর তেনার সাঙ্গপাঙ্গরা শান্ত হলি শিক্ষা ও পরিবেশের আলোড়ন বন্ধ হতি পারে৷ গৌর, ইস্কুলের কথা কিছু বলতিছে?

বলেছে৷ অনেক বলেছে৷ আমার মাথায় যা ঢুকেছে তাতে কেমন অবশ অবশ লাগে৷

***

বিপ্লবী হেমচন্দ্র বিদ্যামন্দির৷

স্কুলের মাঠে সভা৷ প্লাস্টিকের ফুল লতা পাতা পাখি ও করজোড় নারীমূর্তি দিয়ে সাজানো অনুষ্ঠানবাড়ি দিবসে মনের হরষে জ্বালানো বাতিতে মারকাটারি ঝলকাই৷ পাশে ইস্কুলবাড়ির পোড়ো দালান৷ বিশাল ব্যানারে লেখা: ‘পরিবেশ ও শিক্ষা বিষয়ক বুদ্ধিজীবী সম্মেলন৷ এক ও অদ্বিতীয় বক্তা বিশিষ্ট জ্ঞানী চিন্তাসাগর হরিবল্ আচারিয়া৷’ চেয়ারে ছাড়া-ছাড়া লোকজন আছে৷ তবে স্কুলের ঐতিহ্য অনুসারে তেমন নয়৷

শ্রীমন্তপুরের চার-পাঁচটি স্কুল অগ্রণী মেধাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হত, একদা৷ পরীক্ষায় ভালো ফল করা শুধু নয়, অন্যান্য প্রতিযোগিতা, যেমন অভিনয়, আবৃত্তি, গান, কবিতা ও গল্প লেখা, বিতর্ক ও বক্তৃতা ইত্যাদিতে অংশ নিয়ে এইসব স্কুলের ছেলেরা মেয়েরা বাংলা ও বাঙালির এগিয়ে যাবার স্বপ্ন ধরে রেখেছে, একদা৷ গত আড়াই-তিন দশকের ছবিটা অবশ্য অন্যকরম৷ উজ্জ্বলতা ক্রমে বিবর্ণ হতে হতে আবছা মলিন৷ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উন্নতি হয়েছে বিস্তর৷ মোটা বেতন, হাইফাই বাড়ি, গাড়ি, বাড়ির দরজায় নগদে পড়তে-আসা ছাত্র-ছাত্রীদের চটি-জুতোর ভিড়, বিদেশি কুকুরের ভয়-ধরানো ডাক, উর্দিপরা সিকিউরিটি এইসব হয়েছে চাক্ষুষ প্রমাণে৷ টাকার খবর ব্যাঙ্ক জানে৷ অন্যদিকে, স্কুলের জানালা কাৎ, কাঠের দরজায় তাপ্পি, দেওয়ালে ইটের দাঁত, ভাঙা পাঁচিল, বর্ষায় ক্লাসঘরে জল পড়ে, ছাদে রেলিং ভাঙা, টয়লেটের অবস্থা সঙ্গীন৷ বিপ্লবী হেমচন্দ্র বিদ্যামন্দিরেরও একই হাল৷

মাইকে শোনা গেল, শিমন্তপুরে আজ ফাটাফাটি আইটেম৷ শিক্ষা আর পরবিশের ডেভলাপ নিয়ে লেকচার দিবেন হরিবল্ আচারিয়া৷ আপনাদের ভাগ্যপরীক্ষা ভালো যে এত বড়ো বিখ্যাত সবার প্রিয় আমার প্রিয় মাননীয় হরিবল আচারিয়া আপনাদের কাছে আসছেন৷ দলে দলে আসেন৷ বাড়ির লোক নিয়া আসেন৷ সকাল দশটায় মিটিন শুরু৷ মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা আছে৷ মাস্টারমশাইরা আসেন৷ মিড-ডে মিলে আজ ডবল ডিম৷

মাইকে শোনা গেল, তোকে মাইক ধরতে কে বলল? স্কুলে গেছিস একদিনও? ভাগ, শালা৷ পাঁচিল পাহারা দে গে যা৷

