অবলোকনীয় জগতের বাইরে: প্রতিভা সরকারের সাহিত্য


দীপেন ভট্টাচার্য

এটি কোনো রিভিউ নয়, প্রতিভা সরকার কাজের যথার্থ মূল্যায়নের জন্য নিচের কথাগুলি যথেষ্ট নয় -

একটি হৃদপিণ্ডকে শত সহস্র খণ্ডে কেটে ফেলে তাকে নিংড়ালে যে শোণিতধারা বের হয় এমন হৃদয়নিংড়ানো রক্তিম তরলে লেখেন প্রতিভা সরকার। আমি মাত্র তাঁর দুটি বই পড়েছি – চৌদ্দটি অসামান্য ছোট গল্পের সংকলন ‘সদাবাহার’ আর একটি উপন্যাস ‘রসিকার ছেলে’। তিনি কীভাবে লেখেন আমি জানি না, কিন্তু মনে হয় সেই লেখার পেছনে জমা আছে শত বর্ষের সূক্ষ্ম অবলোকন যেখান সমাজ, প্রাণীজগত, আর প্রকৃতি মিলেমিশে তৈরি করে এক অদ্ভূত মায়াবী নির্যাস, সেই নির্যাস হতে পারে সহস্র বছরের সামাজিক নিপীড়নের কিংবা কোনো বন্য প্রাণীর নিবিড় জীবনের আখ্যানে।

পদার্থবিদ্যায় একটি কথা আছে – অবলোকনযোগ্য, যা দেখা যায়, ধরা যায়। এগুলোর অবলোকনীয়তা বৈশিষ্ট আছে। সবকিছু যে প্রত্যক্ষভাবে অবলোকনযোগ্য এমন নয়, অনেক সময় এক্সপেরিমেন্টের মধ্যে অনাবলোকনযোগ্য রাশিকে পরোক্ষভাবে নিরূপণ করতে হয়। প্রতিভা সরকার মনে হয় সমাজ ও প্রকৃতির পাঠ নিয়েছেন এক দুরবিন হাতে ধরে – তাতে অবলোকনযোগ্য যেন কিছুই বাদ পড়েনি, আর যা অনাবলোকনযোগ্য (যাকে অবলোকন করা যায় না) তাকে যেন পরোক্ষভাবেও ধরেননি, তাকে যেন প্রত্যক্ষ করছেন সেই জাদু-দুরবিনে। লিখেছেন অসীমতায়, সাহসে, উন্মুক্ততায়। যারা গুরুচণ্ডালী ওয়েবসাইটে ওনার সামাজিক-রাজনৈতিক প্রবন্ধ পড়েছেন তাঁরা জানবেন প্রতিভা সরকারের মন যেমন মুক্ত, সাহস তেমনই অসীম। সেই অসীমতায় স্থান পেয়েছে বিশাল ভারতবর্ষের প্রতিটি অঞ্চলে অন্ধ করপোরেট উন্নয়নের সাঁড়াশিতে আদিবাসী, পুলিশের বেআইনী তাণ্ডব, ছাত্র ও যৌনকর্মীদের হয়রানি, আবার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের অ্যাখান। তাঁর নিজের ব্যক্তিজগতও যেন লীন হয়েছে সেই শব্দজগতে। একটি পোস্টে লিখেছিলেন -

‘এইখানে একটু নিজের কথাও বলি। ফেসবুকে আমার জাগতিক কিছু পাবার নেই। যারা মেসেঞ্জারে জিগায় তাদের জানাই বই লিখিনি, কখনও লিখবো কিনা সন্দেহ। সমাজকল্যাণের টুকটাকের সুবাদে আদালতেও ডাক পাই বটে, তবে একেবারেই বলার মতো নয়। ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে শর্তই আছে সেসব কেউ জানবে না। আমার বন্ধুতালিকা থেকে তারা মিটিমিটি হাসি ছুঁড়ছেন হয়ত, তা হাসুন, কিন্তু তারাও জানেন আমি এক্কেবারে নামহীন, মানে যশহীন, রূপহীন, সাদামাটা এক মহিলা, যার লড়াইগুলি একেবারেই নিজস্ব, ফলাও করে বলবার মতো নয় একেবারেই। লক্ষের মধ্যে একজন বললেও বেশি বলা হবে।’

