ইন্তিজার হুসেইনের প্রবন্ধ : বিক্রম, বেতাল আর গল্প



ভাষান্তর: জাভেদ হুসেন

ছোটগল্পের ভবিষ্যত অন্ধকার। কারণ পৃথিবীতে গাছ যত কমছে মানুষ তত বাড়ছে। মানুষ ছাড়া আর কিছু যে পৃথিবীতে নেই সেখানে সাংবাদিকতা হতে পারে, গল্প আর কবিতা হয় না। সাংবাদিকতা আর বক্তৃতা নিছক মানুষের জগতের প্রকাশের মাধ্যম। কবিতা আর গল্প কেবল মানুষের প্রকাশের মাধ্যম নয়। তাদের জন্ম হয়েছে মানুষ আর না-মানুষের মিথষ্ক্রিয়া থেকে। গল্পের জন্ম সেই কালে যখন পৃথিবীতে বৃক্ষ ছিল অনেক আর মানুষ ছিল কম। রাত্রি নামলে আগুন ঘিরে থাকত অল্প কিছু মানুষ। আর সেই আগুনের থর থর আভার বাইরে ছিল অন্ধকার, কেবলই অন্ধকার, আর বৃক্ষ, অগণিত বৃক্ষ।

প্রকৃতির একটা সৃষ্টি প্রতিস্থাপন করা যায় আরেকটা সৃষ্টি দিয়ে। অরণ্যকে প্রতিস্থাপন করা যায় মরূভূমি দিয়ে, মরুভূমিকে উঁচু পাহাড় বা কোন সমুদ্রের উর্মিমূখর বেলাভূমি দিয়ে। ধ্যান, ভাবনার চর্চা আর সৃজনশীল কাজ বটবৃক্ষের ছায়ায়, পাহাড়ের গুহায়, আদিগন্ত মরুতেও হতে পারে। তবে কারখানার চার দেয়ালে? না, সম্ভব নয়। আর সম্ভব নয় আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা দিয়ে গগনচূম্বি শৈলশিখর বা ঘন অরণ্যকে প্রতিস্থাপিত করা।

এখন চারদিকে আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা, হৈ চৈ ভরা কারখানা, সারি সারি বাড়ি আর এপার্টমেন্ট … এসব থেকে মুক্তি নেই। শিল্প যুগের ছায়ায় এই মানুষের ভীড় আমাদের শহরেগুলোতেও আমাদের কল্যাণ করে যাচ্ছে। রাস্তায় ভীড় এত যে ক্রমাগত গাছ কাটা বাড়ছে আর চওড়া হচ্ছে রাস্তা। বাসভর্তি মানুষ। মটরসাইকেল আর ট্যাক্সির এত শব্দ যে চিৎকার করে কথা না বললে শোনা যায় না। এত কিছুর পরও যানবাহনের অভাব।

আবাসনেরও অভাব খুব সঙ্গিন। ঘর কম বাসিন্দা বেশি। নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠছে। গত কাল যেখানে অরণ্য ছিল আজ সেখানে বাড়ি আর এপার্টমেন্টের জঙ্গল। তবুও থাকার জায়গা পাওয়া যায় না। খালি বাড়ি অতীতের ব্যাপার। বহু বছর ফাঁকা পড়ে থেকে তালাতেও মরচে ধরেছে, এমন বাড়ি আজ আর দেখা যায় না। সে রকম বাড়ি ছিল রহস্যময়, কল্পনাকে উসকে দিয়ে তারা জন্ম দিত গল্প।

কল্পনা তাজা করার দায়িত্ব ছিল ফাঁকা রহস্যময় বাড়ির, কিছুটা ঘন বৃদ্ধ মহীররহের আর পাখির আর অন্য জীবদের। এসবই ছিল সমাজ জীবনের সক্রিয় অংশিদার। সন্দেহ নেই মানবতার প্রতি, মানুষের প্রতি তুলসি, কবীর আর নযিরের ভালবাসা শুধুই মানুষের জীবনের পথ বেয়ে আসত না। তার উদ্গম হতো মানুষ আর না-মানুষের সেই রহস্যময় সম্পর্কের মাঝ থেকে। আর তাই ছিল সেই সময়ের বিকাশমান সমাজের ভিত্তি।

