বিধুভূষণ সম্পর্কে কিছু কথা বলতে গেলেই মনে পড়ে যাবে কালবৈশাখীর ঝড়ে উল্টে যাওয়া ছাতার বিপন্ন দৃশ্য। আমবাগানে আম পড়ে থাকা আম গাছতলা। আর অকাল বৃষ্টির শিল পড়ে থাকা সাদা মাঠের মুহূর্ত। চোতের শেষে বহুরূপী ভোলানাথের ভেংচি, অতি ফলনের ফলে টমেটো আলু শসার দাম না পেয়ে চাষি হাইরোডে ফেলে রেখে চলে যায়, ভারী মোটরযান বা মালবাহী যান শস্য ফসল থেঁৎলে ও পিষে দিয়ে চলে যায়। সাইকেল রিপেয়ারিংয়ের দোকানের দেওয়ালে ঝোলানো শ্মশান কালীর ছবি। কলাপাতার ওপরে জড়ো করে রাখা কানা ও কুচো ট্যাংরা, অভাগীর ডুমুরের ডালনার পিতলের বাটি। লোহার তোরঙ্গের মধ্যে কুষ্ঠি ঠিকুজি, জমানো পুরানো দত্যি দানোর চিত্র। রিপু করা ফতুয়া, ছেঁড়া ধুতির ফাঁক ফোকরের সঙ্গে তাম্বাকু সেবনের হুঁকো। কাঠের তক্তা পেতে দেওয়া কানা নদীর ওপরে বিগতখানেক এক সেতু। সেতুর ওপারে চোর জোচ্চরদের জুয়া খেলার গোপন আসর। মোটরযান মেরামতির দোকানের এক কোণে বিকল শ্যালো, বাটখারা, দাঁড়িপাল্লার বিচ্ছিন্ন পাল্লা আর ঘরের দেওয়ালে ভাঙ্গা আয়না। তারপরে বোলান, অনুরূপা বিবি, জগদীশ, বলরাম বিধুভূষণের খাস লোক, এদের মনে পড়ে যাবেই। মৃত পশুর শ্মশান, জল জমানোর মাটির পাত্র, পিলসুজ, চোতের পূর্ণিমার রাত্রে শীতল এক রাতের চাঁদ। রাত প্যাঁচা এ বাড়ি ও বাড়ির ছাদে উড়ে উলুধ্বনি দিয়ে, ভোরে বটের কোটরে ফিরে যায়। বিক্রমগঞ্জের হাট, মাটির কলসি ও রকমারি পাত্রের আয়োজন। খোলা মাঠের শীর্ণ পিচের রাস্তার পাশে ফুলকুসুম মাসির চায়ের দোকানের বেঞ্চি, শহরের আদালত থেকে গভীর রাতের বাসে গ্রামবাসীদের গ্রামে ফিরে আসা। গ্রামীণ এক স্বৈরাচারীর অপকর্মের ঘৃণিত তালিকা। মানুষখেকো উলঙ্গ ভুতেদের নেত্য। খাগের ডগায় ধর্ষিতার রক্তের ছিটা, মিথ্যা কথার সাগরে ডুবে থাকা মুখরোচক প্রতিশ্রুতি। এক ঝাঁক ছাতার উড়ে যায় যেমন, তেমনই বিধুভূষণকে মনে করলেই অনেক কথা মনে পড়ে যায়। এই সব বাচালের প্রলাপের মতো কথাগুলি মনে পড়ে যাবে।
কিন্তু তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রবল ইচ্ছে থাকলে, অথবা তার বাসখানার দিকে যেতে হলে আগে থেকেই নিজের গোপন কথা ও হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি সম্পর্কে খুবই সজাগ থাকতে হবে।
না হলে ......
