আইজ্যাক সাহা
(নাহার মনিকার গল্প বাতাস মূর্তিমান পড়ার লিঙ্ক)
বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত কথক যেইমাত্র উল্টোদিকের যানবাহনের মধ্য থেকে ভেসে আসা কথার ‘ঠুনঠুন’ শব্দে মনোযোগী হন আর অব্যবহিত পরেই আমরা শিউলি আখ্যানের সাথে পরিচিত হই আর সাথে তার স্বপ্নের বিবরণী । তৎক্ষণাৎ আমরা উৎসুক হয়ে পড়ি শিউলির স্বপ্ন নিয়ে নয় শুধু বরং তার স্বপ্নের অন্তঃস্থিত অপার রহস্যের মধ্যে ডুবে যেতে। আমাদের বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ করতে থাকে,গল্প আমাদের কোন পথে নিয়ে যেতে চায়, তা কি শিউলির কোনও বিপন্নতার আখ্যান নাকি একটি স্বপ্নের মনঃসমীক্ষণ এই ভাবনা জারিত করতে থাকে আমায়।
যেদিন থেকে নারীকে পুরুষ বেঁধে ফেলেছে, দখল করে ফেলতে পেরেছে সেদিন থেকে আজ অবধি কেবল তার অবমাননার ইতিহাস। আর এই অবমাননারই এক ছবির মধ্যে, তার প্রতিটি রঙের ব্যঞ্জনার মধ্যে ঢুকে পড়ব এই ভাবনায় ধীরে ধীরে আমরা অগ্রসর হতে থাকি। যে লোকটি একটি বেগুনী রঙের সরীসৃপ হাতের মধ্যে আটকে রেখে শিউলিকে কাছে ডাকে, শিউলি ভয়ে পলায়ন করতে চাইলে লোকটি তাড়া করে তাকে যে কিনা শিউলির মেহগনি খাটেই উপবিষ্ট ছিল এতক্ষণ। ফলে ধরে নিতে হয় যে ‘লোকটি’তার নিকট সম্পর্কের কেউ। স্বপ্নের এই ইশারা আমাদের কোন সত্যের মুখোমুখি নিয়ে যায় সে অপেক্ষায় আমরা কথকের মুখের দিকে চেয়ে থাকি। কেননা এক ভয়ার্ত পরিবেশ তৈরী হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে।
“এমন সময় লোকটার বাঁ-হাত তার কাঁধ আঁকশির মতো আটকে তাকে টানে, ডান হাতে জিভ-উগরানো প্রাণী শিউলীর চোখ বরাবর ক্ষুধিত আর স্বার্থান্ধ হয়ে এগিয়ে আসতে থাকে”। আর এমন স্বপ্নের সাথে শিউলির অবচেতনের গভীরে লুক্কায়িত যন্ত্রণার খাদের ভেতর থেকে তুলে আনতে চাইছি মনেপ্রাণে তার জীবনে জড়িয়ে থাকা দিনলিপিকেও। কে সেই ‘লোক’? কেননা সে কুঁকড়ে যাওয়া রুদ্ধশ্বাস চিত্র আঁকা হয়েছে ইতিমধ্যেই আমরা বুঝতে চাইছি যে, সে কোন ‘লোক’যে পিচ্ছিল ওই সর্বত্রগামী সরীসৃপের মত তাকে গিলে ফেলতে চায় আর শিউলি ক্রমাগত পালিয়ে যেতে থাকে ওই ‘লোক’টির হাত থেকে।
কিন্তু সে পারে না, তাকে আঁকশির মত ধরে ফেলে লোকটি, আর শিউলি জীবনভর কেবল এক দমবন্ধ উগরাতে না পারা বেদনায়, চোখ উপড়ানো দুঃস্বপ্নে অতিবাহিত করে।
“বন্ধ চোখে চিৎকার দেওয়ার উপক্রম হলেও শিউলী তার চিৎকার কোথাও ছড়াতে পারে না, নির্গমনের পথ না-পেয়ে দৈত্যের মতো সশব্দ অনুভূতি বুকের ভেতর এপাশ থেকে ওপাশ আর ওপাশ থেকে এপাশ একটা বিশালাকার গোলক হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করলে শিউলী তার বুকের মধ্যে অচেনা এক ব্যথাবোধ দুহাতের দশ আঙুল দিয়ে খুবলে বাইরে বের করতে চায়, তার দুচোখের মণি ঠেলে বেরিয়ে আসে আর ভয়ার্ত চিৎকারটি প্রসবের আগে প্রতিবারই স্বপ্নের এ পর্যায়ে তার ঘুম ভেঙে যায়”।–এই অংশটির বিবরনী নাহার মনিকা এমন ভয়াবহভাবে প্রকাশ করেছেন যে সেই ভয়ের রুদ্ধশ্বাস আবহ আমাদের চারপাশ ঘিরে থাকে কিন্তু সাথে সাথে একটি সংশয়ও ছোট্ট দানার মত আমার বোধের গভীরে প্রবেশ করে যে লেখক কেন এই “ব্যাথাবোধ”কে ‘অচেনা’ বলেছেন ? ‘অচেনা’ কেন ? তবে একটি বিশেষ ঘটনা কি তার জীবনে বিচ্ছিন্ন ? নাকি এ প্রমাদ অনবধানবশত! নাকি স্বপ্নটি নেহাতই তার জীবনযাপনের ইতিহাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়,এক অযাচিত ঘটনা। বুকের গভীরে জমে থাকা কোনও গূঢ় যন্ত্রণার ইতিহাস নয় তবে? তার জীবন কি তবে মসৃণ ও সুখময়! নচেৎ সে এক ‘ফতুয়া পরা মিষ্টি চেহারার’ অপেক্ষাকৃত কম বয়সের মেয়েকে সে স্বপ্নের বিবরণ দেবে কেন! যদি তা তার বুকের গভীরের একান্ত গোপন কষ্ট হয় তবে তা সম্ভব নয়।
আবার যেমন গল্পের শুরুতেই খটকা লাগে ‘দুপুর পার হওয়া রোদ আরো বিনীত’ এই বাক্যবন্ধে। তবে কি দুপুরে রোদ বিনীত ছিল? ওই ‘আরো’ শব্দটি যে সংশয় তৈরী করে !
