শুভংকর গুহর গল্প : মাঠপোড়া জীবনের ইতিকথা


কিছু ঘটনা ঘটছে।

কেউ পাঁচিলের ওপরে ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো রেখে গেছে।
তার আগের দিন বেশ কিছু পোড়া কার্তুজ।
তার আগের দিন কেউ একজন রাইফেল রেখে গেছে।
তার আগের দিন রক্তমাখা গামছা এবং একটি ডোরাকাটা জামা।
তারও আগের দিন খবরের কাগজের ওপরে আলতা দিয়ে লেখা পোস্টার।

আর একেবারে প্রথমে দেখা গেছিল কয়েকজন গামছা দিয়ে মাথায় ফেট্টি বেঁধে কাঁধে রাইফেল নিয়ে চলে গেছিল ইষ্টপুরের জঙ্গলের দিকে।

এইসব কিছু দেখেছে দেবাঞ্জন।

পাঁচিলের ওপরে রাখা কাঁচের টুকরো, পোড়া কার্তুজ, সশস্ত্র মানুষগুলির ইষ্টপুরের জঙ্গলের দিকে যাওয়ার দৃশ্য, রাইফেল, রক্তমাখা গামছা ও টি সার্ট, পোস্টার এবং আরও কিছু দেখে ফেলার মূল্য তাকে দিতে হচ্ছে।

আর এই দেখে ফেলার ঘটনা যাদের জানিয়েছে তারাও দেবাঞ্জনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। স্থানীয় থানার সন্দেহের তালিকায় দেবাঞ্জন সহ রাধাপ্রসাদ, গণেশ, শ্যামল, চণ্ডী, বিশাল ও ইত্যাদী।

#

দীর্ঘতর এই পাঁচিল কে কবে নির্মাণ করেছিল সঠিক কেউ জানে না। পাঁচিল নির্মাণের বিষয়ে নানা রকম কথা ও গল্প ফেঁদে বসেছে তল্লাটের কয়েকজন কথক। যারা মূলত বাস্তব ইতিহাস থেকেও কল্পনায় বানিয়ে তোলা কাহিনিকেই প্রাধান্য দেয় বেশি। সেই সব কাহিনির না আছে বাস্তবতা, না আছে পাঁচিল গড়ে তোলার বিশ্বাসযোগ্য ইতিহাস। ছোটো ছোটো ইট দিয়ে গেঁথে রাখা পাঁচিলের বিভিন্ন স্থানে ইট খুলে নিয়ে গেছে মানুষজন। প্রাচীন এই পাঁচিলের বুনিয়াদের প্রায় সমস্তই জুড়েই খুবলে নেওয়ার ক্ষত।

পাঁচিলের মালিকানা বলতে স্থানীয় পঞ্চায়েত।

যাদের কাছে না আছে সঠিক কাগজপত্র না আছে হস্তান্তরের দলিল। স্থানীয় মানুষজন তাই সাহস অবলম্বন করে পাঁচিলের ইট খুলে নেওয়ার স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সরকারি একজন পর্যবেক্ষক পাঁচিলটি দেখে বলে গেছে, এটি একটি প্রাচীন স্থাপত্যের নিদর্শন। যে স্থাপত্যের সঙ্গে চিন দেশের পাঁচিল নির্মাণের প্রযুক্তির সঙ্গে মিল রয়েছে। মধ্যযুগে না কি এই ভাবেই পাঁচিল গড়ে তোলা হত। এই পাঁচিলটি থেকে যারা ইট খুলে ফেলে এর প্রাচীন বুনিয়াদকে ধ্বংস করছে তারা সভ্যতার ঐতিহ্যের বিনাশকারী। সরকারি পর্যবেক্ষকে স্থানীয়রা জানায়, যে যুগরেই হোক, সরকার প্রথম থেকে নজর দেয়নি কেন? যখন এর প্রকৃত মালিকানা নেই, তখন আপনারাই বা নিষেধ করার কে?

সরকারি আধিকারিক বলেছিল, যে প্রাচীন স্থাপত্যের কোনো নির্দিষ্ট মালিক নেই তার মালিক দেশের সরকার। দেশের মাটিতে কোনো কিছুই বেওয়ারিশ নয়।

দেবাঞ্জন প্রায়ই পাঁচিলের মাথার ওপরে উঠে এপার ওপার দুইপার দেখতে দেখতে দুইদিকের পার্থক্য বুঝতে চেষ্টা করে। পাঁচিলের একদিকে গ্রামীণ জনপদ অন্যদিকে জনহীন, ঘর বাড়ি নেই, শুধুই ছেঁড়া ছেঁড়া বিক্ষিপ্ত ফসলের জমি আর শেয়ালের ও সাপের গর্ত। ধু ধু মাঠের বিপরীতে ইষ্টপুরের জঙ্গলের সূচনা। ছোটো জঙ্গল। বড় কিছু জানোয়ার ও পশু নেই বললেই চলে। সেই জঙ্গলের মধ্যে না কি দিন হোক বা রাত হোক দীর্ঘাকৃতির সাদা ধোঁয়ার মতো অশরীরী বিচরণ করে। গ্রামের মানুষের বিশ্বাস যারা অপঘাতে বা আত্মহত্যা করে তারাই ওই জঙ্গলের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে গোটা দেশের রাজনৈতিক কাজকম্ম পরিচালনা করে। এরা খুবই শক্তিমান, যে কোনো সময় যে কাউকেই গলায় দড়ির ফাঁস লাগিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিতে পারে। ইষ্টপুরের জঙ্গলের ভিতরে তাই কেউ প্রবেশ করে না। গ্রামের পঞ্চায়েত প্রধানের পক্ষ থেকে নির্দেশ আছে কেউ ওই জঙ্গলের ভিতরে গেলে সে গ্রামবাসীদের সন্দেহের মধ্যে চলে আসবে। এমন কি কেউ যদি ইষ্টপুরের জঙ্গলের বিষয়ে কৌতূহল প্রকাশ করে, তাকেও সন্দেহের চোখে দেখা হবে।

ইষ্টপুরের জঙ্গল সম্পর্কে কারও যদি কোনো জিজ্ঞাসা বা কৌতূহল থাকে, সে নিজের গোপনেই রেখে দেয়। গ্রামবাসীরা তাই ভুলেও ইষ্টপুরের জঙ্গল সম্পর্কে কৌতূহল প্রকাশ করে না। কয়েকজন গ্রামবাসী ওই জঙ্গলের ভিতরে কাঠকুটো সংগ্রহ করতে গেছিল, ওদের থানায় ডেকে নিয়ে বড়বাবু ও মেজবাবু জিজ্ঞাসাবাদ করে হেস্তনেস্ত করেছে।

কে জানে?

