কণিষ্ক ভট্টাচার্যের গল্প : শহরে অনুপস্থিত শব্দাবলী



। আদি।

‘আসুন স্যর, আপনার পড়াশোনার ঘরে গিয়ে বসা যাক। কাজ থেকে উঠে এসেছেন...’ পড়ার ঘরের দিকে হাত দেখিয়ে ছেলেটি বলে।

কথাটা শুনে একটু অবাক হয় ধীমান। এই ছেলেটি, এ কি আগে কখনো এসেছে ধীমানদের ফ্ল্যাটে!

ছেলেই বলা যায়। ধীমানের ছাত্রেরই বয়সী। দরজায় বেল বেজে ওঠায় ধীমান নিজেই লেখা ছেড়ে উঠে গেছে খুলতে। এখন ল্যাপটপেই লেখে। হাতে পেন থাকলে না হয় বলা যেত যে, ছেলেটি পেনটা দেখে বুঝেছে যে ধীমান পড়াশোনা করছিল। অবশ্য একজন বয়স্ক অধ্যাপক উইক-অফের দিনে পড়াশোনা করবে এটা মনে করা হয়ত এখনো একেবারে বিরল হয়ে যায়নি। ধীমান দরজার লক লাগায়। একটু সময় নিয়েই লাগায়। বুঝে নিতে চায় যে নিজে একটু ওভার রিঅ্যাক্ট করে ফেলল কিনা।

ছেলেটি নিজেই পড়ার ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে ধীমানকে আগে ঢোকার জন্য হাত এগিয়ে দেয়, ‘আসুন স্যর।’

এই ফ্ল্যাটের প্ল্যান নিশ্চিতভাবে ছেলেটির চেনা। নয়তো কোনটা স্টাডি রুম সেটা তো জানার কথা নয়। ধীমান এবার সরাসরি জিজ্ঞেস করে, ‘আপনি এসেছেন আমাদের ফ্ল্যাটে? আগে কখনো?’

ছেলেটি হাসে, ‘না স্যার। তবে আপনার ঠিকানা কে না চেনে!’

‘কী করে চেনেন? আপনি কি আমাদের কলেজে পড়তেন?’

‘না স্যর,’ বিনয়ী হাসে ছেলেটি, ‘আমি অত বিখ্যাত কলেজে পড়িনি। সাধারণ গ্রামের কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। জেলার ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ।’

ছেলেটা যে সেদিন থেকেই ধীমানকে কিছুটা ধন্দে ফেলে দিয়েছে, সেটা ধীমান বুঝতে দিতে চায় না আর। ছেলেটির নাম মনে আছে ধীমানের। বকুল। তবু ধীমান নিজের পেশাদারি ঢঙে বলে, ‘কী যেন নাম বলেছিলেন আপনার, ফোনে?’

‘বিপুল, স্যর।’

‘ও, আমার যেন মনে হচ্ছিল বকুল? ভুল শুনেছি হয়ত সেদিন ফোনে!’

‘না স্যর। ওটাও আমার নাম। সেদিন হয়ত ওটাই বলেছিলাম।’

‘আপনার কটা নাম?’

‘এই দুটোই, স্যর।’ ছেলেটি হাসে। ‘ক্লাসে বিপুল, কিন্তু বন্ধুরা বকুল ডাকে বলে সকলে ওই নামেই চেনে।’

‘আচ্ছা, কী বিষয় বলুন তো?’

‘আপনি বসুন স্যর।’ বিপুল ধীমানের চেয়ারটা দেখায়। ‘আমি এখানে বসি?’ উলটোদিকের বদলে টেবিলের পাশের চেয়ার দেখিয়ে বিনীত গলায় যেন অনুমতি চায়, কিন্তু ধীমান কিছু বলার আগেই বসে পড়ে। ধীমান একটু ঘুরে বসে।

‘হ্যাঁ, বলুন। আমি একটা লেখার মধ্যে আছি। একটু তাড়াতাড়ি। প্লিজ।’ ব্যস্ততা দেখাতে ল্যাপটপের লেখার দিকে চোখ ফেরায়।

‘আপনি আমায় তুমি বলতে পারেন স্যর। আমি অনেক ছোটো।’ ছেলেটা একটু থেমে বলে, ‘অবশ্য আপনি তো ছাত্রছাত্রীদেরও আপনি বলেন।’

ধীমানের মনে হয় এ যেন একটা বুদ্ধির খেলা হচ্ছে। ছেলেটা ধীমানের সম্পর্কে যেন ডিটেল হোমওয়ার্ক করে এসেছে। কিন্তু ছেলেটার চেহারা এতই সাধারণ যে আলাদা করে মনে রাখার মতো কোনো বিশেষত্ব নেই গোটা অস্তিত্বে। এরকম ছিপছিপে, কালো, সাধারণ নাকমুখের ছেলে চারপাশে অজস্র দেখা যায়। পোশাকও সাধারণ। একটা রং-ওঠা জিন্স, কটনের মরা-সবুজ রঙের হাফ হাতা জামা। একটা ছোটো ব্যাগ ক্রস করে নেওয়া। পায়ে একটা বর্ষার চটি ছিল, সেটা গেটের বাইরে খোলার সময় ধীমান লক্ষ করেছে। তবে চেহারা বা বেশভূষার তুলনায় চোখটা বেশ উজ্জ্বল।

‘বলুন,’ গুছিয়ে বসে ধীমান, যেন পরীক্ষার ভাইভা নিতে, ‘ভাষা বিষয়ে জিজ্ঞাসা ছিল তো আপনার?’

‘হ্যাঁ স্যর।’

‘কী প্রশ্ন?’