মাইকে শোনা গেল, তুই কোন ইস্কুলে পড়লি কবে? চাইল্ডে ছিলি যখন, নাটামুদির দোকানে রোজ খাটতিস৷ আমি জানি৷ আমাকে শিক্ষা দেখাস না৷ সব জানি৷

মাইকে শোনা গেল, ভাগবি এখান থেকে? নাকি থাবড়া খাবি? ছ্যানা, তোর ভাগের মালটাকে এখান থেকে সরা৷ স্যার চলে এলে কেস বিলা হবে৷

একটা ডাক শোনা গেল, ট্যানা, এদিকে আয়৷ স্যারের গাড়ি আসছে৷ মাল নামাতে হবে৷

মাইকে শোনা গেল, মাননীয় হরিবল্ স্যারের গাড়ি সভার পথে৷ সভায় উপস্থিত সকলজনকে বলছি, সবাই উঠে দাঁড়িয়ে স্যারকে স্যালুট দেবেন৷ হাততালিও দেবেন৷ মাস্টাররা সভায় কম৷ তাদের হাজির থাকা খুব দরকার৷ হরিবল আচারিয়া শিক্ষা নিয়ে বলবেন৷ আর শিক্ষকরা থাকবেন না, এটা হতে পারে না৷ কারণ, আমরা মাস্টারদের মোটা বেতন করেছি৷ লাখ লাখ টাকা৷ কাজ করতে হয় না৷ ছাত্র নেই, ক্লাস নেই৷ ফোকটে বেতন নিয়ে যাবেন?

একটা গাড়ি স্কুলের বাইরের গেটে দাঁড়াল৷ দরজা খুলল৷ ভেসে এল গান: তু নে মারি এন্ট্রি/দিল মে বাজে ঘন্টি৷ একজন বেরিয়ে এল৷ সভার দিকে গেল৷

মাইকে শোনা গেল, একটা মাস্টার এল৷ ম্যানা, মাস্টারকে সামনে বসা৷ কেটে পরতে পারে৷ হরিবল্ সাহেব সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলি৷ ইতিহাসে লেখা আছে যে, তৎকালে অজানা ভাইরাসে বহু লোকের প্রাণাধিক হয়৷ মানে মারা যায়৷ সো, পাড়ার ঘরে ঘরে অলিতে গলিতে আওয়াজ হয় ‘হরিবোল’৷ দিনরাত৷ হরিবল্ সাহেবের দিদিমা গ্যান্ডঅ্যান্ডসন, মানে নাতির নাম রাখেন হরিবোল৷ বাবা আসল সাহেব৷ নাম আর্চার৷ মাননীয় তিনি ‘হরিবোল’ বলতে পারতেন না৷ বলতেন ‘হরিবল্’৷ সেই থেকে হরিবল আচারিয়া৷ আচারিয়া হল নেশনল লেঙ্গুয়েজ, মানে জাতীয় ভাষা৷ আর্চার সাহেব পরে রথযাত্রার পার্টিতে ঢুকে ‘হরিবোল’ শিখেছেন৷ বাট, ততদিনে যা হবার হয়ে গেছে৷ মাইন্ডে রাখেন, হরিবল্ সাহেব বছরের বেশি টাইম ফরেনে থাকেন৷ এভরি ইয়ার এক-একটা ইউরূপে যেতে হয়৷ সো, টাইম ভেরি শর্ট৷

একটা গাড়ি এসে স্কুলের বাইরের গেটে দাঁড়াল৷ দরজা খুলল৷ ভেসে এল গান: কজরা রে কজরা, তেরে কালে কালে নয়না৷ একজন নামল৷ সভার দিকে এগিয়ে গেল৷

মাইকে ঘোষণা, আরেকটা মাস্টার এল৷ ন্যানা, কোথায় গেলি? আজ ভেরি ওয়ার্কিং ডে৷ মাস্টারকে বসা৷ খেয়াল রাখিস৷ হরিবল্ সাহেব যতবার ফরেনে যান, ততবার ডিগ্রি পান৷ শিক্ষা আর পরিবেশ নিয়ে তার অনেক নিউজপেপার আছে৷