কেনই বা আগে বা পরে বিশেষ এই বস্তুগুলি আর কোনো গ্রামবাসীর নজরেই এল না সেটা ভেবেই দেবাঞ্জন আরও বিস্মিত হচ্ছিল। একমাত্র সেইই প্রথম দেখে ফেলল, কিন্তু নিজেকেই সন্দেহের মধ্যে রেখে কে প্রথম দেখেছিল এই বিভ্রমের মধ্যে আতঙ্কিত হয়ে দিশেহারা হয়ে গেল।

পাঁচিলের একবারে মধ্যিখানে জুড়ে কিছু দূর পরের পর বেশ বড় বড় ফুঁকো আছে। আসলে ওইগুলি খুবলে নেওয়া ফুঁকো। সেই ফুঁকো অতিক্রম করে, মানুষ গলে যায়, গাভীন মহিষ গলে যায়, এমনকি মাল কাঁধে আরোহীরাও চলে যেতে পারে ওপারে। দেবাঞ্জন প্রতিদিনের মতো, পাঁচিলের ওপরে উঠেছিল, যেমন পাঁচিলের ওপরে উঠে এপার ওপারের বিভেদ দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে যায়। কে জানে সেই দুইপারের পার্থক্য দেখতে দেখতে নিজের মধ্যে কি বিতর্কের সূত্র নির্মাণ করে, নিজেই জানে।

আসলে অনেক কিছু স্মরণে এনে আত্মমগ্ন হয়ে পার্থক্যের সুত্র উপভোগ করতে করতে ভৌতিক আচ্ছন্নতায় জড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন এই আচ্ছন্নতা তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। নিজেকে কোনো যুক্তিতেই প্রতিরোধ করতে না পেরে ছুটে যায় পাঁচিলের মাথার ওপরে।

ঠিক আজকেও পাঁচিলের ওপরে উঠে দুইপারের বিভেদ বুঝে ওঠার আগেই এবং আচ্ছন্নতার মধ্যে প্রবেশ করার আগেই পাঁচিলের নিচে দৃশ্যটি দেখতে পেয়ে স্থির হয়ে গেল। সে কোনোদিন পশুর প্রসব দৃশ্য দেখেনি। যেমন গোয়ালা বা খাটালের মালিক, ঘোড়ার মালিক গরু ও মহিষ ও ঘোড়ার প্রসব দৃশ্য দেখে। সেই সময়ে কি কি জরুরি কাজ তাও তারা বিলক্ষণ জানে। কিন্তু দেবাঞ্জনের মতো অনেকেই গরু মহিষ ও ঘোড়ার প্রসব দৃশ্য কোনোদিন দেখেনি।

এই গ্রামে একমাত্র খসরুর কাছেই একজোড়া ঘোড়া আছে। খসরু আহমেদের ঘোড়াই হল একমাত্র পুঁজি। ঘোড়া নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিভিন্ন বিপজ্জনক খেলা দেখায়, একটি সাদা অন্যটি বাদামি। বাদামি ঘোড়াটি মাদী আর সাদা ঘোড়াটি মদ্দা। অশ্বপালক জানে মদ্দা ঘোড়াকে যুতসই করে রাখতে পারলে, অনেক আয় দেয়। মুনাফা আছে। মদ্দা ঘোড়াকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে পালের কাজে লাগাতে পারলে, এক এক দানপ্রতি রেট খারাপ নয়। এই গ্রাম থেকে বহুদূরের গ্রাম পর্যন্ত পাল খাওয়ানোর মদ্দা ঘোড়া মাত্র দুইজন অশ্বপালকের কাছে আছে। একজন খসরু আহমেদ আর অন্যজন প্রয়াগ খুদেরি।

খসরু আহমেদ নিজের দুই ঘোড়াকে পাল খাওয়ানোর আগে, চোস্ত করে রাখে। ক্ষুরে লোহার পাত বা নাল লাগিয়ে পাথর বা মাটিতে পা দিয়ে ঠোক্কর দেওয়ার জন্য তেজি করে রাখে। গ্রামবাসীরা জানে খসরু আহমেদের মাদী ঘোড়ার নাম মুন্নি আর মদ্দার নাম মুন্না। মুন্না ও মুন্নি দুই ঘোড়াকে নিয়ে গ্রামাসীদের আমোদ ও ফুর্তি কম নয়, বিশেষ করে সাদা ঘোড়া মুন্নার চাহিদা বিয়ের সময় অধিক। বিয়ের যাত্রার সময় বর ঘোড়ার পিঠে চেপে যায় বিবাহ করতে। এটি এই গ্রামের অভিজাত প্রথা।

পাঁচিলের ছায়া নিয়ে মুন্নি মানে মাদী ঘোড়াটি সব থেকে জরুরি কাজটি করবে বলে স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। কিছুক্ষণ পরে খসরু এসে বুঝতে চেষ্টা করছিল, সম্পূর্ণ কাজটি করে ফেলতে কতটা সময় লাগবে। এই নিয়ে তৃতীয়বার মুন্নি শাবক প্রসব করতে চলেছে। মদ্দা হোক বা মাদী খসরু আহমেদ জানে মুনাফা প্রায় সমান সমান। মাদী মুন্নি তার কাজটি দ্রুত সেরে ফেলে গলা তুলে চিঁহিঁহিঁ করে ডেকে উঠতেই পাঁচিলের ওপরে তাকিয়ে দেবাঞ্জনকে বালতি এগিয়ে দিয়ে ইশারায় বলল এক বালতি জল নিয়ে আসতে। এই পবিত্র কাজের পরে পশু হোক বা মানুষ হোক জল দেওয়া এক পবিত্র কাজ। পাঁচিলের নানান জায়গায় ফুঁকো, এক ফুঁকোতে দেবাঞ্জন পা রেখে খসরুর এগিয়ে দেওয়া বালতি নিয়ে চলে গেল টেপা কল থেকে জল তুলে নিয়ে আসতে।

