উপল মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস: আলমগীর



পর্ব: ৫

শাহাজাদা শাহরিয়ার বড়োসড়ো ফৌজ নিয়ে কান্দাহারে গেছেন পারস্যের সাফাভিদ সম্রাট শাহ আব্বাসের আক্রমণ রুখতে।তাঁর সঙ্গে খান ই আব্দুল জাহান লোদি সহ গুরুত্বপূর্ণ সেপাইসালাররা রয়েছেন। এখন,অনভিজ্ঞ, নেহাতই নাদান শাহরিয়ার প্রবল তুষারপাতের মধ্যে কান্দাহারের দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় কতটা এগোতে পেরেছিলেন সেটা পরিষ্কার নয়। আসল নেতৃত্ব বিখ্যাত সেপাইসালার খান ই আব্দুল জাহান লোদিরই দেওয়ার কথা , বাস্তব পরিস্থিতিও তার সাক্ষ্যই দিচ্ছে। শাজাহানও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছিলেন। তিনি বুরহানপুর কেল্লায় কিছু সৈন্য রেখে খান্দেশ অঞ্চলে সরে এলেন সেপাই লস্কর নিয়ে। সম্ভবত মান্ডুর কেল্লাতেই মুমতাজ মহল তাঁর সঙ্গে ছিলেন , বাচ্চাকাচ্চারাও। মালিক অম্বরের সঙ্গে তাঁর কি কোন অলিখিত যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হয় ? এর সম্ভবনা কিন্তু প্রবল কারণ মুঘল সাম্রাজ্যের পলিসি অনুযায়ী বুরহানপুরের সেনা সমাবেশ কমানোর কথা নয় , মালিক অম্বরই বা বুরহানপুর দখলের এই সুযোগ ছেড়ে দিচ্ছেন কেন ? হয়ত মোঘল রাজপরিবারের মধ্যে লড়াইয়ের সুযোগে উনি রণকৌশলগত মূল্যবান সময় সওদা করছিলেন। একই উদ্দেশ্য শাজাহানের থাকাটাও স্বাভাবিক।কান্দাহার যুদ্ধের জন্য যে রাজনৈতিক ও সামরিক শূন্যতা তৈরি হয় তার সুযোগে তখতের সন্ধানে ষোলোশো বাইশের শেষের দিকে শাহাজাদার সৈন্যরা আগ্রার দিকে রওনা দিচ্ছে,উদ্দেশ্য শাহী খাজনা দখল। নূর জাহানের ক্ষমতায়নের বিপক্ষে সেসময়ের সবচেয়ে বড় সেপাইসালার মহবত খানের মতের সঙ্গে একমত ছিলেন শাজাহান, মোঘল দরবারের অনেকেই এই সব দরবারি ফিসফাসে সায় দিতেন। এই লড়াইটাকে তখতের আসলি জংয়ে রূপান্তরের সময় দেখা যাচ্ছে শাজাহান এক দিকে আর অন্যদিকে মোঘল শাহী তাকতের প্রধান রূপক হয়ে দাঁড়িয়েছেন সেপাইসালার মহবত খান। এর পুরোটাই বাদশাহের সায় নিয়ে নূর জাহানের কৃতিত্ব, যেটা শাজাহান বুঝতে পারেননি। মোঘল দরবারের রাজনীতিতে ইরানি আর তুরানি একটা চাপা লড়াই ছিলই । নূর জাহান আর তার পরিবার ছিল ইরানি বা স্থানিক নামে খোরাসানি। তুরানি , উত্তর আফগানি মহবত খানের সঙ্গে যে এত তাড়াতাড়ি বোঝাপড়া সেরে ফেলবেন নূর জাহান হয়ত তা ঠিক আন্দাজ করতে পারেননি শাজাহান। বিদ্বেষ মোহে জাহাঙ্গীরের প্রভাব যে এখনো কতটা কাজের সে অনুমানেও তাঁর ভুল হয়ে যেতে পারে।
ফতেপুর সিক্রিতে পৌঁছে শাহজাদার ফৌজ দেখল দরজা বন্ধ আর তা যে শাহী ফৌজের আগাম তৎপরতা এতো বোঝাই যায়। সে দরজা আর খুলল না দেখে শাজাহান মেওয়ার আর কাংড়া অভিযানে পরীক্ষিত তাঁর বিশ্বস্ত সেপাইসালার সুন্দর দাসকে আগ্রায় ঢুকে তোষাখানার টাকাপয়সা, ধনরাশি বাজেয়াপ্ত করতে বললেন । তৈরি ছিল শাহী ফৌজ, তাদের দাপটের সামনে সুন্দর দাসের সেনারা এঁটে উঠল না। তাড়া খেয়ে শাজাহান আর তাঁর বাহিনী ফতেপুর সিক্রির বাইরে জড়ো হয়ে আবার আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেখে জাহাঙ্গীর বার্তা দিলেন- শাজাহান যেন দূত মারফত জানান যে কোন কোন শর্তে তিনি বিদ্রোহ ছাড়তে রাজি। দূত এসে এমন সব লম্বা চওড়া শর্ত জানাল যে জাহাঙ্গীর গেলেন ক্ষেপে । দূত বেচারাকে কয়েদ করা হল। শর্তাবলীর মধ্যে জাহাঙ্গীরের অবর্তমানে শাজাহানকেই তখতে বসানোর কথা যে খুল্লামখুল্লা বলাছিল তাই তো মনে হচ্ছে। না হলে বাদশাহ এত রেগে উঠবেন কেন ? বেগতিক দেখে শাজাহানের ফৌজ ফিরে এল খান্দেশে ।

