দেবর্ষি সারগীর গল্প : নিষিদ্ধ ধর্ম



নৌকো থেকে শীর্ণ, বালিময় নদীটির তীরে নেমে শেষ রাতের শহরটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, আমার কোনও স্বপ্নই বুঝি আমাকে এখানে টেনে এনেছে, নৌকোটা নয়। রাস্তার দুদিকে দাঁড়ানো বড় বড় বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে শহরের ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলাম। আকাশে যে থমথমে চাঁদ জ্বলছিল তার আলোয় বাড়িগুলোকে খুব ভারি ও অভিজ্ঞ বলে মনে হচ্ছিল। শুনেছি (এটা বাস্তবে, স্বপ্নে নয়) এখানে প্রায় দেড়শো বছর আগে এমন একজন জন্মেছিলেন এবং বছর তিরিশ বেঁচেছিলেন, যিনি ঈশ্বর কোথায় উপস্থিত না বুঝিয়ে ঈশ্বর যে কোথাও অনুপস্থিত নন সেটা বোঝাতেন। তাঁর ওরকম যুক্তিতে জগতের সমস্ত উপাসনালয়ই অর্থহীন হয়ে যায়। সেটাই হল। এবং ক্ষিপ্ত শাসক ও মৌলবাদীরা তাঁকে প্রাণদণ্ড দিল ।

রাস্তার দুদিকে মাঝেমাঝে কিছু উপাসনালয়ও চোখে পড়ছিল। আমি অভিভূত হয়ে সেগুলোর দিকে তাকাচ্ছিলাম। মানুষের থাকার জন্য ঈশ্বর সৃষ্টি করলেন একটা গোটা গ্রহ। আর ঈশ্বরের থাকার জন্য মানুষ সৃষ্টি করল এইসব আশ্চর্য অট্টালিকা, যা আসলে এক একটা গ্রহের মতোই। প্রতিটি উপাসনালয়কেই আমার, এক একটা গ্রহ, এক একটা স্বাধীন জগৎ বলে মনে হয়। সিলিংগুলোকে মনে হয় আকাশের মতো উঁচু। এবং আকাশের চেয়েও বৈচিত্র্যময়। এটা সৌভাগ্যের যে উপাসনালয়ের বাইরে ঈশ্বরকে খোঁজার জ্ঞানটা মানুষের হয়েছে অন্বেষণের অনেক পরের দিকে। যদি গোড়াতেই সে এই জ্ঞানটা লাভ করত তবে জগৎ এরকম আশ্চর্য স্থাপত্য থেকে বঞ্চিত হত।

অনেকটা হাঁটার পর চোখে পড়ল কিছু দূরে এক বৃদ্ধ হেঁটে যাচ্ছেন । হয়ত রাত গভীর থাকতেই ঘুম থেকে উঠে পড়েন। একটা গলি দিয়ে একটু দ্রুত এগিয়ে আমি তাঁকে ধরলাম ।

‘আমি একজন বিদেশী,’ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললাম। ‘এই শহরে এসেছি একজনের গল্প এখানকারই কোনও মানুষের মুখ থেকে একটু শুনব বলে। তাঁর খ্যাতি আমাদের দেশেও বিস্তৃত। এবং শুনেছি পৃথিবীর আরও অনেক দেশে। যাঁর কথা বলছি তিনি মাত্র তিরিশ বছর বেঁচেছিলেন। কিন্তু ওটুকু বয়সেই উপলদ্ধি করেছিলেন এমন এক সত্যকে, যার জন্য তাঁকে প্রাণ দিতে হয়।’

আমার কথা শেষ হওয়ার পর বৃদ্ধ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে। দাড়ি ও গোঁফে তার মুখটা পাথুরে মূর্তির মতো দেখাচ্ছিল। তারপর সতর্ক দৃষ্টিতে রাস্তার দুদিকে চোখ বুলিয়ে বললেন, 'যাঁর কথা তুমি বলছ তাঁর সম্পর্কে আলোচনাও নিষিদ্ধ এখানে। আলোচনা করলে প্রাণদণ্ড হয়। হয়ত গোপনে আলোচনা হয়। সেরকম অবশ্য শুনি।’