কে যেন শুধরে দিল, থিসিস পেপার আছে৷

মাইকে শোনা গেল, স্যরি৷ টু এর ইজ হিউম্যানিটি৷ মানুষ মাত্রেই ভুল হয়৷ অ্যাকচুয়ালি, আমরা আজ যে চিন্তাসাগরকে ফেস করছি, তাতে ফিলিং লিটল লিটল নার্ভাস৷

দূর থেকে হইচই ভেসে আসে৷

মাইকে ঘোষণা, হরিবল্ আচারিয়া ইজ কামিং৷ তিনি আসছেন৷ তার গাড়ি আসছে৷ মামুদালিহাটা থেকে গাড়ি লোহাপুলের ওপারে৷ সবাইকে বলা হচ্ছে স্যালুট দেবেন৷ হাততালি দেবেন৷ হ্যান্ডশেক৷ স্যরি, হাততালি৷ শিমন্তপুর এত বড়ো চিন্তাসাগর আগে দেখেনি৷ ন্যানা, গেট সাফা করে দে৷ উলটোপালটা লোক যেন না থাকে৷ পুরা ক্লিয়ার৷ তিনি মানুষ ভালোবাসেন, কিন্তু ভিড়কে ইনডিসিপ্লিন মনে করেন৷ ন্যানা, ফালতু পাবলিক ধারে-কাছে থাকবে না৷ গ্যানা, গানটা বাজা৷ ‘ওই যে তিনি ওই যে তিনি ওই যে পুলের পথে৷’

ডিজে বেজে ওঠে৷ ‘ইচিকদানা বিচিকদানা, দানের উপর দানা…’৷

এর পরেরটা৷ নেক্সট৷ ওল্ড ক্লাসিকসের কালেকশন৷ বেজে ওঠে ‘উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে/ওই যে তিনি ওই যে বাহির পথে’৷ গান ধীরে ধীরে আবছা হয় সমাসন্ন স্লোগানে৷ হাজার গলার রেকর্ডেড চিৎকার: ‘দাদ হাজা চুলকানি/আমার দাওয়াই ঝলকানি৷ ম্যয়নে তুঝে কেয়া দিয়া/হরিবল্ আচারিয়া৷’ গাড়ির কনভয় স্কুলের সামনেটা ঘিরে ফেলে৷ ঠকাঠক নামে কয়েক জোড়া বুট, শ্যাওলা রঙের উর্দি টুপি৷ একটা পোডিয়াম দুজন ধরাধরি করে নিয়ে যায়৷ মঞ্চে উঠতেই পোডিয়ামে চিরিক চিরিক টুনি জ্বলে৷ বিউগল বাজে৷ এবার নামে হরিবল্৷ থলক থলক ভুঁড়ি দুলিয়ে মঞ্চের দিকে হেঁটে যায়৷ উপস্থিত জনতা হাততালি দেয়৷ ট্যানা ম্যানা ছ্যানা গ্যানা ন্যানা ‘দাদ হাজা চুলকানি’ বলতে বলতে হরিবলকে অনুসরণ করে৷ তাদের পরনে চকরা-বকরা হাফপ্যান্ট, থ্রি-কোয়ার্টার, লেগইনস, অসমান ঝুলের ট্রাউজার৷ থ্রি-কোয়ার্টারের তলার দিকে ঝালর-লাগানো৷ তাদের জামা-গেঞ্জিতে রঙের মাতলামি৷ তাদের কারও মাথায় বাটিছাঁট, কারও ডাস্টবিনছাঁট, কারো খোঁপা, কেউ চকচকে নেড়া৷

চিরিক আলোর পোডিয়ামে যাবার আগে হরিবল সবাইকে নমস্কার জানায়৷ মাইক্রোফোনে ফুঁ দিতেই ঝড়ের আওয়াজ৷ হরিবল বলা শুরু করে৷