আবার নতুন আক্রমণের প্রস্তুতি চালাতে থাকে দুপক্ষই, তবে এবার শাহী ফৌজ বেশি আগ্রাসী। মহবত খান পুরো অভিযানের দায়িত্বে, তবুও জাহাঙ্গীর নিজেই অসুস্থ শরীর সত্বেও মোর্চায় সামিল হচ্ছেন ষোলোশো তেইশের ফেব্রুয়ারিতে । উদ্দেশ্য সামনের সারিতে থেকে বাগী ছেলের বিরুদ্ধে ক্ষমতা প্রদর্শন। এই ক্ষমতা প্রদর্শনের কৌশলটা মোঘল যুদ্ধ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল। যার মধ্যে একটা হল : বেয়াড়া সীমান্তবর্তী রাজ্যে শিকারাভিযানের নাম করে বিশাল সৈন্যসমাবেশ করা, সেনাদের দক্ষতা প্রদর্শন , তোপ -বন্দুকের ভয়ানক আওয়াজ ও ক্ষমতার আস্ফালন আর সিংহ ,বাঘ , হাতি , হরিণ , বুনো মোষের ছোটাছুটি। । একে বলা হতো কুমারঘা। অনেকক্ষেত্রে তাতেই কাজ হয়ে যেত। অপরপক্ষ বিনা রক্তপাতেই এগিয়ে এসে বশ্যতা স্বীকার করত। দৈনন্দিন শিকার অভিযানও ক্ষমতা প্রদর্শনের অন্যতম অঙ্গ ছিল। আর জাহাঙ্গীর ছিলেন একান্তই শিকারপ্রেমী, মোঘল যুদ্ধ কৌশলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রণেতা, ভীতিপ্রদ ক্ষমতা দেখানোর ঘাঁতঘোঁত সব ভালোই বোঝেন, ফলও পেলেন হাতেনাতে। শাহী বাহিনী পৌঁছলো পাঞ্জাব সেখানে শাজাহানের অনেক সেপাইসালার , মনসবদারকে আবার জাহাঙ্গীরের শরণাগত হতে দেখা যাচ্ছে। কুমারঘা নীতির প্রবর্তক কে জানা যায় না , তবে আকবর মোঘল সাম্রাজ্যে এর প্রথম ব্যবহার করছেন এটা সুনিশ্চিত। এরই ব্যাবহার করলেন জাহাঙ্গীর। বশ্যতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পরাজয়ের গ্লানি তাই জাহাঙ্গীর ফিরে আসা সকলকেই উৎসাহ দিতে পদোন্নতি দিয়ে পুরষ্কৃত করছেন। এভাবে ষোলোশো তেইশের মার্চের শেষে দেখা যাচ্ছে বাদশাহ তাঁর ফৌজের সংখ্যা অনেকটা বাড়িয়ে নিয়ে পঁচিশ হাজারের মতো করে ফেলেছেন। আর টানতে পারছিলেন না জাহাঙ্গীর, শরীর আবার বিগড়োতে শুরু করায় মহবত খানেকে দায়িত্ব দিয়ে আগ্রায় ফিরে এলেন।

শাজাহান সেনা নিয়ে এগিয়ে এলেন দিল্লীর দিকে। দুই বাহিনী মুখোমুখি।মহবত বার্তা পাঠাচ্ছেন দাক্ষিণাত্যের শাহী ফৌজের দায়িত্বে ফিরে গেলে শাজাহানের আগের সব জায়গির ফিরিয়ে দেবেন বাদশাহ। শাহাজাদা না মুমকিন ! লড়াই বাঁধে। মহবতের সামনে দাঁড়াতে না পেরে শাজাহান আবার ফিরে যাচ্ছেন মান্ডুর কেল্লায়। মহবতের সঙ্গে কথা চালাতে চাইছেন তিনি ,পাত্তা না দিয়ে শাহী ফৌজ এগিয়ে আসছে। মান্ডু ছেড়ে আসিরগড় কেল্লায় সরে যেতে হচ্ছে শাজাহানকে সম্ভবত মুমতাজ আর ছেলেপিলেদেরও নিয়ে। ওই কেল্লার দায়িত্বেও নূর জাহানের এক আত্মীয়। কিন্তু কিল্লাদার না লড়েই শাজাহানকে ঢুকতে দিলেন। মহবত খান সেখানেও পৌঁছে যাচ্ছেন অচিরেই আর পালাচ্ছেন শাহাজাদা। জাহাঙ্গীর আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ রণকৌশলগত চাল চাললেন। তা হল খানিক আওয়ারা ও মদ্যপ ছেলে শাহাজাদা পারভেজকে শাজাহানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল করা। ইলাহাবাদের দুর্গের নিঃসঙ্গ জীবন থেকে পুনর্বাসিত হচ্ছেন পারভেজ। ষোলোশো তেইশের এপ্রিলে আজমির যাওয়ার পথে শাহী চলমান তাঁবুতে তাকে সাদরে বরণ করছেন বাদশাহ। ইতিমধ্যে সাফাভিদরা কান্দাহার দখল করে ফেলেছে, বাদশাহ শাহ আব্বাস নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন বিশাল বাহিনীর, ফলে মোঘল ফৌজ পেছিয়ে এসেছে।শাহজাদা শাহরিয়ারকে সামনে রেখে সেনা অভিযান ব্যর্থ হয়েছে ফলে ওই শাহজাদার গুরুত্ব গেছে কমে।জাহাঙ্গীর সামনে আনলেন পারভেজকে আর তাতে নূর জাহানের সায় ছিল নিশ্চিত। সে বছরই মে মাসে বাদশাহ পারভেজকে মহবত খানের ফৌজের সঙ্গে বিদ্রোহ দমনে যোগ দেওয়ার ফরমান জারি করলেন। জাহাঙ্গীর বাছাই করা সেপাইসালারদের শাহজাদার সঙ্গে পাঠাচ্ছেন। মহবত -পারভেজের যৌথ আক্রমণের মুখে পড়ছেন শাজাহান। ষোলোশো তেইশ জুড়ে মহবত খান - পারভেজের যৌথ আক্রমণের সামনে পড়তে হল শাজাহানকে , বেশ কিছু ছোটখাট জং হল প্রতিটায় শাহী ফৌজ জেতে আর বিদ্রোহীদের পালাতে হচ্ছে।

----- তারপর ?

