ঋতু আর মেঘ দুই বোন। দেখতে অনেকটা একরকম। তবে ঋতুর চুল কোঁকড়ানো এবং প্রচুর। মেঘের চুল লম্বা আর স্ট্রেট। দুজনের ভাব ও ঝগড়া দুটোই আছে। মা আনোয়ারা আলো মেঘের জন্মের সময় সারা আকাশে যে গভীর ঘন মেঘ জমেছিল সে কথা বলেন। বলেন -- তুই যেদিন পৃথিবীতে এলি খুব মেঘ জমেছিল আকাশে। আমরা অবশ্য বৃষ্টির আশা করছিলাম। অগাস্টের গরম চলছিল খুব।
আর আমার জন্মের সময়? ঋতু প্রশ্ন করে। মা একটু ভেবে বলেন --ঋতুময় প্রকৃতি। বসন্ত ছিল সে সময়। বাগানে রডোড্রেনডনে লাল ফুল ফুটেছিল।
এরপর মা চুপ হয়ে যান। ঋতু খুশী হয়। বসন্তকালে আমার জন্ম! খুশী খুশী গলায় ঋতু বলে।
বাবাটা কথা নাই বার্তা নাই ধুম করে মারা গেলেন। হার্ট এ্যাটাক হয়েছিল। এক এ্যটাকেই শেষ হলেন মামুন হাবিব। আটোমিক এনার্জি কমিশনের চেয়ারম্যান। ব্রেন যার দারুণ শানিত। বিজ্ঞানী এবং নানা সব পরিকল্পনা। তার একটিকে ও বাস্তাবায়িত করবার আগেই চলে গেলেন।। তারপর থেকে একা মা। ওরা তখন য়ুনিভার্সিটির পড়া শেষ করে চাকরি করছে। এক বছরের বড় ঋতু একটা ব্যাংকে। বি বি করে চাকরি শুরু করেছে, বলে এম বি পড়ে সময় নষ্ট করতে চাই না। আর মেঘ ইংরাজিতে এম এ করে য়নিভার্সিটিতেই এক বছর হলো জয়েন করেছে। লেকচারার। ঋতু থাকে রাজশাহী আর মেঘ ঢাকাতে। বাবা চলে যাওয়ার পর মায়ের বোধকরি বাঁচবার ইচ্ছা চলে গিয়েছিল। মেঘ বলে -- বাবাটা ছিল মায়ের প্রাণ ভোমরা। ওই যে সেই গ্ল্পটা প্রাণভোমরাটা লুকিয়ে ছিল না কোন এক বাক্সে না কৌটোয়! তারপর একটু থেমে বলে -- কেন এত তাড়াতাড়ি বাবাটা চলে গেলেন। ইস।
মেঘ ভালোবাসে ক্লাসিক। ঋতু রোমান্টিক। বা একটু হালকা বই। ওরা দুজনেই বাংলা ইংরাজি দুই ভাষারই বই পড়ে। ঋতু একটু গোলমত । খেতে পছন্দ ওর। তাই উঠে পড়ে লেগেছে ¯িøম হতে। মেঘ একেবারে স্লিম। ঋতু মেঘের মত সোনার বোতাম নয় পড়াশুনায়। মেঘ একেবারে ব্রাইট আজ বাটন। মা বলেন -- মেঘ বাবার মেধা পেয়েছে। ঋতু বলে -- আর আমি?
