নোভায়োলেট বুলাওয়েয়োর গ্লোরী: এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ক্ষমতাকাঠামোর বস্ত্রহরণ


এলহাম হোসেন

আফ্রিকার প্রথম প্রজন্মের লেখকগণ মূলত আফ্রিকার ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক পরিস্থিতি নিয়ে রচনা করেছেন তাঁদের উপন্যাসসমূহ। স্বাধীনতাত্তোর প্রজন্মও এই প্রায় একই বিষয়বস্তু নিয়ে লিখছেন। এর অবশ্য কারণ রয়েছে। এখনও আফ্রিকার অনেক দেশে গণতন্ত্র তার পায়ের তলায় শক্ত মাটি পায়নি। নেতৃত্বের ব্যর্থতা, বারবার সামরিক অভ্যুত্থান, নজিরহিীন দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ভোট কারচুপি আফ্রিকার অনের দেশের এখনও ক্রণিক সমস্যা। আর লেখক তো, চিনুয়া আচেবে যা বলেছেন তাঁর ‘দ্য নোভেলিস্ট অ্যাজ আ টিচার’ প্রবন্ধে বলেছেন যে, ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক, অর্থাৎ লেখকের দায় সমাজের কাছে। তিনি সমাজের সমস্যাগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাই তাঁকে কলম ধরতে হয়। এখনও আফ্রিকার শরীর থেকে শত-সহস্র মুখে রক্ত আর ঘাম ঝরছে। একদিকে সাম্রাজ্যবাদ, অপরদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যর্থতা আফ্রিকাকে প্রতিনিয়ত ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে। আফ্র্রিকার লেখক সাহিত্যিকদের ঘিরে রয়েছে নানা ভয়ভীতি, নানা অনিশ্চয়তা তাই তো আফ্রিকার সাহিত্য আনন্দ সাহিত্য নয়। মানুষ বার বার প্রতারণার শিকার হচ্ছে। কখনও স্বৈরশাসক, আবার কখনও সামরিক জান্তা এদের মাথার উপর ছড়ি ঘুরাচ্ছে। আফ্রিকার দেশ জিম্বাবুয়ের ক্ষমতায় প্রায় চার দশক অবৈধভাবে ছিলেন রবার্ট মুগাবে। ১৯১৭ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তাঁর পতন হলেও সেখানকার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসেন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট এমারসন নানগাগওয়া। মানুষ আবারও হতাশ হয়। সেখানে শ্বেতাঙ্গ হত্যা, তাদের সহায়-সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এমন এক অসহনীয় মাত্রায় পৌঁছে গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সেখানকার প্রেসিডেন্ট এবং কতিপয় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এদের সম্পদ জব্দ করেছে। এমতাবস্থায় সেখানকার পরিস্থিতিতে জন্ম নেওয়া সাহিত্য নিশ্চয় আনন্দ সাহিত। হবে না। নোভিয়োলেট বুলাওয়েয়ো এই উদ্ভ্রান্ত ও অনিশ্চিত সময়ের সাহিত্যিক্। তাই তাঁর কলম থেকে বেরিয়েছে এই শক্তিশালী উপন্যাস গ্লোরী।