----- কিসের তারপর ?

----- কী হল ?

----- কিসের ?

----- লড়াইয়ের ?

----- শুধু লড়াইয়ের খবর শুনবে ?

----- আর কী?

----- অনেক কিছু।

----- আর কী কী ? ----- জানবে না মুমতাজ তখন কী করছিলেন ? ছেলেমেয়েরা ? কোথায় থাকছিলেন ?

----- কোথায় ?

----- কোথায় নয় ? তাড়া খেয়ে খেয়ে শাজাহানের বাহিনী ছুটে বেড়াতে লাগল ? তার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে পুরো পরিবার। এখানে সেখানে অন্যখানে। সারা হিন্দুস্থান।

----- কোথায় কোথায় ?

----- মহবত - পারভেজের বাহিনীর সঙ্গে ছোটখাটো লড়াই হয়েই চলল শাজাহানের। -----আসিরগড়ের পর পুবদিকের গোলকোন্ডা অঞ্চল হয়ে অন্ধ্র সমুদ্রতীরবর্তী মাসুলিপটাম, তারপর উত্তরে ওড়িশা অবশেষে মোঘল সাম্রাজ্যের শেষ সীমা বাংলার দুর্ভেদ্য জলা-জঙ্গলের আশ্রয়ে।

----- এতো লড়াই ?

----- ছোটোখাটো যুদ্ধ। শাহী ফৌজ তাড়া করে, শাজাহান পালান।

----- পালাচ্ছেন ?

----- অনবরত।

----- আশ্রয় পাচ্ছেন ? রসদ ?

----- নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন। স্থানীয় জমিদাররা , ভূস্বামীরা , মোঘল শাহী নেটওয়ার্কের লোকজনরাই যোগাতেন। হয় স্বেচ্ছায়, নানা কারণে আগে থেকেই খেপেছিলেন অথবা.....

----- অথবা কী ?

----- অথবা যুদ্ধে হেরে।

----- টিঁকে ছিলেন ?

----- নিশ্চয়ই। ওইজন্যই তিনি শাজাহান , পরাজিত খুসরু নন , হতমান খুসরু।

----- জনপ্রিয় খুসরু ?

----- মধ্য বা প্রাক আধুনিক যুগে জনপ্রিয়তা না তলোয়ার ?

----- জনপ্রিয়তার ধারণা ?

----- ছিল, অবশ্যই ছিল তবে.....

---- কী তবে ?

-----তলোয়ারই বোধ হয় নির্ধারক....

---- তুমি কথা শেষ করছ না কিন্তু।

----আমি কথা শুরু করতে চাইছি।

---- কী নিয়ে ?

----- একটা ধারণা নিয়ে।

----- কোন ধারণা ?

---- সবাই জানত সে সময়।

----কী ? ---- মানতোও বটে।

---- কী ?

----- ইয়া তখত ইয়া তাবুত , হয় তখতে বসবে নইলে যাবে কবরে।

----- শাজাহানের কথায় ফিরে এসো।

----- আসবই তো। ষোলোশো তেইশের নভেম্বরে ওডিশার সীমান্তে পৌঁছলেন শাজাহান। -----তখন তার ক্লান্ত তাড়া খাওয়া বাহিনীতে সেপাই লস্কর কতজন ?

----- ফারুকি বলছেন মাত্র চার থেকে চার থেকে ছ হাজার ঘোড়সওয়ার আর দশ থেকে বারো হাজার পদাতিক।

----- মাত্র ! বাংলার সুবেদার, সালতানাতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ সুবার সুবেদার, কী করল ?

ওডিশার খুর্দায় শাজাহান এক দরবার বসান, সেখানে স্থানীয় অনেক ভূস্বামীরা আরো ক্ষমতা আর লুটপাটের টাকার ভাগ পেতে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করলেন ভূচুম্বন করে। তার মধ্যে রাজা পুরুষোত্তম , রাজা নীলগিরি , রাজা পঞ্চ, রাজা বজধর, রাজা নরসিংহ দেব ইত্যাদির নাম পাওয়া যায়। তাঁদের সৈন্যরা শাহজাদার বাহিনীতে যোগ দিল। এরপর শাজাহান বাংলায় ঢুকে একই প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরো জমিদারদের দলে টানলেন। আরো বেড়ে গেল ফৌজ।তখন বাংলার সুবেদার ছিলেন ইব্রাহিম খান ফতে জং , শাহী ফৌজ সারাক্ষণ ব্যস্ত অসম , আরাকান সীমান্তে বিদ্রোহী দমনে। শাজাহানের বাহিনীর কাছে হেরে গেলেন সুবেদার , তাঁর মৃত্যু হল।

