স্বপ্নময় চক্রবর্তীর উপন্যাস "চতুষ্পাঠী" নিয়ে আলাপ



পদাতিক সৈনিকের অব্যর্থ লড়াই
পুরুষোত্তম সিংহ

গুরুদের প্রাইমারি, সেকেন্ডারি সংস্করণ হয় না। আধিপাত্যবাদের সংস্কৃতি যখন গুরুতন্ত্রে থাবা বসায় তখন চারিদিক থেকে বক্রচক্ষু ভেসে আসে শিক্ষাব্যবস্থার উপর। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার তত্ত্বাবধায়কের ক্ষমতা সর্বাধিক বলে, কিছু পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা অদ্ভুত মায়াময় বলে শিক্ষার্থী পূর্বের সমস্ত গুরুদের ভুলে এইখানে এসে ঘাঁটি বাঁধেন। কর্মযজ্ঞের ঢেঁকিধারী পুরোহিত হয়ে ওঠেন জীবনচেতনার নিয়ন্ত্রক, কারো কারো জীবনদেবতা। প্রচার, প্রসারের ঢক্কানিনাদে, গুরুর কাছ থেকে কিছু নগদ পাবার লোভে, গুরুকে হাইলাইট করার মোহে পূর্বের গুরুদের বিস্মিত হতে হয়। অথচ ক্রিয়াক্ষেত্রে বিপরীত চিত্রনাট্য বর্তমান। প্রাইমেরি গুরুই শ্রেষ্ঠ। জীবনচেতনার অভাবে ও নগদ পাওনার লোভে আমাদের গুরুবাদের দেশে গুরু পরম শ্রেষ্ঠ বোধ কখন গোষ্ঠীতন্ত্রে, গোরুবাদে হারিয়ে যায় বোঝাই যায় না। স্বপ্নময় চক্রবর্তী’র বিলু নতুন যুগের মানুষ হয়েও, নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার ছাত্র হয়েও পুরাতন টোল পণ্ডিত দাদু অনঙ্গমোহনের প্রতি শেষদিন পর্যন্ত বিশ্বস্ত থেকেছে, জ্ঞানী হিসেবে মেনেছে। যদিও বিলুর সেই কথন বর্ধিত হয়েছে ‘জলের উপর পানি’ আখ্যানে। ‘চতুষ্পাঠী’ (১৯৯৫) দাদু অনঙ্গমোহনের জীবনাদর্শ, জীবনচেতনাসহ সংস্কৃত পরিসর বিসর্জনের আখ্যান।

স্বপ্নময় চক্রবর্তী আখ্যান শুরুই করলেন সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ দিয়ে। হ্যাঁ ব্যঙ্গ, শ্লেষের গজমুক্তামণি স্বপ্নময়ের গদ্যের চালিকা শক্তি। স্বপ্নময় গদ্যচরণে প্রথম থেকেই নিপুণ হয়ে উঠেছেন ব্যঙ্গ, শ্লেষের সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষ্যের টুকরো সূত্র এবং জীবনকে দেখার অনেকান্তিক বিন্যাসে। একটি উদ্‌বাস্তু পরিবারকে কেন্দ্র করে তিনি সংস্কৃতির ভিতর বলয়ে প্রবেশ করেছেন। সেই টোল, সংস্কৃত শিক্ষা ব্যবস্থা, গুরুগৃহ বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবন থেকে বহুকাল আগেই হারিয়ে গেছে। ইংরেজ ঔপনিবেশের আরও আগের বৃত্তকে তিনি উপনিবেশ উত্তর রাজনীতি-অর্থনীতি, সমাজ বদলের কাঠামোসহ উদ্‌বাস্তু স্রোতের সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন। মেকলের শিক্ষা সংস্করণের পরবর্তী পাঠ, স্বাধীনতাত্তোর নব্য শিক্ষা পদ্ধতি ও কালচারাল মুভমেন্টের মধ্যে জাতির ঐতিহ্যসূত্রের পূর্বসেতুকে টেনে এনে এমন জারণ ক্রিয়া আবিষ্কার করলেন যা প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করল। কালের ক্ষেত্রে গোত্রান্তর সত্য। বিজন ভট্টাচার্যের হরেন মাস্টার তা বুঝেছিলেন। উদ্‌বাস্তু মানুষ সংস্কৃতির সমস্ত কিছু টিকিয়ে রাখতে পারবে না। পারা সম্ভব নয়। শুধু কি দেশকাল ভিটেমাটির উচ্ছেদ? সংস্কৃতির উচ্ছেদ নয়? সেই সঙ্গে আছে ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক রক্তচক্ষুর শাসন। একদিকে ব্রাহ্মণ্য সমাজের নিয়মতান্ত্রিক শোষিত ভাষ্য অন্যদিকে দরিদ্র ব্রাহ্মণশ্রেণি। বিভূতিভূষণের আখ্যানের প্রায় সমস্ত ব্রাহ্মণরাই দরিদ্র। একদিকে জীবন জীবিকার সংকটে কোমরের কাছা খুলে যাবার জোগার অন্যদিকে ঐতিহ্য বনেদিয়ানার নামে চিরাচরিত সংস্কার টিকিয়ে রাখার দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে কালিক সত্য বড় ভূমিকা পালন করে। স্বপ্নময় কালবিভাজিত বয়ানকে খুব সূক্ষ্মভাবে ঢুকিয়ে দেন। ব্রহ্মচার্যকে কেন্দ্র করে আলগা লড়াই নয় ঐতিহ্যের শৃঙ্খলাতন্ত্রের আড়াল দিয়ে গুরুচণ্ডালী ভাষা, টেরিলিনের পাতলা জামার যুগমানসকে ধরে রাখেন।