জল নিয়ে এসে, ঘোড়ার মুখের সামনে রাখতেই, মুন্নির দুই নীল চোখের ভিতরে সামুদ্রিক ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। শাবক প্রসব করার এক গভীর আনন্দ উপভোগ করতে করতে বালতির জলে মুখ দিয়ে পাঁচিলের ছায়া বারে বারে ভাঙছিল। জন্ম মানেই আলোর প্রকাশ। জন্ম এমন অতীতের সমস্ত মৃত্যু শোকের অন্ধকারকে ঢেকে দেয়।

মুন্নির মুখের সামনে জলের বালতি রেখে, দেবাঞ্জন আবার পাঁচিলের ফুঁকোতে পা রেখে পাঁচিলের মাথায় উঠে গেল। তারপরে প্রতিদিনের মতো সাবধানী ব্যালান্স রেখে গুছিয়ে বসে পকেট থেকে প্যাকেট বার করে ঠোঁটে সিগারেট গুঁজে দেশলাইয়ের খোলে কাঠি ঠুকে দিল। পাঁচিলের নিচে তখন নবজাতক উঠে দাঁড়িয়ে বারে বারে পড়ে যাচ্ছিল। আবার উঠে দাঁড়াচ্ছিল। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের সঙ্গে সখ্য করতে হলে যেভাবে পতন ও উত্থানকে বুঝে নিতে হয়। দেবাঞ্জন সিগারেটের তৃপ্তির ধোঁয়া ছেড়ে ইষ্টপুরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। খসরু আহমেদ তখন মুন্নির সেবায় ব্যস্ত। বারে বারে ঘোড়ার পিঠে ও গলায় আদর করে বোঝাতে চাইছিল, মুন্নি তোর তৃতীয় সন্তানকে আমাদের পাঞ্চাল গ্রাম স্বাগত জানাচ্ছে।

দেবাঞ্জন বিবরণে যেমন জেনেছে অনেকটা সেই রকমই। মাথায় গামছার ফেট্টি, কাঁধে রাইফেল, একজনের আবার গায়ে ফতুয়া হাঁটুর ওপরে ধূতি অন্যজনের ফতুয়ার সঙ্গে লুঙ্গি বাকি সবার জলপাই রঙয়ের টি সার্ট ও ধূসর রঙয়ের প্যান্ট, মোট আটজন কি নয়জনের মতো হবে। দেবাঞ্জন বারে বারে গুনে গুনে জন প্রতি গুনে দলের মোট সংখ্যা স্থির করতে চাইছিল। কিন্তু প্রায় ছায়ার মতো মানুষগুলি জলকাঁপার মতো নড়ে উঠছিল বলে দেবাঞ্জন বারে বারে গুনতে ভুল করে ফেলছিল।

দেবাঞ্জন ওদের দেখতে পেয়ে গ্রামের কারও কারও এই দৃশ্যের মতো শোনা কিছু সংবাদের সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করছিল। কিছু কিছু সংবাদের রিপোর্ট মিলে গেলেও ওরা দলে এতজন মোটেই ছিল না। দেবাঞ্জন ধৈর্য ধরে দৃষ্টি স্থির করে গুনে যাচ্ছিল। অবশেষে দশজন। দশজনই। নিজের উত্তেজনা ও আতঙ্ককে রোধ করার চেষ্টা করল।

খসরু তখনও ব্যস্ত তার মাদী ঘোড়া মুন্নিকে নিয়ে।

অনেক দৃশ্যই আছে যা দেখার পরে নিজের গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হয়। অনেক দৃশ্যই আছে যা সবাইকে আনন্দ দেয় আহ্লাদিত করে, গভীর বেদনার জন্ম দেয়, দুই গাল বেয়ে অশ্রু নিবেদন করে, আবার অনেক দৃশ্য আছে সেটি দেখার পরে অনেক ঝুঁকির হয়ে যায়। দেবাঞ্জন বারে বারে ভাবছিল সে যা দেখছে তা কি সত্যি?

হ্যাঁ। একেবারেই সত্যি।

দলটি কিছুক্ষণ পর পর দাঁড়িয়ে পড়ছিল।

আর পাঞ্চাল গ্রামের দিকে ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিল।

কাঁধের রাইফেলকে বারে বারে শক্ত করে ধরে তটস্ত করে পরস্পরকে কি যেন বলছিল। দেবাঞ্জন ভাবছিল, দলটি তাকে দেখে ফেলেনি তো? পাঁচিলের ওপরে বসে তাদের লক্ষ করছে? সে ওদের সম্পর্কে যথেষ্ট জানে। সত্য মিথ্যা মিলিয়ে মিশিয়ে অনেক খবর হলেও তার চোখের সামনে যে দৃশ্য মেলে উঠছে তা একেবারেই সত্য।

ডান হাতে চিমটি কেটে অনুভবে জানতে চাইছিল সে কি সত্যিই এখানে বসে আছে? ঘোড়ার প্রসব থেকে সামনের দৃশ্য অনেকটাই দুই অনুভূতির। এক হল নবজাতকের জন্ম অন্যদিকে এই দৃশ্য দেখার আতঙ্কের মধ্যে দুটি স্রোতের অনুভূতি বিপরীতধর্মী। তার শরীর যেন কাঁপছে।

দলটি যতক্ষণ না ইষ্টপুরের জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে গেল, দেবাঞ্জন পাথরের মতো স্থির হয়ে বসেছিল। এক সময় দলটি জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে যাওয়ার পরে দেবাঞ্জনের ভিতরে আতঙ্কের ও রহস্যের যে সূচনা করে গেল, তা অন্য কাউকে বলে না দিতে পারলে সে হাল্কা হবে না।

পাঁচিলের ফুঁকোতে পা রেখে, সে নেমে দ্রুত দৌড়ে চলে গেল পঞ্চায়েত সমিতির সাইনবোর্ডের নিচে। পকেট থেকে ফোন বার করে, গণেশ চণ্ডী রাধাপ্রসাদকে যতটা নিচু স্বরে পারল চলে আসতে বলল।