তবে এখন আমাদের আকাশ্চুম্বি অট্টালিকা, কোলাহল ভরা কারখানা আর অতিকায় সব যন্ত্রের হাত ধরে আমরা প্রবেশ করছি নতুন বর্বরতার যুগে। সভ্যতার মতো দেখতে এই বর্বরতাকে ধন্যবাদ। তার কারণে অভিজ্ঞতার এলাকা আসছে কমে আর বাড়ছে ঘটনা ও তথ্যের জঙ্গল। অরণ্যের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক যত ভেঙে পড়ছে, মানুষ তত জঙ্গলের-জীব হয়ে উঠছে।

আজ আর বেতাল পঞ্চবিংশতি লেখা সম্ভব নয়। কেন? কারন বেতাল বলেছিল, ‘পথ চলার সময় ভালো বিষয় নিয়ে কথা বলে সময় কাটানো ভালো। তাই রাজা, যে গল্প বলবো তা শুনুন। আর পথে যদি আপনি কথা বলে ওঠেন তবে আমি ফিরে যাবো’। কিন্তু এখন আমরা অনেক কথা বলতে শুরু করেছি। বক্তৃতা, খবরের কাগজে বিবৃতি, সভা, আলোচনা… আমাদের পথগুলোও কোলাহলে ভরা। সেই পথে চলতে চলতে এখন আর মানুষ আর না-মানুষের মধ্যে আলাপ সম্ভব হয় না। নিরন্তর কোলাহলের মধ্যে আমরা এখন বধির হয়েছি। কিছু গলার শব্দ আমরা এখন আর শুনতেও পাই না।

পথে যখন রাজা বিক্রম কথা বলে উঠলেন, বেতাল ফিরে গিয়ে ঝুলে রইলো গাছে আর জন্ম হলো বাস্তবধর্মী গল্পের। সমাজ সংস্কার, রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরা, বিপ্লব, অঙ্গীকার… এগুলো রাজা বিক্রমের নিজের গড়ে তোলা দেবতা। অথবা একে ডি এইচ লরেন্সের ভাষায় বলা যায়, বাজে ধারণা আর মতামত ফেলার ঝুড়ি। এই ধারণা আর মতামতগুলো আমরা মাথার ভেতর বয়ে বেড়াই অথচ জানি না যে আমাদের ভেতরে নিঃশ্বাস ফেলে এক অন্ধকার মহাদেশ। গল্প বলা বেতাল ভাবনায় ডুবে অনেক দূরে কোথাও ঝুলে আছে কোন গাছে। আর রাজা বিক্রম মাথার ভেতরে বাজে মতামতের ঝুড়ি নিয়ে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। দাবি করছেন যে তার কথাই একমাত্র গল্প! মানুষ যখন মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তার বদলে বেছে নেয় বাজে ধারণার ঝুড়ি তখন সে গল্প কেমন হতে পারে?

বাস্তবধর্মি ঐতিহ্যে লেখা গল্পগুলোর দিকে তাকান। তার পর তাকান সেই ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে লেখা গল্পগুলোর দিকে। দুই ধারার কোন গল্পেই বেতাল কথা বলে না। দুই ধারাতেই রাজা বিক্রম তুলে ধরেন তার উঁচু ভাবনার পসরা। কখনো ডাক দেন বিপ্লবের, কথা বলেন অঙ্গীকারের। কখনো বেছে নেন সমাজ সংস্কার, কখনো আশাবাদের বার্তা দিয়ে সাহস দেন নিজের মানুষদের। ভীড় তো অনেক বড়! তাঁরই বা আর উপায় কী?

বাসে-ট্রামে, সিনেমা হলে, সংস্কৃতি নিয়ে বক্তৃতায় যে সমাগম, তাদের আছে প্রত্যেকের নিজস্ব রুচি। আছে নিজের পছন্দ অপছন্দ। যখন কারো রুচিমতো কিছু হয় না, তখন চিৎকার ভেসে আসে, ‘এর কবিতা ভালো না, মার একে’। গালিব যেমন বলেন:

নিপীড়িত আমাদের জগত কত না সংকীর্ণ
যেখানে পিঁপড়ের একটা ডিমও আকাশ মনে হয়

কী তংগ হাম সিতমযাদগান কা জাহান হ্যায়
জিস মেঁ কে ইক বায়যায়ে মোর আসমাঁ হ্যায়

যে দিকে তাকাই শুধু মানুষের মুখ! এ কেমন জগত? বৃক্ষ, শিকারি প্রাণী আর ছায়ার যে বাকি মহাবিশ্ব … সে কোথায় গেল?