তারপরও তিনি গল্প লিখেছেন, কারণ তাঁর প্রতিভা প্রকৃতিজাত, তা ফল্গুধারায় প্রবাহিত। সেই ধারা বড়াই করে না, কিন্তু সেই ধারাকে লড়াইয়ের গ্রানাইট পাথরকে ক্ষয় করে বইতে হয়েছে। হৃদয়ক্ষরণের সেই আঁচ পাবেন এই বইদুটোতে। কিন্তু তাঁর ছোটো গল্প শুধু লড়াইয়ের নয়, বরং প্রকৃতির গভীরতায় মানুষের অস্তিত্ব আবিষ্কার – ‘সীমানা’ নামে এক গল্পে এক অন্ধ বুড়ি, ইঁদুর আর লক্ষ্মীপেঁচার অ্যাখান এমনই এক মায়াজাল বোনে মনে হয় গ্রহান্তরের এক রূপকথা, ‘সর্পগন্ধায়’ মীনা নামে এক তরুণী মোহাবিষ্ট হয় দুটি সাপের মৈথুনে। কীরকম ভাষা ওনার? ‘দেবী’ নামে গল্পে লিখছেন তমালীর কথা যে নাকি জেলেদের সঙ্গে ভরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে চায় -

‘আজ সার সার নৌকা বেরিয়ে গেলে গাঙের এক কোণ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এল একফালি কালো মেঘ। তমালীর অলস চোখে তাকে মনে হচ্ছিল গ্রামের বাড়ির কালো বেড়ালটা। পিঠে হাত বুলিয়ে দিলে যেমন গররর আওয়াজ উঠে আসে পেটের ভিতর থেকে, তেমনই গুর গুর আওয়াজে ছোটো ছোট বিদ্যুতের টুকরো ছুড়তে লাগল সেই মেঘ। তবে এখন সেটা আর বেড়াল নেই, হয়ে গেছে মত্ত দামাল হাতি। তাও আবার একটা নয়, এক দল।’

ছোটো গল্প কী করে লিখতে হয় সেটা প্রতিভা সরকারের কাছ থেকে আমার শিখতে হবে। প্লটে ও ভাষায় পরিমিতি যেমন, তেমনই মানুষ ও প্রাণী চরিত্রের মিথষ্ক্রিয়ায়, কিন্তু সব ছাপিয়ে একটা ঐতিহাসিক বর্তমান যা কিনা খুবই গভীর। লেখক হিসেবে আমার মতো মানুষ যারা সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়াতে চান, তাদের জন্য প্রতিভা সরকারের কাজ অনুকরণীয় ।

আর ‘রসিকার ছেলে’ উপন্যাসটি সম্পর্কে রিভিউ লেখার মতো যোগ্যতা আমার নেই। ‘রসিকার ছেলে’ এমনই একটি লড়াইয়ের কড়চা যেখানে এতো উন্নয়নের মাঝেও ভারতবর্ষের নিদারুণ সামাজিক বর্ণব্যবস্থার চক্র মুছে যায় না। বিরাট ভারতবর্ষের আপাতদৃষ্টিতে উন্নয়নের, বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে, মধ্যে যে গভীর অন্ধকার বিরাজ করছে যেখানে জাত, বংশপরিচয়, ধর্ম, অর্থ এক হয়ে এমন একটি দুর্ভেদ্য জঙ্গলের সৃষ্টি করেছে যে, সেই অজানিত অজ্ঞেয় চরাচরকে লেজার দিয়ে ব্যবচ্ছেদ করে আমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন প্রতিভা সরকার। ভারতের আন্তর্জাতিক মানের উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে নিম্নবর্গের ছাত্ররা যে মানসিক ও শারীরিক নিপীড়ণের সম্মুখীন হয়; কিছু ক্ষেত্রে তারা প্রাণ হারায় – হয় সরাসরি হত্যার শিকার হয়ে, নয় আত্মহত্যা করে।