'আমরাও না হয় গোপনেই একটু কথা বলি, যদি অবশ্য দয়া করে আপনি রাজি হন,' আমি বললাম অনুনয়ের ভঙ্গিতে।

'তাতেও ঝুঁকি আছে। শাসকের টহলদার সৈনিকেরা শুনে ফেলতে পারে।'

আমি চুপ করে থাকি। আমার জন্য বৃদ্ধের বিপদ ঘটুক সেটা কী করে চাইতে পারি।

'প্রাণদণ্ডের কথা অবশ্য বেশি না ভাবাই ভাল,' হঠাৎ একটু হেসে তিনি বললেন। ‘কারণ মৃত্যু আসার আরও অনেক পথ আছে।”

আমাকে অনুসরণ করতে বলে কয়েকটা অলিগলি দিয়ে হেঁটে বৃদ্ধ নিজের বাড়ি এলেন। একা থাকেন। জানালেন বিয়ে করেননি। বসার ঘরটা সাদামাঠা, চেয়ার-টেবিল ছাড়া একটা কাঠের আলমারি, যার মাথায় একটা প্রকাণ্ড ফুলদানি। উল্টোদিকের দেওয়ালে ঝুলছে সিরামিকের একটা ডিশ, যার গায়ে আমার অজানা ভাষায় একটা বাক্য নকশা করা লিপিতে লেখা।

‘এরকম সংক্ষিপ্ত বাক্যে সাধারণত একটা কবিতাই লেখা হয়, কিন্তু এই ডিশটার বাক্যটিতে লেখা হয়েছে একটা গল্প' আমার কৌতূহল দূর করতে বৃদ্ধ বললেন।

আমি চুপ করে থাকলাম ।

“গল্পটা হল : ‘এবং তারপর লুকোচুরি খেলবেন বলে তিনি তাঁর প্রতিযোগীর শরীরের ভেতরেই লুকিয়ে পড়লেন।”

জানলা দিয়ে একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকল, যদিও ভোর হতে এখনও দেরি। চারপাশ নিস্তব্ধ।

'বাইরের কোনও লোকের কাছে তাঁর সম্পর্কে এই প্রথম আমি কিছু বলছি,' বৃদ্ধ মন্তব্য করলেন, জানলার বাইরে অন্ধকারের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে। 'অবশ্য আমাকে বলতে বলে ভালই করেছ। কারণ, আমার পূর্বপুরুষেরা তাঁকে স্বচক্ষে দেখেছে। তারপর পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গোপনে তাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছে। সেই প্রজন্ম আবার তার পরের প্রজন্মকে। আমিও শুনেছি আমার বাবার কাছে। বিয়ে করিনি বলে আমার কোনও ছেলেপিলে নেই। তাই তোমাকে বলতে পেরে আমার মনে হচ্ছে আমি আমার ছেলেকেই বলছি। তাঁর কথা শোনাতে রাজি হয়ে তোমার অনুরোধ আমি রাখলাম। তোমার কাছে আমারও একটা অনুরোধ আছে। সেটা হল, আমার কাছ থেকে শুনে তোমাদের দেশে তুমিও অন্যদের বোলো।

বৃদ্ধের গলায় আবেগের কাঁপুনি।

'নিশ্চয়ই,' আমি বললাম সঙ্কুচিত গলায়। ‘তবে তার দরকার বিশেষ হবে না। কারণ তাঁর কথা, আমি আগেই বলেছি, আমাদের দেশেও প্রায় সবাই শুনেছে।'