ছেলেটা কয়েক সেকেন্ড সোজাসুজি ধীমানের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর চোখ নামিয়ে বলে, ‘এই যে স্যর শব্দ হারিয়ে যায়, মানে কোনো একটা শব্দ, ধরুন আগে আমরা ব্যবহার করতাম, তারপরে সেই শব্দটা হঠাৎ হারিয়ে গেল। যেমন ধরুন, মা আমাকে বলত ল্যাবা। আসলে খুব বোকা ছিলাম তো!’ একটু লজ্জিত হাসি হাসে ছেলেটি। আবার বলে, ’যে শব্দটা আগে সবাই বলত সেই শব্দটা আর কেউ বলে না। বলে না মানে, কেউই বলে না। কেবল বলে না নয়, কেউ মনেই রাখেনি আর শব্দটা। সকলে ভুলে গেল। একটা গোটা ভাষাগোষ্ঠী থেকেই শব্দটা একেবারে নেই হয়ে গেল... ’

এই প্রশ্নটাই! এটাই জানতে এসেছে ছেলেটা! আজকেই! ধীমান নিজের খটকাটা বুঝতে দিতে চায় না ছেলেটাকে। দীর্ঘ শিক্ষকতার স্বাভাবিক গলায় বলে, ‘এমন তো হয়ই। পৃথিবীর সব ভাষা দশ বছর আর দশ কিলোমিটারের রেডিয়াসে বদলে যায়। খুব কমন ফেনোমেনা। ধ্বনি পরিবর্তনেও শব্দ তার মূলরূপ থেকে বদলে যেতে পারে। মানুষ আসলে উচ্চারণকে সহজ করে নিতে চায়। ফলে এক শব্দ থেকে আরেকটা শব্দ তৈরি হয়।’

‘বদলে যায় বুঝলাম। কিন্তু স্যর, একেবারে হারিয়ে যায়! কেউ মনে রাখে না?’

‘লিখিতভাবে থাকলে সেটা প্রত্ন-শব্দ হিসেবে থেকে যেতে পারে। আবার পরবর্তীকালে কেউ সেই লেখা থেকে সেই শব্দ নতুন করে ব্যবহার করতে পারে। সেটা যদি জনপ্রিয় হয় তবে সেই শব্দ আবার বহুলভাবে সমাজে স্বীকৃতি পেতেই পারে। এমনও হয়েছে বহু শব্দের ক্ষেত্রে।’

‘আবার হারিয়েও যেতে পারে! চিরতরে? ব্যবহার না করলে?’

‘হ্যাঁ, যেতেই পারে।’ বিপুল আবার কী একটা বলতে যাচ্ছিল। ধীমান হাত তুলে থামায়। ‘আপনি কি ভাষাতত্ত্ব নিয়ে কাজ করতে চাইছেন, বিপুল? কিন্তু এগুলো তো আপনার পড়া থাকার কথা। নাকি বকুল বলব! কোন ইউনিভার্সিটি? কার কাছে?’

বিপুল খানিকক্ষণ চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে। তারপরে মুখ তুলে ম্লান হাসে। ‘না স্যর, চাকরিবাকরি নেই। বাড়ির অবস্থা ভালো না। আর গবেষণা... এসময় বসে থেকে গবেষণা করলে স্যর খাব কী!’

এই একবার ধীমানের ছেলেটার সম্পর্কে একটু মায়া জাগে। চাকরিবাকরির যে কী অবস্থা, সে রাজ্যজুড়ে সবাই জানে। ফ্ল্যাটে ঢুকে-থেকে ছেলেটা যে সপ্রতিভতা দেখিয়েছে, এই প্রথম তাতে যেন একটু ভাঁটা পড়ল। খারাপই লাগে ধীমানের। পেটের টানে তো সব গুলিয়ে যায়। ধীমান আন্তরিক গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘কী করছ এখন? টিউশন!’

ছেলেটা মুহূর্তে যেন একটা চকচকে হাসির মুখোশ পরে নেয়। ‘না স্যর, আপনাদের আশীর্বাদে একটা এজেন্সিতে কাজ করছি। পার্মানেন্ট নয়। কন্ট্রাক্টচ্যুয়াল। ওই চলে যাচ্ছে আরকি!’

‘বিজ্ঞাপন সংস্থা? কপি রাইটার?’

‘ওই আরকি, ধরতে পারেন,’ বলে ছেলেটা নিজেই হঠাৎ উঠে পড়ে চেয়ার ছেড়ে।

এমনিতে কথা বলতে যে আর ইচ্ছে করছিল না ধীমানের, সেটাও কি ছেলেটা বুঝে ফেলল! ধীমান চেয়ার ছেড়ে ওঠে। যেই আসুন না কেন তাঁকে ফ্ল্যাটের দরজা অবধি এগিয়ে দেওয়ার সৌজন্য ধীমান কখনো ভোলে না।

‘আজ আসি স্যর। পরে আবার দরকার পড়লে ফোন করব। আপনাকে খুব বিরক্ত করলাম। কাজ করছিলেন...’ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আর, থ্যাঙ্কিউ স্যর।’ হঠাৎ আন্তরিক হাসিতে মুখ ভরে যায় ছেলেটার।

‘কেন?’

‘আমাকে তুমি করে বলার জন্য। ওই যে চাকরিবাকরি নেই শুনে আপনার মায়া হল, আর আপনি তুমি বলে ফেললেন!’ বকুলের হাসির মুখোশ থেকে এখন চকচকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে যেন!

ধীমান চমকে ওঠে, ভুরু কুঁচকে যায় মুহূর্তে। মনে করতে চেষ্টা করে তেমন বলেছে নাকি! চোয়াল শক্ত হয়ে যায় ধীমানের। কিছু বলতে পারে না।

‘তাহলে স্যর, শব্দ ফিরে আসতে পারে, তাই তো! আমিও আসতে পারি। চলি।’ বলে ইয়েল লকটা টেনে দরজা বন্ধ করে দেয় বিপুল। নাকি বকুল!