তবু এসব সংশয়কে দুহাতে ঠেলে রেখে এগিয়ে যেতে থাকি গল্পের অতলে আর এক পর্দা উন্মোচনের প্রতীক্ষায় আমার মন উচাটন হয়ে পড়ে। শিউলি বৃত্তান্তের অবগুন্ঠিত রহস্যের জন্য। কেননা কথকও আমাদের সেই উত্তেজনাকে আরো প্রখর করেছেন একটু পরেই- “স্বপ্নের লোকটা কে? সে কি কোনো পরিচিত পুরুষ যাকে ঘিরে তার দুঃস্বপ্ন জন্ম নেওয়ার মতো প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে? শিউলী এমন ভঙ্গিতে তার স্বপ্ন বলে, যে-ভঙ্গির মানে খুঁজতে আমাদের আরো গভীর মনোযোগের দৃষ্টি দিতে হয়।”
এবং আশ্চর্য! আমার একসময় এসে মনে হয় শিউলি একটি কাল্পনিক চরিত্র। আসলে কথকই শিউলি। শিউলিকে তিনি একটি আলাদা সত্তা হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
এখানেই আমি নাহার মনিকার গল্প বলার ভঙ্গিমাকে বাহবা দেবার জন্য একাকী কম্পিউটারের পর্দার সামনে নত হই। কী অপূর্ব কথনে তিনি আমাদের নিয়ে যান এক ভিন্ন অবস্থায় নিয়ে যান আমাদের প্রত্যাশার কাছে নয় বরং এক অন্য বাস্তবের দিকে। শীতে কুঁকড়ে যাওয়া যে শিউলিকে কথক ও তার সঙ্গিনীরা দেখে সে তার স্বপ্নহীন চোখের পাতা উন্মীলন করে এগিয়ে যায় বা লেখক আমাদের নিয়ে যান এক অন্য রাজ্যে আর সেখান থেকেই শুরু হয় গল্পের নিজস্বতার অভিমুখ যাত্রা। অচিরেই আমরা এক হাড় হিম করা আখ্যানের মধ্যে প্রবেশ করি যেখান থেকে আমাদের আর ফেরবার কোনও গত্যন্তর থাকে না। আমরা মূক হয়ে যাই । আর যখন অন্ধকারের গভীর পর্দার ভেতর শিউলি কাঁদতে থাকে তখন সেই কান্না আমাদের ভিজিয়ে দেয়। “চরাচরজুড়ে শুয়ে থাকা স্থির সময় আলস্যভরে গা তুললে শিউলির কান্নাক্লান্ত স্বর ভেসে আসে”।
যদিও কেন কোন সূত্রের ভিত্তিতে তার স্বামী প্রাক্তন বা মৃত এই তথ্য প্রাপ্ত এই ভাবনা আবার আমার মধ্যে সংশয় তৈরী করে তবু সেটিকে দু’হাতে সরিয়ে ফেলি কেননা তখন একটি বিরাট প্রশ্নচিহ্ন এসে হাজির হয় যে সে কেন তার জন্মের জন্য ক্ষমা চায় ! আর সে এমন গভীর দুঃখে কাঁদে কেন? কার সাথে সে কথা বলে তা বিবেচ্য নয়, অন্তত এই গল্পে সেটা খুব জরুরী নয় এই পর্যায়ে এসে,এবং এখানে লেখক তার কলমে মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন। যেহেতু আমরা শিউলি আখ্যানে নিমগ্ন থাকতে চাই, তাই তার উপাখ্যানগুলির প্রতি আগ্রহী থাকি। এবং এ সময় লেখক আমাদের নিয়ে যান পরবর্তী উপাখ্যানে, শিউলির জন্মবৃত্তান্তে।
