-ইসরাত জাহান
সাদিয়া সুলতানা, গল্পকার, ঔপন্যাসিক। এই সময়ে যে কয়জন গল্পকার ও ঔপন্যাসিক লেখার স্বকীয়তা ও সৌন্দর্যে বোদ্ধা পাঠকমহলের সুনাম কুড়িয়েছেন তাদের ভেতরে সাদিয়া সুলতানা অন্যতম। কিছুটা প্রচারবিমুখ এই লেখক তার কলমের আঁচড়ে উপন্যাসের পাতায় অসাধারণ সব গল্প লিখে চলছেন। তিনি সত্য ঘটনা জানাতে উপন্যাসের আশ্রয় নিয়েছেন, প্রকাশ করছেন সকল অব্যক্ত ক্ষোভ ও যন্ত্রণার।
সাদিয়া সুলতানার লেখালেখির শুরু হয় স্কুলজীবনে। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার পাঠক পাতা ও চিঠিপত্র বিভাগে লেখা প্রকাশের মাধ্যমে তার লেখার যাত্রা শুরু হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে পড়াশোনা করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন তার লেখার ক্ষমতা ধীরে ধীরে আরো প্রসারিত ও শাণিত হয়েছে আর পাঠকেরা পেয়েছে অসাধারণ কিছু উপন্যাস ও গল্প সংকলন।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান এবং শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামানের সংকলন ও সম্পাদনায় প্রকাশিত আইন অভিধান ‘আইন-শব্দকোষ’ এ সাদিয়া সুলতানা গবেষণা সহকারীরূপে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বিচারক হিসাবে বাংলাদেশ বিচার বিভাগে কর্মরত আছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থাবলি: গল্পগ্রন্থ: চক্র (২০১৪), ন আকারে না (২০১৭), ঘুমঘরের সুখ-অসুখ (২০১৯), মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ (২০২০), উজানজল (২০২২) এবং উপন্যাস: আমি আঁধারে থাকি (২০১৮), আজু মাইয়ের পৈতানের সুখ (২০২০), ঈশ্বরকোল (২০২১), বিয়োগরেখা (২০২২), নীলগর্ভ (২০২৩), ৭১ (২০২৪)
সাদিয়া সুলতানার প্রাপ্ত পুরস্কারসমূহ: চিন্তাসূত্র সাহিত্য পুরস্কার (২০২২), বাংলা একাডেমি পরিচালিত রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্য পুরস্কার (২০২৩)।
সাদিয়া সুলতানার লেখায় সদা উঠে এসেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, দেশ ভাগ, আশপাশের অনিয়ম ও অনাচার থেকে শুরু করে মানবিক মূল্যবোধের সকল দৃশপট। অনেকটা নির্মোহভাবে তিনি লিখে যান তার গল্প ও উপন্যাস। তার সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মাঝে পাঠক যেন খুঁজে পায় নিজেদের প্রতিচ্ছবি, আর বর্ণনার সাবলীলতার কারণে পাঠকের কাছে রূঢ় বাস্তবতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সবসময়।
২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে সাদিয়া সুলতানার উপন্যাস ৭১। উপন্যাসটি প্রকাশ করেছেন গ্রন্থিক প্রকাশন, বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী তাইফ আদনান।
