তৃষ্ণা বসাকের গল্প : শোক বাংলা ৭০৭



স্বপ্ন
স্বপ্ন কিভাবে বোনা হয় কে জানে। সুলগ্না বুঝতে পারে না। তার সবপ্নের রং সবসময়ই ধূসর, তার সঙ্গে গোলাপি আর হালকা নীলের পোঁচ থাকে। আর স্বপ্ন সে কোনদিন ঝলমলে দিনের দেখেনি। সবসময়ই যেন রাত বা গাঢ় সন্ধে, আর সরু সরু গলির মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসা সরু সরু মানুষ। স্বপ্নে সে কোনদিন মোটা মানুষ দেখেনি।
সুলগ্না দেখতে পাচ্ছিল সেই আয়না লাগানো টেবিল, একপাশে দেরাজ, যেটা হাঁটকে প্রায়ই বই বার করতে চেষ্টা করত সে। নাটক বা যাত্রার বই, চটি চটি, বেশিরভাগ, খুবই খেলো হয়তো, কিন্তু তাই গোগ্রাসে গিলত সুলগ্না।

সে দেখতে পাচ্ছিল জানলা দিয়ে পুকুর, পুকুর পাড়ের বাতাবিলেবু গাছটা, পুকুরে যাওয়ার সরু পথ, যেখানে একপাশে বঁড়শি ঝোলানো থাকত। এখানেও একটা বইয়ের বাতিল আলমারি ছিল। তার মধ্যে প্রচুর বই, অনেক বইয়ের ল্যাজা মুড়ো ছিল না, তবু তাতে কি এসে যেত? গরমের দুপুরে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে একটা আধ ছেঁড়া বই নিয়ে কোন একটা কোণে বসে যেত, কেউ খুঁজেই পেত না তাকে। উঠত যখন, আকাশে তারা ফুটে গেছে।

সত্য
প্রথমেই বুঝে নিতে হবে সত্য , কখনোই ঈশ্বরের মতো এক প্রকার নয়। সত্য বহু প্রকার।
যেমন আমার মতে রাহুল সর্বজ্ঞ এই সময়ের শ্রেষ্ঠ কবি ,
সুবলের মতে রাহুল একটা ট্র্যাশ,
আবার মৃদুলা বলবে রাহুলের সম্ভাবনা ছিল-
আর এর প্রত্যেকটাই সত্যি।

সত্য শুধু বহু নয়, সত্যের এক একটা স্তরে একটা একটা আলাদা সত্যি লুকিয়ে আছে।

বরফ
আমি বুঝতে পারছি না ও ফিরেছে কিনা। হয়তো পাশের ঘরে আছে, হয়তো নেই। বুকে চেপেও বুঝতে পারছি না ও ফিরেছে কিনা।

রান্নাঘরে একটা শব্দ হয়। গেছো ইঁদুর। হয়তো বাচ্চা দেবে। এসেছে। খাচ্ছে, নষ্ট করছে।
ও কি আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে?

আমার দিকে তাকালেও বুঝতে পারছি, আমার কাছে নেই। ও কি নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছে না?
আমার বইগুলোর কাছে বসি। আমার জীবনের নোঙর, স্থির, অচঞ্চল।

কেন যে বারবার নিজেকে তাক থেকে পাড়ি, কেন চলি? দরজা খুলি? কেউ কি এল? কেউ না। কেউ না।

ছুটে যাই, যদি ও ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে, গেটের সামনে। গেটে বরফ জমে আছে, দেখতে পাই। কেন আমি বরফ সরিয়ে রাখিনি? বেলচা দিয়ে বরফের চাঙড় সরিয়ে সরিয়ে ওর আসার পথ করতে পারতাম।

বরফ অন্য গোলার্ধে না, এই গোলার্ধেও জমে, জমছে। আমি বেলচা খুঁজে পাই না। কাজের সময় কিছু খুঁজেই পাই না।

কিংবা প্রখর রোদ, চামড়া ঝলসে যাচ্ছে, ও রোদ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি উঠতেই পারছি না, যেতেই পারছি না।