এই বইটি সম্পর্কে গুরুচণ্ডালীতে একটি অসাধারণ আলোচনা করেছেন দেবকুমার চক্রবর্তী। উনি লিখছেন -

‘হাজার হাজার বছরের সামাজিক বিভাজন জনিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্র উদাসীন। রসিকা আমাদের শেখায় যে, এই নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তির পথ ভেঙে পড়া নয়, ধারাবাহিক আন্দোলন আর জনসচেতনতা সৃষ্টি। নিপীড়ণ আর বঞ্চনার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরের আগুনটুকু জ্বালিয়ে রাখতে হবে নিরন্তর, যতদিন না বাইরেটার বদল হচ্ছে। রসিকা শেখায় মর্যাদা কোনও মাধুকরী নয়। মাথা ঊঁচু করে, মেরুদণ্ড টান টান করে রাষ্ট্র-ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দায় আসলে বঞ্চিতদের ওপরেই বর্তায়। পাঠশেষে বোঝা যায় উপন্যাসটি লেখার পেছনে বিস্তৃত সাজঘরের কাজ করতে হয়েছে লেখিকাকে। জানতে হয়েছে শীর্ষ শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলির ভিতরের কথা। বুঝতে শিখতে হয়েছে দলিত পরিবারের জীবনধারা, অল্পবিস্তর দক্ষিণ ভারতের ভাষা।’

হাজার বছর পরেও একলব্যের কাছ থেকে মাশুল আদায় করা হচ্ছে, দক্ষিণ, মধ্য ও পূর্ব ভারতের অরণ্য থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত বিস্তৃত ছোট্ট এই বইটিতে হৃদয় মোচড়ানো অন্যায়ের স্থায়িত্বকাল যে দীর্ঘ তাই চিহ্নিত করা হয়েছে। সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রসিকা চরিত্রের দীর্ঘ সংগ্রাম মানব সত্তাকে যে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করা যায় না তাই আমাদের বলে। উপন্যাসটির মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতি সম্বন্ধে প্রতিভা সরকারের গভীর জ্ঞানেরও পরিচয় পাওয়া যায়।

অন্য একটি প্রসঙ্গে দুটো কথা বলে শেষ করি। সাহিত্যে লেখকেরা তাদের চরিত্রকে কতখানি স্বাধীনতা দিচ্ছেন তা নিয়ে আমি মাঝে মধ্যে ভাবি। এখানে স্বাধীনতা অর্থে free will বা স্বাধীন ইচ্ছা বাস্তবায়নের ক্ষমতা। এই ক্ষমতাকে দর্শনবিদ্যায় অনেক সময় agency বলা হয়। আমার যেটা মনে হয়েছে ‘রসিকার ছেলে’ উপন্যাসে লেখক রসিকাকে এজেন্সি দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর ছেলে রোশনকে দেননি। রসিকা সামাজিক বঞ্চনা, ভাগ্যের দুর্বিপাকের মধ্য দিয়ে তাঁর পথ খুঁজে নিয়েছেন; সেই পথ খুঁজে নেবার ক্ষমতা অসাধারণ রোশনকে হয়তো দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে প্রতিভা সরকারের প্রতিটি ছোটো গল্প প্রায় সব কজন প্রটাগনিস্টকে এজেন্সি দিয়েছেন, সেই নায়কেরা (আলাদা করে নায়িকা বলিনা, সবাই নায়ক) চিরাচরিত পথ অবলম্বন করেনি, বরং পাঠককে কিছুটা চমকে দিয়ে নিজেদের জীবনের পথ বেছে নিয়েছে। এমনকি সীমানা গল্পের অন্ধ বুড়িও অসহায় নয় পুরোপুরি, সে অন্ধকারের মধ্যেও নিজের অস্তিত্বের নির্যাস বজায় রেখেছে।