'সেটা অবশ্য স্বাভাবিক,' একটু অন্যমনস্কভাবে তিনি বললেন। 'আর তাঁর গল্পটাও তো কত ছোট। তাই না? অবশ্য ওইটুকু জীবনে আর কত বড় গল্প একজন রচনা করতে পারে? গল্প শুরু হতে না হতেই তো গল্পকারকে মেরে ফেলা হল। গল্পটা তাহলে শোনো : তিনি জন্মেছিলেন এখানকার দক্ষিণ প্রান্তের পাহাড়শ্রেণীর ওপারে একটা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে। অবশ্য ধনী পরিবারে জন্মালেও হয়ত বিশেষ হেরফের হত না, কারণ সেক্ষেত্রেও তিনি স্বেচ্ছায় দারিদ্রের জীবন বেছে নিতেন। ঐশ্বর্যকে যে তিনি অপছন্দ করতেন তা নয়। তবে তাঁর মতে, বিষয়ের ঐশ্বর্য সাধারণত মনের অন্যান্য ঐশ্বর্যকে গ্রাস করে নেয়, মনটা নিজেই যেন কোনও মহামূল্য দ্রব্যের মতো সতর্ক আত্মসচেতন ও নিষ্প্রাণ হয়ে ওঠে। যে-কোনও ভাবুকের মতো নিঃসঙ্গ ও নির্জন থাকতে পছন্দ করতেন। মাঝেমাঝে গভীর রাতে একা জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতেন। এটা তাঁর নেহাতই সৌভাগ্য --- তিনি মন্তব্য করতেন--- কোনও শ্বাপদ পশুর সঙ্গে কখনও তাঁর দেখা হয়নি। ভাবতে ভাবতে একদিন তাঁর মনে হল নিজের ইচ্ছা ব্যতিরেকে জন্মানো মানুষ নিজের সংক্ষিপ্ত অস্তিত্বকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে একমাত্র তখনই, যদি জগতে ঈশ্বর বলে কিছু থাকেন। ঈশ্বর না থাকলে গোটা জগৎ, প্রাণের জন্ম ও মৃত্যু সবই অর্থহীন হয়ে যায়। মানুষ হয়ত তবু বেঁচে থাকবে। কিন্তু কোনও কিছুর স্থায়ী অর্থ খুঁজে পাবে না। এই যুক্তিতে তাঁর কাছে ঈশ্বর সেই সত্তা যা সব কিছুকে অর্থ প্রদান করে। কিন্তু যে উপলব্ধির জন্য তাঁকে শেষপর্যন্ত প্রাণ দিতে হল সেটা হল : ঈশ্বরের জন্য কোনও উপাসনালয় নির্মাণ করার দরকার নেই। তাঁকে পুজো করার দরকার নেই। তাঁকে পেতে কোনও দীর্ঘ, জটিল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার দরকার নেই । কোনও অবতারের অনুগামী হওয়ার দরকার নেই। কোনও তীর্থস্থানে যাওয়ার দরকার নেই। যা দরকার তা শুধু এটুকু স্মরণ করা যে জগতে তিনি আছেন। শুধু এটুকু স্মরণ করলেই তাঁকে পুজো করা হয়ে যায়, তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায়, শ্রেষ্ঠ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয়ে যায়, জীবন ও জগৎ একটা অর্থ পেয়ে যায়। শুধু তাই নয়, এমনকি সব সময় তাঁকে স্মরণ করারও দরকার নেই (গোপনে প্রচারিত তাঁর বাণীর এক জায়গায় এটার উল্লেখ আছে, আমি নিজের চোখে দেখেছি)। শুধু জীবনে অন্তত একবার এটা গভীরভাবে উপলব্ধি করলেই যথেষ্ট যে জগতে ঈশ্বর আছেন। অবচেতনের অন্ধকারে এই একটা জ্ঞান একবার প্রদীপের মতো জ্বালালেই যথেষ্ট। আর বারবার তাঁকে স্মরণ করার দরকার নেই। তাহলেও তাঁকে পুজো করা হয়ে গেল। এর চেয়ে সরল ও স্বাভাবিক ধর্ম আর কী হতে পারে মানুষের চেতনায় ?