বিপ্লবের ব্রহ্মচার্য হবার পর ভিক্ষাব্রত গ্রহণের আড়ালে উদ্‌বাস্তুদের প্রথম প্রজন্মের মর্মান্তিক পরিণতি কি গোপন নেই? যদি ‘ভিক্ষা’ শব্দটিকে ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করি। ‘চতুষ্পাঠী’ গদ্যের একটা স্নিগ্ধতা আছে। আছে সাংস্কৃতিক পরিসর। গদ্যের স্নিগ্ধতা এমনই মায়াময়, এমনই আন্তরিক পাঠককে একটা করুণ রসে ভিজিয়ে দেয়। আবার চোখের কোনে জল আসে না শব্দের গাম্ভীর্যে। তৎসম-দেশি চলিতসহ হরেকরকম শব্দের ব্যবহার বাক্যকে এমন উত্তেজনা দান করে তা শুধু আখ্যানকে তাড়িয়েই নিয়ে যায় না তল দিয়ে উপনিবেশ উত্তর আর্থ-সামাজিক বয়ানকে স্পর্শ করে। বাংলা আখ্যান বলয়ে গত শতকের শেষ দশকে গুটিকয় উপন্যাস লেখা হয়েছে যা দ্বারা গত শতকের শেষ পঞ্চাশ বছরের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল খুব সহজভাবে দেখা যায়। সেই তালিকায় অন্যতম ‘চতুষ্পাঠী’ (১৯৯৫)। এছাড়াও আছে মধুময় পালের ‘আলিঙ্গন দাও রানি’ (১৯৯৮), মানিক চক্রবর্তী’র ‘পনের হাজার শব্দে গণেশ পরিবার’, অভিজিৎ সেনের ‘স্বপ্ন এবং অন্যান্য নীলিমা’ ও অনিশ্চয় চক্রবর্তীর ‘আলো আঁধারে আনন্দ বিপ্লবে’।

দাঙ্গা থেকে মুসলিম অত্যাচার, দেশভাগে হিন্দু জনসমাজের ভিটেমাটি উচ্ছেদ, এপারে উদ্‌বাস্তু জীবনযন্ত্রণার মর্মান্তিক পরিণাম, যুগান্তরে সংস্কৃতের অধঃপতন, নব্য সংস্কৃতির উত্থান, ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার সঙ্গে আর্থিক সংকটের দ্বন্দ্ব এবং সেই জাঁতাকলে এক ব্রাহ্মণ পরিবারের আদর্শ, ন্যায়বোধ, মূল্যবোধের অধঃপতনের গোপন রহস্য এই আখ্যান। উদ্‌বাস্তু জীবন সংকট, প্রাণপনে নিজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বজায় রাখা ও বাইরে রাজনীতির কানাঘুসা আখ্যানের চালক। পূর্ববাংলার শান্তিপ্রিয়, উদাসী, সংস্কৃতিচর্চায় ডুবে থাকা মানুষ এপারে এসে ভাতকাপড়ের সংস্থানে নাজেহাল হচ্ছে। কায়িক পরিশ্রম তো আছেই কিন্তু মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে দীর্ঘদিনের সংস্কৃতিচর্চার অভ্যাস, কখনও সংস্কৃতমন্ত্র, গান, শ্লোক।

‘চতুষ্পাঠী’ উপনিবেশ উত্তর একটা কালচারাল টেক্সট। যার ভিতর বলয়ে আছে উপনিবেশ পর্বের দীর্ঘদিনের অলস বাঙালির যূথবদ্ধ ধারণা। দেশভাগ হতেই ওপারের পল্লি বাঙালির গায়ে গতরে উচ্ছেদের হাওয়া লাগল। দীর্ঘদিন ধরে লালিত সংস্কার, বদ্ধমূল ধারণা, চিরাচরিত বিশ্বাস সমূলে উৎপাটিত হয়ে নগর কলকাতার চলমান শহরে ভেসে গেল। গোরুর গাড়িতে চলা মানুষ, নদীঘাটে হাওয়া খাওয়া মানুষ, অলস বিকালে আড্ডায় মত্ত মানুষ এসে পড়ল সেয়ানগিরি, ধাপ্পাবাজির কবলে। দীর্ঘদিনের বেঁচে থাকার সংস্কৃতি তো টাল খেলই তেমনি বাঁচার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে আক্রান্ত হল। আবার উদ্‌বাস্তুদের মধ্যে অর্থনৈতিক দিক থেকে নানা শ্রেণি। এক শ্রেণির পোশাক, পরিচ্ছেদ, খাদ্যাভ্যাস পৃথক। বিলু এবং শিখাদের পরিবারের পৃথকতা জীবনের বিরোধাভাসকেই শুধু জানান দেয় না স্বপ্নময় চক্রবর্তী জীবনের ভিতর বলয়ে দূরবিন দিয়ে ফটোকপি করেন।

একই পরিবারের সদস্য অনঙ্গমোহন, অঞ্জলি, বিলু, জগদীশ। অঞ্জলির সংকট থেকে অনঙ্গমোহনের সংকট ভিন্ন। অনঙ্গমোহন পূর্ববর্তী প্রজন্মের বলেই ন্যায়বোধ, আদর্শ, সংস্কৃতিচেতনা প্রবল। যুগান্তরে তা ভেঙে যাচ্ছে অঞ্জলির জীবনচেতনায়। আবার জীবনের আঘাতেই হয়ত ভিন্ন সত্যে নিয়ে যাচ্ছে। যুগযন্ত্রণায়, যুগের চলমান ধারণাতে সংস্কৃত অচল তা অঞ্জলি জানেন কিন্তু অনঙ্গমোহন নিজের সত্তা বিসর্জন দেবেন কীভাবে? ভেঙে যাচ্ছে কিশোর বিপ্লব ভট্টাচার্য ওরফে বিলুর মূল্যবোধ। সমাজ যখন ক্ষয়িষ্ণু, সময় যখন ক্রমেই ভেঙে যাচ্ছে, সময়ের দাস হয়ে মানুষ নিজেকে কীভাবে বিপথে চালিত করবে? জগদীশের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে গৃহের অভ্যন্তরের চিত্রনামা আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। তোরঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসে অতীত ঐশ্বর্য। দিশাহারা অনঙ্গমোহন, বিলু, অঞ্জলি। বাস্তবের ধারাপাত দিয়ে এগিয়ে যেতে কিশোর বিলুর কোনো রোমান্টিকতাই গড়ে ওঠে না। বিলুর চুরির জন্য আত্মগ্লানি, অনঙ্গমোহনের শৌর্যবীর্য, অঞ্জলির ভাঙাচোরা জীবনযুদ্ধ উদ্‌বাস্তু মানুষের জীবনচিত্রের যথার্থতা যেমন স্পষ্ট করে তেমনি জীবনে একটা গতি আনে। এ আখ্যান আসলে উদ্‌বাস্তু অস্থিরতার আখ্যান। জীবন এখানে স্থায়ী নয়। এখানে সুখের গন্ধ নেই। সংস্কৃতির পণ্ডিতি আছে বটে তবে তা বারেবারে টাল খায় জীবনের গোলার্ধে।