গ্রামে গঞ্জে এমন মানুষ থাকে, যাদের দেখলে অনেক অনেক কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু বিধুভূষণকে মনে করলেই মাত্রাহীন কথাগুলি ঝাঁকে ঝাঁকে আসবে, আবার মিলিয়ে যাবে স্মৃতির বায়ুর সঙ্গে।
সেদিন নরেশ গ্রামীণ বলছিল, বিধুকাকা এমন এক মানুষ, কেন যে তাকে মনে করলেই বিরামহীন অনর্থক কথা মনে পড়তে থাকবে। আর বিরক্তিকর একটি তল্লাটের চিত্র আক্রান্ত করবে। হীতেশ জানা কথায় কথায় নরেশ গ্রামীণের কাছে জানতে পারল, বেশ কয়েকদিন হল, বিধুভূষণকে নজরে আসছে না। কেউ তার খোঁজ দিতে পারছে না।
নরেশ গ্রামীণ বলল – তুমি যতটুকুই জানো আমি ততটাই জানি।
তুমি কি করে জানলে আমি কতটা জানি?
ঐ যে বললে যতটুকু?
গত পরশু বিকেলে, আমার ঘরের পাশে ওয়াহিদের ঘর, আমি যখন বিধুভূষণের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, তখন ওয়াহিদ আমাকে ডেকে বলল, বিধুকাকা কোথায় গেছে? তল্লাটের কেউ কিছুই জানে না। ভাবলাম মানুষ তো এমনই নিখোঁজ হয়ে যায়। কোথায় যায় পরে জানা গেলেও অনেক সময় জানা যায় না, অথবা যে যায় ফিরে এলেও খোলসা করে বলে না, কোথায় গেছিল? মানুষের যাওয়া আসা যেমন স্বাভাবিক, আবার কখনো কখনো তা রহস্যময়।
ওয়াহিদের কথাটি যে ভণিতা মাত্র তা আমার বুঝতে মোটেই হোঁচটাতে হল না। ওয়াহিদ বিধুভূষণের খাস লোক। সে বিধুভূষণের গতিবিধি জানবে না তো কে জানবে?
বিধুভূষণের বাসখানার দিকেই পা বাড়ালাম, ওয়াহিদকে বলে গেলাম, একবার যাই, দেখে আসি। যদি দেখা পাই, অনেক কথা আছে বিধু মাতব্বরের সঙ্গে। তিনি তো আমাদের মাতব্বর। তাকে যে সব কথাই জানাতে হয়। তিনি আমাদের আশা আখাঙ্খার প্রতিনিধি।
ওয়াহিদ বলল – যারা যায় সবাই বলে বিধুকাকার সঙ্গে অনেক কথা আছে। সবারই কি অনেক কথা থাকে? আর বিধুকাকা কি সবার কথা শুনে মনে রাখে? মনে হয় না।
বললাম – তোমারও কি বিধু মাতব্বরের সঙ্গে কথা থাকে না?
থাকলেও বা? বিধুকাকা কি সবার কথা শোনে? বিধুকাকার দেখাই যে পায় না সকলে। তবুও মানুষ যায়। ওই যে যায় ওই যাওয়ার কল্পনাটুকুই যথেষ্ট। বিধুকাকা আছে, বিধু কাকারা থাকে। তাদের মৃত্যু নাই। তার কাছে সবারই যেতে হয়, কারণ তিনি আমাদের মাতব্বর। অনেক সমস্যার সমাধানের কৌশল তিনি জানেন। বাতাসকে মুঠোর মধ্যে ধরা যায় না। বিধু কাকাকেও ধরা যায় না।
আসলে বিধুভূষণের বাড়ির দিকে যেতে যেতে অনেক কথাই ক্ষয়ে যায়। ওই যে বিধুকাকার কথা মনে পড়লেই, অনেক কথাই মনে আসতে থাকে। কতকিছু মনে পড়ে যাবে, একটি দেওয়াল, গোয়ালঘর, পণ্ডিতের খড়ম, কয়লার রেল ইঞ্জিন, সিরাজ গাঁয়ের বিল, নুপাইয়ের পঞ্চায়েত অফিসের বাদাম গাছ। নৈনি বিহারির খৈনির চালাঘর, ফরাসের হাই রোড।
