মৃত্তিকা মাইতির গল্প : কালীর বদা


গ্রামের শেষ সীমায়, পাড়া-ছাড়া এই একটিই বাড়ি। মাটি ভিড়ানো উঁচু পতার ওপর এক কুঠিওয়ালা একটা মাটির ঘর, খড়ের চালা। খড় বোধহয় বছর দুয়েক বদলানো হয়নি। পাঁউশা রং ধরেছে। সামনে ছোট্ট দাওয়া, বাঁশের ফেরাটি দিয়ে ঘেরা। সেই ফেরাটি দিয়েই দরজা। ভেঙেচুরে গেছে। খোলাই পড়ে থাকে।

“ঘরে কউ আছ গা…? ও… কালী ঠাকমা।”

মানুষের গলা পেয়ে ঘরের কাঁদলধার থেকে সাড়া এল, “যাই…”

কিছুক্ষণ পরে কালী এসে দাঁড়াল উঠোনে। মাথায় কাঁচা-পাকা চুল মেশানো, পরনে ছাপা শাড়ি, ময়লা, তার কোথাও কোথাও ছিঁড়েও গেছে। হাতে কয়েকটা মূলো আর ওলকপি। গ্রাম সম্পর্কের এক নাতবউ, গুরি ডাকছিল কালীকে। তাকে দেখে সে বলল, “ও… পুতরাবউ তুই!”

“ঠাকমা, আমার ছাগলটা মনে হয় গোঠাইছে। ক’দিন ধরে শুধু ভ্যা ভ্যা করছে, তাই লিয়ে এলাম তুমার কাছে পিঠ দেখাইতে।” তারপর কালীর চোখ থেকে দৃষ্টি নামিয়ে হাতের কপি আর মূলোর দিকে ইশারা করে বলে, “তুমার বাগানের আনাজ, ঠাকমা?”

“হা রে, শেষ ক’টা আছে আর। চৈতের শুরুতেই গরম যা পড়ছে, জলবিহীন কাবাসিয়া মেরে যাচ্ছে সব। কাটলে ভিতরে সাদা, সিদ্ধ হতে চায়নি। কষ্ট করিয়া লাগানো— ভাজা-টাজা করে খাচ্ছি। খাবি তো লিয়া যা না।”

শিকড় থেকে উপড়ানো কপি আর মুলোগুলোর পাতা সমেত নিয়ে এসেছিল কালী। ঝুরো মাটি লেগে রয়েছে। সেগুলোকে দাওয়ায় ছুড়ে দিয়ে বলল, “দেখি চল তো তোর ছাগলটাকে।”

উঠোন পেরিয়েই একটা বিশাল তেঁতুল গাছ। তার মোটা মোটা শিকড়গুলো মাটির ওপরেও কিছু রয়েছে। সেই শিকড়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা হোমড়াচোমড়া একটা বদা। প্রায় একটা মদ্দলোকের কোমরের সমান খাড়াই। কালীর মতোই কুচকুচে কালো রং, এক-দেড় চাখর হবে দাড়ি। শিং দেখলে বোঝাই যায় তার বয়েসের গাছপাথর নেই।

যারা ছাগল পোষে তাদের ঘরে পাঁঠা জন্মালে সে ছোট থাকতে থাকতেই গোরু-ছাগলের ডাক্তার আনে। ডাক্তার তার লোহার সাঁড়াশি দিয়ে পাঁঠার জায়গামতো চিপে দেয়। গ্রামের লোকে বলে, জাঁতিয়ে খাসি করে দিয়েছে। না জাঁতিয়ে রেখে দিলে সে বদা। তাকে দিয়ে পাল দেখানো যায়।

কালী পাঁঠাই কিনেছিল পুষবে বলে। তাকে আর জাঁতায়নি। বদা তৈরি করেছে। এখন শুধু কালীর নিজের গ্রাম কৈলাসপুরই নয়, আশপাশের গ্রাম থেকেও কালীর বদার কাছে লোক পাঁঠি নিয়ে আসে পাল দেখাতে। কালীকে এখন তার বদা দিয়েই পাঁচ-সাত গ্রামের লোকে চেনে।