একদিকে ঐতিহ্যের ধারক বাহক প্রবীণ প্রজন্ম কামাখ্যা চক্রবর্তী, অনঙ্গমোহন অন্যদিকে নবীন প্রজন্মের ঘাতে-প্রত্যাঘাতে জর্জরিত অসীম, বিলু। কামাখ্যা-অনঙ্গমোহনরা জীবনের শেষ লগ্নে এসে ভিটেমাটি ত্যাগ করেছেন অন্যদিকে অসীম-বিপ্লবরা জন্ম থেকে উদ্‌বাস্তু শ্রেণি পরিচয় নিয়ে বড় হচ্ছে। ফলে বদলে গেছে মূল্যবোধ, ন্যায়পরায়ণতা ও সংস্কৃতিচেতনা। অথচ প্রাচীন তো তার ন্যায়বোধ-সংস্কৃতিচেতনা নব্য প্রজন্মে সঞ্চারিত করে যেতে চায়। নব্য বাতাসে তা গ্রাহ্য নয়। এ মডেল তারাশঙ্কর গোত্রীয়। কিন্তু তারাশঙ্কর থেকে তা বেরিয়ে আসে সংস্কৃতির উজ্জীবনে। পুরাতন সংস্কৃতির খোলস ত্যাগ করে অসীম-বিলুরা নব্য সংস্কৃতির ধারক বাহক হয়ে উঠেছে। হোক তা ভঙ্গুর, অপসংস্কৃতি, লঘুপরায়ণ তবুও তো সময়ের সত্য। সেই হারানো সময়ের শব্দবিন্যাস, গূহ্যতত্ত্ব, সংস্কৃতবিদ্যা পদ্ধতি, টোল ব্যবস্থার রীতিপন্থা নিয়ে যেমন রোমন্থনের স্মৃতি আছে তেমনি তা আজকের দিনে ক্রমেই অচল হয়ে যাবে তা নিয়ে আক্ষেপ আছে। ঔপনিবেশিক পর্বের সাংস্কৃতিক বলয়, যা প্রাচীন শিক্ষা ব্যবস্থা ও বেদ-উপনিষদকে নির্ভর করে চলমান ছিল তা ঔপনিবেশিক উত্তর পর্বে পাশ্চাত্য শিক্ষাধাঁচে যে টিকছে না সেই দ্বন্দ্ব দুই প্রজন্মের সত্তাকে সামনে রেখে বিদ্যমান থাকে। আছে বাঙাল ঘটির দ্বন্দ্ব। স্থান-কাল-পাত্র-ভূগোলের সংস্কৃতির রূপান্তর। ঔপনিবেশিক পর্বের একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, শ্রেণির সংস্কৃতি ঔপনিবেশিক উত্তর বলয়ে এসে কেমন টালমাটাল খাচ্ছে স্বপ্নময় চক্রবর্তী তাই দেখিয়ে চলেন। স্বাধীনতাত্তোর পর্ব নতুন বাঙালির উন্মেষের পর্ব। সেখানে পূর্ব বাংলার উদ্‌বাস্তুরা এসে এক মিশ্র সংস্কৃতির কবলে পড়েছে। সংস্কৃতিও তো আধিপত্যবাদ, ক্ষমতাতন্ত্রের নজরানা মেনে চলে। অনঙ্গমোহনের নিজস্ব বলয় ক্রমেই ধাক্কা খাচ্ছে। ব্রাহ্মণ্যবাদ আর টিকছে না। গোত্রান্তর ঘটছে। ‘গোত্রান্তর’ নাটকের হরেন মাস্টার মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আজ অনঙ্গমোহনের মনে দ্বিধা। কিন্তু অক্ষম অনঙ্গমোহন হেরে যাচ্ছেন সময়ের কাছে। বিলুর উপনয়নে শূদ্র প্রবেশ করে ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত পড়ছে। তেমনি লেখক খুব সচেতনভাবে মিশ্র সংস্কৃতির ঘেরাটোপ তৈরি করে দিচ্ছেন। পতনশীল ব্রাহ্মণ্যবাদ রুগ্ন দেহ নিয়ে শেষ নিশ্বাস ফেলছে। সময়ের সত্য হিসেবে রেডিও সময়ের আর্তনাদকে শুনিয়ে যাচ্ছে। নির্দিষ্ট বৃত্ত থেকে, নির্দিষ্ট ধ্যান ধারণা থেকে অনঙ্গমোহনের উত্তর প্রজন্ম অনেক আগেই বেরিয়ে এসেছে, বলা ভালো সমষ্টির সঙ্গে মিলতে গিয়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। অনঙ্গমোহনের চতুষ্পাঠীর শিক্ষা হেরে যাচ্ছে আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাছে। তবুও অতীতের আস্ফালন নিয়ে সগৌরবে বিরাজ করতে চাইছেন। ব্যর্থতার গ্লানি প্রতিমুহূর্তে দংশন করছে তবুও নিজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতির গৌরব ত্যাগ করতে নারাজ। ফলে প্রতিমুহূর্তে দ্বন্দ্বে ভুগতে হয়েছে। চতুষ্পাঠী হারানোর ট্র্যাজেডি, সাংসারিক গ্লানি, সন্তান-স্ত্রী হারানো ও পুত্রবধূর ব্যঙ্গোক্তি সব মিলিয়ে সে শুধু কালের রাখাল নয় সংস্কৃতির ভাঙা সেতুর সূত্রধর।