আমি একজনকে খুন করতে চেয়েছিলাম

আমি একজনকে মারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু গিয়ে দেখলাম সে তার আগেই মারা গেছে। খুন হয়েছে , না আত্মহত্যা নাকি স্বাভাবিক মৃত্যুই হয়তো, রোগে ভুগে তা আমি জানি না। তবে অসুখে মৃত্যু হলেও তাকে স্বাভাবিক বলা যায় না। খাবারে রোজ অল্প অল্প করে বিষ মিশিয়েও সেটা একটা অসুখের চেহারা দেওয়া যায় । আবার অল্প অল্প করে বিষ দিয়ে বড় বিষের হাত থেকে বাঁচানো যায়। যেমন করেছিলেন চাণক্য, উনি নাকি রোজ চন্দ্রগুপ্তের খাবারে একটু একটু করে বিষ মেশাতেন, যাতে কেউ তাঁকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করতে না পারে।আর রাজা একদিন কী যে ভুল করে বসলেন, সোহাগ করে নিজের পাত থেকে খাবার তুলে নিজের গর্ভিনী স্ত্রীর মুখে দিলেন। নিমেষের মধ্যে স্ত্রীর মৃত্যু ঘটল বিষক্রিয়ায়, পেট চিরে সন্তানকে বার করে আনা হল, গর্ভের সন্তানকে। এক বিন্দু বিষের দাগ লেগে থাকল কপালে। তাই তার নাম রাখা হল বিন্দুসার।
আমার মনে হয় আমরা যখনি জন্মাই, আমাদের সবার কপালে ওই বিষের টিপ লেগে থাকে।এই জীবন আসলে হত্যার শিবির। সবাই সবাইকে নানা ভাবে খুন করার চেষ্টা করছে। সবার টা ধরা পড়ে না। আমি কিন্তু সত্যিই এই লোকটাকে খুন করতে এসে হাজির হয়েছি। তার শরীরের চারপাশে কড়া বেষ্টনী। বেঁচে থাকতে এত নিরাপত্তা বলয় তার ছিল না। বলা হচ্ছে শুধু ফুল আনবেন আর সে ফুল সংগ্রহ করবে শোক বাংলা ৭০৭ নামে এক সাহায্য কর্মী।

আমি একটা বন্দুক রাখলাম, খেলনা বন্দুক। তার পাশে একটা কাগজে লিখলাম ঠা ঠা ঠা। তারপর একটা কান্নার ইমোজি দিয়ে লিখলাম মিস ইউ। লিখে বেজায় হাসি পেল। মিস ইউ মানে কি আমি যা বলতে চাচ্ছি তাই? এর মানে তো… তাই কেটে লিখলাম ফাক ফাক ফাক! আই মিসড দা চান্স টু কিল ইউ।

লিখে চলে আসছি। চারদিকে সুশৃঙ্খল লাইন। একটা লাইন মৃতদেহ অবদি যাচ্ছে, আর একটা লাইন মৃতদেহ থেকে বেরিয়ে আসছে। যত ফুল জড়ো হচ্ছে, শোক বাংলা ৭০৭ সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছে। বেরোবার মুখে দেখলাম সেই ফুলগুলো নিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে বিক্রি করছে ডাবল দামে। বিক্রি হচ্ছেও। যারা ফুল আনতে ভুলে গেছে, তারা কিনছে, কিনতেই হচ্ছে। ফাঁকা হাতে কোন মৃতদেহের কাছে যাবার শক্তি নেই তাদের।

আমি আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলাম। হঠাৎ মোড়ের মাথায় দেখলাম জায়েন্ট স্ক্রিনে মরদেহ আর তার সামনের লম্বা লাইন দেখানো হচ্ছে। লাইভ। ক্যামেরা হঠাৎ আমার সেই কাগজের টুকরোর ওপর জুম করল। যেখানে আমি লিখে এসেছি-ফাক ফাক ফাক! আই মিসড দা চান্স টু কিল ইউ।

