ঘটনাটা যখন ঘটে তখন কাগজের ব্যবহার শুরু হয়েছে, এবং কবিরা তাদের রচনা কাগজ নামক সাদা, নমনীয়, শিশুর ত্বকের মতো দাগপ্রবণ বস্তুটিতে লেখে । পড়ার শেষে পাঠকরা নকশা করা কাঠ বা রুপোর বাক্সে কাগজের পৃষ্ঠাগুলোকে পরপর রেখে দেয়। কিন্তু পাঠক পাওয়ার ব্যাপারে তো সব কবি সমান ভাগ্যবান নয়। কেউ কেউ কখনওই পাঠক পায় না। তার রচনা কখনওই নকশা করা কাঠের বাক্স বা রুপোর বাক্সের নিরাপত্তা লাভ করে না। বাংলার যে নদীর তীরে অবস্থিত লোকালয়ের কথা এখানে বলছি সেটার ভাঙন ছিল ভয়াবহ। নৌবিদ্যা, সেচ বা জলনিষ্কাশনে বাংলার দক্ষতা তখন খুবই উন্নতমানের। পশ্চিম ভারতে মানুষ যখন শুধু চাষবাস ও পশুপালন নিয়ে সন্তুষ্ট, বাংলার মানুষ তখন দেশবিদেশের সঙ্গে জলপথে বাণিজ্য করছে। ব্যর্থ, বিড়ম্বিত যে কবি সম্পর্কে এখানে বলতে চাইছি তিনি, জলপথে এখানে আসা বিদেশী সওদাগরদের মারফৎ, জীবনের শেষদিকে বিদেশে একটু পরিচিতি লাভ করেছিলেন। তাঁর কবিতা অবশ্য সেখানেও কেউ পড়েনি, কিন্তু তাঁর কথা শুনেছে কেউ কেউ। তাঁর কবিতা না পড়ার কারণ হল কাগজের ওপর কবিতা লেখার অভ্যেসটা তিনি তখন পুরোপুরি ত্যাগ করেছিলেন। মাথায় কবিতার পংক্তি এলে সেটা নিয়ে হয়ত ভাবতেন, পংক্তিগুলো মনে মনে সাজিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনও কবিতার রূপও হয়ত দিতেন, কিন্তু কাগজে আর লিখতেন না।
গোড়ার দিকে তিনিও কবিতা কাগজেই লিখতেন। কিন্তু পাঠক পেতেন না । অবশ্য তাঁর অঞ্চলের লোকেরাও যে খুব কাব্যপিপাসু ছিল তা নয়। কবিতার চেয়ে তারা বেশি পছন্দ করত গান। আর গানের চেয়ে অর্থ, যা দিয়ে নৌকো, নারী, মুক্তো, ময়ূর, হাতি, পারস্যের গালিচা, বেলজিয়ামের আয়না, মধ্যপ্রাচ্যের খেজুর বা ইংল্যাণ্ডের কাঠের পালঙ্ক কেনা যায়। তবু কবিরা কবিতা লিখত, আর কিছু কাব্যভুক সেসব পড়ত। কিন্তু এই কবির ভাগ্যে পাঠক জুটল না। পাঠক না পাওয়ার একটা সম্ভাব্য কারণ সম্পর্কে তিনি মাঝেমাঝে ভাবতেন। তাঁর মনে হত কাহিনী বা ছন্দের চেয়ে তাঁর কবিতায় চিত্রকল্প বেশি থাকে, আর সেটাই হয়ত পাঠকদের বিমুখ করেছে। আদিম মানুষের মতো তখনও লোকে গল্প শুনতে ভালবাসত। তার ফলে কবিতাতেও গল্প চাইত। আর চাইত শিশুদের মতো করে ছন্দ। বস্তুত, কবিতা পড়ার সময় ছন্দের তালে তালে তারা দুলতে ভালবাসত। কিন্তু এই কবির মনে হত কবিতার প্রধান কাজ ছবি ফুটিয়ে তোলা, আর একটা বাস্তবতা নির্মাণ করা, আর একটা ভুবন সৃষ্টি করা। ফলে তাঁর কবিতায় ভিড় করত নানারকম অজস্র