আমার। মা জবাব দেন।
তুমি তো খুব ভালো ছিলে পড়াশুনায়। বলো না তোমার। তুমি একটুর জন্য ফার্স্টক্লাশ মিস করেছিলে।
মা হাসেন। তাহলে কোন পূর্বপুরুষের মত। ওরা কেউ বিয়ে করেনি। মেঘ সহপাঠীকে ভালোবেসেছিল। সে এখন বাইরে গেছে পি এইচ ডি করতে। যদি মেঘ সুযোগ পায় যাবে। তবে পড়ানোর চাকরিটা ও বেশ উপভোগ করছে। বলে -- আমার বাইরে যাবার ইচ্ছা নাই। ঋতু বলে -- আমার ইচ্ছা আছে তবে সুযোগ নেই।
কেন ব্যাংকের কর্ম কর্তাকে ধরে বাইরে পোস্টিং নে। নীরার ভাই চলে গেল ভিয়েতনামে। তুইও যেতে পারিস তেমন কোন দেশে। ওরা দুজন দুজনকে নাম ধরে ডাকে। আর তুই তুই করে। সম্পর্কটা বোনের হলেও অনেকটা বন্ধুত্বের।
না রে মা কে ছেড়ে যাব না ঋতু বলে।-- তা ঠিক। মা এখনো যে প্রানপ্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন সেতো আমাদের জন্যই। মেঘ থাকে মায়ের কাছে আর ঋতু রাজশাহীতে। প্রায় চলে আসে। তারপর দুইজনের নানা খুনসুটি নানা ঝগড়া। ভাব আর ভালোবাসা।
মেঘ বলে -- ঋতু তুই কি করে ট্রাশগুলো পড়িস রে? ডানিয়েল স্টিল, জাকি কলিন্স যতসব! ‘মিলস এ্যান্ড বুনস’ শস্তা রোমান্স ভাবতে পারি না। বারবারা কার্টল্যান্ডও পড়তে দেখেছি। রুচি হয় তোর?
ঋতু বলে -- আমাকে ছাত্রছাত্রী ভোলাতে বা বোঝাতে ক্লাসিক পড়তে হবে না। ডিকেন্স, ইবসেন, ব্রন্টি বোনেরা, জর্জ এলিয়ট, জেন অস্টেন এর ভারী ভারী বই। বই না থান ইট। অনেক আগে সবগুলো ক্লাসিকের ছোটদের সংস্করণে কিছু পড়েছি। আর পড়বার দরকার নেই।
ছোটদের সংস্করণ পড়েছিসা এখন আসল বইটা পড়।
না আমার ওইসব ভারী বই পড়বার দরকার নেই। পঞ্চাশ পাতার ‘মবি ডিকই গুড এনাফ’। ছয়শো পাতা পড়বার ইচ্ছা নাই। টেলিভিশনে মেঘ যা দেখে ঋতু তা দেখে না। কাজেই ওদের দুজনার ঘরের টেলিভিশনে ভিন্ন প্রোগ্রাম। খেতে বসলেও দেখা যাবে মেঘ যেটা পছন্দ করে ঋতু তা নয়। ঋতু খানিকটা মাংশাসী। আর মেঘ মাছ আর সবজি। তারপরেও ওদের এইসব মিল অমিলের ভেতর আসলে গভীর বন্ধুত্ব। ঋতু অনেকসময় এক বছরের বড় বোনের দাবীতে এটা সেটা বলে। আর মেঘ কখনো তা শোনে। আবার কখনো শোনেও না। বলে -- কানের কাছ দিয়ে বড়বোন।
কানের কাছ দিয়ে? পুরো এক বছরের বড়। তারপর হাসাহাসি। বারো মাস তিনশো পয়ষট্টি দিন টাইমস ----। দুজনেই হাসতে থাকে।
তুই বিয়ে করবি না ঋতু? মেঘ প্রশ্ন করে মাঝে মাঝে।
কেন করবো না। বিয়ের বয়স কি গেছে?
প্রেমট্রেমও তো করলি না। মেঘ বলে বন্ধুর মত।
করে ফেলবো একদিন ফট করে। কত লোকজন আমার ব্যাংকে আসে। বলে ঋতু। তারপর প্রশ্ন করে -- তোর রুবায়েত কোথায় এখন?
ও চলে গেছে মিনিসোটাতে। আরো দুই বছর পর ফিরবে। আমি যাব না। চাই না বেচারি মা একা হয়ে যাক।
যেতে হলে যাবি। আমি চেষ্টা চরিত্র করে ঢাকায় বদলি হয়ে আসবো। আদুরে গলায় মেঘ বলে -- আমি মায়ের ছোট। একেবারে বেড়ালের মত কিনা। আমাকে ফেলে মা কি করে থাকে বল?