অমনি কী একটা হুড়োমুড়ি লেগে গেল। আমি বুঝতে পারলাম এবার আমাকে খোঁজা হবে। সেটা খুব সহজ হবে না। কারণ আমি একটা হুডিতে মুখে ঢেকে ছিলাম, আর বেরিয়ে আসার সময়, হুডিটা উলটে পরে নিয়েছি। ওদিকটা নীল ছিল, এদিকটা সবুজ রঙ। আমাকে কেউ খুঁজে পাবে না। আমি তাই পাশের পাবে ঢুকে একটা ড্রিংক নিলাম। অপরাজিতা ফুলের শরবত। ঘন নীল রঙের। আমার মনে হল। এটাই এই মুহূর্তে খাওয়া যায়। কারণ মৃত্যুর রঙ নীল। আমি না মারতে পারলেও লোকটা মারা গেছে তো। আমি পরেও গেছিলাম নীল রঙের হুডি। কিন্তু এখন সেটা উলটে পরতে বাধ্য হয়েছি। প্রাণে বাঁচতে হবে তো। আমার এখনো কিছু কাজ বাকি রয়ে গেছে। কিছু লোককে মারা বাকি। কিন্তু আমার ভাগ্য খারাপ। যাকেই মারতে চাই, দেখি সে আগে মরে গেছে। এ যেন গীতার মতো ব্যাপার। কৃষ্ণ কহিলেন ‘ওদের আমি আগেই মেরে রেখেছি।‘
শরবতে চুমুক দিতে দিতে সামনের আয়নার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি। আরে আমার হুডির রঙ আবার নীল হয়ে গেছে কখন। তাহলে কি আমি উলটে পরিনি আদৌ? তখনি মনে পড়ে এই হুডি কিছুক্ষণ পর পর রঙ বদলায়। কী সাংঘাতিক। আমি তো একটা ভয়ানক লুপে পড়ে গেলাম। কখন যে নীল হবে আর তখনি যদি ওরা আমাকে দেখে- এই প্রোবাবলিটি ফ্যাক্টর কম হলেও হতেও পারে।

এর মধ্যেই স্টেশনের নাম বদলে যাচ্ছে, রাস্তার নাম। পুলিশ গুলোও কিছু বুঝতে পারছে না। ওদের ওয়াকি টকিতে নির্দেশ আসছে হ্যালো হ্যালো পিটার মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট। কিন্তু মসজিদ বাড়ি স্ট্রিট কোথায়? এ তো অক্ষয় কুমার দত্ত রোড । নির্দেশ আসছে নাকতলা। কিন্তু সে নামে কোন স্টেশন নেই। নীল রঙের হুডি পরা ছবি এসেছে। কিন্তু যে লোকটা পালাচ্ছে তার হুডির রঙ সবুজ, না তো গোলাপি, এই যা কালো, ওহ এই তো নীল। কিন্তু নীল কখন হবে, এত উত্তেজনায় শরীর খারাপ হয়ে যায়। পুলিশ রাস্তার ধারে বসে মাথায় কোল্ড ড্রিংক ঢালে একের পর এক। পয়সা দেয় না। কেনই বা দেবে? ততক্ষণে পালিয়ে যাওয়া লোকটার হুডি লাল, সে নিশ্চিন্তে পুলিশের পাশে বসে লেমনেড খায়!

লেমনেড বাজারে পাওয়া যায় না, তাতে কি, কোন কোল্ড ড্রিংক, যাদের প্রচারে হেলিকপটার থেকে নেমে আসে নায়ক, এক ক্রেট ড্রিংক নিয়ে আবার হেলিকপ্টারে উঠে যায়- তাই খায় তাহলে। এই গল্প তেমনি হবে, যেমন পাঠক চাইবে। আমার মেয়ে যেমন করত ছোটবেলায়, ক্রমাগত ইনপুট দিতে দিতে গল্পটা তার মনের মতো করে নিত।
একটা লোক ছিল।
না না বলো একটা গরিব লোক ছিল।
ঠিক আছে, একটা গরিব লোক ছিল।
বলো তার খুব দুঃখ ছিল।
ঠিক আছে, তার খুব দুঃখ ছিল।
এইভাবে চলতে চলতে গল্পটা আমার মেয়ের রচনা হয়ে উঠত।