ছবি, যা অনেক সময় অদ্ভূত, উদ্ভট, এমনকি অবিশ্বাস্য, যেন স্বপ্নে দেখা সব দৃশ্য। এটা ঘটনা যে তিনি নিজের দেখা স্বপ্নগুলো মাঝেমাঝে টুকে রাখতেন। পরিচিতদের বলতেন তাদের দেখা কোনও মজার স্বপ্ন তারা যদি তাঁকে বলে তবে তিনি উপকৃত হন। বাঘ তাঁর কবিতায় প্রায়ই আসত এবং বাঘকে তাঁর মনে হত চলমান আগুন। প্রজাপতিরা তাঁর কবিতায় মাটিতে বসে নিজেদের ডানা থেকে রঙিন ছায়া ফেলত। একটা কবিতায় তিনি লিখেছেন সূর্য থেকে আলো নিয়ে চাঁদ জ্বলে আর চাঁদ থেকে আলো নিয়ে জোনাকি। রঙিন শাড়ি তখনও বাংলাদেশে আবিষ্কৃত হয়নি। তবু তিনি এক জায়গায় লিখেছিলেন : 'আশ্বিন রঙের শাড়ি।’ 'জলের ওপর ভাসতে থাকা বুদ্বুদের অহঙ্কার' জাতীয় দার্শনিক বা আধ্যাত্মিক বাক্যও তাঁর কবিতায় পাওয়া গিয়েছে। তাঁর একটা আট পংক্তির কবিতায় একজন শান্ত, তৃপ্ত, প্রসন্ন, প্রেমময় মানুষ এক গোধূলিতে কোথা থেকে ক্রমাগত ঘন্টাধ্বনির রেশ শুনতে পেয়েছিল। ঘন্টাধ্বনি নয়, ঘন্টাধ্বনির রেশ। সময়কে চোখে দেখার বাসনায় তিনি ওটাকে তুলনা করেছিলেন পিঁপড়ের সারির প্রবাহের সঙ্গে। আর এমন একটা নক্ষত্রলোকের কথা তিনি একাধিক কবিতায় উল্লেখ করেছেন যেখানকার নিরঙ্কুশ মৌনতায় পা রাখলে কোনও জড়পদার্থে রূপান্তরিত হয়ে বেঁচে থাকার সাধ হয়।
লোকেরা হাসাহাসি করত তাঁকে নিয়ে। তিনি কষ্ট পেতেন, কারণ তাঁর ইচ্ছে করত নিজের কবিতা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে গভীরভাবে আলোচনা করতে। গোপন বেদনায় প্রায় পাথর হয়ে যেতেন যখন দেখতেন তাঁর বিদূষী স্ত্রীও (এটা সত্যি যে তাঁর স্ত্রী লেখাপড়া করতে পারত এবং অন্যের কবিতা সুর করে করে পড়তে ভালবাসত) তাঁর কবিতা নিয়ে ঠাট্টাতামাসা করছে। লোকে বলত তাঁর স্ত্রীর একজন কবিপ্রেমিক ছিল, যদিও তার স্বামী এ সম্পর্কে কোথাও কিছু উল্লেখ করেননি। কবিরা সাধারণত তাদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ, জ্বালা, হিংস্রতা তাদের কাব্যে ছদ্ম চরিত্র সৃষ্টি করে প্রকাশ করতে ভালবাসে। এই কবি তাঁর কোনও কবিতায় স্ত্রী সম্পর্কে কিছু লেখেননি। হয়ত তাঁর স্ত্রীর গোপন প্রেমিক থাকাটা মিথ্যে রটনা। হয়ত কাব্যে অন্য সব বিষয় নিয়ে লেখার ব্যাপারে তিনি এত নিমগ্ন থাকতেন যে নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিশেষ কিছু উল্লেখ করেননি। বস্তুত, প্রেমের কবিতাও তিনি খুব কমই লিখেছেন। জগতের নিগূঢ় রহস্য, বিভ্রান্তি, রূপ বা অরূপের নানা জাল ছিঁড়তেই তিনি এত ব্যস্ত থাকতেন যে নারীদের প্রেম, সৌন্দর্য, মধুর বা নিষ্ঠুর ছলনা সম্পর্কে গভীরভাবে ভাবার সময় পাননি। তবে এটা ঘটনা যে স্ত্রীকে ভালবাসতেন। এবং ভালবাসতেন তাঁর সবচেয়ে ছোট মেয়েকেও, যাকে বাংলার বিখ্যাত মশারা আট বছর বয়সে মেরে ফেলে।