তেঁতুল গাছের কাছে গিয়ে কালী দেখল, গুরির বর যদুপতি পাঁঠির দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে কালীর বদা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। তেড়েফুঁড়ে ছুটে যেতে চাইছে। গলার দড়িতে টান পড়লে দড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা করছে। খুলে দিলেই পাঁঠির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।

গুরির বছর সাতেকের মেয়েটা কিছু শুকনো তেঁতুল কুড়িয়ে কুড়িয়ে জামার ওঁটায় রাখছিল। যদুপতি হাঁকডাক করে মেয়েকে শাসন করছে, “এদের জিনিস খেতে নেই, ফেলি দে সব।”

কালী জানে তার নিজের গ্রামের কেউ তাকে পছন্দ করে না, তাই কোনও বাচ্চাকেও তার সীমার ধারেকাছেও আসতে দেয় না। তবু কালী পায়ে পায়ে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায়। কয়েকটা তেঁতুল কুড়িয়ে হাতে দিয়ে, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। “আইজ তোর ইস্কুল নেই ফুলরানি?”

যদুপতি বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারে না।

“আইজ তো রোববার। ইস্কুল ছুটি।” বলেই ফুলরানি নাক কুঁচকে বলে, “তুমার বদার গায়ে খুব গন্ধ, ওকে গা ধুওয়াও না ঠাকমা?”

“গা তো ধুওয়াই রে মা কিন্তু ওদের গায়ে এমনই গন্ধ হয় যে।”

ফুলরানি আবার তেঁতুল কুড়োনোয় মন দেয়।

এবার গুরি একটু ঠাট্টা করে বুড়ির সঙ্গে, “তুমার বদাকে কী খাওয়াও কও ত ঠাকমা? সবসময় তেজে রয়। মনে হয় এই বুঝি ম্যায়া মানুষের দিকেও তেড়ে আসবে!” বলেই খিলখিল করে হেসে ওঠে গুরি।

যদুপতি বউকে ধ্যাতানি দেয়, “যেঠি যাবে, বাচাল ম্যায়া মানুষের মতো দাঁত ক্যালাইবে।” মুখ ভেঙিয়ে বলে, “একটুক্ষণের জন্য থাম না।” কালীর চৌকাঠে আসতে হয়েছে বলে রাগে যদুপতির গা কষকষ করছে।

কালী সেটা বুঝতে পেরে রসিয়ে রসিয়ে গুরির সঙ্গে কথা জোড়ে, “এমনি এমনি কি আর তেজ দেখায় র‍্যা? সেইরকম রাখতে হয়েছে। ও যা টাকা আয় করে ওর পিছানেই তা ব্যয় করি। বাদাম, ছোলা খাওয়াইতে হয়, ঘাস তো আছেই, খড় কুচিয়ে খাওয়াই। আর তেজের রহস্য শুনবি? পুতরাবউ হোস, কী আর কইবা, একটা গোপন কথা বলি শোন, ওকে আমি মাঝু-সাজু তেঁতুল খাওয়াই। খেলে বেশি বেশি বাই চাপে। তবে ব্যাটাছেলে তো, সবসময় বাই চেপেই থাকে।”

গুরিও হাসে গুরগুর করে। “এইটা তুমি ঠিক কইছ ঠাকমা।”

হাসতে হাসতে বদার দড়ি খুলে দেয় কালী। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই বদাটা ছুটে গিয়ে সামনের দু’পা পাঁঠির ওপর তুলে পিঠে লাউ হয়ে যায়। যদুপতি আগেই তার ছাগলটাকে অন্য একটা শিকড়ে বেঁধে দিয়েছিল।

গুরি যেন এতক্ষণে একটু নিশ্চিন্ত হয়েছে। সে কালীকে চোখের ইশারায় বরের থেকে ক’হাত তফাতে টেনে নিয়ে যায়। কালী অবাক না হয়ে পারে না। এমনকি গোপন ব্যাপার যে গুরি বরের সামনে বলতে পারছে না?