কী বলে গেল ছেলেটা! কথাটার কি অন্য কোনো মানে আছে? ছেলেটা অতি-চালাক নাকি অতি-সরল! নাকি পাগল! ধীমান খানিকক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে থাকে পড়ার টেবিলে। ল্যাপটপটা খোলে কিন্তু কী লিখবে মনে করতে পারে না।



। প্রাক-আদি।

এমনিতেই খানিক অস্বস্তিতে আছে ধীমান। কিছু একটা যেন গণ্ডগোল হচ্ছে কিন্তু ধীমান বুঝতে পারছে না সেটা কোথায়।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙার অভ্যেস ধীমানের বহুদিনের। উঠে নিজেই দুকাপ চা বসাত চিরকাল। সময় বুঝে রাজলক্ষ্মীর কাকগুলো বারান্দায় ডাকাডাকি করত, যতক্ষণ না রাজলক্ষ্মী নিজের চা নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দুটো বিস্কুট ভেঙে ওদের দিত। কাক আর কাগজে সকাল কাটত রাজলক্ষ্মীর। হেডলাইন থেকে প্রিন্টার্স লাইন অবধি চোখ বোলাত বারান্দার টুলে বসে। কাক ডাকাডাকি করত। বিস্কুট খেত। ধীমান বহুদিন কাগজ পড়া ছেড়ে দিয়েছেন।

রাজলক্ষ্মী চলে যাওয়ার পরে ধীমানের মেয়ে শ্রীময়ী তার শ্বশুরবাড়ির চেনা বিশ্বাসী একটি কাজের মেয়েকে দিয়ে গেছে। সে সকালবেলা এসে বাজারহাট রান্নাবান্না সব সামলে রাত্তির আটটায় যায়। ধীমান এখনো ভোরে উঠে দুকাপ চা বসায়। কদিন থেকে যেন ধীমান কাকের ডাকাডাকি আর শুনতে পাচ্ছে না। ধীমান চারটে বিস্কুট আর চা নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। কাকদুটো এসে বসে আছে চুপ করে গ্রিলে। কোন শব্দ নেই। যেন ওরা ডাকতে ভুলে গেছে। ধীমান দুটো বিস্কুট ভেঙে গ্রিলে দেয়। দড়ি দিয়ে নামানো ব্যাগে কাগজ দিয়ে গেছে। কাগজ তোলে। কেবল খবরের কাগজ খোলার লোক নেই এখন।

চা শেষ করে এসে ইন্টারনালের কটা খাতা নিয়ে বসে। এত ধরে ধরে পড়ানোর পরেও স্টুডেন্টদের লেখা দেখে খুশি হতে পারে না ধীমান। লেখার বিষয়গুলো মোটামুটি ধরতে পেরেছে ছেলেমেয়েরা কিন্তু ভাষার জোরের জায়গাটা যেন হচ্ছে না। যাকে বলে সুপ্রযুক্ত শব্দ সেটা ঠিকঠাক যেন খুঁজে পায়নি। ফলে বিষয়টা বোঝাতে গিয়ে একগাদা অপ্রয়োজনীয় কথা লিখে রেখেছে। আর সবচেয়ে অদ্ভুত হল, এটা এই সেমিস্টারের গোটা ব্যাজটার একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। দরকারি শব্দটা বাদ যাওয়া। কি-ওয়ার্ড বলে যাকে পরীক্ষার ভাষায়।

ধীমান ভাবে, অন্য সেমের ছাত্রছাত্রীদের কী অবস্থা খোঁজ নিতে হবে ডিপার্টমেন্টে। ক্লাসে আরেকবার একটু বুঝিয়ে দিয়ে বিষয় অনুযায়ী অত্যাবশ্যক শব্দের একটা তালিকা করে দেবে। স্বচ্ছভাবে ভাবনা প্রকাশের জন্য ঠিক জায়গায় ঠিক শব্দটি ব্যবহার করা খুবই জরুরি, আর শেষ পর্যন্ত তো নম্বর পাওয়া ব্যাপারটা পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধীমানদের কলেজের এত নামডাক দিনান্তে ওই বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের ভালো নম্বরের জন্যেই, তা তো অস্বীকার করার নয়!

কলেজে ঢুকতেই প্রকাশকের ছেলেটি এসে প্রুফ দিয়ে গেল। ক্লাস ছিল না বলে ধীমান সেগুলো ওলটাচ্ছিল। এর মধ্যেই সুগত এসে শুরু করল, ‘তুমি এত সময় পাও কী-করে গো ধীমানদা!’

‘স্যারের তো তোমাদের মতো সন্ধের জরুরি কাজকম্ম নেই!’ উলটোদিকের চেয়ার থেকে কথাটা বলে বিভাগের সবচেয়ে কমবয়সী সহকর্মী সুজাতা মিটমিট করে হাসে।

‘তোরাও আয় না, ঠেকাচ্ছে কে!’ সুজাতাকে বলে ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরোয় সুগত।

ধীমানের হঠাৎ সকালের কথা মনে পড়ে, ‘সুজাতা, ফাইনাল সেমের ইন্টারনাল কেমন হয়েছে!’

‘খারাপ না স্যর। কেন?’

‘লিখেছে ঠিকঠাক পয়েন্ট করে?’

‘হ্যাঁ স্যর, কেন বলুন তো?’

‘আমি যে সেমটা দেখছি সেটা কিন্তু বেশ খারাপ।’

‘স্যর, ওরা তো ক্লাসও পায়নি তেমন!’

‘সে ঠিক। উত্তরের প্যাটার্ন একটু দেখো তো। উত্তর বেশি ছড়ানো। যেন শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না বলে একগাদা লিখেছে।’

সুজাতা হাসে, ‘হ্যাঁ স্যর নিশ্চয়ই দেখব। একটা কথা বলি স্যর!’

‘হ্যাঁ বলো না!’

‘বউদি চলে যাওয়ার পর, আপনি নিজেকে কাজে আরও ব্যস্ত করে রেখেছেন, না!’

‘তা খানিকটা তো বটেই...’

ধীমান প্রুফে মন দেয়। প্রুফ দেখে মনটা তেতো হয়ে যায় ধীমানের। এখন তো আর হাতে লেখা প্রুফ নয়। ধীমান টাইপ করেই লেখে তাতে এত ভুল থাকে কী করে!

জয়দীপকে ফোন করে, ‘কী ব্যপার বলো তো!’

ধীমানের গলায় হয়ত বিরক্তি ফুটে উঠেছিল। জয়দীপ ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলে, ‘কী হয়েছে স্যর!’

‘এত ভুল কেন? টাইপ করা লেখায় এত ছাড় গেছে! কাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছ?’

