অক্টোবর মাসের শেষ দুপুরের আলো শাদা চাদর- ঢাকা বিছানার ওপর এসে পড়ে রয়েছে চুপচাপ। এতোক্ষণ জানলার বাইরে ফলসা কাঁঠাল আর নোনা গাছে প্রায় জড়াজড়ি পাতার ওপর ঝিম ধ'রে ব'সে ছিলো, তারপর কোন কিছু ভালো না- লাগা ক্লান্ত যেনো জানলা দিয়ে ঢুকে একেবারে মুর্ছিতের মতো সটান শুয়ে পড়েছে বিছানার ওপর ।
সেই শুয়ে থাকা হলদেটে আলোকে মাঝখানে রেখে তারা দুজন মুখোমুখি বসেছিলো। বাইরে তখন কাঁঠাল গাছের শুকনো ডালে অস্থির কাঠবেড়ালী ডাকছিল-চিড়িক চিড়িক।
দোলা নামের মেয়েটি কাঁধ ডিঙিয়ে বুকের ওপর পড়ে থাকা আঁচলকে অল্প তুলে আরো একটু টেনে এনে বুকের ওপর রাখে এবং চকিতে ছেলেটির, মানে পল্টু নামের বাইশ-তেইশ বছরের যুবকটির দিকে তাকালে দেখে, সে তখন তার বাঁদিকের দেওয়ালে গভীরভাবে কি যেন নিরীক্ষণ করছে। দোলা মেয়েটি চারপাশে তাকিয়ে বলে, 'কী ঠাণ্ডা।”
ছেলেটি তখন চুন খসে পড়া দেওয়ালের গায়ে সামনে বসে থাকা পোকার দিকে সন্তর্পণে অগ্রসরমান টিকটিকি থেকে চোখ ফিরিয়ে যেনো অনেক নীচে থেকে উঠে আসতে আসতে বলে—'অ্যাঁ?'
মেয়েটি কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গিয়ে ছেলেটির দিকে না তাকিয়ে শাদা চাদরের ওপর হলদে আলোয় চোখ রেখে বলে 'কিছু নয়।'
ছেলেটি বুঝতে না পেরে অত্যন্ত হালকা সলজ্জ হাসে।
মেয়েটি হঠাৎ বলে ওঠে, 'আমি উঠি।' এবং খয়েরী রঙের শাড়ি জড়ানো একটি ঋজু নিটোল রেখা কেঁপে উঠে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটি তখন বাঁ হাত দিয়ে বালিশটাকে পিঠ এবং কোমরের মাঝামাঝি রেখে আধশোয়া অবস্থায় মেয়েটির দিকে চেয়ে বলে, 'এক্ষুণি যাবে?'
মেয়েটি এক পলক তার দিকে চেয়ে নিরুত্তাপ অথচ স্থির গলায় মৃদুস্বরে বলে, 'হ্যাঁ'।
ছেলেটি ঠোঁটের কোণে স্মিত একটু হাসি এনে বলে, 'আচ্ছা, আবার এসো।' এবং তার দিকে তাকিয়ে ডান হাতে বালিশের পাশে রাখা একটি বই টেনে নেয় । মেয়েটি কোন কথা না বলে নিজের পায়ের নোখের দিকে তাকায়, তারপর নিঃশব্দে পেছন ফেরে এবং দরজা পেরিয়ে চলে যায়। আর ছেলেটি বই হাতে তার চলে যাওয়া দেখে অন্যমনস্কের মতো, তার যেনো শুধুই অভ্যাস বশে বইয়ের মাঝামাঝি একটা পাতা খুলে তার ওপর দুই চোখ নিবদ্ধ করে এবং হঠাৎ কিঞ্চিৎ শীত ও সেই সঙ্গে তৃষ্ণা অনুভব করে সে। কিন্তু উঠতে ভালো লাগলো না। বালিশ থেকে পিঠ নামিয়ে সেখানে সমস্ত মাথার ভার রাখে। শরীর সামনের দিকে লম্বা করে মেলে দেওয়ায় শীতের অনুভূতি অপেক্ষাকৃত তীব্র হয়। সে পাশ ফিরে হাঁটু দুটো প্রায় বুকের কাছে এনে চোখ বুজে পড়ে থাকে। চঞ্চল কাঠবেড়ালীটার কোন সাড়া-শব্দ আর পাওয়া যাচ্ছে না এখন। অনেক দূরে কে যেনো কাকে রাগী গলায় ডাকছে। চাদরের ওপর পড়ে থাকা আলোটা এখন পেছনের দুটি পা খোঁড়া কুকুরের মতো অতি কষ্টে ধীরে ধীরে ঘষটে ঘষটে জানলার বাইরে চলে যাচ্ছে।
মেয়েটির ঘরের বাইরে আকাশে চাঁদ উঠেছে। ভিজে ভিজে নরোম জ্যোৎস্না এসে পড়েছে ঘরের ভেতর। তাকের ওপর টাইমপিসে অনবরত টিক টিক শব্দ। শুনতে শুনতে মনে হয় তাকে নয়, তার মাথার ভেতরে। শুয়ে শুয়ে সেই শব্দ শোনে; শুনতে শুনতে পাশে শুয়ে থাকা নিদ্রিত রুবীর নিঃশ্বাসের শব্দ। সেই জ্যোৎস্নার ভেতর রুবী নামের তার চোদ্দ পেরোনো বোনটিকে দেখে, তার দিকে পেছন ফিরে কাত হয়ে শুয়ে আছে; গায়ের ওপরকার চাদর পায়ের কাছে দলা পাকিয়ে রয়েছে, পরনের কামিজ কোমর পেরিয়ে আরো ওপরে উঠে আছে, কোমরের ওপরকার উন্মুক্ত কিছুটা চিকচিকে অংশ দেখা যায়। পিঠের দুপাশ থেকে ঢালু হয়ে শিরদাঁড়ায় খাদটা গভীর হয়েছে।