কিন্তু ঈশ্বর সম্পর্কে এত সহজ মতবাদ মানুষের সহজে পছন্দ হয় না। মানুষ ভাবে; এত জটিল একটা জগতের স্রষ্টা নিজে এত সহজলব্ধ হতে পারেন না। আবার এটাও ঠিক, মানুষ ঈশ্বরকে তার শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো করেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে পেতে চায়। ফলে আস্তে আস্তে তাঁর অনেক অনুগামীও তৈরি হল। তারা এক সময় উপাসনালয়ে যাওয়া বন্ধ করল। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা বন্ধ করল। কোনও অবতার বা ঈশ্বরপুত্রের অনুগামী হওয়া বন্ধ করল। অন্য সব ধর্মের চেয়ে তার নিজের ধর্ম উন্নত : এরকম ভাবনা থেকে নিজেকে মুক্ত করল। এবং এর ফলে শাসক ও মৌলবাদীদের কোপদৃষ্টিতে পড়ল। এক চন্দ্রহীন কালো মধ্যরাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করল শাসকের সৈনিকেরা। এবং বিচারে প্রাণদণ্ড দেওয়া হল।

দড়ি দিয়ে বেঁধে তাঁকে ঝুলিয়ে দেওয়া হল একটা অনুচ্চ কাঠের খামের মাথায়। একটু দূর থেকে পাঁচজন সৈনিক পরপর গুলি করবে। প্রকাশ্য শাস্তিদান, যাতে ধর্মদ্রোহীদের নিয়তি যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে সবাই নিজের চোখে দেখতে পায়। লোকে লোকারণ্য। সৈনিকেরা গুলি চালাল। এবং প্রতিটি গুলিই তাঁর গায়ে না লেগে দড়িটায় লাগে আর দড়ি ছিঁড়ে তিনি নিচে পড়ে যান। খুশিতে জনতা চিৎকার করে ওঠে, কাঁদতে থাকে, ছুটে গিয়ে তাঁকে তুলে নিতে চায় মাটি থেকে । একজন সৈনিক তাঁর কাছে গিয়ে নিচু স্বরে বলল : আমরা আপনার অনুগামী । আপনাকে গুলি করে মারলে আমরা নিজেরা আর শান্তিতে বাঁচতে পারব না। অনুগ্রহ করে আপনি উঠে দাঁড়ান। আর শাসকের কাছে বলুন ঈশ্বর নিজেই আপনার মৃত্যু চান না। সেজন্যই গুলি আপনার গায়ে না লেগে দড়িতে লেগেছে। তাই শাসক যেন আপনাকে মুক্তি দেন। অনুগ্রহ করে শুধু এটুকু বলুন শাসকের উদ্দেশে। জনতা ও সৈনিকেরা আপনার সঙ্গে আছে।

'তিনি রাজি হলেন না। কারণ ঈশ্বর যে কোনও অলৌকিক কাণ্ড দেখাতে পারেন, সেটা তিনি বিশ্বাস করেন না। ওরকম কিছু করলে নিজের কঠোর নিয়মকানুন ঈশ্বর নিজেই লঙ্ঘন করবেন। তাছাড়া, ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই যে গুলিগুলো তাঁর গায়ে না লেগে দড়িটায় লাগল, তার অকাট্য প্রমাণ তিনি কী করে পাবেন ? সেটা না পেয়ে ঈশ্বরের অলৌকিক মহিমা উল্লেখ করলে ঈশ্বর সম্পর্কে ভুল মতবাদ প্রচার করা হয়।