একইভাবে আমার গল্পের নায়ক পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী লেমনেড নয়, ট্রাক থেকে তুলে আনা নায়কের পছন্দের কোল্ড ড্রিংক খায়। আর খেতে খেতে খেতে খেতে তার হুডির রঙ লাল থেকে আবার নীল হয়ে যায়। পুলিশ খেয়াল করে না। কিন্তু সে তো বোঝে। তাই সে বোতল রেখে ছুটতে শুরু করে। আর ওর ছুট দেখে পুলিশও ছোটে। ছুটতে ছুটতে চারপাশের ভিড় কমে আসে। উঁচু বাড়িঘর, আকাশ চাটা বাড়ি কমে আসে। নীল নীল পাহাড় আর ঝর্ণা আর তাদের ঘিরে হাত তালি দেওয়া গাছ। ওরা ছুটতে থাকে। যেন একটা চলন্ত রাস্তার দুইপ্রান্তে দুইজন বাঁধা, এমনভাবে তাদের দুজনের মধ্যের দূরত্ব একদম অবিকল এক থাকে। ধ্রুবক।

দূরত্ব ধ্রুবক রেখেই ওরা একসময় একটি ঝর্ণার ধারে বসে পড়ে। চারদিকে পাতা খসার শব্দ। ঝর্ণার জলের শব্দ আর পাখির দীর্ঘ শিস। সেই শিসটাই যেন পথের মতো। ওরা হাঁপাতে হাঁপাতে শোনে সেই শিস। আর ভাবে এই পথে যাবার অধিকার তারা হারিয়েছে। এই শিস ধরে হেঁটে কোনদিন তারা সুরের কাছে পৌছতে পারবে না। একজন খুন করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি, এই ব্যর্থতাবোধ নিয়ে কোন সুরের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। সে ঝর্ণার জলে নেমে মিছিমিছি রক্ত ধোয় আর দেখে তার হুডির রঙ সাদা হয়ে যাচ্ছে। আর পালটায় না রঙ।

দুটি পাথরে গা এলিয়ে ওরা কিছুক্ষণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে রইল। এখনো বেশ দুপুর। সেই বিখ্যাত মৃত শরীরের সামনের লম্বা লাইনের মতো দীর্ঘ দুপুর, শেষ হতেই চাইছে না। এদিকে খরতাপে ফুলগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে । সেই শুখনো ফুলগুলোই বারবার হাত বদল হতে হতে মৃতদেহর বুকে রাখা হচ্ছে। মিনিট সাতেক পর পর সেই ফুল একটা বড় পলিপ্যাকে ভরে ব্যস্ত সমস্ত ভাবে চলে যাচ্ছে কেউ। তার বুকে লেখা আছে শোক বাংলা ৭০৭ । সবাই তাকে দেখেই বুঝছে সে একজন বড় সড় শোক কর্মী। তাঁর কাজ মৃতদেহ থুড়ি মরদেহর বুকের ওপর থেকে ফুলের ভার কমিয়ে দেওয়া। যত দ্রুততার সঙ্গে যত বিন্ম্রতার সঙ্গে সে ফুল সরাচ্ছে তা দেখে মুগ্ধ শোকার্থীরা। তারা ভাবছে এই শোক মাখা ফুল গুলি কোথায় রাখা হবে, সচেতন শোক বাংলা নিশ্চয় তা নদীতে ফেলে দূষণ বাড়াবে না কিংবা মাটিতে পুঁতে ফেলে অসম্মান করবে না।তারা ভাবছে কিন্তু দেখতে তো পাচ্ছে না। এই পলিপ্যাকে ভরা ফুলের রাশ চলে যাচ্ছে এই শোক ভবনের পেছনে। সেখানে একটি ছেলে বসে আছে নতুন তোড়া বানাবার জন্যে। এই তোড়া চলে যাচ্ছে সামনে বসা ফুল বিক্রেতার কাছে। শোক বাংলা ৭০৭ আবার চলে যাচ্ছে মরদেহর কাছে। ঝর্ণার জল থেকে ছিটকে আসা ধোঁয়া ধোঁয়া জলকণা দেখতে দেখতে সে বলল ‘আচ্ছা ফুলদের কেমন লাগে কে জিজ্ঞেস করেছে?’
-তুমি কেন খুন করতে গিয়েছিলে?
-আমার মনে হয়েছিল ওই লোকটার কোন অধিকার নেই বেঁচে থাকার। ও অনেকগুলো লোককে, সত্যি বলতে কি একটা গোটা প্রজন্মকে খুন করেছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা আমাদের কোল খালি করে বিদেশে চলে গেছে, যেতে বাধ্য হয়েছে। যারা জীবনে এক গ্লাস জল গড়িয়েও খায়নি, তারা সেখানে গিয়ে বাথরুম পরিষ্কার করেছে, রেস্তরাঁয় ডিশ ধুয়েছে, বরফের চাঙড় ভেঙ্গেছে। যেসব কাজ করার জন্য সাদা চামড়ার লোকদের পাওয়া যাবে না, সেসব কাজ তারা করেছে কারণ তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এখানে কোন চাকরি নেই। শিল্প আমরা হতে দিই নি। এখন শুধু চপ আর বোমা এই দুই কুটির শিল্প। শিক্ষকরা রাস্তায় বসে আছে, আজকাল ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং তো দূরের কথা ইংরেজি বা সাইকোলজি এমন সব বিষয়ে অনার্স পড়ার জন্যেও ছেলেমেয়েরা দিল্লি হায়দ্রাবাদ ব্যাঙ্গালোর চলে যাচ্ছে।