৭১-উপন্যাসটির পটভূমি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদের উত্তরের জনপদ দিনাজপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইডের নানা ঘটনা ওঠে এসেছে এই উপন্যাসে। এককথায় বলা যায় বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জনকে কাগজে-কলমে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এই উপন্যাসে। আর উপন্যাসটির তাৎপর্য পাঠকের সামনে তুলে ধরার জন্য লেখক উপন্যাসের নাম দিয়েছেন ৭১। এই একাত্তর সালটা বাঙালি জাতির বিজয়ের বছর, আনন্দের বছর। তাই আমার মনে হয় উপন্যাসটির নামকরণ একদম সঠিক। এমন বিজয়ের গৌরবগাঁথা রচনা করতে কত ত্যাগ, কত রক্তের দিয়েছিল বাংলার স্বাধীতাকামী জনগণ তারই ছোট একটা খণ্ডচিত্র এই উপন্যাস।
মূলত ৭১ এর আখ্যান একাত্তরের। একাত্তরের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ওঠে গণহত্যা, নৃশংসতা, নারীর আর্তনাদ, হায়েনা-দুর্বৃত্তদের পৈশাচিক হাসি, অসহায় মানুষের চিৎকার, জেনোসাইড, সব মিলিয়ে শরীর হিম হয়ে আসা সব দৃশপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এসবের বিনিময়ে আমরা বিজয়ের মুখ দেখেছি, আর বিজয়ের কারণেই এখন আমরা বলতে পারি আমরা বাঙালি।
সাদিয়া সুলতানার ৭১ উপন্যাসটিতে উঠে এসেছে দিঘলটারি নামের একটি গ্রামের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। সেই সময়ের শহিদের রক্ত ভেজা নরম মাটি কতটা কষ্ট সয়ে আজ এতোটা শক্ত হয়েছে তারই দলিল হলো এই ৭১ উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা সত্যি ঘটনা ওঠে এসেছে উপন্যাসের পাতায় পাতায়। কাঞ্চন ও পুনর্ভাবার জল ভেসে যাওয়া লাশ, মানুষের ভেতরে গুমরে থাকা কষ্টও উঠে এসেছে উপন্যাসে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, লেখক মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, তারপরও সেই সময়টা উপস্থাপনের কৌশল যেকোনো পাঠককে ভাবাবে, এটাই মনে হয় আসল লেখকের কৃতিত্ব। লেখক তার কল্পনাশক্তির সমন্নয়ে লিখেছেন একাত্তর সালের কিছু মানুষের লড়াইয়ের গল্প, বেঁচে থাকার গল্প, রাজাকারদের নিষ্ঠুরতা, আমাদের মা বোনদের গায়ে এঁকে দেওয়া হায়নাগুলোর কালিমার কথা। লেখক আমাদের বলছেন দরদীর গল্প, আঞ্জুয়ারা, হায়াতন বিবি, নাসির, কিনা মন্ডল, ইয়াসির, মইন, আব্বাস, ইদ্রিস মুনশী, লালবাবু, ফুলবাবু, টাট্টু মিলন, ফরিদুর, সবুজ, আসমা, ছন্দা, ফিরোজা, নছিমন মাই, নওফেল শেখ, লতিফা বিবির গল্প। ইয়াসিরের মা জোবাইদার কথা।
এই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে লেখক সাদিয়া সুলতানা ঘুরে বেড়িয়েছেন দিনাজপুরের বিভিন্ন অঞ্চলে, পথঘাটে। তিনি সন্ধান করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বর্বরতার চিহ্নগুলো। যার স্বাক্ষর এখনও বহন করছে বিভিন্ন স্থান ও কিছু মানুষ। এসব অনুসন্ধানের জন্য লেখক পড়েছেন প্রচুর বই, সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেই সময়ের স্মৃতিধারণ করে বেঁচে থাকা মানুষের। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া বিহারি-বাঙালি দাঙ্গার কথা যেমন ৭১ উপন্যাসে আছে তেমনি আছে বিভিন্ন বাড়ি থেকে নসিমন মাইয়ের চুরি করে নিয়ে আসা পিঁয়াজ আলু চুরির গল্প। জয়গুন বিবি, দরদী, আঞ্জুয়ারা, আসমা, ছন্দা, ফুলবাবুর গল্পে গল্পে একাত্তরের সময়ে মানুষের জীবন, মরণ, ভালোবাসা লেখকের শক্তিশালী কলমে উঠে এসেছে আমাদের সামনে। লেখক তার কল্পনায় বিভিন্ন চরিত্র নির্মাণ করেছেন, বলেছেন দিঘলটারির মানুষের মুক্তিদিনের কথা, কাঞ্চনের পানিতে ভেসে ওঠা লাশের স্বজনদের হাহাকারের কথা। আমরা যদি বিস্তৃত অর্থে চিন্তা করি তাহলে এই দিঘলটারিই হলো বাংলার ভূমি, কাঞ্চন আমাদের নদী। আর এই ভুমি ও নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক জনপথের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হলো ৭১।
৭১ উপন্যাসের অসংখ্য চরিত্রের মাঝে একটি চরিত্র মূখ্য আছে। সে হলো দরদী। এই উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা ঘটনা প্রবাহে দরদী নির্মমতার সাক্ষী হয়ে থেকেছে। শুরু থেকে শেষের মাঝে দরদীর সাথে নানাভাবে যুক্ত হয়েছে অনেক চরিত্র, যেমন নাসির, কিনা মন্ডল, আসমা, ছন্দা, হায়াতন বিবি, ইদ্রিস মুন্সীসহ রাজাকার মইন। উপন্যাসের মূখ্য চরিত্র দরদী শান্ত, ভদ্র নারী। শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর, ননদ বিহীন সংসারে তার একমাত্র আপনজন, স্বামী নাসির। যুদ্ধ শুরু আগে যার দিন কাটত স্বামীর অপেক্ষায়, আর একটু গল্প করার আশায় কাঙালের মতো যে খুঁজে ফিরত মানুষ। সেই অপেক্ষার মাঝে দরদী বাঁশঝাড়ের আড়ালে থাকা কবরস্থানটির দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দিত দিন। নতুন কবর খোঁড়া হলে দরদী দোয়া করত নতুন কবরবাসীর জন্য। একটা সময়ে, যুদ্ধ শেষে সই আঞ্জুয়ারার কাছে রাইফেল চালনা শিখতে চায় দরদী। সর্বক্ষণ মানুষের মঙ্গল কামনাকারী এই মানুষটা সই আঞ্জুয়ারার কাছে অস্ত্র চালনা শিখতে চায়। যেহেতু দরদী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তাই সেই অক্ষমতাকে ওর অপরাধ বলে মনে হয় তাই ও বলে, ‘সই তোর আইফেলটা কী কইছিস, মোক একনা শিখাবু, যুদ্ধ তো করিবা পারনু নাই তর মতোন, একনা শিখিনু হয়।’
কিন্তু দরদী বোঝে না হায়নাগুলোর অত্যাচার সহ্য করে ও নিজে কত বড় যুদ্ধেই না অংশগ্রহণ করেছে। যুদ্ধের পরে দরদীকে আবার সহ্য করতে হয় নানা অপমান ও গঞ্জনা। নওফেল শেখের ছেলের মুখে শুনতে হয় ‘ঐ তুই নাসিরের বউ নাহে? তুই পাকিস্তানিঘরক ক্যাম্পত আছুলু না'। পিছনে শুনতে হয় মাগি... গনিমতের মাল এর মতো বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দ।
দরদী জানে ওর শরীরের আবৃত অনাবৃত অংশে দাগ আছে, কিন্তু দরদী ক্যাম্প থেকে ফিরে বোঝে লোকজন ওর শরীরের দাগ দেখে না, তারা জননাঙ্গনের শুদ্ধতা খোঁজে । ‘এই শুদ্ধতা অনেক বীরাঙ্গনার বাবা মায়ের মতো ওর বাবা কিসমতও খোঁজে।’ এই বাক্যটা দিয়ে লেখক বুঝিয়েছেন সমাজের কাছে নারীর শুদ্ধতার মাপকাঠি। এই শুদ্ধতার কারণেই কনিকা, হেলেনের মতো দরদীর আপনজন কেউই যুদ্ধ শেষে ওদের খুঁজতে আসে না। তাইতো ওরা ঘরে ফিরতে পারে না। পরিবার ওদের ত্যাগ করে এই শুদ্ধতার বাটখারায় মেপে। যে নারী দেশের জন্য এতো বড় ত্যাগ করেছিল, তাকে ত্যাগ করে তাদের আপনজন, সন্তানের কাছেও তাদের শুনতে হয় অশ্রাব্য ভাষা। এর থেকে অসম্মানের আর কী আছে! এই উপন্যাসের দরদী চরিত্রটি এভাবে নানাবিধ নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়ে ঘাত প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়।