তারপর ওরা দুইজন নিজের ঘরে চলে যায়। বাড়িটা বাবার পরিকল্পনায় তৈরী। চারটে ঘর। মা বাবার একটা। ওদের দুই বোনের দুটো। আর একটা গেষ্ট রুম। বাবার পড়াশুনার জন্য একটা বক্স ঘর ছিল। এখন যা নানা হাবিজাবিতে ভর্তি। ওদের খুব ইচ্ছে আছে হাবিজাবি সারিয়ে ঘরটাকে মেঘের পড়ালেখার ঘর করবে। কোন শ্রাবনমেঘের দিনে মেঘ কবিতা বা গল্প লেখে। না হলে এমনি নানা মনের কথা। তবে সেটা এখনো হয়নি। মানে মেঘের সুমেরু পর্বতের ঘর। যেখান থেকে মেঘদূতের জন্ম। বাবা পুরো দুই হাজার স্কোয়ারফুটের আপার্টমেন্ট তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে কিনেছিলেন। এখন সেই দশতলার আপার্টমেন্ট টাকে মেঘ ভীষন ভালোবাসে। এখনো ওর বাইরে যাবার ইচ্ছা নাই। জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে রুবায়েতের সঙ্গে কথা বলে। সুন্দর সুন্দর বানী পাঠায়। গান গেয়ে কখনো শোনায়। আর রুবায়েতের কবিতা আবৃত্তি শোনে। ভালোই চলছে ওদের দূরে থাকার সময়। মেঘ বলে -- দূরে তুমি হ্রদয়ে তুমি। নো প্রবলেম।
ছুটি শেষ হয়ে গেলে মেঘ আর মাকে রেখে ঋতু চলে গেল। বললো -- ঠিকমত মা যেন ওষুধ খায় সেটা দেখিস মেঘ। মা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেললেন। -- একা একা রাজশাহীতে!
মা রাজশাহী! নর্থ পোল নয় । আর ঢাকা সাউথ মানে সাউথ পোল নয়।। আমি এখন আর ছোট নেই। আমার বয়স পঁচিশ। তবে তোমাকে মিস করি খুব। তারপরেও আমি আর হিমি একটা বাড়িতে ভালোই আছি। ও কলেজে পড়ায়। বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে ওর। আমার খুব খেয়াল করে। ঠিক একেবার আপামনির মত। ও আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসবে মা। আনবো?
কেন নয়। যে আমার মেয়ের দেখাশোনা করে সেও আমার মেয়ে।
মা আর কিছু বলেন না। মেয়ে মাকে একটু বুকে জড়িয়ে তারপর চোখ মুছতে মুছতে চলে যায়। বলে -- যদি পারি আবার ঢাকা চলে আসবো মা।
তাই ভালো ঋতু। চলে আয়। তোরা দুইবোন একসঙ্গে থাক। ঝগড়াা কর ভালোবাসাবাসি কর, একসঙ্গে।
সেটাই হবে। মেঘ রে চললাম। মেঘ ছল ছল হয়। তারপর বলে -- খুব তাড়াতাড়ি আবার আসিস।
চেষ্টা করবো। ঋতু ওর কোঁকড়ানো চুলের পুরুষ্ট দু দুটো বেনীতে একেবারে দারুণ দেখতে তখন। মেঘের চুল মায়ের মত। বাবার ও তাই। কেবল ঋতু কোঁকড়া চুল পেয়েছে। গোছা গোছা ঘন কালো এক পিঠ চুল। দেখবার মত।
এবার এলে আমি তোকে কুমড়োফুলের বড়া আর টুনা মাছের কাটলেট করে খাওয়াবো। মেঘ বলে আদুরে গলায়। আর তারপর ছোটবোনের আদর পেয়ে ছলছল চোখে হাসে।