পঞ্চায়েত সমিতির সাইনবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়েই দেবাঞ্জন শুনতে পেল পর পর পাঁচবার ফায়ারিঙয়ের শব্দ। একা দৃশ্য দেখার মধ্যে যে গোপনীয়তা থাকে, শব্দ শোনার মধ্যে সেই গোপনীয়তা থাকে না। দেবাঞ্জন বুঝতে পারল, ওরা ইষ্টপুরের জঙ্গল যে অতিক্রম করে গেল, ফায়ারিঙয়ের শব্দে গ্রামবাসীদের জানিয়ে দিয়ে গেল। এই শব্দ গ্রামবাসীদের মুখে মুখে তৈরি করবে নতুন কথা, পুনরায় আতঙ্কের নতুন পরিভাষা।

ওরা খড়ের গাদার বিমূর্ত ছায়া ভেঙ্গে এল, অশোক, রাধাপ্রসাদ, গণে্‌ চণ্ডী। লক্কা পায়রা যেমন উড়ে বেড়ায়, তেমনিই এরা চক্কর নিয়ে নিয়ে দোভাঁজ বেলাকে এক করে দিয়ে প্রতিদিনকে ফুরিয়ে ফেলে।

দেবাঞ্জন বলল, হাঁপাচ্ছিস কেন রে?

রাধাপ্রসাদ বলল, আমরা তিনজন দেখলাম। আর কেউ দেখেছে কি না ভেবে ভয় পাচ্ছি। যদি দেখে থাকে তাহলে ওদের কথাতেই ধরা পড়ে যাব।

অশোক বলল, কি দেখলি?

রাধাপ্রসাদ বলল- আমরা কি দেখেছি তা বলতে চাই না। ডেকেছিস কেন?

বিশাল বলল, আমিও দেখলাম।

কি দেখলি?

দেবাঞ্জন বলল, মনে হচ্ছে, সবাই বোধহয় ওই একই দেখলাম।

রাধাপ্রসাদ বলল, যদি দেখে থাকি তাহলে নিজেদের মধ্যেই সবাইকে গোপনে রাখতে হবে। যদি তা না রাখতে পারি, তাহলে আমাদের জেনে রাখতে হবে, খুব বড় বিপদ হতে পারে। একবার যদি প্রকাশ্যে এসে পড়ে, তাহলে আমাদের থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

দেবাঞ্জন বলল, যদি থানায় ডেকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে, আমাদের সবাই একই রকম দেখেছি একইরকম বলতে হবে। একটু উনিশ বিশ হলেই আমরা সবাই সন্দেহের তালিকায় চলে আসব। এর পরিণতি ভালো হবে না।

রাধাপ্রসাদ বলল, আগে আমরা নিজেদের মধ্যেই জেনে নেব আমরা কি দেখলাম?

দেবাঞ্জন বলল, একদমই তাই।

রাধাপ্রসাদ বলল, তাহলে আমরা একমত হচ্ছি, সবাই আমরা যা দেখেছি, একই দেখেছি।

বিশাল বলল, দেখার বিষয়গুলিকে আগে নিজেরা ঠিক করে নিতে হবে, কি কি দেখেছি। এই বিষয়ে আমাদের মধ্যে যেন কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।

দেবাঞ্জন খুবই নিচু স্বরে বলল, আমরা কি দেখলাম আমরা জানি। মুখে প্রকাশ করছি না। যখন আমরা জানিই, তখন আমরা আরও সতর্ক থাকতে চাই।

রাধাপ্রসাদ কানের ফুঁকোর কাছে বিড়ি নিয়ে আঙুল দিয়ে চেপে মচমচে শব্দ নিয়ে তারপরে ঠোঁটের কোণে গুঁজে কাঠি ঠুকে দিল খোলের বারুদের ওপরে।

চণ্ডী বিচালি বিছিয়ে তাসের বাণ্ডিল বারে বারে সাফল করে বলল, এখনও একটু সময় আছে, সবাই যখন এসেই পড়েছি, দান দিবি গণেশ?

আমার কাছে খুচরা পয়সা নাই।

#

প্রথম দিন ইষ্টপুরের জঙ্গলের মধ্যে দলটির চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখলেও অশোক বিশাল শ্যামল জেনে গেল গণেশের কাছ থেকে। গণেশের পেটের মধ্যে গোপনে দেখা দৃশ্যের কথা আর গোপন থকাল না। এমন কি সেই কথা বিশাল শ্যামলের মধ্য দিয়ে গ্রামবাসীরাই শুধু নয়, জানতে পেরে গেল গ্রামপ্রধান ও স্থানীয় থানার বড়বাবু মেজবাবু পর্যন্ত।

দেবাঞ্জন বুঝতে পারছিল না পাঁচিলের ওপরে কে এসব রেখে যাচ্ছে? অদ্ভুত তো। না কেউ এই রেখে দেওয়ার মধ্য দিয়ে কিছু বার্তা দিতে চাইছে।

পরের দিন খবরের কাগজের ওপরে আলতা দিয়ে খসখসে লেখা পোস্টার। দেবাঞ্জন পোস্টারের কিছু লেখার অর্থ বুঝতে পারল। বাকি বুঝতে পারল না। কিন্তু বেশ কিছু অক্ষরে লেখা কথা দেবাঞ্জনের কাছে অনেক বিপজ্জনক ও গ্রামসমাজের পক্ষে ভালো মনে হল না। ভাগ্যিস উত্তর পশ্চিম কোন ঘেঁষে মেঘ উড়ে কালবৈশাখী রচনা করল বলে। ঝড়ের দাপটে ও বৃষ্টিতে খসে পড়া পোস্টারগুলি কোথায় যে উড়িয়ে নিয়ে গেল, পরের দিন আর তার চোখে পড়েনি।

ঝড় কি আর কাগজের ঠিকানা রাখে?

কোথা থেকে এসে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যায়?

