অনুবাদ : কুলদা রায়
১. বাড়ির তলাগুলো
সুবিধার জন্য যে কেউ একটা বাড়িকে কল্পনা করে নিতে পারো। চারটি তলা নিয়ে বাড়িটি। সিড়িগুলো প্রতিটি তলাকেই সংযুক্ত করেছে। আবার বিচ্ছিন্নও করে রেখেছে। ছাদটি টালির। একটি রাস্তার পাশে বাড়ি্টি। দামী আঙিনার উপর বসা বাড়িগুলোর মাঝখানে চাপাচাপি করে আছে। জানালাগুলো রাস্তামুখী। প্রবেশ পথ পেছন দিকে।
নীচ তলায় কেউ থাকে না। নীচতলায় কাউকেই দেখা যায়নি। প্রথমতলায় একই রকম বাদামী দরোজা। রং চটে গেছে। কাঁচের ফলকগুলো অস্বচ্ছ হয়ে গেছে।
পর্দাগুলো নীল রেখাঅলা।
প্রথমতলা : বাদামী দরোজা। রঙ চটে গেছে। অস্বচ্ছ কাঁচ। এখানে কেউ বাস করে।
দ্বিতীয় তলা : এখানেও কেউ বাস করে।
এবং তিনতলাতেও কেউ থাকে।
কেউ যদি চলে যায়–কেউ আবার চলে আসে। প্রথম দিন তুমি তার ঘ্রাণ পাবে। কোনো মিস্ত্রী বা ছুতোরের ফেলে যাওয়া কাঠের গুড়ো থেকে পাবে রসুন অথবা তেলের ঘ্রাণ।
পরে হয়তোবা পাবে কোনো শিশুর ব্যবহৃত ডায়াপারের ঘ্রাণ। তৃতীয় দিন এই ঘ্রাণগুলো বাড়ির অংশই মনে হবে। এবং আবার বলি বাড়িটির চারটি তলা আছে।
দ্বিতীয়তলায় আবার কেউ বাস করে।
নামফলকটি বদলে যায়।
একজন টেলিফোন ইঞ্জিনিয়ার হলরুমের ছোট্ট বাক্সটি খোলে। কানেকশন বদল করে। বকাবকি করে। আবার বদলায়। তারপর চলে যায়।
হয়তো কেউ নিচতলায় থাকে। বসন্তে, এপ্রিলের চার তারিখ। ধরা যাক, দ্বিতীয় ও তিনতলার মাঝখানের সিঁড়ির উপর সূর্যের আলো পড়ে। গত বছরেও এরকম হয়েছিল।
তিনতলার ছোট্ট মেয়েটি দোতলার দরোজায় টোকা দেয়। নিচু স্বরে, ভদ্রভাবে মহিলাটিকে বলটি দিতে বলে। তিনতলা থেকে বলটি দোতলার বারান্দা গলে পড়েছে।
চিলেকোঠাটি কাঠের দেওয়াল দিয়ে ভাগ করা। প্রতিটি তলার জন্যই একভাগ। প্রতিটি ভাগই তালা দিয়ে সুরক্ষিত। প্রায় অবশ্যই পুরনো ম্যাট্রসগুলো এখানে রাখাও আছে। ছবির এলবাম, ডাইরি এবং আয়নাগুলো রাখা আছে।
দুই সপ্তাহ পর একবার কেউ এই চিলেকোঠা ঝাড় দেয়।
হকাররা উপরের তলার দরোজার বেল বাজাতে শুরু করে। তারপর শুধায়– উপরতলা থেকে কেউ কি নিচে যেতে চায়, যদি চায় তাহলে তারা যেতে পারে। দোতলায়ও বেল বাজায়।
এরপরে একতলা– নিচতলায়ও বেল বাজায়। যেন সিঁড়ি বেয়ে ওঠা আরামের হবে বলে আশা জাগায়। তাদের মধ্যে একজনই কেবল নিচে যেতে পারবে এই ভেবে আবার বেদনাও জাগায়। ঘরে ঘরে এই কাজটি হকারদের করতে হবে।
বনগুলোর সঙ্গে বনবাসীদের এটা করতে হবে। অপেক্ষার সঙ্গে নারীদের এটা করতে হবে।
এটা করতে হবে ঘরগুলোর সঙ্গে ঘরগুলোকে। .