“দ্যাখো ঠাকমা, আমি কইটি বলিয়া যেন কাউকে কইবনি! তাহালে আমার বর আমাকে আস্ত রাখবেনি। গ্রামের মাথারা কওয়া-কয়ি করছে, তুমাকে এঠিনু উচ্ছেদ করিয়া তুমার সব সম্পত্তি লিয়ে নেবার তাল কষছে তারা।”

গুরির কথা শুনে কালীর কালো মুখ যেন আরও কালো হয়ে গেল। কথাই বেরোছিল না। এমন সময় কালীর বদাটা ডেকে উঠল— ভ্যাহ...ভ্যাহ...। দু’জনেই ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বদাটা পাঁঠির ওপর থেকে নেমে গেছে।

কালীকে তো এমন কতবারই দেখতে হয়। কাজ হয়ে গেলে মদ্দগুলো এমনই নেমে যায়।

গুরি চট করে আঁচলে বাঁধা দেড়শোটি টাকা খুলে কালীর হাতে গুঁজে দেয়। “আইসি ঠাকমা।” বলে বর, মেয়ে আর তার ছাগল নিয়ে চলে যায়। এখন খরচা হল বটে, তবে ছাগল বাচ্চা বিয়োতে শুরু করলে খরচ উঠে যাবে।



চৈত্রের চড়া রোদ মাথা ঝাঁঝিয়ে দিচ্ছে। ঘামে চোখের পাতা আঠা আঠা হয়ে গেছে। কপালে, নাকের নীচের ঘাম গড়িয়ে নামছে গলা বেয়ে। সাড়ে বারোটার আজান পড়ে গেছে সেই কখন, ওইটাই তার ঘড়ি, কালীর আজ রাঁধা-খাওয়া হয়নি। সে তার শুকনো বাগানটায়, আনাজপাতির পাতার ফাঁকে ফাঁকে পা চালিয়ে ঘুরছিল আর নিজের মনেই বিড়বিড়াচ্ছিল। মহাদেব খাটুয়া মরে যেতে সেই সুযোগটাই নিচ্ছে গ্রামের লোক। এতদিন কারও সাহস হয়নি এই পতার ভিটেমাটির দিকে তাকাতে।

একটা টমেটো গাছের গোড়ায় বসে পড়ে আগাছাগুলো আঁচড়ে আঁচড়ে গাছটাকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছিল কালী। সম্পত্তি বলতে, বাড়ি, পুকুর আর বাগানটা মিলিয়ে কাঠা সাতেক জমি। এর লোভ কোনওকালেই ছিল না কালীর। তা যদি হত, মানুষটা বেঁচে থাকতে যখন বলেছিল তার নামে লিখে দেবে, তখনই করিয়ে নিতে পারত কালী। উল্টে সে-ই বারণ করেছিল, “না, তুমার বউ, ছেলেমেয়ে আছে, তাদেরই থাক। আমার শুধু তুমার ছায়ার নীচে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া নিয়ে কথা।”

মহাদেব বলেছিল, “তুমি বুজছ না কালী। আমি যখন থাকব না তুমার একটু শক্ত মাটি দরকার।”

মানুষটার কথাগুলো মনে পড়তেই বুকটা হু-হু করে উঠল কালীর। সব কিছুতেই তো মানুষটার মায়া জড়িয়ে আছে। কম করে দু’কুড়ি বয়েস তারা একসঙ্গে কাটিয়েছে।