হ্যাঁ। পরের দিন আবার কি মনে করে কীসের টানে দেবাঞ্জন আবার চলে এল পাঁচিলের মাথায়? নিজের কাছেই তার এই ব্যাখ্যা নেই। পকেট থেকে সিগারেট বার করে ঠোঁটে রেখে যেই না ফুঃ দিতে যাবে তখনই সে স্থির হয়ে গেল।

একটি রক্তমাখা গামছা ও একটি ডোরা কাটা জামা যার মধ্যে কালচে ছোপ ছোপ। মাঝারি গড়নের জামাটি দেখে দেবাঞ্জন বুঝতে পারল এ মাঝ বয়সী কোনো লোকের জামা। তার বুঝতে অসুবিধা হল না, লোকটিকে হত্যা করা হয়েছে।

দেবাঞ্জন অনেকটা সেই উদ্ভিদ মানুষের মতো পাঁচিলের মাথায় হামাগুড়ি দিয়ে সরে একটু দূরেই পাঁচিলের ফুঁকোতে বাঁ পা নামিয়ে দিয়ে গোটা শরীর উতরে নিল। তারপরে ঠোঁটের ফাঁক থেকে গলে গেল মাটিতে জ্বলন্ত সিগারেট। সে প্রাণপণে ফূঃ দিতে দিতে পার হয়ে এল পাঁচিলের পাশ ঘেঁষে রাস্তার বাঁক পর্যন্ত। তারপরে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মাটিতে অবাক হয়ে থোক থোক ফাঙ্গাস দেখতে থাকল।

পরের পর তিন দিন সে যা দেখল, নিজেকেই সে সন্দেহ করতে থাকল।

বাড়িতে ফিরে যৌনতার টুকিটাকি বিষয়ক একটি পিন সাঁটানো বই খুলে পড়তে পড়তে তার মনে হল, যুদ্ধক্ষেত্রে নেপোলিয়ান বোনাপার্ট কি নৃশংসভাবে খুঁড়িয়ে চলা ঘোড়াকে হত্যা করত। এমনকি কোনো ঘোড়া যদি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করত, সেই ঘোড়াটিকে আগুনে পোড়ানো হত।

রক্তমাখা গামছা ও ডোরাকাটা জামাটি তার চোখের সামনে বারে বারে ভেসে উঠছিল। বালিশের মধ্যে মুখ গুঁজে সে শুনতে পারছিল, ঘরে ফ্যানের হাওয়াতে ক্যালেন্ডারের তারিখগুলি কেমন পরস্পরের সঙ্গে আমড়াগাছি করছিল। আজকে সে প্রথম জানতে পারল প্রতিটি দিন অতীতের দিনগুলির সঙ্গে প্রবল হিংসে করে। এক সময় সে ঘুমিয়ে গেল। ঘুমিয়েই সে বুঝতে পারল তার শরীরের ভিতরে কে যেন ক্রমাগত মাটির কলসি ভেঙ্গে যাচ্ছে।

পরের দিন সে যখন অনেক দেরি করে ঘুম থেকে উঠল, সে বিছানায় বসেই বুঝতে পারছিল তার ঘরটিকে কেউ নির্জন কোনো একটি জায়গায় রেখে দিয়ে গেছে। গাছের পাতার শির শির শব্দ কেমন জানি বৃষ্টির জল ভাঙছে। মনে মনে সে স্থির করে নিল, আজ সে ঘরের বাইরে আর পা রাখবে না। যার কাজ বলতে সারাদিন লক্কার মতো চক্কর কেটে গ্রামের আনাচ কানাচে সন্ধান করে, ব্যতিক্রম কিছু সংগ্রহ করা, সেই দেবাঞ্জন আজ সকালে পুরানো একটি বই সংগ্রহ করে পাঞ্চাল গ্রামের শীর্ণকায় স্রোতকে মনে রেখে বারে বারে চোখ রেখে আউরে যাচ্ছিল “বাড়ি আমার ভাঙ্গন ধারার অজয় নদীর বাঁকে”......

এই সময় আকাশের গায়ে লেগে থাকে পেটকাটি চাঁদিয়াল। আর দূর থেকে ভেসে আসে গরু মহিষ খেদানোর বাগালের কণ্ঠধ্বনি। দেবাঞ্জন কান পেতে শুনতে চাইছিল নিজের জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়া কিছু শব্দ। ছুঁয়ে ফেলতে চাইছিল হারিয়ে যাওয়া অনুভব। ঘরের মধ্যে থেকে খুঁজে যাচ্ছিল একটি ঘর শীতকালে লেপ তোষকের উষ্ণতায় গভীর আপন হয়ে ওঠে। পরের পর কাজগুলি সেরে ফেলতে তার হাত সরছিল না। কিছুতেই মনে করতে চাইছিল না, ঘোড়ার শাবক প্রসব, কাঁধে রাইফেল নিয়ে মাথায় গামছার ফেট্টি বেঁধে ইষ্টপুরের জঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া, রক্তমাখা গামছা ডোরাকাটা জামার মধ্যে শুকনো কালো ছোপ ছোপ। কিন্তু যতই সে মনে না করতে চেষ্টা করুক থেকে থেকেই তার মনে পড়ে যাচ্ছে পাঁচিল ও পরের পর দেখে ফেলা দৃশ্য ও বস্তুগুলি। বেলা যতই গড়িয়ে যাচ্ছিল, দেবাঞ্জন কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠছিল।

বালতি দিয়ে কুয়ো থেকে জল তুলে স্নান সে করেই যাচ্ছিল। জল তুলছিল আর মাথা ও শরীরে ঢেলে নিজের মন থেকে পাঁচিলের দৃশ্যের অশান্তি ধুয়ে ফেলতে চাইছিল। কিন্তু যতই সে শরীরে জল ঢালছিল ভাঙ্গা পাঁচিলের ঘেরাওয়ের মধ্যে দেবাঞ্জন বন্দী হয়ে যাচ্ছিল। স্নান করতে করতে সে হাঁপিয়ে উঠছিল। একসময় সে ক্লন্ত হয়ে কুয়োতলায় বসে পড়ল।

গামছা দিয়ে শরীর মুছে ফেলবে সেই কথা ভুলে গিয়ে মনের ভিতরে বসিয়ে নিচ্ছিল প্রায় প্রতিদিন পাঁচিলের ওইদিকে যাওয়ার অভ্যাসকে। কেন জানি সে ক্রমশ এক গভীর আচ্ছন্নতায় জড়িয়ে গিয়ে ঘরের ভিতরে গিয়ে জামাকাপড় পড়ে সেদ্ধ ছোলা ও মুড়ি গালে রেখে দরজার কাছে এসে মুখ বাড়িয়ে কিছু একটা বলে পা রাখল উঠোনে।

একটা ফাঁকা জনহীন মাটির পথ ধরে যত দ্রুত সম্ভব যাওয়া যায়, মাঠের ওপরে গত পরশুদিনের কালবৈশাখীর ঝড়ের চিহ্নগুলি পড়েছিল। সেইগুলিকে পাশ কাটিয়ে পাঁচিলের দিকের পথ সোজা নিয়ে, এগিয়ে যেতে থাকল এই ভেবে, আজ আবার পাঁচিলের ওপরে সে কি দেখে ফেলবে? না জানা দেখার কৌতূহলকে তার মনে হল, অনেকটা সেই বিপজ্জনক ফাঁদে পা দেওয়ার মতোই। আবার কি দেখে ফেলতে কি দেখে ফেলবে?