সম্ভবত শীত অনুভূত হওয়ায় দু'পা কুঁকুঁড়ে হাঁটুজোড়া বুকের কাছে নিয়ে এসেছে, ফলে কামিজ তোলা কোমরের নীচে থেকে সালোয়ার ঢাকা বাঁকানো ভরাট রেখা পষ্ট হয়ে উঠেছে। তার নিটোল পিঠ, খোঁপার নীচে মসৃণ গ্রীবা দেখতে পায় সে। আর তখন রুবী মেয়েটা দুই উরুর মাঝখানে স্থাপিত পাশ বালিশটা বুকের ওপর নতুন ক'রে তীব্র আঁকড়ে ধ'রে ঘুমের ভেতর অস্ফুট হুঁ হুঁ শব্দে কেঁদে ওঠে। দোলা নামের সেই তন্বিষ্ঠ যুবতীটি তখন হঠাৎ সচেতন হয়ে তার ছোট বোন রুবীর বালিশের কাছে এগিয়ে গিয়ে পাশ ফেরানো মুখের ওপর ঝুঁকে প'ড়ে জিজ্ঞেস করে, 'কি হলো রুবী?' কোন উত্তর পায় না। দেখে, রুবীর মুখে কষ্টের রেখা ফুটে উঠেছে এবং এক সময় তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে আবার স্বাভাবিক ঘুমন্ত রুবীর আদল ফিরে আসে। তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ায় দোলা তার বোনের চুলে এবং মুখে সর্বোপরি তার সমস্ত শরীর থেকে বয়ঃসন্ধির বিচিত্র গন্ধ পায়।
পাশের ঘরে বড় ভাই-ভাবী শুয়ে আছে। ছোট ভাই বাজারে ওষুধের দোকানে। মা-বাবা সবাই শুয়ে আছে। হয়তো বা ঘুমিয়েছে। কোন শব্দ নেই। বাইরে নিঃশব্দ শিশিরপাত, ভিজে ভিজে নরোম জ্যোৎস্না। সে রুবীর গায়ে ভালো ক'রে চাদরটা ঢাকা দিয়ে নিজের বালিশে ফিরে চাদরের নীচে অনুভব করে শোবার সময় রোজকার মতো আজ ব্রেসিয়ার খুলে শোয়নি। তখন শুয়ে শুয়েই পিঠ উঁচু ক'রে পেছনে হাত চালিয়ে ব্লাউজের বোতাম খোলে, ব্রেসিয়ারের হুক খোলে, দু' কাঁধের ওপর দিয়ে নেমে আসা ফিতে খোলে এবং অবশেষে ব্রেসিয়ারটা টেনে বার ক'রে নাকের কাছে এনে অকারণে নিঃশ্বাস নেয়, অতঃপর বালিশের নীচে রেখে দিয়ে ব্লাউজের বোতাম লাগায়। তখন হঠাৎ সেই দুপুর ফুরিয়ে আসা বেলা আর মাথাভর্তি এলোমেলো নরোম চুল, ফরসা-কিঞ্চিত ক্লান্ত মুখাবয়ব, একজোড়া অন্যমনস্ক চোখের সেই বাইশ-তেইশ বছরের পল্টু নামের যুবকটির কথা মনে পড়ে: 'জানো, আজ নদীর ধারে গিয়েছিলাম। সেই যেখানে একটা প্রকাণ্ড বটগাছ আছে। বটগাছের পাশ দিয়ে শাদা ধুলো- ঢাকা আঁকাবাঁকা রাস্তা। মাঝে মাঝে গরুর গাড়ী আসে যায়। আশপাশে কোন বাড়ীঘর, দোকানপাট নেই। নদীর অপর পারে ফসলের ক্ষেতে রোদ পড়েছে। পানি সরে গেছে অনেক দূরে, এ পারে চড়ার বালির ওপর একজোড়া চখাচখী।' ছেলেটা যেনো সেই চুন-খসে-পড়া দেওয়াল-ঘেরা ঠাণ্ডা ঘরে ব'সে ব'সে আপন মনে সেই ছবি দেখতে পাচ্ছিলো। তার চোখ মেয়েটিকে নয়, জানলার বাইরে দিয়ে সেই দৃশ্যের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। দোলা নামের মেয়েটি দেখে ছেলেটির মুখে সেই রৌদ্রস্নাত ধানক্ষেতের নিবিড় ছায়া এসে পড়ছে যেনো। মেয়েটি সেই ছায়া থেকে চোখ সরায় না, ছেলেটি এবার দোলার মুখের দিকে সরাসরি চেয়ে বলে-'জানো, চখাচখী সম্বন্ধে একটা কাব্যশ্রুতি আছে-- তারা সারাদিন খুব কাছাকাছি থাকে, পাশাপাশি, দিন শেষ হ'য়ে রাত নামলে একজন অপরজনকে আর দেখতে পায় না। সারা রাত পরস্পর পরস্পরকে ডেকে ডেকে ফেরে; কিন্তু কেউ কাউকে কাছে পায় না। এমনি সারারাত।'
এখন এই জ্যোৎস্নালোকিত রাতে দোলা নামের মেয়েটির সেই সব কথা মনে হতে থাকলে সে পাশ ফিরে বালিশের ওপর মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। বুকের ভেতর থেকে হু হু শব্দে কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চায়। অবশেষে সত্যি সত্যি ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে মেয়েটি।