এক সময় এমন গল্প ছিল যেখানে মানুষ আবির্ভুত হতো মহবিশ্বের অংশ হিসেবে। কখনো মানুষের চেহারার মাঝে, কখনো অজানা না-মানুষের ভীড়ে পরিবৃত হয়ে, কখনো শহরে, কখনো সেই শহর থেকে দূরে অরণ্যে। সে ছিল মানুষের এমন জগত যেখানে জানালার ওপারে ছিল অজানা অরণ্য। সে জগত নিয়ত ভ্রমণ করত জানা থেকে অজানায়। সেই বিপদসংকুল ভ্রমনে দেখা হয়ে যেত বেতালের সাথে, কখনো লড়তে হতো অপদেবতা বা আজদাহার সাথে। কখনো বা ধারণ করতে হতো অন্য শরীরও। সে পথে পিছিয়ে পড়লে পেছনেই থেকে যেতে হতো। কিন্তু যে এগিয়ে যেতে পারত, সে হয়ে উঠত মানুষ।

এই নতুন যুগ মানুষের জগত থেকে অরণ্যকে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে। মানুষ যে দিকেই এখন যাক, কোন দিকেই সে আর কোন হরিণ দেখতে পাবে না। অনুসরণ করার মতো কাউকে না পেয়ে তাই হারাবে পথ। নতুন গল্প লেখক ভেবেছেন অরণ্য সত্যিই অদৃশ্য হয়েছে। তিনি শুরু করেছেন এমন এক মানব জগত তুলে ধরা যেখানে জানালার ওপারে কোন অরণ্য নেই। কিন্তু মানুষ তো নিজেই নিজের দুশমন। এই দুশমনের জন্ম হয়েছিল নগরে। আর কোন জাদু ছাড়াই সে হরেক রকম শরীর ধারণ শুরু করেছে।

অরণ্যের মাঝ দিয়ে পথ চলার সময় মানুষ যদি বিভিন্ন শরীর ধারণ করে তাহলে নিজের চেষ্টায় সে নিজের শরীরেই ফিরে আসে। বিভিন্ন শরীরে তার প্রবেশ, তারপর নিজের শরীরে ফিরে আসা মানুষের সারসত্ত্বার বিজয় ঘোষণা করে। প্রাচিন গল্পে এই মানুষের এই মহাকাব্যের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কাফকার মানুষ তার শরীর পরিবর্তন করেছে শশব্যস্ত শহরের মধ্যে। নিজের শরীরে ফিরে আসার ভাগ্য তার আর হয় না। মানুষের সারসত্ত্বার মৃত্যু সেই মহাকাব্যের সেই গল্পের মৃত্যু। আর তা যে শুধু ইউরোপে হয়েছে এমন নয়। যেখানেই মানুষ এমন পরিস্থিতির শিকার হবে সেখানে একই ঘটনা ঘটবে।

কিন্তু সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীরা বলেন, ‘এমন কথা বোলো না! তাহলে হতাশার আগুনে ঘি ঢালা হয়, মানবতার অবমূল্যায়ন হয়। মানুষ মহান, হে ঈশ্বর; সে তো বানরে পরিণত হতে পারে না’। আর এ যদি হতাশা হয় তাহলেই বা কী? কেবল মানুষই হতাশ হয়। বানর হতাশ হয় না। হতাশ হওয়া আর কবিতা লেখা ছিল মীর তকি মীরের নিয়তি। বানর হতাশ হয় না কবিতাও লেখে না। তবে বানরের হাতে মীরের রচনাবলী পড়লে তা নিশ্চয়ই ছিঁড়ে তারা টুকরো টুকরো করতে পারে। প্রগতিশীল সমালোচনা মীরকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করেছে। মীর আর যে কবিতায় যে গল্পে হতাশার গন্ধ আছে প্রত্যেকটার হয়েছে এই হাল। ‘মাঁনুষের গঁন্ধ পাঁউ! মাঁনুষের গঁন্ধ পাঁউ!’