এই উপন্যাসের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র আছে, আঞ্জুয়ারা। ও দরদীর সই। আঞ্জুয়ারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। একটা সময় দরদীর সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে আঞ্জুয়ারা। সবকিছু হারানো দরদী যখন আঞ্জুয়ারার কাছে রাইফেল চালানো শিখতে চায়, তখন আঞ্জুয়ারাই দরদীকে বলে, ‘অস্ত্র তো জমা করি দিইছো। আর কে কহিলি তুই যুদ্ধ কইছ নাই? তুই যুদ্ধ না করিলে কে যুদ্ধ কইছে? দীঘলটারির মতি থাকি শুরু কইরা - টাট্টু, ফুল, নাছিমন চাচী, মন্ডল মামু, নাসির দাদা, আসমা বু, ছন্দা, মাস্টারনি, তুই সবাই যুদ্ধ করছো। কারও কারও যুদ্ধ শেষ হইছে। কারওটা হয় নাই।'
যুদ্ধ শেষে আঞ্জুয়ারার শুরু হয় বেঁচে থাকার যুদ্ধ। কেননা সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুসারে পুর্নবাসনের কথা থাকলেও সেসব সুবিধা না পাওয়ার কারণে দরদী আঞ্জুয়ারাসহ বেঁচে ফেরা মানুষগুলোর জীবনে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়।
'মোক এক কৌউটা চাউল দিবেন'-মুক্তিযোদ্ধা হবার কারণে কাউকে এই কথা বলতে আঞ্জুয়ারার বাধে। আঞ্জুয়ারা পরক্ষণে ভাবে ওর যুদ্ধ যাবার পেছনে কোনো রাজনীতি, দল, সুবিধা, আশা কিছুই ছিল না, তাহলে ও কেন গিয়েছিল যুদ্ধে? ভাবনার দৌরাত্ম্য ওর শরীর, মন আন্দোলিত করে। এখানে লেখক আঞ্জুয়ারাকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছেন যুদ্ধ পরবর্তী মুক্তিযোদ্ধাদের নিজেস্ব ভাবনা, সেই সাথে দারিদ্র্যতা ও ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবে।
আমার দৃষ্টিতে উপন্যাসটির আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ফুলবাবু। আরো কিছু পার্শ্ব চরিত্র খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুদ্ধটা ছিল সবার, এই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রই গুরুত্ব বহন করে, যেমনটা দিঘলটলির প্রথম শহীদ মতি। হাফ প্যান্ট পরা শিশু মতি যখন কাঞ্চন নদীর তীরে মনের আনন্দে ঘুড়ি উড়াচ্ছিল তখন দীঘলটারিতে পাকিস্তানি সৈনিকেরা ছয়টি জিপ নিয়ে প্রবেশ করে, শিশু মতি পাকিস্তানিদের ডাকে সাড়া না দেওয়ায় অনেকটা উন্নাসিক হয়ে তারা বালক মতির দিকে বন্দুক তাক করে, বের হয়ে আসে গুলি। অনেক দরগায় মানত করে পাওয়া সন্তানকে হারিয়ে মতির মায়ের আহাজারি পাঠক মনে বিষাদের আঁচড় টেনে দেয়। মতির মৃত্যু গ্রামের সব মানুষের ভেতরে আতংক ও বিষাদের বাতাস ছড়িয়ে দেয়। সময়ের বিবেচনায় তখন মতিকেও গুরুত্বপূর্ণ একটা চরিত্র বলে মনে হয়।
উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্রের ভেতরে নাসির একেবারে সাদামাটা একটি চরিত্র। যে দরদীর স্বামী। যুদ্ধ শুরুর আগে মানুষের ভেতরে সৃষ্টি হওয়া আতংকের সার্বিক চিত্র লেখক নাসিরের মাধ্যমে পাঠকদের দেখাতে সক্ষম হয়েছেন।
নাসিরের সারাদিন কাটে ছোট চায়ের দোকানে চা বানিয়ে, ও সেখানে আসা লোকজনের সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ আলোচনা করে। নাসির মনে প্রাণে চায় দেশের স্বাধীনতা। ওদিকে নাসিরের রাজকার বন্ধু মইনের কারণে ও সাহস করে বলতে পারে না, আমি পাকিস্তানি সৈনিকদের সাহায্য করবো না, যুদ্ধে যেতে ইচ্ছে করলেও বলতে পারে না সাহস করে। স্ত্রীকে ভালোবাসে নাসির তাই তো দরদীকে ফেলে কিভাবে যুদ্ধে যাবে সেই ভাবনা নাসিরকে উৎকণ্ঠিত করে তোলে। একে একে অনেকেই দিঘলটারি ছেড়ে যায় । বর্ডারের ওপারে যাবার আগে লালবাবুর ভিটে-মাটি ছেড়ে যাওয়া সময় নাসিরের কাছে বিদায় নেওয়ার দৃশ্যটা খুবই মর্মস্পশী।
ফুলবাবু, নওফেল শেখের বাড়িতে বছরওয়ারি চুক্তিতে কাজ করে, যার ধ্যান এক থালা গরম ভাত আর পালা গান শোনা, বিড়িতে দুটো টান দেওয়া। ভাই লালের সাথে ফুলের নিত্য ঝগড়া বিবাদ লেগে আছে কিন্তু পোয়াতি স্ত্রী হায়াতনকে নিয়ে ফুলের ভাবনার শেষ নেই। একটা সময় সেই ফুলবাবু যুদ্ধের নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হয়ে শুধু গোর খোঁড়ে। পোয়াতি হায়াতন বিবিকে পাকিস্তানি সেনারা যখন হত্যা করে তখন হায়াতনের পেট চিরে বের হয়ে আসে অপরিণত শিশুর আঙুল। সেই জাহেলি অত্যাচার ফুলবাবুকে নাড়িয়ে দেয়, অস্থির করে তোলে। ফুলবাবুর মনে তখন একটাই ভাবনা ঘোরে- লাশগুলোকে মাটি দিতে হবে। এরপর থেকে কোদাল কাঁধে ফুলবাবু ঘুরে বেড়ায়। কারও হাঁক দেওয়া প্রশ্ন 'ফুলবাবু কুন্ঠে যাইস রে তুই'-এর সে উত্তর দেয় 'গোর খুড়িবা যাছু রে।' এদিকে শতশত লাশ গোর দেওয়ার পরেও ফুলবাবু হিসাবনিকাশ কষে কতগুলো গোর দেওয়া হলো? তিরিশ লাখ এক...যুদ্ধের ভয়াবহতার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হলো কালো মিসমিসে এই ফুলবাবু। বোঝা যায়, লেখক ফুলবাবু চরিত্রটি তৈরি করেছেন অনেক যত্ন নিয়ে।
বিভিন্ন গল্প উপন্যাস আমরা দেখেছি দাড়ি টুপি রাজাকারের পোষাকি উপমা, সেখান থেকে বের হয়ে এই উপন্যাসে আমরা পাই দাড়ি-টুপি ছাড়া শিক্ষিত রাজাকার মইনকে। বলা যায়, গ্রামীন পটভূমিতে মসজিদের তরুণ মুয়াজ্জিন মানেই রাজাকারদের দোসর, সেখান থেকে সফলভাবে বের হয়ে এসেছেন লেখক সাদিয়া সুলতানা।
উপন্যাসের মুনশী চরিত্রটি খুবই নিরীহ স্বভাবের। রাজাকার মইন ও তার মামা বদরুল পাকিস্তানি দোসর হয়ে দিঘলটারিতে হত্যাযজ্ঞ চালায়। দাড়িগোফহীন একজন শিক্ষিত তরুণ মইন, রশিদ মাস্টার, নওফেল শেখ সবার বাড়িতেই হামলা চালায় মইন। মইন শুধু একটা ভালো কাজ করে, বন্ধু নাসিরের লাশটি কবরস্থ করতে নদীর পাড় থেকে তুলে আনে। আবার প্রতিশোধ নিতে সে দরদীকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়।