নোভিয়োলেট বুলাওয়েয়োর দ্বিতীয় উপন্যাস গ্লোরী (২০২২) বিষয়বস্তুতে যেমন সাহসী, রচনাশৈলীতে তেমনই স্বতন্ত্র।নিউ আফ্রিকান ম্যাগাজিন তাঁকে আফ্রিকার একশ প্রভাবশালী লেখকের অন্যতম ঘোষণা করেছে। ১৯১৩ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস উই নিড নিউ নেইম্স- এর জন্য বুকারজয়ী লেখকদের সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত হন। ২০২২ সালেও তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস গ্লোরীর জন্য তিনি আবারও সম্ভাব্য বুকারজয়ীদের সঙ্গে তালিকাভূক্ত হন। তিনিই প্রথম আফ্রিকান লেখক যিনি প্রথম সম্ভাব্য বুকারজয়ীদের সংক্ষিপ্ত তালিকাভূক্ত হন। তবে এটিই শেষ কথা নয়। ২০১১ সালে ‘হিটিং বুদাপেস্ট’ নামক ছোটগল্পের জন্য তিনি কেইন প্রাইজ লাভ করেন। এছাড়া তিনি এটিসালাট প্রাইজ ফর লিটারেচার এবং হেমিংওয়ে ফাইন্ডেশন/পিইএন অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন। বুলাওয়েয়োর জন্ম জিম্বাবুয়েতে ১৯৮১ সালে। লেখাপড়া মূলত নিজ দেশ ও আমেরিকায়। ইংরেজি সাহিত্য ও চারুকলা নিয়ে লেখাপড়া করেছেন। তিনি একজন কর্মীষ্ঠ লেখক যাঁর কাজ হস্তিদন্ত নির্মিত প্রাসাদে বসে সাহিত্য রচনা করা নয়; তাঁর কাজ নিজেহাতে সমাজটাকে আমূল বদলে দেওয়া। সমাজতান্ত্রিক সমাজ-ভাবনা তাকে প্রভাবিত করে। তিনি জর্জ অরওয়েলের এনিমেল ফার্ম উপন্যাসের দ্বারা প্রভাবিত। তিনি সমাজকে ঝাকুনি দিয়ে বদলাতে চান। স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, নিপীড়ন রুখে দিতে চান। এমনই মনোভঙ্গি নিয়ে রচিত হয়েছে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস গ্লোরী। চরিত্রচিত্রণ, বিষয়বস্তুর অবতারণা, পঁচে যাওয়া রাজনীতির মুখোশ-উন্মোচন তাঁর অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় বহন করে।

রবার্ট মুগাবে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতা আন্দোলনের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিপ্লবী, রাজনীতিক; একেবারে মাঠপর্যায় থেকে উঠে আসা রাজনীতিবিদ। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত তিনি জিম্বাবুয়ের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তারপর ১৯৮৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত একটানা ত্রিশ বছর প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিম্বাবুয়ে শাসন করেন দৃঢ় প্রতাপর সঙ্গে। ১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকে তিনি নিজেকে মার্কসবাদী ও লেনিনবাদী বলে ঘোষণা করেন। সমাজতন্ত্রী নেতা বলে নিজেকে দাবী করেন ক্ষমতা গ্রহণ করার প্রথম দিকে। জাতির পিতা হয়ে ওঠেন। কিন্তু শীঘ্রই মানুষের আশাআকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে তিনি ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরশাসকে পরিণত হন। যে ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেন, সেই ঔপনিবেশিকতাবাদেরই তিনি উত্তরাধিকার বহন করেন স্বাধীন জিম্বাবুয়েতে। আফ্রিকার জাতীয়তাবাদ, বহুজাতিক আফ্রিকান ভাবাদর্শ, দেশপ্রেম ইত্যাদির কথা বলে তিনি তাঁর নিজস্ব একটি মতবাদ দাঁড় করান। এটি মুগাবেবাদ বলে পরিচিত। অবশেষে ২০১৭ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুগাবের পতন হয়। ২০১৯ সালে তিনি মারা যান। জনগণ আশায় বুক বাঁধে যে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেটি দূরাশায় পরিণত হয়। নজিরবিহীন দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, শ্বেতাঙ্গবিরোধী সন্ত্রাস, গণহত্যা, গুম-খুন ইত্যাদি জিম্বাবুয়ের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যপারে পরিণত হয়। এমন হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির শরীর ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে এই নোভিয়োলেট বুলাওয়েয়োর উপন্যাস গ্লোরী।