[‘সদাবাহারের’ প্রতিটি গল্পের শেষে কোন ওয়েবজিন বা পত্রিকায় গল্পটি প্রথম বেরিয়েছিল তা লেখক উল্লেখ করেছেন, এই ব্যাপারটি আমার খুব ভালো লেগেছে। এর প্রচ্ছদটি ভয়-জাগানিয়া, কিন্তু তার মধ্যে রয়েছে নতুন জীবনের আশ্বাস। ভূমিকায় লেখক লিখেছেন, ‘সদাবাহার-এর গল্পগুলো সবই সাধারণ মানুষকে নিয়ে লেখা। দধীচির হাড়ে তৈরি আশ্চর্য সব মানুষ, সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে যাদের লড়াই লাগতার, যে বাঁচে জীবনের ফাঁকফোকড় নিয়েই, মার খেয়ে মার হজম করাই যার ভবিতাব্য, অথচ তার মধ্যেও সে ভুলে যায় না প্রতিবাদের ভাষা। তাদের টুকরো টুকরো ছবি সারাক্ষণ উজ্জ্বল থাকবে ও উজ্জীবিত করবে, সেই আশা তেই এটির নাম সদাবাহার, যা আসলে খুবই সাধারণ রংবেহারি একটি ফুল, মরশুমি নয়, আর ফোটে বারো মাস, কী গ্রীষ্ম, কী বর্ষা!’ – এখানে লেখকের সঙ্গে কিছুটা দ্বিমত প্রকাশ করে বলব, লেখক নিজের অজান্তেই সাদাবাহারের নায়কদের এজেন্সি দিয়েছেন, তারা জীবনকে শুধু লাগাতার লড়াই হিসেবে দেখেনি, বরং সেটিকে অতিক্রম করেছে (transcendence), সেই অতিক্রম গল্পগুলোকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. এই পোস্টে আমাকে একটি লম্বা কমেন্ট লিখতে হবে।
    আমি অনেকদিন ধরে লিখছি। সেই ১৯৮৩ সাল থেকে। বেশ ভালো ভালো বলতে লাগল সবাই। তারপর হঠাৎ দুচ্ছাই বলে ছেড়েও দিয়েছিলাম। আবার লিখতে এসে দেখলাম পথ খুব কণ্টকাকীর্ণ। আমার গল্প ভালো বললে কেউ হিসেব করতে বসে যাচ্ছে আমি সিনিয়র না জুনিয়র, মেসেঞ্জারে হোয়াতে আমার নামে মিথ্যে কথা ছড়িয়ে দিয়ে কোণঠাসা করবার লাগাতার প্রচেষ্টা চলেছিল বছরখানেক আগে। তাতে আমার খুব বিশ্বাসভাজন একজনের অংশভাগ ছিল। আমি অল্পেতেই ভেঙে পড়া মানুষ, আবার দুচ্ছাই বলে কেটে পড়ব ভাবছিলাম। ভাগ্যিস তা করিনি।

    দীপেন ভট্টাচার্যের মতো লেখক, বিজ্ঞানী আর বিরাট মাপের মানুষ যখন এইরকম প্রতিক্রিয়া দেন, তখন মনে হয় এই-ই আমার সেরা পুরষ্কার।

    লেখাটা পড়লেই বোঝা যাবে কতটা নিবিষ্ট এই পাঠ!
    দীপেনদাকে শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা জানাই।

    প্রতিভা সরকার

    উত্তরমুছুন