ঔপনিবেশিক পর্বের শিক্ষা ব্যবস্থা হোঁচট খাচ্ছে উপনিবেশ উত্তর বলয়ে। ইংরেজিহীন শিক্ষা অচল হয়ে যাচ্ছে। বিদ্যায়তনিক শিক্ষার বাইরে চতুষ্পাঠীর শিক্ষা মুখ থুবড়ে পড়ছে। নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় ঐতিহ্য। আর সেই জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ক্রমেই হাহাকার করে যাচ্ছেন অনঙ্গমোহন। কিন্তু তিনি তো যথার্থ পণ্ডিত, কাব্যশাস্ত্র ব্যাকরণবিদ। মানা-না মানার দ্বন্দ্বে, নিয়মতান্ত্রিক সিস্টেমে অবধারিতভাবে হেরে গিয়ে ভগ্নকণ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকে ঐতিহ্যের ভগ্নদূত হয়ে। ভাঙন কিন্তু আগেই শুরু হয়েছে। অনঙ্গমোহনের পুত্র জগদীশ স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। সেজন্য অনঙ্গমোহনের পিতা নীলকমল প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। সে আমলেই বিভাজন ভেঙে যাচ্ছে। নীলকমলের টোলে মুসলিম ছাত্ররাও ছিল। ইংরেজ আমলেই সুপ্রাচীন ব্রাহ্মণতান্ত্রিক সংস্কারে ধাক্কা লেগেছিল। একথাও সত্য ধর্ম-সংস্কার-বিশ্বাস-নির্দিষ্টবৃত্তে জাতপাতের মোহবন্ধনের নিয়মতান্ত্রিক শ্রেণিকক্ষে ধাক্কা লাগার প্রয়োজন ছিল। সে ধাক্কা ইংরেজই দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গোরা অচলায়নের বিরুদ্ধে যে ধাক্কা দিয়েছিল বা তারও পূর্বে উনিশ শতকের ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক সংস্কৃতির যূপকাষ্টকে ভাঙার প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছিল বাঙালি জাতির রূপান্তরের নানা তত্ত্ব। কিন্তু সেসবই ছিল সীমিত পরিসরে। বিপুল আঘাত এসেছিল মেকলে প্রবর্তিত শিক্ষা সংস্কারে। শুধু বিরোধাভাসই নয় বাঙালির ক্রম অগ্রসরমান সংস্কৃতির নিম্নগতি প্রবাহে নৌকা চালান স্বপ্নময় চক্রবর্তী। ভাঙন-গড়নের মধ্য দিয়ে যে নতুন সংস্কৃতির জন্ম এবং তা আধিপত্যবলয়ে আরও এক নব্যতর স্রোতে মিশে যাওয়া সেই নান্দনিক ভাষ্য বুনে চলেন। তেমনি হিন্দু-মুসলমানে মিলিত ভূমিতে ভাঙন যে অনিবার্য ছিল তার তলে পৌঁছে যান। ১৯৪৭ এর দেশভাগের ভাঙন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল দীর্ঘদিন আগে থেকে। ব্রাহ্মণ কর্তৃক বর্ণহিন্দু ও মুসলিমকে আপন বলে মনে না করার ব্যবধান সামাজিক বলয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষতের জন্ম দিয়ে এসেছিল। তেমনি যুগের ক্ষেত্রে গোত্রান্তর সত্য, সত্য সময়ের ধারাবিববরণী। সে নিয়মকক্ষে অনঙ্গমোহন, জগদীশরা অচল হয়ে যায়। আবার নির্দিষ্ট কর্ম উপযোগী চাকরিও পায় অঞ্জলি। সেই তাত্ত্বিক ভাষ্য লেখক বড় মায়াবী রঙে আঁকেন—

“অনঙ্গ, এই পৃথিবী বড় সুন্দর। এই পৃথিবীতে দাঙ্গা হয়, পার্টিশন হয়, মহামারী হয়, বন্যা হয়, ধর্ষণ হয়, তবু তো গঙ্গা কলকল, শীত ঋতুর পর খালধারের কৃষ্ণচূড়া শাখায় শির শির করে পাতা, ভগবদলীলায় জারিত জড়িত এই জগতে মরতে আসো নাই মরতে আসনাই রে…। জীবন, জীবন রে তুই না থাকিলে তবে সোহাগ করুম কারে। চপলা তটিনী মধ্যে পতিত নিশ্চল প্রস্তরখণ্ডই শৈবলাক্রান্ত হয়। কারণ সে নিশ্চল।

সুতরাং পরিবর্তনশীল জগতের যোগ্য হও। নচেৎ বাঁচব না। সংশয় ত্যাগ কর। ন সংশয়মনারুহ্য নরো ভদ্রানি পশ্যতি। সংশয়ং পুনরারুহ্য যদি জীবতি পশ্যতি। সংশয় অতিক্রম না কইরা কেউ মঙ্গল দেখতে পায় না। সংশয়ের মধ্যে বাঁইচ্যা থাকলেই সে মঙ্গলরে দেখতে পাবে। সুতরাং তুমি অন্নপূর্ণা হও বৌমা, বৌমা গো।” (চতুষ্পাঠী, দে’জ পাবলিশিং, দ্বিতীয় সংস্করণ, এ্রপ্রিল ২০১৭, পৃ. ৪১)

ইংরেজি শিক্ষার কাছে ক্রমেই হেরে গেল সংস্কৃত। তেমনি প্রাচীন পুথিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার বদল ঘটে গেল দ্রুত। শুধু তাই নয় ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক সংস্কার, বিশ্বাস দ্রুত টাল খেয়ে গেল। নারী শিক্ষার প্রচলন থেকে ক্রম বিবর্তনে নারীর কর্মে রূপান্তর ইত্যাদির মধ্য দিয়ে যুগচেতনার আভাস চিত্রিত হয়ে চলে। সেই যুগচেতনা সামাজিক বলয়ে যেমন গতি এনেছিল তেমনি ব্রাকগ্রাউন্ডে বাজছিল রাজনৈতিক টিউন।

অস্তিত্বের সংকট থেকে ভাষার সংকট, কর্মচ্যুতি শ্রেণি থেকে নব্য কর্মসংস্থানের দিশা, উদ্‌বাস্তুর প্রবীণ প্রজন্মের সমস্ত হারানোর হতাশা থেকে নবীন প্রজন্মের নব্য স্বপ্নের ইশারা সমস্ত মিলিয়ে আখ্যান সময়ের ধারাপাতকে স্পর্শ করে চলে। নব্যভূমিতে অনঙ্গমোহনের জীবনচেতনা বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ লড়াই, অন্যদিকে সময়ের তালাচাবিতে তা ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ায় বিপক্ষের ব্যঙ্গ বিদ্রুপের ঢেউ আখ্যানে মিহি সুরে বাজে। সময়ের ধ্বনি অনঙ্গমোহনকে বারবার বাতিল করে দিতে চাইছে অথচ সে শাশ্বত বিশ্বাস নিয়ে পরিবর্তিত সময়ের উঠোনে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। বারবার পদাঘাত খেয়েও জীবনচেতনার নীরব ভাষ্যে টিকে থাকে। জীবনের পদধ্বনি কোথায় কখন কেমনভাবে বাজবে তা ব্যক্তি জানে না। জানে না বলেই আপোষ করে। সুমিতা যখন অনঙ্গমোহনকে আচার্যদেব বলে সম্বোধন করে তখন হৃদয় উৎফুল্ল হয়ে ওঠে অথচ জীবন ডাক্তারের পণ্ডিতমশাই সম্বোধনে হৃদয়ে ব্যথা বাজে। তবুও ছাত্রের সংখ্যাসূত্র বাজায় রাখতে গর্জে ওঠেন না।