এই উপন্যাসের মূল চরিত্র দরদী হলেও এভাবে পার্শ্ব চরিত্রগুলো তাৎপর্যময় হয়ে ওঠে। কখনো কখনো মনে হয়েছে চরিত্রগুলোর প্রত্যেকটি-ই মুখ্য। প্রধান চরিত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাগিদে বাকি চরিত্রগুলো বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
উপন্যাসে আরো একটি মজার চরিত্র আছে, নাম নসিমন মাই। সে গ্রামের অবস্থাপন্ন ঘরগুলোতে কাজ করে, বিনিময়ে পেটে ভাত বা শুকনো চাল পায়, সেই সুবাদে সবার ঘরের খবর এখানে ওখানে নিজের আগ্রহে বলে বেড়ায় নসিমন মাই। নসিমন মাইয়ের আরো একটা বদ অভ্যাস আছে, সুযোগ পেলেই সে দুটো পিঁয়াজ, একটি আলু, এক শিশি তেল শাড়ির আঁচলে লুকিয়ে নিয়ে আসে। গ্রামে যুদ্ধ লাগার পরে মইন যখন দীনেশ চন্দ্রের বাড়ির দলিল নিয়ে বাড়ি দখল করে তখন নসিমন মাই তাড়াতাড়ি ‘গোয়ামারানি মইন’র কাছ থেকে নিজের জমানো তিন টাকা লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। নওফেল শেখের বাড়ি এসে যখন নওফেল শেখের সামনে তার স্ত্রী লতিফা বিবিকে পাকিস্তানি সৈনিক ধর্ষণ করে তখন নাসিমন মাই নিজের শেষ চেষ্টা হিসেবে বাটা মরিচ মাখানো হাত সৈনিকের মুখে চোখে ঘষে দেয়।
এতো চরিত্রের মাঝে আব্বাস চরিত্রটিও মনে দাগ কাটে। আব্বাস কুড়ানি বিবির সন্তান। সে একজন মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধের শিবিরে জাহেদার কথা মনে পড়ে আব্বাসের তখন সে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে, কেন এসেছে এই যুদ্ধে । দিঘলটারির ব্রিজ ভাঙার আগে ওর কল্পনায় ভেসে ওঠে এই ব্রিজ তৈরির সময়কার স্মৃতি। স্মৃতিকাতর আব্বাস ভাবনার মাঝে উত্তর খুঁজে পায় হয়তো –‘অনেকের মধ্যে একা বেঁচে থাকাটা অস্বস্তিকর, অন্যদের মৃত্যুতে ভুমিকা না থাকলেও যখন তখন পাঁজরের হাড় টন টন করে সুঁচালো কিছুর খোঁচা লাগে হৃদপিণ্ডের ভেতরে, সেটা থেকে বেঁচে থাকার জন্যই হয়তো এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ।’
উপন্যাসটির ব্যতিক্রমী একটি চরিত্র জোবাইদা নামক একজন বিহারী নারী। যিনি সাতচল্লিশের সাক্ষী। হিন্দু-মুসলমান রায়টে কলকাতায় স্বামীর মৃত্যু হলে, তিনটি শিশু নিয়ে সে থিতু হয় দিঘলটারিতে। কিন্তু ছেলে ইয়াসির যুদ্ধে বাঙালিদের বিরুদ্ধে কাজ করায় তিনি মনে মনে অশান্তিতে থাকেন। আশপাশের বাঙালিদের মৃত্যু তার সহ্য হয় না। জোবাইদা ছেলেকে বোঝাতে চান, কিন্তু পারেন না। ইয়াসিরের ভেতরের বাঙালিদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ থাকে। সেই কারণে ছেলেকে দমাতে পারেন না জোবাইদা। জোবাইদার বড় মেয়ে বাঙালিদের হাতে নিহত হয়। তিনি জীবনে শান্তি চান কেননা আজ এখানে কাল ওখানে করতে করতে তিনি ক্লান্ত। ফলে তার পুত্রের রাজাকার হয়ে ওঠা তিনি কোনোভাবেই মানতে পারেন না। তাইতো পুত্রকে ‘গাদ্দার’, ‘বেঈমান’ বলতেও তার সামান্য দ্বিধা হয় না। আমার কাছে উপন্যাসের জোবাইদা চরিত্রটি কেন যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে।