উপন্যাসের শুরুতে দেখা যায় স্বাধীনতা র‌্যালিতে জিদাদা স্কয়ারে স্বৈরশাসক বুড়ো ঘোড়া সমবেত অসংখ্য পশুর সামনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশে তার নারী সঙ্গী ড. সুইট মাদার। সে একটা গাধা। টুভি নামের আরেকটি ধোড়া পাশে দাঁড়িয়ে আছে মঞ্চে। সে ভাইস প্রেসিডেন্ট। স্বৈরশাসক বুড়ো ঘোড়া স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন উপলক্ষ্যে জিদাদা স্কয়ারে হাজির হন বিকেল ৩টা ২৮ মিনিটে। কিন্তু সাধারণ জনতা যারা আসলে সবাই পশু, সকাল থেকেই এই স্থানে সমবেত হতে থাকে। এই স্বৈরশাসক সবার চেনা। সবার প্রিয় না হলেও সবার অতি পরিচিত কারণ, সে এক দশক, দুই দশক নয়, পুরো চার দশক ধরে জিদাদা শাসন করছে। দেশটাকে ভাগ করে ফেলেছে সে, ভৌগলিকভাবে নয়, মনস্তাত্ত্বিকভাবে। এই দেশ ঔপনিবেশিকদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য যারা তার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, তাদের সে বলে লিবারেটর। যারা যুদ্ধ করেনি, তাদের সে নন এনটিটি বলে চিহ্নিত করে। নিজের স্বৈরশাসন জায়েজ করার জন্য ধর্ম ব্যবহার করতেও সে ছাড়ে না। সে তার প্রজাদের (প্রাণী) সম্মুখে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করে- ঈশ্বরের ইচ্ছা পূরণের জন্যই সে আজ দেশের এবং এই জাতির পিতা এবং ক্ষমতায় চার দশকে ধরে আসীন আছে ঈশ্বরেরই নির্দেশে। কিছু উলঙ্গ নারী পশু অতর্কিতে হামলা চালায় মঞ্চে। তারা শ্লোগান দেয় তাদের গুম হয়ে যাওয়া ভাইদের ফেরত চেয়ে। এদের আত্মীয়-স্বজনদের গুম করেছে এই স্বৈরশাসক ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য।

স্বৈরশাসক বুড়ো ঘোড়া মঞ্চে আসা মাত্রই তার ভাইস প্রেসিডেন্ট টুভি, যে নিজেও একটা বুড়ো ঘোড়া, সম্মুখে এক পা উঁচিয়ে ধরে সব প্রাণীর উদ্দেশ্যে শ্লোগান দেয়- চল সবে এগিয়ে যাই। তার সঙ্গে কণ্ঠ মেলায় স্কয়ারে সমবেত হওয়া লক্ষ লক্ষ প্রাণী। এই দেশের সব অধিবাসীকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় থলুকুটি। এরা ঘোষণা করে, এদের শাসকের জন্য এদের রয়েছে অগাধ ভালোবাসা। তাঁদের প্রেসিডেন্টের প্রতি তাদের আনুগত্য তাদের রক্তে মিশে রয়েছে।

বুড়ো ঘোড়ার সঙ্গী তার স্ত্রী একটা গাধা। তবে তার পিএইচডি ডিগ্রী রয়েছে। সে বিশ্ববিদ্যালয়কে বলেছে, সবাই তো তাকে কতকিছু গিফট করতে চায়। দিতে পারলে তারা নিজেদেরকে ধন্য মনে করে। তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় কেন তাকে একটা পিএইচডি ডিগ্রী দেবে না। ব্যাস, যে কথা সেই কাজ। বিশ্ববিদ্যালয় সুইট মাদারের উপর পিএইচডি ডিগ্রী অর্পণ করে। এই ডক্টর সুইট মাদারের অতি মাত্রায় ক্ষমতা লিপ্সার জন্য দেশে অস্থিরতা তৈরী হয়েছে। সে কথায় কথায় তার প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে। ঘায়েল করার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। তার কথা জঘন্য বমির মতো। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট টুভি, যার ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; এমনকি বুড়ো ঘোড়ার মৃত্যুর পর। কাজেই, সে ড. সুইট মাদারের ষড়যন্ত্রের শিকার। সে গাড়ি দুর্ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে যায়। তারপর প্রাণভয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে যায়। পরে সামরিক অভ্যুত্থানের পর বুড়ো ঘোড়ার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটলে তদস্থলে টুভি ক্ষমতায় বসে নির্বাসন থেকে ফিরে এসে। হিংস্র কুকুর সজ্জিত সামরিক বাহিনী তাকে ক্ষমতায় বসায়। তার অন্তরালে অবশ্য সামরিক বাহিনীই ক্ষমতার কলকাঠি নাড়ে। তাই টুভির পথ মসৃণ নয়। বন্ধুর। সে সেনাবাহিনীর পুতুল শাসকে পরিণত হয়। তার আশেপাশে বিশ্বস্ত কেউ নেই। খুব কাছ থেকেজেনারেল জুডাস রেজার মতিগতির উপর সে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। তাকে বিশ্বাস করে না। সে বিশ্বাস করে শুধু তার পোষা পিটবুলকে। এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে দেশ যখন দুলছে তখন জিদাদারসম্পদের ওপর উপর শ্যেনদৃষ্টি পড়েছে চীন ও ইউরোপ-আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর। জিদাদা সম্পদে পরিপূর্ণ একটি দেশ। কিন্তু দেশটি দরিদ্র। এই দারিদ্রের কারণ তাদের মধ্যে বিভক্ত অতিমাত্রায় বিভক্তির কারণে তারা সাম্রাজীবাদী দেশগুলোর তৎপরতা রুখে দিতে পারে না।