একদিন তাঁর স্ত্রী তাঁকে তীব্র অপমান করল। দিনে কবি চাকরি করতেন স্থানীয় এক বণিকের দোকানে। নৌকো থেকে নামা মালপত্রের হিসেব রাখা। কিন্তু মাঝেমাঝে কামাইও করতেন। ফলে মাইনে কাটা যেত। পায়ে কাদা মেখে এক ভাদ্রের সন্ধেয় ব্যাঙের কলরব শুনতে শুনতে খালি হাতে বাড়ি ফিরলে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলে।
'কোথায় যাব?' সঙ্কুচিত মুখে কবি জিজ্ঞেস করলেন।
‘চুলোয়।’
'কেন বলছ ও কথা?' হেসে ফেলে কবি বললেন। 'আমাকে তো স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি যে চুলোয় যেতে হবে।’
‘তাহলে তাড়িয়ে দিচ্ছি। এক্ষুনি!’
কবির স্ত্রী হঠাৎ ছুটে গেল কুয়োতলায়, সেখান থেকে একটা গাছের ভিজে ডাল নিয়ে এসে কবির সামনে উঁচিয়ে তাঁকে বেরিয়ে যেতে বলল ।
অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে কবি দাওয়ায় বসলেন। শোবার ঘরে লম্ফ জ্বলছে। আজ রান্না হবে কিনা বুঝলেন না। কী করবেন সেটাও বুঝছিলেন না। বণিক টাকা দেবে না। বসে থাকতে থাকতে অনেক রাত হয়ে গেল। শেষপর্যন্ত রান্না হল এবং বউ ও ছেলে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তাঁকে খেতে ডাকা হল না, তিনিও খেতে দিতে বললেন না। গভীর রাত পর্যন্ত তিনি একইভাবে বসে থাকলেন। ব্যাঙেরা ডাকাডাকি করছিল। ওদের কীসে এত উল্লাস হয়, তিনি ভাবার চেষ্টা করলেন। কবিতা লেখার সাধ মানুষের ভেতর কেন এল, সেটা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করলেন। ঈশ্বরকে নিয়ে ভাবলেন। এবং হঠাৎ তাঁর মনে হল ঈশ্বর থাকা মানে জগতে সব কিছুই অর্থময়। তাহলে জগতের প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি বস্তু, এমনকি একটা ইটের টুকরোরও একটা তাৎপর্য আছে। কোনও একটা কিছুই নিরর্থক হওয়া মানে ঈশ্বরেরই নিরর্থক হয়ে যাওয়া। তাই যদি হয় তবে তাঁর কাব্যসাধনা, তাঁর অপঠিত, অবহেলিত কবিতাগুলোরও একটা অর্থ, একটা তাৎপর্য কোথাও থেকে যাবে। এবং সেগুলো হয়ত তাদের একটা সার্থকতা কোথাও খুঁজে পাবে।
ভোর হবার পর তিনি একটা মাটির হাঁড়ির ভেতর তাঁর সমস্ত কবিতার কাগজগুলো একে একে ঢোকালেন। তারপর হাঁড়িটা নিয়ে হাঁটতে লাগলেন নদীর দিকে। হাঁটতে তাঁর ভাল লাগছিল। অনেকদিন পর মনটা আশ্চর্য নির্ভার লাগছিল।