আমারও তাই। কালিবাউস মাছ, বৈকুণ্ঠপুরের কয়েদখানা, সীতারামের আস্তাবল, নালা খালে মাছ ধরার ফাঁদি জাল। কত কিছু। মনে পড়ার জন্যও চাই মনে রাখার জন্য স্মৃতির ভাণ্ডার।
ওয়াহিদের সঙ্গে কথা বলার পরে, আমার যাওয়ার মনের ইচ্ছেটির যেন মরে যাচ্ছিল। তবুও সামান্য ইচ্ছেটিকে সঞ্চয় করে, এগিয়ে যাচ্ছিলাম, ওয়াহিদ বলল – যাচ্ছ, যখন যাও। দেখ একবার গিয়ে, দেখা পাও কি না? সেই সকাল থেকে যা শুনছি। মনে ভরসা করতে পারছি না। যদি দেখা পাও ফেরার পথে আমাকে জানিয়ে যেও। বিধু কাকার দরবারে আমার খাস কাজ আছে।
বললাম – যদি এই পথ দিয়ে ফিরি তাহলে অবশ্যই বলে যাব দেখা হল কি না?
ওয়াহিদ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে – যাও দেখা পাবে।
*
ওয়াহিদের বাড়ি থেকে বিধুভূষণের বাড়ি যাওয়ার রাস্তাটি অনেকটাই ঘুরপথ। ধনুকের মতো বাঁকা। নিজের গ্রাম নাদনগঞ্জ থেকে অনেক দূরে, শিকড় দিঘি পাশে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকলাম। একটা শীতলামন্দির, পাখির নক্সার সংগ্রহশালা, রসুলবাঁকের তাঁতকলের আখরা, জানা কাহারদের ঘর, তেঁতো আমের গাছ, একটু এগিয়ে গেলে, বোলান, অনুরূপা, জগদীশ, বলরাম – বিধুভূষণের সহোদরদের ঘরবাড়ি।
এইসব অতিক্রম করার পরে দানবীর বিক্রম পঞ্চাননের উসুলের দরবার। হাঁটতে হবে, পরের পর কি কি নামকরণের স্থান আসবে মনে রাখতে হবে। যাওয়ার সময় কাউকেই বলা যাবে না, বিধুভূষণের বাড়িতে যাচ্ছি। মৃধা পণ্ডিতের তল্লাট হয়ে নসিবপুরের চৌমাথা, সামনেই সর্পদেবীর থান। তারপরেই জ্যামিতির বাক্সের মতো নক্সাকাটা প্রাসাদ না কি !!!
কথায় আছে, বহুদূরের স্টেশনে কোনো এক রেলযাত্রীর ঘড়িতে কটা বাজে বিধুভূষণ বলে দিতে পারে। বিধুভূষণ বহুদূরের বিবরণ দেখতে পায়। এই ক্ষমতা না কি তার চতুর্থ মাত্রা জ্ঞানের মতো। এই চতুর্থ মাত্রা জ্ঞা্ন সম্পন্ন মানুষজনকে বিশেষ দেখা যায় না। অর্থাৎ সামনে ও পিছনের বস্তু একই সময়ে, একই নজরে দেখতে পায়।
বিধুভূষণের বাড়ির দিকে যে আসে বিধুভূষণ বহুদূর থেকেই তার গতিবিধি জানতে পেরে যায়। যে আসে তার পথের গতিপ্রকৃতির দিকে কঠোর নজর রাখে বিধুভূষণ। অর্থাৎ তার গতিবিধি ও উপস্থিতি তার পক্ষে কতটা নিরাপদ ও তার পক্ষে কতটা লাভদায়ক। যেমন তার সাক্ষাৎপ্রার্থী কোথায় দাঁড়িয়ে জর্দা বা সাদা পান খেল, পান খাওয়ার পরে কোথায় পানের পিক ফেলল বা কর্মরত অথবা বাড়ি ফেরতা মাঠকর্মীর সঙ্গে কি কি কথা বলল, সেই কথার হুবহু বিবরণ দেবে বিধুভূষণ, সাক্ষাৎ প্রার্থী যদি কোনো কথা গোপন করে রাখে, বিধুভূষণের সেই গোপন