ভালোই চলছিল সব। হঠাৎ করে ফোন এলো। -- ঋতু আমাদের মা আর নেই। মাও বাবার মত হার্টের এক ম্যাসিভ স্ট্রোকে চলে গেছেন। ডাক্তার বললেন -- এই সোট্রাকের পর বেঁচে থাকলে একটা অঙ্গ বা ব্রেনটা আর কাজ করতো না রে। ফোনের দুইপারে দুইজন কাঁদতে থাকে। তারপর কান্না থামিয়ে মেঘ বলে -- বাবার পাশেই মায়ের কবরটা দিলাম। জানি আপাতত যে কাজে এখন মলোয়েশিয়াতে তুই সেখান থেকে ফট করে আসতে পারবি না। তাই দেরী করলাম না। হিম ঘরে মায়ের একটা মৃতদেহ পড়ে থাকবে ভাবতে পারি না। মনে মনে এও ভাবে প্রাণময়ী মায়ের মৃত মুখ দেখে খুবই ভেঙ্গে পড়রার দরকার নেই ঋতু। তোর ভাবনায় জীবিত মা থাক, মৃত মা নয়। বলে ঋতু -- আমি তাহলে কাজ শেষ করে দশদিন পর আসছি। তবে এই সময় আমি তোর কাছে নেই ভাবতে ভালো লাগছে না। একা কেমন লাগছে তোর?
আবুরমা আছে। ছোটখালা এসে চলে গেছেন। রোজদিন খোঁজ করেন। এই বিল্ডিংএর চারটে পরিবার সকাল সন্ধ্যা খোঁজ নেন্। আমাকে নিয়ে ভাবিস না আপু। মাঝে মাঝে আদর করে বা ভালোবেসে ঋতুকে ও আপু ডাকে।
যখন মনটা একটু হালকা মনে হয় বাড়িতে মায়ের বাক্সপত্র ঘাটতে ঘাটতে এক তাড়া চিঠি পায়। আলমারির মাথার উপরে যে বিশেষ বাক্সটা মা কাউকে খুলতে দিতেন না চিঠিগুলো সেখানে ছিল। ওদের বিয়ের তিন বছর পর লেখা। বাবা যে তিনমাসের জন্য আফ্রিকা গিয়েছিলেন চিঠি গুলো সেই সময়ে লিখেছিলেন মনে হয়। প্রায় সব চিঠিতেই একই সন্বোধন -- আমার আনু কেমন আছো তুমি। মা নীল ফিতায় চিঠিগুলো বেঁধে রেখেছেন। একটা চিঠি খামের ভেতরেই রয়ে গেছে। কেন জানি সেই টিঠিটাকে আর চিঠিগুলোর সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেননি না। মেঘ কি ভেবে চিঠিটা খাম থেকে বের করে। পড়তেও শুরু করে ভুতাগ্রস্থের মত। পড়তে পড়তে জেগে ওঠে।
আমার আনুতুমি বার বার একটা প্রশ্ন করতে। কেন আমি তোমাকে বিয়ে করেছি। তোমার ভাব হয়েছিল শ্রেয়াস আয়ারের সঙ্গে। যেমন হয় কলেজ য়ুনিভর্সিটিতে। ভারত থেকে বাবা মায়ের সঙ্গে রাগারাগি ছেলেটা এসেছিল বাংলা দেশে। পড়াশুনাও শুরু করেছিল। কিছুদিন পরে ড্রাগে ডুবে যায়। আর একদিন হুট করে মারা গেলে তুমি জানতে পারো পাঁচমাসের সন্তানসম্ভাবনা তোমার। তুমি শুনেছো একটা ভালো পরিবারের ছেলে শ্রেয়াস। এর বেশি তেমন কিছু নয়। তবে সে নিয়ে তোমার মাথাব্যথা ছিল না। তুমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দারুণ এক সাহসী সিদ্ধান্ত। তুমি বাংলাদেশের