ছেলেটি তমাল, যমুনা, কদম্ব এবং আদিগন্ত বিস্তৃত গোঠের স্মৃতি নিয়ে বাড়ী ফিরলো দুপুরে। খালা তাকে অনুযোগের স্বরে বলে, 'হ্যাঁরে, তোর খাবার কথাও মনে থাকে না? কখন সেই সক্কালে বেরিয়েছিস, আর এখন এই দুপুরে ফিরছিস, কি ছেলে বাপু, কিচছু বুঝি না।'
সে কোন উত্তর দেয় না।
সারা দুপুর রেডিওর গান শুনলো শুয়ে শুয়ে, জানলার বাইরে গাছপালা দেখলো, চৌকা স্লেটের মতো আকাশ দেখলো। দুপদাপ শব্দ করে ছাদে উঠলো রিনি, নেবে গেলো, চুপচাপ পড়ে পড়ে শুনলো সে। তারপর রেডিওর গান শেষ হয়ে গেলে আবহাওয়ার কথা বলে অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করলে রেডিওর ভেতর কিছুক্ষণ ঘট ঘট আওয়াজ হতে থাকলে নব ঘুরিয়ে সে রেডিও বন্ধ ক'রে দেয়। আর তখন মেয়েটির কথা মনে প'ড়ে যায়। পায়ের কাছে তক্তপোশের কোণের জায়গাটায় চোখ যায় তার, মেয়েটা এসে ওইখানটায় বসে। আজ জায়গাটা ফাঁকা। তখন সকালের কথা মনে আসে। সকালে পুকুর পাড়ের রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েছিলো সে। তখন দরজার ফাঁকে এক ঝলক দেখা গিয়েছিলো মেয়েটিকে। তাকে দেখে মেয়েটি চকিতে সরে গেলো। তার অমন করে সরে যাওয়ার কোন মানে বোঝেনি সে। মুখটা কেমন গম্ভীর, হাসিহীন, কিংবা না হাসলেও মানুষের মুখের রেখায় যেমন স্বাভাবিক শৈথিল্য থাকে তেমন নয়, অন্য রকম। অবশ্য সে মুহূর্তে এতোসব ভাবেনি। তাকে দেখে দ্রুত সরে যাওয়াটাই বেমানান ঠেকেছে তার। ভাবনাগুলো এসেছে পরে।
দীর্ঘ সাত বছর পর সে তার খালার বাড়ী বেড়াতে এসেছে। সাতবছর আগে খালার সেজো মেয়ের বিয়েতে যখন সে এসেছিলো রিনি তখন ছোট্ট, বছর চারেক বয়েস। ওর আগে দুই মেয়ে হ'য়ে মারা গেছে। খালার দুঃখ একটা ছেলে নেই, সমবয়সী খালাতো বোন ডলির যখন বিয়ে হয় খালা দুঃখ করে বলেছিলো, 'কি কপাল নিয়ে যে দুনিয়ায় আসা আমার, খালি মাটির ঢিবিকে সাজিয়ে গুছিয়ে পরের হাতে তুলে দেওয়া'। তারপর কতো সময় কেটে গেলো, এতোদিন পর আবার সেই পুরনো জায়গায় এসে পল্টু সবকিছু খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে, কোথাও কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা। এবং অবাক হয়ে যাচ্ছে যে, এতোদিন পরও তেমন চোখে পড়ার মতো কোন পরিবর্তন হয়নি জায়গাটার। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় রেল লাইন টপকে বাজারে এলে সে মন্দিরার শব্দ এবং অত্যন্ত মিহি মিষ্টি কিন্তু চড়া সুরে গান শুনতে পেলে দ্রুত এগোতে থাকে এবং বাজারের মধ্যে এসে দেখতে পায়, ধূতি ফতুয়া পরা, গলায় কণ্ঠি, এক শীর্ণকায় প্রৌঢ় হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে স্যাকরার দোকানের সামনের রকে। তার পাশে তিরিশ-বত্রিশ বছর বয়সের আঁটসাট শরীরের শাদা কাপড় পরা, গলায় কণ্ঠি, কপালে রসকলি আঁকা মহিলা মন্দিরা বাজিয়ে কীর্তন গাইছে-'মরিলে ঝুলাইয়া রেখো তমালেরো ডালে-এ-এ....।' দাঁড়িয়ে পড়ে সে। বাজারের বেচা কেনা, মানুষজনের ব্যস্ততা, কলরব, ময়রার দোকানের সামনে কুকুর ঘুর ঘুর করছে,একটা কমলা শাদায় মেশানো রঙের গরু শাল পাতার শুকনো ঠোঙা চিবুতে চিবুতে আপন মনে চলে যাচ্ছে। সব ছাপিয়ে বৈষ্ণবীর কীর্তন, মন্দিরা, আর হারমোনিয়ামের ছন্দিত ঝংকার তাকে আবিষ্ট ক'রে দেয়, এবং তার