পিটার পিচশেলের গল্প
২. লোক সকল
সেখানে সে বসেছিল। যদি কেউ তাকে কখনো শুধাতো, সে তখন উত্তর দিতে , ‘সব সময়, আমি সব সময় এখানে বসি।’ সেখানে সে অপেক্ষা করত, মাঝে মাঝে তার বান্ধবীর জন্য, সহকর্মীর জন্য, মাঝে মাঝে ট্রেনের জন্য, সন্ধ্যার জন্য কখনো।
তার জন্য কফি আনার সময় রেস্তোরার পরিবেশনকারী অন্তরঙ্গভাবে হাসত। তার ছিল একটি লাল পার্সব্যাগ। একজন তরুণীর কাছে যেমন লাল পার্সব্যাগ থাকে তারটিও সেরকম। কেউ তার কফির বিলটি দিয়েছে– এরকমও ঘটেছে। কিন্তু যখন তার বান্ধবী অথবা ট্রেনটি এসে পড়েছে এবং তখন সে বলেছে ধন্যবাদ তোমাকে।
আজ অফিসে কেউ তাকে বলেছে তুমি সুন্দর। এটা বলেছে ম্যানেজার । আর সে তার পার্সব্যাগটি নিয়ে মগ্ন হয়েছে।
সুন্দরীদের অপেক্ষা করার দরকার হয় না– কেউ ভেবেছে। সে তরুণী– কেউ আরো ভেবেছে। তার কিছু ঝামেলা আছে বলেও কেউ ধরে নিয়েছে।
সে শ্বাস নিচ্ছে, কেউ খেয়াল করল। তার বান্ধবীদের কেউ শিখিয়েছে, কেউ জানত।
ট্রেনটি সাড়ে ছটায় ছাড়ে। তার আঁটোসাঁটো কোটের বোতাম খুলতে কেউ লক্ষ করে দেখল। কোটটি সে খুলে ফেলল। নিজেকে খোলসমুক্ত করল। পরে আবার সে পরল, তার মধ্যে নিজেকে গলিয়ে দিল। তার নিতম্বের উপর কাপড়টি মসৃণ করে দিল।
তার মুখটি বড়।
তার চুল আকর্ষণীয়। সে ছোট খাটো আর হালকা।
কেউ জানে তার কণ্ঠ, ‘এক কাপ কফি–প্লিজ– তোমাকে ধন্যবাদ–বিদায়।’ কোমল কণ্ঠ।
হরিণীর মতো চোখগুলো।
কেউ তাকে শুধাতে পারে। সরবরাহকারী তাকে শুধায়, ‘কী পছন্দ কর?’
সে একটি ছোট খাটো মেয়ে, হালকা পাতলা বলেই সে ছোট্ট, একটি মেয়ে পুতুল, একটা প্রজাপতি, কেউ একজন আরো ভাবল….।
কেউ একজন সব সময়ই শুধায়।
তার হাতগুলো নাজুক।
সে সেখানে অপেক্ষা করে, কখনো তার বান্ধবীর জন্য, কখনো সহকর্মীর জন্য। কখনোবা ট্রেনের জন্য, সন্ধ্যার জন্য। সে একটি মেয়ে।
যখন কেউ তাকে প্রার্থনা করেছে তখনি সে যেন একজন মহিলা হয়ে উঠেছে।


1 মন্তব্যসমূহ
দ্বিতীয় গল্পটি চমকে দিল। ঝরঝরে অনুবাদ!
উত্তরমুছুনপ্রতিভা সরকার