জয়দীপ আশ্বস্ত করতে চায়, ‘আমি দেখছি স্যর, আপনি ছেড়ে দিন। আমি তো স্যর আপনাকে বললাম ফার্স্ট প্রুফটা ওরা দেখে নেবে।’

‘শোনো জয়দীপ, চিরকাল আমার প্রুফ আমি নিজে দেখতেই পছন্দ করি।’

‘জানি তো স্যর। সরি। আমি দেখে নিচ্ছি। আপনি চিন্তা করবেন না।’

কী যে হচ্ছে চারপাশে ধীমান বুঝতে পারে না।

কলেজ থেকে বেরিয়ে একটা হলুদ ট্যাক্সির জন্য অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। একদল স্টুডেন্ট ফুটপাথে ধীমানকে দেখে বলল, ‘স্যর ট্যাক্সি খুঁজছেন তো!’ ধীমান হাসল। স্টুডেন্টরা ওকে ভালোবাসে। ওদের লব্জ কানে এসেছে ধীমানের, বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন-- “ডিডি, চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।” গোটা তিনচার ছেলে হইহই করে রাস্তায় চলে গেল। দুটো মেয়ে ধীমানের কাছে দাঁড়িয়ে। ‘স্যর আপনি তো ব্যাগ দেবেন না, ওই খামটা দিন!’

‘না না। ঠিক আছে।’

ছেলেগুলো একটা ট্যাক্সিতে উঠেই এসেছে। নেমে বলল, ‘উঠুন স্যর।’

ধীমান জায়গার নাম বলাতে ট্যাক্সিওয়ালা কিছু বলার আগেই ছেলেগুলো বলে, ‘বলে দিয়েছি স্যর। যাবে। এই সরি যাবেন।’

ড্রাইভার বোধহয় মিনমিন করে কিছু বেশি দেওয়ার কথা বলতে যাচ্ছিল। অতগুলো ছেলে হইহই করে ওঠায় থেমে গেল। ট্যাক্সিটা ছাড়তেই ফোন বাজল ধীমানের। ফোন ধীমান পকেটে রাখে না। ব্যাগ খুলে বের করতে করতে কেটে গেল। অচেনা নম্বর। ধীমান আবার ব্যাগে রাখতে যেতেই আরও একবার ফোনটা বেজে উঠল।

ধীমান ফোন ধরে, ‘হ্যালো?’

‘আপনি অধ্যাপক ধীমান দাশগুপ্ত বলছেন?’

‘হ্যাঁ, বলছি।’

‘নমস্কার স্যর। আমার নাম বকুল। আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল...’



। মধ্য।

কাউন্টারে তর্কাতর্কির আওয়াজ শুনে নাথবাবু বেরিয়ে আসেন। ‘কী হয়েছে, কী হয়েছে?’

এসে দেখেন ধীমান খুব উত্তেজিত হয়ে সেলসের নতুন ছেলেটিকে বলছে, ‘আপনাদের আমি পুলিশে দেব।’ নাথবাবুর সঙ্গে ধীমানের পরিচয় আজকের নয়। নাথবাবুকে দেখেও ধীমানের উত্তেজনা কমে না, ‘কী ব্যাপারটা কী আপনাদের!’

ধীমান বেজায় রেগে গেছে ছাড়া নাথবাবু আর কিছুই বুঝতে পারেন না। ধীমানকে বলেন, ‘আসেন। আসেন দাদা, আপনি আমার ঘরে আসেন।’ সেলসের একটি ছেলেকে বলেন, ‘স্যারের ব্যাগটা নিয়ে এসো আর দুটো চা দিতে বলো।’

ধীমান নিজের ব্যাগটা তুলে নিয়ে নাথবাবুর ঘরে যান। নাথবাবু এসিটা বাড়িয়ে সঙ্গে একটা ফ্যান চালিয়ে, টেবিলের ঢাকা দেওয়া গ্লাসটা ধীমানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন, ‘জল খান দেখি দাদা। শান্ত হয়ে বসেন আগে।’

ধীমান বোঝে এতটা উত্তেজিত হওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু একই গণ্ডগোল বারবার হচ্ছে। এসির হাওয়ায় ভালো লাগে শরীরটা। নাথবাবু বলেন, ‘কী বই দরকার আমাকে তো একবার ফোন করলেই হত! ছেলেরা দিয়ে আসত গিয়ে। সারাদিন খাটাখাটনি করে আপনি আবার এসেছেন কেন দাদা! বয়েস হচ্ছে তো!’

এর মধ্যে চা আসে। ধীমানের চিনি ছাড়া লাল চা। নাথবাবুকে বলে দিতে হয় না। ‘চা খান দাদা।’

ধীমান একটাও কথা না বলে চা শেষ করে উঠতে যেতেই নাথবাবু বলেন, ‘আরে ছাড়েননি সিগারেট এখনো! এখানেই খান দাদা।’

ধীমান এসি ঘরে সিগারেট খায় না। নাথবাবুর ঘর থেকে বেরলে ডানদিকে একটা সরু গলি পড়ে পিছনে। পুরনো কলকাতার পাশাপাশি মোট দু-মানুষ চওড়া গলি। তার দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ধীমান সিগারেটে তিন চারটে টান দিয়ে ফেলে দেয়। নাথবাবু বলেন, ‘এবার বলুন তো দাদা কী হয়েছে?’

ধীমান শান্ত গলায় বলে, ‘আপনিও পাইরেসি করছেন, নাকি পাইরেটেড বই রাখছেন, নাথবাবু?’

নাথবাবু এবারে হেসে ফেলেন, ‘আপনার আজ কী হয়েছে দাদা! শরীর খারাপ? আপনি আমারে আজ নতুন দেখেন! কী বই?’

ধীমান বইয়ের নাম বলে। পুরনো একটা বই। অনেক এডিশন।

নাথবাবু বেল বাজান। একটি ছেলে আসে। নাথবাবু নামটা বলে বলেন, ‘দেবদের বই। দেখো তো স্টকে কত কপি আছে? সবকটা নিয়ে এসো।’ ছেলেটি চলে যায়।

‘একটা কথা বলি দাদা, মানুষের মন, এত কাজে চেপে রাখলেও কি থাকে! কদিন ঘুরে আসেন কোথাও। আমাদের হলিডে হোম আছে। সব ব্যবস্থা পাকা। ছুটি নেন কদিন। আপনারে এমন তো কখনো দেখি নাই!’