মতোই আরো নানান বয়সী বেশ কিছু মানুষের ছোটখাটো ভিড় জমে উঠেছে সেখানে। পল্টু বৈষ্ণবী মহিলার মুখের দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিলো না। ছোট্ট টিকোলো নাকের ওপর থেকে কপাল পর্যন্ত রসকলি আঁকা, এলো চুলের রাশ কাঁধ ছাপিয়ে নেবে গেছে পেছনদিকে, সুষমামণ্ডিত মুখ, সব ছাড়িয়ে দু'টি চোখ, ঘন পল্লবের আড়ালে যেনো দু'টি গভীর কালো দীঘি থির হয়ে আছে। সেই গান, সেই চোখের মধ্যে দিয়ে সে যেনো কোন এক সুদূর শূন্যতার ভেতর চলে যেতে থাকে। চারপাশের জীবন এবং পরিবেশ ছাপিয়ে সে যেনো আরো কিছু দেখতে পাচ্ছিলো, অনুভব করছিলো।
গতকাল রাতে জ্যোৎস্না ছিলো, অনেকক্ষণ ধ'রে সেই জ্যোৎস্নার ভেতর দিয়ে একটা মালগাড়ী যাচ্ছিলো ককিয়ে ককিয়ে। দক্ষিণ জলার ফসলভরা মাঠ, গোরস্থান, ঝিম ধরে থাকা শিশির ভেজা বাগান পেরিয়ে সেই শব্দ আসছিলো, সেই নিথর-নিবিড় নির্জনতার ভেতর মালগাড়ী যাওয়ার একঘেয়ে ক্লান্ত শব্দটা শুনতে শুনতে তার মৃত্যুর কথা মনে আসে। আর তখন অদ্ভুত এক বিষণ্নতার মধ্যে মুখ, চোখ, মাথাভর্তি পিঠ এলোনো কালো একরাশ চুল, খয়েরী রঙের শাড়িপরা সর্ব-অবয়ব নিয়ে মেয়েটির ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন ছেলেটি দেখে তার বিছানার ওপর পাখির পালকের মতো নরোম নীল নীল জ্যোৎস্না; সে উঠে বসে, মেয়েটি এলে তক্তপোশের কোণে যেখানটায় বসে সেখানে ফলসা গাছের একটা বড় পাতার ছায়া নিয়ে থির থির করে জ্যোৎস্না কাঁপছে। সে আস্তে আস্তে হাত বুলোতে থাকে জায়গাটায়। তারপর সারারাত ঘুম হয়নি। কখনো মৃত্যুর কথা, কখনো গাছপালা আকাশ প্রকৃতি নিয়ে চারপাশের নির্জন চরাচর, শৈশবের ভাঙা ভাঙা ছবি আর মেয়েটির কথা বার বার মনে এসেছে ঘুরে ফিরে। এইসব ভাবতে ভাবতে রিনি এসে গেলো, 'বাব্বা' বিকেল হয়ে গেছে, এখনো শুয়ে আছে। চলো চা হয়ে গেছে।'
বিকেলটা কত দ্রুত মরে যাচ্ছে। ধান ক্ষেত, জলা, রেল লাইন, রেল লাইনের ওপারে নীলচে ধূসর গাছাপালার ভঙ্গিল রেখার ওপর ঝুঁকে পড়া আকাশ, শেষ সূর্যের আলো মেখে মালার মতো শাদা বকের সারি ফিরে চলেছে।
সে তখন মাঠের বড় আলটার ওপর পুরনো উপড়ে পড়ে থাকা খেজুর গাছের পাশে ব’সে এই দৃশ্যাবলী দেখছিলো। ট্রেনের হুইসিল শোনা যাচ্ছে, যেনো বহু দূর থেকে কেউ কাউকে ডাকছে। কানপেতে শব্দটা শুনতে গিয়ে চমকে উঠলো, মনে হলো, অবিকল মানুষের গলায় কে যেনো ডাকছে, 'পল্টু উ.... উ...।' এবং সে-ও অজান্তে হঠাৎ বলে ওঠে, 'যা...ই।' তারপর সচেতন হ'য়ে গিয়ে দেখলো ধান ক্ষেত, রেললাইন, রেলালাইনের খাদ, সবকিছুর ওপর থেকে আলো ক্রমে সরে যাচ্ছে, যেনো বারান্দার রেলিঙের ওপর থেকে মেলে দেওয়ার শাদা একখানা শাড়ী টেনে নিচ্ছে কেউ।
সন্ধ্যা নামছে। কিন্তু ছেলেটা উঠলো না। থেমে থেমে হাওয়া আসছে কোথাও থেকে। নুয়ে পড়া বাসন্তী রঙের ধানগাছ ছুঁয়ে ছুঁয়ে সেই হাওয়া চলে যায় আর সন্ধ্যা নামতে থাকে। সামনের দিকে চেয়ে থাকলে মনে হয় যেনো ডানা মেলে শকুনের মতো ঝপ ঝপ অন্ধকার নামছে পারপাশে। ছেলেটা ওঠে না। ঠায় বসে বসে সেই অন্ধকার দেখতে থাকে, আর ট্রেনের অপেক্ষা করে; ছেলেবেলায় সে রেল গাড়ীকে ভয় করতো, মা-বাবার সঙ্গে মামাদের বাড়ী বেড়াতে যাবার জন্যে স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষা করতে হতো। এক সময় ট্রেন ছুটে আসার ঝক ঝক শব্দ শোনা গেলে তার বুকের ভেতর গুরগুর ক'রে উঠতো, ছুটে আসা ট্রেনের ইঞ্জিনের সামনের অংশটাকে মনে হতো অত্যন্ত গম্ভীর, কঠোর রাগী একটা বীভৎস মুখ ভয় দেখাতে দেখাতে তেড়ে আসছে। বাবা কিংবা মা দু'হাতে তার কান চেপে ধ'রে নিজের বুকের ওপর তার মুখ ফিরিয়ে রাখতো। ভয় লাগতো, কিন্তু দেখার জন্যে আবার একটা অস্থির, চাপা উত্তেজনাময় কৌতূহল থরথর করে কাঁপতো ভেতরে ভেতরে।