আজ হঠাৎ করে কম বয়সের কথা ভেবে ভেবে হাসে কালী। তখন তারই সবচেয়ে বেশি বয়স, চব্বিশ-পঁচিশ হয়ে গেছিল, বিয়ে হয়নি। বন্ধুদের বিয়ে দেখে মনে মনে ভাবত, তারও বিয়ে হবে, সংসার হবে, বরের সঙ্গে গুছিয়ে ঘরকন্না করবে। কিন্তু কম বয়সে বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়েছে, তার বিয়ে দেবে কে? একটা ভাই ছিল। বাউণ্ডুলে। সে কবেই ঘর ছেড়েছিল, তারপর তার আর খোঁজ নেই। বেঁচে আছে না মরে গেছে তা কালী জানে না আজও। তখন সে একা মেয়ে। দিনেদুপুরে নানা চোখের ছোঁকছোঁকানি। রাত হলেই দরজায় মোদো-মাতালদের ঠোকাঠুকি। জ্ঞাতি, পাড়াপ্রতিবেশী কেউই এগিয়ে এসে ভরসা জোগায়নি। তখন ওই একটি মানুষকেই অবাক হয়ে দেখেছিল কালী। ঘর ভেঙে গেলে ছেয়ে দেওয়া, চালটা, আনাজটা এনে দেওয়া, অসুখবিসুখ করলে পাশে থাকা, সবই করত। পাড়ার ঠাকুমা, কাকি, বউদিরা সাবধান করতে লাগল, “ও ব্যাটাছেলের ঘরে বউ-বাচ্চা আছে, তোকে কোনওদিন বিয়ে করবেনি। তাছাড়া তোর থেকে কত বড়। কত দিন আগলাবে তোকে? ওকে অত আসা-যাওয়া করতে দিস না।”

কালী বারণ করতে পারেনি। দিন দিন লোকের কাদা ছোড়াছুড়ি বাড়তেই লাগল। তখন মহাদেব একদিন তার হাত ধরে গ্রামের এই শেষ প্রান্তে, নিরিবিলিতে নিয়ে এসে তুলেছিল। তখন এখানে কিছুই ছিল না। কালী আসার আগে ঘর ওঠে, তারপর পুকুর খোঁড়া হয়। চারপাশে দু’জনে মিলে কত রকমের গাছ লাগায়। বট, অশ্বত্থ, শিরীষ, আম, তেঁতুল। আর লাগিয়েছিল ফণীমনসা। যেন কাঁটাঝোপের বেড়া দিয়ে সবাইকে ঠেকিয়ে রাখবে। লোকের গালাগাল তখন আরও বেড়ে গেল। বেশ কয়েক বার মহাদেবের দুই ছেলেও এসেছে— কার্তিক আর বিনায়ক। কালীকে তাদেরও অনেক হম্বিতম্বি সহ্য করতে হয়েছে।

গোড়ার দিকে মহাদেব মাসে এক-দু’দিন করে আসত। সারাদিন থেকে রাতে চলে যেত বাড়ি। পরে সেটা বেড়ে সপ্তাহে দাঁড়ায়। তবে ওই, রাতে সে থাকত না। দিনের বেলাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ত কালীর ওপর। যেন কোনও তেজী বদা। মহাদেবের আসা নিয়ে অশান্তি তো কম হয়নি। একা একাই কাঁদার জন্য রাতগুলো পেয়ে যেত কালী। কিছু বলার ছিল না তো তার। মা কালীর শিব আছে। কিন্তু মহাদেব তো কালীর নিজের পুরুষ নয়।

শেষ বয়সে মহাদেবের ছেলেরা আর দেখত না তাকে। বুকের অসুখ নিয়ে কালীর কাছেই এসে থাকতে হয়েছিল। কালীর বাপ-কালকা জমি ছিল কাঠা তিনেক। তার ওপরের ভিটে কবেই মাটিতে ধুলো হয়ে গেছে। ভাই যদি কোনওদিন ফিরে আসে, তাই কালী ওদিকে তাকায়নি। সেই জমি বিকিয়েই মহাদেবের অসুখে যা পেরেছে করেছে সেই সময়ে। তখন থেকেই কালী বদা পোষা শুরু করে সংসার খরচের জন্য।

সেই নিয়েও শুনতে হয়েছে, “তোকে একজন ব্যাটাছেলে পুষেটে, তুই আবার একটা মদ্দ ছাগল পুষবি!” সেই সকল ঠাকুমা-কাকিদের কেউ কেউ মারা গেছে, অনেকে বয়েস হয়ে ঘরবন্দি। তাদের ছেলেরা বড় হয়ে এখন গ্রামের মাতব্বর। গ্রামে ডান্স হাঙ্গামা হলে বাইরে থেকে মেয়েরা নাচতে আসে। মাতব্বরদের মাথা নড়লে তবে নাচ-গান হয়। তারাই এখন তাকে উচ্ছেদ করতে চাইছে?