কথা জেনে ফেলে, বিধুভূষণের কাছে কারও কোনো কথাই গোপন থাকে না, বিধুভূষণের সঙ্গে যারা যারা দেখা করতে আসে, তারা নিজেরাই নিজেদের গোপনকথাগুলিকে আগে থেকেই মনে মনে আউরে নেয়। মনে করে নেওয়ার কারণ, অনেক গোপন কথাই মানুষ ভুলে যায় যে কথাগুলি বা ঘটনাগুলির স্মৃতি তাকে আক্রান্ত করতে পারে বা অনুশোচিত করতে পারে। কাজেই নিজের মধ্যে সঞ্চিত গোপন কথাগুলি সম্পর্কে বিধুভূষণের সাক্ষাৎপ্রার্থী আগে থেকেই সতর্ক হয়ে যায়। যারা যায় তারা আগে থেকেই এতটাই সচেতন থাকে যে নিজে থেকেই বিধুভূষণের কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে না হয়।
বিধুভূষণের খাস লোকজনের মধ্যে আমার প্রথম দেখা হল, অনুরূপা খালেদা বিবির সঙ্গে। অনুরূপা বিবি স্থানীয় পঞ্চায়েত অফিসের ধান সংগ্রাহক। যে সব চাষি ধান বিক্রির জন্য কোনো উপায় খুঁজে পায় না, তাদের সাহায্য করে অনুরূপা খালেদা। সরকারি দামে ধান কিনে নিয়ে আঞ্চলিক ধানঘরে সঞ্চয় করে রেখে দেয়। পরে একসময় ভালো খরিদ্দার পেলে সামান্য মুনাফায় ধান বিক্রি করে দেয়। এতে চাষিও ন্যায্য মূল্য পায়। ক্রেতাকেও অধিক মূল্য দিতে হয় না। মুনাফার অর্থ যৌথ খামারের তহবিলে জমা দিয়ে হিসেব বুঝিয়ে দেয় অনুরূপা। অনুরূপার এই কাজ কম্মের পিছনে না কি বিধুভূষণের ছক আছে। অনুরূপা ধান কেনা ও বিক্রির সময় বারে বারে বিধুভূষণের নাম করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলে– তিনি আমাদের মান্যবর, আমাদের মাতব্বর। তিনি রাতের অন্ধকারে বটগাছের নিচে হাজার জোনাকির আলো।
অনুরূপা বিবি অঞ্চলের খাস লোক, উলেমান ফকিরের তালাকের বিবি। প্রায় পচিশ কোষ দূরে, নিকুঞ্জপুরে উলেমান ফকির আখরা বানিয়ে পুনারায় শাদী করে, দিব্য আছে। অনুরূপা বিবি বিধুভূষণের দরবার করে, আর ধান সংগ্রহ করে দিনাতিপাত করে। বিধুভূষণের চৌকির পাশে বসে হুক্কার মুখে কাঠ কয়লা ফেলে দেয়। এ ছাড়া খাস তদারকির মধ্যে বিধুভূষণের বাসখানায় হেঁসেলের ভিতরে চুল্লির মুখে ফুঁ দিয়ে আগুন উসকে দেয়। রান্না হয়, কুচো মাছের ঝাল হয়, কলমির সেদ্ধ, লাল চাউলের ভাতের সঙ্গে আম পোড়া হলুদ লবণের জল। অন্যথায় পাকা তেঁতুল সিদ্ধ জলের কয়েক ঢোঁক।
অনুরূপা বিবির সঙ্গে তার চালার নিচে বসে খানিক কথা হল, নিজের কৌতূহলকে চেপে রেখে, বলেও ফেললাম – শেষ কবে গেছিলাম মনে করতে পারছি না। বিধু মাতব্বরের দরবারে যাচ্ছি। কিন্তু তার দেখা পাইনি। গিয়ে দেখি তার বাসখানার দরজার পাল্লা বন্ধ। উঠান দেখে মনে হল, বহুদিন উঠানে ঝাঁটা পড়েনি। গাছের শুকনো পাতা পড়ে আছে।
অনুরূপা বিবি বলল – দুইবার গেছ, তুমি নিশ্চিত?