ক্ষমতার একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি কোন প্রতিরোধ বা প্রতিবন্ধকতা সহ্য করতে পারে না। তাই ক্ষমতা সবসময় পরমকে স্পর্শ করতে চায়। পরম হয়ে উঠতে চায়। জিদাদা দেশটিও এর শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে অনন্য। এর কোন জুড়ি নেই। তবে এর শাসকগোষ্ঠী জানে মানুষকে কিভাবে আবেগের বশীভূত করে বোকা বানানো যায়। টুভি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ঠিকই আশ্রয় নেয় যাদুবিদ্যার শক্তির উপর। প্রেসিডেন্ট হয়েই সে তার মাথায় একটি স্কার্ফ পরিধান করতে শুরু করে। এর রং দেশটির পতাকার রং থেকে চুরি করা হয়েছে। সে যাদুটোনাকারী ওঝার কাছে যায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা লাভের জন্য। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম সে যাবে বিদেশ সফরে। তাই সে যাদুকরের কাছে যায়। যাদুকর তাকে তাবিজ দেয়। নির্দেশ দেয় ধারণ করতে। মনে করিয়ে দেয়, এটি যেন সে তার শরীর থেকে আলাদা না করে। তার শরীরের চামড়া যেমন অপরিহার্য এই তাবিজও তেমনি অপরিহার্য। এরপর হলফ করে ঘোষণা করে, “Nothing, and I mean nothing, shall touch you.” (118) ।

এই যখন আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি তখন টুভি নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও নির্বিঘ্ন করতে বিরুদ্ধ মত ও পথের অবদমন করতে পিছপা হয় না। আর এই অবদমনের ক্ষেত্রে যদি জনগণের সমর্থন পাওয়া যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। তাই টুভি প্রথমেই কমরেডদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতায় দেশটাকে দু’ভাগে ভাগ করে। একটা ভাগে দেশের স্বাধীনতার পক্ষের লোকজন। এরা ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এই ভাগে টুভি নিজে রয়েছে। অপর ভাগ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। এদেরকে টুভি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী বলে আখ্যায়িত করে। ব্র্যান্ডিংয়ের মধ্যে রাজনীতি তো রয়েছে। টুভি কমরেডদের বলে, যদি এই নৈরাজ্যকারীরা এদেশে না থাকত, তবে সে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শাসক। তবে ক্ষমতা নিশ্চিত ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য সবগুলো মন্ত্রণালয় স্থাপন করেছে টুভি। মিনিস্টার অব অর্ডার, মিনিস্টার অব ইন্টারনেট, মিনিস্টার অব থিংস ইত্যাদি মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রী তৈরী করে স্বৈরশাসক টুভি তার ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে।

তবে মানুষ তো চায় স্বাধীন হতে। কিন্তু ক্ষমতার বলয় ভাঙ্গা সহজ কাজ নয়। কঠিন কাজ। এখান থেকে তবুও মানুষ মুক্তি চায় না। উপন্যাসের শেষের দিকে হঠাৎ ডেসটিনি নামের একটি ছাগলের আবির্ভাব ঘটে। প্রায় ১০ বছর সে নির্বাসিত ছিল। নির্বাসন থেকে ফিরে আসে এবং মানুষের মধ্যে আশা জাগায়। কিন্তু সেই ছাগলটিও শেষ পর্যন্ত পারে না মানুষকে আশাবাদে সিক্ত করতে। এই তো বাইবেলের বুক অব গ্লোরীর কথা। যিশুর ক্রশবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণের আগের রাতে সঙ্গীদের তিনি উপদেশ দেন। তাঁর পুনর্জাগরণের পূর্বাভাষ দেন। কিন্তু পরের দিন যিশুকে ক্রশবিদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ যিনি পরিত্রাণ দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন, তাঁকেই মানুষ হত্যা করে। নোভায়োলেটের উপন্যাস গ্লোরীতেও ঠিক একই ব্যাপার পরিলক্ষিত হয়। যিনি একসময় স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র-ক্ষমতায় গিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরশাসক। ক্ষমতা তো তেজি সুরার মতো। এটি পেয়ে বসলে হুঁশ হরণ করে।