'তিনি মাটিতে আগের মতোই পড়ে থাকলেন। শাসক সৈনিকদের হুকুম দিলেন তাঁকে আবার থামে ঝুলিয়ে গুলি চালাতে। সৈনিকেরা রাজি হল না। হতভম্ব শাসক অন্য পাঁচজন সৈনিককে ওটা করতে নির্দেশ দিলেন। তারা সেই নির্দেশ পালন করল। এবং পালন করল তাঁর সমস্ত অনুগামী ও আগের পাঁচজন সৈনিককে হত্যা করার নির্দেশও। এভাবে প্রায় কুড়ি হাজার মানুষকে মেরে ফেলা হয়। আর নিষিদ্ধ হয় তাঁর সম্পর্কে সমস্ত আলোচনা, তাঁর বাণী সংবলিত সমস্ত পুস্তিকা ।”

বৃদ্ধ থামলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, 'তবে আমি নিজে মনে মনে তাঁর 'অনুগামী।'

ঘরে স্তব্ধতা। জানলার বাইরে তখনও অন্ধকার।

‘ঈশ্বরের অভিপ্রায় বোঝার মতো কঠিন কাজ আর কিছু নেই,' আমি বললাম, অস্বস্তিকর নীরবতা ভাঙতে চেয়ে। ‘নইলে তাঁকে তো তিনি বাঁচাতেই পারতেন।'

বৃদ্ধ হঠাৎ হেসে ফেললেন। প্রাজ্ঞ, অনাবিল হাসি।

‘তাঁর একটা বাণীতে তিনি বলেছিলেন,' বৃদ্ধ বললেন, “যাই ঘটুক, তবু ঈশ্বরকে ভালবাসব--ঈশ্বর সম্পর্কে এটাই খাঁটি মনোভাব। ঈশ্বর নিজেও এই মাপকাঠি দিয়েই বিচার করেন তাঁর অনুগামীদের।'

‘আপনি নিজেও কি এরকম মনোভাব পোষণ করেন ?'

এ প্রশ্ন আমার নয়। হঠাৎ দরজা খুলে ঘরে ঢুকে পড়ে দুজন সশস্ত্র সৈনিক। প্রশ্নটা তাদের। বুঝলাম এতক্ষণ ওরা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গোপনে শুনেছে আমাদের সব কথাবার্তা। হয়ত গোড়া থেকেই অনুসরণ করছিল আমাদের। ভয়ে আমার বুক ধকধক করতে লাগল। বৃদ্ধ চুপ করে থাকেন। তাঁর মাথা দুদিকে থিরথির করে কাঁপছিল।

‘আপনি নিজেও কি এরকম মনোভাব পোষণ করেন?' সৈনিকটি আবার জিজ্ঞেস করে।

'হ্যাঁ,' বৃদ্ধ বললেন শান্ত গলায় ।

'আপনার সততা আমার ভাল লাগল। তবু ওই নিষিদ্ধ লোকটার অনুগামী হওয়ার জন্য আমরা আপনাকে গ্রেপ্তার করছি। এবং শাসককে পরামর্শ দেব গুলি করে আপনাকে মারার হুকুম দিতে।’

এরপর তারা আমার দিকে তাকাল ।

'আপনি বিদেশী,’ সৈনিকটি বলল। 'তাই আপনাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল। আমরা বুঝতে পেরেছি আপনি এখানে এসেছেন নিছক কৌতূহলবশত?’

‘কিন্তু এই বৃদ্ধের প্রাণদণ্ডের জন্য তো পরোক্ষভাবে আমিই দায়ী,’ মরিয়া হয়ে আমি বললাম। 'আমিই তাকে পীড়াপিড়ি করেছিলাম নিষিদ্ধ লোকটার কথা বলতে, যা আপনারা শুনে ফেলেন। তাই বিদেশী বলে আমাকে যদি সত্যিই মর্যাদা দিতে চান তবে আমার অনুরোধ এঁকেও আপনারা ক্ষমা করে দিন।'

‘এমন কিছু করার চেষ্টা আমরা করতে পারি না যা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’

‘তাহলে এঁর সঙ্গে আমাকেও গুলি করুন।'