প্রথম অবিবাহিত মা হয়ে সিংগল পেরেন্ট ফ্যামেলি হয়ে বেঁচে থাকবে। তোমার জীবন তুমি ও তোমার শিশু একা কাটাবে। ‘কাউকে আমার দরকার নেই’ এমনি কোন চিন্তা তোমার মথায়। আমি এলাম তখন। আহা বুকটায় কি এক যন্ত্রনা অনুভব করলাম তোমার জন্য আনু। কি মিষ্টি দেখতে তুমি। কি ভালো একটি মেয়ে। কি সরল তোমার সবকিছু। কেবল এম এ পাশ করেছো। তোমার সিদ্ধান্তে মা বাবা তোমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান না। আমি খুব ভালোবেসে ফেললাম তোমাকে। তোমাকে প্রথম কোথায় দেখেছিলাম মনে আছে? তারপর কোথায়? আমার কিন্তু সব মনে আছে। তুমি আমার ভালোবাসা বুঝতে পারলে। বললে -- ঠিক আছে। কাঁদতে কাঁদতে বললে তুমি মানুষ না ঈশ্বর! আমি উত্তর দিয়েছিলাম -- নেহায়েতই মানুষ। ঈশ্বর হলেতো ওই আকাশের রাজত্ব থেকে কেবল তোমাকে বরদান করতাম। বুকের ভেতর পেতে চাইতাম না। বিয়ে করে তোমাকে নিয়ে আমি চলে গেলাম সিঙ্গাপুর। কিছুদিন পর ফিরে এলে আর এক মেয়ের মা হলে তুমি। তুমিতো জানো আনু ঋতু আর মেঘ আমার কাছে সমান। আমি ওদের দুুজনকে একই ভাবে ভালোবেসেছি। ঋতু শ্রেয়াস আয়ারের নয়। ঋতুও আমার। মেঘ ও আমার। ওরা দুইজন আমার দুই চোখ।
পড়তে পড়তে রাত বাড়তে থাকে। ঝিম মেরে বসে থাকে মেঘ। ঋতুর বাবা তাহলে ওর বাবা নয়।বিজ্ঞাানী মামুন হাবিব নামের বড় হ্রদয়ের অনেক মজার বাবা! ঋতুর বাবা শ্রেয়াস আয়ার? সে কেমন করে হয়? হতেই পারে না। সে আবার মায়ের সেই কাঠের বাক্স ভালো করে খুঁজতে থাকে। বাক্সটা থাকতো বড় আলমারির মাথার উপর। কোনদিন সেটা কেউ খোলেনি। মা বলতেন -- নানাসব দরকারি কাগজপত্র আছে। ওরা ভাবতো জমি বাড়ির দলিরপত্র। খুঁজতে খুঁজতে ছোট একটা লাল মখলরের ব্যাগে টুং করে একটু শব্দ হয়। লাল ব্যাগের ভেতর রুবি আর ডায়মন্ডের একটি এনগেজমেন্ট রিং। তখনো নতুনের মত ঝক ঝক করছে। আর একটি চিরকুটে শ্রেয়াস আয়ারের বোম্বের বাড়ির ঠিকানা। ওর বাবার নাম। সুশীল আয়ারের এক মাত্র সন্তান শ্রেয়াস। যিনি একজন মালটিন্যাশনাল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। শ্রেযাসের মৃত্যুর পর মা এই পরিচয় ও ঠিকানা পেয়েছিলতাঁর এক সহপাঠীর কাছ থেকে। সহপাঠীর এক টুকরো চিরকুট ও আছে। আংটি? যেমন করে ডিসিসিন নেয় কম বয়সী ছেলে মেয়েরা -- চল আমরা এনগেজমেন্ট করি তেমন কি কোন ঘটনা? এটা কি কোন এনগেজমেন্ট রিং? হবে। কি এসে যায় তাতে? মা কেন এইসব জমিয়ে রেখেছেন? একদিন কি তিনি ঋতুকে বলতেন -- কে তার বাবা? এবার