এখন এই ক্রমাগত অন্ধকার হয়ে আসতে-থাকা নির্জন মাঠে একাকী ট্রেনের অপেক্ষায় বসে বসে শৈশবের সেই সন্ত্রাস এবং কৌতূহলকে অনুভব করতে থাকে। কিন্তু ট্রেনের কোন সাড়া শব্দ পাওয়া যায় না। বাতাসের উল্টো দিকে কান পাতে সে, আশৈশব পরিচিত সেই ঝক ঝক শব্দটি শুনতে চায়, বদলে কেবল হাওয়া আর ধান গাছের সর সর আওয়াজ হতে থাকে।
সে চোখ তুলে রেললাইনের দিকে তাকালে সমতল থেকে কালো আবছা একটা চওড়া প্রলম্বিত রেখা ছাড়া আর কিছু বোঝা যায় না এবং সেদিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতে গিয়ে কয়েক হাত দূরের সরু আলটার ওপর তার চোখ আটকে যায়, দেখে আলের ওপর দিয়ে লম্বা সচল একটা কিছু চলে যাচ্ছে। সহজাত বোধ দিয়ে বোঝে সাপ। মাত্র কয়েক হাত দূর দিয়ে একটা সাপ চলে যাচ্ছে। সে দ্রুত চারপাশে তাকায় এবং দাঁড়িয়ে পড়ে, সাপটা এঁকে বেঁকে আলের ওপর নুয়ে পড়া ধান গাছের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়। তার শীত অনুভূত হতে থাকে। চারপাশে ধান গাছের সরসর শব্দ এবং নির্জন অন্ধকার তাকে বিপন্ন করে তোলে। সামনের দিকে তাকিয়ে ক্রমাগত পেছন হাঁটতে থাকে। কিন্তু বড় আল ছেড়ে সংকীর্ণ অমসৃণ আলের ওপর পেছন হেঁটে যাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য। কাজেই আল থেকে কেবলই ধান ক্ষেতে পা ফসকে যায়। আবার মুখ ফেরাতেও পারছে না, কেননা আততায়ী সাপ গুটি গুটি তার পেছন নিতে পারে এই আশঙ্কা কেবলই ফণা তোলে। এমনি অবস্থা কিছুক্ষণ চলতে থাকলে এক সময় পায়ে অত্যন্ত নরোম আর ঠাণ্ডা কিছুর মৃদু স্পর্শ পায়, তার শরীর বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত চমকে ওঠে এবং এক সময় দেখে সে ক্রমাগত ছুটছে, হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে, হৃৎপিণ্ডের ধক ধক শব্দ নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটতে থাকে এবং অবশেষে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনে, হ্যাট হ্যাট-দেখে গরুর গাড়ী যাচ্ছে, গাড়ীর নীচে দোদুল্যমান হারিকেন জ্বলছে।
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ীর দিকে এগোতে এগোতে এতোক্ষণ পর পায়ের গোড়ালীতে কাদার মত ভিজে কিছু লেপ্টে আছে বলে মনে হয় তার, সে সোজা বাড়ী এসে রকের ওপর রাখা বালতির কাছে গিয়ে বলে, 'রিনি' হারিকেনটা আনতো। খালা বলে, ‘কোথা গেসলি’? সে কোন উত্তর দেয় না, রিনি হারিকেন আনলে দেখে গোড়ালীর কাছে গোবর লেগে আছে। পা ধুতে ধুতে মনে মনে একটু হাসে। কাউকে কিছু বলে না ।
খালা, রিনি ঘুমিয়েছে। এ ঘরে বিছানার চারপাশে ভালো ক'রে মশারি গুঁজে দিয়ে আলো জ্বালিয়ে সে শুয়ে আছে একা। ঘুম আসছে না। বার বার সাপটার কথা মনে আসছে, সেই লম্বা সচল অস্তিত্বটা তাকে ঘুমুতে দিচ্ছে না। বার বার মনে হচ্ছে তার চারপাশে এই যে চুন খসে পড়া, ইট বের হ'য়ে থাকা এবড়োথেবড়ো দেওয়াল, এর ফাঁক ফোকরে যে অমন দু-একটা কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে নেই তাই বা কি করে বলবো। ভাবতে ভাবতে মশরীর ভেতর থেকে চোখ মেলে ভয়ে ভয়ে চারপাশে চেয়ে দেখে, দেখে বিছানার ভেতর গুঁজে দেওয়া মশারীর কোথাও ফাঁক আছে কিনা। বুকের ভেতর আতঙ্ক চরে বেড়ায় এবং অসহায় সে একা শুয়ে থাকে। ঘুম আসে না ।