কেন? এই কথা বলছ কেন?
বলছি অনেক কারণ আছে?
কি কারণ?
কত মানুষ যায় আসে কার নাম মনে রাখতে পারে আমাদের মাতব্বর? আমার তো মনে হয় আসলে কেউ যায় না। আসলে সবাই যায় কিন্তু মাতব্বরের দেখা পায় না। অথবা মাতব্বর দেখা পেলেও মনে রাখে না।
সে কি !!! তিনি তো আমাদের প্রতিনিধি। আমাদের সকলের মাতব্বর।
তাতে কি হয়েছে?
আমি কেন জানি এক চিন্তকের মতো বললাম - আমরা সবাই কি দেশের কাছে যাই? মাতব্বরের কাছে যাই। আমরা যাই একটি ব্যবস্থার কাছে। আমরা সবাই নিজের দেশ ভুলেছি। মাতব্বরকে মনে রেখেছি। শুনেছি তুমি ওর হেঁসেলের চুল্লিতে ফুঃ দাও।
অনুরূপা খালেদা ক্ষণেক হি হি করে হেসে, গোপন কথা জেনে ফেলেছ যে।
তুমি বিধুভূষণের খাস লোক। তোমাকে দেখে তাই থেমে গেলাম। জানতে চাইলাম।
এখন আমাকে বিরক্ত কোরো না। আমি এখন বিধু মাতব্বরের চুলাতে ফুঃ দিচ্ছি। লাল চাউলের ভাত সেদ্ধ হতে বিস্তর সময় লাগে। যব পিশাইয়ের জন্য চাটাই পেতেছি দেখছ না?
অ। বিধুভূষণের জন্য রান্না করছ বুঝি? তা বিধুভূষণ তো নাই বলছ যে?
নাই বলে জগত সংসারে কিছুই নাই। সব আছে। আছে সব।
আমি পা বাড়ানোর আগে, বললাম – বড়ই দোনোমনায় পড়ে গেলাম। ঠিক করে বলো তো তুমি কোথায় আছো? তুমি কি বিধুভূষণের হেঁসেলে না কি খাজনা আদায়ের কাছারির ভিতরে? না খামারে?
তুমি কি দেখছ?
একটি মাটির দেওয়াল। দেওয়ালের ওই দিকে একটি সরু ফালি মাটির রাস্তা।
হ্যাঁ। ওই রাস্তা গেছে ঈদগায়ের দিকে।
তুমি এত জায়গায় আছো?
যেখানেই থাকি, যেখানে আছি সব মাতব্বরের নির্দেশে।
তিনি কি সশরীরে নির্দেশ দেন?
তার নির্দেশ আমরা কেউ দেখতে পাই না।
হাসালে। নির্দেশ কি দেখা যায়?
তুমি ব্যবস্থা বোঝো না।
*
চোখে দেখে যেমন চেনা তেমনই। বোলানকে প্রথমে দেখে সন্দেহ হল। বোলান তো? বোলান নিজেই এগিয়ে এল। কাঁধে তার ফুটফুটে সাদা রঙয়ের একটি কাকাতুয়া। আমাকে দেখে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, থেমে গেল, তারপরে কপাল কুঁচকে বলল – নিবারণ তো?
বললাম – হ্যাঁ। নাদনগঞ্জের।
এই পথে? কোন দিকে?