মেঘ সেজা হয়ে বসে। না। শ্রেয়াস ওর বাবা নয়। ওর বাবা বিজ্ঞানী মামুন হাবিব। ওরা দুই বোন বাবার দুই হাঁটুতে বসে বাবা কাকে বেশি ভালোবাসে সে নিয়ে ঝগড়া করছে এই দৃশ্যটা এত বেশি উজ্জ্বল এর বেশি স্পষ্ট আর কিছু ও ভাববে না। যিনি সমুদ্র হ্রদয়ে ভালোবাসার এমন একজন যাকে জানা হলে ভালোবাসার সঠিক অর্থ করতে পারে অনেকে। ঋতুর বাবা আর ওর বাবা একজন। অন্য কেউ নয়। হতেই পারে না।
সে কখন যেন সেই আংটি আর কাগজ দশতলা থেকে জানালা দিয়ে লেকের পানিতে ফেলে দেয় নিজেও বুঝতে পারে না। লেকের অথৈ পানিতে হারিয়ে যায় একটি আংটি আর একটি ঠিকানা।
তারপর? ঋতু এলে কেঁদে কেটে একটু স্বাভবিক হলে দেখায় বাবার চিঠি।
একা ঘরে। ঋতু প্রথম বারের মত বুঝতে পারে তার গভীর ঘন কোকড়ানো চুলের উত্তরাধিকার। কোথায় থেকে পেয়েছে সে। আর কিছু? না। মনে হয় না আর কিছু। তবে মা হয়তো বলবেন পিঠের লাল পদ্মটা জন্ম সূত্রে ঋতু পেয়েছিল সেটাও উত্তরাধিকার। মা কি এই কারণে এক টুকরো ঠিকানা জমিয়ে রেখেছিলেন? কে বলবে কেন? এ প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য মা নেই। জীবনের সেই বিশাল ভালোবাসার পাশে ঘুমিয়ে আছেন। এবং এই হলো মায়ের সব চাইতে পছন্দের জায়গা। সারাজীবন ধরে যা তিনি প্রতিদিন জেনেছেন।
আপু। দরজায় আঘাত করে মেঘ। ঋতু মেঝের কার্পেটে শুয়ে আছে একটা বালিশ টেনে। ওর বাবাকে মনে পড়ছে। শ্রেয়াসকে নয়।বাবাকে। কখনো বাবা চুপচাপ কাজের ফাঁকে মেঘের কান আর চোখ বাঁচিয়ে ঋতুর গালে টুক করে চুমু খেয়ে বলছেন -- তোকে বেশি ভালোবাসি ঋতু। খবারদার মেঘ যেন জানতে না পারে! মেঘ এসে পাশে বসে। তারপর বালিশ টেনে সেও শুয়ে পড়ে। একটু আদর করে আপুকে। তারপর বলে -- ঋতু কি এত ভাবছিস রে। তুই আর আমি মায়ের ওইটুকুন পেটের ভেতর নয়মাস করে ছিলাম। তুই যখন বেরিয়ে এলি আমি সেখানে ঢুকে গেলাম। বলেই হাসে। আহা। কেমন করে আমাদের জায়গা হয়েছিল অতটুকুন পেটে? আমদের দুইজনের পরিচয়ে এই কি অনেক নয়? আর কোন কিছু জানবার দরকার নেই। তুই আর আমি সহোদরা।
একটি ঠিকানা আর একটি আংটি আমি ফেলে দিয়েছি। রাগ করিস নি তো?
ঋতু কাঁদছে। বলে -- না। বাবা আমাদের বাবাকে আমার খুব মনে পড়ছে।
আমারও। মেঘ বলে। আমার সবসময় মনে হতো বাবা তোকে বেশি ভালোবাসে। খুব ঈর্ষা করতাম তোকে। মনে আছে একবার তোর চুল টেনে খুব ----। বলেই সে হাসতে হাসতে কাঁদে। ঋতুও।
দুই সহোদরা হৃদয়ের শব্দের ভেতর পাশাপাশি শুয়ে কি ভাবছে কে জানে।


0 মন্তব্যসমূহ