দুই কিশোর বিলু-অসীমের চোখ দিয়ে বিবর্তিত কলকাতার চিত্র ভেসে ওঠে। স্ট্রাইক থেকে জীবনের অভিজ্ঞতায় তারা সমৃদ্ধ হয়। সিনেমা, খেলা, যৌনতার অবভাস, রাজনীতি, জীবনের টানাপোড়েন সমস্ত মিলিয়ে জীবনরেণুর চলমান ধ্বনি যেমন দৃষ্টিগোচর হয় তেমনি অভাবী চোখ জীবনের নানামাত্রা এঁকে দেয়। শব্দ প্রয়োগের যথেচ্ছাচার, ভিত্তিহীন উপমা ও তৎসম শব্দের স্থলে অর্ধতৎসম-তদ্ভব শব্দের প্রয়োগ, বাংলা ভাষাকে ক্রমেই সংস্কৃতের প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে এনে দৈনন্দিন জীবনের উপযোগী করে ব্যবহারের চোরাস্রোতের বিরুদ্ধে অনঙ্গমোহনের আপেক্ষিক বিদ্রোহ ও চলমান পরিসর কীভাবে লঘু থেকে লঘুতর হয়ে যাচ্ছে সেই সমীকরণ সূত্র আখ্যানের ন্যারেটিভকে ভিন্নমাত্রা দান করে। অনঙ্গমোহনের বক্তব্যের ভাষা বাঙাল, রাগ প্রকাশের ভাষা বাঙাল অথচ শিষ্টাচার, জ্ঞানতত্ত্ব পর্যালোচনার ভাষা সংস্কৃত, তৎসম শব্দের গাম্ভীর্যে ভরপুর। ন্যারেটিভে কলকাতার বাঙালিসহ উদ্‌বাস্তু প্রজন্মের ভাষা কলকাতার কথ্যবুলি বা চলিত ভাষা। সংলাপে কখনও পূর্ববঙ্গের উচ্চারণ ভেসে এসেছে। এই বিবিধ ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির রূপান্তরের চিহ্নায়ণ আখ্যান নানাভাবে বয়ে চলে।

অনঙ্গমোহনের দ্বন্দ্ব প্রবল। পুরাতনকে টিকিয়ে রাখার জেদ ও নতুনকে গ্রহণ না করার প্রবণতা। কিন্তু নতুনই তো চির আগন্তুক। গ্রহণ করতে না পারার ফলে সে ক্রমেই মানসিক সংকটে ভুগছে। পুরাতন কাল ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হয়ে আসছে নবীন প্রজন্মের কাছে। এর মধ্যে সময়ের বীভৎস পদাবলি সূক্ষ্ম ব্যঙ্গবাণে রাজনীতিকে স্পষ্ট করে চলে। বিপ্লব হয়নি তাই বিপ্লব ভট্টাচার্য হয়ে যায় বিলু। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর পদবি দেখে অনঙ্গমোহনের বিভ্রান্ত গৌরবের আড়াল দিয়ে সময়ের ব্যঙ্গকেই লেখক রোপন করে চলেন। আবার অনঙ্গমোহন কিন্তু গোঁড়া প্রাচীনপন্থী নয়। সে সংস্কারহীন মুক্তমনের অধিকারী। যথার্থ পণ্ডিত। কিন্তু স্বঅর্জিত বিদ্যাতন্ত্র, সংস্কৃতি হারিয়ে যাবার জন্য সদা হতাশগ্রস্ত। অভাব তো আছেই। অভাব, পারিবারিক সংকট, মানসিক সংকট ও সংস্কৃত সংকটে সে বিপর্যস্ত। আবার পণ্ডিত হলেও পূজা অর্চনা, তন্ত্রমন্ত্র, পশুবলিতে বিশ্বাসী। কামাখ্যা পুরোহিতের থেকে পণ্ডিত অনঙ্গমোহনের সম্ভ্রম মর্যাদা যে আলাদা, উচ্চ তা জানেন। তেমনি কালীমন্দিরে ছাগ বলিকে কেন্দ্র করে অনাচারের মধ্য দিয়ে দেবমহিমা কেটে যাচ্ছে। মোদ্দাকথা এই আখ্যানের বিষয় পুরাতন ব্রাহ্মণ্য সমাজ। সেই ব্রাহ্মণ্য সমাজ উদ্‌বাস্তু হয়ে এপারে এসে পরিবর্তিত জীবনবোধ, মূল্যবোধে কোনোভাবেই নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারছে না। পুরাতন মূল্যবোধ, বোধ বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে, আবার নতুন মূল্যবোধকে আয়ত্ত করতে অক্ষম হচ্ছে। এই যুগ সংকট আখ্যানের গোত্র নির্ণায়ক। অনঙ্গমোহন অধ্যাপক, তাই পুরোহিত হওয়া তাঁর সাজে না। আবার সংসারের অনটনে না করলেও নয়। এতো সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ। দ্বিধাচিত্তে অনঙ্গমোহন জবাব দেন—

“ভাবতেছি, কেবলমাত্র পয়সার জন্য, দক্ষিণার জন্য, কাপড়ের জন্য, চাউলের জন্য, ফলফলাদির জন্য আমি ভুল শিক্ষা দিমু? ভগবান তো ক্ষুধা-তৃষ্ণা-নিদ্রার ঊর্ধ্বে। অথচ ইহা গচ্ছ ইহা তিষ্ঠ কইরা তারে খাওয়াই। অথচ নিজেরাই ভোগ করি। দেখ আমি আহ্নিক করি। এইটা আমার জীবনাচার। বিষ্ণু পূজা নারায়ণ পূজাও করি। এইটা আমার ব্যক্তিগত অভ্যাস। কিন্তু যজমানের বাড়ি গিয়া তার মঙ্গল কামনায় বিভিন্ন দেবদেবীর পূজা করাটায় মন সায় দেয় না আমার। আমার কী ক্ষমতা আছে যে, মন্ত্রদ্বারা আবাহন কইরা ঘটের মধ্যে দেবতারে আনতে পারি। ফলফলাদি নৈবেদ্য দিয়া তারে তুষ্ট করি? তারপর তারে কই এইটা দাও, সেইটা দাও...” (তদেব, পৃ. ৭৭)