ভালোই হল। একটা কথা জেনে নিই তোমার কাছে?
জেনে কি হবে?
আপনে কি করে জানলেন আমি কি জানতে চাই?
জানব না? কেউ গিয়ে তার দেখা পেয়েছে?
কার সঙ্গে দেখার কথা বলছেন?
এই তো ওয়াহিদের সঙ্গে কথা বলে এলে? আমি তো পাখির নক্সার সংগ্রহশালায় গেছিলাম। সেই ফেরার পথেই তোমাকে দেখলাম। তুমি আর ওয়াহিদ এইসব কথা বলছিলে।
কোন সব কথা গো?
বিধু কত্তার বাসখানার দিকে যাচ্ছ, সেই সব কথা।
তুমি তাহলে শুনে ফেলেছ?
বিধুকত্তা পাখির সংগ্রহশালায় অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। নীহারুদ্দিন অনেক পাখির পালক সংগ্রহ করেছে, পাখির ওপরে অনেক কাজ হচ্ছে। গ্রামে গ্রামে এখন অনেক পাখির প্রজাতি হারিয়ে যেতে বসেছে। সেই সব পাখির পালকের সংগ্রহের কাজ করছে নীহারুদ্দিন। বিধুকত্তার কথামতোন পাখির সংগ্রহশালায় কাজ হচ্ছে।
আমি বোলানের মুখের ওপরে কথা বলব কি বলব না, ভাবছিলাম, তাও কিছুটা সাহস সঞ্চয় করে বললাম – বিধুভূষণ কি অনুদানের কথা পাকা করেছে?
এই কথা বলার অধিকার তোমার নেই।
গোটা সংসারের পাখিকে ভালোবেসে পাখির পালককে ভালোবেসে কাজ করছে নীহারুদ্দিন। এই পৃথিবী জন্নত দুনিয়া শুধু মানুষের নয়, পাখিরও। জগতের সব পশুর।
বিধুকত্তা ভালোকরেই তা জানে। সে সবকিছু জানেই বলেই, তিনি আমাদের মাতব্বর। তুমি যাচ্ছ, যাও। দেখা করে এসো। দেখা না পেলেও মাতব্বর তোমার সমস্যার কথা জানতে পারবে। একবার গিয়ে টোকা দিয়ে এসো।
শুনে এলাম কয়েকদিন হল তার কোনো সংবাদ নাই।
তাতে কি হয়েছে? যে যায় তার সমস্যার কথা বিধুভূষণ মাতব্বর আগেই জেনে রাখেন।
হ্যাঁ। তার কাছে কোনো কথাই গোপন থাকে না।
একটা প্রকৃতি উদ্যান তৈরি হচ্ছে।
আমার কি করণীয় আছে?
দেশের যে কোনো কাজে সবার কিছু না কিছু করার থাকে।
দেশ আর কোথায়? এক এক মাতব্বরের এক এক তল্লাট। আমাদের প্রতিনিধি ওই বিধুভূষণ মাতব্বর। আমাদের মতো অনেকেই তার কাছে যাই। কিন্তু তার দেখা পাই না। আমিও তার কাছে যাচ্ছি অনেকটাই অনিশ্চয়তা নিয়ে। জানি না.........