ক্ষমতা অদ্ভূত এক আসক্তিরও নাম। ফ্রান্সিস বেকন তাঁর ‘অব গ্রেট প্লেইস’ প্রবন্ধেও মানুষের এই অদ্ভূত প্রবৃত্তি ও আসক্তির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, মানুষ অন্যের উপর ক্ষমতা অর্জন করতে চায়। কিন্তু এই চাওয়া পূর্ণ হওয়ার পর সে দেখে, সে তার নিজের উপরই ক্ষমতা হারিয়েছে। নিজের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে। তখন অন্যরা যদি তাকে বলে, সে সুখী, তবেই সে সুখ বোধ করে; আত্মপ্রসাদ বোধ করে। নিজের বিবেচনায় সে নিজে কখনই সুখী নয়। কারণ, সে স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে ক্ষমতার নজরবন্দী হয়ে পড়ে নিরাপত্তার কারণেই। মিশেল ফুকোর মতে, ক্ষমতা কিন্তু স্বাধীনতা হারানো নয়, অধিকারের হাতবদল নয়। আবার ক্ষমতা সন্ত্রাসও নয় যার বিপরীতে রয়েছে পরোক্ষতা বা নিষ্ক্রিয়তা। ক্ষমতা আসলে তরল এবং এটি ছড়ানো। নানানভাবে নানান রূপে এটি সমাজে জালের মতো ছড়িয়ে রয়েছে এবং ক্রিয়াশীল। যে জ্ঞান মানুষ গ্রহণ করে, সত্য বলে সমীহ করে, সেই জ্ঞানই শক্তিশালী। যিনি এটি চাপিয়ে দিতে পারেন বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে, তিনিই ক্ষমতাবান। ম্যাক ওয়েবার তো মনে করেন, কাক্সিক্ষত ফল লাভ করার সামর্থ্যই ক্ষমতা। ক্ষমতার নানান মাত্রা রয়েছে। অর্থাৎ, সামাজিক, মনস্তাত্তি¡ক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্তি¡ক। ক্ষমতা যতটা না দৃশ্যমান তার ফলের মধ্যে তার চাইতে অনেক বেশী বিদ্যমান তার কৌশলের মধ্যে। কারণ, ক্ষমতা বন্দুক, তলোয়ার ব্যবহার না-ও করতে পারে। তবে সার্ভিলেন্স বা চোখে চোখে রাখার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, গোষ্ঠী বি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটিকে প্যানোপটিসিজম বলা হয়েছে। ক্ষমতার চর্চার সঙ্গে আইডিওলোজি বা প্রচলিত ধ্যানধারণার কথাও প্রাসঙ্গিক। আসলে আইডিওলোজি একটি প্রবঞ্চিত করার মতো ধারণা। এর বাঁধাছকে বাঁধা পড়ে গেলে নতুন জ্ঞান বা বেজিস্ট্যান্স তেরী হয় না। আইডিওলোজি যখন মানুষের উপর চেপে বসে, রেজিস্ট্যান্স তৈরী হতে দেয় না, তখন আন্তোনিও গ্রামসির ভাষায় সেটি হেজেমনিতে পরিণত হয়। তবে এ কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, ফুকোর ক্ষমতার ধারণা মূলত হিস্টোরিসিস্ট; মার্কসীয় নয়। গ্রামসির ক্ষমতার ধারণা আবার ‘বলপ্রয়োগ’ ও ‘বোঝাপড়া’-এই দুই বিশেষ উপষঙ্গের উপর প্রতিষ্ঠিত। ফরাসী দার্শনিক লুই আলথুসার মনে করেন, বুর্জোয়ারা সমাজের উপর ক্ষমতা আরোপ করে নির্যাতন করার উপযোগী টুল বা অস্ত্র ব্যবহার করে এবং আইডিয়োলোজি ব্যবহার করে। আইডিয়োলজি একটি শক্তিশালী অ্যাপারেটাস। এর মধ্যে ধর্মতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব, মনস্তুত্ত্ব সবই রয়েছে। এই অ্যাপারেটাস রাষ্ট্র ব্যবহার করে থাকে। জনগণকে যে কোন দিক থেকে বেঁধেফেলা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য।