এই সব ভাবতে ভাবতেই অজান্তেই দেবাঞ্জন পাঁচিলের ভেঙ্গে যাওয়া ফুঁকোতে পা রেখে মাথা উঁচিয়ে প্রথমেই চোখ রাখল সেই জায়গাতে, কিন্তু গতকালের রক্তমাখা গামছা ও ডোরাকাটা কালো কালো শুকনো রক্তের ছোপ ছোপ জামাটি নেই। সেই জায়গায় রাখা আছে একটি রাইফেল। তার পাশে কিছু পোড়া কার্তুজ।

প্রথমে সে বন্দুক ভেবেছিল, কিন্তু ভালো করে লক্ষ করে বুঝতে পারল, রাইফেল। রাইফেল ও বন্দুকের পার্থক্য আসলে সে কিন্তু আজও বুঝে উঠতে পারেনি। ওইরকম কিছু একটা দেখলেই সে রাইফেল ভাবে।

সে যেমন পাঁচিলের ভাঙ্গা জায়গায় পা রেখেছিল, তেমনিই দাঁড়িয়ে রইল। পাঁচিলের ওপরে রাইফেল কেন? না কি মাথায় গামছার ফেট্টি বেঁধে কাঁধে রাইফেল নিয়ে মানুষগুলি ইষ্টপুরের জঙ্গল থেকে বার হয়ে এখানে এসেছে কোনো উদ্দেশে?

পাঁচিলের ওপর থেকে সে নেমেই গেছিল, ফুঁকোতে পা রেখে নেমে গিয়ে আবার ওপরে উঠে পুনারায় রাইফেলটিকে ভালো করে দেখে নিয়ে, গঠনের বিবরণটি খুঁটিয়ে দেখে নিয়ে নিশ্চিত হতে চাইছিল। পাঁচিলের মাথায় কেনই বা রাইফেলটিকে কে রেখে গেল? সঙ্গে কেনই বা পোড়া কার্তুজ?

পাঁচিল থেকে নেমে চারদিক ভালো করে দেখে নিয়ে, বুঝে নিল আশেপাশে বা দূরে কাছে কেউ আছে কি না?

না কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।

পাঁচিল ঘেঁষে যতটা পারল ইটের খাবলের ফুঁকোতে পা রেখে খুব দ্রুত নয় অতি সন্তর্পণে পা চেপে চেপে এগিয়ে যেতে থাকল পাঞ্চাল গ্রামের চৌমাথার দিকে। রাইফেলটি দেখে ফেলার উত্তেজনাকে যতটা পারল নেতিয়ে, ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে, স্বাভাবিক হওয়ার আগে ঠোঁটের কোণে সিগারেট চেপে ভুলে যেতে চাইল।

এই ক’দিন পরের পর সে কি দেখেছে?

চৌমাথায় প্রবেশের আগে, জেলার ফাঁকা মহাসড়কের ওপরে পাটি পেতে বসে দীনু কাকা ও তার সাগরেদ বসে জুয়া খেলছে। পাটির ওপরে তাসের নিচে টাকা পড়ে আছে। দেবাঞ্জন গুটি গুটি পায়ে ওদের পাশে বসে জুয়া খেলার শরিক হয়ে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত তাস খেলার পরে, তার মাথার খোল হাল্কা হয়ে গেল। পর পর কয়েকদিন ধরে, সে যা দেখেছিল, যেন ভুলেই গেল। যা দেখেছিল, সেই সব কিছু দেখার স্মৃতি মনে করতেও চেষ্টা করল না। ক্রমশ যে আতঙ্কের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছিল, সেই আতঙ্কের আচ্ছছন্নতা তাকে আর গিলে ফেলতে পারছিল না।

কয়েকদিন গেল, দেবাঞ্জন নিজের মধ্যে নিজেকে আত্মস্ত হয়ে, বাড়ির কাজকর্মে মন বসিয়ে, নিয়মের মধ্যে থেকে যাওয়ার প্রবল চেষ্টা করল। এই কয়েকদিন জুয়ার আসর তাকে খুবই আকর্ষণ করছিল। জুয়া খেলার মধ্যে অদ্ভুত এক মাদকতা আছে। কখনো কখনো প্রবল জিৎ, আবার কখনো কখনো খেলে উলু হয়ে পকেট ফোক্কা করে বাড়িতে ফিরে আসত।

সেদিন বিকেলে হাজারো গুয়ে শালিক শুকনো ঘাসের ওপরে কলরব করছিল। খুবই বিরল এই দৃশ্য, মাঝে মাঝে কোনো দিন এই দৃশ্য দেখা গেলে গ্রামের চরাচরে অদ্ভুত চঞ্চলতা দেখা যায়। শত শত শালিকের কলরবে গ্রামসমাজকে কিছু একটা বার্তা দিতে চাইছিল।

শালিকের চেল্লামেল্লির কারণে কান পাতা দায়, সে যাচ্ছিল চৌমাথার দিকেই, দীনুকাকার পাটিতে জুয়া খেলার আসরে। কে যেন পিছন থেকে এসে, তার ডান হাত খপ করে ধরে ফেলে বলল, তোকে রাধাপ্রসাদ ডাকছে?

দেবাঞ্জন চমকে উঠল, আচমকাই সে প্রায় চিৎকার করে ওঠার মতো বলে উঠল, কে? কে রে? সামনে আয়।

দেবাঞ্জন পিছনে তাকিয়ে দেখল, গণেশ।

তোকে রাধাপ্রসাদ ডাকছে?

রাধাপ্রসাদ? কোথায়?

পঞ্চায়েত অফিসের সাইনবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। চল, ওখানে সবাই আছে। তোকে খুব দরকার।

কেন?

খুব দরকার।

কীসের দরকার?

বিপদ ঘটে গেছে?