মহাদেব যখন আর নড়াচড়া করতে পারে না, একদিকটা পড়ে গেছিল, তখন হঠাৎ একদিন তার দুই ছেলে এসে নিয়ে চলে গেছিল তাকে। কালী শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে। মহেদেবের মরে যাওয়ার খবর পেয়েও ও বাড়িতে যেতে পারেনি কালী। শ্মশানে, দূরে, কেঁয়া জঙ্গলের পাশে, অন্ধকারের কালোয় মিশে দাঁড়িয়ে ছিল। পুড়ে যেতে দেখেছিল এক পুরুষমানুষকে, যাকে সে চেনে।

দিনটা কখন যে ঢলে গেছে পশ্চিম দিকে, টেরই পায়নি কালী। বেলা আর বেশি নেই। রোদে থেকে থেকে মাথা ভার হয়ে গেছে। প্রায় টলতে টলতেই কালী ঘরে গিয়ে ঢোকে।



সকাল সকাল কালী আজ পুকুরে নেমেছিল গুঁড়িজালটা নিয়ে। জল কমে গেছে। জাল গলিয়ে, হাতে হালিয়ে যদি কিছু চুনাঁচাদা মাছ ধরা যায় তো।

এই সময় লালু এল হনহনিয়ে বিড়ি টানতে টানতে। গ্রামেরই ছেলে। পার্টিতে ঘোরাঘুরি করে। পরনে লুঙ্গি, কাঁধে একটা গামছা ফেলা। এখন তো ঘরে-বাইরে কেউ হাওয়াই চটি ছাড়া বেরোয় না। বিড়িটায় লম্বা টান মেরে পঁদাটা জলে ছুড়ে দিয়ে বলল, “কালীঠাকমা, আইজ সন্ধেবেলা তুমাকে গ্রামের শীতলা মায়ের মন্দিরে হাজির রইতে হবে। গ্রামের লোকের তুমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। তারা একটা ফায়সালা চায়।”

কথাটা বলে অপেক্ষা করছিল লালু। ঠাকুমা বোধহয় গালিগালাজ দেবে, শাপ-সম্পাত করে পাড়া মাথায় করবে। কিন্তু সেসব কিছুই হচ্ছে না। ঠাকুমা ছাতিজলে দাঁড়িয়ে, মুখে জল ভরা, গাল ফুলিয়ে মিটিমিটি হাসছে যেন! কথাটা বোঝেনি না কি? না কি বুঝেও ঠাট্টা করছে? লালু মনে মনে বিরক্ত হয়। “যাই গো... আর কয়েকজনকে জানাতে হবে।”

এবার কালী মুখের জলটাকে বাচ্চা মেয়ের মতো পুচ করে ফেলে দিয়ে জানতে চায়, “আইজ গোটা গ্রামের লোক বুসবে লালু?”

“না গো, সভাপতি বলেছে বাছা বাছা কয়েকজনকে ডাকতে।”

কালী শুধু বলে, “ও...”

ঘরে সন্ধ্যাবাতি দেখিয়ে কালী যখন মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছয়, মন্দির চাতালে তখন শোরগোল পড়ে গেছে। কারও কারও গলা পাওয়া যাচ্ছে রাস্তা অবধি, “একটা ম্যায়া মানুষের জন্যে অতগুলো মদ্দলোককে অপেক্ষা করতে হবে মশার কামড় খেয়ে! তাও আবার রাঁড় ম্যায়া—”

কেউ বলছে, “অত বিচার-পঞ্চাতের কী আছে তা তো বুঝি না। সবাই একসাথে গিয়ে বললেই হল, তুমি এতদিন অন্যের সম্পত্তি ভোগ করি আইসটঅ, এবার তুমাকে সব ছাড়তে হবে।”