একটি বলদযান সশব্দে গড়িয়ে গেল। গাড়োয়ানের মুখটি গামছা দিয়ে ঢাকা ছিল। বলদযান বোঝাই পুঁথিপত্র, দস্তাবেজ, বাদ্যযন্ত্র, গানের কল, ভাঙ্গাচোরা কলমের ডাই, কয়েকটি সামুদ্রিক ছবি, উট শুয়োর শিয়ালের কঙ্কাল আর বেশ কিছু এক্স রে প্লেট বোঝাই করা। ভাঙ্গাচোরা চিকিৎসা কেন্দ্র, বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে ঘাস, প্রধান শিক্ষকের টেবিলে কাটা খাসির মুণ্ড। গরু ছাগল গাধা শুয়োর পাচারের ময়দান। রাস্তাঘাটে পড়ে আছে কবির কবিতা। বাদ্যকারের ভগ্ন বেহালা।
*
বলরাম গড়াই বিধুভূষণের আরেক খাস লোক।
আমাকে দেখে, আমার দিকে এগিয়ে এসে নিজে থেকেই বলল– এই পথে তোমার যাতায়াত হয় না নিবারণ? বহুদিন পরে এই পথে তোমাকে দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি।
বিধুভূষণের বাসখানায় যাচ্ছি।
বিধু মাতব্বর কিন্তু জানতে পেরে গেছে তুমি তার কাছে যাচ্ছ।
সে আমি জানি। কি কারণে আমি তার কাছে যাচ্ছি, তাও তিনি জানেন। তিনি এমনটাই জেনে থাকেন। মাতব্বর শ্রেণি আগে থেকেই এমন জানেন।
কিন্তু কথা হচ্ছে, তুমি কি আদৌ তার সাক্ষাৎ পাবে? কে জানে? কত লোক তার সাক্ষাৎ না পেয়ে ফিরে যায়। বিধু মাতব্বরের বাড়ি থেকে ফেরার এটাই একমাত্র পথ। অন্য তিন পথে জঙ্গল, নদীর ঘাট ও শ্মশান। আমি নিশ্চিত আগের দুইবারের মতো এবারও তুমি বিধু মাতব্বরের দেখা পাবে না। আরও নিশ্চিত হয়ে বলছি, আগামী দিনেও তুমি বিধুভূষণ মাতব্বরের দেখা পাবে কি না জানি না।
কে জানে? এই অনিশ্চয়তার কথা তুমি জানো।
আমি জানি, তুমি দেখা না পেলে, ফিরে যাবে এই পথ দিয়েই।
তুমি বিধুভূষণের খাস ও বিশ্বস্ত লোক।
আমার সঙ্গে বিধু মাতব্বরের দেখা হবে, আমি শুধু তাকে তোমার কথাটি মনে করিয়ে দিতে পারি। তার আগে তোমার যাওয়ার কারণটি একবার আমাকে টোকা দিয়ে রাখতে পারো। বলব নাদনগঞ্জের নিবারণ, আপনের সঙ্গে দেখা না পেয়ে, আমার কাছে তার কথা জমা রেখে গেছে। আপনের কি মনে পড়ছে? যদি মনে পড়ে, তাহলে ওর জন্য একটা ব্যবস্থা দিয়ে রাখেন।
হ্যাঁ। আমি খুবই সংকটে আছি।
সংকটের কথাটি একবার যদি বলো?
বিধুভূষণ সেই কথা জেনে বসে আছে যে।
আমাকে জানালে আমি তোমার কথা বিধু মাতব্বরকে বলে দেব।
শুধু বলবে নাদনগঞ্জের নিবারণ। একটা কথা বলব?
বলো?
এই যে তোমরা বিধুভূষণ মাতব্বরের খাস লোক, তার দেখা সহজেই পাও, এর মধ্যে বিস্তর নীতি আছে।
বলরাম ঘড়াইয়ের মুখটি আচমকাই ফ্যাকাসে হয়ে উঠল। একটু থতমত খেয়ে বলল – তুমি কি বিধুভূষণের হয়ে কাজ করবে? এই আমি যেমন করি?
না। কেন করব?
সেটি তোমার ইচ্ছে।
আজ বিধুভূষণ, কাল গোঁসাইচরণ, পরশু নেতাই সর্দার, তারপরে মুরশেদ আলম পরের পর নামগুলি বদলে যাবে, আর ওদের ক্ষমতার চরিত্রগুলি একই থেকে যাবে। আমার খুব প্রয়োজন তাই বিধুভূষণের কাছে যাচ্ছি। কারণ সে আমাদের সকলের জনপ্রতিনিধি। দেখা পেলে ভালো। না পেলে আর কি করব?