সর্বশূন্য অনঙ্গমোহনের শখের জ্ঞানচর্চার, জীবনচর্চার চতুষ্পাঠী কখন যেন হয়ে যায় অস্তিত্বের সারথি। চতুষ্পাঠী আছে বলেই কিছুটা সরকারি ভাতা পান। সেই ভাতায় অন্ন সংস্থান হয়। ভাঙনশীল, পতনশীল ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র ও সংস্কৃত সেবকের শেষ আর্তনাদ নিয়ে বেঁচে থাকে অনঙ্গমোহন। যাবার দিন ঘনিয়ে এলেও সে কিছুতেই সিংহাসন ছাড়তে নারাজ। যুগসংকটই এই ন্যারেটিভের প্রদীপশিখা। নতুন যুগ চলে এসেছে। পুরাতন যুগের মানুষ নতুন পাঠক্রমে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কে আর রাজপাট ছাড়তে চায়? আফটার অল কালচার নিয়ে গর্বিত মানুষ তো নিজের দক্ষতা, জ্ঞানচর্চা নব যুগকে দিয়ে যেতে চায়। কিন্তু পরিবর্তিত মূল্যবোধে সেই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসর তো অচল হয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক বৃত্তের সমস্তরকম খোলস ত্যাগ করে উপনিবেশ উত্তর কালখণ্ডের শুরু হয়েছে। উপনিবেশ উত্তর কালখণ্ডে রাষ্ট্র ভাষা হিন্দির প্রতাপ এবং কাজের ভাষা হিসেবে ইংরেজির অগ্রগণ্যতায় প্রাদেশিক ভাষাগুলি বেকায়দায় চলে গেছে। পশ্চিমবঙ্গীয় সংস্করণে মাতৃভাষার পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরে একটি ক্লাসে সংস্কৃত থাকলেও তা নমঃ বিষ্ণু নারায়ণ হরি। হারিয়ে গেল একটা ভাষা। কেউ কেউ মৃতভাষা, দেবতার ভাষা উপাধি দিয়ে সম্পূর্ণই মুছে ফেলল। অথচ একদিন জ্ঞানচর্চার ভাষা ছিল সংস্কৃত। শুধুমাত্র ভাষাগত অধঃপতন নয় নিজস্ব সংস্কৃতি ডুবে গিয়ে মিশ্র সংস্কৃতির আঙিনায় উদ্‌বাস্তুরা কীভাবে ঢুকে গেল সেই সমাজতাত্ত্বিক বীক্ষণ আখ্যানে উঁকি দেয়।

সংস্কৃতকে বাঁচানোর খোলসে নিজের অস্তিত্ব বাঁচানোর লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অনঙ্গমোহন। জীবনের সংকটে ক্রমেই মূল্যবোধের অবনতি ঘটাচ্ছেন। ঘটাতে বাধ্য হচ্ছেন। পেটের ক্ষুধা থেকে তো বড় সংস্কৃতি নেই। ছাত্র সংগ্রহ, টোল পরিদর্শনের জন্য ইনসপেকটার আসার আগে পাঁচজন ছাত্রকে নিয়মিত উপস্থিত করানো এবং তার মধ্যে জীবনের সংকট ব্যক্ত হয়ে চলে। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার কেষ্টবিষ্টুরা ধর তকতা মার পেরেক কাটিং-এ একটি শ্রেণিতে সংস্কৃত নির্দিষ্ট করে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। অস্তিত্ব সংকটের শেষ চিহ্ন নিয়ে অন্তিম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন অনঙ্গমোহন। তেমনি জীবিকার সংকট এমনই ঊর্ধ্বগতি কেউ কেউ টোল খুলতে চাইছে। ছয়-সাতের দশকের অস্থির রাজনীতি, যুদ্ধের বাতাস ও অর্থহীনতায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে কিছুটা রোজগার করতে চাইছে। যুগসংকটকে লেখক যেমন প্রাধান্য দেন তেমনি অভ্যন্তরীণ সংকটকে ব্যক্ত করে চলেন। অনঙ্গমোহন সংস্কৃত পাঠের জন্য ছাত্র সংগ্রহ করছেন অথচ সে শিক্ষার কোনো ফলপ্রদানকারী ভবিষ্যৎ নেই। শিক্ষা যে ক্রমেই কর্মমুখী হয়ে উঠেছে তা অনঙ্গমোহন বোঝেন। বুঝলেও কিছু করার নেই।

একটা যুগ যখন বিদায় নেয় তখন ভেঙে ভেঙে খানখান হতে হতে ধীরে ধীরে পদচিহ্ন লোপ পায়। অনঙ্গমোহন একটা যুগের প্রতিনিধি, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। অথচ যুগের ক্রমবিবর্তনে তা ভাঙছে। অধ্যাপক থেকে পুরোহিত, তন্ত্রধারী, চায়ের দোকানের অধিকারী হয়ে যুগের অন্তিম শ্বাস নিয়ে বিদায় নেবে। যদিও বিদায় নিতে আরেক আখ্যান ‘জলের উপর পানি’তে যেতে হবে। সেই পতনশীল ঐতিহ্যের ভাঙাকাঠামোর প্রতিমা এই আখ্যান। আখ্যান জুড়ে আছে বিদায়ী বিসর্জন বাজনা। কিন্তু একটা যুগ, ঐতিহ্য তো সহজেই বিদায় নেয় না। সেই ভগ্নকণ্ঠের অন্তিম আর্তনাদ আখ্যানে বড় করুণ সুরে বাজে। আর স্বপ্নময় চক্রবর্তী সেই সময়শিল্পী যিনি আখ্যানের মাঠকে ক্রমেই বড় করেন। বড় বৃত্ত থেকে ছোট বৃত্তে নয়, ছোট বৃত্ত থেকে মহাসমস্যার অন্তঃমূলে তিনি যাতায়াত করেন।