বাইরে জ্যোৎস্না উঠেছে কি না, উঠে থাকলে সেই জ্যোৎস্না জানলার ও পাশের লাউ মাচা কিংবা ফলসা, কাঁঠাল, নোনা এবং অন্যান্য গাছগাছালির ওপর কেমন মাখামাখি হয়ে রয়েছে। এসব দেখতে পায় না সে, কেননা জানলা বন্ধ রেখেছে। শুয়ে শুয়ে দোলার কথা, ট্রেনের হুইসিল, অবিকল মানুষের গলার ডাক, উত্তর দেওয়া এবং কোন, ট্রেন না আসা এবং সাপ-চিন্তাগুলো তাকে ক্রমে ক্লান্ত করে ফেলতে থাকে, সে সেই অতল ক্লান্তির মধ্যে ডুবতে থাকে-এবং ডুবে যায় অতঃপর।
মাঠের মাঝখানে কেউ নেই, সে পোড়ো বাড়ীটার ধারে বকুল গাছের নীচে বসেছিলো একা। সামনের পুকুরে বিকেলের সোনালী রোদের আভায় আকাশের নীলচে শাদা ছায়া পড়ছে। মাঝে মাঝে হালকা দমকা হাওয়ায় পুকুরের পানি শিরশিরিয়ে উঠতে থাকলে আকাশ এবং গাছপালা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে ভেঙে ভেঙে পড়ছিলো। আর তখন দ্রুত ছুটে আসতে থাকা পায়ের শব্দ এবং আতঙ্কিত অস্ফুট আর্তনাদ সচকিত ক'রে তোলে তাকে। সে চোখ তুলে অবাক হয়ে দেখে মাঠের আল ছেড়ে ধানক্ষেত মাড়িয়ে দোলা ছুটে আসছে উর্ধ্বশ্বাসে। দ্রুত উঠে দাঁড়ায় সে এবং সামনে এগিয়ে যেতে থাকে, দোলা তাকে দেখতে পেয়ে তাঁর দিকে ছুটে আসতে থাকে।
তখন ঘুম ভেঙে যায়। দেখে মশারির ভেতর সে শুয়ে। ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে। ধকধক করতে থাকে বুকের ভেতর। এবং সে সটান শুয়ে থাকে তেমনি চিৎ হ'য়ে। মশারির চালের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে। স্বপ্নটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে মনে মনে: আচ্ছা, সে না হয় মাঠের ওখানে বকুলগাছের নীচে বসে থাকলো; কিন্তু দোলা কোথেকে এলো। তা-ও আবার অমন আতঙ্কিত হয়ে ছুটতে ছুটতে? কি দেখেছিলো সে, কেনো ভয় পেলো? এইসব জটিল ভাবনাগুলো তাকে ভাবাতে থাকলে এক সময় শাঁ করে সন্ধ্যার মুখে মাঠে দেখা সাপটার কথা মনে পড়ে। দোলা কি সাপ দেখে ছিল? সাপটার কথা মনে আসতেই আবার একটু ভয় ভয় করতে থাকে। মশারির ভেতর থেকে আবার চারপাশে দেখে নেয়। তারপর আবার চারপাশে দেখে নেয়। না ভেঙে গেলে স্বপ্নটার পরের পর্যায় কি হতো। ভাবতে ভাবতে কেমন রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে এবং দোলা মেয়েটার জন্যে একটু একটু মায়া অনুভব করতে থাকে। আজ বাইশ দিনের পরিচয়ের বিভিন্ন মুহূর্তেগুলো সে উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত অসুখে আক্রান্ত হয়। সারারাত ঘুম এলো না, সেই অসুখে পড়ে থাকলো বুঁদ হয়ে।
ব্লাউজের বোতাম আটকাচ্ছিলো দোলা ঘরের ভেতর বসে বসে। মা তাকে বারবার ডাকলেও কোন সাড়া দিলো না। অবশেষে অত্যন্ত ঝাঁঝালো স্বরে প্রায় চিৎকার ক'রে নাম ধ'রে ডাকতেই সে অভিমান আর প্রায় কান্না মেশানো স্বরে চেঁচিয়ে উঠলো ঘরের ভেতর থেকে, 'কি দরকার? আমি কিচ্ছু পারবো না।' শেষ কথা ক'টিতে গলা যেনো ডুবে আসতে চায়। মা তখন তেমনি ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, ‘কেন, কি তোমার এমন কাজ পড়ে গেছে, সারাদিন তো সংসারের একটা কুটো নাড়ো না, খালি গল্পের বই পড়বা আর এ বাড়ী ও বাড়ী আড্ডা দিয়ে বেড়ানো, ধিঙ্গি মেয়ের লজ্জা শরম নেই, আসুক তোর বাপ.....’