এবার আসা যাক গ্লোরী নিয়ে আলোচনায়। আলোচ্য উপন্যাসেও দেখা যায়, যখন যে ক্ষমতায়, সে-ই রাষ্ট্রের নানান অ্যাপারেটাস ব্যবহার করে মানুষের উপর হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু ক্ষমতা যেখানে চর্চা করা হয় সেখানে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা বিরুদ্ধ-বলের নির্মাণ হয়। প্রতিরোধ তৈরী হয়। এই প্রতিরোধ বিদ্রোহ, বিপ্লব ইত্যাদি চেহারা ধারণ করে। এমনই পরিস্থিতিতে দেশের রাষ্ট্র-ক্ষমতার শীর্ষব্যক্তি বৃদ্ধ ঘোড়ার পতন হয় আকস্মিক সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। গণতন্ত্র ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

এতসব ব্যর্থতার কারণ কিন্তু শুধু রাজনীতি নয়। আফ্রিকার প্রায় সবগুলো দেশই স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সোজা হয়ে গণতন্ত্রের পাটাতনের ওপর দাঁড়াতেই পারেনি। আজও। এর কারণ এর রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইডয়োলজির মধ্যেও নিহীত রয়েছে। রাজনীতিও মাল্টিডিসিপ্লিনারী। এর সঙ্গে অনেক উপষঙ্গের ইন্টারটেক্সুয়ালিটি ঘটেছে। তাই জিদাদার রাজনৈতিক ব্যর্থতার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে হলে এখানকার সমাজব্যবস্থার অন্যান্য উপষঙ্গও বুঝতে হবে। শৃংখলা, নিয়ম, আইন ইত্যাদি বলতে শাসকশ্রেণী যা বোঝে তা হলো কোনরূপ বিদ্রোহ, বিপ্লব না করা। যে নাগরিক রাষ্ট্রের সমালোচনা করে না, সে সুনাগরিক, আদর্শ নাগরিক। এমন প্রচারণার মধ্যে প্রতারণার ইন্ধন রয়েছে। সে শিক্ষাব্যবস্থা অভিনব জ্ঞানের প্রতি কৌতুহল বিহীন বুদ্ধিবৃত্তিক দাস উৎপাদন করে, সেটি প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা নয়। শিক্ষার উদ্দেশ্যও এটি হতে পারে না। এমন দাস ক্ষমতা-কাঠামোর জন্য নিরাপদ কারণ, এরা প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করতে শেখেনি। প্রতিপ্রপঞ্চ নির্মাণ করতে জানে না। প্রতিবাদের বাণী এদের কন্ঠে ধ্বনিত হয় না। ঔপনিবেশিক যুগে ভারতবর্ষের কতিপয় মানুষের ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়ার প্রতি আনুগত্য দেখে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) লিখেছিলেন:

তুমি মা কল্পতরু আমরা সব পোষা গরু
শিখিনি শিং বাঁকান
কেবল খাবো খোল বিচিলি ঘাস।।
আমরা ভুসি পেলেই খুশি হ
ঘুসি খেলে বাঁচব না।

ক্ষমতাকাঠামো মুখে না হোক, মনেপ্রাণে চায় কল্পতরু উৎপাদন করতে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়কে এই কল্পতরু উৎপাদনের কারখানায় পরিণত করে নানান কলাকৌশলে। স্বাধীনতাত্তোর জিদাদা এমনই এক দেশ যার নাগরিকরা কল্পতরু। ফলে, স্বৈরশাসক বুড়ো ঘোড়া ক্ষমতাচ্যুত হলেও জনতার মাথার ওপর এসে বসেছে আরেক স্বৈরশাসক। এর শেষ কখন? এর উত্তর অবশ্য নোভায়োলেট তাঁর গ্লোরীতে দিয়েছেন। দেশের মানুষ যতদিন চাইবে, যতদিন সইবে, যতদিন প্রতিবাদের প্রপঞ্চ তৈরী না করবে, ততদিন স্বৈরশাসনও চলবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