এত নির্ভীক মনে মরতে চাওয়া জীবনে সেই প্রথম ঘটল আমার। আমি বুঝতে পারছিলাম বৃদ্ধটির মৃত্যুর পর জীবনের মতো বড় অভিশাপ আর কিছু আমার কাছে হতে পারে না। স্বেচ্ছায় মরতে কেমন মুক্তির স্বাদ অনুভব করছিলাম, কারণ স্বেচ্ছায় মরতে রাজি হলে মৃত্যুভীতির দ্বারা কাহিল হতে হয় না ।

বৃদ্ধটি আগের মতোই চুপ। তাঁর মাথা থিরথির করে দুলছিল। সৈনিকেরা একবার আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে, একবার বৃদ্ধের মুখের দিকে। জানলার বাইরে অন্ধকার ক্রমে ফিকে হয়ে আসছে।

'একটা শর্তে আমরা আপনার প্রাণ বাঁচাতে পারি,’ সৈনিকটি হঠাৎ বলল, বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে। তার কন্ঠস্বরে কেমন কাঁপুনি, কেমন বিহ্বলতা, যেন মনে কোনও প্রবল তোলপাড়কে প্রাণপণে সংবরণ করার চেষ্টা করছে। ‘সেটা হল, ওই নিষিদ্ধ লোকটা সম্পর্কে যে গল্পটা আপনি বললেন তাতে আরও একটা ঘটনা আপনাকে যোগ করতে হবে। ঘটনাটা আপনি জানেন না, কিন্তু আমরা জানি। ঘটনাটা হল, সেদিন তাঁকে মারার জন্য প্রথম যে পাঁচজন সৈনিক বন্দুকের ব্যর্থ গুলি ছুঁড়েছিল তাদের একজনের বংশধর আমরা এই দুজন। এ আমার সহোদর ভাই। এরপর যখন গল্পটা গোপনে কাউকে বলবেন তখন উল্লেখ করতে ভুলবেন না যে, ওই পাঁচজন সৈনিকের একজনের বংশধরেরা এখনও টিকে আছে। আর ওদের দুজনের সঙ্গে আপনার একদিন দেখাও হয়েছিল।'

কথাগুলো বলে সৈনিকটি বৃদ্ধের হাতদুটো চেপে ধরে নিঃশব্দ কান্নায় ভেঙে পড়ল। অশ্রু আমার চোখেও। এরপর ঘরটায় চারজন চুপ করে বসে থাকলাম। সকলের মুখে অব্যক্ত আনন্দ। বাইরে আস্তে আস্তে ভোর হয়ে এল।

‘মনে মনে আমরাও তাঁর অনুগামী,' চলে যাওয়ার আগে সৈনিকটি বলল। ‘আর আমাদের মতো আরও অনেক সৈনিক। আর অসংখ্য সাধারণ মানুষ। আমরা নিশ্চিত জানি, একদিন সবাই তাঁর অনুগামী হবে। তখন আর গোপনে নয়, প্রকাশ্যে।'

দেশটায় আমি থেকে গেলাম। এখানে থাকতে আমার ভাল লাগে। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মাঝেমাঝে একটু বিষন্ন মনে ভাবি, এই আশ্চর্য উপাসনালয়গুলো একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। অবশ্য তাতে ঈশ্বর গৃহচ্যুত হবেন না, পরক্ষণেই সান্ত্বনা দিই নিজেকে। কারণ, ততদিনে প্রতিটি মানুষ নিজেই এক একটা উপাসনালয় হয়ে গিয়েছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. অনবদ্য- অমিতরূপ চক্রবর্তী।

    উত্তরমুছুন
  2. শব্দ, নৈঃশব্দের পর আমার পড়া দেবর্ষী সারগীর দ্বিতীয় গল্প। কী আশ্চর্য সর্বজনীন ভাবনা! অনবদ্য, অসাধারণ! অপেক্ষা নিয়মিত করে তুললেন, প্রিয় দেবর্ষী সারগী...

    উত্তরমুছুন