কালী গিয়ে যে অন্ধকারে দাঁড়িয়েছে তা কেউ লক্ষ করেনি। তার দিকে চোখ পড়তেই সকলে যেন একটু থতমত হল। কিন্তু এক চাটাইয়ে বসতে বলল না কেউ।

মন্দিরের দরজা খোলা, ভেতরের আলোয় বাইরের সকলের মুখ দেখা যাচ্ছে। কালী দেখল, তার বিচার করতে সত্যিই বাছা বাছা লোকই ডাকা হয়েছে। মহাদেবের বড়ছেলে কার্তিক আছে, ছোটটাও রয়েছে, পার্টির কয়েকজন, পুজোয় বেশি চাঁদা দেয় যারা, আর মন্দির কমিটির ছেলেরা। সকলে মন্দিরের চাতালে বসলেও একটু উঁচুতে দাওয়ায় বসে গ্রাম সভাপতি গদাই জানা।

এতক্ষণে সভাপতি যেন নিজের উদারতার পরিচয় দেওয়ার জন্য বলল, “কালীঠাকুমা, বুসঅ।”

কালী সকলের ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে চাটাই ছেড়ে বসে পড়ল।

কোনও ভনিতা না করে সরাসরি মূল কথা পেড়ে ফেলে গদাই জানা। “আইজ তুমাকে কী জন্যে এখানে ডাকা হয়েছে আন্দাজ করতে পারছ নিশ্চয়ই ঠাকুমা?”

কালী হ্যাঁ না কিছুই বলল না।

“তুমি এতদিন যে সম্পত্তি ভোগ করি আইসটঅ, তা তুমার নয়। যার সম্পত্তি সে মানুষটি জীবিত নেই। তার পরিবর্তে এখন যারা মালিক, তারা চায় জমিটাকে শীতলা মায়ের নামে দান করতে। এখন তাহালে তুমার কর্তব্য কী তুমি জান? দখল ছাড়তে হবে। না কি তোমরা কেউ কিছু কইতে চাও?” সমবেত সকলের দিকে একবার তাকায় গদাই।

“না না, তুমি বিচক্ষণ লোক, তুমার উপরে কে আর কী কইবে! একেই বলে শিক্ষিত, একটা পদ সামলানো লোকের বিচার। ডাঁ-চোখ, বাঁ-চোখ করে না।” গদাই জানাকে কেউ কেউ খুশি করতে চায়। তার সুনজরে না থাকলে কখন কোন বিপদ আসে।

কালীকে ভাববার সময় দিয়ে বাকিরা অন্য আলোচনায় ঢুকে পড়ে। গ্রামে আরও কার কার এইরকম সম্পত্তি আছে যা দেবীর নামে করা যায়।

বাবা মারা যাবার পর বছরখানেক কেটে গেছে। আজ প্রথম কালীকে দেখছে কার্তিক। মা কালী নয়, কালী মা-ও নয়। যেন অনেক বুড়িয়ে গেছে। সেই ডাকাবুকো ভাবটা আর নেই। মায়ের মতো ওরও মাথায় অনেক চুল সাদা। চামড়া ঢিলে, চোখের চাউনি ঘোলাটে হয়ে গেছে। ভাবতে ভাবতেই অন্যদের কথার মাঝে কার্তিক মিনমিনে গলায় বলার চেষ্টা করে, “গদাইদা, জমিটা তো আমি আর আমার ভাই চাইছিলাম যে আমাদের দখলে আইসু, সেখানে মাঝু শীতলা মা কাইনু আইসেটে?”