এসব ঘটছে সকাল বেলা, যখন বড় ভাই চলে গেছে অফিসে, বাবা বেরিয়েছে খবরের কাগজ পড়তে, রুবী বারান্দার রকে বসে পড়া মুখস্থ করছে, ছোট ভাই ওষুধের দোকানে; তখনকার কথা। এখন দুপুরের খাওয়ার পাট চুকিয়ে সবাই অবসর নিয়েছে। রুবী স্কুলে। বড় ভাই আসবে সেই সন্ধ্যা উৎরে গেলে। ছোট ভাই দোকানেই থাকে। দুপুরে একবার খেতে আসে। সন্ধ্যা রাতে একবার দোকান বন্ধ করে বাড়ী থেকে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আবার দোকানে চলে যায়। আগে সে, রুবী, ছোট ভাই এ ঘরেই শুতো। সেবার দোকানে চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে ছোট ভাই রাতে দোকানেই থাকে। কাজেই সে আর রুবী। এখন রুবী স্কুলে এবং সে একা শুয়ে আছে। বাবা-মা হয়তো ঘুমিয়েছে, ভাবীও হয়তো। বাইরের দুনিয়াটা দুপুর বেলার নির্জন রোদে কেমন ঝিম ধরে আছে। ভাবীটা আজকাল কেমন যেন হয়ে গেছে, সারাদিন কাজ করে, তার দিকে দূর থেকে কেমন করে যেন তাকায়, কি যেন বুঝতে চায়।
মার সকালবেলার কথাগুলো মনে এলো। ইঙ্গিতটা যেনো বড় বেশী স্পষ্ট। শুয়ে শুয়ে সে এইসব ভাবতে থাকে, জানলার বাইরের দুপুরটা ক্রমে শেষ হয়ে আসছে, আর তার ভেতর একটা অস্বস্তি, অস্থিরতা, দ্বিধা, অভিমান, কষ্ট, মায়া সবকিছু মিলিয়ে কেবল কান্না পেতে থাকে ।
গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে, জণ্ডিস রোগীর মতো ফ্যাকাশে, ক্রমাগত নিঃশেষিত হয়ে আসতে থাকা বনতুলসী, চিচ্চিড়ে, আশ শ্যাওড়া বন আর পিঙ্গল ঘাসের গায়ে লেপ্টে থাকা প্রায় ফুরিয়ে আসা দুপুর কেমন থমকে আছে,
গাছের পাতা নড়ে না, তামাটে রঙের উপুড় হয়ে থাকা বিশাল সরার মতো আকাশের নীচে শেষ অক্টোবরের পৃথিবীটা চুপ করে আছে।
চারপাশের সেই ঠাণ্ডা, শুকনো পারিপার্শ্বিকের ভেতর ঘাস, মাটি, গাছপালা এবং রোদের সম্মিলিত গন্ধে সে হাঁটতে থাকে। ছোট্ট ছাতিম গাছের পাশে একাকী বাঁশ ঝাড়ের নীচে বাঁশ এবং তার পাতার ফাঁক দিয়ে রি রি করে আসতে থাকা সূর্যরশ্মি এসে পড়ছে চারপাশে ছড়ানো শুকনো বাঁশ পাতার ওপর, আর সেই এলোমেলো ছড়ানো পাতার ফাঁকে একটা মরা, শুকিয়ে আমসি হয়ে যাওয়া ব্যাঙকে চার পা তুলে পড়ে থাকতে দেখে যে থমকে দাঁড়ায়, মরা শুকনো খটখটে কালচে হয়ে যাওয়া ব্যাঙের সর্ব অবয়বে সূর্যের আলো পড়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মৃত ব্যাঙটির সেই ভঙ্গির মধ্যে নিরুপায় একটা আকুল বাসনা স্থির হয়ে আছে ভাবতে গিয়ে চারপাশের মগ্ন চরাচরের মতো ভীষণ বিষন্ন হয়ে যায় সে।
তখন অদূরে গুঁড়ি বাঁকানো নারকেল গাছের গোড়ায় চিড়িক চিড়িক শব্দে কাঠবেড়ালীর আওয়াজ ওঠে, কাঠবেড়ালীটাকে দেখা যায় না, শুধু একবার তার পুচ্ছের ধূসর ফোলানো লোমের খানিকটা অংশ সুর্যালোকে ঝিকিয়ে উঠে অদৃশ্য হয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে সে দেবদারু গাছের মতো এক সার আম গাছ ডান দিকে রেখে বাঁক নিলে আনারস, আর বাসক বনের পাশে সরু পথটার নীচে জলহীন, মাটি ফেটে যাওয়া শুকনো ডোবার ধারে এসে