সপ্তদশ শতকের শুরুতে ,বাবা জাহাঙ্গীর একই রকম বিদ্রোহ ঘোষণা করে ছিলেন বাদশাহ আকবরের বিরুদ্ধে ,তিনি সরাসরি নিজেকে হিন্দুস্থানের বাদশাহ ঘোষণা করেন। শাজাহান তা না করলেও বাদশাহী সব আদবে চলতে শুরু করলেন। যেমন ফরমান জারি , ভোরে ঝরোখায় প্রজা দর্শন, হাতির লড়াই দেখা , পেশকস বা উপহার হিসেবে হাতি নেওয়া , শুক্রবার নামাজের খুতবায় নিজের নাম ঘোষণা, শাহী শিকারাভিযানে অংশ নেওয়া ,সর্বোপরি মনসব বিলি। সুবে বাংলা দখল করে প্রচুর টাকা পয়সাও আসছে শাজাহানের হাতে। ওড়িশা , বিহার আর অবিভক্ত বাংলা নিয়ে গঠিত অনেক দূরের দুর্গম বনজঙ্গলে ঘেরা এই প্রান্তিক অঞ্চলে, অনেক স্থানীয় রাজারাজড়াই অনেকাংশে সাম্রাজ্যের কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করতেন। মোঘল সালতানাতের নাম নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোষাগার আর অন্যান্য লুটের তিরিশ চল্লিশ লক্ষ টাকা বিলি করে , অকাতরে মনসবদারী খেতাব বিলিয়ে , জমিজমা- জায়গির দান করে , নানা পদে স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিযুক্ত করে, সর্বোপরি সুবার প্রশাসনিক পদে নিজের লোক নিয়োগ করে নিজের একটা প্রভাব ক্ষেত্রও বানিয়ে ফেললেন শাজাহান । । দানধ্যান করে পক্ষে টানছেন মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের। এঁরা সবাই মিলে জোগাচ্ছেন টাকাপয়সা, সৈন্য সামন্ত , জলপথে যাতায়াত বা যুদ্ধের জন্য নৌকো, গোলা -বারুদ , ঘোড়া ,সৈন্যদের জন্য অফুরান খাদ্য সরবরাহ। এমনকি প্রচুর যুদ্ধকুশলী হাতিও পাওয়া যাচ্ছে এই সমৃদ্ধ সুবা থেকে। যাচ্ছেন নানা সুফি দরবেশের পরিবারবর্গের সঙ্গে দেখা করতে।

প্রথমে আকবর আর তারপর জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলা সীমান্তে মোঘল শাসন পোক্ত হয়। নগদে রাজস্ব আদায় চালু করলেন আকবর । গ্রাম থেকে দিল্লী দরবার পর্যন্ত সে রাজস্ব পৌঁছে দেওয়ার কাঠামো তৈরি করা হল। মুদ্রা সঞ্চালন নির্ভর লেনদেন বাড়ল , শিল্পবাণিজ্য বিকশিত হচ্ছে দ্রুত গতিতে। জনসংখ্যা বাড়ায় বাংলার বনজঙ্গল কেটে চাষের জমি হাসিল করায় উৎসাহ দেওয়া হতো জমিদারদের , উদ্দেশ্য নগদে আরো খাজনা আদায়। একই সঙ্গে মোঘল সালতানাতের ছত্রছায়ায় বাংলার সুফি সাধকরা জঙ্গল হাসিল করে চাষাবাদের প্রসার , গ্রামপত্তন , ব্যবসা বাণিজ্য , ঋণদানের নেটওয়ার্ক তৈরি করে বাংলার মতো করে ইসলাম ধর্মের সীমানা প্রসারিত করেন। এ ইসলাম আরবী -পারসিক নয় , বাংলার মাটি-মানুষ-জনপদের বিকাশের সঙ্গে লিপ্ত এক অন্য ন্যারেটিভ। এই নতুন আর্থসামাজিক বিন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে গড়ে উঠছে মোঘল শাসনের প্রশাসনিক রাজধানী গুরুত্বপূর্ণ শিল্পবাণিজ্য কেন্দ্র ঢাকা শহর। হিন্দুস্থানের সব জায়গার মতোই , শক্তিশালী ইন্দো-ইসলামী শাসনের নৈতিক ভিত্তি ছিল বাংলার এই আটপৌরে মাজারগুলো। সেগুলো তৈরিতেও বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব বেশি রকমের।

শাজাহান অনেক মাজারে জিয়ারতে -পুণ্যযাত্রায় যাচ্ছেন। তার মধ্যে পড়ে পাণ্ডুয়ার শেখ নূর কুতুব ই আলমের মাজার। সেখানে তিনি ফতিহা -মৃতদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলেন , পীর -ফকিরদের দান করলেন চার হাজার টাকা। তারপর তিনি রসুলপুর -নবীগঞ্জে কদম রসুলের মাজারে গেলেন। সেখানে হজরত মুহম্মদের পদচিহ্ন আছে বলা হয়, টাকাপয়সা দিলেন। বর্ধমানে পীর বাহরাম সাক্কার সমাধিতে পৌঁছে যাচ্ছেন তিনি। যেখানে আরো শুয়ে আছেন দ্বন্ধযুদ্ধে নিহত দুই মোঘল সেপাইসালার নূরজাহানের প্রথম স্বামী আলী কুলি বেগ উরফে শের আফগান আর নবাব কুতুবুদ্দিন। স্থানীয় ইতিহাসের অঙ্গ হয়ে পড়ছে ঘটনাবলী।

এখনকার পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান স্টেশনে নেমে, জি টি রোড দিয়ে বিজয় তোরণ, সেখান থেকে বিজয় চাঁদ রোড দিয়ে রাজবাড়ি উত্তর ফটক, তার বাঁয়ে ময়ূর মহল , সেখান থেকে পুরাতন চক হয়ে সাহা চেতন রোড পৌঁছে দিচ্ছে পীর বাহরাম সাক্কার মকবরা। ভেতরে শ্যাওলা ঢাকা কতগুলো সিমেন্ট বাঁধানো সমাধি , তার পর মূল গম্বুজের তলায় ছায়া ঢাকা অঞ্চলে 'দানের ব্যবস্থা' লেখা ফুটোওয়ালা সবুজ রঙের কাঠের বাক্সের ওপর নজর যাবে, যার ভেতরে কত টাকা পড়ল গোনা হবে পরে। সামনের এক লোহার দরজার শিকের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় পীর বাহরাম সাক্কার গোলাপি চাদর ঢাকা কবর তাতে ফুল চড়ানো ছিল কি ?