এতকালের পরিচয় নাথবাবুর সঙ্গে, তার দোকানে এসে এমন করবে ধীমান নিজেও তা কখনো ভাবেনি। এখন যেন একটু অস্বস্তি লাগে ধীমানের কিন্তু কিছু বলতে পারে না। ছেলেটা সাতকপি বই নিয়ে টেবিলে রাখে। নাথবাবু বলেন, ‘এবার বলেন দাদা কী হইসে।’

ধীমান একটা বইয়ের বারো নম্বর পাতা খোলে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে সবকটা বইয়ের ওই পাতা খুলে নাথবাবুকে বলে, ‘এই জায়গায় সাদা কেন? শব্দ কোথায় গেল, নাথবাবু? এবার আমি বলছি, আপনি দেখুন। তেইশ, সাতাশ, আটত্রিশ, ছেচল্লিশ, বাহান্ন এরকম পঞ্চাশটা পাতা আমি বলতে পারব, নাথবাবু। যেখানে যে শব্দগুলো থাকার কথা, তা নেই। গোটা বইয়ে অন্তত একশো ষাট-সত্তরটা শব্দ নেই। আমার স্মৃতিশক্তি খুব ভালো, আপনি জানেন। এবার বলুন এটা আসল বই?’

‘দাদা কী হইসে কন তো!’

‘আপনিই বলুন কী হইসে?’ ধীমান আবার উত্তেজিত হয়ে নাথবাবুর কথার সুর ধরে বলে ফেলে।

‘আমি বইয়ের কথা নয়, আপনার কথা বলছি। এই বই কেন অনেক বইতেই তো পুরনো কিছু শব্দ থাকে না আজকাল। ওই শব্দগুলা নাকি নাই! বাদ গেসে!’

‘আপনি কি আমায় পাগল করে ছাড়বেন! নেই মানে? কোথায় গেল? কে বাদ দিয়েছে?’

‘তা তো জানি না দাদা! আপনি দেবদের ঘরে গিয়াও দেখতে পারেন। নিজেদের বই তো ওরা আর পাইরেসি করব না!’

‘আপনি কী বলছেন নাথবাবু!’ ধীমান হঠাৎ যেন কেমন বিপন্ন বোধ করে। ধীমান ভেবেছিল হয়ত এখানেই সমস্যার সমাধান পাবে। এক মুহূর্ত চুপ করে, নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘না না, আমার নয়, আপনার মাথাটাই গেছে। দেখি আমি কী করতে পারি।’

গনগনে রাগে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে ধীমান। কিছু একটা গভীর আর জটিল গণ্ডগোল হচ্ছে। আর কেউ বুঝতে না পারুক ধীমান বুঝতে পারছে। এই জন্যেই ওই ছেলেটি--- ওই বকুল না বিপুল, সে এসেছিল ন্যাকা সেজে। ‘শব্দ কীকরে হারিয়ে যায় স্যর!’--- মহা-ধুরন্ধর ছেলে ওটি। ধীমান রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরায়। বেশি সিগারেট খাওয়া হয়ে যাচ্ছে। সিগারেট খাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল ধীমান, রাজলক্ষ্মী চলে যাওয়ার পরে আবার একটা দুটো করে বাড়তে থাকে। কদিন তো খুব বেশিই খাচ্ছে।

পাইরেসি নয়। হয়ত আরও জটিল কিছু।

হঠাৎ মনে পড়ে ধীমানের, স্টুডেন্টরা কি এসব বই পড়ছে আজকাল! অবশ্য ক্লাসে আকর গ্রন্থের যে তালিকা দিয়েছিল ধীমান তাতে তো এ বই ছিল।

কিছু একটা করতে হবে, কিন্তু কীভাবে, কী করবে ভেবে পায় না ধীমান। একটা ছেলে ছিল না ডিপার্টমেন্টে, যে পরে আইপিএস হয়ে দেখা করতে এসেছিল! কী যেন নাম, প্রবাল, প্রবাল মিত্র। কিন্তু তার নম্বর তো নেই! ডিপার্টমেন্টে কারো কাছে চাইলে ওরা হাজার প্রশ্ন করবে।

তাহলে কি থানায় যাবে! দুর্নীতি এখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে, থানা কি বইয়ের দরকারি শব্দ হারিয়ে যাওয়াকে আদৌ পাত্তা দেবে! পাইরেসিও তো বলতে পারবে না ধীমান! কিন্তু নিজের অসহ্য ভাবটা কিছুতেই এড়াতে পারে না ধীমান। প্রশাসনকে জানানো ধীমানের নাগরিক কর্তব্য, তার থেকেও বড়ো কথা ধীমান শিক্ষক, ঠিক শব্দ না থাকা মানে আসলে ছাত্রছাত্রীদের প্রতারিত করা। এটা কারা করছে? কী উদ্দেশ্যেই বা করছে? একটা গভীর উদ্দেশ্য ধীমান বুঝতে পারছে, সে তো ভয়ংকর!

ধীমান একটা ট্যাক্সিকে হাত দেখায়। থানার নাম শুনে কিনা কে জানে ড্রাইভার এক কথায় রাজি হয়ে যায়, বেশি দিতেও বলে না। থানার সামনে নেমে ধীমান ভাবে গিয়ে ঠিক কী বলবে? যে উদ্দেশ্যের আশঙ্কা ধীমান করছে তা কি বলতে পারবে! পুলিশ তো প্রশাসনেরই অংশ। তবু ধীমান থানায় ঢোকে। কাঠের বেঞ্চিতে বসে। খাতা নিয়ে জেনারেল ডায়ারি লেখার জন্য যে কর্মী বসে আছেন তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ বলুন কী ব্যাপার!’

ধীমান কী বলবে, চুরি হচ্ছে? শব্দ চুরি? আর এই কাজটা চোরেরা বেশ সংগঠিতভাবে করছে! কিন্তু কিছুতেই ধীমান ব্যাপারটা বলে উঠতে পারেন না। যেন তার নিজের স্টুডেন্টদের মতো অবস্থা তার, কি-ওয়ার্ড খুঁজে পাচ্ছে না ইন্টারনালের খাতায় লেখার সময়! পুলিশ কর্মী একটু অধৈর্যভাব দেখায়, ‘কী হয়েছে, বলুন?’