মুনির নিয়াযির কিছু পংতি পড়ে অবাক হই। এই কালে, শহরের পথে হেটে, এই মানুষটা কেমন করে হঠাৎ অরণ্যের মাঝে হাজির হন? আমি অবাক হই! ঈর্ষা হয় আমার। কারন নিরন্তর শহরের মাঝে হাঁটা, এই ভিড়ের মাঝে নিঃশ্বাস নেয়া আমার ভাল লাগে না। আমার মানবিক গুণগুলো যেন ক্রমে ক্ষয়ে যায়। তাহলে, কেন আমি কোনো নির্জন কোণে এসে শহর পেছনে ফেলে নিজেকে অরণ্যে খুঁজে পাব না?

অরণ্যে মানুষের যে ভয় তার সাথে নগরের ভয়ের তফাৎ আছে। অরণ্যে ভয় অজানার। অজানার ভয় মানুষের চরিত্রে গভীরতা আর ধারণ ক্ষমতার জন্ম দেয়। কিন্তু আজ অজানার ভয় নেই হয়ে গেছে। এখন আমরা জানা জিনিসের ভয়ে আচ্ছন্ন। যুদ্ধের ভয়, গৃহযুদ্ধের ভয়, ভাষা দাঙ্গার ভয়, সড়ক দূর্ঘটনায় মরার ভয়, রাস্তায় ছিনতাইয়ের ভয়। এই ভয় অপমানজনক আর কী লজ্জার এসব মৃত্যু!

বুদ্ধ বলেছিলেন—মানুষ শিশুর মতো, গল্প শুনতে ভালবাসে। তাই তিনি গল্প বলেছেন। যিশু গল্প বলেছেন রূপকে। এক গল্পে তিনি বলেছেন, ‘দেখো ডুমুর গাছের দিকে আর সব গাছের দিকে। যখন তাদের কলি ফোটে, আমরা বুঝি যে গ্রীস্ম এলো।‘ কিন্তু পৃথিবী যখন বৃক্ষ শূন্য তখন আমরা কী করে বুঝবো শীত আর গ্রীস্মের কথা? কী করে বলবো গল্প, উপকথা আর কাহিনী? ছেলেবেলায় যে নিম গাছটা আমাকে গ্রীস্ম আর বর্ষার কথা জানাতো জানি না আজ সে কেমন আছে? সে কি এখনো দাঁড়িয়ে আছে না কি সে উৎসর্গ হয়ে গেছে? কবীরের কথা স্মরণ করুন, ‘ছুতোরকে আসতে দেখে গাছেরা কাঁপে ভয়ে’। কিন্তু এখন এই সমাজের সকল বৃক্ষ ভয়ে কাঁপে, উপড়ে যাওয়ার ভয়ে।

শিল্প সমাজের শিশুরা আর নিজেদের শিশু ভাবে না। গল্প শুনতে ভালবাসে না তারা। বেতালকে তারা চুপ করিয়ে দিয়েছে। নিজেরাই এখন তারা কথা বলে উঁচু স্বরে। চিৎকার করে শ্লোগান দেয়। তারা বলে যে এই শ্লোগানই আজকের গল্প। তাহলে গল্প লেখার জেদ ধরি কেন আমি?

এই জেদের কারন হয় তো সেই নিম গাছ। সে নিম গাছের একটা আমার ভেতরে। আরেকটা আমার বাইরে। বাইরের নিম গাছটার যাই হোক না কেন, ভেতরের নিম গাছটা যেন না মরে। আমার অঙ্গিকার আমার নিম গাছের কাছে যার ফল তেতো। কোন বসন্তের আশা না করেই আমি গাছকে জড়িয়ে ধরিয়ে রাখি। জড়িয়ে ধরে রাখি নিম গাছকে আর গল্পকে। কারন মানুষ আর শিশুর মতো নেই। ওরা আর গল্প শুনতে ভালবাসে না।

(বিক্রম, বেতাল, অউর আফসানা- লাহোরের লফয পত্রিকা, জানুয়ারি ১৯৭৪ সালে ছাপা)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