ক্যামেরা ঘোরে সালোয়ার কামিজ পরা মেকওভারে সুসজ্জিত এক মেয়ের দিকে ,'' আমরা শের আফগানের সমাধিতে এসেছি। তার পাশে শুয়ে আছেন জাহাঙ্গীরের একই মায়ের দুধ খাওয়া ভাই নবাব কুতুবুদ্দিন। আর আছে পীর বাহরাম সাক্কার সমাধি। '' এভাবে আকবরের খুবই শ্রদ্ধাভাজন সুফি পীরের দরগা, এক আফগান বীরের সমাধি বলে খ্যাত হচ্ছিল। নূর জাহানও অত্যন্ত ভরসা রাখতেন এই দরবেশের দোয়ায়। মৃত্যুর পর বেগমের ইচ্ছেতেই এখানে সমাধিস্থ হলেন শের আফগান সে কথা অবশ্য কেউ বলে না। চাপকানের বোতাম খোলাতে যাঁর অধিকাংশই পাকা লম্বা দাড়ি লুটিয়ে এসে পড়েছে বুকের ওপর,সেই বৃদ্ধ মানুষ ,মকবরার দালানে বসে নারকেল ঝাঁটা পাকাচ্ছিলেন।এরপরই এসে পড়বে ঝাড়ু দেবার ওয়াক্ত। ----- আপনার নাম ?

----- আমার নাম হচ্ছে মুহম্মদ সফি।

----- আপনি এখানে কী করেন ?

-----হজরত হাজি পীর বাহরাম সাক্কা রহমতুল্লা আলেই, জলদান করে লোকদেরকে - ভিস্তি নিয়ে -কাঁধে পোকা হয়ে গিয়েছিল ওনার। এই ইস্থানে, পবিত্র মাজারে আমি ঝাড়ু দিয়ে দিয়ে সাফা করি। চল্লিশ বছর উনি লোকেদের জল খাইয়ে ছিলেন তাই বলা হতো সাক্কা -পানি দেন যিনি ।

----- কাকে ?

----- উনাকে। জলের ওপর নাম জীবন, উনি জীবন দান করেছিলেন।

----- আপনি এখানে কত দিন কাজ করছেন ?

----- হু, সে চল্লিশ বছর।

----- চল্লিশ !

----- সে তো হতেই হয় , এবার আপনি যদি বলেন শের আফগানের সম্পর্কে বা কুতুবুদ্দিনের সম্পর্কে -আমি বলতে পারি।

----- এখানে আমরা একজন কন্সার্নড পার্সনকে পেয়েছি, স্যারের কাছ থেকে আমরা জেনে নেবো - আপনি বলবেন ? ------ওই দিকটায় যে কবরটা আছে পূর্ব দিকে। পাশাপাশি দুটো কবর আছে। ঢুকেই যে কবরটা আছে সেটা শের আফগানের কবর। ওর নাম ছিল পথ্থম জীবনে আলি কুলি মির্জা বেগ। ও প্রধান সেনাপতি হিসেবে আকবরের দরবারে কাজ করতেন।

------- আকবরের ?

------- খুব সুরত নূর জাহান, মেহেরউন্নিসা, অভারতীয়, জগতের আলো, ওনার মা -বাবা আকবরের দরবারে কাজ করতে এসেছিলেন।

------ গিয়াস বেগ আর আসমত বেগম।

------ যখন বড় হল বিয়ের উপযুক্ত হল তখন সেলিমের লোভলালসা হল -একে নিকাহ করব।

------ জাহঙ্গীরের ?

------ ভারত সম্রাট আকবর মেনে নিতে পারল না- আমি কর্মচারির মেয়েকে বউমা করিব না। বাধ্য হয়ে তখন এই ভদ্রলোক আলি কুলি বেগের সাথে ওর নিকাহটা দিয়ে দেয়।

------- তারপর ?

------- এইবেরে দেখল সেলিম, যে শালা আমার হাত থেকে ফসকে গেল! ছলে বলে কৌশলে কী করে একে মারব । কী করে মেহেরুন্নিসাকে জয় করব। এই চিন্তাভাবনা- মনে মনে পাঁয়তাড়া আঁটতে লাগল।

------ পাঁয়তাড়া ?

------ এরকম মানুষ পৃথিবীতে আপনি হাজারে একটা পাবেন যার মনে কোন কাদা কবর নাই। এই লোকটির মতো।

------ কোন লোকটি ?

------ এই শের আফগান লোকটির মতো। এগুলো আপনি হাজারে একটা পাবেন গাঁ গ্রামে, অঞ্চলে সাইডে,সোজাসাপটা সরল প্রকৃতির মানুষ যার মনে কোন কাদা কবর আদৌ ছিল না। আদৌ জানত না যে ওমন জায়গায় বাঘ বাস করে কিন্তু সেলিম জানত।

------- বাঘ ?