ফলত আমাদের কাছে একটি বৃত্তান্তের উন্মোচন হয় এবং বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়। যেখানে শিউলির জন্মবৃত্তান্ত ও তার মায়ের ধর্ষণের মর্মন্তুদ কাহিনী আমাদের ভিজিয়ে দেয়। এবং এখানে এসে শিউলি আর একা থাকে না গল্পটি হয়ে ওঠে তৎকালীন সময়ের অসংখ্য শিউলির কাহিনীতে। আর এখানের গল্পটির সার্থকতা। আজকের বাংলাদেশে যখন পুনরায় রাজাকার ও ঘাতকবাহিনীর আলোচনা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তখন এই আখ্যান পাঠককে পুনরায় দাঁতে দাঁত চেপে সংকল্পে স্থিত করার জন্য উসকে দিতে সক্ষম।
ফলত, আমরা এই গল্প পাঠে একজন কিংবা অনেক শিউলিকে আবিস্কার করে ফেলি , ছুঁয়ে ফেলি তার নীরব ও সরব যন্ত্রণাকে,তার অস্তিত্বের সংকটকেও।
আমরা প্রথমে দেখি সে এক কনিষ্ঠাকে তাঁর স্বপ্নের বয়ান করতে-তারপর দেখি সে অন্ধকারের মত গভীর বেদনাবোধের অভ্যন্তর থেকে কোন এক অজানা অস্তিত্বের কাছে তার নিজের জন্মের জন্য হাহাকার করতে। পরে আবিস্কার করি তার জন্মবৃত্তান্তকে ,তখন আমাদের প্রতীতি হয় যে আসলে নাহার মনিকা সেই দুঃস্বপ্নের দিনগুলির কথা আমাদের বলতে চেয়েছেন। কিন্তু তথাপি আমাদের আশা অপূর্ণ থেকে যায়। কেননা তাঁর দুঃস্বপ্নের ‘লোক’টির উপাখ্যানটি আর আলোচিত না হওয়ায়। ফলে ছোটগল্পের স্বধর্ম ব্যাহত হয়। কেননা গল্পটির ‘ফোকাস’ বারংবার পরিবর্তিত হয়। যেহেতু ছোটগল্পে কোন শব্দ ,কোন প্রসঙ্গই অপ্রয়োজনে ব্যবহৃত হতে পারে না ।
আর একটি কথা , গল্প পাঠের পর এর নামকরণ আমার যথার্থ মনে হয় নি।
উপরের সমস্ত অক্ষরগুলি পাঠক উপেক্ষা করতে পারেন,তা এমন কিছু নতুন তথ্য বা দিক নির্দেশ করে না যেহেতু। আমার কিছু কিছু মন্তব্যের সাথে লেখক বা এই গল্পের পাঠক একমত না হতেও পারেন। আবার আমার মূল্যায়ন এমন কিছু সঠিক বলেও আমি মনে করি না। তবে গল্পটি পাঠ শেষে যা বলতে চাই তা আমার অন্তরের ভাললাগা সঞ্জাত।
নাহার মনিকার লেখার প্রকাশভঙ্গিমা আমার খুব পছন্দের। লেখার বিষয় একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই কিন্তু প্রকাশভঙ্গিমাই একজন লেখককে তার স্বাতন্ত্র দেয়। মনিকার কলম স্বাতন্ত্রের দিকচিহ্ন। টানা ঝরঝরে সরল গদ্যে প্রচুর লেখা হয়,সেসবের পাঠকও বেশি। আমি একথা বলতে চাই না যে সাহিত্য হিসেবে সেগুলি ভাল নয়। প্রচুর ভাল লেখা আমরা পাই। আবার ভাষাকে ইচ্ছাকৃত দুরূহ করার পক্ষপাতীও নই আমি। তবে নাহার মনিকার লেখা পড়ে মনে হয় যে এই লেখা এভাবে না লিখলে কোনোভাবেই তা লেখা যেত না। ওর গদ্যের একটি নিজস্বতা রয়েছে,সেটি সহজাত ও তাতেই দেখি সে খুব সাবলীল। অকপটে বলতে চাই যে ভাষার এই ব্যবহার আমার নিজের খুব পছন্দের।
(‘বাতাস মূর্তিমান’ গল্পটি নাহার মনিকা’র গল্পগ্রন্থ ‘পৃষ্ঠাগুলি নিজের’ এর অন্তর্ভুক্ত। আইজাক সাহা এই লেখাটি লিখেছিলেন ২০১১ সালে)


0 মন্তব্যসমূহ