বলরাম ঘড়াই বাঁকা ঠোঁটের নিচে হাসল। সেই হাসির মধ্যে ফড়েদের যেমন তাচ্ছিল্য থাকে, তেমনিই।
বললাম, তোমাকে বিধুভূষণের কাছে যাওয়ার কারণটি বলব না।
বলরাম বলল – বেশ।
যাই এগিয়ে যাই। এখনও অনেকটাই পথ।
যত হেঁটে যাবে, পথ ততই লম্বা হয়ে যাবে। আরও আরও দূরে সরে যাবে বিধুভূষণের ঘরবাড়ি। সে তখন এক মজা হবে। ক্ষমতাবানদের কাছে এই বিভ্রম হল এক রাষ্ট্রীয় রসিকতা।
*
গেল সংক্রান্তির শেষের ব্যস্ততম দিনে আমি বিধুভূষণের বাড়ির দিকে যাত্রা শুরু করেছিলাম। ইতিমধ্যে আমার বিবাহের দিন চুপিসারে চলে গেল। নরহরি সাপুইকে যেদিন গাধার পিঠে চাপিয়ে গ্রামবাসীরা তাকে তার বিবাহের আসরে নিয়ে যাচ্ছিল, খালের মধ্যিখানে পানকৌড়ি যখন ডুব দিয়ে দিয়ে কাদায় ঘেঁটে যাওয়া মাছ খুঁজে যাচ্ছিল, সেই তখন আমার মনে পড়ল, আমার বিবাহের দিন চলে গেল। চোত মাসের বহুরূপীদের ফেলে যাওয়া নোংরা কাপড় চোপড় যখন উষ্ণ বাতাসে ফর ফর করে উড়ছিল, তখন একটি অশোক গাছের ছায়ার নিচে বসে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। কানা দুপুরের ঘুঘু ডেকে চলেছিল, প্রাণী জগতের বিষণ্ণ কন্নার মতো। সেই বহুদূর থেকে ফায়ারিঙয়ের শব্দ আসছিল। প্রতিধ্বনি হচ্ছিল, ফাঁকা মাঠের মধ্যে। চারদিকের প্রকৃতি শুকিয়ে আসছে।
অশোক গাছের সামনে দিয়ে হাজারো শুকিয়ে ওঠা মানুষের পায়ের ছাপ, অনেকটাই পাথরের ওপরে ক্ষতের দাগের মতো, মনে হচ্ছিল বিগত কাদাজলের মরশুমে মানুষের মিছিল চলে গেছিল বিধুভূষণের বাসখানার দিকে। মাটির রাস্তার ঠিক ওপাশেই একটি লগার ওপরে পোড়া মাটির পাতিল যাকে বলা যেতে পারে বিনাশকালের কাকতাড়ুয়া আমাকে দেখে বিজলিয়ে বিজলিয়ে হাসছিল। আমাকে উপহাস করছিল। ভেংচি দিচ্ছিল। আমি কিছু বলতে চাইছিলাম। মাটির পাতিল ততই উচ্চস্বরে হেসে চলেছিল।
যেন বলতে চাইছিল দেখা পেলে বিধুভূষণ মাতব্বরের?
এই কথার উত্তর দিয়ে আমি নিজের বোকামির ফাঁদে আর জড়িয়ে পড়তে চাইলাম না।
*
বহুবছর পরে গাধার পিঠে চেপে সেই গ্রামীণ যুবকের বিবাহে যাওয়ার ঘটনা যখন মনে পড়ল, আমি সেই কাকতাড়ুয়া ও বলদযানের চলে যাওয়ার ঘটনাটির অর্থ ক্রমে ক্রমে বুঝতে পারলাম। আর তখনই আমার কাছে বিধুভূষণকে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো বিভ্রম ও অপাংক্তেয় মনে হল।


1 মন্তব্যসমূহ
ভালো লাগল
উত্তরমুছুন