জোবাইদার ছেলে ইয়াসির রাজাকার, পাকিস্তানিদের দোসর। ইয়াসির সবসময় চায় পাকিস্তান মুলক থাকুক। কিন্তু মৃত্যুর আগে ইদ্রিস মুনশীর মুখ থেকে বের হয়ে আসা ‘বিহীরির বাচ্চা ’ শব্দটা একটা নাড়া দেয় ইয়াসিরকে। এই উপন্যাস আরো একটি রাজাকার চরিত্র আছে, নাম বদরুল, মইনের মামা। যুদ্ধে পরেও যে দিঘলটারিতে থেকে যায়।
শুধু যুদ্ধ বা যুদ্ধের নারকীয়তা না, ৭১ সালে আমাদের হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার দৃশ্যও দারুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক। মইনের ভয় ও ভীতির কারণে দীনেশ চন্দ্র দেশ ত্যাগ করে। পথে চার কন্যাকে হারায় সে। আতংকিত দীনেশ চন্দ্রের জন্য পাঠকের বুকের ভেতরে হাহাকার উঠবে। আসলে একটা মানুষ কতটা অসহায় হয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যায়, সেটা শুধু যে যায় সেই হয়তো বোঝে। তাই হয়তো কবি মহাদেব সাহা বলেছিলেন,'তোমার বুকের মধ্যে আমাকে লুকিয়ে রাখো আমি এই মাটি ছেড়ে, মাটির সান্নিধ্য ছেড়ে, আকাশের আত্মীয়তা ছেড়ে, চাই না কোথাও যেতে, কোথাও যেতে।'
সবশেষে আরো একটি চরিত্রের কথা বলবো, সবুজ। সবুজ দরদীর ছেলে যে পাকিস্তানিদের রেখে যাওয়া চিহ্ন। সবুজ দরদীর গর্ভে বেড়ে ওঠে। দরদী তার এই সন্তানকে আগলে রাখে, খেয়ে না খেয়ে সব অপবাদ সহ্য করে। সেই সবুজ চারপাশের বৈরী পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে একটা সময়ে মাকে বলে ওঠে 'খাংকি' মাগী যা দরদীকে নাড়িয়ে দেয়। ছেলের কথা শুনে মেঘের মতো গর্জে ওঠে দরদী, ‘মোর পেটত দশ মাস দশ দিন থাকিয়া মোক তুই জারুয়ানি কহিস! তোক মোর কাছতেই থাকিবা হবি। কুনোঠে যাইবার পারিবি না তুই।’
৭১ উপন্যাসে এমন আরো অনেক চরিত্র এসেছে নানা অঘটন ঘটনের মাঝে । যেমন কিনা মন্ডল, নারায়ন, টাট্টু মিলন, আসমা, ছন্দা, চেয়ারম্যান নজর উদ্দিন, তার পুত্র বাহার, তাইজল, রশিদ মাস্টার সহ আরো অনেকে। উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র বাস্তবতার কাঠিন্যে জড়ানো। তাই ৭১ উপন্যাসটিকে বলা যায় মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তীকালের দলিল।
সাদিয়া সুলতানার ভাষার গাঁথুনি, বাক্যের ব্যবহার, নতুন শব্দচয়ন ইত্যাদির পাশাপাশি দিনাজপুর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ৭১ উপন্যাসটিকে মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য উপন্যাস থেকে আলাদা করে ভিন্ন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সেই সাথে দারুণ সব উর্দু সংলাপের অনবদ্য ব্যবহার উপন্যাসটিকে সমৃদ্ধ করেছে। পুরো বইটি পাঠের পরে বোঝা যায়, লেখক যথেষ্ট পড়াশোনা করেই এই লেখাটি শুরু করেছিলেন। উপন্যাসের কিছু চরিত্রকে পাঠকের একান্ত আপন মনে হবে।
পরিশেষে বলা যায় সাদিয়া সুলতানা ৭১ উপন্যাসটি সারাজীবন সংগ্রহ করে রাখার মতো একটি বই।
লেখক পরিচিতি:
ইসরাত জাহান, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক, ঢাকায় থাকেন।


4 মন্তব্যসমূহ
গল্পপাঠকে ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুনসমৃদ্ধ
উত্তরমুছুনধন্যবাদ
উত্তরমুছুনঅসাধারণ
উত্তরমুছুন