অনঙ্গমোহন তাত্ত্বিক, জ্ঞানী, পণ্ডিত বলেই জীবনের সংকট প্রবল। লেখক বড় কৌশলে এই জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরটি নির্মাণ করেছেন। ধর্ম-ঈশ্বর-লোকাচার-জীবনচর্যা দিয়ে আখ্যান ব্যক্তির জীবনজিজ্ঞাসাকে বহুমুখী প্রশ্নের সন্মুখে নিয়ে গেছে। সে ঈশ্বরে বিশ্বাসী কিন্তু পূজা অর্চনার জন্য নিজের অবস্থানকে নিচে নামাতে নারাজ। আবার প্রচলিত ধর্মের বাইরে জীবন অতিবাহন করতে গিয়ে হোঁচট খান, জীবনের পদাঘাত খেয়ে ধর্মের কাছে ফিরে আসেন। আবার ধর্ম মানতে গিয়ে জীবনের ছক মেলে না। অস্থির হন। জীবনের তত্ত্ব, সমীকরণ কোথায় খুঁজতে যান। কিন্তু জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরটি অভাবে, জীবনের সংকটে ঠিক জুতসই হয় না। সে তঞ্চকতা করতে চায়নি। সংস্কৃতের পরিসরকে লঘু করতে নারাজ। কিন্তু জীবন, সময়ের এমনই লাঞ্ছনা যা ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। নামতে বাধ্য হচ্ছে। পুরাতন মূল্যবোধ, ভাবাদর্শ, নীতিপন্থা ক্রমেই অচল হয়ে যাচ্ছে, সময় গ্রাস করছে। অনঙ্গমোহনের হতাশার হাহাকার প্রতিমুহূর্তে ধ্বনিত হয়ে চলছে। নিজের টোল টিকিয়ে রাখার অব্যবস্থা, অক্ষমতা, অঞ্জলির ব্যাজস্তুতি নিজের আত্মগ্লানি এমন শব্দবীণায় ভেসে আসে যার নান্দনিক পাঠ বড় গভীর। অনঙ্গমোহনের পরাজয় আসলে টোল ব্যবস্থার পরাজয়, সংস্কৃতের পরাজয়। যা অবধারিত। সেই অবধারিত পরিণামকে এমন জীবনসাঁচে স্বপ্নময় চক্রবর্তী ঢেলেছেন যা প্রশংসনীয়। সে শুধু তো যুগের প্রতিনিধি নয় সময়ের পরতন্ত্রে বাতিল হয়ে যাওয়া নায়ক। রাজপাঠ ত্যাগ করে সাধারণতন্ত্রে মিশে যাচ্ছে যার গোত্রে জ্বলছে উদ্‌বাস্তু শ্রেণিপরিচয়ের প্রদীপ। অধ্যাপক থেকে ঠোঙাওয়ালা, চা বিক্রেতায় গোত্রান্তরের মধ্য দিয়ে উদ্‌বাস্তু শ্রেণি পরিচয়ের প্রথম প্রজন্মের ঐতিহ্য বিচ্যুতির ট্র্যাজিক পরিণাম চিহ্নিত হয়ে চলে। তেমনি কারখানা লকআউট থেকে মিষ্টির দোকানে টিনের কৌটা বন্ধ, ঠোঙা থেকে পলিথিনের মধ্য দিয়ে বাজারজাত দ্রব্যের বিবর্তিত চিত্রটি এঁকে চলেন। ছয়ের দশকের খাদ্য সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, চোরাবাজারি, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিভীষিকা ব্যক্ত হয়ে চলে। খাদ্য সংকটে, জীবিকার সংকটে অনঙ্গমোহন অসীমকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হন। অনঙ্গমোহন ধীরে ধীরে বুঝতে শেখেন সংস্কৃত না হলেও চলবে কিন্তু ইংরেজি গুরুত্বপূর্ণ। সেই মতাদর্শেই অসীমকে চালিত করতে চান। অসীম যেতেই বাল্যবন্ধু হেরম্ব অতিথি হয়ে আসে অভাবের উপর কিল মারার গোঁসাই হয়ে। সম্ভ্রান্ত, সংস্কৃতি সচেতন, ভদ্রতাবোধ, শিষ্টাচার ভেঙে দিচ্ছে অভাব। অনঙ্গমোহন কুলকিনারা না পেয়ে উন্মাদ দিক্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়েন। যে সংস্কৃত নিয়ে তাঁর এত শৌর্যবীর্য, অহংকার, আহ্লাদে আটখানা সেই সংস্কৃতকেই আঘাত করেন—

“তোমার শাস্ত্রের পায়ুমেহন করি আমি…এই বলেই দেয়ালের পাশে বইয়ের তাকে লাথি মারলেন তিনি। ছিটকে পড়ল কাব্য চন্দ্রসুধা…নৈষধ চরিত—কাদম্বরী। তক্ষুনি আবার গিয়ে তুলে নিলেন। চাদরে মুছলেন। ছিঁড়ে যাওয়া পাতাটিকে শুশ্রূষা করলেন অনঙ্গমোহন। হাত বুলোলেন। বাছা, সংস্কৃত ভাষা। তোর দোষ কী। আমারাই অধম। ভাষার সঙ্গে আচার আমারাই যুক্ত করেছি। এটা আমাদেরই বিফলতা। সংস্কৃত বইগুলির গায়ে হাত বুলান অনঙ্গমোহন।” (তদেব, পৃ. ১৩৯)