-যাচ্ছে তো যাচ্ছে। ভালরা তো চিরকালই বাইরে চলে গেছে। এখন ভালো কিছুর জন্যে সবাই যাচ্ছে। এতে অসুবিধে কোথায়? এই যে তোমার পেছনে দৌড়তে দৌড়তে আমি এই জঙ্গলে চলে এলাম, এই কি একটা চাকরি? বাইরে চলে গেলে রাজার হালে থাকতে পারতাম।

-বাইরে কোন রাজা থাকে না।সেখানে মন্ত্রীরা সাইকেল চড়ে ঘুরে বেড়ায় আর লাইন দিয়ে মাছ আর শাক কেনে। আর সেখানে অফিস করে এসেও নিজের বাসন মাজা, ঘর মছা, রান্না করা, এমনকি বাথরুম পরিষ্কার করা – সব নিজের হাতে করতে হয়। গাড়ি চালাতে হয়। আর তার জন্যে দরজার বরফ নিজেকেই বেলচা দিয়ে সরাতে হয়।
দুয়ারে বরফ!
এই প্রথম লোকটা অবাক হয়ে গেল । এইরকম দেশে যাবার জন্যে ছেলেমেয়েগুলো পাগল! সে কিছুক্ষণ ঝর্ণার জলের উড়ন্ত ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর সে বলল দোস্তো, এই একটা ভালো কাজ তুমি করতে যাচ্ছিলে। আর তার জন্যে তোমাকে আমি তাড়া করেছি। হয়তো গুলি করে মেরেই ফেলতাম। কিন্তু আমার কাছে কোন নির্দেশ আসেনি। নির্দেশের জন্য আমি অপেক্ষা করতে করতে আর খুন করা হল না। তাছাড়া বললে বিশ্বাস করবে না এই প্রথম আমি জঙ্গল দেখলাম ঝ র্ণা দেখলাম পাহাড় দেখলাম, এই প্রথম আমি কাজের জায়গা ছাড়া এলাম অন্য কোথাও। নাহলে আমার সবসময় এই ডিউটি পড়ে। বিখ্যাত মানুষ মারা গেলেই লাশ কভার করো, দেখো কেউ এল কিনা মঙ্গল গ্রহ থেকে মাছি বা মশা।

-লাশ না মরদেহ। কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে।
লোকটা তার ব্যাগ থেকে প্যাকেট বার করল।

এই যে বিরিয়ানি। খাও। মরার ডিউটিতে, সেতু ভাঙলে, বন্যা বা খরায় সবসময় বিরিয়ানি দেয়।
বিরিয়ানি!