------- জানত যে পানি আনতে পাঠাব এর করে বাঘ ওকে খেয়ে নেবে আর আমি মেহেরুন্নিসাকে জয় করে নেব। ওপরওলা আপনাকে রাখে তবে পৃথিবীর ক্ষমতা কোনই কাজে লাগবে না

------ একদম।

------ এইবারে চারশো এগারো বছর আগে তো রিমোট বা এরকম বন্দুক পিস্তল ছিল না বাবা। আত্মরক্ষার জন্য নবাব বাদশারা সামথিং একটা ছুরি, তলোয়ার বা খঞ্জর ইত্যাদি রাখত। তখন কিন্তু শের আফগান নাম নেই, আলি কুলি মির্জা বেগের কাছে থাকত। ও যখন পানি আনতে গেল বাঘ তখন ওকে - এবার ধরুন আপনি ক্ষমতাহীন, আমি ক্ষমতাবান। আপনি তো চেষ্টা করবেন একটা ইট দিয়ে হোক আমাকে আটকাতে। ও তখন গা দিয়ে মাংস টেনে নিয়েছে সেই বাঘকে এক হাতে মেরে ঝুলিয়ে নিয়ে চলে এসেছে।

------ এক হাতে!

------ এই অবস্থায় ,কীভাবে ,কী হালতে ,কী দশায় আকবরের কাছে খবরটা পৌঁছে গেল। আকবর বললেন -এরে এরে এতো বড় জন্তু! এখন একটা মুরগি জবাই করলেও ধড়ফড় করে তবে তার জানটা যায়।

------- বাঘ ধড়ফড় করছিল ?

------- করবেই। ও তখন বলল…..

------- কাকে ? আকবরকে ?

------- আর কাকে !

------- কী বলল?

------- বলতে গেল –বাবু ….. , আকবর বলল -তুমি আগে সেবা কর,আগে জল খাও, ওষুধ লাগাও, পরে কী ব্যাপার শুনছি । তখন কানতে কানতে বলল-ছোটবাবু আমাকে পানি আনতে পাঠিয়েছিলন।

------- কেঁদেছিল ?

------- কাঁদবে না! আকবর তখন বলল-ও! আমি সব বুঝতে পেরেছি! আজ থেকে তোমার নাম হল শের আফগান । আফগানিস্তানে যারা পাঠান বাচ্চা হয় ,তারা দু চার লোক একা দেখে নেয়। ছয় থেকে সাত ফুট লম্বা হয়। আকবর শের আফগানকে বাংলার সুবেদার করেছিল। সেলিম তখতে বসে একই মায়ের দুধ খাওয়া ভাই নবাব কুতুবুদ্দিনকে বলল -তুমি যদি ওকে মারতে পারো তুমিই সুবেদার। সে বলল -হ্যাঁ আমি পারব। আমি এখানে বিয়াল্লিশ বছর ঝাড়ু দিচ্ছি , অনেক লোকই আসে তো , তবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বলতে পারব না।

------ কী ?

------ পশ্চিম দিকে মুখ করে নামাজে বসেছিল , সেই সময় বেইমানি করে পেছন থেকে মারলো শের আফগানকে।

------ কে ?

----- নবাব কুতুবুদ্দিন। কেউ বলছে নিয়ারেস্ট রেল স্টেশন অর্থাৎ ওভার ব্রিজের ঐ দিকটায় , কেউ বলছে বোন মসজিদ , কেউ বলছে টেকনিক্যাল কলেজ ,কেউ ডিএম বাংলো এরকমই কোন একটা জায়গায় খঞ্জর দিয়ে মারল। ও তখন উঠে ওকে মারে, দুজনে হুটোপুটি করে একই জায়গায় মারা গেল শের আফগান-কুতুবুদ্দিন। ওদের এখানে এনে কবর দেওয়া হয়।

এভাবেই ইতিহাসের গল্প ইতিহাসে থেকে বা না থেকে, বর্ধমান শহরের অনেক ইতিহাস যোগের কথা বলল। পীর বাহরাম সাক্কার মাজারটির সঙ্গে লেপ্টে থাকা এক মোঘল সুবেদারের বীরগাথা বলার জন্য কেউ না কেউ থেকেই যাচ্ছে।শের আফগান জড়িয়ে যাচ্ছেন বাংলার অতীত গাথায় , নট-নাট্যকার অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন তাঁকে নিয়ে, যে নাটক শুধুই শাসন কম্মের বিবরণী নয়।