‘কিছু না,’ বলে ধীমান বেরিয়ে আসে।



। অন্ত্য।

বাড়ি ফিরে সেদিন একেবারে ধ্বস্ত লাগে যেন ধীমানের।

ধীমান নিজেকে বাস্তববাদী বলেই মনে করে। রাজলক্ষ্মীর চলে যাওয়াকে মানসিকভাবে মেনে নিয়েছে। তবু একেকদিন মনে হয় বাড়ি ফিরে কথা বলার লোকের বড়ো অভাব। ধীমান ফেরার পর পূজা চা-জলখাবার দিয়ে, রাতের খাবার রুটি ক্যাসারোলে রেখে বাকি খাবার টেবিলে সাজিয়ে গেছে। শ্রীময়ী রোজ ফোন করে রাতে নটা নাগাদ। খোঁজখবর নেয়, বেশি রাত জাগতে নিষেধ করে। ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবু একটা হেরে যাওয়ার জ্বালা আজ এই ধ্বস্ত মনে যেন উপশম চায়। রাজলক্ষ্মীর সঙ্গে কথা বলতে পারলে হয়ত তা পেত ধীমান। যা নেই তা ভেবে লাভ নেই, তবু নিজের চিন্তাকে স্বচ্ছ করতে ধীমান কী তার আশঙ্কা, আর সেটা কীভাবে সেসব হচ্ছে তা টাইপ করছিল ল্যাপটপে। তখনই আবার ফোন বাজে।

‘হ্যালো...’

‘আপনি অধ্যাপক ধীমান দাশগুপ্ত বলছেন?’

চমকে ওঠে ধীমান, এই গলা ধীমানের চেনা। কিন্তু নিজের গলা যথাসম্ভব শান্ত আর স্বাভাবিক রেখে বলে, ‘হ্যাঁ বকুল বলুন। এবার কী দরকার?’

‘আমি বকুল নই স্যর, আমি তৃণাঞ্জন। তবে বন্ধুরা আমাকে কমল বলে ডাকে। আপনি আমাকে কমলও বলতে পারেন।’

‘আপনি নিজেকে খুব বুদ্ধিমান ভাবেন, তাই না তৃণাঞ্জন? অথবা কমল!’

‘না না স্যর, ছিছি! কী যে বলেন! আপনি পণ্ডিত মানুষ, গোটা দেশ আপনাকে সম্মান করে, আপনার কাছে...’

‘কী... আমার কাছে কী, কমল?’

‘স্যর আপনাকে কি এসব মানায়! আপনার বয়েস হয়েছে। শহরের সেরা কলেজে পড়ান। আপনি কিনা...’

‘বাক্য শেষ করুন, তৃণাঞ্জন।’

‘আপনি তো সবই জানেন স্যর! এই বয়েসে আপনার বইয়ের দোকানে ওরকম রাগারাগি করা মানায় বলুন! তার ওপর থানায় চলে গেলেন রাগের মাথায়! গিয়ে আবার কী অভিযোগ করবেন সেটাই ভেবে পেলেন না! আমি বলব স্যর, আপনি আসলে শব্দ মনে করতে পারছিলেন না। সুপ্রযুক্ত শব্দ।’

‘আপনি কি আমাকে ভয় দেখাতে চাইছেন বকুল!’

‘আমি তৃণাঞ্জন, স্যর। বন্ধুরা আমাকে কমল বলে ডাকে। না স্যর, ছি ছি! আপনি কি ভয় পাওয়ার মানুষ? আমি কি আপনাকে চিনি না! সাতের দশকের শেষে আমহার্স্ট স্ট্রিটে তেরোই জুলাই আপনাকে টার্গেট করে বোম পড়েছিল। তার পরে শিয়ালদায় একবার। নভেম্বরে। সেবারও আপনি বেঁচে যান। মোহিত নামে আপনার সহপাঠীর পা ঘেঁষে স্লিন্টার বেরিয়ে যায়। আপনাকে আমি ভয় দেখাবো! ছি ছি!’

‘বেশ। আপনাদের এজেন্সির ফাইল তারপরে আর মেইটেইনড হয় না, বকুল?’

‘হয় স্যর, হয় তো! জয়দীপবাবুকে অকারণেই বকাবকি করলেন স্যর।’

‘ও। ফোনও ট্যাপ হচ্ছে তাহলে? বেশ, কেন? অকারণ কেন?’

‘আপনি যে মেল করেছেন তাতেও তো শব্দগুলো ছিল না স্যর। আপনি সেন্ট মেল খুলে দেখুন।’

‘বেশ। কিন্তু আমি তো টাইপ করেছিলাম। তারপর?’

‘ডি-ড্রাইভে দেখুন, ওগুলো সেভ হয়নি। প্রোগ্রাম করা আছে স্যর। আর এখন যে পেজটা খোলা আছে আপনার “আশঙ্কা” ডক ফাইলে ওটাও সেভ করার সময় থাকবে না স্যর।

‘ল্যাপটপও হ্যাক করেছেন তাহলে!’

‘ছি ছি স্যর, অমন বলবেন না। চাকরিবাকরির অবস্থা তা তো খারাপ আপনি জানেন। আপনার স্টুডেন্টদের জন্যে তো আপনি নিজেও তো এখন আর বোম চার্জের পরিস্থিতিতে যান না, তাই না! এই বাজারে পড়াশোনা শিখে এসব ছোটখাটো কাজ করেই তো পেট চালাতে হয় স্যর আমাদের।’

ধীমান কী বলবে ভেবে পায় না।

‘স্যর,’ তৃণাঞ্জন বলে, ‘লিস্ট প্রতিবছর আপডেটেড হয় স্যর।’

‘কীসের লিস্ট?’

‘ওই যে, হারিয়ে যাওয়া শব্দের। ব্যবহার না হওয়া শব্দের। যে শব্দ লোকে ভুলে যায়। যে শব্দ বাতিল হল তার। কয়েক বছর ধরেই বেশ কিছু শব্দ বাতিল করা হয়েছে। সেসব আর ছাপা হয় না। আপনি তো খবরের কাগজ পড়েন না স্যর, তাই আপনি খেয়াল করেননি। নয়ত আপনার মতো মেধাবী লোকের এতদিন সময় লাগার কথা নয় স্যর।’

‘কে করে সেই লিস্ট?’