আপনাদের সঙ্গে আজ আমার পহেলা মিটিং৷ খুব ভালো লাগছে৷ যখন আসতেছিলাম, দু সাইডে সুন্দর সুন্দর সিনসিনারি দেখলম৷ সিমন্তপুর রিয়েলি বিউটিফুল৷ ইহাকে আরও বিউটিফুল বানাইতে হোবে৷ গাছপালা মিনিমাম করাইতে হোবে৷ গাছ কুছ জাদা আছে৷ দাদা হাজা চুলকানি ইয়া ইস্কিন ডিজিজ যাতে আমাদের ঘিন্না হয়, দূর হটাতে হবে৷ ঝলকানি চাই, ঘরে ঘরে ঝলকানি, দ্যাট মিনস উন্নয়ন৷ ভাবলম অনেক টাইম থাকব৷ লেকিন অন দা ওয়ে তলব আসিল আমাকে উত্তর সিমন্তপুর যেতে লাগবে৷ জরুরি কাম৷ তাই জলদি কিছু কথা বলতে চাই৷ অ্যাকচুয়ালি আমি খুব বিজি থাকি৷ থাকতে লাইক করি৷ কাজই আমার ধর্ম৷ নীরবে কাজ করি৷ এই যে স্লোগান আপনারা শুনছেন, এটা আমার বানানো৷ মাই ব্রেনচাইল্ড৷ চিন্তামন্থন৷ লেকিন আমি দেই না৷ ফলোয়াররা দেয়৷ আই লাভ সায়লেন্স৷

সভা চুপচাপ৷ পেডেস্টাল ফ্যানের হাওয়ার শব্দ৷

যে তিনটে সাবজেক্টে কথা বলার জন্য বুদ্ধিজীবী গ্যাদারিং ডাকা হল, তার একনম্বর হেমচন্দ্র ইস্কুল৷ এই ইস্কুল আপনাদের গর্বের৷ আমারও৷ আমি লেখাপড়া ভালোবাসি৷ তিন-চারটা পেপার আছে আমার৷ যাকে বলে থিসিস৷ পরিবেশ ও শিক্ষার রিলেশন নিয়ে৷ নিজে লিখি নাই৷ টাইম নাই৷ বলে দিলম৷ নেপালবাবু গদাধরবাবুরা লিখে দিল৷ আই মেড পেমেন্ট ফর দ্যাট৷ নেপালবাবু গদাধরবাবু একাডেমিতে মেম্বর হল৷ একটা ফ্যাক্ট এখানে বলতেই হোবে৷ দ্যাট ইজ হার্ড রিয়ালিটি, বাংলা ইস্কুল আর চলে না৷ পাবলিক খায় না৷ কেন খায় না? সামাজিক উন্নয়নে৷ বিজ্ঞানের উন্নয়নে৷ ধরেন, সিনেমা হলগুলো বন্ধ হচ্ছে কেন? ঘরে ঘরে টিভি৷ হাতে হাতে মোবাইল৷ সিনেমা হল থাকবে কেন? দ্যাট ইজ কল্ড, প্রগ্রেস৷ পুরানা চিন্তা বাতিল৷ ঘোড়াগাড়ি বাতিল৷ সাইকেলরিকশা বাতিল৷ ট্রামগাড়ি বাতিল৷ বাংলা ইস্কুল নতুন শিক্ষা, প্রগ্রেসিভ শিক্ষা দিতে পারে না৷ ‘সদা সত্য বলিবে’, ‘পরের দ্রব্য না বলিয়া লওয়া অপরাধ’ এসব লাইন এখন বাতিল৷ ফালতু৷ কেউ বোলে? আমরা বোলি? বাচ্চাদের বোলি? কেউ বোলি না, কেউ বিশ্বাস করি না৷ বাংলা ইস্কুল এসব শিখালে লোক আসবে কেন? দিস ইজ কল্ড, চেঞ্জ অফ ভ্যালুজ৷ উই আর ইন এ নিউ ওয়ার্ল্ড৷ নতুন যুগের মানুষ নতুন ভাষা শিখতে চায়৷