আমি দীনুকাকার ওখানে যাচ্ছি।

খুব দরকার আছে। চল। এখনই চল। আজ তোকে দীনু কাকার পাটিতে বসে জুয়া খেলতে হবে না। যেতে হবে না। জরুরি কথা আছে। রাধাপ্রসাদের কাছে সব জানতে পারবি। চল তাড়াতাড়ি চল।

দেবাঞ্জন জামার পকেট থেকে একটি হজমির গুলি বার করে মুখে ফেলে, এগিয়ে যাবে এমন সময় পাঞ্চাল থানার জিপ হুসসস করে ধুলো উড়িয়ে চলে গেল। সম্ভবত কোথাও রেকি করতে যাচ্ছে। দেবাঞ্জন যেতে যেতে একটু অবাক হচ্ছিল, কি এমন জরুরি কথা রাধাপ্রসাদের?

পঞ্চায়েত অফিসের সাইনবোর্ডের নিচে রাধাপ্রসাদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই– অশোক, শ্যামল, চণ্ডী, বিশাল। গণেশ রাধাপ্রসাদের পাশে দাঁড়াল। দেবাঞ্জন ঠিক তার গা ঘেঁষে। রাধাপ্রসাদ একটু ঝাঁঝালো স্বরে বলল, কোথায় ছিলি এতদিন?

দেবাঞ্জন অবাক হয়ে গেল। কেন? কোথায় আবার থাকব?

তোকে অনেক খুঁজেছি। তোর দেখাই নেই।

কেন কি হয়েছে?

দীনু কাকার ওখানে রোজ জুয়া খেলতে যাচ্ছিস। আমরা তোকে খুঁজে পাচ্ছি না।

কীসের দরকার?

দরকার? তুই জানিস না? তোকে কেঊ বলেনি?

না। কেঊ বলেনি। কি বলবে?

তোকে ও আমাদের সবাইকে থানায় ডেকেছে।

থানায়? কেন?

তোর বাড়িতে থানা থেকে লোক যায়নি?

কেন? থানা থেকে আমার বাড়িতে লোক কেন যাবে?

পাঁচিলের ওপরে কি কি দেখেছিস থানার বড়বাবু জানতে চায়। থানার বড়বাবু জেনেছে আমরা সবাই দেখেছি তুই যা দেখেছিস? তুই যা দেখেছিস আমাদের বলেছিস, তাই আমরা জেনেছি।

হ্যাঁ। আমি যা দেখেছি তোদের অনেকটাই বলেছি।

এমন কি শেষে আমাদের বলেছিস, ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো দেখেছিস। আমরা কি দেখেছিলাম? রক্তমাখা গামছা, শুকনো রক্তমাখা জামা। রাইফেল। পোড়া কার্তুজ? আমরা শুধু দেখেছিলাম কাঁধে রাইফেল নিয়ে মাথায় গামছার ফেট্টি বেঁধে একদল মানুষকে ইষ্টপুরের জঙ্গলের মধ্যে চলে যেতে। সে তো গ্রামের অনেক মানুষই দেখেছে। কিন্তু পাঁচিলের ওপরে যা রাখা ছিল তুই একাই দেখেছিস।

দেখেছি। দেখার মধ্যে কি অন্যায় আছে?

সেটাই থানার বড়বাবুকে বলে আসবি। বড়বাবু কেন জানি আমাদের সবাইকে সন্দেহ করছে। কি কারণে সন্দেহ করছে, জানি না। আমরা কি করেছি, সন্দেহ করবে? আমরা কি রাষ্ট্রবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল করি? না, ডাকাত ও লুটেরার দল করি?

তা কেন করতে যাব?

তোকে এখনই যেতে হবে। না হলে আমাদের খুব বড় বিপদ হবে।

কিছু হবে না তো?

কি আর হবে? বলবি আমার চোখে পড়েছে তাই দেখেছি।

দেখার মধ্যে কি অন্যায়?

অন্যায় কিছুই নেই। কিন্তু তুই পাঁচিলের ওপরে কি কারণে যেতিস? কেন যেতিস? বড়বাবুর সন্দেহ সেখানেই। চল, আজই এখনই চল। এই টেনশন আর নেওয়া যাচ্ছে না।

#

থানার বড়বাবু টেবিলের ওপরে রুলের ঠোকা দিয়ে, আপাতত তোমাদের সন্দেহের মধ্যে আনছি না, কিন্তু তোমাদের প্রতি আমাদের সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। দেবাঞ্জনের দিকে কটমট করে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, তোমার বাবা কি করেন?

দেবাঞ্জন খুবই নিচু স্বরে বলল, হাটে ও মেলায় পাখি বিক্রি করে।

আর কি করেন?

অবসরে নিজের জমিতে চাষের কাজ করে।

তুমি কি করো?

পাঁচিলের ওপরে বসে থাকি।

সারাদিন?

অনেকটা সময়।

কেন?

পাঁচিলের এপার ওপারের প্রভেদ দেখি।

মানে?

এপার ওপারের পার্থক্য দেখি।

কীসের আবার পার্থক্য? একদিকে পাঞ্চাল গ্রাম অন্যদিকে ইষ্টপুরের জঙ্গল।

সেটাই দেখি।

এর বেশি কিছুই না?

না স্যার।

সত্যি বলছ?

হ্যাঁ স্যার, মিথ্যা বলব কেন?

তোমার কি মনে হয়, পাঁচিলের ওপরে সন্দেহজনক জিনিসগুলি কে রেখেছিল? কাকে সন্দেহ করছ? কে বা কারা?

কি করে বলব স্যার?

কাউকে দেখেছ?

না, আমি শুধু পাঁচিলের ওপরে রাখা দেখেছি।

ধরোনি তো?

মানে?

ছুঁয়ে দেখনি তো?

না স্যার। রাইফেল পোড়া কার্তুজ রক্তমাখা গামছা ও ডোরাকাটা শুকনো রক্তের ছোপ ছোপ দেওয়া সার্ট দেখে খুবই ভয় পেয়ে গেছিলাম।

আর খবরের কাগজের ওপরে আলতা দিয়ে পোস্টার?

খুবই জড়ানো হাতের লেখা। কিছুটা পড়তে পেরেছিলাম। কিন্তু মানে বুঝতে পারিনি।

ঠিক আছে। তুমি যা বলছ, বিশ্বাস করছি। ধরে নিচ্ছি তুমি সত্যি কথাই বলছ। যদি পরে জানতে পারি, মিথ্যে কথা বলছ, তখন কিন্তু তোমাকে আমরা গ্রেপ্তার করব।

না স্যার। যা বললাম একদম সত্যি কথাই বলছি।

বড়বাবু এবার রাধাপ্রসাদের দিকে তাকিয়ে বলল, এই তোমার বাবা কি করেন?