পড়ে, ডোবার অপর পাড়ে গোরস্থানের সরু প্রলম্বিত পাঁচিল বরাবর পূর্ব-পশ্চিমে চলে গেছে, পাঁচিলের গায়ে কালচে রঙের শ্যাওলা পড়া দাগ, সেই নীচু পাঁচিল আর গোরস্থানের ওপারে ফসল ভরা মাঠ, তারপর খাদ, খাদের পর রেল লাইন, পল্টু সেই আনারস আর বাসক বনের পাশে দাঁড়িয়ে রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে থাকে, কান পাতে কোন ট্রেন আসার শব্দ হচ্ছে কিনা, দেখে লি লি করতে থাকা রেল লাইন ঝকমক করছে। তার ওপারে নীলচে ধূসর স্থির নিসর্গরেখা এবং ঝুঁকে থাকা আকাশ; আর তখন হিস-স শব্দ হয় এবং পায়ের ওপর হাওয়া এবং চিড়িক্ ক'রে ওঠা জ্বালা অনুভব করলে সে চোখ ফিরিয়েই দেখতে পায় শরীরের অর্ধাংশ তুলে বিশাল ফণা নিয়ে দুলছে তার সামনে, মুখের ভেতর থেকে সরু সুতোর মতো জিভ খুব দ্রুত আসা যাওয়া করছে, দুর্বোধ্য উল্কিকাটা ম্যাটমেটে শরীরের ওপর সূর্যের আলোয় অপূর্ব বিভা চমকাচ্ছে, পল্টু নড়তে পারলো না, নিজের পায়ের দিকে তাকাতে পারলো না, তার দৃষ্টিসীমার মধ্যে কেবল আল্পনা আঁকা কুলোর মতো বিশাল ফণা, প্রায় ঘিয়ে রঙের চকচকে গলা, পেট, কুণ্ডলী পাকানো ম্যাটমেটে রঙের নিম্নাংশ, প্রসারিত ফণা এবং ঠোঁটের ওপর সূর্যালোকের বিকীর্ণ হীরক দ্যুতি নিয়ে দোদুল্যমান সেই অহংকারী রাজকীয় ভঙ্গি তাকে সম্মোহিত করে ফেলে।
অতঃপর পল্টু নামের সেই বাইশ-তেইশ বছরের ছেলেটিকে নিতান্তই অকাট নির্বোধ মনে করে কিংবা 'কাজটা বোধহয় ভালো করলাম না’, ভাবতে ভাবতে তাকে সেখানে দাঁড় করিয়ে রেখে ফনা গুটিয়ে ডোবার ঢালু পাড় বেয়ে দ্রুত নেমে চলে গেলো ওপারে পাঁচিলের গায়ের কাছে জড়াজড়ি ক’রে থাকা বন- পালার ভেতর।
আলো ক্রমে সরে যাচ্ছে, চারপাশে ভিড় ক'রে থাকা অসংখ্য মানুষ, বিভিন্ন কণ্ঠের অবিরাম বিলাপধ্বনি, হাঁটুর ওপর উরুর মাঝ বরাবর শক্ত বাঁধনটা অসহ্য টনটন করছে, একটি শাদা শশ্রুমণ্ডিত মুখ নড়ছে তক্তপোষের ওপর থেকে তার ঝুলিয়ে রাখা পায়ের গোড়ায়, আর থেকে থেকে গামছার আঘাত করছে সেখানে, তেতো তেতো মুখে প্রবল তৃষ্ণার ভেতর তার কেবলই ঘুম আসতে থাকে। আর কে একজন তাকে ধ'রে জোর ক'রে বসিয়ে রাখছে, আর কান্না মেশানো, 'আমি ওর মাকে কি জবাব দোবো গো, আল্লা এ তুমি কি করলে মাবুদ' – শুনতে পায় এবং ঘুমে সমস্ত শরীর ভেঙে আসতে চায় তার। তাকে জড়িয়ে ধরে থাকা মানুষটার কাঁধে সে মাথা রাখলে দেখতে পায় ফসল ভরা মাঠের ওপর থেকে আলো সরে যাচ্ছে ক্রমে, ককিয়ে ককিয়ে বিশাল এক মালগাড়ী পার হয়ে যাচ্ছে। কোথা থেকে যেনো তরঙ্গায়িত সম্বোধন ধ্বনিত হয় 'পল্টু-উ’–,আর সে 'যা- ই' – বলতে গিয়েও থমকে গিয়ে দেখে, তার সামনে একটা খয়েরী রঙের শাড়ী জড়ানো শরীর, একটা ঝুঁকে পড়া শ্যামলা মুখ, পাতলা ঠোঁট থির থির কাঁপছে বাতাসে স্পন্দিত পাতার মতো।
ঘন পল্লবের আড়ালে পাড় ওপচানো টলমলে জল নিয়ে গভীর কালো দীঘির মতো, এক জোড়া চোখ, অতল নির্জনতার ভেতর ডুবে যেতে যেতে পল্টু নামের বাইশ-তেইশ বছরের ছেলেটা তখন শুনতে পেলো কোথায় যেনো মন্দিরা বাজছে।


0 মন্তব্যসমূহ