শাজাহানও জড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন এইভাবে। স্থানীয় জমিতে পা শক্ত করে বিদ্রোহী শাহাজাদারা এভাবেই নতুন সব বন্ধুত্ব পাতিয়ে ক্ষমতাবৃত্তকে আরো প্রসারিত করতেন। সে বিদ্রোহেও বেড়ে যেত মোঘল সালতানাতের সীমা। গোটা মোঘল সালতানাতকেই কেন্দ্রীকৃত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলা যায় কি ? ইতিহাসকার সঞ্জয় সুভ্রামানিয়াম মনে করেন তা ছিল এলায়েন্স স্টেট বা আঁতাতকামী রাষ্ট্র। আরেক গবেষক ফারুকি চর্চা করেছেন স্থানীয়, নানান জাতিগত, ধর্মীয় সম্প্রদায়গত আঁতাত পাতাতে শাহজাদাদের উজ্জ্বল ভূমিকার।এমনকি বিদ্রোহ করতে গিয়ে তাঁরা যেসব নতুন নতুন আঁতাত করতেন , বিদ্রোহ দমনের পরও, সে বোঝাপড়া টিঁকে গিয়ে বাদশাহের সঙ্গে বোঝাপড়ায় পরিবর্তিত হতো। শাহজাদার প্রতি আনুগত্য বদলে যেত মোঘল সালতানাতের প্রতি আনুগত্যে। জাহাঙ্গীরের সময় আফগানদের সঙ্গে মুঘলদের লড়াই লেগেই থাকত। ষোলোশো দশের প্রথমে ইব্রাহিম খান আর মুসা খানের নেতৃত্বে এক বড়সড়ো আফগান বিদ্রোহ হয়েছিল বাংলায়। আফগানরা পর্তুগিজ আর আরাকানের মগদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মোঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ত। শাজাহান ওড়িশায় বসেই গুরুত্বপূর্ণ আফগান সর্দারদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিলেন। তাঁরা সুবেদার ইব্রাহিম খানের সঙ্গে লড়াইয়ে শাজাহানকে সাহায্য করেন । সুবেদার সাহেবের মৃত্যুর পর বড় বড় আফগান সর্দাররা শাজাহানের ফৌজে যোগ দেয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হায়দার খান , মৌসম খান , খাজা দাউদ ইত্যাদি। পরে এঁরা সবাই শাজাহানকে ছেড়ে জাহাঙ্গীর বাদশাহর সেপাইসালার পদে বহাল হন। এইভাবে আফগান-মোঘল এক দীর্ঘস্থায়ী আঁতাত হয়। আর ছিল পর্তুগিজ ও অন্যান্য ক্রিশ্চান মিশনারিরা। পর্তুগিজরা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে শাজাহানকে বাংলা থেকে বিহার আর ইলাহাবাদে জলপথে যাত্রায় সাহায্য করে, কিছু পর্তুগিজ সেনা তার বাহিনীতে যোগ দেয় । এই বোঝাপড়া টিঁকল না। শাহী বাহিনী পর্তুগিজদের টাকার লোভ দেখিয়ে টেনে নিল। পরে শাজাহান বাদশাহ হয়ে আফগানদের সঙ্গে নিয়ে পর্তুগিজদের কোনঠাসা করেন।

ঠিক বিদ্রোহের সময়কালে সাধারণ মানুষের জীবনে এই রাজনৈতিক উথালপাতাল আর তীব্র সমরাভিযানজনিত হিংসার কী প্রভাব পড়ে সেটাও কম গুরুত্বের নয়। এক কথায় বলা যায়- মধ্য বা প্রাক আধুনিক যুগের যে কোন বিদ্রোহের মতোই এসবে যথারীতি শহর বা গ্রামের সব উলুখাগড়ারই প্রাণ যেত। আক্রান্ত ঘনবসতি শহরের লোকেরা সোনাদানা , ঘরবাড়ি , ব্যবসাপত্তর ছেড়ে পালাবে কোথায় ? শাহাজাদাদের ফৌজের খাঁই মেটাকে সমৃদ্ধ ব্যবসাকেন্দ্রগুলোতে চলতো লুটপাট , হত্যা , অত্যাচার যেমনটা লাহোরে করেছিলেন খুসরু। দেখা গেছে বিদ্রোহের সময় কম ঘনবসতি গ্রামের লোকেরা পালাতে বা বন জঙ্গলে লুকিয়ে পড়তে তুলনামূলকভাবে বেশি দড় ছিল কিন্তু তাতে লাভ কিছু হতো কি ? জান বাঁচাতে পালিয়ে গিয়ে ফিরে এসে তারা দেখত খেত খামার লুটে ,আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে তাদেরকে সর্বস্বান্ত করে গেছে বিদ্রোহী ফৌজ। এর চূড়ান্ত নমুনা হল শাজাহানের বিদ্রোহের চার -পাঁচ বছরের সময় কাল। বাংলা , ইলাহাবাদ , অওধ বা অযোধ্যা অঞ্চলের কৃষক এমনকি স্থানীয় ভূস্বামীদের ওপর কর আদায়ের নামে অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপিয়ে জীবন অতিষ্ট করে তুলল শাজাহানের বিদ্রোহী ফৌজ। এই জবরদস্তি আর লুটপাটের বিপুল টাকা আবার ঢালা হচ্ছিল যুদ্ধের খরচ মেটাতে আর অনুগত অভিজাত আমির ওমরাহ , মনসবদার , সেপাইসালাদের পুরষ্কার দিয়ে খুশ করতে।ফলে ষোলোশো চব্বিশের শেষে পূর্ব ভারত কেঁপে উঠেছিল জমিদারদের বড়সড়ো বিদ্রোহে। এলাকা পুনরুদ্ধার করতে জাহাঙ্গীরকে ফৌজ সমাবেশ করতে হয়।

সুবে বাংলা শাহাজাদা শাজাহানের দখলে ছিল বছর খানেক।ওডিশা আর বাংলার মতো একই সুবার অন্তর্গত বিহারেও বেশ কিছু ভূস্বামীকে দলে টানেন তিনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাজা নারায়ণমল উজ্জয়নীয়া যার অধীনে ছিল রোহতাস -সাহাবাদ অঞ্চল। এই রাজবংশ জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ষোলোশো দশে, যার পেছনে হয়ত শাহাজাদা খুসরুর মদত ছিল। এই আঁতাতের ফলে এই রাজা ও তাঁর বংশের লোকেরা মোঘল সালতানাতের স্থায়ী বন্ধুতে পরিণত হয়। রোহতাসের কেল্লাটা এই আঁতাতের ফলেই সম্ভবত শাজাহানের হাতে আসে। যে কেল্লায় এই বিদ্রোহের সংক্ষুব্ধ সময়ে ষোলোশো চব্বিশের নয়ই অক্টোবর মুমতাজ জন্ম দিচ্ছেন মুরাদের। তাঁর সঙ্গে দারা শিকহো , জাহানারা , রোশনারা ,ঔরঙ্গজেব সবাই রোহতাস কেল্লার নিরাপত্তায় ছিলেন।