সভা চুপ৷ কাকের ডাক শোনা যায়৷ স্কুলগেটে কথা কাটাকাটি৷

হেম ইস্কুলের হাল খারাপ৷ বিল্ডিং মেরামতি লাগে৷ নতুন ঘর লাগে৷ আমি দেখি নাই, লেকিন শুনেছি, হেডস্যারের ঘরে পানি পড়ে৷ বিজ্ঞানের ঘরে ভি৷ ছাদ ফুটা৷ দু-দশটা এস্টুডেন্ট যা আছে, তারা ইস্কুলের দেয়ালে পিসাব করে৷ শুনলাম, ইস্কুলের পাঁচ টিচার দশ লাখ টাকা দিবেন৷ দে আর ভেরি জেনারাস৷ আই লাইক দিস মেন৷ এই টিচাররা চান্দা ভি তুলবেন বোলছেন৷ ভেরি গুড৷ লেকিন বাত কিছু আলাদা আছে৷ আমি ছোটো মানুষ, মাস্টারমশাইদের বোলবো, এখানে যারা আছেন সেই বুদ্ধিজীবীদের বোলবো, ইস্কুলের হাতে বড়ো ল্যান্ড আছে৷ আপনারা টাকা প্রোমোটিংয়ে লাগান৷ আমার জানাশুনা ভালো প্রোমোটার আছে৷ শুনেন, মন দিয়া শুনেন৷ অনেক বড়ো বিল্ডিং হোবে৷ অনেক ঘর৷ অনেক সিঁড়ি৷ লিফট৷ ছয়তলা-আটতলা হতে পারে৷ স্যাংশনে প্রবলেম নাই৷ আমি আছি৷ কাজ আমার ধর্ম৷ দিনে টোয়েন্টি আওয়ার্স কাজ করি৷ ছবি পুরা চেঞ্জ করিয়ে দিব৷

সভা চুপ৷ যেন কবরস্থান৷ যারা বসে আছে, তারা মৃতদেহ৷

হরিবল্ ঘড়ি দেখে৷ বলে, ফরেনের এক্সপিরিয়েন্স থেকে বলি, এইসব ইস্কুলে সেন্টুমিক্সচার ছাড়া কিছু নাই৷ সেল্ফ সাফিশিয়েন্ট না হলে ইস্কুল মরে যাবে৷ নিজের হাতে নিজের খাবার খাইতে হোবে৷ রাইলস টিউব দিয়া লং টাইম বাঁচে না৷ আমার অ্যাডভাইস, শর্টে বলি, উত্তরে যেতে হোবে, টিচাররা প্রোমোটিংয়ে ইনভেস্ট করেন৷ বিল্ডিং বানাবার টাইমে আর পরে ভি কর্মসংস্থান হোবে৷ প্রচুর জব৷ টিচাররা জব পাবেন৷ দেখাশুনার জব৷ মিস্ত্রির জব৷ জোগালির জব৷ হপ্তা পেমেন্ট৷ এস্টুডেন্টরাও পাবে৷ গার্জিয়ানরাও৷ এপাড়া ওপাড়ার লোক৷ নতুন বিল্ডিংয়ে মল হোবে, জিম হোবে, চালু ডান্স শিখাবার ইস্কুল হোবে, হোটেল হোবে, অডিটোরিয়াম হোবে৷ গানা-বাজনা, ঠাকুর-দেওতার সভা হোবে৷ ডান্স শিখলে হোটেলে চাকরি হোবে৷ বার-এও হোবে৷ বার-এ বয় লাগে৷ বাউন্সার লাগে৷ জিম করে বাউন্সার হোবে৷ আরও অনেক কিছু হোবে৷ মোটা টাকায় স্পেস ভাড়া হোবে৷ শিওর ইনকাম হোবে৷ মাস্টাররা যারা ইনভেস্ট করবে, তারা মাসে মাসে প্রফিটের ভাগ পাবে৷ ধরেন, চার-পাঁচ লাখ এভরি মান্থ৷ মাস্টারদের দেহান্ত হলে ফ্যামিলি পাবে৷ তাদের বাচ্চারা বসে খাবে৷ আপনারা শুনলেন৷ বিচার করেন৷ হাঁ, হেম ইস্কুল থাকবে৷ ছোটোমোটো ইস্কুল৷ দু-দশটা গরিব লোকালের বাচ্চা আসবে, খেলবে, মিড-ডে মিল খাবে৷ আমাদের দায়িত্ব আছে৷ গরিবমানুষ ভগবান৷ লেকিন উন্নয়ন গরিব থাকতে দিবে না৷