কথাটা বলে ফেলেই ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে যায় কার্তিক। সে যদি কালীর দিকে তাকাত তাহলে দেখতে পেত, কালী তারই দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।

বসে থাকা কেউ কেউ মারমুখী হয়ে ওঠে। “এ তোর কেমনতর কথা হলা কার্তিক? অতদিন ধরিয়া তোরা তোদের সম্পত্তি দখলে আনতে পারিসনি, কালী বেঁচে থাকতে আর হয়তো কোনওদিন পারতিসও না। সেটা যদি আমরা তদারকি করিয়া মায়ের নামে করি, তোর তো আপত্তি রওয়ার কথাই না। বরং এটা ভাব না যে, মায়ের নামে সম্পত্তি বাড়িয়ে আমরা তোদের কপালে কিছুটা পুণ্যি এনে দিচ্ছি।”

কার্তিক ফাঁপড়ে পরে যায়। ভাই বিনায়কের দিকে তাকায় একবার। তার ঠোঁট নড়ে না। তারা কথাটা পঞ্চায়েতে তুলেছিল ওই সম্পত্তির দখল নেওয়ার জন্য। ঠাকুর-দেবতার নামে দান করতে যাবে কেন? এ তো উন্টো ফ্যাসাদ হয়ে গেল। চারদিকে পার্টির লোক, মন্দির কমিটির লোক, গ্রামের মাথারা সব। সব আগে থেকেই ঠিক করে ফেলেছে তাহলে?

বিনায়ক আচমকা বলে ফেলে, “তা যদি হয় তাহালে যে ভোগ করেটে সেই করুক।”

গদাই জানা গলা ঝেড়ে বলে, “এখন আর বলে লাভ নেই কোনও। যা হছে ভালই তো হছে। ও সম্পত্তি সবার ভোগে লাগবে।”

কালী জানে ভোগ মানে কী। ওই জমির গাছের ফলে এরাই ভাগ বসাবে, পুকুরে মাছ করে পয়সা তুলবে, চাই কি টাকা নিয়ে দু-এক ঘর লোক বসিয়ে দেবে। মহাদেব খাটুয়ার সম্পত্তি আজ খাস জমি না করে এরা মানবে না।

কালী হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। কাউকে কিছু না বলে খরো পায়ে হেঁটে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

“দেখল, ম্যায়া মানুষটার কাণ্ড দেখল একবার! এখনও একটুও দিমাগ কমেনি মাগির!”

কেউ বলল, “বাছা যাবে কাই, কাল ও দেখবে মজা।” বিচারের লোক সব পারলে এই রাতেই গিয়ে কালীকে ভিটেছাড়া করে আসত। তবে কালটুকু রেখে দিয়েছে তারা।

যদিও যার বিরুদ্ধে এত কথা, শোনার জন্য সেই যখন নেই, ধীরে ধীরে সকলে চুপ মেরে গেল।

পরের দিন সকাল সকাল গ্রামের লোকজন যখন কালীর পতায় পৌঁছল, দেখল ভাঙা ফেরাটির দরজাটা খোলাই পড়ে আছে। ভেতরে শুধুই অন্ধকার। কেউ কোত্থাও নেই! খড়ের চালে সাতভায়া পাখির দল ঝগড়া করছে। তাদের লাফঝাঁপে মজরে যাওয়া খড়গুলো ঝুরো ঝুরো হয়ে পড়ছে উঠোনে। পুকুরের জল আরও কমে গেছে। আনাজপাতি শুকিয়ে খাক। তেঁতুল গাছটার গোড়ার শিকড়ে বদা বাঁধার দড়িটা আলগা হয়ে পড়ে রয়েছে। কালী নেই। তার বদাটাও নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

6 মন্তব্যসমূহ

  1. মৃত্তিকার গল্পটি মাটির গন্ধ নিয়েখুউউব ভালো।

    উত্তরমুছুন
  2. খুব ভালো লাগলো
    ভাষা শৈলী খুবই পরিচিত আমাদের মেদিনীপুরের গ্রাম বাংলার।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব ভালো লাগলো মৃত্তিকার গল্প ।গ্রাম শহর বুঝি না। এই রকম মানুষ সর্বত্র আছে। সুন্দর লিখেছে। ওকে আমার অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  5. খুব ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  6. মৃত্তিকা মাইতির প্রতিটি গল্পে থাকে গ্রাম বাংলার মাটির আর সাধারণ মানুষের কথা। কালীর বদাও তাই।

    উত্তরমুছুন