কিন্তু আমি যে সেই শরীরটা থেকে বেরোতেই পারছি না। সারা শরীর ফুলেঢাকা। ওই ফুল কেউ তুলে নিয়ে যায় নি। ওই ফুল কেউ রিসাইকেল করে ব্যবসা করার সাহস করেনি। কারণ মরদেহ ঢাকতে একটা ন্যূনতম ফুল লাগে। আমি সেটা যদি জানতাম, তাহলে সেই ন্যূনতম ফুল হবার আগেই চলে আসতাম আর সেই ফুলে রেখে আসতাম সময় বোমা। তারপর ধীরে সুস্থে বেরিয়ে এসে, টয়লেটে পেচ্ছাপ করতে করতে বোতাম টা টিপে দিতাম। মরদেহটি টুকরো টুকরো হয়ে যেত আর চারদিকে উড়ে যেত সব। ধোকার টাটি সাজিয়ে মরদেহ নিয়ে শোকের ব্যবসা ঘুচে যেত। লে, বডিই উড়ে গেছে কোথায় ফুল দিবি? এটা ভেবে আমার যেমন পৈশাচিক আনন্দ হচ্ছিল তেমনি দুঃখ। আমি পারিনি, একটা ডেডবডিকেও খুন করতে পারিনি, শুধু একটা অংকের হিসেব গোলমাল করে ফেলায়। আমি যদি খানিক আগে পৌছতাম। কাঁদতে কাঁদতে আমি ঝর্ণার জলে নেমে পড়ছিলাম। আমার জামা কাপড় হুডি ছেড়ে জলে নামলাম। আমার নগ্ন চৈতন্যে জল লাগতেই আমার মাথায় এল, আরে, আমার পক্ষে কোনদিন জানা সম্ভব হত না। কারণ ঐ ফুলের মাপ শোক বাংলার তরফে দেওয়া। ওখানে আমি কেউ না। কিচ্ছু না। আমি যখন স্নান করছিলাম পুলিশ টা বিরিয়ানি খেয়ে হাত ধুতে এল। আর এসেই সে দেখল হুডিটা, রঙ বদলানো হুডিটা। ওর ভারি লোভ হল। ও সেটা পরে ছুটতে লাগল। ছোটার দরকার ছিল না। আমি ওটা আর পরব না ঠিক করে ফেলেছি। ওটা অপয়া। ওটা পরে কাউকে খুন করাই যায় না।


পুনশ্চ
অনেক বছর আগে এরকম একটা দুপুরে খিড়কি পুকুরে যাবার পথে, মাছের বঁড়শির সামনে বসে সুলগ্না একটা আধ ছেঁড়া বই পড়ছিল। যদিও সে ভাবছিল গোটাটাই স্বপ্ন। তার হাত পা গুলো সরু দেখাচ্ছিল, আর বইটা মোটা। সামনের আর পেছনের অনেক গুলো পাতা উড়ে গেলেও বোঝা যাচ্ছিল সেটা একটা যাত্রা পালা, প্রতি পাতার নিচে ছোট করে সে পালার নামও লেখা ছিল- তোমার হাতে আমার রক্ত।


লেখক পরিচিতি:
তৃষ্ণা বসাক একজন প্রতিষ্ঠিত কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও অনুবাদক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.ই. ও এম.টেক । তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা ৪০ -র অধিক। বিশেষ উল্লেখযোগ্য-লাইব্রেরি শার্ট খোলো, কোটি যোগিনীর গলি, চরের মানুষ, চন্দাবতী, চিন্তাচর্চা, আত্মারামের নতুন খাঁচা, অজিত সিং বনাম অজিত সিং, টিস্যু পেপারের পানসি ইত্যাদি।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