দুই মাস্টার, যাদের গাড়িতে হিন্দি গান বাজছিল, তারা মঞ্চে উঠতে চায়৷ ছ্যানা-ন্যানারা বাধা দেয়৷ কোনো একটা চেয়ার থেকে গলা খাঁকারি শোনা যায়৷ গ্যানা-ট্যানারা সেই চেয়ার আইডেন্টিফাই করতে চায়৷

হরিবল বলে, আপনারা যে ‘বিপ্লবী’ বলেন, তাতে আমার বিচার আলাদা৷ ‘বিপ্লবী’ ছিল ব্রিটিশ আমলে৷ বোম বাঁধত৷ ছুরি-চাক্কু চালাত৷ খুন-খারাবি করত৷ ওটা এখন আর চলে না৷ বাতিল৷ স্বাধীন সিমন্তপুর ডেভেলপড সিমন্তপুর৷ ভোটের সময় যে বোম লাগে তা আমি সাপ্লাই দিব৷ ইস্কুল লাগে না৷ আউর একটা কথা, বাংলা ইস্কুলের এস্টুডেন্টরা শুধু বাংলা ইস্কুলেই মাস্টার হতে পারে৷ উহারা আর কুনো কাম জানে না৷ মডার্ন ইস্কুলে, ইংরেজি ইস্কুলে অনেক কাম শিখাবে৷ সেলসম্যান, ডেলিভারিম্যান, গ্রসারিওয়ালা, টিভিম্যান, সিরিয়ালম্যান৷ সিকিউরিটি তো লাখ লাখ লাগে৷ আমরা ‘ইংরেজ ভারত ছোড়ো’ বলেছি, লেকিন ‘ইংরেজি ভারত ছোড়ো’ বলি নাই৷ থিংক করতে জানি বোলেই বোলি নাই৷

কোনো চেয়ার থেকে হাসি শোনা যায়৷ ছ্যানারা আইডেন্টিফাই করতে চায়৷

যে মাস্টাররা টাকা দিবেন বলেছেন, তারা কি আছেন? তারা এস্টেজে আসেন৷ এই সভায়, সকলের সামনে চেক দিতে পারেন৷ শুভ কাজ এখনই শুরু হতে পারে৷ হাতে টাইম কম৷ ফোকটের টাকাটা শুভ কাজে লাগান৷ ডোন্ট মাইন্ড৷ এস্টুডেন্ট নাই, ক্লাস নাই, মগর বেতন আছে৷ হোলো কি না ফোকটের টাকা?

হা হা হেসে ওঠেন সভার একজন৷ চাল গাপ মেরে গ্রাম কে গ্রাম উজাড় করেছে সেদিন৷ হা হা৷ দেশভাগ করে দেশ উজাড় করেছে৷ হা হা৷ মানুষের সুদিনের স্বপ্ন দেখেছিল যারা তাদের খুন করে মগজ লোপাট করেছে৷ এরা বারবার ডেকে আনে আকাল৷ আকালপিরেত৷ আকালের বাপ, আকালের বাচ্চা৷ এবার শিক্ষার আকাল ডেকে গোটা জাতটাকে চিবিয়ে খাবে৷ কী ফন্দি! হা হা৷

হাসি যখন প্রত্যাখ্যান হয়ে ওঠে, স্পর্ধা হয়ে ওঠে, প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইতিহাসকে, হাসি যখন ধিক্কারের ভাষা হয়ে ওঠে, তখন তা ভয়ানক৷

হাসিকে ভয় পায় সভা৷ ছ্যানা-ন্যানারা মঞ্চ ঘিরে দাঁড়ায়৷

হাস্যময় পুরুষকে ভালো করে দেখে কেউ বলে, নিবারণদা, তুমি? কেউ বলে, নিবারণকাকা, তুমি আছো?

স্কুলগেটে সমবেত নারীকণ্ঠ বলে, আমাদের ভাতা দাও৷ ভাতা দাও গো৷ একটু ভাতা দাও৷

ন্যানা-ছ্যানারা চিৎকার করে, লাইনে দাঁড়াও৷ লাইনে থাকো৷ অ্যাই, লাইন ভাঙবে না৷ ভাঙলে ভাতা গায়েব৷



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