‘আমি করি! আমরা করি! আমাদেরই করতে হয়!’ আমি আমরা আর আমাদের শব্দের ওপর জোর দেয় তৃণাঞ্জন। ‘আমি তো ভাষা-সাহিত্যেরই ছাত্র! আপনার সব লেখা আমি পড়েছি স্যর। বেসিক্যালি আমাদের পড়তেই হয়। কিছু মনে করবেন না স্যর, আপনি-আপনারা যাদের জন্য লেখেন তাদের থেকে বেশিই আমরা পড়ি আপনাদের লেখা। আমাদের দরকার বেশি।’

ধীমান খানিকটা চিন্তামগ্ন গলায় যেন সমর্থনের সুরে বলে, ‘হুঁ...’

‘আপনি চিন্তায় পড়ে গেলেন স্যর! পড়াশোনা একদম বন্ধ হয়ে যায়নি কিন্তু! আপনি তো সারাজীবন পড়াশোনা, ভাবনাচিন্তার জন্যই আন্তরিকভাবে কাটালেন বলুন! পড়াশোনা আছে স্যর, ভাবনাচিন্তা আছে, কেবল লোক বদলে গেছে। পক্ষও বদলে গেছে।’

ধীমান চুপ করে থাকে।

‘স্যর, দশ বছর আর দশ কিলোমিটারের রেডিয়াসে শব্দ হারিয়ে যায় স্যর।’ “যায়” শব্দের ওপর একটা জোর দেয় বকুল, ‘আপনিই যে বললেন সেদিন বিপুলকে, এটা তো খুব কমন ফেনোমেনা! আর তার জন্য আপনি... আপনার মতো মানুষ এতটা উত্তেজিত হবেন! এত বছর পড়িয়ে!’

ধীমান একটা বড়ো শ্বাস নেয়। ‘আপনি এভাবে আমাকে আটকাতে পারবেন না তৃণাঞ্জন। আপনারা পারবেন না। বকুল, বিপুল, তৃণাঞ্জন, কমল, গোটা এজেন্সি মিলেও পারবেন না। দরকারে আমি হাতে লিখব। বই-পত্রিকায় ছাপাব না। ফটোকপি করে হাতে হাতে ছড়িয়ে দেব। সবটাই নষ্টদের হাতে যায় না তৃণাঞ্জন। চিরদিনের জন্য যায় না। রাখি।’

‘আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লাগল স্যর। দেখা হবে আবার।’

ফোন কাটে ধীমান। ছেলেটা যা-যা বলল সেগুলো যে ধীমান জানে না এমন নয়। আর সত্যিই তো ধীমান কী করেছে তার স্টুডেন্টদের জন্য! নিজে লিখে যাওয়া ছাড়া, ক্লাসে আন্তরিকভাবে পড়ানো ছাড়া! কিন্তু সত্যিই আর কী-বা করতে পারত ধীমান! হেরে যাওয়া লোক যেমন আবেগের বশে একটা কিছু বলে নিজের মুখ বাঁচাতে চায়, ওই হাতে লেখা আর ফটোকপি করে ছড়িয়ে দেওয়া ব্যপারটা তেমনই বলে ফেলেছে। ওভাবে এখন আর হয় না! সময় বদলে গেছে। দশ বছরের অনেক বেশি সময়। পিছলে গেছে হাতের ফাঁক দিয়ে।



। পরিশিষ্ট।

রবিবার। আজ মেয়েজামাই আসবে নাতনিকে নিয়ে। শ্রীময়ী এসে নিজেই রান্না করবে। রাজলক্ষ্মী চলে যাওয়ার পর ওরা আরও বেশি করে ধীমানকে সঙ্গ দিতে চায়। শ্রীময়ী পূজাকে ফোন করে বলে দিয়েছে কী কী এনে রাখবে। কাজের মেয়েটি ব্রেকফাস্ট আর চা দিয়ে দোকানবাজার করতে গেছে।

ধীমান সকাল থেকে টুল টেনে-টেনে নানা তাক থেকে নানারকম দরকারি বই নামিয়েছে। ধীমানের টেবিলে তিন চারটে স্তূপ হয়েছে বইয়ের। উলটোদিকের চেয়ারে আরেকটা স্তূপ। একজিকিউটিভ বন্ড পেপারের প্যাডটা কোন একটা সেমিনারে দিয়েছিল, সঙ্গে কলম নিয়ে বসেছে ধীমান আজ। পুরনো ফাউন্টেন পেনে লেখার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু ধীমান একটা পার্মানেন্ট মার্কার কিনে এনেছে। নিজের ভাবনা স্বচ্ছভাবে ঠিক শব্দে ধীমানকে লিখে রেখে যেতে হবে। এমন হতেই পারে এটাই ধীমানের শেষ লেখা। লেখার পর ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখবে। ফোনের ক্যামেরায় নয়। তারপরে ঘরেই লুকিয়ে রাখতে হবে কাগজটা। আর ক্যামেরার মেমরি কার্ড নিয়ে বেরবে ধীমান। এখনো হয়ত রাস্তায় সার্চ করবে না ধীমানকে। অবশ্য কিছুই আর অসম্ভব নয়। ধীমান মেল চেক করে দেখেছে, সত্যিই সেন্ট মেলে যে ডকুমেন্ট গেছে জয়দীপের কাছে, তাতে শব্দগুলো নেই। ডি-ড্রাইভে সেভড লেখায়ও শব্দ বাদ গেছে। সব দিক দিয়ে ওরা ঘিরে ফেলেছে। ধীমান লেখায় মন দেয়।

বাইরে থেকে চাবি ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটের দরজা খোলার শব্দ পায় ধীমান। পূজা ঢুকল বোধহয়। একটু গলা তুলে বলে, ‘পূজা আরেক কাপ চা দিস তো মা...’

‘পূজা নয় স্যর, আমি।’ স্টাডির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একগাল হাসে বকুল।

ধীমান এবার অন্যরকম ভয় পায়, এবার উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, ‘পূজা কোথায়? ওকে কী করেছ?’