আমাকে বলছেন স্যার?

তো কাকে বলছি?

আমার বাবা সাইকেলে ঘুরে ঘুরে কীটনাশক বিক্রি করে।

তুমি কি করো?

এখন কোনো কাজ নেই। জুতোর কারখানায় কাজ করতাম।

তোমাকে দেখে সর্দার মনে হয়।

না স্যার, ওরা সবাই আমার বন্ধু।

ও যা বলল, আমরা ধরে নিলাম সত্যি বলল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওর কথাগুলি যদি মিথ্যে হয় তোমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করব।

এবার দেবাঞ্জন একটু সাহস সঞ্চয় করে বলল, স্যার একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? যদি আপনি অনুমতি দেন?

কি বলবে?

যদি আপনি অনুমতি দেন তাহলে সাহস করে বলতে পারি।

বলো। কি বলবে?

স্যার দেখার মধ্যেও কি অপরাধ থাকে?

না থাকে না। যদি না তা রাষ্ট্রবিরোধী হয়। সন্দেহের মধ্যে অবশ্যই। জানতে চেষ্টা করব যে দেখছে সে ওই যা বললাম, তার সঙ্গে যুক্ত কি না? তুমি যা দেখেছ, সেটি সবাইকে বলে নিজের অপরাধকে লঘু করেছ। যাক, প্রয়োজনে আবার তোমাদের সবাইকে ডেকে আনতে পারি। আজ থেকে এমন কিছু করবে না, যা থেকে আমাদের সন্দেহ গভীর হয়।

বড়বাবু শ্যামলের দিকে তাকিয়ে এই তোর বাবা কি করেন?

বেলুনের কারখানায় কাজ করে।

গণেশের দিকে আঙুল তুলে, তুই পিছনে কেন দাঁড়িয়ে আছিস? তোর বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের অনেক নালিশ আছে। তুই গণেশ মণ্ডল?

হ্যাঁ স্যার।

তোর বাবা কি করেন?

কাঁচা সবজির পাইকার।

তুই চুরি করিস?

না স্যার। চুরি কেন করব?

বড়বাবু যতটা পারল, গলা তুলে এই স্বদেশী... স্বদেশী...... যা তো মুক্তির দোকান থেকে চা নিয়ে আয়।

স্বদেশী বলল, সবার জন্য?

তা হলে কি আমার জন্য?

#

পাঞ্চাল গ্রামের রাস্তার চৌমাথাগুলির অদ্ভুত এক জ্যামিতিক মিল আছে। যেখানে দাঁড়ানো যায়, সেখানে দাঁড়ালেই সব চৌমাথাকেই একই রকম দেখতে লাগে। বাদাম গাছের নিচে মাটির কুটির, কুটিরের পাশে চায়ের দোকানের দরমার আচ্ছাদন। সব চায়ের দোকানদারকে একই রকম দেখতে। কালো বাদামি রঙয়ের শরীর, কাঁচাপাকা চুল, একই রকমের গড়ন। খাটো, গলায় তুলসি কাঠের মালা। আর চৌমাথার সব চায়ের দোকানদারের নাম গগন। কেউ বলে গগনদা আবার অনেকেই বলে গগনা। সব গগনাই বিপত্নীক। সবাই নিঃসন্তান। অবলম্বন বলতে, শুধু চায়ের দোকান।

গণেশ, বিশাল, রাধাপ্রসাদ, দেবাঞ্জন, শ্যামল, অশোক থানা থেকে বেরিয়ে প্রথম চায়ের দোকানের চৌমাথা অতিক্রম করল। অশোক শ্যামল বাঁ পাশ নিয়ে উত্তরদিকে চলে গেল। তারপরের মোড়ে চায়ের দোকানের পাশে ডানদিকের মাটির দাগ অনুসরণ করে বিশাল ও গণেশ ঢালু ধরে পা চেপে চেপে নেমে গেল। তারপরের চায়ের দোকানকে পাশে রেখে রাধাপ্রসাদ চলে গেল পাঞ্চাল গ্রামের হিমঘরের দিকে।

একদম শেষে পাঞ্চাল গ্রামের সীমানা ধরে দেবাঞ্জন চায়ের দোকানের পাশ ধরে সেই মধ্যযুগের পাঁচিলের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখল, খসরু আহমেদের ঘোড়াটি নবজাতক শাবকটির সঙ্গে, ছুটে যাচ্ছে ইষ্টপুরের জঙ্গলের দিকে। বাদামি রঙয়ের ঘোড়ার সঙ্গে দুধসাদা শাবকটি ছুটে যাওয়ার দৃশ্য যেন চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য।

দেবাঞ্জন মনে করতে থাকল।

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে আবার আতঙ্কিত হয়ে উঠল, এই দেখার মধ্যে স্থানীয় থানার বড়বাবু কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি খুঁজে দেখবে না তো?

ফাঁকা মাঠ গড়িয়ে হু হু বাতাসের মধ্যে দুইহাত দিয়ে মুখ ঢেকে বসে পড়ল দেবাঞ্জন।

এরপর থেকে কোনো কিছু মুক্তমনে দেখলেও দেবাঞ্জন আতঙ্কিত হয়ে উঠত।



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. মাঠপোড়া জীবনের ইতিকথা। লেখক শুভঙ্কর গুহ। এ এক অদ্ভুত পাঠ। গল্পপাঠ বললাম না কারণ গল্পে প্রচ্ছন্ন বা প্রকট প্রকাশে গল্পকাহিনি থাকাই স্বাভাবিক কিন্তু আমি ভাবছি এই গল্পটি পাঠের শেষে এটি আমার চিন্তা চেতনার ক্ষেত্র ভূমির যে পরিসর দখল করে তা ভাবনার জগৎকে যেভাবে সুদূর প্রসারী করে তোলে তা এক পরম পাওয়া। গল্পের এমন নির্লোভ নির্মেদ বয়ন খুব একটা দেখা যায়না। লেখককে অভিনন্দন জানাই।

    উত্তরমুছুন