নদীর তীরে একটা পোড়োবাড়ি। জানলাদরজায় কাঠ নেই, শুধু বড় বড় ফাঁক। ভাঙনের সময় বাড়িটা ছেড়ে লোকে চলে গিয়েছে। কবি বাড়ির ভেতর ঢুকে একটা ঘরের অন্ধকারতম কোণে হাঁড়িটা নামিয়ে রাখলেন, মনে মনে এই প্রতিজ্ঞা করে যে আর কখনও কবিতা লিখবেন না, আর কখনও কাউকে তাঁর কবিতা পড়ার জন্য অনুরোধ করবেন না।
তিনি তাঁর প্রতিজ্ঞা পালন করেছিলেন। আর কখনও তাঁর খাগের কলম কাগজ স্পর্শ করেনি। মনে কখনও চিত্রকল্প এলে সেটা জোর করে দমন করতেন। তবে মাঝেমাঝে নদীর তীরে আসতেন। পোড়োবাড়িতে ঢুকে হাঁড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কখনও হাঁড়িটাকে হয়ত ছুঁতেন, কিন্তু ভেতরে হাত ঢোকাবার সাহস হত না।
কয়েক বছর পর নদীতে ভয়ঙ্কর ভাঙন শুরু হল। ছুটে এসে কবি দেখলেন ভাঙনের ঘায়ে বাড়িটা ক্রমে ভেঙে পড়ছে, কিন্তু হাঁড়িটা ইচ্ছে করেই বার করেননি। একদিন ভোরবেলায় দেখেন বাড়িটা নিশ্চিহ্ন, যেন হঠাৎ কোনও স্বপ্ন অদৃশ্য হয়ে গেল। বাড়িটার জায়গায় বইছে নিরাকার জলের স্রোত।
সারাদিন কবি ভূতগ্রস্তের মতো বসে নদীটাকে দেখে গেলেন। সন্ধেয় বাড়ি ফেরার জন্য যখন সরু, নির্জন, সাপের মতো শুয়ে থাকা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলেন, তিনি বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, 'তবু আমার কবিতাগুলোর একটা তাৎপর্য জগতে কোথাও হয়ত থেকে যাবে।' তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল।
'হ্যাঁ,' ঈশ্বর বললেন। 'থেকে যাবে। তোমার কবিতাগুলো আমি অন্তত পড়েছি।'
‘হাঁড়ি থেকে তুলে?' বাকরুদ্ধ কবি কোনওরকমে জিজ্ঞেস করেন।
‘না,’ ঈশ্বর উত্তর দিলেন। 'তুমি যখন ওগুলো মনে মনে রচনা করতে তখনই আমার পড়া হয়ে যেত। তুমি ঠিকই ভেবেছ, জগতে এমন কোনও বস্তু বা ক্রিয়া নেই যা আমার অক্ষর স্মৃতিতে স্থান পায় না। তোমার কবিতাও টিকে থাকবে আমার মনে। আর আমার ব্রহ্মাণ্ডে এমন একটা গ্রহ সত্যি আছে যেখানে প্রজাপতি বসলে তাদের গা থেকে রঙিন ছায়া মাটিতে পড়ে।’
পরদিন কবি আবার আসেন নদীর ধারে। অশান্ত জলের দিকে তাকিয়ে ভাবেন ওটার তলায় কোথাও ভেসে চলেছে হাঁড়িটা। কাগজগুলো বেরিয়ে জলে ভিজতে ভিজতে এতক্ষণে নিশ্চয়ই মাছের পাখনার মতো সাদা হয়ে গিয়েছে। ছেঁড়া টুকরোরা ভাসছে। ওদের গায়ে একটা অক্ষরও নেই। তবু কাগজগুলোর ক্রমশ নিশ্চিহ্ন হওয়ার এই গোটা ক্রিয়াটাও চিরকাল অক্ষয় হয়ে টিকে থাকবে ।


0 মন্তব্যসমূহ