‘আপনি রেগে গেলেও তুমি বলেন স্যর!’

‘পূজা কোথায়? চাবি...’

‘পূজা দোকানে বাজারে কোথাও একটা হবে। ওকে আমরা কিছু করব কেন? ও তো আমাদের লোক!’

‘পূজা!’ এতটা বিস্মিত ধীমান এতক্ষণ হয়নি। ‘পূজাও এজেন্ট!’

‘না স্যর, আপনি যা ভাবছেন তা নয়।’

‘তাহলে?’

‘আপনি দশ বছরের ব্যাপারটা যতটা ভেবেছেন দশ কিলোমিটারের ব্যাপারটা ততটা নয়।’

‘মানে?’

‘আপনি শেষ কবে আপনার নিজস্ব দশ কিলোমিটারের রেডিয়াসের বাইরে গেছেন স্যর? এই আপনার কলেজ বাড়ি ইউনিভার্সিটি, এসবের বাইরে?’

ধীমান বুঝতে পারেন না কথাটা কোনদিকে যাচ্ছে।

‘বসুন স্যর, টেনশন করবেন না। আমি এই চেয়ারটায় বসি, স্যর? এই যে আপনার ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবিটা আমাকে বানাতে হয়েছে।’ ধীমানকে চাবিটা তুলে ধরে দেখায় বকুল। ‘এটা থাক আপনার কাছে। আমার কাছে আরেকটা কপি আছে। ফলে, বুঝতেই পারছেন স্যর, তেমন দরকার হলে রাতবিরেতে এজেন্সির অন্য কাজের লোক আসতেই পারে। এমনিতেও আপনি একাই থাকেন। আপনার সারাদিনের ওষুধের লিস্টও তো আছে, স্যর! আপনি ঘুমের মধ্যে বুঝতেই পারবেন না! আর আপনার এই প্যাডের লেখা কোনোদিন নাও বেরতে পারে, তাই না!’

ধীমানের পায়ের কাছে বোম পড়ার পঞ্চাশ বছর আগের স্মৃতি জেগে ওঠে।

‘শুনুন স্যর, আপনি শেষ এই দশ কিলোমিটারের রেডিয়াসের বাইরে গেছেন গত এক বছরে পাঁচবার। জেলার দুটি ইউনিভার্সিটিতে আর তিনটি কলেজে। সেখানেও আপনি আপনার চেনা বৃত্তের মধ্যেই ছিলেন। ওই বৃহত্তর দশ কিলোমিটারের বৃত্ত। ফলে আপনি বুঝতেই পারেননি যে আসলে ওই দশ কিলোমিটারের বৃত্তের বাইরে হারিয়ে যাওয়া কিছু শব্দ এখনো আছে। কেউ কেউ বাঁচিয়ে রেখেছে। এখনো ব্যবহার করে সেইসব শব্দ।’

অনেকক্ষণ পরে ধীমান কথা বলে, ‘কে বাঁচিয়ে রেখেছে, কারা?’

‘ওই পূজা, এই আমি!’

‘আপনি!’ ধীমান একটা বিদ্রুপের হাসি হাসে।

‘হ্যাঁ স্যর আমি। আমিই তো লিস্ট করি, স্যর! আমিই বাদ দিই। ওটা আমার জীবিকা। এজেন্সির কাজ। কিন্তু লিস্ট তো আমার কাছেই থাকে।’

‘কী করেন সেই লিস্ট নিয়ে?’

‘ওই দশ কিলোমিটারের রেডিয়াসের বাইরে যাই। ওই শব্দগুলো লোকজনের সামনে কথায় কথায় মিশিয়ে দিই। ওই পূজাদের সামনে।’

‘মানে?’

‘আমি ডবল এজেন্ট স্যর, আপনি আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিলেন না। একটু বেশি রিস্ক নিয়েই আপনাকে ফোনটা করি। কিন্তু আপনার লেখা পড়ে আমি বুঝেছি আপনিই পারবেন। আপনি ধরে ফেলছেন ব্যাপারটা। এজেন্সি আমার জীবিকা স্যর, আপনি তো জানেন কাজের বাজারের কী অবস্থা! কোনো উপায় ছিল না আমার স্যর। তাই প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিন আমি আমার হাতে নিষিদ্ধ শব্দের তালিকা ধরে সেই শব্দগুলোই ছড়িয়ে দিই। আপনি আমার সঙ্গে একদিন চলুন স্যর।’ বলে ছেলেটি একটা সলজ্জ হাসি হাসে, ‘অবশ্য আমাকে আর বিশ্বাস করা আপনার পক্ষে কঠিন। কিন্তু আপনাকে পরীক্ষা করা আমারও যে দরকার ছিল স্যর।’

‘কিন্তু এসব খবর কি আপনার এজেন্সিতে পৌঁছবে না! আপনাকেও তো যেকোনো দিন এজেন্সি ঘুমের মধ্যে...’

বাক্য শেষ করতে দেয় না ছেলেটা, ‘দিতেই পারে স্যর। যেকোনো দিন। কেউ খোঁজও পাবে না। তাইতো আপনার কাছে আসা। আপনি যাতে চালাতে পারেন কাজটা...’

‘আসল নাম কী তোমার?’

চকচক করে ওঠে ছেলেটির মুখ, ‘ধীমান, স্যর। ধীমান দাশগুপ্ত। সত্যিই। আমরা সমনামী। ডিডি -- চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারেন স্যর। আসি। পরে ফোন করে যাওয়ার দিন ঠিক করব। শব্দ ফিরে আসে স্যর, দেখবেন। আসি। থ্যাঙ্ক ইউ। আর আপনি বলবেন না, প্লিজ।’

ধীমান জানে না এটাও ফাঁদ কিনা। তবে ধীমান যাবে।


পূজা ফেরে একটু পরে। ধীমান ডাকে পূজাকে। পূজা টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায় স্তুপাকৃত নানা তত্ত্বকথার বইয়ের ওপারে। ধীমান খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে পূজার চোখের দিকে। পূজা হঠাৎ চোখ নামিয়ে নেওয়ায় ধীমান হেসে ফেলে বলে, ‘পূজা, আরেক কাপ চা করে দিবি মা...’


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