আবার সংস্কারের রীতিপন্থাকেও বিসর্জন দেন অনঙ্গমোহন। স্বপ্নার বিবাহ দেন হিন্দু সংস্কারের নিয়ম কানুনের বাইরে এসে অত্যন্ত সহজ সরল ভাবে। আসলে যুগই দ্বন্দ্ব রচয়িতা। যুগের দ্বন্দ্বের ধারকবাহক ব্যক্তি। স্বপ্নময় চক্রবর্তী প্রথম ন্যারেটিভেই সংস্কারকে বর্জন করতে চেয়েছেন। জীবনের খোলস থেকে সংস্কার, লোকাচার বিসর্জন দিয়ে নিরেট নির্ভেদ করতে অগ্রসর হয়েছেন। এই অনঙ্গমোহনই কিন্তু ঘটা করে বিলুর উপনয়ন করেছে। কন্যা-পুত্রের মধ্যে ভিন্ন সমীকরণে সংস্কারের গোঁড়ামি না অন্যকিছু? অভাব সব খানখান করে দিয়ে গেছে। চরম অভাবের মধ্যেও সে ছাত্রছাত্রীদের নিত্য পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়ে যান। ব্যক্তিভেদে জীবনের সমীকরণ যে পৃথক হয়ে যায় প্রমাণ অনঙ্গমোহন চরিত্র। আবার উপমায় সেই হয়ে ওঠে উদ্দালোক বা কন্বমণি। আবার নিজের গ্রন্থ উপহার হিসেবে সুমিতাকে দিলেও নিজের নাতিনি স্বপ্নকে দেন না। সুমিতার বিবাহ উপলক্ষ্যে ঘটক বিদায় নয় পথ খরচ পন্থায় কিছু টাকা নেন। অনঙ্গমোহন প্রতি মুহূর্তে মচকাচ্ছেন কিন্তু ভাঙছেন না। প্রাচীন ঐতিহ্য, বনেদিয়ানা ধাক্কা খাচ্ছে আবার কৌশলে বাঁচাচ্ছেন তিনি। কিন্তু সেই সমীকরণে একটা দ্বিধা, শূন্যতা থেকে যাচ্ছে। ঠিক মেলাতে পারছেন না। সেই না মেলানোর দ্বন্দ্বই আখ্যানের অন্যতম দিক। যুগের ক্ষেত্রে গোত্রান্তর সত্য—একথা অনঙ্গমোহন জানেন, মানেন কিন্তু প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হন। জীবনের কালগ্রাসে ক্রমেই অবনমন ঘটছে ঠিকই কিন্তু নতুন সমাজ কাঠামোয় সে বেমানান হয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু নিজের ঐতিহ্য, গৌরব, বনেদিয়ানা কোথায় যেন উঁকি দিচ্ছে আর তখনই দ্বিধা থরথর ঢঙে খানখান হচ্ছেন।

আখ্যান যত পরিণতির দিকে এগিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি অনঙ্গমোহনের সংকট বৃদ্ধি পেয়েছে। অনঙ্গমোহনের জীবনদর্শন, মূল্যবোধ, জীবনচেতনা সময়ের পঙ্কে ক্রমেই বেকায়দায় চলে যাচ্ছে। অনঙ্গমোহন প্রদত্ত উপহারের বই সুমিতা যেমন বিক্রি করে দিয়েছে তেমনি অসীম চালের চোরাকারবারে যুক্ত হয়েছে। জীবনযুদ্ধে পরাজিত অনঙ্গমোহন নিজেও বই বিক্রি করে দিতে চেয়েছে। কিন্তু সব আশা ফুরায় না। ছাইচাপা আগুন থেকেও কিছু আলো ঝিলিক দিয়ে ওঠে। ফুটপাত থেকে অনঙ্গমোহনের বই অন্য সুমিতা কিনেছে। আশাভঙ্গের বেদনায় জর্জারিত অনঙ্গমোহন সামান্য আশাতেই নব স্বপ্নের আনন্দকানন গড়ে তোলেন। কিন্তু তা বিদ্যুৎ চমকের মতো ক্ষণিক উদ্ভাসেই মিলিয়ে যায়। শেষপর্যন্ত অনঙ্গমোহন হয়ে যায় চায়ের দোকানের অর্ধ কর্মচারী। বিলু-অনঙ্গমোহন মিলে গঙ্গার ঘাটে মহালয়ার দিন চায়ের দোকান খোলে। সংস্কৃত মন্ত্রের সঙ্গে মহালয়ার দিন পিতৃতর্পণসহ নব্য ব্যবসার সূচনা। সংস্কৃতের বিসর্জনসহ পণ্ডিতের গোত্রান্তর। এও যেন অন্ন বস্ত্রের লড়াই। এই পর্বটি অনঙ্গমোহনের জীবনযুদ্ধের খতিয়ান। বিলুর যুদ্ধ শুরু হচ্ছে। উদ্‌বাস্তু পরিবারের উত্তর প্রজন্মের সন্তান হিসেবে তাঁর লড়াই চলবে ‘জলের উপর পানি’ আখ্যানে।

‘চতুষ্পাঠী’ সেই আখ্যান যার পরতে পরতে প্রাচীন বিদ্যাচর্চার পরিকাঠামোর মধ্য দিয়ে উদ্‌বাস্তু মানুষের জীবনযুদ্ধের খতিয়ান স্পষ্ট হয়েছে। সংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক পাঠ আবিষ্কার করেছেন লেখক। কালচারাল ডকুমেন্টশনের মধ্য দিয়ে সময়ের পরাপাঠে উদ্‌বাস্তু মিছিলের মর্মান্তিক পরিণতির বীভৎস চিত্রনাট্য উঠে এসেছে। সময়ের অভ্যন্তরীণ চোরাপথ দিয়ে তিনি যেমন প্রাচীন শাস্ত্রে চলে গেছেন তেমনি পুরাতন শিক্ষা পদ্ধতির বিদ্যায়তনিক পরিসরের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করেছেন রাজনৈতিক পাঠে। এই দুই চক্রে পিষ্ট হয়েছেন অনঙ্গমোহন। এই দুই সত্যের সেই চালিকাশক্তি, সেই ধারক বাহক।

লেখক পরিচিতি
পুরুষোত্তম সিংহ 
অধ্যাপক, বাংলা সাহিত্য।
গবেষক, প্রবন্ধকার।
রায়গঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর
পশ্চিমবঙ্গ ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. এই বইটি প্রকাশের পর আমি পুরস্কারের জন্য বেথুয়ার বনামি পত্রিকায় জমা দিই এবং বইটি (চতুষ্পাঠী )পুরস্কার পায়। পুরস্কার পাওয়ার পর আমার আগ্রহে স্বপ্নময় বাবু বেথুয়ার এদেছিলেন পুরস্কার গ্রহণ করতে। স্বপ্নময় বাবু তখন আকাশ বাণী কলকাতার আধিকারিক ও আমি বাণী কলকাতার অধকারিক আর আমি নিভিন্ন প্রোগ্রাম করতে আকাশ বাণী যাই।

    উত্তরমুছুন
  2. দিলীপ মজুমদার (বনামি সম্পাদক)৩০ জানুয়ারি, ২০২৪ এ ১১:৩০ AM

    বনামির পক্ষ থেকে আরও একবার অভিনন্দন জানাই উপন্যাসের স্রষ্টাকে। এমন উপন্যাস সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে বারংবার।

    উত্তরমুছুন