মোঘল রাজপুরুষদের একটা বড় অংশ শাজাহানের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। শাহাজাদা বাংলা ,বিহার, ইলাহাবাদ আর অওধের অধিকাংশ রাজপুরুষকে পুরষ্কার দিয়ে স্বপদে বহাল রাখেন। এইভাবে তাঁর পক্ষে দ্রুত একটা বিশাল প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছিল।

এঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেন রাজস্ব আদায়ে ভারপ্রাপ্ত মির্জা নাথান। যিনি শাহী ফৌজের জন্য অল্প সময়ের নোটিশে সেনা জোগাড় করে ফেলতেন । তাঁদের মধ্যে ছিলেন হাজার হাজার হোজো বা গারুনান তীরন্দাজ , পদাতিক , বন্দুকবাজ , ঘোড়সওয়ার বা ওসমানী আফগান যোদ্ধা। ওনার আরেক নাম হলো আলাউদ্দিন ইসফাহানি। ষোলোশো পাঁচ থেকে চব্বিশে, শাজাহান সুবে বাংলা দখল নেওয়ার আগে পর্যন্ত ,জাহাঙ্গীরের অধীনে কাজ করেছিলেন তারপর হলেন শাজাহানের সহযোগী। শাজাহান ব্যর্থ হয়ে দাক্ষিণাত্যে পালালেন আর মির্জা নাথান শাহী রোশ থেকে বাঁচতে হলেন বেপাত্তা, গায়েব হয়ে এক অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন- গায়েবি ছদ্মনাম নিয়ে । বইটা ফার্সিতে , নাম হল বাহারিস্তান ই গায়েবি। মোঘল বাংলা আর আশপাশের অঞ্চলের এক মাত্র ইতিহাস বই। গায়েব হয়ে মির্জা নাথান এ বই লেখেন ! তিনি এক বাহারিস্তানের অনেকটা ঠিকঠাক বর্ণনা করেছেন, এমনটা সেই আচার্য যদুনাথ থেকে আজকের ফারুকি পর্যন্ত সব ইতিহাসকাররাই মানছেন। আর মানবেন নাইবা কেন ! মোঘল নৌ সেনাপতি - মীর বহরের ছেলে ছিলেন তিনি। সুবেদার ইসমাইল খানের আমলে আফগান বিদ্রোহে আর বারোভূঁইয়াদের একমেবাদ্বিতীয়ম প্রতাপাদিত্যের সঙ্গে তিনি লড়েছেন, কোথায় না লড়েছেন : কোচবিহারে , কামরূপে , কাছাড়ে, আরাকানে , চট্টগ্রামে। তার লেখকের মতোই অনেকদিন গায়েব হয়ে থাকে বইটা। অবশেষে আচার্য যদুনাথ ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারে বইটা খুঁজে পান, তাঁর লেখার ফলে গায়েবি আবার জনসমক্ষে এলেন যদিও এই ফরাসি যোগাযোগটা পরিষ্কার হচ্ছে না কিছুতেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি অধ্যাপক এম আই বরা বইটার ইংরিজি অনুবাদ করেন যা তৎকালীন আসাম সরকার প্রকাশ করছেন উনিশশো ছত্রিশে। চার দফতর বা উপাংশে বিভক্ত বইটার প্রথম দুটো লেখা হল ষোলোশো বত্রিশের আগে শেষ দুটো একচল্লিশের আগে। ষোলোশো চব্বিশের শেষে বা পচিঁশের কয়েক মাসের মধ্যে বেপাত্তা হন মির্জা নাথান , এমনি তাঁর বাংলার মাটির সঙ্গে যোগ ছিল যে জাহাঙ্গীরের চোখে ধুলো দিয়ে পালালেন আর তারপর আড়ালে থেকে রচনা করলেন ওই কালপর্বের অমূল্য চিত্রণ। শাজাহান ও তাঁর বিদ্রোহ প্রসঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও ওই বইতে আছে।

“ভীষণ গরম - মানুষ বল আর অবলা জীব, না খেয়ে কে থাকবে । বাদশাহের তো রোজা না মানলে, নামাজ কবুল না করলে দোষ নেই, তাঁর দায় ইনসাফ করায়, তবু আমাদের শাহেনশা ( এ ক্ষেত্রে শাহজাদা শাহজাহান ) আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় আর আল্লাহের দোয়া মাঙতে এই গরমেও রোজা মানছেন। ”

লিখছেন মির্জা নাথান উরফে গায়েবি তাঁর বাহারিস্তান ই গায়েবি বইতে। প্রত্যক্ষদর্শীর কলমে বিদ্রোহের এ এক নতুন দিকচিহ্ন বটে। ফারুকির মতে, শুধু উনি নন সুবে বাংলার অধিকাংশ সুফি আর আলিমরা শাহজাহানের ধর্মনিষ্ঠায় আকৃষ্ট হয়ে তাঁর বিদ্রোহে সামিল হয়েছিলেন।
----------------
অতিরিক্ত তথ্য সূত্র : The Princes of Mughal Empire ,1504-1719, Munis D. Faruqui




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. মুগ্ধ হলাম। এমন অনায়াস দক্ষতায় সত্যিকারের ইতিহাস রচনা অভাবনীয়

    উত্তরমুছুন
  2. কখনও ডকু ফিকশন, কখনও ফোর্থ ওয়াল ব্রেক করছে ন‍্যারেটিভ।
    কত পড়াশোনা, কত পরিশ্রম অথচ সে সব বোঝা হয়ে আসছে না, লেখা অনায়াস , সুন্দর। এ লেখা পড়তে পারা ভাগ্যের কথা।
    বড় দেরি করে কিস্তিগুলি আসে, এটাই একমাত্র অভিযোগ।

    উত্তরমুছুন